📄 ভূমিকা
একথা স্মরণ রাখা উচিত যে, জেহাদ দারুল হারবকে দারুল ইসলামে পরিণত করার একটি মাধ্যম বিশেষ। যদি কখনও পূর্ণাঙ্গভাবে এ উদ্দেশ্য সাধিত হত, তবে দারুল হারবের আর কোন অস্তিত্ব থাকত না এবং অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ভিন্ন জেহাদের আর কোন প্রয়োজনই হত না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যেতে পারে যে, ইসলামী আইনবিজ্ঞানে ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল শান্তিরাজ্য প্রতিষ্ঠা। এই কারণেই বোধহয় খারেজীদের মত জেহাদ ধর্মের ষষ্ঠ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয় নি। শান্তিপ্রতিষ্ঠার অস্থায়ী হাতিয়ার হিসেবেই জেহাদের ভূমিকা কার্যকরী হয়েছে। ধর্মের নীতিগুলোর মধ্যে জেহাদ অন্যতম স্থায়ী নীতি হিসেবে গণ্য হতে পারে না।
লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামের ধর্মীয় আইনবিজ্ঞান শান্তিপূর্ণ বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর একটি অতি আদর্শবাদ (Utopia) পেশ করেছে। খৃস্টধর্মের মতই ইসলাম মানবজাতির মুক্তি এনে দেবার সাধনা করেছে। মুসলিম শক্তি ক্ষীয়মান হয়ে আসার পরেও মুসলিম আইনবিদ ও দার্শনিকগণ আদর্শস্থানীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার মত রাষ্ট্র সম্পর্কীয় সুদূরপ্রসারী নীতির উদ্ভাবন করে খোদায়ী রাষ্ট্রের আদর্শ সংজ্ঞা ও পরিকল্পনা পেশ করেছেন। এ রাষ্ট্রে খোদাভীরু মুসলমানগণ পরিপূর্ণ সুখ-শান্তিতে বসবাস করবেন। আবদুল কাহির আল-বাগদাদী ও আল-মাওয়ার্দী দুনিয়ার সব বিশ্বাসীকে নিয়ে বিরাট আইনগত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত নিখিল বিশ্বভিত্তিক একটি ইসলামী রাষ্ট্রের কল্পনা করেছেন। এ রাষ্ট্র এক ইমাম দ্বারা পরিচালিত হবে, যাঁর ক্ষমতা কখন কখন স্থানীয় শাসকদের দ্বারা টলায়মান, বিচ্ছিন্ন ও সঙ্কুচিত হলেও অবিভাজ্য বলে গণ্য হবে। আল-ফারাবী ও ইবনে সিনা খোদায়ী রাষ্ট্রের খলিফাকে একাধারে দার্শনিক ও রাজনৈতিক প্রধান বা খলিফা হিসেবে মনে করেছেন। ফারাবীর মতে সর্বাঙ্গীন ও পূর্ণাবয়ব রাষ্ট্রই সত্যিকারভাবে সার্বজনীন রাষ্ট্র।
নানা কারণে অন্যান্য বিশ্বরাষ্ট্র ব্যবস্থার মতই ইসলামী রাষ্ট্র এ আদর্শ কেবল আংশিকভাবেই রূপায়িত করতে পেরেছিল। পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে বিশাল ভূখণ্ডের ওপর ইসলাম প্রভাব বিস্তার করে; কিন্তু বিশ্বঐক্য প্রতিষ্ঠার অন্যান্য প্রয়াসের মতই এ প্রচেষ্টাও যুগপৎ অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের বিরোধিতার ফলে ব্যর্থ হয়। ইসলামের অভ্যন্তরে ক্রমশঃ ধর্মীয় ও আইনগত সমস্যা মাথা তুলে দাঁড়ানোর ফলে আদি সংস্থার মধ্যে কয়েকটি বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হয়। সব লিখিত ইতিহাসেই দেখা যায়, সমস্ত বিশ্ব-সাম্রাজ্যের মধ্যে এই একইধারা বিদ্যমান ছিল। কারণ, প্রতিটি নতুন বিশ্ব-সাম্রাজ্য তার নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা, বিধি-ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানাদি পৃথিবীর এক বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। সভ্যতার ক্রমব্যাপ্তির দিকেও আর একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কারণ, বিশ্ব-সাম্রাজ্য গঠন করতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আদান-প্রদান, ধন-সম্পদ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়। সভ্যতার ব্যাপ্তি যত অধিকতরভাবে সুসমঞ্জস হয়ে গড়ে ওঠে, ততই ক্ষমতার বণ্টন ব্যবস্থা ভারসাম্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফলে, সাম্রাজ্য হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ফেডারেশনে পরিণত হয়, নতুবা স্বাধীন রাজনৈতিক সংস্থায় পরিণত হয়। ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনগত বিরোধ ও সুন্নী মযহাবের ঐতিহাসিক ক্রমোন্নতির সমর্থনে কতকগুলো খিলাফত, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র এবং কতিপয় ক্ষুদ্রতর রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্ম হল।
যদি বাইরে থেকে কোন স্থায়ী শত্রুর হামলার সম্ভাবনা থাকত কিংবা কোন সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা থাকত, তবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হত। এর ফলে অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হতে পারত এবং দলাদলিতে না মেতে বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে পারত।
খৃস্টীয় নবম শতাব্দীতে যখন মুসলিম শক্তি ক্ষমতার সুউচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, তখন বাইজান্টীয় হামলার আশঙ্কা কেবল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এর ফলেই উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন আব্বাসীয় খলিফাদের অধীনে আসেনি। অধিকন্তু, পূর্বাঞ্চলে আব্বাসীয়দের ওপর বাইজান্টীয় চাপের ফলে স্পেনে উমাইয়াগণ আব্বাসীয় আক্রমণ থেকে রেহাই পেল। তাই উমাইয়াগণ পশ্চিমী খৃস্টান রাষ্ট্রপুঞ্জের খণ্ড আক্রমণ প্রতিরোধ করার সুযোগ পেলেন। খৃস্টান রাষ্ট্রগুলো যেমন পাশ্চাত্য (রোমান) ও প্রাচ্য (গোড়া) এ দু'দলে বিভক্ত হয়ে গেল, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রেও বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হল। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি-সাম্যের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থার সৃষ্টি না হলে খৃস্টান রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্র দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একে অপরের সম্মুখীন হত এবং বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের জন্য তাদের মধ্যে সর্বক্ষণ বিরোধ লেগেই থাকত। খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে পূর্ব ও পশ্চিম ইসলামী সাম্রাজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভাগীকরণ আরম্ভ হল। ক্রুসেড যুদ্ধের ফলে পূর্ব 'ইসলামী' সাম্রাজ্য এ অবস্থা বেশী দূর অগ্রসর হতে পারেনি। ক্রুসেড যোদ্ধাগণ দুশো বছর ধরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে এবং বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু পূর্বদিক থেকে মোঙ্গলদের আক্রমণ অভ্যন্তরীণ গোলযোগকে আরও মারাত্মক পর্যায়ে এনে পৌঁছায়। আব্বাসীয়দের পতনের ফলে আরো দুটো মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন হয়। এগুলো হল : মামলুক ও উসমানীয় সাম্রাজ্য। পশ্চিম মুসলিম সাম্রাজ্যও এই একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
সার্বজনীন মুসলিম রাষ্ট্রব্যবস্থা বা ইসলামকে সার্বজনীন ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা অসম্ভব প্রমাণিত হওয়ার ফলে অনিবার্যভাবে পৃথিবীকে দুভাগে ভাগ করা হল : ইসলামী জগৎ ও সমর জগৎ। এখানে স্মরণযোগ্য যে, মুসলিম আইনবিজ্ঞানে এ শ্রেণী বিভাগ ছিল নিতান্তই সাময়িক। কিন্তু গোটা ইসলামী ইতিহাসে এ পার্থক্যবোধ সবসময়েই চলে এসেছে। আইনের দিক থেকে দেখা যায় যে, এ দুই জগতের সম্পর্ক কখনও শান্তিভিত্তিক হয়ে গড়ে ওঠেনি। এক জগৎ সবসময়েই আর একটির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল; কিন্তু এ যুদ্ধকে প্রকৃত যুদ্ধ বলে মনে করা উচিত হবে না। এটা এমন এক বিষয় যা পশ্চিমী আইনের ভাষায় ‘অস্বীকৃতি' (Non-recognition) বলে আখ্যায়িত হতে পারে। অর্থাৎ মুসলিম আইনের আওতায় আসতে হলে গোড়া থেকেই সত্য ধর্ম ও খাঁটি ইমানের যে সব অত্যাবশ্যকীয় বিধি-বিধান রয়েছে, সমর জগৎ তা গ্রহণ করতে পারে নি। একারণেই সমর জগৎ মুসলিম আইনের আওতায় আসেনি।
তবে এ 'অস্বীকৃতির’ ফলে আপোষ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং চুক্তি সম্পাদনে কোন বাধা ছিল না। এ ব্যবস্থা অনেকটা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের অনুরূপ ছিল। কারণ, এ ব্যবস্থার ফলে চুক্তিবদ্ধ দু'দলের মধ্যে সমতার কোন প্রশ্ন ছিল না কিংবা এসব চুক্তিকে স্থায়ী বলেও মনে করা হত না। আধুনিক আইনবিজ্ঞানে এ অবস্থার মত একটা জিনিস আছে, তা হল অবস্থাভেদে বিদ্রোহের (Insurgency) স্বীকৃতি। এতে যেমন পরে কার্যতঃ বা আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেবার কোন বাধা নেই, তেমনি বিদ্রোহ-কবলিত সরকারের স্বীকৃতিও এর মধ্যে নেই। এর দ্বারা শুধু এইটুকু বোঝানো হয়েছে যে, একটি বিশেষ পরিবেশে কোন রাষ্ট্রে আইন রূপায়িত করার জন্য ক্ষমতাবান সংস্থার প্রয়োজন। অনুরূপভাবে ইসলামী রাষ্ট্র অমুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সময় (আধুনিক পরিভাষায় 'স্বীকৃতি') ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী তাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। (ইসলামী দৃষ্টিতে স্বীকৃতির অর্থ হচ্ছে, অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম আইনের প্রয়োগক্ষেত্র সম্প্রসারণ)। এর মধ্যে শুধু এই অনুমোদনটুকু রয়েছে যে, সমর জগৎ যতদিন মুসলিম কর্তৃত্বের বাইরে থাকবে, ততদিন সেখানে এক ক্ষমতাবান সংস্থার প্রয়োজন।
কোন কোন আইনবিদ অবশ্য, বিশেষ করে শাফেয়ীগণ, পৃথিবীর আর একটি তৃতীয় বিভাগের কথা বলেছেন। তা হল : দারুস সুলহ (শান্তির রাজ্য) বা দারুল আহদ (চুক্তির জগৎ)। যুদ্ধ আরম্ভ হবার পূর্বে বা যুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধের পর যদি অমুসলিম রাষ্ট্র ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চায়, তবে তাদের আংশিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ অবস্থায় অবশ্য অমুসলিম রাষ্ট্রকে হয় বাৎসরিক শুল্ক বা জিযিয়া দিতে হবে অথবা তাদের এলাকার অংশ-বিশেষ দিয়ে দিতে হবে। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফীরা, এ তৃতীয় বিভাগটি মেনে নেননি। তাঁরা বলেছেন যে, যদি কোন রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং শুল্ক জিযিয়া দিতে রাজী হয়, তবে তারা দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে এবং ইমামকে অবশ্যই তাদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিতে হবে। নতুবা এ রাষ্ট্র দারুল হারব বলে বিবেচিত হবে।
মোটামুটি একথা বলা যায় যে, জেহাদের মতই আইনের চোখে শান্তি আইনও ছিল নিছক সাময়িক পন্থা। এর মাধ্যমে যুদ্ধ-বিরতির কালে মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে বহির্জগতের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হত। দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পারস্পরিক মর্যাদা স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হত। কিন্তু এর দ্বারা এ দুই রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি। কারণ, দারুল হারবের অধিবাসীদের ইসলাম কবুল না করা পর্যন্ত কিংবা ইসলাম স্বীকৃত ধর্মের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দারুল হারবের পক্ষে কোন স্বাভাবিক বা স্থায়ী মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হত না। অবশ্য কার্যতঃ সক্রিয় জেহাদের নীতি মন্দীভূত হয়ে আসে এবং এ অবস্থা মুসলমানদের গা-সওয়া হয়ে যায়। ক্রমেই তাঁরা শান্তি-আইনের স্থায়িত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশকে একটি রাষ্ট্রপুঞ্জের আওতায় একীভূত করার আধুনিক প্রবণতার সঙ্গে এ ক্রমবিকাশ অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গেছে।
📄 আইনের আওতা
ব্যক্তি : বিশ্বাসী মুসলিম
মুসলিম আইন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে, বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে নয়। মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করলেও বিশ্বাসীকে মুসলিম আইন মেনে চলতে হবে। আবার অনুরূপভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম জনসাধারণ ঠিক মুসলমানের রীতি অনুযায়ী আইন-কানুন মানতে বাধ্য থাকে না। অবশ্য, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস করার ফলে তাদের কতকগুলো কর্তব্য পালন করতেই হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আওতা (Jurisdiction) ব্যক্তির ধর্মের ওপরই নির্ভরশীল। আর ধর্মের ওপর ভিত্তি করেই ব্যক্তি মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন এবং একই সঙ্গে মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেও গণ্য হতে পারেন। সাধারণভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী, কেবল তিনিই মুসলমান বলে পরিচিত হতে পারেন। আইন ও ধর্মের দিক থেকে বিষয়টি অতটা সহজ নয়।
কোন কোন মুসলিম আইনবিদ বলেছেন যে, যেকোন ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) রিসালাতে বিশ্বাস করবেন এবং তিনি যে সব নীতি প্রচার করেছেন সেগুলো সত্য বলে জানবেন, কেবল তিনিই মুসলমান বলে গণ্য হবেন। এ ঘোষণার পরে তিনি যা-ই বলুন না কেন, তাতে কিছুই আসে যায় না। অন্যান্য আইনবিদরা বলেন যে ব্যক্তি ধর্মের পাঁচটি মূলনীতি পালন করেন বা যিনি কেবলমাত্র কাবা শরীফের দিকে মুখ করে ইবাদাত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন, তিনিই মুসলমান। ইমাম আবু হানিফা এতদূর পর্যন্ত বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি কাবা শরীফের অবস্থান সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন, তবু তিনি মুসলমান বলে গণ্য হবেন। আবদুল কাহির আল- বাগদাদী অবশ্য এসব সংজ্ঞাকে খুব বেশী ব্যাপক ও অপ্রামাণ্য বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, তাঁরা মুসলমান বলে গণ্য হবেন যাঁরা এমন বিশ্বাস করেন যে নিখিল-বিশ্ব সৃষ্ট হয়েছে এবং স্রষ্টা এক আর তাঁর পূর্ব অস্থিত্ব, তাঁর গুণাবলী, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা ও তাঁর জ্ঞান সম্পর্কে গভীর আস্থা স্থপন করেন আর তাঁর নিছক মানবিক ব্যক্তিগত রূপ অস্বীকার করেন। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) রিসালাত, তাঁর সার্বজনীন নবুয়ত, তাঁর আইনের শাশ্বত রূপ, তিনি যা আদেশ করেছেন সব সত্য বলে মনে করা, আল-কোরআনকে আইনগত রীতি-নীতির উৎস-মূল বলে জানা এবং কাবা- শরীফের দিকে মুখ করে ইবাদাত যিনি এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন এবং যে ধর্মবিরোধী প্রবণতা তাঁকে অবিশ্বাসের পথে নিয়ে যেতে পারে, তা অনুসরণ করেন না-তিনিই সত্যিকার সুন্নীপন্থী বলে বিবেচিত হবেন।
আল-বাগদাদী বলেন যদি কোন মুসলমান কোন একটি ধর্মবিরোধী মযহাবে বিশ্বাস করেন, তবে ইসলামী রাষ্ট্র তার অধিকার ও কর্তব্য সীমিত করতে বাধ্য। বাগদাদীর মতে তাকে মুসলমানদের গোরস্থানে সমাহিত করা হবে এবং তিনি যুদ্ধে যোগদান করলে যুদ্ধলব্ধ ক্ষতিপূরণ, শুল্ক ও গানিমার অংশ লাভ করতে পারবেন। মসজিদে ইবাদাত করতেও তাকে বাধা দেয়া যাবে না। কিন্তু তিনি উম্মা বা মুসলিম সমাজ-বহির্ভূত বলে গণ্য হবেন। তার মৃতদেহের দাফনকালে কোন নামাজ পড়া হবে না: তার পেছনে নামাজ ও জানাজা পড়াও সিদ্ধ হবে না। তিনি কোন পশু জবেহ করলে তাও হালাল হবে না। তিনি সুন্নী মহিলাদের বিবাহ করতে পারবেন না। কোন সুন্নী পুরুষও অনুরূপ মতাবলম্বী পরিবারের কোন মহিলাকে বিবাহ করতে পারবেন না।
উল্লেখযোগ্য যে, কোন ব্যক্তিকে মুসলিম সমাজের সদস্য হতে হলে তাঁকে ইমানের পূর্ববর্ণিত নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করতেই হবে। তাই, ইসলাম নাগরিকদের ধর্ম ও জাতীয়তা উভয়েরই প্রতীক। কোন কোন আইনবিদ ও ধর্মবেত্তা ইসলাম ও বাহ্যিক আত্মসমর্পণ এবং ইমান বা আন্তরিক আত্মসমর্পণে (বিশ্বাস) পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। কিন্তু নাসাফী প্রমুখ আইনবিদরা এ দুটোকে একই পর্যায়ের বলে মনে করেন।
শিয়াপন্থীগণ ইসলাম ও ইমানের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। ইমানের মধ্যে অভ্রান্ত ইমামের প্রতি আনুগত্য (ওয়ালাইয়া) এবং আস্থাবোধও নিহিত রয়েছে। শিয়াদের কাছে ইসলাম সকল বিশ্বাসীর ধর্ম বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া সকলেই 'ইমান'-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। এরাই খাঁটি ও নিষ্ঠাবান ধর্ম- বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যক্তি: কাফের ও মুরতাদ
ইমানের বিপরীত হচ্ছে কুফর অবিশ্বাস। যে ব্যক্তি আল্লাহকে অস্বীকার করে, সে কাফের। যে মুসলমান মুশরিক হয়ে যায় বা অন্য ধর্ম গ্রহণ করে, তাকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলা হয়। কাফেরদের শাস্তি-বিধান সম্পর্কে ধর্মবেত্তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কোন কোন মনীষী বলেছেন যে, কাফের পরকালে জাহান্নামী হবে এবং অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার কেউ বলেন যে, এ দুনিয়াতেও তাদের আংশিক শাস্তি ভোগ করতে হবে। আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ এ সম্বন্ধে সম্মিলিত অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মুরতাদ হয়ে যাওয়া ইহকালে ও পরকালে আইনতঃ দণ্ডনীয়। সে ব্যক্তি কেবল পরকালের নাজাত থেকেই বঞ্চিত হবে তাই নয়, রাষ্ট্র তার মৃত্যুদণ্ডের বিধান করবে। আল-কোরআনের এ আইন নিম্নলিখিত নির্দেশাবলীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে:
১। "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় এবং বিশ্বাসহীন (বেঈমান) অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হয় তারা হচ্ছে এই শ্রেণীর লোক, যাদের কাজ এ পৃথিবীতে ও পরকালে বৃথা বলে গণ্য হবে। অগ্নিই হল তাদের আবাসভূমি এবং অনন্তকালে তারা সেখানে বাস করবে।” (২: ২১৪)
২। "কেন তোমরা মুনাফিকদের বিষয়টি নিয়ে দু'দলে বিভক্ত হয়ে গেছ? তাদের তোমরা মিত্র বলে মনে কর না, যে পর্যন্ত তারা তাদের ঘর-বাড়ী ছেড়ে আল্লাহর পথে জেহাদ করবার জন্য হিজরত করে। যদি তারা পুনরায় বিরোধিতা শুরু করে, তবে তাদের ধরার চেষ্টা কর এবং যেখানে পাও, হত্যা কর।" (৪:৯০-৯১)
৩। "হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার ধর্ম থেকে দূরে সরে যায়, তবে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর নিজের প্রিয় এমন এক জাতি উত্থিত করবেন, যারা তাঁকে ভালোবাসবে এবং যারা বিশ্বাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে ও অবিশ্বাসীদের শাস্তি দেবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে ও নিন্দাকারীদের নিন্দাকে ভয় করবে না; এটাই হল আল্লাহর রহমত। যার প্রতি ইচ্ছা, আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন। সব কিছুর ওপরই আল্লাহর দখল রয়েছে এবং তিনি সবকিছুই জানেন।" (৫:৫৪)
৪। "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাসী হয়—অবশ্য, যাকে জোর করে ধর্মত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় অথচ যার হৃদয় ঈমানের প্রতি অটল রয়েছে, সে ব্যক্তি ছাড়া এবং যে তার হৃদয়কে অবিশ্বাসে ডুবিয়ে দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহর গযব; তাদের জন্যে কঠোর শাস্তি।” (১৬:১০৬)
যদিও এ চারটি আয়াতের মধ্যে কেবল দ্বিতীয়টিতে ধর্ম পরিত্যাগকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ডের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, তবু সব ভাষ্যকারই এ সম্বন্ধে একমত প্রকাশ করেছেন যে, যে বিশ্বাসী খোলাখুলিভাবে বা গোপনে ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় এবং অবিশ্বাসে অটল থাকে, তাকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। ইসলাম থেকে যে ব্যক্তি দূরে সরে যায়, তাকে মৃত্যুদণ্ড দান সম্পর্কে হাদিসে আরও সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলে আকরম (সঃ) বলেছেন যে, "যে তার ধর্ম পরিত্যাগ করে, তাকে হত্যা করতে হবে।" ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়েও যারা শাস্তি ভোগ করে নি, তাদের সংখ্যা নিতান্ত সামান্য। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর রিদ্দার (রিদ্দাদ—দল ত্যাগ বা পৃথক হওয়া) যুদ্ধ-জয়ের পর এ আইন খুব কঠোরভাবে কার্যকারী করা হয়। ধর্ম পরিত্যাগ করা সম্পর্কে আইনটি খোলাফা-ই-রাশেদীনের ব্যবহার-বিধি দ্বারা সমর্থিত হয়েছে এবং ইজমা বা ঐক্যমত দ্বারা বিধিবদ্ধ রয়েছে। এ আইনের বৈধতা সম্পর্কে কোন মতবিরোধ নেই।
মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া চলবে না। তাকে প্রথমে সাবধান করে দিতে হবে এবং ইসলামে প্রত্যাবর্তন কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নেয়ার জন্য ৩ দিন সময় দিতে হবে। হানাফী ও হাম্বলী আইনবিদগণ ছাড়া আর সব আইনবিদই ধর্ম- ত্যাগের অপরাধের ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষদের সঙ্গে একই পর্যায়ভুক্ত করেছেন। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন যে, নারীদের ইসলামে ফিরে আসতে বাধ্য করার জন্য প্রহার থেকে শুরু করে কারাবাস পর্যন্ত শাস্তি দেয়া যেতে পারে। শিশু ও উন্মাদদের হত্যা করা চলবে না, যে পর্যন্ত না উন্মাদ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক না হয়। তরবারীর সাহায্যে মুরতাদকে হত্যা করতে হবে, আগুনে পুড়িয়ে নয়। কারণ, কেবল আল্লাহতালাই আগুনের মাধ্যমে শাস্তি বিধান করেন। ইমামের হুকুম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। অবশ্য কোন কোন আইনবিদ বিশেষ করে শাফেয়ী আইনবিদগণ মনে করেন যে, দাস যদি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তবে তার প্রভু তাকে হত্যা করতে পারেন।
যদি একদল মুরতাদ সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে হুমকী প্রদর্শন করে, তবে ইমাম জেহাদ ঘোষণা করে জেহাদের বিধান কার্যকরী করবেন। এ সম্বন্ধে যুদ্ধের আইনে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। (বিভিন্ন প্রকারের জেহাদের অধ্যায় দেখুন)।
মুরতাদ সম্পর্কীয় আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আমলে কয়েকজন বিশ্বাসীর মুশরিক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি। মক্কাবাসীদের সঙ্গে মহানবীর যে চুক্তি সম্পাদিত হয় (৬৩০ খৃস্টাব্দ), তার মাধ্যমে মক্কার যে সব অধিবাসী চুক্তিটি সম্পন্ন হবার পূর্বে মুসলিম সমাজে যোগ দিয়েছিল, তাদের নিজধর্মে ফিরে যাবার পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। রিদ্দার যুদ্ধের পর মুরতাদদের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। কারণ, ইসলাম তখন আরব উপদ্বীপে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। তখন থেকেই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ডের আইন বিধিবদ্ধ হয় এবং তার সুষ্ঠু রূপায়ণ ইমামের কর্তব্যরূপে পরিগণিত হয়।
রাষ্ট্রপ্রধান: ইমাম
খিলাফতের প্রশ্নের মত আর কোন প্রশ্ন নিয়ে ইসলামে এতখানি বাকবিতণ্ডা হয় নি। অন্য কোন বিষয়ে আইনের মূলনীতি লংঘনের এমন নজিরও আর বড় একটা পাওয়া যায় না। কারণ, এ বিষয়টি নিয়ে দলগত বিভেদ ও বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়। আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাগণ ইমামতের (খিলাফতের) প্রকৃতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে নানাবিধ আলোচনা করেছেন এবং প্রত্যেকেই নিজের দলের মতামতকেই বড় করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু খিলাফতের ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে কেউ বেশী আলোচনা করেন নি।
ইসলামী আইনবিজ্ঞানে ইমাম রাষ্ট্রের প্রধান নন। স্বয়ং আল্লাহই রাষ্ট্রের মালিক। কার্যতঃ কিন্তু ইমামই সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার্যপরিচালনা করেন। নির্বাচন বা মনোনয়ন, যে ভিত্তিতেই তাঁকে নিয়োগ করা হোক না কেন, তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রে আইনের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে সমগ্র রাষ্ট্রের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা। ইমামতের প্রকৃতি ও কার্যক্রম আসলে রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত। কাজেই এ বিষয়টা এখানে ততটুকুই আলোচনা করা যাক, যতটুকু বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় প্রয়োজন হয়।
ইমামের কর্তব্য হল জেহাদের মারফত বিশ্বব্যাপী আল্লাহর বাণীর সার্বভৌমত্ব কায়েম করে ইসলামের মূল উদ্দেশ্যকে কার্যে পরিণত করা। যুদ্ধ ও শান্তিকাল উভয় সময়েই ইমাম এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এবং বিশ্বাসীদের সঙ্গে অবিশ্বাসীদের সম্পর্ক নিরূপণের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন বাস্তবায়িত করেন। যুদ্ধ পরিচালনার হুকুম তিনিই জারী করেন, নব-বিজিত দেশে আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেন এবং আইন অমান্য করলে শাস্তি-বিধান করেন।
জেহাদ কখন চালিয়ে যেতে হবে বা কখন তা স্থগিত বা বন্ধ রাখতে হবে এসব ব্যাপারে তিনিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শত্রুপক্ষের দাবী স্বীকার করে নিয়ে কখন তাদের সঙ্গে সন্ধি বা শান্তির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সমঝোতায় আসতে হবে, তা তিনিই স্থির করেন।
ইমামের ক্ষমতা ব্যাপক হলেও তারও সীমা আছে। আইনের আওতার মধ্যে থেকেই তাঁকে এ ক্ষমতা পরিচালনা করতে হবে; অর্থাৎ দেখতে হবে, যাতে সুষ্ঠুরূপে আইনের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য সাধনের ওপর দৃষ্টি রেখে যদি ইমাম তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তবেই তিনি মুসলমানদের আনুগত্য দাবী করতে পারেন নতুবা তাঁকে ইমামের পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। তবে কি করে তাঁকে অপসারণ করা যাবে, সেটাই সমস্যা। অপসারণ করা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
বৈদেশিক সম্পর্ক নিরূপণের ব্যাপারে ইমাম তাঁর ক্ষমতা সমরাঙ্গণে যুদ্ধরত সেনাপতিদের বা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের ওপর ন্যস্ত করতে পারেন। অনেক সময়ে এঁদেরকে আপোষ-আলোচনা চালানো, জেহাদ পরিচালনা এবং যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি বণ্টনের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হত। কিন্তু যে কোন বিষয়ে ইমামের অনুমোদন করার বিশেষ ক্ষমতা (Veto power) রয়েছে। এ ক্ষমতা বলে তিনি ইচ্ছা করলে কোন চুক্তি অনুমোদন না-ও করতে পারেন এবং যে গৃহীত কর্মপন্থা বা ব্যবস্থা মুসলিম স্বার্থবিরোধী, তা' বাতিল করে দিতে পারেন। ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী কাজের জন্য তিনি তাঁর প্রতিনিধিদের (শাসনকর্তাদের) শাস্তি-বিধানও করতে পারেন।
পৃথিবীতে ইমাম আল্লাহর খলিফা। আল্লাহর খলিফা হিসেবে তাঁর কাজ হল আল্লাহর আইন কার্যে পরিণত করা। খারেজী দল ভিন্ন আর সব মাযহাব অনুযায়ী স্বাভাবিক এবং নীতিগতভাবে ইমামের শাসন অতীব প্রয়োজনীয়। ইমাম যদি মৃত্যুমুখে পতিত হন, কার্যপরিচালনায় অসমর্থ হয়ে পড়েন বা ইমামতের দায়িত্ব পরিত্যাগ করেন তবে নতুন ইমাম নিযুক্ত করা মুসলিম সমাজের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য বলে গণ্য হয়। কিন্তু ইমাম যদি শত্রুর হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁকে বন্দী করে রাখা হয়, সে ক্ষেত্রে তিনিই আইনগত ইমাম বলে গণ্য হবেন। মুসলিম সমাজ অবশ্যই যুদ্ধ বা কূটনীতির মারফত তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করবেন।
দারুল ইসলামের বিভিন্ন অংশে একাধিক ইমাম নিয়োগের ফলে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। কোন অমুসলিম শাসক কর্তৃক মুসলিম ইমামের স্বীকৃতি তখন খুব বড় প্রশ্ন ছিল না। কারণ, অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রদত্ত স্বীকৃতি মুসলিম আইনে বৈধ বলে গণ্য হয় না। এক মুসলিম ইমামের সঙ্গে অপর মুসলিম ইমামের আইনগত সম্পর্ক নির্ণয়ের ব্যাপারেই সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার উদ্ভব হয়। সাধারণ মুসলিম আইন-বিজ্ঞানে গতানুগতিকভাবে (Classical Theory) অবশ্য এ নীতি পেশ করা হয়েছে যে, যেহেতু আল্লাহ এক এবং আইনের বিধানও একটি বৈ দু'টি নয়, কাজেই শাসকও একজন হতে বাধ্য। আল-বাকিল্লানী ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুন প্রমুখ আইনবিদ এ নীতি পেশ করেছেন যে, যদি দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলসমূহ সুবিস্তীর্ণ হয় এবং কোন কোন এলাকা মাঝপথে সমুদ্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, তবে দুই বা ততোধিক ইমাম নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু একাধিক খলিফার (ইমামের) স্বপক্ষে আর কোন যুক্তি ইবনে রুশদ ও ইবনে খালদুন দেখাতে পারেন নি। ইমামদের পারস্পরিক আইনগত সম্পর্কও তাঁরা ব্যাখা করতে পারেন নি। ফলে একাধিক ইমামতের আইনগত ভিত্তি শিথিলই রয়ে গেছে। আর এর দরুন অনেক অননুমোদিত রাষ্ট্রের পত্তন হয়েছে। মুসলিম আইনবিদগণের বাস্তববিমুখিতাই এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এজন্যই 'অস্বীকৃতি' মুসলিম আইনে বড় কথা হয়ে রইল। বোধহয় একথা বলা যেতে পারে যে, আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য খিলাফতের অস্তিত্বকে ইসলামী জগতের পশ্চিমাঞ্চলের আইনবিদগণ তদানীন্তন পূর্বাঞ্চলের আইনবিদদের চাইতে অধিকতর আইনগত সমর্থন জানিয়েছেন। ইমামের প্রজা বা বিদেশী হিসাবে অমুসলিমদের ওপর আইন প্রয়োগ করার বিষয়টি পরবর্তী দুই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল: দারুল ইসলাম
দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হলেও এ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা পেশ করা হয় নি। আমরা জানি যে, ইসলামী আইনে ব্যক্তিকে মুসলিম সমাজের সদস্য হিসেবেই এ সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়; যে ভূখণ্ডে তিনি বাস করেন, ইসলামী আইন তার সঙ্গে ব্যক্তিকে সংযুক্ত করে না। এ সত্ত্বেও মুসলমানদের একটি অঞ্চলে বাস করতেই হয়। কাজেই তারই আলোকে আইন-বিধি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। এ আইনে মুসলিম সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ণীত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মর্যাদা নির্ধারিত হয় নি। আইনের দৃষ্টিতে কোন এলাকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ইসলামের প্রতি সেখানকার অধিবাসীদের প্রকৃত আনুগত্যের ওপরই নির্ভর করে, ইসলামের প্রতি আনুগত্যের নিছক ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না। তাই যে অঞ্চল বা রাষ্ট্রের অধিবাসীরা মুসলিম আইন পালন করেন, তাকে দারুল ইসলাম (মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল) বা রাষ্ট্র নামে অভিহিত করা হয়।
দারুল ইসলামের সংজ্ঞাটি যে খুব ব্যাপক, তাতে সন্দেহ নেই। দারুল ইসলামের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসীকে কিংবা তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যককে যথাযথভাবে আইনের বিধান পালন করতে হবে, না এতে অন্য কোন শর্ত রয়েছে তা এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবদুল কাহির আল-বাগদাদী বলেন যে, যে অঞ্চলের অধিবাসীরা দ্বিধাহীন চিত্তে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং যেখানে জিম্মীদের ওপর মুসলিম রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার নামই দারুল ইসলাম। আবার অনেক আইনবিদ বলেন যে, কোন মুসলিম ভূখণ্ড দারুল ইসলাম বলে পরিগণিত হবে, যখন বিশ্বাসীগণ ধর্মীয় কর্তব্য স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন।
দারুল ইসলামের আর একটি মাপকাঠি হল এই যে, এখানে শুক্রবারে জুমার নামাজ এবং ঈদের উৎসব প্রতিপালিত হওয়া চাই। আইনবিদগণ আরও বলেন যে, যেখানে খলিফার প্রতিনিধিরূপে ওয়ালী অবস্থান করেন কেবল সেখানেই এ নামাজ পড়া যেতে পারে। ওয়ালীর কর্তৃত্বাধীনেই কেবল নামাজ সিদ্ধ বলে গণ্য হয়। আইনের সুপরিচালনার জন্য এখানে একজন বিচারকও (কাজী) থাকা চাই।
দারুল ইসলামের ভূখণ্ড (আল-ওয়াতান) শক্তিবলে বা শান্তিপূর্ণ উপায়ে লাভ করা যেতে পারে। প্রত্যেক শুক্রবার মসজিদের ইমামের মিম্বরে একটা চিহ্ন পেশ করা হয়। : এ চিহ্নটি যদি তরবারী হয় তবে বুঝতে হবে যে, এ নগর বা দেশ শক্তিবলে দখল করা হয়েছে। যদি চিহ্ন হিসেবে কাঠের তৈরী লাঠি রাখা হয়, তবে বুঝতে হবে এ দেশ বা শহর শান্তিপূর্ণ উপায়ে অর্জিত হয়েছে। কায়রো নগরী শান্তিপূর্ণ উপায়ে দখল করা হয়েছে। দামেস্ক সম্পর্কে অবশ্য মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, নগরের এক অর্ধাংশ শক্তিবলে ও অপর অংশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে দখল করা হয়। সুতরাং, একটি কাঠের তরবারী দিয়ে দু'টি চিহ্ন একত্রিত করা হয়েছে। মদিনার অধিবাসীরা স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুল করে; তাই এখানকার মিম্বরে কোন চিহ্নই স্থান পায়নি।
কিন্তু যদি স্বাধীনভাবে নামাজ পড়া সম্ভব না হয়, তবে সে মুসলিম ভূখণ্ডে আর দারুল ইসলাম বলে গণ্য হবে না। হানাফী আইনবিদগণ দারুল ইসলামের দারুল হারবে পরিণত হবার তিনটি উপায় নির্দেশ করেছেন :
প্রথমতঃ যদি অবিশ্বাসীদের আইন-ব্যবস্থা কার্যকরী হয়; দ্বিতীয়তঃ, যদি কোন ভূখণ্ড অমুসলিম অঞ্চল দ্বারা দারুল ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; তৃতীয়তঃ, যদি এখানে মুসলমান ও জিম্মীদের পক্ষে নিরাপদে বসাবস করা সম্ভব না হয়।
কোন কোন হানাফী আইনবিদ বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন যে, শরিয়তের জায়গায় যে মুহূর্তে অবিশ্বাসীদের আইন-বিধি কার্যকরী হয়, তখনই সে অঞ্চল আর দারুল ইসলামের অংশ বলে গণ্য হতে পারে না। ফলে, বিশ্বাসীগণের পক্ষে এখানে বাস করা যদি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তবে তাদের দারুল ইসলামে হিজরত করতেই হবে। অবশ্য মুসলমানরা যদি দেখেন যে, অমুসলিমদের আইন কার্যকরী করা সত্ত্বেও তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন এবং নামাজ পড়তে কোন বাধা নেই তবে আইনের চোখে তা মুসলিম অঞ্চল বলে গণ্য হবে। এর ফলে হয়ত মুসলমানেরা এখানে আবার ফিরে আসতেও পারেন; অথবা যারা রয়ে গেলেন, তাঁরা অমুসলিমদের ইসলামে আহ্বান জানাবার সুযোগ পেলেন।
বৈধভাবে মুসলিম আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ ও সঙ্কোচনের ওপরে নির্ভর করেই মুসলিম আইনবিদগণ কোন রাষ্ট্রকে দারুল ইসলাম বা দারুল হারব হিসেবে গণ্য করেছেন। যদি গুটিকয়েক বিশ্বাসীও মুসলিম আইন মেনে চলেন, তবে এ স্থানে আইনের চোখে মুসলিম অঞ্চল বলে সাব্যস্ত হবে। উনবিংশ শতাব্দীতে নেতৃস্থানীয় মুসলিম সুধীবৃন্দ পাক-ভারত উপমহাদেশের ব্যাপারে এ ব্যাখ্যাকেই সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও উপমহাদেশটি ইংল্যাণ্ডের অধীনে ছিল, তবুও তাকে মুসলিম অঞ্চল বলে গণ্য করা হয়; কারণ, শাসক মুসলমান না হলেও চলে যদি শরিয়তের অধিংকাংশ বিধান রূপায়িত করা হয়। কোন দেশে কাজী অমুসলিম শাসক কর্তৃক নিযুক্ত হলেও (মুসলমানদের সম্মতি নিয়েই তাঁকে নিযুক্ত করা হত) তিনি মুসলমান হিসেবে যদি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন যাতে নামাজ ঠিকমত আদায় করা হয় ও শরিয়তের বিধান সুষ্ঠুরূপে পরিচালিত হয় তবে সে দেশ মুসলিম দেশ বলে গণ্য হবে।
মুসলিম অঞ্চলের শ্রেণীবিভাগ
মুসলিম আইনবিদগণ ইসলামী ভূখণ্ডকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে নানা বিভাগ ও উপ-বিভাগে বিভক্ত করেছেন। কোন কোন লেখক গোষ্ঠীগত বা উপজাতীয় বিভাগের ওপর জোর দিয়েছেন। আবার কেউ বা রাজবংশের ওপর ভিত্তি করে বিভাগ নির্ণয় করেন (একটি অঞ্চলের এক এক রাজবংশের রাজত্বের ওপর ভিত্তি করে এ বিভাগ নিরূপণ করা হয়েছে, যেমন উত্তর আফ্রিকায় আগলাবিগণ, মিসরে ফাতেমিগণ ও ইরানে বুয়াহিদগণ)। অন্যান্য লেখক বিশেষ করে ভূগোল-বিজ্ঞানীগণ আঞ্চলিক ভিত্তিতেই বিভাগ নির্ধারণ করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, আল মোকাদ্দসী দারুল ইসলামকে আরব ও আজমে (ইরান) বিভক্ত করেছেন। আজমকে আবার আটটি অঞ্চলে এবং আরবকে ছটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। 'হুদুদুল আলমে'র লেখক যে কেবল অমুসলিম অঞ্চল নিয়েই লিখেছেন তা নয়, অমুসলিম-অধ্যুষিত ভূখণ্ডের ওপরও আলোকপাত করেছেন। তিনি পৃথিবীকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন : এশিয়া, ইউরোপ ও লিবিয়া। এ তিনভাগকে আবার একান্নভাগে ভাগ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ভিত্তিতে ইসলামী অঞ্চলকেও বিভক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু মুসলিম আইনে এসব শ্রেণীবিভাগের বৈধতা স্বীকৃত হয় নি। কারণ, এ আইন-বিধানে মুসলিম কর্তৃত্বের বিভাগ বা গোষ্ঠীগত এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হয়নি। কেবলমাত্র একটি উম্মা (উম্মতে মোহাম্মদ) বা জাতির অস্তিত্বই এ আইন ব্যবস্থায় স্বীকৃত হয়েছে। যিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন, তিনি যে বংশের শাসক দ্বারাই শাসিত হোন না কেন এবং দারুল ইসলামের যে অঞ্চলের অধিবাসীই হোন না কেন, তিনি এই উম্মতের সদস্য বলেই গণ্য হবেন। মুসলমানরা নির্বিবাদে এক অঞ্চল থেকে অপর অঞ্চলে যাতায়াত করতে পারতেন। এ ব্যাপারে আনুগত্যের কোন প্রশ্নই উঠত না। কারণ, সব মুসলিম শাসককে নিজ নিজ রাষ্ট্রে একই আইন-বিধি রূপায়িত করতে হয় এবং একই ধর্ম পালন করতে হয়। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন (মৃত্যু ১৪০৬ খৃস্টাব্দে), মরক্কী দার্শনিক ইবনুল আরাবী (মৃত্যু ১২৪০ খৃস্টাব্দ), ইবনে জুবাইর (মৃত্যু : ১২২৭ খৃস্টাব্দ) ও ইবনে বতুতা প্রমুখ পরিব্রাজক ও প্রখ্যাত মুসলমান বহুদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং স্বচ্ছন্দে তাঁদের বাসস্থান পরিবর্তন করেন। এ থেকেই এটা প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম জগতে সাংস্কৃতিক ঐক্য (রাজনৈতিক ক্ষমতা-বিভাগ ও মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর ভৌগোলিক পার্থক্য সত্ত্বেও) স্থায়ী ঐক্য-বন্ধনীর কাজ করে।
আইন ও ধর্মবেত্তাগণ দারুল ইসলামের কোন শ্রেণীবিভাগ স্বীকার করেন নি, কিন্তু স্থানের পবিত্রতা ও ধর্মীয় তাৎপর্যের দিক থেকে কোন কোন অঞ্চলের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। আল-মাওয়ার্দী দারুল ইসলামকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন : ‘হারাম,’ হেজাজ ও অবশিষ্ট মুসলিম ভূখণ্ড। শরিয়তের এ তিন বিভাগের প্রত্যেকটির ওপর কতকগুলো নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শুল্ক ধার্য, অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার ও ভূমির মালিকানা—এ সব বিষয় এ বিধানগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নিরাপদ স্থানকে ‘হারাম’ বলে। কোন কোন আইনবিদের মতে এর মধ্যে মক্কা ও এর শহরতলীকে ধরতে হবে। অন্যান্যদের মতে মক্কা ও মদিনা এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। শেষের মতটাই নির্ভুল বলে সাব্যস্ত হয়েছে। পরবর্তী যুগের আইনবিদগণ দুটো ‘হারাম’ বা নিরাপদ স্থানের উল্লেখ করেছেন (আল-হারামাইন আশ-শারিফাইন) মক্কা ও মদিনা। এ নগরী দুটির হেফাজত ও সংরক্ষণ খলিফার বিশেষ কর্তব্য বলে গণ্য করা হয়। হাদিসের মতে এ দুটো নগরী পৃথিবীর সর্বোত্তম স্থানে অবস্থিত রয়েছে।
‘হারাম’ অঞ্চলে কেবল মুসলমানরাই গমনাগমন ও বসবাস করতে পারেন। কোন অমুসলিমকেই—তা সে কেতাবীই হোক আর মুশরিকই হোক—এসব নগরীতে বসবাস করতে দেয়া হয় না; কিংবা এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে দেয়া হয় না। ইমাম আবু হানিফা অবশ্য কেতাবীদের এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গমনাগমন করার অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু বসবাস করতে অনুমতি দেন নি। কিন্তু অন্যান্য আইনবিগণ এ ব্যতিক্রমটুকুও মেনে নেন নি। সাধারণতঃ হারামের বাসিন্দাগণকে যুদ্ধে যোগ দিতে হয় না। কারণ, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এ অঞ্চলে রক্তপাত করা নিষিদ্ধ করে গেছেন। কোন কোন আইনবিদের মতে মক্কার অধিবাসীগণ যদি বিদ্রোহও করেন, তবু তাদের শাস্তি দেয়া চলবে না। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ ইমাম কর্তৃক এসব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা অনুমোদন করেছেন। হারাম অঞ্চলের গাছপালা ও জীবজন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। তাই, এখানকার গাছপালা কেটে ফেলা বা জীবজন্তুকে ধ্বংস বা হত্যা করা অনুমোদন করা হয় নি। কিন্তু গৃহপালিত পশু হত্যা ও কৃষিজাত দ্রব্য কর্তন করা চলবে। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য এ নিয়মগুলো সব সময়ে প্রতিপালিত হয় নি। তবু, এ নিয়মগুলোর মধ্যে ইসলামের আদি আবাসভূমির প্রতি مسلمانوں গভীর শ্রদ্ধা প্রতিভাত হয়েছে।
মুসলিম অঞ্চলের শ্রেণীবিভাগের ক্ষেত্রে হেজাযের স্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে। মুসলমানদের দৃষ্টিতে হারাম অঞ্চলের পরেই হেজাযের স্থান। এ অঞ্চলে অমুসলিমগণ পরিভ্রমণ করতে পারেন। কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার তাদের নেই। হাদিসে বর্ণিত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) একটি বাণীই এ নিয়মের ভিত্তি রচনা করেছে: "আরব উপদ্বীপ থেকে অবিশ্বাসীদের বিতাড়িত কর।" কোন কোন আইনবিদ সংকীর্ণভাবে এ নীতির ব্যাখ্যা করেছেন এবং আরব উপদ্বীপ বলতে শুধু মক্কা ও মদিনাকেই বুঝেছেন। কেউ কেউ হেজাযকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবার কেউ বা গোটা আরব উপদ্বীপকে এর মধ্যে ধরেছেন। যদি কোন অমুসলিম হেজায পরিভ্রমণকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন, তবে তার মৃতদেহ এখান থেকে অপসারণ করে এ অঞ্চলের বাইরে কবরস্থ করতে হবে। কারণ, এ অঞ্চলে কবর দেয়ার অর্থ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেয়া। কেননা, এ অঞ্চলে অমুসলিমের স্থায়ী বসবাস আইন-বিধানে অনুমোদিত হয় নি।
পরিশেষে বলা যায় যে, হেজাযকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখার কারণ এই যে, এই অঞ্চলেই রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নবুয়ত লাভ করেন, ইসলাম প্রচার করেন, আর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ সময় এখানেই অতিবাহিত করেন। রাসূলের (সঃ) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সব কিছুই হেজাযেই ছিল। তাঁর বহিরাচ্ছাদন (আলখেল্লা) ও পোশাক অবশ্য হেজাযের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হযরতের খফিলাগণ খিলাফতে অধিষ্ঠিত হবার সময়ে এগুলোকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই রক্ষা করে এসেছেন।
তৃতীয় পর্যায়ে পড়ে দারুল ইসলামের অবশিষ্ট অংশ। আরব উপদ্বীপের বাইরে যে সব অঞ্চল মুসলানদের দখলে এসেছিল এগুলো এরই অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম আইনে এ বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্দেশ করা হত না। কেতাবীগণ এ অঞ্চলে জিম্মী হিসেবে বসবাস করতে পারতেন। আমান লাভ করে হারবীগণও এ অঞ্চল সফর করার অনুমতি লাভ করতেন। জিযিয়া কর প্রদান সাপেক্ষে মুশরিকদেরও এখানে বসবাস করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত না। এ অঞ্চলকে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়:
(ক) 'উশর' অঞ্চল: যে অঞ্চলের আদি মালিক বা বাসিন্দাগণ মুসলমান হয়েছে। (খ) দখলীকৃত অঞ্চল (১): যা' মুসলমানদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়; এ অঞ্চলও উশর ভূমি নামে অভিহিত। (গ) দখলীকৃত অঞ্চল (২): যার অধিকার সাবেক বাসিন্দাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়; কিন্তু এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের রাজস্ব বা খারাজ দিতে হত। (ঘ) মাওয়াত বা পতিত জমি: মুসলমানগণ কর্তৃক সংস্কারের ফলে যে অঞ্চল উশর ভূমিতে রূপান্তরিত হয়।
বিভিন্ন পর্যায়ের ভূমিব্যবস্থা সমন্বিত অঞ্চলের শাসন এবং আইনের বিধান অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনীতির আওতায় পড়ে, কাজেই এখানে সে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক।
📄 মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশী: হারবী মুস্তামিনগণ
বিদেশী নাগরিক ও মুসলিম আইন
মুসলিম আইনে কেবল মুসলমানেরাই পূর্ণ আইনগত অধিকার ভোগ করলেও অমুসলিমগণও মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অনুমতি পেলে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে কতকগুলো আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারেন। মুসলিম আইনে মুসলমানই পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার ভোগ করেন; মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করেই আর সবাই বিভিন্ন প্রকার অধিকার লাভ করেন। আইনের চোখে যারা পূর্ণাঙ্গ অধিকার ভোগ করে না, তারা হচ্ছে হারবী, মুস্তামিন ও জিম্মী। জিম্মীদের সম্পর্কে পরবর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হবে। তাই এখানে আর সে আলোচনার প্রয়োজন নেই।
হারবী
মূলতঃ যে দেশের লোকই হোক না কেন, দারুল হারবে অবস্থানকারীদেরই হারবী বলা হয়। এদের মধ্যে কিতাবী ও মুশরিক উভয়ই থাকতে পারেন; যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে দারুল হারবের সঙ্গে দারুল ইসলামের যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান থাকে, সুতরাং এ- দিক থেকে বিদেশী হারবীদের সঙ্গেও মুসলমানদের যুদ্ধগত সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে। মুশরিক হারবী মুসলমানদের মোকাবেলা করলেই আল-কোরআনের এ নির্দেশের (৯: ৫) আওতায় এসে পড়বে: "মুশরিকদের যেখানে পাও, মেরে ফেল।" কেতাবী হারবীর জীবনরক্ষা করা যেতে পারে; কিন্তু তাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কয়েদ করা চলবে এবং দাসেও পরিণত করা যেতে পারে। অবশ্য বিশেষ অনুমতি বা আমান (নিরাপত্তার সনদ) নিয়ে হারবী নির্বিবাদে দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারেন। এ সনদ বলে তিনি তার পরিবার ও ধন-সম্পদ নিয়ে কিছুদিনের জন্য দারুল ইসলামে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে পারেন।
আমান
আমানকে নিরাপত্তাচুক্তি বা সনদ বলা যেতে পারে। এর ফলে হারবী দারুল ইসলামে মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট হতে নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার লাভ করে। দারুল ইসলামে বসবাস করার সময় মুসলমানদের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থার অবসান হয় এবং হারবী তখন "মুস্তামিন" বা নিরাপদ ব্যক্তির মর্যাদা লাভ করেন। আমানের মেয়াদ এক বছরের কম হতে হবে। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে তাকে জিযিয়া দিতে হবে এবং তিনি জিম্মা পর্যায়ভুক্ত বলে গণ্য হবেন।। এক বছরের অধিক সময়ের জন্য আমান প্রার্থী হলে।
অস্থায়ীভাবে যুদ্ধ-বিরতির (মুহা'দানা অথবা মুও'য়াদা) ফলে ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসী মুসলিমগণ আমান প্রদান করতে পারেন। প্রথমটির নাম সরকারী আমান। আর দ্বিতীয়টিকে বেসরকারী আমান বলা যেতে পারে।
সরকারী আমান
ইমাম বা তাঁর প্রতিনিধি কর্তৃক সাধারণতঃ একটি ভূখণ্ডের সমগ্র অধিবাসীকে বা একটি নগরের অধিবাসীকে বা জনকয়েক হারবীকে প্রদান করা হয়। শান্তিচুক্তিতে প্রায়ই এই ধরনের আমানের প্রত্যক্ষ উল্লেখ থাকে। এর শর্তানুসারে হারবীগণ নিরাপদভাবে চলাফেরা করতে পারেন। সেনাপতি আলাপ-আলোচনা চালাবার জন্য এক বা ততোধিক হারবীকে আমন প্রদান করতে পারেন। আমানের আওতায় থাকাকালে হারবীগণ মুসলিম কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ দাবী করতে পারেন। আমানের উদ্দেশ্য সাধিত হবার পর মুস্তামিনকে তার নিজের দেশে নিরাপদভাবে পৌছে দেয়া হয়।
হারবীর অনুরোধক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক যেকোন মুসলিম হারবীকে বেসরকারী পর্যায়ে আমান প্রদান করতে পারেন। এ আমান মুক্ত, দাস বা নর ও নারী সব মুসলিমই দিতে পারেন। বিশ্বাসী মুসলমানের আমান-প্রদানের ক্ষমতা সম্পর্কে অবশ্য আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। দাস এবং নারী ও পুরুষকে আমান প্রদান করার অধিকার মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী আইনবেত্তাগণ অনুমোদন করেছেন। জেহাদী না হলে কিংবা প্রভু কর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত না হলে দাসকে আমান প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করতে হানাফী আইনবিদগণ অস্বীকার করেছেন। আউযায়ী খারিজীদের পর্যন্ত আমানের অধিকার প্রদান করেছেন। নীতিগতভাবে শিশু ও উন্মাদকে সাধারণতঃ আমান প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয় নি। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর মতে বয়স্ক হলেই কেবল শিশুগণ আমান প্রদানের অধিকার লাভ করবে। আউযায়ী দশ বছর বয়স্ক শিশুকে আমান প্রদানের অধিকার দান করেছেন। সব মতাদর্শের আইনবিদগণই নীতির দিক থেকে জিম্মীদের আমান প্রদানের ক্ষমতা অস্বীকার করেছেন।
আমান প্রদানের পদ্ধতি খুবই সহজ।' এ নিয়ে আইনবিদদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। যে ভাষাভাষীই হোক না কেন, হারবীর পক্ষ থেকে আমান লাভের মনোভাব জানবার সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতিসূচক একটি বাক্য বা ইশারাই আমান প্রদানের পক্ষে যথেষ্ট। আমান প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে সামান্য একটি ইঙ্গিত দান বা অভিবাদনই হারবীকে নিরাপত্তার অধিকার লাভের নিশ্চয়তা দান করে। যদি কোন বিশ্বাসী আমান না দেয়ার সিদ্ধান্ত করেন, কিন্তু তার ইঙ্গিতে হারবীগণ আমান লাভ করেছেন বলে মনে করে থাকেন, তবে তা বৈধ আমান বলে গণ্য হবে।
এ প্রসঙ্গে আল-হারমুযানের ঘটনাটি মনে করা যেতে পারে। এখানে আমান প্রদানের কোন ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও ছলে বা কৌশলে না হলেও অন্ততঃপক্ষে হারমুযান আমান পেয়ে গিয়েছে, এ কথাই অপ্রত্যক্ষভাবে ধরে নেয়া হয়েছিল। আমান না নিয়েই যদি কোন হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করে এবং পরে আমান লাভ করতে না পারে, তবে তার শান্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। ইমাম শাফেয়ী এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, তাকে চার মাসের সময় দেয়া উচিত। চার মাস পর তাকে হয় দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করে যেতে হবে (তাকে নিরাপদে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দেয়া হবে), নতুবা জিযিয়া প্রদান করে জিম্মী পর্যায়ভুক্ত হতে হবে। অন্যান্য আইনবিদ বলেছেন যে, এই হারবীকে বহিষ্কৃত করা উচিত। অবশ্য দারুল হারবে পৌঁছা পর্যন্ত অবশ্যই তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোন হারবী কার্যোপলক্ষে ইমামের কাছে কোন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে, তবে তাকে আমান ব্যতিরেকে ইমামের কাছে যেতে দেয়া হত। কারণ, তখন সে কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা (immunity) লাভের অধিকারী। কিন্তু ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, দূতের কোন পরিচয়-পত্র নেই কিংবা সে আদৌ কোন বাণী নিয়ে আসে নি, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দান বৈধ হবে।
ভুলক্রমে বা জাহাজডুবীর ফলে হারবী দারুল ইসলামে প্রবেশ করতে পারে এবং আমান ব্যতিরেকে মুসলমানদের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হতে পারে। অধিকাংশ আইনবিদ বলেন যে, এক্ষেত্রে ইমাম স্বেচ্ছায় হারবীকে মুক্ত করে দিতে পারেন বা অবস্থা বিবেচনা করে অবিলম্বে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন। তিনি ক্ষতিপূরণ নিয়েও তাকে মুক্ত করতে পারেন।
মুস্তামিনদের অধিকার ও কর্তব্য
কোন হারবী যখন মুস্তামিন হিসেবে গণ্য হয়, তখন তার সঙ্গে তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসতে অনুমতি দেয়া হয়। হেজাযের পবিত্র নগরগুলো ছাড়া দারুল ইসলামের সব শহরেই সে পরিভ্রমণ করতে পারবে। জিম্মীর মর্যাদা লাভ করে জিযিয়া প্রদান করলে সে দারুল ইসলামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারে। সে জিম্মী মহিলাকেও বিবাহ করতে পারে এবং তাকে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু হারবী যদি মহিলা হয় এবং কোন জিম্মীকে বিবাহ করে, তবে তার স্বামীকে সে দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। কারণ, এতে শত্রুপক্ষ দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। নিরাপদভাবে চলাফেরা করার অধিকার ভোগকালে মুস্তামিন আইনের আওতায় ব্যবসায়-বাণিজ্যও পরিচালনা করতে পারবে।
আবার মুস্তামিনকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানাদিকে সম্মানের চক্ষে দেখতে হবে এবং সে এমন কিছু বলবে না বা করবে না যাতে ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পেতে পারে। তার কার্যক্রমে ইসলামের স্বার্থ যাতে বিপন্ন না হয়, সে সম্পর্কে তাকে সতর্ক থাকতে হবে। সে যদি মুস্তামিনের ছদ্মবেশে দারুল ইসলামে গুপ্তচর বৃত্তির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করে থাকে, তবে তাকে মৃতুদণ্ড দান বিধিসম্মত। সামরিক ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র কিংবা দাস-দাসী বা অন্য কোন রকমের হাতিয়ার কিনবার অধিকার তার নেই। এগুলো তার পক্ষে নিষিদ্ধ পণ্য (contraband) হিসেবে গণ্য হবে; কারণ, এর ফলে দারুল হারব দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। নিষিদ্ধ পণ্যদ্রব্য ক্রয় করা অবৈধ। এ ধরনের দ্রব্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মুস্তামিনকে তার টাকা দিয়ে দিতে হবে এবং মুস্তামিনও বিক্রেতাকে অস্ত্রশস্ত্র ফিরিয়ে দেবে। অস্ত্রশস্ত্রের বেচাকেনা যদি বন্ধ নাও হয়ে থাকে, তবু কোনমতেই হারবীকে এসব অস্ত্রশস্ত্র দারুল হারবে নিয়ে যেতে দেয়া চলতে পারে না। সুদভিত্তিক চুক্তিও নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে।
মুস্তামিন যদি আইন ভঙ্গ করে বা কোন অপরাধ করে, তবু তার আমান নষ্ট হবে না। কিন্তু তাকে সমুচিত শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী দু'রকমের নিয়ম লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি সে সম্মান ও আদব-কায়দা বিষয়ক আচার লঙ্ঘন করে, তবে তার ফলে তার আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে, একথা বলে তাকে সাবধান করে দিতে হবে। আবার সে যদি দেওয়ানী বা ফৌজদারী বিষয়ক কোন আইন ভংগ করে, তবে তাকে বিশ্বাসী বা জিম্মীদের মতই সমানভাবে শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ বলেছেন যে, মুস্তামিনকে শাস্তি দেয়া চলবে না; সে ব্যভিচার করলেও তার বিরুদ্ধে কোন শাস্তির বিধান নেই; তবে সে যদি চুরি করে বা ডাকাতি করে, তবে সে অপহৃত জিনিস তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সে যদি কোন মুসলমানকে হত্যা করে বা তার হাত কেটে ফেলে, তবে তাকে হত্যা করা বা তার হাত কেটে ফেলা বৈধ। যদি দুই বা ততোধিক মুস্তামিন মুসলিম বিচারকের কাছে হাজির হয়ে বিচারপ্রার্থী হয় ও শরিয়তের বিধান দ্বারা পরিচালিত হতে চায়, তবে তাঁরা সে বিচার পরিচালনা করতে পারবেন। কিন্তু যদি কোন মুসলমান মুস্তামিনকে আক্রমণ করে, তবে মুসলমানটি ইমাম ও তাঁর প্রতিনিধিদের (শাসনকর্তা) কাছে শাস্তি ভোগ করবে। মুসলমানরাও শরিয়ত বিরুদ্ধ ব্যবসায়-বাণিজ্যে লিপ্ত হবার বা অবৈধভাবে জিনিসপত্র খরিদ করার অধিকার পাবে না।
আমানের মেয়াদের সমাপ্তি
আমানের মেয়াদ (এক বছরের বেশী নয়) ফুরিয়ে যাবার ফলে বা মুস্তামিন দারুল ইসলাম পরিত্যাগ করলে আমানের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। সে যদি আবার দারুল ইসলামে ফিরে আসতে চায়, তবে তাকে নতুন করে আমান সংগ্রহ করতে হবে। ইমাম যদি বুঝতে পারেন যে, মুস্তামিন গোপনে দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য সাধনে লিপ্ত আছে বা তার কার্যাবলী মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী, তবে আমান নাকচ করে দেয়া যেতে পারে ও ইমাম মুস্তামিনকে ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত করে দিতে হবে। কোন মুসলমান যদি আমান দিয়ে থাকেন ও আমান ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর বলে গণ্য হয়, তবে ইমাম সে মুসলমানকেও শাস্তি দিতে পারেন।
মুস্তামিন যদি তার ধন-সম্পদ দারুল ইসলামে রেখে ফিরে যায় এবং দারুল হারবে হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে সে সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীগণ দারুল হারবে নিয়ে যেতে পারবে না। ইসলামী রাষ্ট্র তা বাজেয়াপ্ত করে নেবে। কিন্তু মুস্তামিন যদি দারুল ইসলামে অবস্থানকালে মারা যায়, তবে তার প্রতি প্রদত্ত আমান এ সম্পত্তির ওপরও প্রযোজ্য হবে এবং তার উত্তরাধিকারীগণ ইচ্ছা করলে মৃত ব্যক্তির ধন-সম্পদ দারুল ইসলামের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে।
আমানের গুরুত্ব
মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ স্থাপন করার ব্যাপারে আমান প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিম ও অমুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বক্ষণ যুদ্ধ- ভিত্তিক ও অশান্তিপূর্ণ মনে করা হত। তাই আমানের অবর্তমানে অস্থায়ী শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনও এক রকম অসম্ভব ছিল। মুসলিম অমুসলিম সম্পর্কের মধ্যে আমান এমন সহজ স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছিল, যার ফলে মুসলিম ও অমুসলিম একে অপরের রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ করার অনুমতি লাভ করে। মুসলিম রাষ্ট্রে বাস করার সময় আমান বিদেশীদের পাসপোর্টের কাজ করে। সাধারণভাবে যখন মুসলমান ও অমুসলমানদের পক্ষে দারুল ইসলাম থেকে বাইরে যাওয়া বা দারুল ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না, তখন পাসপোর্ট বা ছাড়পত্র ছাড়া কোন জিনিসপত্রের আদান-প্রদানও সম্ভব হত না। আমানের মারফত সীমান্তে লোক ও মালপত্র চলাচল অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত হয়ে এসেছিল। আমান না থাকলে দুটি বিরোধী দেশের মধ্যে বেআইনী আদান-প্রদান সংঘটিত হত ও এদের মধ্যে খুব বেশী মনকষাকষিও শুরু হয়ে যেত। যুদ্ধ-বিরতি কালে বার বার আমান প্রদানের ফলে মুসলিম ব্যবসায়ী ও বিদেশী রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা খুব সহজ হয়ে পড়ে।
📄 অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম
অমুসলিম রাষ্ট্র: দারুল হারব
দারুল ইসলাম হল সেই রাষ্ট্র যেখানে মুসলিম শাসক কর্তৃক মুসলিম আইন বাস্তবে রূপায়িত হয়; কিংবা সেই রাষ্ট্র যা অমুসলিমদের অধিকারে গিয়ে পড়লেও অনেকটা স্বাধীনভাবে মুসলিম আইন পালন করতে সক্ষম হয়। আর যে রাষ্ট্রে অমুসলিম আইন রূপায়িত হয় এবং যেখানে মুসলমান তাঁর নিজস্ব বিধি-বিধান পালন করতে পারেন না, তা' অমুসলিম ভূখণ্ড বলে বিবেচিত হবে। কাজেই দারুল হারব হল এমন একটি ভূখণ্ড যা মুসলিম আইনের সম্পূর্ণ আওতাবহির্ভূত। আইনগত সাম্যের ভিত্তিতে দারুল ইসলামের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের যোগ্যতা দারুল হারবের নেই। কাজেই এ দু'ভূখণ্ডের মধ্যে কোন ব্যবস্থা বা চুক্তি সম্পাদিত হলে তা' স্বল্পস্থায়ী হতে বাধ্য। কারণ, এর মধ্যে অমুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতিও দেয়া হয় না, কিংবা উভয় রাষ্ট্রের স্বাভাবিক যুদ্ধাবস্থার ক্ষেত্রেও কোন পরিবর্তন হয় না।
মুসলিম আইনের বাইরে হলেও দারুল হারবকে পূর্ণ নৈরাজ্য (No man's land) বলে মনে করা চলে না; কারণ, এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে বলে দারুল হারব মুসলিম আইনের আওতায় দারুল ইসলামের সঙ্গে মুসলিম সামরিক আইন অনুযায়ী সম্পর্ক নির্ণয়ের অধিকার লাভ করে। যুদ্ধকালে মুসলমানেরা তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী অমুসলিম যোদ্ধা ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন।
জেহাদের বিরতিকালে যখন অস্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিদেশী শাসক বা শাসকদের ইসলাম আংশিকভাবে স্বীকার করে নেয়। কিন্তু ইসলামের এ স্বীকৃতি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতির (Recognition) পর্যায়ভুক্ত নয়। কারণ, অমুসলিম শাসকদের কার্যকলাপ ইসলাম অনুমোদন করলে তবেই বলা যায় যে, ইসলাম আধুনিক পরিভাষার সংজ্ঞা অনুযায়ী তাদের 'অনুমোদন' দান করেছে। ইসলাম যে অমুসলিম শাসনকে আংশিক স্বীকৃতি দেয় তার অর্থ হল এই যে, কোন অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অস্তিত্ব না থাকলে মানবসমাজ টিকে থাকতে পারে না। এদিক থেকে নীতিগতভাবে এ বিধান মেনে চলা হয় যে, যদি ঘটনাক্রমে কোন মুসলমানকে অমুসলিম রাষ্ট্রে পরিভ্রমণ বা বসবাস করতে হয়, তবে তিনি সেখানকার কর্তৃপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন কিংবা তার বিরোধিতা করতে পারবেন না। অবশ্য ইমাম কর্তৃক তিনি যদি অনুরূপ কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করার জন্য আদিষ্ট হন, তবে সেকথা স্বতন্ত্র। আমান মারফত যদি তিনি এ অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন, তবে নিজেদের আইন-বিধান মেনে চলার মত অমুসলিম আইন মানতেও তিনি বাধ্য থাকবেন। এ রাষ্ট্রের আইন ও মুসলিম আইনের মধ্যে যদি কোন বিরোধ দেখা দেয়, তবে তিনি কোনটি পালন করবেন, সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই (অর্থাৎ মুসলিম আইনই তিনি পালন করবেন)।
আমানের অধীনে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানদের কার্যাবলী
অমুসলিমগণ যেমন আমানের অধীনে তাদের অধিকার ও কার্যাবলীর ওপর কয়েকটি পরিসীমা স্বীকার করে নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করার অধিকার লাভ করেন, তেমনি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত না হলেও মুসলমানগণও অনুরূপ পরিসীমার আওতায়ই অমুসলিম রাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকেন। মুসলমানরা যে পর্যন্ত আমানের অধিকার ভোগ করেন, সে পর্যন্ত তারা অমুসলিমদের কোন রকম ক্ষতিসাধন করতে পারবেন না। তা ছাড়া যদিও সুদ, মদ ও শূকরের গোশত বিক্রয় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইনে বৈধ বলে বিবেচিত হয়, তবু এগুলোর বিষয়ে অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে মুসলমানদের মুসলিম আইন মেনে চলতে হবে। কারণ, আগেই বলা হয়েছে যে, যে কোন মুসলমান যে দেশেই বাস করুন না কেন, মুসলিম আইন তার ওপর সব সময়েই প্রযোজ্য হবে এবং দারুল হারবে থাকাকালে কোন মুসলমান যদি কোন ওয়াদা দিয়ে থাকে, বা চুক্তি সম্পাদন করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে গেলেও তাকে তা পালন করতে হবে। আবার সেখানে থাকাকালে সে যদি টাকা কর্জ নিয়ে থাকে বা কোন জিনিস চুরি করে থাকে, তবে দারুল হারব ত্যাগ করে যাবার পরেও সে তা' ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু দারুল হারবে বসবাসকালে মুসলিমগণ এমন কিছু করতে পারবে না, যাতে সে রাষ্ট্র দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, দারুল হারবে বসবাসকারী মুসলমানগণ দারুল হারব কর্তৃপক্ষের নিকট দারুল ইসলাম সম্পর্কে কোন গোপন তথ্য সরবরাহ করতে পারবে না কিংবা দারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, এ ধরনের অস্ত্রশস্ত্র এবং সমর সরঞ্জাম উৎপাদনের কাজে সাহায্য করতে পারবে না। কেতাবী হলেও মুসলমানদের পক্ষে হারবী মহিলাকে বিবাহ না করাই শ্রেয়। কারণ, এর ফলে তার সন্তান-সন্ততিদের হয়তো দারুল হারবের জন্য কাজ করতে হতে পারে।
যদি প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোন মুসলমান শত্রু-রাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়ে অন্য মুসলমানের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে বা এমন কোন অপরাধ করেছে যাতে উক্ত মুসলমানের ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
আমান ব্যতিরেকে অমুসলিম রাষ্ট্রে মুসলিম
আমান না নিয়েই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করে থাকেন, তবে আমানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মত তিনি এ রাষ্ট্রের আইন-কানুন মানতে বাধ্য থাকবেন না। মুসলিম আইন মতে আমানবিহীন মুসলমানের সঙ্গে অমুসলিম রাষ্ট্রের যুদ্ধগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। এমতাবস্থায় অমুসলিম রাষ্ট্রের আইন-বিধি মেনে নিতে তিনি বাধ্য থাকবেন না। যদি ইমামের অনুমতিক্রমে কোন মুসলমান দারুল হারবে প্রবেশ করেন, তবে যুদ্ধকালে জেহাদীরা যেমন শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন, এবং তাদের লোকদের বন্দী করতে পারেন, তিনিও সে ক্ষেত্রে তা করতে পারবেন। মুসলিম আইনে নিষিদ্ধ কার্যাবলী থেকে তাকে দূরে থাকতে হবে। কাজেই যদি কোন মুসলমান দারুল হারবে অবস্থানকালে ব্যভিচার করে, শূকরের গোশত খায় বা মদ পান করে থাকে, তবে দারুল ইসলামে ফিরে আসার পর তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুদ ও ঋণের বিষয় দুটি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে হানাফী আইনবিদগণ আইনের কঠোরতা কিছুটা শিথিল করেছেন। ইমাম আবু হানিফার মতে অমুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী আইন প্রযোজ্য হবে না।
মুসলিম যুদ্ধবন্দী
যে সব মুসলিম যোদ্ধা শত্রুর হস্তে বন্দী হয়ে দারুল হারবে নীত হন এবং দারুল হারব কর্তৃপক্ষ বাধ্যবাধকতা ভিত্তিক (যেমন পলায়ন না করা কিংবা পুনরায় দারুল হারবে ফিরে আসার ওয়াদা) প্রতিশ্রুতি নিয়ে (On parole) তাদের মুক্ত করেন, তবে তাদের সে প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পালন করতে হবে। যদি কোন মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে ক্ষতিপূরণের (Ransom) টাকা আনবার জন্য দেশে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হয়, তবে তিনি অবশ্যই তার প্রতিজ্ঞা পালন করবেন এবং টাকা সংগ্রহ না করতে পারলেও শত্রুর নিকট ফিরে যাবেন। কোন কোন আইনবিদ বিশেষ করে শাফেয়ীগণ বলেন যে, এ অবস্থায় ওয়াদাবদ্ধ হলেও মুসলমান বন্দীগণ ওয়াদা রক্ষা করার জন্য দারুল হারবে ফিরে যেতে বাধ্য থাকবে না। আর যদি বন্দীগণ কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে থাকেন, তবে তারা যে শুধু স্বচ্ছন্দে পলায়ন করতে পারেন তাই নয়, দারুল ইসলামে ফিরে যাবার পথে তারা শত্রুপক্ষের ধন-সম্পদ বিধ্বস্ত করতে এবং শত্রুপক্ষের লোকদের হত্যা করতে পারেন।
দারুল হারবে অবস্থানকালে মুসলিম বন্দীগণ যে শুধুমাত্র মুসলিম আইন পালন করতেই বাধ্য থাকবেন তা নয়, দারুল হারবের আইন যদি মুসলিম আইনের বিরোধী না হয়, তবে সে আইনও তারা পালন করবেন। তবে প্রতিকূল পরিবেশে তারা যদি মুসলিম আইন পালন করতে না পারেন, তবে সে কথা স্বতন্ত্র। তারা যদি গানিমার অংশ লাভ করার প্রতিশ্রুতিও পান, তবু কোনক্রমেই তারা শত্রুপক্ষের সৈনিকদের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধে যোগদান করতে পারবেন না। ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতিকর কোন তথ্যাদিও তারা শত্রুদের নিকট সরবরাহ করতে পারবেন না। মুসলিম আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ এমন কাজ করতে যদি বন্দীকে বাধ্য করা হয় (যেমন ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করা), তবে এজন্য তাকে কোন শাস্তি ভোগ করতে হবে না। মহিলা বন্দীকে যদি শারীরিক নির্যাতন ভোগ করতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই প্রথমদিকে তা সহ্য করার চেষ্টা করতে হবে; কিন্তু পরে তিনি যদি মৃত্যুর আশংকা করেন, তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে শত্রুদের দাবীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারেন।