📄 সেলজুক পরিবার : যেভাবে খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে
তুর্কিস্তানে তুর্কি শাসকের অধীনে যেসব জনগোষ্ঠী বসবাস করত, তার একটি হলো তুর্কি উগুজ পরিবারজোট। সেলজুক পরিবার মূলত এই উগুজ পরিবারেরই একটি শাখা।
সেলজুক বংশের প্রধান ঊর্ধ্বতন পুরুষ হলেন সেলজুক বিন তুকাক। তিনি একশ সাত বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আপন অভিজাত্য ও সহজাত নেতৃত্বগুণের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন তুর্কি শাসকের নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেলজুকের যোগ্যতা ও দক্ষতায় তুর্কি শাসক সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং সেলজুকের অনিষ্ট সাধনের মনস্থ করেন। শাসকের পরিবর্তিত মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে সেলজুক বিন তুকাক তার পরিজন ও অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে তুর্কিস্তান ছেড়ে ইসলামি ভূখণ্ডে পাড়ি জমান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তুর্কিস্তানে হামলা চালাতে শুরু করেন। এ সময় সামানি রাজপরিবারও নিজেদের ভূখণ্ডে তুর্কিস্তানের হামলা রুখতে সেলজুকের সাহায্য গ্রহণ করে।
এভাবেই দিন অতিবাহিত হতে থাকে। একসময় সেলজুক পরিবারের হাল ধরেন সেলজুক বিন তুকাকের দুই পৌত্র তুগরুল বেগ মুহাম্মাদ ও চাঘরি বেগ দাউদ। তারা সেলজুক বংশের সদস্যদের নিয়ে বুখারার মরু অঞ্চলে চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। কিন্তু বুখারার প্রশাসক তাদের অবস্থানে শঙ্কা ও বিরূপভাব প্রকাশ করলে তারা সেখান থেকে তুর্কিস্তানের শাসক বুগরা খানের নিকট চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে বুগরা খানের সঙ্গে সেলজুক পরিবারের সংঘাত সৃষ্টি হলে তুগরুল বেগ বুগরা খানের হাতে বন্দি হন। কিন্তু চাঘরি বেগ বুগরা খানের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে ভাই তুগরুল বেগকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এরপর তারা সেখান থেকে সামানিয়া রাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানেই বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সামানি রাজপরিবার তখন নিজেদের অন্তিম সময় অতিবাহিত করছিল। সামানিয়া রাষ্ট্রে তখন আত্মপ্রকাশ করেছিল নতুন শক্তি গজনবি (সুবুক্তগিন) পরিবার। এবার গজনবি পরিবারের সঙ্গে সেলজুক পরিবারের সংঘাত শুরু হয়। সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে সুলতান মাহমুদ গজনবির হাতে তুগরুল বেগের চাচা আরসালান বিন সেলজুকের বন্দি হওয়ার মধ্য দিয়ে। অবশ্য পরে সেলজুক ও গজনবি পরিবারের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং সেলজুক পরিবারের নেতৃস্থানীয় সদস্যগণ বিভিন্ন অঞ্চল ও নগরীর শাসনক্ষমতা লাভ করেন।
৪২৯ হিজরি সনে পুনরায় গজনবি-সেলজুক সংঘাত শুরু হয়। এ সময় তুগরুল বেগ মার্ভের কর্তৃত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন। তখন থেকে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা তাদের জুমার খুতবায় 'মালিকুল মুলুক' উপাধিযোগে তুগরুল বেগের নাম উচ্চারণ করতে থাকে।
৪৩২ হিজরি সনে তুগরুল বেগ নিশাপুর, জুরজান ও তিবরিস্তান অধিকার করেন। এরপর ৪৩৩ হিজরি সনে তিনি কিরমান ও দায়লাম অঞ্চলকেও নিজের শাসন এলাকার অন্তর্ভুক্ত করেন।
৪৩৪ হিজরি সনে তুগরুল বেগ খোয়ারিজমে (১১৯) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এবার সেলজুকদের প্রতিপক্ষও বদলে যায়। সেলজুকদের নতুন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় বুওয়াইহি পরিবার। এরপর তুগরুল বেগ ইস্পাহানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কিছুদিন পর সেলজুক-বুওয়াইহি সমঝোতা সৃষ্টি হয় এবং সেলজুক পরিবারের প্রধান তুগরুল বেগ তৎকালীন বুওয়াইহি সুলতান মুহিউদ্দিন আবু কালিজারের কন্যাকে বিয়ে করেন। অপরদিকে আবু কালিজারের পুত্র আবু মানসুর বিয়ে করেন তুগরুলের ভাই চাঘরি বেগ দাউদের কন্যাকে। এটি ৪৩৯ হিজরি সনের কথা।
