📄 মোঙ্গলদের বৃহৎ সাম্রাজ্য যেভাবে ভাগ হয়
মোঙ্গল বলতে স্বজাতীয় লোকদের পাশাপাশি এসব গোষ্ঠীকেও বোঝানোর কারণ হলো, মোঙ্গল জাতির জনক চেঙ্গিস খান তার আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলেও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বরং মোঙ্গল বলতে (মধ্য) এশিয়ার অধিকাংশ জাতিকেই বোঝানো হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, শোষণ ও হত্যা ছাড়া মুসলমানদের ইতিহাসে মোঙ্গলদের অবদান আর কী ছিল? আপনি মুসলমান হিসেবে মোঙ্গলদের বাগদাদ ধ্বংস ও আইনে জালুতে তাদের পরাস্ত হওয়া ছাড়া তাদের ব্যাপারে আর কী ইতিহাস জানেন?
মোঙ্গলদের বৃহৎ সাম্রাজ্য যেভাবে ভাগ হয়
চেঙ্গিস খান পৃথিবীর বড় একটি অংশকে দখল করে নিয়েছিলেন এবং তার সাম্রাজ্যের রাজত্বভার প্রথমা স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। মোঙ্গল সংবিধান 'ইয়াসাক'-এর আইন অনুযায়ী এটি সম্পন্ন হয়েছিল। তখন তিনি তার বড় ছেলে জোচি খানকে রাশিয়া, খোয়ারিজম (খিভা), ককেশাস, কাজান (যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্তর্গত) ও পশ্চিমের বিস্তৃত অঞ্চলগুলো দিয়ে দেন। তার আরেক ছেলে চাগতাইকে দেন উইঘুর অঞ্চল (বর্তমান চীনের কাংসু প্রদেশ), পশ্চিম তুর্কিস্তান ও মাওয়ারাউন নাহার (ট্রান্সঅক্সিয়ানা)-এর দেশগুলো। তার ছেলে তুলুইকে দেন খোরাসান, পারস্য এবং আরব ও এশিয়া মাইনরের সম্ভাব্য বিজিত অঞ্চলগুলো। তার আরেক ছেলে ওগেদাইকে বর্তমান মঙ্গোলিয়া, চীন, পূর্ব তুর্কিস্তান এবং প্রাচ্যের বিজয়সম্ভাব্য অঞ্চলগুলোর দায়িত্ব দেন।
আমরা এই অধ্যায়ে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিচ্ছেদে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত অঞ্চলগুলোর ইতিহাস বিবৃত করব। আর হিন্দুস্তানের ইতিহাস নিয়ে এর শেষাংশে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা উপস্থাপন করব, যেখানকার শেষ মুসলিম শাসন ছিল এই মোঙ্গল (মোঘল) জাতির হাতে।
প্রথম পরিচ্ছেদ : ইউরোপের পূর্বাঞ্চল ও সাইবেরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : ইরান অঞ্চল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : চীন ও মঙ্গোলিয়া।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ : পশ্চিম তুর্কিস্তান অঞ্চল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ : ভারতবর্ষ।
📄 তাতারদের মধ্যে ইসলামের প্রসার
মুসলিম ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞজনদের মতে তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞের স্রোতে ইসলামি বিশ্ব প্রায় ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, এর সকল চিহ্ন ও ঐতিহ্য প্রায় মুছেই যেতে বসেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তাতারদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং ইসলামের দাঈদের ওসিলায় যে সাফল্য আসে, এতদিনের তির-বর্শা ও সুলতান-বাদশাহদের শক্তিপ্রয়োগেও তা সম্ভব হয়নি। ইসলাম তার (পূর্বের) শত্রুদের অন্তরে জায়গা করে নিতে থাকে এবং তাদের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্বকারী এ জনগোষ্ঠী ইসলামের সামনে নত হয়ে যাওয়াটা ছিল ইতিহাসের দুর্লভ ও আশ্চর্যজনক একটি অধ্যায়।
কেননা, তাতাররা ইসলামি বিশ্বের ওপর বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের ন্যায় হামলে পড়েছিল। আর সমগ্র ইসলামি বিশ্বে তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় ছিল না, যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে তা-ই মনে হয়।
কেননা, সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামি বিশ্ব সামগ্রিকভাবে ওই সকল ব্যাধি ও দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিল, যা সাধারণত কোনো জাতি সভ্যতা ও শক্তির উচ্চ শিখরে আরোহণ করলে হয়ে থাকে। অপরদিকে তাতাররা হলো এমন শক্তিশালী জনগোষ্ঠী, যারা গ্রামীণ জীবন থেকে উঠে এসেছে। নির্বুদ্ধিতা ও পাষণ্ডতা যাদের রক্তমাংসে মিশে আছে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, এই সম্প্রদায়ই পরাজিত ও অধীনস্থ মুসলমানদের সামনে নত হয়ে গেছে এবং নিজেদের শক্তিসামর্থ্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করেও ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছে। অথচ ইসলাম তখন রাজনৈতিক ও বস্তুগত সকল ক্ষমতাই হারিয়ে বসেছিল। তখন তাতারদের দৃষ্টিতে মুসলমানরা ছিল উপহাস ও উপেক্ষার পাত্র।
