📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 বাণিজ্যিক সম্পর্ক

📄 বাণিজ্যিক সম্পর্ক


ইসলাম বা ব্যবসা-বাণিজ্য

ইসলাম এমন একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা, যার মধ্যে জাগতিক ও পারত্রিক উভয়বিধ মূল্যবোধেরই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বাসী মুসলমানকে দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করতে বলা হয়েছে যেন তিনি চিরকালই জীবিত থাকবেন; আবার সঙ্গে তাকে এমনভাবে নাজাত বা পারলৌকিক মুক্তির জন্য কাজ করে যেতে হবে যেন আগামীকাল তার মৃত্যুর দিন। আইনে অবশ্য পারত্রিক মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। পারত্রিক জীবনকে অস্বীকার করে ইহকালের জন্য কাজ করা ইসলামে অনুমোদিত হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারা বা তিজারাত) এমন একটি বৃত্তি, যা আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হলে, ধর্মীয় কর্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুনিয়াতে তা অনেক কল্যাণ সাধন করতে পারবে।

যে পরিবেশে ইসলামের উন্মেষ সাধিত হয়, তা' বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খুব প্রসিদ্ধ ছিল এবং ব্যবসায়ী হিসেবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক জীবনের অভিজ্ঞতা খোদার বাণীর মধ্যেও প্রতিভাত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আল-কোরআনে যে কেবল নিয়ামত অন্বেষণকারীদের জন্যে সমর্থিত হয়েছে তা' নয়, বস্তুতঃ ধর্মীয় ভাবধারা প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সংজ্ঞা ও শব্দাবলী ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে আগাগোড়া বাণিজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির স্বর্ণযুগে ব্যবসায়ীগণই সমাজের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রসার এবং সমৃদ্ধি সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। যদিও ব্যবসায়ীগণ সাধারণভাবে রাষ্ট্র-নীতিকে বড় একটা প্রভাবিত করতে পারেননি, তবু আইনবেত্তা ইমাম আবু হানিফার মত ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত ব্যক্তিগণের প্রভাব অনেক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের চাইতে বেশী ছিল। আরব দেশে প্রাক-ইসলামী যুগে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদানের রীতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে।

দারুল ইসলামের বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সব আইনবিদই স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থাৎ দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যে পণ্য-বিনিময়ের ব্যবস্থা অনুমোদন করেননি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, মালিকী আইনবিদগণ স্থল কিংবা সমুদ্রপথে দারুল হারবের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্য করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম মালিক অমুসলিমদের দারুল ইসলামে এসে مسلمانوں সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু মুসলমানরা দারুল হারবে গিয়ে ব্যবসা করুক, এটা তিনি অনুমোদন করেননি। এর কারণ এই যে, ইমাম মালিক মুসলিমের পক্ষে এমন দেশে অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত মনে করেননি, যেখানকার লোকেরা পূর্ব পুরুষদের সম্মান করে না, মূর্তি পূজা করে এবং তাদের দেবদেবীকে বিশ্বপালক রাহমানুররাহীম আল্লাহর শরীক করে। অবশ্য অন্যান্য মযহাবের আইনবিদগণ দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে অমুসলমানদের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তবে তাঁরা ব্যবসায়ের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট লোকজন ও পণ্য-দ্রব্যের চলাচলের ওপরে কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিমদের ব্যবসা-বাণিজ্য

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের নিকট দারুল ইসলামের দ্বার উন্মোচন করে মুসলিম শাসকগণ সত্যিই অভূতপূর্ব ঔদার্য প্রদর্শন করেছেন। সাধারণতঃ, নীতিগতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম ব্যবসায়ীগণকে চার মাসের জন্য আমান (নিরাপত্তা) প্রদান করা হত। পণ্য দ্রব্যাদির আদান-প্রদান যদি এই সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হত, তবে সময় বর্ধিত করে নতুন আমান প্রদান করা হত। যদি কোন ব্যবসায়ী কমপক্ষে এক বছর দারুল ইসলামে অবস্থান করত ও জিম্মী হিসেবে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হত, তবে সাধারণতঃ তাকে কতিপয় সুবিধা দেয়া হত। মুস্তামিন হিসেবে সে দারুল ইসলামে অবাধে চলাফেরা করতে পারত; কেবলমাত্র বায়তুল হারাম বা হেজাযের পবিত্র স্থানসমূহে যাতায়াত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।

পণ্যদ্রব্যাদির অবাধ আদান-প্রদানের ব্যাপারে আইনবিদগণ বিদেশী ব্যবসায়ীদের ওপর কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য ইমামকে উপদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাধারণ নীতি হল এই যে, দারুল ইসলামের সঙ্গে দারুল হারবের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় দারুল ইসলাম থেকে দারুল হারবে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি রফতানী করা চলে না; কারণ, এতে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সব আইনবিদই এ সম্বন্ধে একমত যে, অস্ত্রশস্ত্র ও সমর-সম্ভার যুদ্ধকালীন নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য বলে বিবেচিত হবে। তাই, এগুলোর বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে বেআইনী ঘোষিত হয়। তবে অনেকে এই মতও পোষণ করেন যে ঘোড়া, খচ্চর ও দাসদাসী যুদ্ধে এত অধিক প্রয়োজনীয় যে, এগুলোর বিক্রয়ও নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে ইমাম মালিক আরও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি কতিপয় খাদ্যজাত পণ্য এবং পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের বিক্রয়ের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিদেশী ব্যবসায়ী দারুল ইসলামে অবস্থানকালে যদি অনুরূপ কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ক্রয় করতে চান, তবে তার নিকট সেগুলোর বিক্রয় অবৈধ বলে গণ্য হয় না; কিন্তু দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করার পূর্বে তাকে সেগুলো পুনরায় বিক্রয় করে যেতে হবে। বিদেশী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী ও নিষিদ্ধ দ্রব্যের রফতানী বন্ধ করার জন্য আইনবেত্তা আবু ইউসুফ দারুল ইসলামের সীমান্তে তল্লাশী ঘাঁটি ও প্রহরা-কেন্দ্রসমূহ (মাসালিহ) স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। অবশ্য, বিদেশী সওদাগরকে শূকরের গোশত, মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্য বিক্রয় করার অনুমতি দেয়া হয় না। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এ সব নিয়ম খুব কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা যায়নি; ফলে অনেক সময় দারুল ইসলাম থেকে জিনিসপত্রের রফতানী ও দারুল হারব থেকে জিনিসপত্রের আমদানী অবাধে চলতে থাকে।

দারুল ইসলামে দু'শ দিরহামের অধিক পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করলে বিদেশী ব্যবসায়ীকে সব পণ্যদ্রব্যের ওপর শতকরা দশভাগ পণ্যশুল্ক (উশর) দিতে হত। ইমাম অবশ্য বহির্বাণিজ্যের প্রসারের জন্য শুল্কের হার কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা সরকারী আয় বাড়াবার জন্য তিনি শুল্কের হার বাড়িয়েও দিতে পারেন; কিন্তু বছরে একবারের বেশী এ শুল্ক আদায় হত না। যদি কোন বিদেশী সওদাগরের নিজ দেশে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ বিনা শুল্কে ব্যবসায়ের সুযোগ পেতেন, তবে ইমামও অনুরূপভাবে অবাধ ব্যবসায়ের নীতি অনুসরণ করতেন। ব্যবসায়ের জন্য ইমামের অধীনস্থ জিম্মীদের কোন বাণিজ্য-শুল্ক দিতে হত না; তবে কেবলমাত্র হেজাযে ব্যবসায়ের জন্য জিম্মীদের অনুরূপ শুল্ক দিতে হত।

দারুল হারবের সঙ্গে মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য

মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে ব্যবসায়ের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদগণ অপেক্ষাকৃত কম উদারতা দেখিয়েছেন; কিন্তু দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিম ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা দানের ব্যাপারে তাঁরা অধিকতর ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছেন। মালিকী ও যাহিরী আইনবিদগণ মুসলমানদের পক্ষে দারুল হারবে যাওয়া পছন্দ করেননি; কারণ, এর ফলে তারা পৌত্তলিকতা ও দারুল হারবের আইনের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন। ইবনে হাযম এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জেহাদের উদ্দেশ্য কিংবা রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে দৌত্য বা বাণী নিয়ে যাবার জন্য কেবল ইমাম দারুল হারবে গমনের অনুমতি দিবেন। ইমাম মালিক বলেন যে, দারুল ইসলামের সীমান্তে পরিব্রাজকদের গমনাগমন এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে যাওয়ার ব্যাপারেও ইমাম কড়া নজর রাখবেন।

তবে অধিকাংশ আইনবিদই বিশেষ করে হানাফীগণ এ ব্যাপারে অনেক বেশী উদারতা দেখিছেন। হানাফীগণ ধর্মাধর্ম পদ্ধতি (আল-হিয়াল আশ-শারিয়া) দ্বারা অনেকগুলো বিধিনিষেধ অতিক্রম করেছেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ের মুসলিম আইনবেত্তাগণ এই সব বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন, যেগুলো এখনও বিদ্যমান আছে। বিদেশ হতে কি ধরনের পণ্যদ্রব্য আমদানী করা যাবে এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে দ্রব্য বিনিময়কালে কি পর্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি হবে, আর ইসলামী রাষ্ট্র কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে, তা' তারা বিশদভাবে বিবৃত করেছেন।

দারুল ইসলামের ব্যবসায়ের বিধি অনুযায়ী মুসলমানদের শূকরের গোশত ও মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্যের ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা করতে দেয়া হয় না। যে সব পশু ও উদ্ভিদ যথাক্রমে নোংরা ও ক্ষতিকর, সেগুলোর ব্যবসা থেকেও তাদের বিরত থাকতে হবে; কোন কোন আইনবিদ এই শ্রেণীর বিলাস-উপকরণ ও প্রমোদ জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যবসায় না করার পক্ষে মত প্রকশ করেছেন, যেমন হাতীর দাঁত, পুতুল ও বাদ্য-যন্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক, উন্মাদ, অন্ধ ও দাসদের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসায়ে লিপ্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও উন্মাদের কোন কিছু বিক্রয়ের আইনানুগ যোগ্যতা নেই। সম্পত্তি দেখতে না পেলে সাধারণ ক্ষেত্রে বিক্রয় অসম্ভব; তাই অন্ধ ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অবশ্য, তার পক্ষ থেকে অন্য কোন ব্যক্তি তা বিক্রয় করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দাসরা তাদের মালিকের সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে এ অধিকার লাভ করেনি।

যে কারণে অমুসলিমকে তার নিজের দেশে (দারুল হারবে) নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে যেতে দেয়া হয় না, ঠিক সেই কারণেই কোন মুসলমান ব্যবসায়ীকে নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করারও অনুমতি দেয়া হয় না। মুসলিম সওদাগরকে সাবী (গানিমা হিসেবে প্রাপ্ত মহিলা ও শিশু) এবং লোহা বা লৌহজাত দ্রব্য ও যুদ্ধের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দারুল হারবে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য যদি মুসলিম ব্যবসায়ী তার সঙ্গে দাস-দাসী ও অস্ত্রশস্ত্র বহন করেন এবং দারুল ইসলামে ফিরে আসার সময় যদি তিনি নিশ্চিতভাবে এগুলো তার সঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন, তবেই এসব নিয়ে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরে যেতে দেয়া হয়।

আমান সহ কিংবা আমান ব্যতিরেকে যেইভাবেই হোক, কোন মুসলিম সওদাগর দারুল হারবে পর্যটন বা অবস্থান করলে তাকে দারুল হারবের আইন ছাড়াও নিজ ধর্মের আইন পালন করতে হবে। অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম-মুস্তামিনের ওপর যে সব বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, তাকে তা পালন করতে হবে। যদি তিনি সেখানে অবস্থানকালে অন্য মুসলমানদের ওপরে কোন অন্যায় করেন, তবে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম মুস্তামিন বিদেশী সরকারকে শুল্ক দিতে পারেন; কিন্তু দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তার ওপর অনুরূপ ধরনের কোন শুল্ক ধার্য করা যাবে না। তবে অন্যান্য مسلمانوں মত সাধারণভাবে তাকেও দারুল হারবে অর্জিত অর্থ সহ তার মোট আয় অনুপাতে কর দিতে হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের তাৎপর্য

আইনবিদগণ কর্তৃক مسلمانوں দারুল হারবে যাতায়াত কিংবা ভ্রমণের ফলে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশংকা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে অমুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যই ইসলামের ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিরাট মাধ্যমরূপে কাজ করেছে। বস্তুতঃ, এর ফলেই মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকা ও বিষুবীয় আফ্রিকায় বাণিজ্যপথ ধরে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমেই ইসলাম-জগত সামরিক বিজয় লব্ধ রাজনৈতিক সীমানার বাইরে বহু দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের আত্ম-প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। হেনরী পিরিনের মতে, সম্ভবতঃ খৃস্টান রাষ্ট্রগুলো ইসলামের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে অসম্মত হয় বলেই ইউরোপের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়; ইসলামী-রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাকৃত নীতির ফলে এ সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এর ফলে মুসলিম বাণিজ্য বিভিন্ন পথ ধরে অগ্রসর হয় এবং ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের বিপুল সমৃদ্ধি সাধিত হয়। ক্রুসেড যুদ্ধের আমলে ইউরোপের সঙ্গে আবার লেবাননের বাণিজ্য শুরু হয়। কিন্তু পরে ভারত ও দূরপ্রাচ্যে পৌছার জন্য উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ সম্পর্ক পুনরায় ছিন্ন হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল অবধি ইউরোপের সঙ্গে সিরিয়া ও লেবাননের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক রকম বন্ধ ছিল। এই শতকে মুসলিম-রাষ্ট্র ও খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নব পর্যায়ে উন্নীত হয়।

স্থল ও সমুদ্র উভয় পথেই বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসা- বাণিজ্য অব্যাহত থাকে। বহির্বিশ্বের সাথে ইসলামের এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের দরুন বিশ্ববাণিজ্যের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কতিপয় বিশেষ রীতিনীতি ও বিধিব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব হয়।

মুসলমানরা কেবলমাত্র পূর্ব এশিয়া থেকে নতুন নতুন পণ্য-সামগ্রীই (যেগুলো পরে ইউরোপে চালু হয়) আমদানী করেনি, অধিকন্তু তারা চীনাদের নিকট হতে কাগজী মুদ্রার ব্যবহার-প্রণালী আয়ত্ত করে পরে অন্যান্য দেশে এর প্রচলনে সাহায্য করে।

ব্যাংকিং পদ্ধতির উন্নয়নেও مسلمانوں ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম ব্যাঙ্ক- বিশেষজ্ঞদেরই চেক, ঋণপত্র ও হুণ্ডির ব্যবহারকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন। বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্র (যেমন—বসরা) থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় যাতায়াত করতেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কিভাবে একটি বাণিজ্য-প্রধান নগরের ব্যবসায়ীরা তখনকার দিনে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে বহু দূরবর্তী প্রান্তে স্বচ্ছন্দে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করতে পারতেন।

ইসলাম বা ব্যবসা-বাণিজ্য

ইসলাম এমন একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা, যার মধ্যে জাগতিক ও পারত্রিক উভয়বিধ মূল্যবোধেরই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বাসী মুসলমানকে দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করতে বলা হয়েছে যেন তিনি চিরকালই জীবিত থাকবেন; আবার সঙ্গে তাকে এমনভাবে নাজাত বা পারলৌকিক মুক্তির জন্য কাজ করে যেতে হবে যেন আগামীকাল তার মৃত্যুর দিন। আইনে অবশ্য পারত্রিক মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। পারত্রিক জীবনকে অস্বীকার করে ইহকালের জন্য কাজ করা ইসলামে অনুমোদিত হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারা বা তিজারাত) এমন একটি বৃত্তি, যা আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হলে, ধর্মীয় কর্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুনিয়াতে তা অনেক কল্যাণ সাধন করতে পারবে।

যে পরিবেশে ইসলামের উন্মেষ সাধিত হয়, তা' বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খুব প্রসিদ্ধ ছিল এবং ব্যবসায়ী হিসেবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক জীবনের অভিজ্ঞতা খোদার বাণীর মধ্যেও প্রতিভাত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আল-কোরআনে যে কেবল নিয়ামত অন্বেষণকারীদের জন্যে সমর্থিত হয়েছে তা' নয়, বস্তুতঃ ধর্মীয় ভাবধারা প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সংজ্ঞা ও শব্দাবলী ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে আগাগোড়া বাণিজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির স্বর্ণযুগে ব্যবসায়ীগণই সমাজের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রসার এবং সমৃদ্ধি সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। যদিও ব্যবসায়ীগণ সাধারণভাবে রাষ্ট্র-নীতিকে বড় একটা প্রভাবিত করতে পারেননি, তবু আইনবেত্তা ইমাম আবু হানিফার মত ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত ব্যক্তিগণের প্রভাব অনেক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের চাইতে বেশী ছিল। আরব দেশে প্রাক-ইসলামী যুগে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদানের রীতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে।

দারুল ইসলামের বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সব আইনবিদই স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থাৎ দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যে পণ্য-বিনিময়ের ব্যবস্থা অনুমোদন করেননি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, মালিকী আইনবিদগণ স্থল কিংবা সমুদ্রপথে দারুল হারবের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্য করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম মালিক অমুসলিমদের দারুল ইসলামে এসে مسلمانوں সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু মুসলমানরা দারুল হারবে গিয়ে ব্যবসা করুক, এটা তিনি অনুমোদন করেননি। এর কারণ এই যে, ইমাম মালিক মুসলিমের পক্ষে এমন দেশে অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত মনে করেননি, যেখানকার লোকেরা পূর্ব পুরুষদের সম্মান করে না, মূর্তি পূজা করে এবং তাদের দেবদেবীকে বিশ্বপালক রাহমানুররাহীম আল্লাহর শরীক করে। অবশ্য অন্যান্য মযহাবের আইনবিদগণ দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে অমুসলমানদের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তবে তাঁরা ব্যবসায়ের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট লোকজন ও পণ্য-দ্রব্যের চলাচলের ওপরে কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিমদের ব্যবসা-বাণিজ্য

