📄 ভূমিকা
ছয়শ দশ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য আরব এক নাটকীয় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে চলে আসে। এটা শুধু তার একার ইতিহাস নয়। বরং আসন্ন শতাব্দীগুলোর বহু জাতির ইতিহাসের মোড়ও ঘুরিয়ে দেয়। এই সময়ে মক্কা প্রথমবারের মতো শুনতে পায় যে, নবি মুহাম্মাদ *(৫৭১-৬৩২) একটি নতুন ধর্ম প্রচার করছেন। তিনি নিজে সেটার বার্তাবাহক।
নতুন এই ধর্মটির নাম ইসলাম। এর অর্থ অদ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভুর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাঁর ঐশী ক্ষমতার কাছে পুরোপুরি আত্মনিবেদন। ইসলামের উপাস্য অদ্বিতীয় সত্তা আল্লাহ, যিনি নবি ইবরাহীম-এর প্রভু। ইসলামের একজন বিশ্বাসীকে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়- 'এক আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর প্রেরিত গ্রন্থসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, বিচার-দিবসের প্রতি এবং তাকদিরের ভালো ও মন্দের প্রতি।' (সহীহ মুসলিম: ১) একক সর্বোচ্চ উপাস্যের আরবি শব্দ আল্লাহ। ইবরাহীম-এর প্রভুর থেকে তিনি আলাদা কোনো সত্তা নন, বরং একই উপাস্য। এমন না যে তিনি উপাস্যের একটি ইসলামি সংস্করণ। বরং একেশ্বরবাদী ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের উপাসিত সত্তাই হলেন আল্লাহ। ইসলাম এ কারণেই (অবিকৃত) ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মকে আসমানি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পূর্ববর্তী নবি ও রাসূলগণের রয়েছে বিরাট মর্যাদা। কিন্তু ইহুদি-খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে ইসলামের অনেক পার্থক্যের মাঝে একটি হলো, ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা নয়। তাই এটি একইসাথে একটি ধর্ম ও একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া ইসলাম জোর দিয়ে বলেছে, 'বলো, তিনিই আল্লাহ, একক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী; তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই' (সূরা ইখলাস, ১১২: ১-৪)।
বিগত দুটি একেশ্বরবাদী ধর্ম ইহুদি ও খ্রিষ্টবাদের মতো ইসলামকেও প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আরবের বেদুইনরা কঠোরভাবে তাদের অতীত ধর্ম ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখে। আগের অধ্যায়ে এটি আলোচিত হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাস ও রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, এমন কোনো ধ্যানধারণাকেই তাদের পক্ষে গ্রহণ করা অসম্ভব। অন্তত প্রচণ্ড প্রতিরোধ ছাড়া তো নেবেই না। তার ওপর প্রতিরোধের আরেকটি কারণ নতুন ধর্মটির রাজনৈতিক ভূমিকা। ইসলাম শুধু ধর্মীয়ভাবেই নয়; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও ঘোরতর পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত্তি ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বসে ধর্মটি। তাই সমাজের উঁচু শ্রেণি প্রবলভাবে এর বিরোধিতা করে, বিশেষত স্বয়ং মক্কায়।
ইসলাম সহযোগিতা খুঁজে পায় মদীনার নাগরিক জনসমাজে। মদীনাবাসীরা ইসলামকে সহযোগিতা করার পেছনে দুটি প্রধান অনুঘটক চিহ্নিত করা যায়;
➡ আরব পৌত্তলিকদের সাথে মদীনার ইহুদিদের দ্বন্দ্ব এবং
