📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হালাকু খান

📄 হালাকু খান


চেঙ্গিস খান তার পুত্র তুলুইকে পারস্য, খোরাসান এবং আরব ও এশিয়া মাইনর যতদূর বিস্তৃত হবে তার সবটুকুর কর্তৃত্ব প্রদান করেন। চেঙ্গিসের বংশধরদের মধ্যে তুলুইয়ের সন্তানরাই সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের রাজত্ব লাভ করেছিল। কারণ, একদিকে যেমন তুলুইয়ের পুত্র হালাকু খান এবং তারপর তার বংশধরগণ মধ্যপ্রাচ্য শাসন করে, অন্যদিকে হালাকুর ভাই কুবলাই খান চীনে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই অধ্যায়ে হালাকু খানের শাসিত অঞ্চল নিয়ে আলোচনা করা হবে, যার নাম ছিল ইলখানিয়া সাম্রাজ্য। পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচিত হবে কুবলাইয়ের শাসিত এলাকা নিয়ে।
হালাকু খান

মোঙ্গল ইতিহাসের আলোচিত এক নাম হচ্ছে হালাকু খান। আব্বাসি খিলাফতের সমাপ্তি আলোচনায় এবং পূর্ববর্তী অধ্যায়েও আমরা তার সম্পর্কে আলোচনা করেছি। তাতারদের সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর মনে যে অসন্তোষ ও ঘৃণা কাজ করে, তার প্রধান কারণ এই হালাকু খান। তার নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নির্মমতার কাহিনি শুনলে এখনো মানুষের গা শিউরে ওঠে!
হালাকু খান যুদ্ধনেশায় শুধু দেশ জয় করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং বিজিত অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ছিল তার প্রিয় স্বভাব। এই হালাকু খানের হাতে ধ্বংস হয় তৎকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, সুন্দরতম নগরী ও আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ। ৬৫৬ হিজরিতে (১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) বাগদাদে রীতিমতো গণহত্যা চলে হালাকু খানের হাতে। তারপর শামে প্রবেশ করে হালাকু খানের ঘাতক বাহিনী। দখল করে নেয় হালাব (আলেপ্পো)। এদিকে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের সিংহাসন নিয়ে হালাকু খানের অন্যান্য ভাইয়ের মাঝে দ্বন্দ্ব চলছিল। হালাকু খান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র কারাকোরামে ফিরে গিয়ে তার ভাই কুবলাই খানকে সাহায্য করেন। তার সহায়তায় কুবলাই খান ওগেদাইয়ের সন্তানদের পরাজিত করে সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ও সিংহাসন দখলের মাধ্যমে গ্রেট খান উপাধি লাভ করেন। শামে ফেরার সময় হালাকু খান ভেবেছিলেন তার সহকারী কিতবুগা দামেশক বিজয় করে তার জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে রাখবে। কিন্তু কিতবুগার বাহিনী আইনে জালুতে সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজের হাতে বিধ্বস্ত হয়। কিতবুগা নিজেও নিহত হয়। এতে মুসলিম পৃষ্ঠপোষক চাচাতো ভাই বারকে খানের প্রতি হালাকু খান চরম ক্রোধান্বিত হন। উভয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম দফায় বারকে খান জয়ী হন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় হালাকু তার পুত্র আবাকা খানকে নিয়ে আবারও হামলা চালান। বারকে খানের বাহিনী দারবান্দ শহরে হালাকুর কাছে পরাজিত হয়। প্রতিক্রিয়ায় বারকে খান পুনরায় তার বাহিনী বিন্যস্ত করে হামলা চালান এবং ককেশাসের অন্তর্ভুক্ত তুর্ক নদীর তীরে হালাকু খানকে পরাস্ত করেন। হালাকু খানের সৈনিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ পালিয়ে শামে চলে যায় এবং জাহের বাইবার্সের দলে যোগ দেয়। তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। এ অবস্থায় হালাকু খান আরও চতুর্মুখী সমস্যার মুখে পড়েন ও তার পতন ঘটে।
মুসলিমদের প্রতি হালাকু খানের বিদ্বেষ ছিল সীমাতিরিক্ত। এক খ্রিষ্টান নারী বিয়ে করার পর বিদ্বেষের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য হালাকু খানকে নিয়মিত উসকানি দিত তার খ্রিষ্টান স্ত্রী। মৃত্যুর আগে হালাকু খানের কিছুটা সুমতি হয়। নিজের দ্বিতীয় পুত্র তেকুদারকে কোনো এক মুসলিম পরিবারে প্রতিপালন করার অসিয়ত করে যান। ৬৬৩ হিজরিতে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) হালাকু খান মৃত্যুবরণ করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আবাকা খান

📄 আবাকা খান


হালাকু খানের পুত্র আবাকা খান। রাজত্বের পুরোটা সময় তার চতুর্মুখী যুদ্ধে যুদ্ধে কাটে। উত্তর দিকে লড়াই চলছিল আপন চাচাতো ভাইদের সাথে। প্রথম কিছুদিন বারকে খান, তারপর মাংকো তৈমুরের বিরুদ্ধে। মাংকোর বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে অনেক বড় বিজয় লাভ করেন আবাকা খান। কিন্তু এরপর তার বিরুদ্ধে একাট্টা হয় তিন বংশ। কেদু বিন কাশিনের নেতৃত্বে ওগেদাই বংশ এবং বুরাক খানের নেতৃত্বে চাগতাই বংশ এসে উত্তর সাম্রাজ্যের মোঙ্গলীয়দের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়। তারপর পূর্ব দিক থেকেও আক্রমণ শুরু হয়। এদিকে পশ্চিম পাশে একের পর এক সংঘর্ষ চলছিল মামলুকদের সাথে। মামলুকরা একাধিকবার আবাকা খানের বিরুদ্ধে জয় লাভ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিজয় আসে ৬৭৩ হিজরিতে (১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দে)। বাইবার্সের সময়ে মামলুকরা আনাতোলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ৬৭৯ হিজরিতে (১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে) আবাকা খান শাম দখলের চেষ্টা করে পর্যুদস্ত হয়। ৬৮০ হিজরিতে (১২৮১ খ্রিষ্টাব্দে) পুনরায় সুলতান কালাউনের বাহিনীর কাছে বিধ্বস্ত হয় তার বাহিনী। এ সময় ফুরাত নদী পর্যন্ত মামলুকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফুরাতই ছিল মামলুক ও ইলখানিয়া মোঙ্গল সাম্রাজ্যের সীমানা। ৬৮০ হিজরিতে (১২৮১ খ্রিষ্টাব্দে) আবাকা খান মৃত্যুবরণ করেন। তার সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হয় তার ভাই তেকুদার খান। আবাকা খান মুসলিমবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল তার বাবা হালাকু খানের উত্তরাধিকারসূত্রে। আবার আবাকা খানও নিজ পুত্র আরগুনের জন্য সেই উত্তরাধিকার রেখে যান অক্ষুণ্ণভাবে। আবাকা খানের ইসলামবিদ্বেষের নেপথ্যে অন্যতম কারণ ছিল কনস্টান্টিনোপলের রাজকন্যা। খ্রিষ্টচক্র পরিকল্পনামাফিক তার সাথে রাজকন্যাকে বিয়ে দিয়েছিল তাকে ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তেকুদার

📄 তেকুদার


হালাকু বংশের প্রথম মুসলিম। এই পুত্রকে প্রতিপালনের জন্য হালাকু খান এক মুসলিম পরিবারকে দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। তেকুদার ইসলামি পরিবেশে লালিতপালিত হওয়ায় স্বভাবতই মুসলিম মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তিনি নিজের নাম রাখেন আহমাদ। ক্ষমতায় আরোহণ করে তেকুদার আহমাদ ৬৮১ হিজরিতে (১২৮২ খ্রিষ্টাব্দে) মামলুক সুলতান কালাউনের সাথে শান্তিচুক্তি করতে মনস্থ করেন। কিন্তু তখন আবাকা খানের পুত্র আরগুন খান চাচা তেকুদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করে ফেলেন। যেসময় তেকুদার মামলুক সুলতানের কাছে দূত প্রেরণ করেছিলেন ঠিক সে সময়ই তাকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসেন ভাতিজা আরগুন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আরগুন

📄 আরগুন


আরগুন পিতার কাছ থেকে প্রচণ্ড ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে বড় হন। তাই তিনি মুসলিম চাচা থেকে মুক্তি পেতে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। এরপর মামলুক ও গোল্ডেন হোর্ডের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য মিত্রতা গড়ে তোলেন খ্রিষ্টশক্তি ও আর্মেনীয়দের সাথে। তখনকার গোল্ডেন হোর্ডের অধিপতি তোদান মাংকো খানও ছিলেন মুসলিম। ৬৯১ হিজরিতে (১২৯২ খ্রিষ্টাব্দে) আরগুন মৃত্যুবরণ করে। তার স্থলবর্তী হন তার ভাই কিগাতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00