📄 ক. মুসলিম হওয়া
খলিফাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। ইমাম হওয়ার এটি প্রধান ও মৌলিক শর্ত। কোনো অবস্থাতই এ শর্ত থেকে খালি হতে পারবে না। এটা তো চিন্তাও করা যায় না যে, মুসলমানদের খলিফা বা শাসক হবে অমুসলিম! একজন অমুসলিম—যে ইসলামি আইন বা শরিয়তে বিশ্বাসী নয়, সে মুসলিমদের শরিয়ত অনুযায়ী কীভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করবে?
কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ওপর এ বিষয়টি ওয়াজিব করে দিয়েছেন যে, মুসলমানগণ ওই সকল আমির বা শাসকদের আনুগত্য করবে, যারা তাদের ধর্ম ও আকিদা বিশ্বাসে বিশ্বাসী, যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে ইমানদারগণ, আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের।”
এ আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, যারা মুসলমানদের আমির হবে তারা মুসলমানদের মধ্য থেকেই হবে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
“আর তিনি মুমিনদের ওপর কাফিরদের কখনোই কর্তৃত্ব দেবেন না।”
এ আয়াত থেকেও বুঝা যায়, কাফিররা মুসলমানদের ওপর কোনো প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করার অধিকার রাখে না। অতএব তাদের যদি মুসলমানদের বাদশাহ হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তো মুসলমানদের ওপর কাফিরদের আংশিক নয়; বরং পূর্ণ কর্তৃত্বই সাব্যস্ত হয়ে যাবে, যা সম্পূর্ণরূপে এ আয়াতের দাবি পরিপন্থী।
টিকাঃ
৪৩১. সুরা আন-নিসা: ৫৯
৪৩২. সুরা আন-নিসা: ১৪১
📄 খ. পুরুষ হওয়া
খলিফাকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে। নারীদের খলিফা হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, খিলাফতের দায়িত্ব অত্যন্ত ভারী ও গুরুত্বপূর্ণ। অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে এমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা যাবে না। এর জন্য উপযুক্ত হতে হলে ব্যক্তিকে হতে হবে চিন্তাশীল, সাহসী ও দূরদর্শী। এ ছাড়াও খলিফাকে এমন আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে, যা শুধু পুরুষের মধ্যেই পাওয়া যায়।
কোনো ধরনের কোমলতা, আবেগপ্রবণতা ও মহিলাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের আওতায় পড়ে এমন দুর্বলতা এই দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত নয়। কারণ, কঠোরতার ক্ষেত্রগুলোতে এমন ব্যক্তি সবকিছু ওলটপালট করে ফেলবে। যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে তালগোল পাকিয়ে ফেলবে। মহিলারা সাধারণত সঠিক বিষয়ের পরিবর্তে বেশির ভাগ মনের চাহিদা ও আবেগের দিকেই ধাবিত হয়ে থাকে। স্বভাবগতভাবেই নারীরা হয়ে থাকে কোমল, আবেগী, নমনীয় ও লাজুক। এসব বৈশিষ্ট্য ইমামতের জন্য একেবারেই অনুপোযোগী। তাই মুসলমানদের খলিফা হবে পুরুষ। কোনো মহিলা এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে না।
আবু বাকরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
“যখন পারস্য সম্রাট কিসরা মৃত্যুবরণ করল, তখন রাসুলুল্লাহ থেকে আমি এমন জিনিস শুনেছি, যা থেকে আল্লাহ তাআলা আমাকে হিফাজত করুন। তিনি বলেন, তারা কাকে তার স্থলাভি্বিক্ত করেছে? তারা বলল, তার মেয়েকে। তিনি বললেন, ওই জাতি কখনো সফল হবে না, যারা কোনো মহিলাকে তাদের আমির নিযুক্ত করে।”
টিকাঃ
৪৩৩. সুনানুন নাসায়ি : ৮/২২৭, হা. নং ৫৩৮৮, (মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব) - হাদিসটি সহিহ।
📄 গ. আদালত ও ন্যায়পরায়ণতা থাকা
এটি বিশেষ একটি পরিভাষা। আদালত বলা হয়, দ্বীনি বিষয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা, সগিরা গুনাহ পরিত্যাগ করা, কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁচে থাকা, নিজের ব্যক্তিত্ব ঠিক রাখা, আমানত রক্ষা করা, কোনো বিষয়ে গাফিলতি না করা। কারও মতে, আদালত হলো, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা। খলিফার গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম ইবনে হাজাম বলেন, 'যার দ্বারা কবিরা গুনাহ হয় না এবং যাকে সগিরা গুনাহ করতে দেখা যায় না।'
মাওয়ারদি বলেন, আদালত বা ন্যায়পরায়ণতার অর্থ হলো, সত্যবাদী হওয়া, আমানতদার হওয়া, হারাম, নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা, সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা, আবেগ, ভালোবাসা, রাগ ও ক্রোধের সময় কারও প্রতি প্রভাবিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকা। কারও মধ্যে এই গুণগুলো পরিপূর্ণভাবে থাকলে তার সাক্ষ্য গ্রহণীয় এবং তিনি ইমাম বা খলিফারূপে বরণীয়। আর কারও মধ্যে এগুলোর কোনো একটির ঘাটতি থাকলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না, ও তার হুকুমও কার্যকর হবে না এবং তিনি খলিফা হতে পারবেন না।
টিকাঃ
৪৩৪. আল-মুহাল্লা: ৮/৪২৫ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 ঘ. ইলম থাকা
ইলমের দিক থেকে খিলাফতের যোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সীমা হলো, সমসাময়িক সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা ও হুকুমের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা থাকা। মুসলমানগণ যখন কোনো সমস্যায় পতিত হবে, তখন উলামায়ে কিরাম ও ফুকাহায়ে কিরামের ওপর ওয়াজিব হলো, উক্ত সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে একটি সুষ্ঠু ও সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।
এ ধরনের পর্যালোচনাসভায় খলিফা নিবৃত্ত থাকবেন না; বরং তিনি পর্যালোচনা থেকে সঠিক মতটি বের করে আনবেন। ফুকাহায়ে কিরামের গবেষণা ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব মতামত থাকবে। তিনি নিজ যোগ্যতায় তা থেকে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতটি বের করে আনবেন। আর এ কাজটি শরয়ি বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন আলিম ব্যতীত সম্ভব নয়।
তবে একদল ফুকাহায়ে কিরামের দৃষ্টিতে খলিফার জন্য আলিম হওয়া শর্ত নয়; বরং জেনারেল কেউ-ও খলিফা হতে পারবে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তার একদল আলিম উপদেষ্টা থাকবে, যারা তাঁকে শরয়ি ফয়সালা করতে সাহায্য করবে। তবে এতে কোনো মতানৈক্য নেই যে, তার জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেক থাকতে হবে। মেধাহীন নির্বোধ কাউকে খলিফা বানানো কারো মতেই জায়িজ নেই।
টিকাঃ
৪৩৫. আল-আহকামুস সুলতানিয়া: পৃ. নং ১১২ (দারুল হাদিস, কায়রো)