➡ শহরটির প্রধান দুই গোত্রের মাঝে অবিরত সংঘর্ষ।
প্রথমত, ইহুদিরা মূর্তিপূজারি মদীনাবাসীদের ঘৃণা করত। গর্ব করত নিজেদের আসমানি ধর্ম ও প্রতীক্ষিত মাসীর আবির্ভাবের ব্যাপারে। মদীনাবাসী আরবরা ইসলামের মাঝে ইহুদিবাদের যথার্থ বিকল্প খুঁজে পায়। তারা আশা করে যে, আল্লাহর বাণী বলতে থাকা এই ব্যক্তিই হতে পারেন বহুলালোচিত সেই প্রতীক্ষিত নবি। দ্বিতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র দুটি আশা করে যে নতুন নবি তাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
মক্কায় দশ বছরে সীমিত সাফল্য লাভের পর নবি ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন। কিছু সাহাবিকে তাঁর আগেই স্থানান্তরিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মদীনার কেন্দ্র থেকে নবি বাকি আরবে অভিযান পরিচালনা করেন। মক্কার অবিশ্বাসীদের সাথে বেশ কয়েকটি যুদ্ধের পর অবশেষে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে তাদের পরাজিত করে মক্কা অধিকার করেন তিনি। ৬৩১ সালে নবি এবং তাবুকের ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মাঝে গাসসান ভূমির সীমান্তে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কোনো সামরিক সংঘাত ছাড়াই 'জিযিয়া' নামক কর পরিশোধের শর্তে তারা ইসলামের নিরাপত্তার অধীন হতে সম্মত হয়ে যায় (ইবনু হিশাম)। (প্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম পুরুষদের ওপর আরোপিত এই কর যাকাতের বিকল্প। যাকাত শুধু মুসলিমরা প্রদান করে।) তা ছাড়া ৬৩০-৬৩১ সালের মধ্যে আরবের অন্যান্য অংশ এবং মিশরে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করা হয় জনগণকে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য। মধ্য আরব, ওমান, হাদরামাউত, ইয়েমেন, হামাদান ও কিন্দার অনেক গোত্র ইসলামের ছায়াতলে যোগদান করে। হিটির ভাষ্যমতে যে আরব এত দিন কোনো একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি, সেই আরব নবি মুহাম্মাদ এর শাসনকর্তৃত্ব মেনে নিতে এবং নতুন এই ব্যবস্থায় যোগদানে আগ্রহী হয়ে ওঠে, (Hitti, 1963)। অবশেষে ঐক্যবদ্ধ হয় আরব। ইতিহাসে এটি ইসলামি-আরব রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন হিসেবে সুপরিচিত।
রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মূলনীতি নির্ধারণ করেন নবিজি। মক্কা বিজয়ের পরও তিনি অবস্থান করছিলেন মদীনায়। এটিই হয় ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী (ইবনু হিশাম)। নবি হন রাষ্ট্রপ্রধান। মদীনায় থেকে হিজরত করা সাহাবিগণ তাঁর সহযোগী হন। নবিজি সর্বদা জনগণের হাতের নাগালে থাকতেন। যাপন করতেন সাদামাটা এক জীবন। প্রায়শই তাঁকে নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতে দেখা যেত। স্থানীয় পর্যায়ে নবি মুহাম্মাদ একজন করে নেতা বা ইমাম নিযুক্ত করে দিতেন, যিনি প্রত্যেক প্রদেশের ধর্মীয় উপনেতা ও প্রধান কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পালন করবেন। সেইসঙ্গে পাঠানো হয় কুরআনের শিক্ষকদের, যারা জনগণকে কুরআন ও ধর্মের বিস্তারিত শিক্ষা দেবেন।
📄 পুরস্কার ও শাস্তির বিধান
আমানতদারির দায়িত্ব সম্পূর্ণ করার জন্য এটি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এসব দায়িত্ব কতটুকু পূর্ণ করা হয়েছে, আখিরাত বা পরকালে তা মূল্যায়ন করে সেই অনুযায়ী বিচার করা হবে। কুরআনের আয়াত বলে, 'প্রত্যেক মানুষের কাজ আমি তার গলায় বেঁধে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে। তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট', (সূরা ইসরা, ১৭: ১৩-১৪)
📄 মৌলিক দর্শনের প্রয়োগ
ওপরে বর্ণিত ইসলামি আদর্শগত ধারণা ও মূলনীতিগুলোর পেছনে একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। বলা যায়, তা হলো অর্থনৈতিক সম্পদের সুচারু ব্যবস্থাপনা, যাতে আল্লাহর সৃষ্টিকূলের প্রয়োজনাদি পূরণ হয়। মূলত মানবজাতির চাহিদাকে ঘিরে এটি আবর্তিত হয়। সেইসাথে রয়েছে বিশেষত তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং সাধারণভাবে গোটা বিশ্বজগতের রক্ষণাবেক্ষণ।
তাই ইসলামি মতাদর্শের চূড়ান্ত লক্ষ্য কোনোকিছুর 'সর্বাধিককরণ' (Maximization) নয়; সেটা উপযোগ, মুনাফা বা সম্পদ যা-ই হোক না কেন। বরং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিশ্বজগতের সুরক্ষা। ইসলামি অর্থনীতিতে যদি 'সর্বাধিককরণ'-এর ধারণা অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা হয়, তাহলে এটি ইসলামি মতাদর্শে অন্তর্নিহিত 'মধ্যমপন্থা'-র মৌলিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। তাই মোটাদাগে 'সর্বাধিককরণ' জিনিসটি ইসলামি আদর্শিক চেতনার কাছে অপরিচিত। ওপরে আমরা দেখেছি যে, নবি তাঁর অনুসারীদের ইবাদতের ব্যাপারেও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও নিয়মানুবর্তিতার আদেশ দিয়েছেন বটে। কুরআনের একাধিক স্থানে তিনি জোরারোপ করেছেন যে, তাঁর দেওয়া অনুগ্রহগুলো উপভোগ করতে নিষেধ করেননি তিনি। 'এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যমপন্থি জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি' (সূরা বাকারা, ২: ১৪৩)
তবে তার মানে এই না যে, মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ তাদের বিশ্লেষণে কোনো বিষয়েই সর্বাধিককরণের ধারণাটি ব্যবহার করেননি। করেছেন, তবে মুনাফা বা সম্পদ ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ্যের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইসলামি আদর্শের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে, সামগ্রিকভাবে সর্বাধিককরণের বদলে এর ঝোঁকটা মধ্যমপন্থার দিকে। এটি একটি 'ভারসাম্যপূর্ণ' কাঠামো এবং আচরণের ছাঁচ প্রদান করে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে সর্বাধিককরণের তথাকথিত ছাঁচটি বক্রতা থেকে মুক্ত নয়, যার ফলে স্বাভাবিকতা নিশ্চিত না-ও হতে পারে।
ইসলামে অর্থনৈতিক বিষয়াদির ওপর এই মৌলিক দর্শনের কী প্রভাব রয়েছে, নিচের বিশ্লেষণে তা দেখানো হবে। ধর্মীয় চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এখানে আলোকপাত করা হবে সেইসব অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর, যেগুলো আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির জন্য সহজলভ্য করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি পরীক্ষা করেন যে, এসব ঐশী সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মানুষ এগুলোকে কিভাবে ব্যবহার করে। আমাদের বিশ্লেষণটি এসব সম্পদকে নিম্নলিখিত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করবে:
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: সংজ্ঞা ও দৃষ্টিকোণ