টি. ডব্লিউ. আর্নল্ড এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তার বিখ্যাত গ্রন্থ preaching of islam-এ লিখেছেন, 'কিন্তু তখন হারানো গৌরব ও শৌর্যবীর্যের ধ্বংসস্তুপ থেকে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠা ইসলামের জন্য খুবই জরুরি ছিল। আর ইসলাম তার দাঈদের চেষ্টা-মেহনতে বিজয়ী ও বর্বর তাতারদেরকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে এবং তাকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করিয়ে নিতে সক্ষমও হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবদানই ছিল ওই সকল মুসলিম দাঈর, যারা তৎকালীন আরও দুটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের মোকাবিলা করতে চরমভাবে হিমশিম খাচ্ছিল। যেগুলো তখন যেকোনো উপায়েই এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে সচেষ্ট ছিল। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। এই তুমুল প্রতিযোগিতাটি সংঘটিত হয় খ্রিষ্টবাদ, ইসলাম ও বৌদ্ধ ধর্মের মাঝে। প্রত্যেকটি ধর্মই অপর ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। প্রত্যেকেই চাইত ওই সকল বিজয়ী তাতারদের হৃদয় জয় করতে, যারা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সকল অঞ্চলেই সব ধর্মের অনুসারীদের মাথা নত করে দিয়েছিল।'
(তিনি আরও বলেন,) 'বোঝা যায়, মোঙ্গল শাসনের আওতাধীন অঞ্চলে ইসলামের খ্রিষ্ট ও বৌদ্ধ ধর্মের মতো অন্যান্য শক্তিশালী ধর্মের সাথে পেরে ওঠা সহজ ছিল না। বরং এই দুই ধর্মের সাথে প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়া ছিল কল্পনাতীত। কেননা, মুসলমানরা তখন অন্যদের চেয়ে মোঙ্গলদের হামলায় বেশি পর্যুদস্ত হয়েছিল। এমনকি এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সে সময়ের ধর্মীয় ও ইসলামি জ্ঞানের সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় শহরগুলোর অধিকাংশই বিরান ও অকেজো হয়ে গিয়েছিল। ফকিহ ও সুফি দরবেশদের পরিণাম ছিল মৃত্যু অথবা বন্দিত্ব। মোঙ্গলদের যে সকল বাদশাহ সকল ধর্মের প্রতি কিছুটা সহনশীল ছিল তাদেরও অনেকে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিভিন্ন মাত্রায় ঘৃণা প্রকাশ করেছে। চেঙ্গিস খান ইসলাম-নির্ধারিত পদ্ধতিতে যারা জীবজন্তু জবাই করে, এমন প্রত্যেককে হত্যা করার ফরমান জারি করেছিলেন। কুবলাই খানও এ কাজে তার অনুসরণ করেন। বরং একধাপ এগিয়ে তিনি ইসলাম-নির্ধারিত পদ্ধতিতে যারা পশু জবাই করে, তাদেরকে দেখিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার দিতেন। তিনি মুসলমানদের সাত বছর যাবৎ অনেক নিপীড়ন করেন এবং অনেককে হত্যা করেন। অবস্থা এমন ছিল যে, বহু নিঃস্ব দেউলিয়া ওই আইনের ভিত্তিতে মুসলমানদের সম্পদ উপার্জনের সুযোগ পেয়ে যায়। বহু ক্রীতদাস তাদের মুসলিম মনিবের ব্যাপারে এ রকম মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মুক্ত হয়ে যায়। ১২৪৬-১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে গুযুক খানের শাসনামলে মুসলমানরা নিপীড়ন ও পাষণ্ডতার সর্বোচ্চ পর্যায় দেখেছে। তিনি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব তার দুইজন খ্রিষ্টান উজিরের (মন্ত্রী) হাতে দিয়ে রেখেছিলেন। তার আদালতে খ্রিষ্টীয় পাদরিদের আনাগোনা ছিল বেশি।'
তিনি আরও লেখেন, '১২৮৪-১২৯১ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যে মোঙ্গল ইলখানাতের (৩) চতুর্থ সুলতান আরগুন সে দেশের মুসলমানদেরকে অত্যাচার করেন এবং মুসলমানরা অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগের যেসব পদে এতদিন নিয়োজিত ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে পদচ্যুত করেন। রাজপ্রাসাদে তাদের যাওয়া নিষেধ করে দেন। এত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এই বর্বর অত্যাচারী মোঙ্গলরা মুসলমানদের ধর্মই গ্রহণ করে, যাদেরকে এতদিন তারা জুলুম-অত্যাচারে জর্জরিত করে রেখেছিল এবং পদতলে পিষ্ট করে আসছিল।
নিশ্চয়ই এটি বিস্ময়কর এক ইতিহাস। তবে আমাদের অবাক হতে হয় এই ভেবে, এসব বিবৃতি ইতিহাসে বিস্তারিত ও বিশদভাবে পাওয়া যায় না। আমরা ওই সকল বীর ও মহাত্মাদের নামই এখনো জানতে পারিনি, যারা মুসলমানদের এই বিশাল অবদানের জন্ম দিয়েছেন এবং মোঙ্গলদের মতো এত পাষাণ এক জাতিকে ইসলামের ছায়াতলে এনেছেন। অথচ ইতিহাসে ইসলামি অবদান হিসাবে এগুলো কোনো অর্থেই কম গুরুত্বের নয়। তাদের অবদান শুধু মুসলমানদের ওপরেই নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সমগ্র মানবজাতির ওপর। কেননা, তারা এ বিশ্বকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং তাকে এমন এক জাতির ছায়াতলে এনেছিলেন, যারা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মের প্রতি আন্তরিকভাবে অন্যদের দাওয়াত দিয়েছেন।
চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য চারটি উপসাম্রাজ্যে বিভক্ত হয়। এই চার উপসাম্রাজ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তাতাররাও তাদের শাসকদের প্রচেষ্টায় ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। মাত্র একশ বছরের মধ্যেই তাতাররা প্রায় সবাই ইসলাম কবুল করে নিয়েছিল।
