📄 সন্ধি
সন্ধি-চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা
ইসলাম ও অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সাধারণ সম্পর্ক বিরোধগত। তবু প্রয়োজনের তাগিদে বিশেষ করে কোন ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রের পরাজয়ের ফলে শত্রু- পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল উদ্দেশ্য বিরোধী নয়। আল্লাহ'র বিধানে অমুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া অনুমোদন করা হয়েছে:
"পবিত্র মসজিদে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, তারা ভিন্ন কি করে তোমরা মুশরিক এবং আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে পার? যে পর্যন্ত তারা সততার সঙ্গে কাজ করে, তোমরাও সততার সাথে চল। যারা খোদা-ভীরু, কেবল তাদেরই আল্লাহ ভালোবাসেন" (৯:৬)।
প্রচলিত ব্যবহার-বিধি আল-কোরআনের এই নির্দেশেরই সমর্থন জানিয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কাবাসীদের সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ চুক্তিটির শর্তাদি ও কার্যকালের মাধ্যমে মুসলিম আইনবিদগণ পরবর্তী যুক্তিগুলোর দিক-নির্দেশ করেছেন। একটি হাদিসে রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ "বাইজান্টীয়গণ তোমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে।" কাজেই আল- কোরআন ও হাদিস অনুসারে আইনবিদগণ এ সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম-স্বার্থ রক্ষিত হলে শত্রু পক্ষের সঙ্গে শান্তি-চুক্তি সম্পাদন করা বিধিসম্মত এবং এ চুক্তির ধারাগুলো পালন করতেও মুসলমানরা বাধ্য থাকবেন। প্রাথমিক খলিফাদের কার্যধারা ও আইনবিদদের সর্বসম্মত অভিমত বা ইজমার ফলে চুক্তি সম্পাদন শরিয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়েছে।
রাসূলে আকরমের (সঃ) হাতেই চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা ছিল এবং পরবর্তীকালে এ ক্ষমতা তাঁর খলিফাদের হাতে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রায়ই যুদ্ধরত সেনাপতিদের দেয়া হত। শত্রুপক্ষ যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইত, তবে যুদ্ধরত সেনাপতিকে শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেয়া হত। রাসূল (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ ক্ষতিকর চুক্তি বা ব্যবস্থা নাকচ করে দেবার ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতেন। তাঁদের অনুমতি না নিয়ে এসব চুক্তি মুসলিম সমাজে কার্যকরী করা যেত না।
সন্ধির আইনগত প্রকৃতি
সন্ধি ('মুহাদানা' বা 'মুওয়াদা') হল এক রকমের "আকদ" বা বন্ধন; চুক্তিতে কোন একটি বিষয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করার ফলে তার আইনগত ফলাফল প্রত্যক্ষ করা যায়। মুসলিম আইনের 'আকদ' (চুক্তি) পশ্চিমী আইনের চুক্তির (contract) চাইতে অনেক বেশী ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'আকদে'র বাহ্যিক আকার ও পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ঐক্যমত বা মনের মিলকেই মৌলিক জিনিস বলে মনে করা হয়। একদল প্রস্তাব ('ইজাব') করেন আর অপর দল তা গ্রহণ ('কবুল') করেন, ফলে 'মনের সমন্বয়' সম্ভব হয়। চুলচেরা বিচারে এতে পারস্পরিক সুবিধা থাকুক আর নাই থাকুক, আইনের চোখে চুক্তিটি বৈধ ও কার্যকরী বলে সাব্যস্ত হবে।
আইনগ্রন্থ "মাজাল্লা"তে চুক্তির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ "কোন বিষয়ে দুটি দল যখন করণীয় পন্থা স্থির করে তা' পালনের জন্য বাধ্যবাধকতার আওতায় পরস্পরকে আবদ্ধ করে, তার নামই চুক্তি। প্রস্তাব ও সম্মতির সমন্বয়েই এর সৃষ্টি।"
তাই ইসলামে চুক্তি আসলে মতৈক্য ও স্বীকৃতি থেকেই জন্ম নেয়; বিশেষ একটি বাহ্যিক রূপ বা পদ্ধতি পালন করার প্রয়োজন এখানে নেই। চুক্তির ধারাগুলো নির্ধারিত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি উভয়পক্ষের ওপর প্রযোজ্য হয়। চুক্তি লেখা, দস্তখত করা ও তারিখ দেয়া (কোন কোন ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখা) আইনের দিক থেকে অপরিহার্য নয়। শুধু সমঝোতা নির্দেশ করার জন্য এবং চুক্তির শর্ত ও মেয়াদ সম্পর্কীয় দলিল-পত্র রাখবার জন্যই চুক্তিটি লিখিতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হয়।
চুক্তি-সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গে যাতে করে এর শর্ত ও ধারাগুলো বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিপালিত হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। আল-কোরআনে মুসলিমকে 'ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রাখবার জন্য' আহ্বান করা হয়েছে (১৬ : ৯৩)। আরও বলা হয়েছে "মেয়াদের শেষ দিন অবধি চুক্তিটি পালন কর (৯:৪)।" তাই চুক্তির অবশ্য পালনীয় মৌলিক প্রকৃতি "আকদের" অন্তর্নিহিত অবস্থা প্রকাশ করে। সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাই একথা স্বীকার করে নিয়েছেন। ইসলাম ইমামকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির ব্যাপারে সব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শত্রুপক্ষের আক্রমণ আসন্ন হয়ে পড়লে বা তারা চুক্তি অমান্য করলে বা চুক্তিটি নাকচ করে দিলে অবশ্য চুক্তির ধারাগুলো পালন না করলেও চলবে। অবশ্য এ অবস্থায় চুক্তির পরিসমাপ্তির কথা তাদের জানিয়ে দিতে হবে।
মুসলিম চুক্তির বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করার পূর্বে বিশেষভাবে নির্বাচিত বা প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধি-চুক্তির বিবরণ বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তি পত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রত্যেকটি সন্ধির বিস্তারিত ইতিহাস বয়ান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধিপত্রের মূল দলিল ও তার সাধারণ পটভূমি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হবে।
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম সন্ধি-চুক্তি
আল-কোরআন থেকে যেমন চুক্তি পালনের নীতি এসেছে, তেমনি হযরতের কার্যধারাও কতকগুলো দিক-নির্দেশক বিধি-ব্যবস্থার পত্তন করেছে। এগুলোর ভিত্তিতেই মুসলিম ও অমুসলিম কর্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিবেশন পরিপ্রেক্ষিতে হযরত (সঃ) বিভিন্ন ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। তাঁর খলিফাগণ এগুলো আদর্শ চুক্তি হিসেবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি (যা পরে মদিনার ইহুদীরা মেনে নেন এবং এটা মদিনার অধিবাসীদের পক্ষে সনদের কাজ করে) থেকে শুরু করে হুদায়বিয়ার সন্ধি (যা মদিনার মুসলিম ও মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে অস্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করে) পর্যন্ত তিনি নানা ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইহুদী ও খৃস্টানদেরও সনদ প্রদান করেন। ফলে তারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করেন।
হিজরতের পর মদিনার গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করাই ছিল হযরতের প্রথম সন্ধির উদ্দেশ্য। ইবনে হিশামের "সিরাতে” এর মূল দলিলটি পাওয়া যায়; ওয়াকিদী'র "মাগাযী" তেও আংশিকভাবে এ সন্ধিচুক্তিটির বিবরণ পাওয়া গেছে। সন্ধিচুক্তিটির দলিলের প্রথম অংশে মদিনার বিভিন্ন গোত্রের-পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর চুক্তিটির পরবর্তী অংশে রয়েছে ইহুদীদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ। চুক্তির তারিখ সম্বন্ধে ইবনে হিশাম কোন কিছুই বলেননি; কিন্তু এটা যে হিজরী ১লা সন থেকে দ্বিতীয় সনের মাঝামাঝি কোন সময়ে সম্পাদিত হয় (খ্রিস্টাব্দ ৬২৩-৬২৪) তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, দ্বিতীয় হিজরীতেই (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকগণ যুদ্ধক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের মোকাবেলা করে।
সন্ধি-চুক্তির সনদের দলিল
আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক) মোহাজের ও আনসারদের নিয়ে ইহুদীদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত সনদটি লিপিবদ্ধ করেন। এই সনদের শর্তের ভিত্তিতে ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ইহুদীগণকে তাদের ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের অবাধ অধিকার দেয়া হয়; আর তাদের নিজেদের সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার এবং এর রক্ষা-কবচেরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে এতে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কতকগুলো বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়। নীচে চুক্তির সনদের বিবরণ দেয় হল:
মুসলিম ও ইহুদীগণ চুক্তিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক জাতি
"পরম করুণাময় ও কৃপানিধান মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। একদিকে কোরেশ বংশীয় ও ইয়াছরিবের (মদিনার) মুমিন মুসলমানগণ এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহ-সংগ্রামী, আর অন্যদিকে মদিনার ইহুদী সম্প্রদায় এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহিত একত্রে যুদ্ধ করে—তাদের সকলের প্রতি এটা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে প্রদত্ত সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সবকিছু হতে স্বতন্ত্রভাবে একটি সমাজ (রাজনৈতিক দিক হতে) গঠন করবে।
"কোরেশ বংশীয় মদিনার বিশ্বাসী মুসলমানগণ এবং অন্য যারা তাদের অনুসরণ করে, তাদের সাথে যোগ দেয় ও তাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে সংগ্রাম করে; এটা হচ্ছে, তাদের সবার প্রতি তাদের নবী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সম্প্রদায় হতে পৃথকভাবে একটি উম্মা (সমাজ) গঠন করবে।
"কোরেশ বংশীয় মোহাজেরগণ একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং বর্তমানে তারা যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই থাকবে। আর তারা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তি-মূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
ইহুদীদের অধিকার
"আউফ বংশীয়গণ পূর্বের মতই একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"সায়দাহ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-হারিস বংশীয়গণ বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"জুসম বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-নজর বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আমর-বিন-আউফ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-নাবিত বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-আ'স বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"বিশ্বাসীগণ তাদের মধ্যে কাউকে চরম ঋণ ভারগ্রস্ত অবস্থায় অথবা পরিবারের দুর্বিষহ চাপে জর্জরিত অবস্থায় একা ফেলে রাখবেন না এবং তারা তাদের আত্মীয়-বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য উদারভাবে ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য দানের সম্ভাব্য যে কোন ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ হতে কখনো বিরত থাকবেন না;
"কোন বিশ্বাসী অপর কোন বিশ্বাসীর আশ্রিত ব্যক্তির (মওলা) সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না; কোন ব্যক্তি যদি ন্যায়নীতি বিগর্হিতভাবে অপরাধ অনুষ্ঠান করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে উৎপীড়ন করে থাকে কিংবা সীমা লঙ্ঘনের অভিপ্রায়ে বা বিশ্বাসীদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শক্তির অভিলাষী হয়ে থাকে, তবে মুমিন বিশ্বাসীগণ অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবেন, এমন কি সে ব্যক্তি যদি তাদের (বিশ্বাসীদের) পুত্রও হয়ে থাকে;
"কোন বিশ্বাসী একজন অবিশ্বাসীর জন্য অপর কোন অবিশ্বাসীকে হত্যা করতে পারবে না; কিংবা তিনি একজন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোন অবিশ্বাসীকে সাহায্য বা সমর্থন করবেন না;
"দীনতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকল বিশ্বাসীর জন্যই (সমভাবে) রয়েছে আল্লাহর (আইনের) নিরাপত্তা। বিশ্বাসীগণ পরস্পরকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবেন। একজন বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে একজন দীনতম বিশ্বাসীকেও রক্ষা করবেন; অন্যান্য জাতি ভিন্ন শুধু বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাহায্যকারী;
"ইহুদীদের মধ্যে যারা আমাদের অনুসরণ করে, তারা সমভাবে আমাদের সমর্থন এবং সর্বপ্রকার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করবে; তাদের প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন কিংবা অন্যায় ব্যবহার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন অভিপ্রায় পোষণ করবো না অথবা তাদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করব না। সবার জন্যই সমভাবে রয়েছে বিশ্বাসীদের শান্তির নিশ্চয়তা;
"বিশ্বাসীগণ সম্মিলিতভাবে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবেন। আল্লাহর পথে যুদ্ধানুষ্ঠানের পরে কোন বিশ্বাসী অপর বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে এবং তাদের মধ্যে ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে মতৈক্য ছাড়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবেন না;
"যে সব যোদ্ধা আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করবে এবং ক্ষীপ্রগতিতে আক্রমণ চালাবেন, তারা একের পর এক অগ্রসর হবেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন আর পরস্পরকে অনুসরণ করবেন;
"আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালনাকালে বিশ্বাসীগণ তাদের রক্তপাতের (কিংবা তাদের প্রতি হামলার) প্রতিশোধ গ্রহণের কাজে তাদের পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা করবেন। একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী নিশ্চয়ই সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পথের নির্দেশ অনুসরণ করবেন;
"কোন মুশরিক مسلمانوں প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কোরেশদের ধন-মাল কিংবা জনবল দিয়ে সাহায্য করতে পারবে না কিংবা তাদের (কোরেশদের) কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না; অথবা কোন বিশ্বাসীকে (কোরেশদের প্রতি আক্রমণে) বাধা দেবে না;
“যে কেউ একজন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তাকে অবশ্যই (হত্যার কার্য-কারণ সম্পর্কে) বিশ্বাসীর ওয়ালীর (অভিভাবক) সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে; এবং অন্যায়ভাবে বিশ্বাসীকে হত্যা করা হলে তার বদলে হত্যাকারীর মৃত্যুর বিধান করতে হবে; নিহত বিশ্বাসীর ওয়ালী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত বিশ্বাসীকে অবশ্যই হত্যাকারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই তাদের জন্য বৈধ হবে না;
"এই চুক্তির দলিলে যা' কিছু লিখিত রয়েছে—যে বিশ্বাসী তা স্বীকার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে (কেয়ামত) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তার পক্ষে কোন অপরাধীকে সাহায্য দান করা কিংবা তাকে আশ্রয় দেয়া বৈধ হবে না। এবং যারা তাকে আশ্রয় ও সাহায্য দান করবে, শেষ বিচারের দিন নিশ্চয়ই তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ (গজব) ও ক্রোধ আপতিত হবে। আর তাঁর (আল্লাহর) অভিসম্পাৎ গ্রহণ করা নিশ্চয়ই উচিত হবে না; কোন বিষয়ে তোমরা ভিন্ন মত পোষণ করলে, তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই তোমরা সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসরণ করবে:
মুসলিম ও ইহুদী একই রাজনৈতিক জাতি
(ক) "যে পর্যন্ত ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে, সে পর্যন্ত তাদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হতে হবে এবং যে পর্যন্ত মুসলমানগণ যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকবেন, সে পর্যন্ত ইহুদীগণও তাদের সাথে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে যাবেন; "আউফ গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে একই (রাজনৈতিক দিক থেকে) জাতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইহুদীদের জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; আর বিশ্বাসীদের জন্যও রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; তাদের মাওয়ালীদের (আশ্রিত বা দাসদের) এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজনেরও এই একই অধিকার থাকবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এই অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা (জালিম ও পাপীগণ) তাদের এবং তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারে না:
(খ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-নাজ্জার গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(গ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-হারিস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ঘ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সায়দাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ঙ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, জুসম গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(চ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আউস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ছ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সালাবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এ অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা তাদের ও তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারবে না; সালাবাহ গোত্র যে সব অধিকার লাভ করেছে, তাদের বংশসম্ভূত জাফনাহ গোত্রও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(জ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-শুতেবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে নিশ্চয়ই ন্যায়নিষ্ঠা ও সদাচরণ থেকে অপরাধের পার্থক্য রয়েছে;
১। সালাহবাহদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের আশ্রিতদেরও (মাওয়ালী) সেই সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের সালাহবাহ গোত্রের অনুরূপই গণ্য করা হবে; এবং
২। ইহুদীদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের অনুগামীদেরও (বিতানা) সে সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের ইহুদীদের অনুরূপই গণ্য করা হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যবাধকতা
"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমোদন ব্যতীত কোন ইহুদীই (মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে) যোগদান করতে পারবে না;
"কাউকে বৈধভাবে আঘাতের (বা রক্তপাতের) প্রতিশোধ গ্রহণে বাধা দেয়া হবে না; যে কেউ অন্য কাউকে বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা করে, সে তার এবং তার পরিজনদের জীবনের বিনিময়েই এইরূপ করে থাকে। আর যার প্রতি এইরূপ অন্যায় করা হয়েছে, একমাত্র সে (হত্যাকারী) এবং তার পরিবারই তার নিকট দায়ী থাকবে। এবং এইরূপ ঘটনায় যে ব্যক্তি অধিকতর ভাল ব্যবহার করে থাকে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষেই আছেন;
"ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বহন করবে এবং মুসলমানরাও তাদের ব্যয়ভার বহন করবে; এবং এই চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর যারা হামলা করে থাকে, তারা (চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়) তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই নিজেদের পরস্পরকে সাহায্য করবে; এবং তাদের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও কল্যাণবোধ; এবং তারা কখনো কোন অপরাধ কিংবা পাপাচার করবে না; নিশ্চয়ই নির্দোষিতা অপরাধ হতে পৃথক (অর্থাৎ অপরাধীদের সাথে ভিন্ন রকম ব্যবহার করা হবে); আর তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে তারা তাদের দুশমনদের (যারা চুক্তিবদ্ধ মিত্র সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে) ওপর নিশ্চয়ই জয়লাভ করবে; কেউই তার মিত্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কিছু করতে পারবে না; কারণ, নিশ্চয়ই মজলুমের পক্ষেই বিজয় আসবে; এবং যে ব্যক্তি তার মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেনি, সে সাহায্য পাবে;
"যে পর্যন্ত বিশ্বাসীগণ হামলাকারী দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাবে, সে পর্যন্ত ইহুদীগণ তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে এবং বিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হবে;
"মদিনা নগরীর অভ্যন্তর ভাগ (দওফ) এই সনদের অধিকারীদের (চুক্তিবদ্ধ লোকদের) নিকট পবিত্র থাকবে;
"প্রতিবেশীকে আমাদের নিজেদের মতই (স্বয়ং আশ্রয়দাতা প্রতিবেশীর মতই) গণ্য করতে হবে এবং তার প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন করা হবে না কিংবা তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না—যদি না তার পক্ষ থেকে কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা সে কোন অপরাধ করে থাকে। স্ত্রীলোককে তার আত্মীয়-বর্গের সম্মতি ব্যতীত আশ্রয় দেয়া যাবে না;
ইসলামের মৌলিক নীতির সার্বভৌমত্ব
"এই চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে যদি কোন বিষয়ে কোন বিরোধ বা বিভেদের সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে কোন অশুভ পরিণতির আশঙ্কা দেখা দেয় তবে তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আর তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। যে এই চুক্তিপত্রের বিধানগুলো পালনের জন্যে সব চেয়ে বেশী আগ্রহশীল থাকবে এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে এগুলো পালন করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে থাকবেন। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই এই সনদ কার্যকরীকরণে সাহায্য করবেন। (শত্রুভাবাপন্ন) কোরেশগণ এবং তাদের সাহায্যকারী ও সমর্থকদের সাহায্য দান করা চলবে না;
"যারা মদিনা দখলের হুমকি দান করবে, তাদের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ দলগুলো একে অপরকে সাহায্য দান করবে এবং যারা আক্রমণ করবে, (মুসলমান ও ইহুদীগণ) তাদের ওপর অবশ্যই জয়লাভ করবে;
"কোন শান্তিচুক্তি সম্পাদনে ইহুদীদের অংশ গ্রহণের জন্য মুসলমানগণ যদি তাদের প্রতি আহ্বান জানায়, তবে অবশ্যই তাদের তা গ্রহণ করতে হবে; এবং যখন ইহুদীদের পক্ষ থেকে মুসলমানগণকে অনুরূপ আহ্বান জানানো হবে, তখন তাদের জন্যও অনুরূপ কর্তব্য হবে; তবে কেবল ওই সব ব্যক্তি ছাড়া যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জেহাদ (ধর্মের জন্য যুদ্ধ) করে (অর্থাৎ তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে);
"প্রত্যেক দল পূর্বের মতই তাদের পক্ষ হতে তাদের নিজ নিজ অংশ পাবে;
"নিশ্চয়ই আল-আউস গোত্রের ইহুদীগণ, আর তাদের আশ্রিতগণ এবং তারা নিজেরা সদ্ব্যবহার অক্ষুণ্ণ রাখলে এই চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর মতই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ সর্বপ্রকার অধিকার ও মর্যাদা লাভ করবে;
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গেই আছে যে এই চুক্তিপত্রে যা কিছু রয়েছে, তার প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত এবং ন্যায়পরায়ণ; জালিম ও পাপাচারী ব্যতীত কেউই এই চুক্তির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না; এবং এই চুক্তিপত্র জালিম ও পাপাচারীদের জন্য নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা করবে না;
"যারা মদিনা নগরে বসবাস করবে, তাদের যে কেউ যুদ্ধে থাক বা ঘরে অবস্থান করুক, তারা নিরাপদে থাকবে, কেবলমাত্র অত্যাচারী ও পাপাচারীগণ ব্যতীত; তাদের জন্য নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই;
"যারা ধর্মশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে জীবনযাপন করবে এবং এই চুক্তির বিধানসমূহ কার্যকরী করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের আশ্রয় দেবেন ও নিরাপদ রাখবেন। আর নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)।"
এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, এ চুক্তিটি একটি ত্রি-পাক্ষিক চুক্তি। মক্কার বাস্তুচ্যুত মোহাজের, মদিনার আনসার (মোহাজেরদের সাহায্যকারী ও অনুগামীগণ) এবং ইহুদীগণ-এই তিন পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে চুক্তিপত্রের দলিলটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে, এটা কেবলমাত্র একটা সাধারণ মৈত্রীচুক্তি নয়; বস্তুত এর লক্ষ্য ও গুরুত্ব আরো অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর ক্ষেত্র আরো ব্যাপক। চুক্তির প্রথম অংশ হতেই সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌছার প্রয়াসই কেবল এর লক্ষ্য নয়।
প্রকৃতপক্ষে, সংকীর্ণ গোষ্ঠিগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় নৈউ সংস্থার আওতায় মদিনার সকল প্রতিদ্বন্দ্বী আরব গোত্রকে সম্মিলিত করে অবশিষ্ট জন সমষ্টি হতে স্বতন্ত্র একটি জাতি গঠনই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রারম্ভিক গঠনতন্ত্রও বলা যেতে পারে। বস্তুতঃ এরই ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবদের জীবন-প্রবাহের গোটা স্নায়ুকেন্দ্রকে তথা তাদের দৃষ্টিসীমাকে সামগ্রিকভাবে একটি নয়া ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত করে একটি সম্মিলিত সমাজসংস্থার সমস্ত বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সংকীর্ণ গোষ্ঠিকেন্দ্রিক আনুগত্যের বিলোপ সাধনে ব্রতী হন।
চুক্তির দ্বিতীয় অংশ হতে বোঝা যায় যে, আরব গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি পক্ষ ও ইহুদী গোত্রগুলোকে নিয়ে অপর একটি পক্ষ গঠিত হয় এবং অতঃপর উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়। বিশ্বাসীদের নিয়ে প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের সমন্বয়ে একটি জাতি গঠিত হয়; কিন্তু এককভাবে সমস্ত ইহুদী গোত্রের সমবায়ে কোন স্বতন্ত্র জাতি গঠন করা হয়নি। তবে স্বতন্ত্রভাবে আশ্রিত ও অনুগামীগণসহ প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের স্বকীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার সংরক্ষিত হয়।
চুক্তির এই অংশের প্রকৃতি হতে বোঝা যায় যে, মদিনাকে কেন্দ্র করে আরব ও ইহুদী গোত্রসমূহের সমবায়ে একটা কনফেডারেশন গঠিত হয়েছে। এই কনফেডারেশনের অংশ হিসেবে মদিনা অগ্রবর্তী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ব্যাপক প্রাধান্য বিস্তার করে। এই চুক্তির ফলেই কনফেডারেশনের সমস্ত দল বা গোত্রের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একটা ঐক্যগত সমঝোতা বা পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়। যদি কোন সময় কোন একটি ইহুদী গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ত, তখন এই সম্পর্ক বিশেষ সহায়ক হত।
হুদায়বিয়ার সন্ধি
বদরের যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে মক্কাবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন (খ্রিস্টাব্দ ৬২৪-৩০) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মর্যাদা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে তিনি মদিনার আশেপাশের গোত্রগুলোকে ইসলামের রাষ্টীয় কর্তৃত্বাধীনে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস পান। ইবনে হিশামের ভাষায়, বদরের সামরিক সাফল্যের পর হযরত প্রকৃতপক্ষে হেজাযের একচ্ছত্র শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ওহুদের যুদ্ধের (খ্রিস্টাব্দ ৬২৫) নগণ্য পরাজয় তাঁর ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কারণ, কিছুকাল পরেই খন্দকের যুদ্ধে (খ্রিস্টাব্দ ৬২৭) তিনি আবার এক সুদূরপ্রসারী সাফল্য লাভ করেন।