এরপর তুগরুল বেগ রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করেন। পরবর্তী সময়ে রোমানদের সঙ্গে সেলজুক পরিবারের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে তুগরুল বেগ শর্তারোপ করেন যে, তিনি রোমানদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে একটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। শর্ত মোতাবেক সেখানে মসজিদ নির্মিত হয় এবং জুমার খুতবায় তুগরুল বেগের নাম উচ্চারিত হতে থাকে।
এ সময় পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সেলজুক পরিবার নিজেদের অধিকৃত সুবিস্তৃত সেলজুক রাষ্ট্রকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের মাঝে নেতৃত্ব বণ্টন করে দেয় এবং তুগরুল বেগকে সকলের প্রধান ও সুলতান নির্বাচন করে। তিনি রায় নগরীকে সেলজুক রাষ্ট্রের রাজধানী নির্বাচন করেন। নিঃসন্তান তুগরুল বেগের সহকারী নির্বাচিত করা হয় তার ভ্রাতুষ্পুত্র (চাঘরি বেগ দাউদের পুত্র) আলপ আরসালানকে। তুগরুল বেগের কর্মতৎপরতা ও খলিফার সঙ্গে পত্রবিনিময়ের ভিত্তিতে খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ এবার খুতবায় বুওয়াইহি সুলতানের নামের পূর্বে সেলজুক সুলতান তুগরুল বেগের নাম পাঠ করার এবং সরকারি মুদ্রায় তার নাম অঙ্কনের নির্দেশ দেন।
৪৪৭ হিজরি সনে (১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফার অনুমতি নিয়ে তুগরুল বেগ বাগদাদে উপস্থিত হন। এ সময় খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ বুওয়াইহি সুলতান আল-মালিকুর রাহিম আবু নাসরকে তুগরুল বেগের আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে বাগদাদে বুওয়াইহি যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে, সূচনা হয় সেলজুক যুগের।
৪৫৪ হিজরি সনে খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ তুগরুল বেগের ভাই দাউদের কন্যা খাদিজাকে বিয়ে করেন। এরপর তুগরুল বেগ খলিফা-কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং খলিফার অমত সত্ত্বেও বিয়ে করেন। বাগদাদ থেকে ফেরার পথে তুগরুল বেগ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে রায় নগরীতে পৌঁছার পর ৪৫৫ হিজরি সনের রমজান মাসে (১০৬৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) তিনি ইন্তেকাল করেন।
সেলজুক পরিবার ধীরে ধীরে তৎকালীন ইসলামি প্রাচ্যের সিংহভাগ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
টিকাঃ
১১৯. আব্বাসি খিলাফতকালে খিলাফতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেসব স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, তার একটি খোয়ারিজম রাষ্ট্র। মধ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠা খোয়ারিজম রাষ্ট্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে স্বতন্ত্রভাবে আসবে।
📄 সেলজুক পরিবার ও সুলতানদের বংশলতিকা
সেলজুক
মুসা মিকাইল আরসালান
দাউদ চাঘরি বেগ রুকনুদ্দিন তুগরুল বেগ মুহাম্মাদ (৪৪৯-৪৫৫ হি.)
কুতুলমিশ ইমাদুদ্দিন কারুত(২) সুলায়মান(১)
আযদুদ্দৌলা আবু শুজা আলপ আরসালান (৪৫৫-৪৬৫ হি.)
তুতুশ(৩) জালালুদ্দৌলা আবুল ফাতাহ মালিক শাহ (৪৬৫-৪৮৫ হি.) তিকিশ (তাখারিস্তানের অধিপতি)
সানজার মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন মাহমুদ বারকিয়ারুক (৪৯৮-৫১১ হি.) (৪৮৫-৪৮৭ হি.) (৪৮৭-৪৯৮ হি.)
রুকনুদ্দৌলা ২য় মালিক শাহ(৪) (৪৯৮ হি.)
২য় তুগরুল বেগ (৫২৬-৫২৭ হি.) সুলায়মান শাহ (৫৫৪-৫৫৬ হি.) গিয়াসুদ্দিন মাসউদ মুগিছুদ্দিন মাহমুদ (৫২৭-৫৪৭ হি.) (৫১১-৫২৫ হি.)
সেলজুক শাহ দাউদ ২য় মুহাম্মাদ (৫৪৮-৫৫৪ হি.) মুঈনুদ্দিন ৩য় মালিক শাহ (৫৪৭-৫৪৮ হি.)
আরসালান শাহ (৫৫৬-৫৭৩ হি.) ৩য় তুগরুল বেগ(৫) (৫৭৩-৫৯০ হি.)
১. তার মাধ্যমে রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এ রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ছিল ৪৭০ হি. হতে ৭০৮ হি. সন পর্যন্ত। তুর্কি উসমানি পরিবার ও মঙ্গোলদের হাতে রোমান সেলজুকদের পতন ঘটে।
২. তার মাধ্যমে কিরমানি সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এর ব্যাপ্তি ছিল ৪৩২ হি. হতে ৫৮৩ হি. সন পর্যন্ত। গজনবি রাজপরিবারের হাতে এ রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
৩. তার মাধ্যমে শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এর ব্যাপ্তি ছিল ৪৮৭-৫১১ হি. পর্যন্ত। শাম ও জাহিরার আতাবিক পদবীধারীদের হাতে এ রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
৪. তার সময় সেলজুক রাষ্ট্র ইরাক ও কুর্দিস্তানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার চলে যায় খোয়ারিজ- মর শাসকদের হাতে।
৫. তিনি খোয়ারিজমের শাহ সুলতান আলাউদ্দিন তিকিশের হাতে নিহত হলে বাগদাদে সেলজুক রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
📄 শিয়া-সুন্নি সংঘাত
খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর আমলেই ৪৪৩ হিজরি সনের সফর মাসে বাগদাদে শিয়া-সুন্নি দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং উভয় পক্ষের প্রচুর মানুষ নিহত হয়। ঐতিহাসিকগণ এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, শিয়ারা এ সময় কয়েকটি বুরুজ (টাওয়ার) তৈরি করে তাতে স্বর্ণ দ্বারা নিম্নোক্ত বাক্যগুলো উৎকীর্ণ করেছিল-
মুহাম্মাদ ও আলি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। যারা তা মানল, তারা শোকর করল; আর যারা অস্বীকার করল, তারা কুফরি করল।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আলি রাযি.-কে সমান্তরালে রাখার এই গর্হিত শিয়া-কাণ্ডে বাগদাদের সুন্নি মুসলমানগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং রবিউল আউয়াল মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এ সময় বনু বুওয়াইহ-এর নেতৃবৃন্দের সমাধি পোড়ানো হয়, পোড়ানো হয় খলিফা মনসুর, খলিফা আমিন, তার মা জুবায়দাসহ অনেকের সমাধি। ফিতনা দিনে দিনে বিস্তৃত হয়ে সীমা ছাড়িয়ে যায়। শিয়া রাফিজিরাও বিভিন্ন রকম ফাসাদ সৃষ্টি করে। তারা বিভিন্ন প্রাচীন কবর খুড়ে কবরস্থ বুজুর্গদের লাশ জ্বালিয়ে দেয়। এমনকি তারা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সমাধিতেও আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। রাফিজিদের নেতৃত্বে ছিল কুতাইয়ি নামক জনৈক বদমাশ। সে তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনুসরণ করে প্রকাশ্যে বা গোপনে হত্যা করত। তার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড দুঃসাহসী, শক্তিশালী ও চতুর হওয়ায় কেউ তাকে বশে আনতে পারছিল না।
৪৪৮ হিজরি সন পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল। আর ৪৪৮ হিজরি সনেই শুরু হয় সেলজুক পরিবারের সালতানাত।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন—