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: মালিকানার ধরন
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদন
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: ভোগ
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: উপার্জন বণ্টন
➡ অর্থনৈতিক সম্পদ: রাষ্ট্রের ভূমিকা
আগেই বলে নিই যে, এটি কোনো এলোপাতাড়ি শ্রেণিবিন্যাস নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর্যায়গুলো তুলে ধরা। এগুলো আল্লাহর সৃষ্টির অনুক্রমেরও প্রতিফলন। প্রথমত, অর্থনৈতিক সম্পদকে সংজ্ঞায়িত, বা অন্তত বর্ণনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসব সম্পদের এক ধরনের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তৃতীয়ত, এসব সম্পদের উন্নয়ন বা বিকাশ ঘটাতে হবে, যাতে সেই উন্নয়নের ফলাফল বোধগম্য হয়। চতুর্থত, এসব সম্পদ ভোগ করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন ছাড়া ভোগ করলে এসব সম্পদ হ্রাস পাবে। পঞ্চমত, সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাটির যেহেতু ইসলামে প্রোথিত, সেহেতু উদ্বৃত্ত (Surplus) (আধুনিক পরিভাষায় বললে মূল্য-সংযোজিত) সম্পদকে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সুষমভাবে বণ্টন করে দিতে হবে, যাতে অন্যায় পরিহার করা যায়। সর্বশেষে, রাষ্ট্রের ভূমিকাও স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে। এই ভূমিকা ব্যক্তির ভূমিকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এই ব্যাপারগুলোকেই নিরীক্ষণ করা হবে নিচে।
📄 কুরআন-সুন্নাহর অর্থনীতি এবং বর্তমান যুগ
কিছু সমালোচক বলতে চান যে, কুরআন ও সুন্নাহ অর্থনীতির জন্য কোনো সুবিন্যস্ত পদ্ধতি প্রদান করেনি। এমনটা বলার অর্থ হলো একটি ধর্মের মৌলিক উৎসগুলো কী কী দেয় এবং কী কী দেয় না, সেটাই বুঝতে ব্যর্থ হওয়া। বর্তমান ও ভবিষ্যতে উম্মাহ যতটি অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হবে, কুরআন ও সুন্নাহ সেই প্রত্যেকটির জন্য ধরে ধরে একটি করে আসমানি সমাধান দেওয়ার জন্য আসেনি। বরং এটি এসেছে একটি ভিত্তিমূলক কাঠামো প্রদান করতে। এই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি দাঁড় করানো সম্ভব, সেটা যতই বিস্তৃত হোক না কেন। কিছু সমালোচকের মতামত পড়লে অবাক হয়ে যেতে হয়। তাদের ভাষ্যমতে কুরআন-সুন্নাহ যেহেতু আমাদের সময়ের বৈচিত্র্যময় শিল্পায়িত সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান প্রদান করেনি, তাই এসব উৎস সমসাময়িক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। সমালোচকদের দাবি, কুরআন ও সুন্নাহর মতো প্রাথমিক উৎসগুলো একটি আদিম সমাজের সরল অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ নিয়ে কাজ করেছে, যা আধুনিক জামানার শিল্পায়নের জটিলতার ওপর প্রয়োগযোগ্য নয়। কাজেই, সেগুলোকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে বাতিল করে দেওয়া উচিত। তা ছাড়া এগুলো যেহেতু একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সকল রূপ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী এবং সেগুলোর উত্তর দিয়ে যায়নি, সেহেতু কী করেই বা এগুলোকে ঐশী উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায়? এই হলো তাদের প্রশ্ন।