ঠিক এই সময়েই ইহুদীদের নাযীর গোত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে তাদের সাথে সম্পাদিত মৈত্রীচুক্তি বাতিল হয়ে যায়। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, ইহুদীগণ (নাযীর গোত্র) কর্তৃক হযরতের জীবননাশের ষড়যন্ত্রই এই চুক্তি বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ। অবশ্য চক্রান্তকারী বানু নাযীর ছাড়া চুক্তির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ইহুদী গোত্রের সঙ্গে হযরত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখেন। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়ার জন্যে হযরত বানু নাযীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। কিন্তু এর পরও কিছুকাল ইহুদীদের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটেনি; কারণ, অবশিষ্ট ইহুদীগণ বিশেষ করে স্ব-ধর্মাবলম্বী বানু নাযীরের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল কোরায়জা গোত্রও এই সময় হযরতের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মদিনার مسلمانوں সঙ্গে (ইহুদীদের) মৈত্রীচুক্তির ফলে ইহুদীদের এই শত্রুতার অবসান ঘটে।
হযরত প্রথমতঃ তাঁর পরম শত্রু কোরেশদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে মক্কা বিজয়ের দ্বারা তাঁর জীবনের সাফল্যকে পূণাঙ্গ রূপ দান করেন। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, মক্কায় হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হযরত কোরেশদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌছেন। হজব্রত পালন এই সমঝোতায় পৌঁছানোর আশু কারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে তখন উভয়পক্ষের অবস্থা থেকে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, অন্ততঃ সাময়িকভাবে হলেও তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। কোরেশদের অবস্থা তখনো এমন পর্যায়ে ছিল যে, মদিনার শাসন-কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাদের পরাভূত করা সহজ-সাধ্য ছিল না বিশেষ করে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে। অন্যদিকে মক্কাবাসীগণ বদর ও খন্দকের যুদ্ধে উপর্যুাপরি দু'বার مسلمانوں হাতে চরমভাবে পরাজিত হয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সিরিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর ফলে কোরেশদের বাণিজ্য-কাফেলা প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় অন্ততঃ স্বল্পকালের জন্যে হলেও উভয়পক্ষ একটা শান্তিচুক্তির জন্য বিশেষভাবে আগ্রহশীল হয়ে ওঠে। যে ঘটনাবলী শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তা হচ্ছে সংক্ষেপে এইঃ
রাসূল তাঁর মুষ্টিমেয় সংখ্যক অনুগামী নিয়ে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কোরেশগণ হযরতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আশঙ্কা ও সন্দেহ পোষণ করে পথিমধ্যেই তাঁকে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় হযরত কোরেশদের নিকট শান্তির প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত করেন। এতদানুযায়ী তিনি তাঁর জামাতা ও ভাবী তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানকে তাঁর শান্তি প্রস্তাবসহ কোরেশদের নিকট প্রেরণ করেন। মক্কাবাসীগণ এ প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং হযরতের সঙ্গে শান্তিচুক্তির শর্তাদি সম্পর্কে আলোচনার জন্যে সুহাইল ইবনে-আমরকে প্রেরণ করে। এই আলাপ-আলোচনার ফলেই 'হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি' নামে অভিহিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। হযরত রাসূলের চাচাতো ভাই ও ভাবী চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে-আবু তালেব চুক্তির দলিল লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সম্পাদকের কাজ করেন।
নীচে চুক্তিটির বিবরণ দেয়া হল:
"হে আল্লাহ্! তোমার নামে শুরু করছি। এ চুক্তিটি মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ শান্তি পূর্ণভাবে সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে একমত হয়ে সম্পাদন করেছেন;
"তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে একমত হয়ে দশ বছর কালের জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিয়েছেন; পরস্পরের আক্রমণ থেকে (উভয়পক্ষের) জনসাধারণ নিরাপদ থাকবে;
"কোরেশদের কোন লোক তার ওয়ালীর (অভিভাবক) অনুমতি ছাড়া মুহাম্মদের (সঃ) দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে তাদের (কোরেশদের) কাছে প্রত্যার্পণ করতে হবে; কিন্তু মুহাম্মদের (স:) কোন অনুগামী কোরেশদের দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে কোনরূপ বাধা দেয়া হবে না;
"আমাদের উভয় দলের পক্ষেই অসদাচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ নিষিদ্ধ; এবং আমাদের মধ্যে স্বপক্ষ ত্যাগ ও বিশ্বাসঘাতকতার কোনরূপ অপরাধ অনুষ্ঠিত হতে পারবে না;
"যারা (যেসব লোক) মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাঁর চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারা অবাধে তা' করতে পারবে; এবং যারা কোরেশদের সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাদের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারাও অবাধে তা' করতে পারবে।"
এই চুক্তির ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সদিচ্ছা সম্পর্কে মক্কাবাসীদের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য কয়েকজন সাক্ষী উপস্থিত করেন। এঁরা চুক্তির শর্তসমূহ পালন ও অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ করেন। এই সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বকর, উমর ইবনে আল-খাত্তাব ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ। এই চুক্তির ফলে ইসলামের আরেকটি বিরাট বিজয় সূচীত হয়। কারণ, এই চুক্তির মাধ্যমেই অবশেষে অভিজাত কোরেশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শাসন-কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং গৌণভাবে হলেও ইসলামকে মদিনার রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। এতে মক্কায় হযরতের মর্যাদা সমুন্নত হয় এবং সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। অথচ মদিনায় হিজরতের পূর্বে এক সময়ে এই মক্কাতেই তাঁকে অকথ্য লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল।
হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এই রীতির অনুবর্তন হয় যে, মুসলিম কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী মেয়াদের ভিত্তিতে মুশরিকদের (অংশীবাদী) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন। এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে আইনবিদদের মধ্যে অবশ্য মত-বিরোধ রয়েছে। কোন কোন আইনবিদ হুদায়বিয়ার চুক্তির অনুরূপ দশ বছরের মেয়াদ অনুমোদন করেছেন। আবার কেউ বা দু-তিন বছরের মেয়াদের কথা বলেছেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এসব চুক্তি দু-তিন বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। অবশ্য আইনবিদগণ এ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, শত্রুদের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল স্বার্থের পরিপন্থী নয়।
হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তিও কার্যতঃ দু' বছরের মধ্যেই লঙ্ঘন করা হয়। ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, مسلمانوں ওপর কোরেশদের অবৈধ আক্রমণের ফলেই চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়। চুক্তির বিধানে "যারা মুহাম্মদের (সঃ) দলে এবং তাঁর মৈত্রীতে যোগদান করতে চাইবে, তারা অবাধে তা' করতে পারবে" বলে যে স্বীকৃত শর্তটি রয়েছে, এ হামলার দ্বারা কোরেশগণ সরাসরি তা লঙ্ঘন করে। এরপরও অবিশ্যি কোরেশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ-আলোচনা চালান হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সময় কোরেশদের তুলনায় মুসলমানগণ অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে; ঠিক এই অবস্থায় مسلمانوں ওপর একটা অন্যায় হামলা দ্বারা তারা একটা বৃহত্তর শক্তি পরীক্ষাকে আসন্ন করে তোলে। নিজের অনুগামীদের ওপর কোরেশদের এই অহেতুক আক্রমণে হযরত (সঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু তবুও তিনি তাদের সঙ্গে একটা আপোষ রফার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে মুসলমানগণ মক্কা অভিমুখে সামরিক অভিযান পরিচালনার সংকল্প করেন। হিজরী ৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩০) তাঁরা মক্কা দখল করেন। এই সময় কোরেশগণ অত্যন্ত হীনবল ও শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা নব বলে উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনীর গতিরোধ করতে কিংবা তাদের সাথে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহস পেল না। হযরত (সঃ) তাঁর বিজয়পতাকা হস্তে মুক্ত তোরণ দ্বার দিয়ে অবাধে পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করলেন।
মক্কা বিজয়ের ফলে দুই নগর-রাষ্ট্রের বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটে। আর এর ফলে সমগ্র হেজাযে ইসলামের সুদৃঢ় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এরপর হযরতের (সঃ) মিশন এক বিস্তৃততর লক্ষ্যপানে সম্প্রসারিত হয়।
রাষ্ট্রীয় সনদ হিসেবে জিম্মী-চুক্তির স্থান
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরো এক ধরনের কতকগুলো চুক্তি সম্পাদন করেন। এগুলো পূর্বোক্ত চুক্তিগুলো হতে একটু আলাদা ধরনের। আরবের কেতাবী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিও এর মধ্যে রয়েছে। এসব চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ কেতাবীদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং অবাধভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত হয়। অবিশ্যি, তারা যতদিন চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলবেন, ততদিনই এই নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এই চুক্তিগুলোর আইনগত প্রকৃতি সম্পর্কে এ বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে (সপ্তদশ পরিচ্ছেদ)। এই পরিচ্ছেদে এ চুক্তিগুলোর কাঠামো ও পদ্ধতি এবং অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। জেরুজালেমের প্রধান খৃস্টান বিশপ দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর-বিন-আল-খাত্তাবের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেন, এ শ্রেণীর চুক্তির ক্ষেত্রে তার চাইতে উৎকৃষ্টতর নজির আর পাওয়া যায় না। এ চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে প্রধান বিশপ দাবী করেন যে, এই চুক্তির দলিলে স্বয়ং খলিফাকেই স্বাক্ষর দান করতে হবে, তাঁর কোন প্রতিনিধির স্বাক্ষর হলে চলবে না। হিরা ও দামেস্কের শান্তিচুক্তির দলিলে কিন্তু খলিফার প্রতিনিধিগণই স্বাক্ষর দান করেন। হযরত উমর প্রধান বিশপের দাবীতে সম্মত হন এবং চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দানের জনে। জেরুজালেম গমন করেন। হিজরী ১৭ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩৮) এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। নীচে চুক্তির শর্তগুলোর বিবরণ দেয়া হল :
"পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি।
"আমীরুল মুমেনীন (বিশ্বাসীদের নেতা) আবদুল্লাহ উমর ইলিয়ার (জেরুজালেম) অধিবাসীগণকে এগুলো (এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিধি-ব্যবস্থা ও অধিকারসমূহ) মঞ্জুর করেছেন;
"তিনি তাদের জীবন, ধনসম্পদ, গীর্জা ও ক্রস (যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান) রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন:
"তাদের গীর্জায় কেউ (কোন বিদেশী) বাস করতে পারবে ন, কিন্তু কে এব (পার্জার) কোনরূপ ক্ষতি বা ধ্বংস সবন করা যাবে না। আর তাদের এস কি তাদের
"তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের (ধর্মীয় বিধি-ব্যবস্থা বা আচার-অনুষ্ঠান) জন্য তাদের ওপর কোনরূপ জোর জবরদস্তি করা চলবে না, কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার জুলুম বা উৎপীড়ন চলবে না;
"ইলিয়া নগরে (জেরুজালেমে) তাদের সঙ্গে ইহুদীদের বসবাসের অনুমতি দেয়া যাবে না;
"মাদাইনের (সাবেক পারস্যের রাজধানী) অধিবাসীদের মত সমানুপাতে ইলিয়ার অধিবাসীদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে;
"ইলিয়ার অধিবাসীগণকে রুম (রোমান বা বাইজান্টীয়) ও তস্করদের নগর ছেড়ে যেতে দিতে হবে। যদি তারা (রোমানগণ) নগর ছেড়ে যায়, তবে তাদের স্বদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। অবশ্য যে সব বাইজান্টীয় নগরে বসবাস করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে; তবে জিযিয়ার ব্যাপারে ইলিয়াবাসীদের অনুরূপ শর্তে তাদেরও স্বীকৃত হতে হবে;
"ইলিয়ার অধিবাসীদের মধ্য হতে যে সব লোক বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তারা তাদের গীর্জা ও ক্রস পরিত্যাগ করে গেলে তাদের জীবন এবং ধনসম্পদের নিরপত্তা-বিধান করা হবে;
"কৃষিভূমির যে সব লোক (কৃষক) পূর্ব থেকেই এই নগরে (ইলিয়ায়) বসবাস করে আসছিল, তারা এখানে অবস্থান করতে চাইলে তাদের সে অধিকার দেয়া হবে, তবে নগরে অন্যান্য অধিবাসীদের মত তাদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে। তবে যারা বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে যেতে চায়, তারা (অবাধে) তা' পারবে; আর যারা সাময়িকভাবে জনপদে (তাদের ভূমিতে) তাদের লোকদের কাছে যেতে চায়, ফসল তোলার মওসুম পর্যন্ত তারা তথায় যেতে বা অবস্থান করতে পারবে;
"নগরের বাসিন্দাদের জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে এই চুক্তির দলিলে (এই দলিলে প্রদত্ত শর্তসমূহ অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে) আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, খলিফাগণ ও বিশ্বাসীদের (পক্ষ হতে) প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হল।
"সাক্ষীগণ : খালিদ ইবনে আল-ওয়ালীদ, আমর ইবনে আল-আস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান।
"হিজরী ১৫ সালে এই চুক্তির দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়।"
প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী সাধারণ মাথা-গণতি কর হিসেবে কেতাবীদের যেমন নিয়মিতভাবে জিযিয়া প্রদান করতে হত, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক জিম্মী হিসেবে তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণকর বিধিব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ সমন্বিত অধিকারের আইনানুগ রাষ্ট্রীয় সনদও ছিল। অন্যান্য চুক্তির মত জিম্মী অধিকার সংরক্ষণের এই সনদটিও যথারীতি আলাপ-আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়। তবে বিশেষভাবে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এ চুক্তিটির পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, এ চুক্তিটি স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; কারণ, চুক্তির কোন পক্ষের কোন লোক কর্তৃক এর শর্তাদি লঙ্ঘিত হলেও অপরপক্ষের ওপর শর্তের বাধ্যবাধকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়তঃ, চুক্তিটি প্রযুক্ত বা বলবৎ হওয়ার সময় থেকেই কেতাবীগণ খেলাফতের (দারুল ইসলামের) নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে। গোড়ার দিকে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো দুই স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলেও শেষ পর্যন্ত কেতাবী সম্প্রদায়গুলো (জিম্মীগণ) ইসলামী জাতীয়তার আওতায় শামিল হলে চুক্তির প্রকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়। অবিশ্যি, ইসলামী জাতীয়তার অঙ্গীভূত হলেও অনেকাংশই এই সম্প্রদায়সমূহের স্বায়ত্বশাসনাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আইনবিদগণ ইসলামের সঙ্গে জিম্মীদের সম্পর্কের বিষয় সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থাকে শরিয়তের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। ফলে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো (জিম্মী সম্বন্ধীয় চুক্তি) রাষ্ট্রীয় শাসন-সংবিধানের মর্যাদা লাভ করে। জিম্মীদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো পরবর্তীকালে 'উমরের সনদ' বলে অভিহিত হয়।
খলিফাদের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহ
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিসমূহকে পরবর্তীকালে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণ (খলিফাগণ) অবিচলিত নিষ্ঠার সাথে এ আদর্শ অনুসরণ করে গেছেন। আইনগত প্রকৃতির দিক থেকে এমন কি কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর সাথে খলিফাগণ কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।
পরবর্তীকালে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য এবং পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ায় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের তাগিদে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ধর্মীয় উদ্দেশ্য-প্রধান চুক্তিগুলো হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক শ্রেণীর নয়া চুক্তির সৃষ্টি হল। উমাইয়া শাসন আমলে খলিফা ১ম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিক বাইজান্টীয়দের (রোমান) সাথে কতিপয় চুক্তিতে আবদ্ধ হন। সেই সময় মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় বাইজান্টীয় আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। এমতাবস্থায় তাদের আক্রমণ পরিহারের উদ্দেশ্যে তাঁরা শুল্ক দানের শর্তে তাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। মুয়াবিয়া তখনো খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেননি। খেলাফত নিয়ে তিনি তখনো হযরত আলীর সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো শর্তে তিনি বাইজান্টীয় সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্স-এর সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিজের কর্তৃত্ববলে মুয়াবিয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি সম্রাটকে শুল্ক দিতে স্বীকৃত হন। ইরাকের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকাকালে অন্যতম উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকও (হিজরী ৬৫-৮৬; খ্রিস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। আইনবিদগণ অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের ব্যাপারে ইমামের কার্যের বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। আল-আউযায়ী (মৃত্যু: হিজরী ১৫৭; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৩) ও সুফিয়ান আস-সাউরী (মৃত্যু হিজরী ১৬১; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৭) এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, প্রয়োজনের তাগিদে অনুরূপ শুল্ক প্রদান দোষাবহ নয়। এঁরা উভয়েই উমাইয়া আমলের লোক ছিলেন। তবে মুসলিম শক্তির গৌরবময় যুগের আইনবিদ ইমাম শাফেয়ী এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। হানাফী আইনবিদগণও অনিবার্য কারণ ব্যতীত (অর্থাৎ অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া) অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। তবে অধিকাংশ আইনবিদই বার্ষিক শুল্ক দানের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন; অবশ্য বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প কালের জন্য অনুরূপ শুল্ক প্রদান করা যেতে পারে বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেবলমাত্র চরমপন্থী আইনবিদ আল-লুলু যে কোন পরিস্থিতেই হোক না কেন, শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। এমন কি শক্তির দিক থেকে مسلمانوں অবস্থা দুর্বল বলে মনে করলেও শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের পরিবর্তে ইমামের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত বলে তিনি রায় দেন।
আব্বাসীয় আমলে খলিফাগণ নানাবিধ কারণে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। প্রথমতঃ, উপর্যুপরি সীমান্ত লঙ্ঘন বন্ধের জন্যে উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। কারণ, আব্বাসীয়-বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রাকৃতিক আড়ালের স্বল্পতা হেতু উভয়পক্ষ প্রায়ই জবরদস্তিমূলক পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করত। আব্বাসীয় বংশের শাসন আমলের প্রথম দিকে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী বাইজান্টীয় সম্রাটগণ বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে বার্ষিক শুল্ক দিতে বাধ্য হন। এ ভাবেই বাইজান্টীয় সম্রাজ্ঞী ইরিন (মৃত্যু খ্রিস্টাব্দ ৮০২) খলিফা হারুনুর রশীদকে শুল্ক দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে বার বার হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। সম্রাট নিসিফোরসের রাজ্যভিষেক পর্যন্ত এই চুক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু নিসিফোরস সাম্রাজ্যিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত সমস্ত শুল্ক ফেরত চেয়ে বাগদাদে একটি অবমাননাকর পত্র প্রেরণ করেন। খলিফা হারুন এতে খুব ক্রুদ্ধ হন এবং নিসিফোরসকে সমুচিত জওয়াব দানের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে, নিসিফোরস বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে পুনরায় নতুনভাবে শুল্ক প্রদান করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরে বাগদাদের খলিফাদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ক্ষীয়মাণ হয়ে আসলে কন্সট্যানটিনোপলের (বাইজান্টীয়) সম্রাটগণ তাঁদের শুল্ক দান বন্ধ করে দেন; এমন কি তাঁরা তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সীমান্তের ওপরও হানা দিতে শুরু করেন। মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ক্রুডেস যুদ্ধের নায়ক রাজন্যবর্গের সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি সম্পাদিত হয়। আঞ্চলিক খণ্ড সংঘর্ষের অবসান, অবাধভাবে সাধারণ লোকদের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল বা পরিভ্রমণ, ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শন, হজব্রত পালন প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই এই শ্রেণীর চুক্তি হয়। হজব্রত পালন কিংবা পবিত্র ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ-সুবিধার বিশেষ উদ্দেশ্যে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দীন ও ক্রুসেড নায়ক রিচার্ড কু'র-ডি-লায়নের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে আর এক শ্রেণীর চুক্তিও সম্পাদিত হয়। এগুলো 'ফিদা-চুক্তি' (ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য চুক্তি) নামে অভিহিত। বন্দী বিনিময়ের ভিত্তিতে কিংবা স্বীকৃত অর্থ প্রদান করে যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে বিজয়ী তাঁর রাষ্ট্রীয় তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন। অপরপক্ষে, এর ফলে হাজার হাজার হতভাগ্য যুদ্ধবন্দীর জীবন রক্ষা পেত। এ চুক্তির ব্যবস্থা না থাকলে হয় এরা নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করত কিংবা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
উমাইয়া আমলে ফিদা-চুক্তির কোন উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বন্দী বিনিময় করার রেওয়াজ তখনো ছিল। আরব ইতিহাসকারদের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, চুক্তির মাধ্যমে সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে ফিদা-চুক্তি খলিফা হারুনুর রশীদের আমলেই প্রথম প্রবর্তিত হয়। হিজরী ১৮১ সালে হারুন চুক্তিটি সম্পাদন করেন। এর ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭শ' মুসলিম বন্দী মুক্তিলাভ করে। ইতিহাসবেত্তা আল-মাসুদী বলেন যে, খলিফা হারুনের আমল থেকে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত অনুরূপ মোট ১২টি ফিদা-চুক্তি সম্পাদিত হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানাদির পর বন্দীদের মুক্তিদান কার্য সম্পন্ন হত। উভয়পক্ষই এই উপলক্ষে নানাবিধ আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করতেন।
চুক্তির শর্তাদি কার্যকরী করার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিভূ (রাহাইন) বিনিময়েরও ব্যবস্থা সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়। প্রাচীন চীন ও রোমে এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। প্রাচীন রীতিতে এইরূপ বিধান ছিল যে, চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও শর্তাদি যথাযথভাবে কার্যকরী করা হলে প্রতিভূদের নিরুপদ্রবে তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে দেয়া হত। আর যদি কোন কারণে চুক্তি লঙ্ঘন করা হত, প্রতিভূদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হত এবং অনেক সময় তাদের উৎপীড়ন ও দুর্দশাও ভোগ করতে হত। কিন্তু মুসলমানগণ প্রতিভূদের নিজেদের আমানত হিসেবে মনে করতেন এবং তাদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তা দান করতেন। প্রতিভূদের সঙ্গে তাঁরা ন্যায়বিচার ও সহৃদয় ব্যবহার করতেন। চুক্তিভঙ্গ হলে এবং যুদ্ধ ঘোষিত হলে মুসলমানগণ প্রতিভূদের তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ না বাধলে প্রতিভূদের হয় আগের মতই নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখা হত কিংবা তাদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হত।
চুক্তিগুলোর সাধারণ প্রকৃতি
মুসলমানদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনার ভিত্তিতে সংক্ষেপে নিম্নোক্ত পর্যায়ে এ সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ ধারণায় পৌঁছা যেতে পারে:
প্রথমতঃ, মুসলিম-চুক্তিগুলো মোটের ওপর সংক্ষিপ্ত ও সাধারণভাবে একই প্রকৃতির। তাছাড়া, চুক্তির শর্তাদির প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কেও কোন বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি। অনেক সময় অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ততার দরুন বিষয়বস্তু ও শব্দবিন্যাস অস্পষ্ট থেকে গেছে।
দ্বিতীয়তঃ, প্রত্যেক চুক্তির ভূমিকায় সাধারণভাবে বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) কথাটি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের নামের তালিকা ও পদবীর উল্লেখ থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজে যে চুক্তিগুলো সম্পাদন করে গেছেন, তাতেও অনুরূপভাবে 'আল্লাহ'র রাসূল' কথাটির সাধারণ উল্লেখ দেখা যায়। একমাত্র হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তিটিতে (কোরেশদের অনিচ্ছার জন্য) এর উল্লেখ ছিল না। হযরতের উত্তরাধিকারী খলিফাগণ যে সব চুক্তি সম্পাদন করেছেন, তাতে তাঁদের উপাধি 'খলিফা' বা 'আমিরুল মুমেনীন' কথাটি সাধারণভাবে উল্লিখিত হয়েছে।
সাধারণতঃ, সাক্ষীদের নামোল্লেখ করে চুক্তির সম্পাদন-কার্য সমাপ্ত করা হয়। চুক্তির বিষয়বস্তুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার সময় এই সব সাক্ষী উপস্থিত থাকতেন।
তৃতীয়তঃ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধির মূল বিষয়বস্তুর পরিবর্তন বা বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগের সন্ধি চুক্তিগুলো ছিল প্রধানতঃ ধর্মীয় উদ্দেশ্যভিত্তিক; আর পরবর্তী খলিফাগণ কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিগুলো ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যভিত্তিক। মুসলিম আইনবিদগণ অবশ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী চুক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। এ ব্যাপারে চুক্তির বিষয়বস্তুর পক্ষগুলোর সাথে মুসলিম কর্তৃপক্ষের কিরূপ সম্পর্ক রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে স্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে: আর দারুল হারবের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে অস্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে। সাময়িকভাবে জেহাদ স্থগিত রাখার ভিত্তিতেই হারবীদের সাথে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করা হত।
