📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশী: হারবী মুস্তামিনগণ

📄 মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশী: হারবী মুস্তামিনগণ


বিদেশী নাগরিক ও মুসলিম আইন

মুসলিম আইনে কেবল মুসলমানেরাই পূর্ণ আইনগত অধিকার ভোগ করলেও অমুসলিমগণও মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অনুমতি পেলে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে কতকগুলো আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারেন। মুসলিম আইনে মুসলমানই পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার ভোগ করেন; মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করেই আর সবাই বিভিন্ন প্রকার অধিকার লাভ করেন। আইনের চোখে যারা পূর্ণাঙ্গ অধিকার ভোগ করে না, তারা হচ্ছে হারবী, মুস্তামিন ও জিম্মী। জিম্মীদের সম্পর্কে পরবর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হবে। তাই এখানে আর সে আলোচনার প্রয়োজন নেই।

হারবী

মূলতঃ যে দেশের লোকই হোক না কেন, দারুল হারবে অবস্থানকারীদেরই হারবী বলা হয়। এদের মধ্যে কিতাবী ও মুশরিক উভয়ই থাকতে পারেন; যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে দারুল হারবের সঙ্গে দারুল ইসলামের যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান থাকে, সুতরাং এ- দিক থেকে বিদেশী হারবীদের সঙ্গেও মুসলমানদের যুদ্ধগত সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে। মুশরিক হারবী মুসলমানদের মোকাবেলা করলেই আল-কোরআনের এ নির্দেশের (৯: ৫) আওতায় এসে পড়বে: "মুশরিকদের যেখানে পাও, মেরে ফেল।" কেতাবী হারবীর জীবনরক্ষা করা যেতে পারে; কিন্তু তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কয়েদ করা চলবে এবং দাসেও পরিণত করা যেতে পারে। অবশ্য বিশেষ অনুমতি বা আমান (নিরাপত্তার সনদ) নিয়ে হারবী নির্বিবাদে দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারেন। এ সনদ বলে তিনি তার পরিবার ও ধন-সম্পদ নিয়ে কিছুদিনের জন্য দারুল ইসলামে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে পারেন।

আমান

আমানকে নিরাপত্তাচুক্তি বা সনদ বলা যেতে পারে। এর ফলে হারবী দারুল ইসলামে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার লাভ করে। দারুল ইসলামে বসবাস করার সময় মুসলমানদের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থার অবসান হয় এবং হারবী তখন "মুস্তামিন" বা নিরাপদ ব্যক্তির মর্যাদা লাভ করেন। আমানের মেয়াদ এক বছরের কম হতে হবে। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে তাকে জিযিয়া দিতে হবে এবং তিনি জিম্মা পর্যায়ভুক্ত বলে গণ্য হবেন।। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে।

অস্থায়ীভাবে যুদ্ধ-বিরতির (মুহা'দানা অথবা মুও'য়াদা) ফলে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসী মুসলিমগণ আমান প্রদান করতে পারেন। প্রথমটির নাম সরকারী আমান। আর দ্বিতীয়টিকে বেসরকারী আমান বলা যেতে পারে।

সরকারী আমান

ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কর্তৃক সাধারণতঃ একটি ভূখণ্ডের সমগ্র অধিবাসীকে বা একটি নগরের অধিবাসীকে বা জনকয়েক হারবীকে প্রদান করা হয়। শান্তিচুক্তিতে প্রায়ই এই ধরনের আমানের প্রত্যক্ষ উল্লেখ থাকে। এর শর্তানুসারে হারবীগণ নিরাপদভাবে চলাফেরা করতে পারেন। সেনাপতি আলাপ-আলোচনা চালাবার জন্য এক বা ততোধিক হারবীকে আমন প্রদান করতে পারেন। আমানের আওতায় থাকাকালে হারবীগণ মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ দাবী করতে পারেন। আমানের উদ্দেশ্য সাধিত হবার পর মুস্তামিনকে তার নিজের দেশে নিরাপদভাবে পৌছে দেয়া হয়।

হারবীর অনুরোধক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক যেকোন মুসলিম হারবীকে বেসরকারী পর্যায়ে আমান প্রদান করতে পারেন। এ আমান মুক্ত, দাস বা নর ও নারী সব মুসলিমই দিতে পারেন। বিশ্বাসী মুসলমানের আমান-প্রদানের ক্ষমতা সম্পর্কে অবশ্য আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। দাস এবং নারী ও পুরুষকে আমান প্রদান করার অধিকার মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আইনবেত্তাগণ অনুমোদন করেছেন। জেহাদী না হলে কিংবা প্রভু কর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত না হলে দাসকে আমান প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করতে হানাফী আইনবিদগণ অস্বীকার করেছেন। আউযায়ী খারিজীদের পর্যন্ত আমানের অধিকার প্রদান করেছেন। নীতিগতভাবে শিশু ও উন্মাদকে সাধারণতঃ আমান প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয় নি। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর মতে বয়স্ক হলেই কেবল শিশুগণ আমান প্রদানের অধিকার লাভ করবে। আউযায়ী দশ বছর বয়স্ক শিশুকে আমান প্রদানের অধিকার দান করেছেন। সব মতাদর্শের আইনবিদগণই নীতির দিক থেকে জিম্মীদের আমান প্রদানের ক্ষমতা অস্বীকার করেছেন।

আমান প্রদানের পদ্ধতি খুবই সহজ।' এ নিয়ে আইনবিদদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। যে ভাষাভাষীই হোক না কেন, হারবীর পক্ষ থেকে আমান লাভের মনোভাব জানবার সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতিসূচক একটি বাক্য বা ইশারাই আমান প্রদানের পক্ষে যথেষ্ট। আমান প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে সামান্য একটি ইঙ্গিত দান বা অভিবাদনই হারবীকে নিরাপত্তার অধিকার লাভের নিশ্চয়তা দান করে। যদি কোন বিশ্বাসী আমান না দেয়ার সিদ্ধান্ত করেন, কিন্তু তার ইঙ্গিতে হারবীগণ আমান লাভ করেছেন বলে মনে করে থাকেন, তবে তা বৈধ আমান বলে গণ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে আল-হারমুযানের ঘটনাটি মনে করা যেতে পারে। এখানে আমান প্রদানের কোন ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ছলে বা কৌশলে না হলেও অন্ততঃপক্ষে হারমুযান আমান পেয়ে গিয়েছে, এ কথাই অপ্রত্যক্ষভাবে ধরে নেয়া হয়েছিল। আমান না নিয়েই যদি কোন হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করে এবং পরে আমান লাভ করতে না পারে, তবে তার শান্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। ইমাম শাফেয়ী এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, তাকে চার মাসের সময় দেয়া উচিত। চার মাস পর তাকে হয় দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করে যেতে হবে (তাকে নিরাপদে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেয়া হবে), নতুবা জিযিয়া প্রদান করে জিম্মী পর্যায়ভুক্ত হতে হবে। অন্যান্য আইনবিদ বলেছেন যে, এই হারবীকে বহিষ্কৃত করা উচিত। অবশ্য দারুল হারবে পৌঁছা পর্যন্ত অবশ্যই তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোন হারবী কার্যোপলক্ষে ইমামের কাছে কোন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে, তবে তাকে আমান ব্যতিরেকে ইমামের কাছে যেতে দেয়া হত। কারণ, তখন সে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা (immunity) লাভের অধিকারী। কিন্তু ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, দূতের কোন পরিচয়-পত্র নেই কিংবা সে আদৌ কোন বাণী নিয়ে আসে নি, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান বৈধ হবে।

ভুলক্রমে বা জাহাজডুবীর ফলে হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারে এবং আমান ব্যতিরেকে মুসলমানদের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হতে পারে। অধিকাংশ আইনবিদ বলেন যে, এক্ষেত্রে ইমাম স্বেচ্ছায় হারবীকে মুক্ত করে দিতে পারেন বা অবস্থা বিবেচনা করে অবিলম্বে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। তিনি ক্ষতিপূরণ নিয়েও তাকে মুক্ত করতে পারেন।

মুস্তামিনদের অধিকার ও কর্তব্য

কোন হারবী যখন মুস্তামিন হিসেবে গণ্য হয়, তখন তার সঙ্গে তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসতে অনুমতি দেয়া হয়। হেজাযের পবিত্র নগরগুলো ছাড়া দারুল ইসলামের সব শহরেই সে পরিভ্রমণ করতে পারবে। জিম্মীর মর্যাদা লাভ করে জিযিয়া প্রদান করলে সে দারুল ইসলামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে। সে জিম্মী মহিলাকেও বিবাহ করতে পারে এবং তাকে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু হারবী যদি মহিলা হয় এবং কোন জিম্মীকে বিবাহ করে, তবে তার স্বামীকে সে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। কারণ, এতে শত্রুপক্ষ দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। নিরাপদভাবে চলাফেরা করার অধিকার ভোগকালে মুস্তামিন আইনের আওতায় ব্যবসায়-বাণিজ্যও পরিচালনা করতে পারবে।

আবার মুস্তামিনকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানাদিকে সম্মানের চক্ষে দেখতে হবে এবং সে এমন কিছু বলবে না বা করবে না যাতে ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পেতে পারে। তার কার্যক্রমে ইসলামের স্বার্থ যাতে বিপন্ন না হয়, সে সম্পর্কে তাকে সতর্ক থাকতে হবে। সে যদি মুস্তামিনের ছদ্মবেশে দারুল ইসলামে গুপ্তচর বৃত্তির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করে থাকে, তবে তাকে মৃতুদণ্ড দান বিধিসম্মত। সামরিক ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র কিংবা দাস-দাসী বা অন্য কোন রকমের হাতিয়ার কিনবার অধিকার তার নেই। এগুলো তার পক্ষে নিষিদ্ধ পণ্য (contraband) হিসেবে গণ্য হবে; কারণ, এর ফলে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য ক্রয় করা অবৈধ। এ ধরনের দ্রব্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মুস্তামিনকে তার টাকা দিয়ে দিতে হবে এবং মুস্তামিনও বিক্রেতাকে অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে দেবে। অস্ত্রশস্ত্রের বেচাকেনা যদি বন্ধ নাও হয়ে থাকে, তবু কোনমতেই হারবীকে এসব অস্ত্রশস্ত্র দারুল হারবে নিয়ে যেতে দেয়া চলতে পারে না। সুদভিত্তিক চুক্তিও নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে।

মুস্তামিন যদি আইন ভঙ্গ করে বা কোন অপরাধ করে, তবু তার আমান নষ্ট হবে না। কিন্তু তাকে সমুচিত শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী দু'রকমের নিয়ম লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি সে সম্মান ও আদব-কায়দা বিষয়ক আচার লঙ্ঘন করে, তবে তার ফলে তার আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে, একথা বলে তাকে সাবধান করে দিতে হবে। আবার সে যদি দেওয়ানী বা ফৌজদারী বিষয়ক কোন আইন ভংগ করে, তবে তাকে বিশ্বাসী বা জিম্মীদের মতই সমানভাবে শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ বলেছেন যে, মুস্তামিনকে শাস্তি দেয়া চলবে না; সে ব্যভিচার করলেও তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তির বিধান নেই; তবে সে যদি চুরি করে বা ডাকাতি করে, তবে সে অপহৃত জিনিস তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সে যদি কোন মুসলমানকে হত্যা করে বা তার হাত কেটে ফেলে, তবে তাকে হত্যা করা বা তার হাত কেটে ফেলা বৈধ। যদি দুই বা ততোধিক মুস্তামিন মুসলিম বিচারকের কাছে হাজির হয়ে বিচারপ্রার্থী হয় ও শরিয়তের বিধান দ্বারা পরিচালিত হতে চায়, তবে তাঁরা সে বিচার পরিচালনা করতে পারবেন। কিন্তু যদি কোন মুসলমান মুস্তামিনকে আক্রমণ করে, তবে মুসলমানটি ইমাম ও তাঁর প্রতিনিধিদের (শাসনকর্তা) কাছে শাস্তি ভোগ করবে। মুসলমানরাও শরিয়ত বিরুদ্ধ ব্যবসায়-বাণিজ্যে লিপ্ত হবার বা অবৈধভাবে জিনিসপত্র খরিদ করার অধিকার পাবে না।

আমানের মেয়াদের সমাপ্তি

আমানের মেয়াদ (এক বছরের বেশী নয়) ফুরিয়ে যাবার ফলে বা মুস্তামিন দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করলে আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। সে যদি আবার দারুল ইসলামে ফিরে আসতে চায়, তবে তাকে নতুন করে আমান সংগ্রহ করতে হবে। ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, মুস্তামিন গোপনে দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য সাধনে লিপ্ত আছে বা তার কার্যাবলী মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী, তবে আমান নাকচ করে দেয়া যেতে পারে ও ইমাম মুস্তামিনকে ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত করে দিতে হবে। কোন মুসলমান যদি আমান দিয়ে থাকেন ও আমান ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে গণ্য হয়, তবে ইমাম সে মুসলমানকেও শাস্তি দিতে পারেন।

মুস্তামিন যদি তার ধন-সম্পদ দারুল ইসলামে রেখে ফিরে যায় এবং দারুল হারবে হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে সে সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীগণ দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। ইসলামী রাষ্ট্র তা বাজেয়াপ্ত করে নেবে। কিন্তু মুস্তামিন যদি দারুল ইসলামে অবস্থানকালে মারা যায়, তবে তার প্রতি প্রদত্ত আমান এ সম্পত্তির ওপরও প্রযোজ্য হবে এবং তার উত্তরাধিকারীগণ ইচ্ছা করলে মৃত ব্যক্তির ধন-সম্পদ দারুল ইসলামের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে।

আমানের গুরুত্ব

মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ স্থাপন করার ব্যাপারে আমান প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বক্ষণ যুদ্ধ- ভিত্তিক ও অশান্তিপূর্ণ মনে করা হত। তাই আমানের অবর্তমানে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনও এক রকম অসম্ভব ছিল। মুসলিম অমুসলিম সম্পর্কের মধ্যে আমান এমন সহজ স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল, যার ফলে মুসলিম ও অমুসলিম একে অপরের রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ করার অনুমতি লাভ করে। মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করার সময় আমান বিদেশীদের পাসপোর্টের কাজ করে। সাধারণভাবে যখন মুসলমান ও অমুসলমানদের পক্ষে দারুল ইসলাম থেকে বাইরে যাওয়া বা দারুল ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না, তখন পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র ছাড়া কোন জিনিসপত্রের আদান-প্রদানও সম্ভব হত না। আমানের মারফত সীমান্তে লোক ও মালপত্র চলাচল অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে এসেছিল। আমান না থাকলে দুটি বিরোধী দেশের মধ্যে বেআইনী আদান-প্রদান সংঘটিত হত ও এদের মধ্যে খুব বেশী মনকষাকষিও শুরু হয়ে যেত। যুদ্ধ-বিরতি কালে বার বার আমান প্রদানের ফলে মুসলিম ব্যবসায়ী ও বিদেশী রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা খুব সহজ হয়ে পড়ে।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম

📄 অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম


অমুসলিম রাষ্ট্র: দারুল হারব

দারুল ইসলাম হল সেই রাষ্ট্র যেখানে মুসলিম শাসক কর্তৃক মুসলিম আইন বাস্তবে রূপায়িত হয়; কিংবা সেই রাষ্ট্র যা অমুসলিমদের অধিকারে গিয়ে পড়লেও অনেকটা স্বাধীনভাবে মুসলিম আইন পালন করতে সক্ষম হয়। আর যে রাষ্ট্রে অমুসলিম আইন রূপায়িত হয় এবং যেখানে মুসলমান তাঁর নিজস্ব বিধি-বিধান পালন করতে পারেন না, তা' অমুসলিম ভূখণ্ড বলে বিবেচিত হবে। কাজেই দারুল হারব হল এমন একটি ভূখণ্ড যা মুসলিম আইনের সম্পূর্ণ আওতাবহির্ভূত। আইনগত সাম্যের ভিত্তিতে দারুল ইসলামের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যোগ্যতা দারুল হারবের নেই। কাজেই এ দু'ভূখণ্ডের মধ্যে কোন ব্যবস্থা বা চুক্তি সম্পাদিত হলে তা' স্বল্পস্থায়ী হতে বাধ্য। কারণ, এর মধ্যে অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতিও দেয়া হয় না, কিংবা উভয় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক যুদ্ধাবস্থার ক্ষেত্রেও কোন পরিবর্তন হয় না।

মুসলিম আইনের বাইরে হলেও দারুল হারবকে পূর্ণ নৈরাজ্য (No man's land) বলে মনে করা চলে না; কারণ, এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে বলে দারুল হারব মুসলিম আইনের আওতায় দারুল ইসলামের সঙ্গে মুসলিম সামরিক আইন অনুযায়ী সম্পর্ক নির্ণয়ের অধিকার লাভ করে। যুদ্ধকালে মুসলমানেরা তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী অমুসলিম যোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন।

জেহাদের বিরতিকালে যখন অস্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিদেশী শাসক বা শাসকদের ইসলাম আংশিকভাবে স্বীকার করে নেয়। কিন্তু ইসলামের এ স্বীকৃতি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতির (Recognition) পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ, অমুসলিম শাসকদের কার্যকলাপ ইসলাম অনুমোদন করলে তবেই বলা যায় যে, ইসলাম আধুনিক পরিভাষার সংজ্ঞা অনুযায়ী তাদের 'অনুমোদন' দান করেছে। ইসলাম যে অমুসলিম শাসনকে আংশিক স্বীকৃতি দেয় তার অর্থ হল এই যে, কোন অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অস্তিত্ব না থাকলে মানবসমাজ টিকে থাকতে পারে না। এদিক থেকে নীতিগতভাবে এ বিধান মেনে চলা হয় যে, যদি ঘটনাক্রমে কোন মুসলমানকে অমুসলিম রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে হয়, তবে তিনি সেখানকার কর্তৃপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন কিংবা তার বিরোধিতা করতে পারবেন না। অবশ্য ইমাম কর্তৃক তিনি যদি অনুরূপ কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করার জন্য আদিষ্ট হন, তবে সেকথা স্বতন্ত্র। আমান মারফত যদি তিনি এ অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন, তবে নিজেদের আইন-বিধান মেনে চলার মত অমুসলিম আইন মানতেও তিনি বাধ্য থাকবেন। এ রাষ্ট্রের আইন ও মুসলিম আইনের মধ্যে যদি কোন বিরোধ দেখা দেয়, তবে তিনি কোনটি পালন করবেন, সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই (অর্থাৎ মুসলিম আইনই তিনি পালন করবেন)।

আমানের অধীনে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানদের কার্যাবলী

অমুসলিমগণ যেমন আমানের অধীনে তাদের অধিকার ও কার্যাবলীর ওপর কয়েকটি পরিসীমা স্বীকার করে নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করেন, তেমনি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত না হলেও মুসলমানগণও অনুরূপ পরিসীমার আওতায়ই অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন। মুসলমানরা যে পর্যন্ত আমানের অধিকার ভোগ করেন, সে পর্যন্ত তারা অমুসলিমদের কোন রকম ক্ষতিসাধন করতে পারবেন না। তা ছাড়া যদিও সুদ, মদ ও শূকরের গোশত বিক্রয় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইনে বৈধ বলে বিবেচিত হয়, তবু এগুলোর বিষয়ে অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে মুসলমানদের মুসলিম আইন মেনে চলতে হবে। কারণ, আগেই বলা হয়েছে যে, যে কোন মুসলমান যে দেশেই বাস করুন না কেন, মুসলিম আইন তার ওপর সব সময়েই প্রযোজ্য হবে এবং দারুল হারবে থাকাকালে কোন মুসলমান যদি কোন ওয়াদা দিয়ে থাকে, বা চুক্তি সম্পাদন করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে গেলেও তাকে তা পালন করতে হবে। আবার সেখানে থাকাকালে সে যদি টাকা কর্জ নিয়ে থাকে বা কোন জিনিস চুরি করে থাকে, তবে দারুল হারব ত্যাগ করে যাবার পরেও সে তা' ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু দারুল হারবে বসবাসকালে মুসলিমগণ এমন কিছু করতে পারবে না, যাতে সে রাষ্ট্র দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, দারুল হারবে বসবাসকারী মুসলমানগণ দারুল হারব কর্তৃপক্ষের নিকট দারুল ইসলাম সম্পর্কে কোন গোপন তথ্য সরবরাহ করতে পারবে না কিংবা দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, এ ধরনের অস্ত্রশস্ত্র এবং সমর সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজে সাহায্য করতে পারবে না। কেতাবী হলেও মুসলমানদের পক্ষে হারবী মহিলাকে বিবাহ না করাই শ্রেয়। কারণ, এর ফলে তার সন্তান-সন্ততিদের হয়তো দারুল হারবের জন্য কাজ করতে হতে পারে।

যদি প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোন মুসলমান শত্রু-রাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ে অন্য মুসলমানের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে বা এমন কোন অপরাধ করেছে যাতে উক্ত মুসলমানের ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

আমান ব্যতিরেকে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম

আমান না নিয়েই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করে থাকেন, তবে আমানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মত তিনি এ রাষ্ট্রের আইন-কানুন মানতে বাধ্য থাকবেন না। মুসলিম আইন মতে আমানবিহীন মুসলমানের সঙ্গে অমুসলিম রাষ্ট্রের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। এমতাবস্থায় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইন-বিধি মেনে নিতে তিনি বাধ্য থাকবেন না। যদি ইমামের অনুমতিক্রমে কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করেন, তবে যুদ্ধকালে জেহাদীরা যেমন শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন, এবং তাদের লোকদের বন্দী করতে পারেন, তিনিও সে ক্ষেত্রে তা করতে পারবেন। মুসলিম আইনে নিষিদ্ধ কার্যাবলী থেকে তাকে দূরে থাকতে হবে। কাজেই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে অবস্থানকালে ব্যভিচার করে, শূকরের গোশত খায় বা মদ পান করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুদ ও ঋণের বিষয় দুটি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে হানাফী আইনবিদগণ আইনের কঠোরতা কিছুটা শিথিল করেছেন। ইমাম আবু হানিফার মতে অমুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী আইন প্রযোজ্য হবে না।

মুসলিম যুদ্ধবন্দী

যে সব মুসলিম যোদ্ধা শত্রুর হস্তে বন্দী হয়ে দারুল হারবে নীত হন এবং দারুল হারব কর্তৃপক্ষ বাধ্যবাধকতা ভিত্তিক (যেমন পলায়ন না করা কিংবা পুনরায় দারুল হারবে ফিরে আসার ওয়াদা) প্রতিশ্রুতি নিয়ে (On parole) তাদের মুক্ত করেন, তবে তাদের সে প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পালন করতে হবে। যদি কোন মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে ক্ষতিপূরণের (Ransom) টাকা আনবার জন্য দেশে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হয়, তবে তিনি অবশ্যই তার প্রতিজ্ঞা পালন করবেন এবং টাকা সংগ্রহ না করতে পারলেও শত্রুর নিকট ফিরে যাবেন। কোন কোন আইনবিদ বিশেষ করে শাফেয়ীগণ বলেন যে, এ অবস্থায় ওয়াদাবদ্ধ হলেও মুসলমান বন্দীগণ ওয়াদা রক্ষা করার জন্য দারুল হারবে ফিরে যেতে বাধ্য থাকবে না। আর যদি বন্দীগণ কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে থাকেন, তবে তারা যে শুধু স্বচ্ছন্দে পলায়ন করতে পারেন তাই নয়, দারুল ইসলামে ফিরে যাবার পথে তারা শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বিধ্বস্ত করতে এবং শত্রুপক্ষের লোকদের হত্যা করতে পারেন।

দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম বন্দীগণ যে শুধুমাত্র মুসলিম আইন পালন করতেই বাধ্য থাকবেন তা নয়, দারুল হারবের আইন যদি মুসলিম আইনের বিরোধী না হয়, তবে সে আইনও তারা পালন করবেন। তবে প্রতিকূল পরিবেশে তারা যদি মুসলিম আইন পালন করতে না পারেন, তবে সে কথা স্বতন্ত্র। তারা যদি গানিমার অংশ লাভ করার প্রতিশ্রুতিও পান, তবু কোনক্রমেই তারা শত্রুপক্ষের সৈনিকদের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধে যোগদান করতে পারবেন না। ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতিকর কোন তথ্যাদিও তারা শত্রুদের নিকট সরবরাহ করতে পারবেন না। মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ এমন কাজ করতে যদি বন্দীকে বাধ্য করা হয় (যেমন ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করা), তবে এজন্য তাকে কোন শাস্তি ভোগ করতে হবে না। মহিলা বন্দীকে যদি শারীরিক নির্যাতন ভোগ করতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই প্রথমদিকে তা সহ্য করার চেষ্টা করতে হবে; কিন্তু পরে তিনি যদি মৃত্যুর আশংকা করেন, তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে শত্রুদের দাবীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারেন।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 জিম্মীদের মর্যাদা

📄 জিম্মীদের মর্যাদা


ইসলাম ও অমুসলিম নাগরিক

সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মর্যাদা বিভিন্ন আইন-ব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে নিরূপিত হয়েছে। যে সব জাতি গোড়ার দিকে মুসলিম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তাদের সাথে সম্পর্ক নিরূপণের ক্ষেত্রে ইসলাম এক চমকপ্রদ পরীক্ষাকার্য চালায়। কালক্রমে এসব চুক্তির স্বীকৃত ব্যবস্থাবলী মুসলিম আইনের পরবর্তী সংযোজিত অংশের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে সব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়, তারা ভিন্ন আর সব চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীকেই যে কোন মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণের কলেমা (মূল কালাম) 'শাহাদাত' পাঠ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে যোগদানের অবারিত সুযোগ দান করা হয়। যতদিন পর্যন্ত জিম্মীগণ তাদের নিজের ধর্মেই আস্থাবান থাকত, ততদিন তারা তাদের নিজেদের আইন-কানুন পালনের অধিকার ভোগ করত (অবশ্য এটা যদি বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থবিরোধী না হয়)। যদি তারা স্বেচ্ছায় মুসলিম আইন-ব্যবস্থার আওতায় আসতে চাইত, তবে কোন বাধাই ছিল না। জিম্মীদের কানুন ও বিচার বিভাগীয় পরিচালনার বিষয়টি এক পৃথক গবেষণার বস্তু। কাজেই তা বর্তমান আলোচনার এলাকার বাইরেই পড়ে।

জিম্মীর অর্থ ও তাৎপর্য

ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যে কেবল আহলে কিতাব ছিল তাই নয়, এর মধ্যে পৌত্তলিক (আবদাত আল-আসনাম) ও অগ্নিপূজকও ছিল। এদের অবশ্য আরবীয় উপদ্বীপের বাইরে বসতি স্থাপন করতে হত। কেতাবীদের মধ্যে খৃস্টান, ইহুদী, মাজিয়ান (জরথুস্ট্রীয়), সামারীয় ও সেবীয়গণ রয়েছে। সাধারণতঃ আরবদেশে মুশরিক বা বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাসীগণকে জিম্মীর মর্যাদা দেয়া হত না।

চুলচেরা বিচারে মাজিয়ানরা কেতাবী বলে গণ্য হতে পারে না। কারণ, হাদিসে জানা যায় যে, আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাস ছিল না এবং তাদের কোন কেতাবও ছিল না। যেহেতু তাদের একজন উপাস্য ছিল সেজন্য রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) ও প্রাথমিক যুগের খলিফাগণ তাদের কেতাবী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন এবং তাদের জিম্মীর মর্যাদা দান করেছেন।

দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে যেখানেই বাস করত না কেন, যাদের ধর্মীয় কেতাব ছিল তাদেরই 'আহলুল-কেতাব' বা কেতাবী বলে গণ্য করা হত। দারুল ইসলামে যে সব আহলুল কেতাব বাস করত ও যারা মুসলিম কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছিল, তাদের জিম্মী নামে অভিহিত করা হত। 'জিম্মা' কথাটির অর্থ হল এমন চুক্তি, বিশ্বাসী মুসলিম যার মর্যাদা দিতে স্বীকৃত হন। এ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তাকে নিন্দাই হতে হয় (জাম-নিন্দা)। আইনের বিচারে দেখা যায় যে, জিম্মা কথাটি বলতে একটি বিশেষ অবস্থা বুঝায়; এ অবস্থা লাভ করলে ব্যক্তি কতকগুলো অধিকার লাভ করেন, যেগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষিত হয়। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছাড়াও এ অধিকারের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমান প্রদান করা হয়। কিন্তু এর ফলে সে ব্যক্তি পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করে না। কারণ, কেতাবী যদিও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন কিন্তু রসূলের ওপর ঈমান আনেন না। তাই তাকে সত্যিকার বিশ্বাসী বলে গণ্য করা যেতে পারে না। সেজন্য তিনি মুসলিম-ভ্রাতৃত্বের পূর্ণ সদস্যরূপে গণ্য হতে পারেন না। কোন প্রকার হস্তক্ষেপ বা নিপীড়ন থেকে রেহাই পাবার জন্য জিম্মীকে জিযিয়া প্রদান করতে হয়।

প্রশ্ন উঠেছে যে, দুনিয়াতে সম্পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যখন ইসলামের উদ্দেশ্য, তার পরিপ্রেক্ষিতে জিযিয়া নিয়ে অবিশ্বাসী বা কুফুরীকে স্থায়ী করা যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে কি-না। সারাখসী বলেন যে, অর্থকরী দিকটা এখানে খুব বড় কথা নয়। অতি উদারভাবে অমুসলিমকে যে ইসলামে আহ্বান করা হত, এরমধ্যে তা-ই মূর্ত হয়ে উঠেছে। মুসলমানদের মধ্যে বসবাস করার অনুমতি লাভ করার ফলে জিম্মীগণ ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য দ্বারা আকৃষ্ট হন এবং তার ফলে ইসলাম গ্রহণ করতে তারা সম্মত হতেও পারেন।

হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে জিম্মীদের চুক্তি

প্রখ্যাত আইন ও ধর্মবেত্তাগণ কর্তৃক লিখিত আইন-পুস্তকে জিম্মী ও মুসলমানদের সম্পর্ক নির্ণয় করে অনেক আইন-কানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে। অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর প্রতি ব্যবহার সম্পর্কে প্রাথমিক মুসলিমদের বিধান ও কার্যাবলীর পর্যালোচনা পরবর্তী যুগের পরিবর্তন সম্পর্কে যথেষ্ট আলোকপাত করবে।

হযরতের (সঃ) সঙ্গে স্বেচ্ছায় চুক্তিবদ্ধ কেতাবীগণের সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় উদারতা ও সজ্ঞান সতর্কতা প্রত্যক্ষ করা যায়। 'মদিনা-চুক্তি'তে (৬২৩ খৃস্টাব্দ) একথাই সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আউস ও খাযরাজ গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের এ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। ইহুদীগণও চুক্তিতে শরীক হয়। এতে ইহুদীদের সঙ্গে মুসলমানদের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তার বিবরণ নিম্নরূপঃ

"বানু আউস গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সঙ্গে একই (রাজনৈতিক) জাতি বলে বিবেচিত হবে। ইহুদীরা তাদের নিজেদের ধর্মে বিশ্বাসী থাকবেন এবং মুসলমানদের নিজেদের (আলাদা) ধর্ম থাকবে।

"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমতি ছাড়া কোন ইহুদী মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে পারবে না।

"মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে শরীক হলে ইহুদীগণ যুদ্ধব্যয় বাবদ অর্থ প্রদান করবেন।"

এ চুক্তিতে ইহুদীদের ওপর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় নি। হযরতের (সঃ) বৃহত্তর কওমের মধ্যে পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায়রূপে তাদের অবস্থান করতে হবে, বিধি-নিষেধের মধ্যে শুধু এইটুকু। তাদের যুদ্ধে যোগদানে বাধ্য করা হত না। অবশ্য যুদ্ধে যোগদান করার জন্য তাদের আহ্বান করা হত। তারা যুদ্ধে যোগদান করলে সম্মিলিত যুদ্ধ-তহবিলে তাদের কিছু অর্থ প্রদান করতে হত। তাদের প্রতি কোন বিশেষ শুল্ক ও জিযিয়া তখনও ধার্য করা হয় নি। জিযিয়া আল-কোরআনের নিম্নলিখিত আয়াতে বিধিবদ্ধ হয়:

"কেতাবীদের মধ্যে যারা আল্লাহর ওপর ও শেষ দিনে ঈমান আনেনি এবং যারা আল্লাহর ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা নিষেধ করে নি এবং যারা সত্যকে স্বীকার করে না তাদের সঙ্গে সংগ্রাম কর ও তাদের অবনত করে জিযিয়া আদায় কর"। (৯:২৯)।

কেতাবীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে কয়েকটি সাবধানবাণী ছাড়া আল-কোরআন আর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করে নি। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকলে, আল-কোরআন ও হাদিসে যে কেবল কিতাবীদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে তা নয়, তাদের আক্রমণ ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার জন্যও উদাত্ত আহ্বান জানান হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাবালা, জারাশ, আধরুহ, মাকনা, খায়বার, নাজরান ও আয়লা—এই সব কেতাবীদের প্রতি যে সনদ প্রদান করেন তা আবু ইউসুফ ও বালাজুরী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এসব সনদে জিযিয়া প্রদানের বিনিময়ে তাদের জীবন, ধন-সম্পদ ও ধর্ম-বিশ্বাস রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। নাজরান গোত্রকে দেয়া নিম্নোক্ত সনদটি এ বিষয়ে দিকদর্শনের কাজ করছে:

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা হল সেই সনদ যা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) নাজরানের অধিবাসীদের দান করেন। নাজরানের অধিবাসী, তাদের ফলমূল, ধন-সম্পদ ও দাস-দাসীদের প্রতিও তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এগুলোর তারা ভোগ করবে। কিন্তু দু'হাজার পোশাক বা 'হুলাল আল-আওয়াকী' তারা দান করবে। এর মধ্যে এক হাজার রজব মাসে দিতে হবে, আর এক হাজার সফর মাসে দিতে হবে। প্রত্যেকবার শুল্ক প্রদানের সময়ে এক আউন্স করে রৌপ্য দিতে হবে। যদি ফসল এর চাইতে বেশী বা কম হয়, তবে ফসলের অনুপাতে শুল্ক ধার্য হবে। মুসলমানরা নাজরানের অধিবাসীদের কাছ থেকে ঢাল, ঘোড়া, নানাপ্রকার জীবজন্তু এবং অন্যান্য দ্রব্য পেতে পারবেন। ঊর্ধ্বপক্ষে ২০ দিন তারা আমার দূতদের আপ্যায়িত করবে ও তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করবে। কিন্তু তারা সে দ্রব্যাদি এক মাসের বেশী নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ইয়ামন ও মা-আররাতে যদি যুদ্ধ বাধে তবে তারা ত্রিশজন সৈন্যের পোশাক-পরিচ্ছদ আর ত্রিশটি ঘোড়া ও ত্রিশটি উট সরবরাহ করবে।

"ঋণ হিসেবে আমার দূতদের জন্য প্রদত্ত জিনিসপত্র যদি আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে তার জন্য নাজরানের অধিবাসীদের সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তাদের উপস্থিত অনুপস্থিত সবাই জীবন, ধন-সম্পদ, জমি-জমা, ধর্ম, পরিবার, চার্চ ও নিজস্ব দ্রব্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আল্লাহর আশ্রয় এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতিশ্রুতি লাভ করবে। কোন পাদ্রী বা সাধুকে তার চার্চ বা মঠ থেকে অপসারণ করা চলবে না এবং তাদের পৌরহিত্য পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা চলবে না। তাদের ওপর কোন প্রকার জোর-জুলুম বা নিপীড়ন করা চলবে না। আমাদের ফৌজ তাদের জমি অধিকার করবে না। যারা সুবিচার চায়, তারা তা লাভ করবে। উৎপীড়ক কিংবা উৎপীড়িত বলে কিছু থাকবে না। যারা সুদের ব্যবসায় করে, তারা আমার কাছে রেহাই পাবে না। অপরের অপরাধের জন্য কাউকে দোষী করা চলবে না। এ চুক্তি বহাল রাখার জন্য আল্লাহর প্রদত্ত রক্ষাকবচ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতিশ্রুতিই আইনগত ভিত্তি রচনা করবে। এ চুক্তি ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন নাজরানের অধিবাসীগণ বিশ্বস্ততার সাথে চলবে আর তাদের কর্তব্য পালন করবে এবং কোন প্রকার অত্যাচারে শরীক হবে না। এ চুক্তিটি নিম্নলিখিত সাক্ষীবৃন্দের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়: আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, গায়লান ইবনে আমর, বানু নাসর গোত্রের মালিক ইবনে আউফ, আল-আকরা ইবনে হাবিস আল-হানযালী ও আল- মুগীরা ইবনে শুবা। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর এ চুক্তিটি সম্পাদনার কাজ করেন।"

আয়লা বা আকাবার খৃস্টানদের প্রতিও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অনুরূপ একটি সনদ প্রদান করেন। এর দ্বারা তিনি সর্বশেষ কেতাবী সম্প্রদায়কে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক পর্যায়ে আনবার চেষ্ট করেন। এর ফলে আরব দেশের ওপর ইসলামের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়লার খৃস্টানদের প্রধান ইয়াহুন্নার (জন) কাছে লিখিত এক পত্রে তিনি ইসলামের সঙ্গে খৃস্টানদের শান্তি স্থাপন করতে আহ্বান করেন। চিঠিখানি এইঃ

"ইয়াহুন্না ইবনে রুবা ও আয়লার অধিবাসীদের প্রতি। আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ্'র সব প্রশংসা যিনি ভিন্ন আর কোন উপাস্য নেই। আপনাকে লিখিতভাবে না জানিয়ে আমি আপনার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব না। ইসলাম গ্রহণ করুন কিংবা জিযিয়া প্রদান করুন এবং আল্লাহ, তাঁর নবী ও নবীর প্রতিনিধিদের মান্য করুন। প্রতিনিধিদের সম্মান করুন ও তাঁদের উত্তম পোশাক প্রদান করুন। কিন্তু এ পোশাক যেন বিজাতীয় পোশাক না হয়। জায়েদকে পোশাকে সজ্জিত করুন যাতে আমি ও আমার প্রতিনিধিগণ সন্তুষ্ট হতে পারি। আপনি যদি জল ও স্থলপথে নিরাপত্তা লাভ করতে চান, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করুন। এতে আপনি আরব বা বিদেশী শত্রুদের প্রতিটি আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবেন। যদি আপনি আমার দাবীতে সম্মত না হন, তবে আমি আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করে আপনার লোকজন হত্যা করে এবং আপনাদের মহিলা ও শিশুদের বন্দী না করে আপনার কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করতে চাই না। আমি আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহকে, তাঁর কিতাবগুলোকে, তাঁর নবীদের এবং মরিয়মের পুত্র ও আল্লাহর-বাণী হযরত ইসাকে (আঃ) সত্য বলে জানি। আমি তাঁকে আল্লাহর নবী বলে বিশ্বাস করি।

"বিপদ নিপতিত হবার পূর্বে আমার আবেদন গ্রহণ করুন। আমার সেনাপতিদের আমি আপনার কাছে পাঠিয়েছি। হারমালাকে আপনি তিন ওয়াসক যব দেবেন। কারণ, হারমালা আপনার পক্ষ হয়ে আমার কাছে সুপারিশ করেছেন। আল্লাহর দয়া না হলে এবং তাঁর সুপারিশ না থাকলে আমার ফৌজের সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে আপনার কোন যোগাযোগ বা সংবাদ আদান-প্রদান সম্ভব হত না। আমার প্রতিনিধিদের আপনি যদি মান্য করেন, তবে আল্লাহ, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারিগণ আপনার প্রতিবেশীরূপে গণ্য হবেন। আমার প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন শুরাহবিল, উবাই, আবু হারমালা, হোরাইস ইবনে যায়েদ আত্-তাঈ।

"আপনার সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি হবে, তাই আমি মেনে নেব। আপনি স্বচ্ছন্দে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয় অবলম্বন করতে পারবেন। আপনি যদি এতে স্বীকৃত হন, তবে আপনার ওপর শান্তি।

"মাকনার লোকদের তাদের বাসভূমিতে পাঠিয়ে দিন।" ইয়াহুন্না হযরত মুহাম্মদের (সঃ) তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। অতিথি হিসেবে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করা হয় ও তাঁকে একটি লম্বা আলখেল্লা উপহার দেয়া হয়। আলাপ- আলোচনা চলতে থাকে। পরিশেষে নিম্নলিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় :

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি:

"এটি হল একটি নিরাপত্তা সনদ যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ইয়াহুন্না ইবনে রুবা ও আয়লার অধিবাসীদের প্রদান করেছেন। সিরিয়া, ইয়ামন বা সমুদ্র-উপকূল থেকে আগত তাদের জাহাজ, পরিব্রাজক এবং সঙ্গীদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।

"যারা গোলযোগের সৃষ্টি করে, তাদের ধন-সম্পদ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। তাদের যারা ধরে নিতে পারবে, তারা এদের অধীনস্থ হয়ে যাবে।

"আয়লার অধিবাসীদের পানির ঝরণায় যাওয়া নিষেধ করা অবৈধ হবে। তাদের ব্যবহৃত স্থলপথ ও জলপথ থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না।

"আল্লাহর রাসূলের অনুমতিক্রমে এ চুক্তি জুহাইন ইবনে আস-সালত ও শুরাহ-বিল ইবনে হাসান কর্তৃক লিখিত হয়।"

উপরে বর্ণিত দলিলগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে যে কেবল গোড়াতে মুসলিম ও কেতাবীদের পরস্পর সম্পর্কই ধরা পড়েছে তাই নয় এর মধ্যে সারল্য এবং মুসলিম-অমুসলিম সামাজিক বিভেদের অনুপস্থিতিও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একথা অবশ্য বলা যায় যে, সাবধানতাই শান্তিপূর্ণ উদার নীতির পত্তন করে। তবু একথা সত্য যে, কেতাবীদের প্রতি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শিক্ষা খুব উদার ছিল। প্রথমতঃ, তাঁর ধর্ম প্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর প্রতি ঈমান। আর তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করার অর্থ তাঁর কর্তৃত্বও স্বীকার করে নেয়া। কিন্তু এ রীতি গৌণভাবে প্রথম রীতির দ্বারা সীমিত হয়েছে। কেতাবীদের আল্লাহর রাসূলের (সঃ) ওপর ঈমান না থাকলেও আল্লাহর ওপর তাদের ঈমান ছিল। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সনদগুলো মেনে নেবার ফলে তারা "আল্লাহর রাসূল" একথাগুলো ব্যবহার না করলেও তাঁর খোদায়ী কর্তৃত্ব স্বীকার করেন না। ব্যবহারিক সমস্যা সম্পর্কে হযরত (সঃ) খুব বাস্ত ববাদী ছিলেন। সেইজন্য তিনি এই সমঝোতা এই আশায় মেনে নেন যে, উদারতার ফলে কেতাবী ভাইরা সহজেই সত্যধর্ম গ্রহণ করতে পারবে। এ নীতি অনুসরণ করেই জিযিয়া ভিন্ন আর কোন বিভেদমূলক পন্থা অনুসরণ করা হয় নি। মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাতের মতই জিম্মীদের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া হত। কর্তৃত্ব অস্বীকৃত হওয়ার ফলেই কখনও কখনও হযরতকে তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে বিন্দুমাত্র ধর্মীয় অনুদারতা ছিল না।

জিম্মাদের সম্পর্কে হযরত উমরের আইন

আইনবিদগণ আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরতের কার্যাবলী ছাড়াও খলিফা প্রথম উমরের (রাঃ) সনদের উল্লেখ করে থাকেন। এ সনদে মুসলিম রাষ্ট্র সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কেতাবীদের অবস্থার পূর্ণব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে সনদটিতে বর্ণিত বিষয়সমূহ উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। সনদটি পরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। কিন্তু শুরুতে এ কথা বলে রাখা ভাল যে, হযরত উমর (রাঃ) বোধহয় একই দলিলে সনদটিতে উল্লেখিত শর্তাদির বিবরণ প্রদান করেন নি। কিন্তু সাধারণতঃ তাই ধরে নেয়া হয়।

আবু ইউসুফ ও বালাযুরীর বর্ণনা অনুসারে ইরাক ও সিরিয়ার খৃস্টানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে সমঝোতার পৌছানোর ব্যাপারে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেন। খলিফা উমর (রাঃ) এ চুক্তিগুলো অনুমোদন করেন। বালাযুরী প্রদত্ত চুক্তির বিষয়গুলো আবু ইউসুফের সঙ্গে মিলে যায়। আর আবু ইসুফের প্রদত্ত দলিলই এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করছে। তাই এ দলিলগুলো এখানে বিশদভাবে বিবৃত করা হবে। আবু ইউসুফ বলেন যে, প্রধান সেনাপতি খালিদের সেনাবাহিনী ইরাকে শক্তি বলে অনেক শহর দখল করেন; কিন্তু হিরা অঞ্চলে তাঁকে কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। ফলে তাঁর সঙ্গে হিরার অধিবাসীদের এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। হিরার খৃস্টানদের সঙ্গে মুসলিম কর্তৃপক্ষের এটাই ছিল প্রথম চুক্তি। চুক্তিটির বিবরণ নীচে দেয়া হল:

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা খালিদ বিন ওয়ালিদ ও হিরার অধিবাসীদের মধ্যে চুক্তি। খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) আমাকে ইয়ামা'মা থেকে অগ্রসর হয়ে ইরাকের অধিবাসীদের (আরবীয় ও পারসিকদের) নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনার আহ্বান জানাবার জন্য এবং ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেবার জন্য ও ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃত হলে তাদের নরকাগ্নি সম্পর্কে সাবধানবাণী দেবার জন্য আদেশ করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁরা মুসলমানদের সঙ্গে সমান দাবী-দাওয়া ও কাজ-কর্মের অধিকার ভোগ করবে। পরিশেষে আমি হিরায় পৌঁছে আয়াস-বিন-কাবিসা আততাঈ ও শহরের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আমি তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে আহ্বান করি। কিন্তু তারা তাতে রাজী হন নি। তাই, আমি তাঁদের জিযিয়া প্রদান করতে অথবা যুদ্ধের সম্মুখীন হতে আহ্বান করি। তাঁরা জবাব দেন: 'আমরা যুদ্ধ চাই না। কেতাবীরা যেমন জিযিয়া প্রদান করে শান্তি স্থাপন করেন, আমরাও অনুরূপ জিযিয়া দিয়ে শান্তি লাভ করতে চাই।' আমি এ প্রস্তাব মেনে নিলাম ও গণনা করে দেখলাম যে, তাদের জনসংখ্যা সাত হাজার। এক হাজার বৃদ্ধ জিযিয়া থেকে রেহাই পেলেন। ছ' হাজার লোকের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া ঠিক হল। জিযিয়ার পরিমাণ হবে ৬০ হাজার দিনার।

"একথা স্বীকৃত হল যে, হিরার অধিবাসীগণ তাদের চুক্তি লঙ্ঘন করবে না এবং আরব বা ইরানী مسلمانوں বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না। তাদের কেউ যদি দুর্বল ও বৃদ্ধ বা পীড়িত হয়ে পড়ে বা ধনী অবস্থা থেকে গরীব হয়ে যায় তবে তাকে আর জিযিয়া দিতে হবে না। সে ও তার পরিবার দারুল ইসলামে অবস্থান করলে বায়তুল মাল থেকে তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হবে। তারা যদি দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করে, তবে তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের বন্দোবস্ত করা হবে না। তাদের যদি কোন দাস ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সর্বাপেক্ষা অধিক দাম নিয়ে তাকে বিক্রয় করে দিতে হবে ও বিক্রয়-লব্ধ অর্থ তার প্রভুকে দিতে হবে। সামরিক পোশাক ছাড়া কেতাবীগণ যে কোন পোশাক পরিধান করতে পারবে; অবশ্য সে পোশাক যেন মুসলমানদের পোশাকের মত না হয়। তাদের মধ্যে কেউ যদি সামরিক পোশাক পরিধান করে, তবে তাকে গ্রেফতার করা চলবে এবং সেজন্য তাকে কারণ দর্শাতে হবে। এ কারণ যদি যথোপযুক্ত না হয়, তবে একটি সামরিক পোশাকের দাম তার কাছ থেকে আদায় করা হবে। ঠিক হয় যে, বায়তুল মালের মাধ্যমে জিযিয়া প্রদান করতে হবে। যদি তাদের কোন অর্থকরী সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে তারা তা বায়তুল মাল থেকে গ্রহণ করবে।"

এ চুক্তিটি মুসলিম ও অধিকৃত অঞ্চলের খৃস্টানদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর প্রথম। এ চুক্তির গুরুত্ব এই যে, এর দ্বারা উভয়পক্ষ অনেকগুলো বাধ্যবাধকতা মেনে নেন। খৃস্টানগণ পৌর-জীবন যাপন করতে, সামরিক পোশাক পরিধান না করতে এবং মুসলমানদের শত্রুকে সাহায্য না করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর মুসলিম কর্তৃপক্ষ শুল্ক দেয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের ওপর হিসেব করে সামগ্রিকভাবে জিযিয়া গ্রহণ করবেন এবং এর বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তার সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আবু ইউসুফ বলেন, এটাই প্রাচ্যের প্রথম জিযিয়া। এতে বোঝা যায় যে, এ চুক্তিটি মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ইরাকের খৃস্টানদের মধ্যে সম্পাদিত প্রাথমিক চুক্তি। এর মধ্যে এমন কোন কিছুর ব্যবস্থা নেই, যা অসম্মানজনক বলে গণ্য হতে পারে। জিযিয়া প্রদান করা বা সামরিক ব্যাপারে শরীক না হওয়ার মধ্যে আপত্তিজনক কিছুই নেই। কারণ, পরাজিত হবার ফলে স্বভাবতই সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতা নিয়ে নেয়া হয় এবং মুসলিম কর্তৃপক্ষই দেশরক্ষার ভার নেন। আবার মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা লাভ করার বিনিময়ে জিযিয়া দেয়া হয়। মনে রাখা উচিত যে, জিম্মীদের ওপর কোন ভূমি-শুল্ক (খারাজ) ধার্য করা হত না। জিযিয়া পাইকারী-শুল্ক (মাথা-গণতি কর) ছিল না। একটি সামগ্রিক শুল্কের নামই জিযিয়া যার মধ্যে কোন অসম্মান বা হীনমন্যতা ছিল না। জিযিয়া বৃদ্ধি করার কোন কথাও জিযিয়ার মধ্যে ছিল না। বরং এতে এ কথাই লেখা ছিল যে, যদি ধনীগণ পরে জিযিয়া দিতে অসমর্থ হয়ে পড়েন, তবে তাদের আর জিযিয়া দিতে হবে না। তাদের বায়তুল মাল থেকে সাহায্য করা হবে। লক্ষ্য করার বিষয়, এতে কেতাবীগণ মুসলিমদের সঙ্গে একই ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাছ থকে সুযোগ-সুবিধা লাভ করে।

আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন যে, বানিকিয়া ও আইন-আততামর প্রভৃতি শহরও একই প্রকার চুক্তির আওতায় বশ্যতা স্বীকার করে। বালাযুরীও একথা সমর্থন করেছেন। সিরিয়ার বেলায় অবশ্য চুক্তিতে আবুও কতকগুলো বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছিল। আবু উবাইদার পরামর্শে খলিফা উমর (রাঃ) তা গ্রহণ করেন। পরে এগুলো মুসলিম শাসনাধীনে সব কেতাবীদের প্রতি প্রযোজ্য হয়। এ ব্যাপারে বালাযুরীর সঙ্গে তা'বারী ও ইয়াকুবী প্রায় একমত পোষণ করেন। চুক্তির কয়েকটি ধারায় অবশ্য কয়েকটি গরমিল দেখা যায়। সিরিয়া অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী মাখুলের মতে আবু ইউসুফ কর্তৃক প্রদত্ত বর্ণনাটি নিম্নরূপ:

"জিযিয়া দেবার বিনিময়ে مسلمانوں সঙ্গে দামেস্কের অধিবাসীদের শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর ফলে মুসলমানেরা তাদের জীবন ও ধনসম্পদ এবং চার্চ রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন। তারা কোন নতুন চার্চ নির্মাণ করতে পারবেন না। অবশ্য পুরাতন চার্চগুলো তারা সংস্কার ও পুননির্মাণ করতে পারেন। দামেস্কের অধিবাসীগণ পুল সংস্কার করতে বাধ্য ছিলেন এবং একাজ তারা স্বচ্ছন্দে করতে পারেন। তাদের অঞ্চল দিয়ে সফরের সময় তারা মুসলমানদের অভ্যর্থনা করতেন, তিনদিন আদর-আপ্যায়ন করতেন ও প্রয়োজন হলে তাদের পথ দেখিয়ে দিতেন। তারা আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের জন্য আলোক-সংকেতের ব্যবস্থা করতেন এবং কোন মুসলমানকে প্রহার বা অসম্মান করতে পারতেন না। নামাজের সময় তাদের ঘণ্টা বাজাবার অধিকার ছিল না। মুসলিম জনসমাবেশে তারা ক্রুশ বা শূকর নিয়ে যেতে পারতেন না। সামরিক পোশাক পরিধান করতে, অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে বা ধর্মীয় উৎসব ছাড়া ভোজের সময় নিশান বহন করতে তাদের অনুমতি দেয়া হত না।"

চুক্তির এ ধারাগুলো দামেস্কের অধিবাসীরা সানন্দে গ্রহণ করেন। ফলে অন্যান্য অনেক গোত্রও এ সব নীতির ওপর ভিত্তি করে মুসলিম কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে আসে। যখন খলিফা উমরের (রাঃ) কাছে এগুলো অনুমোদনের প্রার্থনা জানানো হয়, তখন তিনি বললেন:

"সিরিয়ার শহর ও নগরগুলোর অধিবাসীদের সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিগুলো আমি পরীক্ষা করে দেখেছি। এবং আমি আমার রাসূলের সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে তাঁদের মতামতও জানতে পেরেছি। এগুলো ও আল্লাহর কেতাবের ওপর ভিত্তি করে (৫৯: ৬-৮) আমি যে সিদ্ধান্তে এসেছি তা হল এই যে, যেদেশ আপনারা দখল করেছেন, তা সেখানকার অধিবাসীদেরই থাকবে, তারাই সেখানকার কৃষিকার্য পরিচালনা করবে। আর আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারে তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী আপনারা তাদের ওপর জিযিয়া ধার্য করবেন। তারা জিযিয়া দান করলে আপনারা তাদের কাছ থেকে আর কিছু চাইবেন না। আর জমি যদি সাবেক অধিবাসীদেরই থাকে, তবে মুসলমানেরা এর থেকে ফসল ভোগ করতে পারবে।

"তাই আপনারা তাদের (জিম্মীদের) ওপর জিযিয়া ধার্য করবেন; কিন্তু কখনও তাদের বন্দী করবেন না কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার বা ক্ষতি সাধন করবেন না। সত্যিকার দাবী না থাকলে আপনারা তাদের কাছ থেকে ধনসম্পদও গ্রহণ করবেন না। তদের সঙ্গে আপনারা যে চুক্তি সম্পাদিত করেছেন, তা বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন। উৎসবের দিনে বছরে একদিন করে ক্রুশ বের করা সম্বন্ধে বলতে চাই যে, তারা তাদের নিশান বাইরে না আনে, তবে শহরের বাইরে ক্রুশ আনতে তাদের বাধা দেবেন না।"

আবু ইউসুফ যদিও কেবল হযরত উমর (রাঃ), আবু উবায়দার অনুসৃত নীতি অনুমোদন করে যে পত্র লিখেছিলেন, তা হুবহু বিবৃত করেছেন, তবু একথা বলা যায় যে, হযরত উমর (রাঃ) খালিদের নীতি অনুমোদন করেন। পরবর্তীযুগে কেতাবীদের সঙ্গে যতগুলো চুক্তি সম্পাদিত হয়, সবই কিয়ামতের দিন অবধি চালু থাকবে।

আবু উবায়দার কাছে লিখিত পত্রে আমরা যে কেবল ক্রুশ ও চার্চ সম্পর্কে কতকগুলো নতুন নতুন দাবী সন্নিবেশিত দেখতে পাই তাই নয়, এগুলো সব জিম্মীদের জন্যই কার্যকরী করা হয়। অবশ্য ইরাকের খৃস্টানদের সঙ্গে সম্পন্ন খালিদের চুক্তিতে এসবের কোন উল্লেখ ছিল না। শত্রুপক্ষের নিকট হতে দখলকৃত জমিজমা সম্পর্কেও এ নীতির উল্লেখ দেখতে পাই। হযরত উমর (রাঃ) বিশেষ জোর দিয়ে বলেন যে, গ্রামাঞ্চলের জমিজমা (শহর বা নগরের জমিজমা নয়) গানিমা হিসেবে যোদ্ধা বা জেহাদীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যাবে না। এ জমি হস্তান্তরিত করাও চলবে না। এসব জমি জিম্মী কৃষকদের (উলুজ) হাতেই থাকবে। তারাই জমি চাষ করবে এবং মুসলমান, তাদের বংশধর ও তাদের নিজেদের (কৃষকদের) কল্যাণে সামর্থ অনুযায়ী জিযিয়া প্রদান করবে। খেয়াল করার বিষয় যে, খালিদ ও আবু উবায়দা উভয়ের চুক্তিতেই জিযিয়া এমন একটি শুল্ক বলে গণ্য হয়েছে যার সাথে আয়ের উৎস বা পদ্ধতির কোন সম্পর্ক নেই। হযরত উমরের (রাঃ) চিঠিতে কেবল উক্ত জমিরই উল্লেখ আছে যা জিম্মীরা জিযিয়া প্রদান করে নিজেদের বলে দাবী করতে পারত। প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত উমর (রাঃ) কি খারাজ বা ভূমি-রাজস্ব হিসেবে অন্য কোন শুল্ক দাবী করতেন। অথবা জিম্মীরা কৃষক হিসেবে যখন জমির ওপরেই একান্তভাবে নির্ভর করত, তখন এ শুল্কের আর প্রয়োজন ছিল না—একি সত্য? আবু ইউসুফ ও বালাযুরীর প্রদত্ত চুক্তিগুলোর দলিল দেখে এর কোন সুরাহা করা যায় নি। অবশ্য দুজনেই বলেছেন যে, হযরত উমরের হুকুম-নামায় জিযিয়া ও খারাজ উভয়ই রয়েছে।

জিযিয়া ও খারাজ

জিযিয়া ও খারাজ (রাজস্ব) সম্পর্কে অনেকখানি অনিশ্চয়তা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে বিজিত দেশে প্রাথমিক যুগের কর-ব্যবস্থার আইন সম্পর্কে নানাপ্রকার মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ওয়েলহ'সেন বলেন: জিযিয়া দেশ-জয় কালে ধার্য করা হত। নির্দিষ্ট অর্থ ও ফসলের নির্দিষ্ট অংশের সামগ্রিক নামই জিযিয়া। এর মধ্যে ভূমি-কর বা খারাজ ও ব্যক্তি-কর বা জিযিয়াও (মাথা-গণতি কর নয়) ছিল। কিন্তু শুল্ক আদায়ের পদ্ধতির সাথে মুসলিম শাসকদের কার্যের কোন সম্পর্ক ছিল না। জিযিয়া ও খারাজের মধ্যে কখনো কখনো একটিই ধার্য করা হত। কারণ, এদুটি কথার দ্বারা এক জিনিসই (শুল্ক) বোঝাত। পরবর্তীকালে মুসলিম-আইনবিদগণ জিযিয়া ও খারাজে পার্থক্য নির্দেশ করেন এবং প্রাথমিক মুসলিম সমাজে তার (কাল্পনিক) প্রয়োগ করেন। বিজিত দেশে জমি কেনা থেকে মুসলমানদের বিরত করা ও নব-দীক্ষিত মুসলমানদের কাছ থেকে জিযিয়া না নেবার নীতি খলিফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (দ্বিতীয় উমর) প্রবর্তন করেন। অতঃপর সব জমি থেকে খারাজ সংগ্রহ করা সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। তা সে জমি জিম্মীরই হোক বা নব-দীক্ষিত مسلمانوںই হোক।

কার্ল বেকার ও প্রিন্স কেতানী প্রমুখ পণ্ডিতগণ ওয়েলহ'সেনের মতামত মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দানিয়েল সি, ডেনেট এ মতের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। ডেনেট কিন্তু ওয়েলহ'সেনের মতামতের অনেকটা সংস্কার বা উন্নতি-বিধান করেছেন। কতকগুলো অমীমাংসিত সমস্যারও তিনি সমাধান করেছেন। তিনি সত্যিই বলেছেন যে, শুল্কের ব্যাপারে কেবল এক বা অভিন্ন রীতি ছিল না। ডেনেট ওয়েলহ'সেনের সঙ্গে একমত যে, জিযিয়া ও খারাজ নিছক শুল্ক (Tribute) ছিল না। ডেনেট বলেন যে, জিযিয়া ও খারাজ বলতে শুল্কই বোঝাত। কারণ, শুল্ক সম্বন্ধে ধারণা বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল।

ডেনেটের মত ওয়েলহ'সেনের মতের চাইতে অনেকটা উন্নত ধরনের। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটি দোষ রয়ে গেছে। শুল্ক অর্থে জিযিয়া ও খারাজ শব্দটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হত— (ওয়েলহ'সেন ও বেকারের মত অনুসরণ করে) কিন্তু সাধারণ কর হিসেবে যে ব্যবহৃত হত না—এ কথা কেবল আংশিক সত্য। আমরা আগেই বলেছি, খালিদের চুক্তিতে হিরার অধিবাসীদের ওপর গণনা-সাপেক্ষে জিযিয়া ধার্য হয়। (৭ হাজার লোকের মধ্যে ৬ হাজার লোকের ওপর ৬০ হাজার দিনার জিযিয়া ধার্য করা হয়)। এটা ছিল সামগ্রিক শুল্ক, ব্যক্তিগত কর নয়। শুল্ক কথাটি ব্যবহার করে ওয়েলহ'সেন ঠিকই করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এটা একটি শহরের অধিবাসীদের ওপর ধার্য করা হত। জিযিয়া ও খারাজ কর হিসেবে ব্যবহৃত হত মনে করে ডেনেট ভুল করেছেন। জিযিয়া কখনই সাধারণ কর হিসেবে গণ্য হত না। খারাজকেই শুধু কর হিসেবে মনে করা হত। কেননা, জিযিয়া আরব দেশে ও তার বাইরে মুসলিম বিজয়ের পূর্বেই ব্যক্তিগত শুল্ক হিসেবে চালু হয়ে গিয়েছিল। ডেনেট নিজেই ক্রিস্টেনসেন ও লটের অনুমোদনক্রমে এ কথা স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম বিজয়ের সময় সিরিয়া ও ইরাকে ব্যক্তিগত কর চালু ছিল। "জিযিয়া" কথাটি এসেছে আরামীয় "গাযিযা" থেকে। "জিযিয়া" ধার্য করার ব্যাপারে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীতে পার্থক্য নির্দেশ করা হত। আল-কোরআনে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে (৯: ২৯)। তাই জিযিয়া ও খারাজকে এক জিনিস মনে করে জিযিয়াকে কর হিসেবে গণ্য করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।

"খারাজ কথাটি (গ্রীক—"চোরেজিয়া") অবশ্য সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হত। আল- কোরআন বলেছে, বান্দার নেয়ামতস্বরূপ খারাজ ধার্য করা হয়। আবু ইউসুফ বালাযুরী, ইয়াকুবী ও ইবনে সাল্লাম "জমির খারাজ" এবং "মাথাপিছু বা কাঁধপিছু খারাজে"রই উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ কর ভিন্ন আর কিছুই নয়। কিন্তু এসব আইনবিদের কেউই ভূমি-জিযিয়া কথাটাকে সাধারণ কর হিসেবে ব্যবহার করেন নি। কেবল ইবনে আবদুল হাকামই এভাবে ব্যবহার করেছেন। মিরসীয় প্রথাকেই বোধহয় তিনি অনুসরণ করতেন।

ইবনে সাল্লাম শুল্ককে "দারিওয়া" নামে অভিহিত করেন। কিন্তু শুল্ক কথাটি সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল না। আবু ইউসুফ, এহিয়া ইবনে আদম ও কুদামা ইবনে জাফর প্রমুখ প্রাথমিক যুগের আইনবিদগণ অর্থনৈতিক ও শুষ্কতত্ত্বের কেতাবগুলোর নাম রেখেছেন "কিতাবুল খারাজ"। কিন্তু কেউ এই শ্রেণীর কেতাবের নাম "কেতাবুল জিযিয়া" রাখেন নি। "লিসানুল আরব" ও "তাজউল আরুস" নামক বইতে ভূমি- রাজস্ব ছাড়াও সাধারণ শুল্কের ('ইতাওয়া') উল্লেখ রয়েছে। কাজেই দেখা গেল, "খারাজই" সাধারণ কর হিসেবে ব্যবহৃত হত, জিযিয়া নয়।

যদিও প্রথমদিকে বিজিত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানগণ কর্তৃক খারাজ ও জিযিয়া ধার্য করার মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল, তবু কিছুদিন পর বিশেষ করে খলিফা হযরত উমর বিন আবদুল আজিজের (মৃত্যুঃ ৭২০ খৃস্টাব্দ) সময় থেকে এক্ষেত্রে সুসমঞ্জস নীতির প্রচলন হয়। লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনবিদদের 'জিযিয়া' ও 'খারাজ' সম্পর্কীয় বিধি-ব্যবস্থার এই সুসমঞ্জস রীতিকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

মনে রাখা উচিত যে, যেসব শহর শান্তিচুক্তির ফলে মুসলিম অধিকারে আসে, যেমন সাওয়াদের হিরা, উল্লাইস, আয়েন আততামর ও বনিকিয়া এবং সিরিয়ার দামেস্ক, বালাবাক, হিমস ও জেরুজালেম তাদেরকে শহরের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই শুল্ক রূপে জিযিয়া দিতে হত। (যেমন হিরা শহরের অধিবাসীরা ৬ হাজার দিনার ও হামস শহরের অধিবাসীগণ ১ লাখ ৭০ হাজার দিনার দেয়)। প্রথমদিকে এ শুল্ক সাধারণ জিযিয়ার নিয়ম অনুসারেই ধার্য করা হত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রত্যেক জিম্মীকে ব্যক্তিগতভাবেই জিযিয়া দিতে হত। কারণ, প্রত্যেক শহরে জিম্মীদের যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তারা জিযিয়া থেকে রেহাই পেয়ে থাকে। ফলে অবশিষ্ট জিম্মীদের তখন জিযিয়ার সবটুকুই দিতে হত। এতে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠল। কিন্তু স্থানীয় শাসকগণ এ ব্যাপারে কোন পরিবর্তন সাধন করেন নি। পরিশেষে দ্বিতীয় উমর এক ও অভিন্ন রীতির প্রবর্তন করেন ফলে আল-কোরআনের নীতি অনুসারে (সুস্থ ও সবল জিম্মীকে) ব্যক্তিগতভাবে মাথাপিছু জিযিয়া দিতে হত। এ প্রসঙ্গে ইরাকের নতুন আবাসভূমি নাজরানিয়াবাসী খৃস্টানগণের কথা বলা যেতে পারে। বালাযুরীর বর্ণনায় জানা যায় যে, মৃত্যু ও নবধর্মে দীক্ষার ফলে জিম্মীদের সংখ্যা অনেক কমে আসে; তবু মা'বিয়া প্রমুখ শাসনকর্তাগণ কিছুতেই শুল্কের পরিমাণ কমাতে রাজি হন নি। খলিফা দ্বিতীয় উমর হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে সম্পন্ন জিম্মীদের চুক্তির পূর্ণব্যাখা করেন। ফলে সামগ্রিক শুল্ক মাথাপিছু হারে পর্যবসিত হল। মাথাগণতি (সবার ওপরে নয়) জিযিয়ার সুসমঞ্জস রীতির মাধ্যমেই এ বিবর্তন সম্ভব হল।

খলিফা প্রথম উমরও (রাঃ) অনুরূপভাবে যুদ্ধে বিজিত অঞ্চল ও চুক্তির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে অর্জিত অঞ্চল সম্পর্কে একই বিধান দেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে অর্জিত অঞ্চলকে সামগ্রিক সম্পদ বলা হয় এবং যুদ্ধে বিজিত অঞ্চলকে বলা হয়, 'গানিমা'। প্রথম অঞ্চল রাষ্ট্রীয় ভূমি। কিন্তু গানিমা হিসেবে যে সব অঞ্চল লাভ করা হয়, তা হযরত উমরের (রাঃ) আমলে সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সময়ে বানু-কুরায়যার গানিমাভুক্ত জমি বাজেয়াপ্ত করে বণ্টন করে দেয়া হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এ গানিমা রাষ্ট্রীয় সম্পদরূপেও গণ্য হয়েছে। তবে খারাজের মত এখানেও অধিবাসীদের মধ্যে জমি বণ্টন করে ফসলের অংশ রাষ্ট্রকে দেবার রীতি ছিল। হযরত উমর (রাঃ) এ জমির হস্তান্তর নিষিদ্ধ করেছেন ও দু'রকমের জমির ওপর খারাজ বা ভূমি-কর ধার্য করেছেন। এটাই সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তী যুগের খলিফাগণও এ রীতি অনুসরণ করেন। যদি কোন জিম্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তবে তার প্রতি ধার্য জিযিয়া থেকে তিনি রেহাই পাবেন। কিন্তু খারাজ বা ভূমি-কর তাকে দিতেই হবে। কোন জিম্মী যদি উত্তরাধিকারসূত্রে জমি-জমা পেয়ে থাকে বা তার কাছে জমি বিক্রয় করা হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের খারাজ তাকেও মিটিয়ে দিতে হত। কোন কোন ব্যক্তিকে খারাজ থেকে রেহাই দেয়া হয়, আবার কোন কোন ব্যক্তিকে খারাজ দিতে হত। এ ব্যাপারে খলিফার ইচ্ছাধীন ক্ষমতা বা বিশেষ এখতিয়ার ছিল। তিনি খারাজ তুলে দিয়ে আরবীয় রীতি অনুযায়ী “উশর” (ফসলের ১০) বসাতে অথবা খারাজও ধার্য করতে পারেন। খারাজ তুলে দিয়ে “উশর” বসানোর রীতি প্রথম উমরের (রাঃ) আমলে মোটেই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু হযরত উসমান (রাঃ) ও পরবর্তী খলিফাদের আমলে এটাই সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়ায়।

খালিদ ও আবু উবায়দার চুক্তি থেকে ভূমি-কর বা জিযিয়া ধার্য করার পদ্ধতি সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট নযির পাওয়া যায় না। আবু ইউসুফ, বালাযুরী, এহিয়া ইবনে আদম ও অন্যান্য আইনবিদের লেখা থেকে জানা যায় যে, নারী শিশু, দরিদ্র ব্যক্তি, অন্ধ, অসুস্থ, উন্মাদ, বেকার ও দরিদ্র ধর্মযাজক ভিন্ন সব জিম্মীকেই জিযিয়া ছাড়া খারাজও দিতে হত। আবু ইউসুফের বর্ণনায় জানা যায় যে, প্রত্যেক জিম্মীকে তার সম্পদ ও আয় অনুযায়ী শুল্ক দান করতে হত। ইরাকে এ শুল্ককে জিম্মীদের অবস্থা অনুযায়ী তিনভাগে ভাগ করা হয়: বাৎসরিক যথাক্রমে ৪৮, ২৪ ও ১২ দিরহাম। সিরিয়ায় জিযিয়ার অন্য হার বিদ্যমান ছিল। প্রতি জারিবের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফসল কর হিসেবে দেবার পরও এক দিনার করে প্রদানের ব্যবস্থা কোন কোন চুক্তিতে বিধিবদ্ধ হয়।

হযরত উমরের সনদ

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, খলিফা হযরত প্রথম উমর (রাঃ) জিম্মীদের মর্যাদা সম্পর্কে সুসামঞ্জস ও সর্বাঙ্গীন কোন নিয়ম নির্দেশ করেন নি। প্রকৃতপক্ষে, আংশিকভাবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলী এবং আংশিকভাবে হযরত উমরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রদত্ত নির্দেশনামা ও পরবর্তী খলিফাদের কার্যধারার ওপর ভিত্তি করেই এসব নিয়ম-কানুন ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে। তবু আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণের কাছ থেকে কতকগুলো দলিল পাওয়া গেছে। এসব দলিলে বিভিন্ন কানুন ও নীতির বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলো নাকি হযরত উমর জিম্মীদের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নিরূপণের জন্যে জারী করেন। একেই হযরত উমরের সনদ বলা হয়। সিরিয়ার খৃস্টানগণ আবু উবায়দার নিকট যে দরখাস্ত পেশ করেন, হযরত উমর তা অনুমোদন করেন। এর বিবরণ নীচে দেয়া হলঃ

"আপনারা যখন আমাদের দেশে আসেন, তখন আমরা আপনাদের নিকট থেকে জীবনের নিরাপত্তা এবং এখানকার অধিবাসীগণ ধর্মের স্বাধীনতা পেতে চায়। আর আমরা এসব বিষয়গুলো মেনে নিয়েছি—দামেস্ক ও এর চারপাশে কোন চার্চ, ধর্মস্থান বা ধর্মযাজকালয় নির্মাণ করা হবে না। যে সব চার্চ বিনষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো আমরা সংস্কার করব না। মুসলিম বাসস্থান অঞ্চলেও এই একই রীতি অনুসৃত হবে। দিনে বা রাত্রিকালে চার্চগুলোতে সাময়িকভাবে অপেক্ষা করার অধিকার مسلمانوں কাছ থেকে কেড়ে নেয়া চলবে না। পরিব্রাজক ও মুসাফেরের জন্যে দরজা সর্বক্ষণ খোলা থাকবে। চার্চে বা বাড়ীতে কোন গুপ্তচরকে আমরা আশ্রয় দেব না। মুসলিমদের প্রতি বিশ্বাসঘাতককে আমরা লুকিয়ে রাখব না। মৃদুভাবে আমরা চার্চে 'নাকুস' বাজাব। সেখানে আমরা ক্রুশ ঝোলাব না এবং উচ্চস্বরে উপাসনা বা ধর্ম-সঙ্গীত গাইব না, মিছিল করে আমরা ক্রুশ বা বাইবেল নিয়ে যেতে পারব না; ইস্টার বা বিশেষ রবিবারে আমরা মিছিল বার করতে পারব না; মৃতদেহের ওপর উচ্চস্বরে কাঁদা চলবে না বা মুসলিম-বাজারে আগুনসহ মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারব না; মুসলমানদের কবরের নিকট আমরা কাউকে কবর দেব না; মুসলমানদের সমাবেশে মদ বিক্রয় বা পৌত্তলিকতার বাহ্যিক প্রদর্শনও নিষদ্ধ। আমাদের ধর্মে মুসলিমদের প্রলুব্ধ করতে বা আহ্বান করতে পারব না; মুসলমানদের দাসদের আমরা রাখতে পারব না; আমাদের কোন আত্মীয়-স্বজনকে আমরা ইসলাম গ্রহণ করতে বাধা দিতে পারব না; আমাদের ধর্মের কোন প্রচার আমরা করব না; মুসলমানদের মত আমরা কালানসুয়া, পাগড়ী, জুতা ব্যবহার করতে পারব না; তাঁদের মত চুল ছাঁটতে বা অশ্বে আরোহণ করতে পারব না; তাঁদের ভাষা আমরা ব্যবহার করতে পারব না; তাঁদের নামের মত আমরা নাম গ্রহণ করতে পারব না; আমাদের সামনের চুল কাটতে হবে ও বিভক্ত করে রাখতে হবে; কোমরে যুননার ঝোলাতে হবে; আমাদের সিলমোহরে আরবী অক্ষর লেখা যাবে না; ঘোড়ার জিন ব্যবহার করা চলবে না; আমরা বাড়ীতে অস্ত্রশস্ত্র রাখতে পারব না এবং তরবারী বহন করতে পারব না; মুসলমানদের সমাবেশে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে; তাদের রাস্তা দেখিয়ে দিতে হবে; তারা যখন চাইবেন, জনসভায় তাদের সম্মানার্থে উঠে দাঁড়াতে হবে; আমাদের বাড়ীঘর তাদের বাড়ীঘরের চাইতে উঁচু করে তৈরী করা চলবে না; আমাদের ছেলে-মেয়েদের আমরা কোরআন শেখাতে পারব না; ব্যবসায় ভিন্ন আর কোন ব্যাপারে মুসলমানদের সঙ্গে শরীক হতে পারব না; আমাদের চলতি প্রথা-মত প্রত্যেকটি মুসলিম পরিব্রাজককে তিনদিন আপ্যায়িত করব ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করব। আমরা কোন মুসলমানকে অবমাননা করব না। যে ব্যক্তি মুসলমানকে আঘাত করবে, তার অধিকার ও দাবী-দাওয়া নস্যাৎ হয়ে যাবে।"

ওপরেরটিই একমাত্র দলিল নয়; ছোট-বড় এমনি ধারার আরো অনেক দলিল আছে। অবশ্য, এগুলো মূল ধারার দিক দিয়ে একই রকম। একথা প্রমাণ করার দরকার নেই যে, হযরত উমরের তথাকথিত এ সনদটি তাঁর সময়কার নয়। পরবর্তী যুগেই এটি বিধিবদ্ধ হয়। কারণ, এর মধ্যে যে সব বাধ্যবাধকতা আছে, তা সেনাপতিদের প্রতি হযরত উমর কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনামার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। অনুদারতা ও নিপীড়নই এ ধারাগুলোর ভিত্তি। হযরত উমরের উদারতার নযির এর মধ্যে পাওয়া যায় না।

অবশ্য, সনদটির আইনগত গুরুত্ব সমধিক। কারণ, ইসলামের প্রথম যুগের আইনবিদগণ এর ওপর ভিত্তি করেই আইনের বিধান দিয়েছেন। সর্বসম্মতিক্রমে এটা জিম্মীদের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নির্ণয়ের নির্দিষ্ট বিধি-ব্যবস্থা বলে সাব্যস্ত হয়েছে। এর আইনগত বৈধতার ফলে ঐতিহাসিক প্রামাণ্যের প্রশ্নটি আর কেউ তোলে না।

জিম্মীদের অধিকার ও'দায়িত্ব

ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে আজ অবধি জিম্মীদের যে সব অধিকার, দায়িত্ব ও কর্মপদ্ধতি গড়ে উঠেছে, তা এবার সংক্ষিপ্তরূপে দেখান যেতে পারে। এগুলোই ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক নির্ণয় করে এসেছে। মনে রাখা উচিত যে, এর কোন কোন নীতি কোরআনের বিধান থেকে নেয়া হয়েছে; আবার কোনটি খলিফা প্রথম উমরের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী খলিফাদের দেয়া নির্দেশনামা থেকে এসেছে। ইসলামে দাখিলের অসম্মতির কতকগুলো নিদর্শন, যেমন গিয়ার, যুন্নার ও রঙীন কালানসূয়া পরিধান করা দ্বিতীয় উমরের সময় থেকে চালু হয়। আল-মুতাওয়াক্কীলের সময়ে এগুলোর ব্যবহার অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু সম্ভবতঃ গণদাবীর ফলে তিনি এগুলো আবার পুনঃপ্রবর্তন করার প্রয়োজন মনে করেন। অন্যান্য খলিফাদের আমলে বিশেষ করে ফাতেমী খলিফা আল-হাকিম-বি আমরুল্লাহ্'র সময়ে আরও কতগুলো নতুন বাধ্যবাধকতা প্রবর্তন করা হয়।

সাধারণভাবে বলা যায় যে, আইনের বিধি অনুসারে মুসলিম শাসককে জিম্মীদের জীবন, ধনসম্পদ, চার্চ, ক্রুশ রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার অধিকার দিতে হবে। অবশ্য তারা নতুন চার্চ নির্মাণ করতে পারবে না (তবে তারা পুরানো চার্চগুলো সংস্কার করতে পারবে বা নতুন করে নির্মাণ করতে পারবে) এবং তাদের ক্রুশ বাইরে আনতে পারবে না বা উচ্চস্বরে উপাসনা করতে বা গীর্জার ঘণ্টা বাজাতে পারবে না। কোন জিম্মীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা চলবে না এবং পবিত্রভূমি (হারাম) ভিন্ন দারুল ইসলামে নির্বিবাদে পরিভ্রমণ করতে দিতে হবে।

আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ সংক্ষেপে বারোটি কার্যক্রম পেশ করেছেন। এগুলোকে আবার দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ছটি অতি প্রয়োজনীয়। এগুলো লঙ্ঘন করলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায়; পরের ছটি পালন করা প্রয়োজনীয়। এগুলো লঙ্ঘন করলে শাস্তি ভোগ করতে হয়। নিম্নলিখিত ছটি নিয়ম-কানুন অবশ্য কর্তব্য, অন্যগুলো প্রয়োজনীয় :

১। প্রত্যেক পুরুষ, বয়স্ক, স্বাধীন ও সুস্থ জিম্মী জিযিয়া দিতে বাধ্য থাকবে। তার পরিমাণ অবশ্য মুসলিম শাসক কর্তৃক নির্ধারিত হবে। মালিকী আইনবিদেরা বলেন যে, ওয়ালী বা শাসকগণ জিযিয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবেন। হানাফী মতপন্থীগণ একে তিনভাগে ভাগ করেছেন :

(ক) স্বচ্ছল ব্যক্তিদের ৪৮ দিরহাম করে জিযিয়া দিতে হবে, (খ) গরীবগণ ১২ দিরহাম এবং (গ) যারা এর মাঝামাঝি, তারা ২৪ দিরহাম করে দেবে। শাফেয়ী আইনবেত্তাগণ বলেন যে, কমপক্ষে জিযিয়া মাথাপিছু এক দিনার হওয়া উচিত। যদি জিম্মী তার ধর্ম পরিত্যাগ করে, তবে তার ওপর থেকে জিযিয়া তুলে নেয়া হবে। যে সব জিম্মীর জমি আছে, তাদের খারাজ দান করতে হবে। মুসলমান হলে জিযিয়া দিতে হয় না। কিন্তু মুসলমান হলেও ভূমি-কর দিতে হবে। অবশ্য ইমাম জিম্মীকে এ কর থেকে রেহাই দিতে পারেন।

হানাফী মতে জিযিয়া না দিলেও চুক্তি ভঙ্গ হয় না। কারণ, এর মধ্যে সব চাইতে প্রয়োজনীয় বিষয় হল জিম্মী হওয়ার ব্যাপারটি—জিযিয়া প্রদান করা নয়। জিম্মী হওয়ার ফলেই জিযিয়া দিতে হয়। সেই কারণে আইনবিদগণ জিম্মীদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার ব্যাপারে উদারতা অবলম্বন করতে বলেছেন। আবু ইউসুফ বলেন, 'জিযিয়া না দিলে তাদের প্রহার করা উচিত নয় অথবা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা উচিত নয়। জিযিয়া না দেয়া পর্যন্ত তাদের কয়েদ করা উচিত।' জিম্মীদের জেহাদে শরীক হওয়ার যখন কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তখন জিযিয়াকে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও মুসলিম শাসনে রক্ষণাবেক্ষণের অধিকারের বিনিময়ে প্রদত্ত শুল্কও বলা যেতে পারে।

২। জিম্মীগণ ইসলাম ধর্মকে সমালোচনা করবে না, মুসলিম অনুষ্ঠানাদির অবমাননা করবে না।

৩। তারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বা আল-কোরআনের নিন্দাবাদ বা অসম্মান করবে না।

৪। তারা মুসলমানের জীবন বা ধনসম্পদ বিনষ্ট করবে না; কিংবা তার ধর্ম-বিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরাতে কিংবা তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে প্রলুব্ধ করবে না। কারণ, একে অবিশ্বাস প্রসারের অপচেষ্টা বলে গণ্য করা হবে।

৫। জিম্মী মুসলিম মহিলাদের বিবাহ করতে পারবে না কিংবা তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারবে না। (মুসলমানগণ অবশ্য ম্যাজিয়ান বা পৌত্তলিক ভিন্ন কিতাবী মহিলাকে বিবাহ করতে পারে)।

৬। তারা শত্রুপক্ষকে সাহায্য করতে পারবে না; অথবা হারবীকে (বিদেশী) সাহায্য করতে পারবে না বা গুপ্তচর নিয়োগ করতে পারবে না। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য শত্রুপক্ষের নিকট বলতে পারবে না কিংবা তাদের কোন সংবাদাদি সরবরাহ করতে পারবে না।

৭। مسلمانوں সঙ্গে তারা ব্যবসায়ের সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার পেলেও তারা মদ বিক্রয় বা সুদের ব্যবসায় করতে পারবে না; কিংবা প্রকাশ্যে তারা মদ ও শূকরের গোশত খেতে পারবে না।

৮। তারা বিশেষ কতকগুলো পোশাক পরিধান করবে, যেমন গিয়ার পোশাকে একটা হলদে বন্ধনী; যুন্নার (girdle) এবং মাথার লম্বা ও রঙীন কালানসুয়া বা শিরস্ত্রাণ।

৯। তারা ঘোড়ায় চড়তে পারবে না বা অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারবে না। অবশ্য গাধা ও খচ্চরের পিঠে তারা চড়তে পারবে। তাদের বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন হিসেবে জিনের ওপর তাদেরকে একটা কাষ্ঠ-গোলক বেঁধে দিতে হবে।

১০। তাদের বাড়ী-ঘর मुसलमानों চাইতে উঁচু হবে না—নীচু হলেই ভাল।

১১। তারা তাদের গীর্জার ঘণ্টা জোরে বাজাবে না বা উচ্চস্বরে উপাসনা করবে না।

১২। মৃতদেহ নিয়ে তারা চীৎকার করে কাঁদবে না; মুসলিম জনপদ থেকে দূরে তাদের কবরস্থ করতে হবে।

এর ফলে প্রত্যেক সম্প্রদায় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পায়। এরা নিজের নিজের ধর্ম পালন করার অধিকার ভোগ করত নিজস্ব ধর্মীয় নেতার অধীনে এবং নিজেদেরকে পরিচালিত করত। ধর্মীয় নেতারা আবার মুসলিম শাসকদের নিকট দায়ী থাকতেন। কাজেই জিম্মীকে দুটি সমাজ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখাতে হত। তার নিজের সমাজ ও যে বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তার সমাজের অস্তিত্ব ছিল। তার নিজের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তার অধিকার সম্পূর্ণরূপে রক্ষিত ছিল; কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তার ওপর কতকগুলো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হত, যেমন সাক্ষ্যদান, ফৌজদারী আইন ও বিবাহ। সে মুসলমানদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করতে পারবে না। যদি তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করত, তবে হয় তাকেও নতুন ধর্ম গ্রহণ করতে হত, নতুবা স্ত্রীকে তালাক দিতে হত। গানিমাতেও তার কোন অধিকার ছিল না। যুদ্ধে যোগদান করলে তাকে বেতন দেয়া হত।

কিতাবীদের মধ্যে বানু-তাগলীবের আরব খৃস্টানগণই সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে। তারা নিজেদের জিম্মী বলতে চাইতেন না এবং জিযিয়াও দিতেন না। খলিফা প্রথম উমর অমুসলিম থাকা অবস্থায় তাদের কাছ থেকে জিযিয়া দাবী করেন। কিন্তু তারা জিযিয়া দিতে অস্বীকার করেন। তারা বলেন যে, তারা আরব দেশীয় এবং এদিক থেকে নিজের দেশের আরবীয়দের কাছ থেকে ভিন্ন ব্যবহার তারা প্রত্যাশা করেন না।

কিন্তু হযরত উমর তাদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তারা দারুল ইসলাম থেকে হিজরত করার হুমকী দেখায়। এমতাবস্থায় তখন হযরত ওমর বানু-তাগলীব গোত্রের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উবায়দা ইবনে আন-নুমানের উপদেশক্রমে জিযিয়া আদায় না করার সিদ্ধান্ত করেন। অবশ্য, এই শর্ত আরোপ করেন যে, তাদের দ্বিগুণ সদকা দিতে হবে এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের খৃস্টধর্মে দীক্ষাদান থেকে বিরত থাকতে হবে।

গাসানের খৃস্টান আরব বাদশা জাবালা ইবনে আল-আইহামের বিষয়টি অন্যভাবে মীমাংসিত হয়। মুসলিম বিজয়ের পর জাবালা তাঁর স্বদেশে ফিরে আসেন; কিন্তু এর অল্পদিন পরই তাকে জিযিয়া দিতে বলা হয়। তিনি এই বলে জিযিয়া দিতে অস্বীকার করেন যে, তিনি একজন আরব; এবং পরে তিনি বাইজান্টীয় ভূখণ্ডে চলে যান। অন্য একটি সূত্রে জাবালার হিজরতের অন্য কারণ জানতে পারা যায়। বালাযুরী বলেন, জাবালাকে জনৈক মুসলমান অপদস্থ করে। খলিফা উমরের কাছে যখন বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, তখন খলিফার বিচার তাঁর মনপুত হয় নি। ফলে তিনি দারুল ইসলাম ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে একথা স্পষ্টভাবে জানতে পারা গেছে যে, খলিফা উমর (রাঃ) বানু-তাগলীবের মত জাবালাকে বিশেষ সুবিধা দান করতে চান নি।

উপসংহার

আইনবিদদের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগের অবস্থা অনেকখানি ভিন্ন ছিল। যেহেতু আইন যথোচিত ও প্রয়োজনীয় অবস্থার মধ্যে কেবল পার্থক্য নির্দেশ করে, তাই উদারতার মাত্রা শাসক ও তাদের অধীনস্থদের মর্জির ওপরই নির্ভর করত। এমনও নযির আছে যে, উভয়পক্ষেই আইন এড়িয়ে গেছে এবং অমান্যও করেছে (জিম্মীদের সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ, জিযিয়া প্রদান ও গীর্জা ও সিনাগণ নির্মাণের ব্যাপারে)। খলিফা আল-মনসুর সরকারী চাকুরী থেকে সব জিম্মীকে অপসারিত করেন। আর আল-মতাওয়াক্কীল তাদের প্রতি খুব খড়গহস্ত ছিলেন। তিনি মুসলমানদের দেশ জয়ের পরে নির্মিত সব গীর্জা ও সিনাগস বিনষ্ট করার আদেশ দেন। জিম্মীরাও অধিকতর সুযোগ-সুবিধা পাবার জন্যে ভিত্তিহীন দাবী-দাওয়া জানাতে থাকে। সিনাই পর্বতের খৃস্টানদের বিষয়টি এর একটি নযির। বর্ণিত আছে যে, একটি গীর্জা দখলে রাখার জন্য হযরতের সঙ্গে নাকি ওখানকার জিম্মীদের ২য় হিজরীতে একটি চুক্তি হয় এবং এজন্য জিম্মীগণ জাল দলিল পেশ করে। এর ফলে কোন কোন মুসলিম শাসনকর্তা এতদূর বলেছেন যে, প্রথম দিকে জিম্মীদের সঙ্গে যে সব চুক্তি হয়েছে, তা এখন অকেজো হয়ে গিয়েছে। তাই এগুলো নষ্ট করে দেয়া উচিত। আল-গাজ্জালী প্রমুখ অনেক আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা অবিশ্বাসের স্থায়িত্বের দরুন জিম্মীদের প্রতি কিছুটা কঠোর ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন।

এসব ব্যবস্থা ও কার্যাবলী অনেক জিম্মীর পক্ষে কঠোর হলেও একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সত্যিকারের ঔদার্যমূলক এবং যে সব কিতাবী তাদের কিতাবের নীতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করতে চাইতেন, এ আইন তাদের রক্ষাকবচ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। অনুদারতার প্রভাব যদিও কখনো কখনো বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে থাকে, তবে তার গোড়ায় ছিল ক্রমবর্ধমান পীড়নমূলক শাসনের লক্ষণ, যে জন্য অমুসলিমের মতই মুসলমান জনসাধারণকেও কম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয় নি।

কোন কোন খলিফা ও শাসনকর্তা যেমন কঠোর ও নিষ্ঠুর ছিলেন, তেমনি আবার অনেক খলিফা উদারতা ও অমায়িক ব্যবহারের প্রতীক ছিলেন। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় আল-মুকতাফীর (খৃস্টাব্দ ১১৩৬-১১৬০) নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি নিস্টোরীয় পাদ্রীদের যে সনদ দান করেন, তা এই উদারতার সুষ্ঠু প্রমাণ। এ. মিংগানা কর্তৃক সম্পাদিত "A Charter of Protection granted to the Nestorian Church in A.D. 1138 by Muktafi II" Man-Chester, 1925, P. P, 3-7.) নামক ঐতিহাসিক সনদের বিবরণে এরই নযির মেলে। বিভ্রান্ত শাসনাধীনে অনেক সময় জিম্মীগণ নিষ্পেষিত হয়েছে। কিন্তু مسلمانوں অবস্থাও খুব ভাল ছিল না। কোন একটি বিশেষ শাসনকালে বা যুগে জিম্মীদের প্রতি অত্যাচারের মাত্রার গতিপথ নির্দেশ করে।

মুসলিম শাসনাধীনে জিম্মীদের প্রতি ব্যবহারের বিষয়টি বিচার করতে গেলে খামখেয়ালী খলিফাদের ও মুসলিমদের হাতে জিম্মীদের দুঃখ-কষ্টের নযির নিলে চলবে না; এ বিচার করতে গেলে আইনের সাধারণ উদারতার নীতি, প্রত্যেক যুগের প্রচলিত অবস্থা ও পরিবেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার কথাও মনে রাখতে হবে।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 সন্ধি

📄 সন্ধি


সন্ধি-চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা

ইসলাম ও অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সাধারণ সম্পর্ক বিরোধগত। তবু প্রয়োজনের তাগিদে বিশেষ করে কোন ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রের পরাজয়ের ফলে শত্রু- পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল উদ্দেশ্য বিরোধী নয়। আল্লাহ'র বিধানে অমুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া অনুমোদন করা হয়েছে:

"পবিত্র মসজিদে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, তারা ভিন্ন কি করে তোমরা মুশরিক এবং আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে পার? যে পর্যন্ত তারা সততার সঙ্গে কাজ করে, তোমরাও সততার সাথে চল। যারা খোদা-ভীরু, কেবল তাদেরই আল্লাহ ভালোবাসেন" (৯:৬)।

প্রচলিত ব্যবহার-বিধি আল-কোরআনের এই নির্দেশেরই সমর্থন জানিয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কাবাসীদের সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ চুক্তিটির শর্তাদি ও কার্যকালের মাধ্যমে মুসলিম আইনবিদগণ পরবর্তী যুক্তিগুলোর দিক-নির্দেশ করেছেন। একটি হাদিসে রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ "বাইজান্টীয়গণ তোমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে।" কাজেই আল- কোরআন ও হাদিস অনুসারে আইনবিদগণ এ সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম-স্বার্থ রক্ষিত হলে শত্রু পক্ষের সঙ্গে শান্তি-চুক্তি সম্পাদন করা বিধিসম্মত এবং এ চুক্তির ধারাগুলো পালন করতেও মুসলমানরা বাধ্য থাকবেন। প্রাথমিক খলিফাদের কার্যধারা ও আইনবিদদের সর্বসম্মত অভিমত বা ইজমার ফলে চুক্তি সম্পাদন শরিয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়েছে।

রাসূলে আকরমের (সঃ) হাতেই চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা ছিল এবং পরবর্তীকালে এ ক্ষমতা তাঁর খলিফাদের হাতে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রায়ই যুদ্ধরত সেনাপতিদের দেয়া হত। শত্রুপক্ষ যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইত, তবে যুদ্ধরত সেনাপতিকে শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেয়া হত। রাসূল (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ ক্ষতিকর চুক্তি বা ব্যবস্থা নাকচ করে দেবার ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতেন। তাঁদের অনুমতি না নিয়ে এসব চুক্তি মুসলিম সমাজে কার্যকরী করা যেত না।

সন্ধির আইনগত প্রকৃতি

সন্ধি ('মুহাদানা' বা 'মুওয়াদা') হল এক রকমের "আকদ" বা বন্ধন; চুক্তিতে কোন একটি বিষয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করার ফলে তার আইনগত ফলাফল প্রত্যক্ষ করা যায়। মুসলিম আইনের 'আকদ' (চুক্তি) পশ্চিমী আইনের চুক্তির (contract) চাইতে অনেক বেশী ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'আকদে'র বাহ্যিক আকার ও পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ঐক্যমত বা মনের মিলকেই মৌলিক জিনিস বলে মনে করা হয়। একদল প্রস্তাব ('ইজাব') করেন আর অপর দল তা গ্রহণ ('কবুল') করেন, ফলে 'মনের সমন্বয়' সম্ভব হয়। চুলচেরা বিচারে এতে পারস্পরিক সুবিধা থাকুক আর নাই থাকুক, আইনের চোখে চুক্তিটি বৈধ ও কার্যকরী বলে সাব্যস্ত হবে।

আইনগ্রন্থ "মাজাল্লা"তে চুক্তির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ "কোন বিষয়ে দুটি দল যখন করণীয় পন্থা স্থির করে তা' পালনের জন্য বাধ্যবাধকতার আওতায় পরস্পরকে আবদ্ধ করে, তার নামই চুক্তি। প্রস্তাব ও সম্মতির সমন্বয়েই এর সৃষ্টি।"

তাই ইসলামে চুক্তি আসলে মতৈক্য ও স্বীকৃতি থেকেই জন্ম নেয়; বিশেষ একটি বাহ্যিক রূপ বা পদ্ধতি পালন করার প্রয়োজন এখানে নেই। চুক্তির ধারাগুলো নির্ধারিত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি উভয়পক্ষের ওপর প্রযোজ্য হয়। চুক্তি লেখা, দস্তখত করা ও তারিখ দেয়া (কোন কোন ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখা) আইনের দিক থেকে অপরিহার্য নয়। শুধু সমঝোতা নির্দেশ করার জন্য এবং চুক্তির শর্ত ও মেয়াদ সম্পর্কীয় দলিল-পত্র রাখবার জন্যই চুক্তিটি লিখিতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হয়।

চুক্তি-সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গে যাতে করে এর শর্ত ও ধারাগুলো বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিপালিত হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। আল-কোরআনে মুসলিমকে 'ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রাখবার জন্য' আহ্বান করা হয়েছে (১৬ : ৯৩)। আরও বলা হয়েছে "মেয়াদের শেষ দিন অবধি চুক্তিটি পালন কর (৯:৪)।" তাই চুক্তির অবশ্য পালনীয় মৌলিক প্রকৃতি "আকদের" অন্তর্নিহিত অবস্থা প্রকাশ করে। সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাই একথা স্বীকার করে নিয়েছেন। ইসলাম ইমামকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির ব্যাপারে সব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শত্রুপক্ষের আক্রমণ আসন্ন হয়ে পড়লে বা তারা চুক্তি অমান্য করলে বা চুক্তিটি নাকচ করে দিলে অবশ্য চুক্তির ধারাগুলো পালন না করলেও চলবে। অবশ্য এ অবস্থায় চুক্তির পরিসমাপ্তির কথা তাদের জানিয়ে দিতে হবে।

মুসলিম চুক্তির বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করার পূর্বে বিশেষভাবে নির্বাচিত বা প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধি-চুক্তির বিবরণ বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তি পত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রত্যেকটি সন্ধির বিস্তারিত ইতিহাস বয়ান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধিপত্রের মূল দলিল ও তার সাধারণ পটভূমি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হবে।

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম সন্ধি-চুক্তি

আল-কোরআন থেকে যেমন চুক্তি পালনের নীতি এসেছে, তেমনি হযরতের কার্যধারাও কতকগুলো দিক-নির্দেশক বিধি-ব্যবস্থার পত্তন করেছে। এগুলোর ভিত্তিতেই মুসলিম ও অমুসলিম কর্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিবেশন পরিপ্রেক্ষিতে হযরত (সঃ) বিভিন্ন ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। তাঁর খলিফাগণ এগুলো আদর্শ চুক্তি হিসেবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি (যা পরে মদিনার ইহুদীরা মেনে নেন এবং এটা মদিনার অধিবাসীদের পক্ষে সনদের কাজ করে) থেকে শুরু করে হুদায়বিয়ার সন্ধি (যা মদিনার মুসলিম ও মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে অস্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করে) পর্যন্ত তিনি নানা ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইহুদী ও খৃস্টানদেরও সনদ প্রদান করেন। ফলে তারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করেন।

হিজরতের পর মদিনার গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করাই ছিল হযরতের প্রথম সন্ধির উদ্দেশ্য। ইবনে হিশামের "সিরাতে” এর মূল দলিলটি পাওয়া যায়; ওয়াকিদী'র "মাগাযী" তেও আংশিকভাবে এ সন্ধিচুক্তিটির বিবরণ পাওয়া গেছে। সন্ধিচুক্তিটির দলিলের প্রথম অংশে মদিনার বিভিন্ন গোত্রের-পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর চুক্তিটির পরবর্তী অংশে রয়েছে ইহুদীদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ। চুক্তির তারিখ সম্বন্ধে ইবনে হিশাম কোন কিছুই বলেননি; কিন্তু এটা যে হিজরী ১লা সন থেকে দ্বিতীয় সনের মাঝামাঝি কোন সময়ে সম্পাদিত হয় (খ্রিস্টাব্দ ৬২৩-৬২৪) তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, দ্বিতীয় হিজরীতেই (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকগণ যুদ্ধক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের মোকাবেলা করে।

সন্ধি-চুক্তির সনদের দলিল

আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক) মোহাজের ও আনসারদের নিয়ে ইহুদীদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত সনদটি লিপিবদ্ধ করেন। এই সনদের শর্তের ভিত্তিতে ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ইহুদীগণকে তাদের ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের অবাধ অধিকার দেয়া হয়; আর তাদের নিজেদের সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার এবং এর রক্ষা-কবচেরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে এতে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কতকগুলো বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়। নীচে চুক্তির সনদের বিবরণ দেয় হল:

মুসলিম ও ইহুদীগণ চুক্তিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক জাতি

"পরম করুণাময় ও কৃপানিধান মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। একদিকে কোরেশ বংশীয় ও ইয়াছরিবের (মদিনার) মুমিন মুসলমানগণ এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহ-সংগ্রামী, আর অন্যদিকে মদিনার ইহুদী সম্প্রদায় এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহিত একত্রে যুদ্ধ করে—তাদের সকলের প্রতি এটা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে প্রদত্ত সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সবকিছু হতে স্বতন্ত্রভাবে একটি সমাজ (রাজনৈতিক দিক হতে) গঠন করবে।

"কোরেশ বংশীয় মদিনার বিশ্বাসী মুসলমানগণ এবং অন্য যারা তাদের অনুসরণ করে, তাদের সাথে যোগ দেয় ও তাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে সংগ্রাম করে; এটা হচ্ছে, তাদের সবার প্রতি তাদের নবী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সম্প্রদায় হতে পৃথকভাবে একটি উম্মা (সমাজ) গঠন করবে।

"কোরেশ বংশীয় মোহাজেরগণ একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং বর্তমানে তারা যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই থাকবে। আর তারা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তি-মূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

ইহুদীদের অধিকার

"আউফ বংশীয়গণ পূর্বের মতই একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"সায়দাহ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-হারিস বংশীয়গণ বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"জুসম বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-নজর বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আমর-বিন-আউফ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-নাবিত বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-আ'স বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"বিশ্বাসীগণ তাদের মধ্যে কাউকে চরম ঋণ ভারগ্রস্ত অবস্থায় অথবা পরিবারের দুর্বিষহ চাপে জর্জরিত অবস্থায় একা ফেলে রাখবেন না এবং তারা তাদের আত্মীয়-বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য উদারভাবে ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য দানের সম্ভাব্য যে কোন ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ হতে কখনো বিরত থাকবেন না;

"কোন বিশ্বাসী অপর কোন বিশ্বাসীর আশ্রিত ব্যক্তির (মওলা) সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না; কোন ব্যক্তি যদি ন্যায়নীতি বিগর্হিতভাবে অপরাধ অনুষ্ঠান করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে উৎপীড়ন করে থাকে কিংবা সীমা লঙ্ঘনের অভিপ্রায়ে বা বিশ্বাসীদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শক্তির অভিলাষী হয়ে থাকে, তবে মুমিন বিশ্বাসীগণ অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবেন, এমন কি সে ব্যক্তি যদি তাদের (বিশ্বাসীদের) পুত্রও হয়ে থাকে;

"কোন বিশ্বাসী একজন অবিশ্বাসীর জন্য অপর কোন অবিশ্বাসীকে হত্যা করতে পারবে না; কিংবা তিনি একজন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোন অবিশ্বাসীকে সাহায্য বা সমর্থন করবেন না;

"দীনতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকল বিশ্বাসীর জন্যই (সমভাবে) রয়েছে আল্লাহর (আইনের) নিরাপত্তা। বিশ্বাসীগণ পরস্পরকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবেন। একজন বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে একজন দীনতম বিশ্বাসীকেও রক্ষা করবেন; অন্যান্য জাতি ভিন্ন শুধু বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাহায্যকারী;

"ইহুদীদের মধ্যে যারা আমাদের অনুসরণ করে, তারা সমভাবে আমাদের সমর্থন এবং সর্বপ্রকার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করবে; তাদের প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন কিংবা অন্যায় ব্যবহার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন অভিপ্রায় পোষণ করবো না অথবা তাদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করব না। সবার জন্যই সমভাবে রয়েছে বিশ্বাসীদের শান্তির নিশ্চয়তা;

"বিশ্বাসীগণ সম্মিলিতভাবে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবেন। আল্লাহর পথে যুদ্ধানুষ্ঠানের পরে কোন বিশ্বাসী অপর বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে এবং তাদের মধ্যে ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে মতৈক্য ছাড়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবেন না;

"যে সব যোদ্ধা আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করবে এবং ক্ষীপ্রগতিতে আক্রমণ চালাবেন, তারা একের পর এক অগ্রসর হবেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন আর পরস্পরকে অনুসরণ করবেন;

"আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালনাকালে বিশ্বাসীগণ তাদের রক্তপাতের (কিংবা তাদের প্রতি হামলার) প্রতিশোধ গ্রহণের কাজে তাদের পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা করবেন। একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী নিশ্চয়ই সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পথের নির্দেশ অনুসরণ করবেন;

"কোন মুশরিক مسلمانوں প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কোরেশদের ধন-মাল কিংবা জনবল দিয়ে সাহায্য করতে পারবে না কিংবা তাদের (কোরেশদের) কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না; অথবা কোন বিশ্বাসীকে (কোরেশদের প্রতি আক্রমণে) বাধা দেবে না;

“যে কেউ একজন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তাকে অবশ্যই (হত্যার কার্য-কারণ সম্পর্কে) বিশ্বাসীর ওয়ালীর (অভিভাবক) সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে; এবং অন্যায়ভাবে বিশ্বাসীকে হত্যা করা হলে তার বদলে হত্যাকারীর মৃত্যুর বিধান করতে হবে; নিহত বিশ্বাসীর ওয়ালী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত বিশ্বাসীকে অবশ্যই হত্যাকারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই তাদের জন্য বৈধ হবে না;

"এই চুক্তির দলিলে যা' কিছু লিখিত রয়েছে—যে বিশ্বাসী তা স্বীকার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে (কেয়ামত) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তার পক্ষে কোন অপরাধীকে সাহায্য দান করা কিংবা তাকে আশ্রয় দেয়া বৈধ হবে না। এবং যারা তাকে আশ্রয় ও সাহায্য দান করবে, শেষ বিচারের দিন নিশ্চয়ই তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ (গজব) ও ক্রোধ আপতিত হবে। আর তাঁর (আল্লাহর) অভিসম্পাৎ গ্রহণ করা নিশ্চয়ই উচিত হবে না; কোন বিষয়ে তোমরা ভিন্ন মত পোষণ করলে, তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই তোমরা সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসরণ করবে:

মুসলিম ও ইহুদী একই রাজনৈতিক জাতি

(ক) "যে পর্যন্ত ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে, সে পর্যন্ত তাদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হতে হবে এবং যে পর্যন্ত মুসলমানগণ যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকবেন, সে পর্যন্ত ইহুদীগণও তাদের সাথে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে যাবেন; "আউফ গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে একই (রাজনৈতিক দিক থেকে) জাতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইহুদীদের জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; আর বিশ্বাসীদের জন্যও রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; তাদের মাওয়ালীদের (আশ্রিত বা দাসদের) এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজনেরও এই একই অধিকার থাকবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এই অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা (জালিম ও পাপীগণ) তাদের এবং তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারে না:

(খ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-নাজ্জার গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(গ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-হারিস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ঘ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সায়দাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ঙ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, জুসম গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(চ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আউস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ছ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সালাবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এ অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা তাদের ও তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারবে না; সালাবাহ গোত্র যে সব অধিকার লাভ করেছে, তাদের বংশসম্ভূত জাফনাহ গোত্রও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(জ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-শুতেবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে নিশ্চয়ই ন্যায়নিষ্ঠা ও সদাচরণ থেকে অপরাধের পার্থক্য রয়েছে;

১। সালাহবাহদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের আশ্রিতদেরও (মাওয়ালী) সেই সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের সালাহবাহ গোত্রের অনুরূপই গণ্য করা হবে; এবং

২। ইহুদীদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের অনুগামীদেরও (বিতানা) সে সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের ইহুদীদের অনুরূপই গণ্য করা হবে।

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যবাধকতা

"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমোদন ব্যতীত কোন ইহুদীই (মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে) যোগদান করতে পারবে না;

"কাউকে বৈধভাবে আঘাতের (বা রক্তপাতের) প্রতিশোধ গ্রহণে বাধা দেয়া হবে না; যে কেউ অন্য কাউকে বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা করে, সে তার এবং তার পরিজনদের জীবনের বিনিময়েই এইরূপ করে থাকে। আর যার প্রতি এইরূপ অন্যায় করা হয়েছে, একমাত্র সে (হত্যাকারী) এবং তার পরিবারই তার নিকট দায়ী থাকবে। এবং এইরূপ ঘটনায় যে ব্যক্তি অধিকতর ভাল ব্যবহার করে থাকে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষেই আছেন;

"ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বহন করবে এবং মুসলমানরাও তাদের ব্যয়ভার বহন করবে; এবং এই চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর যারা হামলা করে থাকে, তারা (চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়) তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই নিজেদের পরস্পরকে সাহায্য করবে; এবং তাদের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও কল্যাণবোধ; এবং তারা কখনো কোন অপরাধ কিংবা পাপাচার করবে না; নিশ্চয়ই নির্দোষিতা অপরাধ হতে পৃথক (অর্থাৎ অপরাধীদের সাথে ভিন্ন রকম ব্যবহার করা হবে); আর তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে তারা তাদের দুশমনদের (যারা চুক্তিবদ্ধ মিত্র সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে) ওপর নিশ্চয়ই জয়লাভ করবে; কেউই তার মিত্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কিছু করতে পারবে না; কারণ, নিশ্চয়ই মজলুমের পক্ষেই বিজয় আসবে; এবং যে ব্যক্তি তার মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেনি, সে সাহায্য পাবে;

"যে পর্যন্ত বিশ্বাসীগণ হামলাকারী দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাবে, সে পর্যন্ত ইহুদীগণ তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে এবং বিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হবে;

"মদিনা নগরীর অভ্যন্তর ভাগ (দওফ) এই সনদের অধিকারীদের (চুক্তিবদ্ধ লোকদের) নিকট পবিত্র থাকবে;

"প্রতিবেশীকে আমাদের নিজেদের মতই (স্বয়ং আশ্রয়দাতা প্রতিবেশীর মতই) গণ্য করতে হবে এবং তার প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন করা হবে না কিংবা তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না—যদি না তার পক্ষ থেকে কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা সে কোন অপরাধ করে থাকে। স্ত্রীলোককে তার আত্মীয়-বর্গের সম্মতি ব্যতীত আশ্রয় দেয়া যাবে না;

ইসলামের মৌলিক নীতির সার্বভৌমত্ব

"এই চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে যদি কোন বিষয়ে কোন বিরোধ বা বিভেদের সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে কোন অশুভ পরিণতির আশঙ্কা দেখা দেয় তবে তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আর তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। যে এই চুক্তিপত্রের বিধানগুলো পালনের জন্যে সব চেয়ে বেশী আগ্রহশীল থাকবে এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে এগুলো পালন করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে থাকবেন। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই এই সনদ কার্যকরীকরণে সাহায্য করবেন। (শত্রুভাবাপন্ন) কোরেশগণ এবং তাদের সাহায্যকারী ও সমর্থকদের সাহায্য দান করা চলবে না;

"যারা মদিনা দখলের হুমকি দান করবে, তাদের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ দলগুলো একে অপরকে সাহায্য দান করবে এবং যারা আক্রমণ করবে, (মুসলমান ও ইহুদীগণ) তাদের ওপর অবশ্যই জয়লাভ করবে;

"কোন শান্তিচুক্তি সম্পাদনে ইহুদীদের অংশ গ্রহণের জন্য মুসলমানগণ যদি তাদের প্রতি আহ্বান জানায়, তবে অবশ্যই তাদের তা গ্রহণ করতে হবে; এবং যখন ইহুদীদের পক্ষ থেকে মুসলমানগণকে অনুরূপ আহ্বান জানানো হবে, তখন তাদের জন্যও অনুরূপ কর্তব্য হবে; তবে কেবল ওই সব ব্যক্তি ছাড়া যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জেহাদ (ধর্মের জন্য যুদ্ধ) করে (অর্থাৎ তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে);

"প্রত্যেক দল পূর্বের মতই তাদের পক্ষ হতে তাদের নিজ নিজ অংশ পাবে;

"নিশ্চয়ই আল-আউস গোত্রের ইহুদীগণ, আর তাদের আশ্রিতগণ এবং তারা নিজেরা সদ্ব্যবহার অক্ষুণ্ণ রাখলে এই চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর মতই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ সর্বপ্রকার অধিকার ও মর্যাদা লাভ করবে;

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গেই আছে যে এই চুক্তিপত্রে যা কিছু রয়েছে, তার প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত এবং ন্যায়পরায়ণ; জালিম ও পাপাচারী ব্যতীত কেউই এই চুক্তির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না; এবং এই চুক্তিপত্র জালিম ও পাপাচারীদের জন্য নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা করবে না;

"যারা মদিনা নগরে বসবাস করবে, তাদের যে কেউ যুদ্ধে থাক বা ঘরে অবস্থান করুক, তারা নিরাপদে থাকবে, কেবলমাত্র অত্যাচারী ও পাপাচারীগণ ব্যতীত; তাদের জন্য নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই;

"যারা ধর্মশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে জীবনযাপন করবে এবং এই চুক্তির বিধানসমূহ কার্যকরী করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের আশ্রয় দেবেন ও নিরাপদ রাখবেন। আর নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)।"

এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, এ চুক্তিটি একটি ত্রি-পাক্ষিক চুক্তি। মক্কার বাস্তুচ্যুত মোহাজের, মদিনার আনসার (মোহাজেরদের সাহায্যকারী ও অনুগামীগণ) এবং ইহুদীগণ-এই তিন পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে চুক্তিপত্রের দলিলটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে, এটা কেবলমাত্র একটা সাধারণ মৈত্রীচুক্তি নয়; বস্তুত এর লক্ষ্য ও গুরুত্ব আরো অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর ক্ষেত্র আরো ব্যাপক। চুক্তির প্রথম অংশ হতেই সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌছার প্রয়াসই কেবল এর লক্ষ্য নয়।

প্রকৃতপক্ষে, সংকীর্ণ গোষ্ঠিগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় নৈউ সংস্থার আওতায় মদিনার সকল প্রতিদ্বন্দ্বী আরব গোত্রকে সম্মিলিত করে অবশিষ্ট জন সমষ্টি হতে স্বতন্ত্র একটি জাতি গঠনই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রারম্ভিক গঠনতন্ত্রও বলা যেতে পারে। বস্তুতঃ এরই ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবদের জীবন-প্রবাহের গোটা স্নায়ুকেন্দ্রকে তথা তাদের দৃষ্টিসীমাকে সামগ্রিকভাবে একটি নয়া ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত করে একটি সম্মিলিত সমাজসংস্থার সমস্ত বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সংকীর্ণ গোষ্ঠিকেন্দ্রিক আনুগত্যের বিলোপ সাধনে ব্রতী হন।

চুক্তির দ্বিতীয় অংশ হতে বোঝা যায় যে, আরব গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি পক্ষ ও ইহুদী গোত্রগুলোকে নিয়ে অপর একটি পক্ষ গঠিত হয় এবং অতঃপর উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়। বিশ্বাসীদের নিয়ে প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের সমন্বয়ে একটি জাতি গঠিত হয়; কিন্তু এককভাবে সমস্ত ইহুদী গোত্রের সমবায়ে কোন স্বতন্ত্র জাতি গঠন করা হয়নি। তবে স্বতন্ত্রভাবে আশ্রিত ও অনুগামীগণসহ প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের স্বকীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার সংরক্ষিত হয়।

চুক্তির এই অংশের প্রকৃতি হতে বোঝা যায় যে, মদিনাকে কেন্দ্র করে আরব ও ইহুদী গোত্রসমূহের সমবায়ে একটা কনফেডারেশন গঠিত হয়েছে। এই কনফেডারেশনের অংশ হিসেবে মদিনা অগ্রবর্তী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ব্যাপক প্রাধান্য বিস্তার করে। এই চুক্তির ফলেই কনফেডারেশনের সমস্ত দল বা গোত্রের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একটা ঐক্যগত সমঝোতা বা পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়। যদি কোন সময় কোন একটি ইহুদী গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ত, তখন এই সম্পর্ক বিশেষ সহায়ক হত।

হুদায়বিয়ার সন্ধি

বদরের যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে মক্কাবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন (খ্রিস্টাব্দ ৬২৪-৩০) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মর্যাদা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে তিনি মদিনার আশেপাশের গোত্রগুলোকে ইসলামের রাষ্টীয় কর্তৃত্বাধীনে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস পান। ইবনে হিশামের ভাষায়, বদরের সামরিক সাফল্যের পর হযরত প্রকৃতপক্ষে হেজাযের একচ্ছত্র শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ওহুদের যুদ্ধের (খ্রিস্টাব্দ ৬২৫) নগণ্য পরাজয় তাঁর ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কারণ, কিছুকাল পরেই খন্দকের যুদ্ধে (খ্রিস্টাব্দ ৬২৭) তিনি আবার এক সুদূরপ্রসারী সাফল্য লাভ করেন।

ঠিক এই সময়েই ইহুদীদের নাযীর গোত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে তাদের সাথে সম্পাদিত মৈত্রীচুক্তি বাতিল হয়ে যায়। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, ইহুদীগণ (নাযীর গোত্র) কর্তৃক হযরতের জীবননাশের ষড়যন্ত্রই এই চুক্তি বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ। অবশ্য চক্রান্তকারী বানু নাযীর ছাড়া চুক্তির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ইহুদী গোত্রের সঙ্গে হযরত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখেন। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়ার জন্যে হযরত বানু নাযীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। কিন্তু এর পরও কিছুকাল ইহুদীদের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটেনি; কারণ, অবশিষ্ট ইহুদীগণ বিশেষ করে স্ব-ধর্মাবলম্বী বানু নাযীরের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল কোরায়জা গোত্রও এই সময় হযরতের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মদিনার مسلمانوں সঙ্গে (ইহুদীদের) মৈত্রীচুক্তির ফলে ইহুদীদের এই শত্রুতার অবসান ঘটে।

হযরত প্রথমতঃ তাঁর পরম শত্রু কোরেশদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে মক্কা বিজয়ের দ্বারা তাঁর জীবনের সাফল্যকে পূণাঙ্গ রূপ দান করেন। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, মক্কায় হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হযরত কোরেশদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌছেন। হজব্রত পালন এই সমঝোতায় পৌঁছানোর আশু কারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে তখন উভয়পক্ষের অবস্থা থেকে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, অন্ততঃ সাময়িকভাবে হলেও তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। কোরেশদের অবস্থা তখনো এমন পর্যায়ে ছিল যে, মদিনার শাসন-কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাদের পরাভূত করা সহজ-সাধ্য ছিল না বিশেষ করে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে। অন্যদিকে মক্কাবাসীগণ বদর ও খন্দকের যুদ্ধে উপর্যুাপরি দু'বার مسلمانوں হাতে চরমভাবে পরাজিত হয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সিরিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর ফলে কোরেশদের বাণিজ্য-কাফেলা প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় অন্ততঃ স্বল্পকালের জন্যে হলেও উভয়পক্ষ একটা শান্তিচুক্তির জন্য বিশেষভাবে আগ্রহশীল হয়ে ওঠে। যে ঘটনাবলী শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তা হচ্ছে সংক্ষেপে এইঃ

রাসূল তাঁর মুষ্টিমেয় সংখ্যক অনুগামী নিয়ে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কোরেশগণ হযরতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আশঙ্কা ও সন্দেহ পোষণ করে পথিমধ্যেই তাঁকে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় হযরত কোরেশদের নিকট শান্তির প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত করেন। এতদানুযায়ী তিনি তাঁর জামাতা ও ভাবী তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানকে তাঁর শান্তি প্রস্তাবসহ কোরেশদের নিকট প্রেরণ করেন। মক্কাবাসীগণ এ প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং হযরতের সঙ্গে শান্তিচুক্তির শর্তাদি সম্পর্কে আলোচনার জন্যে সুহাইল ইবনে-আমরকে প্রেরণ করে। এই আলাপ-আলোচনার ফলেই 'হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি' নামে অভিহিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। হযরত রাসূলের চাচাতো ভাই ও ভাবী চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে-আবু তালেব চুক্তির দলিল লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সম্পাদকের কাজ করেন।

নীচে চুক্তিটির বিবরণ দেয়া হল:

"হে আল্লাহ্! তোমার নামে শুরু করছি। এ চুক্তিটি মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ শান্তি পূর্ণভাবে সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে একমত হয়ে সম্পাদন করেছেন;

"তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে একমত হয়ে দশ বছর কালের জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিয়েছেন; পরস্পরের আক্রমণ থেকে (উভয়পক্ষের) জনসাধারণ নিরাপদ থাকবে;

"কোরেশদের কোন লোক তার ওয়ালীর (অভিভাবক) অনুমতি ছাড়া মুহাম্মদের (সঃ) দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে তাদের (কোরেশদের) কাছে প্রত্যার্পণ করতে হবে; কিন্তু মুহাম্মদের (স:) কোন অনুগামী কোরেশদের দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে কোনরূপ বাধা দেয়া হবে না;

"আমাদের উভয় দলের পক্ষেই অসদাচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ নিষিদ্ধ; এবং আমাদের মধ্যে স্বপক্ষ ত্যাগ ও বিশ্বাসঘাতকতার কোনরূপ অপরাধ অনুষ্ঠিত হতে পারবে না;

"যারা (যেসব লোক) মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাঁর চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারা অবাধে তা' করতে পারবে; এবং যারা কোরেশদের সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাদের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারাও অবাধে তা' করতে পারবে।"

এই চুক্তির ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সদিচ্ছা সম্পর্কে মক্কাবাসীদের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য কয়েকজন সাক্ষী উপস্থিত করেন। এঁরা চুক্তির শর্তসমূহ পালন ও অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ করেন। এই সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বকর, উমর ইবনে আল-খাত্তাব ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ। এই চুক্তির ফলে ইসলামের আরেকটি বিরাট বিজয় সূচীত হয়। কারণ, এই চুক্তির মাধ্যমেই অবশেষে অভিজাত কোরেশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শাসন-কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং গৌণভাবে হলেও ইসলামকে মদিনার রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। এতে মক্কায় হযরতের মর্যাদা সমুন্নত হয় এবং সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। অথচ মদিনায় হিজরতের পূর্বে এক সময়ে এই মক্কাতেই তাঁকে অকথ্য লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল।

হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এই রীতির অনুবর্তন হয় যে, মুসলিম কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী মেয়াদের ভিত্তিতে মুশরিকদের (অংশীবাদী) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন। এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে আইনবিদদের মধ্যে অবশ্য মত-বিরোধ রয়েছে। কোন কোন আইনবিদ হুদায়বিয়ার চুক্তির অনুরূপ দশ বছরের মেয়াদ অনুমোদন করেছেন। আবার কেউ বা দু-তিন বছরের মেয়াদের কথা বলেছেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এসব চুক্তি দু-তিন বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। অবশ্য আইনবিদগণ এ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, শত্রুদের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল স্বার্থের পরিপন্থী নয়।

হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তিও কার্যতঃ দু' বছরের মধ্যেই লঙ্ঘন করা হয়। ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, مسلمانوں ওপর কোরেশদের অবৈধ আক্রমণের ফলেই চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়। চুক্তির বিধানে "যারা মুহাম্মদের (সঃ) দলে এবং তাঁর মৈত্রীতে যোগদান করতে চাইবে, তারা অবাধে তা' করতে পারবে" বলে যে স্বীকৃত শর্তটি রয়েছে, এ হামলার দ্বারা কোরেশগণ সরাসরি তা লঙ্ঘন করে। এরপরও অবিশ্যি কোরেশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ-আলোচনা চালান হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সময় কোরেশদের তুলনায় মুসলমানগণ অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে; ঠিক এই অবস্থায় مسلمانوں ওপর একটা অন্যায় হামলা দ্বারা তারা একটা বৃহত্তর শক্তি পরীক্ষাকে আসন্ন করে তোলে। নিজের অনুগামীদের ওপর কোরেশদের এই অহেতুক আক্রমণে হযরত (সঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু তবুও তিনি তাদের সঙ্গে একটা আপোষ রফার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে মুসলমানগণ মক্কা অভিমুখে সামরিক অভিযান পরিচালনার সংকল্প করেন। হিজরী ৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩০) তাঁরা মক্কা দখল করেন। এই সময় কোরেশগণ অত্যন্ত হীনবল ও শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা নব বলে উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনীর গতিরোধ করতে কিংবা তাদের সাথে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহস পেল না। হযরত (সঃ) তাঁর বিজয়পতাকা হস্তে মুক্ত তোরণ দ্বার দিয়ে অবাধে পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করলেন।

মক্কা বিজয়ের ফলে দুই নগর-রাষ্ট্রের বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটে। আর এর ফলে সমগ্র হেজাযে ইসলামের সুদৃঢ় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এরপর হযরতের (সঃ) মিশন এক বিস্তৃততর লক্ষ্যপানে সম্প্রসারিত হয়।

রাষ্ট্রীয় সনদ হিসেবে জিম্মী-চুক্তির স্থান

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরো এক ধরনের কতকগুলো চুক্তি সম্পাদন করেন। এগুলো পূর্বোক্ত চুক্তিগুলো হতে একটু আলাদা ধরনের। আরবের কেতাবী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিও এর মধ্যে রয়েছে। এসব চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ কেতাবীদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং অবাধভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত হয়। অবিশ্যি, তারা যতদিন চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলবেন, ততদিনই এই নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এই চুক্তিগুলোর আইনগত প্রকৃতি সম্পর্কে এ বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে (সপ্তদশ পরিচ্ছেদ)। এই পরিচ্ছেদে এ চুক্তিগুলোর কাঠামো ও পদ্ধতি এবং অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। জেরুজালেমের প্রধান খৃস্টান বিশপ দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর-বিন-আল-খাত্তাবের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেন, এ শ্রেণীর চুক্তির ক্ষেত্রে তার চাইতে উৎকৃষ্টতর নজির আর পাওয়া যায় না। এ চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে প্রধান বিশপ দাবী করেন যে, এই চুক্তির দলিলে স্বয়ং খলিফাকেই স্বাক্ষর দান করতে হবে, তাঁর কোন প্রতিনিধির স্বাক্ষর হলে চলবে না। হিরা ও দামেস্কের শান্তিচুক্তির দলিলে কিন্তু খলিফার প্রতিনিধিগণই স্বাক্ষর দান করেন। হযরত উমর প্রধান বিশপের দাবীতে সম্মত হন এবং চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দানের জনে। জেরুজালেম গমন করেন। হিজরী ১৭ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩৮) এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। নীচে চুক্তির শর্তগুলোর বিবরণ দেয়া হল :

"পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি।

"আমীরুল মুমেনীন (বিশ্বাসীদের নেতা) আবদুল্লাহ উমর ইলিয়ার (জেরুজালেম) অধিবাসীগণকে এগুলো (এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিধি-ব্যবস্থা ও অধিকারসমূহ) মঞ্জুর করেছেন;

"তিনি তাদের জীবন, ধনসম্পদ, গীর্জা ও ক্রস (যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান) রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন:

"তাদের গীর্জায় কেউ (কোন বিদেশী) বাস করতে পারবে ন, কিন্তু কে এব (পার্জার) কোনরূপ ক্ষতি বা ধ্বংস সবন করা যাবে না। আর তাদের এস কি তাদের

"তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের (ধর্মীয় বিধি-ব্যবস্থা বা আচার-অনুষ্ঠান) জন্য তাদের ওপর কোনরূপ জোর জবরদস্তি করা চলবে না, কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার জুলুম বা উৎপীড়ন চলবে না;

"ইলিয়া নগরে (জেরুজালেমে) তাদের সঙ্গে ইহুদীদের বসবাসের অনুমতি দেয়া যাবে না;

"মাদাইনের (সাবেক পারস্যের রাজধানী) অধিবাসীদের মত সমানুপাতে ইলিয়ার অধিবাসীদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে;

"ইলিয়ার অধিবাসীগণকে রুম (রোমান বা বাইজান্টীয়) ও তস্করদের নগর ছেড়ে যেতে দিতে হবে। যদি তারা (রোমানগণ) নগর ছেড়ে যায়, তবে তাদের স্বদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। অবশ্য যে সব বাইজান্টীয় নগরে বসবাস করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে; তবে জিযিয়ার ব্যাপারে ইলিয়াবাসীদের অনুরূপ শর্তে তাদেরও স্বীকৃত হতে হবে;

"ইলিয়ার অধিবাসীদের মধ্য হতে যে সব লোক বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তারা তাদের গীর্জা ও ক্রস পরিত্যাগ করে গেলে তাদের জীবন এবং ধনসম্পদের নিরপত্তা-বিধান করা হবে;

"কৃষিভূমির যে সব লোক (কৃষক) পূর্ব থেকেই এই নগরে (ইলিয়ায়) বসবাস করে আসছিল, তারা এখানে অবস্থান করতে চাইলে তাদের সে অধিকার দেয়া হবে, তবে নগরে অন্যান্য অধিবাসীদের মত তাদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে। তবে যারা বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে যেতে চায়, তারা (অবাধে) তা' পারবে; আর যারা সাময়িকভাবে জনপদে (তাদের ভূমিতে) তাদের লোকদের কাছে যেতে চায়, ফসল তোলার মওসুম পর্যন্ত তারা তথায় যেতে বা অবস্থান করতে পারবে;

"নগরের বাসিন্দাদের জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে এই চুক্তির দলিলে (এই দলিলে প্রদত্ত শর্তসমূহ অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে) আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, খলিফাগণ ও বিশ্বাসীদের (পক্ষ হতে) প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হল।

"সাক্ষীগণ : খালিদ ইবনে আল-ওয়ালীদ, আমর ইবনে আল-আস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান।

"হিজরী ১৫ সালে এই চুক্তির দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়।"

প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী সাধারণ মাথা-গণতি কর হিসেবে কেতাবীদের যেমন নিয়মিতভাবে জিযিয়া প্রদান করতে হত, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক জিম্মী হিসেবে তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণকর বিধিব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ সমন্বিত অধিকারের আইনানুগ রাষ্ট্রীয় সনদও ছিল। অন্যান্য চুক্তির মত জিম্মী অধিকার সংরক্ষণের এই সনদটিও যথারীতি আলাপ-আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়। তবে বিশেষভাবে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এ চুক্তিটির পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, এ চুক্তিটি স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; কারণ, চুক্তির কোন পক্ষের কোন লোক কর্তৃক এর শর্তাদি লঙ্ঘিত হলেও অপরপক্ষের ওপর শর্তের বাধ্যবাধকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়তঃ, চুক্তিটি প্রযুক্ত বা বলবৎ হওয়ার সময় থেকেই কেতাবীগণ খেলাফতের (দারুল ইসলামের) নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে। গোড়ার দিকে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো দুই স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলেও শেষ পর্যন্ত কেতাবী সম্প্রদায়গুলো (জিম্মীগণ) ইসলামী জাতীয়তার আওতায় শামিল হলে চুক্তির প্রকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়। অবিশ্যি, ইসলামী জাতীয়তার অঙ্গীভূত হলেও অনেকাংশই এই সম্প্রদায়সমূহের স্বায়ত্বশাসনাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আইনবিদগণ ইসলামের সঙ্গে জিম্মীদের সম্পর্কের বিষয় সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থাকে শরিয়তের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। ফলে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো (জিম্মী সম্বন্ধীয় চুক্তি) রাষ্ট্রীয় শাসন-সংবিধানের মর্যাদা লাভ করে। জিম্মীদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো পরবর্তীকালে 'উমরের সনদ' বলে অভিহিত হয়।

খলিফাদের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহ

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিসমূহকে পরবর্তীকালে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণ (খলিফাগণ) অবিচলিত নিষ্ঠার সাথে এ আদর্শ অনুসরণ করে গেছেন। আইনগত প্রকৃতির দিক থেকে এমন কি কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর সাথে খলিফাগণ কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।

পরবর্তীকালে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য এবং পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ায় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের তাগিদে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ধর্মীয় উদ্দেশ্য-প্রধান চুক্তিগুলো হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক শ্রেণীর নয়া চুক্তির সৃষ্টি হল। উমাইয়া শাসন আমলে খলিফা ১ম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিক বাইজান্টীয়দের (রোমান) সাথে কতিপয় চুক্তিতে আবদ্ধ হন। সেই সময় মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় বাইজান্টীয় আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। এমতাবস্থায় তাদের আক্রমণ পরিহারের উদ্দেশ্যে তাঁরা শুল্ক দানের শর্তে তাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। মুয়াবিয়া তখনো খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেননি। খেলাফত নিয়ে তিনি তখনো হযরত আলীর সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো শর্তে তিনি বাইজান্টীয় সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্স-এর সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিজের কর্তৃত্ববলে মুয়াবিয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি সম্রাটকে শুল্ক দিতে স্বীকৃত হন। ইরাকের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকাকালে অন্যতম উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকও (হিজরী ৬৫-৮৬; খ্রিস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। আইনবিদগণ অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের ব্যাপারে ইমামের কার্যের বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। আল-আউযায়ী (মৃত্যু: হিজরী ১৫৭; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৩) ও সুফিয়ান আস-সাউরী (মৃত্যু হিজরী ১৬১; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৭) এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, প্রয়োজনের তাগিদে অনুরূপ শুল্ক প্রদান দোষাবহ নয়। এঁরা উভয়েই উমাইয়া আমলের লোক ছিলেন। তবে মুসলিম শক্তির গৌরবময় যুগের আইনবিদ ইমাম শাফেয়ী এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। হানাফী আইনবিদগণও অনিবার্য কারণ ব্যতীত (অর্থাৎ অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া) অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। তবে অধিকাংশ আইনবিদই বার্ষিক শুল্ক দানের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন; অবশ্য বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প কালের জন্য অনুরূপ শুল্ক প্রদান করা যেতে পারে বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেবলমাত্র চরমপন্থী আইনবিদ আল-লুলু যে কোন পরিস্থিতেই হোক না কেন, শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। এমন কি শক্তির দিক থেকে مسلمانوں অবস্থা দুর্বল বলে মনে করলেও শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের পরিবর্তে ইমামের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত বলে তিনি রায় দেন।

আব্বাসীয় আমলে খলিফাগণ নানাবিধ কারণে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। প্রথমতঃ, উপর্যুপরি সীমান্ত লঙ্ঘন বন্ধের জন্যে উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। কারণ, আব্বাসীয়-বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রাকৃতিক আড়ালের স্বল্পতা হেতু উভয়পক্ষ প্রায়ই জবরদস্তিমূলক পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করত। আব্বাসীয় বংশের শাসন আমলের প্রথম দিকে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী বাইজান্টীয় সম্রাটগণ বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে বার্ষিক শুল্ক দিতে বাধ্য হন। এ ভাবেই বাইজান্টীয় সম্রাজ্ঞী ইরিন (মৃত্যু খ্রিস্টাব্দ ৮০২) খলিফা হারুনুর রশীদকে শুল্ক দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে বার বার হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। সম্রাট নিসিফোরসের রাজ্যভিষেক পর্যন্ত এই চুক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু নিসিফোরস সাম্রাজ্যিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত সমস্ত শুল্ক ফেরত চেয়ে বাগদাদে একটি অবমাননাকর পত্র প্রেরণ করেন। খলিফা হারুন এতে খুব ক্রুদ্ধ হন এবং নিসিফোরসকে সমুচিত জওয়াব দানের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে, নিসিফোরস বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে পুনরায় নতুনভাবে শুল্ক প্রদান করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরে বাগদাদের খলিফাদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ক্ষীয়মাণ হয়ে আসলে কন্সট্যানটিনোপলের (বাইজান্টীয়) সম্রাটগণ তাঁদের শুল্ক দান বন্ধ করে দেন; এমন কি তাঁরা তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সীমান্তের ওপরও হানা দিতে শুরু করেন। মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ক্রুডেস যুদ্ধের নায়ক রাজন্যবর্গের সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি সম্পাদিত হয়। আঞ্চলিক খণ্ড সংঘর্ষের অবসান, অবাধভাবে সাধারণ লোকদের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল বা পরিভ্রমণ, ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শন, হজব্রত পালন প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই এই শ্রেণীর চুক্তি হয়। হজব্রত পালন কিংবা পবিত্র ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ-সুবিধার বিশেষ উদ্দেশ্যে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দীন ও ক্রুসেড নায়ক রিচার্ড কু'র-ডি-লায়নের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে আর এক শ্রেণীর চুক্তিও সম্পাদিত হয়। এগুলো 'ফিদা-চুক্তি' (ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য চুক্তি) নামে অভিহিত। বন্দী বিনিময়ের ভিত্তিতে কিংবা স্বীকৃত অর্থ প্রদান করে যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে বিজয়ী তাঁর রাষ্ট্রীয় তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন। অপরপক্ষে, এর ফলে হাজার হাজার হতভাগ্য যুদ্ধবন্দীর জীবন রক্ষা পেত। এ চুক্তির ব্যবস্থা না থাকলে হয় এরা নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করত কিংবা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

উমাইয়া আমলে ফিদা-চুক্তির কোন উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বন্দী বিনিময় করার রেওয়াজ তখনো ছিল। আরব ইতিহাসকারদের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, চুক্তির মাধ্যমে সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে ফিদা-চুক্তি খলিফা হারুনুর রশীদের আমলেই প্রথম প্রবর্তিত হয়। হিজরী ১৮১ সালে হারুন চুক্তিটি সম্পাদন করেন। এর ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭শ' মুসলিম বন্দী মুক্তিলাভ করে। ইতিহাসবেত্তা আল-মাসুদী বলেন যে, খলিফা হারুনের আমল থেকে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত অনুরূপ মোট ১২টি ফিদা-চুক্তি সম্পাদিত হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানাদির পর বন্দীদের মুক্তিদান কার্য সম্পন্ন হত। উভয়পক্ষই এই উপলক্ষে নানাবিধ আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করতেন।

চুক্তির শর্তাদি কার্যকরী করার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিভূ (রাহাইন) বিনিময়েরও ব্যবস্থা সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়। প্রাচীন চীন ও রোমে এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। প্রাচীন রীতিতে এইরূপ বিধান ছিল যে, চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও শর্তাদি যথাযথভাবে কার্যকরী করা হলে প্রতিভূদের নিরুপদ্রবে তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে দেয়া হত। আর যদি কোন কারণে চুক্তি লঙ্ঘন করা হত, প্রতিভূদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হত এবং অনেক সময় তাদের উৎপীড়ন ও দুর্দশাও ভোগ করতে হত। কিন্তু মুসলমানগণ প্রতিভূদের নিজেদের আমানত হিসেবে মনে করতেন এবং তাদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তা দান করতেন। প্রতিভূদের সঙ্গে তাঁরা ন্যায়বিচার ও সহৃদয় ব্যবহার করতেন। চুক্তিভঙ্গ হলে এবং যুদ্ধ ঘোষিত হলে মুসলমানগণ প্রতিভূদের তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ না বাধলে প্রতিভূদের হয় আগের মতই নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখা হত কিংবা তাদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হত।

চুক্তিগুলোর সাধারণ প্রকৃতি

মুসলমানদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনার ভিত্তিতে সংক্ষেপে নিম্নোক্ত পর্যায়ে এ সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ ধারণায় পৌঁছা যেতে পারে:

প্রথমতঃ, মুসলিম-চুক্তিগুলো মোটের ওপর সংক্ষিপ্ত ও সাধারণভাবে একই প্রকৃতির। তাছাড়া, চুক্তির শর্তাদির প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কেও কোন বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি। অনেক সময় অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ততার দরুন বিষয়বস্তু ও শব্দবিন্যাস অস্পষ্ট থেকে গেছে।

দ্বিতীয়তঃ, প্রত্যেক চুক্তির ভূমিকায় সাধারণভাবে বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) কথাটি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের নামের তালিকা ও পদবীর উল্লেখ থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজে যে চুক্তিগুলো সম্পাদন করে গেছেন, তাতেও অনুরূপভাবে 'আল্লাহ'র রাসূল' কথাটির সাধারণ উল্লেখ দেখা যায়। একমাত্র হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তিটিতে (কোরেশদের অনিচ্ছার জন্য) এর উল্লেখ ছিল না। হযরতের উত্তরাধিকারী খলিফাগণ যে সব চুক্তি সম্পাদন করেছেন, তাতে তাঁদের উপাধি 'খলিফা' বা 'আমিরুল মুমেনীন' কথাটি সাধারণভাবে উল্লিখিত হয়েছে।

সাধারণতঃ, সাক্ষীদের নামোল্লেখ করে চুক্তির সম্পাদন-কার্য সমাপ্ত করা হয়। চুক্তির বিষয়বস্তুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার সময় এই সব সাক্ষী উপস্থিত থাকতেন।

তৃতীয়তঃ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধির মূল বিষয়বস্তুর পরিবর্তন বা বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগের সন্ধি চুক্তিগুলো ছিল প্রধানতঃ ধর্মীয় উদ্দেশ্যভিত্তিক; আর পরবর্তী খলিফাগণ কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিগুলো ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যভিত্তিক। মুসলিম আইনবিদগণ অবশ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী চুক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। এ ব্যাপারে চুক্তির বিষয়বস্তুর পক্ষগুলোর সাথে মুসলিম কর্তৃপক্ষের কিরূপ সম্পর্ক রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে স্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে: আর দারুল হারবের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে অস্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে। সাময়িকভাবে জেহাদ স্থগিত রাখার ভিত্তিতেই হারবীদের সাথে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করা হত।

চতুর্থতঃ, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ নির্ধারিত করে দেন। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের আইনবিদগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শত্রুর সাথে সম্পাদিত কোন শান্তিচুক্তির মেয়াদ দশ বছরের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির মেয়াদের নজিরকেই তাঁরা এ যুক্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির শর্তে চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ দশ বছর নির্ধারিত হয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত (অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত) স্থায়ী হয়নি-তার চেয়েও অনেক কম সময় (তিন-চার বছর) স্থায়ী হয়। সুতরাং, অনুরূপ ভিত্তিতে তাঁরা এই শ্রেণীর চুক্তির মেয়াদ তিন-চার বছরের বেশী বাড়ানোর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির মেয়াদ দশ বছর দশ মাস কিংবা দশ বছর এগারো মাস কাল (বারো মাস পর্যন্ত নয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়।

জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এই চুক্তিগুলোকে কেবল স্থায়ীভিত্তিক বলেই গণ্য করা হত না, বস্তুত, দুই পক্ষের মধ্যে এ গুলোকে সংযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে মনে করা হত। প্রকৃতপক্ষে, জিম্মী চুক্তি রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটা আইনানুগ সনদ হিসেবে কার্যকরী ছিল। এ চুক্তি কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিম্মীগণ মুসলিম রাষ্ট্রের একটা অবিভাজ্য অংশ হিসেবে তাদের যাবতীয় সামাজিক ও আইনগত অধিকার ভোগ করত।

শেষতঃ, মুসলিম শাসকগণ তাঁদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিগত সমঝোতার বাধ্যবাধকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে গণ্য করতেন এবং সতর্কতার সাথে এগুলো পালন করতেন। অবশ্য, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে মুসলমানদের খুব বেশী উৎসাহিত করতেন না; তবে একবার চুক্তি সম্পন্ন হলে যাতে এর মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে চুক্তির বিধান ও শর্তাদি পালিত হয়, তার প্রতি তাঁরা সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

সন্ধিচুক্তির পরিসমাপ্তি

মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে সন্ধি কথাটির বিশেষ প্রকৃতি হতেই বোঝা যায় যে, এর ভিত্তি অস্থায়ী। মুসলিম আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুসারে মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক সামরিক শান্তিভিত্তিক নয়। আইনের বিধান অনুযায়ী জেহাদ দশ বছরের অধিক কাল স্থগিত রাখা চলে না; সুতরাং, এই সময় উত্তীর্ণ হলেই সন্ধি চুক্তিসমূহের কার্যকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্য কথায়, চুক্তির মেয়াদ দশ বছরের বেশী হতে পারে না। এমন কি চুক্তিতে মেয়াদের কথা না থাকলেও দশ বছর উত্তীর্ণ হলেই স্বাভাবিকভাবেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। অবশ্য, আইনবিদগণ ইমামকে চুক্তির অস্থায়ী রূপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার জন্য চুক্তির দলিলে এর কার্যকালের মেয়াদের উল্লেখ করতে বলেছেন।

ইসলামের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি যাতে সম্পাদন করা না হয়, সে সম্পর্কেও ইমামকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি যদি এমন চুক্তি সম্পাদন করেন, যাতে তিনি শত্রুপক্ষের নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছেন, তবে সে চুক্তি 'ফাসিদ' (অনিয়মিত বা বিধিবহির্ভূত) বলে গণ্য হবে। বিধিসম্মত করার জন্য এ চুক্তিকে হয় সংশোধন করতে হবে, অথবা এর সমাপ্তি ঘটেছে বলে ঘোষণা করতে হবে।

ইমাম যদি এমন শর্তসমন্বিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা পালন করা তাঁর পক্ষে সাধ্যাতীত কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। এমন কি, চুক্তিটি বিধিসম্মত হলেও ইমাম যদি এর শর্তাদিকে ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বুঝতে পারেন, তবে তিনি এর পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন। অবশ্য, মুসলমানরা যে চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চান, একথা পূর্বাহ্নেই উল্লেখযোগ্য সময়ের মধ্যে অপরপক্ষকে জানিয়ে দিতে হবে।

পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে ইমাম এমন কোন শর্তে সম্মত হতে পারবেন না, যাতে চুক্তির দুই পক্ষের মধ্যে যে কোন এক পক্ষকে চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা দেয়া হয়; এমন কি, ইমামকে এই ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি এইরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবেন না। কেননা, চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতি যেমন মূলভিত্তির কাজ করে, তেমনি চুক্তি পরিসমাপ্তির ব্যাপারেও তাকে অবশ্যই মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

জিম্মীর সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে স্থায়ী প্রকৃতির; সুতরাং এগুলো কখনো বাতিল বা পরিসমাপ্ত হতে পারে না। এমন কি, কিছু সংখ্যক জিম্মী তাদের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলেও অন্য সকল জিম্মীর ওপর চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বলবৎ থাকবে। কেননা যে সব কিতাবী সম্প্রদায় মুসলিম শাসনাধীনে বসবাস করতে সম্মত হয়, এ চুক্তিগুলো (জিম্মী চুক্তিগুলো) তাদের প্রতি প্রদত্ত মুসলিম শাসন-কর্তৃপক্ষের শুধু নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিই নয়—বস্তুতঃ, জিম্মীগণ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো রাষ্ট্রীয় শাসনতান্ত্রিক সনদের রূপও পরিগ্রহ করে। এ অবস্থায় কোন জিম্মী তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তাকে সাধারণভাবে শাস্তি ভোগ করতে হয়। তবে আইন অনুসারে তার ওপর প্রযোজ্য বা বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করার অধিকার তার রয়েছে এবং সে ইচ্ছা করলে অবাধে দারুল হারবে হিজরত করতে পারে।

সন্ধি-চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা

ইসলাম ও অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সাধারণ সম্পর্ক বিরোধগত। তবু প্রয়োজনের তাগিদে বিশেষ করে কোন ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রের পরাজয়ের ফলে শত্রু- পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল উদ্দেশ্য বিরোধী নয়। আল্লাহ'র বিধানে অমুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া অনুমোদন করা হয়েছে:

"পবিত্র মসজিদে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, তারা ভিন্ন কি করে তোমরা মুশরিক এবং আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে পার? যে পর্যন্ত তারা সততার সঙ্গে কাজ করে, তোমরাও সততার সাথে চল। যারা খোদা-ভীরু, কেবল তাদেরই আল্লাহ ভালোবাসেন" (৯:৬)।

প্রচলিত ব্যবহার-বিধি আল-কোরআনের এই নির্দেশেরই সমর্থন জানিয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কাবাসীদের সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ চুক্তিটির শর্তাদি ও কার্যকালের মাধ্যমে মুসলিম আইনবিদগণ পরবর্তী যুক্তিগুলোর দিক-নির্দেশ করেছেন। একটি হাদিসে রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ "বাইজান্টীয়গণ তোমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে।" কাজেই আল- কোরআন ও হাদিস অনুসারে আইনবিদগণ এ সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম-স্বার্থ রক্ষিত হলে শত্রু পক্ষের সঙ্গে শান্তি-চুক্তি সম্পাদন করা বিধিসম্মত এবং এ চুক্তির ধারাগুলো পালন করতেও মুসলমানরা বাধ্য থাকবেন। প্রাথমিক খলিফাদের কার্যধারা ও আইনবিদদের সর্বসম্মত অভিমত বা ইজমার ফলে চুক্তি সম্পাদন শরিয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়েছে।

রাসূলে আকরমের (সঃ) হাতেই চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা ছিল এবং পরবর্তীকালে এ ক্ষমতা তাঁর খলিফাদের হাতে গিয়ে বর্তায়। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা প্রায়ই যুদ্ধরত সেনাপতিদের দেয়া হত। শত্রুপক্ষ যদি ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইত, তবে যুদ্ধরত সেনাপতিকে শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেয়া হত। রাসূল (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ ক্ষতিকর চুক্তি বা ব্যবস্থা নাকচ করে দেবার ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতেন। তাঁদের অনুমতি না নিয়ে এসব চুক্তি মুসলিম সমাজে কার্যকরী করা যেত না।

সন্ধির আইনগত প্রকৃতি

সন্ধি ('মুহাদানা' বা 'মুওয়াদা') হল এক রকমের "আকদ" বা বন্ধন; চুক্তিতে কোন একটি বিষয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করার ফলে তার আইনগত ফলাফল প্রত্যক্ষ করা যায়। মুসলিম আইনের 'আকদ' (চুক্তি) পশ্চিমী আইনের চুক্তির (contract) চাইতে অনেক বেশী ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'আকদে'র বাহ্যিক আকার ও পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ঐক্যমত বা মনের মিলকেই মৌলিক জিনিস বলে মনে করা হয়। একদল প্রস্তাব ('ইজাব') করেন আর অপর দল তা গ্রহণ ('কবুল') করেন, ফলে 'মনের সমন্বয়' সম্ভব হয়। চুলচেরা বিচারে এতে পারস্পরিক সুবিধা থাকুক আর নাই থাকুক, আইনের চোখে চুক্তিটি বৈধ ও কার্যকরী বলে সাব্যস্ত হবে।

আইনগ্রন্থ "মাজাল্লা"তে চুক্তির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেঃ "কোন বিষয়ে দুটি দল যখন করণীয় পন্থা স্থির করে তা' পালনের জন্য বাধ্যবাধকতার আওতায় পরস্পরকে আবদ্ধ করে, তার নামই চুক্তি। প্রস্তাব ও সম্মতির সমন্বয়েই এর সৃষ্টি।"

তাই ইসলামে চুক্তি আসলে মতৈক্য ও স্বীকৃতি থেকেই জন্ম নেয়; বিশেষ একটি বাহ্যিক রূপ বা পদ্ধতি পালন করার প্রয়োজন এখানে নেই। চুক্তির ধারাগুলো নির্ধারিত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি উভয়পক্ষের ওপর প্রযোজ্য হয়। চুক্তি লেখা, দস্তখত করা ও তারিখ দেয়া (কোন কোন ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখা) আইনের দিক থেকে অপরিহার্য নয়। শুধু সমঝোতা নির্দেশ করার জন্য এবং চুক্তির শর্ত ও মেয়াদ সম্পর্কীয় দলিল-পত্র রাখবার জন্যই চুক্তিটি লিখিতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হয়।

চুক্তি-সম্পাদন করার সঙ্গে সঙ্গে যাতে করে এর শর্ত ও ধারাগুলো বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিপালিত হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। আল-কোরআনে মুসলিমকে 'ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা রাখবার জন্য' আহ্বান করা হয়েছে (১৬ : ৯৩)। আরও বলা হয়েছে "মেয়াদের শেষ দিন অবধি চুক্তিটি পালন কর (৯:৪)।" তাই চুক্তির অবশ্য পালনীয় মৌলিক প্রকৃতি "আকদের" অন্তর্নিহিত অবস্থা প্রকাশ করে। সব মুসলিম আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাই একথা স্বীকার করে নিয়েছেন। ইসলাম ইমামকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির ব্যাপারে সব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শত্রুপক্ষের আক্রমণ আসন্ন হয়ে পড়লে বা তারা চুক্তি অমান্য করলে বা চুক্তিটি নাকচ করে দিলে অবশ্য চুক্তির ধারাগুলো পালন না করলেও চলবে। অবশ্য এ অবস্থায় চুক্তির পরিসমাপ্তির কথা তাদের জানিয়ে দিতে হবে।

মুসলিম চুক্তির বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করার পূর্বে বিশেষভাবে নির্বাচিত বা প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধি-চুক্তির বিবরণ বিশেষ করে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তি পত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রত্যেকটি সন্ধির বিস্তারিত ইতিহাস বয়ান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক সন্ধিপত্রের মূল দলিল ও তার সাধারণ পটভূমি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হবে।

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম সন্ধি-চুক্তি

আল-কোরআন থেকে যেমন চুক্তি পালনের নীতি এসেছে, তেমনি হযরতের কার্যধারাও কতকগুলো দিক-নির্দেশক বিধি-ব্যবস্থার পত্তন করেছে। এগুলোর ভিত্তিতেই মুসলিম ও অমুসলিম কর্তৃপক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিবেশন পরিপ্রেক্ষিতে হযরত (সঃ) বিভিন্ন ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। তাঁর খলিফাগণ এগুলো আদর্শ চুক্তি হিসেবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি (যা পরে মদিনার ইহুদীরা মেনে নেন এবং এটা মদিনার অধিবাসীদের পক্ষে সনদের কাজ করে) থেকে শুরু করে হুদায়বিয়ার সন্ধি (যা মদিনার মুসলিম ও মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে অস্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করে) পর্যন্ত তিনি নানা ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইহুদী ও খৃস্টানদেরও সনদ প্রদান করেন। ফলে তারা মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকতা লাভ করেন।

হিজরতের পর মদিনার গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করাই ছিল হযরতের প্রথম সন্ধির উদ্দেশ্য। ইবনে হিশামের "সিরাতে” এর মূল দলিলটি পাওয়া যায়; ওয়াকিদী'র "মাগাযী" তেও আংশিকভাবে এ সন্ধিচুক্তিটির বিবরণ পাওয়া গেছে। সন্ধিচুক্তিটির দলিলের প্রথম অংশে মদিনার বিভিন্ন গোত্রের-পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর চুক্তিটির পরবর্তী অংশে রয়েছে ইহুদীদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিবরণ। চুক্তির তারিখ সম্বন্ধে ইবনে হিশাম কোন কিছুই বলেননি; কিন্তু এটা যে হিজরী ১লা সন থেকে দ্বিতীয় সনের মাঝামাঝি কোন সময়ে সম্পাদিত হয় (খ্রিস্টাব্দ ৬২৩-৬২৪) তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, দ্বিতীয় হিজরীতেই (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকগণ যুদ্ধক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের মোকাবেলা করে।

সন্ধি-চুক্তির সনদের দলিল

আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক) মোহাজের ও আনসারদের নিয়ে ইহুদীদের সাথে সন্ধির উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত সনদটি লিপিবদ্ধ করেন। এই সনদের শর্তের ভিত্তিতে ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ইহুদীগণকে তাদের ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের অবাধ অধিকার দেয়া হয়; আর তাদের নিজেদের সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার এবং এর রক্ষা-কবচেরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে এতে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের ওপর কতকগুলো বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়। নীচে চুক্তির সনদের বিবরণ দেয় হল:

মুসলিম ও ইহুদীগণ চুক্তিবদ্ধ একটি রাজনৈতিক জাতি

"পরম করুণাময় ও কৃপানিধান মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। একদিকে কোরেশ বংশীয় ও ইয়াছরিবের (মদিনার) মুমিন মুসলমানগণ এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহ-সংগ্রামী, আর অন্যদিকে মদিনার ইহুদী সম্প্রদায় এবং আর যারা তাদের অনুসরণকারী ও তাদের সহিত একত্রে যুদ্ধ করে—তাদের সকলের প্রতি এটা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) পক্ষ হতে প্রদত্ত সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সবকিছু হতে স্বতন্ত্রভাবে একটি সমাজ (রাজনৈতিক দিক হতে) গঠন করবে।

"কোরেশ বংশীয় মদিনার বিশ্বাসী মুসলমানগণ এবং অন্য যারা তাদের অনুসরণ করে, তাদের সাথে যোগ দেয় ও তাদের সাথে সম্মিলিত হয়ে সংগ্রাম করে; এটা হচ্ছে, তাদের সবার প্রতি তাদের নবী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) সনদ। নিশ্চয়ই তারা অন্যান্য সম্প্রদায় হতে পৃথকভাবে একটি উম্মা (সমাজ) গঠন করবে।

"কোরেশ বংশীয় মোহাজেরগণ একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং বর্তমানে তারা যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই থাকবে। আর তারা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তি-মূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

ইহুদীদের অধিকার

"আউফ বংশীয়গণ পূর্বের মতই একই সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বসবাস করবে এবং যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"সায়দাহ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-হারিস বংশীয়গণ বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"জুসম বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-নজর বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আমর-বিন-আউফ বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-নাবিত বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"আল-আ'স বংশীয়গণও বর্তমানের মত একই অবস্থায় থাকবে। আর তাদের প্রত্যেক গোত্রই ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার তাগিদে তাদের স্বগোত্রীয় বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য মুক্তিমূল্য (বা ক্ষতিপূরণ) প্রদান করবে।

"বিশ্বাসীগণ তাদের মধ্যে কাউকে চরম ঋণ ভারগ্রস্ত অবস্থায় অথবা পরিবারের দুর্বিষহ চাপে জর্জরিত অবস্থায় একা ফেলে রাখবেন না এবং তারা তাদের আত্মীয়-বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থার জন্য উদারভাবে ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য দানের সম্ভাব্য যে কোন ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ হতে কখনো বিরত থাকবেন না;

"কোন বিশ্বাসী অপর কোন বিশ্বাসীর আশ্রিত ব্যক্তির (মওলা) সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন না; কোন ব্যক্তি যদি ন্যায়নীতি বিগর্হিতভাবে অপরাধ অনুষ্ঠান করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে উৎপীড়ন করে থাকে কিংবা সীমা লঙ্ঘনের অভিপ্রায়ে বা বিশ্বাসীদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শক্তির অভিলাষী হয়ে থাকে, তবে মুমিন বিশ্বাসীগণ অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবেন, এমন কি সে ব্যক্তি যদি তাদের (বিশ্বাসীদের) পুত্রও হয়ে থাকে;

"কোন বিশ্বাসী একজন অবিশ্বাসীর জন্য অপর কোন অবিশ্বাসীকে হত্যা করতে পারবে না; কিংবা তিনি একজন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে কোন অবিশ্বাসীকে সাহায্য বা সমর্থন করবেন না;

"দীনতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকল বিশ্বাসীর জন্যই (সমভাবে) রয়েছে আল্লাহর (আইনের) নিরাপত্তা। বিশ্বাসীগণ পরস্পরকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবেন। একজন বিশ্বাসী অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে একজন দীনতম বিশ্বাসীকেও রক্ষা করবেন; অন্যান্য জাতি ভিন্ন শুধু বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাহায্যকারী;

"ইহুদীদের মধ্যে যারা আমাদের অনুসরণ করে, তারা সমভাবে আমাদের সমর্থন এবং সর্বপ্রকার আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করবে; তাদের প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন কিংবা অন্যায় ব্যবহার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন অভিপ্রায় পোষণ করবো না অথবা তাদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করব না। সবার জন্যই সমভাবে রয়েছে বিশ্বাসীদের শান্তির নিশ্চয়তা;

"বিশ্বাসীগণ সম্মিলিতভাবে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করবেন। আল্লাহর পথে যুদ্ধানুষ্ঠানের পরে কোন বিশ্বাসী অপর বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে এবং তাদের মধ্যে ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে মতৈক্য ছাড়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবেন না;

"যে সব যোদ্ধা আমাদের পক্ষে যুদ্ধ করবে এবং ক্ষীপ্রগতিতে আক্রমণ চালাবেন, তারা একের পর এক অগ্রসর হবেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন আর পরস্পরকে অনুসরণ করবেন;

"আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালনাকালে বিশ্বাসীগণ তাদের রক্তপাতের (কিংবা তাদের প্রতি হামলার) প্রতিশোধ গ্রহণের কাজে তাদের পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা করবেন। একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী নিশ্চয়ই সর্বোৎকৃষ্ট ও সঠিক পথের নির্দেশ অনুসরণ করবেন;

"কোন মুশরিক مسلمانوں প্রতি শত্রুভাবাপন্ন কোরেশদের ধন-মাল কিংবা জনবল দিয়ে সাহায্য করতে পারবে না কিংবা তাদের (কোরেশদের) কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে সাহায্য করবে না; অথবা কোন বিশ্বাসীকে (কোরেশদের প্রতি আক্রমণে) বাধা দেবে না;

“যে কেউ একজন বিশ্বাসীকে হত্যা করবে, তাকে অবশ্যই (হত্যার কার্য-কারণ সম্পর্কে) বিশ্বাসীর ওয়ালীর (অভিভাবক) সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে; এবং অন্যায়ভাবে বিশ্বাসীকে হত্যা করা হলে তার বদলে হত্যাকারীর মৃত্যুর বিধান করতে হবে; নিহত বিশ্বাসীর ওয়ালী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত বিশ্বাসীকে অবশ্যই হত্যাকারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এবং তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই তাদের জন্য বৈধ হবে না;

"এই চুক্তির দলিলে যা' কিছু লিখিত রয়েছে—যে বিশ্বাসী তা স্বীকার করেছেন এবং যিনি আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনে (কেয়ামত) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তার পক্ষে কোন অপরাধীকে সাহায্য দান করা কিংবা তাকে আশ্রয় দেয়া বৈধ হবে না। এবং যারা তাকে আশ্রয় ও সাহায্য দান করবে, শেষ বিচারের দিন নিশ্চয়ই তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ (গজব) ও ক্রোধ আপতিত হবে। আর তাঁর (আল্লাহর) অভিসম্পাৎ গ্রহণ করা নিশ্চয়ই উচিত হবে না; কোন বিষয়ে তোমরা ভিন্ন মত পোষণ করলে, তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই তোমরা সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসরণ করবে:

মুসলিম ও ইহুদী একই রাজনৈতিক জাতি

(ক) "যে পর্যন্ত ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে, সে পর্যন্ত তাদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হতে হবে এবং যে পর্যন্ত মুসলমানগণ যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকবেন, সে পর্যন্ত ইহুদীগণও তাদের সাথে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে যাবেন; "আউফ গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সাথে একই (রাজনৈতিক দিক থেকে) জাতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইহুদীদের জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; আর বিশ্বাসীদের জন্যও রয়েছে তাদের নিজস্ব ধর্মমত; তাদের মাওয়ালীদের (আশ্রিত বা দাসদের) এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজনেরও এই একই অধিকার থাকবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এই অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা (জালিম ও পাপীগণ) তাদের এবং তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারে না:

(খ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-নাজ্জার গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(গ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-হারিস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ঘ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সায়দাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ঙ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, জুসম গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(চ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আউস গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(ছ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, সালাবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে অপরাধী, জালিম ও পাপাচারী ব্যক্তিগণ এ অধিকার লাভ করবে না; নিশ্চয়ই তারা তাদের ও তাদের পরিজনদের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন ছাড়া অন্য কারো ক্ষতি করতে পারবে না; সালাবাহ গোত্র যে সব অধিকার লাভ করেছে, তাদের বংশসম্ভূত জাফনাহ গোত্রও সে সব অধিকার লাভ করবে;

(জ) আউফ গোত্রের ইহুদীরা যে সব অধিকার লাভ করেছে, আল-শুতেবাহ গোত্রের ইহুদীরাও সে সব অধিকার লাভ করবে; তবে নিশ্চয়ই ন্যায়নিষ্ঠা ও সদাচরণ থেকে অপরাধের পার্থক্য রয়েছে;

১। সালাহবাহদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের আশ্রিতদেরও (মাওয়ালী) সেই সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের সালাহবাহ গোত্রের অনুরূপই গণ্য করা হবে; এবং

২। ইহুদীদের যে সব অধিকার দেয়া হয়েছে, তাদের অনুগামীদেরও (বিতানা) সে সব অধিকার দেয়া হবে; আর তাদের ইহুদীদের অনুরূপই গণ্য করা হবে।

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যবাধকতা

"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমোদন ব্যতীত কোন ইহুদীই (মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে) যোগদান করতে পারবে না;

"কাউকে বৈধভাবে আঘাতের (বা রক্তপাতের) প্রতিশোধ গ্রহণে বাধা দেয়া হবে না; যে কেউ অন্য কাউকে বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা করে, সে তার এবং তার পরিজনদের জীবনের বিনিময়েই এইরূপ করে থাকে। আর যার প্রতি এইরূপ অন্যায় করা হয়েছে, একমাত্র সে (হত্যাকারী) এবং তার পরিবারই তার নিকট দায়ী থাকবে। এবং এইরূপ ঘটনায় যে ব্যক্তি অধিকতর ভাল ব্যবহার করে থাকে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষেই আছেন;

"ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বহন করবে এবং মুসলমানরাও তাদের ব্যয়ভার বহন করবে; এবং এই চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর যারা হামলা করে থাকে, তারা (চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়) তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই নিজেদের পরস্পরকে সাহায্য করবে; এবং তাদের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও কল্যাণবোধ; এবং তারা কখনো কোন অপরাধ কিংবা পাপাচার করবে না; নিশ্চয়ই নির্দোষিতা অপরাধ হতে পৃথক (অর্থাৎ অপরাধীদের সাথে ভিন্ন রকম ব্যবহার করা হবে); আর তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে তারা তাদের দুশমনদের (যারা চুক্তিবদ্ধ মিত্র সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে) ওপর নিশ্চয়ই জয়লাভ করবে; কেউই তার মিত্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কিছু করতে পারবে না; কারণ, নিশ্চয়ই মজলুমের পক্ষেই বিজয় আসবে; এবং যে ব্যক্তি তার মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেনি, সে সাহায্য পাবে;

"যে পর্যন্ত বিশ্বাসীগণ হামলাকারী দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাবে, সে পর্যন্ত ইহুদীগণ তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবে এবং বিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে শরীক হবে;

"মদিনা নগরীর অভ্যন্তর ভাগ (দওফ) এই সনদের অধিকারীদের (চুক্তিবদ্ধ লোকদের) নিকট পবিত্র থাকবে;

"প্রতিবেশীকে আমাদের নিজেদের মতই (স্বয়ং আশ্রয়দাতা প্রতিবেশীর মতই) গণ্য করতে হবে এবং তার প্রতি কোনরূপ উৎপীড়ন করা হবে না কিংবা তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না—যদি না তার পক্ষ থেকে কোন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা সে কোন অপরাধ করে থাকে। স্ত্রীলোককে তার আত্মীয়-বর্গের সম্মতি ব্যতীত আশ্রয় দেয়া যাবে না;

ইসলামের মৌলিক নীতির সার্বভৌমত্ব

"এই চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে যদি কোন বিষয়ে কোন বিরোধ বা বিভেদের সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে কোন অশুভ পরিণতির আশঙ্কা দেখা দেয় তবে তার মীমাংসার জন্য অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আর তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। যে এই চুক্তিপত্রের বিধানগুলো পালনের জন্যে সব চেয়ে বেশী আগ্রহশীল থাকবে এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে এগুলো পালন করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে থাকবেন। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই এই সনদ কার্যকরীকরণে সাহায্য করবেন। (শত্রুভাবাপন্ন) কোরেশগণ এবং তাদের সাহায্যকারী ও সমর্থকদের সাহায্য দান করা চলবে না;

"যারা মদিনা দখলের হুমকি দান করবে, তাদের বিরুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ দলগুলো একে অপরকে সাহায্য দান করবে এবং যারা আক্রমণ করবে, (মুসলমান ও ইহুদীগণ) তাদের ওপর অবশ্যই জয়লাভ করবে;

"কোন শান্তিচুক্তি সম্পাদনে ইহুদীদের অংশ গ্রহণের জন্য মুসলমানগণ যদি তাদের প্রতি আহ্বান জানায়, তবে অবশ্যই তাদের তা গ্রহণ করতে হবে; এবং যখন ইহুদীদের পক্ষ থেকে মুসলমানগণকে অনুরূপ আহ্বান জানানো হবে, তখন তাদের জন্যও অনুরূপ কর্তব্য হবে; তবে কেবল ওই সব ব্যক্তি ছাড়া যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জেহাদ (ধর্মের জন্য যুদ্ধ) করে (অর্থাৎ তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে);

"প্রত্যেক দল পূর্বের মতই তাদের পক্ষ হতে তাদের নিজ নিজ অংশ পাবে;

"নিশ্চয়ই আল-আউস গোত্রের ইহুদীগণ, আর তাদের আশ্রিতগণ এবং তারা নিজেরা সদ্ব্যবহার অক্ষুণ্ণ রাখলে এই চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর মতই চুক্তিতে লিপিবদ্ধ সর্বপ্রকার অধিকার ও মর্যাদা লাভ করবে;

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গেই আছে যে এই চুক্তিপত্রে যা কিছু রয়েছে, তার প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত এবং ন্যায়পরায়ণ; জালিম ও পাপাচারী ব্যতীত কেউই এই চুক্তির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারবে না; এবং এই চুক্তিপত্র জালিম ও পাপাচারীদের জন্য নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা করবে না;

"যারা মদিনা নগরে বসবাস করবে, তাদের যে কেউ যুদ্ধে থাক বা ঘরে অবস্থান করুক, তারা নিরাপদে থাকবে, কেবলমাত্র অত্যাচারী ও পাপাচারীগণ ব্যতীত; তাদের জন্য নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই;

"যারা ধর্মশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে জীবনযাপন করবে এবং এই চুক্তির বিধানসমূহ কার্যকরী করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের আশ্রয় দেবেন ও নিরাপদ রাখবেন। আর নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর রাসূল (তাঁর ওপর আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক)।"

এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, এ চুক্তিটি একটি ত্রি-পাক্ষিক চুক্তি। মক্কার বাস্তুচ্যুত মোহাজের, মদিনার আনসার (মোহাজেরদের সাহায্যকারী ও অনুগামীগণ) এবং ইহুদীগণ-এই তিন পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে চুক্তিপত্রের দলিলটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে, এটা কেবলমাত্র একটা সাধারণ মৈত্রীচুক্তি নয়; বস্তুত এর লক্ষ্য ও গুরুত্ব আরো অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর ক্ষেত্র আরো ব্যাপক। চুক্তির প্রথম অংশ হতেই সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায় যে, বিভিন্ন গোত্র বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌছার প্রয়াসই কেবল এর লক্ষ্য নয়।

প্রকৃতপক্ষে, সংকীর্ণ গোষ্ঠিগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় নৈউ সংস্থার আওতায় মদিনার সকল প্রতিদ্বন্দ্বী আরব গোত্রকে সম্মিলিত করে অবশিষ্ট জন সমষ্টি হতে স্বতন্ত্র একটি জাতি গঠনই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রারম্ভিক গঠনতন্ত্রও বলা যেতে পারে। বস্তুতঃ এরই ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবদের জীবন-প্রবাহের গোটা স্নায়ুকেন্দ্রকে তথা তাদের দৃষ্টিসীমাকে সামগ্রিকভাবে একটি নয়া ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে পরিবর্তিত করে একটি সম্মিলিত সমাজসংস্থার সমস্ত বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সংকীর্ণ গোষ্ঠিকেন্দ্রিক আনুগত্যের বিলোপ সাধনে ব্রতী হন।

চুক্তির দ্বিতীয় অংশ হতে বোঝা যায় যে, আরব গোত্রগুলোকে নিয়ে একটি পক্ষ ও ইহুদী গোত্রগুলোকে নিয়ে অপর একটি পক্ষ গঠিত হয় এবং অতঃপর উভয় পক্ষ সম্মিলিতভাবে মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়। বিশ্বাসীদের নিয়ে প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের সমন্বয়ে একটি জাতি গঠিত হয়; কিন্তু এককভাবে সমস্ত ইহুদী গোত্রের সমবায়ে কোন স্বতন্ত্র জাতি গঠন করা হয়নি। তবে স্বতন্ত্রভাবে আশ্রিত ও অনুগামীগণসহ প্রত্যেক ইহুদী গোত্রের স্বকীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার সংরক্ষিত হয়।

চুক্তির এই অংশের প্রকৃতি হতে বোঝা যায় যে, মদিনাকে কেন্দ্র করে আরব ও ইহুদী গোত্রসমূহের সমবায়ে একটা কনফেডারেশন গঠিত হয়েছে। এই কনফেডারেশনের অংশ হিসেবে মদিনা অগ্রবর্তী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ব্যাপক প্রাধান্য বিস্তার করে। এই চুক্তির ফলেই কনফেডারেশনের সমস্ত দল বা গোত্রের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে একটা ঐক্যগত সমঝোতা বা পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়। যদি কোন সময় কোন একটি ইহুদী গোত্র মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ত, তখন এই সম্পর্ক বিশেষ সহায়ক হত।

হুদায়বিয়ার সন্ধি

বদরের যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে মক্কাবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন (খ্রিস্টাব্দ ৬২৪-৩০) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মর্যাদা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে তিনি মদিনার আশেপাশের গোত্রগুলোকে ইসলামের রাষ্টীয় কর্তৃত্বাধীনে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস পান। ইবনে হিশামের ভাষায়, বদরের সামরিক সাফল্যের পর হযরত প্রকৃতপক্ষে হেজাযের একচ্ছত্র শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ওহুদের যুদ্ধের (খ্রিস্টাব্দ ৬২৫) নগণ্য পরাজয় তাঁর ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কারণ, কিছুকাল পরেই খন্দকের যুদ্ধে (খ্রিস্টাব্দ ৬২৭) তিনি আবার এক সুদূরপ্রসারী সাফল্য লাভ করেন।

ঠিক এই সময়েই ইহুদীদের নাযীর গোত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে তাদের সাথে সম্পাদিত মৈত্রীচুক্তি বাতিল হয়ে যায়। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, ইহুদীগণ (নাযীর গোত্র) কর্তৃক হযরতের জীবননাশের ষড়যন্ত্রই এই চুক্তি বাতিল হওয়ার প্রধান কারণ। অবশ্য চক্রান্তকারী বানু নাযীর ছাড়া চুক্তির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ইহুদী গোত্রের সঙ্গে হযরত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখেন। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চক্রান্তে লিপ্ত হওয়ার জন্যে হযরত বানু নাযীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। কিন্তু এর পরও কিছুকাল ইহুদীদের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটেনি; কারণ, অবশিষ্ট ইহুদীগণ বিশেষ করে স্ব-ধর্মাবলম্বী বানু নাযীরের প্রতি অধিকতর সহানুভূতিশীল কোরায়জা গোত্রও এই সময় হযরতের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মদিনার مسلمانوں সঙ্গে (ইহুদীদের) মৈত্রীচুক্তির ফলে ইহুদীদের এই শত্রুতার অবসান ঘটে।

হযরত প্রথমতঃ তাঁর পরম শত্রু কোরেশদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে মক্কা বিজয়ের দ্বারা তাঁর জীবনের সাফল্যকে পূণাঙ্গ রূপ দান করেন। আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, মক্কায় হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হযরত কোরেশদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌছেন। হজব্রত পালন এই সমঝোতায় পৌঁছানোর আশু কারণ হলেও প্রকৃতপক্ষে তখন উভয়পক্ষের অবস্থা থেকে এটা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, অন্ততঃ সাময়িকভাবে হলেও তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। কোরেশদের অবস্থা তখনো এমন পর্যায়ে ছিল যে, মদিনার শাসন-কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাদের পরাভূত করা সহজ-সাধ্য ছিল না বিশেষ করে ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে। অন্যদিকে মক্কাবাসীগণ বদর ও খন্দকের যুদ্ধে উপর্যুাপরি দু'বার مسلمانوں হাতে চরমভাবে পরাজিত হয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সিরিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর ফলে কোরেশদের বাণিজ্য-কাফেলা প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় অন্ততঃ স্বল্পকালের জন্যে হলেও উভয়পক্ষ একটা শান্তিচুক্তির জন্য বিশেষভাবে আগ্রহশীল হয়ে ওঠে। যে ঘটনাবলী শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে, তা হচ্ছে সংক্ষেপে এইঃ

রাসূল তাঁর মুষ্টিমেয় সংখ্যক অনুগামী নিয়ে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। কোরেশগণ হযরতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আশঙ্কা ও সন্দেহ পোষণ করে পথিমধ্যেই তাঁকে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় হযরত কোরেশদের নিকট শান্তির প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত করেন। এতদানুযায়ী তিনি তাঁর জামাতা ও ভাবী তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানকে তাঁর শান্তি প্রস্তাবসহ কোরেশদের নিকট প্রেরণ করেন। মক্কাবাসীগণ এ প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং হযরতের সঙ্গে শান্তিচুক্তির শর্তাদি সম্পর্কে আলোচনার জন্যে সুহাইল ইবনে-আমরকে প্রেরণ করে। এই আলাপ-আলোচনার ফলেই 'হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি' নামে অভিহিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। হযরত রাসূলের চাচাতো ভাই ও ভাবী চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে-আবু তালেব চুক্তির দলিল লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে সম্পাদকের কাজ করেন।

নীচে চুক্তিটির বিবরণ দেয়া হল:

"হে আল্লাহ্! তোমার নামে শুরু করছি। এ চুক্তিটি মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ শান্তি পূর্ণভাবে সুহাইল ইবনে আমরের সঙ্গে একমত হয়ে সম্পাদন করেছেন;

"তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে একমত হয়ে দশ বছর কালের জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিয়েছেন; পরস্পরের আক্রমণ থেকে (উভয়পক্ষের) জনসাধারণ নিরাপদ থাকবে;

"কোরেশদের কোন লোক তার ওয়ালীর (অভিভাবক) অনুমতি ছাড়া মুহাম্মদের (সঃ) দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে তাদের (কোরেশদের) কাছে প্রত্যার্পণ করতে হবে; কিন্তু মুহাম্মদের (স:) কোন অনুগামী কোরেশদের দলে যোগদান করতে চাইলে, তাকে কোনরূপ বাধা দেয়া হবে না;

"আমাদের উভয় দলের পক্ষেই অসদাচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ নিষিদ্ধ; এবং আমাদের মধ্যে স্বপক্ষ ত্যাগ ও বিশ্বাসঘাতকতার কোনরূপ অপরাধ অনুষ্ঠিত হতে পারবে না;

"যারা (যেসব লোক) মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাঁর চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারা অবাধে তা' করতে পারবে; এবং যারা কোরেশদের সঙ্গে যোগদান করতে এবং তাদের চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তারাও অবাধে তা' করতে পারবে।"

এই চুক্তির ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর সদিচ্ছা সম্পর্কে মক্কাবাসীদের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য কয়েকজন সাক্ষী উপস্থিত করেন। এঁরা চুক্তির শর্তসমূহ পালন ও অক্ষুণ্ণ রাখার শপথ গ্রহণ করেন। এই সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আবু বকর, উমর ইবনে আল-খাত্তাব ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ। এই চুক্তির ফলে ইসলামের আরেকটি বিরাট বিজয় সূচীত হয়। কারণ, এই চুক্তির মাধ্যমেই অবশেষে অভিজাত কোরেশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ মদিনায় হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শাসন-কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং গৌণভাবে হলেও ইসলামকে মদিনার রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। এতে মক্কায় হযরতের মর্যাদা সমুন্নত হয় এবং সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। অথচ মদিনায় হিজরতের পূর্বে এক সময়ে এই মক্কাতেই তাঁকে অকথ্য লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছিল।

হুদায়বিয়ার চুক্তির ফলে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এই রীতির অনুবর্তন হয় যে, মুসলিম কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী মেয়াদের ভিত্তিতে মুশরিকদের (অংশীবাদী) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন। এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে আইনবিদদের মধ্যে অবশ্য মত-বিরোধ রয়েছে। কোন কোন আইনবিদ হুদায়বিয়ার চুক্তির অনুরূপ দশ বছরের মেয়াদ অনুমোদন করেছেন। আবার কেউ বা দু-তিন বছরের মেয়াদের কথা বলেছেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এসব চুক্তি দু-তিন বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়নি। অবশ্য আইনবিদগণ এ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, শত্রুদের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া ইসলামের মূল স্বার্থের পরিপন্থী নয়।

হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তিও কার্যতঃ দু' বছরের মধ্যেই লঙ্ঘন করা হয়। ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, مسلمانوں ওপর কোরেশদের অবৈধ আক্রমণের ফলেই চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়। চুক্তির বিধানে "যারা মুহাম্মদের (সঃ) দলে এবং তাঁর মৈত্রীতে যোগদান করতে চাইবে, তারা অবাধে তা' করতে পারবে" বলে যে স্বীকৃত শর্তটি রয়েছে, এ হামলার দ্বারা কোরেশগণ সরাসরি তা লঙ্ঘন করে। এরপরও অবিশ্যি কোরেশদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ-আলোচনা চালান হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সময় কোরেশদের তুলনায় মুসলমানগণ অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে; ঠিক এই অবস্থায় مسلمانوں ওপর একটা অন্যায় হামলা দ্বারা তারা একটা বৃহত্তর শক্তি পরীক্ষাকে আসন্ন করে তোলে। নিজের অনুগামীদের ওপর কোরেশদের এই অহেতুক আক্রমণে হযরত (সঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু তবুও তিনি তাদের সঙ্গে একটা আপোষ রফার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে মুসলমানগণ মক্কা অভিমুখে সামরিক অভিযান পরিচালনার সংকল্প করেন। হিজরী ৮ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩০) তাঁরা মক্কা দখল করেন। এই সময় কোরেশগণ অত্যন্ত হীনবল ও শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা নব বলে উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনীর গতিরোধ করতে কিংবা তাদের সাথে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহস পেল না। হযরত (সঃ) তাঁর বিজয়পতাকা হস্তে মুক্ত তোরণ দ্বার দিয়ে অবাধে পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করলেন।

মক্কা বিজয়ের ফলে দুই নগর-রাষ্ট্রের বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটে। আর এর ফলে সমগ্র হেজাযে ইসলামের সুদৃঢ় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এরপর হযরতের (সঃ) মিশন এক বিস্তৃততর লক্ষ্যপানে সম্প্রসারিত হয়।

রাষ্ট্রীয় সনদ হিসেবে জিম্মী-চুক্তির স্থান

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরো এক ধরনের কতকগুলো চুক্তি সম্পাদন করেন। এগুলো পূর্বোক্ত চুক্তিগুলো হতে একটু আলাদা ধরনের। আরবের কেতাবী সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিও এর মধ্যে রয়েছে। এসব চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ কেতাবীদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং অবাধভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত হয়। অবিশ্যি, তারা যতদিন চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলবেন, ততদিনই এই নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। এই চুক্তিগুলোর আইনগত প্রকৃতি সম্পর্কে এ বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে (সপ্তদশ পরিচ্ছেদ)। এই পরিচ্ছেদে এ চুক্তিগুলোর কাঠামো ও পদ্ধতি এবং অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। জেরুজালেমের প্রধান খৃস্টান বিশপ দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর-বিন-আল-খাত্তাবের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদন করেন, এ শ্রেণীর চুক্তির ক্ষেত্রে তার চাইতে উৎকৃষ্টতর নজির আর পাওয়া যায় না। এ চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে প্রধান বিশপ দাবী করেন যে, এই চুক্তির দলিলে স্বয়ং খলিফাকেই স্বাক্ষর দান করতে হবে, তাঁর কোন প্রতিনিধির স্বাক্ষর হলে চলবে না। হিরা ও দামেস্কের শান্তিচুক্তির দলিলে কিন্তু খলিফার প্রতিনিধিগণই স্বাক্ষর দান করেন। হযরত উমর প্রধান বিশপের দাবীতে সম্মত হন এবং চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দানের জনে। জেরুজালেম গমন করেন। হিজরী ১৭ সালে (খ্রিস্টাব্দ ৬৩৮) এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। নীচে চুক্তির শর্তগুলোর বিবরণ দেয়া হল :

"পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি।

"আমীরুল মুমেনীন (বিশ্বাসীদের নেতা) আবদুল্লাহ উমর ইলিয়ার (জেরুজালেম) অধিবাসীগণকে এগুলো (এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিধি-ব্যবস্থা ও অধিকারসমূহ) মঞ্জুর করেছেন;

"তিনি তাদের জীবন, ধনসম্পদ, গীর্জা ও ক্রস (যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান) রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন:

"তাদের গীর্জায় কেউ (কোন বিদেশী) বাস করতে পারবে ন, কিন্তু কে এব (পার্জার) কোনরূপ ক্ষতি বা ধ্বংস সবন করা যাবে না। আর তাদের এস কি তাদের

"তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের (ধর্মীয় বিধি-ব্যবস্থা বা আচার-অনুষ্ঠান) জন্য তাদের ওপর কোনরূপ জোর জবরদস্তি করা চলবে না, কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার জুলুম বা উৎপীড়ন চলবে না;

"ইলিয়া নগরে (জেরুজালেমে) তাদের সঙ্গে ইহুদীদের বসবাসের অনুমতি দেয়া যাবে না;

"মাদাইনের (সাবেক পারস্যের রাজধানী) অধিবাসীদের মত সমানুপাতে ইলিয়ার অধিবাসীদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে;

"ইলিয়ার অধিবাসীগণকে রুম (রোমান বা বাইজান্টীয়) ও তস্করদের নগর ছেড়ে যেতে দিতে হবে। যদি তারা (রোমানগণ) নগর ছেড়ে যায়, তবে তাদের স্বদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের জীবন ও ধনসম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। অবশ্য যে সব বাইজান্টীয় নগরে বসবাস করতে চায়, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে; তবে জিযিয়ার ব্যাপারে ইলিয়াবাসীদের অনুরূপ শর্তে তাদেরও স্বীকৃত হতে হবে;

"ইলিয়ার অধিবাসীদের মধ্য হতে যে সব লোক বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তারা তাদের গীর্জা ও ক্রস পরিত্যাগ করে গেলে তাদের জীবন এবং ধনসম্পদের নিরপত্তা-বিধান করা হবে;

"কৃষিভূমির যে সব লোক (কৃষক) পূর্ব থেকেই এই নগরে (ইলিয়ায়) বসবাস করে আসছিল, তারা এখানে অবস্থান করতে চাইলে তাদের সে অধিকার দেয়া হবে, তবে নগরে অন্যান্য অধিবাসীদের মত তাদেরও জিযিয়া প্রদান করতে হবে। তবে যারা বাইজান্টীয়দের সঙ্গে নগর ছেড়ে যেতে চায়, তারা (অবাধে) তা' পারবে; আর যারা সাময়িকভাবে জনপদে (তাদের ভূমিতে) তাদের লোকদের কাছে যেতে চায়, ফসল তোলার মওসুম পর্যন্ত তারা তথায় যেতে বা অবস্থান করতে পারবে;

"নগরের বাসিন্দাদের জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে যথাযথ দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে এই চুক্তির দলিলে (এই দলিলে প্রদত্ত শর্তসমূহ অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে) আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, খলিফাগণ ও বিশ্বাসীদের (পক্ষ হতে) প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হল।

"সাক্ষীগণ : খালিদ ইবনে আল-ওয়ালীদ, আমর ইবনে আল-আস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান।

"হিজরী ১৫ সালে এই চুক্তির দলিলটি স্বাক্ষরিত হয়।"

প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী সাধারণ মাথা-গণতি কর হিসেবে কেতাবীদের যেমন নিয়মিতভাবে জিযিয়া প্রদান করতে হত, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক জিম্মী হিসেবে তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণকর বিধিব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ সমন্বিত অধিকারের আইনানুগ রাষ্ট্রীয় সনদও ছিল। অন্যান্য চুক্তির মত জিম্মী অধিকার সংরক্ষণের এই সনদটিও যথারীতি আলাপ-আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হয়। তবে বিশেষভাবে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে এ চুক্তিটির পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ, এ চুক্তিটি স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত; কারণ, চুক্তির কোন পক্ষের কোন লোক কর্তৃক এর শর্তাদি লঙ্ঘিত হলেও অপরপক্ষের ওপর শর্তের বাধ্যবাধকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্বিতীয়তঃ, চুক্তিটি প্রযুক্ত বা বলবৎ হওয়ার সময় থেকেই কেতাবীগণ খেলাফতের (দারুল ইসলামের) নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদের অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে। গোড়ার দিকে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো দুই স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলেও শেষ পর্যন্ত কেতাবী সম্প্রদায়গুলো (জিম্মীগণ) ইসলামী জাতীয়তার আওতায় শামিল হলে চুক্তির প্রকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়। অবিশ্যি, ইসলামী জাতীয়তার অঙ্গীভূত হলেও অনেকাংশই এই সম্প্রদায়সমূহের স্বায়ত্বশাসনাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, আইনবিদগণ ইসলামের সঙ্গে জিম্মীদের সম্পর্কের বিষয় সংক্রান্ত বিধিব্যবস্থাকে শরিয়তের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। ফলে এই শ্রেণীর চুক্তিগুলো (জিম্মী সম্বন্ধীয় চুক্তি) রাষ্ট্রীয় শাসন-সংবিধানের মর্যাদা লাভ করে। জিম্মীদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো পরবর্তীকালে 'উমরের সনদ' বলে অভিহিত হয়।

খলিফাদের আমলে স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহ

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিসমূহকে পরবর্তীকালে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণ (খলিফাগণ) অবিচলিত নিষ্ঠার সাথে এ আদর্শ অনুসরণ করে গেছেন। আইনগত প্রকৃতির দিক থেকে এমন কি কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলেও ইসলামের প্রাথমিক যুগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর সাথে খলিফাগণ কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।

পরবর্তীকালে স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য এবং পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ায় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের তাগিদে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ধর্মীয় উদ্দেশ্য-প্রধান চুক্তিগুলো হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক শ্রেণীর নয়া চুক্তির সৃষ্টি হল। উমাইয়া শাসন আমলে খলিফা ১ম মুয়াবিয়া ও আবদুল মালিক বাইজান্টীয়দের (রোমান) সাথে কতিপয় চুক্তিতে আবদ্ধ হন। সেই সময় মুসলমানগণ গৃহযুদ্ধে ব্যাপৃত থাকায় বাইজান্টীয় আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। এমতাবস্থায় তাদের আক্রমণ পরিহারের উদ্দেশ্যে তাঁরা শুল্ক দানের শর্তে তাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। মুয়াবিয়া তখনো খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেননি। খেলাফত নিয়ে তিনি তখনো হযরত আলীর সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো শর্তে তিনি বাইজান্টীয় সম্রাট দ্বিতীয় কন্সট্যান্স-এর সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিজের কর্তৃত্ববলে মুয়াবিয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি সম্রাটকে শুল্ক দিতে স্বীকৃত হন। ইরাকের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকাকালে অন্যতম উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকও (হিজরী ৬৫-৮৬; খ্রিস্টাব্দ ৬৮৫-৭০৫) বাইজান্টীয়দের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেন। আইনবিদগণ অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের ব্যাপারে ইমামের কার্যের বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত প্রকাশ করেছেন। আল-আউযায়ী (মৃত্যু: হিজরী ১৫৭; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৩) ও সুফিয়ান আস-সাউরী (মৃত্যু হিজরী ১৬১; খ্রিস্টাব্দ ৭৭৭) এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, প্রয়োজনের তাগিদে অনুরূপ শুল্ক প্রদান দোষাবহ নয়। এঁরা উভয়েই উমাইয়া আমলের লোক ছিলেন। তবে মুসলিম শক্তির গৌরবময় যুগের আইনবিদ ইমাম শাফেয়ী এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। হানাফী আইনবিদগণও অনিবার্য কারণ ব্যতীত (অর্থাৎ অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া) অমুসলিম কর্তৃপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। তবে অধিকাংশ আইনবিদই বার্ষিক শুল্ক দানের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন; অবশ্য বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প কালের জন্য অনুরূপ শুল্ক প্রদান করা যেতে পারে বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেবলমাত্র চরমপন্থী আইনবিদ আল-লুলু যে কোন পরিস্থিতেই হোক না কেন, শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের বিরোধিতা করেছেন। এমন কি শক্তির দিক থেকে مسلمانوں অবস্থা দুর্বল বলে মনে করলেও শত্রুপক্ষকে শুল্ক দানের পরিবর্তে ইমামের যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত বলে তিনি রায় দেন।

আব্বাসীয় আমলে খলিফাগণ নানাবিধ কারণে বাইজান্টীয়দের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। প্রথমতঃ, উপর্যুপরি সীমান্ত লঙ্ঘন বন্ধের জন্যে উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। কারণ, আব্বাসীয়-বাইজান্টীয় সীমান্তে প্রাকৃতিক আড়ালের স্বল্পতা হেতু উভয়পক্ষ প্রায়ই জবরদস্তিমূলক পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করত। আব্বাসীয় বংশের শাসন আমলের প্রথম দিকে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী বাইজান্টীয় সম্রাটগণ বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে বার্ষিক শুল্ক দিতে বাধ্য হন। এ ভাবেই বাইজান্টীয় সম্রাজ্ঞী ইরিন (মৃত্যু খ্রিস্টাব্দ ৮০২) খলিফা হারুনুর রশীদকে শুল্ক দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে বার বার হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। সম্রাট নিসিফোরসের রাজ্যভিষেক পর্যন্ত এই চুক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু নিসিফোরস সাম্রাজ্যিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত সমস্ত শুল্ক ফেরত চেয়ে বাগদাদে একটি অবমাননাকর পত্র প্রেরণ করেন। খলিফা হারুন এতে খুব ক্রুদ্ধ হন এবং নিসিফোরসকে সমুচিত জওয়াব দানের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে, নিসিফোরস বাগদাদ কর্তৃপক্ষকে পুনরায় নতুনভাবে শুল্ক প্রদান করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরে বাগদাদের খলিফাদের প্রতিপত্তি ও মর্যাদা ক্ষীয়মাণ হয়ে আসলে কন্সট্যানটিনোপলের (বাইজান্টীয়) সম্রাটগণ তাঁদের শুল্ক দান বন্ধ করে দেন; এমন কি তাঁরা তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সীমান্তের ওপরও হানা দিতে শুরু করেন। মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ক্রুডেস যুদ্ধের নায়ক রাজন্যবর্গের সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি সম্পাদিত হয়। আঞ্চলিক খণ্ড সংঘর্ষের অবসান, অবাধভাবে সাধারণ লোকদের বিভিন্ন এলাকায় চলাচল বা পরিভ্রমণ, ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শন, হজব্রত পালন প্রভৃতি উদ্দেশ্যেই এই শ্রেণীর চুক্তি হয়। হজব্রত পালন কিংবা পবিত্র ধর্মস্থানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ-সুবিধার বিশেষ উদ্দেশ্যে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দীন ও ক্রুসেড নায়ক রিচার্ড কু'র-ডি-লায়নের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে আর এক শ্রেণীর চুক্তিও সম্পাদিত হয়। এগুলো 'ফিদা-চুক্তি' (ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিমূল্য চুক্তি) নামে অভিহিত। বন্দী বিনিময়ের ভিত্তিতে কিংবা স্বীকৃত অর্থ প্রদান করে যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে বিজয়ী তাঁর রাষ্ট্রীয় তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন। অপরপক্ষে, এর ফলে হাজার হাজার হতভাগ্য যুদ্ধবন্দীর জীবন রক্ষা পেত। এ চুক্তির ব্যবস্থা না থাকলে হয় এরা নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করত কিংবা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

উমাইয়া আমলে ফিদা-চুক্তির কোন উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বন্দী বিনিময় করার রেওয়াজ তখনো ছিল। আরব ইতিহাসকারদের বর্ণনা হতে জানা যায় যে, চুক্তির মাধ্যমে সুসংহত ব্যবস্থা হিসেবে ফিদা-চুক্তি খলিফা হারুনুর রশীদের আমলেই প্রথম প্রবর্তিত হয়। হিজরী ১৮১ সালে হারুন চুক্তিটি সম্পাদন করেন। এর ফলে প্রায় ৩ হাজার ৭শ' মুসলিম বন্দী মুক্তিলাভ করে। ইতিহাসবেত্তা আল-মাসুদী বলেন যে, খলিফা হারুনের আমল থেকে তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত অনুরূপ মোট ১২টি ফিদা-চুক্তি সম্পাদিত হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানাদির পর বন্দীদের মুক্তিদান কার্য সম্পন্ন হত। উভয়পক্ষই এই উপলক্ষে নানাবিধ আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করতেন।

চুক্তির শর্তাদি কার্যকরী করার নিশ্চয়তা বিধানের জন্যে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিভূ (রাহাইন) বিনিময়েরও ব্যবস্থা সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়। প্রাচীন চীন ও রোমে এ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। প্রাচীন রীতিতে এইরূপ বিধান ছিল যে, চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও শর্তাদি যথাযথভাবে কার্যকরী করা হলে প্রতিভূদের নিরুপদ্রবে তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে দেয়া হত। আর যদি কোন কারণে চুক্তি লঙ্ঘন করা হত, প্রতিভূদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হত এবং অনেক সময় তাদের উৎপীড়ন ও দুর্দশাও ভোগ করতে হত। কিন্তু মুসলমানগণ প্রতিভূদের নিজেদের আমানত হিসেবে মনে করতেন এবং তাদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তা দান করতেন। প্রতিভূদের সঙ্গে তাঁরা ন্যায়বিচার ও সহৃদয় ব্যবহার করতেন। চুক্তিভঙ্গ হলে এবং যুদ্ধ ঘোষিত হলে মুসলমানগণ প্রতিভূদের তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিতেন; কিন্তু যুদ্ধ না বাধলে প্রতিভূদের হয় আগের মতই নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখা হত কিংবা তাদের স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হত।

চুক্তিগুলোর সাধারণ প্রকৃতি

মুসলমানদের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনার ভিত্তিতে সংক্ষেপে নিম্নোক্ত পর্যায়ে এ সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ ধারণায় পৌঁছা যেতে পারে:

প্রথমতঃ, মুসলিম-চুক্তিগুলো মোটের ওপর সংক্ষিপ্ত ও সাধারণভাবে একই প্রকৃতির। তাছাড়া, চুক্তির শর্তাদির প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কেও কোন বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি। অনেক সময় অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ততার দরুন বিষয়বস্তু ও শব্দবিন্যাস অস্পষ্ট থেকে গেছে।

দ্বিতীয়তঃ, প্রত্যেক চুক্তির ভূমিকায় সাধারণভাবে বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) কথাটি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের নামের তালিকা ও পদবীর উল্লেখ থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজে যে চুক্তিগুলো সম্পাদন করে গেছেন, তাতেও অনুরূপভাবে 'আল্লাহ'র রাসূল' কথাটির সাধারণ উল্লেখ দেখা যায়। একমাত্র হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তিটিতে (কোরেশদের অনিচ্ছার জন্য) এর উল্লেখ ছিল না। হযরতের উত্তরাধিকারী খলিফাগণ যে সব চুক্তি সম্পাদন করেছেন, তাতে তাঁদের উপাধি 'খলিফা' বা 'আমিরুল মুমেনীন' কথাটি সাধারণভাবে উল্লিখিত হয়েছে।

সাধারণতঃ, সাক্ষীদের নামোল্লেখ করে চুক্তির সম্পাদন-কার্য সমাপ্ত করা হয়। চুক্তির বিষয়বস্তুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার সময় এই সব সাক্ষী উপস্থিত থাকতেন।

তৃতীয়তঃ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধির মূল বিষয়বস্তুর পরিবর্তন বা বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, প্রাথমিক যুগের সন্ধি চুক্তিগুলো ছিল প্রধানতঃ ধর্মীয় উদ্দেশ্যভিত্তিক; আর পরবর্তী খলিফাগণ কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিগুলো ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যভিত্তিক। মুসলিম আইনবিদগণ অবশ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী চুক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। এ ব্যাপারে চুক্তির বিষয়বস্তুর পক্ষগুলোর সাথে মুসলিম কর্তৃপক্ষের কিরূপ সম্পর্ক রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে স্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে: আর দারুল হারবের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে অস্থায়ী বলে গণ্য করা হয়েছে। সাময়িকভাবে জেহাদ স্থগিত রাখার ভিত্তিতেই হারবীদের সাথে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করা হত।

চতুর্থতঃ, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ নির্ধারিত করে দেন। হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের আইনবিদগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, শত্রুর সাথে সম্পাদিত কোন শান্তিচুক্তির মেয়াদ দশ বছরের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির মেয়াদের নজিরকেই তাঁরা এ যুক্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির শর্তে চুক্তির কার্যকালের মেয়াদ দশ বছর নির্ধারিত হয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত (অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত) স্থায়ী হয়নি-তার চেয়েও অনেক কম সময় (তিন-চার বছর) স্থায়ী হয়। সুতরাং, অনুরূপ ভিত্তিতে তাঁরা এই শ্রেণীর চুক্তির মেয়াদ তিন-চার বছরের বেশী বাড়ানোর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির মেয়াদ দশ বছর দশ মাস কিংবা দশ বছর এগারো মাস কাল (বারো মাস পর্যন্ত নয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়।

জিম্মীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এই চুক্তিগুলোকে কেবল স্থায়ীভিত্তিক বলেই গণ্য করা হত না, বস্তুত, দুই পক্ষের মধ্যে এ গুলোকে সংযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে মনে করা হত। প্রকৃতপক্ষে, জিম্মী চুক্তি রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটা আইনানুগ সনদ হিসেবে কার্যকরী ছিল। এ চুক্তি কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিম্মীগণ মুসলিম রাষ্ট্রের একটা অবিভাজ্য অংশ হিসেবে তাদের যাবতীয় সামাজিক ও আইনগত অধিকার ভোগ করত।

শেষতঃ, মুসলিম শাসকগণ তাঁদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিগত সমঝোতার বাধ্যবাধকতাকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে গণ্য করতেন এবং সতর্কতার সাথে এগুলো পালন করতেন। অবশ্য, মুসলিম আইনবিদগণ অমুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে মুসলমানদের খুব বেশী উৎসাহিত করতেন না; তবে একবার চুক্তি সম্পন্ন হলে যাতে এর মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে চুক্তির বিধান ও শর্তাদি পালিত হয়, তার প্রতি তাঁরা সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

সন্ধিচুক্তির পরিসমাপ্তি

মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে সন্ধি কথাটির বিশেষ প্রকৃতি হতেই বোঝা যায় যে, এর ভিত্তি অস্থায়ী। মুসলিম আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুসারে মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক সামরিক শান্তিভিত্তিক নয়। আইনের বিধান অনুযায়ী জেহাদ দশ বছরের অধিক কাল স্থগিত রাখা চলে না; সুতরাং, এই সময় উত্তীর্ণ হলেই সন্ধি চুক্তিসমূহের কার্যকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্য কথায়, চুক্তির মেয়াদ দশ বছরের বেশী হতে পারে না। এমন কি চুক্তিতে মেয়াদের কথা না থাকলেও দশ বছর উত্তীর্ণ হলেই স্বাভাবিকভাবেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। অবশ্য, আইনবিদগণ ইমামকে চুক্তির অস্থায়ী রূপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার জন্য চুক্তির দলিলে এর কার্যকালের মেয়াদের উল্লেখ করতে বলেছেন।

ইসলামের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি যাতে সম্পাদন করা না হয়, সে সম্পর্কেও ইমামকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি যদি এমন চুক্তি সম্পাদন করেন, যাতে তিনি শত্রুপক্ষের নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছেন, তবে সে চুক্তি 'ফাসিদ' (অনিয়মিত বা বিধিবহির্ভূত) বলে গণ্য হবে। বিধিসম্মত করার জন্য এ চুক্তিকে হয় সংশোধন করতে হবে, অথবা এর সমাপ্তি ঘটেছে বলে ঘোষণা করতে হবে।

ইমাম যদি এমন শর্তসমন্বিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা পালন করা তাঁর পক্ষে সাধ্যাতীত কিংবা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। এমন কি, চুক্তিটি বিধিসম্মত হলেও ইমাম যদি এর শর্তাদিকে ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে বুঝতে পারেন, তবে তিনি এর পরিসমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন। অবশ্য, মুসলমানরা যে চুক্তিটির পরিসমাপ্তি চান, একথা পূর্বাহ্নেই উল্লেখযোগ্য সময়ের মধ্যে অপরপক্ষকে জানিয়ে দিতে হবে।

পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে ইমাম এমন কোন শর্তে সম্মত হতে পারবেন না, যাতে চুক্তির দুই পক্ষের মধ্যে যে কোন এক পক্ষকে চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা দেয়া হয়; এমন কি, ইমামকে এই ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি এইরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবেন না। কেননা, চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে পারস্পরিক সম্মতি যেমন মূলভিত্তির কাজ করে, তেমনি চুক্তি পরিসমাপ্তির ব্যাপারেও তাকে অবশ্যই মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

জিম্মীর সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে স্থায়ী প্রকৃতির; সুতরাং এগুলো কখনো বাতিল বা পরিসমাপ্ত হতে পারে না। এমন কি, কিছু সংখ্যক জিম্মী তাদের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করলেও অন্য সকল জিম্মীর ওপর চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে বলবৎ থাকবে। কেননা যে সব কিতাবী সম্প্রদায় মুসলিম শাসনাধীনে বসবাস করতে সম্মত হয়, এ চুক্তিগুলো (জিম্মী চুক্তিগুলো) তাদের প্রতি প্রদত্ত মুসলিম শাসন-কর্তৃপক্ষের শুধু নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিই নয়—বস্তুতঃ, জিম্মীগণ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো রাষ্ট্রীয় শাসনতান্ত্রিক সনদের রূপও পরিগ্রহ করে। এ অবস্থায় কোন জিম্মী তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে তাকে সাধারণভাবে শাস্তি ভোগ করতে হয়। তবে আইন অনুসারে তার ওপর প্রযোজ্য বা বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করার অধিকার তার রয়েছে এবং সে ইচ্ছা করলে অবাধে দারুল হারবে হিজরত করতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00