📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের ওপর পাশ্চাত্যের প্রভাব
মধ্যযুগীয় খিলাফতের অবসানের পর আইনের ক্ষেত্রে যে সব পরিবর্তন সাধিত হয়, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে সাধারণ মুসলিম আইনবিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের অনুসন্ধান সম্পূর্ণ করা মেটেই অবান্তর হবে না। এসব পরিবর্তনের সময়েই ইসলামী রাষ্ট্র খৃস্টান রাষ্ট্রের সম্পর্কে আসে। এ প্রভাবের ফলে আইনের ক্ষেত্রে অনিবার্য পরিবর্তন এসেছে। এ সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করতে গেলে একখানি পৃথক পুস্ত কের প্রয়োজন। যে সব মৌলিক পরিবর্তন ও কারণ মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনকে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা থেকে আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেছে, কেবল সেগুলো সম্পর্কেই এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করে হবে।

দারুল ইসলামের প্রকৃতিগত বিবর্তন
কার্যতঃ স্বাধীন আঞ্চলিক শাসকগণ এবং কখনো কখনো স্পেন ও মিসরের প্রতিদ্বন্দ্বী খলিফারা বাগদাদের খলিফার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ ও অস্বীকার করে। তবু আইনের দৃষ্টিতে দারুল ইসলামের ঐক্য অক্ষুণ্ণই ছিল। কারণ, স্বাধীন প্রাদেশিক শাসকগণ আব্বাসীয় খলিফাদের সর্বময় কর্তৃত্ব মেনে নিতেন। কিন্তু স্পেন ও মিসরের খলিফারা নিজ নিজ রাষ্ট্রে কেবল সীমাবদ্ধ আনুগত্যই দাবী করতে পারতেন। ইসলামী জগতের কার্যতঃ স্বাধীন শাসকদের মধ্যযুগীয় খৃস্টান জগতের স্বাধীন রাজাদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এসব স্বাধীন রাজাগণ তাঁদের ক্ষমতা লাভ করতেন সম্রাট বা পোপের নিকট হতে। বাইজান্টিয়ামের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকে ফাতেমীয় মিসর বা উমাইয়া শাসিত স্পেনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ, যদিও বাইজান্টিয়াম পশ্চিমী সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্ব অস্বীকার করে, তবু খৃস্টান জগতের আইনগত ঐক্য তার দ্বারা ব্যাহত হয়নি।
খৃস্টীয় ১২৫৮ সনে বাগদাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দারুল ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন থেকেই ইসলামের আইনগত ঐক্যের প্রতীক আর বিদ্যমান রইল না; (অবশ্য ক্রীড়নক আব্বাসীয় খলিফা কায়রোতে অবস্থান করতেন। তাঁর মামলুক প্রভুরা ভিন্ন তাঁকে আর কেউ বড় একটা মানত না)। আর সেই সঙ্গে শরিয়ত রূপায়িত করার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বও বিলুপ্ত হল। মোঙ্গল অভিযানকারীরা ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে, তাঁরা বিদেশী শাসক হিসেবে মুসলিম রাষ্ট্রকে নিজেদের রাষ্ট্রনীতি ও আইন ব্যবস্থার আলোকেই পরিচালিত করেছেন। এমন কি, গজনীর বাদশাহ সুলতান মাহমুদ (খৃষ্টীয় ১২৯৫-১৩০৪) ইসলাম ধর্ম কবুল করার পরও ইসলামী আইন ছাড়া মোঙ্গল আইনের বিধান অনুসারেও ফরমান জারী করতেন। পরবর্তী যুগে সালজুক ও উসমানীয় সুলতানগণ তাঁর এ রীতিরই অনুসরণ করেন। দারুল ইসলামের যে অংশ তাঁদের অধীনে ছিল, সেখানে শরিয়তের সঙ্গে সঙ্গে নতুন আইন ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।
আব্বাসীয়-খিলাফতের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বহু ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এবং লোকায়ত শাসকের উদ্ভব হয়। এরা দু'শতাব্দী ধরে ক্ষমতার লোভে নিজেদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা করে শেষে বিলুপ্ত হয়। এর ফলে, দারুল ইসলাম কয়েকটি বৃহৎ রাজনৈতিক বিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, উসমানীয় সুলতানগণ ইউরোপে তাঁদের প্রভুত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পর প্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলমান শাসকদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের দিকে মনোনিবেশ করেন। ইরানে শাহ ইসমাইল সাফাবী (১৫০০-১৫২৫) কর্তৃক নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্বদিকে উসমানীয়দের ক্ষমতা বিস্তার ব্যাহত হয়। শাহ ইসমাইল শিয়া মযহাবকে রাষ্ট্রীয় ধর্মরূপে ঘোষণা করেন। ইরানে শিয়া আইন বিধান রূপায়ণের ফলে ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও জোরদার হতে থাকে। আগে থেকেই এ বিরোধ পাকাপাকি হয়ে এসেছিল। এর ফলে দারুল ইসলাম তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত হয়ে যায়ঃ (১) উসমানীয় রাষ্ট্র (যার মধ্যে ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র ও পশ্চিম এশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল); (২) সাফাবী কর্তৃত্বাধীনে ইরান; এবং (৩) মোগলদের অধীনে মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশ। দারুল ইসলাম বিভক্ত হবার ফলে মুসলিম-রাষ্ট্রের ধারণাও বিবর্তিত হতে থাকে। এর ফলে সার্বজনীন মুসলিম রাষ্ট্র জাতীয় মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হল। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পশ্চিমী ধারণা এ প্রবণতাকে আরও অনেকখানি বাড়িয়ে দিল।
দারুল ইসলাম বিভিন্ন রাজনৈতিক ভূখণ্ডে বিভক্ত হবার ফল হল মারাত্মক। এতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো সংকীর্ণ গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পাশ্চাত্য প্রভাব মুসলিম দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করতে থাকে। অবশ্য এ কথা সত্য যে, উসমানীয়দের রাজ্য বিস্তারের ফলে 'ইসলামী' রাষ্ট্রের সীমানা খৃস্টান দেশগুলোতে গিয়ে ঠেকেছিল; এ অবস্থায় দখলীকৃত কতকগুলো জায়গা থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে সরে আসতে হয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবার খৃস্টানদের হাতে স্পেনের পূর্ণ কর্তৃত্ব চলে যায়। অন্যদিকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ভারতে গমনের নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর ভারত মহাসাগরে পর্তুগীজদের গতিবিধি লোহিত সাগরের মাধ্যমে পরিচালিত মুসলিম বাণিজ্যে চরম আঘাত হানে। অতঃপর পূর্ব আফ্রিকা ও পারস্য উপসাগরে পর্তুগীজগণ কতকগুলো বাণিজ্য কেন্দ্র দখল করে। এতে কয়েকটি মুসলিম ভূখণ্ড তাদের অধীনে এসে পড়ে। ফ্রান্স ও বৃটেন পর্তুগীজদের পদাংক অনুসরণ করে এবং খৃষ্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত মহাসাগরে তাদের তৎপরতার ফলে আরও কতিপয় মুসলিম দেশ তাদের অধীনে চলে আসে। ফরাসী কর্তৃত্ব উৎখাত করার পর বৃটেনই ইরানের পূর্বদিকের সমস্ত মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর শাসন ক্ষমতা লাভ করে (মধ্য এশিয়া পরে রাশিয়ার অধীনে চলে যায়)। প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ শাসনের মাধ্যমে বৃটেন পারস্য উপসাগর, আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ উপকূল ও পূর্ব আফ্রিকায় তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা ও শেষে পতনের ফলে আরও কতকগুলো মুসলিম রাষ্ট্র বৃটেনের করতলে আসে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স ভারত মহাসাগর থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হয়; তবে উনবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকায় কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