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের নিকট দারুল ইসলামের দ্বার উন্মোচন করে মুসলিম শাসকগণ সত্যিই অভূতপূর্ব ঔদার্য প্রদর্শন করেছেন। সাধারণতঃ, নীতিগতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম ব্যবসায়ীগণকে চার মাসের জন্য আমান (নিরাপত্তা) প্রদান করা হত। পণ্য দ্রব্যাদির আদান-প্রদান যদি এই সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হত, তবে সময় বর্ধিত করে নতুন আমান প্রদান করা হত। যদি কোন ব্যবসায়ী কমপক্ষে এক বছর দারুল ইসলামে অবস্থান করত ও জিম্মী হিসেবে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হত, তবে সাধারণতঃ তাকে কতিপয় সুবিধা দেয়া হত। মুস্তামিন হিসেবে সে দারুল ইসলামে অবাধে চলাফেরা করতে পারত; কেবলমাত্র বায়তুল হারাম বা হেজাযের পবিত্র স্থানসমূহে যাতায়াত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।

পণ্যদ্রব্যাদির অবাধ আদান-প্রদানের ব্যাপারে আইনবিদগণ বিদেশী ব্যবসায়ীদের ওপর কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য ইমামকে উপদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাধারণ নীতি হল এই যে, দারুল ইসলামের সঙ্গে দারুল হারবের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় দারুল ইসলাম থেকে দারুল হারবে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি রফতানী করা চলে না; কারণ, এতে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সব আইনবিদই এ সম্বন্ধে একমত যে, অস্ত্রশস্ত্র ও সমর-সম্ভার যুদ্ধকালীন নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য বলে বিবেচিত হবে। তাই, এগুলোর বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে বেআইনী ঘোষিত হয়। তবে অনেকে এই মতও পোষণ করেন যে ঘোড়া, খচ্চর ও দাসদাসী যুদ্ধে এত অধিক প্রয়োজনীয় যে, এগুলোর বিক্রয়ও নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে ইমাম মালিক আরও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি কতিপয় খাদ্যজাত পণ্য এবং পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের বিক্রয়ের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিদেশী ব্যবসায়ী দারুল ইসলামে অবস্থানকালে যদি অনুরূপ কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ক্রয় করতে চান, তবে তার নিকট সেগুলোর বিক্রয় অবৈধ বলে গণ্য হয় না; কিন্তু দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করার পূর্বে তাকে সেগুলো পুনরায় বিক্রয় করে যেতে হবে। বিদেশী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী ও নিষিদ্ধ দ্রব্যের রফতানী বন্ধ করার জন্য আইনবেত্তা আবু ইউসুফ দারুল ইসলামের সীমান্তে তল্লাশী ঘাঁটি ও প্রহরা-কেন্দ্রসমূহ (মাসালিহ) স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। অবশ্য, বিদেশী সওদাগরকে শূকরের গোশত, মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্য বিক্রয় করার অনুমতি দেয়া হয় না। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এ সব নিয়ম খুব কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা যায়নি; ফলে অনেক সময় দারুল ইসলাম থেকে জিনিসপত্রের রফতানী ও দারুল হারব থেকে জিনিসপত্রের আমদানী অবাধে চলতে থাকে।

দারুল ইসলামে দু'শ দিরহামের অধিক পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করলে বিদেশী ব্যবসায়ীকে সব পণ্যদ্রব্যের ওপর শতকরা দশভাগ পণ্যশুল্ক (উশর) দিতে হত। ইমাম অবশ্য বহির্বাণিজ্যের প্রসারের জন্য শুল্কের হার কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা সরকারী আয় বাড়াবার জন্য তিনি শুল্কের হার বাড়িয়েও দিতে পারেন; কিন্তু বছরে একবারের বেশী এ শুল্ক আদায় হত না। যদি কোন বিদেশী সওদাগরের নিজ দেশে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ বিনা শুল্কে ব্যবসায়ের সুযোগ পেতেন, তবে ইমামও অনুরূপভাবে অবাধ ব্যবসায়ের নীতি অনুসরণ করতেন। ব্যবসায়ের জন্য ইমামের অধীনস্থ জিম্মীদের কোন বাণিজ্য-শুল্ক দিতে হত না; তবে কেবলমাত্র হেজাযে ব্যবসায়ের জন্য জিম্মীদের অনুরূপ শুল্ক দিতে হত।

দারুল হারবের সঙ্গে মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য

মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে ব্যবসায়ের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদগণ অপেক্ষাকৃত কম উদারতা দেখিয়েছেন; কিন্তু দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিম ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা দানের ব্যাপারে তাঁরা অধিকতর ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছেন। মালিকী ও যাহিরী আইনবিদগণ মুসলমানদের পক্ষে দারুল হারবে যাওয়া পছন্দ করেননি; কারণ, এর ফলে তারা পৌত্তলিকতা ও দারুল হারবের আইনের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন। ইবনে হাযম এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জেহাদের উদ্দেশ্য কিংবা রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে দৌত্য বা বাণী নিয়ে যাবার জন্য কেবল ইমাম দারুল হারবে গমনের অনুমতি দিবেন। ইমাম মালিক বলেন যে, দারুল ইসলামের সীমান্তে পরিব্রাজকদের গমনাগমন এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে যাওয়ার ব্যাপারেও ইমাম কড়া নজর রাখবেন।

তবে অধিকাংশ আইনবিদই বিশেষ করে হানাফীগণ এ ব্যাপারে অনেক বেশী উদারতা দেখিছেন। হানাফীগণ ধর্মাধর্ম পদ্ধতি (আল-হিয়াল আশ-শারিয়া) দ্বারা অনেকগুলো বিধিনিষেধ অতিক্রম করেছেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ের মুসলিম আইনবেত্তাগণ এই সব বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন, যেগুলো এখনও বিদ্যমান আছে। বিদেশ হতে কি ধরনের পণ্যদ্রব্য আমদানী করা যাবে এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে দ্রব্য বিনিময়কালে কি পর্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি হবে, আর ইসলামী রাষ্ট্র কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে, তা' তারা বিশদভাবে বিবৃত করেছেন।

দারুল ইসলামের ব্যবসায়ের বিধি অনুযায়ী মুসলমানদের শূকরের গোশত ও মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্যের ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা করতে দেয়া হয় না। যে সব পশু ও উদ্ভিদ যথাক্রমে নোংরা ও ক্ষতিকর, সেগুলোর ব্যবসা থেকেও তাদের বিরত থাকতে হবে; কোন কোন আইনবিদ এই শ্রেণীর বিলাস-উপকরণ ও প্রমোদ জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যবসায় না করার পক্ষে মত প্রকশ করেছেন, যেমন হাতীর দাঁত, পুতুল ও বাদ্য-যন্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক, উন্মাদ, অন্ধ ও দাসদের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসায়ে লিপ্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও উন্মাদের কোন কিছু বিক্রয়ের আইনানুগ যোগ্যতা নেই। সম্পত্তি দেখতে না পেলে সাধারণ ক্ষেত্রে বিক্রয় অসম্ভব; তাই অন্ধ ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অবশ্য, তার পক্ষ থেকে অন্য কোন ব্যক্তি তা বিক্রয় করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দাসরা তাদের মালিকের সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে এ অধিকার লাভ করেনি।

যে কারণে অমুসলিমকে তার নিজের দেশে (দারুল হারবে) নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে যেতে দেয়া হয় না, ঠিক সেই কারণেই কোন মুসলমান ব্যবসায়ীকে নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করারও অনুমতি দেয়া হয় না। মুসলিম সওদাগরকে সাবী (গানিমা হিসেবে প্রাপ্ত মহিলা ও শিশু) এবং লোহা বা লৌহজাত দ্রব্য ও যুদ্ধের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দারুল হারবে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য যদি মুসলিম ব্যবসায়ী তার সঙ্গে দাস-দাসী ও অস্ত্রশস্ত্র বহন করেন এবং দারুল ইসলামে ফিরে আসার সময় যদি তিনি নিশ্চিতভাবে এগুলো তার সঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন, তবেই এসব নিয়ে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরে যেতে দেয়া হয়।

আমান সহ কিংবা আমান ব্যতিরেকে যেইভাবেই হোক, কোন মুসলিম সওদাগর দারুল হারবে পর্যটন বা অবস্থান করলে তাকে দারুল হারবের আইন ছাড়াও নিজ ধর্মের আইন পালন করতে হবে। অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম-মুস্তামিনের ওপর যে সব বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, তাকে তা পালন করতে হবে। যদি তিনি সেখানে অবস্থানকালে অন্য মুসলমানদের ওপরে কোন অন্যায় করেন, তবে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম মুস্তামিন বিদেশী সরকারকে শুল্ক দিতে পারেন; কিন্তু দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তার ওপর অনুরূপ ধরনের কোন শুল্ক ধার্য করা যাবে না। তবে অন্যান্য مسلمانوں মত সাধারণভাবে তাকেও দারুল হারবে অর্জিত অর্থ সহ তার মোট আয় অনুপাতে কর দিতে হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের তাৎপর্য

আইনবিদগণ কর্তৃক مسلمانوں দারুল হারবে যাতায়াত কিংবা ভ্রমণের ফলে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশংকা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে অমুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যই ইসলামের ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিরাট মাধ্যমরূপে কাজ করেছে। বস্তুতঃ, এর ফলেই মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকা ও বিষুবীয় আফ্রিকায় বাণিজ্যপথ ধরে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমেই ইসলাম-জগত সামরিক বিজয় লব্ধ রাজনৈতিক সীমানার বাইরে বহু দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের আত্ম-প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। হেনরী পিরিনের মতে, সম্ভবতঃ খৃস্টান রাষ্ট্রগুলো ইসলামের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে অসম্মত হয় বলেই ইউরোপের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়; ইসলামী-রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাকৃত নীতির ফলে এ সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এর ফলে মুসলিম বাণিজ্য বিভিন্ন পথ ধরে অগ্রসর হয় এবং ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের বিপুল সমৃদ্ধি সাধিত হয়। ক্রুসেড যুদ্ধের আমলে ইউরোপের সঙ্গে আবার লেবাননের বাণিজ্য শুরু হয়। কিন্তু পরে ভারত ও দূরপ্রাচ্যে পৌছার জন্য উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ সম্পর্ক পুনরায় ছিন্ন হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল অবধি ইউরোপের সঙ্গে সিরিয়া ও লেবাননের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক রকম বন্ধ ছিল। এই শতকে মুসলিম-রাষ্ট্র ও খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নব পর্যায়ে উন্নীত হয়।

স্থল ও সমুদ্র উভয় পথেই বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসা- বাণিজ্য অব্যাহত থাকে। বহির্বিশ্বের সাথে ইসলামের এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের দরুন বিশ্ববাণিজ্যের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কতিপয় বিশেষ রীতিনীতি ও বিধিব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব হয়।

মুসলমানরা কেবলমাত্র পূর্ব এশিয়া থেকে নতুন নতুন পণ্য-সামগ্রীই (যেগুলো পরে ইউরোপে চালু হয়) আমদানী করেনি, অধিকন্তু তারা চীনাদের নিকট হতে কাগজী মুদ্রার ব্যবহার-প্রণালী আয়ত্ত করে পরে অন্যান্য দেশে এর প্রচলনে সাহায্য করে।

ব্যাংকিং পদ্ধতির উন্নয়নেও مسلمانوں ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম ব্যাঙ্ক- বিশেষজ্ঞদেরই চেক, ঋণপত্র ও হুণ্ডির ব্যবহারকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন। বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্র (যেমন—বসরা) থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় যাতায়াত করতেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কিভাবে একটি বাণিজ্য-প্রধান নগরের ব্যবসায়ীরা তখনকার দিনে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে বহু দূরবর্তী প্রান্তে স্বচ্ছন্দে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করতে পারতেন।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 সালিশী

📄 সালিশী


প্রাক-ইসলাম যুগে সালিশী ব্যবস্থা

সাধারণভাবে স্বীকৃত সামাজিক রীতি ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিবদমান পক্ষসমূহের বিরোধ মীমাংসার নীতি হিসেবে অতি প্রাচীনকাল থেকেই সালিশীর ব্যবস্থা চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের মীমাংসা। তবে প্রকৃতপক্ষে, কোন পক্ষের দাবীর যথার্থতা নিরূপণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ফলে সালিশী অনেকটা মীমাংসাভিত্তিক ব্যবস্থার রূপ পরিগ্রহ করে। বস্তুতঃ, এই ব্যবস্থা এত প্রাচীন যে, খৃস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে (সিরকা-৩১০০) মেসোপটেমীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশের শাসনকর্তা ইয়েনাটম ও মেসোপটেমিয়ার অন্যতম নগর-রাষ্ট্র উম্মার অধিবাসীদের মধ্যে সালিশীর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সালিশীর একটি ধারার সংযোজন দেখা যায়। নিকট-প্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসে সালিশীর অনুরূপ আরো অনেক নজির পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন গ্রীসেই এ ব্যবস্থার ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়।

গ্রীসের নগর-রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমানা ও নদ-নদী নিয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপারে বিরোধ দেখা দিলে সালিশীর ব্যবস্থা করা হত। বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে ডেলফীর দৈববাণীও অনেক সময় সালিশের কাজ করত এবং এর রায় প্রায় সবাই মাথা পেতে স্বীকার করে নিত। বিবদমান দেশগুলোর বাইরের তৃতীয় কোন রাষ্ট্রকেও সালিশ মানা হত। এই মধ্যস্থ রাষ্ট্র সাধারণতঃ বিরোধের কারণ সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতেন এবং এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিরোধমূলক বিষয় সম্পর্কে রায় প্রদান করতেন।

প্রাক-ইসলাম যুগের আরবে গোত্রের সরদার ও কাহীন (দৈবজ্ঞ বা ভবিষৎ বক্তা) আন্তঃগোত্রীয় বিরোধের ব্যাপারে সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের তা'মীম গোত্রের সরদারগণ প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহের বিরোধ মীমাংসায় সালিশ হিসেবে তাঁদের সাফল্যজনক ভূমিকার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। অনেক সময় সমাজের উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণও সালিশের কাজ করতেন। উকাযের বার্ষিক মেলায় কিংবা পবিত্র ও শান্তির মাসসমূহে (আশ হুরুল হারাম) সাধারণতঃ এই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি সালিশী করতেন। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এই সব পবিত্র মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। বিভিন্ন গোত্রের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারেও এই গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের ইতিহাস হতে জানা যায় যে, আল-হারিস ইবনে আউফ ও খারিজার মধ্যস্থতায় আবস ও যু'বিয়ান গোত্রের যুদ্ধগত বিরোধের মীমাংসা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত (সঃ) আরবদের নানাবিধ বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে সালিশ (হাকাম) হিসেবে কাজ করেন। কা'বার ঐতিহাসিক কালো পাথর ওঠানোর ব্যাপারে আরব সরদারদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সালিশীর (তাহকিম) মাধ্যমেই তার মীমাংসা হয়। সে সময়কার আরব গোত্রসমূহের দীর্ঘদিনের বিরোধগুলোর ভেতর মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিরোধের বিষয়টি সমধিক উল্লেখযোগ্য। এই বিরোধে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সালিশ হিসেবে কাজ করেন এবং প্রচলিত আরব-রীতি ও সামাজিক ব্যবহার-বিধি অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করেন। এইভাবে তাঁর মধ্যস্থতায় এই গোত্র দুইটির ঐতিহাসিক শত্রুতার অবসান ঘটে।

ইসলাম ও সালিশী

ইসলাম-পন্থীদের মধ্যে শান্তি ও সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে ইসলামের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে দুইটি বিবদমান মুসলিম দলের মধ্যে আপোষ-রফা কিংবা বিরোধ মীমাংসার মাধ্যম হিসেবে ইসলাম আরবের সালিশী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দান করেছে। ইসলামের নীতি লঙ্ঘন করা না হলে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যেও সালিশী অনুমোদিত ছিল। আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলীতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে হযরত (সঃ) ও ইহুদী গোত্র বানু কোরায়জার মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে সালিশীর নজিরের উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষই তাঁদের বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়টি তাঁদের মনোনীত একজন লোকের নিকট মীমাংসার জন্য পেশ করতে সম্মত হন।

এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করে আল-শায়বানি বলেন যে, ইমাম সমগ্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কিংবা কোন খণ্ড যুদ্ধের অবসানের উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষের নিকট বিরোধমূলক বিষয়টি পেশ করতে পারেন। সকলের নিকট সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য একজন ধীরবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মুসলমানকেই সালিশ নিযুক্ত করতে হবে। তাঁকে যদি উভয়পক্ষই স্বেচ্ছায় নিযুক্ত করে থাকেন, তবে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে তাঁরা বাধ্য থাকবেন। অবশ্য, যদি পূর্বাহ্নে তাঁদের মতামত না নিয়েই তিনি নিযুক্ত হয়ে থাকেন কিংবা তিনি এমন বিবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যার সঙ্গে তাঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী অথবা তাঁর সন্তান-সন্ততি সংশ্লিষ্ট থাকেন, তবে সে ব্যাপারে তাঁর রায় গ্রাহ্য হবে না।

হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সালিশী

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৬-৬৬১) ও সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে গৃহযুদ্ধের অবসানের জন্যে যে সালিশী হয়, সম্ভবতঃ ইসলামের ইতিহাসে সালিশীর ক্ষেত্রে তা-ই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজনৈতিক বিষয়টি এখানে আইনগত দিকের চাইতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেভাবে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়, তাতে তদানীন্তন যুগের সালিশীর প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণায় পৌঁছা যায়।

আমর-বিন-আল-আস যুদ্ধে মুয়াবিয়ার আসন্ন পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয় বুঝতে পেরে মুয়াবিয়াকে সালিশীর আবেদন জানা ও পরামর্শ দান করেন। আমরের পরামর্শ অনুযায়ী মুয়াবিয়া সালিশীর জন্য অনুরোধ করেন এবং তাঁর সৈন্যদের বর্শার অগ্রভাগে আল-কোরআন তুলে ধরতে নির্দেশ দেন। এর তাৎপর্য এই যে, মুয়াবিয়া তাঁর ও হযরত আলীর মধ্যে কোরআনকে মধ্যস্থ হিসেবে উপস্থাপিত করে যুদ্ধ অবসানের আবেদন করেন। হযরত আলী মুয়াবিয়ার এ চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ধরতে পারলেও আল- কোরআনের মাধ্যমে পেশকৃত এ আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তা'ছাড়া, তাঁর অনুগামী ও সমর্থকগণ কোরআনের প্রতি তাদের স্বাভাবিক ভক্তি-শ্রদ্ধাবশতঃ এ আবেদনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। কারণ, কোরআনকে মান্য করাটা मुसलमानों মধ্যে একটা সাধারণ কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত। যাহোক, উভয়পক্ষই স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের পক্ষ হতে একজন সালিশ (হাকাম) নিয়োগে স্বীকৃত হন এবং কোরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই সালিশকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করেন। হযরত মুয়াবিয়া আমর-ইবনুল-আসকে এবং হযরত আলী আবু মূসা-আল- আশারীকে সালিশ নির্বাচিত করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত আলী তাঁর সমর্থকদের চাপের ফলে আবু মূসাকে নিয়োগ করেন। উভয় সালিশকেই জীবন, ধন- সম্পদ এবং তাঁদের পরিবারবর্গের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। সালিশদের এক বছরের মধ্যে তাঁদের রায় দান করতে বলা হয়। হিজরী ৩৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৯) আধরুহ নামক স্থানে উভয় সালিশ বৈঠকে মিলিত হন এবং উভয়পক্ষ কর্তৃক যথারীতি স্বীকৃত একটি সন্ধিচুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করেন। হুদায়বিয়া চুক্তিকে এই সালিশী চুক্তিটির দলিল প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি গ্রহণের ফলে হযরত আলী খলিফার সরকারী পদবী হতে বঞ্চিত হলেন এবং তাঁর মর্যাদা সিরিয়াস্থ তাঁর শাসন-প্রতিনিধি (গভর্নর) মুয়াবিয়ার সমপর্যায়ে নেমে এলো। নীচে চুক্তিটির বিষয়বস্তুর বিবরণ দেয়া হল:

"পরম করুণাময় আল্লাহ'র নামে শুরু করছি।

"আলী-ইবনে-আবুতালিব ও মুয়াবিয়া-ইবনে-আবু সুফিয়ান এতদ্বারা তাঁদের মধ্যে (বিরোধ মীমাংসায় অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে) সালিশীর ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছেন।

আলী কুফাবাসীগণ ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আর মুয়াবিয়া শামীবাসীগণ (সিরিয়াবাসী) ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

“আমরা আল্লাহ এবং তাঁর কিতাবের (আল-কোরআনের) নির্দেশিত সালিশীর জন্য আবেদন করছি; কারণ, এছাড়া অন্য কোনো পন্থা বা ভিত্তি নেই...এবং উভয় আইনবিদ—আবু মুসা আল-আশআরী ও আমর ইবনুল-আস আল্লাহর কিতাবের (আল-কোরআন) নির্দেশিত পন্থার ভিত্তিতে কাজ করবেন...এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে যদি কোন কিছু না পাওয়া যায়, তবে আইনানুযায়ী সুন্নাহ’র বিধানই তাঁদের কর্মপন্থার ভিত্তি হবে....”

বলা বাহুল্য, চুক্তিটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। সালিশীর উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে এতে কোন কিছুর উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র এতে কোরআন ও সুন্নাহকে সালিশীর ভিত্তিরূপে গণ্য করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটির সংক্ষিপ্ততা ও অস্পষ্টতা আমর-ইবনুল-আসকে মূল বিষয়টি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দান করেছে; এবং এই সুযোগের মাধ্যমে অন্যতম সালিশ আবু মুসাকে নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে তিনি আলোচ্য বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেন:

“আবু মুসা, আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, উসমানকে (তৃতীয় খলিফা) অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে?”

আবু মুসা সম্মতিসূচক জওয়াব দান করেন।

অতঃপর আমর আবার বলেন : “আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, মুয়াবিয়া এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজন উসমানের উত্তরাধিকারী?”

আবু মুসা এতেও সম্মতি জ্ঞাপন করেন।

আমর পুনরায় বলেন, আল্লাহ বলেছেন : “......অন্যায়ভাবে যে কাউকেই হত্যা করা হয়, তার উত্তরাধিকারীদের ওপরেই আমরা কর্তৃত্ব দান করেছি; হত্যার ব্যাপারে (প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে) সে (উত্তরাধিকারী) যেন সীমা অতিক্রম না করে; এবং (সীমা অতিক্রম না করলে) নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য দান করা হবে” (কোরআন ১৭ : ৩৩)।

এরপর আমর মন্তব্য করলেন : “সুতরাং, এমতাবস্থায় হযরত উসমানের পর মুয়াবিয়া কেন তাঁর উত্তরাধিকারী (অর্থাৎ খলিফা) হবেন না?”

কিন্তু আমর আবার বললেন : “আপনি যদি এই ভয় করেন যে, শাসন-ক্ষমতা পরিচালনার ব্যাপারে মুয়াবিয়ার যোগ্যতা ও অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণ প্রশ্ন তুলবে, তবে আপনি তাদের এই জওয়াব দিতে পারেন যে, মুয়াবিয়া হযরত উসমানের (রাঃ) স্ববংশসম্ভূত এবং উত্তরাধিকারী, আর হযরত উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আরও বলতে পারেন যে, মুয়াবিয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং রাষ্ট্র-পরিচালনায়ও বিশেষ সুদক্ষ। আর, তা'ছাড়া তিনি রাসূলের (সঃ) অন্যতম সাহাবী ছিলেন।"

আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "হে আমর! আল্লাহকে ভয় কর! হযরত আলী ইবনে আবু তালেব কো রেশদের মধ্যে একজন অতি সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।"

খলিফা হওয়ার পক্ষে কে সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত, শেষ পর্যন্ত তা' নিয়েই সালিশদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ফলে, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার উপায় বা পদ্ধতির ওপর বিশেষ কোন গুরুত্বই আরোপ করা হল না। আবু মূসা দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রাঃ) পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে খলিফা মনোনীত করার বিষয় চিন্তা করেন। পক্ষান্তরে, আমর খলিফার পদে মুয়াবিয়ার পক্ষ সমর্থনের সিদ্ধান্ত করেন।

পরিশেষে আবু মূসাকে লক্ষ্য করে আমর বললেন: "এ ব্যাপারে (খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে) আপনার মত কি?"

আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "আমার মত হল, এ দু'জন লোককে (হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়াকে) পদচ্যুত করে مسلمانوں সাধারণ নির্বাচনের (শুরা বা সাধারণ গণভোট) ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উচিত। তারা তাদের নিজেদের জন্য (তাদের শাসক হিসেবে) তাদের পছন্দ অনুযায়ী যাঁকে খুশী নির্বাচন করবে।" আমর বললেন: "আমার মতও তাই।"

বাহ্যতঃ, অনুরূপভাবে সমঝোতায় পৌঁছে যাবার পর, দু'জন সালিশই সরকারীভাবে সাধারণ্যে তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে প্রস্তুত হলেন। বয়োঃজ্যেষ্ঠ হিসেবে আবু মূসাকে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য আমর নম্রভাবে অনুরোধ করলেন এবং বললেন যে, তাঁর (আবু মূসার) ঘোষণার পরই তিনি (আমর) তাঁর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবেন। আবু মূসা একথার পর প্রথম আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং অতঃপর বললেনঃ

"হে লোকগণ! আমরা এই জাতির সমস্যাটি পরীক্ষা করে দেখেছি এবং হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া উভয়কে অপসারণ করা ছাড়া আর কোন উত্তম সমাধান খুঁজে পাইনি যাতে করে সমগ্র বিষয়টি এই জাতি নিজের হাতে গ্রহণ করবে এবং তাদের যাকে ইচ্ছা, তার ওপর শাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করবে। আমি হযরত আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি এবং আপনারা যাঁকে যোগ্য মনে করেন, তাঁকে নির্বাচিত করতে পারেন।"

আবু মূসার উপরোক্ত ঘোষণার পর আমর আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন: "আপনারা এ লোকটিকে (আবু মূসার) বক্তব্য শুনেছেন। তিনি তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতের অনুরূপ আমিও তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি। কিন্তু আমি আমার বন্ধু মুয়াবিয়াকে শাসন-পরিচালকের পদে সমর্থন করছি। কারণ, তিনিই হযরত উসমানের উত্তরাধিকারী এবং এই পদের জন্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্যতম ব্যক্তি"।

সালিশদের এই ঘোষিত সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁদের পরস্পরের সুস্পষ্ট মতবিরোধ থাকায় স্বাভাবিক কারণেই হযরত আলী এটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। তিনি সালিশদের কার্যক্রমের নিন্দাবাদ ও তাঁদের প্রতি দোষারোপ করে বলেন:

"...তাঁরা কোরআনের নীতি থেকে দূরে সরে গেছেন..... এবং কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ইচ্ছামত কাজ করেছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের পেছনে কোন প্রামাণ্য ভিত্তি কিংবা কোন পূর্বতন নজির নেই; অধিকন্তু, এই সিদ্ধান্তে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক মতানৈক্য রয়েছে...."

আবু মূসার সাথে চাতুরীর জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ কঠোর ভাষায় আমরের নিন্দা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ প্রশ্নটিতে তত চাতুর্যপূর্ণ বা প্রতারণামূলক বলে মনে হয় না। কারণ, এতে আসলে বিরোধ-বহির্ভূত একটি সমস্যার ফয়সালায় আবু মূসাকে প্রভাবান্বিত করার ব্যাপারে আমরের বিশেষ দক্ষতারই পরিচয় পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আবু মূসার ত্রুটি হল, নির্দিষ্ট বিরোধমূলক প্রশ্নটি (আলী ও মুয়াবিয়ার সংঘর্ষের অবসানের প্রশ্ন) এবং সালিশ হিসেবে তাঁদের ক্ষমতা-বহির্ভূত অপর প্রশ্নটির (অর্থাৎ খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নটি) মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতা। কারণ, মূল বিষয় ও চুক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের নির্দিষ্ট প্রশ্ন সম্পর্কে রায় দানের জন্যই আবু মূসা ও আমরকে সালিশ নিয়োগ করা হয়।

সালিশীর তাৎপর্য

অনেক ঐতিহাসিকই প্রাক-ইসলামী যুগ কিংবা ইসলামী যুগে বিরোধ-মীমাংসার পন্থা বা মধ্যম হিসেবে সালিশীর ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন; কিন্তু আসলে আরবে কেবলমাত্র গোষ্ঠীগত (এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর) কোন্দল মীমাংসার ব্যাপারেই সালিশী সীমাবদ্ধ ছিল; তাছাড়া, ইসলামের আবির্ভাবের পরে খুব কম ক্ষেত্রেই সালিশীর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আধরুহ সালিশীর ব্যাপারে যেমন ঘটেছে, তেমনি প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমস্যা থেকে আইনগত সমস্যাকে পৃথক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, খলিফা ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সালিশীর মোকদ্দমার চাইতে কূটনীতি কিংবা যুদ্ধের শরণাপন্ন হতেন। তবে খুঁটিনাটি ব্যাপারে, যেমন গোষ্ঠীগত সংঘর্ষের ক্ষেত্রে হত্যার ক্ষতিপূরণ বা রক্ত মূল্য পরিশোধের প্রশ্নে কিংবা ব্যক্তিগত অথবা আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের বিরোধ-মীমাংসার মত সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে সালিশীর অনেকটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সাধারণতঃ, জনমত এবং শাসকদের এখতিয়ারাধীন ক্ষমতা বলে সালিশীর বিধানসমূহ কার্যকরী করা হত।

প্রাক-ইসলাম যুগে সালিশী ব্যবস্থা

সাধারণভাবে স্বীকৃত সামাজিক রীতি ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিবদমান পক্ষসমূহের বিরোধ মীমাংসার নীতি হিসেবে অতি প্রাচীনকাল থেকেই সালিশীর ব্যবস্থা চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের মীমাংসা। তবে প্রকৃতপক্ষে, কোন পক্ষের দাবীর যথার্থতা নিরূপণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ফলে সালিশী অনেকটা মীমাংসাভিত্তিক ব্যবস্থার রূপ পরিগ্রহ করে। বস্তুতঃ, এই ব্যবস্থা এত প্রাচীন যে, খৃস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে (সিরকা-৩১০০) মেসোপটেমীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশের শাসনকর্তা ইয়েনাটম ও মেসোপটেমিয়ার অন্যতম নগর-রাষ্ট্র উম্মার অধিবাসীদের মধ্যে সালিশীর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সালিশীর একটি ধারার সংযোজন দেখা যায়। নিকট-প্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসে সালিশীর অনুরূপ আরো অনেক নজির পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন গ্রীসেই এ ব্যবস্থার ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়।

গ্রীসের নগর-রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমানা ও নদ-নদী নিয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপারে বিরোধ দেখা দিলে সালিশীর ব্যবস্থা করা হত। বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে ডেলফীর দৈববাণীও অনেক সময় সালিশের কাজ করত এবং এর রায় প্রায় সবাই মাথা পেতে স্বীকার করে নিত। বিবদমান দেশগুলোর বাইরের তৃতীয় কোন রাষ্ট্রকেও সালিশ মানা হত। এই মধ্যস্থ রাষ্ট্র সাধারণতঃ বিরোধের কারণ সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতেন এবং এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিরোধমূলক বিষয় সম্পর্কে রায় প্রদান করতেন।

প্রাক-ইসলাম যুগের আরবে গোত্রের সরদার ও কাহীন (দৈবজ্ঞ বা ভবিষৎ বক্তা) আন্তঃগোত্রীয় বিরোধের ব্যাপারে সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের তা'মীম গোত্রের সরদারগণ প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহের বিরোধ মীমাংসায় সালিশ হিসেবে তাঁদের সাফল্যজনক ভূমিকার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। অনেক সময় সমাজের উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণও সালিশের কাজ করতেন। উকাযের বার্ষিক মেলায় কিংবা পবিত্র ও শান্তির মাসসমূহে (আশ হুরুল হারাম) সাধারণতঃ এই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি সালিশী করতেন। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এই সব পবিত্র মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। বিভিন্ন গোত্রের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারেও এই গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের ইতিহাস হতে জানা যায় যে, আল-হারিস ইবনে আউফ ও খারিজার মধ্যস্থতায় আবস ও যু'বিয়ান গোত্রের যুদ্ধগত বিরোধের মীমাংসা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত (সঃ) আরবদের নানাবিধ বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে সালিশ (হাকাম) হিসেবে কাজ করেন। কা'বার ঐতিহাসিক কালো পাথর ওঠানোর ব্যাপারে আরব সরদারদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সালিশীর (তাহকিম) মাধ্যমেই তার মীমাংসা হয়। সে সময়কার আরব গোত্রসমূহের দীর্ঘদিনের বিরোধগুলোর ভেতর মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিরোধের বিষয়টি সমধিক উল্লেখযোগ্য। এই বিরোধে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সালিশ হিসেবে কাজ করেন এবং প্রচলিত আরব-রীতি ও সামাজিক ব্যবহার-বিধি অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করেন। এইভাবে তাঁর মধ্যস্থতায় এই গোত্র দুইটির ঐতিহাসিক শত্রুতার অবসান ঘটে।

ইসলাম ও সালিশী

ইসলাম-পন্থীদের মধ্যে শান্তি ও সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে ইসলামের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে দুইটি বিবদমান মুসলিম দলের মধ্যে আপোষ-রফা কিংবা বিরোধ মীমাংসার মাধ্যম হিসেবে ইসলাম আরবের সালিশী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দান করেছে। ইসলামের নীতি লঙ্ঘন করা না হলে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যেও সালিশী অনুমোদিত ছিল। আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলীতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে হযরত (সঃ) ও ইহুদী গোত্র বানু কোরায়জার মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে সালিশীর নজিরের উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষই তাঁদের বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়টি তাঁদের মনোনীত একজন লোকের নিকট মীমাংসার জন্য পেশ করতে সম্মত হন।

এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করে আল-শায়বানি বলেন যে, ইমাম সমগ্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কিংবা কোন খণ্ড যুদ্ধের অবসানের উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষের নিকট বিরোধমূলক বিষয়টি পেশ করতে পারেন। সকলের নিকট সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য একজন ধীরবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মুসলমানকেই সালিশ নিযুক্ত করতে হবে। তাঁকে যদি উভয়পক্ষই স্বেচ্ছায় নিযুক্ত করে থাকেন, তবে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে তাঁরা বাধ্য থাকবেন। অবশ্য, যদি পূর্বাহ্নে তাঁদের মতামত না নিয়েই তিনি নিযুক্ত হয়ে থাকেন কিংবা তিনি এমন বিবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যার সঙ্গে তাঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী অথবা তাঁর সন্তান-সন্ততি সংশ্লিষ্ট থাকেন, তবে সে ব্যাপারে তাঁর রায় গ্রাহ্য হবে না।

হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সালিশী

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৬-৬৬১) ও সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে গৃহযুদ্ধের অবসানের জন্যে যে সালিশী হয়, সম্ভবতঃ ইসলামের ইতিহাসে সালিশীর ক্ষেত্রে তা-ই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজনৈতিক বিষয়টি এখানে আইনগত দিকের চাইতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেভাবে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়, তাতে তদানীন্তন যুগের সালিশীর প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণায় পৌঁছা যায়।