চতুর্থতঃ, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ নির্ধারিত করে দেন। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের আইনবিদগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শত্রুর সাথে সম্পাদিত কোন শান্তিচুক্তির মেয়াদ দশ বছরের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির মেয়াদের নজিরকেই তাঁরা এ যুক্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির শর্তে চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ দশ বছর নির্ধারিত হয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত (অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত) স্থায়ী হয়নি-তার চেয়েও অনেক কম সময় (তিন-চার বছর) স্থায়ী হয়। সুতরাং, অনুরূপ ভিত্তিতে তাঁরা এই শ্রেণীর চুক্তির মেয়াদ তিন-চার বছরের বেশী বাড়ানোর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির মেয়াদ দশ বছর দশ মাস কিংবা দশ বছর এগারো মাস কাল (বারো মাস পর্যন্ত নয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়।
জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এই চুক্তিগুলোকে কেবল স্থায়ীভিত্তিক বলেই গণ্য করা হত না, বস্তুত, দুই পক্ষের মধ্যে এ গুলোকে সংযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে মনে করা হত। প্রকৃতপক্ষে, জিম্মী চুক্তি রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটা আইনানুগ সনদ হিসেবে কার্যকরী ছিল। এ চুক্তি কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিম্মীগণ মুসলিম রাষ্ট্রের একটা অবিভাজ্য অংশ হিসেবে তাদের যাবতীয় সামাজিক ও আইনগত অধিকার ভোগ করত।
শেষতঃ, মুসলিম শাসকগণ তাঁদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিগত সমঝোতার বাধ্যবাধকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে গণ্য করতেন এবং সতর্কতার সাথে এগুলো পালন করতেন। অবশ্য, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে মুসলমানদের খুব বেশী উৎসাহিত করতেন না; তবে একবার চুক্তি সম্পন্ন হলে যাতে এর মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে চুক্তির বিধান ও শর্তাদি পালিত হয়, তার প্রতি তাঁরা সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সন্ধিচুক্তির পরিসমাপ্তি
মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে সন্ধি কথাটির বিশেষ প্রকৃতি হতেই বোঝা যায় যে, এর ভিত্তি অস্থায়ী। মুসলিম আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুসারে মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক সামরিক শান্তিভিত্তিক নয়। আইনের বিধান অনুযায়ী জেহাদ দশ বছরের অধিক কাল স্থগিত রাখা চলে না; সুতরাং, এই সময় উত্তীর্ণ হলেই সন্ধি চুক্তিসমূহের কার্যকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্য কথায়, চুক্তির মেয়াদ দশ বছরের বেশী হতে পারে না। এমন কি চুক্তিতে মেয়াদের কথা না থাকলেও দশ বছর উত্তীর্ণ হলেই স্বাভাবিকভাবেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। অবশ্য, আইনবিদগণ ইমামকে চুক্তির অস্থায়ী রূপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার জন্য চুক্তির দলিলে এর কার্যকালের মেয়াদের উল্লেখ করতে বলেছেন।
ইসলামের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি যাতে সম্পাদন করা না হয়, সে সম্পর্কেও ইমামকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি যদি এমন চুক্তি সম্পাদন করেন, যাতে তিনি শত্রুপক্ষের নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছেন, তবে সে চুক্তি 'ফাসিদ' (অনিয়মিত বা বিধিবহির্ভূত) বলে গণ্য হবে। বিধিসম্মত করার জন্য এ চুক্তিকে হয় সংশোধন করতে হবে, অথবা এর সমাপ্তি ঘটেছে বলে ঘোষণা করতে হবে।
ইমাম যদি এমন শর্তসমন্বিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা পালন করা তাঁর পক্ষে সাধ্যাতীত কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। এমন কি, চুক্তিটি বিধিসম্মত হলেও ইমাম যদি এর শর্তাদিকে ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বুঝতে পারেন, তবে তিনি এর পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন। অবশ্য, মুসলমানরা যে চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চান, একথা পূর্বাহ্নেই উল্লেখযোগ্য সময়ের মধ্যে অপরপক্ষকে জানিয়ে দিতে হবে।
পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে ইমাম এমন কোন শর্তে সম্মত হতে পারবেন না, যাতে চুক্তির দুই পক্ষের মধ্যে যে কোন এক পক্ষকে চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা দেয়া হয়; এমন কি, ইমামকে এই ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি এইরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবেন না। কেননা, চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতি যেমন মূলভিত্তির কাজ করে, তেমনি চুক্তি পরিসমাপ্তির ব্যাপারেও তাকে অবশ্যই মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
জিম্মীর সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে স্থায়ী প্রকৃতির; সুতরাং এগুলো কখনো বাতিল বা পরিসমাপ্ত হতে পারে না। এমন কি, কিছু সংখ্যক জিম্মী তাদের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলেও অন্য সকল জিম্মীর ওপর চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বলবৎ থাকবে। কেননা যে সব কিতাবী সম্প্রদায় মুসলিম শাসনাধীনে বসবাস করতে সম্মত হয়, এ চুক্তিগুলো (জিম্মী চুক্তিগুলো) তাদের প্রতি প্রদত্ত মুসলিম শাসন-কর্তৃপক্ষের শুধু নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিই নয়—বস্তুতঃ, জিম্মীগণ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো রাষ্ট্রীয় শাসনতান্ত্রিক সনদের রূপও পরিগ্রহ করে। এ অবস্থায় কোন জিম্মী তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তাকে সাধারণভাবে শাস্তি ভোগ করতে হয়। তবে আইন অনুসারে তার ওপর প্রযোজ্য বা বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করার অধিকার তার রয়েছে এবং সে ইচ্ছা করলে অবাধে দারুল হারবে হিজরত করতে পারে।
সন্ধি-চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা
ইসলাম ও অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সাধারণ সম্পর্ক বিরোধগত। তবু প্রয়োজনের তাগিদে বিশেষ করে কোন ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রের পরাজয়ের ফলে শত্রু- পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল উদ্দেশ্য বিরোধী নয়। আল্লাহ'র বিধানে অমুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া অনুমোদন করা হয়েছে:
"পবিত্র মসজিদে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, তারা ভিন্ন কি করে তোমরা মুশরিক এবং আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে পার? যে পর্যন্ত তারা সততার সঙ্গে কাজ করে, তোমরাও সততার সাথে চল। যারা খোদা-ভীরু, কেবল তাদেরই আল্লাহ ভালোবাসেন" (৯:৬)।
প্রচলিত ব্যবহার-বিধি আল-কোরআনের এই নির্দেশেরই সমর্থন জানিয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কাবাসীদের সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ চুক্তিটির শর্তাদি ও কার্যকালের মাধ্যমে মুসলিম আইনবিদগণ পরবর্তী যুক্তিগুলোর দিক-নির্দেশ করেছেন। একটি হাদিসে রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ "বাইজান্টীয়গণ তোমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে।" কাজেই আল- কোরআন ও হাদিস অনুসারে আইনবিদগণ এ সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম-স্বার্থ রক্ষিত হলে শত্রু পক্ষের সঙ্গে শান্তি-চুক্তি সম্পাদন করা বিধিসম্মত এবং এ চুক্তির ধারাগুলো পালন করতেও মুসলমানরা বাধ্য থাকবেন। প্রাথমিক খলিফাদের কার্যধারা ও আইনবিদদের সর্বসম্মত অভিমত বা ইজমার ফলে চুক্তি সম্পাদন শরিয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়েছে।
রাসূলে আকরমের (সঃ) হাতেই চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা ছিল এবং পরবর্তীকালে এ ক্ষমতা তাঁর খলিফাদের হাতে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রায়ই যুদ্ধরত সেনাপতিদের দেয়া হত। শত্রুপক্ষ যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইত, তবে যুদ্ধরত সেনাপতিকে শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেয়া হত। রাসূল (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ ক্ষতিকর চুক্তি বা ব্যবস্থা নাকচ করে দেবার ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতেন। তাঁদের অনুমতি না নিয়ে এসব চুক্তি মুসলিম সমাজে কার্যকরী করা যেত না।
সন্ধির আইনগত প্রকৃতি
সন্ধি ('মুহাদানা' বা 'মুওয়াদা') হল এক রকমের "আকদ" বা বন্ধন; চুক্তিতে কোন একটি বিষয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করার ফলে তার আইনগত ফলাফল প্রত্যক্ষ করা যায়। মুসলিম আইনের 'আকদ' (চুক্তি) পশ্চিমী আইনের চুক্তির (contract) চাইতে অনেক বেশী ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'আকদে'র বাহ্যিক আকার ও পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ঐক্যমত বা মনের মিলকেই মৌলিক জিনিস বলে মনে করা হয়। একদল প্রস্তাব ('ইজাব') করেন আর অপর দল তা গ্রহণ ('কবুল') করেন, ফলে 'মনের সমন্বয়' সম্ভব হয়। চুলচেরা বিচারে এতে পারস্পরিক সুবিধা থাকুক আর নাই থাকুক, আইনের চোখে চুক্তিটি বৈধ ও কার্যকরী বলে সাব্যস্ত হবে।
আইনগ্রন্থ "মাজাল্লা"তে চুক্তির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ "কোন বিষয়ে দুটি দল যখন করণীয় পন্থা স্থির করে তা' পালনের জন্য বাধ্যবাধকতার আওতায় পরস্পরকে আবদ্ধ করে, তার নামই চুক্তি। প্রস্তাব ও সম্মতির সমন্বয়েই এর সৃষ্টি।"
তাই ইসলামে চুক্তি আসলে মতৈক্য ও স্বীকৃতি থেকেই জন্ম নেয়; বিশেষ একটি বাহ্যিক রূপ বা পদ্ধতি পালন করার প্রয়োজন এখানে নেই। চুক্তির ধারাগুলো নির্ধারিত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি উভয়পক্ষের ওপর প্রযোজ্য হয়। চুক্তি লেখা, দস্তখত করা ও তারিখ দেয়া (কোন কোন ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখা) আইনের দিক থেকে অপরিহার্য নয়। শুধু সমঝোতা নির্দেশ করার জন্য এবং চুক্তির শর্ত ও মেয়াদ সম্পর্কীয় দলিল-পত্র রাখবার জন্যই চুক্তিটি লিখিতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হয়।
চুক্তি-সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গে যাতে করে এর শর্ত ও ধারাগুলো বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিপালিত হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। আল-কোরআনে মুসলিমকে 'ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রাখবার জন্য' আহ্বান করা হয়েছে (১৬ : ৯৩)। আরও বলা হয়েছে "মেয়াদের শেষ দিন অবধি চুক্তিটি পালন কর (৯:৪)।" তাই চুক্তির অবশ্য পালনীয় মৌলিক প্রকৃতি "আকদের" অন্তর্নিহিত অবস্থা প্রকাশ করে। সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাই একথা স্বীকার করে নিয়েছেন। ইসলাম ইমামকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির ব্যাপারে সব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শত্রুপক্ষের আক্রমণ আসন্ন হয়ে পড়লে বা তারা চুক্তি অমান্য করলে বা চুক্তিটি নাকচ করে দিলে অবশ্য চুক্তির ধারাগুলো পালন না করলেও চলবে। অবশ্য এ অবস্থায় চুক্তির পরিসমাপ্তির কথা তাদের জানিয়ে দিতে হবে।
মুসলিম চুক্তির বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করার পূর্বে বিশেষভাবে নির্বাচিত বা প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধি-চুক্তির বিবরণ বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তি পত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রত্যেকটি সন্ধির বিস্তারিত ইতিহাস বয়ান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধিপত্রের মূল দলিল ও তার সাধারণ পটভূমি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হবে।
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম সন্ধি-চুক্তি
আল-কোরআন থেকে যেমন চুক্তি পালনের নীতি এসেছে, তেমনি হযরতের কার্যধারাও কতকগুলো দিক-নির্দেশক বিধি-ব্যবস্থার পত্তন করেছে। এগুলোর ভিত্তিতেই মুসলিম ও অমুসলিম কর্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিবেশন পরিপ্রেক্ষিতে হযরত (সঃ) বিভিন্ন ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। তাঁর খলিফাগণ এগুলো আদর্শ চুক্তি হিসেবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি (যা পরে মদিনার ইহুদীরা মেনে নেন এবং এটা মদিনার অধিবাসীদের পক্ষে সনদের কাজ করে) থেকে শুরু করে হুদায়বিয়ার সন্ধি (যা মদিনার মুসলিম ও মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে অস্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করে) পর্যন্ত তিনি নানা ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইহুদী ও খৃস্টানদেরও সনদ প্রদান করেন। ফলে তারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করেন।
হিজরতের পর মদিনার গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করাই ছিল হযরতের প্রথম সন্ধির উদ্দেশ্য। ইবনে হিশামের "সিরাতে” এর মূল দলিলটি পাওয়া যায়; ওয়াকিদী'র "মাগাযী" তেও আংশিকভাবে এ সন্ধিচুক্তিটির বিবরণ পাওয়া গেছে। সন্ধিচুক্তিটির দলিলের প্রথম অংশে মদিনার বিভিন্ন গোত্রের-পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর চুক্তিটির পরবর্তী অংশে রয়েছে ইহুদীদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ। চুক্তির তারিখ সম্বন্ধে ইবনে হিশাম কোন কিছুই বলেননি; কিন্তু এটা যে হিজরী ১লা সন থেকে দ্বিতীয় সনের মাঝামাঝি কোন সময়ে সম্পাদিত হয় (খ্রিস্টাব্দ ৬২৩-৬২৪) তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, দ্বিতীয় হিজরীতেই (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকগণ যুদ্ধক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের মোকাবেলা করে।
সন্ধি-চুক্তির সনদের দলিল
আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক) মোহাজের ও আনসারদের নিয়ে ইহুদীদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত সনদটি লিপিবদ্ধ করেন। এই সনদের শর্তের ভিত্তিতে ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ইহুদীগণকে তাদের ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের অবাধ অধিকার দেয়া হয়; আর তাদের নিজেদের সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার এবং এর রক্ষা-কবচেরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে এতে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কতকগুলো বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়। নীচে চুক্তির সনদের বিবরণ দেয় হল:
মুসলিম ও ইহুদীগণ চুক্তিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক জাতি
"পরম করুণাময় ও কৃপানিধান মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। একদিকে কোরেশ বংশীয় ও ইয়াছরিবের (মদিনার) মুমিন মুসলমানগণ এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহ-সংগ্রামী, আর অন্যদিকে মদিনার ইহুদী সম্প্রদায় এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহিত একত্রে যুদ্ধ করে—তাদের সকলের প্রতি এটা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে প্রদত্ত সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সবকিছু হতে স্বতন্ত্রভাবে একটি সমাজ (রাজনৈতিক দিক হতে) গঠন করবে।
"কোরেশ বংশীয় মদিনার বিশ্বাসী মুসলমানগণ এবং অন্য যারা তাদের অনুসরণ করে, তাদের সাথে যোগ দেয় ও তাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে সংগ্রাম করে; এটা হচ্ছে, তাদের সবার প্রতি তাদের নবী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সম্প্রদায় হতে পৃথকভাবে একটি উম্মা (সমাজ) গঠন করবে।
"কোরেশ বংশীয় মোহাজেরগণ একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং বর্তমানে তারা যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই থাকবে। আর তারা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তি-মূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
ইহুদীদের অধিকার
"আউফ বংশীয়গণ পূর্বের মতই একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"সায়দাহ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-হারিস বংশীয়গণ বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"জুসম বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-নজর বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আমর-বিন-আউফ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-নাবিত বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"আল-আ'স বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।
"বিশ্বাসীগণ তাদের মধ্যে কাউকে চরম ঋণ ভারগ্রস্ত অবস্থায় অথবা পরিবারের দুর্বিষহ চাপে জর্জরিত অবস্থায় একা ফেলে রাখবেন না এবং তারা তাদের আত্মীয়-বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য উদারভাবে ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য দানের সম্ভাব্য যে কোন ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ হতে কখনো বিরত থাকবেন না;
"কোন বিশ্বাসী অপর কোন বিশ্বাসীর আশ্রিত ব্যক্তির (মওলা) সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না; কোন ব্যক্তি যদি ন্যায়নীতি বিগর্হিতভাবে অপরাধ অনুষ্ঠান করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে উৎপীড়ন করে থাকে কিংবা সীমা লঙ্ঘনের অভিপ্রায়ে বা বিশ্বাসীদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শক্তির অভিলাষী হয়ে থাকে, তবে মুমিন বিশ্বাসীগণ অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবেন, এমন কি সে ব্যক্তি যদি তাদের (বিশ্বাসীদের) পুত্রও হয়ে থাকে;
"কোন বিশ্বাসী একজন অবিশ্বাসীর জন্য অপর কোন অবিশ্বাসীকে হত্যা করতে পারবে না; কিংবা তিনি একজন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোন অবিশ্বাসীকে সাহায্য বা সমর্থন করবেন না;
"দীনতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকল বিশ্বাসীর জন্যই (সমভাবে) রয়েছে আল্লাহর (আইনের) নিরাপত্তা। বিশ্বাসীগণ পরস্পরকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবেন। একজন বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে একজন দীনতম বিশ্বাসীকেও রক্ষা করবেন; অন্যান্য জাতি ভিন্ন শুধু বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাহায্যকারী;
"ইহুদীদের মধ্যে যারা আমাদের অনুসরণ করে, তারা সমভাবে আমাদের সমর্থন এবং সর্বপ্রকার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করবে; তাদের প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন কিংবা অন্যায় ব্যবহার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন অভিপ্রায় পোষণ করবো না অথবা তাদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করব না। সবার জন্যই সমভাবে রয়েছে বিশ্বাসীদের শান্তির নিশ্চয়তা;
"বিশ্বাসীগণ সম্মিলিতভাবে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবেন। আল্লাহর পথে যুদ্ধানুষ্ঠানের পরে কোন বিশ্বাসী অপর বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে এবং তাদের মধ্যে ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে মতৈক্য ছাড়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবেন না;
"যে সব যোদ্ধা আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করবে এবং ক্ষীপ্রগতিতে আক্রমণ চালাবেন, তারা একের পর এক অগ্রসর হবেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন আর পরস্পরকে অনুসরণ করবেন;
"আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালনাকালে বিশ্বাসীগণ তাদের রক্তপাতের (কিংবা তাদের প্রতি হামলার) প্রতিশোধ গ্রহণের কাজে তাদের পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা করবেন। একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী নিশ্চয়ই সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পথের নির্দেশ অনুসরণ করবেন;
"কোন মুশরিক مسلمانوں প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কোরেশদের ধন-মাল কিংবা জনবল দিয়ে সাহায্য করতে পারবে না কিংবা তাদের (কোরেশদের) কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না; অথবা কোন বিশ্বাসীকে (কোরেশদের প্রতি আক্রমণে) বাধা দেবে না;
“যে কেউ একজন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তাকে অবশ্যই (হত্যার কার্য-কারণ সম্পর্কে) বিশ্বাসীর ওয়ালীর (অভিভাবক) সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে; এবং অন্যায়ভাবে বিশ্বাসীকে হত্যা করা হলে তার বদলে হত্যাকারীর মৃত্যুর বিধান করতে হবে; নিহত বিশ্বাসীর ওয়ালী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত বিশ্বাসীকে অবশ্যই হত্যাকারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই তাদের জন্য বৈধ হবে না;
"এই চুক্তির দলিলে যা' কিছু লিখিত রয়েছে—যে বিশ্বাসী তা স্বীকার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে (কেয়ামত) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তার পক্ষে কোন অপরাধীকে সাহায্য দান করা কিংবা তাকে আশ্রয় দেয়া বৈধ হবে না। এবং যারা তাকে আশ্রয় ও সাহায্য দান করবে, শেষ বিচারের দিন নিশ্চয়ই তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ (গজব) ও ক্রোধ আপতিত হবে। আর তাঁর (আল্লাহর) অভিসম্পাৎ গ্রহণ করা নিশ্চয়ই উচিত হবে না; কোন বিষয়ে তোমরা ভিন্ন মত পোষণ করলে, তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই তোমরা সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসরণ করবে:
মুসলিম ও ইহুদী একই রাজনৈতিক জাতি
(ক) "যে পর্যন্ত ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে, সে পর্যন্ত তাদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হতে হবে এবং যে পর্যন্ত মুসলমানগণ যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকবেন, সে পর্যন্ত ইহুদীগণও তাদের সাথে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে যাবেন; "আউফ গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে একই (রাজনৈতিক দিক থেকে) জাতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইহুদীদের জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; আর বিশ্বাসীদের জন্যও রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; তাদের মাওয়ালীদের (আশ্রিত বা দাসদের) এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজনেরও এই একই অধিকার থাকবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এই অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা (জালিম ও পাপীগণ) তাদের এবং তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারে না:
(খ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-নাজ্জার গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(গ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-হারিস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ঘ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সায়দাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ঙ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, জুসম গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(চ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আউস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(ছ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সালাবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এ অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা তাদের ও তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারবে না; সালাবাহ গোত্র যে সব অধিকার লাভ করেছে, তাদের বংশসম্ভূত জাফনাহ গোত্রও সে সব অধিকার লাভ করবে;
(জ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-শুতেবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে নিশ্চয়ই ন্যায়নিষ্ঠা ও সদাচরণ থেকে অপরাধের পার্থক্য রয়েছে;
১। সালাহবাহদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের আশ্রিতদেরও (মাওয়ালী) সেই সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের সালাহবাহ গোত্রের অনুরূপই গণ্য করা হবে; এবং
২। ইহুদীদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের অনুগামীদেরও (বিতানা) সে সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের ইহুদীদের অনুরূপই গণ্য করা হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যবাধকতা
"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমোদন ব্যতীত কোন ইহুদীই (মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে) যোগদান করতে পারবে না;
"কাউকে বৈধভাবে আঘাতের (বা রক্তপাতের) প্রতিশোধ গ্রহণে বাধা দেয়া হবে না; যে কেউ অন্য কাউকে বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা করে, সে তার এবং তার পরিজনদের জীবনের বিনিময়েই এইরূপ করে থাকে। আর যার প্রতি এইরূপ অন্যায় করা হয়েছে, একমাত্র সে (হত্যাকারী) এবং তার পরিবারই তার নিকট দায়ী থাকবে। এবং এইরূপ ঘটনায় যে ব্যক্তি অধিকতর ভাল ব্যবহার করে থাকে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষেই আছেন;
"ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বহন করবে এবং মুসলমানরাও তাদের ব্যয়ভার বহন করবে; এবং এই চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর যারা হামলা করে থাকে, তারা (চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়) তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই নিজেদের পরস্পরকে সাহায্য করবে; এবং তাদের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও কল্যাণবোধ; এবং তারা কখনো কোন অপরাধ কিংবা পাপাচার করবে না; নিশ্চয়ই নির্দোষিতা অপরাধ হতে পৃথক (অর্থাৎ অপরাধীদের সাথে ভিন্ন রকম ব্যবহার করা হবে); আর তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে তারা তাদের দুশমনদের (যারা চুক্তিবদ্ধ মিত্র সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে) ওপর নিশ্চয়ই জয়লাভ করবে; কেউই তার মিত্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কিছু করতে পারবে না; কারণ, নিশ্চয়ই মজলুমের পক্ষেই বিজয় আসবে; এবং যে ব্যক্তি তার মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেনি, সে সাহায্য পাবে;
"যে পর্যন্ত বিশ্বাসীগণ হামলাকারী দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাবে, সে পর্যন্ত ইহুদীগণ তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে এবং বিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হবে;
"মদিনা নগরীর অভ্যন্তর ভাগ (দওফ) এই সনদের অধিকারীদের (চুক্তিবদ্ধ লোকদের) নিকট পবিত্র থাকবে;
"প্রতিবেশীকে আমাদের নিজেদের মতই (স্বয়ং আশ্রয়দাতা প্রতিবেশীর মতই) গণ্য করতে হবে এবং তার প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন করা হবে না কিংবা তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না—যদি না তার পক্ষ থেকে কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা সে কোন অপরাধ করে থাকে। স্ত্রীলোককে তার আত্মীয়-বর্গের সম্মতি ব্যতীত আশ্রয় দেয়া যাবে না;
ইসলামের মৌলিক নীতির সার্বভৌমত্ব
"এই চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে যদি কোন বিষয়ে কোন বিরোধ বা বিভেদের সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে কোন অশুভ পরিণতির আশঙ্কা দেখা দেয় তবে তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আর তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। যে এই চুক্তিপত্রের বিধানগুলো পালনের জন্যে সব চেয়ে বেশী আগ্রহশীল থাকবে এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে এগুলো পালন করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে থাকবেন। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই এই সনদ কার্যকরীকরণে সাহায্য করবেন। (শত্রুভাবাপন্ন) কোরেশগণ এবং তাদের সাহায্যকারী ও সমর্থকদের সাহায্য দান করা চলবে না;
"যারা মদিনা দখলের হুমকি দান করবে, তাদের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ দলগুলো একে অপরকে সাহায্য দান করবে এবং যারা আক্রমণ করবে, (মুসলমান ও ইহুদীগণ) তাদের ওপর অবশ্যই জয়লাভ করবে;
"কোন শান্তিচুক্তি সম্পাদনে ইহুদীদের অংশ গ্রহণের জন্য মুসলমানগণ যদি তাদের প্রতি আহ্বান জানায়, তবে অবশ্যই তাদের তা গ্রহণ করতে হবে; এবং যখন ইহুদীদের পক্ষ থেকে মুসলমানগণকে অনুরূপ আহ্বান জানানো হবে, তখন তাদের জন্যও অনুরূপ কর্তব্য হবে; তবে কেবল ওই সব ব্যক্তি ছাড়া যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জেহাদ (ধর্মের জন্য যুদ্ধ) করে (অর্থাৎ তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে);
