📄 গোত্রবাদ
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আরবে ব্যক্তিস্বার্থের জোড়া প্রতিবিম্ব ছিল গোত্রবাদ। গোত্রের সদস্যদের প্রতি একজন বেদুইন তথা আরবের বিশ্বস্ততা ছিল একদম দেশপ্রেমের আদলে। সে নিজে যেমন কওমের কাছে সুরক্ষিত থাকত, তেমনি নিজেও থাকত তাদের প্রতিরক্ষায় তৎপর। প্রতিবেশী গোত্রদের সাথে তার গোত্র যে কারণেই যুদ্ধে জড়াক, সে তাতে অংশ নেবেই। নিজের ও স্বগোত্রের প্রতি ব্যক্তিস্বার্থের চেতনা থেকে গোত্রের প্রতি বিশ্বস্ততার অনুভূতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর এটাই বেদুইন সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো গঠন করেছে।
সামাজিক একক হিসেবে গোত্রের নিজস্ব একজন সর্দার বা শাইখ থাকতেন। গোত্রের সদস্যরা তাকে বেছে নিত প্রবীণতা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত গুণের ভিত্তিতে। অন্য গোত্রগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি নিজের গোত্রের প্রতিনিধি বটে, কিন্তু গোত্র-সংক্রান্ত সকল বিষয়ের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তার ছিল না (Hassan, 1959)। গুরুতর বিচারিক বিষয় এবং আন্তঃগোত্রীয় সংঘাতের ব্যাপারে তাকে বংশীয় প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পরিষদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পক্ষান্তরে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বলে তৈরি হওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চেতনার ফলে বেদুইনরা শাইখকে দেখত সমমর্যাদার ব্যক্তি হিসেবে। সর্দার কোনো রাজা-বাদশাহ নন। পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যগুলোর প্রান্তে অবস্থিত এলাকাগুলোর নেতাদের এসব সাম্রাজ্য 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করত বটে। কিন্তু দক্ষিণ আরবের অধিবাসীরা কখনো গোত্র-প্রধানকে বোঝাতে এই উপাধি ব্যবহার করেনি (প্রাগুক্ত)।
ব্যক্তিস্বার্থ ও গোত্রবাদের এই জোড়া শক্তিটি গোত্রভিত্তিক সমাজের গণতান্ত্রিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই গণতন্ত্র আধুনিক গণতন্ত্রের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। ব্যক্তিচেতনা ও গোত্রীয় আনুগত্যের চেতনা প্রাক-ইসলামি আরবদের অর্থনৈতিক কাঠামোও তৈরি করেছে। ব্যক্তিস্বার্থের বলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে গোত্রীয় বন্ধনের ফলে রক্ষিত হয় সর্বজনীন অর্থনৈতিক বিষয়াদি। এই জনগোষ্ঠীগুলো বসবাস করত সর্বজনীন অর্থনৈতিক সম্পদের মাঝে। তাই গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে গোত্রপতিকে সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হতো কোন ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগত এবং কোনগুলো সামষ্টিক। আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় যে, সেকালে বেদুইনদের অর্থনীতি পরিচালনায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা এভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়।
প্রাক-ইসলামি আরবের এই ব্যবস্থা ইসলামের আগমনের পরও টিকে যায়। তবে ইসলামি রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার জন্য তাতে রদবদল করা হয় (প্রাগুক্ত)। ইসলাম ব্যক্তিস্বার্থের চেতনাকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্বারোপ না করলেও একে অস্বীকার করে না। আবার দলান্ধতাকে সমর্থন না করলেও দলবদ্ধ থাকার অনুভূতিকেও ফেলে দেয় না। কোনোকিছুর প্রতি আত্মসম্পর্কিত থাকার যে স্বাভাবিক অনুভূতি এবং সে অনুভূতির যে প্রয়োজনীয়তা, ইসলাম কেবল সেটির একটি পথ দেখিয়ে দেয়। ইসলাম গোত্রের ধারণাকে প্রতিস্থাপিত করে ইসলামি জনসমাজ তথা উম্মাহ দিয়ে। ব্যক্তি ও সমাজ-একটিকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য না দিয়ে ইনসাফের ভিত্তিতে এই দুই উপাদানের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামি দর্শন ও অর্থনীতির তত্ত্ব।