উসমানীয় শাসন : ইসলাম কর্তৃক খৃস্টান জগতের আইনগত স্বীকৃতি
উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তনে এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়। উসমানীয় সুলতানগণ উদারপন্থী হানাফী মযহাবকেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দান করেন। তাছাড়া, তাঁরা তুর্কী আচার-ব্যবহার ও রীতি-নীতির ওপর ভিত্তি করে ফরমান জারী করার প্রাচীন তুর্কী প্রথাও চালু রেখেছিলেন। এ ফরমানগুলোর আইনগত মর্যাদা নিতান্ত সামান্য ছিল না। ফরমানগুলো প্রায়ই আইন পুস্তকে সংযোজিত হত। এগুলোকে বলা হত 'কানুন-নামা'। শরিয়তের পাশাপাশি এই কানুনগুলো আইনের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করত। আইনের ব্যাপারে কানুন শরিয়তকে ছাড়িয়ে যেতে পারত না। কিন্তু কার্যতঃ, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার তাগিদে শরিয়ত কানুন দ্বারাই অনেকখানি পরিবর্তিত হয়। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ফলে সুলতানগণের পক্ষে বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে নতুন রীতি-নীতি প্রবর্তন করা সম্ভব হয়।
পশ্চিমী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উসমানীয় সুলতানগণ খৃস্টান জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদার নীতি অবলম্বন করেন। কারণ, উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারতে যাবার নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ায় ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যে ভাঁটা পড়তে থাকে। মিসরের মামলুকগণ ও বিজয়ী বীর মুহাম্মদ পূর্বেই পশ্চিমী সওদাগরদের প্রতি ঔদার্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করেন। তাই ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত চুক্তি পশ্চিমী ব্যবসায় এবং উসমানীয় (মুসলিম) রাষ্ট্রে বিদেশীদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কিত সাধারণ নীতি প্রচলিত ব্যবস্থাকেই জোরদার করে।
ইসলামের সঙ্গে খৃস্টান জগতের সম্পর্ক নির্ণয়ে এ চুক্তি কতকগুলো নতুন বিষয়ের অবতারণা করে। চুক্তির প্রস্তাবনায় ফ্রান্সের রাজা ও তার প্রতিনিধিদের সুলতান সুলেমান ও তার প্রতিনিধিদের সমপর্যায়ভুক্ত বলে স্বীকৃতি দান করা হয়। চুক্তিটির প্রথম ধারায় সুলতান ও ফরাসী রাজার মধ্যে তাঁদের জীবদ্দশায় আইনগত ও অব্যর্থ শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রে নাগরিকদের (অর্থাৎ ফরাসী ও উসমানীয়) পারস্পরিক অধিকারের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফরাসীরা জিযিয়া থেকে রেহাই পেলো এবং তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করার অধিকারসহ নিজেদের কনস্যুলেট দ্বারা আইনের অধীনে বিচারের অধিকার লাভ করল। ফ্রান্সের রাজাকেও এই সব অধিকার দেয়া হল:
"ফরাসী দেশের রাজা কন্সট্যান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বা পেরা বা সাম্রাজ্যের অন্য যে কোন স্থানে আলেকজান্দ্রিয়াস্থ তাঁর বাণিজ্য প্রতিনিধির অনুরূপ একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করতে পারবেন। উপরোক্ত প্রতিনিধিকে সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা করতে হবে ও যথোপযুক্ত কর্তৃত্ব দান করতে হবে যাতে তিনি তার অঞ্চলে কর্তব্য সম্পাদনে অন্যান্য বিচারক বা কাজী দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হন; এবং তিনি তাঁর নিজের ধর্ম ও আইনের আলোকে ফরাসী সওদাগর ও ফরাসী রাজার প্রজাদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধের ব্যাপারে সব দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা ও মোকদ্দমার বিচার করতে পারবেন। সওদাগরগণের অনুরোধ সত্ত্বেও সুলতানের কাজী বা অন্যান্য কর্মচারীগণ ফরাসী বণিক ও ফরাসী রাজার প্রজাদের মধ্যে মামলার মীমাংসা করতে পারবেন না। আর যদি কাজীগণের আদালতে কোন মামলার শুনানী হয়, তবে তাদের রায় বেআইনী বলে গণ্য হবে।" (দ্বিতীয় ধারা)।
স্মরণ রাখা উচিত যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন শত্রুর সঙ্গে দশ বছরের বেশী মেয়াদে শান্তি স্থাপন করা অনুমোদন করে না। উসমানীয় কার্যবিধি এ নিয়মের পরিবর্তন সাধন করে এবং সুলতানের জীবদ্দশা অবধি এর মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া, ১৫৩৫ সনের চুক্তি উভয়পক্ষের সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তি স্বীকার করেছে। অনেক লেখকের মতে এটা হল ফরাসী রাজার প্রতি প্রদত্ত বিশেষ সুযোগ-সুবিধার নজির। পরে অবশ্য অন্যান্য খৃস্টান রাজাদেরও অনুরূপ মর্যাদা দেয়া হয়। চুক্তির ১৫ ধারায় অবশ্য লেখা আছে যে, এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য রাজাদেরও দেয়া হবে। এ ধারাটি এইরূপ:
"ফ্রান্সের রাজা প্রস্তাব করেছেন যে, মহামান্য পোপ, ইংল্যান্ডের রাজা ও তাঁর ভাই, স্থায়ী মিত্র এবং স্কটল্যান্ডের রাজা স্বেচ্ছায় এ শান্তিচুক্তিতে মিত্র হিসেবে শরিক হতে পারেন। চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তাঁদের অবশ্যই আট মাসের মধ্যে মহান সুলতানের কাছে চুক্তি সম্পর্কে তাঁদের অনুমোদনপত্র পাঠাতে হবে এবং তাঁর স্বীকৃতি লাভ করতে হবে।"
উপরোক্ত রাজাগণ এ চুক্তিতে শরিক না হলেও (ইংল্যান্ড সুলতানের সঙ্গে ১৫৮০ সনে এক পৃথক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়) সুলতান এই নীতি প্রতিষ্ঠা করলেন যা অন্যান্য খৃস্টান রাজাদের প্রতিও প্রযোজ্য হবে।
১৫৩৫ সনের চুক্তি ইসলামী আইনের আর একটি নীতিকে বদলে দেয়; তা হল, অমুসলমানদের (এক বছরের বেশী দারুল ইসলামে বাস করলে) জিযিয়া থেকে রেহাই দেয়া। ১৮৩৯ সন পর্যন্ত সুলতানের অমুসলিম প্রজাগণ এ শুল্ক প্রদান করে আসে। ওই শুল্ক তুলে দেয়া হয়। বিচারের ক্ষেত্রে ফরাসীদের নিজেদের কনস্যুলেটের অধীনে আসবার অধিকারের ব্যাপারে চুক্তির মধ্যে আইনের ব্যক্তি সম্পর্কিত দিকটায় সাধারণ নীতিই পরিস্ফুট হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে কতকগুলো চুক্তির দ্বারা এ নীতি পাল্টে যায় (বিশেষ করে ১৭৪০ সনের চুক্তি)। এ নতুন পরিবর্তন অনুসারে বিদেশীদের সঙ্গে মুসলমানগণ যে সব মামলা-মোকদ্দমায় সংশ্লিষ্ট, তা বিদেশী কনস্যুলেটের আওতায় এসে পড়ে। ফলে এসব ব্যাপারে ইসলামী আইন প্রযোজ্য হওয়ার সাধারণ নীতি অনেকখানি বদলে গেল।
১৫৩৫ সনের চুক্তিটি এমন সময়ে সুসম্পন্ন করা হয়, যখন সবেমাত্র আধুনিক আন্ত র্জাতিক আইনের বিকাশ শুরু হয়েছে। এ চুক্তিটি বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে খৃস্টান ও মুসলিম আইনের সমন্বয়ের ব্যাপারে এক অভূতপূর্ব সুযোগ দান করে। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর পর ঐতিহাসিক বিবর্তনে খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারার সৃষ্টি হয়। ফলে এ দুই জগতের মধ্যকার আইন ব্যবস্থাও আলাদা হয়ে যায়। নীচে এ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতি খৃস্টান জগতের মনোভাব
খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতে বিরোধমূলক স্বার্থের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বনের উপযুক্ত মুহূর্ত ছিল ১৫৩৫ সনের চুক্তি সম্পাদনের সময়। চুক্তিটির বাণিজ্য সম্পর্কীয় ধারাগুলো পশ্চিমী ব্যবসায়ীদের কাছে খুব বেশী আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু যেসব রাজনৈতিক কারণে চুক্তিটির জন্ম হয়, তার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কোন সম্বন্ধ ছিল না। ফরাসী-রাজ ফ্রান্সিসের তাঁর খৃস্টান প্রতিদ্বন্দ্বী পঞ্চম চার্লসের বিরুদ্ধে সমর্থন লাভের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। আর অন্যদিকে ভিয়েনা আক্রমণে অকৃতকার্য (১৫২৯) হওয়ার পর খৃস্টান রাজাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে সুলেমান তাঁর বিরুদ্ধে জোট ভেঙ্গে দেবার চেষ্ট করেন। অন্যান্য খৃস্টান রাষ্ট্রের জন্যেও এ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার দ্বার খোলা রাখা হলেও ইসলামী জগত ও খৃস্টান জগতের মধ্যে মোটেই সমঝোতা সম্ভব হয়নি। কোন খৃস্টান রাজাকে সুযোগ-সুবিধা দানের আইনগত ভিত্তি সাম্যনীতি ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করত না। আইনের ব্যক্তি সম্পর্কিত ভিত্তির ওপরেই ছিল এর প্রতিষ্ঠা। এর ফলে মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করার সময় অমুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকগণও কতকগুলো সুবিধা লাভ করতেন।
যে সব ধর্মীয় বিষয় খৃস্টানদের জীবনের মূল নিয়ামক ছিল, সেগুলোতে কোন অখৃস্টান শক্তির যোগদানকে সংস্কার আন্দোলনের (Reformation) যুগে ইউরোপের লোকেরা বরদাশত করতে চায়নি। উসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল একটা “মুসলিম” রাষ্ট্র। তাই খৃস্টান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তা বিদেশী উপকরণ বলে গণ্য হত। কোন কোন খৃস্টান রাজা ১৫৩৫ সনের চুক্তিকে খৃস্টান ধর্মের আইনের খেলাফ বলে মনে করতেন, যদিও সম্রাটের অধীনে ও খৃস্টান আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মধ্যযুগীয় সার্বজনীন খৃস্টান রাষ্ট্রের চিন্তা ধারা তখন প্রায় লোপ পেয়ে গেছে।
যে সব ইউরোপীয় আইনবেত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনবিদ ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও জাতিসমূহের সাম্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করার জন্যে সুপারিশ করেছেন, উসমানীয় সুলতানদের প্রতি তাঁদের মনোভাবে বিশেষ কোন পরিবর্তন আসেনি। খৃস্টান জগতের সাধারণ প্রচলিত মতানুসারে একথা ধরে নেয়া হয় যে, উসমানীয় সাম্রাজ্য নব বিবর্তিত আন্তর্জাতিক আইনের এলাকার বাইরে।
আলবেরিকাস জেন্টিলিস (১৫৫২-১৬০৮) তথাকথিত ধর্মীয় যুদ্ধ পছন্দ করতেন না; এবং তিনি রেড ইন্ডিয়ানদের ওপর স্পেনের আক্রমণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি কিন্তু তুর্কীদের সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তুর্কীদের সঙ্গে মিত্রতামূলক চুক্তি সম্পাদনের জন্য তিনি প্রথম ফ্রান্সিসের সমালোচনা করেন। কারণ, তাঁর মতে খৃস্টান ও অখৃস্টান বাদশাহদের মধ্যে সমঝোতা বরদাশত করা যায় না। এমন কি, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের বিশিষ্ট দিকপাল গ্রোসিয়াস পর্যন্ত অখৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে পার্থক্যমূলক ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন; অথচ তিনি প্রাকৃতিক নিয়মকে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। প্রাকৃতিক নিয়মের ভিত্তিতে খৃষ্ট ধর্মের বিরোধী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন তিনি মেনে নিতেন। তবু তাঁর মতে খৃস্টান শাসকগণ খৃষ্টধর্মের দুশমনদের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে কাজ করবেন। তাই গোড়ার দিকে কেবল খৃস্টান জাতিগুলোর সম্পর্ক নির্ণয়ের তাগিদেই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আদর্শ ও বুনিয়াদ গড়ে ওঠে, যা খৃস্টান সভ্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ইউরোপে তুর্কী সমস্যা
ভাবপ্রবণ ইউরোপীয় লেখকদেরও উদ্বেগের কারণ ঘটে এবং এ নিয়ে তাঁরা অনেক পানি ঘোলা করেন। এঁরা খৃস্টান জগতে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। খৃস্টান রাজাদের বিরোধ দূর করে শান্তি স্থাপনের জন্য খৃষ্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে কতকগুলো পরিকল্পনা পেশ করা হয়। মধ্যযুগের ডুবীয় (Dubois) পরিকল্পনার মত প্রায় সবগুলোতেই খৃস্টান রাজাদের কাছে এই আবেদন জানানো হয়েছে যে, তাঁরা যেন নিজেদের মধ্যকার সব বিরোধ ভুলে গিয়ে তুর্কীদের বিরুদ্ধে সমবেত হন। ডব্লিউ, পেন (W. Penn) বলেন, ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর শান্তি পূর্ণ পারস্পরিক সমঝোতার প্রাথমিক ভিত্তি হল তুর্কীদের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা। লিবনিয (Lebnitz) চতুর্দশ লুইকে হল্যান্ড আক্রমণ না করে মিসর দখলের পরামর্শ দেন।
অবশ্য, এমেরিক ক্রুস (Emeric Cruce) ও অ্যাবে ডি সেন্ট পিয়ার (Abbe De Saint Pierre) তাঁদের সম্মিলিত রাষ্ট্রসংস্থার পরিকল্পনায় তুর্কীদের বাদ দেননি।
সেন্ট পিয়ার বলেন যে, এ ধরনের সম্মিলন হলেই যে সব ধর্মেও মিলন হবে, এমন নয়। তবে এতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হবে। তুর্কীদের বাদ দিয়ে খৃস্টান জগতের মধ্যে শান্তি স্থাপনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হল কার্ডিন্যাল আলবেরনীর (Alberoni) পরিকল্পনা। আলবেরনী স্পেনের উজীরে আযম ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি ১৭৫৩ সনে লুজানে একখানা বই প্রকাশ করেন। এর নাম হল: Testament Politique du Cardinal Jule Alberoni. এতে তিনি ইউরোপের সব খৃস্টান-রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে এক সাধারণ পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব করেন যাতে খৃস্টান জগতের সমস্ত সাধারণ সমস্যা নিয়ে এখানে আলোচনা করা যায়। কিন্তু কার্ডিন্যাল আলবেরনী মনে করতেন যে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার পূর্বে খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত হয়ে ইউরোপ থেকে তুর্কীদের বিতাড়িত করতে হবে। তিনি জার্মান ও ইংরেজী ভাষাতেও একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এর নাম হল: Cardinal Alberoni's Scheme for Reducing the Turkish Empire to the Obedience of Christian Princes (London, 1736). "শান্তি" সম্পর্কীয় তাঁর সাধারণ পরিকল্পনায় তিনি বলেন:
"মনে হয়, খৃস্টান ইউরোপের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্যেই উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁদের ভূখণ্ড রক্ষার্থে জার্মানীর সম্রাটদের খুব বেশী মনোযোগী হওয়া উচিত এবং সেদিকে রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করা উচিত। সব খৃস্টান রাজাকে একত্রিত করে তুর্কী সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব হবে। জার্মানীর অস্ট্রীয় রাজবংশের অধীনে যে সব ভূখণ্ড আছে, তার কিছু কিছু এ সব রাজাদের দিতে হবে। প্রাচ্য দেশে অগ্রসর হওয়ার জন্যেই তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হবে।...
"মনে হয়, এ পরিকল্পনা রূপায়িত হলে অস্ট্রীয় রাজবংশ ও বুরবন রাজবংশের মধ্যকার সমস্ত কলহ ও বিবাদ দূর হয়ে যাবে। ফলে তারা খৃস্টান জগত থেকে বিধর্মীদের বিতাড়িত করতে পারবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সব বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, জাতিসমূহের মধ্যে শিল্প প্রসারের তাগিদে সাম্যের ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পত্তন করতে পারবে; এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা যদি নিজস্ব রাষ্ট্রের ওপর অধিকার পায়, তবে অনিশ্চয়তা ও হিংসাপূর্ণ অবস্থার ফলে উদ্ভূত যুদ্ধ ও যুদ্ধ-ভীতি থেকে তাদের প্রজাদের বাঁচাতে পারবে। তারা নিজেদের শক্তি সংগঠন এবং বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সমর-কৌশল প্রদর্শনের উপযুক্ত ক্ষেত্র লাভ করবে; আর খৃস্টানদের রক্তক্ষয় থেকে রেহাই পেয়ে বিবেকের দংশন থেকেও তারা মুক্তি পাবে। প্রকৃতপক্ষে, অস্থিরচিত্ততাই পরবর্তী যুগে কয়েক শতাব্দী ধরে খৃস্টানদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য দায়ী।"
এ থেকে এ সিদ্ধান্তেই আসতে হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের উন্নয়নের খাতিরে সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ইসলামী জগত বা খৃস্টান জগত কোনটিই এককভাবে বিষয়টির মোকাবেলা করতে চায়নি এবং একটি সাধারণ সমবায়ে মিলিত হয়ে তাদের ধর্মীয় নীতিতে একে খাপ খাইয়ে নিতে চায়নি। অবিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাবের ফলে ইসলামী জগত ও খৃস্টান জগতের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব হয়নি। বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা ম্যাকিয়াভেলীয় ও জোর-জবরদস্তিমূলক নীতি অনুসরণ করতেন। উসমানীয় সুলতানদের দরবারে প্রেরিত ইউরোপীয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ উৎকোচ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করতেন। আবার উসমানীয় উজীরগণ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের ভীতি প্রদর্শন করে ও অসদ্ব্যবহার করে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে রাষ্ট্রীয় তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালাতেন। এ পরিস্থিতির ফলে খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুলেমান ও প্রথম ফ্রান্সিসের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের চেয়ে বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি।

উসমানীয় সাম্রাজ্য ও আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের উন্নয়নের ধারাটি আরও জোরদার হতে থাকে। এ সময়ে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন (Reformation) সার্বজনীন রাষ্ট্রের ধারণাকে বরবাদ করে দেয়। তখন যে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম হয়, তা শক্তি সাম্যের (Balance of power) ভিত্তিতে ও আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত হত। উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপীয় জাতিপুঞ্জের বাইরেই ছিল। এর কারণ আগেই বলা হয়েছে। পরবর্তী দু'শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এ ব্যবস্থা দ্বারাই নির্ণীত হয়েছে। ইউরোপীয় আইন ব্যবস্থার মধ্যে যদি উসমানীয় সাম্রাজ্যকে একীভূত করে নেয়া সম্ভব হত, তবে গোড়া থেকেই আন্ত জাতিক আইন সার্বজনীন পর্যায়ে উঠতে পারত।
ইউরোপের ক্রমবর্দ্ধমান শক্তি আর আইন ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষীকরণের সঙ্গে সঙ্গে উসমানীয় শক্তির পতন ঘনিয়ে আসে। সুলতানগণ তুরস্কে পাশ্চাত্যের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক কলাকৌশল অতিসত্বর চালু করেন; কিন্তু সেইভাবে পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রনীতি এবং আইনের নতুন নতুন প্রত্যয় ও ধারণা তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁরা এগুলো গ্রহণ করতে পারলে "ইসলামী” জগত তখনই আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হ'তে পারত। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে 'ইসলামী' জগতের সংঘর্ষে ইসলামের সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। ইউরোপীয় শক্তিপুঞ্জের কাছে এ পরাজয় অনেকটা আশ্চর্যজনক বোধ হয়েছিল। কারণ, তাঁরা সহজেই সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় লাভ করেন। ১৫৩৫ সালের চুক্তিটি ১৭৪০ সালে যেভাবে রদবদল করা হয়, তা থেকেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুক্তির পরিবর্তন উসমানীয়দের পক্ষে মোটেই সুবিধাজনক ছিল না। ১৭৭৪ সালে কুচুক কায়নরাজার সন্ধির ফলে সুলতানের খৃস্টান প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষমতা ফ্রান্স ও রাশিয়াকে দেয়া হয়। এর কারণ হল এই যে, মুসলিম সমাজের অবনতি এত দূর গিয়ে পৌঁছে যে তারা ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমানে তাল দিয়ে চলতে পারেনি। ইউরোপীয়গণ মুসলিম জগতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে খুব বিস্ময় বোধ করে। তাদের মতে, ইসলামী সভ্যতা এত "নীচু- দরের" হওয়া সত্ত্বেও কেন মুসলমানরা ইউরোপীয়দের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উৎকর্ষতা ও মুসলমানদের নিজেদের অবনতির কথা বুঝতে পারে না। এমতাবস্থায় ইউরোপীয় জাতিগুলো সরাসরি সুযোগ-সুবিধা লাভ করার জন্যই বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ে; তারা ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কে সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক নির্ণয় করার দিকে কোন খেয়ালই করল না। আন্তর্জাতিক আইন-বিধি ও কার্যধারা দূরে ফেলে দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ কূটনীতির আশ্রয় নিতে লাগল। আবার কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা শক্তি প্রয়োগে মেতে ওঠে। ফলে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ যেমন মুসলিম দেশগুলোকে আন্ত র্জাতিক আইনের আওতার বাইরে বলে মনে করতেন, তেমনি ইউরোপীয়দের কবলে মুসলমানদের কোন ভূখণ্ড হস্তান্তরিত হয়ে থাকলে সেখানকার খৃস্টান শাসন মুসলমানরা স্বীকার করে নেননি। পক্ষান্তরে, ইউরোপীয়গণ আরো মনে করতেন যে, অনগ্রসর এলাকা হিসেবে এ সব মুসলিম অঞ্চলে যুদ্ধ আইনের নীতিগুলো প্রযোজ্য নয়। খৃস্টান ধর্মে দীক্ষা দেবার মত মুসলিম ভূখণ্ড দখল করাও ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রশংসাজনক কাজ বলে মনে করা হত।
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ নিয়ে যখন ইউরোপীয় শক্তিবৃন্দের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় এবং এর ফলে ইউরোপে শান্তিভঙ্গের আশংকা ঘটে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তুর্কী সাম্রাজ্যের ঐক্য রক্ষার্থ উসমানীয় সুলতানকে ইউরোপীয় জাতিপুঞ্জের মধ্যে সাদরে আহ্বান জানানো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ভিয়েনা কংগ্রেসে (১৮১৪-১৫) যখন এ আমন্ত্রণের কথা ওঠে, তখন রাশিয়া তাতে আপত্তি জানায়; কারণ, তুরস্ক নাকি "বর্বর" দেশ।