"প্রত্যেক দল পূর্বের মতই তাদের পক্ষ হতে তাদের নিজ নিজ অংশ পাবে;
"নিশ্চয়ই আল-আউস গোত্রের ইহুদীগণ, আর তাদের আশ্রিতগণ এবং তারা নিজেরা সদ্ব্যবহার অক্ষুণ্ণ রাখলে এই চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর মতই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ সর্বপ্রকার অধিকার ও মর্যাদা লাভ করবে;
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গেই আছে যে এই চুক্তিপত্রে যা কিছু রয়েছে, তার প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত এবং ন্যায়পরায়ণ; জালিম ও পাপাচারী ব্যতীত কেউই এই চুক্তির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না; এবং এই চুক্তিপত্র জালিম ও পাপাচারীদের জন্য নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা করবে না;
"যারা মদিনা নগরে বসবাস করবে, তাদের যে কেউ যুদ্ধে থাক বা ঘরে অবস্থান করুক, তারা নিরাপদে থাকবে, কেবলমাত্র অত্যাচারী ও পাপাচারীগণ ব্যতীত; তাদের জন্য নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই;
"যারা ধর্মশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে জীবনযাপন করবে এবং এই চুক্তির বিধানসমূহ কার্যকরী করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের আশ্রয় দেবেন ও নিরাপদ রাখবেন। আর নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)।"
এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, এ চুক্তিটি একটি ত্রি-পাক্ষিক চুক্তি। মক্কার বাস্তুচ্যুত মোহাজের, মদিনার আনসার (মোহাজেরদের সাহায্যকারী ও অনুগামীগণ) এবং ইহুদীগণ-এই তিন পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে চুক্তিপত্রের দলিলটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে, এটা কেবলমাত্র একটা সাধারণ মৈত্রীচুক্তি নয়; বস্তুত এর লক্ষ্য ও গুরুত্ব আরো অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর ক্ষেত্র আরো ব্যাপক। চুক্তির প্রথম অংশ হতেই সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌছার প্রয়াসই কেবল এর লক্ষ্য নয়।
প্রকৃতপক্ষে, সংকীর্ণ গোষ্ঠিগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় নৈউ সংস্থার আওতায় মদিনার সকল প্রতিদ্বন্দ্বী আরব গোত্রকে সম্মিলিত করে অবশিষ্ট জন সমষ্টি হতে স্বতন্ত্র একটি জাতি গঠনই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রারম্ভিক গঠনতন্ত্রও বলা যেতে পারে। বস্তুতঃ এরই ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবদের জীবন-প্রবাহের গোটা স্নায়ুকেন্দ্রকে তথা তাদের দৃষ্টিসীমাকে সামগ্রিকভাবে একটি নয়া ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত করে একটি সম্মিলিত সমাজসংস্থার সমস্ত বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সংকীর্ণ গোষ্ঠিকেন্দ্রিক আনুগত্যের বিলোপ সাধনে ব্রতী হন।
চুক্তির দ্বিতীয় অংশ হতে বোঝা যায় যে, আরব গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি পক্ষ ও ইহুদী গোত্রগুলোকে নিয়ে অপর একটি পক্ষ গঠিত হয় এবং অতঃপর উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়। বিশ্বাসীদের নিয়ে প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের সমন্বয়ে একটি জাতি গঠিত হয়; কিন্তু এককভাবে সমস্ত ইহুদী গোত্রের সমবায়ে কোন স্বতন্ত্র জাতি গঠন করা হয়নি। তবে স্বতন্ত্রভাবে আশ্রিত ও অনুগামীগণসহ প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের স্বকীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার সংরক্ষিত হয়।
চুক্তির এই অংশের প্রকৃতি হতে বোঝা যায় যে, মদিনাকে কেন্দ্র করে আরব ও ইহুদী গোত্রসমূহের সমবায়ে একটা কনফেডারেশন গঠিত হয়েছে। এই কনফেডারেশনের অংশ হিসেবে মদিনা অগ্রবর্তী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ব্যাপক প্রাধান্য বিস্তার করে। এই চুক্তির ফলেই কনফেডারেশনের সমস্ত দল বা গোত্রের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একটা ঐক্যগত সমঝোতা বা পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়। যদি কোন সময় কোন একটি ইহুদী গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ত, তখন এই সম্পর্ক বিশেষ সহায়ক হত।
হুদায়বিয়ার সন্ধি
বদরের যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে মক্কাবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন (খ্রিস্টাব্দ ৬২৪-৩০) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মর্যাদা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে তিনি মদিনার আশেপাশের গোত্রগুলোকে ইসলামের রাষ্টীয় কর্তৃত্বাধীনে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস পান। ইবনে হিশামের ভাষায়, বদরের সামরিক সাফল্যের পর হযরত প্রকৃতপক্ষে হেজাযের একচ্ছত্র শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ওহুদের যুদ্ধের (খ্রিস্টাব্দ ৬২৫) নগণ্য পরাজয় তাঁর ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কারণ, কিছুকাল পরেই খন্দকের যুদ্ধে (খ্রিস্টাব্দ ৬২৭) তিনি আবার এক সুদূরপ্রসারী সাফল্য লাভ করেন।
ঠিক এই সময়েই ইহুদীদের নাযীর গোত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে তাদের সাথে সম্পাদিত মৈত্রীচুক্তি বাতিল হয়ে যায়। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, ইহুদীগণ (নাযীর গোত্র) কর্তৃক হযরতের জীবননাশের ষড়যন্ত্রই এই চুক্তি বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ। অবশ্য চক্রান্তকারী বানু নাযীর ছাড়া চুক্তির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ইহুদী গোত্রের সঙ্গে হযরত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখেন। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়ার জন্যে হযরত বানু নাযীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। কিন্তু এর পরও কিছুকাল ইহুদীদের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটেনি; কারণ, অবশিষ্ট ইহুদীগণ বিশেষ করে স্ব-ধর্মাবলম্বী বানু নাযীরের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল কোরায়জা গোত্রও এই সময় হযরতের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মদিনার مسلمانوں সঙ্গে (ইহুদীদের) মৈত্রীচুক্তির ফলে ইহুদীদের এই শত্রুতার অবসান ঘটে।
হযরত প্রথমতঃ তাঁর পরম শত্রু কোরেশদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে মক্কা বিজয়ের দ্বারা তাঁর জীবনের সাফল্যকে পূণাঙ্গ রূপ দান করেন। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, মক্কায় হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হযরত কোরেশদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌছেন। হজব্রত পালন এই সমঝোতায় পৌঁছানোর আশু কারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে তখন উভয়পক্ষের অবস্থা থেকে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, অন্ততঃ সাময়িকভাবে হলেও তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। কোরেশদের অবস্থা তখনো এমন পর্যায়ে ছিল যে, মদিনার শাসন-কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাদের পরাভূত করা সহজ-সাধ্য ছিল না বিশেষ করে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে। অন্যদিকে মক্কাবাসীগণ বদর ও খন্দকের যুদ্ধে উপর্যুাপরি দু'বার مسلمانوں হাতে চরমভাবে পরাজিত হয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সিরিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর ফলে কোরেশদের বাণিজ্য-কাফেলা প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় অন্ততঃ স্বল্পকালের জন্যে হলেও উভয়পক্ষ একটা শান্তিচুক্তির জন্য বিশেষভাবে আগ্রহশীল হয়ে ওঠে। যে ঘটনাবলী শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তা হচ্ছে সংক্ষেপে এইঃ
রাসূল তাঁর মুষ্টিমেয় সংখ্যক অনুগামী নিয়ে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কোরেশগণ হযরতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আশঙ্কা ও সন্দেহ পোষণ করে পথিমধ্যেই তাঁকে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় হযরত কোরেশদের নিকট শান্তির প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত করেন। এতদানুযায়ী তিনি তাঁর জামাতা ও ভাবী তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানকে তাঁর শান্তি প্রস্তাবসহ কোরেশদের নিকট প্রেরণ করেন। মক্কাবাসীগণ এ প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং হযরতের সঙ্গে শান্তিচুক্তির শর্তাদি সম্পর্কে আলোচনার জন্যে সুহাইল ইবনে-আমরকে প্রেরণ করে। এই আলাপ-আলোচনার ফলেই 'হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি' নামে অভিহিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। হযরত রাসূলের চাচাতো ভাই ও ভাবী চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে-আবু তালেব চুক্তির দলিল লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সম্পাদকের কাজ করেন।
নীচে চুক্তিটির বিবরণ দেয়া হল:
"হে আল্লাহ্! তোমার নামে শুরু করছি। এ চুক্তিটি মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ শান্তি পূর্ণভাবে সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে একমত হয়ে সম্পাদন করেছেন;
"তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে একমত হয়ে দশ বছর কালের জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিয়েছেন; পরস্পরের আক্রমণ থেকে (উভয়পক্ষের) জনসাধারণ নিরাপদ থাকবে;
"কোরেশদের কোন লোক তার ওয়ালীর (অভিভাবক) অনুমতি ছাড়া মুহাম্মদের (সঃ) দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে তাদের (কোরেশদের) কাছে প্রত্যার্পণ করতে হবে; কিন্তু মুহাম্মদের (স:) কোন অনুগামী কোরেশদের দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে কোনরূপ বাধা দেয়া হবে না;
"আমাদের উভয় দলের পক্ষেই অসদাচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ নিষিদ্ধ; এবং আমাদের মধ্যে স্বপক্ষ ত্যাগ ও বিশ্বাসঘাতকতার কোনরূপ অপরাধ অনুষ্ঠিত হতে পারবে না;
"যারা (যেসব লোক) মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাঁর চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারা অবাধে তা' করতে পারবে; এবং যারা কোরেশদের সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাদের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারাও অবাধে তা' করতে পারবে।"
এই চুক্তির ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সদিচ্ছা সম্পর্কে মক্কাবাসীদের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য কয়েকজন সাক্ষী উপস্থিত করেন। এঁরা চুক্তির শর্তসমূহ পালন ও অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ করেন। এই সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বকর, উমর ইবনে আল-খাত্তাব ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ। এই চুক্তির ফলে ইসলামের আরেকটি বিরাট বিজয় সূচীত হয়। কারণ, এই চুক্তির মাধ্যমেই অবশেষে অভিজাত কোরেশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শাসন-কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং গৌণভাবে হলেও ইসলামকে মদিনার রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। এতে মক্কায় হযরতের মর্যাদা সমুন্নত হয় এবং সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। অথচ মদিনায় হিজরতের পূর্বে এক সময়ে এই মক্কাতেই তাঁকে অকথ্য লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল।
হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এই রীতির অনুবর্তন হয় যে, মুসলিম কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী মেয়াদের ভিত্তিতে মুশরিকদের (অংশীবাদী) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন। এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে আইনবিদদের মধ্যে অবশ্য মত-বিরোধ রয়েছে। কোন কোন আইনবিদ হুদায়বিয়ার চুক্তির অনুরূপ দশ বছরের মেয়াদ অনুমোদন করেছেন। আবার কেউ বা দু-তিন বছরের মেয়াদের কথা বলেছেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এসব চুক্তি দু-তিন বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। অবশ্য আইনবিদগণ এ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, শত্রুদের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল স্বার্থের পরিপন্থী নয়।
হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তিও কার্যতঃ দু' বছরের মধ্যেই লঙ্ঘন করা হয়। ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, مسلمانوں ওপর কোরেশদের অবৈধ আক্রমণের ফলেই চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়। চুক্তির বিধানে "যারা মুহাম্মদের (সঃ) দলে এবং তাঁর মৈত্রীতে যোগদান করতে চাইবে, তারা অবাধে তা' করতে পারবে" বলে যে স্বীকৃত শর্তটি রয়েছে, এ হামলার দ্বারা কোরেশগণ সরাসরি তা লঙ্ঘন করে। এরপরও অবিশ্যি কোরেশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ-আলোচনা চালান হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সময় কোরেশদের তুলনায় মুসলমানগণ অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে; ঠিক এই অবস্থায় مسلمانوں ওপর একটা অন্যায় হামলা দ্বারা তারা একটা বৃহত্তর শক্তি পরীক্ষাকে আসন্ন করে তোলে। নিজের অনুগামীদের ওপর কোরেশদের এই অহেতুক আক্রমণে হযরত (সঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু তবুও তিনি তাদের সঙ্গে একটা আপোষ রফার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে মুসলমানগণ মক্কা অভিমুখে সামরিক অভিযান পরিচালনার সংকল্প করেন। হিজরী ৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩০) তাঁরা মক্কা দখল করেন। এই সময় কোরেশগণ অত্যন্ত হীনবল ও শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা নব বলে উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনীর গতিরোধ করতে কিংবা তাদের সাথে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহস পেল না। হযরত (সঃ) তাঁর বিজয়পতাকা হস্তে মুক্ত তোরণ দ্বার দিয়ে অবাধে পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করলেন।
মক্কা বিজয়ের ফলে দুই নগর-রাষ্ট্রের বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটে। আর এর ফলে সমগ্র হেজাযে ইসলামের সুদৃঢ় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এরপর হযরতের (সঃ) মিশন এক বিস্তৃততর লক্ষ্যপানে সম্প্রসারিত হয়।
রাষ্ট্রীয় সনদ হিসেবে জিম্মী-চুক্তির স্থান
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরো এক ধরনের কতকগুলো চুক্তি সম্পাদন করেন। এগুলো পূর্বোক্ত চুক্তিগুলো হতে একটু আলাদা ধরনের। আরবের কেতাবী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিও এর মধ্যে রয়েছে। এসব চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ কেতাবীদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং অবাধভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত হয়। অবিশ্যি, তারা যতদিন চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলবেন, ততদিনই এই নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এই চুক্তিগুলোর আইনগত প্রকৃতি সম্পর্কে এ বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে (সপ্তদশ পরিচ্ছেদ)। এই পরিচ্ছেদে এ চুক্তিগুলোর কাঠামো ও পদ্ধতি এবং অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। জেরুজালেমের প্রধান খৃস্টান বিশপ দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর-বিন-আল-খাত্তাবের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেন, এ শ্রেণীর চুক্তির ক্ষেত্রে তার চাইতে উৎকৃষ্টতর নজির আর পাওয়া যায় না। এ চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে প্রধান বিশপ দাবী করেন যে, এই চুক্তির দলিলে স্বয়ং খলিফাকেই স্বাক্ষর দান করতে হবে, তাঁর কোন প্রতিনিধির স্বাক্ষর হলে চলবে না। হিরা ও দামেস্কের শান্তিচুক্তির দলিলে কিন্তু খলিফার প্রতিনিধিগণই স্বাক্ষর দান করেন। হযরত উমর প্রধান বিশপের দাবীতে সম্মত হন এবং চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দানের জনে। জেরুজালেম গমন করেন। হিজরী ১৭ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩৮) এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। নীচে চুক্তির শর্তগুলোর বিবরণ দেয়া হল :
"পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি।
"আমীরুল মুমেনীন (বিশ্বাসীদের নেতা) আবদুল্লাহ উমর ইলিয়ার (জেরুজালেম) অধিবাসীগণকে এগুলো (এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিধি-ব্যবস্থা ও অধিকারসমূহ) মঞ্জুর করেছেন;
"তিনি তাদের জীবন, ধনসম্পদ, গীর্জা ও ক্রস (যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান) রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন:
"তাদের গীর্জায় কেউ (কোন বিদেশী) বাস করতে পারবে ন, কিন্তু কে এব (পার্জার) কোনরূপ ক্ষতি বা ধ্বংস সবন করা যাবে না। আর তাদের এস কি তাদের
"তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের (ধর্মীয় বিধি-ব্যবস্থা বা আচার-অনুষ্ঠান) জন্য তাদের ওপর কোনরূপ জোর জবরদস্তি করা চলবে না, কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার জুলুম বা উৎপীড়ন চলবে না;
"ইলিয়া নগরে (জেরুজালেমে) তাদের সঙ্গে ইহুদীদের বসবাসের অনুমতি দেয়া যাবে না;
"মাদাইনের (সাবেক পারস্যের রাজধানী) অধিবাসীদের মত সমানুপাতে ইলিয়ার অধিবাসীদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে;
"ইলিয়ার অধিবাসীগণকে রুম (রোমান বা বাইজান্টীয়) ও তস্করদের নগর ছেড়ে যেতে দিতে হবে। যদি তারা (রোমানগণ) নগর ছেড়ে যায়, তবে তাদের স্বদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। অবশ্য যে সব বাইজান্টীয় নগরে বসবাস করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে; তবে জিযিয়ার ব্যাপারে ইলিয়াবাসীদের অনুরূপ শর্তে তাদেরও স্বীকৃত হতে হবে;
"ইলিয়ার অধিবাসীদের মধ্য হতে যে সব লোক বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তারা তাদের গীর্জা ও ক্রস পরিত্যাগ করে গেলে তাদের জীবন এবং ধনসম্পদের নিরপত্তা-বিধান করা হবে;
"কৃষিভূমির যে সব লোক (কৃষক) পূর্ব থেকেই এই নগরে (ইলিয়ায়) বসবাস করে আসছিল, তারা এখানে অবস্থান করতে চাইলে তাদের সে অধিকার দেয়া হবে, তবে নগরে অন্যান্য অধিবাসীদের মত তাদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে। তবে যারা বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে যেতে চায়, তারা (অবাধে) তা' পারবে; আর যারা সাময়িকভাবে জনপদে (তাদের ভূমিতে) তাদের লোকদের কাছে যেতে চায়, ফসল তোলার মওসুম পর্যন্ত তারা তথায় যেতে বা অবস্থান করতে পারবে;
"নগরের বাসিন্দাদের জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে এই চুক্তির দলিলে (এই দলিলে প্রদত্ত শর্তসমূহ অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে) আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, খলিফাগণ ও বিশ্বাসীদের (পক্ষ হতে) প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হল।
"সাক্ষীগণ : খালিদ ইবনে আল-ওয়ালীদ, আমর ইবনে আল-আস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান।
"হিজরী ১৫ সালে এই চুক্তির দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়।"
প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী সাধারণ মাথা-গণতি কর হিসেবে কেতাবীদের যেমন নিয়মিতভাবে জিযিয়া প্রদান করতে হত, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক জিম্মী হিসেবে তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণকর বিধিব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ সমন্বিত অধিকারের আইনানুগ রাষ্ট্রীয় সনদও ছিল। অন্যান্য চুক্তির মত জিম্মী অধিকার সংরক্ষণের এই সনদটিও যথারীতি আলাপ-আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়। তবে বিশেষভাবে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এ চুক্তিটির পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, এ চুক্তিটি স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; কারণ, চুক্তির কোন পক্ষের কোন লোক কর্তৃক এর শর্তাদি লঙ্ঘিত হলেও অপরপক্ষের ওপর শর্তের বাধ্যবাধকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়তঃ, চুক্তিটি প্রযুক্ত বা বলবৎ হওয়ার সময় থেকেই কেতাবীগণ খেলাফতের (দারুল ইসলামের) নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে। গোড়ার দিকে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো দুই স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলেও শেষ পর্যন্ত কেতাবী সম্প্রদায়গুলো (জিম্মীগণ) ইসলামী জাতীয়তার আওতায় শামিল হলে চুক্তির প্রকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়। অবিশ্যি, ইসলামী জাতীয়তার অঙ্গীভূত হলেও অনেকাংশই এই সম্প্রদায়সমূহের স্বায়ত্বশাসনাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আইনবিদগণ ইসলামের সঙ্গে জিম্মীদের সম্পর্কের বিষয় সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থাকে শরিয়তের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। ফলে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো (জিম্মী সম্বন্ধীয় চুক্তি) রাষ্ট্রীয় শাসন-সংবিধানের মর্যাদা লাভ করে। জিম্মীদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো পরবর্তীকালে 'উমরের সনদ' বলে অভিহিত হয়।
খলিফাদের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহ
হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিসমূহকে পরবর্তীকালে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণ (খলিফাগণ) অবিচলিত নিষ্ঠার সাথে এ আদর্শ অনুসরণ করে গেছেন। আইনগত প্রকৃতির দিক থেকে এমন কি কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর সাথে খলিফাগণ কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।
পরবর্তীকালে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য এবং পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ায় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের তাগিদে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ধর্মীয় উদ্দেশ্য-প্রধান চুক্তিগুলো হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক শ্রেণীর নয়া চুক্তির সৃষ্টি হল। উমাইয়া শাসন আমলে খলিফা ১ম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিক বাইজান্টীয়দের (রোমান) সাথে কতিপয় চুক্তিতে আবদ্ধ হন। সেই সময় মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় বাইজান্টীয় আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। এমতাবস্থায় তাদের আক্রমণ পরিহারের উদ্দেশ্যে তাঁরা শুল্ক দানের শর্তে তাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। মুয়াবিয়া তখনো খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেননি। খেলাফত নিয়ে তিনি তখনো হযরত আলীর সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো শর্তে তিনি বাইজান্টীয় সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্স-এর সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিজের কর্তৃত্ববলে মুয়াবিয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি সম্রাটকে শুল্ক দিতে স্বীকৃত হন। ইরাকের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকাকালে অন্যতম উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকও (হিজরী ৬৫-৮৬; খ্রিস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। আইনবিদগণ অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের ব্যাপারে ইমামের কার্যের বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। আল-আউযায়ী (মৃত্যু: হিজরী ১৫৭; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৩) ও সুফিয়ান আস-সাউরী (মৃত্যু হিজরী ১৬১; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৭) এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, প্রয়োজনের তাগিদে অনুরূপ শুল্ক প্রদান দোষাবহ নয়। এঁরা উভয়েই উমাইয়া আমলের লোক ছিলেন। তবে মুসলিম শক্তির গৌরবময় যুগের আইনবিদ ইমাম শাফেয়ী এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। হানাফী আইনবিদগণও অনিবার্য কারণ ব্যতীত (অর্থাৎ অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া) অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। তবে অধিকাংশ আইনবিদই বার্ষিক শুল্ক দানের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন; অবশ্য বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প কালের জন্য অনুরূপ শুল্ক প্রদান করা যেতে পারে বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেবলমাত্র চরমপন্থী আইনবিদ আল-লুলু যে কোন পরিস্থিতেই হোক না কেন, শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। এমন কি শক্তির দিক থেকে مسلمانوں অবস্থা দুর্বল বলে মনে করলেও শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের পরিবর্তে ইমামের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত বলে তিনি রায় দেন।
আব্বাসীয় আমলে খলিফাগণ নানাবিধ কারণে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। প্রথমতঃ, উপর্যুপরি সীমান্ত লঙ্ঘন বন্ধের জন্যে উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। কারণ, আব্বাসীয়-বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রাকৃতিক আড়ালের স্বল্পতা হেতু উভয়পক্ষ প্রায়ই জবরদস্তিমূলক পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করত। আব্বাসীয় বংশের শাসন আমলের প্রথম দিকে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী বাইজান্টীয় সম্রাটগণ বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে বার্ষিক শুল্ক দিতে বাধ্য হন। এ ভাবেই বাইজান্টীয় সম্রাজ্ঞী ইরিন (মৃত্যু খ্রিস্টাব্দ ৮০২) খলিফা হারুনুর রশীদকে শুল্ক দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে বার বার হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। সম্রাট নিসিফোরসের রাজ্যভিষেক পর্যন্ত এই চুক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু নিসিফোরস সাম্রাজ্যিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত সমস্ত শুল্ক ফেরত চেয়ে বাগদাদে একটি অবমাননাকর পত্র প্রেরণ করেন। খলিফা হারুন এতে খুব ক্রুদ্ধ হন এবং নিসিফোরসকে সমুচিত জওয়াব দানের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে, নিসিফোরস বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে পুনরায় নতুনভাবে শুল্ক প্রদান করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরে বাগদাদের খলিফাদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ক্ষীয়মাণ হয়ে আসলে কন্সট্যানটিনোপলের (বাইজান্টীয়) সম্রাটগণ তাঁদের শুল্ক দান বন্ধ করে দেন; এমন কি তাঁরা তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সীমান্তের ওপরও হানা দিতে শুরু করেন। মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ক্রুডেস যুদ্ধের নায়ক রাজন্যবর্গের সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি সম্পাদিত হয়। আঞ্চলিক খণ্ড সংঘর্ষের অবসান, অবাধভাবে সাধারণ লোকদের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল বা পরিভ্রমণ, ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শন, হজব্রত পালন প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই এই শ্রেণীর চুক্তি হয়। হজব্রত পালন কিংবা পবিত্র ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ-সুবিধার বিশেষ উদ্দেশ্যে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দীন ও ক্রুসেড নায়ক রিচার্ড কু'র-ডি-লায়নের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে আর এক শ্রেণীর চুক্তিও সম্পাদিত হয়। এগুলো 'ফিদা-চুক্তি' (ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য চুক্তি) নামে অভিহিত। বন্দী বিনিময়ের ভিত্তিতে কিংবা স্বীকৃত অর্থ প্রদান করে যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে বিজয়ী তাঁর রাষ্ট্রীয় তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন। অপরপক্ষে, এর ফলে হাজার হাজার হতভাগ্য যুদ্ধবন্দীর জীবন রক্ষা পেত। এ চুক্তির ব্যবস্থা না থাকলে হয় এরা নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করত কিংবা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