টিকাঃ
[১] সহীহ। সহীহ বুখারি: ৫৬৬৪, সুনানু আবী দাউদ: ৩৮০। - সম্পাদক
📄 আতিথেয়তা
প্রাক-ইসলামি আরবের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অতিথিপরায়ণতা। এ এমন এক নীতি, যা মরুজীবনের গভীরে প্রোথিত। সাহসিকতা, বীরত্ব, উদ্দীপনা ও সহনশীলতার পাশাপাশি এই বৈশিষ্ট্যেরও গুণগান করে গেছেন সে যুগের মুখপাত্র হিসেবে অভিহিত কবিবৃন্দ (আত-তাবারি, ১৯৯১)। একজন মানুষ যত বড় শত্রুই হোক না কেন, অতিথি হিসেবে আগমন করলে তাকে সর্বোচ্চ আতিথেয়তা সহকারে বরণ করতে হতো। আতিথেয়তায় এদিক-সেদিক করা মানে ব্যক্তি ও গোত্রের মর্যাদায় আঘাত। নগণ্য অর্থনৈতিক সম্পদের মাঝে যেভাবে আরবরা জীবনযাপন করত, তার সাথে আতিথেয়তার এই সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। আবার এই নীতিটিই হতে পারে স্বয়ং এরকম জীবনধারার ফলাফল। প্রতিকূল পরিবেশে সর্বজনীন অসহায়ত্বের যে অনুভূতি তৈরি হয়, তার ফলেই অতিথিপরায়ণতাকে এত উঁচু দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আতিথেয়তার এই নীতি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়—সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তিদের প্রয়োজনকে যথেষ্ট আমলে নেওয়া হতো। তা ছাড়া আতিথেয়তার পেছনে একটি প্রধান উদ্দীপক ছিল ব্যক্তিগত ও গোত্রগত মর্যাদা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। তাই একদম অর্থনৈতিক পরিভাষায় বললে, প্রাক-ইসলামি যুগের আরব ভোক্তার কাছে পণ্যের উপযোগ দুই ধরনের: পণ্য ভোগ করতে পারার সন্তোষ এবং নৈতিক সন্তোষ। ইসলামি অর্থনৈতিক তত্ত্বে মুসলিম ভোক্তার উপযোগ তিন ধরনের: পণ্য ভোগের সন্তোষ, নৈতিক সন্তোষ এবং ইহকাল ও পরকালে ঐশী পুরস্কার লাভের সন্তোষ। (পরবর্তীকালে এটি আরও আলোচিত হবে।)
📄 অর্থনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্যে আক্রমণ
অর্থনৈতিক সম্পদ তো সীমিতই। তাই যেসব গোত্রের কাছে তার সদস্যদের খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট সম্পদ নেই, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের অধিকারী গোত্রদের ওপর সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করত। এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক। চরম প্রয়োজন ছাড়া এক ফোঁটা রক্ত ঝরানোও নিষিদ্ধ (Hitti, 1963)। আধুনিক সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হামলার ব্যাপারে একেবারে কম করে হলেও বলতে হয়, এগুলো অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু এগুলোকে তৎকালীন মন-মানসিকতার আলোকে বুঝতে হবে। এসব আক্রমণ ছিল সম্পদহীন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলপূর্বক অভিযান। এর উদ্দেশ্য ছিল মানবসমাজে অর্থনৈতিক সম্পদের পুনর্বণ্টন করা। ওই সমাজে অর্থনৈতিক ও বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই পুনর্বণ্টনের দায়িত্ব পালন করার মতো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ অনুপস্থিত ছিল। তাই ব্যক্তি নিজের হাতে আইন তুলে নিত। মরুবাসী সমাজে যে লড়াইয়ের মেজাজ এমনিতেই বিরাজ করত, সেটি এই কার্যক্রমকে আরও জোরদার করেছে বলে মনে হয়। ঐশী ধর্মগুলো থেকে যে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি হয়, তৎকালীন আরবে সেটা বা সেটার অভাব এসব অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক কার্যক্রম প্রতিরোধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দেখা যায় না। বনু তাগলিবের মতো খ্রিষ্টান গোত্রগুলোও এটি কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই চর্চা করত (প্রাগুক্ত)।