অনেকদিন ধরে তুরস্ক ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এসেছে। তবু তুরস্ককে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা সম্পর্কে আইনবিদগণ একমত হতে পারেননি। ইউরোপীয় রীতিনীতির মানের তুলনায় তুর্কী তার কর্তব্য সমাধা করতে পারবে কি না সে সম্পর্কে অনেক আইনবেত্তাই সন্দেহ প্রকাশ করেন। Hurtige Hane নামক বইতে স্যার উইলিয়াম স্কট বলেন যে, আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরিভাবে ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর ওপর প্রয়োগ করা অনুচিত। কারণ, তাঁর মতে, "যে সব লোক মরক্কো রাজ্যে বাস করে, তাদের পক্ষে ইউরোপীয় রাষ্ট্রে অনুসৃত আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়ম-কানুন পালন করা খুবই কঠিন হবে। অনেক দিক থেকেই তাদের ইউরোপীয় বণিকদের সমপর্যায়ভুক্ত মনে করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের কোন কোন বিষয়ে নীতিগুলো অনেকখানি শিথিল করে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিবিড় ও অবিরাম আদান-প্রদানের ফলেই এ রীতি-নীতি গড়ে উঠেছে।"
স্যার উইলিয়ম স্কট তাঁর The Madonna del Burso নামক বইতে আরও সাধারণভাবে ওই একই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন:
"ওই সব দেশের (উসমানীয় সাম্রাজ্যের) অধিবাসীরা আমাদের আন্তর্জাতিক আইনের রীতি-নীতি পালন করে না। তাদের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতির কথা বিবেচনা করেই আদালত আইনের (Public Law) কঠোর নিয়ম নিগড়ে তাদের বাঁধতে চাননি। এটা বহুবার ঘটেছে। কিন্তু ইউরোপীয়গণ বহুদিন ধরে পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয়ে এ সব আইনের বিধানই প্রয়োগ করে এসেছেন।"
লরিমার বলেন:
"ইউরোপ ও এশিয়ায় অবস্থিত তুরস্ক আংশিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করবে। এছাড়া, এশিয়ার যে সব রাষ্ট্র ইউরোপের অধীনে আসেনি, তারাও আংশিক স্বীকৃতি পাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, চীন, শ্যাম (থাইল্যান্ড) ও জাপান।"
লরিমার আরও বলেন:
"এ সব দেশে কোন আইনবিদ পরিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করতে পারেন না;... কিন্তু তিনি এটা নির্ধারণ করবেন যে, কোন্ বিষয়ে ও কোন্ কোন্ দিকে বর্বর ও অসভ্য মানুষরা আংশিক স্বীকৃতির আওতায় আসে।"
আইনগত অস্বীকৃতির ভিত্তি পর্যালোচনা করে লরিমার দেখিয়েছেন যে, এ বিষয়গুলোই অস্বীকৃতির কারণ নির্দেশ করে: অপরিণত বয়স, শারীরিক ও মানসিক দৌর্বল্য, অপরাধ-প্রবণতা ও জাতিতে জাতিতে ধর্মীয় বিরোধ। তিনি বলেন: “যে ধরনের রাজনৈতিক উন্নয়ন ও ক্রমবিকাশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হতে পারে, তুর্কী জাতি সম্ভবতঃ সেদিক দিয়ে অনুপযুক্ত।” কিন্তু ধর্মীয় বিরোধের ওপরই তিনি বেশী জোর দেন।
টি. ই. হল্যান্ড ও ডব্লিউ ই. হল ধর্মকে বাদ দিয়ে সভ্যতার বিভিন্ন স্তরের ওপর ভিত্তি করেই পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। তাঁরা বলেন যে, এ অবস্থা কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সময় পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে। কেননা, শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বাইরে অবস্থিত দেশগুলোকে জাতিপুঞ্জের সদস্য হিসাবে গণ্য করতে হবে।
অপর একটি মতবাদের আইনবিদগণ বলেন যে, যেহেতু উসমানীয় সাম্রাজ্য কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও চুক্তি সম্পাদন করে এসেছে, তাই মোটামুটি আন্তর্জাতিক আইন তাদের প্রতি প্রযোজ্য। তবু উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলমান জাতিগুলো যে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছিল, এর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৮৪৫ সনে হোয়েটন এ কথাই বলেছিলেন:
"খৃস্টান ও মুসলিম শক্তিবর্গের পরস্পর সম্পর্ক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কখনও কখনও খৃস্টানগণ মুসলমানদের আইন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কখনও-বা তাঁরা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে খৃস্টান আন্তর্জাতিক আইনে কিছু কিছু পরিবর্তন সাধন করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, ক্ষতিপূরণ দিয়ে বন্দী মুক্তি দেয়া বা রাষ্ট্রদূতদের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের আইনই গ্রহণ করা হয়। বহুদিন ধরে অবিরাম আদান-প্রদানের ফলে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে সব বিশিষ্ট রীতি-নীতি গড়ে উঠেছে, সেগুলো শিথিল বা অসম্পূর্ণভাবে মুসলমানদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে।"
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের শেষ দিকে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, তুরস্ককে আন্তর্জাতিক আইনের এলাকার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা ক্রমপ্রসারণশীল জাতিপুঞ্জের সাথে সামঞ্জস্যহীন। ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হিসেবে তুরস্ক এমন এক আইনের আওতায় আসলো, যা ইউরোপীয় জাতিগুলোর মধ্যে পূর্বেই বিকাশ লাভ করেছে। ১৮১৫ সনে ইউরোপীয় জোটের সদস্য হিসেবে যোগ দিতে না পারায় তুরস্ক আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পূর্ণাঙ্গরূপে আসতে পারল না। কিন্তু ১৮৫৬ সনের জোটে যোগদান করতে পারায় এ আইনের সুযোগ-সুবিধা তুরস্ক পরিপূর্ণরূপে ভোগ করার অধিকার পেল। (অবশ্য নিজস্ব রাষ্ট্রে বিদেশীদের অধিকার (Capitulatory rights) তখনও বিদ্যমান ছিল; ১৯২৪ সনে এ অধিকার বিলুপ্ত হয়)। ইউরোপীয় শক্তিবর্গ ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তেই এসে পৌছেন এবং ইউরোপীয় জোটে তুরস্কের প্রবেশের অব্যবহিত পূর্বে হোয়েটনের লেখা থেকে এ কথারই নজির মিলে:
"ইউরোপের খৃস্টান জাতিসমূহ এবং এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলমান ও পৌত্তলিক জাতিসমূহের মধ্যে সাম্প্রতিক আদান-প্রদানের ফলে মুসলমান ও পৌত্তলিকগণের মধ্যে নিজেদের বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির পরিবর্তে খৃস্টান জগতের নিয়ম-কানুন গ্রহণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তুরস্ক, ইরান, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রদূত পাঠাবার ও পারস্পরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রদূত আদান-প্রদান করার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ইউরোপের শক্তি-সাম্যের ব্যবস্থায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা ও ঐক্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য হয়েছে। কাজেই এ অধিকার সম্প্রতি ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাথে এ সাম্রাজ্যের সাধারণ নিয়ম-কানুনের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে। ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য খৃস্টান আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এসে গিয়েছে।"