উমাইয়া আমলে ফিদা-চুক্তির কোন উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বন্দী বিনিময় করার রেওয়াজ তখনো ছিল। আরব ইতিহাসকারদের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, চুক্তির মাধ্যমে সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে ফিদা-চুক্তি খলিফা হারুনুর রশীদের আমলেই প্রথম প্রবর্তিত হয়। হিজরী ১৮১ সালে হারুন চুক্তিটি সম্পাদন করেন। এর ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭শ' মুসলিম বন্দী মুক্তিলাভ করে। ইতিহাসবেত্তা আল-মাসুদী বলেন যে, খলিফা হারুনের আমল থেকে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত অনুরূপ মোট ১২টি ফিদা-চুক্তি সম্পাদিত হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানাদির পর বন্দীদের মুক্তিদান কার্য সম্পন্ন হত। উভয়পক্ষই এই উপলক্ষে নানাবিধ আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করতেন।
চুক্তির শর্তাদি কার্যকরী করার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিভূ (রাহাইন) বিনিময়েরও ব্যবস্থা সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়। প্রাচীন চীন ও রোমে এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। প্রাচীন রীতিতে এইরূপ বিধান ছিল যে, চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও শর্তাদি যথাযথভাবে কার্যকরী করা হলে প্রতিভূদের নিরুপদ্রবে তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে দেয়া হত। আর যদি কোন কারণে চুক্তি লঙ্ঘন করা হত, প্রতিভূদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হত এবং অনেক সময় তাদের উৎপীড়ন ও দুর্দশাও ভোগ করতে হত। কিন্তু মুসলমানগণ প্রতিভূদের নিজেদের আমানত হিসেবে মনে করতেন এবং তাদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তা দান করতেন। প্রতিভূদের সঙ্গে তাঁরা ন্যায়বিচার ও সহৃদয় ব্যবহার করতেন। চুক্তিভঙ্গ হলে এবং যুদ্ধ ঘোষিত হলে মুসলমানগণ প্রতিভূদের তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ না বাধলে প্রতিভূদের হয় আগের মতই নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখা হত কিংবা তাদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হত।
চুক্তিগুলোর সাধারণ প্রকৃতি
মুসলমানদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনার ভিত্তিতে সংক্ষেপে নিম্নোক্ত পর্যায়ে এ সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ ধারণায় পৌঁছা যেতে পারে:
প্রথমতঃ, মুসলিম-চুক্তিগুলো মোটের ওপর সংক্ষিপ্ত ও সাধারণভাবে একই প্রকৃতির। তাছাড়া, চুক্তির শর্তাদির প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কেও কোন বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি। অনেক সময় অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ততার দরুন বিষয়বস্তু ও শব্দবিন্যাস অস্পষ্ট থেকে গেছে।
দ্বিতীয়তঃ, প্রত্যেক চুক্তির ভূমিকায় সাধারণভাবে বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) কথাটি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের নামের তালিকা ও পদবীর উল্লেখ থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজে যে চুক্তিগুলো সম্পাদন করে গেছেন, তাতেও অনুরূপভাবে 'আল্লাহ'র রাসূল' কথাটির সাধারণ উল্লেখ দেখা যায়। একমাত্র হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তিটিতে (কোরেশদের অনিচ্ছার জন্য) এর উল্লেখ ছিল না। হযরতের উত্তরাধিকারী খলিফাগণ যে সব চুক্তি সম্পাদন করেছেন, তাতে তাঁদের উপাধি 'খলিফা' বা 'আমিরুল মুমেনীন' কথাটি সাধারণভাবে উল্লিখিত হয়েছে।
সাধারণতঃ, সাক্ষীদের নামোল্লেখ করে চুক্তির সম্পাদন-কার্য সমাপ্ত করা হয়। চুক্তির বিষয়বস্তুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার সময় এই সব সাক্ষী উপস্থিত থাকতেন।
তৃতীয়তঃ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধির মূল বিষয়বস্তুর পরিবর্তন বা বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগের সন্ধি চুক্তিগুলো ছিল প্রধানতঃ ধর্মীয় উদ্দেশ্যভিত্তিক; আর পরবর্তী খলিফাগণ কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিগুলো ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যভিত্তিক। মুসলিম আইনবিদগণ অবশ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী চুক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। এ ব্যাপারে চুক্তির বিষয়বস্তুর পক্ষগুলোর সাথে মুসলিম কর্তৃপক্ষের কিরূপ সম্পর্ক রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে স্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে: আর দারুল হারবের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে অস্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে। সাময়িকভাবে জেহাদ স্থগিত রাখার ভিত্তিতেই হারবীদের সাথে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করা হত।
চতুর্থতঃ, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ নির্ধারিত করে দেন। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের আইনবিদগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শত্রুর সাথে সম্পাদিত কোন শান্তিচুক্তির মেয়াদ দশ বছরের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির মেয়াদের নজিরকেই তাঁরা এ যুক্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির শর্তে চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ দশ বছর নির্ধারিত হয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত (অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত) স্থায়ী হয়নি-তার চেয়েও অনেক কম সময় (তিন-চার বছর) স্থায়ী হয়। সুতরাং, অনুরূপ ভিত্তিতে তাঁরা এই শ্রেণীর চুক্তির মেয়াদ তিন-চার বছরের বেশী বাড়ানোর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির মেয়াদ দশ বছর দশ মাস কিংবা দশ বছর এগারো মাস কাল (বারো মাস পর্যন্ত নয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়।
জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এই চুক্তিগুলোকে কেবল স্থায়ীভিত্তিক বলেই গণ্য করা হত না, বস্তুত, দুই পক্ষের মধ্যে এ গুলোকে সংযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে মনে করা হত। প্রকৃতপক্ষে, জিম্মী চুক্তি রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটা আইনানুগ সনদ হিসেবে কার্যকরী ছিল। এ চুক্তি কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিম্মীগণ মুসলিম রাষ্ট্রের একটা অবিভাজ্য অংশ হিসেবে তাদের যাবতীয় সামাজিক ও আইনগত অধিকার ভোগ করত।
শেষতঃ, মুসলিম শাসকগণ তাঁদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিগত সমঝোতার বাধ্যবাধকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে গণ্য করতেন এবং সতর্কতার সাথে এগুলো পালন করতেন। অবশ্য, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে মুসলমানদের খুব বেশী উৎসাহিত করতেন না; তবে একবার চুক্তি সম্পন্ন হলে যাতে এর মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে চুক্তির বিধান ও শর্তাদি পালিত হয়, তার প্রতি তাঁরা সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সন্ধিচুক্তির পরিসমাপ্তি
মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে সন্ধি কথাটির বিশেষ প্রকৃতি হতেই বোঝা যায় যে, এর ভিত্তি অস্থায়ী। মুসলিম আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুসারে মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক সামরিক শান্তিভিত্তিক নয়। আইনের বিধান অনুযায়ী জেহাদ দশ বছরের অধিক কাল স্থগিত রাখা চলে না; সুতরাং, এই সময় উত্তীর্ণ হলেই সন্ধি চুক্তিসমূহের কার্যকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্য কথায়, চুক্তির মেয়াদ দশ বছরের বেশী হতে পারে না। এমন কি চুক্তিতে মেয়াদের কথা না থাকলেও দশ বছর উত্তীর্ণ হলেই স্বাভাবিকভাবেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। অবশ্য, আইনবিদগণ ইমামকে চুক্তির অস্থায়ী রূপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার জন্য চুক্তির দলিলে এর কার্যকালের মেয়াদের উল্লেখ করতে বলেছেন।
ইসলামের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি যাতে সম্পাদন করা না হয়, সে সম্পর্কেও ইমামকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি যদি এমন চুক্তি সম্পাদন করেন, যাতে তিনি শত্রুপক্ষের নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছেন, তবে সে চুক্তি 'ফাসিদ' (অনিয়মিত বা বিধিবহির্ভূত) বলে গণ্য হবে। বিধিসম্মত করার জন্য এ চুক্তিকে হয় সংশোধন করতে হবে, অথবা এর সমাপ্তি ঘটেছে বলে ঘোষণা করতে হবে।
ইমাম যদি এমন শর্তসমন্বিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা পালন করা তাঁর পক্ষে সাধ্যাতীত কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। এমন কি, চুক্তিটি বিধিসম্মত হলেও ইমাম যদি এর শর্তাদিকে ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বুঝতে পারেন, তবে তিনি এর পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন। অবশ্য, মুসলমানরা যে চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চান, একথা পূর্বাহ্নেই উল্লেখযোগ্য সময়ের মধ্যে অপরপক্ষকে জানিয়ে দিতে হবে।
পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে ইমাম এমন কোন শর্তে সম্মত হতে পারবেন না, যাতে চুক্তির দুই পক্ষের মধ্যে যে কোন এক পক্ষকে চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা দেয়া হয়; এমন কি, ইমামকে এই ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি এইরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবেন না। কেননা, চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতি যেমন মূলভিত্তির কাজ করে, তেমনি চুক্তি পরিসমাপ্তির ব্যাপারেও তাকে অবশ্যই মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
জিম্মীর সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে স্থায়ী প্রকৃতির; সুতরাং এগুলো কখনো বাতিল বা পরিসমাপ্ত হতে পারে না। এমন কি, কিছু সংখ্যক জিম্মী তাদের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলেও অন্য সকল জিম্মীর ওপর চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বলবৎ থাকবে। কেননা যে সব কিতাবী সম্প্রদায় মুসলিম শাসনাধীনে বসবাস করতে সম্মত হয়, এ চুক্তিগুলো (জিম্মী চুক্তিগুলো) তাদের প্রতি প্রদত্ত মুসলিম শাসন-কর্তৃপক্ষের শুধু নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিই নয়—বস্তুতঃ, জিম্মীগণ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো রাষ্ট্রীয় শাসনতান্ত্রিক সনদের রূপও পরিগ্রহ করে। এ অবস্থায় কোন জিম্মী তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তাকে সাধারণভাবে শাস্তি ভোগ করতে হয়। তবে আইন অনুসারে তার ওপর প্রযোজ্য বা বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করার অধিকার তার রয়েছে এবং সে ইচ্ছা করলে অবাধে দারুল হারবে হিজরত করতে পারে।
📄 বাণিজ্যিক সম্পর্ক
ইসলাম বা ব্যবসা-বাণিজ্য
ইসলাম এমন একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা, যার মধ্যে জাগতিক ও পারত্রিক উভয়বিধ মূল্যবোধেরই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বাসী মুসলমানকে দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করতে বলা হয়েছে যেন তিনি চিরকালই জীবিত থাকবেন; আবার সঙ্গে তাকে এমনভাবে নাজাত বা পারলৌকিক মুক্তির জন্য কাজ করে যেতে হবে যেন আগামীকাল তার মৃত্যুর দিন। আইনে অবশ্য পারত্রিক মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। পারত্রিক জীবনকে অস্বীকার করে ইহকালের জন্য কাজ করা ইসলামে অনুমোদিত হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারা বা তিজারাত) এমন একটি বৃত্তি, যা আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হলে, ধর্মীয় কর্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুনিয়াতে তা অনেক কল্যাণ সাধন করতে পারবে।
যে পরিবেশে ইসলামের উন্মেষ সাধিত হয়, তা' বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খুব প্রসিদ্ধ ছিল এবং ব্যবসায়ী হিসেবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক জীবনের অভিজ্ঞতা খোদার বাণীর মধ্যেও প্রতিভাত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আল-কোরআনে যে কেবল নিয়ামত অন্বেষণকারীদের জন্যে সমর্থিত হয়েছে তা' নয়, বস্তুতঃ ধর্মীয় ভাবধারা প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সংজ্ঞা ও শব্দাবলী ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে আগাগোড়া বাণিজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির স্বর্ণযুগে ব্যবসায়ীগণই সমাজের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রসার এবং সমৃদ্ধি সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। যদিও ব্যবসায়ীগণ সাধারণভাবে রাষ্ট্র-নীতিকে বড় একটা প্রভাবিত করতে পারেননি, তবু আইনবেত্তা ইমাম আবু হানিফার মত ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত ব্যক্তিগণের প্রভাব অনেক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের চাইতে বেশী ছিল। আরব দেশে প্রাক-ইসলামী যুগে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদানের রীতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে।
দারুল ইসলামের বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সব আইনবিদই স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থাৎ দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যে পণ্য-বিনিময়ের ব্যবস্থা অনুমোদন করেননি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, মালিকী আইনবিদগণ স্থল কিংবা সমুদ্রপথে দারুল হারবের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্য করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম মালিক অমুসলিমদের দারুল ইসলামে এসে مسلمانوں সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু মুসলমানরা দারুল হারবে গিয়ে ব্যবসা করুক, এটা তিনি অনুমোদন করেননি। এর কারণ এই যে, ইমাম মালিক মুসলিমের পক্ষে এমন দেশে অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত মনে করেননি, যেখানকার লোকেরা পূর্ব পুরুষদের সম্মান করে না, মূর্তি পূজা করে এবং তাদের দেবদেবীকে বিশ্বপালক রাহমানুররাহীম আল্লাহর শরীক করে। অবশ্য অন্যান্য মযহাবের আইনবিদগণ দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে অমুসলমানদের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তবে তাঁরা ব্যবসায়ের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট লোকজন ও পণ্য-দ্রব্যের চলাচলের ওপরে কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করেন।
দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিমদের ব্যবসা-বাণিজ্য
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের নিকট দারুল ইসলামের দ্বার উন্মোচন করে মুসলিম শাসকগণ সত্যিই অভূতপূর্ব ঔদার্য প্রদর্শন করেছেন। সাধারণতঃ, নীতিগতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম ব্যবসায়ীগণকে চার মাসের জন্য আমান (নিরাপত্তা) প্রদান করা হত। পণ্য দ্রব্যাদির আদান-প্রদান যদি এই সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হত, তবে সময় বর্ধিত করে নতুন আমান প্রদান করা হত। যদি কোন ব্যবসায়ী কমপক্ষে এক বছর দারুল ইসলামে অবস্থান করত ও জিম্মী হিসেবে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হত, তবে সাধারণতঃ তাকে কতিপয় সুবিধা দেয়া হত। মুস্তামিন হিসেবে সে দারুল ইসলামে অবাধে চলাফেরা করতে পারত; কেবলমাত্র বায়তুল হারাম বা হেজাযের পবিত্র স্থানসমূহে যাতায়াত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।
পণ্যদ্রব্যাদির অবাধ আদান-প্রদানের ব্যাপারে আইনবিদগণ বিদেশী ব্যবসায়ীদের ওপর কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য ইমামকে উপদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাধারণ নীতি হল এই যে, দারুল ইসলামের সঙ্গে দারুল হারবের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় দারুল ইসলাম থেকে দারুল হারবে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি রফতানী করা চলে না; কারণ, এতে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সব আইনবিদই এ সম্বন্ধে একমত যে, অস্ত্রশস্ত্র ও সমর-সম্ভার যুদ্ধকালীন নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য বলে বিবেচিত হবে। তাই, এগুলোর বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে বেআইনী ঘোষিত হয়। তবে অনেকে এই মতও পোষণ করেন যে ঘোড়া, খচ্চর ও দাসদাসী যুদ্ধে এত অধিক প্রয়োজনীয় যে, এগুলোর বিক্রয়ও নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে ইমাম মালিক আরও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি কতিপয় খাদ্যজাত পণ্য এবং পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের বিক্রয়ের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিদেশী ব্যবসায়ী দারুল ইসলামে অবস্থানকালে যদি অনুরূপ কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ক্রয় করতে চান, তবে তার নিকট সেগুলোর বিক্রয় অবৈধ বলে গণ্য হয় না; কিন্তু দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করার পূর্বে তাকে সেগুলো পুনরায় বিক্রয় করে যেতে হবে। বিদেশী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী ও নিষিদ্ধ দ্রব্যের রফতানী বন্ধ করার জন্য আইনবেত্তা আবু ইউসুফ দারুল ইসলামের সীমান্তে তল্লাশী ঘাঁটি ও প্রহরা-কেন্দ্রসমূহ (মাসালিহ) স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। অবশ্য, বিদেশী সওদাগরকে শূকরের গোশত, মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্য বিক্রয় করার অনুমতি দেয়া হয় না। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এ সব নিয়ম খুব কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা যায়নি; ফলে অনেক সময় দারুল ইসলাম থেকে জিনিসপত্রের রফতানী ও দারুল হারব থেকে জিনিসপত্রের আমদানী অবাধে চলতে থাকে।
দারুল ইসলামে দু'শ দিরহামের অধিক পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করলে বিদেশী ব্যবসায়ীকে সব পণ্যদ্রব্যের ওপর শতকরা দশভাগ পণ্যশুল্ক (উশর) দিতে হত। ইমাম অবশ্য বহির্বাণিজ্যের প্রসারের জন্য শুল্কের হার কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা সরকারী আয় বাড়াবার জন্য তিনি শুল্কের হার বাড়িয়েও দিতে পারেন; কিন্তু বছরে একবারের বেশী এ শুল্ক আদায় হত না। যদি কোন বিদেশী সওদাগরের নিজ দেশে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ বিনা শুল্কে ব্যবসায়ের সুযোগ পেতেন, তবে ইমামও অনুরূপভাবে অবাধ ব্যবসায়ের নীতি অনুসরণ করতেন। ব্যবসায়ের জন্য ইমামের অধীনস্থ জিম্মীদের কোন বাণিজ্য-শুল্ক দিতে হত না; তবে কেবলমাত্র হেজাযে ব্যবসায়ের জন্য জিম্মীদের অনুরূপ শুল্ক দিতে হত।
দারুল হারবের সঙ্গে মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য
মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে ব্যবসায়ের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদগণ অপেক্ষাকৃত কম উদারতা দেখিয়েছেন; কিন্তু দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিম ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা দানের ব্যাপারে তাঁরা অধিকতর ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছেন। মালিকী ও যাহিরী আইনবিদগণ মুসলমানদের পক্ষে দারুল হারবে যাওয়া পছন্দ করেননি; কারণ, এর ফলে তারা পৌত্তলিকতা ও দারুল হারবের আইনের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন। ইবনে হাযম এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জেহাদের উদ্দেশ্য কিংবা রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে দৌত্য বা বাণী নিয়ে যাবার জন্য কেবল ইমাম দারুল হারবে গমনের অনুমতি দিবেন। ইমাম মালিক বলেন যে, দারুল ইসলামের সীমান্তে পরিব্রাজকদের গমনাগমন এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে যাওয়ার ব্যাপারেও ইমাম কড়া নজর রাখবেন।
তবে অধিকাংশ আইনবিদই বিশেষ করে হানাফীগণ এ ব্যাপারে অনেক বেশী উদারতা দেখিছেন। হানাফীগণ ধর্মাধর্ম পদ্ধতি (আল-হিয়াল আশ-শারিয়া) দ্বারা অনেকগুলো বিধিনিষেধ অতিক্রম করেছেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ের মুসলিম আইনবেত্তাগণ এই সব বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন, যেগুলো এখনও বিদ্যমান আছে। বিদেশ হতে কি ধরনের পণ্যদ্রব্য আমদানী করা যাবে এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে দ্রব্য বিনিময়কালে কি পর্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি হবে, আর ইসলামী রাষ্ট্র কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে, তা' তারা বিশদভাবে বিবৃত করেছেন।
দারুল ইসলামের ব্যবসায়ের বিধি অনুযায়ী মুসলমানদের শূকরের গোশত ও মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্যের ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা করতে দেয়া হয় না। যে সব পশু ও উদ্ভিদ যথাক্রমে নোংরা ও ক্ষতিকর, সেগুলোর ব্যবসা থেকেও তাদের বিরত থাকতে হবে; কোন কোন আইনবিদ এই শ্রেণীর বিলাস-উপকরণ ও প্রমোদ জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যবসায় না করার পক্ষে মত প্রকশ করেছেন, যেমন হাতীর দাঁত, পুতুল ও বাদ্য-যন্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক, উন্মাদ, অন্ধ ও দাসদের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসায়ে লিপ্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও উন্মাদের কোন কিছু বিক্রয়ের আইনানুগ যোগ্যতা নেই। সম্পত্তি দেখতে না পেলে সাধারণ ক্ষেত্রে বিক্রয় অসম্ভব; তাই অন্ধ ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অবশ্য, তার পক্ষ থেকে অন্য কোন ব্যক্তি তা বিক্রয় করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দাসরা তাদের মালিকের সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে এ অধিকার লাভ করেনি।
যে কারণে অমুসলিমকে তার নিজের দেশে (দারুল হারবে) নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে যেতে দেয়া হয় না, ঠিক সেই কারণেই কোন মুসলমান ব্যবসায়ীকে নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করারও অনুমতি দেয়া হয় না। মুসলিম সওদাগরকে সাবী (গানিমা হিসেবে প্রাপ্ত মহিলা ও শিশু) এবং লোহা বা লৌহজাত দ্রব্য ও যুদ্ধের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দারুল হারবে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য যদি মুসলিম ব্যবসায়ী তার সঙ্গে দাস-দাসী ও অস্ত্রশস্ত্র বহন করেন এবং দারুল ইসলামে ফিরে আসার সময় যদি তিনি নিশ্চিতভাবে এগুলো তার সঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন, তবেই এসব নিয়ে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরে যেতে দেয়া হয়।
আমান সহ কিংবা আমান ব্যতিরেকে যেইভাবেই হোক, কোন মুসলিম সওদাগর দারুল হারবে পর্যটন বা অবস্থান করলে তাকে দারুল হারবের আইন ছাড়াও নিজ ধর্মের আইন পালন করতে হবে। অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম-মুস্তামিনের ওপর যে সব বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, তাকে তা পালন করতে হবে। যদি তিনি সেখানে অবস্থানকালে অন্য মুসলমানদের ওপরে কোন অন্যায় করেন, তবে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম মুস্তামিন বিদেশী সরকারকে শুল্ক দিতে পারেন; কিন্তু দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তার ওপর অনুরূপ ধরনের কোন শুল্ক ধার্য করা যাবে না। তবে অন্যান্য مسلمانوں মত সাধারণভাবে তাকেও দারুল হারবে অর্জিত অর্থ সহ তার মোট আয় অনুপাতে কর দিতে হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের তাৎপর্য
আইনবিদগণ কর্তৃক مسلمانوں দারুল হারবে যাতায়াত কিংবা ভ্রমণের ফলে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশংকা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে অমুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যই ইসলামের ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিরাট মাধ্যমরূপে কাজ করেছে। বস্তুতঃ, এর ফলেই মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকা ও বিষুবীয় আফ্রিকায় বাণিজ্যপথ ধরে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমেই ইসলাম-জগত সামরিক বিজয় লব্ধ রাজনৈতিক সীমানার বাইরে বহু দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের আত্ম-প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। হেনরী পিরিনের মতে, সম্ভবতঃ খৃস্টান রাষ্ট্রগুলো ইসলামের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে অসম্মত হয় বলেই ইউরোপের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়; ইসলামী-রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাকৃত নীতির ফলে এ সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এর ফলে মুসলিম বাণিজ্য বিভিন্ন পথ ধরে অগ্রসর হয় এবং ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের বিপুল সমৃদ্ধি সাধিত হয়। ক্রুসেড যুদ্ধের আমলে ইউরোপের সঙ্গে আবার লেবাননের বাণিজ্য শুরু হয়। কিন্তু পরে ভারত ও দূরপ্রাচ্যে পৌছার জন্য উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ সম্পর্ক পুনরায় ছিন্ন হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল অবধি ইউরোপের সঙ্গে সিরিয়া ও লেবাননের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক রকম বন্ধ ছিল। এই শতকে মুসলিম-রাষ্ট্র ও খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নব পর্যায়ে উন্নীত হয়।
স্থল ও সমুদ্র উভয় পথেই বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসা- বাণিজ্য অব্যাহত থাকে। বহির্বিশ্বের সাথে ইসলামের এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের দরুন বিশ্ববাণিজ্যের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কতিপয় বিশেষ রীতিনীতি ও বিধিব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব হয়।
মুসলমানরা কেবলমাত্র পূর্ব এশিয়া থেকে নতুন নতুন পণ্য-সামগ্রীই (যেগুলো পরে ইউরোপে চালু হয়) আমদানী করেনি, অধিকন্তু তারা চীনাদের নিকট হতে কাগজী মুদ্রার ব্যবহার-প্রণালী আয়ত্ত করে পরে অন্যান্য দেশে এর প্রচলনে সাহায্য করে।
ব্যাংকিং পদ্ধতির উন্নয়নেও مسلمانوں ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম ব্যাঙ্ক- বিশেষজ্ঞদেরই চেক, ঋণপত্র ও হুণ্ডির ব্যবহারকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন। বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্র (যেমন—বসরা) থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় যাতায়াত করতেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কিভাবে একটি বাণিজ্য-প্রধান নগরের ব্যবসায়ীরা তখনকার দিনে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে বহু দূরবর্তী প্রান্তে স্বচ্ছন্দে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করতে পারতেন।
ইসলাম বা ব্যবসা-বাণিজ্য
ইসলাম এমন একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা, যার মধ্যে জাগতিক ও পারত্রিক উভয়বিধ মূল্যবোধেরই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্বাসী মুসলমানকে দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করতে বলা হয়েছে যেন তিনি চিরকালই জীবিত থাকবেন; আবার সঙ্গে তাকে এমনভাবে নাজাত বা পারলৌকিক মুক্তির জন্য কাজ করে যেতে হবে যেন আগামীকাল তার মৃত্যুর দিন। আইনে অবশ্য পারত্রিক মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। পারত্রিক জীবনকে অস্বীকার করে ইহকালের জন্য কাজ করা ইসলামে অনুমোদিত হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য (তিজারা বা তিজারাত) এমন একটি বৃত্তি, যা আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হলে, ধর্মীয় কর্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুনিয়াতে তা অনেক কল্যাণ সাধন করতে পারবে।