আর্নল্ড এমন অনেক ঘটনাই বর্ণনা করেছেন, যা এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা দেয়। চেঙ্গিস খানের বড় ছেলে জোচি খান মোঙ্গল সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় সিয়েরা দারদা শাসন করতেন। তার এলাকায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের বর্ণনা দিতে গিয়ে আর্নল্ড বলেছেন—
'১২৫৬-১২৬৭ খ্রিষ্টাব্দের শাসক বারকে খান মোঙ্গল শাসকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান। তিনি রাশিয়ায় ১২৫৬ ও ১২৬৭-এর মধ্যবর্তী সময়ে গোল্ডেন হোর্ডের গোত্রপতি ছিলেন। (এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, নাজমুদ্দিন মুখতার জাহিদি রহ. ১২৬০ সালে বারকে খানের জন্য একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দলিল-প্রমাণ সহকারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত প্রমাণ করে এবং রিসালাত অস্বীকারকারীদের বক্তব্য খণ্ডন করে। এ পুস্তিকাটি সে সময়ে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মাঝে হওয়া বিতর্ক সভাগুলোর চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে।) (৪) তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বলা হয় যে, তিনি একদিন বুখারা থেকে আগত একটি বাণিজ্যিক কাফেলার মুখোমুখি হন। দুইজন ব্যবসায়ীকে ইসলামি আকিদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তখন তারা এমন চমৎকার সুন্দর ব্যাখ্যা পেশ করে যে, একসময় তিনি এ ধর্ম গ্রহণ করে নেন এবং এর প্রতি পুরোপুরি আন্তরিক হয়ে পড়েন। তিনি তার ছোট ভাইয়ের কাছেই প্রথমে তার ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন এবং তাকেও তার পথে চলতে অনুপ্রাণিত করেন। এরপর তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন।'
তিনি আরও বলেছেন, 'সুলতান বারকে খান মিশরের মামলুক শাসক রুকনুদ্দিন জাহের বাইবার্স (১২৬০-১২৭৭ খ্রি.)-কে মিত্র বানান। বাইবার্স নিজের পক্ষ থেকেই এ ঘনিষ্ট সম্পর্কের সূচনা করেন। গোল্ডেন হোর্ডের দুইশ সৈন্যের ক্ষুদ্র একটি প্লাটুনকে তিনি অভ্যর্থনা জানান। (ঘটনার বিবরণ ছিল এরকম,) যখন বারকে খানের এসব সৈন্য তাদের সম্রাট এবং বাগদাদজয়ী হালাকু খানের মাঝে কঠিন শত্রুতার বিষয়টি বুঝতে পারল, তখন তারা সবাই সিরিয়ার দিকে পলায়ন করে। তাদের গন্তব্য ছিল মূলত মিশর। এখানে এসে তারা সুলতান বাইবার্সের রাজপ্রাসাদে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সম্মান পান। বাইবার্স তাদেরকে ইসলামের সত্যতার বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হন এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ইতিপূর্বে সুলতান বাইবার্স স্বয়ং হালাকু খানের সাথে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেছিলেন এবং কিছুদিন পূর্বেই তাকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। সুলতান বাইবার্স এদের মধ্য থেকে দুইজন আশ্রয়প্রার্থী মোঙ্গল ও অন্যান্য কয়েকজন দূতকে একটি চিঠি নিয়ে বারকে খানের কাছে পাঠান। তারা মিশরে ফেরার সময় এ বার্তা নিয়ে ফেরে যে, বারকে খানের সাম্রাজ্যে প্রত্যেক শাসকের জন্য বিশেষ ইমাম এবং মুআজ্জিন নিয়োগ দেওয়া আছে। আর শিশুরা মাদরাসায় কুরআনে কারিম হিফজ করছে। সুলতান বাইবার্স ও বারকে খানের মাঝে সংঘটিত এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফলে গোল্ডেন হোর্ডের প্রতিনিধিদল প্রচুর পরিমাণে মিশরে আসতে থাকে এবং দ্বীন হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করে নিতে থাকে।'
আর্নল্ড চেঙ্গিস বংশের দ্বিতীয় সাম্রাজ্য ইলখানাতে ইসলাম প্রসারের বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন:
'পারস্যের দেশগুলোতে যেখানে হালাকু খান মোঙ্গল ইলখানাত বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—খুবই সীমিত পরিসরে সেখানে ইসলামের প্রসার ঘটেছিল। বারকে খান এবং মিশরের সুলতানের আক্রমণকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে হালাকু খান আর্মেনিয়ার শাসক এবং ক্রুসেডারদের মতো খ্রিষ্টান শক্তিগুলোর সাথে মিত্রতা গড়ে তোলেন। হালাকুর সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীও ছিলেন খ্রিষ্টান। তাই তিনি তার স্বামীকে স্বভাবতই তার ধর্মীয় ভাইদের পক্ষপাতিত্ব করতে ফুসলিয়ে থাকবেন। তিনি হালাকু খানের ছেলে আবাকা খানকে (১২৬৫-১২৮১ খ্রিষ্টাব্দ) কনস্টান্টিনোপলের সম্রাটের মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দেন। যদিও আবাকা খান তার নিজ ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করেননি, তবু তার