📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 নিরপেক্ষতা

📄 নিরপেক্ষতা


ইসলাম ও নিরপেক্ষতা
যে রাষ্ট্র সারা দুনিয়ার সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিরোধমূলক সম্পর্ককেই সাধারণ ব্যাপার বলে মনে করেছে এবং যে রাষ্ট্র কেবল চুক্তির মাধ্যমে অল্পকালের জন্য শান্তি কামনা করে এসেছে, সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন আর একটি রাষ্ট্রের কোন মিল থাকতে পারে না যে রাষ্ট্র পূর্বোক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে ও তার শত্রুদের সঙ্গে সম্ভাবমূলক সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়। নিরপেক্ষতা বলতে যদি কোন রাষ্ট্রের সেই মনোভাবকে বোঝায়, যার ফলে সে রাষ্ট্র কোন পক্ষ অবলম্বন না করে স্বেচ্ছায় যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে পারে, তবে এ অবস্থা মুসলিম আইনবিজ্ঞানে স্বীকৃত হয়নি।
মুসলিম শাসনব্যবস্থা মেনে নিয়ে বা অস্থায়ী শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যে রাষ্ট্র ইসলামের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে রাজী হয় না, সে রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে ইসলামের যুদ্ধ লেগেই থাকে। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী আইন অনুযায়ী পৃথিবীকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে; প্রথমটি হল, মুসলিম ভূখণ্ড এবং মুসলিম বিজিত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত দারুল ইসলাম আর দ্বিতীয়টি হল, পৃথিবীর বাকি অংশ নিয়ে গঠিত দারুল হারব। কতিপয় আইনবিদ তৃতীয় একটি বিভাগের কথাও বলেছেন। এটা হল, দারুল আহদ বা দারুস সুলহ বা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দেশসমূহ। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদই একে দারুল ইসলাম কিংবা দারুল হারবের অংশ বলে গণ্য করেছেন। কোন আইনবিদই ইসলামের আইনের আওতার বাইরে কোন রাষ্ট্রকে দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যবর্তী কোন মর্যাদা দান করেন নি।
ইসলামী আইনের বিধানে নিরপেক্ষতা বলে কোন কিছু নেই। কিন্তু আইন প্রয়োগের বেলায় ধর্মীয় বিধানে ও বাস্তব ক্ষেত্রে কতকগুলো ব্যতিক্রমমূলক বিষয় স্বীকার না করে পারা যায়নি। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, স্বেচ্ছাকৃতভাবে ইসলামী রাষ্ট্র কতকগুলো অঞ্চল একেবারেই আক্রমণ করেনি; ফলে এগুলো জেহাদের আওতা থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর সহচরদের প্রতি এসব দেশের সহৃদয় ব্যবহারের পুরস্কার হিসেবেই হোক কিংবা এগুলোর দুর্গমতার দরুনই হোক, এরা জেহাদ থেকে রেহাই পেয়েছে। এসব ভূখণ্ড আর একটি পৃথক বিভাগের গোড়া পত্তন করেছে। বিভিন্ন 'দার' বা বিভাগ দিয়ে বিশ্বের বিভাগীকরণের পদ্ধতি অনুযায়ী এই স্বতন্ত্র বিভাগটিকে "দারুল হিয়াদ" বা নিরপেক্ষ জগত বলে অভিহিত করা যায়।
নিরপেক্ষ জগত কিন্তু বিশ্বের উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগের মধ্যে কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ নয়। কারণ, ইসলামের আইন ব্যবস্থায় সব দেশকেই নীতিগতভাবে বিরুদ্ধবাদী বা শত্রুভাবাপন্ন বলে মনে করা হয়ে থাকে। ইসলামী রাষ্ট্রের আইনের অনুমোদন বলে যে সব রাষ্ট্র নিরাপত্তা লাভ করে ও জেহাদ থেকে রেহাই পায়, তাদেরই কেবল নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা চলে। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই শ্রেণীর রাষ্ট্রকে সত্যিকার নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা যায় না। কারণ, আধুনিক আইনে একটা রাষ্ট্র দুই বা ততোধিক যুদ্ধলিপ্ত রাষ্ট্রের প্রতি নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করতে পারে। এ শ্রেণীর রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ বা নিরপেক্ষকৃত রাষ্ট্র বলা যেতে পারে; অর্থাৎ এইসব রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা যুদ্ধে ব্যাপৃত রাষ্ট্রগুলোসহ বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়ে থাকে। ইসলামী আইনের বিধানেও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যবস্থা অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই আইনে নিরপেক্ষতা বলে বিশেষ কোন সংজ্ঞার অস্তিত্ব নেই। নিরপেক্ষতার রূপায়ণের বৈশিষ্ট্য বা তাৎপর্য আইন প্রণেতাদের মতামত অপেক্ষা নিরপেক্ষকরণের মধ্যেই অধিকতর সুস্পষ্ট।

আবিসিনিয়ার মর্যাদা
মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে আবিসিনিয়া বহু যুগব্যাপী এক অভূতপূর্ব মর্যাদার আসন লাভ করে এসেছে। অমুসলিম রাষ্ট্রপূঞ্জের মধ্যে এ দেশ এমন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল, যাকে ইসলামী রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় জেহাদের গণ্ডীর বাইরে রেখেছে।
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞগণ এ সম্পর্কে তাঁদের অভিমত বিশ্লেষণ কালে আবিসিনিয়ার সঙ্গে প্রথম যুগের ইসলামী রাষ্ট্রের গভীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের নজির এবং এ সম্পর্কে সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছেন। তাছাড়া কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম বাহিনী আবিসিনিয়ায় অনুপ্রবেশ করেনি। মুসলিম আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আবিসিনিয়ার মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এর ঐতিহাসিক পটভূমির ওপর কিছুটা আলোকপাতের প্রয়োজন রয়েছে।
ইসলামের উন্মেষ পূর্বে আবিসিনিয়া আরবের ইয়ামেন অঞ্চল আক্রমণ করে এবং সেখানে খৃস্টধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। সাধারণ প্রচলিত বর্ণনা হতে জানা যায় যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জন্মের বছরেই (খৃস্টাব্দ ৫৭০) আবিসিনিয়া মক্কা আক্রমণ করে। এই সামরিক অভিযানই যে, আরব ও আবিসিনিয়ার মধ্যে একমাত্র সংযোগ ছিল তাই নয়, এ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও বিদ্যমান ছিল। এ সম্পর্কের ফলেই এককালে মক্কায় আবিসিনীয় কলোনী গড়ে ওঠে এবং আরবী ভাষায় বহু আবিসিনীয় শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে।
সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ পরিবেশে ইসলামের জন্ম হয় এবং গোড়া থেকেই প্রচণ্ড প্রতিকূলতার সাথে পদে পদে সংগ্রাম করে একে অগ্রসর হতে হয়। এ অবস্থায় প্রতিবেশী দেশ আবিসিনিয়াকে সমর্থক হিসেবে পাবার সম্ভাবনার কথা ভাবা হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষে মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, আবিসিনিয়াবাসীরা পূর্ব হতেই আরবে পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করে এসেছে। হযরত রাসূলের (সঃ) অনুসারীদের মধ্যে কয়েকজন আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন মহানবীর প্রিয় মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল (রাঃ)। আবিসিনিয়ার সঙ্গে মহানবীর সম্পর্কের ইতিহাস অনেকটা প্রবাদ কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ সম্পর্ক আবিসিনিয়াকে এক বিরাট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় সব মুসলিম ইতিহাস থেকেই জানা যায় যে, ইসলামের গোড়া পত্তনের প্রথম যুগে মক্কার পৌত্তলিকদের অকথ্য নির্যাতন হতে আত্মরক্ষার জন্যে হযরতের (সঃ) বহুসংখ্যক অনুগামী আবিসিনিয়া আশ্রয় গ্রহণ করেন। মক্কা হতে মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় এই হিজরতকে “প্রথম আবিসিনীয় হিজরা” বলা হয়। এই হিজরত সংঘটিত হয় ৬১৫ খৃস্টাব্দে। অবশ্য, ইতিহাসে এই হিজরত সংক্রান্ত ঘটনাবলীর বর্ণনায় কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। সাধারণ ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মক্কা হতে হযরত রাসূলের অনুগামীদের আবিসিনিয়া হিজরতের অব্যবহিত পরেই আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট মক্কার কোরেশ সরদারগণ মোহাজেরদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবী জানিয়ে এক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। কোরেশদের সঙ্গে মোহাজেরদের বিরোধের কারণ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্যে নাজ্জাশী মোহাজেরদের ডেকে পাঠান। মোহাজেরদের নেতা জাফর বিন আবু তালেব এ ব্যাপারে নাজ্জাশীর প্রশ্নের জওয়াবে যে বক্তব্য পেশ করেন, তা এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করছে। পরবর্তীকালে অনুরূপ অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে মুসলিম প্রতিনিধিগণ এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন। নীচে এই ঐতিহাসিক বিবৃতিটির বিবরণ দেয়া হল :
“হে বাদশাহ! আরবের অন্ধকার যুগে (আইয়‍্যামে জাহেলিয়া) আমরা এমন এক জাতি ছিলাম যারা অজ্ঞানতার অতলে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিলাম, মূর্তিপূজায় ব্যাপৃত থাকতাম, হারাম খাদ্য ভক্ষণ করতাম, গর্হিত ও লজ্জাজনক কাজ করতাম, নিজ বংশের অতি নিকটতম আত্মীয়কে হত্যা করতাম; প্রতিবেশীদের দাবী-দাওয়া এবং তাদের সম্পর্কে আমাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতাম; আমাদের মধ্যে আমরা যারা সবল ছিলাম তারা দুর্বলদের অধিকার হরণ করতাম এবং অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখতাম। এ অবস্থা অপ্রতিহতভাবে চলতে লাগল... অতঃপর আল্লাহ আমাদের মধ্য হতে আমাদের জন্য একজন নবী পাঠালেন, যাঁর বংশমর্যাদা, সততা, বিশ্বস্ততা, নির্ভরযোগ্যতা এবং চারিত্রিক পবিত্রতা ও মহান গুণাবলী সর্বজনবিদিত। তিনি আল্লাহর একত্বে (তওহিদে) আস্থা জ্ঞাপন এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ ও তাঁর ইবাদাত করার জন্যে আমাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেন। এবং এরই সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের ও আমাদের পূর্বপুরুষদের অজ্ঞানতার যুগের উপাস্য পাথর ও প্রতিমার পূজা পরিত্যাগ করার জন্যও আহ্বান জানালেন। তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে, বিশ্বস্ত হতে এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি আমাদের কর্তব্য যথার্থভাবে পালন করতে বলেছেন; এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের গর্হিত কার্যাবলী ও অবৈধ রক্তপাত হতে বিরত থাকতে, লজ্জাজনক কাজ ও মিথ্যাচার বর্জন করতে, এতিমদের হক ও অধিকার হতে বঞ্চিত না করতে এবং ধর্মশীলা ও সাধ্বী নারীদের কুৎসা রটনা হতে দূরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আমাদের এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করতে এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করতে, নামাজ আদায় করতে, আর দরিদ্রকে সাহায্য, খয়রাত ও আশ্রয় দান করতে এবং রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছেন।... তাই, আমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আল্লাহ তাঁর নিকট যা (যে সব বাণী বা কালাম) নাযেল করেছেন এবং তাঁকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, তা অনুসরণ করলাম। আমরা তাই একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করি না। এবং আমাদের জন্য যে সব কাজ হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে, আমরা তা পরিত্যাগ করেছি; আর যে সব কাজ আমাদের জন্য অনুমোদন (যায়েজ বা হালাল) করা হয়েছে, আমরা তা' পালন করছি। এই সত্য পথ অনুসরণের ফলে আমাদের দেশের অনেক লোক আমাদের শত্রু হল এবং আমাদের ওপর নিপীড়ন চালাতে লাগল; তারা আমাদের এই মহান ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে পুনরায় আমাদের পৌত্তলিকতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করতে লাগল।"
বাদশাহ নাজ্জাশীর সঙ্গে আলোচনায় হযরত জাফর আল-কোরআনের সমর্থন পেশ করেন (কোরআন-১৯: ১৬-৩৪)। ফলে নাজ্জাশী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণের সিদ্ধান্ত করেন। মোহাজেরদের বিরুদ্ধে প্রেরিত কোরেশ প্রতিনিধিদের দাবী-দাওয়ায় তিনি কোনরূপ কর্ণপাত করলেন না। বর্ণিত আছে যে, এরপরও মুসলিম মোহাজেরদের একটি বা দুটি দল আবিসিনিয়া হিজরত করেন।
