📄 যুদ্ধ পরিচালনার পন্থা
জেহাদিগণ
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
চতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহ কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬) যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা- হয়। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যেই পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি উঠেছিল। ধর্মদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকেও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল-বালাযুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যারা পুনরায় ইসলাম কবুল করে, তারা ভিন্ন আর কেউ মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায় নি।
বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ
বিভেদ সৃষ্টি করার প্রয়াসের নামই হল 'বাগী' বা বিদ্রোহ। যদি বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ ইমামের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হত না ও তাদের দারুল ইসলামে শান্তিতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হত। অবশ্য ইমাম তাদের বিভেদমূলক ধারণাগুলো বর্জন করতে ও প্রচলিত মতবাদ মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করবেন। তারা যদি এতে রাজী না থাকে ও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে অস্বীকৃত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। কতকগুলো অভিযোগ ও দাবী-দাওয়া যদি বিরোধের কারণ হয়ে থাকে ও ধর্মের মূলনীতির সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক না থাকে, (যেমন, প্রাদেশিক শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) তবে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি বিভেদকারীগণ সংখ্যায় খুব অল্প হয়, তবে তাদের শায়েস্তা করা মোটেই কঠিন হবে না। খারেজীরা এর এক দৃষ্টান্ত। খলিফা হযতর আলীর (রাঃ) সাথে যখন তাদের মতবিরোধ হল, তখন তাদের এ তিনটি ব্যাপারে বিশেষ ঔদার্য দেখান হয় : মসজিদে নামাজ পড়তে তাদের অনুমতি দেয়া হয়, খলিফা কর্তৃক আক্রমণ থেকেও তারা রেহাই পেল। তাছাড়া তাদের দারুল ইসলামে বসবাস করতেও অনুমতি দেয়া হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা খলিফাকে আক্রমণ করে বসল, অমনি খলিফা হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে ধাবিত হলেন; আন-নাহরোওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৮ খৃস্টাব্দ) তাদের শক্তি নস্যাৎ করে দিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইমামকে মুসলিম জনমত সমর্থন করতে চাইত না, যিনি নিজেই আইনের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ক্রমশঃ এ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন যে, ইমামের বিরুদ্ধে কোন রকম বিদ্রোহই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম যদি ভুলও করে বসেন, তবু তাঁর কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতেই হবে, এ মতবাদই তাঁরা পোষণ করতেন। আশারীপন্থী চিন্তানায়কগণ ও পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত সুন্নী আইনবিদগণ সর্বপ্রকার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ইমামের কর্তৃত্বকেই সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, বিদ্রোহ "স্বৈরাচারের" চাইতে অনেক বেশী নিন্দনীয়। তাঁদের মতে নতুন ইমামের প্রতি একবার "বাইয়া" বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার পর তা ফিরিয়ে নেবার আর কোন আইনগত পন্থা নেই। কারণ আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারেই বিশ্বাসী মুসলমানকে "আল্লাহ এবং রসূলের ও তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নিযুক্ত ইমামের কর্তৃত্ব"কে মেনে নিতে হবে। যদি ইমামের সঙ্গে মুসলমানদের কোন বিষয়ে মতবিরোধ উপস্থিত হয়, তবে তা "তোমরা যদি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হও, তবে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ছেড়ে দাও” (অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও রাসূল প্রদত্ত কার্যবিধির আলোকে তার মীমাংসা কর)। কিন্তু রাসূলের অনুপস্থিতিতে আইন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইমামই রাসূলের স্থান দখল করেন। তাই রাষ্ট্রে কার্যতঃ ইমামই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য তিনি জেহাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিদ্রোহ বিভেদেরই নামান্তর মাত্র—ইমামের কর্তৃত্ব বিদ্রোহের দ্বারা বানচাল হয়ে যায়। ইমামতের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ও তাঁর অধীনস্থ নাগরিকদের বিভেদকারীদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে কোনও উপায় নেই।
পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ
মুসলিম সমাজ-পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের কার্যকলাপ বড় রকমের চৌর্য-বৃত্তি বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে নিম্নলিখিত আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে:
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও দুনিয়ায় গোলমাল-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এভাবে দুনিয়াতে তারা অপমানিত হবে ও আখেরাতেও তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে।" (৫: ৩৭)।
আল-কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতেই আইনবিদগণ সমাজ পরিত্যাগ করা ও সড়কী দস্যুদের ইমাম কর্তৃক শাস্তি বিধানের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। কিন্তু শাস্তির মাত্রা সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ তাদের হত্যা করা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন, কেউ বা হাত-পা কেটে ফেলার সুপারিশ করেছেন। আবার কেউ বা নির্বাসন দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। অপরাধীর চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। নির্বাসন দেবার ব্যাপারেও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন যে, অপরাধীকে দারুল হারবে নির্বাসিত করা হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে নির্বাসিত করতে হবে; কিন্তু দারুল ইসলামে সে অবস্থান করতে পারবে। (খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজও এই মত পোষণ করতেন)। ইমাম আবু হানিফার মতে অপরাধীকে কারাভোগ করতে হবে।
কিতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ
কিতাবী বা আহলুল কী আইনবিদ বলেন যে, ধর্মদ্রোহী স্ত্রীকে সাবী বা দাসী হিসেবে গণ্য করতে হবে, যুদ্ধার্জিত বিষয় বলে মনে করতে হবে বা বিক্রয় করে দিতে হবে। ধর্মদ্রোহের পর যে সব সন্তান- সন্তুতি জন্মগ্রহণ করবে, তারাও সমগোত্রীয় বলে গণ্য হবে। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ এটা প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) মৃত্যুর পর আরবীয় গোষ্ঠীগুলোর মুসলিম কওম থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গ্রহণ করা ধর্মদ্রোহিতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এদের প্রথম ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে আহ্বান করেন। যারা তবু ফিরে আসল না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ এ জেহাদ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ধর্মদ্রোহীদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারা হয়। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যেই পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি উঠেছিল। ধর্মদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকেও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল-বালাযুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যারা পুনরায় ইসলাম কবুল করে, তারা ভিন্ন আর কেউ মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায় নি।
বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ
বিভেদ সৃষ্টি করার প্রয়াসের নামই হল 'বাগী' বা বিদ্রোহ। যদি বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ ইমামের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হত না ও তাদের দারুল ইসলামে শান্তিতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হত। অবশ্য ইমাম তাদের বিভেদমূলক ধারণাগুলো বর্জন করতে ও প্রচলিত মতবাদ মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করবেন। তারা যদি এতে রাজী না থাকে ও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে অস্বীকৃত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। কতকগুলো অভিযোগ ও দাবী-দাওয়া যদি বিরোধের কারণ হয়ে থাকে ও ধর্মের মূলনীতির সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক না থাকে, (যেমন, প্রাদেশিক শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) তবে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি বিভেদকারীগণ সংখ্যায় খুব অল্প হয়, তবে তাদের শায়েস্তা করা মোটেই কঠিন হবে না। খারেজীরা এর এক দৃষ্টান্ত। খলিফা হযতর আলীর (রাঃ) সাথে যখন তাদের মতবিরোধ হল, তখন তাদের এ তিনটি ব্যাপারে বিশেষ ঔদার্য দেখান হয় : মসজিদে নামাজ পড়তে তাদের অনুমতি দেয়া হয়, খলিফা কর্তৃক আক্রমণ থেকেও তারা রেহাই পেল। তাছাড়া তাদের দারুল ইসলামে বসবাস করতেও অনুমতি দেয়া হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা খলিফাকে আক্রমণ করে বসল, অমনি খলিফা হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে ধাবিত হলেন; আন-নাহরোওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৮ খৃস্টাব্দ) তাদের শক্তি নস্যাৎ করে দিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইমামকে মুসলিম জনমত সমর্থন করতে চাইত না, যিনি নিজেই আইনের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ক্রমশঃ এ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন যে, ইমামের বিরুদ্ধে কোন রকম বিদ্রোহই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম যদি ভুলও করে বসেন, তবু তাঁর কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতেই হবে, এ মতবাদই তাঁরা পোষণ করতেন। আশারীপন্থী চিন্তানায়কগণ ও পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত সুন্নী আইনবিদগণ সর্বপ্রকার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ইমামের কর্তৃত্বকেই সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, বিদ্রোহ "স্বৈরাচারের" চাইতে অনেক বেশী নিন্দনীয়। তাঁদের মতে নতুন ইমামের প্রতি একবার "বাইয়া" বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার পর তা ফিরিয়ে নেবার আর কোন আইনগত পন্থা নেই। কারণ আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারেই বিশ্বাসী মুসলমানকে "আল্লাহ এবং রসূলের ও তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নিযুক্ত ইমামের কর্তৃত্ব"কে মেনে নিতে হবে। যদি ইমামের সঙ্গে মুসলমানদের কোন বিষয়ে মতবিরোধ উপস্থিত হয়, তবে তা "তোমরা যদি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হও, তবে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ছেড়ে দাও” (অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও রাসূল প্রদত্ত কার্যবিধির আলোকে তার মীমাংসা কর)। কিন্তু রাসূলের অনুপস্থিতিতে আইন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইমামই রাসূলের স্থান দখল করেন। তাই রাষ্ট্রে কার্যতঃ ইমামই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য তিনি জেহাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিদ্রোহ বিভেদেরই নামান্তর মাত্র—ইমামের কর্তৃত্ব বিদ্রোহের দ্বারা বানচাল হয়ে যায়। ইমামতের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ও তাঁর অধীনস্থ নাগরিকদের বিভেদকারীদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে কোনও উপায় নেই।
পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ
মুসলিম সমাজ-পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের কার্যকলাপ বড় রকমের চৌর্য-বৃত্তি বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে নিম্নলিখিত আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে:
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও দুনিয়ায় গোলমাল-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এভাবে দুনিয়াতে তারা অপমানিত হবে ও আখেরাতেও তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে।" (৫: ৩৭)।
আল-কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতেই আইনবিদগণ সমাজ পরিত্যাগ করা ও সড়কী দস্যুদের ইমাম কর্তৃক শাস্তি বিধানের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। কিন্তু শাস্তির মাত্রা সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ তাদের হত্যা করা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন, কেউ বা হাত-পা কেটে ফেলার সুপারিশ করেছেন। আবার কেউ বা নির্বাসন দিয়েইপয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকেিতাবের মধ্যে ইহুদী, সেবীয় ও খৃস্টানরা রয়েছেন। এঁরা আল্লাহয় বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারে মনে করা হয় যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কিতাব নানাভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর রহমত থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আল্লাহ যখন তাঁদের সত্যপথে আহ্বান করার জন্য শেষ রাসূল পাঠালেন, তখন তাঁরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন; কিন্তু তাঁর রাসূল ও আল- কোরআনের ওপর তাঁরা ইমান আনেন নি। তাই পৌত্তলিকদের মত কিতাবীদেরও নিশ্চয়ই শান্তি ভোগ করতে হবে। তবু আল্লাহর ওপর যখন তাঁদের বিশ্বাস আছে, তখন তাঁরা আংশিকভাবে শাস্তি ভোগ করবেন। একথা সত্য যে, তাঁদের বিরুদ্ধেও জেহাদ পরিচালিত হয়। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যতটা কঠিনভাবে জেহাদের নীতি পরিচালিত হয় এদের বিরুদ্ধে ততখানি প্রযোজ্য হয় না।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া পৌত্তলিকদের আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কিতাবীরা এ তিনটি পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেনঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা জেহাদে প্রবৃত্ত হওয়া। যদি তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তাঁরা মুসলমানদের মত পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন। আর যদি তাঁরা জিযিয়া প্রদান করে কিতাবী হিসেবেই অবস্থান করতে চান, তবে তাঁদের কতকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। এদিক থেকে তাঁদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলা যায়। আর যদি তাঁরা যুদ্ধ করতে চান, তবে যুদ্ধকালে তাঁদের পৌত্তলিকদের সম- পর্যায়ভুক্ত মনে করা হবে।
রিবাত
আত্মরক্ষার খাতিরে (সুগুর) বন্দর ও সীমান্তের শহরগুলোতে ফৌজ মোতায়েন করে দারুল ইসলামের সীমান্ত সংরক্ষণের নাম "রিবাত”। যদিও একথা সত্য যে, এ জেহাদ আল-কোরআনের একটা নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, তবু ইসলামী রাষ্ট্র দেশ-রক্ষার ওপর যখন বেশী জোর দিতে শুরু করল, তখনই এ জেহাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জেহাদের মধ্যে আল-কোরআন কোন পার্থক্য নির্দেশ করে নি। আল-কোরআনে রয়েছে:
"খোদার দুশমন, তোমার দুশমন ও অন্যান্যদের মনে ভীতিসঞ্চার করার জন্য তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ও অশ্ব প্রস্তুত করে রাখ।" (৮ঃ ৬২)।
কিন্তু আইনবেত্তাগণ এবং বিশেষ ক্ষান্ত হয়েছেন। অপরাধীর চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। নির্বাসন দেবার ব্যাপারেও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন যে, অপরাধীকে দারুল হারবে নির্বাসিত করা হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে নির্বাসিত করতে হবে; কিন্তু দারুল ইসলামে সে অবস্থান করতে পারবে। (খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজও এই মত পোষণ করতেন)। ইমাম আবু হানিফার মতে অপরাধীকে কারাভোগ করতে হবে।
কিতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ
কিতাবী বা আহলুল কিতাবের মধ্যে ইহুদী, সেবীয় ও খৃস্টানরা রয়েছেন। এঁরা আল্লাহয় বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারে মনে করা হয় যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কিতাব নানাভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর রহমত থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আল্লাহ যখন তাঁদের সত্যপথে আহ্বান করার জন্য শেষ রাসূল পাঠালেন, তখন তাঁরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন; কিন্তু তাঁর রাসূল ও আল- কোরআনের ওপর তাঁরা ইমান আনেন নি। তাই পৌত্তলিকদের মত কিতাবীদেরও নিশ্চয়ই শান্তি ভোগ করতে হবে। তবু আল্লাহর ওপর যখন তাঁদের বিশ্বাস আছে, তখন তাঁরা আংশিকভাবে শাস্তি ভোগ করবেন। একথা সত্য যে, তাঁদের বিরুদ্ধেও জেহাদ পরিচালিত হয়। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যতটা কঠিনভাবে জেহাদের নীতি পরিচালিত হয় এদের বিরুদ্ধে ততখানি প্রযোজ্য হয় না।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া পৌত্তলিকদের আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কিতাবীরা এ তিনটি পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেনঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা জেহাদে প্রবৃত্ত হওয়া। যদি তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তাঁরা মুসলমানদের মত পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন। আর যদি তাঁরা জিযিয়া প্রদান করে কিতাবী হিসেবেই অবস্থান করতে চান, তবে তাঁদের কতকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। এদিক থেকে তাঁদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলা যায়। আর যদি তাঁরা যুদ্ধ করতে চান, তবে যুদ্ধকালে তাঁদের পৌত্তলিকদের সম- পর্যায়ভুক্ত মনে করা হবে।
রিবাত