যে পরিবেশে ইসলামের উন্মেষ সাধিত হয়, তা' বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খুব প্রসিদ্ধ ছিল এবং ব্যবসায়ী হিসেবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক জীবনের অভিজ্ঞতা খোদার বাণীর মধ্যেও প্রতিভাত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আল-কোরআনে যে কেবল নিয়ামত অন্বেষণকারীদের জন্যে সমর্থিত হয়েছে তা' নয়, বস্তুতঃ ধর্মীয় ভাবধারা প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সংজ্ঞা ও শব্দাবলী ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে আগাগোড়া বাণিজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির স্বর্ণযুগে ব্যবসায়ীগণই সমাজের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রসার এবং সমৃদ্ধি সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। যদিও ব্যবসায়ীগণ সাধারণভাবে রাষ্ট্র-নীতিকে বড় একটা প্রভাবিত করতে পারেননি, তবু আইনবেত্তা ইমাম আবু হানিফার মত ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত ব্যক্তিগণের প্রভাব অনেক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের চাইতে বেশী ছিল। আরব দেশে প্রাক-ইসলামী যুগে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদানের রীতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে।
দারুল ইসলামের বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সব আইনবিদই স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থাৎ দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের মধ্যে পণ্য-বিনিময়ের ব্যবস্থা অনুমোদন করেননি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, মালিকী আইনবিদগণ স্থল কিংবা সমুদ্রপথে দারুল হারবের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্য করতে নিষেধ করেছেন। ইমাম মালিক অমুসলিমদের দারুল ইসলামে এসে مسلمانوں সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু মুসলমানরা দারুল হারবে গিয়ে ব্যবসা করুক, এটা তিনি অনুমোদন করেননি। এর কারণ এই যে, ইমাম মালিক মুসলিমের পক্ষে এমন দেশে অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত মনে করেননি, যেখানকার লোকেরা পূর্ব পুরুষদের সম্মান করে না, মূর্তি পূজা করে এবং তাদের দেবদেবীকে বিশ্বপালক রাহমানুররাহীম আল্লাহর শরীক করে। অবশ্য অন্যান্য মযহাবের আইনবিদগণ দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে অমুসলমানদের সঙ্গে مسلمانوں বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তবে তাঁরা ব্যবসায়ের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট লোকজন ও পণ্য-দ্রব্যের চলাচলের ওপরে কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করেন।
দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিমদের ব্যবসা-বাণিজ্য
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের নিকট দারুল ইসলামের দ্বার উন্মোচন করে মুসলিম শাসকগণ সত্যিই অভূতপূর্ব ঔদার্য প্রদর্শন করেছেন। সাধারণতঃ, নীতিগতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম ব্যবসায়ীগণকে চার মাসের জন্য আমান (নিরাপত্তা) প্রদান করা হত। পণ্য দ্রব্যাদির আদান-প্রদান যদি এই সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হত, তবে সময় বর্ধিত করে নতুন আমান প্রদান করা হত। যদি কোন ব্যবসায়ী কমপক্ষে এক বছর দারুল ইসলামে অবস্থান করত ও জিম্মী হিসেবে জিযিয়া দিতে স্বীকৃত হত, তবে সাধারণতঃ তাকে কতিপয় সুবিধা দেয়া হত। মুস্তামিন হিসেবে সে দারুল ইসলামে অবাধে চলাফেরা করতে পারত; কেবলমাত্র বায়তুল হারাম বা হেজাযের পবিত্র স্থানসমূহে যাতায়াত তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।
পণ্যদ্রব্যাদির অবাধ আদান-প্রদানের ব্যাপারে আইনবিদগণ বিদেশী ব্যবসায়ীদের ওপর কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য ইমামকে উপদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাধারণ নীতি হল এই যে, দারুল ইসলামের সঙ্গে দারুল হারবের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় দারুল ইসলাম থেকে দারুল হারবে যুদ্ধের সরঞ্জামাদি রফতানী করা চলে না; কারণ, এতে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সব আইনবিদই এ সম্বন্ধে একমত যে, অস্ত্রশস্ত্র ও সমর-সম্ভার যুদ্ধকালীন নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য বলে বিবেচিত হবে। তাই, এগুলোর বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে বেআইনী ঘোষিত হয়। তবে অনেকে এই মতও পোষণ করেন যে ঘোড়া, খচ্চর ও দাসদাসী যুদ্ধে এত অধিক প্রয়োজনীয় যে, এগুলোর বিক্রয়ও নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। এ ব্যাপারে ইমাম মালিক আরও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি কতিপয় খাদ্যজাত পণ্য এবং পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের বিক্রয়ের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিদেশী ব্যবসায়ী দারুল ইসলামে অবস্থানকালে যদি অনুরূপ কিছু নিষিদ্ধ দ্রব্য ক্রয় করতে চান, তবে তার নিকট সেগুলোর বিক্রয় অবৈধ বলে গণ্য হয় না; কিন্তু দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করার পূর্বে তাকে সেগুলো পুনরায় বিক্রয় করে যেতে হবে। বিদেশী ব্যবসায়ীদের তল্লাশী ও নিষিদ্ধ দ্রব্যের রফতানী বন্ধ করার জন্য আইনবেত্তা আবু ইউসুফ দারুল ইসলামের সীমান্তে তল্লাশী ঘাঁটি ও প্রহরা-কেন্দ্রসমূহ (মাসালিহ) স্থাপনের সুপারিশ করেছেন। অবশ্য, বিদেশী সওদাগরকে শূকরের গোশত, মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্য বিক্রয় করার অনুমতি দেয়া হয় না। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এ সব নিয়ম খুব কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা যায়নি; ফলে অনেক সময় দারুল ইসলাম থেকে জিনিসপত্রের রফতানী ও দারুল হারব থেকে জিনিসপত্রের আমদানী অবাধে চলতে থাকে।
দারুল ইসলামে দু'শ দিরহামের অধিক পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করলে বিদেশী ব্যবসায়ীকে সব পণ্যদ্রব্যের ওপর শতকরা দশভাগ পণ্যশুল্ক (উশর) দিতে হত। ইমাম অবশ্য বহির্বাণিজ্যের প্রসারের জন্য শুল্কের হার কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা সরকারী আয় বাড়াবার জন্য তিনি শুল্কের হার বাড়িয়েও দিতে পারেন; কিন্তু বছরে একবারের বেশী এ শুল্ক আদায় হত না। যদি কোন বিদেশী সওদাগরের নিজ দেশে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ বিনা শুল্কে ব্যবসায়ের সুযোগ পেতেন, তবে ইমামও অনুরূপভাবে অবাধ ব্যবসায়ের নীতি অনুসরণ করতেন। ব্যবসায়ের জন্য ইমামের অধীনস্থ জিম্মীদের কোন বাণিজ্য-শুল্ক দিতে হত না; তবে কেবলমাত্র হেজাযে ব্যবসায়ের জন্য জিম্মীদের অনুরূপ শুল্ক দিতে হত।
দারুল হারবের সঙ্গে মুসলমানদের ব্যবসা-বাণিজ্য
মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে ব্যবসায়ের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদগণ অপেক্ষাকৃত কম উদারতা দেখিয়েছেন; কিন্তু দারুল ইসলামের সঙ্গে অমুসলিম ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা দানের ব্যাপারে তাঁরা অধিকতর ঔদার্যের পরিচয় দিয়েছেন। মালিকী ও যাহিরী আইনবিদগণ মুসলমানদের পক্ষে দারুল হারবে যাওয়া পছন্দ করেননি; কারণ, এর ফলে তারা পৌত্তলিকতা ও দারুল হারবের আইনের আওতায় আসতে বাধ্য হবেন। ইবনে হাযম এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, জেহাদের উদ্দেশ্য কিংবা রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে দৌত্য বা বাণী নিয়ে যাবার জন্য কেবল ইমাম দারুল হারবে গমনের অনুমতি দিবেন। ইমাম মালিক বলেন যে, দারুল ইসলামের সীমান্তে পরিব্রাজকদের গমনাগমন এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের দারুল হারবে যাওয়ার ব্যাপারেও ইমাম কড়া নজর রাখবেন।
তবে অধিকাংশ আইনবিদই বিশেষ করে হানাফীগণ এ ব্যাপারে অনেক বেশী উদারতা দেখিছেন। হানাফীগণ ধর্মাধর্ম পদ্ধতি (আল-হিয়াল আশ-শারিয়া) দ্বারা অনেকগুলো বিধিনিষেধ অতিক্রম করেছেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ের মুসলিম আইনবেত্তাগণ এই সব বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন, যেগুলো এখনও বিদ্যমান আছে। বিদেশ হতে কি ধরনের পণ্যদ্রব্য আমদানী করা যাবে এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে দ্রব্য বিনিময়কালে কি পর্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি হবে, আর ইসলামী রাষ্ট্র কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে, তা' তারা বিশদভাবে বিবৃত করেছেন।
দারুল ইসলামের ব্যবসায়ের বিধি অনুযায়ী মুসলমানদের শূকরের গোশত ও মদ প্রভৃতি নিষিদ্ধ দ্রব্যের ব্যবসা এবং সুদের ব্যবসা করতে দেয়া হয় না। যে সব পশু ও উদ্ভিদ যথাক্রমে নোংরা ও ক্ষতিকর, সেগুলোর ব্যবসা থেকেও তাদের বিরত থাকতে হবে; কোন কোন আইনবিদ এই শ্রেণীর বিলাস-উপকরণ ও প্রমোদ জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যবসায় না করার পক্ষে মত প্রকশ করেছেন, যেমন হাতীর দাঁত, পুতুল ও বাদ্য-যন্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক, উন্মাদ, অন্ধ ও দাসদের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসায়ে লিপ্ত হতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও উন্মাদের কোন কিছু বিক্রয়ের আইনানুগ যোগ্যতা নেই। সম্পত্তি দেখতে না পেলে সাধারণ ক্ষেত্রে বিক্রয় অসম্ভব; তাই অন্ধ ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অবশ্য, তার পক্ষ থেকে অন্য কোন ব্যক্তি তা বিক্রয় করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দাসরা তাদের মালিকের সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত বলে এ অধিকার লাভ করেনি।
যে কারণে অমুসলিমকে তার নিজের দেশে (দারুল হারবে) নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে যেতে দেয়া হয় না, ঠিক সেই কারণেই কোন মুসলমান ব্যবসায়ীকে নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করারও অনুমতি দেয়া হয় না। মুসলিম সওদাগরকে সাবী (গানিমা হিসেবে প্রাপ্ত মহিলা ও শিশু) এবং লোহা বা লৌহজাত দ্রব্য ও যুদ্ধের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দারুল হারবে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য যদি মুসলিম ব্যবসায়ী তার সঙ্গে দাস-দাসী ও অস্ত্রশস্ত্র বহন করেন এবং দারুল ইসলামে ফিরে আসার সময় যদি তিনি নিশ্চিতভাবে এগুলো তার সঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন, তবেই এসব নিয়ে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরে যেতে দেয়া হয়।
আমান সহ কিংবা আমান ব্যতিরেকে যেইভাবেই হোক, কোন মুসলিম সওদাগর দারুল হারবে পর্যটন বা অবস্থান করলে তাকে দারুল হারবের আইন ছাড়াও নিজ ধর্মের আইন পালন করতে হবে। অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম-মুস্তামিনের ওপর যে সব বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, তাকে তা পালন করতে হবে। যদি তিনি সেখানে অবস্থানকালে অন্য মুসলমানদের ওপরে কোন অন্যায় করেন, তবে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তাকে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম মুস্তামিন বিদেশী সরকারকে শুল্ক দিতে পারেন; কিন্তু দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তনের পর তার ওপর অনুরূপ ধরনের কোন শুল্ক ধার্য করা যাবে না। তবে অন্যান্য مسلمانوں মত সাধারণভাবে তাকেও দারুল হারবে অর্জিত অর্থ সহ তার মোট আয় অনুপাতে কর দিতে হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের তাৎপর্য
আইনবিদগণ কর্তৃক مسلمانوں দারুল হারবে যাতায়াত কিংবা ভ্রমণের ফলে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশংকা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে অমুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যই ইসলামের ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে এক বিরাট মাধ্যমরূপে কাজ করেছে। বস্তুতঃ, এর ফলেই মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকা ও বিষুবীয় আফ্রিকায় বাণিজ্যপথ ধরে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমেই ইসলাম-জগত সামরিক বিজয় লব্ধ রাজনৈতিক সীমানার বাইরে বহু দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের আত্ম-প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়া ও লেবাননের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। হেনরী পিরিনের মতে, সম্ভবতঃ খৃস্টান রাষ্ট্রগুলো ইসলামের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে অসম্মত হয় বলেই ইউরোপের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিন্ন হয়; ইসলামী-রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাকৃত নীতির ফলে এ সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। এর ফলে মুসলিম বাণিজ্য বিভিন্ন পথ ধরে অগ্রসর হয় এবং ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পদ ও ঐশ্বর্যের বিপুল সমৃদ্ধি সাধিত হয়। ক্রুসেড যুদ্ধের আমলে ইউরোপের সঙ্গে আবার লেবাননের বাণিজ্য শুরু হয়। কিন্তু পরে ভারত ও দূরপ্রাচ্যে পৌছার জন্য উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে নতুন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ সম্পর্ক পুনরায় ছিন্ন হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল অবধি ইউরোপের সঙ্গে সিরিয়া ও লেবাননের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক রকম বন্ধ ছিল। এই শতকে মুসলিম-রাষ্ট্র ও খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নব পর্যায়ে উন্নীত হয়।
স্থল ও সমুদ্র উভয় পথেই বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে مسلمانوں ব্যবসা- বাণিজ্য অব্যাহত থাকে। বহির্বিশ্বের সাথে ইসলামের এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের দরুন বিশ্ববাণিজ্যের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কতিপয় বিশেষ রীতিনীতি ও বিধিব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব হয়।
মুসলমানরা কেবলমাত্র পূর্ব এশিয়া থেকে নতুন নতুন পণ্য-সামগ্রীই (যেগুলো পরে ইউরোপে চালু হয়) আমদানী করেনি, অধিকন্তু তারা চীনাদের নিকট হতে কাগজী মুদ্রার ব্যবহার-প্রণালী আয়ত্ত করে পরে অন্যান্য দেশে এর প্রচলনে সাহায্য করে।
ব্যাংকিং পদ্ধতির উন্নয়নেও مسلمانوں ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম ব্যাঙ্ক- বিশেষজ্ঞদেরই চেক, ঋণপত্র ও হুণ্ডির ব্যবহারকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন। বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্র (যেমন—বসরা) থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় যাতায়াত করতেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, কিভাবে একটি বাণিজ্য-প্রধান নগরের ব্যবসায়ীরা তখনকার দিনে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে বহু দূরবর্তী প্রান্তে স্বচ্ছন্দে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করতে পারতেন।
📄 সালিশী
প্রাক-ইসলাম যুগে সালিশী ব্যবস্থা
সাধারণভাবে স্বীকৃত সামাজিক রীতি ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিবদমান পক্ষসমূহের বিরোধ মীমাংসার নীতি হিসেবে অতি প্রাচীনকাল থেকেই সালিশীর ব্যবস্থা চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের মীমাংসা। তবে প্রকৃতপক্ষে, কোন পক্ষের দাবীর যথার্থতা নিরূপণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ফলে সালিশী অনেকটা মীমাংসাভিত্তিক ব্যবস্থার রূপ পরিগ্রহ করে। বস্তুতঃ, এই ব্যবস্থা এত প্রাচীন যে, খৃস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে (সিরকা-৩১০০) মেসোপটেমীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশের শাসনকর্তা ইয়েনাটম ও মেসোপটেমিয়ার অন্যতম নগর-রাষ্ট্র উম্মার অধিবাসীদের মধ্যে সালিশীর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সালিশীর একটি ধারার সংযোজন দেখা যায়। নিকট-প্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসে সালিশীর অনুরূপ আরো অনেক নজির পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন গ্রীসেই এ ব্যবস্থার ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়।
গ্রীসের নগর-রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমানা ও নদ-নদী নিয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপারে বিরোধ দেখা দিলে সালিশীর ব্যবস্থা করা হত। বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে ডেলফীর দৈববাণীও অনেক সময় সালিশের কাজ করত এবং এর রায় প্রায় সবাই মাথা পেতে স্বীকার করে নিত। বিবদমান দেশগুলোর বাইরের তৃতীয় কোন রাষ্ট্রকেও সালিশ মানা হত। এই মধ্যস্থ রাষ্ট্র সাধারণতঃ বিরোধের কারণ সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতেন এবং এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিরোধমূলক বিষয় সম্পর্কে রায় প্রদান করতেন।
প্রাক-ইসলাম যুগের আরবে গোত্রের সরদার ও কাহীন (দৈবজ্ঞ বা ভবিষৎ বক্তা) আন্তঃগোত্রীয় বিরোধের ব্যাপারে সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের তা'মীম গোত্রের সরদারগণ প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহের বিরোধ মীমাংসায় সালিশ হিসেবে তাঁদের সাফল্যজনক ভূমিকার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। অনেক সময় সমাজের উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণও সালিশের কাজ করতেন। উকাযের বার্ষিক মেলায় কিংবা পবিত্র ও শান্তির মাসসমূহে (আশ হুরুল হারাম) সাধারণতঃ এই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি সালিশী করতেন। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এই সব পবিত্র মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। বিভিন্ন গোত্রের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারেও এই গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের ইতিহাস হতে জানা যায় যে, আল-হারিস ইবনে আউফ ও খারিজার মধ্যস্থতায় আবস ও যু'বিয়ান গোত্রের যুদ্ধগত বিরোধের মীমাংসা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত (সঃ) আরবদের নানাবিধ বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে সালিশ (হাকাম) হিসেবে কাজ করেন। কা'বার ঐতিহাসিক কালো পাথর ওঠানোর ব্যাপারে আরব সরদারদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সালিশীর (তাহকিম) মাধ্যমেই তার মীমাংসা হয়। সে সময়কার আরব গোত্রসমূহের দীর্ঘদিনের বিরোধগুলোর ভেতর মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিরোধের বিষয়টি সমধিক উল্লেখযোগ্য। এই বিরোধে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সালিশ হিসেবে কাজ করেন এবং প্রচলিত আরব-রীতি ও সামাজিক ব্যবহার-বিধি অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করেন। এইভাবে তাঁর মধ্যস্থতায় এই গোত্র দুইটির ঐতিহাসিক শত্রুতার অবসান ঘটে।
ইসলাম ও সালিশী
ইসলাম-পন্থীদের মধ্যে শান্তি ও সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে ইসলামের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে দুইটি বিবদমান মুসলিম দলের মধ্যে আপোষ-রফা কিংবা বিরোধ মীমাংসার মাধ্যম হিসেবে ইসলাম আরবের সালিশী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দান করেছে। ইসলামের নীতি লঙ্ঘন করা না হলে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যেও সালিশী অনুমোদিত ছিল। আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলীতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে হযরত (সঃ) ও ইহুদী গোত্র বানু কোরায়জার মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে সালিশীর নজিরের উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষই তাঁদের বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়টি তাঁদের মনোনীত একজন লোকের নিকট মীমাংসার জন্য পেশ করতে সম্মত হন।
এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করে আল-শায়বানি বলেন যে, ইমাম সমগ্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কিংবা কোন খণ্ড যুদ্ধের অবসানের উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষের নিকট বিরোধমূলক বিষয়টি পেশ করতে পারেন। সকলের নিকট সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য একজন ধীরবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মুসলমানকেই সালিশ নিযুক্ত করতে হবে। তাঁকে যদি উভয়পক্ষই স্বেচ্ছায় নিযুক্ত করে থাকেন, তবে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে তাঁরা বাধ্য থাকবেন। অবশ্য, যদি পূর্বাহ্নে তাঁদের মতামত না নিয়েই তিনি নিযুক্ত হয়ে থাকেন কিংবা তিনি এমন বিবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যার সঙ্গে তাঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী অথবা তাঁর সন্তান-সন্ততি সংশ্লিষ্ট থাকেন, তবে সে ব্যাপারে তাঁর রায় গ্রাহ্য হবে না।
হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সালিশী
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৬-৬৬১) ও সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে গৃহযুদ্ধের অবসানের জন্যে যে সালিশী হয়, সম্ভবতঃ ইসলামের ইতিহাসে সালিশীর ক্ষেত্রে তা-ই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজনৈতিক বিষয়টি এখানে আইনগত দিকের চাইতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেভাবে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়, তাতে তদানীন্তন যুগের সালিশীর প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণায় পৌঁছা যায়।
আমর-বিন-আল-আস যুদ্ধে মুয়াবিয়ার আসন্ন পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয় বুঝতে পেরে মুয়াবিয়াকে সালিশীর আবেদন জানা ও পরামর্শ দান করেন। আমরের পরামর্শ অনুযায়ী মুয়াবিয়া সালিশীর জন্য অনুরোধ করেন এবং তাঁর সৈন্যদের বর্শার অগ্রভাগে আল-কোরআন তুলে ধরতে নির্দেশ দেন। এর তাৎপর্য এই যে, মুয়াবিয়া তাঁর ও হযরত আলীর মধ্যে কোরআনকে মধ্যস্থ হিসেবে উপস্থাপিত করে যুদ্ধ অবসানের আবেদন করেন। হযরত আলী মুয়াবিয়ার এ চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ধরতে পারলেও আল- কোরআনের মাধ্যমে পেশকৃত এ আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তা'ছাড়া, তাঁর অনুগামী ও সমর্থকগণ কোরআনের প্রতি তাদের স্বাভাবিক ভক্তি-শ্রদ্ধাবশতঃ এ আবেদনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। কারণ, কোরআনকে মান্য করাটা मुसलमानों মধ্যে একটা সাধারণ কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত। যাহোক, উভয়পক্ষই স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের পক্ষ হতে একজন সালিশ (হাকাম) নিয়োগে স্বীকৃত হন এবং কোরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই সালিশকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করেন। হযরত মুয়াবিয়া আমর-ইবনুল-আসকে এবং হযরত আলী আবু মূসা-আল- আশারীকে সালিশ নির্বাচিত করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত আলী তাঁর সমর্থকদের চাপের ফলে আবু মূসাকে নিয়োগ করেন। উভয় সালিশকেই জীবন, ধন- সম্পদ এবং তাঁদের পরিবারবর্গের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। সালিশদের এক বছরের মধ্যে তাঁদের রায় দান করতে বলা হয়। হিজরী ৩৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৯) আধরুহ নামক স্থানে উভয় সালিশ বৈঠকে মিলিত হন এবং উভয়পক্ষ কর্তৃক যথারীতি স্বীকৃত একটি সন্ধিচুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করেন। হুদায়বিয়া চুক্তিকে এই সালিশী চুক্তিটির দলিল প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি গ্রহণের ফলে হযরত আলী খলিফার সরকারী পদবী হতে বঞ্চিত হলেন এবং তাঁর মর্যাদা সিরিয়াস্থ তাঁর শাসন-প্রতিনিধি (গভর্নর) মুয়াবিয়ার সমপর্যায়ে নেমে এলো। নীচে চুক্তিটির বিষয়বস্তুর বিবরণ দেয়া হল:
"পরম করুণাময় আল্লাহ'র নামে শুরু করছি।
"আলী-ইবনে-আবুতালিব ও মুয়াবিয়া-ইবনে-আবু সুফিয়ান এতদ্বারা তাঁদের মধ্যে (বিরোধ মীমাংসায় অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে) সালিশীর ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছেন।
আলী কুফাবাসীগণ ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আর মুয়াবিয়া শামীবাসীগণ (সিরিয়াবাসী) ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
“আমরা আল্লাহ এবং তাঁর কিতাবের (আল-কোরআনের) নির্দেশিত সালিশীর জন্য আবেদন করছি; কারণ, এছাড়া অন্য কোনো পন্থা বা ভিত্তি নেই...এবং উভয় আইনবিদ—আবু মুসা আল-আশআরী ও আমর ইবনুল-আস আল্লাহর কিতাবের (আল-কোরআন) নির্দেশিত পন্থার ভিত্তিতে কাজ করবেন...এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে যদি কোন কিছু না পাওয়া যায়, তবে আইনানুযায়ী সুন্নাহ’র বিধানই তাঁদের কর্মপন্থার ভিত্তি হবে....”
বলা বাহুল্য, চুক্তিটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। সালিশীর উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে এতে কোন কিছুর উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র এতে কোরআন ও সুন্নাহকে সালিশীর ভিত্তিরূপে গণ্য করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটির সংক্ষিপ্ততা ও অস্পষ্টতা আমর-ইবনুল-আসকে মূল বিষয়টি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দান করেছে; এবং এই সুযোগের মাধ্যমে অন্যতম সালিশ আবু মুসাকে নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে তিনি আলোচ্য বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেন:
“আবু মুসা, আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, উসমানকে (তৃতীয় খলিফা) অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে?”
আবু মুসা সম্মতিসূচক জওয়াব দান করেন।
অতঃপর আমর আবার বলেন : “আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, মুয়াবিয়া এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজন উসমানের উত্তরাধিকারী?”
আবু মুসা এতেও সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
আমর পুনরায় বলেন, আল্লাহ বলেছেন : “......অন্যায়ভাবে যে কাউকেই হত্যা করা হয়, তার উত্তরাধিকারীদের ওপরেই আমরা কর্তৃত্ব দান করেছি; হত্যার ব্যাপারে (প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে) সে (উত্তরাধিকারী) যেন সীমা অতিক্রম না করে; এবং (সীমা অতিক্রম না করলে) নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য দান করা হবে” (কোরআন ১৭ : ৩৩)।
এরপর আমর মন্তব্য করলেন : “সুতরাং, এমতাবস্থায় হযরত উসমানের পর মুয়াবিয়া কেন তাঁর উত্তরাধিকারী (অর্থাৎ খলিফা) হবেন না?”
কিন্তু আমর আবার বললেন : “আপনি যদি এই ভয় করেন যে, শাসন-ক্ষমতা পরিচালনার ব্যাপারে মুয়াবিয়ার যোগ্যতা ও অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণ প্রশ্ন তুলবে, তবে আপনি তাদের এই জওয়াব দিতে পারেন যে, মুয়াবিয়া হযরত উসমানের (রাঃ) স্ববংশসম্ভূত এবং উত্তরাধিকারী, আর হযরত উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আরও বলতে পারেন যে, মুয়াবিয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং রাষ্ট্র-পরিচালনায়ও বিশেষ সুদক্ষ। আর, তা'ছাড়া তিনি রাসূলের (সঃ) অন্যতম সাহাবী ছিলেন।"
আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "হে আমর! আল্লাহকে ভয় কর! হযরত আলী ইবনে আবু তালেব কো রেশদের মধ্যে একজন অতি সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।"
খলিফা হওয়ার পক্ষে কে সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত, শেষ পর্যন্ত তা' নিয়েই সালিশদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ফলে, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার উপায় বা পদ্ধতির ওপর বিশেষ কোন গুরুত্বই আরোপ করা হল না। আবু মূসা দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রাঃ) পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে খলিফা মনোনীত করার বিষয় চিন্তা করেন। পক্ষান্তরে, আমর খলিফার পদে মুয়াবিয়ার পক্ষ সমর্থনের সিদ্ধান্ত করেন।
পরিশেষে আবু মূসাকে লক্ষ্য করে আমর বললেন: "এ ব্যাপারে (খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে) আপনার মত কি?"
আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "আমার মত হল, এ দু'জন লোককে (হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়াকে) পদচ্যুত করে مسلمانوں সাধারণ নির্বাচনের (শুরা বা সাধারণ গণভোট) ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উচিত। তারা তাদের নিজেদের জন্য (তাদের শাসক হিসেবে) তাদের পছন্দ অনুযায়ী যাঁকে খুশী নির্বাচন করবে।" আমর বললেন: "আমার মতও তাই।"
বাহ্যতঃ, অনুরূপভাবে সমঝোতায় পৌঁছে যাবার পর, দু'জন সালিশই সরকারীভাবে সাধারণ্যে তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে প্রস্তুত হলেন। বয়োঃজ্যেষ্ঠ হিসেবে আবু মূসাকে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য আমর নম্রভাবে অনুরোধ করলেন এবং বললেন যে, তাঁর (আবু মূসার) ঘোষণার পরই তিনি (আমর) তাঁর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবেন। আবু মূসা একথার পর প্রথম আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং অতঃপর বললেনঃ
"হে লোকগণ! আমরা এই জাতির সমস্যাটি পরীক্ষা করে দেখেছি এবং হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া উভয়কে অপসারণ করা ছাড়া আর কোন উত্তম সমাধান খুঁজে পাইনি যাতে করে সমগ্র বিষয়টি এই জাতি নিজের হাতে গ্রহণ করবে এবং তাদের যাকে ইচ্ছা, তার ওপর শাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করবে। আমি হযরত আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি এবং আপনারা যাঁকে যোগ্য মনে করেন, তাঁকে নির্বাচিত করতে পারেন।"
আবু মূসার উপরোক্ত ঘোষণার পর আমর আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন: "আপনারা এ লোকটিকে (আবু মূসার) বক্তব্য শুনেছেন। তিনি তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতের অনুরূপ আমিও তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি। কিন্তু আমি আমার বন্ধু মুয়াবিয়াকে শাসন-পরিচালকের পদে সমর্থন করছি। কারণ, তিনিই হযরত উসমানের উত্তরাধিকারী এবং এই পদের জন্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্যতম ব্যক্তি"।
সালিশদের এই ঘোষিত সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁদের পরস্পরের সুস্পষ্ট মতবিরোধ থাকায় স্বাভাবিক কারণেই হযরত আলী এটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। তিনি সালিশদের কার্যক্রমের নিন্দাবাদ ও তাঁদের প্রতি দোষারোপ করে বলেন:
"...তাঁরা কোরআনের নীতি থেকে দূরে সরে গেছেন..... এবং কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ইচ্ছামত কাজ করেছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের পেছনে কোন প্রামাণ্য ভিত্তি কিংবা কোন পূর্বতন নজির নেই; অধিকন্তু, এই সিদ্ধান্তে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক মতানৈক্য রয়েছে...."
আবু মূসার সাথে চাতুরীর জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ কঠোর ভাষায় আমরের নিন্দা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ প্রশ্নটিতে তত চাতুর্যপূর্ণ বা প্রতারণামূলক বলে মনে হয় না। কারণ, এতে আসলে বিরোধ-বহির্ভূত একটি সমস্যার ফয়সালায় আবু মূসাকে প্রভাবান্বিত করার ব্যাপারে আমরের বিশেষ দক্ষতারই পরিচয় পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আবু মূসার ত্রুটি হল, নির্দিষ্ট বিরোধমূলক প্রশ্নটি (আলী ও মুয়াবিয়ার সংঘর্ষের অবসানের প্রশ্ন) এবং সালিশ হিসেবে তাঁদের ক্ষমতা-বহির্ভূত অপর প্রশ্নটির (অর্থাৎ খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নটি) মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতা। কারণ, মূল বিষয় ও চুক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের নির্দিষ্ট প্রশ্ন সম্পর্কে রায় দানের জন্যই আবু মূসা ও আমরকে সালিশ নিয়োগ করা হয়।
সালিশীর তাৎপর্য
অনেক ঐতিহাসিকই প্রাক-ইসলামী যুগ কিংবা ইসলামী যুগে বিরোধ-মীমাংসার পন্থা বা মধ্যম হিসেবে সালিশীর ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন; কিন্তু আসলে আরবে কেবলমাত্র গোষ্ঠীগত (এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর) কোন্দল মীমাংসার ব্যাপারেই সালিশী সীমাবদ্ধ ছিল; তাছাড়া, ইসলামের আবির্ভাবের পরে খুব কম ক্ষেত্রেই সালিশীর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আধরুহ সালিশীর ব্যাপারে যেমন ঘটেছে, তেমনি প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমস্যা থেকে আইনগত সমস্যাকে পৃথক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, খলিফা ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সালিশীর মোকদ্দমার চাইতে কূটনীতি কিংবা যুদ্ধের শরণাপন্ন হতেন। তবে খুঁটিনাটি ব্যাপারে, যেমন গোষ্ঠীগত সংঘর্ষের ক্ষেত্রে হত্যার ক্ষতিপূরণ বা রক্ত মূল্য পরিশোধের প্রশ্নে কিংবা ব্যক্তিগত অথবা আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের বিরোধ-মীমাংসার মত সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে সালিশীর অনেকটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সাধারণতঃ, জনমত এবং শাসকদের এখতিয়ারাধীন ক্ষমতা বলে সালিশীর বিধানসমূহ কার্যকরী করা হত।
প্রাক-ইসলাম যুগে সালিশী ব্যবস্থা
সাধারণভাবে স্বীকৃত সামাজিক রীতি ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিবদমান পক্ষসমূহের বিরোধ মীমাংসার নীতি হিসেবে অতি প্রাচীনকাল থেকেই সালিশীর ব্যবস্থা চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের মীমাংসা। তবে প্রকৃতপক্ষে, কোন পক্ষের দাবীর যথার্থতা নিরূপণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ফলে সালিশী অনেকটা মীমাংসাভিত্তিক ব্যবস্থার রূপ পরিগ্রহ করে। বস্তুতঃ, এই ব্যবস্থা এত প্রাচীন যে, খৃস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে (সিরকা-৩১০০) মেসোপটেমীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশের শাসনকর্তা ইয়েনাটম ও মেসোপটেমিয়ার অন্যতম নগর-রাষ্ট্র উম্মার অধিবাসীদের মধ্যে সালিশীর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের মীমাংসা হয়। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সালিশীর একটি ধারার সংযোজন দেখা যায়। নিকট-প্রাচ্যের প্রাচীন ইতিহাসে সালিশীর অনুরূপ আরো অনেক নজির পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন গ্রীসেই এ ব্যবস্থার ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়।
গ্রীসের নগর-রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সীমানা ও নদ-নদী নিয়ে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপারে বিরোধ দেখা দিলে সালিশীর ব্যবস্থা করা হত। বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে ডেলফীর দৈববাণীও অনেক সময় সালিশের কাজ করত এবং এর রায় প্রায় সবাই মাথা পেতে স্বীকার করে নিত। বিবদমান দেশগুলোর বাইরের তৃতীয় কোন রাষ্ট্রকেও সালিশ মানা হত। এই মধ্যস্থ রাষ্ট্র সাধারণতঃ বিরোধের কারণ সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতেন এবং এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিরোধমূলক বিষয় সম্পর্কে রায় প্রদান করতেন।
প্রাক-ইসলাম যুগের আরবে গোত্রের সরদার ও কাহীন (দৈবজ্ঞ বা ভবিষৎ বক্তা) আন্তঃগোত্রীয় বিরোধের ব্যাপারে সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের তা'মীম গোত্রের সরদারগণ প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রসমূহের বিরোধ মীমাংসায় সালিশ হিসেবে তাঁদের সাফল্যজনক ভূমিকার জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। অনেক সময় সমাজের উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণও সালিশের কাজ করতেন। উকাযের বার্ষিক মেলায় কিংবা পবিত্র ও শান্তির মাসসমূহে (আশ হুরুল হারাম) সাধারণতঃ এই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি সালিশী করতেন। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এই সব পবিত্র মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। বিভিন্ন গোত্রের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারেও এই গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সালিশ হিসেবে কাজ করতেন। আরবের ইতিহাস হতে জানা যায় যে, আল-হারিস ইবনে আউফ ও খারিজার মধ্যস্থতায় আবস ও যু'বিয়ান গোত্রের যুদ্ধগত বিরোধের মীমাংসা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত (সঃ) আরবদের নানাবিধ বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে সালিশ (হাকাম) হিসেবে কাজ করেন। কা'বার ঐতিহাসিক কালো পাথর ওঠানোর ব্যাপারে আরব সরদারদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সালিশীর (তাহকিম) মাধ্যমেই তার মীমাংসা হয়। সে সময়কার আরব গোত্রসমূহের দীর্ঘদিনের বিরোধগুলোর ভেতর মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিরোধের বিষয়টি সমধিক উল্লেখযোগ্য। এই বিরোধে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সালিশ হিসেবে কাজ করেন এবং প্রচলিত আরব-রীতি ও সামাজিক ব্যবহার-বিধি অনুযায়ী এর নিষ্পত্তি করেন। এইভাবে তাঁর মধ্যস্থতায় এই গোত্র দুইটির ঐতিহাসিক শত্রুতার অবসান ঘটে।
ইসলাম ও সালিশী
ইসলাম-পন্থীদের মধ্যে শান্তি ও সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে ইসলামের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে দুইটি বিবদমান মুসলিম দলের মধ্যে আপোষ-রফা কিংবা বিরোধ মীমাংসার মাধ্যম হিসেবে ইসলাম আরবের সালিশী ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দান করেছে। ইসলামের নীতি লঙ্ঘন করা না হলে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যেও সালিশী অনুমোদিত ছিল। আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলীতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে হযরত (সঃ) ও ইহুদী গোত্র বানু কোরায়জার মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে সালিশীর নজিরের উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে উভয়পক্ষই তাঁদের বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়টি তাঁদের মনোনীত একজন লোকের নিকট মীমাংসার জন্য পেশ করতে সম্মত হন।
এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করে আল-শায়বানি বলেন যে, ইমাম সমগ্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কিংবা কোন খণ্ড যুদ্ধের অবসানের উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষের নিকট বিরোধমূলক বিষয়টি পেশ করতে পারেন। সকলের নিকট সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য একজন ধীরবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মুসলমানকেই সালিশ নিযুক্ত করতে হবে। তাঁকে যদি উভয়পক্ষই স্বেচ্ছায় নিযুক্ত করে থাকেন, তবে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে তাঁরা বাধ্য থাকবেন। অবশ্য, যদি পূর্বাহ্নে তাঁদের মতামত না নিয়েই তিনি নিযুক্ত হয়ে থাকেন কিংবা তিনি এমন বিবাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, যার সঙ্গে তাঁর মাতা-পিতা, স্ত্রী অথবা তাঁর সন্তান-সন্ততি সংশ্লিষ্ট থাকেন, তবে সে ব্যাপারে তাঁর রায় গ্রাহ্য হবে না।
হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সালিশী
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৬-৬৬১) ও সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে গৃহযুদ্ধের অবসানের জন্যে যে সালিশী হয়, সম্ভবতঃ ইসলামের ইতিহাসে সালিশীর ক্ষেত্রে তা-ই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজনৈতিক বিষয়টি এখানে আইনগত দিকের চাইতে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেভাবে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়, তাতে তদানীন্তন যুগের সালিশীর প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণায় পৌঁছা যায়।
আমর-বিন-আল-আস যুদ্ধে মুয়াবিয়ার আসন্ন পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয় বুঝতে পেরে মুয়াবিয়াকে সালিশীর আবেদন জানা ও পরামর্শ দান করেন। আমরের পরামর্শ অনুযায়ী মুয়াবিয়া সালিশীর জন্য অনুরোধ করেন এবং তাঁর সৈন্যদের বর্শার অগ্রভাগে আল-কোরআন তুলে ধরতে নির্দেশ দেন। এর তাৎপর্য এই যে, মুয়াবিয়া তাঁর ও হযরত আলীর মধ্যে কোরআনকে মধ্যস্থ হিসেবে উপস্থাপিত করে যুদ্ধ অবসানের আবেদন করেন। হযরত আলী মুয়াবিয়ার এ চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ধরতে পারলেও আল- কোরআনের মাধ্যমে পেশকৃত এ আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তা'ছাড়া, তাঁর অনুগামী ও সমর্থকগণ কোরআনের প্রতি তাদের স্বাভাবিক ভক্তি-শ্রদ্ধাবশতঃ এ আবেদনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। কারণ, কোরআনকে মান্য করাটা मुसलमानों মধ্যে একটা সাধারণ কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত। যাহোক, উভয়পক্ষই স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের পক্ষ হতে একজন সালিশ (হাকাম) নিয়োগে স্বীকৃত হন এবং কোরআন ও সুন্নার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই সালিশকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করেন। হযরত মুয়াবিয়া আমর-ইবনুল-আসকে এবং হযরত আলী আবু মূসা-আল- আশারীকে সালিশ নির্বাচিত করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হযরত আলী তাঁর সমর্থকদের চাপের ফলে আবু মূসাকে নিয়োগ করেন। উভয় সালিশকেই জীবন, ধন- সম্পদ এবং তাঁদের পরিবারবর্গের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। সালিশদের এক বছরের মধ্যে তাঁদের রায় দান করতে বলা হয়। হিজরী ৩৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৫৯) আধরুহ নামক স্থানে উভয় সালিশ বৈঠকে মিলিত হন এবং উভয়পক্ষ কর্তৃক যথারীতি স্বীকৃত একটি সন্ধিচুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করেন। হুদায়বিয়া চুক্তিকে এই সালিশী চুক্তিটির দলিল প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি গ্রহণের ফলে হযরত আলী খলিফার সরকারী পদবী হতে বঞ্চিত হলেন এবং তাঁর মর্যাদা সিরিয়াস্থ তাঁর শাসন-প্রতিনিধি (গভর্নর) মুয়াবিয়ার সমপর্যায়ে নেমে এলো। নীচে চুক্তিটির বিষয়বস্তুর বিবরণ দেয়া হল:
"পরম করুণাময় আল্লাহ'র নামে শুরু করছি।
"আলী-ইবনে-আবুতালিব ও মুয়াবিয়া-ইবনে-আবু সুফিয়ান এতদ্বারা তাঁদের মধ্যে (বিরোধ মীমাংসায় অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে) সালিশীর ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছেন।
আলী কুফাবাসীগণ ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আর মুয়াবিয়া শামীবাসীগণ (সিরিয়াবাসী) ও তাঁদের অনুগামী মুমিন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
“আমরা আল্লাহ এবং তাঁর কিতাবের (আল-কোরআনের) নির্দেশিত সালিশীর জন্য আবেদন করছি; কারণ, এছাড়া অন্য কোনো পন্থা বা ভিত্তি নেই...এবং উভয় আইনবিদ—আবু মুসা আল-আশআরী ও আমর ইবনুল-আস আল্লাহর কিতাবের (আল-কোরআন) নির্দেশিত পন্থার ভিত্তিতে কাজ করবেন...এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবে যদি কোন কিছু না পাওয়া যায়, তবে আইনানুযায়ী সুন্নাহ’র বিধানই তাঁদের কর্মপন্থার ভিত্তি হবে....”
বলা বাহুল্য, চুক্তিটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। সালিশীর উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে এতে কোন কিছুর উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র এতে কোরআন ও সুন্নাহকে সালিশীর ভিত্তিরূপে গণ্য করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটির সংক্ষিপ্ততা ও অস্পষ্টতা আমর-ইবনুল-আসকে মূল বিষয়টি হতে দূরে সরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দান করেছে; এবং এই সুযোগের মাধ্যমে অন্যতম সালিশ আবু মুসাকে নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে তিনি আলোচ্য বিষয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেন:
“আবু মুসা, আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, উসমানকে (তৃতীয় খলিফা) অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে?”
আবু মুসা সম্মতিসূচক জওয়াব দান করেন।
অতঃপর আমর আবার বলেন : “আপনি কি এটা স্বীকার করেন না যে, মুয়াবিয়া এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজন উসমানের উত্তরাধিকারী?”
আবু মুসা এতেও সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
আমর পুনরায় বলেন, আল্লাহ বলেছেন : “......অন্যায়ভাবে যে কাউকেই হত্যা করা হয়, তার উত্তরাধিকারীদের ওপরেই আমরা কর্তৃত্ব দান করেছি; হত্যার ব্যাপারে (প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে) সে (উত্তরাধিকারী) যেন সীমা অতিক্রম না করে; এবং (সীমা অতিক্রম না করলে) নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য দান করা হবে” (কোরআন ১৭ : ৩৩)।
এরপর আমর মন্তব্য করলেন : “সুতরাং, এমতাবস্থায় হযরত উসমানের পর মুয়াবিয়া কেন তাঁর উত্তরাধিকারী (অর্থাৎ খলিফা) হবেন না?”
কিন্তু আমর আবার বললেন : “আপনি যদি এই ভয় করেন যে, শাসন-ক্ষমতা পরিচালনার ব্যাপারে মুয়াবিয়ার যোগ্যতা ও অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণ প্রশ্ন তুলবে, তবে আপনি তাদের এই জওয়াব দিতে পারেন যে, মুয়াবিয়া হযরত উসমানের (রাঃ) স্ববংশসম্ভূত এবং উত্তরাধিকারী, আর হযরত উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আরও বলতে পারেন যে, মুয়াবিয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং রাষ্ট্র-পরিচালনায়ও বিশেষ সুদক্ষ। আর, তা'ছাড়া তিনি রাসূলের (সঃ) অন্যতম সাহাবী ছিলেন।"
আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "হে আমর! আল্লাহকে ভয় কর! হযরত আলী ইবনে আবু তালেব কো রেশদের মধ্যে একজন অতি সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি।"
খলিফা হওয়ার পক্ষে কে সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত, শেষ পর্যন্ত তা' নিয়েই সালিশদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। ফলে, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার উপায় বা পদ্ধতির ওপর বিশেষ কোন গুরুত্বই আরোপ করা হল না। আবু মূসা দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রাঃ) পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে খলিফা মনোনীত করার বিষয় চিন্তা করেন। পক্ষান্তরে, আমর খলিফার পদে মুয়াবিয়ার পক্ষ সমর্থনের সিদ্ধান্ত করেন।
পরিশেষে আবু মূসাকে লক্ষ্য করে আমর বললেন: "এ ব্যাপারে (খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে) আপনার মত কি?"
আবু মূসা জওয়াবে বললেন: "আমার মত হল, এ দু'জন লোককে (হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়াকে) পদচ্যুত করে مسلمانوں সাধারণ নির্বাচনের (শুরা বা সাধারণ গণভোট) ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উচিত। তারা তাদের নিজেদের জন্য (তাদের শাসক হিসেবে) তাদের পছন্দ অনুযায়ী যাঁকে খুশী নির্বাচন করবে।" আমর বললেন: "আমার মতও তাই।"
বাহ্যতঃ, অনুরূপভাবে সমঝোতায় পৌঁছে যাবার পর, দু'জন সালিশই সরকারীভাবে সাধারণ্যে তাঁদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে প্রস্তুত হলেন। বয়োঃজ্যেষ্ঠ হিসেবে আবু মূসাকে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার জন্য আমর নম্রভাবে অনুরোধ করলেন এবং বললেন যে, তাঁর (আবু মূসার) ঘোষণার পরই তিনি (আমর) তাঁর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবেন। আবু মূসা একথার পর প্রথম আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং অতঃপর বললেনঃ
"হে লোকগণ! আমরা এই জাতির সমস্যাটি পরীক্ষা করে দেখেছি এবং হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া উভয়কে অপসারণ করা ছাড়া আর কোন উত্তম সমাধান খুঁজে পাইনি যাতে করে সমগ্র বিষয়টি এই জাতি নিজের হাতে গ্রহণ করবে এবং তাদের যাকে ইচ্ছা, তার ওপর শাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করবে। আমি হযরত আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি এবং আপনারা যাঁকে যোগ্য মনে করেন, তাঁকে নির্বাচিত করতে পারেন।"
আবু মূসার উপরোক্ত ঘোষণার পর আমর আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন: "আপনারা এ লোকটিকে (আবু মূসার) বক্তব্য শুনেছেন। তিনি তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতের অনুরূপ আমিও তাঁর বন্ধুকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত করেছি। কিন্তু আমি আমার বন্ধু মুয়াবিয়াকে শাসন-পরিচালকের পদে সমর্থন করছি। কারণ, তিনিই হযরত উসমানের উত্তরাধিকারী এবং এই পদের জন্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্যতম ব্যক্তি"।
সালিশদের এই ঘোষিত সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁদের পরস্পরের সুস্পষ্ট মতবিরোধ থাকায় স্বাভাবিক কারণেই হযরত আলী এটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন। তিনি সালিশদের কার্যক্রমের নিন্দাবাদ ও তাঁদের প্রতি দোষারোপ করে বলেন:
"...তাঁরা কোরআনের নীতি থেকে দূরে সরে গেছেন..... এবং কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের ইচ্ছামত কাজ করেছে, তাঁদের সিদ্ধান্তের পেছনে কোন প্রামাণ্য ভিত্তি কিংবা কোন পূর্বতন নজির নেই; অধিকন্তু, এই সিদ্ধান্তে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক মতানৈক্য রয়েছে...."