ইসলামের আসার পর এই চর্চাগুলোকে প্রশমিত করে আনা হয়। ধর্মীয় চেতনার ওপর গুরুত্বারোপ করে যুদ্ধবিগ্রহকে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যের জন্যই কেবল বৈধতা দেওয়া হয়। অযথা ধ্বংসলীলা ও রক্তপাত এড়াতে আরোপ করা হয় কঠোর নিয়মকানুন। আর এর মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বিদেশ জয়ের দিকে। তবে ইসলামি ঐতিহ্যে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের হক থাকার বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত। 'তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।' (সূরা যারিয়াত ৫১: ১৯)। এই ব্যাপারটি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়। জিযিয়ার মতো বিভিন্ন মাধ্যমও এতে ব্যবহার হয়। যথাস্থানে এর আলোচনা আসবে।
টিকাঃ
[১] ইসলামে সাম্রাজ্যবাদ তথা নিছক রাজ্য বিস্তার ও ভূমি সম্প্রসারণের জন্য যুদ্ধের অনুমতি নেই। ইসলামে জিহাদের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহর ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। মুসলিমগণ সত্য দ্বীনের অনুসারী হিসেবে این পবিত্র দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সাহাবিগণ জিহাদ করেছিলেন দ্বীন কায়েম ও শরীয়ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। সহীহ বুখারি (৭৪৫৮) ও সহীহ মুসলিমে (১৯০৪) বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হয়, কেউ বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ করে, কেউ গোত্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে, আর কেউ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে, এগুলোর মধ্যে কোনটি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ বলে গণ্য হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণী সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে, কেবল সেই আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করেছে গণ্য হবে। সম্পাদক
📄 বীরত্ব এবং সংঘাতের প্রতি আগ্রহ
সাহস আর বীরত্বের মতো গর্বের উৎস আর কিছু হতেই পারে না, হোক সেটা ব্যক্তি বা গোত্রের জন্য। এটা ছিল আরবের অধিবাসীদের ব্যক্তিত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। একটা মানুষ বা গোত্রকে যতভাবে অপমান করা যায়, তার মাঝে নিকৃষ্টতম দুটি বিষয় ছিল— আতিথেয়তায় কার্পণ্য এবং ভীরুতা। সাহস ছিল গর্বের একটি বিশেষ উৎস। তাতে প্রাণ গেলে যাক। তাই প্রাচীন এক কবিকে আমরা সগর্বে গাইতে শুনি, 'মল্লযুদ্ধের আহ্বানে প্রথম সাড়া দান, কেড়ে নিল আপন গোত্রের কত যোদ্ধার প্রাণ' (Nicholson 1993)। তার স্বগোত্রীয় যোদ্ধার লড়াইয়ের দক্ষতাকে প্রশংসা করা যাচ্ছে না বটে। কিন্তু এতটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, বিপদ বা সামরিক সংঘাতে তারা কখনো পিছপা হয়নি। সামরিক শক্তি ও মর্যাদার দিক থেকে নিজের গোত্রের যে দাপট, সেটার গুণগান করার আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় আরেক কবির মাঝে। তিনি দম্ভ সহকারে ঘোষণা করছেন যে, তিনি ও তার গোত্র অত্যাচারী নিপীড়ক। নিজেরা কখনো নিপীড়িত হননি। তারা যখন দল বেঁধে কোনো জলাশয়ের কাছে যান, তখন তারাই আগে স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ পানি পান করেন। বাকিদের জন্য রেখে যান কর্দমাক্ত ও ঘোলা জল (প্রাগুক্ত)। ন্যায়ের চেতনার স্থান যেন এখানে সাহসিকতা ও অত্যাচারের চেয়ে কম, পাছে ন্যায়পরায়ণতাকে কেউ দুর্বলতা ও শিথিলতা ভেবে বসে। বলাবাহুল্য, এর বিপরীতে ইসলাম এই ঘোষণা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে যে, অন্যায়কারীদের জন্য আল্লাহর ক্রোধ ও শান্তি অবধারিত।