প্যারিস চুক্তির (১৮৫৬) ৭-ধারায় তুরস্কের "ইউরোপীয় আইন ও জোটে" প্রবেশ করা সম্পর্কে যে কথা আছে, তার অর্থ সম্বন্ধে পাশ্চাত্য আইনবিদদের কোন সুস্পষ্ট ধারণা নেই। অধিকাংশ আইনবিদ বলেছেন যে, এ ধারাটির মাধ্যমে তুরস্ক আন্তর্জাতিক আইনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছে। এর দ্বারা শুধু তুরস্ক ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গের মধ্যে স্থান পেয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে শরীক হবার বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন কথা খুব কম আইনবিদই বলেছেন। ধীরে ধীরে উসমানীয় সাম্রাজ্য আন্তর্জাতিক আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু প্যারিসে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাতে কোন রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে থাকার সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়।

ইসলামী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন
উসমানীয় সাম্রাজ্যের পক্ষে ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হিসেবে স্থান পাবার বাধা-বিপত্তি আর রইল না। কিন্তু ইসলামকে ইউরোপীয় আইন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার সমস্যাটি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। পশ্চিমের হিতৈষী ও মুসলিম উদারপন্থীগণ বহুদিন ধরে উসমানীয় সুলতানকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও সংগঠনের উপদেশ দিয়ে এসেছেন। তাঁরা মনে করতেন যে, এর ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যে মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে এবং আধুনিক রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে সুলতান তাঁর কর্তব্য সমাধা করতে পারবেন। কিন্তু সুলতান পাশ্চাত্যের নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক কৌশল গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন; কিন্তু তিনি পাশ্চাত্যের আইনের প্রত্যয় ও ধারণা গ্রহণ করতে চাননি। কারণ, তার ফলে মুসলিম আইন ও মুসলিম প্রতিষ্ঠানাদি অনেকখানি পরিবর্তিত হয়ে যাবে বলে তিনি আশংকা করেন। এ সময়ে প্রাদেশিক অভ্যুত্থান, আঞ্চলিক স্বাধীনতার দাবী ও উদারনৈতিক দল কর্তৃক সংস্কারের দাবী অভ্যন্তরীণ সংকটের সৃষ্টি করে। রক্ষণশীলদের সন্তুষ্ট করা যেমন সুলতানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না, তেমনি রুশ আক্রমণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করার জন্য পশ্চিমী হিতৈষীদের পরামর্শও তিনি ফেলে দিতে পারেননি। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পন্থায় আধুনিকীকরণ করে শক্তিশালী করার গঠনমূলক নীতি মোটামুটিভাবে "তানযিমাত”বা সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। সুলতান ও নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রনীতিকদের কাছে একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সংস্কার সাধন না করলে সাম্রাজ্য ধ্বংস পড়বে।
বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় সুলতান ইতিমধ্যেই কতকগুলো সাধারণ ইসলামী রীতি-নীতির পরিবর্তন করেন ও পশ্চিমী নিয়ম-কানুন গ্রহণ করেন। আধুনিক যুগের গোড়ার দিক থেকেই ইউরোপে স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন পাঠানোর রীতি চলে আসছে। কিন্তু ষষ্ঠদশ শতক পর্যন্ত সুলতানের শুধু বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের প্রতিনিধিদেরই প্রবেশ করতে দেওয়া হত। অষ্টাদশ শতকে সুলতান পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠাবার রীতি স্বীকার করে নেন। ১৭৯২ সনের পর সুলতান নিজেই প্যারিস, লণ্ডন, ভিয়েনা ও বার্লিনে স্থায়ী কূটনৈতিক প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন।
পাশ্চাত্যের রীতি অনুসরণ করে সুলতান দার্দানেলিস ও বসফরাস প্রণালীতে রাশিয়াকে প্রথম অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার দান করেন (কুচুক কাইনারজা চুক্তি, ১৭৭৪)। এরপর অন্যান্য শক্তিবর্গও এ অধিকার লাভ করে। প্রথমতঃ, বাণিজ্য জাহাজকেই এ অধিকার দেয়া হয়; কিন্তু পরে এ নিয়ম শিথিল করা হয়। ক্রমে ক্রমে অস্ট্রিয়া (১৭৮৪), ইংল্যান্ড (১৭৯৯), ফ্রান্স (১৮০২) ও প্রুশিয়া (১৮০৬) এ অধিকার লাভ করে। দার্দানেলিস ও বসফরাস প্রণালীতে বিদেশী যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করতে না দেয়া উসমানীয় শাসকদের প্রাচীন রীতি। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে কূটনৈতিক চাপের ফলে সুলতান এ অধিকার দিতে স্বীকৃত হন।
পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের চাপে খৃস্টান প্রজাদের অবস্থার উন্নয়নের ব্যাপারে উসমানীয় শাসনে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। খৃস্টান প্রজাদের 'রা'য়া' বলা হত ('জিম্মী'র বদলে 'রা'য়া ব্যবহৃত হত)। ফ্রান্স (১৭৪০), রাশিয়া (১৭৭৪) ও অন্যান্য রাষ্ট্র এ প্রজাদের রক্ষাকবচের অধিকার পায়। মহান সুলতানের দরবারে এদের অবস্থা সম্বন্ধে অবহিত করার ক্ষমতাও তাদের দেয়া হয়। "তানযিমাত" ফরমানের মধ্যে এসব দাবী দাওয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 'খত-ই-শরীফ-গুলখানা' (৩ নভেম্বর, ১৮৩৯) থেকে শুরু করে অন্যান্য আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ নীতি রূপায়িত হয়। পরিশেষে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ এ সব অধিকারের চূড়ান্ত স্বীকৃতি দান করে একটি রাষ্ট্রীয় সনদে এগুলোকে সংযোজিত করেন (২৩ ডিসেম্বর, ১৮৭৬)। এ সব রাষ্ট্রীয় বিধানের মধ্যে বিবিধ আইনগত সংস্কারের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তানযিমাত বিধানসমূহ কিংবা ক্ষণস্থায়ী 'মিধাত-গঠনতন্ত্র' (১৮৭৬) কার্যকরী করা যায়নি। পাশ্চাত্য আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি গতানুগতিক ইসলামপন্থীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে এসব সংস্কার আন্দোলন টিকে থাকতে পারেনি।
পাশ্চাত্যের নিয়ম-কানুন গ্রহণ করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সংস্কার সাধন সম্ভব হল না। কারণ, ইসলামের নামে সুলতানের স্বৈরাচারী শাসন চালানোর বিরুদ্ধে অনেক মুসলিম চিন্তানায়ক অধৈর্য হয়ে উঠলেন এবং তাঁরা মুসলিম রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে লাগলেন। হামিদীয় আমলের (১৮৭৬-১৯০৯) শেষ নাগাদ নতুন যুব সম্প্রদায় পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন। এঁরা আশা করছিলেন যে, পাশ্চাত্যের ভাবধারা গ্রহণ করলে উসমানীয় রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উদারপন্থীগণ বলতে লাগলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ধর্ম অচল হয়ে গেছে এবং জাতীয়তাবাদই কেবল এর ভিত্তি হতে পারে। এ আন্দোলন গোপনে দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলনকারীরা সুলতান আবদুল হামিদকে ১৮৭৬ সনের অস্থায়ী শাসনতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য করেন। সুলতান আবদুল হামিদের সিংহাসনচ্যুতির (১৯০৯) সঙ্গে সঙ্গে প্যান ইসলামী যুগের অবসান হয়। "নব্য-তুর্কী দলের" (Young Turks) নতুন শাসনে জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং মন্ত্রিসভা কর্তৃক পরিচালিত দায়িত্বশীল সরকারের হাতে ক্ষমতা প্রদান করা হয় ও আইনসভা কর্তৃক আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা হয়। এ কথাও ঘোষণা করা হয় যে, ধর্মের ভিত্তিতে কোন পার্থক্য নির্দেশ করা চলবে না এবং আইনের চোখে সব নাগরিকই স্বাধীন ও সমান বলে বিবেচিত হবে।
ইসলামী রাষ্ট্র থেকে জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তিতে এই পরিবর্তন ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করে। কারণ, জাতীয়তাবাদ পশ্চিমী চিন্তাধারা থেকে জন্ম নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্ম দেয় এবং জাতিই যে ক্ষমতার উৎস এ নীতির প্রবর্তন করে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়তের একাধিপত্য লোপ পায়। কিন্তু এ পর্যায়ে ধর্মীয় ক্ষমতা থেকে লোকায়ত ক্ষমতা আলাদা করার কোন চেষ্টা করা হয়নি। আইন ও ক্ষমতা সম্পর্কে ভাবধারার সাথে ইসলামের সমন্বয় সাধনের বিষয়টি গভীরভারে পর্যালোচনাও করা হয়নি।
ধর্মীয় ভিত্তি পরিত্যাগ করে জাতীয় ভিত্তি গ্রহণ করায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সূত্রপাত হল। উসমানীয় শাসনে দারুল ইসলামে এক সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে উঠেছিল। জাতীয়তাবাদ এ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা ত-দূরের কথা, তাকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে ফেলে। দারুল ইসলামের বিচ্ছিন্নতা আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, জাতীয়তাবাদ একে আরো ত্বরান্বিত করে দেয়। জাতীয়তাবাদের প্রভাবে নতুন রাষ্ট্রগুলোও আইনের ভিত্তিরূপে ইসলামকে পরিত্যাগ করল। তুরস্ক যেমন সম্পূর্ণভাবে শরিয়ত থেকে দূরে চলে গেল, তেমনি আরবীয় উপদ্বীপে শরিয়ত একই অবস্থায় রয়ে গেল। উর্বর হেলালী দেশগুলো (সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ইরাক ও ফিলিস্তিন) ও মিসর ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গণ্য করে ইসলামের প্রতি মৌখিক আনুগত্য জানিয়ে একটা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। একই সঙ্গে এরা জাতীয় সরকার গঠন করে এবং বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে। বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আওতায় এসব রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে জাতিপুঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

আইন ও রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষকরণ
প্রথম মহাযুদ্ধের পূর্বেই আইন ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ভাবধারা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু মুসলিম আইন সংশোধনের বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলোপ সাধনের কোন চেষ্টাই করা হয়নি। প্রথম মহাযুদ্ধের পর উসমানী সামাজ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং এর ফলে এক নব যুগের সূচনা হয়। তুরস্কে ও অন্যান্য নতুন রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদের বিজয় নিশান উড়তে থাকে ও মুসলিম জগত "খিলাফত" সমস্যার সম্মুখীন হয়। মুসলমানরা ক্ষমতার ধর্মনিরপেক্ষকরণ পদ্ধতি গ্রহণ বা বর্জন করবে, এ মৌলিক প্রশ্ন খিলাফতের সঙ্গেই জড়িত ছিল।
গোড়ার দিকে কামালপন্থী সংস্কারবাদীগণ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আলাদা করার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদকে (Grand National Assembly) দেয়া হয় এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা খলিফার হাতেই থাকে। ১৯২৩ সালে সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদ কর্তৃক "খিলাফত ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব" নাম দিয়ে যে পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়, তাতে বলা হয়েছে যে, সত্যিকার খিলাফত খোলাফায়ে রাশেদার পর বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং পরে উমাইয়াগণ একে বাদশাহীতে পর্যবসিত করে। তাই, এক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদের কার্যক্রমের মধ্যে নতুন কিছু নেই। কারণ, কয়েক শতাব্দী ধরে খলিফাগণ সত্যিকার খলিফার গুণগত বৈশিষ্ট্য বর্জন করেন। তাছাড়া, (এ পুস্তিকার যুক্তি অনুসারে) আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পার্থক্য নির্দেশ একটা হাদিস থেকেও সমর্থিত হতে পারে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলে গেছেন যে, তাঁর ওফাতের পর খিলাফত মাত্র ত্রিশ বছর বহাল থাকবে; তারপর শুরু হবে বাদশাহী শাসন। নাসাফী এ হাদিসটির উল্লেখ করেছেন। কাজেই নব্য তুরস্ক গতানুগতিক খিলাফত জিইয়ে রাখার কোন আইনসঙ্গত বিধান খুঁজে পায়নি। রক্ষণশীলগণ এ ব্যাখ্যায় খুশী হতে পারেননি। তাই, তাঁরা কামালপন্থী সংস্কারপন্থীদের ঘোর সমালোচনা করতে থাকেন। অবশ্য খলিফা ঘোষণা করেন যে, তিনি রাজনৈতিক ব্যাপারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবেন না। ফলে সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদ এক বৈপ্লবিক নীতি গ্রহণ করে খিলাফত বিলুপ্ত করে (১৯২৪); আর এর সঙ্গে সঙ্গে শরিয়তের বিধানও উঠে যায়। এভাবে তুরস্ক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
তুরস্কের কর্মপন্থা মেনে নেয়া হবে, না নতুন খলিফা নিয়োগ করা হবে, এ প্রশ্নের সুষ্ঠু মীমাংসার জন্য অন্যান্য দেশের মুসলমানগণ, এককভাবে তুরস্ক কর্তৃক খিলাফতের বিলোপ সাধনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। এ ব্যাপারে ১৯২৬ সনের মে মাসে কায়রোতে একটি 'খিলাফত সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয় এবং ইসলামে খেলাফতের প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে একটা প্রস্তাব পাশ করা হয়। কিন্তু এ প্রস্তাব রূপায়ণের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। মক্কা (১৯২৬) ও জেরুযালেমেও (১৯৩১) আরও দুটো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু খিলাফতের প্রশ্নটি সম্বন্ধে কোন আলোচনা আর হল না। বোধহয়, সমস্যাটি তখন পুরানো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টির ভবিষ্যতে আর কোন গুরুত্ব নেই মনে করলে ভুল হবে।
খিলাফতের বিলোপ সাধনে ইসলামী রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষকরণ করা হবে কিনা এ প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়ায়। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মিসরের শরিয়ত আদালতের বিচারক শেখ আলী আবদুর রাযিকের 'ইসলাম ও রাষ্ট্রনীতি' (ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকম) বইখানা এ প্রসঙ্গেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সমর্থন ও খিলাফতের বিলোপ সাধনের স্বপক্ষে আবদুর রাযিক বলেন যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইসলামকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলে মনে করতেন না। অবশ্য রাসূল (সঃ) রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তব্য পালন করে গেছেন। কিন্তু নবী হিসেবে তাঁর ধর্মীয় কার্যধারা এসব কাজ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। আল-কোরআন, হাদিস ও ইজমায় খিলাফতের ভিত্তি নিহিত রয়েছে বলে যে মতবাদ আছে, তিনি তা নস্যাৎ করে দেন। তিনি বলেন যে, খিলাফত সম্পর্কে বহু বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রমাণ্য-সূত্রে এর কোন মীমাংসা হয়নি। কাজেই ধর্মের সঙ্গে খিলাফত জুড়ে রাখা ও এর বিলোপ না করার যৌক্তিকতা তিনি অস্বীকার করতেন। কারণ, রাজনৈতিক কারণেই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। আবদুর রাযিকের মতবাদের তাৎপর্য এই যে, এর ফলে শরীয়তের সীমার বাইরে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপ্রধান বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করার ক্ষমতা লাভ করেন। এ ব্যাখ্যা যে কেবল কামালপন্থীদের কার্যধারাকে সমর্থন জানিয়েছে তাই নয়, যে দেশের (মিসর) আলেমদের "নিয়ন্ত্রণ পরিষদ" তাঁর মতবাদকে অগ্রাহ্য করেছে তার বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার সমর্থনও এর মধ্যে পাওয়া যাবে। আবদুর রাযিকের মতবাদ আলেমগণ নস্যাৎ করে দিয়েছেন ও তাঁর নাম ওলামা পর্যায় থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য, তখন এর বিরুদ্ধে কোন গঠনমূলক সমালোচনা করা হয়নি।
আবদুর রাযিকের মতবাদ নিয়ে বাকবিতণ্ডা কালে এক নব্য মিসরীয় যুবক প্যারিসে আইন পড়তেন। তিনি তাঁর ডক্টরেটের বিষয় হিসেবে "খিলাফত: প্রাচ্যদেশীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের দিকে এর ক্রমোন্নয়ন" (The Caliphate : Its Development Toward an Oriental League of Nations) গ্রহণ করেন। ইনি হলেন ড. সানহুরী। রাজনৈতিক ক্ষমতা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়, আবদুর রাযিকের এ মতবাদ ড. সানহুরী খণ্ডন করেছেন। আধুনিক জীবনধারার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম আইন বিবর্তিত হতে পারে না বলে তিনি মনে করেন না। পূর্বেও খিলাফতের বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিবর্তিত হয়ে তা প্রাচ্যদেশীয় জাতিপুঞ্জে রূপান্তরিত হতে পারে। ইসলাম থেবে রাজনৈতিক ক্ষমতা আলাদা করা সম্পর্কে তিনি আবদুর রাযিকের মতের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভিত্তি মেনে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক সমাজে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পূর্ণ ভূমিকা তিনি স্বীকার করেছেন।
তুরস্কের মত সর্বাঙ্গীন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে শুরু করে আরবীয় উপদ্বীপের মত শরিয়তপন্থী রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রই তাঁদের বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী মেনে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জাতিপুঞ্জ (The League of Nations) ও সম্মিলিতজাতিপুঞ্জ তাদের প্রত্যক্ষভাবে যোগদানের ফলে দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের শান্তিমূলক সম-অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে দু'জন মুসলিম আইনবিদের নিয়োগের ফলে সমগ্র মুসলিম জগতে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। মুসলিম দেশগুলো আন্তর্জাতিক কমিশনগুলোতে কাজ করার অদম্য স্পৃহা দেখিয়েছে। এর দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয়েছে যে, মুসলমানগণ বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ মেনে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সমাজে একত্রিত হতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এমন কি যে সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ধর্মনিরপেক্ষকরণের বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাও ইসলামের বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে গতানুগতিক মুসলিম আইন থেকে অনেকখানি দূরে সরে গেছেন।

উপসংহার
রক্ষণশীলদের বিরোধিতা সত্ত্বেও আইন ও ক্ষমতার ধর্মনিরপেক্ষকরণ এগিয়ে চলেছে। তবু কয়েকজন মধ্যমপন্থী চিন্তানায়ক তাঁদের জীবদ্দশায় যে সব বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে, সে সম্বন্ধে পর্যালোচনা করেছেন। নিজেদের গৌরবময় অতীতের দিকে ফিরে তাকানো দোষণীয় নয়। কারণ, এতে মানসিক অসুস্থতা দূর হয় ও ভবিষ্যতে নব উদ্যমে কাজ করার যথেষ্ট উদ্দীপনা পাওয়া যায়। কোন কোন আধুনিক লেখক পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা ও রীতি-নীতি গ্রহণ করার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন। কারণ, এর ফলে জাতীয় ঐতিহ্য, বর্তমান পরিবেশ ও অবস্থার দিকে মোটেই খেয়াল করা হয় না। পাশ্চাত্য প্রভাবের ফলে যে ফল পাওয়া গেছে, তা আশানুরূপ হয়নি। তাই এ চিন্তাধারা আরও জোরদার হয়েছে। অনেক সমালোচক পাশ্চাত্যের প্রভাবের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে তৎপর হয়েছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন নতুন সামাজিক পরিবেশ পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা পত্তন করলে, তা পাশ্চাত্য দেশের মত ফলপ্রসূ না হবার সম্ভাবনাই বেশী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্ষেত্রে এঁরা মুসলিম দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের অনুপ্রবেশ ও পৃথিবীতে ইসলামের মর্যাদার অবনতির কথাও বলেন। কারণ, জাতীয় ভিত্তিতে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে এদের সংহতি বিনষ্ট হয়েছে ও কূটনৈতিক ব্যাপারে এরা যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি।
আধুনিক জগতে বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ায় ইসলামের সম্ভাব্য অবদান সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তাধারা দানা বেঁধে উঠেছে। এ চিন্তাধারাকে 'নব প্যান' ইসলামবাদ বলা চলে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ চিন্তাধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে দেখা যায় যে, ১৯৫০ সালের সিরীয় গঠনতন্ত্রে (১৯৫৩ সনের রূপান্তরিত গঠনতন্ত্রেও পুনরায় একথা উল্লেখ করা হয়েছে) এবং সিরিয়া, মিসর ও ইরাকের দেওয়ানী আইন বিধিতে শরিয়ত আইনের উৎস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এসব বিষয়ে এ ভাবধারাই বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এ গঠনতন্ত্র ও আইনবিধি রচনার সময় ড. সানহুরীর বই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৫৩ সালে ২ নভেম্বর তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এমন কি, তুরস্কও বর্তমানে ধর্মের বিরুদ্ধে বিধি নিষেধ শিথিল করেছে। ফলে ইসলামী পুনর্গঠনের অনুকূলে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইসলামী সম্মেলনে মুসলিম রাজনীতিকদের সফর বিনিময় ও আঞ্চলিক চুক্তি সম্পাদনে এক পূণর্জাগরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমাজে মুসলিম জোট হিসেবে সহযোগিতা করার বাসনা আজ সুপরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবশ্য এটা ভাল করেই বুঝতে পেরেছেন যে, বর্তমানে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক নীতি অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে ধর্মীয় পরিবেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এবং তা জীবনের পরিবর্তিত পরিবেশে ইসলামের নিজস্ব কল্যাণ-পথের দিশারী হয়েছে।
পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলমানগণ দেখাতে চেয়েছেন যে, ইসলামী ও খৃস্টান জাতিগুলোর পারস্পরিক তাগিদে শরিয়ত আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তনে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00