রাজ্য খ্রিষ্টান ধর্ম-পণ্ডিতদের দিয়েই মুখরিত ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন শাসনকর্তার কাছে তিনি দূত পাঠিয়েছিলেন। ফ্রান্সের রাজা সেন্ট লুইস, সিসিলির রাজা শার্ল, অ্যারাগনের শাসক জেমস প্রমুখের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ করে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে মৈত্রী গঠন করতে চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে মোঙ্গলদের ষোলোজন রাষ্ট্রদূতকে ১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় লিউন সম্মেলনে প্রেরণ করা হয়। তখন প্রধান রাষ্ট্রদূত খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। তাকে ও তার কয়েকজন সাথিকে খ্রিষ্টধর্মের নিয়মানুসারে জলে গোসল করিয়ে সে ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। খ্রিষ্টানরা আরও আশাবাদী হয়ে ওঠে। তারা আবাকা খানের পক্ষ থেকেও খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের আশা করে। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয় যে, এই সকল আশা ছিল মরীচিকা। তার ভাই তেকুদার আহমাদ (৫) ছিলেন পারস্যে ইসলাম গ্রহণকারী মোঙ্গল মুসলমানদের প্রথম বাদশাহ। তিনি খ্রিষ্টান ধর্মের ওপর বেড়ে উঠেছিলেন। যেমন, তার সমকালীন এক খ্রিষ্টান লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী আমরা জানতে পারি, শৈশবে তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তখন তার নাম ছিল নিকুলা। কিন্তু বয়স বাড়ার পর মুসলমানদের সাথে মেলামেশার সুবাদে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন ধার্মিক মুসলমান হিসেবে পরিচিতি পান। খ্রিষ্টবাদ থেকে ফিরে এসে তিনি মুহাম্মাদ খান নাম ধারণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি তার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছেন সকল তাতারকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মে নিয়ে আসতে। কিন্তু যখন তারা ধর্ম থেকে ফিরে আসার ব্যাপারে নিজেদের কঠোর মনোভাব প্রকাশ করল, তিনি আর তাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করাতে সাহস পাননি। তবে তাদেরকে সম্মানজনক উপাধি, উপহার ও দান-দক্ষিণ্য প্রদান করে সেই উদ্দেশ্যে লেগে থাকেন। ফলে এক বিশাল সংখ্যক তাতার তার সময়েই মুসলিম আকিদাবিশ্বাস গ্রহণ করে নেয়।'
তেকুদার আহমাদ তার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ চিঠি মারফত মিশরের মামলুক সুলতান কালাউনের কাছে পাঠান। চিঠির ভাষ্য ছিল:
মিশরের বাদশাহ বরাবর,
পরকথা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সাহায্য ও হিদায়াতের আলো দিয়েই শৈশবে আমাদেরকে তাঁর রুবুবিয়্যাত এবং তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার তাওফিক দিয়েছেন। আরও তাওফিক দিয়েছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সত্যতার সাক্ষ্য দিতে এবং আল্লাহর নেককার ওলিদের প্রতি সুধারণা পোষণ করতে। আল্লাহ তাআলা যার মঙ্গল চান, তার অন্তরকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাই আমরা ক্রমাগত আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চ এবং মুসলমান ও ইসলামি শরিয়তকে সমুন্নত রাখার প্রতি ঝুঁকছি। মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ আমাদের ওপর যে, তিনি আমাদের বংশকে এক মহারাজত্ব দান করেছেন। আমার ভাই এখন সেই রাজত্বের কর্ণধার। আমাদের সাম্রাজ্যের জ্ঞানী-গুণী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি, সকল ভাই, সন্তানসন্ততি, আমির, গভর্নর, সেনাপতি, গোত্রপতিসহ আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, আমাদের এই সুবিশাল বাহিনী, যাদের পদভারে ধরণি যেন ক্লান্ত, যাদের শক্তিমত্তা ও প্রাচুর্যের কারণে সমগ্র বিশ্ব ভীত-সন্ত্রস্ত, তাদের এক বিরাট অংশ আমরা এতদিন যে কাজে মগ্ন ছিলাম, এখন সবাই ভুল বুঝতে পেরেছি। যে সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠা করা আমাদের কর্ম ছিল, তার সাথে আমাদের বর্তমান কর্মের কোনো মিল নেই। মূলত ইসলামের সত্য-সুন্দর পথ অবলম্বন করলেই সে লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। রক্তপাত ও হানাহানির পথ বর্জন করে শান্তি ও নিরাপত্তা (যা এতদিন আমরাই নষ্ট করেছি) পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া আমাদের কর্তব্য।
এর মাধ্যমে মুসলিমরা শহর-নগরে শান্তি ও নিরাপত্তার জিন্দেগি যাপন করবে। এতে সম্মান জানানো হবে আল্লাহর নির্দেশনাকে এবং এতে সৃষ্টিজগতের প্রতি সদাচার করা হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিয়েছেন। আমরা চাই এতদিনের প্রজ্বলিত আগুন নিভিয়ে দিতে, ফিতনা-ফাসাদ বিলুপ্ত করতে, বিশ্বের জন্য যা কল্যাণকর তা করতে এবং যা অকল্যাণকর তা দূর করতে। এখন আর আমরা উপযুক্ত কারণ তালাশ না করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ব।