আর একটি ঘটনা মুসলমানদের আবিসিনিয়ার প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন করে তোলে। এই ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বাদশাহ নাজ্জাশীকে ইসলাম গ্রহণের যে দাওয়াত পাঠান, নাজ্জাশী তার অনুকূলে জবাব দান করেন। হিজরী ৮ সালে হযরত বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বানপত্র পাঠান। নাজ্জাশীর কাছেও তিনি অনুরূপ একটি পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তিনি বলেন:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) কাছ থেকে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। আল্লাহর সব প্রশংসা যিনি এক, মহান ও পবিত্র, করুণাময় এবং নির্ভরযোগ্য হেফাজতকারী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মরিয়মের পুত্র হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর রূহ এবং বাণীস্বরূপ। এবং তিনিই (আল্লাহ) তাঁকে মহাআশীষপ্রাপ্ত, মহাসাধবী মরিয়মের কাছে পাঠান এবং তার ফলেই মরিয়মের গর্ভে তাঁর জন্ম হল। তিনি (আল্লাহ) নিজের আত্মা থেকে হযরত ঈসাকে সৃষ্টি করেন-তাঁর নিজেদের প্রশ্বাস দিয়ে তাঁকে জীবনীশক্তি দান করেন। এভাবেই তিনি হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করেন। আমি আপন লা-শরীক এবং আসমান, জমিন ও শেষ বিচার দিনের মালিক আল্লাহর উপাসনা করার জন্য আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার রিসালাত মেনে নিন। আমাকে অনুসরণ করুন এবং আমার অনুগামীদের জামাতে দাখিল হোন। কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল।... আপনার রাজকীয় সার্বভৌমত্বের গর্ব পরিত্যাগ করুন। আমি আপনাকে ও আপনার প্রজাদের সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদাত মেনে নিতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার কর্তব্য শেষ হল। আমি আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি। আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা, যাঁরা আমার উপদেশ শুনলেন, তাঁরা যেন এর দ্বারা উপকৃত হন। সত্য ধর্মের আলোকের পথে যিনি চলবেন, তাঁর প্রতি সালাম।"
মুসলিম ইতিহাসের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, বাদশাহ নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহর (সঃ) পত্রখানি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর মাথায় ও ললাটে স্পর্শ করেন এবং তাঁর (হযরতের) রিসালাত কবুল করেন। তিনি হযরতের নিকট উপহার পাঠান এবং সেই সঙ্গে এই মর্মে তাঁর চিঠির জওয়াব প্রেরণ করেন:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। আল্লাহ তাঁর রহমতের ছায়ায় আপনাকে আশ্রয় দান করুন এবং তাঁর অফুরন্ত আশীষ আপনার ওপর বর্ষিত হোক। আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনিই আমাকে ইসলামে দাখিল করেছেন। আপনার চিঠি আমি পাঠ করেছি। আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সবই সত্য এবং সত্য ধর্মের কথা। কারণ, তিনি তাছাড়া আর অধিক কিছুই বলেননি। আসমান-জমিন ও শেষ বিচার দিনের মালিকের ওপর আমি আমার বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করছি। আপনার মহান উপদেশবলী সম্বন্ধে আমি গভীরভাবে চিন্তা করেছি।.... আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল; এবং আমি একথা জাফরের সামনে ঘোষণা করেছি এবং তাঁর নিকট ইসলাম কবুল করেছি। হে রাসূল! জগতসমূহের স্রষ্টা রাব্বুল আলামীনের ইবাদাতের জন্যে আমি নিজকে সমর্পণ করলাম। আমি আমার পুত্রকে আপনার কাছে আমার ব্যক্তিগত দূতরূপে পাঠাচ্ছি। কিন্তু আপনি যদি হুকুম করেন, তবে আমি নিজে গিয়ে আপনার পবিত্র পথ-নির্দেশের পথে নিজকে উৎসর্গ করব। আমি পুনরায় সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনার বাণী সত্য।"
ঐতিহাসিক বাজ বলেন, "আমরা যখন আবিসিনিয়ার খৃস্টানবাদের অতি গোঁড়া ও ধর্মান্ধ প্রকৃতির কথা স্মরণ করি, তখন আরমাহ (নাজ্জাশী) ও তাঁর পাদ্রীদের ইসলাম গ্রহণ খুবই বিস্ময়কর বলে মনে হয়।" হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নাজ্জাশীর কাছে লিখিত পত্রে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে তাঁর মতামতের ওপরেই বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন; কিন্তু এতে তিনি রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কোন কথাই বলেননি। হয়তো সেই কারণেই বাদশাহ নাজ্জাশী তাঁর আহ্বান প্রত্যাখান করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। প্রথম থেকেই আবিসিনিয়া মুসলিম আক্রমণ থেকে রেহাই পায়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনী আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করেনি। পরে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম আবিসিনিয়ায় প্রবেশ লাভ করে। বিশেষ করে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলমানেরা লোহিত সাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আবিসিনিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পান। এর ফলেই শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের পক্ষে আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করা সম্ভবপর হয়। কিন্তু শক্তি বলে ইসলাম কখনো আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করেনি।
আবিসিনিয়ার মর্যাদা সম্বন্ধে আইনগত মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ অন্যান্য যে কোন বিবেচনা বা প্রসঙ্গ অপেক্ষা প্রথম যুগের মুসলমানদের প্রতি আবিসিনিয়ার মৈত্রীসুলভ মনোভাব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো দ্বারাই বেশী প্রভাবান্বিত হয়েছেন। আবিসিনিয়াবাসীদের সততা, সাহস ও সারল্য সম্পর্কে রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কতকগুলো প্রশংসাসূচক মন্তব্যের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আছে। এ হাদিসটির বার বার উল্লেখ দেখা যায়। এতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মুসলমানদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেন: "যতদিন পর্যন্ত আবিসিনিয়াবাসীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ না করবে, ততদিন তাদের শান্তিতে থাকতে দিও।" ইমাম মালিক এ হাদিসটি যথার্থ কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। তবুও তিনি এর নির্দেশ মেনে চলতে মুসলমানদের উপদেশ দেন। তিনি আরও বলেন যে, মুসলমানগণ গোড়া থেকে রীতি হিসেবে আবিসিনিয়া আক্রমণ থেকে বিরত থেকে এসেছেন। আতা ইবনে আবিরাবাহ এ মতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। খৃস্টানদের সম্পর্কে আল-কোরআনের আয়াতের (৬৪ : ৮৫, ৮৬) উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, কোরআনে মুসলমানদের দৃষ্টিতে খৃস্টানদের একটা বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোরআনের এই আয়াতগুলো আবিসিনিয়া-বাসীদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। কারণ, এদের সঙ্গেই গোড়ার দিকে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুসারীরা বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
বাস্তব কার্যধারা হাদিসেরই সমর্থন করে এসেছে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তৃতির প্রাথমিক যুগে আবিসিনিয়া ছাড়া আর সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করা হয়। ফলে, জেহাদ থেকে আবিসিনিয়ার অব্যাহতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ইমাম মালিক আবিসিনিয়া সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন যে, মুসলিম শাসকগণ রীতি হিসেবে আবিসিনিয়াকে আক্রমণ থেকে রেহাই দিয়ে এসেছেন।
মুসলিম আইনবিজ্ঞানের বিধান অনুসারে যে দেশ জেহাদ থেকে রক্ষা পাবে, তা হয় দারুল ইসলামের অন্তর্গত হবে, নতুবা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে 'দারুল আহাদ' হবে। একথা হয়ত বলা চলে যে, বাদশাহ নাজ্জাশী কর্তৃক ইসলাম গ্রহণ তাঁর দেশকে দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করারই শামিল। কিন্তু ইসলামী আইনের রূপায়ণই আসলে ইসলামের মাপকাঠি। সুতরাং, যেহেতু ইসলামী আইন আবিসিনিয়ায় প্রয়োগ করা হত না, তাই একে দারুল ইসলামের অংশ বলে মনে করা হয়নি। আবিসিনিয়ার বাদশাহ যদিও হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) আল্লাহর নবী বলে স্বীকার করেছেন, তবু উপরোক্ত কারণেই এদেশ দারুল ইসলামের অংশ নয়।
আবিসিনিয়া যদি দারুল ইসলাম ও দারুল হারব কিছুই না হয়, তবে একে মাঝামাঝি এক ধরনের একটা কিছু বা 'দারুল হিয়াদ' বা নিরপেক্ষ জগত বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ, এ এমন একটি দেশ যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র একে তার প্রসার এলাকার বাইরে রেখেছে। কাজেই এদেশ নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে গণ্য হত। যে পর্যন্ত মুসলমানদের আক্রমণ না করবে, সে পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রও এ রাষ্ট্রকে আক্রমণ না করার আইনগত প্রতিশ্রুতি দেয়।

নুবিয়া
নুবিয়ায় আবিসিনিয়ার মত ঘটনা সংঘটিত হয়নি; ফলে নুবিয়াকে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই নুবিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রর সঙ্গে নুবিয়ার পারস্পরিক ভিত্তিতে ব্যবসাগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমর বিন-আস কর্তৃক মিসর বিজয়ের পর মুসলমানদের সঙ্গে নুবিয়াবাসীদের একটা খণ্ড যুদ্ধ হয়। এতে উভয়পক্ষই বুঝতে পারল যে, অহেতুক একে অন্যের ভূখণ্ড আক্রমণ না করে পারস্পরিক সমঝোতায় আবদ্ধ হওয়াই ভাল। অতঃপর মিসরের পরবর্তী শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ-ইবনে-আবি সারাহ একটি চুক্তি সম্পাদনা করেন (খৃস্টাব্দ-৬৫২)। এতে স্থির হয় যে, নুবিয়ার অধিবাসীগণ প্রতি বছর ইসলামী রাষ্ট্রকে ৩৬০ জন দাস এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, যব, ঘোড়া ও পোশাকাদি শুল্ক হিসেবে দান করবে। চুক্তিটির বিবরণ নীচে দেয়া হল:
“এটা সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ-বিন-আবি সারাহ কর্তৃক নুবিয়ার সরদার ও অধিবাসীদের প্রতি অঙ্গীকৃত চুক্তি। এ চুক্তি আসোয়ানের সীমান্ত থেকে আলওয়া পর্যন্ত নুবিয়ার ছোট বড়ো সকল অধিবাসীর প্রতি প্রযোজ্য।
"আব্দুল্লাহ-বিন-সাদ নুবিয়ার অধিবাসী, প্রতিবেশী মিসর রাষ্ট্রের মুসলিম এবং অন্যান্য মুসলিম ও জিম্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দান করছেন।
"আপনাদের নুবীয় জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) রক্ষাকবচের ছায়াতলে নিরাপত্তা ভোগ করবে। যতদিন আপনারা চুক্তিটি পালন করবেন, ততদিন আমরা আপনাদের আক্রমণ করব না বা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না কিংবা আপনাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করব না। সফরকারী হিসেবে আপনারা আমাদের দেশে সফর করতে পারবেন; কিন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন না। আমরাও সফরকারী হিসেবে (স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নয়) আপনাদের দেশে প্রবেশ করব। মুসলমানগণ ও তাদের মিত্রগণ যখন আপনাদের দেশে প্রবেশ করবেন বা ভ্রমণ করবেন, তখন তারা সে স্থান পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আপনারা তাদের নিরাপত্তার ভার নেবেন।
"আপনাদের দেশে মুসলমানদের কোন দাস পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া মাত্র আপনারা মুসলিম রাষ্ট্রে ফিরিয়ে দেবেন। আপনারা তার ওপর কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। কোন মুসলমান তাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে তাকে আপনারা বাধা দিতে বা ভয় দেখাতে পারবেন না। সে (মুসলিম) ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে আপনাদের সাহায্য করতে হবে। আপনাদের নগরে যদি মুসলমানগণ কোন মসজিদ নির্মাণ করেন, তবে আপনারা তা সযত্নে রক্ষা করবেন। কাউকে সেই মসজিদে ইবাদাত করতে বাধা দিতে পারবেন না। আপনারা মসজিদখানিকে পরিষ্কার করে রাখবেন; এতে নিয়মিত প্রদীপ দেয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং একে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবেন।
"প্রতি বছর আপনারা মুসলমানদের প্রধান শাসকের নিকট ৩৬০ জন দাস প্রেরণ করবেন। দাস-দাসীগণ যেন মধ্যম প্রকারের এবং সবল ও সুস্থ হয়—অতি বৃদ্ধ বা স্বল্প বয়স্ক শিশু যেন না হয়। এদের আপনারা আসোয়ানের শাসনকর্তার নিকট সমর্পণ করবেন।
"আলোয়া হতে আসোয়ান সীমান্ত পর্যন্ত কোন শত্রু আপনাদের ওপর হামলা চালালে মুসলমানগণ তাকে প্রতিরোধ করতে কিংবা তার আক্রমণ থেকে আপনাদের রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে না। আপনারা যদি মুসলমানদের কোন দাসকে আশ্রয় দেন অথবা কোন মুসলমান বা তার মিত্রকে হত্যা করেন কিংবা আপনাদের নগরে মুসলমানগণ কর্তৃক নির্মিত মসজিদ ধ্বংস করেন বা ৩৬০ জন দাস থেকে একজনও কম প্রদান করেন, তবে এ শান্তি ও নিরাপত্তার চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে; এবং আবার আমাদের ও আপনাদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হবে, যে পর্যন্ত না আল্লাহ এর বিচার করেন (অর্থাৎ বিরোধের সুরাহা করেন); কেননা, আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
"এই শর্তগুলোর ভিত্তিতেই আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) চুক্তি ও ওয়াদা দ্বারা আবদ্ধ হচ্ছি; এবং আপনারা আপনাদের ধর্ম বিশ্বাস মতে যাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানিত ও মহত্তম বলে মনে করেন—সেই নবীগণ এবং আপনাদের ধর্ম ও জাতির পরম শ্রদ্ধাভাজন পুণ্যাত্মা মহাপরুষদের নামে আমাদের সাথে এই চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছেন। আমাদের ও আপনাদের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তিতে আল্লাহ সাক্ষী রইলেন।
"উমর-বিন-সুরাহবিল কর্তৃক হিজরী ৩১ সনের রমযান মাসে (এপ্রিল-মে : ৬৫২ খৃস্টাব্দ) চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হল।"