আমর-বিন-আল-আস যুদ্ধে মুয়াবিয়ার আসন্ন পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয় বুঝতে পেরে মুয়াবিয়াকে সালিশীর আবেদন জানা ও পরামর্শ দান করেন। আমরের পরামর্শ অনুযায়ী মুয়াবিয়া সালিশীর জন্য অনুরোধ করেন এবং তাঁর সৈন্যদের বর্শার অগ্রভাগে আল-কোরআন তুলে ধরতে নির্দেশ দেন। এর তাৎপর্য এই যে, মুয়াবিয়া তাঁর ও হযরত আলীর মধ্যে কোরআনকে মধ্যস্থ হিসেবে উপস্থাপিত করে যুদ্ধ অবসানের আবেদন করেন। হযরত আলী মুয়াবিয়ার এ চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ধরতে পারলেও আল- কোরআনের মাধ্যমে পেশকৃত এ আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তা'ছাড়া, তাঁর অনুগামী ও সমর্থকগণ কোরআনের প্রতি তাদের স্বাভাবিক ভক্তি-শ্রদ্ধাবশতঃ এ আবেদনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। কারণ, কোরআনকে মান্য করাটা मुसलमानों মধ্যে একটা সাধারণ কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত। যাহোক, উভয়পক্ষই স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের পক্ষ হতে একজন সালিশ (হাকাম) নিয়োগে স্বীকৃত হন এবং কোরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই সালিশকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করেন। হযরত মুয়াবিয়া আমর-ইবনুল-আসকে এবং হযরত আলী আবু মূসা-আল- আশারীকে সালিশ নির্বাচিত করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত আলী তাঁর সমর্থকদের চাপের ফলে আবু মূসাকে নিয়োগ করেন। উভয় সালিশকেই জীবন, ধন- সম্পদ এবং তাঁদের পরিবারবর্গের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। সালিশদের এক বছরের মধ্যে তাঁদের রায় দান করতে বলা হয়। হিজরী ৩৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৯) আধরুহ নামক স্থানে উভয় সালিশ বৈঠকে মিলিত হন এবং উভয়পক্ষ কর্তৃক যথারীতি স্বীকৃত একটি সন্ধিচুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করেন। হুদায়বিয়া চুক্তিকে এই সালিশী চুক্তিটির দলিল প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি গ্রহণের ফলে হযরত আলী খলিফার সরকারী পদবী হতে বঞ্চিত হলেন এবং তাঁর মর্যাদা সিরিয়াস্থ তাঁর শাসন-প্রতিনিধি (গভর্নর) মুয়াবিয়ার সমপর্যায়ে নেমে এলো। নীচে চুক্তিটির বিষয়বস্তুর বিবরণ দেয়া হল:

"পরম করুণাময় আল্লাহ'র নামে শুরু করছি।

"আলী-ইবনে-আবুতালিব ও মুয়াবিয়া-ইবনে-আবু সুফিয়ান এতদ্বারা তাঁদের মধ্যে (বিরোধ মীমাংসায় অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে) সালিশীর ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছেন।

আলী কুফাবাসীগণ ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আর মুয়াবিয়া শামীবাসীগণ (সিরিয়াবাসী) ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

“আমরা আল্লাহ এবং তাঁর কিতাবের (আল-কোরআনের) নির্দেশিত সালিশীর জন্য আবেদন করছি; কারণ, এছাড়া অন্য কোনো পন্থা বা ভিত্তি নেই...এবং উভয় আইনবিদ—আবু মুসা আল-আশআরী ও আমর ইবনুল-আস আল্লাহর কিতাবের (আল-কোরআন) নির্দেশিত পন্থার ভিত্তিতে কাজ করবেন...এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে যদি কোন কিছু না পাওয়া যায়, তবে আইনানুযায়ী সুন্নাহ’র বিধানই তাঁদের কর্মপন্থার ভিত্তি হবে....”

বলা বাহুল্য, চুক্তিটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। সালিশীর উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে এতে কোন কিছুর উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র এতে কোরআন ও সুন্নাহকে সালিশীর ভিত্তিরূপে গণ্য করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটির সংক্ষিপ্ততা ও অস্পষ্টতা আমর-ইবনুল-আসকে মূল বিষয়টি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দান করেছে; এবং এই সুযোগের মাধ্যমে অন্যতম সালিশ আবু মুসাকে নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে তিনি আলোচ্য বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেন:

“আবু মুসা, আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, উসমানকে (তৃতীয় খলিফা) অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে?”

আবু মুসা সম্মতিসূচক জওয়াব দান করেন।

অতঃপর আমর আবার বলেন : “আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, মুয়াবিয়া এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজন উসমানের উত্তরাধিকারী?”

আবু মুসা এতেও সম্মতি জ্ঞাপন করেন।

আমর পুনরায় বলেন, আল্লাহ বলেছেন : “......অন্যায়ভাবে যে কাউকেই হত্যা করা হয়, তার উত্তরাধিকারীদের ওপরেই আমরা কর্তৃত্ব দান করেছি; হত্যার ব্যাপারে (প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে) সে (উত্তরাধিকারী) যেন সীমা অতিক্রম না করে; এবং (সীমা অতিক্রম না করলে) নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য দান করা হবে” (কোরআন ১৭ : ৩৩)।

এরপর আমর মন্তব্য করলেন : “সুতরাং, এমতাবস্থায় হযরত উসমানের পর মুয়াবিয়া কেন তাঁর উত্তরাধিকারী (অর্থাৎ খলিফা) হবেন না?”

কিন্তু আমর আবার বললেন : “আপনি যদি এই ভয় করেন যে, শাসন-ক্ষমতা পরিচালনার ব্যাপারে মুয়াবিয়ার যোগ্যতা ও অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণ প্রশ্ন তুলবে, তবে আপনি তাদের এই জওয়াব দিতে পারেন যে, মুয়াবিয়া হযরত উসমানের (রাঃ) স্ববংশসম্ভূত এবং উত্তরাধিকারী, আর হযরত উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আরও বলতে পারেন যে, মুয়াবিয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং রাষ্ট্র-পরিচালনায়ও বিশেষ সুদক্ষ। আর, তা'ছাড়া তিনি রাসূলের (সঃ) অন্যতম সাহাবী ছিলেন।"

আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "হে আমর! আল্লাহকে ভয় কর! হযরত আলী ইবনে আবু তালেব কো রেশদের মধ্যে একজন অতি সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।"

খলিফা হওয়ার পক্ষে কে সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত, শেষ পর্যন্ত তা' নিয়েই সালিশদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ফলে, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার উপায় বা পদ্ধতির ওপর বিশেষ কোন গুরুত্বই আরোপ করা হল না। আবু মূসা দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রাঃ) পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে খলিফা মনোনীত করার বিষয় চিন্তা করেন। পক্ষান্তরে, আমর খলিফার পদে মুয়াবিয়ার পক্ষ সমর্থনের সিদ্ধান্ত করেন।

পরিশেষে আবু মূসাকে লক্ষ্য করে আমর বললেন: "এ ব্যাপারে (খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে) আপনার মত কি?"

আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "আমার মত হল, এ দু'জন লোককে (হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়াকে) পদচ্যুত করে مسلمانوں সাধারণ নির্বাচনের (শুরা বা সাধারণ গণভোট) ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উচিত। তারা তাদের নিজেদের জন্য (তাদের শাসক হিসেবে) তাদের পছন্দ অনুযায়ী যাঁকে খুশী নির্বাচন করবে।" আমর বললেন: "আমার মতও তাই।"

বাহ্যতঃ, অনুরূপভাবে সমঝোতায় পৌঁছে যাবার পর, দু'জন সালিশই সরকারীভাবে সাধারণ্যে তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে প্রস্তুত হলেন। বয়োঃজ্যেষ্ঠ হিসেবে আবু মূসাকে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য আমর নম্রভাবে অনুরোধ করলেন এবং বললেন যে, তাঁর (আবু মূসার) ঘোষণার পরই তিনি (আমর) তাঁর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবেন। আবু মূসা একথার পর প্রথম আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং অতঃপর বললেনঃ

"হে লোকগণ! আমরা এই জাতির সমস্যাটি পরীক্ষা করে দেখেছি এবং হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া উভয়কে অপসারণ করা ছাড়া আর কোন উত্তম সমাধান খুঁজে পাইনি যাতে করে সমগ্র বিষয়টি এই জাতি নিজের হাতে গ্রহণ করবে এবং তাদের যাকে ইচ্ছা, তার ওপর শাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করবে। আমি হযরত আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি এবং আপনারা যাঁকে যোগ্য মনে করেন, তাঁকে নির্বাচিত করতে পারেন।"

আবু মূসার উপরোক্ত ঘোষণার পর আমর আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন: "আপনারা এ লোকটিকে (আবু মূসার) বক্তব্য শুনেছেন। তিনি তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতের অনুরূপ আমিও তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি। কিন্তু আমি আমার বন্ধু মুয়াবিয়াকে শাসন-পরিচালকের পদে সমর্থন করছি। কারণ, তিনিই হযরত উসমানের উত্তরাধিকারী এবং এই পদের জন্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্যতম ব্যক্তি"।

সালিশদের এই ঘোষিত সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁদের পরস্পরের সুস্পষ্ট মতবিরোধ থাকায় স্বাভাবিক কারণেই হযরত আলী এটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। তিনি সালিশদের কার্যক্রমের নিন্দাবাদ ও তাঁদের প্রতি দোষারোপ করে বলেন:

"...তাঁরা কোরআনের নীতি থেকে দূরে সরে গেছেন..... এবং কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ইচ্ছামত কাজ করেছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের পেছনে কোন প্রামাণ্য ভিত্তি কিংবা কোন পূর্বতন নজির নেই; অধিকন্তু, এই সিদ্ধান্তে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক মতানৈক্য রয়েছে...."

আবু মূসার সাথে চাতুরীর জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ কঠোর ভাষায় আমরের নিন্দা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ প্রশ্নটিতে তত চাতুর্যপূর্ণ বা প্রতারণামূলক বলে মনে হয় না। কারণ, এতে আসলে বিরোধ-বহির্ভূত একটি সমস্যার ফয়সালায় আবু মূসাকে প্রভাবান্বিত করার ব্যাপারে আমরের বিশেষ দক্ষতারই পরিচয় পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আবু মূসার ত্রুটি হল, নির্দিষ্ট বিরোধমূলক প্রশ্নটি (আলী ও মুয়াবিয়ার সংঘর্ষের অবসানের প্রশ্ন) এবং সালিশ হিসেবে তাঁদের ক্ষমতা-বহির্ভূত অপর প্রশ্নটির (অর্থাৎ খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নটি) মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতা। কারণ, মূল বিষয় ও চুক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের নির্দিষ্ট প্রশ্ন সম্পর্কে রায় দানের জন্যই আবু মূসা ও আমরকে সালিশ নিয়োগ করা হয়।

সালিশীর তাৎপর্য

অনেক ঐতিহাসিকই প্রাক-ইসলামী যুগ কিংবা ইসলামী যুগে বিরোধ-মীমাংসার পন্থা বা মধ্যম হিসেবে সালিশীর ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন; কিন্তু আসলে আরবে কেবলমাত্র গোষ্ঠীগত (এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর) কোন্দল মীমাংসার ব্যাপারেই সালিশী সীমাবদ্ধ ছিল; তাছাড়া, ইসলামের আবির্ভাবের পরে খুব কম ক্ষেত্রেই সালিশীর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আধরুহ সালিশীর ব্যাপারে যেমন ঘটেছে, তেমনি প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমস্যা থেকে আইনগত সমস্যাকে পৃথক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, খলিফা ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সালিশীর মোকদ্দমার চাইতে কূটনীতি কিংবা যুদ্ধের শরণাপন্ন হতেন। তবে খুঁটিনাটি ব্যাপারে, যেমন গোষ্ঠীগত সংঘর্ষের ক্ষেত্রে হত্যার ক্ষতিপূরণ বা রক্ত মূল্য পরিশোধের প্রশ্নে কিংবা ব্যক্তিগত অথবা আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের বিরোধ-মীমাংসার মত সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে সালিশীর অনেকটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সাধারণতঃ, জনমত এবং শাসকদের এখতিয়ারাধীন ক্ষমতা বলে সালিশীর বিধানসমূহ কার্যকরী করা হত।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 কূটনীতি

📄 কূটনীতি


কূটনীতি সম্পর্কে মুসলমানদের ধারণা
জাতিতে জাতিতে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বহু প্রাচীনকাল থেকেই কূটনীতির রীতি চলে আসছে। কিন্তু ইসলামের রাষ্ট্রীয় আওতার বাইরের অন্যান্য জাতির সঙ্গে যে পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থাকে ইসলামের একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক বলে মনে করা হত, সে পর্যন্ত ইসলামে কূটনীতি কেবলমাত্র নিছক শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়নি।
ইসলামের গোড়ার দিকের ইতিহাসে দেখা যায় যে, কূটনীতিকে যুদ্ধের একটা অংশ বা বিকল্প হিসেবেই ধরে নেয়া হত। যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে ইসলামের বাণী প্রচার করার পূর্ব-ঘোষণা হিসেবে কূটনীতি প্রয়োগ করা হত। আবার কূটনীতির মাধ্যমেই যুদ্ধের পরে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের পন্থা নিরূপিত হত। আব্বাসীয় আমলের উপঢৌকন বিনিময় বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কীয় চুক্তি সম্পাদন প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ ব্যাপারে কূটনীতি ব্যবহৃত হত না। এমন কি রাষ্ট্রদূতদের তখনকার দিনে প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুপ্তচর বলে সন্দেহ করা হলেও কোন বিশেষ ঘটনা বা সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূত পাঠান হত।
মোটামুটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা ও কূটনীতি প্রায় একই জিনিস ছিল। জাতিতে জাতিতে সম্বন্ধ নির্ধারণের ব্যাপারে তখন কূটনীতির বড় একটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। বলতে গেলে কূটনীতি তখন অনেকটা ম্যাকিয়াভেলীয় বা সুবিধাবাদী নীতিভিত্তিক ছিল।
বিদেশী রাজা-বাদশাহদের দরবারে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করত এবং এতে কতকগুলো বিশেষ উদ্দেশ্যও হাসিল করা যেত।
রাষ্ট্রদূতগণ রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছিয়ে দিয়েই তাঁদের মিশনের সাফল্য ও অসাফল্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্যে শীঘ্রই তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ফিরে যেতেন। রাষ্ট্রদূতদের বিশেষ জাঁকজমক ও আদর-আপ্যায়নের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান হত। তবু তাঁদের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশী রাষ্ট্রের গুপ্তচর বলে মনে করা হত। তাই, তাঁদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হত। তাঁরা যাতে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ না পান এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন না করেন, সেদিকেও নজর রাখা হত।

রাষ্ট্রদূত
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞগণ মুসলিম প্রতিনিধিকে রাসূল (বহুবচনে-রুসূল) বা সাফীর (বহুবচনে সুফারা) বলে অভিহিত করেছেন। রাসূল কথাটি ইরসাল থেকে এসেছে। ইরসাল মানে হল, পাঠানো বা কোন বিশেষ কাজ দিয়ে কোথাও কোন প্রতিনিধি পাঠান। তাই, রাসূল বলতে নবী বা দূত দুই-ই-বোঝাতে পারে। সাফীর কথাটি সফর থেকে এসেছে। সফর বলতে রাষ্ট্রদূতের কাজের সঙ্গে সঙ্গে সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ মীমাংসার কাজও বোঝায়। কিন্তু গোড়ার দিকে এ দুটি শব্দের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নির্দেশ করা হয়নি। অবশ্য, পরবর্তী আইনবিদগণ সাফীর বলতে কূটনৈতিক প্রতিনিধি বুঝেছেন এবং রাসূল কথাটি (ধর্ম সম্বন্ধীয়) নবী অর্থে ব্যবহার করেছেন।
মুসলিম রাষ্ট্রদূতগণ খলিফা ও সুলতানের প্রতিনিধিত্ব করতেন। বিশ্বস্ততা এবং জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মধ্য হতে রাষ্ট্রদূতদের নিয়োগ করা হত। সাধারণতঃ কার্যদক্ষতা, সাহসিকতা ও উপস্থিত-বুদ্ধির সঙ্গে তাঁদের শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্য এবং মানসিক প্রফুল্লতা বিচার করে তাঁদের নিয়োগ করা হত। মধ্যপান তাঁদের জন্যে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক বিধায় নারীদের সংস্পর্শ থেকে তাঁদের দূরে থাকতে হত। খলিফা বা সুলতানগণ প্রায়ই রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করার জন্য উপযুক্ত লোক খুঁজে পেতেন না। তাই, তাঁরা সাধারণতঃ কূটনৈতিক কাজে দুই বা তিনজনের একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতেন; এর মধ্যে একজন যোদ্ধা ও একজন বিদ্বান ব্যক্তি থাকতেন। তৃতীয়জন সম্পাদক বা সেক্রেটারী নিযুক্ত হতেন।
রাষ্ট্রদূতদের সরকারী চিঠি বহন করতে হত এবং সেগুলো তাঁরা বিদেশী রাষ্ট্র-প্রধানকে সম্বোধন করে পড়ে দিতেন। এ সব চিঠিতে রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র থাকত, যাতে তিনি মৌখিক বাণী নিয়ে পৌছে দিতে পারেন। অনেক সময় এ পরিচয়পত্রে প্রেরিত রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে সাধারণ নীতি উল্লেখ থাকত। এতে একথাও লেখা থাকত যে, গোপনীয় তথ্য রাষ্ট্রদূত নিজে মুখে বলবেন।
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আমল থেকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিদেশে দূত পাঠান হত। মুসলিম ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বাইজান্টীয়াম, মিসর, পারস্য (ইরান) ও আবিসিনিয়ায় ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে দূত (প্রতিনিধি) প্রেরণ করেন। এসব দেশে দূতদের সঙ্গে প্রেরিত পত্রে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ইত্যাদি সম্পর্কে যে সাধারণ বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, দু’একটি বিষয়ে পার্থক্য ছাড়া এগুলো প্রায় একই ধাঁচে লেখা। বাইজান্টীয় সম্রাটের নিকট লিখিত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পত্রটির ভাষ্য নিম্নরূপ:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি।
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নিকট থেকে রুমের (বাইজান্টীয়ার) সর্বোচ্চ শাসক হেরাক্লিয়াসের প্রতি।
"যাঁরা সত্যকে অনুসরণ করেন, তাঁদের প্রতি শান্তি (সালাম)। আপনাকে আল্লাহর নামে ইসলামে আহ্বান করা আমার কর্তব্য। আপনি যদি (ইসলাম গ্রহণ করেন) মুসলমান হন, তবে আপনি নিরাপদ এবং আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কৃত করবেন। আপনারা অর্থাৎ কিতাবীরা আমাদের মধ্যে আল্লাহর একই বাণী দেখতে পাবেন। আসুন, আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করি এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোন 'ইলাহ' বা উপাস্য গ্রহণ না করি। যদি ঈমান আনেন, তবে বলুন: "আমরা মুসলমান"; আর যদি এতে বিশ্বাস না কারণ, তবে আপনি আপনার লোকদের পাপের জন্যে দায়ী হবেন।"
প্রচলিত বিবরণ হতে জানা যায় যে, আবিসিনিয়ার বাদশাহ ও মিসরের মুকাউকাস হযরতের (সঃ) ইসলামে দাখিল হওয়ার দাওয়াত গ্রহণ করেন। কিন্তু বাইজান্টীয় সম্রাট জবাব দেন যে, তাঁর প্রজারা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। আর পারস্যের বাদশাহ হযরতের আহ্বান পত্রটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেন এবং পত্রবাহক দূতদের বিতাড়িত করেন। পারস্যের বাদশাহর আচরণের কথা অবহিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মন্তব্য করেন : "তার সাম্রাজ্যও এমনিভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়বে!" এই কূটনৈতিক আদান-প্রদানের প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক।
প্রাথমিক যুগের খলিফাদের (খোলাফায়ে রাশেদা ও উমাইয়া খেলাফত) আমলে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন এবং শুল্ক প্রদানের ব্যাপারেই কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। উমাইয়া খলিফাগণ বিশেষ করে প্রথম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিকের আমলে বাইজান্টীয়দের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হয় এবং বার্ষিক শুল্ক প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ সময়ে মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। আরব ঐতিহাসিকগণ এসব বিষয়ের কোন উল্লেখ করেননি। আর এসব কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও চুক্তিগুলোর কোন দলিলও সুরক্ষিত হয়নি।
উমাইয়াদের চাইতে আব্বাসীয় খলিফাগণই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের কূটনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করেন। বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রায় বছরই সমর-অভিযান চালান হত। ফলে বন্দী বিনিময় কিংবা ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্যে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালাতে হত। তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাম্রাজ্যিক কারণে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে তৎকালীন সমসাময়িক প্রায় সকল শাসকের কাছেই রাষ্ট্রদূত পাঠানোর রীতি ছিল। ফাতেমীয় ও মামলুক শাসকগণ ব্যাপকভাবে এই রীতি অনুসরণ করেন। তাঁরা ইউরোপ এবং মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন।

রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনা
বিদেশী রাষ্ট্রদূতগণ নিজেদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে আমান ব্যতিরেকে দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারতেন এবং সরাসরি রাজধানীতে উপস্থিত হতে পারতেন। সাধারণতঃ, তাঁদের সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক থাকতেন।
কার্য উপলক্ষে অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রদূতগণ আমান ব্যতিরেকে দারুল ইসলামে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করতেন। একে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বলা যেতে পারে। যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এবং নিষিদ্ধ কার্যাদি থেকে বিরত থাকলে তাঁরা সাধারণতঃ এই সুবিধা ভোগ করতেন। নিষিদ্ধ কাজগুলো হচ্ছে গুপ্তচর বৃত্তি অথবা দারুল হারবে পাঠানোর জন্যে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করা। শাসকদের মধ্যে হিংসাত্মক মনোভাব থাকলে এ সুবিধা সবসময় দেয়া হত না। তবু মুসলিম ও অমুসলিম শাসকগণ কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থাকে পারস্পরিক মঙ্গলের দিক থেকে কল্যাণকর বলে মনে করতেন।
আব্বাসীয় আমলের শেষের দিকে বিভিন্ন দেশের মর্যাদাবান মুসলমানদের নিকট হতে পাঠানো সরকারী পরিদর্শকদের অভ্যর্থনার জন্য যে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করা হত, তার চাইতে অনেক বেশী জাঁকজমক করা হত বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনায়। মুসলিম শক্তির অবনতির যুগে এ ধরনের জাঁকজমক প্রদর্শন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রদূতগণ সাধারণতঃ খলিফা ও সুলতানদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ইসলাম জগতের বিভিন্ন রাজধানীতে তাঁদের সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা করা হত। শোভাযাত্রা সহকারে তাঁদের রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হত; রাস্তা বরাবর মিছিল চলত ও দুই পাশে সৈন্যগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। আগমনের পথে থাকত সুসজ্জিত তোরণ। তাঁদের অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে সজ্জিত বাড়ী নির্দিষ্ট করে রাখা হত, যেখানে জমকালোভাবে তাঁদের ভোজ ও আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হত। বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতগণের বাগদাদ পরিদর্শন সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিকগণ বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।
আল-মুক্কতাদিরের আমলে হিজরী ৩০৫ সনে (খৃস্টাব্দ ৯১৮) বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতের বাগদাদ পরিদর্শন সম্পর্কে মুসলিম ইতিহাসে খুঁটিনাটি বর্ণনা পাওয়া যায়। খলিফা ও তাঁর সুদক্ষ উজির ইবনে আল-ফুরাতের ইচ্ছাক্রমে বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতকে সাম্রাজ্যের বিস্ময়কর বস্তু, স্থান ও অট্টালিকা এবং অতুলনীয় ঐশ্বর্যের উপকরণসমূহ দেখান হয়। খলিফা আততায়ী ও সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসক বুয়াহিদের শাহজাদা অদুদ্‌-উদ-দওলা কর্তৃক আয়োজিত ফাতেমীয় রাষ্ট্রদূতের অভ্যর্থনা এর আর একটি দৃষ্টান্ত। ফাতেমীয় রাষ্ট্রদূত খলিফার শান-শওকত ও ইযযত-সম্ভ্রম দেখে অবাক হন। কর্ডোভার খলিফা ও মিসরের মামলুক সুলতানগণও বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতেন।
রাজধানীতে অবস্থানকালে রাষ্ট্রদূতদের যে কেবল আদর-আপ্যায়ন করা হত তাই নয়, তাঁদের প্রসিদ্ধ ও মনোরম স্থানগুলো দেখান হত এবং নানারকমের উপহার ও সম্মানী পোশাক দেয়া হত। অতিথিসেবক রাষ্ট্রের আতিথেয়তা এবং এর মার্জিত কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও আদাব-কায়দার গৌরব-মহিমার নিদর্শন হিসেবেই এসব উপহার দেয়া হত। উপহার আদান-প্রদান কূটনীতি সম্পর্কীয় অনুষ্ঠানেরই অংশ বিশেষ ছিল।
কাজ শেষ হয়ে গেলে রাষ্ট্রদূতগণ বিদায়ের অনুমতি চাইতেন। এ সময়ও অভ্যর্থনা-অনুষ্ঠানের অনুরূপ অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হত।

কূটনৈতিক মিশনের কার্যাবলী
স্থায়ীভাবে কূটনৈতিক মিশন বিনিময় করার প্রথা সেকালে প্রচলিত ছিল না। তাই, সাধারণত: কতগুলো বিশেষ কাজের জন্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের বিদেশে পাঠান হত। মুসলিম শাসকদের প্রয়োজন ও অবস্থার ওপরই এ কূটনৈতিক কার্যাবলীর প্রকৃতি নির্ভর করত। ইসলামের উন্মেষ-কালের গোড়ার দিকে প্রধানতঃ শত্রুপক্ষকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানোর মধ্যেই কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলাম গ্রহণ না করলে এ আহ্বানের মাধ্যমেই শত্রুদের সঙ্গে বিরোধের সূচনা হত বা যুদ্ধ ঘোষণা করা হত। দ্বিতীয়তঃ শত্রুপক্ষ ইসলাম গ্রহণে রাজি হলে বা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন আপোষে আসতে চাইলে রাষ্ট্রদূতগণ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করতেন।
আব্বাসীয় আমলে যখন ইসলামী রাষ্ট্র সুসংহত হয়ে আসে, তখন রাষ্ট্রদূতদের ওপর অন্যান্য আরও অনেক গুরুদায়িত্বপূর্ণ কার্যভার ন্যস্ত হয়। খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্যই যে কেবল রাষ্ট্রদূত বিনিময় করা হত তাই নয়, উপহার, যুদ্ধবন্দী বিনিময় এবং বিরোধ মীমাংসার জন্য কিংবা বাণিজ্যের সুবন্দোবস্ত করার জন্যও রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের ব্যবস্থা ছিল। অভ্যর্থনাকারী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করাও কূটনীতিকদের কাজ ছিল। কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল, গুপ্তচরবৃত্তি। যে রাষ্ট্র তাঁদের প্রেরণ করত আর যে রাষ্ট্র তাঁদের গ্রহণ করত, তারা সকলেই দূতদের প্রদত্ত বিশেষ সুবিধার সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করত; আর একইভাবে সতর্ক থাকত, যাতে অপরপক্ষ বিশেষ কোন সুবিধা করতে না পারে।
মুসলিম শাসকও কার্যতঃ স্বাধীন প্রাদেশিক শাসকদের মধ্যেও রাষ্ট্রদূত বিনিময় করা হত। সরকারী চিঠিপত্র ছাড়াও মোবারকবাদ, সমবেদনা জ্ঞাপন কিংবা শাসক বংশগুলোর মধ্যে বিবাহ-বন্ধন দৃঢ় করার জন্যও রাষ্ট্রদূত পাঠান হত। বিরোধ এড়ানোর জন্য, যাতায়াতের পথ সুগম করা এবং পণ্যদ্রব্য আদান-প্রদানের ব্যাপারে মুসলিম ও অমুসলিম শাসকদের মধ্যে পরস্পর শুভেচ্ছা বাণীও পাঠান হত।
আব্বাসীয় আমলে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিরোধ লেগেই থাকত এবং প্রতি বছরই নতুন করে গোলমাল বেধে উঠত বলে যুদ্ধবন্দী বিনিময় বা বন্দীমুক্তির ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য রাষ্ট্রদূত পাঠান হত। তাছাড়া, একটি রাষ্ট্রকে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেবার জন্যেও রাষ্ট্রদূতদের পাঠান হত।

মুসলিম কূটনীতি ও বিশ্ব রাজনীতি
আব্বাসীয়দের সময়ে মুসলিম রাষ্ট্র সব চাইতে বেশী সুসংহত হয়। এই সময়ে দুনিয়ায় চারটি বড় বড় শক্তি ছিল। প্রাচ্যে ছিল আব্বাসীয় ও বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য। এরা রোম ও পারস্যের বিরোধিতারই যেন জের টেনে চলেছিলেন। একে অপরের রাষ্ট্রে এঁরা হামলা করতেন ও ঘন ঘন শান্তিচুক্তি অমান্য করতেন। আর ইউরোপে ছিল ফ্র্যাঙ্কীয় সাম্রাজ্য ও স্পেনের উমাইয়া সাম্রাজ্য। এই দুই দলেও বিরোধ লেগেই ছিল। এই বিরোধিতার শুরু হয় তুরস্কের যুদ্ধে চার্লস মার্টেলের হাতে আবদুর রহমানের পরাজয়ের মাধ্যমে (৭৩২ খৃস্টাব্দ)।
প্রাচ্যের দুই শক্তি ও পশ্চিমী দুই শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু বছর ধরে চলে। ফলে, তৃতীয় পিপীন (খাটো পিপীন নামে পরিচিত) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে চান। তিনি এ উদ্দেশ্যে কন্সট্যানটিনোপলে এক কূটনৈতিক মিশন পাঠান (৭৫৭ খৃস্টাব্দ)। বাইজান্টীয় সম্রাট এতে সাড়া দেন এবং পিপীনের নিকট তাঁর পক্ষ হতে একটি কূটনৈতিক মিশন পাঠান। কিন্তু পোপের নীতি ছিল, ফ্রাঙ্ক ও বাইজান্টীয়দের মধ্যে যাতে কোন রকম চুক্তি না হয়। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই আব্বাসীয়গণ স্পেনকে বশে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল হয়নি। এভাবেই দুটো মুসলমান রাষ্ট্র ও দুটো খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে লাগল। এ জটিল অবস্থার ফলেই শেষ পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্কীয় শাসকগণ ও আব্বাসীয় খলিফাগণ পরস্পর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য হন। আর এর ফলেই কর্ডোভা ও কন্সট্যানটিনোপলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ল্যাটিন ইতিহাস ও সাহিত্য ছাড়া আর কোথাও ফ্র্যাঙ্কীয় ও আব্বাসীয় শাসকদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের কোন বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, মুসলিম ইতিহাসে এর কোন উল্লেখ নেই। এ নীরবতার ফলে 'এ্যাচেন' ও 'বাগদাদের'র মধ্যে যেভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে পশ্চিমী ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে, মুসলিম ঐতিহাসিকদের নীরবতার দরুন অনেকে এ সব সম্পর্ক আদৌ স্থাপিত হয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
পশ্চিমী ইতিহাসের সূত্র থেকে জানা যায় যে, ফ্র্যাঙ্ক ও আব্বাসীয়দের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রথমে পিপীনই এগিয়ে আসেন (খৃস্টাব্দ ৭৬৫)। তিনিই প্রথম কূটনৈতিক মিশন পাঠান দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের দরবারে। আল-মনসুর তখন বাইজান্টীয় সম্রাটের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তিনবছর পর একটি আব্বাসীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল এবং খলিফার প্রদত্ত উপহার সঙ্গে নিয়ে পিপীনের প্রেরিত মিশনটি ফিরে আসে। মুসলিম কূটনীতিকদের পিপীন সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন এবং পরিশেষে তাঁদের মার্সাই হতে ফিরে যাবার বন্দোবস্ত করে দেন।
পিপীনের পুত্র শার্লম্যানও প্রাচ্যে কয়েকটি মিশন পাঠান। খলিফা হারুনুর রশীদের দরবারে তিনি দুটি (৭৯৭ খৃস্টাব্দ ও ৮০২ খৃস্টাব্দ) ও জেরুযালেমের মহামান্য প্রধান যাজকের নিকট একটি মিশন পাঠান (৭৯৯ খৃস্টাব্দ)। ৭৯৭ খৃস্টাব্দে তিনি দু'জন ফ্র্যাঙ্কিশ প্রতিনিধি ও একজন ইহুদী দোভাষীকে পাঠান। উপরোক্ত দুইজন ফ্রাঙ্ক প্রাচ্য দেশেই মারা যান এবং চার বছর পর দোভাষীটি একটি হাতী নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ৮০২ খৃস্টাব্দে শার্লম্যান বাগদাদে দ্বিতীয় মিশন পাঠান। তাঁর মিশনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় এবং শার্লম্যান 'পবিত্র ও মহান রাজশক্তি' রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। বাকলার বলেন যে, এ কূটনৈতিক আদান-প্রদানের ফলে শার্লম্যান জেরুযালেমের ওপর অনেকখানি কর্তৃত্ব লাভ করেন। বাকলার আব্বাসীয়দের অধীনে জেরুযালেমের ওয়ালী হিসেবে শার্লম্যানের পদমর্যাদার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, আল-মাওয়ার্দীর পুস্তকে বর্ণিত নিয়ম অনুসারে এ ধরনের পদ অমুসলিমের ওপর বর্তাতে পারে।
৭৯৯ খৃস্টাব্দে জেরুযালেমের প্রধান যাজক শার্লম্যানের নিকট একটি মিশন প্রেরণ করেন। শার্লম্যান এর পরিবর্তে প্রাসাদ-সামগ্রী ও উপঢৌকন সহ প্রধান যাজকের নিকট একটি ফিরতি মিশন পাঠান। ৮০০ খৃস্টাব্দে প্রধান যাজকের কাছ থেকে আর একটি মিশন আশীর্বাদস্বরূপ পবিত্র সমাধি ও হযরত ঈসার ক্রুস-স্থানের চাবি ও একটি প্রতীক নিশান নিয়ে শার্লম্যানের দরবারে উপস্থিত হয়।
ল্যাটিন ঐতিহাসিকদের প্রচলিত বর্ণনা মেনে নেয়া হলে একথা বলা চলে যে, দু'জন শক্তিমান শাসকের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনই এ সব কূটনৈতিক মিশনের উদ্দেশ্য ছিল। নিজেদের মর্যাদা বাড়াবার জন্যই তদানীন্তন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক শার্লম্যান ও হারুন উভয়েই প্রগাঢ় বন্ধুত্ব-সূত্রে আবদ্ধ হন। কন্সট্যান্টিনোপল ও কর্ডোভার বিরুদ্ধে মিলিত হওয়াও তাঁদের অপর উদ্দেশ্য ছিল। পরবর্তী দুই শতাব্দীর ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, শার্লম্যানের পক্ষে ফিলিস্তিনের দখল পাওয়া ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মুসলিম রাজশক্তির পতনের যুগে ক্রুসেড যোদ্ধাগণ ফিলিস্তিন দখল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলমানদের কাছে তাদের ঘোর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।
জেরুযালেমের প্রধান যাজক ও শার্লম্যানের মধ্যে যে দৌত্যের আদান-প্রদান চলে তার উদ্দেশ্য থেকে বোঝা যায় যে, এটা ছিল একটা নিছক ধর্মীয় ব্যাপার—রাজনৈতিক বিষয় নয়। কারণ, খলিফাকে না জানিয়ে বা তাঁর অনুমতি না নিয়ে ফিলিস্তিনের খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান পাদ্রীর পক্ষে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা চালান সম্ভব ছিল না। বোধহয়, তিনি শার্লম্যান ও হারুনুর রশীদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সুযোগ গ্রহণ করেন। পশ্চিমী খৃস্টান শাসকদের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন যাতে করে প্রাচ্য দেশে নৈতিক ও বাস্তব ক্ষেত্রে চার্চের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। প্রধান পাদ্রীর রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দান করার কোন ক্ষমতা ছিল না। তাই তিনি শার্লম্যানের কাছে উপহার হিসেবে চাবি ও প্রতীক নিশান পাঠিয়েছিলেন।

