📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভৌগোলিক অবস্থান

📄 ভৌগোলিক অবস্থান


আরব ভূখণ্ড এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে ভূখণ্ডটি আরব উপদ্বীপ (৪) ও আরব উপমহাদেশ নামেও খ্যাত।
আয়তনের দিক থেকে জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ বিশ্বের সর্ববৃহৎ উপদ্বীপ। আরব উপদ্বীপের আয়তন ১২,৫০,০০০ বর্গমাইল (৩২,৩৭,৫০০ বর্গকিলোমিটার)। তবে সাধারণ অনুমানে আরব উপদ্বীপের প্রায় ৯৫% এলাকা বসবাসের অনুপযুক্ত মরু অঞ্চল আর বাকি ৫% এলাকা বসবাস উপযোগী।
আরব উপদ্বীপ উত্তর-পূর্বে আরব উপসাগর, পূর্বে হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর, দক্ষিণে এডেন উপসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বাব আল-মানদিব প্রণালি এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগর দ্বারা বেষ্টিত। রাজনৈতিকভাবে অঞ্চলটির উত্তর সীমানা সুনির্দিষ্ট নয়; বরং ইরাক ও শামের মরুভূমি অঞ্চলের মাঝে অস্পষ্ট। কতক ভূগোলবিশারদের মতে উত্তরে আরবের সীমা ফিলিস্তিন ও ট্রান্স জর্ডান পর্যন্ত, মতান্তরে আলেপ্পো ও ফুরাত নদী পর্যন্ত।
ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিশারদগণ আরবকে প্রসিদ্ধ পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত করেছেন।(৫)
১. তিহামা: আরব উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত সমতল ভূমি।
২. হিজায : উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে অবস্থিত সারাত পর্বতমালা অধ্যুষিত অঞ্চল। হিজায অঞ্চল নজদের টিলাবিশিষ্ট অঞ্চলকে তিহামা হতে পৃথক করে রেখেছে।
৩. নজদ : আরব উপদ্বীপের মধ্যভাগে অবস্থিত বিস্তৃত টিলাবিশিষ্ট অঞ্চল। পশ্চিমে হিজায হতে পূর্বে দাহনা মরুভূমি পর্যন্ত এবং দক্ষিণে হাযান থেকে উত্তরে নাফুদ মরুভূমি পর্যন্ত নজদের বিস্তৃতি।
৪. আরূদ : আরব উপদ্বীপের পূর্ব অংশ।
৫. ইয়ামেন: আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশ।
দিগন্ত-বিস্তৃত বালুকারাশি আরব উপদ্বীপের দৃশ্যমান ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। একমাত্র ব্যতিক্রম উপদ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল, যেখানে রয়েছে দীর্ঘ পর্বতশ্রেণি। এ ছাড়াও হাররাতুশ শাম অঞ্চলে আছে আগ্নেয়গিরি-বিশিষ্ট এলাকা, যা উপদ্বীপটির উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে জর্ডান ও দক্ষিণ শামের দিকে বিস্তৃত। সীমিত পর্বতশ্রেণি ও উচ্চভূমি ব্যতিরেকে পুরো আরব ভূখণ্ডজুড়ে আছে মরু অঞ্চল ও মরুপ্রান্তর।
আরবে এমন কোনো নদী নেই, যা সারা বছর প্রবহমান থেকে সাগরে পতিত হয়। আবহমান কাল হতে নদীপ্রবাহের বদলে সাময়িক বৃষ্টির পানি চলাচলের জন্য রয়েছে পরস্পর সংযুক্ত অসংখ্য উপত্যকা। আরবিতে 'ওয়াদি' নামে খ্যাত এসব উপত্যকা সাধারণভাবে শুষ্ক নদী বা নদীগাত্রের মতো দেখায়। প্রবল বৃষ্টি হলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে এগুলোতে বন্যার পানি প্রবাহিত হতে থাকে। বছরের অন্যান্য সময় উপত্যকাগুলো শুষ্ক থাকে। তবে এগুলোর তলদেশে পানির স্তর বিদ্যমান থাকে, যা বিভিন্ন গভীরতায় কূপ খননের মাধ্যমে পানি আহরণ করতে সাহায্য করে। হঠাৎ কোথাও পানির আর্দ্রতা ভূগর্ভ ছাপিয়ে উপচে পড়লে সেখানে দেখা মেলে একখণ্ড সবুজ মরূদ্যানের।

টিকাঃ
৩. প্রাককথন শিরোনামে উল্লেখিত পরিচ্ছেদ-দুটি এবং প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদ মূল গ্রন্থের অংশ নয়; বরং অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত। পরিচ্ছেদগুলো সংকলনে উল্লেখযোগ্য যেসব গ্রন্থের সহায়তা নেওয়া হয়েছে, তা হলো— ১. সীরাত বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ২. নবীয়ে রহমত, সাইয়েদ আবুল হাসান আলি মিয়া নদবি। ৩. সীরাতুন্নবী, সাইয়েদ সুলাইমান নদবি। ৪. হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন। ৫. উইকিপিডিয়া (মুক্ত বিশ্বকোষ)-এর বিভিন্ন নিবন্ধ।
৪. চারদিক পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডকে ‘দ্বীপ’ বলে; আর তিনদিক পানি দ্বারা বেষ্টিত ও একদিক স্থল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে বলে ‘উপদ্বীপ’। আর দুই পাশে বৃহৎ স্থলভূমিবিশিষ্ট সংকীর্ণ যে জলপ্রবাহ দুটি নদী বা সাগরকে যুক্ত করে, তাকে ‘প্রণালি’ বলা হয়।

আরব উপদ্বীপ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এর পূর্বে পারস্য উপসাগর, পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে আরব সাগর এবং উত্তরে ইরাক ও শাম দেশ অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৩২,৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার।
আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ এলাকা মরুভূমি। তবে এর কিছু উর্বর ভূমিও আছে। যেমন: ইয়ামেন, ইরাক ও শামের কিছু অংশ। আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল।
আরব উপদ্বীপের জলবায়ু উষ্ণ ও শুষ্ক। এখানে বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। তবে কিছু এলাকায় মরুদ্যান আছে, যেখানে খেজুর ও অন্যান্য ফসল উৎপন্ন হয়।
আরব উপদ্বীপের প্রধান শহরগুলো হলো মক্কা, মদিনা, তায়েফ, সানআ, হাদরামাউত, বসরা, কুফা, দামেশক ও জেরুজালেম।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 প্রাচীন কালে আরব

📄 প্রাচীন কালে আরব


প্রাচীন আরবদের কোনো কোনো সম্প্রদায় জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার মানদণ্ডে অত্যুচ্চ অবস্থানে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার প্রচণ্ড অহমিকায় অন্ধ হয়ে যখন তারা মহান আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন এবং তারা কালের গর্ভে এমনভাবে হারিয়ে যায়, যেন কোনোদিন তাদের অস্তিত্বই ছিল না।
ঐতিহাসিক বিবেচনায় আরবজাতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. আল-আরাবুল বায়িদা বা প্রাচীনতম আরব। বনু কাহতানের বহু পূর্বেই তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।
আদ, ছামুদ, তস্ম, আমালিক প্রভৃতি ইতিহাসখ্যাত গোত্র আল-আরাবুল বায়িদার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আদ ও ছামুদ জাতির উল্লেখ আছে। হজরত নুহ আ.-এর অব্যবহিত পরেই ছিল আদ ও ছামুদ জাতির রাজত্ব ও ধ্বংসকাল।
২. আল-আরাবুল আ'রিবা। বনু কাহতান নামেও পরিচিত। ইয়ামেন ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে দীর্ঘকাল বনু কাহতানের আধিপত্য ছিল।
৩. আল-আরাবুল মুসতা'রিবা। হজরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর। তাদেরকে বনু ইসমাইল ও বনু আদনানও বলা হয়। হিজায ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলজুড়ে ছিল আল-আরাবুল মুসতা'রিবার বসবাস।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বনু কাহতান এবং বনু ইসমাইলই ছিল আরবের মূল অধিবাসী। অবশ্য বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইহুদিও আরব উপদ্বীপে বসবাস করত।
আওস, খাযরাজ, খুযাআ, গাসসান, দাওস, লাখম, তাই, জুহায়না, কাল্ব, আসলাম, তাগলিব ইত্যাদি গোত্র ছিল বনু কাহতানের শাখা। অপরদিকে কুরাইশ, হুযায়ল, কিনানা, মুযায়না, তামিম, আদি, সালাবা, গাতফান, হাওয়াযিন, সুলায়ম, আবস, যুবইয়ান, ছাকিফ, বনু হিলাল প্রভৃতি ছিল বনু ইসমাইলের শাখা। আরবে বসবাসকারী ইহুদিদের প্রসিদ্ধ শাখা ছিল বনু কায়নুকা, বনু নযির, বনু কুরায়যা ইত্যাদি।
বনু কাহতান ও বনু ইসমাইল ইসলামপূর্ব বিভিন্ন যুগে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠন করেছিল। এসব রাষ্ট্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাবায়ি রাজ্য (যা পরবর্তী সময়ে হিময়ারি রাজ্য নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করে), মায়িনি, নাবিতি, লাখমি, গাসসানি ও কিন্দি রাজ্য।

প্রাচীনকালে আরব উপদ্বীপ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব শাসক ও আইন ছিল। গোত্রগুলোর মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত।
আরব উপদ্বীপের প্রধান গোত্রগুলো হলো আদ, ছামুদ, বনু ইসরাইল, বনু কাহতান ও বনু আদনান।
প্রাচীনকালে আরবরা পৌত্তলিক ছিল। তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। তাদের প্রধান দেব-দেবী ছিল লাত, মানাত ও উযযা।
প্রাচীনকালে আরবরা ব্যবসা-বাণিজ্য, পশুপালন ও কৃষিকাজ করত। তারা কবিতা ও সাহিত্যচর্চায়ও পারদর্শী ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00