কিন্তু ইসলামি অর্থনীতির বিরোধীরা ইচ্ছেকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হন:
➡ প্রথমত, কুরআন-সুন্নাহ প্রতিটি খুঁটিনাটি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান প্রদান করার জন্য আসে না। এমনকি ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সমসাময়িক সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য, আবির্ভাবের চৌদ্দ শতক পরের একটি সমাজে উদ্ভূত বিষয় তো অনেক দূরের ব্যাপার। এমনকি বর্তমান যুগের সংবিধানগুলোর কোনো আইনের ব্যাপারেও এমনটি বলা সম্ভব না। আইনগুলো প্রণয়ন করাই হয় এজন্য, যাতে পরবর্তীকালে মন্ত্রণালয়ের আদেশ আর আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়ে প্রয়োজনীয় শূন্যস্থানগুলো পূরণ করা যায়। অনেকক্ষেত্রেই এসব সমাধান একেবারে প্রতিটা মামলার জন্য আলাদা আলাদা হয়। আসমানি উৎসগুলোও একটা মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামো প্রদান করে। আর খুঁটিনাটি সমস্যাগুলো তার ভিত্তিতে সমাধান করার জন্য সাধারণ আইনপ্রণেতাদের হাতে ছেড়ে দেয়। ভাবতে পারেন, নবি-এর সময়কালের মানুষদের যদি বলা হতো একসময় টিভি, মোবাইল টেলিফোন, ইন্টারনেট ও বিমান আবিষ্কৃত হবে, তখন তাদের অবস্থা কী দাঁড়াত! আরেকভাবে বললে, কুরআন ও সুন্নাহতে ফ্রেডরিক টেইলরের 'সময় ও গতি অধ্যয়নবিদ্যা' (Time and motion study) অনুপস্থিত দেখে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ইসলাম বুঝি শিল্পায়িত সমাজের জন্য অনুপযোগী। আবার এমনও না যে, উল্লিখিত পদ্ধতিটি বা অন্য যে-কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বুঝি কুরআন-সুন্নাহতে না থাকার কারণে সেটা অনৈসলামি।
➡ দ্বিতীয়ত, কুরআন ও সুন্নাহ আসলেই এমন বিধান দিয়েছে, যা আসন্ন অবস্থা সম্পর্কে আগাম বার্তা ও সমাধান প্রদান করে। কয়েক শতাব্দী পর আসলেই সেরকম পরিস্থিতি এসেছেও। এরকম একটি উদাহরণ ঋণ সংক্রান্ত আয়াতটি, যেটি কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত। ঋণের লিখিত দলীল রাখার ব্যাপারটিকে কুরআন একদম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে আলোচনা করেছে। সাধারণ ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের মধ্যে পার্থক্য, ঋণের লিখিত দলীল কখন রাখতে হবে এবং কখন রাখা লাগবে না, কত সময়ের জন্য এবং কী পরিস্থিতিতে লিখিত দলীলের বদলে সাক্ষীর সাক্ষ্য ব্যবহার করা যাবে, সবই বলা হয়েছে (সূরা বাকারা, ২: ২৮২)। আসন্ন সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে এবং আসলেই বর্তমান সময়ের ইসলামি ও অনৈসলামিক আইনব্যবস্থার সাধারণ ও বাণিজ্যিক ঋণ সংক্রান্ত আইনে এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ভোগের ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটি উদাহরণ। “দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না”-এটি এমন এক দর্শন, যা ভোগ ও উৎপাদনের মাঝে ভারসাম্য অর্জনে সাহায্য করে এবং অর্থনীতির চাকা চলমান রাখতে সহায়তা করে। তত্ত্ব ও চর্চা থেকে দেখা গেছে যে, ভোগ কম করার ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়লেও তাতে উৎপাদনের গতি ও লাভজনকতা কমে গিয়ে বিনিয়োগহীনতা দেখা দিতে পারে। বেশি ভোগের ফলে ঘটে এর বিপরীত প্রভাব: স্বল্প সঞ্চয়ের ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া, চাহিদা-আকর্ষণ মুদ্রাস্ফীতি, এবং বিশ্ববাজারে বহিঃঋণের সম্ভাব্য বৃদ্ধি ও তার ফলে আর্থিক ঝুঁকি। মধ্যমপন্থি ভোগকে দেখা যায় কাঙ্ক্ষিত নীতি হিসেবে, যা উভয় ধরনের প্রান্তিকতা পরিহারে সাহায্য করে এবং অর্থনীতির বিবিধ ক্ষেত্রের মাঝে যৌক্তিক ভারসাম্য অর্জনে সহায়তা করে। আর ভোগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এই মধ্যমপন্থার কথাই প্রচার করে ইসলাম। এটি একটি ইসলামি নীতি বা দর্শন, যা কুরআন ও সুন্নাহতে ভালোমতো প্রোথিত।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইসলামি অর্থনীতির কাঠামো সম্পর্কে জানার পর এবার আমরা মনোনিবেশ করব পরবর্তী অধ্যায়ে। এখানে এমন একটি যুগে ইসলামি অর্থনীতির বিকাশ নিয়ে আলোচনা হবে, যা নবি-এর যুগের থেকে অনেক বেশি বিস্তৃত: খিলাফতে রাশিদা।
কিছু সমালোচক বলতে চান যে, কুরআন ও সুন্নাহ অর্থনীতির জন্য কোনো সুবিন্যস্ত পদ্ধতি প্রদান করেনি। এমনটা বলার অর্থ হলো একটি ধর্মের মৌলিক উৎসগুলো কী কী দেয় এবং কী কী দেয় না, সেটাই বুঝতে ব্যর্থ হওয়া। বর্তমান ও ভবিষ্যতে উম্মাহ যতটি অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হবে, কুরআন ও সুন্নাহ সেই প্রত্যেকটির জন্য ধরে ধরে একটি করে আসমানি সমাধান দেওয়ার জন্য আসেনি। বরং এটি এসেছে একটি ভিত্তিমূলক কাঠামো প্রদান করতে। এই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি দাঁড় করানো সম্ভব, সেটা যতই বিস্তৃত হোক না কেন। কিছু সমালোচকের মতামত পড়লে অবাক হয়ে যেতে হয়। তাদের ভাষ্যমতে কুরআন-সুন্নাহ যেহেতু আমাদের সময়ের বৈচিত্র্যময় শিল্পায়িত সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান প্রদান করেনি, তাই এসব উৎস সমসাময়িক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। সমালোচকদের দাবি, কুরআন ও সুন্নাহর মতো প্রাথমিক উৎসগুলো একটি আদিম সমাজের সরল অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ নিয়ে কাজ করেছে, যা আধুনিক জামানার শিল্পায়নের জটিলতার ওপর প্রয়োগযোগ্য নয়। কাজেই, সেগুলোকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে বাতিল করে দেওয়া উচিত। তা ছাড়া এগুলো যেহেতু একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সকল রূপ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী এবং সেগুলোর উত্তর দিয়ে যায়নি, সেহেতু কী করেই বা এগুলোকে ঐশী উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায়? এই হলো তাদের প্রশ্ন।
কিন্তু ইসলামি অর্থনীতির বিরোধীরা ইচ্ছেকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হন:
➡ প্রথমত, কুরআন-সুন্নাহ প্রতিটি খুঁটিনাটি অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান প্রদান করার জন্য আসে না। এমনকি ওহি অবতীর্ণ হওয়ার সমসাময়িক সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য, আবির্ভাবের চৌদ্দ শতক পরের একটি সমাজে উদ্ভূত বিষয় তো অনেক দূরের ব্যাপার। এমনকি বর্তমান যুগের সংবিধানগুলোর কোনো আইনের ব্যাপারেও এমনটি বলা সম্ভব না। আইনগুলো প্রণয়ন করাই হয় এজন্য, যাতে পরবর্তীকালে মন্ত্রণালয়ের আদেশ আর আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়ে প্রয়োজনীয় শূন্যস্থানগুলো পূরণ করা যায়। অনেকক্ষেত্রেই এসব সমাধান একেবারে প্রতিটা