📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান > 📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়

📄 কনস্টান্টিনোপল বিজয়


প্রায় আটশত বছর মুসলমানরা তাদের বুকের ভেতর যে স্বপ্ন পুষে রেখেছিল, ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ আল-ফাতিহ) সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দান করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কন্সটান্টিনোপল বিজিত হয়।¹

বিজয়ী সুলতান ও প্রস্তুতি
১৪৫১ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই সুলতান মুহাম্মদ কন্সটান্টিনোপল বিজয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বসফরাস প্রণালির তীরে রুহেলি হিসারি নামক এক শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি প্রকৌশলী উরবানকে দিয়ে এক প্রকাণ্ড কামান তৈরি করান, যা দুর্গের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম ছিল। এছাড়াও তিনি বিশাল এক নৌবাহিনী প্রস্তুত করেন।

অবরোধ ও অভিনব কৌশল
১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল অবরোধ শুরু হয়। কন্সটান্টিনোপল শহরটি ছিল তিন দিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত এবং এর প্রতিরক্ষা দেয়াল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সমুদ্রপথে গোল্ডেন হর্ন নামক স্থানে প্রবেশের পথটি চেইন দিয়ে আটকে রেখেছিল বাইজান্টাইনরা। সুলতান মুহাম্মদ এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি রাতের অন্ধকারে কাঠের পাটাতনে চর্বি মাখিয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে প্রায় ৭০-৮০টি জাহাজ চালিয়ে গোল্ডেন হর্নের ভেতরে নিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে বাইজান্টাইনরা বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

বিজয়ের ক্ষণ
২৯ মে ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশ দেন। স্থল ও জল উভয় দিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে বাইজান্টাইনদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। উসমানীয় সেনারা বীরদর্পে শহরে প্রবেশ করে। সম্রাট একাদশ কন্সটান্টিন যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হন। জোহরের সময় সুলতান মুহাম্মদ বিজয়ী বেশে শহরে প্রবেশ করেন। তিনি আয়া সুফিয়া গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তর করেন এবং শহরের নাম দেন 'ইসলামবুল' বা ইস্তাম্বুল। এই বিজয়ের ফলে মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়।

টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন: 'তোমরা অবশ্যই কন্সটান্টিনোপল বিজয় করবে। কতই না অপূর্ব হবে সেই বিজয়ী সেনাপতি, কতই না অপূর্ব হবে তার সেনাবাহিনী।'

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান > 📄 মোহাচের যুদ্ধ

📄 মোহাচের যুদ্ধ


৯৩২ হিজরিতে (১৫২৬ খ্রি.) উসমানি সম্রাট সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের (ভ্লাদিস্লাস) মধ্যে মোহাক্স নামক স্থানে এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়।

পটভূমি
হাঙ্গেরির রাজা উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে সুলতানের দূতকে হত্যা করলে সুলতান সুলাইমান ক্ষিপ্ত হন। তিনি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে বেলগ্রেড হয়ে হাঙ্গেরির দিকে অগ্রসর হন। সুলতানের বাহিনীতে প্রায় ১ লক্ষ সেনা ও ৩০০ কামান ছিল।

যুদ্ধ ও বিজয়
১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাক্স উপত্যকায় দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হাঙ্গেরীয়রা উসমানীয়দের মধ্যভাগে আক্রমণ করে। সুলতান সুলাইমান এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করেন; তিনি তার বাহিনীকে সরিয়ে দিয়ে হাঙ্গেরীয়দের ভেতরে আসার সুযোগ দেন এবং পরে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। উসমানীয় কামানের গোলার আঘাতে হাঙ্গেরীয় বাহিনী লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মাত্র দেড় ঘণ্টার যুদ্ধে হাঙ্গেরির ২ লক্ষ সৈন্যের পরাজয় ঘটে এবং রাজা লুই পলায়নের সময় পানিতে ডুবে মারা যান।

ফলাফল
এ বিজয়ের মাধ্যমে হাঙ্গেরি উসমানীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং আগামী ১৪০ বছরের জন্য সেখানে উসমানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের ইতিহাসে এই যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ফলে উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা ভিয়েনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

টিকাঃ
১. সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট। অটোমান স্বর্ণযুগের অন্যতম মহান শাসক। তার আমলে উসমানি সাম্রাজ্য সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়।
২. ফারসাখ: প্রাচীন আরবের দূরত্ব-নির্ণয়ের একটি পরিভাষা। ১ ফারসাখ সমান প্রায় তিন মাইল।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান > 📄 লেপান্টের যুদ্ধ

📄 লেপান্টের যুদ্ধ


১৫৭১ সালে ইউরোপীয় মিত্রশক্তিগুলোর সম্মিলিত নৌবাহিনীর সাথে উসমানীয়দের ঐতিহাসিক লেপান্টের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে উসমানীয় বাহিনী পরাজিত হয়।

পূর্বকথা
সুলতান দ্বিতীয় সালিমের সময় উসমানীয়রা সাইপ্রাস দখল করতে চাইলে ইউরোপের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো পোপের আহ্বানে একতাবদ্ধ হয়। স্পেন, ভেনিস ও পোপের সম্মিলিত নৌবাহিনী উসমানীয়দের বিরুদ্ধে এক বিশাল জোট গঠন করে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ডন জন।

যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতি
১৫৭১ সালের ৭ অক্টোবর গ্রিসের লেপান্ট সাগরে ভয়াবহ নৌযুদ্ধ শুরু হয়। উসমানীয় সেনাপতিদের কিছু কৌশলগত ভুলের কারণে তারা প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে যায়। তুর্কি নৌবাহিনী প্রচণ্ড সাহসের সাথে লড়লেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়। উসমানীয়দের প্রায় ১৪২টি জাহাজ ডুবে যায় এবং ২০,০০০-এর বেশি সেনা নিহত হয়।

ফলাফল
লেপান্টের যুদ্ধ ছিল উসমানীয়দের জন্য একটি বড় ধাক্কা। যদিও তারা এক বছরের মধ্যে পুনরায় তাদের নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিল, কিন্তু মানসিকভাবে ইউরোপীয়রা বুঝতে পেরেছিল যে উসমানীয়দের পরাজিত করা সম্ভব। এই যুদ্ধ ভূমধ্যসাগরে উসমানীয়দের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা কমিয়ে দেয়।

📘 ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ নববী যুগ থেকে বর্তমান > 📄 ওয়াদি-আল-মাখাযিন যুদ্ধ

📄 ওয়াদি-আল-মাখাযিন যুদ্ধ


১৫৭৮ সালের ৪ আগস্ট মরক্কোর ওয়াদি আল-মাখাযিন নামক স্থানে উসমানি খিলাফত সমর্থিত মরক্কোর বাহিনী এবং পর্তুগিজ বাহিনীর মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি 'তিন রাজার যুদ্ধ' নামেও পরিচিত।

পটভূমি
মরক্কোর সিংহাসন নিয়ে বিরোধের জেরে ক্ষমতাচ্যুত সুলতান আল-মুতাওয়াক্কিল পর্তুগালের রাজা সেবাস্তিয়ানের সাহায্য চান। সেবাস্তিয়ান বিশাল এক ক্রুসেড বাহিনী নিয়ে মরক্কো আক্রমণ করেন। বিপরীতে উসমানি সাম্রাজ্যের সমর্থনে সুলতান আবদুল মালিক মরক্কো রক্ষার প্রস্তুতি নেন।

যুদ্ধ ও বিজয়
মরক্কোর মুসলিম বাহিনী পর্তুগিজদের কৌশলে একটি নদীর তীরে নিয়ে আসে। যুদ্ধের সময় সুলতান আবদুল মালিক অসুস্থ অবস্থায় মারা গেলেও তার সেনারা তা জানতে পারেনি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যায়। পর্তুগিজ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। রাজা সেবাস্তিয়ান এবং ক্ষমতাচ্যুত মুতাওয়াক্কিল উভয়েই যুদ্ধে নিহত হন। একই যুদ্ধে তিন রাজার মৃত্যুর কারণে একে 'তিন রাজার যুদ্ধ' বলা হয়।

ফলাফল
এ বিজয়ের ফলে মরক্কো পর্তুগিজদের দখলদারিত্ব থেকে রক্ষা পায় এবং উসমানি সাম্রাজ্যের সাথে উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। পর্তুগাল তাদের সামরিক শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং পরবর্তীতে স্পেনের অধীনে চলে যায়।

টিকাঃ
১. সাদিয়া সাম্রাজ্য: মরক্কো ও তার আশপাশের এলাকায় ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত এই সাম্রাজ্যের শাসন বজায় ছিল। তারা নিজেদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর হিসেবে পরিচয় দিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00