আত্মরক্ষার খাতিরে (সুগুর) বন্দর ও সীমান্তের শহরগুলোতে ফৌজ মোতায়েন করে দারুল ইসলামের সীমান্ত সংরক্ষণের নাম "রিবাত”। যদিও একথা সত্য যে, এ জেহাদ আল-কোরআনের একটা নির্ তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইন-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়।
সেনাপতির হুকুম তামিল করতে ও ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে জেহাদিগণ বাধ্য।
সমর পরিচালনার সাধারণ দিকটার মধ্যে ওপরের সবটা বিষয় রয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পর্কে আলোচনা এবং চুক্তি সম্পাদনা ও যুদ্ধে লব্ধ ধন-সম্পদ বণ্টনের বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।
সেনাদলের গঠন পদ্ধতি
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক অনুসারীদের নিয়ে সম্পূর্ণ একটি সৈন্য দল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু মুসলিম সমাজে যখন লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল, তখন তাঁদেরই সৈন্যদলে ভর্তি করা হত, যাঁরা জেহাদের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। জেহাদীরা ছিলেন "মুকাতিলা” বা সংগ্রামীদের দলে। আর যাঁরা বাড়ীতে থাকতেন, তাঁদের বলা হত "কা'য়াদা"। মুকাতিলাদের মুহাজিরও বলা হত। কারণ, নববিজিত ভূখণ্ড দখল করার ব্যাপারে যাঁরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, তাঁরা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সহ এসব জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এ সব অঞ্চলকে মুসলিম শাসনাধীনে রাখার অনুকূলে এঁরাই সামরিক শক্তি যুগিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীতে যোগদান করে এঁরা সামরিক শক্তি সংগঠিত করেন এবং এঁদের মধ্য থেকেই প্রতিভাশালী শাসকগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ ইরাক ও সিরিয়া দখলের পর মুকাতিলাদের সংখ্যা খুব বেশী বেড়ে যায়। সেখানকার খৃস্টান এবং অন্যান্য আরব গোষ্ঠী ইরানী ও বাইজান্টীয় প্রভুদের বিরুদ্ধে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করে।
ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের (৭৪৪-৭৫০ খৃস্টাব্দ) আমলে নতুন ফৌজী সংগঠন কাল পর্যন্ত সৈন্যদলকে পাঁচটি শ্রেণীতে (আল- খামিস) বিভক্ত করা হত: কেন্দ্রস্থল (কালব), দুই পার্শ্ব বা বাহু (মায়মানা ও মায়সারা), সম্মুখভাগ (মুকাদ্দমা) ও পশ্চাদ্ভাগ (সাকা)। প্রত্যেক সৈন্য বিভাগের গোষ্ঠীগত ঐক্য রক্ষিত হত এবং এক এক গোষ্ঠীর নিজস্ব নিশানও থাকত। প্রায়ই অশ্বারোহীগণ পার্শ্বদ্বয়ের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতেন। কারণ তাঁদের অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সাথে ও কার্যকরীভাবে যুদ্ধ চালাবার ক্ষমতা ছিল। তাঁদের অস্ত্র ছিল রুমহ বা বর্শা। পদাতিক সৈন্য তীর-ধনুক ও পরবর্তীকালে ঢাল-তলোয়ার ব্যবহার করত। ইসলামী রাষ্ট্র প্রসারের প্রাথমিক যুগে সৈন্যসংখ্যা খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এতে মাত্র চার থেকে বার হাজার লোক ছিল। বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারী তাঁর বর্ণনায় বলেছেন যে, কাদেসিয়ার করে স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মালিকী আইনবিদগণ (যাঁদের সীমান্ত ইউরোপীয় ফৌজ কর্তৃক হামেশা আক্রান্ত হত) রিবাতের আত্মরক্ষামূলক দিকটার ওপরেই বেশী জোর দিয়েছেন। হাদিসেও আত্মরক্ষামূলক রিবাতের খুব মূল্য দেয়া হয়েছে। তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তখনই এ হাদিসগুলো প্রচারিত হয়, যখন রিবাত আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একটি হাদিসে আছে: আবদুল্লাহ উমর বর্ণনা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহর মতে জেহাদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য। আর রিবাতের কাজ হল, বিশ্বাসী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণ। স্পেনে জেহাদের চাইতে রিবাত অধিক প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। কারণ, তাদের সীমান্ত হামেশাই খৃস্টান ফৌজ দ্বারা আক্রান্ত হত। এ কারণে ইবনে হোদাইল বৃস্টীয় দ্বাদশ শতকে (যখন স্পেনে ইসলামী শাসন কেবলমাত্র দক্ষিণাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে) জেহাদ সম্পর্কে লিখিত তাঁর কিতাবের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রিবাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং স্থলে ও সমুদ্রপথে আত্মরক্ষা বিশ্বাসীদের অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইসলামী জগতের পশ্চিম সীমান্ত আন্দালুস (স্পেন) সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাদিসের উল্লেখ করে রিবাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপীয় আক্রমণ থেকে স্পেনকে রক্ষা করা। হাদিসে আছে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: আত্মরক্ষার জন্য একটি রাত্র জাগরণ হাজার রাতের ইবাদাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
জেহাদিগণ
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
চতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহদেশের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, তবু ইসলামী রাষ্ট্র দেশ-রক্ষার ওপর যখন বেশী জোর দিতে শুরু করল, তখনই এ জেহাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জেহাদের মধ্যে আল-কোরআন কোন পার্থক্য নির্দেশ করে নি। আল-কোরআনে রয়েছে:
"খোদার দুশমন, তোমার দুশমন ও অন্যান্যদের মনে ভীতিসঞ্চার করার জন্য তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ও অশ্ব প্রস্তুত করে রাখ।" (৮ঃ ৬২)।
কিন্তু আইনবেত্তাগণ এবং বিশেষ করে স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মালিকী আইনবিদগণ (যাঁদের সীমান্ত ইউরোপীয় ফৌজ কর্তৃক হামেশা আক্রান্ত হত) রিবাতের আত্মরক্ষামূলক দিকটার ওপরেই বেশী জোর দিয়েছেন। হাদিসেও আত্মরক্ষামূলক রিবাতের খুব মূল্য দেয়া হয়েছে। তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তখনই এ হাদিসগুলো প্রচারিত হয়, যখন রিবাত আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একটি হাদিসে আছে: আবদুল্লাহ উমর বর্ণনা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহর মতে জেহাদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য। আর রিবাতের কাজ হল, বিশ্বাসী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণ। স্পেনে জেহাদের চাইতে রিবাত অধিক প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। কারণ, তাদের সীমান্ত হামেশাই খৃস্টান ফৌজ দ্বারা আক্রান্ত হত। এ কারণে ইবনে হোদাইল বৃস্টীয় দ্বাদশ শতকে (যখন স্পেনে ইসলামী শাসন কেবলমাত্র দক্ষিণাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে) জেহাদ সম্পর্কে লিখিত তাঁর কিতাবের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রিবাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং স্থলে ও সমুদ্রপথে আত্মরক্ষা বিশ্বাসীদের অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইসলামী জগতের পশ্চিম সীমান্ত আন্দালুস (স্পেন) সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাদিসের উল্লেখ করে রিবাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপীয় আক্রমণ থেকে স্পেনকে রক্ষা করা। হাদিসে আছে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: আত্মরক্ষার জন্য একটি রাত্র জাগরণ হাজার রাতের ইবাদাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
জেহাদিগণ
সপ্তম অধ্যায়
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
ঐতিহাসিক যুদ্ধে (৬৩৭ খৃস্টাব্দ) মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র বার হাজার। এঁরা পারস্যের ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
জেহাদীরা কয়েকটি আজনাদ বা রেজিমেন্টে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেকটি রেজিমেন্ট ছাউনী ফেলে থাকত, যেমন সিরিয়ার জাবিয়া, তাবারিয়া ও হোমস; ইরাকে বসরা ও কুফা এবং মিসরে ফুসতাত ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। যুদ্ধ করা ছাড়া এ যোদ্ধাদের আর কোন কাজ ছিল না। তাঁরা রাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধা ভোগকারী নাগরিক ছিলেন। ইহজগতে তাঁরা লাভ করতেন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ আর পরলোকে বেহেশত লাভের প্রতিশ্রুতি। তাঁরা কৃষিকার্যে যেন না যান, সেদিকে খলিফা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। কারণ, তাঁরা যদি এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন, তবে লড়াইয়ের ময়দানে তাঁদের একত্রিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। এ নীতি প্রবর্তন করেন হযরত উমর (রাঃ)।
স্থায়ী বসবাস কিন্তু তবু রোধ করা যায় নি এবং সৈন্য ছাউনীর সংখ্যাও বেড়ে যেতে থাকে। ফলে ফৌজের ঘাঁটিগুলোই সাম্রাজ্যের মধ্যে বড় বড় শহরে পরিণত হয়।
