📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 আইনের আওতা

📄 আইনের আওতা


ব্যক্তি : বিশ্বাসী মুসলিম

মুসলিম আইন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে, বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে নয়। মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করলেও বিশ্বাসীকে মুসলিম আইন মেনে চলতে হবে। আবার অনুরূপভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম জনসাধারণ ঠিক মুসলমানের রীতি অনুযায়ী আইন-কানুন মানতে বাধ্য থাকে না। অবশ্য, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করার ফলে তাদের কতকগুলো কর্তব্য পালন করতেই হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আওতা (Jurisdiction) ব্যক্তির ধর্মের ওপরই নির্ভরশীল। আর ধর্মের ওপর ভিত্তি করেই ব্যক্তি মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন এবং একই সঙ্গে মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেও গণ্য হতে পারেন। সাধারণভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী, কেবল তিনিই মুসলমান বলে পরিচিত হতে পারেন। আইন ও ধর্মের দিক থেকে বিষয়টি অতটা সহজ নয়।

কোন কোন মুসলিম আইনবিদ বলেছেন যে, যেকোন ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) রিসালাতে বিশ্বাস করবেন এবং তিনি যে সব নীতি প্রচার করেছেন সেগুলো সত্য বলে জানবেন, কেবল তিনিই মুসলমান বলে গণ্য হবেন। এ ঘোষণার পরে তিনি যা-ই বলুন না কেন, তাতে কিছুই আসে যায় না। অন্যান্য আইনবিদরা বলেন যে ব্যক্তি ধর্মের পাঁচটি মূলনীতি পালন করেন বা যিনি কেবলমাত্র কাবা শরীফের দিকে মুখ করে ইবাদাত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন, তিনিই মুসলমান। ইমাম আবু হানিফা এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি কাবা শরীফের অবস্থান সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন, তবু তিনি মুসলমান বলে গণ্য হবেন। আবদুল কাহির আল- বাগদাদী অবশ্য এসব সংজ্ঞাকে খুব বেশী ব্যাপক ও অপ্রামাণ্য বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, তাঁরা মুসলমান বলে গণ্য হবেন যাঁরা এমন বিশ্বাস করেন যে নিখিল-বিশ্ব সৃষ্ট হয়েছে এবং স্রষ্টা এক আর তাঁর পূর্ব অস্থিত্ব, তাঁর গুণাবলী, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা ও তাঁর জ্ঞান সম্পর্কে গভীর আস্থা স্থপন করেন আর তাঁর নিছক মানবিক ব্যক্তিগত রূপ অস্বীকার করেন। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) রিসালাত, তাঁর সার্বজনীন নবুয়ত, তাঁর আইনের শাশ্বত রূপ, তিনি যা আদেশ করেছেন সব সত্য বলে মনে করা, আল-কোরআনকে আইনগত রীতি-নীতির উৎস-মূল বলে জানা এবং কাবা- শরীফের দিকে মুখ করে ইবাদাত যিনি এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন এবং যে ধর্মবিরোধী প্রবণতা তাঁকে অবিশ্বাসের পথে নিয়ে যেতে পারে, তা অনুসরণ করেন না-তিনিই সত্যিকার সুন্নীপন্থী বলে বিবেচিত হবেন।

আল-বাগদাদী বলেন যদি কোন মুসলমান কোন একটি ধর্মবিরোধী মযহাবে বিশ্বাস করেন, তবে ইসলামী রাষ্ট্র তার অধিকার ও কর্তব্য সীমিত করতে বাধ্য। বাগদাদীর মতে তাকে মুসলমানদের গোরস্থানে সমাহিত করা হবে এবং তিনি যুদ্ধে যোগদান করলে যুদ্ধলব্ধ ক্ষতিপূরণ, শুল্ক ও গানিমার অংশ লাভ করতে পারবেন। মসজিদে ইবাদাত করতেও তাকে বাধা দেয়া যাবে না। কিন্তু তিনি উম্মা বা মুসলিম সমাজ-বহির্ভূত বলে গণ্য হবেন। তার মৃতদেহের দাফনকালে কোন নামাজ পড়া হবে না: তার পেছনে নামাজ ও জানাজা পড়াও সিদ্ধ হবে না। তিনি কোন পশু জবেহ করলে তাও হালাল হবে না। তিনি সুন্নী মহিলাদের বিবাহ করতে পারবেন না। কোন সুন্নী পুরুষও অনুরূপ মতাবলম্বী পরিবারের কোন মহিলাকে বিবাহ করতে পারবেন না।

উল্লেখযোগ্য যে, কোন ব্যক্তিকে মুসলিম সমাজের সদস্য হতে হলে তাঁকে ইমানের পূর্ববর্ণিত নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করতেই হবে। তাই, ইসলাম নাগরিকদের ধর্ম ও জাতীয়তা উভয়েরই প্রতীক। কোন কোন আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা ইসলাম ও বাহ্যিক আত্মসমর্পণ এবং ইমান বা আন্তরিক আত্মসমর্পণে (বিশ্বাস) পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। কিন্তু নাসাফী প্রমুখ আইনবিদরা এ দুটোকে একই পর্যায়ের বলে মনে করেন।

শিয়াপন্থীগণ ইসলাম ও ইমানের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ইমানের মধ্যে অভ্রান্ত ইমামের প্রতি আনুগত্য (ওয়ালাইয়া) এবং আস্থাবোধও নিহিত রয়েছে। শিয়াদের কাছে ইসলাম সকল বিশ্বাসীর ধর্ম বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া সকলেই 'ইমান'-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। এরাই খাঁটি ও নিষ্ঠাবান ধর্ম- বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত।

ব্যক্তি: কাফের ও মুরতাদ

ইমানের বিপরীত হচ্ছে কুফর অবিশ্বাস। যে ব্যক্তি আল্লাহকে অস্বীকার করে, সে কাফের। যে মুসলমান মুশরিক হয়ে যায় বা অন্য ধর্ম গ্রহণ করে, তাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলা হয়। কাফেরদের শাস্তি-বিধান সম্পর্কে ধর্মবেত্তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, কাফের পরকালে জাহান্নামী হবে এবং অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার কেউ বলেন যে, এ দুনিয়াতেও তাদের আংশিক শাস্তি ভোগ করতে হবে। আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ এ সম্বন্ধে সম্মিলিত অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মুরতাদ হয়ে যাওয়া ইহকালে ও পরকালে আইনতঃ দণ্ডনীয়। সে ব্যক্তি কেবল পরকালের নাজাত থেকেই বঞ্চিত হবে তাই নয়, রাষ্ট্র তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান করবে। আল-কোরআনের এ আইন নিম্নলিখিত নির্দেশাবলীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে:

১। "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় এবং বিশ্বাসহীন (বেঈমান) অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হয় তারা হচ্ছে এই শ্রেণীর লোক, যাদের কাজ এ পৃথিবীতে ও পরকালে বৃথা বলে গণ্য হবে। অগ্নিই হল তাদের আবাসভূমি এবং অনন্তকালে তারা সেখানে বাস করবে।” (২: ২১৪)

২। "কেন তোমরা মুনাফিকদের বিষয়টি নিয়ে দু'দলে বিভক্ত হয়ে গেছ? তাদের তোমরা মিত্র বলে মনে কর না, যে পর্যন্ত তারা তাদের ঘর-বাড়ী ছেড়ে আল্লাহর পথে জেহাদ করবার জন্য হিজরত করে। যদি তারা পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে, তবে তাদের ধরার চেষ্টা কর এবং যেখানে পাও, হত্যা কর।" (৪:৯০-৯১)

৩। "হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার ধর্ম থেকে দূরে সরে যায়, তবে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর নিজের প্রিয় এমন এক জাতি উত্থিত করবেন, যারা তাঁকে ভালোবাসবে এবং যারা বিশ্বাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে ও অবিশ্বাসীদের শাস্তি দেবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে ও নিন্দাকারীদের নিন্দাকে ভয় করবে না; এটাই হল আল্লাহর রহমত। যার প্রতি ইচ্ছা, আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন। সব কিছুর ওপরই আল্লাহর দখল রয়েছে এবং তিনি সবকিছুই জানেন।" (৫:৫৪)

৪। "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাসী হয়—অবশ্য, যাকে জোর করে ধর্মত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় অথচ যার হৃদয় ঈমানের প্রতি অটল রয়েছে, সে ব্যক্তি ছাড়া এবং যে তার হৃদয়কে অবিশ্বাসে ডুবিয়ে দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহর গযব; তাদের জন্যে কঠোর শাস্তি।” (১৬:১০৬)

যদিও এ চারটি আয়াতের মধ্যে কেবল দ্বিতীয়টিতে ধর্ম পরিত্যাগকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ডের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, তবু সব ভাষ্যকারই এ সম্বন্ধে একমত প্রকাশ করেছেন যে, যে বিশ্বাসী খোলাখুলিভাবে বা গোপনে ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় এবং অবিশ্বাসে অটল থাকে, তাকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। ইসলাম থেকে যে ব্যক্তি দূরে সরে যায়, তাকে মৃত্যুদণ্ড দান সম্পর্কে হাদিসে আরও সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলে আকরম (সঃ) বলেছেন যে, "যে তার ধর্ম পরিত্যাগ করে, তাকে হত্যা করতে হবে।" ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়েও যারা শাস্তি ভোগ করে নি, তাদের সংখ্যা নিতান্ত সামান্য। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর রিদ্দার (রিদ্দাদ—দল ত্যাগ বা পৃথক হওয়া) যুদ্ধ-জয়ের পর এ আইন খুব কঠোরভাবে কার্যকারী করা হয়। ধর্ম পরিত্যাগ করা সম্পর্কে আইনটি খোলাফা-ই-রাশেদীনের ব্যবহার-বিধি দ্বারা সমর্থিত হয়েছে এবং ইজমা বা ঐক্যমত দ্বারা বিধিবদ্ধ রয়েছে। এ আইনের বৈধতা সম্পর্কে কোন মতবিরোধ নেই।

মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া চলবে না। তাকে প্রথমে সাবধান করে দিতে হবে এবং ইসলামে প্রত্যাবর্তন কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নেয়ার জন্য ৩ দিন সময় দিতে হবে। হানাফী ও হাম্বলী আইনবিদগণ ছাড়া আর সব আইনবিদই ধর্ম- ত্যাগের অপরাধের ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষদের সঙ্গে একই পর্যায়ভুক্ত করেছেন। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন যে, নারীদের ইসলামে ফিরে আসতে বাধ্য করার জন্য প্রহার থেকে শুরু করে কারাবাস পর্যন্ত শাস্তি দেয়া যেতে পারে। শিশু ও উন্মাদদের হত্যা করা চলবে না, যে পর্যন্ত না উন্মাদ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক না হয়। তরবারীর সাহায্যে মুরতাদকে হত্যা করতে হবে, আগুনে পুড়িয়ে নয়। কারণ, কেবল আল্লাহতালাই আগুনের মাধ্যমে শাস্তি বিধান করেন। ইমামের হুকুম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। অবশ্য কোন কোন আইনবিদ বিশেষ করে শাফেয়ী আইনবিদগণ মনে করেন যে, দাস যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তবে তার প্রভু তাকে হত্যা করতে পারেন।

যদি একদল মুরতাদ সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে হুমকী প্রদর্শন করে, তবে ইমাম জেহাদ ঘোষণা করে জেহাদের বিধান কার্যকরী করবেন। এ সম্বন্ধে যুদ্ধের আইনে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। (বিভিন্ন প্রকারের জেহাদের অধ্যায় দেখুন)।

মুরতাদ সম্পর্কীয় আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আমলে কয়েকজন বিশ্বাসীর মুশরিক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি। মক্কাবাসীদের সঙ্গে মহানবীর যে চুক্তি সম্পাদিত হয় (৬৩০ খৃস্টাব্দ), তার মাধ্যমে মক্কার যে সব অধিবাসী চুক্তিটি সম্পন্ন হবার পূর্বে মুসলিম সমাজে যোগ দিয়েছিল, তাদের নিজধর্মে ফিরে যাবার পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। রিদ্দার যুদ্ধের পর মুরতাদদের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। কারণ, ইসলাম তখন আরব উপদ্বীপে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। তখন থেকেই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ডের আইন বিধিবদ্ধ হয় এবং তার সুষ্ঠু রূপায়ণ ইমামের কর্তব্যরূপে পরিগণিত হয়।

রাষ্ট্রপ্রধান: ইমাম

খিলাফতের প্রশ্নের মত আর কোন প্রশ্ন নিয়ে ইসলামে এতখানি বাকবিতণ্ডা হয় নি। অন্য কোন বিষয়ে আইনের মূলনীতি লংঘনের এমন নজিরও আর বড় একটা পাওয়া যায় না। কারণ, এ বিষয়টি নিয়ে দলগত বিভেদ ও বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ ইমামতের (খিলাফতের) প্রকৃতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে নানাবিধ আলোচনা করেছেন এবং প্রত্যেকেই নিজের দলের মতামতকেই বড় করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু খিলাফতের ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে কেউ বেশী আলোচনা করেন নি।

ইসলামী আইনবিজ্ঞানে ইমাম রাষ্ট্রের প্রধান নন। স্বয়ং আল্লাহই রাষ্ট্রের মালিক। কার্যতঃ কিন্তু ইমামই সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার্যপরিচালনা করেন। নির্বাচন বা মনোনয়ন, যে ভিত্তিতেই তাঁকে নিয়োগ করা হোক না কেন, তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রে আইনের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে সমগ্র রাষ্ট্রের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা। ইমামতের প্রকৃতি ও কার্যক্রম আসলে রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত। কাজেই এ বিষয়টা এখানে ততটুকুই আলোচনা করা যাক, যতটুকু বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় প্রয়োজন হয়।

ইমামের কর্তব্য হল জেহাদের মারফত বিশ্বব্যাপী আল্লাহর বাণীর সার্বভৌমত্ব কায়েম করে ইসলামের মূল উদ্দেশ্যকে কার্যে পরিণত করা। যুদ্ধ ও শান্তিকাল উভয় সময়েই ইমাম এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এবং বিশ্বাসীদের সঙ্গে অবিশ্বাসীদের সম্পর্ক নিরূপণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন বাস্তবায়িত করেন। যুদ্ধ পরিচালনার হুকুম তিনিই জারী করেন, নব-বিজিত দেশে আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেন এবং আইন অমান্য করলে শাস্তি-বিধান করেন।

জেহাদ কখন চালিয়ে যেতে হবে বা কখন তা স্থগিত বা বন্ধ রাখতে হবে এসব ব্যাপারে তিনিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শত্রুপক্ষের দাবী স্বীকার করে নিয়ে কখন তাদের সঙ্গে সন্ধি বা শান্তির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সমঝোতায় আসতে হবে, তা তিনিই স্থির করেন।

ইমামের ক্ষমতা ব্যাপক হলেও তারও সীমা আছে। আইনের আওতার মধ্যে থেকেই তাঁকে এ ক্ষমতা পরিচালনা করতে হবে; অর্থাৎ দেখতে হবে, যাতে সুষ্ঠুরূপে আইনের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য সাধনের ওপর দৃষ্টি রেখে যদি ইমাম তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তবেই তিনি মুসলমানদের আনুগত্য দাবী করতে পারেন নতুবা তাঁকে ইমামের পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। তবে কি করে তাঁকে অপসারণ করা যাবে, সেটাই সমস্যা। অপসারণ করা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে।

বৈদেশিক সম্পর্ক নিরূপণের ব্যাপারে ইমাম তাঁর ক্ষমতা সমরাঙ্গণে যুদ্ধরত সেনাপতিদের বা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের ওপর ন্যস্ত করতে পারেন। অনেক সময়ে এঁদেরকে আপোষ-আলোচনা চালানো, জেহাদ পরিচালনা এবং যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি বণ্টনের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হত। কিন্তু যে কোন বিষয়ে ইমামের অনুমোদন করার বিশেষ ক্ষমতা (Veto power) রয়েছে। এ ক্ষমতা বলে তিনি ইচ্ছা করলে কোন চুক্তি অনুমোদন না-ও করতে পারেন এবং যে গৃহীত কর্মপন্থা বা ব্যবস্থা মুসলিম স্বার্থবিরোধী, তা' বাতিল করে দিতে পারেন। ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী কাজের জন্য তিনি তাঁর প্রতিনিধিদের (শাসনকর্তাদের) শাস্তি-বিধানও করতে পারেন।

পৃথিবীতে ইমাম আল্লাহর খলিফা। আল্লাহর খলিফা হিসেবে তাঁর কাজ হল আল্লাহর আইন কার্যে পরিণত করা। খারেজী দল ভিন্ন আর সব মাযহাব অনুযায়ী স্বাভাবিক এবং নীতিগতভাবে ইমামের শাসন অতীব প্রয়োজনীয়। ইমাম যদি মৃত্যুমুখে পতিত হন, কার্যপরিচালনায় অসমর্থ হয়ে পড়েন বা ইমামতের দায়িত্ব পরিত্যাগ করেন তবে নতুন ইমাম নিযুক্ত করা মুসলিম সমাজের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য বলে গণ্য হয়। কিন্তু ইমাম যদি শত্রুর হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁকে বন্দী করে রাখা হয়, সে ক্ষেত্রে তিনিই আইনগত ইমাম বলে গণ্য হবেন। মুসলিম সমাজ অবশ্যই যুদ্ধ বা কূটনীতির মারফত তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।

দারুল ইসলামের বিভিন্ন অংশে একাধিক ইমাম নিয়োগের ফলে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। কোন অমুসলিম শাসক কর্তৃক মুসলিম ইমামের স্বীকৃতি তখন খুব বড় প্রশ্ন ছিল না। কারণ, অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রদত্ত স্বীকৃতি মুসলিম আইনে বৈধ বলে গণ্য হয় না। এক মুসলিম ইমামের সঙ্গে অপর মুসলিম ইমামের আইনগত সম্পর্ক নির্ণয়ের ব্যাপারেই সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার উদ্ভব হয়। সাধারণ মুসলিম আইন-বিজ্ঞানে গতানুগতিকভাবে (Classical Theory) অবশ্য এ নীতি পেশ করা হয়েছে যে, যেহেতু আল্লাহ এক এবং আইনের বিধানও একটি বৈ দু'টি নয়, কাজেই শাসকও একজন হতে বাধ্য। আল-বাকিল্লানী ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুন প্রমুখ আইনবিদ এ নীতি পেশ করেছেন যে, যদি দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলসমূহ সুবিস্তীর্ণ হয় এবং কোন কোন এলাকা মাঝপথে সমুদ্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, তবে দুই বা ততোধিক ইমাম নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু একাধিক খলিফার (ইমামের) স্বপক্ষে আর কোন যুক্তি ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুন দেখাতে পারেন নি। ইমামদের পারস্পরিক আইনগত সম্পর্কও তাঁরা ব্যাখা করতে পারেন নি। ফলে একাধিক ইমামতের আইনগত ভিত্তি শিথিলই রয়ে গেছে। আর এর দরুন অনেক অননুমোদিত রাষ্ট্রের পত্তন হয়েছে। মুসলিম আইনবিদগণের বাস্তববিমুখিতাই এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এজন্যই 'অস্বীকৃতি' মুসলিম আইনে বড় কথা হয়ে রইল। বোধহয় একথা বলা যেতে পারে যে, আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য খিলাফতের অস্তিত্বকে ইসলামী জগতের পশ্চিমাঞ্চলের আইনবিদগণ তদানীন্তন পূর্বাঞ্চলের আইনবিদদের চাইতে অধিকতর আইনগত সমর্থন জানিয়েছেন। ইমামের প্রজা বা বিদেশী হিসাবে অমুসলিমদের ওপর আইন প্রয়োগ করার বিষয়টি পরবর্তী দুই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।

মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল: দারুল ইসলাম

দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হলেও এ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা পেশ করা হয় নি। আমরা জানি যে, ইসলামী আইনে ব্যক্তিকে মুসলিম সমাজের সদস্য হিসেবেই এ সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়; যে ভূখণ্ডে তিনি বাস করেন, ইসলামী আইন তার সঙ্গে ব্যক্তিকে সংযুক্ত করে না। এ সত্ত্বেও মুসলমানদের একটি অঞ্চলে বাস করতেই হয়। কাজেই তারই আলোকে আইন-বিধি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। এ আইনে মুসলিম সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ণীত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মর্যাদা নির্ধারিত হয় নি। আইনের দৃষ্টিতে কোন এলাকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ইসলামের প্রতি সেখানকার অধিবাসীদের প্রকৃত আনুগত্যের ওপরই নির্ভর করে, ইসলামের প্রতি আনুগত্যের নিছক ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না। তাই যে অঞ্চল বা রাষ্ট্রের অধিবাসীরা মুসলিম আইন পালন করেন, তাকে দারুল ইসলাম (মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল) বা রাষ্ট্র নামে অভিহিত করা হয়।

দারুল ইসলামের সংজ্ঞাটি যে খুব ব্যাপক, তাতে সন্দেহ নেই। দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসীকে কিংবা তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যককে যথাযথভাবে আইনের বিধান পালন করতে হবে, না এতে অন্য কোন শর্ত রয়েছে তা এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবদুল কাহির আল-বাগদাদী বলেন যে, যে অঞ্চলের অধিবাসীরা দ্বিধাহীন চিত্তে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং যেখানে জিম্মীদের ওপর মুসলিম রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার নামই দারুল ইসলাম। আবার অনেক আইনবিদ বলেন যে, কোন মুসলিম ভূখণ্ড দারুল ইসলাম বলে পরিগণিত হবে, যখন বিশ্বাসীগণ ধর্মীয় কর্তব্য স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন।

দারুল ইসলামের আর একটি মাপকাঠি হল এই যে, এখানে শুক্রবারে জুমার নামাজ এবং ঈদের উৎসব প্রতিপালিত হওয়া চাই। আইনবিদগণ আরও বলেন যে, যেখানে খলিফার প্রতিনিধিরূপে ওয়ালী অবস্থান করেন কেবল সেখানেই এ নামাজ পড়া যেতে পারে। ওয়ালীর কর্তৃত্বাধীনেই কেবল নামাজ সিদ্ধ বলে গণ্য হয়। আইনের সুপরিচালনার জন্য এখানে একজন বিচারকও (কাজী) থাকা চাই।

দারুল ইসলামের ভূখণ্ড (আল-ওয়াতান) শক্তিবলে বা শান্তিপূর্ণ উপায়ে লাভ করা যেতে পারে। প্রত্যেক শুক্রবার মসজিদের ইমামের মিম্বরে একটা চিহ্ন পেশ করা হয়। : এ চিহ্নটি যদি তরবারী হয় তবে বুঝতে হবে যে, এ নগর বা দেশ শক্তিবলে দখল করা হয়েছে। যদি চিহ্ন হিসেবে কাঠের তৈরী লাঠি রাখা হয়, তবে বুঝতে হবে এ দেশ বা শহর শান্তিপূর্ণ উপায়ে অর্জিত হয়েছে। কায়রো নগরী শান্তিপূর্ণ উপায়ে দখল করা হয়েছে। দামেস্ক সম্পর্কে অবশ্য মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, নগরের এক অর্ধাংশ শক্তিবলে ও অপর অংশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে দখল করা হয়। সুতরাং, একটি কাঠের তরবারী দিয়ে দু'টি চিহ্ন একত্রিত করা হয়েছে। মদিনার অধিবাসীরা স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুল করে; তাই এখানকার মিম্বরে কোন চিহ্নই স্থান পায়নি।

কিন্তু যদি স্বাধীনভাবে নামাজ পড়া সম্ভব না হয়, তবে সে মুসলিম ভূখণ্ডে আর দারুল ইসলাম বলে গণ্য হবে না। হানাফী আইনবিদগণ দারুল ইসলামের দারুল হারবে পরিণত হবার তিনটি উপায় নির্দেশ করেছেন :

প্রথমতঃ যদি অবিশ্বাসীদের আইন-ব্যবস্থা কার্যকরী হয়; দ্বিতীয়তঃ, যদি কোন ভূখণ্ড অমুসলিম অঞ্চল দ্বারা দারুল ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; তৃতীয়তঃ, যদি এখানে মুসলমান ও জিম্মীদের পক্ষে নিরাপদে বসাবস করা সম্ভব না হয়।

কোন কোন হানাফী আইনবিদ বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন যে, শরিয়তের জায়গায় যে মুহূর্তে অবিশ্বাসীদের আইন-বিধি কার্যকরী হয়, তখনই সে অঞ্চল আর দারুল ইসলামের অংশ বলে গণ্য হতে পারে না। ফলে, বিশ্বাসীগণের পক্ষে এখানে বাস করা যদি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তবে তাদের দারুল ইসলামে হিজরত করতেই হবে। অবশ্য মুসলমানরা যদি দেখেন যে, অমুসলিমদের আইন কার্যকরী করা সত্ত্বেও তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন এবং নামাজ পড়তে কোন বাধা নেই তবে আইনের চোখে তা মুসলিম অঞ্চল বলে গণ্য হবে। এর ফলে হয়ত মুসলমানেরা এখানে আবার ফিরে আসতেও পারেন; অথবা যারা রয়ে গেলেন, তাঁরা অমুসলিমদের ইসলামে আহ্বান জানাবার সুযোগ পেলেন।

বৈধভাবে মুসলিম আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ও সঙ্কোচনের ওপরে নির্ভর করেই মুসলিম আইনবিদগণ কোন রাষ্ট্রকে দারুল ইসলাম বা দারুল হারব হিসেবে গণ্য করেছেন। যদি গুটিকয়েক বিশ্বাসীও মুসলিম আইন মেনে চলেন, তবে এ স্থানে আইনের চোখে মুসলিম অঞ্চল বলে সাব্যস্ত হবে। উনবিংশ শতাব্দীতে নেতৃস্থানীয় মুসলিম সুধীবৃন্দ পাক-ভারত উপমহাদেশের ব্যাপারে এ ব্যাখ্যাকেই সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও উপমহাদেশটি ইংল্যাণ্ডের অধীনে ছিল, তবুও তাকে মুসলিম অঞ্চল বলে গণ্য করা হয়; কারণ, শাসক মুসলমান না হলেও চলে যদি শরিয়তের অধিংকাংশ বিধান রূপায়িত করা হয়। কোন দেশে কাজী অমুসলিম শাসক কর্তৃক নিযুক্ত হলেও (মুসলমানদের সম্মতি নিয়েই তাঁকে নিযুক্ত করা হত) তিনি মুসলমান হিসেবে যদি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন যাতে নামাজ ঠিকমত আদায় করা হয় ও শরিয়তের বিধান সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয় তবে সে দেশ মুসলিম দেশ বলে গণ্য হবে।

মুসলিম অঞ্চলের শ্রেণীবিভাগ

মুসলিম আইনবিদগণ ইসলামী ভূখণ্ডকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নানা বিভাগ ও উপ-বিভাগে বিভক্ত করেছেন। কোন কোন লেখক গোষ্ঠীগত বা উপজাতীয় বিভাগের ওপর জোর দিয়েছেন। আবার কেউ বা রাজবংশের ওপর ভিত্তি করে বিভাগ নির্ণয় করেন (একটি অঞ্চলের এক এক রাজবংশের রাজত্বের ওপর ভিত্তি করে এ বিভাগ নিরূপণ করা হয়েছে, যেমন উত্তর আফ্রিকায় আগলাবিগণ, মিসরে ফাতেমিগণ ও ইরানে বুয়াহিদগণ)। অন্যান্য লেখক বিশেষ করে ভূগোল-বিজ্ঞানীগণ আঞ্চলিক ভিত্তিতেই বিভাগ নির্ধারণ করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, আল মোকাদ্দসী দারুল ইসলামকে আরব ও আজমে (ইরান) বিভক্ত করেছেন। আজমকে আবার আটটি অঞ্চলে এবং আরবকে ছটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। 'হুদুদুল আলমে'র লেখক যে কেবল অমুসলিম অঞ্চল নিয়েই লিখেছেন তা নয়, অমুসলিম-অধ্যুষিত ভূখণ্ডের ওপরও আলোকপাত করেছেন। তিনি পৃথিবীকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন : এশিয়া, ইউরোপ ও লিবিয়া। এ তিনভাগকে আবার একান্নভাগে ভাগ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ভিত্তিতে ইসলামী অঞ্চলকেও বিভক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু মুসলিম আইনে এসব শ্রেণীবিভাগের বৈধতা স্বীকৃত হয় নি। কারণ, এ আইন-বিধানে মুসলিম কর্তৃত্বের বিভাগ বা গোষ্ঠীগত এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হয়নি। কেবলমাত্র একটি উম্মা (উম্মতে মোহাম্মদ) বা জাতির অস্তিত্বই এ আইন ব্যবস্থায় স্বীকৃত হয়েছে। যিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন, তিনি যে বংশের শাসক দ্বারাই শাসিত হোন না কেন এবং দারুল ইসলামের যে অঞ্চলের অধিবাসীই হোন না কেন, তিনি এই উম্মতের সদস্য বলেই গণ্য হবেন। মুসলমানরা নির্বিবাদে এক অঞ্চল থেকে অপর অঞ্চলে যাতায়াত করতে পারতেন। এ ব্যাপারে আনুগত্যের কোন প্রশ্নই উঠত না। কারণ, সব মুসলিম শাসককে নিজ নিজ রাষ্ট্রে একই আইন-বিধি রূপায়িত করতে হয় এবং একই ধর্ম পালন করতে হয়। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন (মৃত্যু ১৪০৬ খৃস্টাব্দে), মরক্কী দার্শনিক ইবনুল আরাবী (মৃত্যু ১২৪০ খৃস্টাব্দ), ইবনে জুবাইর (মৃত্যু : ১২২৭ খৃস্টাব্দ) ও ইবনে বতুতা প্রমুখ পরিব্রাজক ও প্রখ্যাত মুসলমান বহুদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং স্বচ্ছন্দে তাঁদের বাসস্থান পরিবর্তন করেন। এ থেকেই এটা প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম জগতে সাংস্কৃতিক ঐক্য (রাজনৈতিক ক্ষমতা-বিভাগ ও মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর ভৌগোলিক পার্থক্য সত্ত্বেও) স্থায়ী ঐক্য-বন্ধনীর কাজ করে।

আইন ও ধর্মবেত্তাগণ দারুল ইসলামের কোন শ্রেণীবিভাগ স্বীকার করেন নি, কিন্তু স্থানের পবিত্রতা ও ধর্মীয় তাৎপর্যের দিক থেকে কোন কোন অঞ্চলের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। আল-মাওয়ার্দী দারুল ইসলামকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন : ‘হারাম,’ হেজাজ ও অবশিষ্ট মুসলিম ভূখণ্ড। শরিয়তের এ তিন বিভাগের প্রত্যেকটির ওপর কতকগুলো নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শুল্ক ধার্য, অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার ও ভূমির মালিকানা—এ সব বিষয় এ বিধানগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

নিরাপদ স্থানকে ‘হারাম’ বলে। কোন কোন আইনবিদের মতে এর মধ্যে মক্কা ও এর শহরতলীকে ধরতে হবে। অন্যান্যদের মতে মক্কা ও মদিনা এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। শেষের মতটাই নির্ভুল বলে সাব্যস্ত হয়েছে। পরবর্তী যুগের আইনবিদগণ দুটো ‘হারাম’ বা নিরাপদ স্থানের উল্লেখ করেছেন (আল-হারামাইন আশ-শারিফাইন) মক্কা ও মদিনা। এ নগরী দুটির হেফাজত ও সংরক্ষণ খলিফার বিশেষ কর্তব্য বলে গণ্য করা হয়। হাদিসের মতে এ দুটো নগরী পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থানে অবস্থিত রয়েছে।

‘হারাম’ অঞ্চলে কেবল মুসলমানরাই গমনাগমন ও বসবাস করতে পারেন। কোন অমুসলিমকেই—তা সে কেতাবীই হোক আর মুশরিকই হোক—এসব নগরীতে বসবাস করতে দেয়া হয় না; কিংবা এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে দেয়া হয় না। ইমাম আবু হানিফা অবশ্য কেতাবীদের এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গমনাগমন করার অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু বসবাস করতে অনুমতি দেন নি। কিন্তু অন্যান্য আইনবিগণ এ ব্যতিক্রমটুকুও মেনে নেন নি। সাধারণতঃ হারামের বাসিন্দাগণকে যুদ্ধে যোগ দিতে হয় না। কারণ, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এ অঞ্চলে রক্তপাত করা নিষিদ্ধ করে গেছেন। কোন কোন আইনবিদের মতে মক্কার অধিবাসীগণ যদি বিদ্রোহও করেন, তবু তাদের শাস্তি দেয়া চলবে না। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ ইমাম কর্তৃক এসব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা অনুমোদন করেছেন। হারাম অঞ্চলের গাছপালা ও জীবজন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। তাই, এখানকার গাছপালা কেটে ফেলা বা জীবজন্তুকে ধ্বংস বা হত্যা করা অনুমোদন করা হয় নি। কিন্তু গৃহপালিত পশু হত্যা ও কৃষিজাত দ্রব্য কর্তন করা চলবে। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য এ নিয়মগুলো সব সময়ে প্রতিপালিত হয় নি। তবু, এ নিয়মগুলোর মধ্যে ইসলামের আদি আবাসভূমির প্রতি مسلمانوں গভীর শ্রদ্ধা প্রতিভাত হয়েছে।

মুসলিম অঞ্চলের শ্রেণীবিভাগের ক্ষেত্রে হেজাযের স্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে। মুসলমানদের দৃষ্টিতে হারাম অঞ্চলের পরেই হেজাযের স্থান। এ অঞ্চলে অমুসলিমগণ পরিভ্রমণ করতে পারেন। কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার তাদের নেই। হাদিসে বর্ণিত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) একটি বাণীই এ নিয়মের ভিত্তি রচনা করেছে: "আরব উপদ্বীপ থেকে অবিশ্বাসীদের বিতাড়িত কর।" কোন কোন আইনবিদ সংকীর্ণভাবে এ নীতির ব্যাখ্যা করেছেন এবং আরব উপদ্বীপ বলতে শুধু মক্কা ও মদিনাকেই বুঝেছেন। কেউ কেউ হেজাযকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবার কেউ বা গোটা আরব উপদ্বীপকে এর মধ্যে ধরেছেন। যদি কোন অমুসলিম হেজায পরিভ্রমণকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন, তবে তার মৃতদেহ এখান থেকে অপসারণ করে এ অঞ্চলের বাইরে কবরস্থ করতে হবে। কারণ, এ অঞ্চলে কবর দেয়ার অর্থ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেয়া। কেননা, এ অঞ্চলে অমুসলিমের স্থায়ী বসবাস আইন-বিধানে অনুমোদিত হয় নি।

পরিশেষে বলা যায় যে, হেজাযকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখার কারণ এই যে, এই অঞ্চলেই রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুয়ত লাভ করেন, ইসলাম প্রচার করেন, আর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ সময় এখানেই অতিবাহিত করেন। রাসূলের (সঃ) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সব কিছুই হেজাযেই ছিল। তাঁর বহিরাচ্ছাদন (আলখেল্লা) ও পোশাক অবশ্য হেজাযের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হযরতের খফিলাগণ খিলাফতে অধিষ্ঠিত হবার সময়ে এগুলোকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই রক্ষা করে এসেছেন।

তৃতীয় পর্যায়ে পড়ে দারুল ইসলামের অবশিষ্ট অংশ। আরব উপদ্বীপের বাইরে যে সব অঞ্চল মুসলানদের দখলে এসেছিল এগুলো এরই অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম আইনে এ বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্দেশ করা হত না। কেতাবীগণ এ অঞ্চলে জিম্মী হিসেবে বসবাস করতে পারতেন। আমান লাভ করে হারবীগণও এ অঞ্চল সফর করার অনুমতি লাভ করতেন। জিযিয়া কর প্রদান সাপেক্ষে মুশরিকদেরও এখানে বসবাস করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত না। এ অঞ্চলকে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়:

(ক) 'উশর' অঞ্চল: যে অঞ্চলের আদি মালিক বা বাসিন্দাগণ মুসলমান হয়েছে। (খ) দখলীকৃত অঞ্চল (১): যা' মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়; এ অঞ্চলও উশর ভূমি নামে অভিহিত। (গ) দখলীকৃত অঞ্চল (২): যার অধিকার সাবেক বাসিন্দাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়; কিন্তু এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের রাজস্ব বা খারাজ দিতে হত। (ঘ) মাওয়াত বা পতিত জমি: মুসলমানগণ কর্তৃক সংস্কারের ফলে যে অঞ্চল উশর ভূমিতে রূপান্তরিত হয়।

বিভিন্ন পর্যায়ের ভূমিব্যবস্থা সমন্বিত অঞ্চলের শাসন এবং আইনের বিধান অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনীতির আওতায় পড়ে, কাজেই এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশী: হারবী মুস্তামিনগণ

📄 মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশী: হারবী মুস্তামিনগণ


বিদেশী নাগরিক ও মুসলিম আইন

মুসলিম আইনে কেবল মুসলমানেরাই পূর্ণ আইনগত অধিকার ভোগ করলেও অমুসলিমগণও মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অনুমতি পেলে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে কতকগুলো আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারেন। মুসলিম আইনে মুসলমানই পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার ভোগ করেন; মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করেই আর সবাই বিভিন্ন প্রকার অধিকার লাভ করেন। আইনের চোখে যারা পূর্ণাঙ্গ অধিকার ভোগ করে না, তারা হচ্ছে হারবী, মুস্তামিন ও জিম্মী। জিম্মীদের সম্পর্কে পরবর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হবে। তাই এখানে আর সে আলোচনার প্রয়োজন নেই।

হারবী

মূলতঃ যে দেশের লোকই হোক না কেন, দারুল হারবে অবস্থানকারীদেরই হারবী বলা হয়। এদের মধ্যে কিতাবী ও মুশরিক উভয়ই থাকতে পারেন; যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে দারুল হারবের সঙ্গে দারুল ইসলামের যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান থাকে, সুতরাং এ- দিক থেকে বিদেশী হারবীদের সঙ্গেও মুসলমানদের যুদ্ধগত সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে। মুশরিক হারবী মুসলমানদের মোকাবেলা করলেই আল-কোরআনের এ নির্দেশের (৯: ৫) আওতায় এসে পড়বে: "মুশরিকদের যেখানে পাও, মেরে ফেল।" কেতাবী হারবীর জীবনরক্ষা করা যেতে পারে; কিন্তু তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কয়েদ করা চলবে এবং দাসেও পরিণত করা যেতে পারে। অবশ্য বিশেষ অনুমতি বা আমান (নিরাপত্তার সনদ) নিয়ে হারবী নির্বিবাদে দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারেন। এ সনদ বলে তিনি তার পরিবার ও ধন-সম্পদ নিয়ে কিছুদিনের জন্য দারুল ইসলামে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে পারেন।

আমান

আমানকে নিরাপত্তাচুক্তি বা সনদ বলা যেতে পারে। এর ফলে হারবী দারুল ইসলামে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার লাভ করে। দারুল ইসলামে বসবাস করার সময় মুসলমানদের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থার অবসান হয় এবং হারবী তখন "মুস্তামিন" বা নিরাপদ ব্যক্তির মর্যাদা লাভ করেন। আমানের মেয়াদ এক বছরের কম হতে হবে। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে তাকে জিযিয়া দিতে হবে এবং তিনি জিম্মা পর্যায়ভুক্ত বলে গণ্য হবেন।। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে।

অস্থায়ীভাবে যুদ্ধ-বিরতির (মুহা'দানা অথবা মুও'য়াদা) ফলে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসী মুসলিমগণ আমান প্রদান করতে পারেন। প্রথমটির নাম সরকারী আমান। আর দ্বিতীয়টিকে বেসরকারী আমান বলা যেতে পারে।

সরকারী আমান

ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কর্তৃক সাধারণতঃ একটি ভূখণ্ডের সমগ্র অধিবাসীকে বা একটি নগরের অধিবাসীকে বা জনকয়েক হারবীকে প্রদান করা হয়। শান্তিচুক্তিতে প্রায়ই এই ধরনের আমানের প্রত্যক্ষ উল্লেখ থাকে। এর শর্তানুসারে হারবীগণ নিরাপদভাবে চলাফেরা করতে পারেন। সেনাপতি আলাপ-আলোচনা চালাবার জন্য এক বা ততোধিক হারবীকে আমন প্রদান করতে পারেন। আমানের আওতায় থাকাকালে হারবীগণ মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ দাবী করতে পারেন। আমানের উদ্দেশ্য সাধিত হবার পর মুস্তামিনকে তার নিজের দেশে নিরাপদভাবে পৌছে দেয়া হয়।

হারবীর অনুরোধক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক যেকোন মুসলিম হারবীকে বেসরকারী পর্যায়ে আমান প্রদান করতে পারেন। এ আমান মুক্ত, দাস বা নর ও নারী সব মুসলিমই দিতে পারেন। বিশ্বাসী মুসলমানের আমান-প্রদানের ক্ষমতা সম্পর্কে অবশ্য আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। দাস এবং নারী ও পুরুষকে আমান প্রদান করার অধিকার মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আইনবেত্তাগণ অনুমোদন করেছেন। জেহাদী না হলে কিংবা প্রভু কর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত না হলে দাসকে আমান প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করতে হানাফী আইনবিদগণ অস্বীকার করেছেন। আউযায়ী খারিজীদের পর্যন্ত আমানের অধিকার প্রদান করেছেন। নীতিগতভাবে শিশু ও উন্মাদকে সাধারণতঃ আমান প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয় নি। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর মতে বয়স্ক হলেই কেবল শিশুগণ আমান প্রদানের অধিকার লাভ করবে। আউযায়ী দশ বছর বয়স্ক শিশুকে আমান প্রদানের অধিকার দান করেছেন। সব মতাদর্শের আইনবিদগণই নীতির দিক থেকে জিম্মীদের আমান প্রদানের ক্ষমতা অস্বীকার করেছেন।

আমান প্রদানের পদ্ধতি খুবই সহজ।' এ নিয়ে আইনবিদদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। যে ভাষাভাষীই হোক না কেন, হারবীর পক্ষ থেকে আমান লাভের মনোভাব জানবার সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতিসূচক একটি বাক্য বা ইশারাই আমান প্রদানের পক্ষে যথেষ্ট। আমান প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে সামান্য একটি ইঙ্গিত দান বা অভিবাদনই হারবীকে নিরাপত্তার অধিকার লাভের নিশ্চয়তা দান করে। যদি কোন বিশ্বাসী আমান না দেয়ার সিদ্ধান্ত করেন, কিন্তু তার ইঙ্গিতে হারবীগণ আমান লাভ করেছেন বলে মনে করে থাকেন, তবে তা বৈধ আমান বলে গণ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে আল-হারমুযানের ঘটনাটি মনে করা যেতে পারে। এখানে আমান প্রদানের কোন ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ছলে বা কৌশলে না হলেও অন্ততঃপক্ষে হারমুযান আমান পেয়ে গিয়েছে, এ কথাই অপ্রত্যক্ষভাবে ধরে নেয়া হয়েছিল। আমান না নিয়েই যদি কোন হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করে এবং পরে আমান লাভ করতে না পারে, তবে তার শান্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। ইমাম শাফেয়ী এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, তাকে চার মাসের সময় দেয়া উচিত। চার মাস পর তাকে হয় দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করে যেতে হবে (তাকে নিরাপদে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেয়া হবে), নতুবা জিযিয়া প্রদান করে জিম্মী পর্যায়ভুক্ত হতে হবে। অন্যান্য আইনবিদ বলেছেন যে, এই হারবীকে বহিষ্কৃত করা উচিত। অবশ্য দারুল হারবে পৌঁছা পর্যন্ত অবশ্যই তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোন হারবী কার্যোপলক্ষে ইমামের কাছে কোন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে, তবে তাকে আমান ব্যতিরেকে ইমামের কাছে যেতে দেয়া হত। কারণ, তখন সে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা (immunity) লাভের অধিকারী। কিন্তু ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, দূতের কোন পরিচয়-পত্র নেই কিংবা সে আদৌ কোন বাণী নিয়ে আসে নি, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান বৈধ হবে।

ভুলক্রমে বা জাহাজডুবীর ফলে হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারে এবং আমান ব্যতিরেকে মুসলমানদের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হতে পারে। অধিকাংশ আইনবিদ বলেন যে, এক্ষেত্রে ইমাম স্বেচ্ছায় হারবীকে মুক্ত করে দিতে পারেন বা অবস্থা বিবেচনা করে অবিলম্বে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। তিনি ক্ষতিপূরণ নিয়েও তাকে মুক্ত করতে পারেন।

মুস্তামিনদের অধিকার ও কর্তব্য

কোন হারবী যখন মুস্তামিন হিসেবে গণ্য হয়, তখন তার সঙ্গে তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসতে অনুমতি দেয়া হয়। হেজাযের পবিত্র নগরগুলো ছাড়া দারুল ইসলামের সব শহরেই সে পরিভ্রমণ করতে পারবে। জিম্মীর মর্যাদা লাভ করে জিযিয়া প্রদান করলে সে দারুল ইসলামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে। সে জিম্মী মহিলাকেও বিবাহ করতে পারে এবং তাকে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু হারবী যদি মহিলা হয় এবং কোন জিম্মীকে বিবাহ করে, তবে তার স্বামীকে সে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। কারণ, এতে শত্রুপক্ষ দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। নিরাপদভাবে চলাফেরা করার অধিকার ভোগকালে মুস্তামিন আইনের আওতায় ব্যবসায়-বাণিজ্যও পরিচালনা করতে পারবে।

আবার মুস্তামিনকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানাদিকে সম্মানের চক্ষে দেখতে হবে এবং সে এমন কিছু বলবে না বা করবে না যাতে ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পেতে পারে। তার কার্যক্রমে ইসলামের স্বার্থ যাতে বিপন্ন না হয়, সে সম্পর্কে তাকে সতর্ক থাকতে হবে। সে যদি মুস্তামিনের ছদ্মবেশে দারুল ইসলামে গুপ্তচর বৃত্তির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করে থাকে, তবে তাকে মৃতুদণ্ড দান বিধিসম্মত। সামরিক ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র কিংবা দাস-দাসী বা অন্য কোন রকমের হাতিয়ার কিনবার অধিকার তার নেই। এগুলো তার পক্ষে নিষিদ্ধ পণ্য (contraband) হিসেবে গণ্য হবে; কারণ, এর ফলে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য ক্রয় করা অবৈধ। এ ধরনের দ্রব্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মুস্তামিনকে তার টাকা দিয়ে দিতে হবে এবং মুস্তামিনও বিক্রেতাকে অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে দেবে। অস্ত্রশস্ত্রের বেচাকেনা যদি বন্ধ নাও হয়ে থাকে, তবু কোনমতেই হারবীকে এসব অস্ত্রশস্ত্র দারুল হারবে নিয়ে যেতে দেয়া চলতে পারে না। সুদভিত্তিক চুক্তিও নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে।

মুস্তামিন যদি আইন ভঙ্গ করে বা কোন অপরাধ করে, তবু তার আমান নষ্ট হবে না। কিন্তু তাকে সমুচিত শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী দু'রকমের নিয়ম লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি সে সম্মান ও আদব-কায়দা বিষয়ক আচার লঙ্ঘন করে, তবে তার ফলে তার আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে, একথা বলে তাকে সাবধান করে দিতে হবে। আবার সে যদি দেওয়ানী বা ফৌজদারী বিষয়ক কোন আইন ভংগ করে, তবে তাকে বিশ্বাসী বা জিম্মীদের মতই সমানভাবে শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ বলেছেন যে, মুস্তামিনকে শাস্তি দেয়া চলবে না; সে ব্যভিচার করলেও তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তির বিধান নেই; তবে সে যদি চুরি করে বা ডাকাতি করে, তবে সে অপহৃত জিনিস তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সে যদি কোন মুসলমানকে হত্যা করে বা তার হাত কেটে ফেলে, তবে তাকে হত্যা করা বা তার হাত কেটে ফেলা বৈধ। যদি দুই বা ততোধিক মুস্তামিন মুসলিম বিচারকের কাছে হাজির হয়ে বিচারপ্রার্থী হয় ও শরিয়তের বিধান দ্বারা পরিচালিত হতে চায়, তবে তাঁরা সে বিচার পরিচালনা করতে পারবেন। কিন্তু যদি কোন মুসলমান মুস্তামিনকে আক্রমণ করে, তবে মুসলমানটি ইমাম ও তাঁর প্রতিনিধিদের (শাসনকর্তা) কাছে শাস্তি ভোগ করবে। মুসলমানরাও শরিয়ত বিরুদ্ধ ব্যবসায়-বাণিজ্যে লিপ্ত হবার বা অবৈধভাবে জিনিসপত্র খরিদ করার অধিকার পাবে না।

আমানের মেয়াদের সমাপ্তি

আমানের মেয়াদ (এক বছরের বেশী নয়) ফুরিয়ে যাবার ফলে বা মুস্তামিন দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করলে আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। সে যদি আবার দারুল ইসলামে ফিরে আসতে চায়, তবে তাকে নতুন করে আমান সংগ্রহ করতে হবে। ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, মুস্তামিন গোপনে দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য সাধনে লিপ্ত আছে বা তার কার্যাবলী মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী, তবে আমান নাকচ করে দেয়া যেতে পারে ও ইমাম মুস্তামিনকে ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত করে দিতে হবে। কোন মুসলমান যদি আমান দিয়ে থাকেন ও আমান ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে গণ্য হয়, তবে ইমাম সে মুসলমানকেও শাস্তি দিতে পারেন।

মুস্তামিন যদি তার ধন-সম্পদ দারুল ইসলামে রেখে ফিরে যায় এবং দারুল হারবে হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে সে সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীগণ দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। ইসলামী রাষ্ট্র তা বাজেয়াপ্ত করে নেবে। কিন্তু মুস্তামিন যদি দারুল ইসলামে অবস্থানকালে মারা যায়, তবে তার প্রতি প্রদত্ত আমান এ সম্পত্তির ওপরও প্রযোজ্য হবে এবং তার উত্তরাধিকারীগণ ইচ্ছা করলে মৃত ব্যক্তির ধন-সম্পদ দারুল ইসলামের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে।

আমানের গুরুত্ব

মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ স্থাপন করার ব্যাপারে আমান প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বক্ষণ যুদ্ধ- ভিত্তিক ও অশান্তিপূর্ণ মনে করা হত। তাই আমানের অবর্তমানে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনও এক রকম অসম্ভব ছিল। মুসলিম অমুসলিম সম্পর্কের মধ্যে আমান এমন সহজ স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল, যার ফলে মুসলিম ও অমুসলিম একে অপরের রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ করার অনুমতি লাভ করে। মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করার সময় আমান বিদেশীদের পাসপোর্টের কাজ করে। সাধারণভাবে যখন মুসলমান ও অমুসলমানদের পক্ষে দারুল ইসলাম থেকে বাইরে যাওয়া বা দারুল ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না, তখন পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র ছাড়া কোন জিনিসপত্রের আদান-প্রদানও সম্ভব হত না। আমানের মারফত সীমান্তে লোক ও মালপত্র চলাচল অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে এসেছিল। আমান না থাকলে দুটি বিরোধী দেশের মধ্যে বেআইনী আদান-প্রদান সংঘটিত হত ও এদের মধ্যে খুব বেশী মনকষাকষিও শুরু হয়ে যেত। যুদ্ধ-বিরতি কালে বার বার আমান প্রদানের ফলে মুসলিম ব্যবসায়ী ও বিদেশী রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা খুব সহজ হয়ে পড়ে।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম

📄 অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম


অমুসলিম রাষ্ট্র: দারুল হারব

দারুল ইসলাম হল সেই রাষ্ট্র যেখানে মুসলিম শাসক কর্তৃক মুসলিম আইন বাস্তবে রূপায়িত হয়; কিংবা সেই রাষ্ট্র যা অমুসলিমদের অধিকারে গিয়ে পড়লেও অনেকটা স্বাধীনভাবে মুসলিম আইন পালন করতে সক্ষম হয়। আর যে রাষ্ট্রে অমুসলিম আইন রূপায়িত হয় এবং যেখানে মুসলমান তাঁর নিজস্ব বিধি-বিধান পালন করতে পারেন না, তা' অমুসলিম ভূখণ্ড বলে বিবেচিত হবে। কাজেই দারুল হারব হল এমন একটি ভূখণ্ড যা মুসলিম আইনের সম্পূর্ণ আওতাবহির্ভূত। আইনগত সাম্যের ভিত্তিতে দারুল ইসলামের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যোগ্যতা দারুল হারবের নেই। কাজেই এ দু'ভূখণ্ডের মধ্যে কোন ব্যবস্থা বা চুক্তি সম্পাদিত হলে তা' স্বল্পস্থায়ী হতে বাধ্য। কারণ, এর মধ্যে অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতিও দেয়া হয় না, কিংবা উভয় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক যুদ্ধাবস্থার ক্ষেত্রেও কোন পরিবর্তন হয় না।

মুসলিম আইনের বাইরে হলেও দারুল হারবকে পূর্ণ নৈরাজ্য (No man's land) বলে মনে করা চলে না; কারণ, এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে বলে দারুল হারব মুসলিম আইনের আওতায় দারুল ইসলামের সঙ্গে মুসলিম সামরিক আইন অনুযায়ী সম্পর্ক নির্ণয়ের অধিকার লাভ করে। যুদ্ধকালে মুসলমানেরা তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী অমুসলিম যোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন।

জেহাদের বিরতিকালে যখন অস্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিদেশী শাসক বা শাসকদের ইসলাম আংশিকভাবে স্বীকার করে নেয়। কিন্তু ইসলামের এ স্বীকৃতি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতির (Recognition) পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ, অমুসলিম শাসকদের কার্যকলাপ ইসলাম অনুমোদন করলে তবেই বলা যায় যে, ইসলাম আধুনিক পরিভাষার সংজ্ঞা অনুযায়ী তাদের 'অনুমোদন' দান করেছে। ইসলাম যে অমুসলিম শাসনকে আংশিক স্বীকৃতি দেয় তার অর্থ হল এই যে, কোন অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অস্তিত্ব না থাকলে মানবসমাজ টিকে থাকতে পারে না। এদিক থেকে নীতিগতভাবে এ বিধান মেনে চলা হয় যে, যদি ঘটনাক্রমে কোন মুসলমানকে অমুসলিম রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে হয়, তবে তিনি সেখানকার কর্তৃপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন কিংবা তার বিরোধিতা করতে পারবেন না। অবশ্য ইমাম কর্তৃক তিনি যদি অনুরূপ কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করার জন্য আদিষ্ট হন, তবে সেকথা স্বতন্ত্র। আমান মারফত যদি তিনি এ অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন, তবে নিজেদের আইন-বিধান মেনে চলার মত অমুসলিম আইন মানতেও তিনি বাধ্য থাকবেন। এ রাষ্ট্রের আইন ও মুসলিম আইনের মধ্যে যদি কোন বিরোধ দেখা দেয়, তবে তিনি কোনটি পালন করবেন, সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই (অর্থাৎ মুসলিম আইনই তিনি পালন করবেন)।

আমানের অধীনে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানদের কার্যাবলী

অমুসলিমগণ যেমন আমানের অধীনে তাদের অধিকার ও কার্যাবলীর ওপর কয়েকটি পরিসীমা স্বীকার করে নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করেন, তেমনি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত না হলেও মুসলমানগণও অনুরূপ পরিসীমার আওতায়ই অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন। মুসলমানরা যে পর্যন্ত আমানের অধিকার ভোগ করেন, সে পর্যন্ত তারা অমুসলিমদের কোন রকম ক্ষতিসাধন করতে পারবেন না। তা ছাড়া যদিও সুদ, মদ ও শূকরের গোশত বিক্রয় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইনে বৈধ বলে বিবেচিত হয়, তবু এগুলোর বিষয়ে অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে মুসলমানদের মুসলিম আইন মেনে চলতে হবে। কারণ, আগেই বলা হয়েছে যে, যে কোন মুসলমান যে দেশেই বাস করুন না কেন, মুসলিম আইন তার ওপর সব সময়েই প্রযোজ্য হবে এবং দারুল হারবে থাকাকালে কোন মুসলমান যদি কোন ওয়াদা দিয়ে থাকে, বা চুক্তি সম্পাদন করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে গেলেও তাকে তা পালন করতে হবে। আবার সেখানে থাকাকালে সে যদি টাকা কর্জ নিয়ে থাকে বা কোন জিনিস চুরি করে থাকে, তবে দারুল হারব ত্যাগ করে যাবার পরেও সে তা' ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু দারুল হারবে বসবাসকালে মুসলিমগণ এমন কিছু করতে পারবে না, যাতে সে রাষ্ট্র দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, দারুল হারবে বসবাসকারী মুসলমানগণ দারুল হারব কর্তৃপক্ষের নিকট দারুল ইসলাম সম্পর্কে কোন গোপন তথ্য সরবরাহ করতে পারবে না কিংবা দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, এ ধরনের অস্ত্রশস্ত্র এবং সমর সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজে সাহায্য করতে পারবে না। কেতাবী হলেও মুসলমানদের পক্ষে হারবী মহিলাকে বিবাহ না করাই শ্রেয়। কারণ, এর ফলে তার সন্তান-সন্ততিদের হয়তো দারুল হারবের জন্য কাজ করতে হতে পারে।

যদি প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোন মুসলমান শত্রু-রাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ে অন্য মুসলমানের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে বা এমন কোন অপরাধ করেছে যাতে উক্ত মুসলমানের ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

আমান ব্যতিরেকে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম

আমান না নিয়েই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করে থাকেন, তবে আমানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মত তিনি এ রাষ্ট্রের আইন-কানুন মানতে বাধ্য থাকবেন না। মুসলিম আইন মতে আমানবিহীন মুসলমানের সঙ্গে অমুসলিম রাষ্ট্রের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। এমতাবস্থায় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইন-বিধি মেনে নিতে তিনি বাধ্য থাকবেন না। যদি ইমামের অনুমতিক্রমে কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করেন, তবে যুদ্ধকালে জেহাদীরা যেমন শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন, এবং তাদের লোকদের বন্দী করতে পারেন, তিনিও সে ক্ষেত্রে তা করতে পারবেন। মুসলিম আইনে নিষিদ্ধ কার্যাবলী থেকে তাকে দূরে থাকতে হবে। কাজেই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে অবস্থানকালে ব্যভিচার করে, শূকরের গোশত খায় বা মদ পান করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুদ ও ঋণের বিষয় দুটি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে হানাফী আইনবিদগণ আইনের কঠোরতা কিছুটা শিথিল করেছেন। ইমাম আবু হানিফার মতে অমুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী আইন প্রযোজ্য হবে না।

মুসলিম যুদ্ধবন্দী

যে সব মুসলিম যোদ্ধা শত্রুর হস্তে বন্দী হয়ে দারুল হারবে নীত হন এবং দারুল হারব কর্তৃপক্ষ বাধ্যবাধকতা ভিত্তিক (যেমন পলায়ন না করা কিংবা পুনরায় দারুল হারবে ফিরে আসার ওয়াদা) প্রতিশ্রুতি নিয়ে (On parole) তাদের মুক্ত করেন, তবে তাদের সে প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পালন করতে হবে। যদি কোন মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে ক্ষতিপূরণের (Ransom) টাকা আনবার জন্য দেশে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হয়, তবে তিনি অবশ্যই তার প্রতিজ্ঞা পালন করবেন এবং টাকা সংগ্রহ না করতে পারলেও শত্রুর নিকট ফিরে যাবেন। কোন কোন আইনবিদ বিশেষ করে শাফেয়ীগণ বলেন যে, এ অবস্থায় ওয়াদাবদ্ধ হলেও মুসলমান বন্দীগণ ওয়াদা রক্ষা করার জন্য দারুল হারবে ফিরে যেতে বাধ্য থাকবে না। আর যদি বন্দীগণ কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে থাকেন, তবে তারা যে শুধু স্বচ্ছন্দে পলায়ন করতে পারেন তাই নয়, দারুল ইসলামে ফিরে যাবার পথে তারা শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বিধ্বস্ত করতে এবং শত্রুপক্ষের লোকদের হত্যা করতে পারেন।

দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম বন্দীগণ যে শুধুমাত্র মুসলিম আইন পালন করতেই বাধ্য থাকবেন তা নয়, দারুল হারবের আইন যদি মুসলিম আইনের বিরোধী না হয়, তবে সে আইনও তারা পালন করবেন। তবে প্রতিকূল পরিবেশে তারা যদি মুসলিম আইন পালন করতে না পারেন, তবে সে কথা স্বতন্ত্র। তারা যদি গানিমার অংশ লাভ করার প্রতিশ্রুতিও পান, তবু কোনক্রমেই তারা শত্রুপক্ষের সৈনিকদের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধে যোগদান করতে পারবেন না। ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতিকর কোন তথ্যাদিও তারা শত্রুদের নিকট সরবরাহ করতে পারবেন না। মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ এমন কাজ করতে যদি বন্দীকে বাধ্য করা হয় (যেমন ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করা), তবে এজন্য তাকে কোন শাস্তি ভোগ করতে হবে না। মহিলা বন্দীকে যদি শারীরিক নির্যাতন ভোগ করতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই প্রথমদিকে তা সহ্য করার চেষ্টা করতে হবে; কিন্তু পরে তিনি যদি মৃত্যুর আশংকা করেন, তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে শত্রুদের দাবীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারেন।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 জিম্মীদের মর্যাদা

📄 জিম্মীদের মর্যাদা


ইসলাম ও অমুসলিম নাগরিক

সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মর্যাদা বিভিন্ন আইন-ব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে নিরূপিত হয়েছে। যে সব জাতি গোড়ার দিকে মুসলিম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তাদের সাথে সম্পর্ক নিরূপণের ক্ষেত্রে ইসলাম এক চমকপ্রদ পরীক্ষাকার্য চালায়। কালক্রমে এসব চুক্তির স্বীকৃত ব্যবস্থাবলী মুসলিম আইনের পরবর্তী সংযোজিত অংশের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে সব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়, তারা ভিন্ন আর সব চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীকেই যে কোন মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণের কলেমা (মূল কালাম) 'শাহাদাত' পাঠ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে যোগদানের অবারিত সুযোগ দান করা হয়। যতদিন পর্যন্ত জিম্মীগণ তাদের নিজের ধর্মেই আস্থাবান থাকত, ততদিন তারা তাদের নিজেদের আইন-কানুন পালনের অধিকার ভোগ করত (অবশ্য এটা যদি বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থবিরোধী না হয়)। যদি তারা স্বেচ্ছায় মুসলিম আইন-ব্যবস্থার আওতায় আসতে চাইত, তবে কোন বাধাই ছিল না। জিম্মীদের কানুন ও বিচার বিভাগীয় পরিচালনার বিষয়টি এক পৃথক গবেষণার বস্তু। কাজেই তা বর্তমান আলোচনার এলাকার বাইরেই পড়ে।

জিম্মীর অর্থ ও তাৎপর্য

ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যে কেবল আহলে কিতাব ছিল তাই নয়, এর মধ্যে পৌত্তলিক (আবদাত আল-আসনাম) ও অগ্নিপূজকও ছিল। এদের অবশ্য আরবীয় উপদ্বীপের বাইরে বসতি স্থাপন করতে হত। কেতাবীদের মধ্যে খৃস্টান, ইহুদী, মাজিয়ান (জরথুস্ট্রীয়), সামারীয় ও সেবীয়গণ রয়েছে। সাধারণতঃ আরবদেশে মুশরিক বা বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাসীগণকে জিম্মীর মর্যাদা দেয়া হত না।

চুলচেরা বিচারে মাজিয়ানরা কেতাবী বলে গণ্য হতে পারে না। কারণ, হাদিসে জানা যায় যে, আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাস ছিল না এবং তাদের কোন কেতাবও ছিল না। যেহেতু তাদের একজন উপাস্য ছিল সেজন্য রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) ও প্রাথমিক যুগের খলিফাগণ তাদের কেতাবী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন এবং তাদের জিম্মীর মর্যাদা দান করেছেন।

দারুল ইসলামের অভ্যন্তরে বা বাইরে যেখানেই বাস করত না কেন, যাদের ধর্মীয় কেতাব ছিল তাদেরই 'আহলুল-কেতাব' বা কেতাবী বলে গণ্য করা হত। দারুল ইসলামে যে সব আহলুল কেতাব বাস করত ও যারা মুসলিম কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছিল, তাদের জিম্মী নামে অভিহিত করা হত। 'জিম্মা' কথাটির অর্থ হল এমন চুক্তি, বিশ্বাসী মুসলিম যার মর্যাদা দিতে স্বীকৃত হন। এ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তাকে নিন্দাই হতে হয় (জাম-নিন্দা)। আইনের বিচারে দেখা যায় যে, জিম্মা কথাটি বলতে একটি বিশেষ অবস্থা বুঝায়; এ অবস্থা লাভ করলে ব্যক্তি কতকগুলো অধিকার লাভ করেন, যেগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষিত হয়। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছাড়াও এ অধিকারের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমান প্রদান করা হয়। কিন্তু এর ফলে সে ব্যক্তি পূর্ণ নাগরিকত্ব লাভ করে না। কারণ, কেতাবী যদিও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন কিন্তু রসূলের ওপর ঈমান আনেন না। তাই তাকে সত্যিকার বিশ্বাসী বলে গণ্য করা যেতে পারে না। সেজন্য তিনি মুসলিম-ভ্রাতৃত্বের পূর্ণ সদস্যরূপে গণ্য হতে পারেন না। কোন প্রকার হস্তক্ষেপ বা নিপীড়ন থেকে রেহাই পাবার জন্য জিম্মীকে জিযিয়া প্রদান করতে হয়।

প্রশ্ন উঠেছে যে, দুনিয়াতে সম্পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যখন ইসলামের উদ্দেশ্য, তার পরিপ্রেক্ষিতে জিযিয়া নিয়ে অবিশ্বাসী বা কুফুরীকে স্থায়ী করা যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে কি-না। সারাখসী বলেন যে, অর্থকরী দিকটা এখানে খুব বড় কথা নয়। অতি উদারভাবে অমুসলিমকে যে ইসলামে আহ্বান করা হত, এরমধ্যে তা-ই মূর্ত হয়ে উঠেছে। মুসলমানদের মধ্যে বসবাস করার অনুমতি লাভ করার ফলে জিম্মীগণ ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য দ্বারা আকৃষ্ট হন এবং তার ফলে ইসলাম গ্রহণ করতে তারা সম্মত হতেও পারেন।

হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে জিম্মীদের চুক্তি

প্রখ্যাত আইন ও ধর্মবেত্তাগণ কর্তৃক লিখিত আইন-পুস্তকে জিম্মী ও মুসলমানদের সম্পর্ক নির্ণয় করে অনেক আইন-কানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে। অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর প্রতি ব্যবহার সম্পর্কে প্রাথমিক মুসলিমদের বিধান ও কার্যাবলীর পর্যালোচনা পরবর্তী যুগের পরিবর্তন সম্পর্কে যথেষ্ট আলোকপাত করবে।

হযরতের (সঃ) সঙ্গে স্বেচ্ছায় চুক্তিবদ্ধ কেতাবীগণের সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় উদারতা ও সজ্ঞান সতর্কতা প্রত্যক্ষ করা যায়। 'মদিনা-চুক্তি'তে (৬২৩ খৃস্টাব্দ) একথাই সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আউস ও খাযরাজ গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের এ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। ইহুদীগণও চুক্তিতে শরীক হয়। এতে ইহুদীদের সঙ্গে মুসলমানদের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তার বিবরণ নিম্নরূপঃ

"বানু আউস গোত্রের ইহুদীগণ মুসলমানদের সঙ্গে একই (রাজনৈতিক) জাতি বলে বিবেচিত হবে। ইহুদীরা তাদের নিজেদের ধর্মে বিশ্বাসী থাকবেন এবং মুসলমানদের নিজেদের (আলাদা) ধর্ম থাকবে।

"হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনুমতি ছাড়া কোন ইহুদী মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে পারবে না।

"মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে শরীক হলে ইহুদীগণ যুদ্ধব্যয় বাবদ অর্থ প্রদান করবেন।"

এ চুক্তিতে ইহুদীদের ওপর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয় নি। হযরতের (সঃ) বৃহত্তর কওমের মধ্যে পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায়রূপে তাদের অবস্থান করতে হবে, বিধি-নিষেধের মধ্যে শুধু এইটুকু। তাদের যুদ্ধে যোগদানে বাধ্য করা হত না। অবশ্য যুদ্ধে যোগদান করার জন্য তাদের আহ্বান করা হত। তারা যুদ্ধে যোগদান করলে সম্মিলিত যুদ্ধ-তহবিলে তাদের কিছু অর্থ প্রদান করতে হত। তাদের প্রতি কোন বিশেষ শুল্ক ও জিযিয়া তখনও ধার্য করা হয় নি। জিযিয়া আল-কোরআনের নিম্নলিখিত আয়াতে বিধিবদ্ধ হয়:

"কেতাবীদের মধ্যে যারা আল্লাহর ওপর ও শেষ দিনে ঈমান আনেনি এবং যারা আল্লাহর ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন, তা নিষেধ করে নি এবং যারা সত্যকে স্বীকার করে না তাদের সঙ্গে সংগ্রাম কর ও তাদের অবনত করে জিযিয়া আদায় কর"। (৯:২৯)।

কেতাবীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে কয়েকটি সাবধানবাণী ছাড়া আল-কোরআন আর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করে নি। ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকলে, আল-কোরআন ও হাদিসে যে কেবল কিতাবীদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে তা নয়, তাদের আক্রমণ ও নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার জন্যও উদাত্ত আহ্বান জানান হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাবালা, জারাশ, আধরুহ, মাকনা, খায়বার, নাজরান ও আয়লা—এই সব কেতাবীদের প্রতি যে সনদ প্রদান করেন তা আবু ইউসুফ ও বালাজুরী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এসব সনদে জিযিয়া প্রদানের বিনিময়ে তাদের জীবন, ধন-সম্পদ ও ধর্ম-বিশ্বাস রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। নাজরান গোত্রকে দেয়া নিম্নোক্ত সনদটি এ বিষয়ে দিকদর্শনের কাজ করছে:

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা হল সেই সনদ যা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) নাজরানের অধিবাসীদের দান করেন। নাজরানের অধিবাসী, তাদের ফলমূল, ধন-সম্পদ ও দাস-দাসীদের প্রতিও তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। এগুলোর তারা ভোগ করবে। কিন্তু দু'হাজার পোশাক বা 'হুলাল আল-আওয়াকী' তারা দান করবে। এর মধ্যে এক হাজার রজব মাসে দিতে হবে, আর এক হাজার সফর মাসে দিতে হবে। প্রত্যেকবার শুল্ক প্রদানের সময়ে এক আউন্স করে রৌপ্য দিতে হবে। যদি ফসল এর চাইতে বেশী বা কম হয়, তবে ফসলের অনুপাতে শুল্ক ধার্য হবে। মুসলমানরা নাজরানের অধিবাসীদের কাছ থেকে ঢাল, ঘোড়া, নানাপ্রকার জীবজন্তু এবং অন্যান্য দ্রব্য পেতে পারবেন। ঊর্ধ্বপক্ষে ২০ দিন তারা আমার দূতদের আপ্যায়িত করবে ও তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করবে। কিন্তু তারা সে দ্রব্যাদি এক মাসের বেশী নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ইয়ামন ও মা-আররাতে যদি যুদ্ধ বাধে তবে তারা ত্রিশজন সৈন্যের পোশাক-পরিচ্ছদ আর ত্রিশটি ঘোড়া ও ত্রিশটি উট সরবরাহ করবে।

"ঋণ হিসেবে আমার দূতদের জন্য প্রদত্ত জিনিসপত্র যদি আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে তার জন্য নাজরানের অধিবাসীদের সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তাদের উপস্থিত অনুপস্থিত সবাই জীবন, ধন-সম্পদ, জমি-জমা, ধর্ম, পরিবার, চার্চ ও নিজস্ব দ্রব্যাদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আল্লাহর আশ্রয় এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতিশ্রুতি লাভ করবে। কোন পাদ্রী বা সাধুকে তার চার্চ বা মঠ থেকে অপসারণ করা চলবে না এবং তাদের পৌরহিত্য পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা চলবে না। তাদের ওপর কোন প্রকার জোর-জুলুম বা নিপীড়ন করা চলবে না। আমাদের ফৌজ তাদের জমি অধিকার করবে না। যারা সুবিচার চায়, তারা তা লাভ করবে। উৎপীড়ক কিংবা উৎপীড়িত বলে কিছু থাকবে না। যারা সুদের ব্যবসায় করে, তারা আমার কাছে রেহাই পাবে না। অপরের অপরাধের জন্য কাউকে দোষী করা চলবে না। এ চুক্তি বহাল রাখার জন্য আল্লাহর প্রদত্ত রক্ষাকবচ এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সঃ) প্রতিশ্রুতিই আইনগত ভিত্তি রচনা করবে। এ চুক্তি ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন নাজরানের অধিবাসীগণ বিশ্বস্ততার সাথে চলবে আর তাদের কর্তব্য পালন করবে এবং কোন প্রকার অত্যাচারে শরীক হবে না। এ চুক্তিটি নিম্নলিখিত সাক্ষীবৃন্দের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়: আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, গায়লান ইবনে আমর, বানু নাসর গোত্রের মালিক ইবনে আউফ, আল-আকরা ইবনে হাবিস আল-হানযালী ও আল- মুগীরা ইবনে শুবা। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর এ চুক্তিটি সম্পাদনার কাজ করেন।"

আয়লা বা আকাবার খৃস্টানদের প্রতিও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অনুরূপ একটি সনদ প্রদান করেন। এর দ্বারা তিনি সর্বশেষ কেতাবী সম্প্রদায়কে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক পর্যায়ে আনবার চেষ্ট করেন। এর ফলে আরব দেশের ওপর ইসলামের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়লার খৃস্টানদের প্রধান ইয়াহুন্নার (জন) কাছে লিখিত এক পত্রে তিনি ইসলামের সঙ্গে খৃস্টানদের শান্তি স্থাপন করতে আহ্বান করেন। চিঠিখানি এইঃ

"ইয়াহুন্না ইবনে রুবা ও আয়লার অধিবাসীদের প্রতি। আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ্'র সব প্রশংসা যিনি ভিন্ন আর কোন উপাস্য নেই। আপনাকে লিখিতভাবে না জানিয়ে আমি আপনার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব না। ইসলাম গ্রহণ করুন কিংবা জিযিয়া প্রদান করুন এবং আল্লাহ, তাঁর নবী ও নবীর প্রতিনিধিদের মান্য করুন। প্রতিনিধিদের সম্মান করুন ও তাঁদের উত্তম পোশাক প্রদান করুন। কিন্তু এ পোশাক যেন বিজাতীয় পোশাক না হয়। জায়েদকে পোশাকে সজ্জিত করুন যাতে আমি ও আমার প্রতিনিধিগণ সন্তুষ্ট হতে পারি। আপনি যদি জল ও স্থলপথে নিরাপত্তা লাভ করতে চান, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করুন। এতে আপনি আরব বা বিদেশী শত্রুদের প্রতিটি আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবেন। যদি আপনি আমার দাবীতে সম্মত না হন, তবে আমি আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করে আপনার লোকজন হত্যা করে এবং আপনাদের মহিলা ও শিশুদের বন্দী না করে আপনার কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করতে চাই না। আমি আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহকে, তাঁর কিতাবগুলোকে, তাঁর নবীদের এবং মরিয়মের পুত্র ও আল্লাহর-বাণী হযরত ইসাকে (আঃ) সত্য বলে জানি। আমি তাঁকে আল্লাহর নবী বলে বিশ্বাস করি।

"বিপদ নিপতিত হবার পূর্বে আমার আবেদন গ্রহণ করুন। আমার সেনাপতিদের আমি আপনার কাছে পাঠিয়েছি। হারমালাকে আপনি তিন ওয়াসক যব দেবেন। কারণ, হারমালা আপনার পক্ষ হয়ে আমার কাছে সুপারিশ করেছেন। আল্লাহর দয়া না হলে এবং তাঁর সুপারিশ না থাকলে আমার ফৌজের সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত আমার সঙ্গে আপনার কোন যোগাযোগ বা সংবাদ আদান-প্রদান সম্ভব হত না। আমার প্রতিনিধিদের আপনি যদি মান্য করেন, তবে আল্লাহ, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারিগণ আপনার প্রতিবেশীরূপে গণ্য হবেন। আমার প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন শুরাহবিল, উবাই, আবু হারমালা, হোরাইস ইবনে যায়েদ আত্-তাঈ।

"আপনার সঙ্গে তাঁদের যে চুক্তি হবে, তাই আমি মেনে নেব। আপনি স্বচ্ছন্দে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয় অবলম্বন করতে পারবেন। আপনি যদি এতে স্বীকৃত হন, তবে আপনার ওপর শান্তি।

"মাকনার লোকদের তাদের বাসভূমিতে পাঠিয়ে দিন।" ইয়াহুন্না হযরত মুহাম্মদের (সঃ) তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। অতিথি হিসেবে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করা হয় ও তাঁকে একটি লম্বা আলখেল্লা উপহার দেয়া হয়। আলাপ- আলোচনা চলতে থাকে। পরিশেষে নিম্নলিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় :

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি:

"এটি হল একটি নিরাপত্তা সনদ যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ইয়াহুন্না ইবনে রুবা ও আয়লার অধিবাসীদের প্রদান করেছেন। সিরিয়া, ইয়ামন বা সমুদ্র-উপকূল থেকে আগত তাদের জাহাজ, পরিব্রাজক এবং সঙ্গীদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।

"যারা গোলযোগের সৃষ্টি করে, তাদের ধন-সম্পদ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। তাদের যারা ধরে নিতে পারবে, তারা এদের অধীনস্থ হয়ে যাবে।

"আয়লার অধিবাসীদের পানির ঝরণায় যাওয়া নিষেধ করা অবৈধ হবে। তাদের ব্যবহৃত স্থলপথ ও জলপথ থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না।

"আল্লাহর রাসূলের অনুমতিক্রমে এ চুক্তি জুহাইন ইবনে আস-সালত ও শুরাহ-বিল ইবনে হাসান কর্তৃক লিখিত হয়।"

উপরে বর্ণিত দলিলগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে যে কেবল গোড়াতে মুসলিম ও কেতাবীদের পরস্পর সম্পর্কই ধরা পড়েছে তাই নয় এর মধ্যে সারল্য এবং মুসলিম-অমুসলিম সামাজিক বিভেদের অনুপস্থিতিও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একথা অবশ্য বলা যায় যে, সাবধানতাই শান্তিপূর্ণ উদার নীতির পত্তন করে। তবু একথা সত্য যে, কেতাবীদের প্রতি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শিক্ষা খুব উদার ছিল। প্রথমতঃ, তাঁর ধর্ম প্রচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর প্রতি ঈমান। আর তাঁকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করার অর্থ তাঁর কর্তৃত্বও স্বীকার করে নেয়া। কিন্তু এ রীতি গৌণভাবে প্রথম রীতির দ্বারা সীমিত হয়েছে। কেতাবীদের আল্লাহর রাসূলের (সঃ) ওপর ঈমান না থাকলেও আল্লাহর ওপর তাদের ঈমান ছিল। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সনদগুলো মেনে নেবার ফলে তারা "আল্লাহর রাসূল" একথাগুলো ব্যবহার না করলেও তাঁর খোদায়ী কর্তৃত্ব স্বীকার করেন না। ব্যবহারিক সমস্যা সম্পর্কে হযরত (সঃ) খুব বাস্ত ববাদী ছিলেন। সেইজন্য তিনি এই সমঝোতা এই আশায় মেনে নেন যে, উদারতার ফলে কেতাবী ভাইরা সহজেই সত্যধর্ম গ্রহণ করতে পারবে। এ নীতি অনুসরণ করেই জিযিয়া ভিন্ন আর কোন বিভেদমূলক পন্থা অনুসরণ করা হয় নি। মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাতের মতই জিম্মীদের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া হত। কর্তৃত্ব অস্বীকৃত হওয়ার ফলেই কখনও কখনও হযরতকে তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে বিন্দুমাত্র ধর্মীয় অনুদারতা ছিল না।

জিম্মাদের সম্পর্কে হযরত উমরের আইন

আইনবিদগণ আল-কোরআনের নির্দেশ ও হযরতের কার্যাবলী ছাড়াও খলিফা প্রথম উমরের (রাঃ) সনদের উল্লেখ করে থাকেন। এ সনদে মুসলিম রাষ্ট্র সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কেতাবীদের অবস্থার পূর্ণব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে সনদটিতে বর্ণিত বিষয়সমূহ উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। সনদটি পরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। কিন্তু শুরুতে এ কথা বলে রাখা ভাল যে, হযরত উমর (রাঃ) বোধহয় একই দলিলে সনদটিতে উল্লেখিত শর্তাদির বিবরণ প্রদান করেন নি। কিন্তু সাধারণতঃ তাই ধরে নেয়া হয়।

আবু ইউসুফ ও বালাযুরীর বর্ণনা অনুসারে ইরাক ও সিরিয়ার খৃস্টানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে সমঝোতার পৌছানোর ব্যাপারে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেন। খলিফা উমর (রাঃ) এ চুক্তিগুলো অনুমোদন করেন। বালাযুরী প্রদত্ত চুক্তির বিষয়গুলো আবু ইউসুফের সঙ্গে মিলে যায়। আর আবু ইসুফের প্রদত্ত দলিলই এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করছে। তাই এ দলিলগুলো এখানে বিশদভাবে বিবৃত করা হবে। আবু ইউসুফ বলেন যে, প্রধান সেনাপতি খালিদের সেনাবাহিনী ইরাকে শক্তি বলে অনেক শহর দখল করেন; কিন্তু হিরা অঞ্চলে তাঁকে কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। ফলে তাঁর সঙ্গে হিরার অধিবাসীদের এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। হিরার খৃস্টানদের সঙ্গে মুসলিম কর্তৃপক্ষের এটাই ছিল প্রথম চুক্তি। চুক্তিটির বিবরণ নীচে দেয়া হল:

"পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা খালিদ বিন ওয়ালিদ ও হিরার অধিবাসীদের মধ্যে চুক্তি। খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) আমাকে ইয়ামা'মা থেকে অগ্রসর হয়ে ইরাকের অধিবাসীদের (আরবীয় ও পারসিকদের) নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনার আহ্বান জানাবার জন্য এবং ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেবার জন্য ও ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃত হলে তাদের নরকাগ্নি সম্পর্কে সাবধানবাণী দেবার জন্য আদেশ করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁরা মুসলমানদের সঙ্গে সমান দাবী-দাওয়া ও কাজ-কর্মের অধিকার ভোগ করবে। পরিশেষে আমি হিরায় পৌঁছে আয়াস-বিন-কাবিসা আততাঈ ও শহরের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আমি তাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে আহ্বান করি। কিন্তু তারা তাতে রাজী হন নি। তাই, আমি তাঁদের জিযিয়া প্রদান করতে অথবা যুদ্ধের সম্মুখীন হতে আহ্বান করি। তাঁরা জবাব দেন: 'আমরা যুদ্ধ চাই না। কেতাবীরা যেমন জিযিয়া প্রদান করে শান্তি স্থাপন করেন, আমরাও অনুরূপ জিযিয়া দিয়ে শান্তি লাভ করতে চাই।' আমি এ প্রস্তাব মেনে নিলাম ও গণনা করে দেখলাম যে, তাদের জনসংখ্যা সাত হাজার। এক হাজার বৃদ্ধ জিযিয়া থেকে রেহাই পেলেন। ছ' হাজার লোকের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়া ঠিক হল। জিযিয়ার পরিমাণ হবে ৬০ হাজার দিনার।

"একথা স্বীকৃত হল যে, হিরার অধিবাসীগণ তাদের চুক্তি লঙ্ঘন করবে না এবং আরব বা ইরানী مسلمانوں বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না। তাদের কেউ যদি দুর্বল ও বৃদ্ধ বা পীড়িত হয়ে পড়ে বা ধনী অবস্থা থেকে গরীব হয়ে যায় তবে তাকে আর জিযিয়া দিতে হবে না। সে ও তার পরিবার দারুল ইসলামে অবস্থান করলে বায়তুল মাল থেকে তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হবে। তারা যদি দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করে, তবে তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের বন্দোবস্ত করা হবে না। তাদের যদি কোন দাস ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সর্বাপেক্ষা অধিক দাম নিয়ে তাকে বিক্রয় করে দিতে হবে ও বিক্রয়-লব্ধ অর্থ তার প্রভুকে দিতে হবে। সামরিক পোশাক ছাড়া কেতাবীগণ যে কোন পোশাক পরিধান করতে পারবে; অবশ্য সে পোশাক যেন মুসলমানদের পোশাকের মত না হয়। তাদের মধ্যে কেউ যদি সামরিক পোশাক পরিধান করে, তবে তাকে গ্রেফতার করা চলবে এবং সেজন্য তাকে কারণ দর্শাতে হবে। এ কারণ যদি যথোপযুক্ত না হয়, তবে একটি সামরিক পোশাকের দাম তার কাছ থেকে আদায় করা হবে। ঠিক হয় যে, বায়তুল মালের মাধ্যমে জিযিয়া প্রদান করতে হবে। যদি তাদের কোন অর্থকরী সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে তারা তা বায়তুল মাল থেকে গ্রহণ করবে।"

এ চুক্তিটি মুসলিম ও অধিকৃত অঞ্চলের খৃস্টানদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর প্রথম। এ চুক্তির গুরুত্ব এই যে, এর দ্বারা উভয়পক্ষ অনেকগুলো বাধ্যবাধকতা মেনে নেন। খৃস্টানগণ পৌর-জীবন যাপন করতে, সামরিক পোশাক পরিধান না করতে এবং মুসলমানদের শত্রুকে সাহায্য না করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর মুসলিম কর্তৃপক্ষ শুল্ক দেয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের ওপর হিসেব করে সামগ্রিকভাবে জিযিয়া গ্রহণ করবেন এবং এর বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তার সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আবু ইউসুফ বলেন, এটাই প্রাচ্যের প্রথম জিযিয়া। এতে বোঝা যায় যে, এ চুক্তিটি মুসলিম কর্তৃপক্ষ ও ইরাকের খৃস্টানদের মধ্যে সম্পাদিত প্রাথমিক চুক্তি। এর মধ্যে এমন কোন কিছুর ব্যবস্থা নেই, যা অসম্মানজনক বলে গণ্য হতে পারে। জিযিয়া প্রদান করা বা সামরিক ব্যাপারে শরীক না হওয়ার মধ্যে আপত্তিজনক কিছুই নেই। কারণ, পরাজিত হবার ফলে স্বভাবতই সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতা নিয়ে নেয়া হয় এবং মুসলিম কর্তৃপক্ষই দেশরক্ষার ভার নেন। আবার মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা লাভ করার বিনিময়ে জিযিয়া দেয়া হয়। মনে রাখা উচিত যে, জিম্মীদের ওপর কোন ভূমি-শুল্ক (খারাজ) ধার্য করা হত না। জিযিয়া পাইকারী-শুল্ক (মাথা-গণতি কর) ছিল না। একটি সামগ্রিক শুল্কের নামই জিযিয়া যার মধ্যে কোন অসম্মান বা হীনমন্যতা ছিল না। জিযিয়া বৃদ্ধি করার কোন কথাও জিযিয়ার মধ্যে ছিল না। বরং এতে এ কথাই লেখা ছিল যে, যদি ধনীগণ পরে জিযিয়া দিতে অসমর্থ হয়ে পড়েন, তবে তাদের আর জিযিয়া দিতে হবে না। তাদের বায়তুল মাল থেকে সাহায্য করা হবে। লক্ষ্য করার বিষয়, এতে কেতাবীগণ মুসলিমদের সঙ্গে একই ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাছ থকে সুযোগ-সুবিধা লাভ করে।

আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন যে, বানিকিয়া ও আইন-আততামর প্রভৃতি শহরও একই প্রকার চুক্তির আওতায় বশ্যতা স্বীকার করে। বালাযুরীও একথা সমর্থন করেছেন। সিরিয়ার বেলায় অবশ্য চুক্তিতে আবুও কতকগুলো বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছিল। আবু উবাইদার পরামর্শে খলিফা উমর (রাঃ) তা গ্রহণ করেন। পরে এগুলো মুসলিম শাসনাধীনে সব কেতাবীদের প্রতি প্রযোজ্য হয়। এ ব্যাপারে বালাযুরীর সঙ্গে তা'বারী ও ইয়াকুবী প্রায় একমত পোষণ করেন। চুক্তির কয়েকটি ধারায় অবশ্য কয়েকটি গরমিল দেখা যায়। সিরিয়া অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী মাখুলের মতে আবু ইউসুফ কর্তৃক প্রদত্ত বর্ণনাটি নিম্নরূপ:

"জিযিয়া দেবার বিনিময়ে مسلمانوں সঙ্গে দামেস্কের অধিবাসীদের শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর ফলে মুসলমানেরা তাদের জীবন ও ধনসম্পদ এবং চার্চ রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন। তারা কোন নতুন চার্চ নির্মাণ করতে পারবেন না। অবশ্য পুরাতন চার্চগুলো তারা সংস্কার ও পুননির্মাণ করতে পারেন। দামেস্কের অধিবাসীগণ পুল সংস্কার করতে বাধ্য ছিলেন এবং একাজ তারা স্বচ্ছন্দে করতে পারেন। তাদের অঞ্চল দিয়ে সফরের সময় তারা মুসলমানদের অভ্যর্থনা করতেন, তিনদিন আদর-আপ্যায়ন করতেন ও প্রয়োজন হলে তাদের পথ দেখিয়ে দিতেন। তারা আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের জন্য আলোক-সংকেতের ব্যবস্থা করতেন এবং কোন মুসলমানকে প্রহার বা অসম্মান করতে পারতেন না। নামাজের সময় তাদের ঘণ্টা বাজাবার অধিকার ছিল না। মুসলিম জনসমাবেশে তারা ক্রুশ বা শূকর নিয়ে যেতে পারতেন না। সামরিক পোশাক পরিধান করতে, অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে বা ধর্মীয় উৎসব ছাড়া ভোজের সময় নিশান বহন করতে তাদের অনুমতি দেয়া হত না।"

চুক্তির এ ধারাগুলো দামেস্কের অধিবাসীরা সানন্দে গ্রহণ করেন। ফলে অন্যান্য অনেক গোত্রও এ সব নীতির ওপর ভিত্তি করে মুসলিম কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে আসে। যখন খলিফা উমরের (রাঃ) কাছে এগুলো অনুমোদনের প্রার্থনা জানানো হয়, তখন তিনি বললেন:

"সিরিয়ার শহর ও নগরগুলোর অধিবাসীদের সঙ্গে সম্পন্ন চুক্তিগুলো আমি পরীক্ষা করে দেখেছি। এবং আমি আমার রাসূলের সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে তাঁদের মতামতও জানতে পেরেছি। এগুলো ও আল্লাহর কেতাবের ওপর ভিত্তি করে (৫৯: ৬-৮) আমি যে সিদ্ধান্তে এসেছি তা হল এই যে, যেদেশ আপনারা দখল করেছেন, তা সেখানকার অধিবাসীদেরই থাকবে, তারাই সেখানকার কৃষিকার্য পরিচালনা করবে। আর আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারে তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী আপনারা তাদের ওপর জিযিয়া ধার্য করবেন। তারা জিযিয়া দান করলে আপনারা তাদের কাছ থেকে আর কিছু চাইবেন না। আর জমি যদি সাবেক অধিবাসীদেরই থাকে, তবে মুসলমানেরা এর থেকে ফসল ভোগ করতে পারবে।

"তাই আপনারা তাদের (জিম্মীদের) ওপর জিযিয়া ধার্য করবেন; কিন্তু কখনও তাদের বন্দী করবেন না কিংবা তাদের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার বা ক্ষতি সাধন করবেন না। সত্যিকার দাবী না থাকলে আপনারা তাদের কাছ থেকে ধনসম্পদও গ্রহণ করবেন না। তদের সঙ্গে আপনারা যে চুক্তি সম্পাদিত করেছেন, তা বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন। উৎসবের দিনে বছরে একদিন করে ক্রুশ বের করা সম্বন্ধে বলতে চাই যে, তারা তাদের নিশান বাইরে না আনে, তবে শহরের বাইরে ক্রুশ আনতে তাদের বাধা দেবেন না।"

আবু ইউসুফ যদিও কেবল হযরত উমর (রাঃ), আবু উবায়দার অনুসৃত নীতি অনুমোদন করে যে পত্র লিখেছিলেন, তা হুবহু বিবৃত করেছেন, তবু একথা বলা যায় যে, হযরত উমর (রাঃ) খালিদের নীতি অনুমোদন করেন। পরবর্তীযুগে কেতাবীদের সঙ্গে যতগুলো চুক্তি সম্পাদিত হয়, সবই কিয়ামতের দিন অবধি চালু থাকবে।

আবু উবায়দার কাছে লিখিত পত্রে আমরা যে কেবল ক্রুশ ও চার্চ সম্পর্কে কতকগুলো নতুন নতুন দাবী সন্নিবেশিত দেখতে পাই তাই নয়, এগুলো সব জিম্মীদের জন্যই কার্যকরী করা হয়। অবশ্য ইরাকের খৃস্টানদের সঙ্গে সম্পন্ন খালিদের চুক্তিতে এসবের কোন উল্লেখ ছিল না। শত্রুপক্ষের নিকট হতে দখলকৃত জমিজমা সম্পর্কেও এ নীতির উল্লেখ দেখতে পাই। হযরত উমর (রাঃ) বিশেষ জোর দিয়ে বলেন যে, গ্রামাঞ্চলের জমিজমা (শহর বা নগরের জমিজমা নয়) গানিমা হিসেবে যোদ্ধা বা জেহাদীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যাবে না। এ জমি হস্তান্তরিত করাও চলবে না। এসব জমি জিম্মী কৃষকদের (উলুজ) হাতেই থাকবে। তারাই জমি চাষ করবে এবং মুসলমান, তাদের বংশধর ও তাদের নিজেদের (কৃষকদের) কল্যাণে সামর্থ অনুযায়ী জিযিয়া প্রদান করবে। খেয়াল করার বিষয় যে, খালিদ ও আবু উবায়দা উভয়ের চুক্তিতেই জিযিয়া এমন একটি শুল্ক বলে গণ্য হয়েছে যার সাথে আয়ের উৎস বা পদ্ধতির কোন সম্পর্ক নেই। হযরত উমরের (রাঃ) চিঠিতে কেবল উক্ত জমিরই উল্লেখ আছে যা জিম্মীরা জিযিয়া প্রদান করে নিজেদের বলে দাবী করতে পারত। প্রশ্ন উঠতে পারে, হযরত উমর (রাঃ) কি খারাজ বা ভূমি-রাজস্ব হিসেবে অন্য কোন শুল্ক দাবী করতেন। অথবা জিম্মীরা কৃষক হিসেবে যখন জমির ওপরেই একান্তভাবে নির্ভর করত, তখন এ শুল্কের আর প্রয়োজন ছিল না—একি সত্য? আবু ইউসুফ ও বালাযুরীর প্রদত্ত চুক্তিগুলোর দলিল দেখে এর কোন সুরাহা করা যায় নি। অবশ্য দুজনেই বলেছেন যে, হযরত উমরের হুকুম-নামায় জিযিয়া ও খারাজ উভয়ই রয়েছে।

জিযিয়া ও খারাজ

জিযিয়া ও খারাজ (রাজস্ব) সম্পর্কে অনেকখানি অনিশ্চয়তা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে বিজিত দেশে প্রাথমিক যুগের কর-ব্যবস্থার আইন সম্পর্কে নানাপ্রকার মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ওয়েলহ'সেন বলেন: জিযিয়া দেশ-জয় কালে ধার্য করা হত। নির্দিষ্ট অর্থ ও ফসলের নির্দিষ্ট অংশের সামগ্রিক নামই জিযিয়া। এর মধ্যে ভূমি-কর বা খারাজ ও ব্যক্তি-কর বা জিযিয়াও (মাথা-গণতি কর নয়) ছিল। কিন্তু শুল্ক আদায়ের পদ্ধতির সাথে মুসলিম শাসকদের কার্যের কোন সম্পর্ক ছিল না। জিযিয়া ও খারাজের মধ্যে কখনো কখনো একটিই ধার্য করা হত। কারণ, এদুটি কথার দ্বারা এক জিনিসই (শুল্ক) বোঝাত। পরবর্তীকালে মুসলিম-আইনবিদগণ জিযিয়া ও খারাজে পার্থক্য নির্দেশ করেন এবং প্রাথমিক মুসলিম সমাজে তার (কাল্পনিক) প্রয়োগ করেন। বিজিত দেশে জমি কেনা থেকে মুসলমানদের বিরত করা ও নব-দীক্ষিত মুসলমানদের কাছ থেকে জিযিয়া না নেবার নীতি খলিফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (দ্বিতীয় উমর) প্রবর্তন করেন। অতঃপর সব জমি থেকে খারাজ সংগ্রহ করা সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। তা সে জমি জিম্মীরই হোক বা নব-দীক্ষিত مسلمانوںই হোক।

কার্ল বেকার ও প্রিন্স কেতানী প্রমুখ পণ্ডিতগণ ওয়েলহ'সেনের মতামত মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দানিয়েল সি, ডেনেট এ মতের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। ডেনেট কিন্তু ওয়েলহ'সেনের মতামতের অনেকটা সংস্কার বা উন্নতি-বিধান করেছেন। কতকগুলো অমীমাংসিত সমস্যারও তিনি সমাধান করেছেন। তিনি সত্যিই বলেছেন যে, শুল্কের ব্যাপারে কেবল এক বা অভিন্ন রীতি ছিল না। ডেনেট ওয়েলহ'সেনের সঙ্গে একমত যে, জিযিয়া ও খারাজ নিছক শুল্ক (Tribute) ছিল না। ডেনেট বলেন যে, জিযিয়া ও খারাজ বলতে শুল্কই বোঝাত। কারণ, শুল্ক সম্বন্ধে ধারণা বহু প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল।

ডেনেটের মত ওয়েলহ'সেনের মতের চাইতে অনেকটা উন্নত ধরনের। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটি দোষ রয়ে গেছে। শুল্ক অর্থে জিযিয়া ও খারাজ শব্দটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হত— (ওয়েলহ'সেন ও বেকারের মত অনুসরণ করে) কিন্তু সাধারণ কর হিসেবে যে ব্যবহৃত হত না—এ কথা কেবল আংশিক সত্য। আমরা আগেই বলেছি, খালিদের চুক্তিতে হিরার অধিবাসীদের ওপর গণনা-সাপেক্ষে জিযিয়া ধার্য হয়। (৭ হাজার লোকের মধ্যে ৬ হাজার লোকের ওপর ৬০ হাজার দিনার জিযিয়া ধার্য করা হয়)। এটা ছিল সামগ্রিক শুল্ক, ব্যক্তিগত কর নয়। শুল্ক কথাটি ব্যবহার করে ওয়েলহ'সেন ঠিকই করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এটা একটি শহরের অধিবাসীদের ওপর ধার্য করা হত। জিযিয়া ও খারাজ কর হিসেবে ব্যবহৃত হত মনে করে ডেনেট ভুল করেছেন। জিযিয়া কখনই সাধারণ কর হিসেবে গণ্য হত না। খারাজকেই শুধু কর হিসেবে মনে করা হত। কেননা, জিযিয়া আরব দেশে ও তার বাইরে মুসলিম বিজয়ের পূর্বেই ব্যক্তিগত শুল্ক হিসেবে চালু হয়ে গিয়েছিল। ডেনেট নিজেই ক্রিস্টেনসেন ও লটের অনুমোদনক্রমে এ কথা স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম বিজয়ের সময় সিরিয়া ও ইরাকে ব্যক্তিগত কর চালু ছিল। "জিযিয়া" কথাটি এসেছে আরামীয় "গাযিযা" থেকে। "জিযিয়া" ধার্য করার ব্যাপারে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীতে পার্থক্য নির্দেশ করা হত। আল-কোরআনে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে (৯: ২৯)। তাই জিযিয়া ও খারাজকে এক জিনিস মনে করে জিযিয়াকে কর হিসেবে গণ্য করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।

"খারাজ কথাটি (গ্রীক—"চোরেজিয়া") অবশ্য সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হত। আল- কোরআন বলেছে, বান্দার নেয়ামতস্বরূপ খারাজ ধার্য করা হয়। আবু ইউসুফ বালাযুরী, ইয়াকুবী ও ইবনে সাল্লাম "জমির খারাজ" এবং "মাথাপিছু বা কাঁধপিছু খারাজে"রই উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ কর ভিন্ন আর কিছুই নয়। কিন্তু এসব আইনবিদের কেউই ভূমি-জিযিয়া কথাটাকে সাধারণ কর হিসেবে ব্যবহার করেন নি। কেবল ইবনে আবদুল হাকামই এভাবে ব্যবহার করেছেন। মিরসীয় প্রথাকেই বোধহয় তিনি অনুসরণ করতেন।

ইবনে সাল্লাম শুল্ককে "দারিওয়া" নামে অভিহিত করেন। কিন্তু শুল্ক কথাটি সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল না। আবু ইউসুফ, এহিয়া ইবনে আদম ও কুদামা ইবনে জাফর প্রমুখ প্রাথমিক যুগের আইনবিদগণ অর্থনৈতিক ও শুষ্কতত্ত্বের কেতাবগুলোর নাম রেখেছেন "কিতাবুল খারাজ"। কিন্তু কেউ এই শ্রেণীর কেতাবের নাম "কেতাবুল জিযিয়া" রাখেন নি। "লিসানুল আরব" ও "তাজউল আরুস" নামক বইতে ভূমি- রাজস্ব ছাড়াও সাধারণ শুল্কের ('ইতাওয়া') উল্লেখ রয়েছে। কাজেই দেখা গেল, "খারাজই" সাধারণ কর হিসেবে ব্যবহৃত হত, জিযিয়া নয়।

যদিও প্রথমদিকে বিজিত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানগণ কর্তৃক খারাজ ও জিযিয়া ধার্য করার মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল, তবু কিছুদিন পর বিশেষ করে খলিফা হযরত উমর বিন আবদুল আজিজের (মৃত্যুঃ ৭২০ খৃস্টাব্দ) সময় থেকে এক্ষেত্রে সুসমঞ্জস নীতির প্রচলন হয়। লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনবিদদের 'জিযিয়া' ও 'খারাজ' সম্পর্কীয় বিধি-ব্যবস্থার এই সুসমঞ্জস রীতিকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

মনে রাখা উচিত যে, যেসব শহর শান্তিচুক্তির ফলে মুসলিম অধিকারে আসে, যেমন সাওয়াদের হিরা, উল্লাইস, আয়েন আততামর ও বনিকিয়া এবং সিরিয়ার দামেস্ক, বালাবাক, হিমস ও জেরুজালেম তাদেরকে শহরের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই শুল্ক রূপে জিযিয়া দিতে হত। (যেমন হিরা শহরের অধিবাসীরা ৬ হাজার দিনার ও হামস শহরের অধিবাসীগণ ১ লাখ ৭০ হাজার দিনার দেয়)। প্রথমদিকে এ শুল্ক সাধারণ জিযিয়ার নিয়ম অনুসারেই ধার্য করা হত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রত্যেক জিম্মীকে ব্যক্তিগতভাবেই জিযিয়া দিতে হত। কারণ, প্রত্যেক শহরে জিম্মীদের যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তারা জিযিয়া থেকে রেহাই পেয়ে থাকে। ফলে অবশিষ্ট জিম্মীদের তখন জিযিয়ার সবটুকুই দিতে হত। এতে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠল। কিন্তু স্থানীয় শাসকগণ এ ব্যাপারে কোন পরিবর্তন সাধন করেন নি। পরিশেষে দ্বিতীয় উমর এক ও অভিন্ন রীতির প্রবর্তন করেন ফলে আল-কোরআনের নীতি অনুসারে (সুস্থ ও সবল জিম্মীকে) ব্যক্তিগতভাবে মাথাপিছু জিযিয়া দিতে হত। এ প্রসঙ্গে ইরাকের নতুন আবাসভূমি নাজরানিয়াবাসী খৃস্টানগণের কথা বলা যেতে পারে। বালাযুরীর বর্ণনায় জানা যায় যে, মৃত্যু ও নবধর্মে দীক্ষার ফলে জিম্মীদের সংখ্যা অনেক কমে আসে; তবু মা'বিয়া প্রমুখ শাসনকর্তাগণ কিছুতেই শুল্কের পরিমাণ কমাতে রাজি হন নি। খলিফা দ্বিতীয় উমর হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সঙ্গে সম্পন্ন জিম্মীদের চুক্তির পূর্ণব্যাখা করেন। ফলে সামগ্রিক শুল্ক মাথাপিছু হারে পর্যবসিত হল। মাথাগণতি (সবার ওপরে নয়) জিযিয়ার সুসমঞ্জস রীতির মাধ্যমেই এ বিবর্তন সম্ভব হল।

খলিফা প্রথম উমরও (রাঃ) অনুরূপভাবে যুদ্ধে বিজিত অঞ্চল ও চুক্তির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে অর্জিত অঞ্চল সম্পর্কে একই বিধান দেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে অর্জিত অঞ্চলকে সামগ্রিক সম্পদ বলা হয় এবং যুদ্ধে বিজিত অঞ্চলকে বলা হয়, 'গানিমা'। প্রথম অঞ্চল রাষ্ট্রীয় ভূমি। কিন্তু গানিমা হিসেবে যে সব অঞ্চল লাভ করা হয়, তা হযরত উমরের (রাঃ) আমলে সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সময়ে বানু-কুরায়যার গানিমাভুক্ত জমি বাজেয়াপ্ত করে বণ্টন করে দেয়া হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এ গানিমা রাষ্ট্রীয় সম্পদরূপেও গণ্য হয়েছে। তবে খারাজের মত এখানেও অধিবাসীদের মধ্যে জমি বণ্টন করে ফসলের অংশ রাষ্ট্রকে দেবার রীতি ছিল। হযরত উমর (রাঃ) এ জমির হস্তান্তর নিষিদ্ধ করেছেন ও দু'রকমের জমির ওপর খারাজ বা ভূমি-কর ধার্য করেছেন। এটাই সাধারণ নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তী যুগের খলিফাগণও এ রীতি অনুসরণ করেন। যদি কোন জিম্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তবে তার প্রতি ধার্য জিযিয়া থেকে তিনি রেহাই পাবেন। কিন্তু খারাজ বা ভূমি-কর তাকে দিতেই হবে। কোন জিম্মী যদি উত্তরাধিকারসূত্রে জমি-জমা পেয়ে থাকে বা তার কাছে জমি বিক্রয় করা হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের খারাজ তাকেও মিটিয়ে দিতে হত। কোন কোন ব্যক্তিকে খারাজ থেকে রেহাই দেয়া হয়, আবার কোন কোন ব্যক্তিকে খারাজ দিতে হত। এ ব্যাপারে খলিফার ইচ্ছাধীন ক্ষমতা বা বিশেষ এখতিয়ার ছিল। তিনি খারাজ তুলে দিয়ে আরবীয় রীতি অনুযায়ী “উশর” (ফসলের ১০) বসাতে অথবা খারাজও ধার্য করতে পারেন। খারাজ তুলে দিয়ে “উশর” বসানোর রীতি প্রথম উমরের (রাঃ) আমলে মোটেই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু হযরত উসমান (রাঃ) ও পরবর্তী খলিফাদের আমলে এটাই সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়ায়।

খালিদ ও আবু উবায়দার চুক্তি থেকে ভূমি-কর বা জিযিয়া ধার্য করার পদ্ধতি সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট নযির পাওয়া যায় না। আবু ইউসুফ, বালাযুরী, এহিয়া ইবনে আদম ও অন্যান্য আইনবিদের লেখা থেকে জানা যায় যে, নারী শিশু, দরিদ্র ব্যক্তি, অন্ধ, অসুস্থ, উন্মাদ, বেকার ও দরিদ্র ধর্মযাজক ভিন্ন সব জিম্মীকেই জিযিয়া ছাড়া খারাজও দিতে হত। আবু ইউসুফের বর্ণনায় জানা যায় যে, প্রত্যেক জিম্মীকে তার সম্পদ ও আয় অনুযায়ী শুল্ক দান করতে হত। ইরাকে এ শুল্ককে জিম্মীদের অবস্থা অনুযায়ী তিনভাগে ভাগ করা হয়: বাৎসরিক যথাক্রমে ৪৮, ২৪ ও ১২ দিরহাম। সিরিয়ায় জিযিয়ার অন্য হার বিদ্যমান ছিল। প্রতি জারিবের ওপর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফসল কর হিসেবে দেবার পরও এক দিনার করে প্রদানের ব্যবস্থা কোন কোন চুক্তিতে বিধিবদ্ধ হয়।

হযরত উমরের সনদ

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, খলিফা হযরত প্রথম উমর (রাঃ) জিম্মীদের মর্যাদা সম্পর্কে সুসামঞ্জস ও সর্বাঙ্গীন কোন নিয়ম নির্দেশ করেন নি। প্রকৃতপক্ষে, আংশিকভাবে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কার্যাবলী এবং আংশিকভাবে হযরত উমরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রদত্ত নির্দেশনামা ও পরবর্তী খলিফাদের কার্যধারার ওপর ভিত্তি করেই এসব নিয়ম-কানুন ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠে। তবু আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণের কাছ থেকে কতকগুলো দলিল পাওয়া গেছে। এসব দলিলে বিভিন্ন কানুন ও নীতির বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলো নাকি হযরত উমর জিম্মীদের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নিরূপণের জন্যে জারী করেন। একেই হযরত উমরের সনদ বলা হয়। সিরিয়ার খৃস্টানগণ আবু উবায়দার নিকট যে দরখাস্ত পেশ করেন, হযরত উমর তা অনুমোদন করেন। এর বিবরণ নীচে দেয়া হলঃ

"আপনারা যখন আমাদের দেশে আসেন, তখন আমরা আপনাদের নিকট থেকে জীবনের নিরাপত্তা এবং এখানকার অধিবাসীগণ ধর্মের স্বাধীনতা পেতে চায়। আর আমরা এসব বিষয়গুলো মেনে নিয়েছি—দামেস্ক ও এর চারপাশে কোন চার্চ, ধর্মস্থান বা ধর্মযাজকালয় নির্মাণ করা হবে না। যে সব চার্চ বিনষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো আমরা সংস্কার করব না। মুসলিম বাসস্থান অঞ্চলেও এই একই রীতি অনুসৃত হবে। দিনে বা রাত্রিকালে চার্চগুলোতে সাময়িকভাবে অপেক্ষা করার অধিকার مسلمانوں কাছ থেকে কেড়ে নেয়া চলবে না। পরিব্রাজক ও মুসাফেরের জন্যে দরজা সর্বক্ষণ খোলা থাকবে। চার্চে বা বাড়ীতে কোন গুপ্তচরকে আমরা আশ্রয় দেব না। মুসলিমদের প্রতি বিশ্বাসঘাতককে আমরা লুকিয়ে রাখব না। মৃদুভাবে আমরা চার্চে 'নাকুস' বাজাব। সেখানে আমরা ক্রুশ ঝোলাব না এবং উচ্চস্বরে উপাসনা বা ধর্ম-সঙ্গীত গাইব না, মিছিল করে আমরা ক্রুশ বা বাইবেল নিয়ে যেতে পারব না; ইস্টার বা বিশেষ রবিবারে আমরা মিছিল বার করতে পারব না; মৃতদেহের ওপর উচ্চস্বরে কাঁদা চলবে না বা মুসলিম-বাজারে আগুনসহ মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারব না; মুসলমানদের কবরের নিকট আমরা কাউকে কবর দেব না; মুসলমানদের সমাবেশে মদ বিক্রয় বা পৌত্তলিকতার বাহ্যিক প্রদর্শনও নিষদ্ধ। আমাদের ধর্মে মুসলিমদের প্রলুব্ধ করতে বা আহ্বান করতে পারব না; মুসলমানদের দাসদের আমরা রাখতে পারব না; আমাদের কোন আত্মীয়-স্বজনকে আমরা ইসলাম গ্রহণ করতে বাধা দিতে পারব না; আমাদের ধর্মের কোন প্রচার আমরা করব না; মুসলমানদের মত আমরা কালানসুয়া, পাগড়ী, জুতা ব্যবহার করতে পারব না; তাঁদের মত চুল ছাঁটতে বা অশ্বে আরোহণ করতে পারব না; তাঁদের ভাষা আমরা ব্যবহার করতে পারব না; তাঁদের নামের মত আমরা নাম গ্রহণ করতে পারব না; আমাদের সামনের চুল কাটতে হবে ও বিভক্ত করে রাখতে হবে; কোমরে যুননার ঝোলাতে হবে; আমাদের সিলমোহরে আরবী অক্ষর লেখা যাবে না; ঘোড়ার জিন ব্যবহার করা চলবে না; আমরা বাড়ীতে অস্ত্রশস্ত্র রাখতে পারব না এবং তরবারী বহন করতে পারব না; মুসলমানদের সমাবেশে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে; তাদের রাস্তা দেখিয়ে দিতে হবে; তারা যখন চাইবেন, জনসভায় তাদের সম্মানার্থে উঠে দাঁড়াতে হবে; আমাদের বাড়ীঘর তাদের বাড়ীঘরের চাইতে উঁচু করে তৈরী করা চলবে না; আমাদের ছেলে-মেয়েদের আমরা কোরআন শেখাতে পারব না; ব্যবসায় ভিন্ন আর কোন ব্যাপারে মুসলমানদের সঙ্গে শরীক হতে পারব না; আমাদের চলতি প্রথা-মত প্রত্যেকটি মুসলিম পরিব্রাজককে তিনদিন আপ্যায়িত করব ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করব। আমরা কোন মুসলমানকে অবমাননা করব না। যে ব্যক্তি মুসলমানকে আঘাত করবে, তার অধিকার ও দাবী-দাওয়া নস্যাৎ হয়ে যাবে।"

ওপরেরটিই একমাত্র দলিল নয়; ছোট-বড় এমনি ধারার আরো অনেক দলিল আছে। অবশ্য, এগুলো মূল ধারার দিক দিয়ে একই রকম। একথা প্রমাণ করার দরকার নেই যে, হযরত উমরের তথাকথিত এ সনদটি তাঁর সময়কার নয়। পরবর্তী যুগেই এটি বিধিবদ্ধ হয়। কারণ, এর মধ্যে যে সব বাধ্যবাধকতা আছে, তা সেনাপতিদের প্রতি হযরত উমর কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনামার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। অনুদারতা ও নিপীড়নই এ ধারাগুলোর ভিত্তি। হযরত উমরের উদারতার নযির এর মধ্যে পাওয়া যায় না।

অবশ্য, সনদটির আইনগত গুরুত্ব সমধিক। কারণ, ইসলামের প্রথম যুগের আইনবিদগণ এর ওপর ভিত্তি করেই আইনের বিধান দিয়েছেন। সর্বসম্মতিক্রমে এটা জিম্মীদের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নির্ণয়ের নির্দিষ্ট বিধি-ব্যবস্থা বলে সাব্যস্ত হয়েছে। এর আইনগত বৈধতার ফলে ঐতিহাসিক প্রামাণ্যের প্রশ্নটি আর কেউ তোলে না।

জিম্মীদের অধিকার ও'দায়িত্ব

ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে আজ অবধি জিম্মীদের যে সব অধিকার, দায়িত্ব ও কর্মপদ্ধতি গড়ে উঠেছে, তা এবার সংক্ষিপ্তরূপে দেখান যেতে পারে। এগুলোই ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক নির্ণয় করে এসেছে। মনে রাখা উচিত যে, এর কোন কোন নীতি কোরআনের বিধান থেকে নেয়া হয়েছে; আবার কোনটি খলিফা প্রথম উমরের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী খলিফাদের দেয়া নির্দেশনামা থেকে এসেছে। ইসলামে দাখিলের অসম্মতির কতকগুলো নিদর্শন, যেমন গিয়ার, যুন্নার ও রঙীন কালানসূয়া পরিধান করা দ্বিতীয় উমরের সময় থেকে চালু হয়। আল-মুতাওয়াক্কীলের সময়ে এগুলোর ব্যবহার অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু সম্ভবতঃ গণদাবীর ফলে তিনি এগুলো আবার পুনঃপ্রবর্তন করার প্রয়োজন মনে করেন। অন্যান্য খলিফাদের আমলে বিশেষ করে ফাতেমী খলিফা আল-হাকিম-বি আমরুল্লাহ্'র সময়ে আরও কতগুলো নতুন বাধ্যবাধকতা প্রবর্তন করা হয়।

সাধারণভাবে বলা যায় যে, আইনের বিধি অনুসারে মুসলিম শাসককে জিম্মীদের জীবন, ধনসম্পদ, চার্চ, ক্রুশ রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার অধিকার দিতে হবে। অবশ্য তারা নতুন চার্চ নির্মাণ করতে পারবে না (তবে তারা পুরানো চার্চগুলো সংস্কার করতে পারবে বা নতুন করে নির্মাণ করতে পারবে) এবং তাদের ক্রুশ বাইরে আনতে পারবে না বা উচ্চস্বরে উপাসনা করতে বা গীর্জার ঘণ্টা বাজাতে পারবে না। কোন জিম্মীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা চলবে না এবং পবিত্রভূমি (হারাম) ভিন্ন দারুল ইসলামে নির্বিবাদে পরিভ্রমণ করতে দিতে হবে।

আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ সংক্ষেপে বারোটি কার্যক্রম পেশ করেছেন। এগুলোকে আবার দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ছটি অতি প্রয়োজনীয়। এগুলো লঙ্ঘন করলে চুক্তি বাতিল হয়ে যায়; পরের ছটি পালন করা প্রয়োজনীয়। এগুলো লঙ্ঘন করলে শাস্তি ভোগ করতে হয়। নিম্নলিখিত ছটি নিয়ম-কানুন অবশ্য কর্তব্য, অন্যগুলো প্রয়োজনীয় :

১। প্রত্যেক পুরুষ, বয়স্ক, স্বাধীন ও সুস্থ জিম্মী জিযিয়া দিতে বাধ্য থাকবে। তার পরিমাণ অবশ্য মুসলিম শাসক কর্তৃক নির্ধারিত হবে। মালিকী আইনবিদেরা বলেন যে, ওয়ালী বা শাসকগণ জিযিয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবেন। হানাফী মতপন্থীগণ একে তিনভাগে ভাগ করেছেন :

(ক) স্বচ্ছল ব্যক্তিদের ৪৮ দিরহাম করে জিযিয়া দিতে হবে, (খ) গরীবগণ ১২ দিরহাম এবং (গ) যারা এর মাঝামাঝি, তারা ২৪ দিরহাম করে দেবে। শাফেয়ী আইনবেত্তাগণ বলেন যে, কমপক্ষে জিযিয়া মাথাপিছু এক দিনার হওয়া উচিত। যদি জিম্মী তার ধর্ম পরিত্যাগ করে, তবে তার ওপর থেকে জিযিয়া তুলে নেয়া হবে। যে সব জিম্মীর জমি আছে, তাদের খারাজ দান করতে হবে। মুসলমান হলে জিযিয়া দিতে হয় না। কিন্তু মুসলমান হলেও ভূমি-কর দিতে হবে। অবশ্য ইমাম জিম্মীকে এ কর থেকে রেহাই দিতে পারেন।

হানাফী মতে জিযিয়া না দিলেও চুক্তি ভঙ্গ হয় না। কারণ, এর মধ্যে সব চাইতে প্রয়োজনীয় বিষয় হল জিম্মী হওয়ার ব্যাপারটি—জিযিয়া প্রদান করা নয়। জিম্মী হওয়ার ফলেই জিযিয়া দিতে হয়। সেই কারণে আইনবিদগণ জিম্মীদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার ব্যাপারে উদারতা অবলম্বন করতে বলেছেন। আবু ইউসুফ বলেন, 'জিযিয়া না দিলে তাদের প্রহার করা উচিত নয় অথবা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা উচিত নয়। জিযিয়া না দেয়া পর্যন্ত তাদের কয়েদ করা উচিত।' জিম্মীদের জেহাদে শরীক হওয়ার যখন কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তখন জিযিয়াকে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও মুসলিম শাসনে রক্ষণাবেক্ষণের অধিকারের বিনিময়ে প্রদত্ত শুল্কও বলা যেতে পারে।

২। জিম্মীগণ ইসলাম ধর্মকে সমালোচনা করবে না, মুসলিম অনুষ্ঠানাদির অবমাননা করবে না।

৩। তারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বা আল-কোরআনের নিন্দাবাদ বা অসম্মান করবে না।

৪। তারা মুসলমানের জীবন বা ধনসম্পদ বিনষ্ট করবে না; কিংবা তার ধর্ম-বিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরাতে কিংবা তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে প্রলুব্ধ করবে না। কারণ, একে অবিশ্বাস প্রসারের অপচেষ্টা বলে গণ্য করা হবে।

৫। জিম্মী মুসলিম মহিলাদের বিবাহ করতে পারবে না কিংবা তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারবে না। (মুসলমানগণ অবশ্য ম্যাজিয়ান বা পৌত্তলিক ভিন্ন কিতাবী মহিলাকে বিবাহ করতে পারে)।

৬। তারা শত্রুপক্ষকে সাহায্য করতে পারবে না; অথবা হারবীকে (বিদেশী) সাহায্য করতে পারবে না বা গুপ্তচর নিয়োগ করতে পারবে না। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য শত্রুপক্ষের নিকট বলতে পারবে না কিংবা তাদের কোন সংবাদাদি সরবরাহ করতে পারবে না।

৭। مسلمانوں সঙ্গে তারা ব্যবসায়ের সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার পেলেও তারা মদ বিক্রয় বা সুদের ব্যবসায় করতে পারবে না; কিংবা প্রকাশ্যে তারা মদ ও শূকরের গোশত খেতে পারবে না।

৮। তারা বিশেষ কতকগুলো পোশাক পরিধান করবে, যেমন গিয়ার পোশাকে একটা হলদে বন্ধনী; যুন্নার (girdle) এবং মাথার লম্বা ও রঙীন কালানসুয়া বা শিরস্ত্রাণ।

৯। তারা ঘোড়ায় চড়তে পারবে না বা অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারবে না। অবশ্য গাধা ও খচ্চরের পিঠে তারা চড়তে পারবে। তাদের বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন হিসেবে জিনের ওপর তাদেরকে একটা কাষ্ঠ-গোলক বেঁধে দিতে হবে।

১০। তাদের বাড়ী-ঘর मुसलमानों চাইতে উঁচু হবে না—নীচু হলেই ভাল।

১১। তারা তাদের গীর্জার ঘণ্টা জোরে বাজাবে না বা উচ্চস্বরে উপাসনা করবে না।

১২। মৃতদেহ নিয়ে তারা চীৎকার করে কাঁদবে না; মুসলিম জনপদ থেকে দূরে তাদের কবরস্থ করতে হবে।

এর ফলে প্রত্যেক সম্প্রদায় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পায়। এরা নিজের নিজের ধর্ম পালন করার অধিকার ভোগ করত নিজস্ব ধর্মীয় নেতার অধীনে এবং নিজেদেরকে পরিচালিত করত। ধর্মীয় নেতারা আবার মুসলিম শাসকদের নিকট দায়ী থাকতেন। কাজেই জিম্মীকে দুটি সমাজ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখাতে হত। তার নিজের সমাজ ও যে বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তার সমাজের অস্তিত্ব ছিল। তার নিজের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তার অধিকার সম্পূর্ণরূপে রক্ষিত ছিল; কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তার ওপর কতকগুলো বিধি-নিষেধ আরোপ করা হত, যেমন সাক্ষ্যদান, ফৌজদারী আইন ও বিবাহ। সে মুসলমানদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করতে পারবে না। যদি তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করত, তবে হয় তাকেও নতুন ধর্ম গ্রহণ করতে হত, নতুবা স্ত্রীকে তালাক দিতে হত। গানিমাতেও তার কোন অধিকার ছিল না। যুদ্ধে যোগদান করলে তাকে বেতন দেয়া হত।

কিতাবীদের মধ্যে বানু-তাগলীবের আরব খৃস্টানগণই সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে। তারা নিজেদের জিম্মী বলতে চাইতেন না এবং জিযিয়াও দিতেন না। খলিফা প্রথম উমর অমুসলিম থাকা অবস্থায় তাদের কাছ থেকে জিযিয়া দাবী করেন। কিন্তু তারা জিযিয়া দিতে অস্বীকার করেন। তারা বলেন যে, তারা আরব দেশীয় এবং এদিক থেকে নিজের দেশের আরবীয়দের কাছ থেকে ভিন্ন ব্যবহার তারা প্রত্যাশা করেন না।

কিন্তু হযরত উমর তাদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তারা দারুল ইসলাম থেকে হিজরত করার হুমকী দেখায়। এমতাবস্থায় তখন হযরত ওমর বানু-তাগলীব গোত্রের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উবায়দা ইবনে আন-নুমানের উপদেশক্রমে জিযিয়া আদায় না করার সিদ্ধান্ত করেন। অবশ্য, এই শর্ত আরোপ করেন যে, তাদের দ্বিগুণ সদকা দিতে হবে এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের খৃস্টধর্মে দীক্ষাদান থেকে বিরত থাকতে হবে।

গাসানের খৃস্টান আরব বাদশা জাবালা ইবনে আল-আইহামের বিষয়টি অন্যভাবে মীমাংসিত হয়। মুসলিম বিজয়ের পর জাবালা তাঁর স্বদেশে ফিরে আসেন; কিন্তু এর অল্পদিন পরই তাকে জিযিয়া দিতে বলা হয়। তিনি এই বলে জিযিয়া দিতে অস্বীকার করেন যে, তিনি একজন আরব; এবং পরে তিনি বাইজান্টীয় ভূখণ্ডে চলে যান। অন্য একটি সূত্রে জাবালার হিজরতের অন্য কারণ জানতে পারা যায়। বালাযুরী বলেন, জাবালাকে জনৈক মুসলমান অপদস্থ করে। খলিফা উমরের কাছে যখন বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, তখন খলিফার বিচার তাঁর মনপুত হয় নি। ফলে তিনি দারুল ইসলাম ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে একথা স্পষ্টভাবে জানতে পারা গেছে যে, খলিফা উমর (রাঃ) বানু-তাগলীবের মত জাবালাকে বিশেষ সুবিধা দান করতে চান নি।

উপসংহার

আইনবিদদের ব্যাখ্যা এবং বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগের অবস্থা অনেকখানি ভিন্ন ছিল। যেহেতু আইন যথোচিত ও প্রয়োজনীয় অবস্থার মধ্যে কেবল পার্থক্য নির্দেশ করে, তাই উদারতার মাত্রা শাসক ও তাদের অধীনস্থদের মর্জির ওপরই নির্ভর করত। এমনও নযির আছে যে, উভয়পক্ষেই আইন এড়িয়ে গেছে এবং অমান্যও করেছে (জিম্মীদের সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ, জিযিয়া প্রদান ও গীর্জা ও সিনাগণ নির্মাণের ব্যাপারে)। খলিফা আল-মনসুর সরকারী চাকুরী থেকে সব জিম্মীকে অপসারিত করেন। আর আল-মতাওয়াক্কীল তাদের প্রতি খুব খড়গহস্ত ছিলেন। তিনি মুসলমানদের দেশ জয়ের পরে নির্মিত সব গীর্জা ও সিনাগস বিনষ্ট করার আদেশ দেন। জিম্মীরাও অধিকতর সুযোগ-সুবিধা পাবার জন্যে ভিত্তিহীন দাবী-দাওয়া জানাতে থাকে। সিনাই পর্বতের খৃস্টানদের বিষয়টি এর একটি নযির। বর্ণিত আছে যে, একটি গীর্জা দখলে রাখার জন্য হযরতের সঙ্গে নাকি ওখানকার জিম্মীদের ২য় হিজরীতে একটি চুক্তি হয় এবং এজন্য জিম্মীগণ জাল দলিল পেশ করে। এর ফলে কোন কোন মুসলিম শাসনকর্তা এতদূর বলেছেন যে, প্রথম দিকে জিম্মীদের সঙ্গে যে সব চুক্তি হয়েছে, তা এখন অকেজো হয়ে গিয়েছে। তাই এগুলো নষ্ট করে দেয়া উচিত। আল-গাজ্জালী প্রমুখ অনেক আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা অবিশ্বাসের স্থায়িত্বের দরুন জিম্মীদের প্রতি কিছুটা কঠোর ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন।

এসব ব্যবস্থা ও কার্যাবলী অনেক জিম্মীর পক্ষে কঠোর হলেও একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সত্যিকারের ঔদার্যমূলক এবং যে সব কিতাবী তাদের কিতাবের নীতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করতে চাইতেন, এ আইন তাদের রক্ষাকবচ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। অনুদারতার প্রভাব যদিও কখনো কখনো বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে থাকে, তবে তার গোড়ায় ছিল ক্রমবর্ধমান পীড়নমূলক শাসনের লক্ষণ, যে জন্য অমুসলিমের মতই মুসলমান জনসাধারণকেও কম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয় নি।

কোন কোন খলিফা ও শাসনকর্তা যেমন কঠোর ও নিষ্ঠুর ছিলেন, তেমনি আবার অনেক খলিফা উদারতা ও অমায়িক ব্যবহারের প্রতীক ছিলেন। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় আল-মুকতাফীর (খৃস্টাব্দ ১১৩৬-১১৬০) নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি নিস্টোরীয় পাদ্রীদের যে সনদ দান করেন, তা এই উদারতার সুষ্ঠু প্রমাণ। এ. মিংগানা কর্তৃক সম্পাদিত "A Charter of Protection granted to the Nestorian Church in A.D. 1138 by Muktafi II" Man-Chester, 1925, P. P, 3-7.) নামক ঐতিহাসিক সনদের বিবরণে এরই নযির মেলে। বিভ্রান্ত শাসনাধীনে অনেক সময় জিম্মীগণ নিষ্পেষিত হয়েছে। কিন্তু مسلمانوں অবস্থাও খুব ভাল ছিল না। কোন একটি বিশেষ শাসনকালে বা যুগে জিম্মীদের প্রতি অত্যাচারের মাত্রার গতিপথ নির্দেশ করে।

মুসলিম শাসনাধীনে জিম্মীদের প্রতি ব্যবহারের বিষয়টি বিচার করতে গেলে খামখেয়ালী খলিফাদের ও মুসলিমদের হাতে জিম্মীদের দুঃখ-কষ্টের নযির নিলে চলবে না; এ বিচার করতে গেলে আইনের সাধারণ উদারতার নীতি, প্রত্যেক যুগের প্রচলিত অবস্থা ও পরিবেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার কথাও মনে রাখতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00