📄 সহনক্ষমতা
মানুষের ওপর পরিবেশের প্রভাবের স্পষ্টতম উদাহরণ হলো সহ্যক্ষমতা। শুষ্ক ভূমি হিসেবে আরবের দেওয়ার মতো তেমন কিছুই ছিল না। এমন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বেদুইনদেরকে সেই ভূমির কঠিন পরিস্থিতির সাথে মানসিক ও শারীরিকভাবে মানিয়ে নেওয়া শিখতে হতো। মানসিকভাবে তাদের ধৈর্যশীল হওয়া দরকার ছিল। কারণ তারা রুক্ষ ভূমির মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করতে একেবারেই অক্ষম। বেদুইনরা শিখে নেয় যে, মানসিক সহনশীলতা বা 'ধৈর্য' হলো টিকে থাকার প্রথম উপাদান। আর শারীরিক ধৈর্য হিসেবে তাদের শিখতে হতো কিভাবে মরুজীবনের দুর্বিষহতা সহ্য করতে হয়। তাদের খাদ্য ছিল নগণ্য, প্রধানত খেজুর এবং আটা ও দুধ বা পানির মিশ্রণ। আর পোশাক ছিল খাবারের মতোই অপ্রতুল।
বেদুইনদের কাছে সহ্যক্ষমতা ছিল মহত্তম গুণ। এমন এক গুণ, গোত্রের ও এর সদস্যদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে আরব কাব্যমালায় যা সগর্বে গাওয়া হয়েছে। মুসলিমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবেও কুরআনে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে এর ওপর। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রসারের সময় শক্তিশালী এক সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই চরম সহ্যক্ষমতা এক মহাগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সহ্যের মানদণ্ড উঁচু হওয়ার কারণে বাহিনীগুলো এমন সৈন্য দিয়ে গড়া ছিল, যারা অন্যান্য সেনাবাহিনীর তুলনায় স্বল্পতর খাবারের ওপর টিকে থাকতে পারত। বাইজেন্টাইন ও পারস্য সেনাবাহিনীর তুলনায় সরঞ্জামাদি কম থাকায় ইসলামি সেনাবাহিনীর চলাচলের গতি ছিল দ্রুততর। (এর এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যায় ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাথমিক কালের সম্প্রসারণের ইতিহাসকে। ইসলামি সেনাদল তখন বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য দক্ষিণ ইরাক থেকে সিরিয়ার দক্ষিণদিক পর্যন্ত অতিক্রম করে ফেলে খুবই অপ্রত্যাশিত গতিতে।) ভোক্তার আচরণ-সম্পর্কিত ইসলামি বিধিমালায় অর্থনৈতিক সম্পদের স্বল্পতা ও সীমিত সম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জোর দেওয়া হয়েছে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের ওপর। ভোগের ক্ষেত্রে না-অপচয়, না-কৃপণতা নীতির আদেশ দেওয়া হয়েছে কুরআনে (সূরা আরাফ, ৭: ৩১, সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ২৯)। যথাস্থানে এ নিয়ে আলোচনা আসবে।
📄 ব্যক্তিস্বার্থ
এটি ছিল বেদুইন চরিত্রের আরেকটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিস্বার্থের ছিল দুটি দিক: নিজের প্রতি আস্থা এবং গোত্রের প্রতি বিশ্বস্ততা। এই দুই স্তরের বাইরে অন্যের বিষয়-আশয় নিয়ে ব্যক্তি মাথা ঘামাবে না। এই বৈশিষ্ট্যটিও পরিবেশের প্রভাবের একটি প্রতিফলন। মরুভূমি জিনিসটাই প্রশস্ত ও খোলামেলা, যা বেদুইনকে স্বাধীনচেতা ও মুক্তির অনুভূতি এনে দেয়। যদি অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর কারণে কোনো ভূমিতে অবস্থান করা কঠিন হয়ে যেত, তাহলে অন্যত্র সরে যেত তারা। তা ছাড়া মরুজীবনের কাঠিন্য হয় ব্যক্তিস্বার্থকে আরও দৃঢ় করে তোলে, অথবা ব্যক্তিস্বার্থের জন্ম দেয়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার নীতি এভাবেই প্রাধান্যের ক্রম নির্ধারণ করে দিত: আগে নিজেকে প্রাধান্য দিতে হবে, তারপর অন্যদের। হিট্টির ভাষ্যমতে, বেদুইনরা কখনোই নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক ধাঁচের সামাজিক জীবের পর্যায়ে উন্নীত করতে পারেনি। গোত্রীয় সীমানার বাইরে সর্বজনীন কল্যাণের আদর্শের প্রতি কোনো আগ্রহ বিকশিত হয়নি তাদের মাঝে (Hitti, 1963)1
ইসলাম সামাজিক সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বেদুইন-চরিত্রে ব্যক্তিস্বার্থ এতই গভীরে প্রোথিত যে, ইসলাম আগমনের পরেও এক বেদুইন এরকম দুআ করেছিল বলে বর্ণিত আছে, 'হে রব! শুধু আমাকে আর মুহাম্মাদকে রহম করো। আর কাউকে রহম কোরো না!' (আবু দাউদ, ১২৮০)। এমন একটি সমাজকে 'পুঁজিবাদী' বলে আখ্যায়িত করা যায় কি না, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু পুঁজিবাদী চেতনার একটি প্রাথমিক লক্ষণ ব্যক্তিস্বার্থ সেই সমাজটি যে বহন করে চলেছিল, তা একদম স্পষ্ট।
ইসলাম ব্যক্তিস্বার্থকে স্বীকার করে এবং এর আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেয়। তাই অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ইসলাম ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর উল্লেখযোগ্য গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের জন্য আরেকজনের ক্ষতি করা যাবে না। এটি ইসলামে ব্যক্তিস্বার্থ গ্রহণযোগ্য হওয়ার একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। আর আদর্শগতভাবে ইসলাম আত্মসংযম, দানশীলতা ও সামাজিক সহযোগিতার শিক্ষা প্রচার করে।
📄 গোত্রবাদ
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আরবে ব্যক্তিস্বার্থের জোড়া প্রতিবিম্ব ছিল গোত্রবাদ। গোত্রের সদস্যদের প্রতি একজন বেদুইন তথা আরবের বিশ্বস্ততা ছিল একদম দেশপ্রেমের আদলে। সে নিজে যেমন কওমের কাছে সুরক্ষিত থাকত, তেমনি নিজেও থাকত তাদের প্রতিরক্ষায় তৎপর। প্রতিবেশী গোত্রদের সাথে তার গোত্র যে কারণেই যুদ্ধে জড়াক, সে তাতে অংশ নেবেই। নিজের ও স্বগোত্রের প্রতি ব্যক্তিস্বার্থের চেতনা থেকে গোত্রের প্রতি বিশ্বস্ততার অনুভূতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর এটাই বেদুইন সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো গঠন করেছে।
সামাজিক একক হিসেবে গোত্রের নিজস্ব একজন সর্দার বা শাইখ থাকতেন। গোত্রের সদস্যরা তাকে বেছে নিত প্রবীণতা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত গুণের ভিত্তিতে। অন্য গোত্রগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি নিজের গোত্রের প্রতিনিধি বটে, কিন্তু গোত্র-সংক্রান্ত সকল বিষয়ের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তার ছিল না (Hassan, 1959)। গুরুতর বিচারিক বিষয় এবং আন্তঃগোত্রীয় সংঘাতের ব্যাপারে তাকে বংশীয় প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পরিষদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পক্ষান্তরে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বলে তৈরি হওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চেতনার ফলে বেদুইনরা শাইখকে দেখত সমমর্যাদার ব্যক্তি হিসেবে। সর্দার কোনো রাজা-বাদশাহ নন। পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যগুলোর প্রান্তে অবস্থিত এলাকাগুলোর নেতাদের এসব সাম্রাজ্য 'রাজা' উপাধিতে ভূষিত করত বটে। কিন্তু দক্ষিণ আরবের অধিবাসীরা কখনো গোত্র-প্রধানকে বোঝাতে এই উপাধি ব্যবহার করেনি (প্রাগুক্ত)।