আবু মূসার সাথে চাতুরীর জন্য আরব ঐতিহাসিকগণ কঠোর ভাষায় আমরের নিন্দা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ প্রশ্নটিতে তত চাতুর্যপূর্ণ বা প্রতারণামূলক বলে মনে হয় না। কারণ, এতে আসলে বিরোধ-বহির্ভূত একটি সমস্যার ফয়সালায় আবু মূসাকে প্রভাবান্বিত করার ব্যাপারে আমরের বিশেষ দক্ষতারই পরিচয় পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আবু মূসার ত্রুটি হল, নির্দিষ্ট বিরোধমূলক প্রশ্নটি (আলী ও মুয়াবিয়ার সংঘর্ষের অবসানের প্রশ্ন) এবং সালিশ হিসেবে তাঁদের ক্ষমতা-বহির্ভূত অপর প্রশ্নটির (অর্থাৎ খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নটি) মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যর্থতা। কারণ, মূল বিষয় ও চুক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের নির্দিষ্ট প্রশ্ন সম্পর্কে রায় দানের জন্যই আবু মূসা ও আমরকে সালিশ নিয়োগ করা হয়।
সালিশীর তাৎপর্য
অনেক ঐতিহাসিকই প্রাক-ইসলামী যুগ কিংবা ইসলামী যুগে বিরোধ-মীমাংসার পন্থা বা মধ্যম হিসেবে সালিশীর ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন; কিন্তু আসলে আরবে কেবলমাত্র গোষ্ঠীগত (এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর) কোন্দল মীমাংসার ব্যাপারেই সালিশী সীমাবদ্ধ ছিল; তাছাড়া, ইসলামের আবির্ভাবের পরে খুব কম ক্ষেত্রেই সালিশীর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আধরুহ সালিশীর ব্যাপারে যেমন ঘটেছে, তেমনি প্রায় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমস্যা থেকে আইনগত সমস্যাকে পৃথক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, খলিফা ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সালিশীর মোকদ্দমার চাইতে কূটনীতি কিংবা যুদ্ধের শরণাপন্ন হতেন। তবে খুঁটিনাটি ব্যাপারে, যেমন গোষ্ঠীগত সংঘর্ষের ক্ষেত্রে হত্যার ক্ষতিপূরণ বা রক্ত মূল্য পরিশোধের প্রশ্নে কিংবা ব্যক্তিগত অথবা আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের বিরোধ-মীমাংসার মত সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে সালিশীর অনেকটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সাধারণতঃ, জনমত এবং শাসকদের এখতিয়ারাধীন ক্ষমতা বলে সালিশীর বিধানসমূহ কার্যকরী করা হত।
📄 কূটনীতি
কূটনীতি সম্পর্কে মুসলমানদের ধারণা
জাতিতে জাতিতে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বহু প্রাচীনকাল থেকেই কূটনীতির রীতি চলে আসছে। কিন্তু ইসলামের রাষ্ট্রীয় আওতার বাইরের অন্যান্য জাতির সঙ্গে যে পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থাকে ইসলামের একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক বলে মনে করা হত, সে পর্যন্ত ইসলামে কূটনীতি কেবলমাত্র নিছক শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়নি।
ইসলামের গোড়ার দিকের ইতিহাসে দেখা যায় যে, কূটনীতিকে যুদ্ধের একটা অংশ বা বিকল্প হিসেবেই ধরে নেয়া হত। যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে ইসলামের বাণী প্রচার করার পূর্ব-ঘোষণা হিসেবে কূটনীতি প্রয়োগ করা হত। আবার কূটনীতির মাধ্যমেই যুদ্ধের পরে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের পন্থা নিরূপিত হত। আব্বাসীয় আমলের উপঢৌকন বিনিময় বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কীয় চুক্তি সম্পাদন প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ ব্যাপারে কূটনীতি ব্যবহৃত হত না। এমন কি রাষ্ট্রদূতদের তখনকার দিনে প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুপ্তচর বলে সন্দেহ করা হলেও কোন বিশেষ ঘটনা বা সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূত পাঠান হত।
মোটামুটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা ও কূটনীতি প্রায় একই জিনিস ছিল। জাতিতে জাতিতে সম্বন্ধ নির্ধারণের ব্যাপারে তখন কূটনীতির বড় একটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। বলতে গেলে কূটনীতি তখন অনেকটা ম্যাকিয়াভেলীয় বা সুবিধাবাদী নীতিভিত্তিক ছিল।
বিদেশী রাজা-বাদশাহদের দরবারে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করত এবং এতে কতকগুলো বিশেষ উদ্দেশ্যও হাসিল করা যেত।
রাষ্ট্রদূতগণ রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছিয়ে দিয়েই তাঁদের মিশনের সাফল্য ও অসাফল্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্যে শীঘ্রই তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ফিরে যেতেন। রাষ্ট্রদূতদের বিশেষ জাঁকজমক ও আদর-আপ্যায়নের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান হত। তবু তাঁদের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশী রাষ্ট্রের গুপ্তচর বলে মনে করা হত। তাই, তাঁদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হত। তাঁরা যাতে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কোন সংবাদ না পান এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন না করেন, সেদিকেও নজর রাখা হত।
রাষ্ট্রদূত
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞগণ মুসলিম প্রতিনিধিকে রাসূল (বহুবচনে-রুসূল) বা সাফীর (বহুবচনে সুফারা) বলে অভিহিত করেছেন। রাসূল কথাটি ইরসাল থেকে এসেছে। ইরসাল মানে হল, পাঠানো বা কোন বিশেষ কাজ দিয়ে কোথাও কোন প্রতিনিধি পাঠান। তাই, রাসূল বলতে নবী বা দূত দুই-ই-বোঝাতে পারে। সাফীর কথাটি সফর থেকে এসেছে। সফর বলতে রাষ্ট্রদূতের কাজের সঙ্গে সঙ্গে সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ মীমাংসার কাজও বোঝায়। কিন্তু গোড়ার দিকে এ দুটি শব্দের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নির্দেশ করা হয়নি। অবশ্য, পরবর্তী আইনবিদগণ সাফীর বলতে কূটনৈতিক প্রতিনিধি বুঝেছেন এবং রাসূল কথাটি (ধর্ম সম্বন্ধীয়) নবী অর্থে ব্যবহার করেছেন।
মুসলিম রাষ্ট্রদূতগণ খলিফা ও সুলতানের প্রতিনিধিত্ব করতেন। বিশ্বস্ততা এবং জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মধ্য হতে রাষ্ট্রদূতদের নিয়োগ করা হত। সাধারণতঃ কার্যদক্ষতা, সাহসিকতা ও উপস্থিত-বুদ্ধির সঙ্গে তাঁদের শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্য এবং মানসিক প্রফুল্লতা বিচার করে তাঁদের নিয়োগ করা হত। মধ্যপান তাঁদের জন্যে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক বিধায় নারীদের সংস্পর্শ থেকে তাঁদের দূরে থাকতে হত। খলিফা বা সুলতানগণ প্রায়ই রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করার জন্য উপযুক্ত লোক খুঁজে পেতেন না। তাই, তাঁরা সাধারণতঃ কূটনৈতিক কাজে দুই বা তিনজনের একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতেন; এর মধ্যে একজন যোদ্ধা ও একজন বিদ্বান ব্যক্তি থাকতেন। তৃতীয়জন সম্পাদক বা সেক্রেটারী নিযুক্ত হতেন।
রাষ্ট্রদূতদের সরকারী চিঠি বহন করতে হত এবং সেগুলো তাঁরা বিদেশী রাষ্ট্র-প্রধানকে সম্বোধন করে পড়ে দিতেন। এ সব চিঠিতে রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র থাকত, যাতে তিনি মৌখিক বাণী নিয়ে পৌছে দিতে পারেন। অনেক সময় এ পরিচয়পত্রে প্রেরিত রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে সাধারণ নীতি উল্লেখ থাকত। এতে একথাও লেখা থাকত যে, গোপনীয় তথ্য রাষ্ট্রদূত নিজে মুখে বলবেন।
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আমল থেকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিদেশে দূত পাঠান হত। মুসলিম ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বাইজান্টীয়াম, মিসর, পারস্য (ইরান) ও আবিসিনিয়ায় ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে দূত (প্রতিনিধি) প্রেরণ করেন। এসব দেশে দূতদের সঙ্গে প্রেরিত পত্রে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ইত্যাদি সম্পর্কে যে সাধারণ বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, দু’একটি বিষয়ে পার্থক্য ছাড়া এগুলো প্রায় একই ধাঁচে লেখা। বাইজান্টীয় সম্রাটের নিকট লিখিত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) পত্রটির ভাষ্য নিম্নরূপ:
"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি।
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নিকট থেকে রুমের (বাইজান্টীয়ার) সর্বোচ্চ শাসক হেরাক্লিয়াসের প্রতি।
"যাঁরা সত্যকে অনুসরণ করেন, তাঁদের প্রতি শান্তি (সালাম)। আপনাকে আল্লাহর নামে ইসলামে আহ্বান করা আমার কর্তব্য। আপনি যদি (ইসলাম গ্রহণ করেন) মুসলমান হন, তবে আপনি নিরাপদ এবং আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কৃত করবেন। আপনারা অর্থাৎ কিতাবীরা আমাদের মধ্যে আল্লাহর একই বাণী দেখতে পাবেন। আসুন, আমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদাত করি এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোন 'ইলাহ' বা উপাস্য গ্রহণ না করি। যদি ঈমান আনেন, তবে বলুন: "আমরা মুসলমান"; আর যদি এতে বিশ্বাস না কারণ, তবে আপনি আপনার লোকদের পাপের জন্যে দায়ী হবেন।"
প্রচলিত বিবরণ হতে জানা যায় যে, আবিসিনিয়ার বাদশাহ ও মিসরের মুকাউকাস হযরতের (সঃ) ইসলামে দাখিল হওয়ার দাওয়াত গ্রহণ করেন। কিন্তু বাইজান্টীয় সম্রাট জবাব দেন যে, তাঁর প্রজারা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। আর পারস্যের বাদশাহ হযরতের আহ্বান পত্রটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেন এবং পত্রবাহক দূতদের বিতাড়িত করেন। পারস্যের বাদশাহর আচরণের কথা অবহিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মন্তব্য করেন : "তার সাম্রাজ্যও এমনিভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়বে!" এই কূটনৈতিক আদান-প্রদানের প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক।
প্রাথমিক যুগের খলিফাদের (খোলাফায়ে রাশেদা ও উমাইয়া খেলাফত) আমলে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন এবং শুল্ক প্রদানের ব্যাপারেই কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। উমাইয়া খলিফাগণ বিশেষ করে প্রথম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিকের আমলে বাইজান্টীয়দের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হয় এবং বার্ষিক শুল্ক প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ সময়ে মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। আরব ঐতিহাসিকগণ এসব বিষয়ের কোন উল্লেখ করেননি। আর এসব কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও চুক্তিগুলোর কোন দলিলও সুরক্ষিত হয়নি।
উমাইয়াদের চাইতে আব্বাসীয় খলিফাগণই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের কূটনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করেন। বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রায় বছরই সমর-অভিযান চালান হত। ফলে বন্দী বিনিময় কিংবা ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্যে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চালাতে হত। তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাম্রাজ্যিক কারণে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে তৎকালীন সমসাময়িক প্রায় সকল শাসকের কাছেই রাষ্ট্রদূত পাঠানোর রীতি ছিল। ফাতেমীয় ও মামলুক শাসকগণ ব্যাপকভাবে এই রীতি অনুসরণ করেন। তাঁরা ইউরোপ এবং মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন।
রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনা
বিদেশী রাষ্ট্রদূতগণ নিজেদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে আমান ব্যতিরেকে দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারতেন এবং সরাসরি রাজধানীতে উপস্থিত হতে পারতেন। সাধারণতঃ, তাঁদের সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক থাকতেন।
কার্য উপলক্ষে অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রদূতগণ আমান ব্যতিরেকে দারুল ইসলামে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করতেন। একে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বলা যেতে পারে। যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এবং নিষিদ্ধ কার্যাদি থেকে বিরত থাকলে তাঁরা সাধারণতঃ এই সুবিধা ভোগ করতেন। নিষিদ্ধ কাজগুলো হচ্ছে গুপ্তচর বৃত্তি অথবা দারুল হারবে পাঠানোর জন্যে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করা। শাসকদের মধ্যে হিংসাত্মক মনোভাব থাকলে এ সুবিধা সবসময় দেয়া হত না। তবু মুসলিম ও অমুসলিম শাসকগণ কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থাকে পারস্পরিক মঙ্গলের দিক থেকে কল্যাণকর বলে মনে করতেন।
আব্বাসীয় আমলের শেষের দিকে বিভিন্ন দেশের মর্যাদাবান মুসলমানদের নিকট হতে পাঠানো সরকারী পরিদর্শকদের অভ্যর্থনার জন্য যে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করা হত, তার চাইতে অনেক বেশী জাঁকজমক করা হত বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের অভ্যর্থনায়। মুসলিম শক্তির অবনতির যুগে এ ধরনের জাঁকজমক প্রদর্শন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রদূতগণ সাধারণতঃ খলিফা ও সুলতানদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ইসলাম জগতের বিভিন্ন রাজধানীতে তাঁদের সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা করা হত। শোভাযাত্রা সহকারে তাঁদের রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হত; রাস্তা বরাবর মিছিল চলত ও দুই পাশে সৈন্যগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। আগমনের পথে থাকত সুসজ্জিত তোরণ। তাঁদের অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে সজ্জিত বাড়ী নির্দিষ্ট করে রাখা হত, যেখানে জমকালোভাবে তাঁদের ভোজ ও আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হত। বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতগণের বাগদাদ পরিদর্শন সম্পর্কে মুসলিম ঐতিহাসিকগণ বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।
আল-মুক্কতাদিরের আমলে হিজরী ৩০৫ সনে (খৃস্টাব্দ ৯১৮) বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতের বাগদাদ পরিদর্শন সম্পর্কে মুসলিম ইতিহাসে খুঁটিনাটি বর্ণনা পাওয়া যায়। খলিফা ও তাঁর সুদক্ষ উজির ইবনে আল-ফুরাতের ইচ্ছাক্রমে বাইজান্টীয় রাষ্ট্রদূতকে সাম্রাজ্যের বিস্ময়কর বস্তু, স্থান ও অট্টালিকা এবং অতুলনীয় ঐশ্বর্যের উপকরণসমূহ দেখান হয়। খলিফা আততায়ী ও সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসক বুয়াহিদের শাহজাদা অদুদ্-উদ-দওলা কর্তৃক আয়োজিত ফাতেমীয় রাষ্ট্রদূতের অভ্যর্থনা এর আর একটি দৃষ্টান্ত। ফাতেমীয় রাষ্ট্রদূত খলিফার শান-শওকত ও ইযযত-সম্ভ্রম দেখে অবাক হন। কর্ডোভার খলিফা ও মিসরের মামলুক সুলতানগণও বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতেন।
রাজধানীতে অবস্থানকালে রাষ্ট্রদূতদের যে কেবল আদর-আপ্যায়ন করা হত তাই নয়, তাঁদের প্রসিদ্ধ ও মনোরম স্থানগুলো দেখান হত এবং নানারকমের উপহার ও সম্মানী পোশাক দেয়া হত। অতিথিসেবক রাষ্ট্রের আতিথেয়তা এবং এর মার্জিত কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও আদাব-কায়দার গৌরব-মহিমার নিদর্শন হিসেবেই এসব উপহার দেয়া হত। উপহার আদান-প্রদান কূটনীতি সম্পর্কীয় অনুষ্ঠানেরই অংশ বিশেষ ছিল।
কাজ শেষ হয়ে গেলে রাষ্ট্রদূতগণ বিদায়ের অনুমতি চাইতেন। এ সময়ও অভ্যর্থনা-অনুষ্ঠানের অনুরূপ অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হত।
কূটনৈতিক মিশনের কার্যাবলী
স্থায়ীভাবে কূটনৈতিক মিশন বিনিময় করার প্রথা সেকালে প্রচলিত ছিল না। তাই, সাধারণত: কতগুলো বিশেষ কাজের জন্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের বিদেশে পাঠান হত। মুসলিম শাসকদের প্রয়োজন ও অবস্থার ওপরই এ কূটনৈতিক কার্যাবলীর প্রকৃতি নির্ভর করত। ইসলামের উন্মেষ-কালের গোড়ার দিকে প্রধানতঃ শত্রুপক্ষকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানোর মধ্যেই কূটনৈতিক মিশনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলাম গ্রহণ না করলে এ আহ্বানের মাধ্যমেই শত্রুদের সঙ্গে বিরোধের সূচনা হত বা যুদ্ধ ঘোষণা করা হত। দ্বিতীয়তঃ শত্রুপক্ষ ইসলাম গ্রহণে রাজি হলে বা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন আপোষে আসতে চাইলে রাষ্ট্রদূতগণ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করতেন।
আব্বাসীয় আমলে যখন ইসলামী রাষ্ট্র সুসংহত হয়ে আসে, তখন রাষ্ট্রদূতদের ওপর অন্যান্য আরও অনেক গুরুদায়িত্বপূর্ণ কার্যভার ন্যস্ত হয়। খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্যই যে কেবল রাষ্ট্রদূত বিনিময় করা হত তাই নয়, উপহার, যুদ্ধবন্দী বিনিময় এবং বিরোধ মীমাংসার জন্য কিংবা বাণিজ্যের সুবন্দোবস্ত করার জন্যও রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের ব্যবস্থা ছিল। অভ্যর্থনাকারী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করাও কূটনীতিকদের কাজ ছিল। কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল, গুপ্তচরবৃত্তি। যে রাষ্ট্র তাঁদের প্রেরণ করত আর যে রাষ্ট্র তাঁদের গ্রহণ করত, তারা সকলেই দূতদের প্রদত্ত বিশেষ সুবিধার সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করত; আর একইভাবে সতর্ক থাকত, যাতে অপরপক্ষ বিশেষ কোন সুবিধা করতে না পারে।
মুসলিম শাসকও কার্যতঃ স্বাধীন প্রাদেশিক শাসকদের মধ্যেও রাষ্ট্রদূত বিনিময় করা হত। সরকারী চিঠিপত্র ছাড়াও মোবারকবাদ, সমবেদনা জ্ঞাপন কিংবা শাসক বংশগুলোর মধ্যে বিবাহ-বন্ধন দৃঢ় করার জন্যও রাষ্ট্রদূত পাঠান হত। বিরোধ এড়ানোর জন্য, যাতায়াতের পথ সুগম করা এবং পণ্যদ্রব্য আদান-প্রদানের ব্যাপারে মুসলিম ও অমুসলিম শাসকদের মধ্যে পরস্পর শুভেচ্ছা বাণীও পাঠান হত।
আব্বাসীয় আমলে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিরোধ লেগেই থাকত এবং প্রতি বছরই নতুন করে গোলমাল বেধে উঠত বলে যুদ্ধবন্দী বিনিময় বা বন্দীমুক্তির ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য রাষ্ট্রদূত পাঠান হত। তাছাড়া, একটি রাষ্ট্রকে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেবার জন্যেও রাষ্ট্রদূতদের পাঠান হত।
মুসলিম কূটনীতি ও বিশ্ব রাজনীতি
আব্বাসীয়দের সময়ে মুসলিম রাষ্ট্র সব চাইতে বেশী সুসংহত হয়। এই সময়ে দুনিয়ায় চারটি বড় বড় শক্তি ছিল। প্রাচ্যে ছিল আব্বাসীয় ও বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য। এরা রোম ও পারস্যের বিরোধিতারই যেন জের টেনে চলেছিলেন। একে অপরের রাষ্ট্রে এঁরা হামলা করতেন ও ঘন ঘন শান্তিচুক্তি অমান্য করতেন। আর ইউরোপে ছিল ফ্র্যাঙ্কীয় সাম্রাজ্য ও স্পেনের উমাইয়া সাম্রাজ্য। এই দুই দলেও বিরোধ লেগেই ছিল। এই বিরোধিতার শুরু হয় তুরস্কের যুদ্ধে চার্লস মার্টেলের হাতে আবদুর রহমানের পরাজয়ের মাধ্যমে (৭৩২ খৃস্টাব্দ)।
প্রাচ্যের দুই শক্তি ও পশ্চিমী দুই শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু বছর ধরে চলে। ফলে, তৃতীয় পিপীন (খাটো পিপীন নামে পরিচিত) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে চান। তিনি এ উদ্দেশ্যে কন্সট্যানটিনোপলে এক কূটনৈতিক মিশন পাঠান (৭৫৭ খৃস্টাব্দ)। বাইজান্টীয় সম্রাট এতে সাড়া দেন এবং পিপীনের নিকট তাঁর পক্ষ হতে একটি কূটনৈতিক মিশন পাঠান। কিন্তু পোপের নীতি ছিল, ফ্রাঙ্ক ও বাইজান্টীয়দের মধ্যে যাতে কোন রকম চুক্তি না হয়। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই আব্বাসীয়গণ স্পেনকে বশে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল হয়নি। এভাবেই দুটো মুসলমান রাষ্ট্র ও দুটো খৃস্টান রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে লাগল। এ জটিল অবস্থার ফলেই শেষ পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্কীয় শাসকগণ ও আব্বাসীয় খলিফাগণ পরস্পর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য হন। আর এর ফলেই কর্ডোভা ও কন্সট্যানটিনোপলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ল্যাটিন ইতিহাস ও সাহিত্য ছাড়া আর কোথাও ফ্র্যাঙ্কীয় ও আব্বাসীয় শাসকদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের কোন বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, মুসলিম ইতিহাসে এর কোন উল্লেখ নেই। এ নীরবতার ফলে 'এ্যাচেন' ও 'বাগদাদের'র মধ্যে যেভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে পশ্চিমী ইতিহাসে বর্ণনা করা হয়েছে, মুসলিম ঐতিহাসিকদের নীরবতার দরুন অনেকে এ সব সম্পর্ক আদৌ স্থাপিত হয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
পশ্চিমী ইতিহাসের সূত্র থেকে জানা যায় যে, ফ্র্যাঙ্ক ও আব্বাসীয়দের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রথমে পিপীনই এগিয়ে আসেন (খৃস্টাব্দ ৭৬৫)। তিনিই প্রথম কূটনৈতিক মিশন পাঠান দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের দরবারে। আল-মনসুর তখন বাইজান্টীয় সম্রাটের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তিনবছর পর একটি আব্বাসীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল এবং খলিফার প্রদত্ত উপহার সঙ্গে নিয়ে পিপীনের প্রেরিত মিশনটি ফিরে আসে। মুসলিম কূটনীতিকদের পিপীন সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন এবং পরিশেষে তাঁদের মার্সাই হতে ফিরে যাবার বন্দোবস্ত করে দেন।
পিপীনের পুত্র শার্লম্যানও প্রাচ্যে কয়েকটি মিশন পাঠান। খলিফা হারুনুর রশীদের দরবারে তিনি দুটি (৭৯৭ খৃস্টাব্দ ও ৮০২ খৃস্টাব্দ) ও জেরুযালেমের মহামান্য প্রধান যাজকের নিকট একটি মিশন পাঠান (৭৯৯ খৃস্টাব্দ)। ৭৯৭ খৃস্টাব্দে তিনি দু'জন ফ্র্যাঙ্কিশ প্রতিনিধি ও একজন ইহুদী দোভাষীকে পাঠান। উপরোক্ত দুইজন ফ্রাঙ্ক প্রাচ্য দেশেই মারা যান এবং চার বছর পর দোভাষীটি একটি হাতী নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ৮০২ খৃস্টাব্দে শার্লম্যান বাগদাদে দ্বিতীয় মিশন পাঠান। তাঁর মিশনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় এবং শার্লম্যান 'পবিত্র ও মহান রাজশক্তি' রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। বাকলার বলেন যে, এ কূটনৈতিক আদান-প্রদানের ফলে শার্লম্যান জেরুযালেমের ওপর অনেকখানি কর্তৃত্ব লাভ করেন। বাকলার আব্বাসীয়দের অধীনে জেরুযালেমের ওয়ালী হিসেবে শার্লম্যানের পদমর্যাদার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, আল-মাওয়ার্দীর পুস্তকে বর্ণিত নিয়ম অনুসারে এ ধরনের পদ অমুসলিমের ওপর বর্তাতে পারে।
৭৯৯ খৃস্টাব্দে জেরুযালেমের প্রধান যাজক শার্লম্যানের নিকট একটি মিশন প্রেরণ করেন। শার্লম্যান এর পরিবর্তে প্রাসাদ-সামগ্রী ও উপঢৌকন সহ প্রধান যাজকের নিকট একটি ফিরতি মিশন পাঠান। ৮০০ খৃস্টাব্দে প্রধান যাজকের কাছ থেকে আর একটি মিশন আশীর্বাদস্বরূপ পবিত্র সমাধি ও হযরত ঈসার ক্রুস-স্থানের চাবি ও একটি প্রতীক নিশান নিয়ে শার্লম্যানের দরবারে উপস্থিত হয়।
ল্যাটিন ঐতিহাসিকদের প্রচলিত বর্ণনা মেনে নেয়া হলে একথা বলা চলে যে, দু'জন শক্তিমান শাসকের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনই এ সব কূটনৈতিক মিশনের উদ্দেশ্য ছিল। নিজেদের মর্যাদা বাড়াবার জন্যই তদানীন্তন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক শার্লম্যান ও হারুন উভয়েই প্রগাঢ় বন্ধুত্ব-সূত্রে আবদ্ধ হন। কন্সট্যান্টিনোপল ও কর্ডোভার বিরুদ্ধে মিলিত হওয়াও তাঁদের অপর উদ্দেশ্য ছিল। পরবর্তী দুই শতাব্দীর ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, শার্লম্যানের পক্ষে ফিলিস্তিনের দখল পাওয়া ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মুসলিম রাজশক্তির পতনের যুগে ক্রুসেড যোদ্ধাগণ ফিলিস্তিন দখল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলমানদের কাছে তাদের ঘোর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।
জেরুযালেমের প্রধান যাজক ও শার্লম্যানের মধ্যে যে দৌত্যের আদান-প্রদান চলে তার উদ্দেশ্য থেকে বোঝা যায় যে, এটা ছিল একটা নিছক ধর্মীয় ব্যাপার—রাজনৈতিক বিষয় নয়। কারণ, খলিফাকে না জানিয়ে বা তাঁর অনুমতি না নিয়ে ফিলিস্তিনের খৃস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান পাদ্রীর পক্ষে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা চালান সম্ভব ছিল না। বোধহয়, তিনি শার্লম্যান ও হারুনুর রশীদের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সুযোগ গ্রহণ করেন। পশ্চিমী খৃস্টান শাসকদের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন যাতে করে প্রাচ্য দেশে নৈতিক ও বাস্তব ক্ষেত্রে চার্চের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। প্রধান পাদ্রীর রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দান করার কোন ক্ষমতা ছিল না। তাই তিনি শার্লম্যানের কাছে উপহার হিসেবে চাবি ও প্রতীক নিশান পাঠিয়েছিলেন।
কূটনীতির গুরুত্ব
যুদ্ধকালে আমান প্রাপ্তির ফলে যেমন সাধারণ লোকের পক্ষে এক দেশ থেকে অপর দেশে যাতায়াত করা সম্ভব হত, তেমনি মুসলিম ও অমুসলিম শাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরকারী পর্যায়ে সংযোগ স্থাপন করা চলত কূটনীতির মাধ্যমে। জেহাদ বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ ঘোষণা করার পূর্বে কতকগুলো নীতি মেনে চলতে হত। যুদ্ধ আরম্ভের পূর্বে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত এর দৃষ্টান্ত। কূটনীতির মাধ্যমেই ইসলামে আহ্বান জানানো সম্ভব হত। তাছাড়া, মুসলমান শাসকদের অমুসলমানদের সঙ্গে দশ বছর পর্যন্ত শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা অনুমোদিত ছিল। মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রদূতদের আলাপ-আলোচনার মাধমেই এটা সম্ভব হত। কাজেই কূটনীতি ইসলামের যুদ্ধনীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করত। কূটনীতি ছিল জেহাদের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জেহাদের শক্তি যখন মন্দীভূত হয়ে আসল এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য জাতির শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল, তখন শান্তিপূর্ণ ব্যাপারে কূটনীতির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে, উপহার বিনিময়ে ও অন্যান্য সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কূটনীতি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করল।
সেকালে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সংযোগের ব্যবস্থা খুব বেশী উন্নত না হওয়ায় রাষ্ট্রদূত প্রেরণের ফলে যে কেবল সংবাদ বিনিময়ে সাহায্য হত তাই নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপনেও কূটনীতি যথেষ্ট সাহায্য করত। কূটনৈতিক কার্যাবলী ছাড়াও রাষ্ট্রদূতগণ তাঁদের সঙ্গে দূর দেশ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র, বই ও দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যাদি নিয়ে আসতেন। ফলে তাঁদের দেশের লোক অন্যান্য জাতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করত। অন্য কোন উপায়ে এসব খবরাখবর পাওয়া তখন সম্ভব ছিল না। সে যুগে ইবনে জুবাইর (১১৪৫-১২১৭ খৃস্টাব্দ) ও ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৭ খৃস্টাব্দ) প্রমুখ পরিব্রাজকগণ তদানীন্তন পৃথিবীর অনেক জায়গায় বহুদিন ধরে পরিভ্রমণ করার পর নানা তথ্যাদি সংগ্রহ করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তেমনি রাষ্ট্রদূতগণও বিচিত্র ও বিস্ময়কর দেশসমূহ পরিভ্রমণ করে (শার্লম্যানের দূতগণ এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত) স্বস্ব সম্রাট বা বাদশাহ এবং দরবারের সভাসদদের নিকট তাঁদের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতেন। কাজেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে অন্যান্য উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নও সম্ভব হয়েছিল।