নুবিয়াবাসীগণ মুসলমানদের যে শুল্ক প্রদান করত, তাকে "বাকত" বলা হত। এ শুল্ক জিযিয়া শ্রেণীভুক্ত ছিল না; কারণ, নুবিয়াবাসীগণ জিম্মীর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমতাবস্থায় অনুরূপ বার্ষিক শুল্ক প্রদানকে মুসলমানদের নিকট তাদের আত্মসমর্পণের কোন নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায় না। এটা ছিল অনেকটা পারস্পরিক বাণিজ্যিক আদান-প্রদান বা চুক্তিভিত্তিক একটা ব্যবস্থা। লক্ষ্যণীয় যে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে শুল্ক প্রদানের সময়ে নুবিয়াবাসীগণ সম্মানস্বরূপ মুসলমানদের নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত ৪০টির অধিক দাস এবং অন্যান্য উপহার (বিশেষ করে দুষ্প্রাপ্য পশু, যেমন হাতী, জিরাফ ও চিতাবাঘ) প্রদান করে। অপরপক্ষে মুসলমানগণ বিনিময়ে তাদের গম, বার্লি, পানীয় দ্রব্য, অশ্ব এবং অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রী প্রদান করে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই যে, চুক্তিটির পারস্পরিক বিনিময় ভিত্তিক প্রকৃতি লক্ষ্য করা যায় তাই নয়, বস্তুতঃ আইনবিষয়ক এবং রাজনৈতিক শর্তেও এটা সুপরিস্ফুট রয়েছে। এই শর্তাদির ভিত্তিতেই মুসলমানগণ ও নুবিয়াবাসীগণ পরস্পরের রাষ্ট্রে ভ্রমণকারীদের সফরের সুযোগ দান, পরস্পরের দেশে মহান নবীগণ এবং পরস্পরের ধর্মমত ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের (যেমন নুবিয়ায় মুসলমানদের মসজিদ) প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং পরস্পরের ওপর আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে স্বীকৃত হয়। চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ সম্পর্কে কোন সময় নির্দিষ্ট করা হয়নি; ফলে সাধারণ বিধি ও নিয়ম অনুসারে চুক্তিটি দশ বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। তবে 'বাকত' (নির্ধারিত শ্রেণীর শুল্ক) পরিশোধের নিয়ম বার্ষিক হওয়ায়, উভয়পক্ষই সময়ে সময়ে খুব সহজেই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিতেন। এ অবস্থার ফলে কার্যতঃ দেখা যায় যে, মিসরে ফাতেমীয় খেলাফত পর্যন্ত ৬শ' বছরের অধিককাল চুক্তিটি অক্ষুণ্ণ ছিল।
মুসলিম আইনে দখলের পূর্বে ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নুবিয়ার মর্যাদার প্রশ্ন আর একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। দুটো বিষয়ে আবিসিনিয়া থেকে এর পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, ইসলামী রাষ্ট্র নুবিয়াকে আবিসিনিয়ার মত জেহাদ থেকে রেহাই দেয়নি। অবশ্য, চুক্তিকালীন সময়ে এর ওপর কোন আক্রমণ করা যেত না। তাই নুবিয়াকে যে দারুল হারব থেকে আলাদা করা হল, তা ছিল নিতান্ত অস্থায়ী। উভয়পক্ষের চুক্তি পালনের ইচ্ছার ওপরই এ ব্যবস্থা নির্ভর করত। যদি চুক্তি লঙ্ঘন করা হত কিংবা যে কোন একটি পক্ষ খবর পাঠিয়ে (নাবধ) চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চাইত, তবে তখনই নুবিয়া দারুল হারবের অংশ হয়ে যেত; দ্বিতীয়তঃ, ইসলামী রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় নুবিয়াকে দারুল হারব থেকে আলাদা করেনি। বস্তুতঃ অবস্থার চাপে পড়ে অন্ততঃ প্রথম দিকে ইসলামী রাষ্ট্র নুবিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের দিক হতে ইসলামী আইনের বিধান নুবিয়াকে সাময়িকভাবে জেহাদের আওতার বাইরে রাখতে স্বীকৃতি দান করেছে। কার্যতঃ দেখা যায় যে, দীর্ঘ ছয় শতাব্দীব্যাপী নুবিয়া জেহাদ থেকে মুক্ত থাকে।
জেহাদের আওতার বাইরে থাকা কালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দিক থেকে নুবিয়া দারুল ইসলাম (কারণ, এখানে ইসলামী বিধান কার্যকরী ছিল না) কিংবা দারুল হারব কোনটাই ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় একে 'দারুল আহদের' পর্যায়ভুক্ত বলে মনে করা যেতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, নুবিয়ার শান্তিচুক্তির প্রকৃতি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির চেয়ে আলাদা ধরনের। কারণ, চুক্তি অনুযায়ী একে শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে ইসলামী রাষ্ট্রকে কোন রাজস্ব দিতে হত না। কেবলমাত্র পারস্পরিক আদান-প্রদানের ভিত্তিতেই নুবিয়া ইসলামী রাষ্ট্রকে একটা শুল্ক প্রদান করত। নুবিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্তে এই ব্যবস্থা স্বীকৃত হওয়ায় মুসলিম আইনে একে (নুবিয়াকে) একটা বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়। এদিক থেকে কতকাংশে এর মর্যাদা অনেকটা আবিসিনিয়ার অনুরূপ ছিল। চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ পর্যন্ত উভয়পক্ষ এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে স্বীকৃত হয়। নুবিয়ার এ মর্যাদাকে (চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত) বিশেষ এক প্রকারের নিরপেক্ষতা বলে অভিহিত করা যেতে পারে।

সাইপ্রাস
সাইপ্রাস (কুবরাস) উপরোক্ত বিশেষ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আর একটি দৃষ্টান্ত। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম আইন ব্যবস্থায় সাইপ্রাস একটা বিশেষ স্থান অধিকার করে।
প্রথম মুয়াবিয়া যখন ৬৪৮ খৃস্টাব্দে সাইপ্রাস আক্রমণ করেন, তখন সাইপ্রাস ছিল বাইজান্টীয়দের অধিকারভুক্ত দ্বীপ।
এ দ্বীপটি বাইজান্টীয়দের শুল্ক প্রদান করত। সাইপ্রাস দখল করলে মুসলমানদের সঙ্গে বাইজান্টীয়দের আর একটি যুদ্ধ বেধে যাবার সম্ভাবনা ছিল। পূর্ব থেকেই তাদের সঙ্গে মুসলমানদের ভূমধ্যসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই ছিল। তাই নতুন সংঘর্ষ এড়াবার জন্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে সাইপ্রাসকে এই দুই বৃহৎ শক্তির (মুসলিম ও বাইজান্টীয়) মধ্যবর্তী একটা রাষ্ট্রে (Buffer State) পরিণত করা হয়। চুক্তিতে স্থির হয় যে, সাইপ্রাসকে প্রতি বছর মুসলমানদের ৭০২০ দিনার প্রদান করতে হবে। বাইজান্টীয়দের সঙ্গে সাইপ্রাসের এ ধরনের শুল্ক সম্পর্কীয় চুক্তি আগে থেকেই ছিল। এখন সাইপ্রাসের অধিবাসীদের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে এ শুল্ক ধার্য হল। স্থির হল, মুসলমান ও তার শত্রুদের মধ্যে সাইপ্রাস কোন পক্ষ অবলম্বন করবে না। তবে মুসলমানদের তারা বাইজান্টীয়দের গতিবিধি সম্পর্কে খবরাখবর দেবে। বালাযুরী বলেন, চুক্তিতে এও স্থির হয় যে, “নৌ-অভিযানের সময় মুসলমানগণ সাইপ্রাস দ্বীপের কোন ক্ষতি সাধন করবে না; আবার সাইপ্রাসবাসীগণও তাদের সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না।”
৬৫৪ খৃস্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়া আবার সাইপ্রাস আক্রমণ করেন। কারণ, সেই সময়ে চুক্তির খেলাফ করে এক নৌ-যুদ্ধে সাইপ্রাসবাসীরা বাইজান্টীয়দের জাহাজ দিয়ে সাহায্য করে। সাইপ্রাসবাসীগণ চুক্তি লঙ্ঘন করলেও হযরত মুয়াবিয়া পূর্বের চুক্তির শর্তাদি অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং পুনর্বাসনের জন্যে সাইপ্রাসে ১২,০০০ লোক পাঠান। সেই সময়ে মুয়াবিয়া সাইপ্রাসে একটি মসজিদও নির্মাণ করেন। তাছাড়া, তিনি দ্বীপটিতে একটি নগর নির্মাণ করেন এবং বালবাক থেকে কিছুসংখ্যক লোক ও একদল ফৌজ সেখানে মোতায়েন করেন। পরে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযিদ এদের ফিরিয়ে নেন এবং নগরটা ধ্বংস করতে হুকুম দেন। শেষ পর্যন্ত ৬৪৮ সনের চুক্তির ভিত্তিতে সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
খলিফা আবদুল মালিকের (খৃস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) অধীনে একটি নৌ-অভিযানের ফলে সাইপ্রাসে মুসলিম প্রভাব অনেকখানি কমে আসে। ৬৮৯ সনে সম্পাদিত এক চুক্তিতে খলিফা বাইজান্টীয় শক্তিকে বার্ষিক শুল্ক দিতে রাজি হন। আরো ঠিক হয়, সাইপ্রাস থেকে প্রাপ্ত শুল্ক মুসলিম ও বাইজান্টীয়গণ ভাগ করে নিবে এবং সাইপ্রাস উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নিরপেক্ষ থাকবে।
সাইপ্রাসের অবস্থা ছিল সঙ্গীন। প্রাথমদিকে বাইজান্টীয় ও মুসলিম শাসনে সাইপ্রাস ছিল পরাধীন। শেষে এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি অর্ধেক হারে বার্ষিক শুল্ক ভাগ করে নিয়ে সাইপ্রাসের স্বাধীনতা স্বীকার করতে রাজি হয়।
আব্বাসীয় আমলে পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলামের নৌ-শক্তির অবনতি, উমাইয়াদের সঙ্গে আব্বাসীয়দের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আফ্রিকায় প্রতিদ্বন্দ্বী আগলাবিদ ও ফাতেমীয় রাজবংশের অভ্যুত্থানের ফলে পরিস্থিতি অনেকখানি বাইজান্টীয়দের পক্ষে অনুকূল হয়। সাইপ্রাসবাসীদের মুসলিমদের স্বপক্ষে আনবার জন্য খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খৃস্টাব্দ) বার্ষিক শুল্ক কমিয়ে দিয়ে ৬৪৮ সনের চুক্তিতে নির্দিষ্ট মূল শুল্ক প্রবর্তন করেন। কারণ, উমাইয়া আমলে এ শুল্ক কয়েকবার বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু বাইজান্টীয়দের প্রতি সাইপ্রাসবাসীদের সহানুভূতি থাকায় এতে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।
সাইপ্রাসের শাসনকর্তা আবদুল মালিক ইবনে-সালেহ ইবনে-আব্বাসের (মৃত্যু ৮১২ খৃস্টাব্দ) আমলে বাইজান্টীয়দের উসকানিতে সাইপ্রাসের এক বিরোধী দল বিদ্রোহের সৃষ্টি করে। বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল, সাইপ্রাসকে শুল্ক প্রদান থেকে মুক্ত করা। আবদুল মালিক বিদ্রোহ দমন করে দ্বীপটিকে সম্পূর্ণ দখল করে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্ত র্ভুক্ত করতে উদ্যত হন। এ উদ্দেশ্যে সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল করে দেবার স্বপক্ষে তিনি আইনগত মতামত জানতে চান এবং তদানীন্তন যুগের খ্যাতনামা আইনবিদদের কাছে মতামতের জন্যে পত্র লেখেন। আইনবিদগণ চুক্তিটি বাতিল করে দেবার পক্ষে মত দেননি। সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা সম্পর্কে আইনবিদদের কতকগুলো মতামত আমাদের আলোচনার দিক থেকে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তাই, সেগুলো পুরোপুরি এখানে দেয়া হল।
মালিকী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক-ইবনে-আনাস (মৃত্যু ৭৯৫ খৃস্টাব্দ) এই মর্মে সাইপ্রাসের গভর্নর আবদুল মালিকের পত্রের জবাব দেন:
"সাইপ্রাসবাসীদের সঙ্গে আমাদের শান্তিচুক্তি বহু দিনের এবং শাসনকর্তাগণ তা পালন করে এসেছেন। কারণ, তাঁরা চুক্তির শর্তগুলোকে সাইপ্রাসবাসীদের পক্ষে অসম্মানজনক ও হেয়কর এবং মুসলমানদের পক্ষে শক্তির উৎস বলে মনে করেছেন। এর ফলে মুসলমানরা শুল্ক ভোগ করতেন ও শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করার সুযোগ পেতেন। তবু, আমি এমন কোন শাসকের কথা জানি না, যিনি চুক্তি ভঙ্গ করেছেন বা তাদের শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তাই যতদিন তাদের দিক থেকে চুক্তি ভঙ্গের কোন নিদর্শন না পাওয়া যায়, ততদিন আমি তাদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করতে কিংবা চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে যথেষ্ট সংকোচবোধ করি। কারণ, আল্লাহতায়ালা বলেন, “যতদিনের মেয়াদ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে তোমাদের চুক্তি হয়েছে, ততদিন তোমরা চুক্তিটি পালন কর"; (কোরআন-৯: ৪); "অতঃপর যদি তারা ঠিকভাবে না চলে, প্রতারণা পরিত্যাগ না করে এবং তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে যদি তোমরা স্থির নিশ্চিত হয়ে থাক, তবে তোমরা তাদের আক্রমণ করতে পার। এ ক্ষেত্রে আক্রমণ করা ন্যায়সঙ্গত হবে এবং তোমরা সাফল্য লাভ করবে। এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তারা অপদস্থ ও আপমানিত হবে।”
মুসা ইবনে আয়ুন নিম্নলিখিত মতামত ব্যক্ত করেছেন: "এ ধরনের ঘটনা পূর্বে ঘটেছে; কিন্তু প্রত্যেক বার শাসনকর্তাগণ তাদের মাফ করে দিয়েছেন। কারণ, আমি প্রাথমিক যুগের শাসকদের মধ্যে এমন একজনকেও দেখিনি, যিনি সাইপ্রাসবাসী বা অন্যান্য কারোর সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। এমনও হতে পারে যে, তাদের নেতাগণ যা করেছেন সাধারণ সাইপ্রাসবাসীদের তাতে কোন হাতই ছিল না। তাই, যাই ঘটুক না কেন, আমি চুক্তিটি ও এর শর্তগুলো পালন করাই যুক্তিযুক্ত মনে করি। আল-আউযায়ীকে আমি একটা দৃষ্টান্ত দিতে শুনেছি। এক ব্যক্তি মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পরে অমুসলমানদের কাছে মুসলমানদের গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করে। আউযায়ী বলেন-'তারা যদি জিম্মী হয়, তবে তারা এর দ্বারা চুক্তিটি ভঙ্গ করেছে এবং তাদের নিরাপত্তার অধিকার বিনষ্ট করেছে। এ অবস্থায় শাসনকর্তা ইচ্ছা করলে তাদের হত্যা করতে পারেন বা ক্রুসবিদ্ধ করতে পারেন। আর যদি যুদ্ধের পর অধীনতা স্বীকারের ফলে তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মুসলমানগণ তাদের নিরাপত্তার জন্য দায়ী নয়; এক্ষেত্রে শাসনকর্তা তাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল করে দিতে পারেন। কারণ, আল্লাহ প্রতারকদের ভালোবাসেন না'!"
ইসমাইল-ইবনে-আয়াশ নিম্নলিখিত মতামত ব্যক্ত করেছেন: "সাইপ্রাসের অধিবাসীরা তাদের স্ত্রী-পরিবার নিয়ে বাইজান্টীয়দের হাতে উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে। তাদের এ অবস্থায় আমাদের উচিত তাদের পক্ষাবলম্বন করা এবং তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। তাফলিসবাসীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সম্পর্কে হাবিব ইবনে মাসলামা লেখেনঃ "যদি তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা থেকে মুসলমানদের কোন কিছু বিরত করে এবং সে সময়ে কোন শত্রু তোমাদের পদানত করে, এ অবস্থায় তোমরা মুসলমানদের প্রতি অনুগত থাকলে এ ব্যাপারে চুক্তিভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হবে না।" তাই আমি বলতে চাই যে, সাইপ্রাসবাসীদের সঙ্গে চুক্তিটি বলবত থাকবে এবং তারা নিরাপত্তা ভোগ করবে। কারণ, আল-ওয়ালিদ ইবনে ইয়াযিদ যখন তাদের সিরিয়ায় বহিষ্কৃত করেন, তখন মুসলমানগণ এ কাজকে অন্যায় বলে মনে করেন এবং আইনবিদগণও এটা অনুমোদন করেননি। ফলে ইয়াযিদ বিন আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তখন তিনি পুনরায় তাদের সাইপ্রাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। এ নীতি মুসলমানগণ সমর্থন করেছেন এবং এটা ন্যায়ানুগ বলে গণ্য হয়েছে।"
আল-লায়েত ইবনে সা'দ, সুফিয়ান ইবনে ইউয়ানা, ইয়াহইয়া ইবনে হামজা, আবু ইসহাক আল-ফাযারী ও মাখলাদ ইবনে আল-হোসেন প্রমুখ আইনবিদগণ তাঁদের জবাবে বলেন যে, যেহেতু সাইপ্রাসবাসীরা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করেছে, সে অবস্থায় মুসলমানরাও চুক্তিটা নাকচ করে দিতে পারেন এবং তাদের শাস্তির বিধান করতে পারেন।
যে সব আইনবিদ সাইপ্রাস চুক্তি বাতিল করে দেবার বিপক্ষে রায় দিয়েছেন, তাঁদের জওয়াবে প্রদত্ত কতগুলো বিষয় বিবেচনা করে দেখা উচিত। এতে সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য রয়েছে।
প্রথমতঃ, সাইপ্রাস কেবল ইসলামের অধীনস্থ (শুল্ক দেবার পর) রাষ্ট্র ছিল না; এ দ্বীপ বাইজান্টীয়দের অধীনেও ছিল। কাজেই সাইপ্রাসবাসীগণ কর্তৃক ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারটি বাইজান্টীয় অনুশাসনের ওপরও নির্ভর করত।
ইবনে আয়াশের মতে, বাইজান্টীয়দের চাপে সাইপ্রাসবাসীগণ চুক্তিটির শর্ত পালন করতে না পারলে, মুসলমানগণের পক্ষে চুক্তিটি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে গণ্য হবে না। বাইজান্টীয় ও মুসলিম উভয়পক্ষের যৌথ বাধ্যবাধকতা সাইপ্রাসবাসীদের ওপর প্রযুক্ত রয়েছে বলে মুসলমানদের একক বাধ্যবাধকতা সাইপ্রাস পালন করতে না পারলেও ইসলামী রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে এ দ্বীপটি রক্ষা পাবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার দরুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিধানে সাইপ্রাস মধ্যবর্তী বা বন্ধনী রাষ্ট্র (Buffer state) বলে গণ্য হত।
দ্বিতীয়তঃ, সাইপ্রাস ইসলামী রাষ্ট্রকে শুল্ক প্রদান করলেও মূসা ইবনে আয়ুনের মতে এখানকার অধিবাসীরা জিম্মী হিসেবে গণ্য হত না। তাই, তারা যদি ইসলামী রাষ্ট্রের দুশমনদের গোপনীয় সংবাদাদি প্রেরণ করে, তবে মুসলমানরা চুক্তি নাকচ করে দেবার ওজর খুঁজে পাবেন; কারণ, তাদের নিরপেক্ষতা আর অক্ষুণ্ণ থাকবে না। অপরপক্ষে, জিম্মীগণ যদি শত্রুকে খবর সরবরাহ করে, তবে ইসলামের অধীনস্থ সম্প্রদায় হিসেবে তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে; কিন্তু তাদের চুক্তি বাতিল করে দেবার প্রশ্ন এখানে থাকবে না।
দারুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাইপ্রাস দারুল ইসলামের অংশ বলে গণ্য হয়নি। কারণ, সেখানকার অধিবাসীরা জিম্মী হিসেবে গণ্য হত না; আর ইসলামী আইনও সে রাষ্ট্রে কার্যকরী ছিল না। অপরপক্ষে, তাকে দারুল হারবের পর্যায়েও ফেলা যায় না। কারণ, মুসলমান ও বাইজান্টীয়গণ সাইপ্রাস আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আবিসিনিয়াকে ইসলামের প্রতি সম্ভাবপূর্ণ মনোভাবের জন্য এবং নুবিয়াকে মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য জেহাদের এলাকা থেকে বাইরে রাখা হয়। কিন্তু সাইপ্রাসের বেলায় এসব কিছুই ঘটেনি। সাইপ্রাস এমন সমুদ্র বেষ্টিত এক ভূখণ্ড, যা মুসলিম ও বাইজান্টীয় নৌ-আধিপত্যের অমীমাংসিত সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল ছিল। সাধারণতঃ কোন ভূখণ্ড যদি দুই বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে অবস্থিত হয়, তবে তার নিরপেক্ষতা রক্ষার অধিক সম্ভাবনা থাকে। এভাবেই ভূমধ্যসাগরীয় দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে চুক্তির ফলে সাইপ্রাসকেও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হয়। মুসলিম আইনে এর মর্যাদা নিরপেক্ষ জগতের শামিল বলে গণ্য হয়।

উপসংহার
একটি হাদিসে আছে যে, সর্বশেষে যে জাতিকে মুসলমানরা আক্রমণ করবে, তারা হবে তুর্কী জাতি। এদের ওপর মুসলিম আক্রমণের এই বিলম্বের কারণ, এ জাতির বলিষ্ঠতা ও এ দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ। এ হাদিসটি প্রামাণ্য হোক আর না-ই হোক, এতে অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি ইসলামের মনোভাব সু-প্রকাশিত হয়েছে; অর্থাৎ আজ হোক বা কাল হোক, জেহাদ সব দেশের বিরুদ্ধে চালিয়ে যেতে হবে, তা সে দেশের জাতিত্ব ও ভৌগোলিক পরিবেশ যে কোন প্রকৃতিরই হোক না কেন। মুসলিম আইনে আবিসিনিয়া ছাড়া বোধহয় আর কোন দেশকে জেহাদ থেকে রেহাই দেয়া হয়নি। তুলনামূলক বিচারে দেখা যায় যে, নুবিয়া ও সাইপ্রাস এবং সম্ভবতঃ তুর্কীগণ স্থায়ীভাবে জেহাদের এলাকা থেকে বাদ পড়েনি; যতদিন পর্যন্ত তারা চুক্তির শর্ত পালন করে, কেবল ততদিন তাদের নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু আইনের সাধারণ প্রকৃতি অনুযায়ী অল্পকালের মধ্যেই চুক্তিগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কাজেই এমন একদিন আসবেই যখন এসব দেশকে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। দশ বছর অন্তর অন্তর চুক্তির মেয়াদ নতুন করে বাড়িয়ে নিলেও আইনের বিচারে একথাই সত্য।
শান্তি সম্পর্কীয় আইন-বিধির মত নিরপেক্ষতা আইনের দ্বারা সাময়িক উদ্দেশ্য হাসিল হত। সমগ্র পৃথিবীকে ইসলামীকরণের পূর্ব পর্যন্তই ছিল এর সক্রিয় ভূমিকা। পরবর্তীকালে অবশ্য জেহাদ স্তিমিত হয়ে আসে। কাজেই শান্তি সম্পর্কীয় আইন ও নিরপেক্ষতা আইন ততদিন পর্যন্ত বলবত থাকবে যতদিন পৃথিবীতে মুসলিম ও অমুসলিম পাশাপাশি বসবাস করবে বা সহাবস্থান করবে। নিরপেক্ষতা আইন কেবল আবিসিনিয়ার বেলায় এখনো প্রযুক্ত রয়েছে। সাইপ্রাস, নুবিয়া ও তর্কীদের বেলায় আর এ আইন খাটে না। কারণ, নুবিয়া (বর্তমান লিবিয়া) ও তুরস্ক ইসলামেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আর সাইপ্রাস ১৫৭০ খৃস্টাব্দে উসমানীয়গণ কর্তৃক অধিকারের পর প্রায় তিন শতাব্দীকাল তাদের দখলে থাকে। আবার ১৮৭৮ সনে সাইপ্রাস খৃস্টানদের দখলে চলে যায়। যদি নিরপেক্ষতা রাখার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তবে নিরপেক্ষতা আইন যে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে না, এমন কোন কারণ নেই।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের ওপর পাশ্চাত্যের প্রভাব
মধ্যযুগীয় খিলাফতের অবসানের পর আইনের ক্ষেত্রে যে সব পরিবর্তন সাধিত হয়, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে সাধারণ মুসলিম আইনবিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের অনুসন্ধান সম্পূর্ণ করা মেটেই অবান্তর হবে না। এসব পরিবর্তনের সময়েই ইসলামী রাষ্ট্র খৃস্টান রাষ্ট্রের সম্পর্কে আসে। এ প্রভাবের ফলে আইনের ক্ষেত্রে অনিবার্য পরিবর্তন এসেছে। এ সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করতে গেলে একখানি পৃথক পুস্ত কের প্রয়োজন। যে সব মৌলিক পরিবর্তন ও কারণ মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনকে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা থেকে আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেছে, কেবল সেগুলো সম্পর্কেই এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করে হবে।

দারুল ইসলামের প্রকৃতিগত বিবর্তন
কার্যতঃ স্বাধীন আঞ্চলিক শাসকগণ এবং কখনো কখনো স্পেন ও মিসরের প্রতিদ্বন্দ্বী খলিফারা বাগদাদের খলিফার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ ও অস্বীকার করে। তবু আইনের দৃষ্টিতে দারুল ইসলামের ঐক্য অক্ষুণ্ণই ছিল। কারণ, স্বাধীন প্রাদেশিক শাসকগণ আব্বাসীয় খলিফাদের সর্বময় কর্তৃত্ব মেনে নিতেন। কিন্তু স্পেন ও মিসরের খলিফারা নিজ নিজ রাষ্ট্রে কেবল সীমাবদ্ধ আনুগত্যই দাবী করতে পারতেন। ইসলামী জগতের কার্যতঃ স্বাধীন শাসকদের মধ্যযুগীয় খৃস্টান জগতের স্বাধীন রাজাদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এসব স্বাধীন রাজাগণ তাঁদের ক্ষমতা লাভ করতেন সম্রাট বা পোপের নিকট হতে। বাইজান্টিয়ামের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকে ফাতেমীয় মিসর বা উমাইয়া শাসিত স্পেনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ, যদিও বাইজান্টিয়াম পশ্চিমী সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্ব অস্বীকার করে, তবু খৃস্টান জগতের আইনগত ঐক্য তার দ্বারা ব্যাহত হয়নি।
খৃস্টীয় ১২৫৮ সনে বাগদাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দারুল ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন থেকেই ইসলামের আইনগত ঐক্যের প্রতীক আর বিদ্যমান রইল না; (অবশ্য ক্রীড়নক আব্বাসীয় খলিফা কায়রোতে অবস্থান করতেন। তাঁর মামলুক প্রভুরা ভিন্ন তাঁকে আর কেউ বড় একটা মানত না)। আর সেই সঙ্গে শরিয়ত রূপায়িত করার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বও বিলুপ্ত হল। মোঙ্গল অভিযানকারীরা ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে, তাঁরা বিদেশী শাসক হিসেবে মুসলিম রাষ্ট্রকে নিজেদের রাষ্ট্রনীতি ও আইন ব্যবস্থার আলোকেই পরিচালিত করেছেন। এমন কি, গজনীর বাদশাহ সুলতান মাহমুদ (খৃষ্টীয় ১২৯৫-১৩০৪) ইসলাম ধর্ম কবুল করার পরও ইসলামী আইন ছাড়া মোঙ্গল আইনের বিধান অনুসারেও ফরমান জারী করতেন। পরবর্তী যুগে সালজুক ও উসমানীয় সুলতানগণ তাঁর এ রীতিরই অনুসরণ করেন। দারুল ইসলামের যে অংশ তাঁদের অধীনে ছিল, সেখানে শরিয়তের সঙ্গে সঙ্গে নতুন আইন ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।
আব্বাসীয়-খিলাফতের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বহু ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এবং লোকায়ত শাসকের উদ্ভব হয়। এরা দু'শতাব্দী ধরে ক্ষমতার লোভে নিজেদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা করে শেষে বিলুপ্ত হয়। এর ফলে, দারুল ইসলাম কয়েকটি বৃহৎ রাজনৈতিক বিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, উসমানীয় সুলতানগণ ইউরোপে তাঁদের প্রভুত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পর প্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলমান শাসকদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের দিকে মনোনিবেশ করেন। ইরানে শাহ ইসমাইল সাফাবী (১৫০০-১৫২৫) কর্তৃক নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্বদিকে উসমানীয়দের ক্ষমতা বিস্তার ব্যাহত হয়। শাহ ইসমাইল শিয়া মযহাবকে রাষ্ট্রীয় ধর্মরূপে ঘোষণা করেন। ইরানে শিয়া আইন বিধান রূপায়ণের ফলে ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও জোরদার হতে থাকে। আগে থেকেই এ বিরোধ পাকাপাকি হয়ে এসেছিল। এর ফলে দারুল ইসলাম তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত হয়ে যায়ঃ (১) উসমানীয় রাষ্ট্র (যার মধ্যে ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র ও পশ্চিম এশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল); (২) সাফাবী কর্তৃত্বাধীনে ইরান; এবং (৩) মোগলদের অধীনে মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশ। দারুল ইসলাম বিভক্ত হবার ফলে মুসলিম-রাষ্ট্রের ধারণাও বিবর্তিত হতে থাকে। এর ফলে সার্বজনীন মুসলিম রাষ্ট্র জাতীয় মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হল। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পশ্চিমী ধারণা এ প্রবণতাকে আরও অনেকখানি বাড়িয়ে দিল।
দারুল ইসলাম বিভিন্ন রাজনৈতিক ভূখণ্ডে বিভক্ত হবার ফল হল মারাত্মক। এতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো সংকীর্ণ গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পাশ্চাত্য প্রভাব মুসলিম দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করতে থাকে। অবশ্য এ কথা সত্য যে, উসমানীয়দের রাজ্য বিস্তারের ফলে 'ইসলামী' রাষ্ট্রের সীমানা খৃস্টান দেশগুলোতে গিয়ে ঠেকেছিল; এ অবস্থায় দখলীকৃত কতকগুলো জায়গা থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে সরে আসতে হয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবার খৃস্টানদের হাতে স্পেনের পূর্ণ কর্তৃত্ব চলে যায়। অন্যদিকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ভারতে গমনের নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর ভারত মহাসাগরে পর্তুগীজদের গতিবিধি লোহিত সাগরের মাধ্যমে পরিচালিত মুসলিম বাণিজ্যে চরম আঘাত হানে। অতঃপর পূর্ব আফ্রিকা ও পারস্য উপসাগরে পর্তুগীজগণ কতকগুলো বাণিজ্য কেন্দ্র দখল করে। এতে কয়েকটি মুসলিম ভূখণ্ড তাদের অধীনে এসে পড়ে। ফ্রান্স ও বৃটেন পর্তুগীজদের পদাংক অনুসরণ করে এবং খৃষ্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত মহাসাগরে তাদের তৎপরতার ফলে আরও কতিপয় মুসলিম দেশ তাদের অধীনে চলে আসে। ফরাসী কর্তৃত্ব উৎখাত করার পর বৃটেনই ইরানের পূর্বদিকের সমস্ত মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর শাসন ক্ষমতা লাভ করে (মধ্য এশিয়া পরে রাশিয়ার অধীনে চলে যায়)। প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ শাসনের মাধ্যমে বৃটেন পারস্য উপসাগর, আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ উপকূল ও পূর্ব আফ্রিকায় তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা ও শেষে পতনের ফলে আরও কতকগুলো মুসলিম রাষ্ট্র বৃটেনের করতলে আসে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স ভারত মহাসাগর থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হয়; তবে উনবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকায় কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

উসমানীয় শাসন : ইসলাম কর্তৃক খৃস্টান জগতের আইনগত স্বীকৃতি
উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তনে এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়। উসমানীয় সুলতানগণ উদারপন্থী হানাফী মযহাবকেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দান করেন। তাছাড়া, তাঁরা তুর্কী আচার-ব্যবহার ও রীতি-নীতির ওপর ভিত্তি করে ফরমান জারী করার প্রাচীন তুর্কী প্রথাও চালু রেখেছিলেন। এ ফরমানগুলোর আইনগত মর্যাদা নিতান্ত সামান্য ছিল না। ফরমানগুলো প্রায়ই আইন পুস্তকে সংযোজিত হত। এগুলোকে বলা হত 'কানুন-নামা'। শরিয়তের পাশাপাশি এই কানুনগুলো আইনের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করত। আইনের ব্যাপারে কানুন শরিয়তকে ছাড়িয়ে যেতে পারত না। কিন্তু কার্যতঃ, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার তাগিদে শরিয়ত কানুন দ্বারাই অনেকখানি পরিবর্তিত হয়। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ফলে সুলতানগণের পক্ষে বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে নতুন রীতি-নীতি প্রবর্তন করা সম্ভব হয়।
পশ্চিমী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উসমানীয় সুলতানগণ খৃস্টান জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদার নীতি অবলম্বন করেন। কারণ, উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারতে যাবার নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ায় ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যে ভাঁটা পড়তে থাকে। মিসরের মামলুকগণ ও বিজয়ী বীর মুহাম্মদ পূর্বেই পশ্চিমী সওদাগরদের প্রতি ঔদার্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করেন। তাই ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত চুক্তি পশ্চিমী ব্যবসায় এবং উসমানীয় (মুসলিম) রাষ্ট্রে বিদেশীদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কিত সাধারণ নীতি প্রচলিত ব্যবস্থাকেই জোরদার করে।
ইসলামের সঙ্গে খৃস্টান জগতের সম্পর্ক নির্ণয়ে এ চুক্তি কতকগুলো নতুন বিষয়ের অবতারণা করে। চুক্তির প্রস্তাবনায় ফ্রান্সের রাজা ও তার প্রতিনিধিদের সুলতান সুলেমান ও তার প্রতিনিধিদের সমপর্যায়ভুক্ত বলে স্বীকৃতি দান করা হয়। চুক্তিটির প্রথম ধারায় সুলতান ও ফরাসী রাজার মধ্যে তাঁদের জীবদ্দশায় আইনগত ও অব্যর্থ শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রে নাগরিকদের (অর্থাৎ ফরাসী ও উসমানীয়) পারস্পরিক অধিকারের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফরাসীরা জিযিয়া থেকে রেহাই পেলো এবং তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করার অধিকারসহ নিজেদের কনস্যুলেট দ্বারা আইনের অধীনে বিচারের অধিকার লাভ করল। ফ্রান্সের রাজাকেও এই সব অধিকার দেয়া হল:
"ফরাসী দেশের রাজা কন্সট্যান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বা পেরা বা সাম্রাজ্যের অন্য যে কোন স্থানে আলেকজান্দ্রিয়াস্থ তাঁর বাণিজ্য প্রতিনিধির অনুরূপ একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করতে পারবেন। উপরোক্ত প্রতিনিধিকে সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা করতে হবে ও যথোপযুক্ত কর্তৃত্ব দান করতে হবে যাতে তিনি তার অঞ্চলে কর্তব্য সম্পাদনে অন্যান্য বিচারক বা কাজী দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হন; এবং তিনি তাঁর নিজের ধর্ম ও আইনের আলোকে ফরাসী সওদাগর ও ফরাসী রাজার প্রজাদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধের ব্যাপারে সব দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা ও মোকদ্দমার বিচার করতে পারবেন। সওদাগরগণের অনুরোধ সত্ত্বেও সুলতানের কাজী বা অন্যান্য কর্মচারীগণ ফরাসী বণিক ও ফরাসী রাজার প্রজাদের মধ্যে মামলার মীমাংসা করতে পারবেন না। আর যদি কাজীগণের আদালতে কোন মামলার শুনানী হয়, তবে তাদের রায় বেআইনী বলে গণ্য হবে।" (দ্বিতীয় ধারা)।
স্মরণ রাখা উচিত যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন শত্রুর সঙ্গে দশ বছরের বেশী মেয়াদে শান্তি স্থাপন করা অনুমোদন করে না। উসমানীয় কার্যবিধি এ নিয়মের পরিবর্তন সাধন করে এবং সুলতানের জীবদ্দশা অবধি এর মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া, ১৫৩৫ সনের চুক্তি উভয়পক্ষের সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তি স্বীকার করেছে। অনেক লেখকের মতে এটা হল ফরাসী রাজার প্রতি প্রদত্ত বিশেষ সুযোগ-সুবিধার নজির। পরে অবশ্য অন্যান্য খৃস্টান রাজাদেরও অনুরূপ মর্যাদা দেয়া হয়। চুক্তির ১৫ ধারায় অবশ্য লেখা আছে যে, এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য রাজাদেরও দেয়া হবে। এ ধারাটি এইরূপ:
"ফ্রান্সের রাজা প্রস্তাব করেছেন যে, মহামান্য পোপ, ইংল্যান্ডের রাজা ও তাঁর ভাই, স্থায়ী মিত্র এবং স্কটল্যান্ডের রাজা স্বেচ্ছায় এ শান্তিচুক্তিতে মিত্র হিসেবে শরিক হতে পারেন। চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তাঁদের অবশ্যই আট মাসের মধ্যে মহান সুলতানের কাছে চুক্তি সম্পর্কে তাঁদের অনুমোদনপত্র পাঠাতে হবে এবং তাঁর স্বীকৃতি লাভ করতে হবে।"
উপরোক্ত রাজাগণ এ চুক্তিতে শরিক না হলেও (ইংল্যান্ড সুলতানের সঙ্গে ১৫৮০ সনে এক পৃথক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়) সুলতান এই নীতি প্রতিষ্ঠা করলেন যা অন্যান্য খৃস্টান রাজাদের প্রতিও প্রযোজ্য হবে।
১৫৩৫ সনের চুক্তি ইসলামী আইনের আর একটি নীতিকে বদলে দেয়; তা হল, অমুসলমানদের (এক বছরের বেশী দারুল ইসলামে বাস করলে) জিযিয়া থেকে রেহাই দেয়া। ১৮৩৯ সন পর্যন্ত সুলতানের অমুসলিম প্রজাগণ এ শুল্ক প্রদান করে আসে। ওই শুল্ক তুলে দেয়া হয়। বিচারের ক্ষেত্রে ফরাসীদের নিজেদের কনস্যুলেটের অধীনে আসবার অধিকারের ব্যাপারে চুক্তির মধ্যে আইনের ব্যক্তি সম্পর্কিত দিকটায় সাধারণ নীতিই পরিস্ফুট হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে কতকগুলো চুক্তির দ্বারা এ নীতি পাল্টে যায় (বিশেষ করে ১৭৪০ সনের চুক্তি)। এ নতুন পরিবর্তন অনুসারে বিদেশীদের সঙ্গে মুসলমানগণ যে সব মামলা-মোকদ্দমায় সংশ্লিষ্ট, তা বিদেশী কনস্যুলেটের আওতায় এসে পড়ে। ফলে এসব ব্যাপারে ইসলামী আইন প্রযোজ্য হওয়ার সাধারণ নীতি অনেকখানি বদলে গেল।
১৫৩৫ সনের চুক্তিটি এমন সময়ে সুসম্পন্ন করা হয়, যখন সবেমাত্র আধুনিক আন্ত র্জাতিক আইনের বিকাশ শুরু হয়েছে। এ চুক্তিটি বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে খৃস্টান ও মুসলিম আইনের সমন্বয়ের ব্যাপারে এক অভূতপূর্ব সুযোগ দান করে। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর পর ঐতিহাসিক বিবর্তনে খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবধারার সৃষ্টি হয়। ফলে এ দুই জগতের মধ্যকার আইন ব্যবস্থাও আলাদা হয়ে যায়। নীচে এ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতি খৃস্টান জগতের মনোভাব
খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতে বিরোধমূলক স্বার্থের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বনের উপযুক্ত মুহূর্ত ছিল ১৫৩৫ সনের চুক্তি সম্পাদনের সময়। চুক্তিটির বাণিজ্য সম্পর্কীয় ধারাগুলো পশ্চিমী ব্যবসায়ীদের কাছে খুব বেশী আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু যেসব রাজনৈতিক কারণে চুক্তিটির জন্ম হয়, তার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কোন সম্বন্ধ ছিল না। ফরাসী-রাজ ফ্রান্সিসের তাঁর খৃস্টান প্রতিদ্বন্দ্বী পঞ্চম চার্লসের বিরুদ্ধে সমর্থন লাভের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। আর অন্যদিকে ভিয়েনা আক্রমণে অকৃতকার্য (১৫২৯) হওয়ার পর খৃস্টান রাজাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে সুলেমান তাঁর বিরুদ্ধে জোট ভেঙ্গে দেবার চেষ্ট করেন। অন্যান্য খৃস্টান রাষ্ট্রের জন্যেও এ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার দ্বার খোলা রাখা হলেও ইসলামী জগত ও খৃস্টান জগতের মধ্যে মোটেই সমঝোতা সম্ভব হয়নি। কোন খৃস্টান রাজাকে সুযোগ-সুবিধা দানের আইনগত ভিত্তি সাম্যনীতি ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করত না। আইনের ব্যক্তি সম্পর্কিত ভিত্তির ওপরেই ছিল এর প্রতিষ্ঠা। এর ফলে মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করার সময় অমুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকগণও কতকগুলো সুবিধা লাভ করতেন।
যে সব ধর্মীয় বিষয় খৃস্টানদের জীবনের মূল নিয়ামক ছিল, সেগুলোতে কোন অখৃস্টান শক্তির যোগদানকে সংস্কার আন্দোলনের (Reformation) যুগে ইউরোপের লোকেরা বরদাশত করতে চায়নি। উসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল একটা “মুসলিম” রাষ্ট্র। তাই খৃস্টান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তা বিদেশী উপকরণ বলে গণ্য হত। কোন কোন খৃস্টান রাজা ১৫৩৫ সনের চুক্তিকে খৃস্টান ধর্মের আইনের খেলাফ বলে মনে করতেন, যদিও সম্রাটের অধীনে ও খৃস্টান আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মধ্যযুগীয় সার্বজনীন খৃস্টান রাষ্ট্রের চিন্তা ধারা তখন প্রায় লোপ পেয়ে গেছে।
যে সব ইউরোপীয় আইনবেত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনবিদ ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও জাতিসমূহের সাম্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করার জন্যে সুপারিশ করেছেন, উসমানীয় সুলতানদের প্রতি তাঁদের মনোভাবে বিশেষ কোন পরিবর্তন আসেনি। খৃস্টান জগতের সাধারণ প্রচলিত মতানুসারে একথা ধরে নেয়া হয় যে, উসমানীয় সাম্রাজ্য নব বিবর্তিত আন্তর্জাতিক আইনের এলাকার বাইরে।
আলবেরিকাস জেন্টিলিস (১৫৫২-১৬০৮) তথাকথিত ধর্মীয় যুদ্ধ পছন্দ করতেন না; এবং তিনি রেড ইন্ডিয়ানদের ওপর স্পেনের আক্রমণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি কিন্তু তুর্কীদের সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তুর্কীদের সঙ্গে মিত্রতামূলক চুক্তি সম্পাদনের জন্য তিনি প্রথম ফ্রান্সিসের সমালোচনা করেন। কারণ, তাঁর মতে খৃস্টান ও অখৃস্টান বাদশাহদের মধ্যে সমঝোতা বরদাশত করা যায় না। এমন কি, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের বিশিষ্ট দিকপাল গ্রোসিয়াস পর্যন্ত অখৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে পার্থক্যমূলক ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন; অথচ তিনি প্রাকৃতিক নিয়মকে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন। প্রাকৃতিক নিয়মের ভিত্তিতে খৃষ্ট ধর্মের বিরোধী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন তিনি মেনে নিতেন। তবু তাঁর মতে খৃস্টান শাসকগণ খৃষ্টধর্মের দুশমনদের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে কাজ করবেন। তাই গোড়ার দিকে কেবল খৃস্টান জাতিগুলোর সম্পর্ক নির্ণয়ের তাগিদেই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আদর্শ ও বুনিয়াদ গড়ে ওঠে, যা খৃস্টান সভ্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ইউরোপে তুর্কী সমস্যা
ভাবপ্রবণ ইউরোপীয় লেখকদেরও উদ্বেগের কারণ ঘটে এবং এ নিয়ে তাঁরা অনেক পানি ঘোলা করেন। এঁরা খৃস্টান জগতে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। খৃস্টান রাজাদের বিরোধ দূর করে শান্তি স্থাপনের জন্য খৃষ্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে কতকগুলো পরিকল্পনা পেশ করা হয়। মধ্যযুগের ডুবীয় (Dubois) পরিকল্পনার মত প্রায় সবগুলোতেই খৃস্টান রাজাদের কাছে এই আবেদন জানানো হয়েছে যে, তাঁরা যেন নিজেদের মধ্যকার সব বিরোধ ভুলে গিয়ে তুর্কীদের বিরুদ্ধে সমবেত হন। ডব্লিউ, পেন (W. Penn) বলেন, ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর শান্তি পূর্ণ পারস্পরিক সমঝোতার প্রাথমিক ভিত্তি হল তুর্কীদের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা। লিবনিয (Lebnitz) চতুর্দশ লুইকে হল্যান্ড আক্রমণ না করে মিসর দখলের পরামর্শ দেন।
অবশ্য, এমেরিক ক্রুস (Emeric Cruce) ও অ্যাবে ডি সেন্ট পিয়ার (Abbe De Saint Pierre) তাঁদের সম্মিলিত রাষ্ট্রসংস্থার পরিকল্পনায় তুর্কীদের বাদ দেননি।
সেন্ট পিয়ার বলেন যে, এ ধরনের সম্মিলন হলেই যে সব ধর্মেও মিলন হবে, এমন নয়। তবে এতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হবে। তুর্কীদের বাদ দিয়ে খৃস্টান জগতের মধ্যে শান্তি স্থাপনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হল কার্ডিন্যাল আলবেরনীর (Alberoni) পরিকল্পনা। আলবেরনী স্পেনের উজীরে আযম ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি ১৭৫৩ সনে লুজানে একখানা বই প্রকাশ করেন। এর নাম হল: Testament Politique du Cardinal Jule Alberoni. এতে তিনি ইউরোপের সব খৃস্টান-রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে এক সাধারণ পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব করেন যাতে খৃস্টান জগতের সমস্ত সাধারণ সমস্যা নিয়ে এখানে আলোচনা করা যায়। কিন্তু কার্ডিন্যাল আলবেরনী মনে করতেন যে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার পূর্বে খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত হয়ে ইউরোপ থেকে তুর্কীদের বিতাড়িত করতে হবে। তিনি জার্মান ও ইংরেজী ভাষাতেও একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এর নাম হল: Cardinal Alberoni's Scheme for Reducing the Turkish Empire to the Obedience of Christian Princes (London, 1736). "শান্তি" সম্পর্কীয় তাঁর সাধারণ পরিকল্পনায় তিনি বলেন:
"মনে হয়, খৃস্টান ইউরোপের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্যেই উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁদের ভূখণ্ড রক্ষার্থে জার্মানীর সম্রাটদের খুব বেশী মনোযোগী হওয়া উচিত এবং সেদিকে রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করা উচিত। সব খৃস্টান রাজাকে একত্রিত করে তুর্কী সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব হবে। জার্মানীর অস্ট্রীয় রাজবংশের অধীনে যে সব ভূখণ্ড আছে, তার কিছু কিছু এ সব রাজাদের দিতে হবে। প্রাচ্য দেশে অগ্রসর হওয়ার জন্যেই তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হবে।...
"মনে হয়, এ পরিকল্পনা রূপায়িত হলে অস্ট্রীয় রাজবংশ ও বুরবন রাজবংশের মধ্যকার সমস্ত কলহ ও বিবাদ দূর হয়ে যাবে। ফলে তারা খৃস্টান জগত থেকে বিধর্মীদের বিতাড়িত করতে পারবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সব বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, জাতিসমূহের মধ্যে শিল্প প্রসারের তাগিদে সাম্যের ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পত্তন করতে পারবে; এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা যদি নিজস্ব রাষ্ট্রের ওপর অধিকার পায়, তবে অনিশ্চয়তা ও হিংসাপূর্ণ অবস্থার ফলে উদ্ভূত যুদ্ধ ও যুদ্ধ-ভীতি থেকে তাদের প্রজাদের বাঁচাতে পারবে। তারা নিজেদের শক্তি সংগঠন এবং বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সমর-কৌশল প্রদর্শনের উপযুক্ত ক্ষেত্র লাভ করবে; আর খৃস্টানদের রক্তক্ষয় থেকে রেহাই পেয়ে বিবেকের দংশন থেকেও তারা মুক্তি পাবে। প্রকৃতপক্ষে, অস্থিরচিত্ততাই পরবর্তী যুগে কয়েক শতাব্দী ধরে খৃস্টানদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য দায়ী।"
এ থেকে এ সিদ্ধান্তেই আসতে হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের উন্নয়নের খাতিরে সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ইসলামী জগত বা খৃস্টান জগত কোনটিই এককভাবে বিষয়টির মোকাবেলা করতে চায়নি এবং একটি সাধারণ সমবায়ে মিলিত হয়ে তাদের ধর্মীয় নীতিতে একে খাপ খাইয়ে নিতে চায়নি। অবিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাবের ফলে ইসলামী জগত ও খৃস্টান জগতের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব হয়নি। বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা ম্যাকিয়াভেলীয় ও জোর-জবরদস্তিমূলক নীতি অনুসরণ করতেন। উসমানীয় সুলতানদের দরবারে প্রেরিত ইউরোপীয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ উৎকোচ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করতেন। আবার উসমানীয় উজীরগণ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের ভীতি প্রদর্শন করে ও অসদ্ব্যবহার করে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে রাষ্ট্রীয় তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালাতেন। এ পরিস্থিতির ফলে খৃস্টান জগত ও ইসলামী জগতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুলেমান ও প্রথম ফ্রান্সিসের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের চেয়ে বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি।

উসমানীয় সাম্রাজ্য ও আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের উন্নয়নের ধারাটি আরও জোরদার হতে থাকে। এ সময়ে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন (Reformation) সার্বজনীন রাষ্ট্রের ধারণাকে বরবাদ করে দেয়। তখন যে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম হয়, তা শক্তি সাম্যের (Balance of power) ভিত্তিতে ও আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত হত। উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপীয় জাতিপুঞ্জের বাইরেই ছিল। এর কারণ আগেই বলা হয়েছে। পরবর্তী দু'শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এ ব্যবস্থা দ্বারাই নির্ণীত হয়েছে। ইউরোপীয় আইন ব্যবস্থার মধ্যে যদি উসমানীয় সাম্রাজ্যকে একীভূত করে নেয়া সম্ভব হত, তবে গোড়া থেকেই আন্ত জাতিক আইন সার্বজনীন পর্যায়ে উঠতে পারত।
ইউরোপের ক্রমবর্দ্ধমান শক্তি আর আইন ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষীকরণের সঙ্গে সঙ্গে উসমানীয় শক্তির পতন ঘনিয়ে আসে। সুলতানগণ তুরস্কে পাশ্চাত্যের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক কলাকৌশল অতিসত্বর চালু করেন; কিন্তু সেইভাবে পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রনীতি এবং আইনের নতুন নতুন প্রত্যয় ও ধারণা তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁরা এগুলো গ্রহণ করতে পারলে "ইসলামী” জগত তখনই আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হ'তে পারত। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে 'ইসলামী' জগতের সংঘর্ষে ইসলামের সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। ইউরোপীয় শক্তিপুঞ্জের কাছে এ পরাজয় অনেকটা আশ্চর্যজনক বোধ হয়েছিল। কারণ, তাঁরা সহজেই সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় লাভ করেন। ১৫৩৫ সালের চুক্তিটি ১৭৪০ সালে যেভাবে রদবদল করা হয়, তা থেকেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুক্তির পরিবর্তন উসমানীয়দের পক্ষে মোটেই সুবিধাজনক ছিল না। ১৭৭৪ সালে কুচুক কায়নরাজার সন্ধির ফলে সুলতানের খৃস্টান প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষমতা ফ্রান্স ও রাশিয়াকে দেয়া হয়। এর কারণ হল এই যে, মুসলিম সমাজের অবনতি এত দূর গিয়ে পৌঁছে যে তারা ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমানে তাল দিয়ে চলতে পারেনি। ইউরোপীয়গণ মুসলিম জগতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে খুব বিস্ময় বোধ করে। তাদের মতে, ইসলামী সভ্যতা এত "নীচু- দরের" হওয়া সত্ত্বেও কেন মুসলমানরা ইউরোপীয়দের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উৎকর্ষতা ও মুসলমানদের নিজেদের অবনতির কথা বুঝতে পারে না। এমতাবস্থায় ইউরোপীয় জাতিগুলো সরাসরি সুযোগ-সুবিধা লাভ করার জন্যই বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ে; তারা ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কে সাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক নির্ণয় করার দিকে কোন খেয়ালই করল না। আন্তর্জাতিক আইন-বিধি ও কার্যধারা দূরে ফেলে দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ কূটনীতির আশ্রয় নিতে লাগল। আবার কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা শক্তি প্রয়োগে মেতে ওঠে। ফলে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ যেমন মুসলিম দেশগুলোকে আন্ত র্জাতিক আইনের আওতার বাইরে বলে মনে করতেন, তেমনি ইউরোপীয়দের কবলে মুসলমানদের কোন ভূখণ্ড হস্তান্তরিত হয়ে থাকলে সেখানকার খৃস্টান শাসন মুসলমানরা স্বীকার করে নেননি। পক্ষান্তরে, ইউরোপীয়গণ আরো মনে করতেন যে, অনগ্রসর এলাকা হিসেবে এ সব মুসলিম অঞ্চলে যুদ্ধ আইনের নীতিগুলো প্রযোজ্য নয়। খৃস্টান ধর্মে দীক্ষা দেবার মত মুসলিম ভূখণ্ড দখল করাও ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রশংসাজনক কাজ বলে মনে করা হত।
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ নিয়ে যখন ইউরোপীয় শক্তিবৃন্দের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় এবং এর ফলে ইউরোপে শান্তিভঙ্গের আশংকা ঘটে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তুর্কী সাম্রাজ্যের ঐক্য রক্ষার্থ উসমানীয় সুলতানকে ইউরোপীয় জাতিপুঞ্জের মধ্যে সাদরে আহ্বান জানানো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ভিয়েনা কংগ্রেসে (১৮১৪-১৫) যখন এ আমন্ত্রণের কথা ওঠে, তখন রাশিয়া তাতে আপত্তি জানায়; কারণ, তুরস্ক নাকি "বর্বর" দেশ।
অনেকদিন ধরে তুরস্ক ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এসেছে। তবু তুরস্ককে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা সম্পর্কে আইনবিদগণ একমত হতে পারেননি। ইউরোপীয় রীতিনীতির মানের তুলনায় তুর্কী তার কর্তব্য সমাধা করতে পারবে কি না সে সম্পর্কে অনেক আইনবেত্তাই সন্দেহ প্রকাশ করেন। Hurtige Hane নামক বইতে স্যার উইলিয়াম স্কট বলেন যে, আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরিভাবে ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর ওপর প্রয়োগ করা অনুচিত। কারণ, তাঁর মতে, "যে সব লোক মরক্কো রাজ্যে বাস করে, তাদের পক্ষে ইউরোপীয় রাষ্ট্রে অনুসৃত আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়ম-কানুন পালন করা খুবই কঠিন হবে। অনেক দিক থেকেই তাদের ইউরোপীয় বণিকদের সমপর্যায়ভুক্ত মনে করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের কোন কোন বিষয়ে নীতিগুলো অনেকখানি শিথিল করে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিবিড় ও অবিরাম আদান-প্রদানের ফলেই এ রীতি-নীতি গড়ে উঠেছে।"
স্যার উইলিয়ম স্কট তাঁর The Madonna del Burso নামক বইতে আরও সাধারণভাবে ওই একই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন:
"ওই সব দেশের (উসমানীয় সাম্রাজ্যের) অধিবাসীরা আমাদের আন্তর্জাতিক আইনের রীতি-নীতি পালন করে না। তাদের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতির কথা বিবেচনা করেই আদালত আইনের (Public Law) কঠোর নিয়ম নিগড়ে তাদের বাঁধতে চাননি। এটা বহুবার ঘটেছে। কিন্তু ইউরোপীয়গণ বহুদিন ধরে পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয়ে এ সব আইনের বিধানই প্রয়োগ করে এসেছেন।"
লরিমার বলেন:
"ইউরোপ ও এশিয়ায় অবস্থিত তুরস্ক আংশিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করবে। এছাড়া, এশিয়ার যে সব রাষ্ট্র ইউরোপের অধীনে আসেনি, তারাও আংশিক স্বীকৃতি পাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, চীন, শ্যাম (থাইল্যান্ড) ও জাপান।"
লরিমার আরও বলেন:
"এ সব দেশে কোন আইনবিদ পরিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করতে পারেন না;... কিন্তু তিনি এটা নির্ধারণ করবেন যে, কোন্ বিষয়ে ও কোন্ কোন্ দিকে বর্বর ও অসভ্য মানুষরা আংশিক স্বীকৃতির আওতায় আসে।"
আইনগত অস্বীকৃতির ভিত্তি পর্যালোচনা করে লরিমার দেখিয়েছেন যে, এ বিষয়গুলোই অস্বীকৃতির কারণ নির্দেশ করে: অপরিণত বয়স, শারীরিক ও মানসিক দৌর্বল্য, অপরাধ-প্রবণতা ও জাতিতে জাতিতে ধর্মীয় বিরোধ। তিনি বলেন: “যে ধরনের রাজনৈতিক উন্নয়ন ও ক্রমবিকাশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হতে পারে, তুর্কী জাতি সম্ভবতঃ সেদিক দিয়ে অনুপযুক্ত।” কিন্তু ধর্মীয় বিরোধের ওপরই তিনি বেশী জোর দেন।
টি. ই. হল্যান্ড ও ডব্লিউ ই. হল ধর্মকে বাদ দিয়ে সভ্যতার বিভিন্ন স্তরের ওপর ভিত্তি করেই পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। তাঁরা বলেন যে, এ অবস্থা কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সময় পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে। কেননা, শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বাইরে অবস্থিত দেশগুলোকে জাতিপুঞ্জের সদস্য হিসাবে গণ্য করতে হবে।
অপর একটি মতবাদের আইনবিদগণ বলেন যে, যেহেতু উসমানীয় সাম্রাজ্য কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও চুক্তি সম্পাদন করে এসেছে, তাই মোটামুটি আন্তর্জাতিক আইন তাদের প্রতি প্রযোজ্য। তবু উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলমান জাতিগুলো যে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছিল, এর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৮৪৫ সনে হোয়েটন এ কথাই বলেছিলেন:
"খৃস্টান ও মুসলিম শক্তিবর্গের পরস্পর সম্পর্ক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কখনও কখনও খৃস্টানগণ মুসলমানদের আইন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কখনও-বা তাঁরা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে খৃস্টান আন্তর্জাতিক আইনে কিছু কিছু পরিবর্তন সাধন করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, ক্ষতিপূরণ দিয়ে বন্দী মুক্তি দেয়া বা রাষ্ট্রদূতদের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের আইনই গ্রহণ করা হয়। বহুদিন ধরে অবিরাম আদান-প্রদানের ফলে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে সব বিশিষ্ট রীতি-নীতি গড়ে উঠেছে, সেগুলো শিথিল বা অসম্পূর্ণভাবে মুসলমানদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে।"
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের শেষ দিকে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, তুরস্ককে আন্তর্জাতিক আইনের এলাকার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা ক্রমপ্রসারণশীল জাতিপুঞ্জের সাথে সামঞ্জস্যহীন। ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হিসেবে তুরস্ক এমন এক আইনের আওতায় আসলো, যা ইউরোপীয় জাতিগুলোর মধ্যে পূর্বেই বিকাশ লাভ করেছে। ১৮১৫ সনে ইউরোপীয় জোটের সদস্য হিসেবে যোগ দিতে না পারায় তুরস্ক আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পূর্ণাঙ্গরূপে আসতে পারল না। কিন্তু ১৮৫৬ সনের জোটে যোগদান করতে পারায় এ আইনের সুযোগ-সুবিধা তুরস্ক পরিপূর্ণরূপে ভোগ করার অধিকার পেল। (অবশ্য নিজস্ব রাষ্ট্রে বিদেশীদের অধিকার (Capitulatory rights) তখনও বিদ্যমান ছিল; ১৯২৪ সনে এ অধিকার বিলুপ্ত হয়)। ইউরোপীয় শক্তিবর্গ ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তেই এসে পৌছেন এবং ইউরোপীয় জোটে তুরস্কের প্রবেশের অব্যবহিত পূর্বে হোয়েটনের লেখা থেকে এ কথারই নজির মিলে:
"ইউরোপের খৃস্টান জাতিসমূহ এবং এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলমান ও পৌত্তলিক জাতিসমূহের মধ্যে সাম্প্রতিক আদান-প্রদানের ফলে মুসলমান ও পৌত্তলিকগণের মধ্যে নিজেদের বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির পরিবর্তে খৃস্টান জগতের নিয়ম-কানুন গ্রহণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তুরস্ক, ইরান, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রদূত পাঠাবার ও পারস্পরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রদূত আদান-প্রদান করার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ইউরোপের শক্তি-সাম্যের ব্যবস্থায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা ও ঐক্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য হয়েছে। কাজেই এ অধিকার সম্প্রতি ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাথে এ সাম্রাজ্যের সাধারণ নিয়ম-কানুনের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে। ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য খৃস্টান আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এসে গিয়েছে।"
প্যারিস চুক্তির (১৮৫৬) ৭-ধারায় তুরস্কের "ইউরোপীয় আইন ও জোটে" প্রবেশ করা সম্পর্কে যে কথা আছে, তার অর্থ সম্বন্ধে পাশ্চাত্য আইনবিদদের কোন সুস্পষ্ট ধারণা নেই। অধিকাংশ আইনবিদ বলেছেন যে, এ ধারাটির মাধ্যমে তুরস্ক আন্তর্জাতিক আইনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছে। এর দ্বারা শুধু তুরস্ক ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গের মধ্যে স্থান পেয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে শরীক হবার বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন কথা খুব কম আইনবিদই বলেছেন। ধীরে ধীরে উসমানীয় সাম্রাজ্য আন্তর্জাতিক আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু প্যারিসে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাতে কোন রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে থাকার সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়।

ইসলামী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্ন
উসমানীয় সাম্রাজ্যের পক্ষে ইউরোপীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হিসেবে স্থান পাবার বাধা-বিপত্তি আর রইল না। কিন্তু ইসলামকে ইউরোপীয় আইন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার সমস্যাটি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। পশ্চিমের হিতৈষী ও মুসলিম উদারপন্থীগণ বহুদিন ধরে উসমানীয় সুলতানকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও সংগঠনের উপদেশ দিয়ে এসেছেন। তাঁরা মনে করতেন যে, এর ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যে মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে এবং আধুনিক রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে সুলতান তাঁর কর্তব্য সমাধা করতে পারবেন। কিন্তু সুলতান পাশ্চাত্যের নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক কৌশল গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন; কিন্তু তিনি পাশ্চাত্যের আইনের প্রত্যয় ও ধারণা গ্রহণ করতে চাননি। কারণ, তার ফলে মুসলিম আইন ও মুসলিম প্রতিষ্ঠানাদি অনেকখানি পরিবর্তিত হয়ে যাবে বলে তিনি আশংকা করেন। এ সময়ে প্রাদেশিক অভ্যুত্থান, আঞ্চলিক স্বাধীনতার দাবী ও উদারনৈতিক দল কর্তৃক সংস্কারের দাবী অভ্যন্তরীণ সংকটের সৃষ্টি করে। রক্ষণশীলদের সন্তুষ্ট করা যেমন সুলতানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না, তেমনি রুশ আক্রমণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করার জন্য পশ্চিমী হিতৈষীদের পরামর্শও তিনি ফেলে দিতে পারেননি। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক পন্থায় আধুনিকীকরণ করে শক্তিশালী করার গঠনমূলক নীতি মোটামুটিভাবে "তানযিমাত”বা সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। সুলতান ও নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রনীতিকদের কাছে একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সংস্কার সাধন না করলে সাম্রাজ্য ধ্বংস পড়বে।
বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় সুলতান ইতিমধ্যেই কতকগুলো সাধারণ ইসলামী রীতি-নীতির পরিবর্তন করেন ও পশ্চিমী নিয়ম-কানুন গ্রহণ করেন। আধুনিক যুগের গোড়ার দিক থেকেই ইউরোপে স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন পাঠানোর রীতি চলে আসছে। কিন্তু ষষ্ঠদশ শতক পর্যন্ত সুলতানের শুধু বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের প্রতিনিধিদেরই প্রবেশ করতে দেওয়া হত। অষ্টাদশ শতকে সুলতান পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠাবার রীতি স্বীকার করে নেন। ১৭৯২ সনের পর সুলতান নিজেই প্যারিস, লণ্ডন, ভিয়েনা ও বার্লিনে স্থায়ী কূটনৈতিক প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন।
পাশ্চাত্যের রীতি অনুসরণ করে সুলতান দার্দানেলিস ও বসফরাস প্রণালীতে রাশিয়াকে প্রথম অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার দান করেন (কুচুক কাইনারজা চুক্তি, ১৭৭৪)। এরপর অন্যান্য শক্তিবর্গও এ অধিকার লাভ করে। প্রথমতঃ, বাণিজ্য জাহাজকেই এ অধিকার দেয়া হয়; কিন্তু পরে এ নিয়ম শিথিল করা হয়। ক্রমে ক্রমে অস্ট্রিয়া (১৭৮৪), ইংল্যান্ড (১৭৯৯), ফ্রান্স (১৮০২) ও প্রুশিয়া (১৮০৬) এ অধিকার লাভ করে। দার্দানেলিস ও বসফরাস প্রণালীতে বিদেশী যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করতে না দেয়া উসমানীয় শাসকদের প্রাচীন রীতি। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে কূটনৈতিক চাপের ফলে সুলতান এ অধিকার দিতে স্বীকৃত হন।
পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের চাপে খৃস্টান প্রজাদের অবস্থার উন্নয়নের ব্যাপারে উসমানীয় শাসনে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। খৃস্টান প্রজাদের 'রা'য়া' বলা হত ('জিম্মী'র বদলে 'রা'য়া ব্যবহৃত হত)। ফ্রান্স (১৭৪০), রাশিয়া (১৭৭৪) ও অন্যান্য রাষ্ট্র এ প্রজাদের রক্ষাকবচের অধিকার পায়। মহান সুলতানের দরবারে এদের অবস্থা সম্বন্ধে অবহিত করার ক্ষমতাও তাদের দেয়া হয়। "তানযিমাত" ফরমানের মধ্যে এসব দাবী দাওয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 'খত-ই-শরীফ-গুলখানা' (৩ নভেম্বর, ১৮৩৯) থেকে শুরু করে অন্যান্য আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ নীতি রূপায়িত হয়। পরিশেষে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ এ সব অধিকারের চূড়ান্ত স্বীকৃতি দান করে একটি রাষ্ট্রীয় সনদে এগুলোকে সংযোজিত করেন (২৩ ডিসেম্বর, ১৮৭৬)। এ সব রাষ্ট্রীয় বিধানের মধ্যে বিবিধ আইনগত সংস্কারের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তানযিমাত বিধানসমূহ কিংবা ক্ষণস্থায়ী 'মিধাত-গঠনতন্ত্র' (১৮৭৬) কার্যকরী করা যায়নি। পাশ্চাত্য আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি গতানুগতিক ইসলামপন্থীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে এসব সংস্কার আন্দোলন টিকে থাকতে পারেনি।
পাশ্চাত্যের নিয়ম-কানুন গ্রহণ করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সংস্কার সাধন সম্ভব হল না। কারণ, ইসলামের নামে সুলতানের স্বৈরাচারী শাসন চালানোর বিরুদ্ধে অনেক মুসলিম চিন্তানায়ক অধৈর্য হয়ে উঠলেন এবং তাঁরা মুসলিম রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে লাগলেন। হামিদীয় আমলের (১৮৭৬-১৯০৯) শেষ নাগাদ নতুন যুব সম্প্রদায় পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন। এঁরা আশা করছিলেন যে, পাশ্চাত্যের ভাবধারা গ্রহণ করলে উসমানীয় রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উদারপন্থীগণ বলতে লাগলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ধর্ম অচল হয়ে গেছে এবং জাতীয়তাবাদই কেবল এর ভিত্তি হতে পারে। এ আন্দোলন গোপনে দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলনকারীরা সুলতান আবদুল হামিদকে ১৮৭৬ সনের অস্থায়ী শাসনতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য করেন। সুলতান আবদুল হামিদের সিংহাসনচ্যুতির (১৯০৯) সঙ্গে সঙ্গে প্যান ইসলামী যুগের অবসান হয়। "নব্য-তুর্কী দলের" (Young Turks) নতুন শাসনে জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং মন্ত্রিসভা কর্তৃক পরিচালিত দায়িত্বশীল সরকারের হাতে ক্ষমতা প্রদান করা হয় ও আইনসভা কর্তৃক আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা হয়। এ কথাও ঘোষণা করা হয় যে, ধর্মের ভিত্তিতে কোন পার্থক্য নির্দেশ করা চলবে না এবং আইনের চোখে সব নাগরিকই স্বাধীন ও সমান বলে বিবেচিত হবে।
ইসলামী রাষ্ট্র থেকে জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তিতে এই পরিবর্তন ইসলামী আইনের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করে। কারণ, জাতীয়তাবাদ পশ্চিমী চিন্তাধারা থেকে জন্ম নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্ম দেয় এবং জাতিই যে ক্ষমতার উৎস এ নীতির প্রবর্তন করে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়তের একাধিপত্য লোপ পায়। কিন্তু এ পর্যায়ে ধর্মীয় ক্ষমতা থেকে লোকায়ত ক্ষমতা আলাদা করার কোন চেষ্টা করা হয়নি। আইন ও ক্ষমতা সম্পর্কে ভাবধারার সাথে ইসলামের সমন্বয় সাধনের বিষয়টি গভীরভারে পর্যালোচনাও করা হয়নি।
ধর্মীয় ভিত্তি পরিত্যাগ করে জাতীয় ভিত্তি গ্রহণ করায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসের সূত্রপাত হল। উসমানীয় শাসনে দারুল ইসলামে এক সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে উঠেছিল। জাতীয়তাবাদ এ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা ত-দূরের কথা, তাকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে ফেলে। দারুল ইসলামের বিচ্ছিন্নতা আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, জাতীয়তাবাদ একে আরো ত্বরান্বিত করে দেয়। জাতীয়তাবাদের প্রভাবে নতুন রাষ্ট্রগুলোও আইনের ভিত্তিরূপে ইসলামকে পরিত্যাগ করল। তুরস্ক যেমন সম্পূর্ণভাবে শরিয়ত থেকে দূরে চলে গেল, তেমনি আরবীয় উপদ্বীপে শরিয়ত একই অবস্থায় রয়ে গেল। উর্বর হেলালী দেশগুলো (সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ইরাক ও ফিলিস্তিন) ও মিসর ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গণ্য করে ইসলামের প্রতি মৌখিক আনুগত্য জানিয়ে একটা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। একই সঙ্গে এরা জাতীয় সরকার গঠন করে এবং বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে। বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আওতায় এসব রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে জাতিপুঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

আইন ও রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষকরণ
প্রথম মহাযুদ্ধের পূর্বেই আইন ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ভাবধারা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু মুসলিম আইন সংশোধনের বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলোপ সাধনের কোন চেষ্টাই করা হয়নি। প্রথম মহাযুদ্ধের পর উসমানী সামাজ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং এর ফলে এক নব যুগের সূচনা হয়। তুরস্কে ও অন্যান্য নতুন রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদের বিজয় নিশান উড়তে থাকে ও মুসলিম জগত "খিলাফত" সমস্যার সম্মুখীন হয়। মুসলমানরা ক্ষমতার ধর্মনিরপেক্ষকরণ পদ্ধতি গ্রহণ বা বর্জন করবে, এ মৌলিক প্রশ্ন খিলাফতের সঙ্গেই জড়িত ছিল।
গোড়ার দিকে কামালপন্থী সংস্কারবাদীগণ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আলাদা করার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদকে (Grand National Assembly) দেয়া হয় এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা খলিফার হাতেই থাকে। ১৯২৩ সালে সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদ কর্তৃক "খিলাফত ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব" নাম দিয়ে যে পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়, তাতে বলা হয়েছে যে, সত্যিকার খিলাফত খোলাফায়ে রাশেদার পর বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং পরে উমাইয়াগণ একে বাদশাহীতে পর্যবসিত করে। তাই, এক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদের কার্যক্রমের মধ্যে নতুন কিছু নেই। কারণ, কয়েক শতাব্দী ধরে খলিফাগণ সত্যিকার খলিফার গুণগত বৈশিষ্ট্য বর্জন করেন। তাছাড়া, (এ পুস্তিকার যুক্তি অনুসারে) আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পার্থক্য নির্দেশ একটা হাদিস থেকেও সমর্থিত হতে পারে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলে গেছেন যে, তাঁর ওফাতের পর খিলাফত মাত্র ত্রিশ বছর বহাল থাকবে; তারপর শুরু হবে বাদশাহী শাসন। নাসাফী এ হাদিসটির উল্লেখ করেছেন। কাজেই নব্য তুরস্ক গতানুগতিক খিলাফত জিইয়ে রাখার কোন আইনসঙ্গত বিধান খুঁজে পায়নি। রক্ষণশীলগণ এ ব্যাখ্যায় খুশী হতে পারেননি। তাই, তাঁরা কামালপন্থী সংস্কারপন্থীদের ঘোর সমালোচনা করতে থাকেন। অবশ্য খলিফা ঘোষণা করেন যে, তিনি রাজনৈতিক ব্যাপারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবেন না। ফলে সর্বোচ্চ জাতীয় পরিষদ এক বৈপ্লবিক নীতি গ্রহণ করে খিলাফত বিলুপ্ত করে (১৯২৪); আর এর সঙ্গে সঙ্গে শরিয়তের বিধানও উঠে যায়। এভাবে তুরস্ক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
তুরস্কের কর্মপন্থা মেনে নেয়া হবে, না নতুন খলিফা নিয়োগ করা হবে, এ প্রশ্নের সুষ্ঠু মীমাংসার জন্য অন্যান্য দেশের মুসলমানগণ, এককভাবে তুরস্ক কর্তৃক খিলাফতের বিলোপ সাধনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। এ ব্যাপারে ১৯২৬ সনের মে মাসে কায়রোতে একটি 'খিলাফত সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয় এবং ইসলামে খেলাফতের প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে একটা প্রস্তাব পাশ করা হয়। কিন্তু এ প্রস্তাব রূপায়ণের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। মক্কা (১৯২৬) ও জেরুযালেমেও (১৯৩১) আরও দুটো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু খিলাফতের প্রশ্নটি সম্বন্ধে কোন আলোচনা আর হল না। বোধহয়, সমস্যাটি তখন পুরানো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টির ভবিষ্যতে আর কোন গুরুত্ব নেই মনে করলে ভুল হবে।
খিলাফতের বিলোপ সাধনে ইসলামী রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষকরণ করা হবে কিনা এ প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়ায়। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মিসরের শরিয়ত আদালতের বিচারক শেখ আলী আবদুর রাযিকের 'ইসলাম ও রাষ্ট্রনীতি' (ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকম) বইখানা এ প্রসঙ্গেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সমর্থন ও খিলাফতের বিলোপ সাধনের স্বপক্ষে আবদুর রাযিক বলেন যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইসলামকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলে মনে করতেন না। অবশ্য রাসূল (সঃ) রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তব্য পালন করে গেছেন। কিন্তু নবী হিসেবে তাঁর ধর্মীয় কার্যধারা এসব কাজ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। আল-কোরআন, হাদিস ও ইজমায় খিলাফতের ভিত্তি নিহিত রয়েছে বলে যে মতবাদ আছে, তিনি তা নস্যাৎ করে দেন। তিনি বলেন যে, খিলাফত সম্পর্কে বহু বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রমাণ্য-সূত্রে এর কোন মীমাংসা হয়নি। কাজেই ধর্মের সঙ্গে খিলাফত জুড়ে রাখা ও এর বিলোপ না করার যৌক্তিকতা তিনি অস্বীকার করতেন। কারণ, রাজনৈতিক কারণেই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। আবদুর রাযিকের মতবাদের তাৎপর্য এই যে, এর ফলে শরীয়তের সীমার বাইরে আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপ্রধান বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করার ক্ষমতা লাভ করেন। এ ব্যাখ্যা যে কেবল কামালপন্থীদের কার্যধারাকে সমর্থন জানিয়েছে তাই নয়, যে দেশের (মিসর) আলেমদের "নিয়ন্ত্রণ পরিষদ" তাঁর মতবাদকে অগ্রাহ্য করেছে তার বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার সমর্থনও এর মধ্যে পাওয়া যাবে। আবদুর রাযিকের মতবাদ আলেমগণ নস্যাৎ করে দিয়েছেন ও তাঁর নাম ওলামা পর্যায় থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য, তখন এর বিরুদ্ধে কোন গঠনমূলক সমালোচনা করা হয়নি।
আবদুর রাযিকের মতবাদ নিয়ে বাকবিতণ্ডা কালে এক নব্য মিসরীয় যুবক প্যারিসে আইন পড়তেন। তিনি তাঁর ডক্টরেটের বিষয় হিসেবে "খিলাফত: প্রাচ্যদেশীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের দিকে এর ক্রমোন্নয়ন" (The Caliphate : Its Development Toward an Oriental League of Nations) গ্রহণ করেন। ইনি হলেন ড. সানহুরী। রাজনৈতিক ক্ষমতা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়, আবদুর রাযিকের এ মতবাদ ড. সানহুরী খণ্ডন করেছেন। আধুনিক জীবনধারার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম আইন বিবর্তিত হতে পারে না বলে তিনি মনে করেন না। পূর্বেও খিলাফতের বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বিবর্তিত হয়ে তা প্রাচ্যদেশীয় জাতিপুঞ্জে রূপান্তরিত হতে পারে। ইসলাম থেবে রাজনৈতিক ক্ষমতা আলাদা করা সম্পর্কে তিনি আবদুর রাযিকের মতের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভিত্তি মেনে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক সমাজে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পূর্ণ ভূমিকা তিনি স্বীকার করেছেন।
তুরস্কের মত সর্বাঙ্গীন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে শুরু করে আরবীয় উপদ্বীপের মত শরিয়তপন্থী রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রই তাঁদের বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী মেনে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জাতিপুঞ্জ (The League of Nations) ও সম্মিলিতজাতিপুঞ্জ তাদের প্রত্যক্ষভাবে যোগদানের ফলে দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের শান্তিমূলক সম-অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে দু'জন মুসলিম আইনবিদের নিয়োগের ফলে সমগ্র মুসলিম জগতে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। মুসলিম দেশগুলো আন্তর্জাতিক কমিশনগুলোতে কাজ করার অদম্য স্পৃহা দেখিয়েছে। এর দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয়েছে যে, মুসলমানগণ বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ মেনে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সমাজে একত্রিত হতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এমন কি যে সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ধর্মনিরপেক্ষকরণের বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাও ইসলামের বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে গতানুগতিক মুসলিম আইন থেকে অনেকখানি দূরে সরে গেছেন।

উপসংহার
রক্ষণশীলদের বিরোধিতা সত্ত্বেও আইন ও ক্ষমতার ধর্মনিরপেক্ষকরণ এগিয়ে চলেছে। তবু কয়েকজন মধ্যমপন্থী চিন্তানায়ক তাঁদের জীবদ্দশায় যে সব বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে, সে সম্বন্ধে পর্যালোচনা করেছেন। নিজেদের গৌরবময় অতীতের দিকে ফিরে তাকানো দোষণীয় নয়। কারণ, এতে মানসিক অসুস্থতা দূর হয় ও ভবিষ্যতে নব উদ্যমে কাজ করার যথেষ্ট উদ্দীপনা পাওয়া যায়। কোন কোন আধুনিক লেখক পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা ও রীতি-নীতি গ্রহণ করার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন। কারণ, এর ফলে জাতীয় ঐতিহ্য, বর্তমান পরিবেশ ও অবস্থার দিকে মোটেই খেয়াল করা হয় না। পাশ্চাত্য প্রভাবের ফলে যে ফল পাওয়া গেছে, তা আশানুরূপ হয়নি। তাই এ চিন্তাধারা আরও জোরদার হয়েছে। অনেক সমালোচক পাশ্চাত্যের প্রভাবের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে তৎপর হয়েছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন নতুন সামাজিক পরিবেশ পাশ্চাত্যের চিন্তাধারা পত্তন করলে, তা পাশ্চাত্য দেশের মত ফলপ্রসূ না হবার সম্ভাবনাই বেশী। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্ষেত্রে এঁরা মুসলিম দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের অনুপ্রবেশ ও পৃথিবীতে ইসলামের মর্যাদার অবনতির কথাও বলেন। কারণ, জাতীয় ভিত্তিতে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে এদের সংহতি বিনষ্ট হয়েছে ও কূটনৈতিক ব্যাপারে এরা যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি।
আধুনিক জগতে বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ায় ইসলামের সম্ভাব্য অবদান সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তাধারা দানা বেঁধে উঠেছে। এ চিন্তাধারাকে 'নব প্যান' ইসলামবাদ বলা চলে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ চিন্তাধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে দেখা যায় যে, ১৯৫০ সালের সিরীয় গঠনতন্ত্রে (১৯৫৩ সনের রূপান্তরিত গঠনতন্ত্রেও পুনরায় একথা উল্লেখ করা হয়েছে) এবং সিরিয়া, মিসর ও ইরাকের দেওয়ানী আইন বিধিতে শরিয়ত আইনের উৎস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এসব বিষয়ে এ ভাবধারাই বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এ গঠনতন্ত্র ও আইনবিধি রচনার সময় ড. সানহুরীর বই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৯৫৩ সালে ২ নভেম্বর তারিখে পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এমন কি, তুরস্কও বর্তমানে ধর্মের বিরুদ্ধে বিধি নিষেধ শিথিল করেছে। ফলে ইসলামী পুনর্গঠনের অনুকূলে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইসলামী সম্মেলনে মুসলিম রাজনীতিকদের সফর বিনিময় ও আঞ্চলিক চুক্তি সম্পাদনে এক পূণর্জাগরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমাজে মুসলিম জোট হিসেবে সহযোগিতা করার বাসনা আজ সুপরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অবশ্য এটা ভাল করেই বুঝতে পেরেছেন যে, বর্তমানে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক নীতি অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে ধর্মীয় পরিবেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এবং তা জীবনের পরিবর্তিত পরিবেশে ইসলামের নিজস্ব কল্যাণ-পথের দিশারী হয়েছে।
পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলমানগণ দেখাতে চেয়েছেন যে, ইসলামী ও খৃস্টান জাতিগুলোর পারস্পরিক তাগিদে শরিয়ত আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের বিবর্তনে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00