ব্যক্তিস্বার্থ ও গোত্রবাদের এই জোড়া শক্তিটি গোত্রভিত্তিক সমাজের গণতান্ত্রিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই গণতন্ত্র আধুনিক গণতন্ত্রের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। ব্যক্তিচেতনা ও গোত্রীয় আনুগত্যের চেতনা প্রাক-ইসলামি আরবদের অর্থনৈতিক কাঠামোও তৈরি করেছে। ব্যক্তিস্বার্থের বলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে গোত্রীয় বন্ধনের ফলে রক্ষিত হয় সর্বজনীন অর্থনৈতিক বিষয়াদি। এই জনগোষ্ঠীগুলো বসবাস করত সর্বজনীন অর্থনৈতিক সম্পদের মাঝে। তাই গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে গোত্রপতিকে সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হতো কোন ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগত এবং কোনগুলো সামষ্টিক। আধুনিক পরিভাষায় বলা যায় যে, সেকালে বেদুইনদের অর্থনীতি পরিচালনায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা এভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়।
প্রাক-ইসলামি আরবের এই ব্যবস্থা ইসলামের আগমনের পরও টিকে যায়। তবে ইসলামি রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার জন্য তাতে রদবদল করা হয় (প্রাগুক্ত)। ইসলাম ব্যক্তিস্বার্থের চেতনাকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্বারোপ না করলেও একে অস্বীকার করে না। আবার দলান্ধতাকে সমর্থন না করলেও দলবদ্ধ থাকার অনুভূতিকেও ফেলে দেয় না। কোনোকিছুর প্রতি আত্মসম্পর্কিত থাকার যে স্বাভাবিক অনুভূতি এবং সে অনুভূতির যে প্রয়োজনীয়তা, ইসলাম কেবল সেটির একটি পথ দেখিয়ে দেয়। ইসলাম গোত্রের ধারণাকে প্রতিস্থাপিত করে ইসলামি জনসমাজ তথা উম্মাহ দিয়ে। ব্যক্তি ও সমাজ-একটিকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য না দিয়ে ইনসাফের ভিত্তিতে এই দুই উপাদানের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামি দর্শন ও অর্থনীতির তত্ত্ব।
টিকাঃ
[১] সহীহ। সহীহ বুখারি: ৫৬৬৪, সুনানু আবী দাউদ: ৩৮০। - সম্পাদক
📄 আতিথেয়তা
প্রাক-ইসলামি আরবের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অতিথিপরায়ণতা। এ এমন এক নীতি, যা মরুজীবনের গভীরে প্রোথিত। সাহসিকতা, বীরত্ব, উদ্দীপনা ও সহনশীলতার পাশাপাশি এই বৈশিষ্ট্যেরও গুণগান করে গেছেন সে যুগের মুখপাত্র হিসেবে অভিহিত কবিবৃন্দ (আত-তাবারি, ১৯৯১)। একজন মানুষ যত বড় শত্রুই হোক না কেন, অতিথি হিসেবে আগমন করলে তাকে সর্বোচ্চ আতিথেয়তা সহকারে বরণ করতে হতো। আতিথেয়তায় এদিক-সেদিক করা মানে ব্যক্তি ও গোত্রের মর্যাদায় আঘাত। নগণ্য অর্থনৈতিক সম্পদের মাঝে যেভাবে আরবরা জীবনযাপন করত, তার সাথে আতিথেয়তার এই সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। আবার এই নীতিটিই হতে পারে স্বয়ং এরকম জীবনধারার ফলাফল। প্রতিকূল পরিবেশে সর্বজনীন অসহায়ত্বের যে অনুভূতি তৈরি হয়, তার ফলেই অতিথিপরায়ণতাকে এত উঁচু দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আতিথেয়তার এই নীতি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়—সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তিদের প্রয়োজনকে যথেষ্ট আমলে নেওয়া হতো। তা ছাড়া আতিথেয়তার পেছনে একটি প্রধান উদ্দীপক ছিল ব্যক্তিগত ও গোত্রগত মর্যাদা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। তাই একদম অর্থনৈতিক পরিভাষায় বললে, প্রাক-ইসলামি যুগের আরব ভোক্তার কাছে পণ্যের উপযোগ দুই ধরনের: পণ্য ভোগ করতে পারার সন্তোষ এবং নৈতিক সন্তোষ। ইসলামি অর্থনৈতিক তত্ত্বে মুসলিম ভোক্তার উপযোগ তিন ধরনের: পণ্য ভোগের সন্তোষ, নৈতিক সন্তোষ এবং ইহকাল ও পরকালে ঐশী পুরস্কার লাভের সন্তোষ। (পরবর্তীকালে এটি আরও আলোচিত হবে।)