এ বছরই রাফিজিদের নির্দেশ প্রদান করা হয় যে, তারা যে আজানে অতিরিক্ত 'হাইয়া আলা খাইরিল আমল' উচ্চারণ করত, তা বাদ দিতে হবে। তাদের মুয়াজ্জিনদের ফজরের আজানে 'হাইয়া আলাল ফালাহ'-এর পর দু-বার 'আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম' বলার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাফিজিদের বিভিন্ন মসজিদের দ্বারে উৎকীর্ণ 'মুহাম্মাদ ও আলি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ' বাণী মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কবিতাপাঠকগণ বসরা প্রবেশদ্বার দিয়ে রাফিজিদের কেন্দ্র কারখের প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করে সাহাবায়ে কেরামের শানে রচিত বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। ইতিপূর্বে বনু বুওয়াইহির শাসনামলে তারা এরূপ করতে পারত না। কারণ, বুওয়াইহি শাসকপরিবার শিয়াদেরকে সহায়তা করত এবং শক্তি জোগাত। ইতিমধ্যে বুওয়াইহি পরিবারের শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে এবং তাদের স্থলে সেলজুক তুর্কিদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেলজুকরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআকে ভালোবাসত, তাদের প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করত এবং তাদের মর্যাদা সমুন্নত করত। কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় সদা সর্বদা আল্লাহই প্রশংসিত। (১২০)
টিকাঃ
১২০. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/৬৬।
📄 ৪৯০ হিজরি সনে সংঘটিত ভয়াবহ এক ফিতনা
এ সময় উবায়দিরা আরসালান আবুল হারিস বাসাসিরি তুর্কি-এর সহায়তায় বাগদাদ দখল করার এবং আব্বাসি খলিফাকে নির্বাসিত করার চেষ্টা চালায়।
বাসাসিরি ছিল বুওয়াইহি সুলতান বাহাউদ্দৌলার ক্রীতদাস। পূর্বে সে বাসা নগরীর জনৈক ব্যক্তির দাস ছিল বিধায় তাকে বাসাসিরি বলা হতো। বাসাসিরি 'আল-মালিকুল মুযাফফার' উপাধি গ্রহণ করে এবং আপন চাতুর্যগুণে খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খলিফা তার পরামর্শ ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। পুরো ইরাকের মিম্বরে মিম্বরে তার নামে খুতবা পাঠ করা হতো। কিন্তু কিছুদিন পরই বাসাসিরির আসল রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়। সে খলিফা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এ সময় সেলজুক সুলতান তুগরুল বেগ ও তার ভাই ইবরাহিমের মধ্যে সংঘাত চলছিল। বাসাসিরি তখন আরব আমির কুরাইশ বিন বাদরানকে সঙ্গে নিয়ে মসুল অভিমুখে রওনা হয় এবং মসুলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সংবাদ পেয়ে তুগরুল বেগ দ্রুত মসুলে গমন করে নগরীটি পুনরুদ্ধার করেন। বাসাসিরি ও কুরাইশ পালিয়ে গেলে তুগরুল বেগ নুসায়বিন পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। এদিকে তুগরুল বেগের ভাই ইবরাহিম পালিয়ে হামাদানে চলে যায় এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তুগরুল বেগ এবার ভাই ইবরাহিমের পিছু নেন। এ সময় অল্পকিছু সৈন্য তার অনুসরণ করলেও বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
বাগদাদ তখন বলতে গেলে সৈন্যশূন্য। বাসাসিরি একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বাগদাদ অভিমুখে রওনা হয়। বাসাসিরির আগমনসংবাদ শুনে বাগদাদে আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়। পুরো বাগদাদে তখন একটাই আওয়াজ—'যারা বাগদাদ ছাড়তে চায়, তারা যেন অতি শীঘ্র বাগদাদ ছাড়ে!' জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার মতো সৈন্য বাগদাদে না থাকায় অনেকে খলিফাকেও বাগদাদ ত্যাগের পরামর্শ দিলে স্বয়ং খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহও বাগদাদ ত্যাগের মনস্থ করেন। অবশ্য পরে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রাজপ্রাসাদে অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দেন।
৪৫০ হিজরি সনের ৮ জিলকদ (১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর) বাসাসিরি উবায়দিদের সাদা ঝান্ডা হাতে বাগদাদে প্রবেশ করে। মূল পতাকায় উবায়দি খলিফার নাম খচিত ছিল। কারখের অধিবাসী শিয়ারা বাসাসিরিকে স্বাগত জানায়। বাসাসিরি সন্ত্রাসী শ্রেণির লোকদের সমবেত করে এবং তাদেরকে খলিফার প্রাসাদ লুণ্ঠনের অনুমতি প্রদান করে। শিয়ারা সুন্নিদের ঘরবাড়ি লুটপাট করতে থাকে। বাগদাদে পুনরায় শিয়া রুসম-রেওয়াজ ও বিদআতের প্রচলন শুরু হয়।
খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ এ সময় আব্বাসি রাজপরিবারের সীমিত সংখ্যক সদস্যসহ প্রাসাদে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। খলিফা আরব আমির কুরাইশ বিন বাদরানের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে সে খলিফাকে নিরাপত্তা প্রদান করে। খলিফাকে নিরাপত্তা দেওয়ায় বাসাসিরি কুরাইশের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়। অবশ্য পরে উভয়ে একমত হয় যে, তারা খলিফাকে বাগদাদ থেকে বের করে আনা (১২১) অঞ্চলের আমির মুহারিশ বিন মুজালির কাছে পাঠিয়ে দেবে। মুহারিশ ছিলেন কুরাইশ বিন বাদরানের পিতৃবংশীয় ভাই। খলিফা বারবার কুরাইশের কাছে অনুরোধ করেন যে, তাকে যেন বাগদাদ থেকে নির্বাসিত না করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই নিষ্ফল প্রমাণিত হয়। খলিফাকে হাওদায় বসিয়ে আনা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী পূর্ণ এক বছর খলিফা মুহারিশের কাছেই ছিলেন। তার সঙ্গে তার পরিবারের কেউ ছিল না। এটি ৪৫০ হিজরি সনের জিলকদ (১০৫৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি) মাসের ঘটনা।
বাসাসিরি বাগদাদে জুমার খুতবায় উবায়দি খলিফার নাম পাঠের নির্দেশ জারি করে। বাগদাদের রাফিজিরা এ সময় অত্যন্ত আনন্দিত ছিল। বাসাসিরি বাগদাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ওপর কঠিন নির্যাতন চালায়।
৪৫১ হিজরি সনের শুরুতেও পরিস্থিতি এমনই ছিল। তবে সুলতান তুগরুল বেগ এরমধ্যে তার ভাই ইবরাহিমকে পরাভূত ও হত্যা করতে সক্ষম হন। এবার তিনি বাসাসিরির দফারফা করতে পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি আরব আমির কুরাইশকে বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করেন এবং হুমকি প্রদান করেন। এরপর কুরাইশ ও তুগরুল বেগ বাসাসিরির বিরুদ্ধে একজোট হন। সুলতান তুগরুল বেগ এরপর বাগদাদ অভিমুখে রওনা হন। তুগরুল বেগের আগমন সংবাদ পেয়ে বাসাসিরি পালিয়ে যায়। তুগরুল বেগের বাগদাদে প্রবেশের দিনটি ছিল অত্যন্ত স্মরণীয় একটি দিন। তুগরুল বেগ খলিফাকে বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য কয়েকটি রাজকীয় বাহন প্রেরণ করেন। খলিফা ফেরার পথে নাহরাওয়ানে পৌঁছলে সুলতান তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য বাগদাদ থেকে বের হয়ে আসেন এবং খলিফার তাঁবুতে প্রবেশ করে খলিফার সম্মুখভূমিতে সাতবার চুম্বন করেন।
এরপর সুলতান তুগরুল বেগ ওয়াসিতে পলায়নকারী বাসাসিরির পশ্চাদ্ধাবন করেন। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বাসাসিরির অনুসারীরা পরাজিত হয়। কিছু সৈনিক বাসাসিরির পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করে। এরপর তার কর্তিত মস্তক বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে এই বিরাট ফিতনার সমাপ্তি ঘটে।
টিকাঃ
১২১. আনা: জাযিরা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাক্কা ও হিতের মধ্যবর্তী প্রসিদ্ধ একটি নগরী। নগরীটির অবস্থান ফুরাত নদীর তীরঘেঁষে হাদিসাতুল ফুরাত এলাকার নিকটে। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৪/৭২।