না। এখন থেকে আমাদের দৃঢ় নিয়ত হলো, সর্বদা সততার ওপর অটল থাকব এবং সফলতার জন্য যা প্রয়োজন তাই করব।
আমরা শাইখ কুতুবুদ্দিন এবং আতাবেক বাহাউদ্দিনকে আমাদের বিচারবিভাগ এবং ইসলামি বিষয়ে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য নির্বাচন করেছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন সত্য পথ ও তার পথিকদের অনুসরণ করার আগ্রহ। কেউ যদি ইসলামের নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে কোনো প্রমাণ তালাশ করে, তাহলে তা সে আমাদের পুরাতন অবস্থা ও বর্তমান অবস্থা দেখলেই পাবে। এখন থেকে আমরা আল্লাহর কালিমা সমুন্নত করার মেহনত শুরু করলাম। ইনশাআল্লাহ আমরা ইসলামের প্রতিটি নির্দেশ বাস্তবায়ন করব। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীনের চাহিদা অনুযায়ী এই দ্বীনকে অন্য সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দেবো। আমরা জনগণের অন্তরে প্রশান্তির বাতাস বইয়ে দিতে চাই। এতদিন আমাদের সাথে যে যা করেছে, সব ক্ষমা করে দিয়েছি। সবার সাথে ক্ষমার আচরণ প্রদর্শন করছি। সবাইকে বলেছি, ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ পেছনের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন।
মুসলমানদের ওয়াকফ সম্পত্তি তথা মসজিদ, মাদরাসা ও দর্শনীয় স্থান সংস্কারে হাত দিয়েছি। হাজিদের কাফেলাকে সম্মান করতে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছি। বরং তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করে কাফেলা তৈরি করে দিতে বলেছি। পথের নিরাপত্তা বিধান ও নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে বলেছি। এসব দেশে গমনাগমনকারী বাণিজ্যিক কাফেলার জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছি। তাদের ইচ্ছামতো ও প্রয়োজন অনুযায়ী যেখানে ইচ্ছা তারা যেতে পারে। এসব পূরণের জন্য মিশরের সুলতানের সাথে সন্ধি করা প্রয়োজন। এতে বিরান ভূমিগুলো আবার আবাদ হবে। বিশৃঙ্খলা দূর হবে। ধারালো তলোয়ার কোষবদ্ধ হবে। সবাই সুখ শান্তির দেশে বাস করবে। মুসলিম উম্মাহর অপমান ও অপদস্থতার দিন সমাপ্ত হবে।
যারা মোঙ্গল ইতিহাস পড়বে, এটা তাদের ভালো লাগার একটা অনুষঙ্গ হবে যে, নিপীড়ন ও রক্তপ্রবাহের ঘটনা পড়ে শেষ করতেই সর্বোচ্চ মানবতা ও সম্প্রীতির একটি অধ্যায়ের শুরু করতে পারবে। যার বর্ণনা মিশরের মামলুক বাদশাহকে লেখা তেকুদার আহমাদের চিঠিতে আছে। মোঙ্গলদের মতো নিষ্ঠুর এই জাতিগোষ্ঠী থেকে এমন এমন আচরণ প্রকাশিত হতে পারে ভেবে বিস্মিত হবে পাঠক।
তেকুদার আহমাদের খ্রিষ্টান নির্যাতন ওই সকল মোঙ্গলীয়দের রাগিয়ে তুলেছিল, যারা ধর্ম ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও খ্রিষ্টানদের সাথে খুব মিশে চলত। তারা এই অভিযোগ উত্থাপন করে কুবলাই খানের কাছে আর বলে, তেকুদার খান তার পূর্বসূরিদের আদর্শ মানে না। তখন তার বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ গড়ে ওঠে, যার মূলে ছিল তারই ভ্রাতুষ্পুত্র আরগুন। তিনি তাকে হত্যাপূর্বক তার সিংহাসনে বসেন। আরগুনের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে ১২৮৪ থেকে ১২৯১ পর্যন্ত খ্রিষ্টানরা তাদের আসনে নতুনভাবে জেঁকে বসে। অপরদিকে জুলুম-নির্যাতন সয়ে যাওয়া ছাড়া মুসলমানদের আর কোনো উপায় থাকে না। তাদেরকে অর্থনৈতিক ও বিচার সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।
কিন্তু ১২৯৫ সালে ইলখানাতের সপ্তম সুলতান গাজান (শাসনকাল ১২৯৫-১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলাম গ্রহণের আগ পর্যন্ত তেকুদারের পরবর্তী শাসকরা তারকা পূজাতেই পড়ে ছিল। তিনি এসে ইসলামকে পারস্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করেন। গাজানের আগে শেষ তিন মোঙ্গল শাসকের সময়ে খ্রিষ্টানরা পারস্যের শাসক পরিবারকে ইসলাম ধর্ম থেকে বিমুখ করতে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। এই পরিবারই তাদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতি দেখাতে তাদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিল। গাজানের আগের ছিলেন বাইদো খান। পারস্যে ফিতনার মূলে তিনিই ছিলেন। ১২৯৫ সালে মাত্র কয়েক মাস তিনি ক্ষমতায় অবস্থান করেন। তিনি খ্রিষ্টধর্মকে ইসলামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতেন। এমনকি মোঙ্গলদের মাঝে যেন ইসলাম প্রসারিত না হয়, সেজন্য প্রতিবন্ধক দাঁড় করাতে শুরু করেন। তিনি তার রাজ্যে ইসলাম প্রচার নিষিদ্ধ করে দেন।
গাজান বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের আগে খোরাসানের বেশকিছু বৌদ্ধ উপাসনালয় সংস্কার করেন। তিনি এ ধর্মের যাজকদের সংস্রবে খুবই আনন্দিত হতেন। মোঙ্গলরা যখন থেকে এই অঞ্চলে রাজত্ব বিস্তার করেছে, তখন থেকেই এসব যাজকেরা প্রচুর পরিমাণে এই অঞ্চলে আসতে শুরু করে। তবে বোঝা যায়, সুলতান গাজানের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রতি ঝোঁক ছিল। কেননা, তিনি তৎকালে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। (৬)
তার উজির রশিদ উদ্দিন (৭), যিনি একজন আলেম এবং সে সময়ের ইতিহাসবেত্তা, তাকে ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। যা তাকে তার পুরো রাজত্বকালে ইসলামের রীতিনীতিকে মর্যাদার সাথে রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইবনে কাসির রহ. গাজানের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ৬৯৪ হিজরির কথা উল্লেখ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতামত পরখ করলেও প্রমাণিত হয় যে, এ ক্ষেত্রে অবদান স্বীকার করতে হবে তুর্কি আমির তোজোনের। কেননা, তাতারদের রাজা তার চেষ্টা-শ্রমের বিনিময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। ৬৯৪ হিজরির ঘটনা বিবৃত করতে গিয়ে ইবনে কাসির রহ. লেখেন, তখন তাতারদের বাদশাহ কাজান বিন আরগুন বিন আবাকা বিন তুলুই বিন চেঙ্গিস খান আমির তোজোনের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাতাররা প্রায় সবাই তখন ইসলাম গ্রহণ করে। ওই দিন তারা মানুষের জন্য স্বর্ণমুদ্রা ও হীরা-জহরত ছিটিয়ে দেয়। আমির কাজানের নাম দেওয়া হয় মাহমুদ। তিনি জুমার নামাজে শরিক হন। খ্রিষ্টানদের অনেকগুলো গির্জা ধ্বংস করেন। তাদের ওপর জিজিয়া আরোপ করেন। বাগদাদ ও অন্যান্য দেশের দখলকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেন।
আর্নল্ড বলেন, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মাদ খোদাওয়ান্দ (মূল নাম উইলজাইতু) নামে তার যে ভাই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, তিনি তার মাতৃধর্মানুসারে খ্রিষ্টবাদ লালন করতেন। নিকোলাই নাম রেখে তাকে খ্রিষ্টীয় রীতিতে দীক্ষাস্নান করানো হয়। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর যুবক বয়সেই তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রভাবক ছিল তার স্ত্রী।
ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন, এই শাসকের বিপুল প্রভাব পড়েছিল মোঙ্গলদের ওপর। ওই আমল থেকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম পারস্যের ইলখানাত সাম্রাজ্যের সাধারণ ধর্মরূপে প্রতিষ্ঠা পায়।
ওই পরিবারের তৃতীয় শাখাটি শাসন করত মধ্য এশিয়ার দেশগুলো। তার প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খানের ছেলে চাগতাই। আর্নল্ড বলেন, চাগতাই শাসিত মোঙ্গল সাম্রাজ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার সম্বন্ধে যে সকল খবর ও তথ্য আমাদের জানা আছে, তা খুবই স্বল্প। তবে এই পরিবারের অনেক শাসকই তখন কোনো না কোনো মুসলিম উজিরকে তার সভাসদ হিসেবে রাখতেন। অথচ তখনও ইসলামের প্রতি তাদের সামান্য ঝোঁকও লক্ষ করা যায়নি। এদিকে চাগতাই তার মুসলিম প্রজাদের ওপর কঠিন কঠিন সব বিধিনিষেধ দিয়ে রেখেছিলেন, যা মুসলমানদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও অন্যান্য অনেক বিষয়ের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আসে। যেমন, প্রাণী জবেহ করা এবং অজুসংক্রান্ত ফরজ বিষয়সমূহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ঐতিহাসিক জুযজানির(১) বর্ণনা অনুযায়ী, এই চাগতাই মোঙ্গলদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরোধী ছিল মুসলমানদের। তার ইসলামবিদ্বেষ একসময় এমন পর্যায়ে ঠেকেছিল যে, কেউ তার সামনে ‘মুসলিম' নামটি উচ্চারণ করুক, তা-ও তিনি চাইতেন না। শুধু নীচুতা বোঝানোর জন্য এই শব্দ ব্যবহার করলেই ছাড় পাওয়া যেত। কারা হালাকুর (চাগতাইয়ের পৌত্র) স্ত্রী ওরগানা তার ছেলেকে ইসলামি অনুশাসনে প্রতিপালিত করেছিলেন। ১২৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মুবারক শাহ নামে তিনি চাগতাই শাসনের ক্ষমতার দাবিদার হয়ে সামনে আসেন। চাগতাই সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে তখন মোঙ্গল শাসকদের মাঝে চলছিল তুমুল প্রতিযোগিতা। কিন্তু খুব দ্রুতই তার চাচাতো ভাই বুরাক খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
মোঙ্গলদের মধ্যে তার ইসলাম গ্রহণের কোনো প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। কেননা, বাস্তবে যদি আমরা তার সন্তানদের দিকে দেখি, তাহলে এমন কাউকে পাব না, যে বাবার ধর্ম গ্রহণ করেছে। বর্ণিত আছে, স্বয়ং বুরাক খানও ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে এই ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম পরিবর্তন করে গিয়াস উদ্দিন নাম ধারণ করেন। তবে ইসলামের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাকে দাফন করা হয়নি; বরং প্রাচীন মোঙ্গলীয় রীতিতে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার মৃত্যুর পর ইতিপূর্বে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারা আবার তাদের তারকাপূজার ধর্মে ফিরে যায়। চাগতাই সাম্রাজ্যীয় মোঙ্গলদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় ইসলামের প্রসার হয়েছে মুবারক খানের ইসলাম গ্রহণের পরবর্তী শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে। ১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তারমাশিরিনের ইসলাম গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে। এবার মোঙ্গলরা তাদের নতুন ধর্মকে আঁকড়ে ধরা শুরু করে তাদের নেতার অনুসরণে। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও মোঙ্গলদের মনে ইসলাম পরিপূর্ণরূপে প্রোথিত হতে পারেনি। কেননা, (যদি এ ইতিহাস সত্যি হয়ে থাকে) পরবর্তী ১০ বছরে তাদের বুজুন নামক যে বাদশাহ ছিলেন, তিনি তারমাশিরিনকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তারপর মুসলমানদের ওপর করেছেন অসহনীয় নির্যাতন। এর কয়েক বছর পরেই কাশগরে প্রথম মুসলিম শাসকের আগমনের কথা শোনা যায়। চাগতাই পরিবারের দুর্বলতাই এই রাজ্যটিকে স্বাধীন হতে সাহায্য করে।
কোনো ঐতিহাসিক বলেন, কাশগরের রাজা তুঘলক তৈমুর খান (শাসনকাল: ১৩৪৭-১৩৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) বুখারার কোনো এক বুজুর্গের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বুজুর্গের নাম ছিল জামাল উদ্দিন। তার সাথে ব্যবসায়িক এক কাফেলা ছিল। তারা তখন সেসব ভূখণ্ড অতিক্রম করছিল, যেগুলো বাদশাহ নিছক শিকারের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন।
তখন রাজা আদেশ করলেন তাদের হাত-পা বেঁধে তার সামনে উপস্থিত করতে। তাদের উপস্থিত করা হলে তিনি রাগতস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করার সাহস কীভাবে করল তারা! বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, তারা ভিনদেশী। তারা জানে না যে, নিষিদ্ধ ভূখণ্ডে পা রেখেছে তারা।
রাজা যখন জানলেন যে, তারা পারস্যের অধিবাসী, তখন তিনি বললেন, পারসিকদের চেয়ে কুকুরও দামি। তখন বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বললেন, হ্যাঁ, সত্য যে আমরা কুকুরের চেয়েও অধম ছিলাম, যদি না আমরা এই সত্য ধর্ম গ্রহণ করে নিতাম। রাজা এমন উত্তর শুনে শিকার থেকে ফিরে আসার পর এই সাহসী পারসিক বৃদ্ধকে তার সামনে উপস্থিত করতে বললেন।
তারপর একান্তে তাকে তার সে ধর্মের কথা জিজ্ঞাসা করলেন এবং জানতে চাইলেন, তিনি কী কথা বলতে চেয়েছেন। বৃদ্ধ তখন আত্মমর্যাদা আর গাম্ভীর্যের সাথে এমনভাবে ইসলামের মৌলিক পরিচয়ের তুলে ধরেন যে, আমিরের মনের দুয়ার ইসলামের জন্য খুলে যেতে শুরু করে এবং তিনি ইসলামের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে মোমের মতো গলে যেতে থাকে তার মন। বৃদ্ধ তাকে কুফরের ভয়ংকর রূপটিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বাদশাহ তাতে নিজের ভুল বিশ্বাসের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে থাকেন এবং এ কথা বলেন যে, আমি যদিও এখন ইসলাম গ্রহণ করব, কিন্তু আমার প্রজাদের এখনই সরল পথে নিয়ে আসা আমার পক্ষে সহজ বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে আপনি আমাকে কিছু সময় দিন, যখন আমার পূর্বপুরুষের রাজত্ব আমার হাতে চলে আসবে, তখন পূণরায় আপনি আমার কাছে আসুন।
চাগতাইয়ের সাম্রাজ্য তখন বিচ্ছিন্নরূপে দীর্ঘদিন যাবৎ খণ্ড-খণ্ড রাজ্য হিসেবে শাসিত হয়ে আসছিল। একসময় সুলতান তুঘলক তৈমুর গোটা সাম্রাজ্য নিজের রাজত্বের অধীনে আনতে সক্ষম হন এবং রাজা হিসাবে সাম্রাজ্যকে আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ করতে সফল হন। অন্যদিকে বৃদ্ধ বুজুর্গ জামাল উদ্দিন তার দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বুজুর্গ বৃদ্ধের যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এলো, তখন তিনি তার ছেলে রশিদ উদ্দিনকে বলে গেলেন যে, খুব অল্পসময়ের মধ্যে তুঘলক তৈমুর বিশাল রাজত্বের অধিকারী হয়ে যাবেন। তার কাছে গিয়ে আমার সালাম বলো আর আমাকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ো।
অল্প কয়েক বছর পর রশিদ উদ্দিন তুঘলক খানের সেনাছাউনীতে যান। ততদিনে তুঘলক তৈমুর নিজের পিতার অসিয়ত পূরণ করে পূর্বপুরুষের রাজ্যসমূহ অধিকার করে সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু অনেক কাঠখড় পোড়ালেও রশিদ উদ্দিন বাদশাহর নিকট উপস্থিত হতে পারলেন না। তাই একদিন এক কৌশলের আশ্রয় নিলেন।
একদিন খুব সকালে বাদশাহর তাবুর কাছাকাছি এক জায়গায় জোরেশোরে আজান দিতে শুরু করলেন। আজানের আওয়াজ বাদশাহর ঘুম ভাঙায়। রাগতস্বরে বাদশাহ ফরমান করেন তাকে দরবারে উপস্থিত করতে। বাদশাহর সামনে আসার এই সুযোগে রশিদ উদ্দিন তার পিতার পয়গাম পৌঁছে দেয়। তুঘলক তৈমুর তার পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে তাকে বলেন, 'বিশ্বাস করুন, যখন থেকে আমি আমার পৈতৃক রাজত্ব লাভ করি, তখন থেকেই এই প্রতিশ্রুতির কথা মনে করছি। কিন্তু যাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছি, তিনি আজও আমার কাছে আসেননি। আর এখন যেহেতু আপনি চলে এসেছেন, তাই আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।' তারপর বাদশাহ কালিমায়ে শাহাদাতাইন পড়ে মুসলমান হয়ে যান। তৈমুরের রাজ্যে ইসলামের সূর্য উদিত হয়। দূরীভূত হয় সব অন্ধকার। এই ধর্ম যেন অন্যদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে, সে লক্ষ্যে বাদশাহ ও রশিদ উদ্দিন মিলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাদশাহ গভর্নরদের একে একে স্বাগত জানাবেন। তাদের সামনে ইসলাম পেশ করবেন। যে গ্রহণ করবে তাকে উত্তম উপহার দেবেন। আর যে প্রত্যাখ্যান করবে, তাকে তারকা ও মূর্তি পূজারিদের মতো জবাই করবেন।
চেঙ্গিস খানের বংশের চতুর্থ শাখাটি ওগেদাই খানের সাথে সম্পৃক্ত। মাংকো খান ও কুবলাই খানের মতো বিজয়ী বীর এ বংশ থেকেই বেরিয়েছেন। চেঙ্গিস বংশের এই অংশটি তাতার সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশে রাজত্ব করত। তাদের সম্পর্কে আর্নল্ড বলেন, 'চেঙ্গিস খানের বংশীয় এই শাখায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন অনেক অনুসারী পাওয়া যাবে, যারা মোঙ্গল সাম্রাজ্যের সীমান্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল জিহাদের জন্য এবং কাফেরদের ইসলামের ছায়ায় নিয়ে আসার জন্য। তাই ওগেদাইয়ের শাসনকালে অর্থাৎ ১২২৯ থেকে ১২৪১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বৌদ্ধ কুগুজের ইসলাম গ্রহণের কথা আমরা ইতিহাসে জানতে পারি। তিনি মোঙ্গলদের পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত পারস্যের শাসক ছিলেন। তৈমুর খানের শাসনকালে (১২২৩-১২২৮ খ্রিষ্টাব্দ) রাজা কুবলাইয়ের পৌত্র 'আনন্দ'-এর ইসলাম গ্রহণের কথা জানা যায়। শুধু নিজে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাই নয়; বরং তানগুতের অধিবাসীদের মধ্যে প্রচুর লোককে ইসলামধর্ম গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। তৈমুরের দরবারে ডাক পড়ার পর অনেক চেষ্টা করেও তাকে ইসলামধর্ম থেকে টলানো যায়নি। তিনি নতুন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাকায় তৈমুর তাকে কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু খুব অল্পদিনের মাথায় তানগুতবাসীর বিদ্রোহের ভয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যারা আনন্দকে প্রচুর পরিমাণ ভালোবাসত। এভাবেই এই জনগোষ্ঠী, যারা ইসলামি বিশ্বাসকে তছনছ করেছে, পায়ের তলায় পিষে ফেলেছে, যাদের সামনে কোনো শক্তি দাঁড়ানোর সাহস পেত না, মাত্র অল্পকয়েক বছরের ব্যবধানে ইসলামের ছায়াতলে এসে পড়ে। আর এই সত্য আরও একবার ভাস্বর হয়ে উঠেছে যে, ইসলামের আছে গভীরতম আবেদনশক্তি। তার রয়েছে হৃদয়কে বশে আনার এবং বন্ধু ও সহচর বানানোর স্বভাবজাত ক্ষমতা।
তাতাররা শুধু নামেই মুসলমান হয়নি; বরং তাদের মধ্যেও জন্ম নিয়েছেন অনেক ফকিহ, আলেম, মুজাহিদ, দাঈ, দরবেশ। যারা ছিলেন সততা ও একনিষ্ঠ বিশ্বাসের অধিকারী। তারা ইতিহাসের কঠিন একটি মুহূর্তে ইসলামকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখেছিলেন।
📄 আফগানিস্তান
আফগানিস্তানের বর্তমান মানচিত্র খুব পুরোনো নয়। দীর্ঘকাল থেকে আফগানিস্তানের প্রদেশগুলো পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কিছু অংশ ছিল ইলখানিয়া সাম্রাজ্যের নিকট, কিছু হিন্দুস্তানের নিকট, কিছু উজবেকদের নিকট।
তৈমুর সাম্রাজ্য আফগানের ওপর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল। বিভক্ত রাজ্যগুলোর একটি ছিল হেরাত। যা খোরাসানের অধীনতায় প্রতিষ্ঠিত থাকে। এই রাজ্য শাসন করত তৈমুরের উত্তরসূরিদের একটি অংশ। আরও দুটি রাজ্য হলো কাবুল ও গজনি। ৯৩২ হিজরির দিকে এগুলো শাসন করত হিন্দুস্তানের মোঘল বাদশাহ বাবর। আরেকটি রাজ্য হলো কান্দাহার। এখানে সাফাভিদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সাফাভিদের হাত থেকে চলে যায় উজবেকদের হাতে। এরপর মোঘলরা ১০২১ হিজরিতে (১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে) কান্দাহার দখল করে। তারপর ১০৩৮ হিজরিতে (১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে) সাফাভিদের হাতে তুলে দেয় এর শাসনক্ষমতা।