মামলার জন্য আলাদা আলাদা হয়। আসমানি উৎসগুলোও একটা মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামো প্রদান করে। আর খুঁটিনাটি সমস্যাগুলো তার ভিত্তিতে সমাধান করার জন্য সাধারণ আইনপ্রণেতাদের হাতে ছেড়ে দেয়। ভাবতে পারেন, নবি-এর সময়কালের মানুষদের যদি বলা হতো একসময় টিভি, মোবাইল টেলিফোন, ইন্টারনেট ও বিমান আবিষ্কৃত হবে, তখন তাদের অবস্থা কী দাঁড়াত! আরেকভাবে বললে, কুরআন ও সুন্নাহতে ফ্রেডরিক টেইলরের 'সময় ও গতি অধ্যয়নবিদ্যা' (Time and motion study) অনুপস্থিত দেখে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ইসলাম বুঝি শিল্পায়িত সমাজের জন্য অনুপযোগী। আবার এমনও না যে, উল্লিখিত পদ্ধতিটি বা অন্য যে-কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বুঝি কুরআন-সুন্নাহতে না থাকার কারণে সেটা অনৈসলামি।
➡ দ্বিতীয়ত, কুরআন ও সুন্নাহ আসলেই এমন বিধান দিয়েছে, যা আসন্ন অবস্থা সম্পর্কে আগাম বার্তা ও সমাধান প্রদান করে। কয়েক শতাব্দী পর আসলেই সেরকম পরিস্থিতি এসেছেও। এরকম একটি উদাহরণ ঋণ সংক্রান্ত আয়াতটি, যেটি কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত। ঋণের লিখিত দলীল রাখার ব্যাপারটিকে কুরআন একদম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে আলোচনা করেছে। সাধারণ ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের মধ্যে পার্থক্য, ঋণের লিখিত দলীল কখন রাখতে হবে এবং কখন রাখা লাগবে না, কত সময়ের জন্য এবং কী পরিস্থিতিতে লিখিত দলীলের বদলে সাক্ষীর সাক্ষ্য ব্যবহার করা যাবে, সবই বলা হয়েছে (সূরা বাকারা, ২: ২৮২)। আসন্ন সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে এবং আসলেই বর্তমান সময়ের ইসলামি ও অনৈসলামিক আইনব্যবস্থার সাধারণ ও বাণিজ্যিক ঋণ সংক্রান্ত আইনে এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ভোগের ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটি উদাহরণ। “দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না”-এটি এমন এক দর্শন, যা ভোগ ও উৎপাদনের মাঝে ভারসাম্য অর্জনে সাহায্য করে এবং অর্থনীতির চাকা চলমান রাখতে সহায়তা করে। তত্ত্ব ও চর্চা থেকে দেখা গেছে যে, ভোগ কম করার ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়লেও তাতে উৎপাদনের গতি ও লাভজনকতা কমে গিয়ে বিনিয়োগহীনতা দেখা দিতে পারে। বেশি ভোগের ফলে ঘটে এর বিপরীত প্রভাব: স্বল্প সঞ্চয়ের ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া, চাহিদা-আকর্ষণ মুদ্রাস্ফীতি, এবং বিশ্ববাজারে বহিঃঋণের সম্ভাব্য বৃদ্ধি ও তার ফলে আর্থিক ঝুঁকি। মধ্যমপন্থি ভোগকে দেখা যায় কাঙ্ক্ষিত নীতি হিসেবে, যা উভয় ধরনের প্রান্তিকতা পরিহারে সাহায্য করে এবং অর্থনীতির বিবিধ ক্ষেত্রের মাঝে যৌক্তিক ভারসাম্য অর্জনে সহায়তা করে। আর ভোগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এই মধ্যমপন্থার কথাই প্রচার করে ইসলাম। এটি একটি ইসলামি নীতি বা দর্শন, যা কুরআন ও সুন্নাহতে ভালোমতো প্রোথিত।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইসলামি অর্থনীতির কাঠামো সম্পর্কে জানার পর এবার আমরা মনোনিবেশ করব পরবর্তী অধ্যায়ে। এখানে এমন একটি যুগে ইসলামি অর্থনীতির বিকাশ নিয়ে আলোচনা হবে, যা নবি-এর যুগের থেকে অনেক বেশি বিস্তৃত: খিলাফতে রাশিদা।