ক্রমে ক্রমে সৈন্যদল অনেকটা পেশাদার হয়ে পড়ল। বিশেষ করে উমাইয়াদের তামলে এ ক্রমবিবর্তন বেশ স্পষ্টরূপে লক্ষ্য করা যায়। বিদ্রোহ এবং গৃহযুদ্ধ দমন করার জন্য উমাইয়াদের সুদক্ষ ফৌজের খুবই বেশী প্রয়োজন ছিল। তাঁদের আমলেই পাঁচটি শ্রেণীতে সৈন্য বিভক্ত করার নীতি (খামিস) পরিত্যক্ত হল। সমগ্র সৈন্যদলকে একটি দলে সুসংবদ্ধ করে তার নাম দেয়া হল 'কুদুস'। খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের সময়ে এ পুনর্গঠন করা হয়। তাঁর আমলেই বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার পদ্ধতি প্রচলিত হয়। বাইজান্টীয় প্রভাবের ফলে মুসলিম সৈন্যদের সামরিক বেশভূষার দিক হতে গ্রীকদের থেকে প্রায়ই আলাদা করা যেত না। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও প্রায় একই রকম ছিল। মুসলিম বাহিনীর বলিষ্ঠ স্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি এবং মানসিক দুর্বলতার জন্য যখন ইবনে খালদুন দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তখনই কিন্তু উমাইয়া শাসনাধীনে সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
আব্বাসীয় খলিফাগণ নিয়মিত সেনা (সর্বদা কার্যে নিযুক্ত মুরতাযিকা) ও স্বেচ্ছা-সেবকবাহিনী (মুতাতাবিয়া) নিয়োগ করতেন। স্বেচ্ছাসেবকদের অস্থায়ী কাজের জন্য সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হত। কার্যকালীন সময়ে কেবল তাঁদের মাইনে দেয়া হত। নিয়মিত সেনাবাহিনীর এক বিশেষ দল থেকে খলিফার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের নেয়া হত। এ প্রহরী দলই সংরক্ষিত সেনাবাহিনী (Standing Army) হিসেবে কাজ করত। খলিফারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য বিদেশীদের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ করতেন এবং তাদের উচ্চহারে বেতন দিতেন। যখন খলিফার সম্মান ও প্রতিপত্তি কমে আসে, তখন এ সেনাদল তাদের মনিবদের চাইতেও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠে। Praetorian guard-এর মত তুর্কী রক্ষীদলও প্রায় একই ভূমিকা কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬) যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা-পয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইনচতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহ কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬)
যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা-পয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর গ্রহণ করে। এরা নিজেদের খেয়ালখুশী মাফিক একজন শাসককে পদচ্যুত করে যথেচ্ছভাবে আর একজনকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করত।
যুদ্ধ পরিচালনা
সেনাপতির হুকুমেই যুদ্ধ শুরু হত। হুকুমের পর আসে তাকবীর বা দোওয়া— (আল্লাহু আকবর—আল্লাহ' মহান)। যুদ্ধ আরম্ভ হবার পূর্বে তাকবীর ধ্বনি শুভ সূচনার ইঙ্গিত বহন করে। তাবারীর বর্ণনায় জানা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি সাদ যোহরের নামাজের পূর্বে যুদ্ধ শুরু না করার হুকুম করেন। যোহরের নামাজের অব্যবহিত পরেই তিনি চারবার তাকবীর ধ্বনি করে যুদ্ধ সূচনার সংকেত দান করেন। রোমানদের অভ্যন্তরীণ আইনের (Jus fetiale) অনুষ্ঠানের মত কোন কোন খলিফাও সেনাপতিগণকে কয়েকটি বিশেষ দিন বাদ দিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে পরামর্শ দিতেন।
যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে আল-কোরআন থেকে জেহাদ সম্পর্কীয় সূরা পাঠ করে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধিরও রেওয়াজ ছিল। যুদ্ধে যোগদানকারী কবি-সাহিত্যিকগণ বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা আবৃত্তি করতেন। আরবদের সাহসিকতা, আত্মসম্মানবোধ ও ধর্মীয়-উদ্দীপনা প্রভৃতি প্রেরণামূলক আরবীয় গুণাবলীর প্রতি আবেদন জানানো হত। যুদ্ধক্ষেত্রে কবিগণ সামরিক বীরত্বব্যঞ্জক নতুন নতুন কবিতা রচনা করে আবৃত্তি করতেন। এ কবিতাগুলো মোটেই নিম্নশ্রেণীর নয়। সত্যি কথা বলতে কি, যুদ্ধের উদ্দীপনা ও উন্মাদনার মধ্যেই বড় বড় লড়াইয়ের ময়দানে কতকগুলো উচ্চাংগের কবিতা রচিত হয়।
গোড়ার দিকে যুদ্ধের পরিচালনা খুব সুশৃঙ্খল ছিল না। পরবর্তীকালে এর ব্যতিক্রম ঘটে। প্রথমদিকে যে সব যুদ্ধের ফলে রাষ্ট্রীয় পরিধি বেড়ে যায়, তার মধ্যে প্রাক- ইসলামী যুদ্ধের গোষ্ঠী-যুদ্ধরীতিই অনুসৃত হত। সাধারণতঃ কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সাহসী সৈনিক শত্রুপক্ষের সৈন্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে লড়াইয়ে আহ্বান করে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ আরম্ভ করত। কোন কোন যুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে উভয়পক্ষের যোদ্ধাদের মধ্যে মল্লযুদ্ধ চলত কয়েক ঘণ্টা। কখনও কখনও এতেই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যেত; অথবা এ যুদ্ধই কয়েকদিন ধরে চলত। তারপর বাকী সৈন্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। প্রাক-ইসলামী যুদ্ধে প্রচলিত "কার" ও "ফার" নামক যুদ্ধরীতি মুসলমানরাও অনুমোদন করতেন। এ রীতি অনুসারে সেনাবাহিনী সর্বশক্তি নিয়োগ করে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করত; তারপর অকস্মাৎ পশ্চাদপসরণ করত। এ রীতি বার বার অনুসৃত হত। ফলে শত্রুসেনা বহুল পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হত এবং বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। কিন্তু মুসলিম ফৌজের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগতে পারত না। অশ্বারোহী সৈন্যগণ দ্রুতগতিশীল এবং তাদের আক্রমণ শক্তি অধিকতর কার্যকরী হওয়ায় এ ধরনের আক্রমণে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়। সেনাপতির হুকুম তামিল করতে ও ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে জেহাদিগণ বাধ্য।
সমর পরিচালনার সাধারণ দিকটার মধ্যে ওপরের সবটা বিষয় রয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পর্কে আলোচনা এবং চুক্তি সম্পাদনা ও যুদ্ধে লব্ধ ধন-সম্পদ বণ্ট হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইন-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়। সেনাপতির হুকুম তাম করত।
ক্রমে মুসলিম সেনাবাহিনী যতই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করতে লাগল, ততই কেবল যে নতুন নতুন আক্রমণের নিয়মিত পদ্ধতি তাদের আয়ত্তে আসে তা-ই নয়, তারা নিজেদের বিন্যাস-ব্যবস্থা ও সংগঠন পদ্ধতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে এবং অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যবহারে ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করে। সামরিক কলাকৌশল শরিয়তের বিধান অনুসারে আইনানুমোদিত বলেই গণ্য হত। কারণ, রণকৌশল ছিল যুদ্ধে নৈপুণ্য ও পারদর্শিতার ব্যাপার। তীক্ষ্ণ সতর্কতা, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং অধ্যবসায়ই এ কলাকৌশলের ভিত্তি ছিল।
📄 যুদ্ধের সূচনা
মনে রাখা দরকার যে, জেহাদ শুধু সামাজিক কর্তব্যই ছিল না, ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবেও জেহাদকে মূল্য দেয়া হত। ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবেও জেহাদের কর্তব্য পালন করতে হবে। জেহাদ আহ্বান করা না হলে বা ইমামের হুকুম না পেলেও কিছু আসে যায় না। ইসলামী রাষ্ট্র অতর্কিতে আক্রান্ত হলে মহিলা ও শিশুসমেত প্রতিটি মুমিনকে ইসলামী রাষ্ট্র রক্ষার জন্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। সামগ্রিক দৃষ্টিতে জেহাদ রাষ্ট্রীয় হাতিয়াররূপে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রের কর্তা বা উপকর্তা হিসেবে ইমামের কর্তব্য হবে জেহাদ ঘোষণা করা。
জেহাদ ঘোষণার পরই আসে বিশ্বাসীদের যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান। জেহাদ ঘোষণার ফলে আইনের চোখে পরস্পর শত্রুতামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্বাসীদের আহ্বান করার মাধ্যমেই জেহাদের রূপায়ণ সম্ভব হয়। ইমাম অবশ্যই বিশ্বাসীদের প্রতি নৈতিক আবেদন জানাবেন এবং তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, জেহাদ ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা, ইমামের আহ্বানে সাড়া দেয়া বিশ্বাসীদের কর্তব্য। কারণ, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন : ‘তোমাদের আহ্বান করলে উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সাড়া দাও।’ ইমাম কর্তৃক জনসভায় ভাষণ প্রদান, প্রার্থনা বা প্রদেশগুলোতে খবর পাঠাবার পর সবাই আহ্বানে সাড়া দেয়। ইসলামের প্রসারের যুগে প্রাথমিক যুগের খলিফাগণ কর্তৃক রাজধানীর নিকটবর্তী গোষ্ঠীগুলোর নিকট চিঠি লেখা হত। বালাযুরীর ভাষায়, “নজদ ও হেযাযের সমগ্র আরববাসীকে চিঠি লিখে যুদ্ধে আহ্বান জানানো হত এবং যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি করানো হত।” ইসলামের ইতিহাসে পরবর্তী যুগেও খলিফা ও সুলতানগণ এ নিয়ম অনুসরণ করে এসেছেন।
যুদ্ধে আহ্বানের ক্ষমতা খলিফা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরও দিতে পারেন। শত্রু রাষ্ট্রের সীমান্তের প্রদেশগুলো সম্পর্কে একথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বাসীদের যুদ্ধে আহ্বান করার জন্য খলিফাকে আমীরুল মুমেনিন হিসেবে শাসনকর্তাদের প্রতি হুকুমনামা পাঠাতে হত। বিশ্বাসীগণ যুদ্ধ করতে বাধ্য থাকতেন। দেশ আক্রান্ত হলেই সীমান্তের সেনাপতিগণের নিকট যুদ্ধ পরিচালনার হুকুম জারী করা হত। শত্রুপক্ষ সীমান্ত ভেদ করে এগিয়ে আসলে জেহাদ তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত কর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। তখন শত্রুকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবার জন্য অনাহূতভাবেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।
‘দাওয়াতে’র প্রয়োজনীয়তা
রোমক অভ্যন্তরীণ আইনে যেমন যুদ্ধের জন্য কতকগুলো অনুষ্ঠান পালন করতে হত, তেমনি জেহাদের ব্যাপারেও ইসলামে আহ্বান করার রীতি প্রচলিত ছিল। অমুসলিম নতুন ধর্মের আহ্বান গ্রহণ না করলে আর কিতাবিগণ জিযিয়া না দিলে তারা শত্রু হিসেবে পরিগণিত হত এবং তাদের সাথে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিত। আল-কোরআনে আল্লাহ বলেছেন: "পয়গম্বর না পাঠিয়ে আমরা কাউকে শাস্তি দিই নি।" আর হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে যে রাসূলে আকরম বলেছেন: 'যে পর্যন্ত তারা এক আল্লাহকে উপাস্য বলে না মানে, সে পর্যন্ত আমি পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। যদি তারা একথা স্বীকার করে (জিযিয়া দেয়), তাদের জানমাল নিরাপদে থাকবে।' এদুটো উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, প্রথমতঃ, অবিশ্বাসীকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানো হবে। তারা ইসলাম গ্রহণ করবে কিংবা যুদ্ধ করবে-একথা জানার জন্যই তাদের আহ্বান জানানো হয়।
যে নিয়ম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) স্বয়ং নির্ধারিত করেন, তা তিনি অনুসরণ করতেন। তাঁর পরবর্তী যুগে প্রাথমিক খলিফাগণ বা খোলাফায়ে রাশেদা তাঁর এ নিয়ম-কানুন বিশ্বস্ততার সাথে মেনে চলতেন। বাইজান্টীয় ও ইরানীদের বিরুদ্ধে অভিযানের পূর্বে আরব সেনাপতিরা তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অথবা জিযিয়া দিতে আহ্বান জানান। পরিপূর্ণ সরকারী দাওয়াতনামা কয়েকজন বিশিষ্ট যোদ্ধা মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে শত্রুপক্ষের সেনাপতির নিকট নিয়ে যেতেন। এর মধ্যে ধর্ম গ্রহণের যে আহ্বান জানানো হত, মাদাইন দখলের (খৃস্টীয় ৬৩৪ সন) পূর্বে খালিদ বিন আল-ওয়ালীদ যে সরকারী পত্র লেখেন, তার ঐতিহাসিক বর্ণনা নীচে দেয়া হলঃ
"খালিদ বিন-ওয়ালীদের নিকট থেকে ইরানী কর্তৃপক্ষের নিকট। যাঁরা সত্যপন্থী, তাঁদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ, যিনি তোমাদের অপমানিত করেছেন এবং তোমাদের রাজ্যকে ধ্বংসের পথে টেনে নিয়েছেন। যাঁরা আমাদের প্রার্থনায় যোগদান করেও আমাদের সঙ্গে (যুদ্ধে) আহ্বান করে, তাঁরা মুসলমান এবং আমাদের মতোই তাঁরা সমান অধিকার লাভ করবে। আমার পত্র পাওয়ার পর আমি যা লিখলাম, আপনি তা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেবেন। তবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। নতুবা আল্লাহর নামে আমি এমন সব লোক পাঠাব, আপনাদের কাছে জীবন যত প্রিয়, তাদের কাছে মৃত্যুও তেমনি বলে মনে হবে।"
যুদ্ধের পূর্বে শত্রুর কাছে দাওয়াত পাঠানোর সাধারণ নীতি সম্পর্কে ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু খুঁটিনাটি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদার নীতি অনুসরণ করে হানাফী ও মালিকী আইনবিদরা বলেছেন যে, যুদ্ধের পূর্বে দাওয়াত পাঠানো উচিত। আল-কুদূরী (৯৭৩-১০৩৭ খৃস্টাব্দ) নামক হানাফী আইনবিদ বলেন যে, শত্রুপক্ষ যদি পূর্বে দাওয়াত নামা পেয়েও থাকে, তবু আর একবার দাওয়াত পাঠানো উচিত। শাফেয়ী আইনবেত্তাগণ বলেন যে, যাদের আগেই ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত করা হয়েছে, তাদের পুনরায় সংবাদ না দিয়েই ইমাম ইসলামের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। আর যদি ইমাম দেখেন যে, বিনা যুদ্ধেই তাদের ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আর একবার তিনি দাওয়াত পাঠাতে পারেন। হাম্বলী আইনবিদরা বিশেষ জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম গ্রহণের জন্য কেতাবীরা ত' পূর্বেই (তাঁদের নবীদের মারফত) আহূত হয়েছেন। সুতরাং, তাদের আবার আহ্বান জানানো এবং সতর্ক করে দেবার দরকার নেই। শুধু অবিশ্বাসী পৌত্তলিক জাতিগুলোকেই আহ্বান জানানো উচিত। কারণ, এদের কাছে কোনদিন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান পৌঁছায় নি; কিংবা কোন দিন ইসলামের নাম পর্যন্তও তারা শোনেনি। তাই তাদের কাছেই শুধু সতর্কবাণী পাঠাতে হবে। পরবর্তী যুগের ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ জেহাদকে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা মনে করতেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত অকেজো বলে মনে করতেন। কারণ, সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম খুবই সুপরিচিত হয়ে গিয়েছে। আবার কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণের আহ্বান সম্পর্কে কোন কথাই বলেন নি।
আলাপ-আলোচনা
প্রাথমিক যুগের মুসলিম বিজয়ের যুগে সেনাপতিগণ দাওয়াতনামা পাঠানোর পর তিনদিন অপেক্ষা করতেন। তারপর যুদ্ধ শুরু হত। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে শত্রুপক্ষ আলাপ-আলোচনা চালাতে প্রস্তুত থাকলে মুসলমানগণ তাতে সম্মত হতেন। এসব আলাপ-আলোচনার ফলে অনেক সময়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌছানো সম্ভব হত, যেমন ইরাক ও সিরিয়ার কতকগুলো শহরের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে একথা প্রযোজ্য। কিন্তু মতবাদের বিভিন্নতার ফলে প্রায়ই আলাপ-আলোচনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেত এবং তার অব্যবহিত পরেই লড়াই শুরু হয়ে যেত। এসব আলোচনার প্রকৃতি সম্পর্কে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে কাদেসিয়ার যুদ্ধের (৬৩৭ খৃস্টাব্দ) পূর্বে মুসলমান ও তাঁদের শত্রুপক্ষের পরস্পর আলাপ-আলোচনার মধ্যে। এ আলোচনা আরবসেনাপতি সা'দ বি ওয়াক্কাস ও পারস্যসেনাপতি রুস্তমের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। আল-মুগীরা বিন শু'বার নেতৃত্বে সা'দ বিখ্যাত যোদ্ধাদের একটি দলকে রুস্তমের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাবার জন্য পাঠিয়ে দেন।
এই আলাপ-আলোচনার বিস্তৃত বিবরণ তাবারী ও বালাযুরীর লিখিত ইতিহাসে পাওয়া যায়। মৌলিক ব্যাপারে উভয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি ব্যাপারে বিরোধও যে নেই, তা নয়। বালাযুরীর বর্ণনা অনুসারে যোদ্ধাদল ইরানী পক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ইবনে শু'বা রুস্তমের পাশে তাঁর সুউচ্চ আসনে বসতে উদ্যত হন। রুস্তমের দেহরক্ষীগণ দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে তাঁকে সেখানে বসতে বাধা দেয়। ইবনে শু'বা বলেন, এ ধরনের আচার-ব্যবহারই পারস্যের অবনতির প্রধান কারণ। দলের অন্যান্য সদস্যগণও রুস্তমের ছাউনীতে প্রবেশ করেন ও আলোচনায় শরীক হন।
রুস্তম নিম্নোক্ত প্রশ্ন করে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন: "আপনারা এখানে এসেছেন কেন?"
দলের অন্যতম সদস্য রা'বী জবাব দেন:
"আল্লাহই আমাদের আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। মানব-পূজা থেকে বিরত থাকার জন্য এবং এক আল্লাহর ইবাদাত করার জন্য আহ্বান জানাতে আমরা এসেছি।"
তখন রুস্তম অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখার দাবী জানান। রা'বী জবাবে বললেন যে, রাসূলে করীম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) হুকুম দিয়েছেন যে দাওয়াতনামা পাঠাবার পর তিনদিনের বেশী যেন লড়াই বন্ধ রাখা না হয়।
পরদিন আলাপ-আলোচনার দিন ধার্য হয়। রুস্তম আবার আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। আলোচনাকালে তিনি বলেন: "আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনাদের দেশ দরিদ্র বলেই আপনারা এখানে এসেছেন। এ অবস্থায় আপনাদের সেনাপতির জন্য একটি পোশাক, একটি খচ্চর ও এক হাজার দিনার এবং প্রত্যেক সৈনিকদের জন্য এক ওয়াকার খেজুর ও পোশাক উপহার দেবার জন্য আমি আদেশ দেব। কারণ, আপনাদের হত্যা বা কয়েদ করার ইচ্ছা আমার নেই।" ইবনে শু'বা এর জবাবে বললেন:
"আমাদের দারিদ্র্য সম্পর্কে আপনি যা বলেছেন, তা সুস্পষ্ট এবং আমরা তা অস্বীকার করি না। কিন্তু আপনি আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে মন্তব্য করলেন, তা ঠিক নয়। ...কারণ, আল্লাহ আমাদের কাছে এক রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর বদৌলতেই আমরা ঐক্যবদ্ধ ও সম্মানিত হয়েছি।"
আলাপ-আলোচনা চলতে লাগল। মুসলিম প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ রুস্তমকে ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান বা যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া এ তিনটির যেকোন একটি গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। রুস্তম এতে খুব বিরক্ত হন। এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি হতাশার সুরে বলেন, তাঁর পক্ষে মুসলমানদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করা অসম্ভব। বালাযুরীর বর্ণনায় আছে, তখন মুসলমানদের দলের একজন জবাব দেনঃ 'আমাদের রাসূল (সঃ) আপনাদের দেশে আমাদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।'
তাবারীর বর্ণনায় পারসিক ও বাইজান্টীয়দের সাথে আলোচনার যে বর্ণনা রয়েছে, ওপরের আলোচনা থেকে তা খুব আলাদা নয়। মিসর বিজয়ের সময় মুসলমানদের সঙ্গে মিসরীয়দের যে আলাপ-আলোচনা হয়, তাও প্রায় একই ধরনের। ইবনে আবদুল হাকামের বর্ণনায় জানা যায় যে, মিসরের প্রধান খৃস্টান যাজক মুসলিম সেনাপতি আমর বিন আসের কাছে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করার আহ্বান জানিয়ে এক প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে দেন। আমর ওই আহ্বানে সাড়া দেন। যদিও গোড়ার দিকে আলাপ-আলোচনা সফল হয় নি, তবু পরিশেষে কপটগণ মুসলমানদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছিল। দুঃখের বিষয়, ঐতিহাসিকরা চুক্তির ধারাগুলো ছাড়া আর কোন কিছুই লিপিবদ্ধ করেন নি। চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে আলাপ-আলোচনার কথোপকথনের ধারা সম্পর্কে কোন বর্ণনাও তাঁরা দেন নি।
📄 স্থল-যুদ্ধ
যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া বা শত্রুপক্ষের ধনসম্পদ লাভ করা মুসলিম আইনে যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য নয়। যুদ্ধের মধ্যে কর্তব্য পালন ছাড়া আর কোন কিছুই নেই। ইসলামী আদর্শকে সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদেই আল্লাহর পথে জেহাদ পরিচালিত হয়। সে জন্য জেহাদীদের তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অযথা রক্তক্ষয় করতে বা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করতে নিষেধ করা হয়েছে। সিরিয়া অভিযানকারী সেনাদলের প্রতি হযরত আবু বকরের (রাঃ) ভাষণ এবং পরবর্তী যুগের খলিফাদের একই রকমের উপদেশ-বাণীর মধ্যে এ বিষয় সম্পর্কে মৌলিক নীতি খুঁজে পাওয়া যাবে।
নিষিদ্ধ কার্যাবলী
আইনবিগদগণ হযরত আবু বকরের (রাঃ) নসিহতগুলোর মধ্যে অকারণে অমুসলিমদের ধনসম্পদ বিনষ্ট না করার নীতি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু খুঁটিনাটি ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। বর্তমানে যে সব বিবরণ আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, তা থেকে জানা যায় যে, কেবলমাত্র আল-আউযায়ী (খৃস্টীয় ৭৭৪) ও আস-সাউরী (খৃস্টীয় ৭৭৮) অকারণে ধ্বংস না করার নীতি নির্বিবাদে মেনে নিয়েছেন। আইনের চারটি মযহাবের প্রবর্তক এবং অন্যান্য আইনবিদগণ আল-কোরআন ও সুন্নার কতিপয় নির্দেশ অনুযায়ী এ নীতিকে অনেকটা সীমিত করে এনেছেন। আল-আউযায়ী বলেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবির ব্যবহারিক জীবনের আলোকে আল-কোরআন ও সুন্নার ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কেননা, তাঁর মতে সাহাবিগণ আল-কোরআনের ব্যাখ্যার ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার চাইতেও পারদর্শী ছিলেন। তাই তাঁদের ব্যাখ্যাই সর্বাগ্রে গৃহীত হওয়া উচিত।
ইমাম মালিক তাঁর "মু'আত্তায়” যুদ্ধের আইনের ব্যাপারে যে আলোচনা করেন, তাতে তিনি গৃহপালিত পশু ও মৌচাক ধ্বংস না করতে বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা এ বিধান দিয়েছেন যে, জেহাদীগণ যে সব জিনিস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না যেমন বাড়ী, চার্চ, গাছ-পালা, পশু—সবই ধ্বংস করতে পারেন। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, প্রাণহীন সব কিছু ধ্বংস করা যেতে পারে, যেমন বৃক্ষ। কিন্তু পশু কেবল তখনই হত্যা করা উচিত যখন জেহাদীরা মনে করেন যে, এগুলো ধ্বংস না করলে শত্রুপক্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে পড়বে।
আইনবিদগণ এ সম্বন্ধে সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, যাঁরা যুদ্ধে যোগদান করেন না যেমন নারী, শিশু, পাদ্রী, ফকির, বৃদ্ধ, অন্ধ, উন্মাদ, এদের কোন প্রকার পীড়ন করা চলবে না। অনেক হানাফী ও শাফেয়ী আইনবিদ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের নিপীড়ন করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তারা যুদ্ধে যোগদান করে না।
প্রাক-ইসলামী যুগে শত্রুপক্ষের নিহত ব্যক্তিদের মস্তক বর্শার অগ্রভাগে বহন করার নীতি প্রচলিত ছিল। আইনবিদগণ এ প্রথা রহিত করার সুপারিশ করেন। এই হল এসব আইনবিদের অভিমত। খলিল নামক মালিকী আইনবেত্তা যুদ্ধে বিষাক্ত তীর ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। আর হিল্লী শত্রুর বিরুদ্ধে তীর ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
প্রাক-ইসলামী যুগের রীতি-নীতি অনুসরণ করে মুসলিমগণ পবিত্র মাসে যুদ্ধে যোগ দিতেন না। এ সময়ে সকলের যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকা উচিত। কারণ, তখন আল্লাহর বিশেষ রহমত নাযিল হয়। আল-কোরআনের নিম্নলিখিত নির্দেশের মধ্যেও এর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়:
"পবিত্র মাস শেষ হয়ে গেলে মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর। কারণ, তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেবতাদের শরীক করে।" (৯:৫)।
কোরআনের এ নীতি পরবর্তীকালে আর একটি নীতি দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। সেটা হল এই:
"তারা (মুসলমানগণ) তোমাকে পবিত্র মাসে যুদ্ধ পরিচালনা সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। তাদের বল: পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা খারাপ; কিন্তু আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া ও তার ওপরে ইমান না রাখা এবং কাবা শরীফকে সম্মান না করা ও সেখান থেকে লোকদের তাড়িয়ে দেয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি খারাপ।” (২:২১৪)।
আতা ভিন্ন আর সব আইনবিদ এই সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম আইন অনুসারে পবিত্র মাসে বিশেষ রহমত নাযিলের নীতি আর গ্রাহ্য নয়; অবশ্য পবিত্র মাসে যুদ্ধে যোগদান হতে বিরত থাকা অনুমোদন করা হয়েছে।
শত্রুদের প্রতি ব্যবহার
দারুল হারবের অমুসলমানগণকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত জানাবার পর তারা যদি বিভিন্ন বিকল্পপন্থার যে কোন একটি (ইসলাম গ্রহণ অথবা জিযিয়া প্রদান) গ্রহণ না করেন, তবে জেহাদীগণ নীতিগতভাবে জেহাদের মারফত তাদের হত্যা করতে পারেন। তারা যুদ্ধে যোগ দিন আর না দিন।
অবশ্য তাদের বিশ্বাসভঙ্গ করে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদ করা কোন মতেই অনুমোদিত হয় নি। নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও ইসলামের মধ্যে যে কোনটি বেছে নিতে হলে হারবীদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েই তার মীমাংসা করতে হবে।
জেহাদীগণ শত্রুপক্ষকে অবরোধ করতে এবং নগরের প্রাচীর ও গৃহ ধ্বংস করতে আগ্নেয়াস্ত্র (নিক্ষেপাস্ত্র) ব্যবহার করতে পারেন। শত্রু-অধিকৃত স্থান দগ্ধ করতে বা প্লাবিত করতে পারেন। তাঁরা খালের পানি অবরুদ্ধ করতে পারেন ও শত্রুপক্ষ যাতে পানি না পায়, সেজন্য পানি সরবরাহও বন্ধ করে দিতে পারেন। বিষাক্ত দ্রব্য, রক্ত বা অন্যান্য জিনিস পান করার পানিতে বা খালে নিক্ষেপ করা যেতে পারে। এতে শত্রুগণ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। সাধারণভাবে বিষাক্ত ও অগ্নিবহ তীরও যুদ্ধে ব্যবহার করতে অনুমতি দেয়া হয়।
যদি হারবীগণ (অমুসলিম যোদ্ধা) নারী ও শিশুসমেত মুসলিমদের ধরে ফেলে এবং তাঁরা ও অসুমসলিমগণ জেহাদীদের দ্বারা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন, তবে জেহাদীগণ হিংসাত্মক কার্যকলাপ সীমিত করবেন। এটাই হল আইনবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত। হিংসাত্মক কার্যকলাপের পরিসীমা সম্পর্কে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ব্যক্তিগতভাবে জেনে হারবীদের যদি আক্রমণ করা না যায়, তবে প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য আল-আউযায়ী উপদেশ দিয়েছেন। আল-কোরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের ওপর ভিত্তি করে তিনি এ মতামত প্রকাশ করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময়ে এটি নাযিল হয়:
"তোমাদের অজান্তে বিশ্বাসী নারী-পুরুষের তোমরা হয়ত মথিত করতে পার। এবং তার ফলে তোমরা গোনাহগার হয়ে যেতে পার।" (৪৮:২৫)।
সুফিয়ান আস-সাউরী ও ইমাম আবু হানিফা প্রয়োজনবোধে তীর-ধনুক দিয়ে শত্রুকে আক্রমণ করার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এতে জেহাদীগণ কর্তৃক অমুসলিম আক্রান্ত হওয়ার ফলে যদি অস্ত্র-শস্ত্রের আঘাতে কোন মুসলমানের মৃত্যু হয়, তবু আক্রমণ করা বাঞ্ছনীয়। মুমিনদের (মহিলা ও শিশুসমেত) হত্যা তখন ভুলক্রমে হয়ে গিয়েছে বলে মনে করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী বলেন, যুদ্ধার্থে সুরক্ষিত কেন্দ্র ও দুর্গসমূহ আক্রমণ করা চলে। কিন্তু বাড়ী-ঘরের ওপর হামলা চলবে না। যদি যুদ্ধের এলাকা খুব পাশাপাশি হয়, তবে মুমিনদের মৃত্যু ঘটলেও তীর না ছুঁড়ে (আক্রমণ না করে) হাত গুটিয়ে বসে থাকা উচিত নয়। শাফেয়ী আইন ও ধর্মবেত্তা ইমাম গাজ্জালী বলেন যে, হারবীদের ওপর বেপরোয়া আক্রমণকালে জেহাদীদের তীরের আঘাতে দুর্ঘটনাক্রমে কোন মুমিন নিহত হলে তা' দোষাবহ হবে না। অর্থাৎ এ অবস্থায় 'ইসতিসলাহ' বা জনকল্যাণের তাগিদে কয়েকজন মুমিনের হত্যা অনুমোদিত হয়েছে। কারণ, জেহাদকালে এ ধরনের আক্রমণে মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।
গুপ্তচর
মুসলিম সেনাপতিগণ গুপ্তচর বৃত্তির উপযোগিতা স্বীকার করতেন এবং এ প্রাচীন প্রথার উপযুক্ত ব্যবহার প্রচলন করেন। কিন্তু অন্যান্য জাতির মত তাঁরা বৈদেশিক গুপ্তচরদের কঠোর হস্তে শাস্তি দিতেন। যদি কোন হারবী নিরাপদভাবে (আমান) দারুল ইসলামে প্রবেশ করে থাকে ও পরে তার গুপ্তচর বৃত্তি ধরা পড়ে, তবে তাকে হত্যা করা হয়। আর ইমাম যদি সিদ্ধান্ত করেন তবে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করাও যেতে পারে। যদি কোন মহিলা ও শিশু আমানের (নিরাপত্তা) ভিত্তিতে দারুল ইসলামে প্রবেশ করে থাকে এবং তাদের গুপ্তচরবৃত্তি ধরা পড়ে তবে মহিলাকে হত্যা করা উচিত, কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ করে নয়। শিশুকে শত্রুপক্ষ থেকে প্রাপ্ত দ্রব্য (Fay) বলে মনে করতে হবে; কিন্তু হত্যা করা যাবে না।
যদি কোন মুসলমান গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে শত্রুপক্ষকে খবর সরবরাহ করে, তবুও আইনে তার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া হয় নি। অবশ্য ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালিক দেশের শাসনকর্তা বা ইমামের ওপর তার শাস্তি বিধানের বিষয়টি ন্যস্ত করেছেন। আল-আউযায়ী তাকে নির্বাসিত করার বা নিপীড়নমূলক শাস্তি বিধান করার সুপারিশ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা বলেন যে, সে তওবা (অনুশোচনা) না করা পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা হবে। কেতাবীদের গুপ্তচর বৃত্তির ব্যাপারে এই একই আইন প্রযোজ্য হবে।
মৃত ব্যক্তির প্রতি ব্যবহার
হারবীর মৃত্যুর পর তার মৃতদেহকে অবমাননা করা, তার মাথা কেটে ফেলা বা বর্শার অগ্রভাগে তার মাথা তুলে নেয়া চলবে না। আবু ইয়ালা বলেন যে, মৃতব্যক্তি মাত্রকেই দাফন করা উচিত। তবে শবাধারে রাখা বা কাফন না পরালেও চলবে। বদরের যুদ্ধের পর হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সুন্নার ওপরই তাঁর এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
📄 নৌ-যুদ্ধ
ইসলাম ও নৌ-শক্তি
ইসলামী আইনবিজ্ঞানে সমুদ্রপথে যুদ্ধের বিষয়টির আলোচনা অনেকখানি অপূর্ণ রয়ে গেছে। গোড়া থেকেই মুসলমানেরা সমুদ্রপথ এড়িয়ে চলতেন। তাছাড়া সব চাইতে বড় কারণ হল এই যে, মুসলিম শক্তি স্থলপথেই সীমাবদ্ধ ছিল। পানিপথে তাঁদের শক্তি দানা বেঁধে উঠতে পারে নি। ফলে বিষয়টি তাঁরা অবহেলা করেই এসেছেন। স্থল এলাকায় ইসলামের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মরুপ্রদেশ থেকে বাইজান্টীয় ও ইরানী সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানী সাম্রাজ্যের দ্রুত ও চরম অধঃপতন ঘনিয়ে আসল। কারণ, ইরান হল এমন একটি স্থলশক্তি, যাকে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করতে পেরেছিল। কিন্তু মুসলমানরা যখন আলেকজান্দ্রিয়ায় ও সিরিয়ার সমুদ্রতীরে বাইজান্টীয়দের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁরা বিপুল বাধার সম্মুখীন হন। বাইজান্টীয়দের নৌ-শক্তি তখনও অটুট ছিল। এ পর্যন্ত বহুদিন ধরে মুসলমানগণ স্থলশক্তির সাহায্যেই তাঁদের বিজিত দেশ নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন। জাবিয়া, কুফা ও ফুসতাত মরুভূমিতে অবস্থিত এসব ঘাঁটি থেকেই স্বচ্ছন্দে বিজিত এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সমুদ্রপথে মুসমানদের সর্বক্ষণ আক্রমণের মোকাবিলা করতে হত। তাই নৌ-বাহিনী গঠন করে সাম্রাজ্যকে বিদেশী আক্রমণ থেকে রক্ষা করার বন্দোবস্ত করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও হযরত মুয়াবিয়ার রাষ্ট্রনৈতিক দূরদর্শিতার ফলে মুসলমানগণ নৌ-শক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারলেন। কারণ, যতদিন ভূমধ্যসাগর বাইজান্টীয়দের কবলে রয়ে গেল, ততদিন মিসর ও সিরিয়ায় ইসলামের অবস্থা মোটেই নিরাপদ ছিল না।
খৃস্টীয় ৬৪৮ সালে হযরত মুয়াবিয়া কর্তৃক সাইপ্রাস অধিকারের পরই মুসলিম নৌ-শক্তির গোড়াপত্তন হয়। ফলে সিরিয়ার ওপর তাঁর আধিপত্য অনেকটা মজবুত হয়ে আসে। রোডস ও সিসিলি দ্বীপের ওপর আক্রমণ মুসলমানদের অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দেয় এবং ৬৫৫ সালে প্রথম বৃহৎ নৌ-সমরে তাঁরা জয়ী হন। কয়েকটি নৌ-কৌশল প্রয়োগের ফলেই মুসলিমগণ যাত-আস-সাউরীর যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এতে বোঝা গেল যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানগণও সামুদ্রিক যুদ্ধে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। বাইজান্টীয়-শক্তি সমুদ্রপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকা সত্ত্বেও ভূমধ্যসাগরের আধিপত্য কেবলমাত্র খৃস্টান শক্তির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ রইল না। নৌ-আধিপত্যের ব্যাপারে খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলল। কারণ প্রতিবার কেউ না কেউ নতুন নতুন রণ-কৌশল বা অস্ত্রশস্ত্র উদ্ভাবন করতে লাগল। ইস্তাম্বুলের মুসলিম অবরোধ গ্রীকদের অগ্নিপ্রক্ষেপ কৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে যায় (খৃস্টীয় ৬৭৩-৬৯৭)। আবার অপরপক্ষ হয়তো বা একই অস্ত্র আকস্মিকভাবে প্রয়োগ করতেন অথবা নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে পালটা আক্রমণ চালাতেন। এ কারনেই উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলের একটানা আক্রমণ সত্ত্বেও (৭১৭ খৃস্টাব্দে ইস্তাম্বুলের ওপর আর একটি আক্রমণ) বাইজান্টীয় সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পেরেছিল।
পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসলামের নৌ-শক্তি দ্রুতগতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে সমগ্র উত্তর আফ্রিকার সমুদ্র অঞ্চল ও স্পেনের ওপর সুদৃঢ় আধিপত্যের ফলে এবং সিসিলি, সাডিনিয়া ও দক্ষিণ ইতালী অধিকারের ফলে ইসলাম সর্বাঙ্গ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। ভূমধ্যসাগরের ওপর প্রভাবের তাৎপর্য খুব সুদূরপ্রসারী ছিল। এর ফলে যে কেবল পূর্ব ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আন্ত র্জাতিক বাণিজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই কেবল সম্ভব হল তাই নয়, নতুন পদ্ধতিতে (যেমন স্বর্ণ-দিনারের ব্যবহার ও ব্যাঙ্কিং ইত্যাদি) সামুদ্রিক বাণিজ্য, নৌ-যুদ্ধ ও নৌ-চলাচল ব্যবস্থা পরিচালনার নতুন নতুন পন্থা ও রীতি-নীতির পত্তন হল। মুসলিম নৌ-শক্তির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে খৃস্টান শক্তিগুলো পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ইবনে খালদুন সুস্পষ্টরূপে দেখিয়েছেন, কি করে খৃস্টান রাষ্ট্রগুলোর নৌ-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও স্পেনের কোন কোন অঞ্চল মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে উসমানীয় তুর্কিগণ কর্তৃক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের এক বৃহৎ অঞ্চল ও আফ্রিকার উপকূলে প্রভুত্ব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের নৌ-শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী তিন শতাব্দী ধরে এ প্রভুত্ব বজায় ছিল।
মুসলিম সামুদ্রিক আইন
অধিকাংশ আইনবিদই সমুদ্র সম্পর্কে প্রায় একরকম কিছুই বলেন নি। অল্প কয়েকজন সমুদ্রের আইন সম্বন্ধে যা লিখেছেন, তা থেকে যুদ্ধ ও শান্তিকালে আন্ত র্জাতিক ক্ষেত্রে সামুদ্রিক আইনের নিখুঁত ছবি দাঁড় করানো কঠিন। আল-কোরআনে সমুদ্র সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি আছে। একটিতে এই সাবধান বাণী রয়েছে: "আল্লাহ ফেরাউনের সৈন্যদের সমুদ্রে নিমজ্জিত করে শাস্তি দিয়েছেন" (২:৪৭)। আবার অন্য আর একটিতে দু'রকমের সমুদ্রের কথা আছে—স্বাদু ও মিঠে পানির সাগর আর নোনা এবং তেতো পানির সাগর। আল্লাহ বলেন, উভয় প্রকারের সমুদ্র থেকেই বিশ্বাসীগণ মাছ ধরে খেতে পারবেন, মণি-মুক্তা সংগ্রহ করতে পারবেন ও বিভিন্ন প্রকার সুবিধা লাভের জন্য সমুদ্রে অভিযান চালাতে পারেন। আল-কোরআনের যে সব নির্দেশের মধ্যে "সমুদ্রকে অধীন করে দিয়েছেন" যাতে করে "সেখানে জাহাজ চলাচল করতে পারে" (৪৫: ১১) রয়েছে, সেগুলোই অনেক বেশী প্রাসঙ্গিক। আল-কোরআনে আরও আছে, "তিনি তোমাদের জন্য তারকা সৃষ্টি করেছেন, যাতে স্থলে ও সমুদ্রপথে তোমরা অন্ধকারে পথ চলতে পারো" (৬ঃ ৯৭)।
হাদিসে কোরআনের চাইতে বেশী কিছু নেই। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) বিশ্বাসীদের নাকি সমুদ্র ভ্রমণ থেকে বিরত করেন। সেনাপতিদের তিনি এই নির্দেশ দেন যে, তাঁরা যেন সামরিক অভিযান মরুভূমির দিকেই পরিচালিত করেন। স্মরণ রাখা উচিত যে, হযরত উমর (রাঃ) হযরত মুয়াবিয়া কর্তৃক সাইপ্রাস দখলের প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন; আর অনিচ্ছাকৃতভাবেই হযরত উসমান (রাঃ) তা অনুমোদন করেন। এ অবস্থায় আইনবিদগণ ইসলাম থেকে শান্তিকালে নৌ-চলাচল ব্যবস্থা কিংবা নৌ- যুদ্ধের আইন সম্বন্ধে প্রামাণ্য সূত্রে কোন নির্দেশ বার করতে পারেন নি। তাই তাঁদের স্থল-যুদ্ধের অনুরূপ অবস্থা থেকে বা অন্যান্য জাতির ব্যবহার-বিধি ও আচার-ব্যবহারের ওপরই এ ব্যাপারে নির্ভর করতে হয়েছে।
নৌ-যুদ্ধের আইন-কানুন
হাদিসে আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: 'যাঁরা নৌ-যুদ্ধে শহীদ হন, তাঁরা স্থল-যুদ্ধের শহীদদের চাইতে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন'। সমুদ্র সম্বন্ধে যে চিরাচরিত ভীতি ছিল, এই পুরস্কার ঘোষণার মধ্যেই সমুদ্র-যুদ্ধে উৎসাহ দেবার প্রয়োজনীয়তা পরোক্ষভাবে সুপরিস্ফুট হয়েছে। শায়বানিও বলেছেন, কোন মুসলমান সমুদ্র অভিযানে শরীক হলে দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবেন। জেহাদী জাহাজে আরোহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তিনি নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যান।
স্থলযুদ্ধে দুর্গ সম্বন্ধে যে আইন প্রচলিত আছে, নৌ-যুদ্ধে সে আইনই জাহাজের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আইনবিদগণ তুলনামূলক বিচার করে ঐক্যবদ্ধভাবে এ নীতি প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। জেহাদীরা যেমন অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং বাইরের সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিনষ্ট করে দুর্গ অবরোধ ও আক্রমণ করতে পারেন, তেমনি সামুদ্রিক জেহাদীরা শত্রুপক্ষের জাহাজের লোকদের বশে এনে বশ্যতা স্বীকার না করানো পর্যন্ত আগুন ধরিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে শত্রু-জাহাজকে আক্রমণ করতে পারেন ও তার ধ্বংসসাধন করতে পারেন। এ আইনের ওপর ভিত্তি করেই নৌ-জেহাদীগণ শত্রুপক্ষের মনোবল বিনষ্ট করে ভীতিজনক অবস্থার সৃষ্টি করে জাহাজের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেন। জাহাজের ওপর মুসলমান নৌ-সেনারা যে কেবল পাথর ও আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতেন তাই নয়, তাঁরা সাপ, বিচ্ছু ও ক্ষতিকর চূর্ণও ছুঁড়ে মারতেন। শত্রুপক্ষকে বিতাড়িত করার জন্য এবং জাহাজের লোকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও ভীতি সঞ্চারের জন্য তাঁরা এ পন্থা অবলম্বন করতেন।
স্থল-যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে শত্রু-দুর্গের চারদিক শত্রুগণ কর্তৃক বন্দী মুসলিম নারী ও শিশুদের দিয়ে ঘিরে দিলেও যেমন সে দুর্গ আক্রমণ করা যেত, তেমনি জাহাজের চারদিক মুসলিম বন্দী দ্বারা ঘিরে রাখলেও তা হামলা থেকে রেহাই পাবে না। সাধারণ আইনবিদদের মতের বিরুদ্ধে আল-আউযায়ী অবশ্য এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মুসলিম বন্দীদের দ্বারা দুর্গ ঘিরে রাখলে সে দুর্গ আক্রমণ করা চলবে না। তেমনি শত্রু-জাহাজও যদি মুসলমানদের দ্বারা পরিবেষ্টিত করে দেয়া হয়, তবে সে জাহাজ আগুন ধরিয়ে বা অন্যান্য উপায়ে ধ্বংস করা চলবে না।
নৌ-যুদ্ধের সময় যদি মুসলমানদের কোন জাহাজ ঘায়েল হয়, তবে জেহাদী হয় জাহাজেই অবস্থান করবেন, নয় এক সঙ্গে ডুবে যাবেন অথবা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। যদি তিনি ঝাঁপ দিয়ে পড়েন, তবে তাঁর শত্রুর হাতে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবু শত্রুর হাতে তিনি মারা পড়বেন না, এ কথা জোর করে বলা যায় না।
নৌ-যুদ্ধের পর মুসলিম যুদ্ধ জাহাজ বন্দী ও ধন-সম্পদ লাভ করতে পারে। আইনবিদদের মতে, স্থল-যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ যেভাবে বণ্টন করা হয়, নৌ-যুদ্ধেও সেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যদি মুসলিম নৌ-সেনারা দেখেন যে, অর্জিত ধন-সম্পদ ওজনে এত ভারী যে জাহাজ ডুবে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে, তখন তাঁরা যে কেবল ধন-সম্পদই সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে পারেন তা নয়, নারী ও শিশু সমেত সব যুদ্ধবন্দীকে তাঁরা ফেলে দিতে পারেন। কিন্তু জাহাজে যদি মুসলিম নারী ও শিশু থাকে তবে তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করা চলবে না। কারণ, তাদের সমুদ্রে নিক্ষেপ করা অবৈধ বলে সাব্যস্ত হয়েছে। এ দুরবস্থার কথা চিন্তা করেই সুযুতী প্রমুখ আইনবিদগণ বলেছেন যে, যুদ্ধ জাহাজে নারী ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। মুসলমানদের জাহাজে যদি জিম্মী বা আমানের (নিরাপত্তা) ভিত্তিতে আনীত অমুসলিম থাকেন, তবে তাদেরও সমুদ্রে নিক্ষেপ করা চলবে না। কারণ মুসলমানদের তাদের দেয়া ওয়াদা পালন করতেই হবে।
যদি শত্রু পক্ষের জাহাজ সমুদ্রযাত্রার পক্ষে অকেজো হয়ে পড়ে ও জাহাজীগণ আমান না নিয়েই দারুল ইসলামের উপকূলে এসে হাজির হন, তবে তাদের নিপীড়িত করা চলবে না। আউযায়ী বলেছেন যে, শত্রুপক্ষ যদি আমান প্রার্থী হয়, তবে তাদের তা প্রদান করতে হবে। তবে তারা যদি আমান না চান, তবে তাদের আক্রমণ করা যেতে পারে। যদি কোন শত্রু-জাহাজ দারুল ইসলামের সমুদ্র-উপকূলে এসে পড়ে এবং জাহাজের ব্যবসায়ীদের কোন আমান না থাকে, তবে তাদের শত্রুর কাছ থেকে পাওয়া সম্পদ (Fay) হিসেবে মনে করতে হবে। কিন্তু তারা যদি কূটনৈতিক কার্যোপলক্ষে এসেছে বলে দাবী করে, তবে তাদের কূটনৈতিক নিরাপত্তা (Immunity) দান করতে হবে এবং ইমামের কাছে যেতে অনুমতি দিতে হবে। ইমাম যদি দেখেন যে, তাদের কাছে পরিচয়-পত্র নেই, তবে তাদের কয়েদ করা, দাসে পরিণত করা কিংবা হত্যা করা যেতে পারে। তাদের ধন-সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা চলবে।
নৌ-বাহিনী সংগঠন
মুসলিম নৌ-বাহিনী যতই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকে, এর দক্ষতা এবং সংগঠন-শক্তি ততই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। খৃস্টীয় দশম শতাব্দীতে সমুদ্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতারূপে যখন মুসলিম নৌ-শক্তি সর্বাধিক শক্তিশালী হয়, তখন মুসলিম রণপোত ও বাণিজ্য বহর পরিচালনা-নৈপুণ্য, সামুদ্রিক-জ্ঞান ও নৌ-কলাকৌশলের দিক থেকে সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জন করে এবং তদানীন্তন যুগের অগ্রগামী ভূমিকা গ্রহণ করে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌ-বাহিনী ও নৌ-সংগঠন সম্পর্কে বিস্তর তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যান্য মুসলিম এলাকার ব্যাপারেও বোধহয় এ তথ্যগুলো প্রযোজ্য। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরে চালু জাহাজের চাইতে ভূমধ্যসাগরের জাহাজগুলো ছিল আকারে অনেক বড় ও উন্নতমানের। জাহাজ তৈরীর জন্য মুসলমানেরা উৎকৃষ্ট কাঠ আমদানী করতেন এবং সুদক্ষ পরিচালনা ও দ্রুত গমনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংযোজিত করতেন। বিশাল সমুদ্রে চলাচলের সময় জাহাজের ফাটল ও ছিদ্র সহজেই মেরামত করে নেয়া চলত। চলমান জাহাজের চারদিকে কয়েকজন জাহাজীকে সাঁতার দেবার শিক্ষা দেয়া হত। এরা মোম ও সহজলভ্য অন্যান্য জিনিস দিয়ে জাহাজের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতেন।
প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের মত নৌ-বাহিনীর এডমিরাল বা "আমীরুল বাহরকে" পরিপূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হত। স্বয়ং খলিফার অনেক ক্ষমতারও তিনি অংশীদার ছিলেন। স্থলে যেমন খলিফা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন, তেমনি "আমীরুল বাহরের" কাজ হল সমুদ্র-পথে শাসন চালান। নৌ-জেহাদীদের পরিচালনা এবং অস্ত্রাদির তত্ত্বাবধানের জন্য একজন কায়েদ বা কাপ্তেন নিয়োজিত হতে এবং পাল ও দাড় পরিচালনার জন্য একজন সরদার বা “রইস” থাকতেন। যদি আমিরুল-বাহর নৌ-অভিযান পরিচালনা নিজহস্তে গ্রহণ না করতেন, তবে কোন নিম্নপদস্থ আমীরের হাতে এ কাজের ভার দেয়া হত। গ্রীকগণ কর্তৃক আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা আক্রমণ করার ফলে মুসলমানদের সমূহ ক্ষতি সাধিত হবার পর মুসলমানরা নিজেদের যুদ্ধ-জাহাজে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার প্রচলন করেন। এসব জাহাজকে হারাক্কাস বা আগ্নেয় জাহাজ বলা হত। এগুলো থেকে শত্রু-জাহাজে দাহ্য-বস্তু নিক্ষেপে করা হত।
মুসলমানেরা কম্পাস ব্যবহার করতেন। তবে বোধহয় পরবর্তী যুগে এর প্রচলন হয়। প্রথম যুগের মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন-বিশারদগণ এর কোন উল্লেখই করেন নি। প্রাথমিক ইউরোপীয় কম্পাসের মত এ কম্পাস-পঞ্জীতে বত্রিশটি বিন্দু ছিল। কিন্তু এটুকু ছাড়া এ দুটোর মধ্যে আর কোন সাদৃশ্য নেই। মুসলমানেরা চারটি প্রধান বিন্দুর উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁরা এ বিন্দুগুলোকে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাগে বিভক্ত করেন নি। বিভিন্ন তারকার নামের সঙ্গে মিলিয়ে এঁরা বিন্দুগুলোর নামকরণ করেছেন। প্রধান চারটি বিন্দুকে তাঁরা "আল-জিহাত আল-আ'রবা" বা চারদিক বলে অভিহিত করেছেন। এগুলো হলেঃ "ইয়া" বা উত্তর (ধ্রুবতারারও ওই একই নাম); "মাতলা” বা পূর্ব; "মাগরিব” বা পশ্চিম। "মাতলা" ও "মাগরিব" সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত থেকে গৃহীত হয়েছে। "কুতব" বলতে দক্ষিণ বোঝায়, মেরুর ওই একই নাম। কম্পাসের বিন্দুগুলো পশ্চিম দিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে চিহ্নিত করা হয়। যে তারকা যে দিকে অস্ত যায়, সেই অনুসারেই হয় এক একটি বিন্দুর নামকরণ। পূর্বের দিকেও পর পর একই নামকরণ করে শুধু "মাতলা" কথাটি জুড়ে দেয়া হয়।