📄 বাল'আমবাউরের ঘটনা
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত দিয়েছেন বাল'আম বাউরের। বাল'আম বাউর হযরত মূসা আলাইহিস সালামের যুগের এক ব্যক্তি। সে অত্যন্ত আবেদ-যাহেদ ব্যক্তি ছিলো। মুস্তাজাবুদ দা'ওয়াত ছিলো। অর্থাৎ, সে যে দু'আই করতো, তা সাথে সাথে কবুল হয়ে যেতো। মানুষ তার দ্বারা দু'আ করাতো। আল্লাহ তা'আলা তাকে এ মর্যাদা দিয়েছিলেন। সে 'আমালেকা'দের অঞ্চলে বাস করতো। এ অঞ্চলের লোকেরা ছিলো কাফের। এ জন্যে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাদের উপরে আক্রমণ করার ইচ্ছা করেন। ঐ অঞ্চলের কাফেররা যখন জানতে পারলো যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আক্রমণ করবেন, তখন তারা বাল'আম বাউরের কাছে গেলো। গিয়ে বললো, আপনি বড়ো ইবাদতকারী, বুযুর্গ ব্যক্তি। আল্লাহ তা'আলা আপনার দু'আ কবুল করেন। আপনি দু'আ করুন যেন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের বাহিনী পরাজয় বরণ করে। আমাদের উপর বিজয়ী হতে না পারে।
বাল'আম বাউর বললো, আমি এ দু'আ করতে পারবো না। কারণ, তিনি আল্লাহ তা'আলার নির্বাচিত পয়গম্বর। তাঁর সঙ্গে যে সৈন্যবাহিনী আছে, তারা সকলেই ঈমানদার। আমি তাদের পরাজয়ের দু'আ করতে পারবো না। তারা পীড়াপিড়ী করলো যে, আপনি অবশ্যই দু'আ করুন। তখন সে বললো, আচ্ছা আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিখারা করি। সুতরাং সে ইস্তিখারা করলো- ইস্তিখারার মধ্যে এ উত্তরই এলো যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার পয়গম্বর। তুমি তাঁর জন্যে কি করে বদ-দু'আ করবে? সুতরাং সে মানুষদেরকে জানিয়ে দিলো যে, আমি আল্লাহর নিকট ইস্তিখারা করেছিলাম, আল্লাহ তা'আলা বদ-দু'আ করতে নিষেধ করেছেন।
লোকেরা দ্বিতীয় দিন আবার তার কাছে গেলো। তার জন্যে ঘুষস্বরূপ কিছু হাদিয়াও নিয়ে এলো। এসে বললো, এই হাদিয়া নিন এবং দু'আ করুন। ইস্তিখারার মাধ্যমে যখন সে জানতে পেরেছে যে, এটা আল্লাহ তা'আলার মঞ্জুর নয়, তখন বদ-দু'আ করতে তার অস্বীকার করা উচিত ছিলো। তখন এখানেই বিষয়টা ঢুকে যেতো। কিন্তু হাদিয়া পাওয়ার পর আরেকবার ইস্তিখারার কথা মাথায় এলো। তাদেরকে বললো যে, আচ্ছা আমি আরেকবার ইস্তিখারা করি। যখন দ্বিতীয়বার ইস্তিখারা করলো, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর এলো না। তখন সে মানুষদেরকে জানিয়ে দিলো যে, আমি বদ-দু'আ করবো না। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো যে, আপনি যে ইস্তিখারা করলেন, তার কী উত্তর এসেছে? সে বললো, কোনো উত্তর আসেনি। লোকেরা বললো, তাহলে তো কাজ হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার যদি আপনাকে বাধা দেওয়ার ইচ্ছা থাকতো, তাহলে তো আপনাকে নিষেধ করতেন। যখন নিষেধ করেননি এবং কোনো উত্তর আসেনি, এর অর্থ হলো আপনি অনুমতি লাভ করেছেন। লোকেরাও এই ব্যাখ্যা করলো, সাথে ঐ ইবাদতকারী ব্যক্তিও একই ব্যাখ্যা করলো। পরিশেষে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর জাতির ধ্বংসের জন্যে বদ-দু'আ করলো।
এই বদ-দু'আ যেহেতু একজন নবীর বিরুদ্ধে ছিলো এ কারণে তা কবুল হয়নি। তবে কেউ কেউ লিখেছেন যে, বাল'আম বাউরের বদ-দু'আর ফলে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম কয়েক বছর পর্যন্ত তীহ ময়দানে ঘুরতে থাকেন। তারপর ঐ আবেদ ব্যক্তি তার জাতিকে বলে- আমি তোমাদের কথা মতো দু'আ তো করেছি, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করবেন না। কারণ, আমি পূর্বেই ইস্তিখারা করেছিলাম। লোকেরা বললো, আপনি যে গোনাহ করার তা তো করেই ফেলেছেন। এখন দু'আও কবুল হচ্ছে না। এখন এমন কোনো ব্যবস্থা বলে দিন, যেন মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়।
তখন ঐ আবেদ চিন্তা করে বললো, আমি এমন এক ব্যবস্থার কথা বলছি, যার ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ছাড়বে। তা হলো, তোমরা নিজেদের যুবতী মেয়েদেরকে তৈরী করো। তাদেরকে সাজিয়ে গুছিয়ে ঐ বাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দাও। এরা বহু দিন যাবৎ পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করছে। যুবতীরা যখন তাদের কাছে যাবে, তখন কেউ না কেউ গোনাহে লিপ্ত হবে। যখন এরা গোনাহে লিপ্ত হবে, তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের উপর আযাব আসবে। এভাবে তোমরা তাদেরকে ধ্বংস করতে পারবে। তারা তাই করলো। যুবতী মেয়েদেরকে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের বাহিনীর মধ্যে পাঠিয়ে দিলো। ফলে কতক লোক গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হলো। বরং ঘটনার বিবরণে লেখা আছে যে, আমালেকার শাহাজাদী বনী ইসরাঈলের একজন সর্দারের কাছে গেলো। ঐ সর্দার শাহাজাদীকে নিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এলো এবং জিজ্ঞাসা করলো যে, এই শাহাজাদী কি আমার জন্যে হারাম? হযরম মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, হ্যাঁ তোমার জন্যে হারাম। সে বললো, হারাম হওয়া সত্ত্বেও আজ আমি তাকে সাথে নিয়ে যাবো। সুতরাং সে তাকে নিয়ে গেলো এবং অপকর্মে লিপ্ত হলো। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের এক সন্তান তা জানতে পেরে উভয়কে বর্ষা দ্বারা হত্যা করলো। এ ঘটনার পর এই অপকর্মের আযাব স্বরূপ বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্লেগ রোগের মহামারী দেখা দিলো। সুতরাং হাদীস শরীফেও এসেছে যে,
الطَّاعُونُ رِجْسٌ أُرْسِلَ عَلَى طَائِفَةٍ مِنْ بَنِي إِسْرَابِيلَ
'এই প্লেগ ঐ আযাবের অবশিষ্টাংশ, যা বনী ইসরাঈলের নিকট পাঠানো হয়েছিলো।'
এসব কিছু বাল'আম বাউরের প্রস্তাবে হয়। সে আমালেকাকে এ ব্যবস্থা শিখিয়েছিলো। লক্ষ করুন! যেই বাল'আম বাউর এতো বড়ো আবেদ, আলেম ও মুস্তাজাবুদ দা'ওয়াত ছিলো। যখন তার মন ঘুরে গেলো, তখন তার পরিণতি এই হলো। যার উল্লেখ কুরআনের এ আয়াতে রয়েছে,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي أَتَيْنَهُ أَيْتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَنُ فَكَانَ مِنَ الْغَوِيْنَ وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَهُ بِهَا وَلَكِنَّةً أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوْنَهُ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِنْ تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ...
'তাদেরকে ঐ ব্যক্তির অবস্থা পাঠ করে শুনান, যাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়েছিলাম অতপর সে তা থেকে সম্পূর্ণ রূপে বের হয়ে যায়, অতপর শয়তান তার পিছু নেয়, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমি চাইলে তাকে এসব আয়াতের বদৌলতে উঁচু মর্যাদায় পৌছে দিতাম, কিন্তু সে তো দুনিয়ার দিকে ধাবিত হলো এবং নিজের প্রবৃত্তির চাহিদার অনুগমন করলো, তাই তার অবস্থা হয়ে গেলো কুকুরের ন্যায়। তুমি তার উপর হামলা করলেও সে হাঁপায়,। তাকে ছেড়ে দিলেও সে হাঁপায়।"
📄 অন্তর কখন ঘুরে যায়
হযরত থানভী রহ. এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলছেন যে, বাল'আম বাউরের ঘটনা এর একটি দৃষ্টান্ত। সে এতো বড়ো আলেম, আবেদ ও মুস্তাজাবুদ দা'ওয়াত ছিলো, মানুষ তার কাছে গিয়ে নিজেদের জন্যে দু'আ করাতো, কিন্তু তার পরিণতি হলো এই। মন ঘুরে যেতে সময় লাগে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কারো অন্তরকে এমনিতেই অন্ধকারের দিকে ঘুরিয়ে দেন না যে, অকস্মাৎ একজন মুসলমান কাফের হয়ে যাবে। বরং তার আচরণ এমন হতে থাকে, যার ভিত্তিতে মন ঘুরে যায়। সেই আচরণ হলো, নিজের ইবাদতের কারণে অহমিকা চলে আসে, অহংকার সৃষ্টি হয়। অহংকারের ফলে বড়ো বড়োদের পা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে。
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৩৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪১০৮, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৯৮৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২০৭৫৬
৩. আ'রাফ: ১৭৫-১৭৬
📄 শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী রহ.-এর একটি ঘটনা
হযরত শাইখ আব্দুল ওয়াহহাব শা'রানী রহ. অনেক উঁচু স্তরের আল্লাহর ওলী ছিলেন। তিনি হযরত শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. সম্পর্কে একটি ঘটনা লিখেছেন। একবার হযরত শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. তাহাজ্জুদের নামায পড়ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন যে, একটি নূর চমকালো। পুরো পরিবেশ আলোকিত হয়ে উঠলো। সেই আলোর মধ্যে থেকে আওয়াজ এলো- হে আব্দুল কাদের! তুমি আমার ইবাদতের হক আদায় করেছো। এ পর্যন্ত তুমি যতো ইবাদত করেছো, তাই যথেষ্ট। আজকের পর থেকে তোমার উপর নামায ফরয নয়, রোযা ফরয নয়, সমস্ত ইবাদতের কষ্ট তোমার থেকে তুলে নেওয়া হলো।
আলোর মধ্যে থেকে এই আওয়াজ এলো। যেন আল্লাহ তা'আলা বলছেন যে, তোমার ইবাদত এ পর্যায়ে কবুল হয়েছে যে, ভবিষ্যতে তোমার আর ইবাদত করতে হবে না। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ. যখন এ নূর দেখলেন এবং এ আওয়াজ শুনলেন, তখন সাথে সাথে তিনি উত্তরে বললেন, 'হতভাগা! দূর হ, আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিস। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামা থেকে তো ইবাদত মাফ হয়নি, তাঁর উপর থেকে ইবাদতের দায়িত্ব রহিত হয়নি, আর আমার থেকে রহিত হচ্ছে। তুই আমাকে ধোঁকা দিতে চাস।'
দেখুন, শয়তান কতো বড়ো আক্রমণ করেছে! তার অন্তরে যদি ইবাদতের অহংকার চলে আসতো, তাহলে সেখানেই পদস্খলন ঘটতো। যেসব লোক অনেক বেশি কাশফ ও কারামতের পিছনে লেগে থাকে, তাদেরকে ধ্বংস করার জন্যে তো শয়তানের এটা উত্তম আক্রমণ ছিলো। কিন্তু তিনি তো ছিলেন শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী রহ.। অবিলম্বে তিনি বুঝে ফেললেন যে, এ কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে হতে পারে না। কারণ, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর থেকে ইবাদতের দায়িত্ব লোপ পায়নি। তাহলে আমার উপর থেকে কি করে লোপ পায়?
📄 শয়তানের দ্বিতীয় আক্রমণ
অল্পক্ষণ পর আরেকটা নূর ভেসে উঠলো। দিগন্ত আলোকিত হয়ে উঠলো। সেই নূরের মধ্যে থেকে আওয়াজ এলো-
হে আব্দুল কাদের! তোমার ইলম আজ তোমাকে রক্ষা করেছে। অন্যথায় কতো আবেদকে যে আমি এই আক্রমণ দ্বারা ধ্বংস করেছি, তার হিসাব নেই।
হযরত শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী রহ. পুনরায় বললেন, 'হতভাগা আবারও আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিস। আমার ইলম আমাকে রক্ষা করেনি, আল্লাহর অনুগ্রহ আমাকে রক্ষা করেছে।' এই দ্বিতীয় আক্রমণ ছিলো প্রথম আক্রমণের চেয়ে বিপদজনক ও মারাত্মক। কারণ, এর মাধ্যমে তার মধ্যে ইলমের অহমিকা ও গর্ব সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো।