📄 ১. شركة الابدان - দৈহিক অংশীদারত্ব
এই প্রকারকে শিরকাতুল আমাল বা কাজের মাধ্যমে অংশীদারত্বও বলে। এর স্বরূপ হলো, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি স্বয়ং তারা নিজেরাই উপার্জন করার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। উদাহরণত কাঠমিস্ত্রী, কারিগর, কামার অথবা দর্জিরা নিজেদের কাজ অংশীদারত্বের সাথে করা। এমনিভাবে যদি মূলধনহীন কয়েকজন শিকারি বা কুলি তাদের নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী অংশীদারত্বের সাথে লাভ ভাগাভাগি করে নেওয়ার শর্তে কাজ করে, তাহলে সেটাও এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হবে। ৭৪০
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ এই পদ্ধতিকে জায়িজ বলে অভিমত দিয়েছেন। তাদের দলিল হলো, রাসুলুল্লাহ-এর জমানায় এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। তাদের নিকট এ পদ্ধতিতে অপছন্দনীয় কিছু ছিল না।
সাধারণত এ চুক্তিতে সকল অংশীদারের সম্মতিক্রমে সকলের সমান লাভের শর্ত করা হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো কাজ অথবা পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে কমবেশি করে লাভ বণ্টিত হয়ে থাকে। ফলে অংশীদারদের মাঝে যে যতটুকু কাজ করেছে, সে ততটুকু পাবে। কেউ বেশি করলে লাভ থেকে বেশি নিতে পারবে।
টিকাঃ
৭৪০. বাদায়িউস সানায়ি : ৬/৫৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
📄 ২. شركة العنان - সমঅংশীদারত্ব
শিরকাতুল ইনান দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুজনই নিজেদের মালের মাঝে অংশীদার থাকবে এবং লাভও তাদের মাঝে বন্টিত হবে; এই শর্তে যে, তারা উভয়ে কর্মচারী দ্বারা কাজ করাবে। ইজমার ভিত্তিতে এই পদ্ধতিটি বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রে মাজহাবের ভিন্নতাভেদে কিছু শর্ত রয়েছে। যথা:
ক. ব্যবসার মূলধন মুদ্রা জাতীয় হওয়া, যেমন : টাকা, রুপি, ডলার, দিনার, দিরহাম ইত্যাদি। আর দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে যৌথব্যবসা বৈধ নয়। ৭৪১ হানাফি ও হাম্বলিদের মত এমনই। এক বর্ণনানুসারে শাফিয়িদের মতও এমনই। ইবনে মুনজির ও আবু সাওর তাদের মত গ্রহণ করেছেন। আর দ্রব্যসামগ্রী বলতে দিনার ও দিরহাম এ দুধরনের মুদ্রা ব্যতীত অন্য সকল সামগ্রীকে বোঝায়। ৭৪২
শুধু দিনার-দিরহাম বা এ জাতীয় মুদ্রা দ্বারাই শিরকাতুল ইনান বৈধ হয়ে থাকে। এর কারণ হলো, দিনার-দিরহাম বা মুদ্রা ছাড়া অন্য যেকোনো দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে লভ্যাংশ বণ্টনের সময় অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে ওই সামগ্রীর মূল্যটি মূলধন হিসাবে বিবেচিত হয়, সামগ্রীটি নয়। অথচ সেই মূল্যই (মূলধন) অজানা। অতঃপর ধারণার ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এর ফলে লভ্যাংশ অস্পষ্ট হওয়ার দরুন বণ্টনের সময় ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দিনার ও দিরহাম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ক্ষতিকর সম্ভাবনা মোটেই থাকে না। কারণ, সেখানে মূলধন স্পষ্ট থাকে বিধায় লভ্যাংশটাও স্পষ্ট থাকে।
অন্যদিকে মালিকিদের মতে, মুদ্রা ও পণ্যসামগ্রী উভয়টি দ্বারা যৌথ কারবার করা যায়। এ ক্ষেত্রে মূল্যকে মূলধন হিসাবে বিবেচনা করা হবে। তাদের মতে, শিরকাতুল ইনান হলো, উভয়পক্ষ নিজেদের সম্পদ নিয়ে আসবে, তারপর তা একত্র করবে অথবা দুজনেই তাদের অর্থ একটি সিন্দুকে রাখবে, অতঃপর একত্রে সেখান থেকে মূলধন দিয়ে ব্যবসা করবে এবং কেউ কারও অনুমতি ছাড়া ওই অর্থের মধ্যে হস্তক্ষেপ করবে না। ৭৪৩
খ. যৌথব্যবসায় মূলধন জানা থাকতে হবে। সুতরাং অস্পষ্ট বা আন্দাজ করা সম্পদের ওপর ভিত্তি করে যৌথব্যবসা বৈধ নয়। কেননা, মূলধনের পরিমাণে অস্পষ্টতার কারণে লভ্যাংশের মধ্যেও অস্পষ্টতা সৃষ্টি হবে। ব্যবসা বৈধ হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, লাভের হার জানা থাকা। এ শর্তটি ইমাম শাফিয়ি ও আহমাদ বিন হাম্বল ব্যক্ত করেছেন। তবে ইমাম আবু হানিফা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, শিরকত সহিহ হওয়ার জন্য চুক্তির সময় মূলধনের পরিমাণ জানা থাকা শর্ত নয়। কারণ, মূলধনের মধ্যে অস্পষ্টতা চুক্তি সম্পাদন করতে কোনো বাধা দেয় না। আর চুক্তিকালে মূলধনের অস্পষ্টতা ঝগড়ার কারণ হয় না। কেননা, স্বাভাবিকভাবে এর পরিমাণটা জানা হয়ে যায়। অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের সময় মুদ্রার পরিমাণ এমনিতেই অনুমেয় হয়ে যায়। তাই বণ্টনের সময় লভ্যাংশের পরিমাণে অস্পষ্টতা সৃষ্টি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ৭৪৪
গ. যৌথ ব্যবসায় মূলধন সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। কারও ঋণের টাকায়, বা বাকিতে চুক্তি করলে তা সহিহ হবে না। কেননা, যৌথ ব্যবসার উদ্দেশ্যই হলো লাভবান হওয়া। আর টাকা নগদ উপস্থিত থাকলেই কেবল এই সুযোগ অর্জন করা যায়, বাকি বা অনুপস্থিত থাকলে এ উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। হানাফি ও হাম্বলি মাজহাবের বক্তব্য এমনই। ৭৪৫
ঘ. ইমাম শাফিয়ি-এর মতে, উভয়ের মূলধন এক জাতীয় হতে হবে। যৌথব্যবসায় দুপক্ষের মূলধন ভিন্ন জাতীয় বা ভিন্ন গুণের হলে চুক্তি বৈধ হবে না। এমনকি যদি একজনের সম্পদ দিনার আর অপরজনের সম্পদ দিরহাম হয়, তবুও বৈধ নয়। কারণ, শেয়ার তথা শিরকত ব্যবসা বৈধ হওয়ার জন্য উভয়ের সম্পদ একত্র করতে হয়। আর দুজনের সম্পদ একজাতীয় ও একই বৈশিষ্ট্যের হলেই কেবল একত্র করা সম্ভব। ৭৪৬ এর বিপরীতে ইমাম আবু হানিফা ও আহমাদ বিন হাম্বল-এর মতে যৌথব্যবসা বৈধ হওয়ার জন্য সম্পদ এক জাতীয় হওয়া শর্ত নয়। কেননা, যৌথব্যবসায় ওকালাত তথা প্রতিনিধিত্ব করা জায়িজ। সুতরাং যেই সম্পদের মধ্যে ওকালাত জায়িজ, তাতে যৌথ ব্যবসাও জায়িজ। আর যেহেতু উভয়পক্ষের সম্পদ একসাথে করার পূর্ব পর্যন্ত ওকালাত বৈধ, সেহেতু ভিন্ন জাতীয় সম্পদের মধ্যেও যৌথব্যবসা বৈধ। এর ওপর ভিত্তি করে একটি কথা বলা হয় যে, একপক্ষ দিনার এবং অপরপক্ষ দিরহাম দিলেও ব্যবসা জায়িজ হবে। ৭৪৭
ঙ. যৌথব্যবসায় অন্যজনের সম্পদের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে। এটি যৌথব্যবসার অন্যতম শর্ত। যদি দুজন দুজনকে অনুমতি দিয়ে রাখে, তাহলে উভয়ের হস্তক্ষেপ করা বৈধ। আর যদি একজন অনুমতি দেয়, অপরজন না দেয়, তাহলে অনুমতি না পাওয়া ব্যক্তি শুধু তার অংশেই হস্তক্ষেপ করবে। যদি কোনো একপক্ষ অপরপক্ষকে পুরোপুরি ব্যবসায় হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দিয়ে রাখে, তাহলে তার জন্য পুরোপুরিভাবে হস্তক্ষেপ করা বৈধ হবে। আর যদি পণ্যের ধরন ও প্রকার অথবা স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়, তাহলে তাকে সেই পরিধিতেই ব্যবসা করতে হবে। কেননা, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের উকিলের মতো। সুতরাং একজন অপরজনকে যতটুকুর উকিল বানায়, সে ঠিক ততটুকুরই অধিকার রাখে। ৭৪৮
টিকাঃ
৭৪১. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৫৯ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৪২. মুখতারুস সিহাহ: ২০৫ (আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত)
৭৪৩. বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ৪/৩৫-৩৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
৭৪৪. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৬৩ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৪৫. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৬০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৪৬. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ১৪/৬৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৭৪৭. বাদায়িউস সানায়ি : ৬/৬০ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৪৮. আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ১৪/৭০ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ৩. شركة الوجوه - মর্যাদায় অংশীদারত্ব
এই পদ্ধতিকে শিরকাতুল উজুহ এ জন্য বলা হয় যে, উভয় শরিক তাদের মর্যাদার দ্বারা ক্রয়কৃত জিনিসের মধ্যে অংশীদার থাকে। আর জাহ ও ওয়াজহ শব্দ দুটি সমার্থক। যেমন যখন কেউ সম্মানিত হয়, তখন বলা হয়, ফুলানুন ওয়াজিহুন অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি সম্মানিত।
আল্লাহ তাআলা মুসা-এর ব্যাপারে বলেন:
{ وَكَانَ عِندَ اللهِ وَجِيهًا }
'তিনি আল্লাহর কাছে ছিলেন মর্যাদাবান।' ৭৪৯
পরিভাষায় শিরকাতুল উজুহ বলা হয়, 'উভয়পক্ষের মূলধন না থাকা সত্ত্বেও তারা সম্মানের বিনিময়ে যা ক্রয় করেছে, তার লভ্যাংশে উভয়েই অংশীদার হওয়া।' ৭৫০
মালিকি ও শাফিয়ি মাজহাব মতে, শিরকাতুল উজুহ বাতিল একটি চুক্তি। কিন্তু হানাফি ও হাম্বলিদের নিকট এটা জায়িজ। ৭৫১
টিকাঃ
৭৪৯. সুরা আল-হাজাব : ৬৯
৭৫০. বিদায়াতুল মুবতাদি: পৃ. নং ১২৮ (মাকতাবাতু ওয়া মাতবাআতু মুহাম্মাদ আলি সাবাহ, কায়রো)
৭৫১. ফাতহুল কাদির: ৬/১৮৯-১৯০ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ৪. شركة المفاوضة - সমান অংশীদারত্ব
আল-মুফাওজা এর আভিধানিক অর্থ সমতা। অর্থাৎ সমান স্তর বা সমমর্যাদার একটি দল, যারা একে অপরের সাথে মিলিত, মিশ্রিত ও জড়িত। তাদের মধ্যে কেউই মূল নয় অথবা প্রত্যেকে ভিন্ন ধরনের, কিংবা প্রত্যেকেই একে অন্যের সাথে মিশ্রিত। সর্বোপরি, আল-মুফাওজা হলো সর্ববিষয়ে অংশীদারত্ব। ৭৫২
এই পদ্ধতির শেয়ার ব্যবসাকে আল-মুফাওজা বলা হয় এ জন্য যে, এখানে মূলধন, লভ্যাংশ এবং সর্ববিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার সকলের জন্য সমান থাকে। কেউ বলে থাকেন যে, আল-মুফাওজা শব্দটি তাফভিজ বা সমর্পণ থেকে নির্গত। কেননা, প্রত্যেক অংশীদারই তার উপস্থিতি-অনুপস্থিতি-সর্বাবস্থায় অন্য শরিককে তার সম্পদে হস্তক্ষেপের অনুমতি দিয়ে রাখে। ৭৫৩
আল-মুফাওজা এর ধরন হলো, দুই বা ততোধিক অংশীদার প্রত্যেকেই অপরের সম্পদের মধ্যে হস্তক্ষেপ এবং ঋণের ব্যাপারে সমান অধিকারপ্রাপ্ত। ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত সকল বিষয়ে তারা প্রত্যেকে পরস্পরের পক্ষ থেকে উকিলের মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে। এই পদ্ধতিটি ব্যাপক ও বিস্তৃত। অর্থাৎ প্রত্যেক শরিক অন্য শরিককে ব্যবসায় পরিপূর্ণভাবে হস্তক্ষেপের অনুমতি দিয়ে থাকে। তা ছাড়া মুফাওজা অর্থ হচ্ছে সমতা বা সমান। সুতরাং শব্দের অর্থেরও দাবি যে, যেসব বিষয়ে যৌথব্যবসা হতে পারে, সেসব বিষয়ে তারা উভয়ে পরিপূর্ণরূপে সমান অধিকারী। ৭৫৪
ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম আহমাদ-এর মতে এমন ব্যবসা বাতিল। শরিয়তে এর কোনো বর্ণনা নেই। এই ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেন :
'কুল্লু শারতিন লাইসা ফি কিতাবিল্লাহি ফাহুয়া বাতিলুন' (আল্লাহর কিতাবে নেই, এমন সকল শর্ত বাতিল বলে বিবেচিত হবে।) ৭৫৫
এ ধরনের ব্যবসায়িক পদ্ধতি কুরআনে কারিমে নেই। তাই এটি বাতিল। তাদের আরেকটি দলিল হলো, এই পদ্ধতির ভিত্তি দুটি জায়িজ বিষয়ের ওপর। আর তা হলো, ওকালাত ও কাফালাত। আর এই দুটির প্রত্যেকটিই পৃথক পৃথকভাবে বৈধ ছিল, একত্রে নয়। অথচ উভয় অংশীদার একই ব্যবসায় উভয়টিকে একত্র করেছে। তাই এখন তা আর বৈধ থাকছে না। কিন্তু এখানে জায়িজ হওয়ার মতটিই অধিক শক্তিশালী। কেননা, লেনদেনের সকল পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ-এর যুগে ছিল না। তাই বলে পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত সকল ব্যবসায়িক পদ্ধতিকে কেউ বাতিল বলে না। এখানে মূল দেখার বিষয় হলো, নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি শরিয়তের কোনো মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক কিনা। যদি সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা দেখতে যত ভালো পদ্ধতিই মনে হোক না কেন, সেটা বাতিল লেনদেন বলে বিবেচিত হবে। আর এরকম সাংঘর্ষিক না হলে, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সুতরাং এ শিরকতে যেহেতু শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু পাওয়া যায় না, তাই এটাকে নাজায়িজ বলার কোনো কারণ নেই।
আল-মুফাওজা শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ :
কিছু শর্তের ভিত্তিতে আল-মুফাওজা বা সমান অংশীদারত্বে যৌথব্যবসা বৈধ। যথা:
ক. লাভের হার/পরিমাণ স্পষ্ট থাকা। অস্পষ্ট থাকলে আল-মুফাওজা নামক অংশীদারত্ব ফাসিদ হয়ে যাবে। কেননা, ব্যবসার উদ্দেশ্যই হলো লাভ। আর লাভের ওপরই চুক্তি হয়ে থাকে। তাই লাভের অস্পষ্টতা এ পদ্ধতির যৌথব্যবসাকে বিনষ্ট করে দেয়।
খ. লাভের পরিমাণ মূলধনের সর্বত্র বিস্তৃত থাকতে হবে। কোনো একটি অংশের সাথে নির্দিষ্ট করা হলে চলবে না। তাই যদি ব্যবসার লভ্যাংশের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়, যেমন লাভ হতে দশ দিনার বা একশ দিনার পাবে, তাহলে এই শিরকত শুদ্ধ হবে না। কেননা, এমন নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে শিরকত বাতিল হয়ে যায়। কারও লভ্যাংশের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলে তো উক্ত লাভের মধ্যে উভয়ের অংশীদারত্ব সাব্যস্ত হয় না।
গ. মূলধন সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। অনুপস্থিত বা ধার হিসাবে অন্যের কাছে থাকা কোনো সম্পদ হলে চলবে না। কেননা, শেয়ার ব্যবসার উদ্দেশ্যই হলো লাভ। আর তা অর্জিত হয় সম্পদের মধ্যে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। কিন্তু ধার বা অনুপস্থিত সম্পদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। তাই এ ক্ষেত্রে যেহেতু উদ্দেশ্য তথা লাভ হাসিল হয় না, সেহেতু মূলধন সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।
ঘ. প্রত্যেক অংশীদারের জন্য ওকালাত (প্রতিনিধিত্ব) এবং কাফালাত (দায়িত্ব) এর অধিকার থাকতে হবে। যদি উভয়ে স্বাধীন ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হয়, তবে এটা সম্ভব হবে। আর যৌথ কারবারে এটি আবশ্যকীয় একটি বিষয়। ওকালাত (প্রতিনিধিত্ব) এর মর্মার্থ হলো, তাদের প্রত্যেকেই তার অপর অংশীদারের পক্ষ থেকে যৌথ সম্পদে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে উকিল হবে। তারা একজন অন্যজনকে ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতি দিয়ে রাখবে এবং তাদের উভয়ের যেকোনো কাজ গ্রহণ করা হবে। কারণ, যৌথ ব্যবসার চাহিদা এমনই। আর উকিল তো হলো, তার অংশীদারের অনুমতিক্রমে হস্তক্ষেপকারী। সুতরাং এখানে ওকালতির অধিকার থাকা শর্ত। এমনিভাবে কাফালাত বা দায়িত্ব গ্রহণও মুফাওজা চুক্তির চাহিদা। কেননা, ব্যবসার মধ্যে তাদের একজনের জন্য যা কিছু সাব্যস্ত হয়, তা অপরজনের জন্যও সাব্যস্ত হয়। আর তাদের প্রত্যেকেই অপর অংশীদারের ওপর যা সাব্যস্ত হয়েছে, তাতে তার পক্ষ থেকে কফিল বা জিম্মাদারের মতো হবে। অতএব, এই ব্যবসায় কাফালাত (দায়িত্ব)-এর অধিকার থাকতে হবে।
ঙ. মুফাওজা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মূলধনের পরিমাণ সমান হওয়া। অতএব যদি উভয়ের সম্পদ সমান না হয়ে কমবেশ হয়, তাহলে এটা আর মুফাওজা হবে না। কেননা, মুফাওজা-এর মানেই হচ্ছে সমতা বা সমান হওয়া।
চ. আল-মুফাওজা এর মধ্যে লাভের অংশ সমান হওয়া। যদি তারা কমবেশি করে লাভ গ্রহণের শর্ত করে, তাহলে সমান না হওয়ার কারণে তা আল-মুফাওজা হবে না।
ছ. আল-মুফাওজা-এর মধ্যে ব্যাপকতা থাকা। সব ধরনের ব্যবসাকে আল-মুফাওজা-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার অবকাশ থাকতে হবে। কোনো অংশীদার অপর অংশীদার ছাড়া তাদের যৌথ ব্যবসার ধরন নির্ধারণ করতে পারবে না। কেননা, এমনটি করলে আল-মুফাওজা বাতিল হয়ে যায়। এর ওপর ভিত্তি করে বলা হয়, মুসলিম ও জিম্মির মাঝে আল-মুফাওজা জায়িজ হবে না। কারণ, জিম্মি ব্যক্তি এমন ব্যবসার সাথে আল-মুফাওজা করে ফেলবে, যা মুসলিম ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়। যেমন, মদ, শুকর বেচাকেনা ইত্যাদির ব্যবসা করা। ফলে ব্যবসার মধ্যে তাদের মাঝে আর সমতা রক্ষা হয় না। এমন মত পেশ করেছেন ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মাদ। আর ওকালাত ও কাফালতের ক্ষেত্রে উভয়ে সমান হওয়ার বিবেচনায় ইমাম আবু ইউসুফ-এর মতে তা বৈধ।
জ. আল-মুফাওজা শব্দটি মুখে উচ্চারণ করা। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত আছে যে, আল-মুফাওজা শব্দ উচ্চারণ করা ব্যতীত আল-মুফাওজা ব্যবসা বৈধ হবে না। কারণ, আল-মুফাওজা এর কিছু শর্ত আছে। যেগুলো তা উচ্চারণ করা ছাড়া বুঝে আসে না। তাই বুঝে আসার জন্য তা উচ্চারণ করতে হবে। অথবা বোঝার মতো সমার্থক অন্য কোনো বক্তব্য দিতে হবে। কেননা, এখানে মূল হচ্ছে বুঝে আসা, নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণ করা মুখ্য নয়। ৭৫৬
টিকাঃ
৭৫২. আল-কামুসুল মুহিত: পৃ. নং ৬৫১ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
৭৫৩. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৫৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭৫৪. ফাতহুল কাদির: ৬/১৫৬ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
৭৫৫. মুসনাদু আহমাদ: ৪২/৫১৬, হা. নং ২৫৭৮৭ (মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত) - হাদিসটি সহিহ।
৭৫৬. বাদায়িউস সানায়ি: ৬/৬১ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত) ফাতহুল কাদির: ৬/১৫৮- ১৬৩ (দারুল ফিকর, বৈরুত)