কূটনীতির গুরুত্ব
যুদ্ধকালে আমান প্রাপ্তির ফলে যেমন সাধারণ লোকের পক্ষে এক দেশ থেকে অপর দেশে যাতায়াত করা সম্ভব হত, তেমনি মুসলিম ও অমুসলিম শাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরকারী পর্যায়ে সংযোগ স্থাপন করা চলত কূটনীতির মাধ্যমে। জেহাদ বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ ঘোষণা করার পূর্বে কতকগুলো নীতি মেনে চলতে হত। যুদ্ধ আরম্ভের পূর্বে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত এর দৃষ্টান্ত। কূটনীতির মাধ্যমেই ইসলামে আহ্বান জানানো সম্ভব হত। তাছাড়া, মুসলমান শাসকদের অমুসলমানদের সঙ্গে দশ বছর পর্যন্ত শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা অনুমোদিত ছিল। মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রদূতদের আলাপ-আলোচনার মাধমেই এটা সম্ভব হত। কাজেই কূটনীতি ইসলামের যুদ্ধনীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করত। কূটনীতি ছিল জেহাদের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জেহাদের শক্তি যখন মন্দীভূত হয়ে আসল এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য জাতির শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল, তখন শান্তিপূর্ণ ব্যাপারে কূটনীতির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে, উপহার বিনিময়ে ও অন্যান্য সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কূটনীতি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করল।
সেকালে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সংযোগের ব্যবস্থা খুব বেশী উন্নত না হওয়ায় রাষ্ট্রদূত প্রেরণের ফলে যে কেবল সংবাদ বিনিময়ে সাহায্য হত তাই নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপনেও কূটনীতি যথেষ্ট সাহায্য করত। কূটনৈতিক কার্যাবলী ছাড়াও রাষ্ট্রদূতগণ তাঁদের সঙ্গে দূর দেশ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র, বই ও দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যাদি নিয়ে আসতেন। ফলে তাঁদের দেশের লোক অন্যান্য জাতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করত। অন্য কোন উপায়ে এসব খবরাখবর পাওয়া তখন সম্ভব ছিল না। সে যুগে ইবনে জুবাইর (১১৪৫-১২১৭ খৃস্টাব্দ) ও ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৭ খৃস্টাব্দ) প্রমুখ পরিব্রাজকগণ তদানীন্তন পৃথিবীর অনেক জায়গায় বহুদিন ধরে পরিভ্রমণ করার পর নানা তথ্যাদি সংগ্রহ করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তেমনি রাষ্ট্রদূতগণও বিচিত্র ও বিস্ময়কর দেশসমূহ পরিভ্রমণ করে (শার্লম্যানের দূতগণ এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত) স্বস্ব সম্রাট বা বাদশাহ এবং দরবারের সভাসদদের নিকট তাঁদের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতেন। কাজেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে অন্যান্য উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নও সম্ভব হয়েছিল।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 নিরপেক্ষতা

📄 নিরপেক্ষতা


ইসলাম ও নিরপেক্ষতা
যে রাষ্ট্র সারা দুনিয়ার সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিরোধমূলক সম্পর্ককেই সাধারণ ব্যাপার বলে মনে করেছে এবং যে রাষ্ট্র কেবল চুক্তির মাধ্যমে অল্পকালের জন্য শান্তি কামনা করে এসেছে, সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন আর একটি রাষ্ট্রের কোন মিল থাকতে পারে না যে রাষ্ট্র পূর্বোক্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে ও তার শত্রুদের সঙ্গে সম্ভাবমূলক সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়। নিরপেক্ষতা বলতে যদি কোন রাষ্ট্রের সেই মনোভাবকে বোঝায়, যার ফলে সে রাষ্ট্র কোন পক্ষ অবলম্বন না করে স্বেচ্ছায় যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে পারে, তবে এ অবস্থা মুসলিম আইনবিজ্ঞানে স্বীকৃত হয়নি।
মুসলিম শাসনব্যবস্থা মেনে নিয়ে বা অস্থায়ী শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যে রাষ্ট্র ইসলামের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে রাজী হয় না, সে রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে ইসলামের যুদ্ধ লেগেই থাকে। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামী আইন অনুযায়ী পৃথিবীকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে; প্রথমটি হল, মুসলিম ভূখণ্ড এবং মুসলিম বিজিত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত দারুল ইসলাম আর দ্বিতীয়টি হল, পৃথিবীর বাকি অংশ নিয়ে গঠিত দারুল হারব। কতিপয় আইনবিদ তৃতীয় একটি বিভাগের কথাও বলেছেন। এটা হল, দারুল আহদ বা দারুস সুলহ বা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দেশসমূহ। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদই একে দারুল ইসলাম কিংবা দারুল হারবের অংশ বলে গণ্য করেছেন। কোন আইনবিদই ইসলামের আইনের আওতার বাইরে কোন রাষ্ট্রকে দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যবর্তী কোন মর্যাদা দান করেন নি।
ইসলামী আইনের বিধানে নিরপেক্ষতা বলে কোন কিছু নেই। কিন্তু আইন প্রয়োগের বেলায় ধর্মীয় বিধানে ও বাস্তব ক্ষেত্রে কতকগুলো ব্যতিক্রমমূলক বিষয় স্বীকার না করে পারা যায়নি। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, স্বেচ্ছাকৃতভাবে ইসলামী রাষ্ট্র কতকগুলো অঞ্চল একেবারেই আক্রমণ করেনি; ফলে এগুলো জেহাদের আওতা থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর সহচরদের প্রতি এসব দেশের সহৃদয় ব্যবহারের পুরস্কার হিসেবেই হোক কিংবা এগুলোর দুর্গমতার দরুনই হোক, এরা জেহাদ থেকে রেহাই পেয়েছে। এসব ভূখণ্ড আর একটি পৃথক বিভাগের গোড়া পত্তন করেছে। বিভিন্ন 'দার' বা বিভাগ দিয়ে বিশ্বের বিভাগীকরণের পদ্ধতি অনুযায়ী এই স্বতন্ত্র বিভাগটিকে "দারুল হিয়াদ" বা নিরপেক্ষ জগত বলে অভিহিত করা যায়।
নিরপেক্ষ জগত কিন্তু বিশ্বের উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগের মধ্যে কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ নয়। কারণ, ইসলামের আইন ব্যবস্থায় সব দেশকেই নীতিগতভাবে বিরুদ্ধবাদী বা শত্রুভাবাপন্ন বলে মনে করা হয়ে থাকে। ইসলামী রাষ্ট্রের আইনের অনুমোদন বলে যে সব রাষ্ট্র নিরাপত্তা লাভ করে ও জেহাদ থেকে রেহাই পায়, তাদেরই কেবল নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা চলে। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই শ্রেণীর রাষ্ট্রকে সত্যিকার নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা যায় না। কারণ, আধুনিক আইনে একটা রাষ্ট্র দুই বা ততোধিক যুদ্ধলিপ্ত রাষ্ট্রের প্রতি নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করতে পারে। এ শ্রেণীর রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ বা নিরপেক্ষকৃত রাষ্ট্র বলা যেতে পারে; অর্থাৎ এইসব রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা যুদ্ধে ব্যাপৃত রাষ্ট্রগুলোসহ বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়ে থাকে। ইসলামী আইনের বিধানেও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যবস্থা অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই আইনে নিরপেক্ষতা বলে বিশেষ কোন সংজ্ঞার অস্তিত্ব নেই। নিরপেক্ষতার রূপায়ণের বৈশিষ্ট্য বা তাৎপর্য আইন প্রণেতাদের মতামত অপেক্ষা নিরপেক্ষকরণের মধ্যেই অধিকতর সুস্পষ্ট।

আবিসিনিয়ার মর্যাদা
মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে আবিসিনিয়া বহু যুগব্যাপী এক অভূতপূর্ব মর্যাদার আসন লাভ করে এসেছে। অমুসলিম রাষ্ট্রপূঞ্জের মধ্যে এ দেশ এমন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল, যাকে ইসলামী রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় জেহাদের গণ্ডীর বাইরে রেখেছে।
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞগণ এ সম্পর্কে তাঁদের অভিমত বিশ্লেষণ কালে আবিসিনিয়ার সঙ্গে প্রথম যুগের ইসলামী রাষ্ট্রের গভীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের নজির এবং এ সম্পর্কে সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছেন। তাছাড়া কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম বাহিনী আবিসিনিয়ায় অনুপ্রবেশ করেনি। মুসলিম আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আবিসিনিয়ার মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এর ঐতিহাসিক পটভূমির ওপর কিছুটা আলোকপাতের প্রয়োজন রয়েছে।
ইসলামের উন্মেষ পূর্বে আবিসিনিয়া আরবের ইয়ামেন অঞ্চল আক্রমণ করে এবং সেখানে খৃস্টধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। সাধারণ প্রচলিত বর্ণনা হতে জানা যায় যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জন্মের বছরেই (খৃস্টাব্দ ৫৭০) আবিসিনিয়া মক্কা আক্রমণ করে। এই সামরিক অভিযানই যে, আরব ও আবিসিনিয়ার মধ্যে একমাত্র সংযোগ ছিল তাই নয়, এ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও বিদ্যমান ছিল। এ সম্পর্কের ফলেই এককালে মক্কায় আবিসিনীয় কলোনী গড়ে ওঠে এবং আরবী ভাষায় বহু আবিসিনীয় শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে।
সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ পরিবেশে ইসলামের জন্ম হয় এবং গোড়া থেকেই প্রচণ্ড প্রতিকূলতার সাথে পদে পদে সংগ্রাম করে একে অগ্রসর হতে হয়। এ অবস্থায় প্রতিবেশী দেশ আবিসিনিয়াকে সমর্থক হিসেবে পাবার সম্ভাবনার কথা ভাবা হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষে মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, আবিসিনিয়াবাসীরা পূর্ব হতেই আরবে পৌত্তলিকতার বিরোধিতা করে এসেছে। হযরত রাসূলের (সঃ) অনুসারীদের মধ্যে কয়েকজন আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন মহানবীর প্রিয় মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল (রাঃ)। আবিসিনিয়ার সঙ্গে মহানবীর সম্পর্কের ইতিহাস অনেকটা প্রবাদ কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ সম্পর্ক আবিসিনিয়াকে এক বিরাট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় সব মুসলিম ইতিহাস থেকেই জানা যায় যে, ইসলামের গোড়া পত্তনের প্রথম যুগে মক্কার পৌত্তলিকদের অকথ্য নির্যাতন হতে আত্মরক্ষার জন্যে হযরতের (সঃ) বহুসংখ্যক অনুগামী আবিসিনিয়া আশ্রয় গ্রহণ করেন। মক্কা হতে মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় এই হিজরতকে “প্রথম আবিসিনীয় হিজরা” বলা হয়। এই হিজরত সংঘটিত হয় ৬১৫ খৃস্টাব্দে। অবশ্য, ইতিহাসে এই হিজরত সংক্রান্ত ঘটনাবলীর বর্ণনায় কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। সাধারণ ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মক্কা হতে হযরত রাসূলের অনুগামীদের আবিসিনিয়া হিজরতের অব্যবহিত পরেই আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট মক্কার কোরেশ সরদারগণ মোহাজেরদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবী জানিয়ে এক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। কোরেশদের সঙ্গে মোহাজেরদের বিরোধের কারণ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্যে নাজ্জাশী মোহাজেরদের ডেকে পাঠান। মোহাজেরদের নেতা জাফর বিন আবু তালেব এ ব্যাপারে নাজ্জাশীর প্রশ্নের জওয়াবে যে বক্তব্য পেশ করেন, তা এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করছে। পরবর্তীকালে অনুরূপ অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে মুসলিম প্রতিনিধিগণ এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন। নীচে এই ঐতিহাসিক বিবৃতিটির বিবরণ দেয়া হল :
“হে বাদশাহ! আরবের অন্ধকার যুগে (আইয়‍্যামে জাহেলিয়া) আমরা এমন এক জাতি ছিলাম যারা অজ্ঞানতার অতলে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিলাম, মূর্তিপূজায় ব্যাপৃত থাকতাম, হারাম খাদ্য ভক্ষণ করতাম, গর্হিত ও লজ্জাজনক কাজ করতাম, নিজ বংশের অতি নিকটতম আত্মীয়কে হত্যা করতাম; প্রতিবেশীদের দাবী-দাওয়া এবং তাদের সম্পর্কে আমাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতাম; আমাদের মধ্যে আমরা যারা সবল ছিলাম তারা দুর্বলদের অধিকার হরণ করতাম এবং অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখতাম। এ অবস্থা অপ্রতিহতভাবে চলতে লাগল... অতঃপর আল্লাহ আমাদের মধ্য হতে আমাদের জন্য একজন নবী পাঠালেন, যাঁর বংশমর্যাদা, সততা, বিশ্বস্ততা, নির্ভরযোগ্যতা এবং চারিত্রিক পবিত্রতা ও মহান গুণাবলী সর্বজনবিদিত। তিনি আল্লাহর একত্বে (তওহিদে) আস্থা জ্ঞাপন এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ ও তাঁর ইবাদাত করার জন্যে আমাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেন। এবং এরই সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের ও আমাদের পূর্বপুরুষদের অজ্ঞানতার যুগের উপাস্য পাথর ও প্রতিমার পূজা পরিত্যাগ করার জন্যও আহ্বান জানালেন। তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে, বিশ্বস্ত হতে এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি আমাদের কর্তব্য যথার্থভাবে পালন করতে বলেছেন; এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের গর্হিত কার্যাবলী ও অবৈধ রক্তপাত হতে বিরত থাকতে, লজ্জাজনক কাজ ও মিথ্যাচার বর্জন করতে, এতিমদের হক ও অধিকার হতে বঞ্চিত না করতে এবং ধর্মশীলা ও সাধ্বী নারীদের কুৎসা রটনা হতে দূরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আমাদের এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসনা করতে এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করতে, নামাজ আদায় করতে, আর দরিদ্রকে সাহায্য, খয়রাত ও আশ্রয় দান করতে এবং রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছেন।... তাই, আমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আল্লাহ তাঁর নিকট যা (যে সব বাণী বা কালাম) নাযেল করেছেন এবং তাঁকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, তা অনুসরণ করলাম। আমরা তাই একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করি না। এবং আমাদের জন্য যে সব কাজ হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে, আমরা তা পরিত্যাগ করেছি; আর যে সব কাজ আমাদের জন্য অনুমোদন (যায়েজ বা হালাল) করা হয়েছে, আমরা তা' পালন করছি। এই সত্য পথ অনুসরণের ফলে আমাদের দেশের অনেক লোক আমাদের শত্রু হল এবং আমাদের ওপর নিপীড়ন চালাতে লাগল; তারা আমাদের এই মহান ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে পুনরায় আমাদের পৌত্তলিকতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করতে লাগল।"
বাদশাহ নাজ্জাশীর সঙ্গে আলোচনায় হযরত জাফর আল-কোরআনের সমর্থন পেশ করেন (কোরআন-১৯: ১৬-৩৪)। ফলে নাজ্জাশী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণের সিদ্ধান্ত করেন। মোহাজেরদের বিরুদ্ধে প্রেরিত কোরেশ প্রতিনিধিদের দাবী-দাওয়ায় তিনি কোনরূপ কর্ণপাত করলেন না। বর্ণিত আছে যে, এরপরও মুসলিম মোহাজেরদের একটি বা দুটি দল আবিসিনিয়া হিজরত করেন।
আর একটি ঘটনা মুসলমানদের আবিসিনিয়ার প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন করে তোলে। এই ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বাদশাহ নাজ্জাশীকে ইসলাম গ্রহণের যে দাওয়াত পাঠান, নাজ্জাশী তার অনুকূলে জবাব দান করেন। হিজরী ৮ সালে হযরত বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বানপত্র পাঠান। নাজ্জাশীর কাছেও তিনি অনুরূপ একটি পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তিনি বলেন:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) কাছ থেকে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। আল্লাহর সব প্রশংসা যিনি এক, মহান ও পবিত্র, করুণাময় এবং নির্ভরযোগ্য হেফাজতকারী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মরিয়মের পুত্র হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর রূহ এবং বাণীস্বরূপ। এবং তিনিই (আল্লাহ) তাঁকে মহাআশীষপ্রাপ্ত, মহাসাধবী মরিয়মের কাছে পাঠান এবং তার ফলেই মরিয়মের গর্ভে তাঁর জন্ম হল। তিনি (আল্লাহ) নিজের আত্মা থেকে হযরত ঈসাকে সৃষ্টি করেন-তাঁর নিজেদের প্রশ্বাস দিয়ে তাঁকে জীবনীশক্তি দান করেন। এভাবেই তিনি হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করেন। আমি আপন লা-শরীক এবং আসমান, জমিন ও শেষ বিচার দিনের মালিক আল্লাহর উপাসনা করার জন্য আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার রিসালাত মেনে নিন। আমাকে অনুসরণ করুন এবং আমার অনুগামীদের জামাতে দাখিল হোন। কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল।... আপনার রাজকীয় সার্বভৌমত্বের গর্ব পরিত্যাগ করুন। আমি আপনাকে ও আপনার প্রজাদের সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদাত মেনে নিতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমার কর্তব্য শেষ হল। আমি আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি। আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা, যাঁরা আমার উপদেশ শুনলেন, তাঁরা যেন এর দ্বারা উপকৃত হন। সত্য ধর্মের আলোকের পথে যিনি চলবেন, তাঁর প্রতি সালাম।"
মুসলিম ইতিহাসের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, বাদশাহ নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহর (সঃ) পত্রখানি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর মাথায় ও ললাটে স্পর্শ করেন এবং তাঁর (হযরতের) রিসালাত কবুল করেন। তিনি হযরতের নিকট উপহার পাঠান এবং সেই সঙ্গে এই মর্মে তাঁর চিঠির জওয়াব প্রেরণ করেন:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। আল্লাহ তাঁর রহমতের ছায়ায় আপনাকে আশ্রয় দান করুন এবং তাঁর অফুরন্ত আশীষ আপনার ওপর বর্ষিত হোক। আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনিই আমাকে ইসলামে দাখিল করেছেন। আপনার চিঠি আমি পাঠ করেছি। আপনি হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সবই সত্য এবং সত্য ধর্মের কথা। কারণ, তিনি তাছাড়া আর অধিক কিছুই বলেননি। আসমান-জমিন ও শেষ বিচার দিনের মালিকের ওপর আমি আমার বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করছি। আপনার মহান উপদেশবলী সম্বন্ধে আমি গভীরভাবে চিন্তা করেছি।.... আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল; এবং আমি একথা জাফরের সামনে ঘোষণা করেছি এবং তাঁর নিকট ইসলাম কবুল করেছি। হে রাসূল! জগতসমূহের স্রষ্টা রাব্বুল আলামীনের ইবাদাতের জন্যে আমি নিজকে সমর্পণ করলাম। আমি আমার পুত্রকে আপনার কাছে আমার ব্যক্তিগত দূতরূপে পাঠাচ্ছি। কিন্তু আপনি যদি হুকুম করেন, তবে আমি নিজে গিয়ে আপনার পবিত্র পথ-নির্দেশের পথে নিজকে উৎসর্গ করব। আমি পুনরায় সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনার বাণী সত্য।"
ঐতিহাসিক বাজ বলেন, "আমরা যখন আবিসিনিয়ার খৃস্টানবাদের অতি গোঁড়া ও ধর্মান্ধ প্রকৃতির কথা স্মরণ করি, তখন আরমাহ (নাজ্জাশী) ও তাঁর পাদ্রীদের ইসলাম গ্রহণ খুবই বিস্ময়কর বলে মনে হয়।" হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নাজ্জাশীর কাছে লিখিত পত্রে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে তাঁর মতামতের ওপরেই বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন; কিন্তু এতে তিনি রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কোন কথাই বলেননি। হয়তো সেই কারণেই বাদশাহ নাজ্জাশী তাঁর আহ্বান প্রত্যাখান করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। প্রথম থেকেই আবিসিনিয়া মুসলিম আক্রমণ থেকে রেহাই পায়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনী আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করেনি। পরে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম আবিসিনিয়ায় প্রবেশ লাভ করে। বিশেষ করে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলমানেরা লোহিত সাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আবিসিনিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পান। এর ফলেই শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের পক্ষে আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করা সম্ভবপর হয়। কিন্তু শক্তি বলে ইসলাম কখনো আবিসিনিয়ায় প্রবেশ করেনি।
আবিসিনিয়ার মর্যাদা সম্বন্ধে আইনগত মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ অন্যান্য যে কোন বিবেচনা বা প্রসঙ্গ অপেক্ষা প্রথম যুগের মুসলমানদের প্রতি আবিসিনিয়ার মৈত্রীসুলভ মনোভাব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো দ্বারাই বেশী প্রভাবান্বিত হয়েছেন। আবিসিনিয়াবাসীদের সততা, সাহস ও সারল্য সম্পর্কে রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কতকগুলো প্রশংসাসূচক মন্তব্যের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আছে। এ হাদিসটির বার বার উল্লেখ দেখা যায়। এতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মুসলমানদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেন: "যতদিন পর্যন্ত আবিসিনিয়াবাসীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ না করবে, ততদিন তাদের শান্তিতে থাকতে দিও।" ইমাম মালিক এ হাদিসটি যথার্থ কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। তবুও তিনি এর নির্দেশ মেনে চলতে মুসলমানদের উপদেশ দেন। তিনি আরও বলেন যে, মুসলমানগণ গোড়া থেকে রীতি হিসেবে আবিসিনিয়া আক্রমণ থেকে বিরত থেকে এসেছেন। আতা ইবনে আবিরাবাহ এ মতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। খৃস্টানদের সম্পর্কে আল-কোরআনের আয়াতের (৬৪ : ৮৫, ৮৬) উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, কোরআনে মুসলমানদের দৃষ্টিতে খৃস্টানদের একটা বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোরআনের এই আয়াতগুলো আবিসিনিয়া-বাসীদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। কারণ, এদের সঙ্গেই গোড়ার দিকে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুসারীরা বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
বাস্তব কার্যধারা হাদিসেরই সমর্থন করে এসেছে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তৃতির প্রাথমিক যুগে আবিসিনিয়া ছাড়া আর সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করা হয়। ফলে, জেহাদ থেকে আবিসিনিয়ার অব্যাহতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ইমাম মালিক আবিসিনিয়া সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন যে, মুসলিম শাসকগণ রীতি হিসেবে আবিসিনিয়াকে আক্রমণ থেকে রেহাই দিয়ে এসেছেন।
মুসলিম আইনবিজ্ঞানের বিধান অনুসারে যে দেশ জেহাদ থেকে রক্ষা পাবে, তা হয় দারুল ইসলামের অন্তর্গত হবে, নতুবা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে 'দারুল আহাদ' হবে। একথা হয়ত বলা চলে যে, বাদশাহ নাজ্জাশী কর্তৃক ইসলাম গ্রহণ তাঁর দেশকে দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করারই শামিল। কিন্তু ইসলামী আইনের রূপায়ণই আসলে ইসলামের মাপকাঠি। সুতরাং, যেহেতু ইসলামী আইন আবিসিনিয়ায় প্রয়োগ করা হত না, তাই একে দারুল ইসলামের অংশ বলে মনে করা হয়নি। আবিসিনিয়ার বাদশাহ যদিও হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) আল্লাহর নবী বলে স্বীকার করেছেন, তবু উপরোক্ত কারণেই এদেশ দারুল ইসলামের অংশ নয়।
আবিসিনিয়া যদি দারুল ইসলাম ও দারুল হারব কিছুই না হয়, তবে একে মাঝামাঝি এক ধরনের একটা কিছু বা 'দারুল হিয়াদ' বা নিরপেক্ষ জগত বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ, এ এমন একটি দেশ যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র একে তার প্রসার এলাকার বাইরে রেখেছে। কাজেই এদেশ নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে গণ্য হত। যে পর্যন্ত মুসলমানদের আক্রমণ না করবে, সে পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রও এ রাষ্ট্রকে আক্রমণ না করার আইনগত প্রতিশ্রুতি দেয়।

নুবিয়া
নুবিয়ায় আবিসিনিয়ার মত ঘটনা সংঘটিত হয়নি; ফলে নুবিয়াকে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই নুবিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্রর সঙ্গে নুবিয়ার পারস্পরিক ভিত্তিতে ব্যবসাগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমর বিন-আস কর্তৃক মিসর বিজয়ের পর মুসলমানদের সঙ্গে নুবিয়াবাসীদের একটা খণ্ড যুদ্ধ হয়। এতে উভয়পক্ষই বুঝতে পারল যে, অহেতুক একে অন্যের ভূখণ্ড আক্রমণ না করে পারস্পরিক সমঝোতায় আবদ্ধ হওয়াই ভাল। অতঃপর মিসরের পরবর্তী শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ-ইবনে-আবি সারাহ একটি চুক্তি সম্পাদনা করেন (খৃস্টাব্দ-৬৫২)। এতে স্থির হয় যে, নুবিয়ার অধিবাসীগণ প্রতি বছর ইসলামী রাষ্ট্রকে ৩৬০ জন দাস এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, যব, ঘোড়া ও পোশাকাদি শুল্ক হিসেবে দান করবে। চুক্তিটির বিবরণ নীচে দেয়া হল:
“এটা সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ-বিন-আবি সারাহ কর্তৃক নুবিয়ার সরদার ও অধিবাসীদের প্রতি অঙ্গীকৃত চুক্তি। এ চুক্তি আসোয়ানের সীমান্ত থেকে আলওয়া পর্যন্ত নুবিয়ার ছোট বড়ো সকল অধিবাসীর প্রতি প্রযোজ্য।
"আব্দুল্লাহ-বিন-সাদ নুবিয়ার অধিবাসী, প্রতিবেশী মিসর রাষ্ট্রের মুসলিম এবং অন্যান্য মুসলিম ও জিম্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দান করছেন।
"আপনাদের নুবীয় জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) রক্ষাকবচের ছায়াতলে নিরাপত্তা ভোগ করবে। যতদিন আপনারা চুক্তিটি পালন করবেন, ততদিন আমরা আপনাদের আক্রমণ করব না বা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না কিংবা আপনাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করব না। সফরকারী হিসেবে আপনারা আমাদের দেশে সফর করতে পারবেন; কিন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন না। আমরাও সফরকারী হিসেবে (স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নয়) আপনাদের দেশে প্রবেশ করব। মুসলমানগণ ও তাদের মিত্রগণ যখন আপনাদের দেশে প্রবেশ করবেন বা ভ্রমণ করবেন, তখন তারা সে স্থান পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আপনারা তাদের নিরাপত্তার ভার নেবেন।
"আপনাদের দেশে মুসলমানদের কোন দাস পালিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া মাত্র আপনারা মুসলিম রাষ্ট্রে ফিরিয়ে দেবেন। আপনারা তার ওপর কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। কোন মুসলমান তাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে তাকে আপনারা বাধা দিতে বা ভয় দেখাতে পারবেন না। সে (মুসলিম) ফিরে আসা পর্যন্ত তাকে আপনাদের সাহায্য করতে হবে। আপনাদের নগরে যদি মুসলমানগণ কোন মসজিদ নির্মাণ করেন, তবে আপনারা তা সযত্নে রক্ষা করবেন। কাউকে সেই মসজিদে ইবাদাত করতে বাধা দিতে পারবেন না। আপনারা মসজিদখানিকে পরিষ্কার করে রাখবেন; এতে নিয়মিত প্রদীপ দেয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং একে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবেন।
"প্রতি বছর আপনারা মুসলমানদের প্রধান শাসকের নিকট ৩৬০ জন দাস প্রেরণ করবেন। দাস-দাসীগণ যেন মধ্যম প্রকারের এবং সবল ও সুস্থ হয়—অতি বৃদ্ধ বা স্বল্প বয়স্ক শিশু যেন না হয়। এদের আপনারা আসোয়ানের শাসনকর্তার নিকট সমর্পণ করবেন।
"আলোয়া হতে আসোয়ান সীমান্ত পর্যন্ত কোন শত্রু আপনাদের ওপর হামলা চালালে মুসলমানগণ তাকে প্রতিরোধ করতে কিংবা তার আক্রমণ থেকে আপনাদের রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে না। আপনারা যদি মুসলমানদের কোন দাসকে আশ্রয় দেন অথবা কোন মুসলমান বা তার মিত্রকে হত্যা করেন কিংবা আপনাদের নগরে মুসলমানগণ কর্তৃক নির্মিত মসজিদ ধ্বংস করেন বা ৩৬০ জন দাস থেকে একজনও কম প্রদান করেন, তবে এ শান্তি ও নিরাপত্তার চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে; এবং আবার আমাদের ও আপনাদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হবে, যে পর্যন্ত না আল্লাহ এর বিচার করেন (অর্থাৎ বিরোধের সুরাহা করেন); কেননা, আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
"এই শর্তগুলোর ভিত্তিতেই আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) চুক্তি ও ওয়াদা দ্বারা আবদ্ধ হচ্ছি; এবং আপনারা আপনাদের ধর্ম বিশ্বাস মতে যাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানিত ও মহত্তম বলে মনে করেন—সেই নবীগণ এবং আপনাদের ধর্ম ও জাতির পরম শ্রদ্ধাভাজন পুণ্যাত্মা মহাপরুষদের নামে আমাদের সাথে এই চুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছেন। আমাদের ও আপনাদের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তিতে আল্লাহ সাক্ষী রইলেন।
"উমর-বিন-সুরাহবিল কর্তৃক হিজরী ৩১ সনের রমযান মাসে (এপ্রিল-মে : ৬৫২ খৃস্টাব্দ) চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হল।"
নুবিয়াবাসীগণ মুসলমানদের যে শুল্ক প্রদান করত, তাকে "বাকত" বলা হত। এ শুল্ক জিযিয়া শ্রেণীভুক্ত ছিল না; কারণ, নুবিয়াবাসীগণ জিম্মীর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমতাবস্থায় অনুরূপ বার্ষিক শুল্ক প্রদানকে মুসলমানদের নিকট তাদের আত্মসমর্পণের কোন নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায় না। এটা ছিল অনেকটা পারস্পরিক বাণিজ্যিক আদান-প্রদান বা চুক্তিভিত্তিক একটা ব্যবস্থা। লক্ষ্যণীয় যে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে শুল্ক প্রদানের সময়ে নুবিয়াবাসীগণ সম্মানস্বরূপ মুসলমানদের নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত ৪০টির অধিক দাস এবং অন্যান্য উপহার (বিশেষ করে দুষ্প্রাপ্য পশু, যেমন হাতী, জিরাফ ও চিতাবাঘ) প্রদান করে। অপরপক্ষে মুসলমানগণ বিনিময়ে তাদের গম, বার্লি, পানীয় দ্রব্য, অশ্ব এবং অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রী প্রদান করে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই যে, চুক্তিটির পারস্পরিক বিনিময় ভিত্তিক প্রকৃতি লক্ষ্য করা যায় তাই নয়, বস্তুতঃ আইনবিষয়ক এবং রাজনৈতিক শর্তেও এটা সুপরিস্ফুট রয়েছে। এই শর্তাদির ভিত্তিতেই মুসলমানগণ ও নুবিয়াবাসীগণ পরস্পরের রাষ্ট্রে ভ্রমণকারীদের সফরের সুযোগ দান, পরস্পরের দেশে মহান নবীগণ এবং পরস্পরের ধর্মমত ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের (যেমন নুবিয়ায় মুসলমানদের মসজিদ) প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং পরস্পরের ওপর আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে স্বীকৃত হয়। চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ সম্পর্কে কোন সময় নির্দিষ্ট করা হয়নি; ফলে সাধারণ বিধি ও নিয়ম অনুসারে চুক্তিটি দশ বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। তবে 'বাকত' (নির্ধারিত শ্রেণীর শুল্ক) পরিশোধের নিয়ম বার্ষিক হওয়ায়, উভয়পক্ষই সময়ে সময়ে খুব সহজেই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিতেন। এ অবস্থার ফলে কার্যতঃ দেখা যায় যে, মিসরে ফাতেমীয় খেলাফত পর্যন্ত ৬শ' বছরের অধিককাল চুক্তিটি অক্ষুণ্ণ ছিল।
মুসলিম আইনে দখলের পূর্বে ইসলামের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নুবিয়ার মর্যাদার প্রশ্ন আর একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। দুটো বিষয়ে আবিসিনিয়া থেকে এর পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, ইসলামী রাষ্ট্র নুবিয়াকে আবিসিনিয়ার মত জেহাদ থেকে রেহাই দেয়নি। অবশ্য, চুক্তিকালীন সময়ে এর ওপর কোন আক্রমণ করা যেত না। তাই নুবিয়াকে যে দারুল হারব থেকে আলাদা করা হল, তা ছিল নিতান্ত অস্থায়ী। উভয়পক্ষের চুক্তি পালনের ইচ্ছার ওপরই এ ব্যবস্থা নির্ভর করত। যদি চুক্তি লঙ্ঘন করা হত কিংবা যে কোন একটি পক্ষ খবর পাঠিয়ে (নাবধ) চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চাইত, তবে তখনই নুবিয়া দারুল হারবের অংশ হয়ে যেত; দ্বিতীয়তঃ, ইসলামী রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় নুবিয়াকে দারুল হারব থেকে আলাদা করেনি। বস্তুতঃ অবস্থার চাপে পড়ে অন্ততঃ প্রথম দিকে ইসলামী রাষ্ট্র নুবিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের দিক হতে ইসলামী আইনের বিধান নুবিয়াকে সাময়িকভাবে জেহাদের আওতার বাইরে রাখতে স্বীকৃতি দান করেছে। কার্যতঃ দেখা যায় যে, দীর্ঘ ছয় শতাব্দীব্যাপী নুবিয়া জেহাদ থেকে মুক্ত থাকে।
জেহাদের আওতার বাইরে থাকা কালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দিক থেকে নুবিয়া দারুল ইসলাম (কারণ, এখানে ইসলামী বিধান কার্যকরী ছিল না) কিংবা দারুল হারব কোনটাই ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় একে 'দারুল আহদের' পর্যায়ভুক্ত বলে মনে করা যেতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, নুবিয়ার শান্তিচুক্তির প্রকৃতি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির চেয়ে আলাদা ধরনের। কারণ, চুক্তি অনুযায়ী একে শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে ইসলামী রাষ্ট্রকে কোন রাজস্ব দিতে হত না। কেবলমাত্র পারস্পরিক আদান-প্রদানের ভিত্তিতেই নুবিয়া ইসলামী রাষ্ট্রকে একটা শুল্ক প্রদান করত। নুবিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্তে এই ব্যবস্থা স্বীকৃত হওয়ায় মুসলিম আইনে একে (নুবিয়াকে) একটা বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়। এদিক থেকে কতকাংশে এর মর্যাদা অনেকটা আবিসিনিয়ার অনুরূপ ছিল। চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ পর্যন্ত উভয়পক্ষ এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে স্বীকৃত হয়। নুবিয়ার এ মর্যাদাকে (চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত) বিশেষ এক প্রকারের নিরপেক্ষতা বলে অভিহিত করা যেতে পারে।

সাইপ্রাস
সাইপ্রাস (কুবরাস) উপরোক্ত বিশেষ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আর একটি দৃষ্টান্ত। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম আইন ব্যবস্থায় সাইপ্রাস একটা বিশেষ স্থান অধিকার করে।
প্রথম মুয়াবিয়া যখন ৬৪৮ খৃস্টাব্দে সাইপ্রাস আক্রমণ করেন, তখন সাইপ্রাস ছিল বাইজান্টীয়দের অধিকারভুক্ত দ্বীপ।
এ দ্বীপটি বাইজান্টীয়দের শুল্ক প্রদান করত। সাইপ্রাস দখল করলে মুসলমানদের সঙ্গে বাইজান্টীয়দের আর একটি যুদ্ধ বেধে যাবার সম্ভাবনা ছিল। পূর্ব থেকেই তাদের সঙ্গে মুসলমানদের ভূমধ্যসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগেই ছিল। তাই নতুন সংঘর্ষ এড়াবার জন্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে সাইপ্রাসকে এই দুই বৃহৎ শক্তির (মুসলিম ও বাইজান্টীয়) মধ্যবর্তী একটা রাষ্ট্রে (Buffer State) পরিণত করা হয়। চুক্তিতে স্থির হয় যে, সাইপ্রাসকে প্রতি বছর মুসলমানদের ৭০২০ দিনার প্রদান করতে হবে। বাইজান্টীয়দের সঙ্গে সাইপ্রাসের এ ধরনের শুল্ক সম্পর্কীয় চুক্তি আগে থেকেই ছিল। এখন সাইপ্রাসের অধিবাসীদের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে এ শুল্ক ধার্য হল। স্থির হল, মুসলমান ও তার শত্রুদের মধ্যে সাইপ্রাস কোন পক্ষ অবলম্বন করবে না। তবে মুসলমানদের তারা বাইজান্টীয়দের গতিবিধি সম্পর্কে খবরাখবর দেবে। বালাযুরী বলেন, চুক্তিতে এও স্থির হয় যে, “নৌ-অভিযানের সময় মুসলমানগণ সাইপ্রাস দ্বীপের কোন ক্ষতি সাধন করবে না; আবার সাইপ্রাসবাসীগণও তাদের সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না।”
৬৫৪ খৃস্টাব্দে হযরত মুয়াবিয়া আবার সাইপ্রাস আক্রমণ করেন। কারণ, সেই সময়ে চুক্তির খেলাফ করে এক নৌ-যুদ্ধে সাইপ্রাসবাসীরা বাইজান্টীয়দের জাহাজ দিয়ে সাহায্য করে। সাইপ্রাসবাসীগণ চুক্তি লঙ্ঘন করলেও হযরত মুয়াবিয়া পূর্বের চুক্তির শর্তাদি অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং পুনর্বাসনের জন্যে সাইপ্রাসে ১২,০০০ লোক পাঠান। সেই সময়ে মুয়াবিয়া সাইপ্রাসে একটি মসজিদও নির্মাণ করেন। তাছাড়া, তিনি দ্বীপটিতে একটি নগর নির্মাণ করেন এবং বালবাক থেকে কিছুসংখ্যক লোক ও একদল ফৌজ সেখানে মোতায়েন করেন। পরে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযিদ এদের ফিরিয়ে নেন এবং নগরটা ধ্বংস করতে হুকুম দেন। শেষ পর্যন্ত ৬৪৮ সনের চুক্তির ভিত্তিতে সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
খলিফা আবদুল মালিকের (খৃস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) অধীনে একটি নৌ-অভিযানের ফলে সাইপ্রাসে মুসলিম প্রভাব অনেকখানি কমে আসে। ৬৮৯ সনে সম্পাদিত এক চুক্তিতে খলিফা বাইজান্টীয় শক্তিকে বার্ষিক শুল্ক দিতে রাজি হন। আরো ঠিক হয়, সাইপ্রাস থেকে প্রাপ্ত শুল্ক মুসলিম ও বাইজান্টীয়গণ ভাগ করে নিবে এবং সাইপ্রাস উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নিরপেক্ষ থাকবে।
সাইপ্রাসের অবস্থা ছিল সঙ্গীন। প্রাথমদিকে বাইজান্টীয় ও মুসলিম শাসনে সাইপ্রাস ছিল পরাধীন। শেষে এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি অর্ধেক হারে বার্ষিক শুল্ক ভাগ করে নিয়ে সাইপ্রাসের স্বাধীনতা স্বীকার করতে রাজি হয়।
আব্বাসীয় আমলে পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলামের নৌ-শক্তির অবনতি, উমাইয়াদের সঙ্গে আব্বাসীয়দের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আফ্রিকায় প্রতিদ্বন্দ্বী আগলাবিদ ও ফাতেমীয় রাজবংশের অভ্যুত্থানের ফলে পরিস্থিতি অনেকখানি বাইজান্টীয়দের পক্ষে অনুকূল হয়। সাইপ্রাসবাসীদের মুসলিমদের স্বপক্ষে আনবার জন্য খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খৃস্টাব্দ) বার্ষিক শুল্ক কমিয়ে দিয়ে ৬৪৮ সনের চুক্তিতে নির্দিষ্ট মূল শুল্ক প্রবর্তন করেন। কারণ, উমাইয়া আমলে এ শুল্ক কয়েকবার বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু বাইজান্টীয়দের প্রতি সাইপ্রাসবাসীদের সহানুভূতি থাকায় এতে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।
সাইপ্রাসের শাসনকর্তা আবদুল মালিক ইবনে-সালেহ ইবনে-আব্বাসের (মৃত্যু ৮১২ খৃস্টাব্দ) আমলে বাইজান্টীয়দের উসকানিতে সাইপ্রাসের এক বিরোধী দল বিদ্রোহের সৃষ্টি করে। বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল, সাইপ্রাসকে শুল্ক প্রদান থেকে মুক্ত করা। আবদুল মালিক বিদ্রোহ দমন করে দ্বীপটিকে সম্পূর্ণ দখল করে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্ত র্ভুক্ত করতে উদ্যত হন। এ উদ্দেশ্যে সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল করে দেবার স্বপক্ষে তিনি আইনগত মতামত জানতে চান এবং তদানীন্তন যুগের খ্যাতনামা আইনবিদদের কাছে মতামতের জন্যে পত্র লেখেন। আইনবিদগণ চুক্তিটি বাতিল করে দেবার পক্ষে মত দেননি। সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা সম্পর্কে আইনবিদদের কতকগুলো মতামত আমাদের আলোচনার দিক থেকে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তাই, সেগুলো পুরোপুরি এখানে দেয়া হল।
মালিকী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক-ইবনে-আনাস (মৃত্যু ৭৯৫ খৃস্টাব্দ) এই মর্মে সাইপ্রাসের গভর্নর আবদুল মালিকের পত্রের জবাব দেন:
"সাইপ্রাসবাসীদের সঙ্গে আমাদের শান্তিচুক্তি বহু দিনের এবং শাসনকর্তাগণ তা পালন করে এসেছেন। কারণ, তাঁরা চুক্তির শর্তগুলোকে সাইপ্রাসবাসীদের পক্ষে অসম্মানজনক ও হেয়কর এবং মুসলমানদের পক্ষে শক্তির উৎস বলে মনে করেছেন। এর ফলে মুসলমানরা শুল্ক ভোগ করতেন ও শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করার সুযোগ পেতেন। তবু, আমি এমন কোন শাসকের কথা জানি না, যিনি চুক্তি ভঙ্গ করেছেন বা তাদের শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তাই যতদিন তাদের দিক থেকে চুক্তি ভঙ্গের কোন নিদর্শন না পাওয়া যায়, ততদিন আমি তাদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করতে কিংবা চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে যথেষ্ট সংকোচবোধ করি। কারণ, আল্লাহতায়ালা বলেন, “যতদিনের মেয়াদ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে তোমাদের চুক্তি হয়েছে, ততদিন তোমরা চুক্তিটি পালন কর"; (কোরআন-৯: ৪); "অতঃপর যদি তারা ঠিকভাবে না চলে, প্রতারণা পরিত্যাগ না করে এবং তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে যদি তোমরা স্থির নিশ্চিত হয়ে থাক, তবে তোমরা তাদের আক্রমণ করতে পার। এ ক্ষেত্রে আক্রমণ করা ন্যায়সঙ্গত হবে এবং তোমরা সাফল্য লাভ করবে। এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তারা অপদস্থ ও আপমানিত হবে।”
মুসা ইবনে আয়ুন নিম্নলিখিত মতামত ব্যক্ত করেছেন: "এ ধরনের ঘটনা পূর্বে ঘটেছে; কিন্তু প্রত্যেক বার শাসনকর্তাগণ তাদের মাফ করে দিয়েছেন। কারণ, আমি প্রাথমিক যুগের শাসকদের মধ্যে এমন একজনকেও দেখিনি, যিনি সাইপ্রাসবাসী বা অন্যান্য কারোর সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। এমনও হতে পারে যে, তাদের নেতাগণ যা করেছেন সাধারণ সাইপ্রাসবাসীদের তাতে কোন হাতই ছিল না। তাই, যাই ঘটুক না কেন, আমি চুক্তিটি ও এর শর্তগুলো পালন করাই যুক্তিযুক্ত মনে করি। আল-আউযায়ীকে আমি একটা দৃষ্টান্ত দিতে শুনেছি। এক ব্যক্তি মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পরে অমুসলমানদের কাছে মুসলমানদের গোপনীয় তথ্য সরবরাহ করে। আউযায়ী বলেন-'তারা যদি জিম্মী হয়, তবে তারা এর দ্বারা চুক্তিটি ভঙ্গ করেছে এবং তাদের নিরাপত্তার অধিকার বিনষ্ট করেছে। এ অবস্থায় শাসনকর্তা ইচ্ছা করলে তাদের হত্যা করতে পারেন বা ক্রুসবিদ্ধ করতে পারেন। আর যদি যুদ্ধের পর অধীনতা স্বীকারের ফলে তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে মুসলমানগণ তাদের নিরাপত্তার জন্য দায়ী নয়; এক্ষেত্রে শাসনকর্তা তাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল করে দিতে পারেন। কারণ, আল্লাহ প্রতারকদের ভালোবাসেন না'!"
ইসমাইল-ইবনে-আয়াশ নিম্নলিখিত মতামত ব্যক্ত করেছেন: "সাইপ্রাসের অধিবাসীরা তাদের স্ত্রী-পরিবার নিয়ে বাইজান্টীয়দের হাতে উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে। তাদের এ অবস্থায় আমাদের উচিত তাদের পক্ষাবলম্বন করা এবং তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। তাফলিসবাসীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সম্পর্কে হাবিব ইবনে মাসলামা লেখেনঃ "যদি তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা থেকে মুসলমানদের কোন কিছু বিরত করে এবং সে সময়ে কোন শত্রু তোমাদের পদানত করে, এ অবস্থায় তোমরা মুসলমানদের প্রতি অনুগত থাকলে এ ব্যাপারে চুক্তিভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হবে না।" তাই আমি বলতে চাই যে, সাইপ্রাসবাসীদের সঙ্গে চুক্তিটি বলবত থাকবে এবং তারা নিরাপত্তা ভোগ করবে। কারণ, আল-ওয়ালিদ ইবনে ইয়াযিদ যখন তাদের সিরিয়ায় বহিষ্কৃত করেন, তখন মুসলমানগণ এ কাজকে অন্যায় বলে মনে করেন এবং আইনবিদগণও এটা অনুমোদন করেননি। ফলে ইয়াযিদ বিন আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তখন তিনি পুনরায় তাদের সাইপ্রাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। এ নীতি মুসলমানগণ সমর্থন করেছেন এবং এটা ন্যায়ানুগ বলে গণ্য হয়েছে।"
আল-লায়েত ইবনে সা'দ, সুফিয়ান ইবনে ইউয়ানা, ইয়াহইয়া ইবনে হামজা, আবু ইসহাক আল-ফাযারী ও মাখলাদ ইবনে আল-হোসেন প্রমুখ আইনবিদগণ তাঁদের জবাবে বলেন যে, যেহেতু সাইপ্রাসবাসীরা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করেছে, সে অবস্থায় মুসলমানরাও চুক্তিটা নাকচ করে দিতে পারেন এবং তাদের শাস্তির বিধান করতে পারেন।
যে সব আইনবিদ সাইপ্রাস চুক্তি বাতিল করে দেবার বিপক্ষে রায় দিয়েছেন, তাঁদের জওয়াবে প্রদত্ত কতগুলো বিষয় বিবেচনা করে দেখা উচিত। এতে সাইপ্রাসের আইনগত মর্যাদা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য রয়েছে।
প্রথমতঃ, সাইপ্রাস কেবল ইসলামের অধীনস্থ (শুল্ক দেবার পর) রাষ্ট্র ছিল না; এ দ্বীপ বাইজান্টীয়দের অধীনেও ছিল। কাজেই সাইপ্রাসবাসীগণ কর্তৃক ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারটি বাইজান্টীয় অনুশাসনের ওপরও নির্ভর করত।
ইবনে আয়াশের মতে, বাইজান্টীয়দের চাপে সাইপ্রাসবাসীগণ চুক্তিটির শর্ত পালন করতে না পারলে, মুসলমানগণের পক্ষে চুক্তিটি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে গণ্য হবে না। বাইজান্টীয় ও মুসলিম উভয়পক্ষের যৌথ বাধ্যবাধকতা সাইপ্রাসবাসীদের ওপর প্রযুক্ত রয়েছে বলে মুসলমানদের একক বাধ্যবাধকতা সাইপ্রাস পালন করতে না পারলেও ইসলামী রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে এ দ্বীপটি রক্ষা পাবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার দরুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিধানে সাইপ্রাস মধ্যবর্তী বা বন্ধনী রাষ্ট্র (Buffer state) বলে গণ্য হত।
দ্বিতীয়তঃ, সাইপ্রাস ইসলামী রাষ্ট্রকে শুল্ক প্রদান করলেও মূসা ইবনে আয়ুনের মতে এখানকার অধিবাসীরা জিম্মী হিসেবে গণ্য হত না। তাই, তারা যদি ইসলামী রাষ্ট্রের দুশমনদের গোপনীয় সংবাদাদি প্রেরণ করে, তবে মুসলমানরা চুক্তি নাকচ করে দেবার ওজর খুঁজে পাবেন; কারণ, তাদের নিরপেক্ষতা আর অক্ষুণ্ণ থাকবে না। অপরপক্ষে, জিম্মীগণ যদি শত্রুকে খবর সরবরাহ করে, তবে ইসলামের অধীনস্থ সম্প্রদায় হিসেবে তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে; কিন্তু তাদের চুক্তি বাতিল করে দেবার প্রশ্ন এখানে থাকবে না।
দারুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাইপ্রাস দারুল ইসলামের অংশ বলে গণ্য হয়নি। কারণ, সেখানকার অধিবাসীরা জিম্মী হিসেবে গণ্য হত না; আর ইসলামী আইনও সে রাষ্ট্রে কার্যকরী ছিল না। অপরপক্ষে, তাকে দারুল হারবের পর্যায়েও ফেলা যায় না। কারণ, মুসলমান ও বাইজান্টীয়গণ সাইপ্রাস আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আবিসিনিয়াকে ইসলামের প্রতি সম্ভাবপূর্ণ মনোভাবের জন্য এবং নুবিয়াকে মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য জেহাদের এলাকা থেকে বাইরে রাখা হয়। কিন্তু সাইপ্রাসের বেলায় এসব কিছুই ঘটেনি। সাইপ্রাস এমন সমুদ্র বেষ্টিত এক ভূখণ্ড, যা মুসলিম ও বাইজান্টীয় নৌ-আধিপত্যের অমীমাংসিত সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল ছিল। সাধারণতঃ কোন ভূখণ্ড যদি দুই বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে অবস্থিত হয়, তবে তার নিরপেক্ষতা রক্ষার অধিক সম্ভাবনা থাকে। এভাবেই ভূমধ্যসাগরীয় দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে চুক্তির ফলে সাইপ্রাসকেও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হয়। মুসলিম আইনে এর মর্যাদা নিরপেক্ষ জগতের শামিল বলে গণ্য হয়।

উপসংহার
একটি হাদিসে আছে যে, সর্বশেষে যে জাতিকে মুসলমানরা আক্রমণ করবে, তারা হবে তুর্কী জাতি। এদের ওপর মুসলিম আক্রমণের এই বিলম্বের কারণ, এ জাতির বলিষ্ঠতা ও এ দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ। এ হাদিসটি প্রামাণ্য হোক আর না-ই হোক, এতে অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি ইসলামের মনোভাব সু-প্রকাশিত হয়েছে; অর্থাৎ আজ হোক বা কাল হোক, জেহাদ সব দেশের বিরুদ্ধে চালিয়ে যেতে হবে, তা সে দেশের জাতিত্ব ও ভৌগোলিক পরিবেশ যে কোন প্রকৃতিরই হোক না কেন। মুসলিম আইনে আবিসিনিয়া ছাড়া বোধহয় আর কোন দেশকে জেহাদ থেকে রেহাই দেয়া হয়নি। তুলনামূলক বিচারে দেখা যায় যে, নুবিয়া ও সাইপ্রাস এবং সম্ভবতঃ তুর্কীগণ স্থায়ীভাবে জেহাদের এলাকা থেকে বাদ পড়েনি; যতদিন পর্যন্ত তারা চুক্তির শর্ত পালন করে, কেবল ততদিন তাদের নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু আইনের সাধারণ প্রকৃতি অনুযায়ী অল্পকালের মধ্যেই চুক্তিগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কাজেই এমন একদিন আসবেই যখন এসব দেশকে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। দশ বছর অন্তর অন্তর চুক্তির মেয়াদ নতুন করে বাড়িয়ে নিলেও আইনের বিচারে একথাই সত্য।
শান্তি সম্পর্কীয় আইন-বিধির মত নিরপেক্ষতা আইনের দ্বারা সাময়িক উদ্দেশ্য হাসিল হত। সমগ্র পৃথিবীকে ইসলামীকরণের পূর্ব পর্যন্তই ছিল এর সক্রিয় ভূমিকা। পরবর্তীকালে অবশ্য জেহাদ স্তিমিত হয়ে আসে। কাজেই শান্তি সম্পর্কীয় আইন ও নিরপেক্ষতা আইন ততদিন পর্যন্ত বলবত থাকবে যতদিন পৃথিবীতে মুসলিম ও অমুসলিম পাশাপাশি বসবাস করবে বা সহাবস্থান করবে। নিরপেক্ষতা আইন কেবল আবিসিনিয়ার বেলায় এখনো প্রযুক্ত রয়েছে। সাইপ্রাস, নুবিয়া ও তর্কীদের বেলায় আর এ আইন খাটে না। কারণ, নুবিয়া (বর্তমান লিবিয়া) ও তুরস্ক ইসলামেরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আর সাইপ্রাস ১৫৭০ খৃস্টাব্দে উসমানীয়গণ কর্তৃক অধিকারের পর প্রায় তিন শতাব্দীকাল তাদের দখলে থাকে। আবার ১৮৭৮ সনে সাইপ্রাস খৃস্টানদের দখলে চলে যায়। যদি নিরপেক্ষতা রাখার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তবে নিরপেক্ষতা আইন যে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে না, এমন কোন কারণ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00