📄 ভূমিকা
একটি ধর্মকে সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য নিয়ে যে রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সে রাষ্ট্র ক্রমঃপ্রসারণশীল হতে বাধ্য। ইসলামী রাষ্ট্র ইসলামকে সারা দুনিয়ার মধ্যে সব চাইতে শক্তিমান জীবনার্দশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। কারণ, আল্লাহর আইন-ব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ণই হল এ রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ। প্রাথমিক যুগে ইসলামের মিশন দ্রুত ও সাফল্যজনকভাবে পরিচালিত হয়েছিল। ইসলামের শান্তিপূর্ণ অনুপ্রবেশ ও প্রসার একইভাবে এগিয়ে চলল। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র পুরাতন পৃথিবীর অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোমান সাম্রাজ্যের মত সুবিশাল রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
অন্যান্য সার্বজনীন রাষ্ট্রের মত দ্রুত প্রসারী মুসলিম রাষ্ট্রের প্রসারণেরও একটা সীমা ছিল। অতীতের বিজয়ী মুসলিম সেনানীগণ পাশ্চাত্য দেশে তুরের যুদ্ধে (খৃস্টীয় ৭৩২) পরাজিত হন। আর প্রাচ্যদেশে তাঁরা ভারতীয় এলাকার বাইরে আর বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেন নি। তাই মুসলিম প্রসারের শক্তিশালী তরঙ্গ গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে নি। পিরেনিজ পর্বতমালা ও সিন্ধুনদ অবধি এসে মুসলিম রাষ্ট্র বিস্তারের ধারা হঠাৎ থেমে গেল। সেদিনের পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা আর সম্ভব হল না। মুসলিম রাষ্ট্রের বাইরেও অনেকগুলো জাতি ও গোষ্ঠী রয়ে গেল, যাদের সাথে মুসলিম শাসকদের একটা সমঝোতায় আসতে হয়েছিল। আইনের ঔপপত্তিক বিধানে যদিও বা এ সমঝোতা ছিল নিতান্ত সাময়িক, তবু পরবর্তী যুগের ইসলামী ইতিহাসে এ সম্পর্কটি অনেকটা স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে।
মুসলিম আইনে তাই দুনিয়াকে দুভাগে বিভক্ত করা হল : দারুল ইসলাম (ইসলামের আবাসভূমি) ও দারুল হারব (সমর-ভূমি)-রূপে। আরও সহজ করে বলতে গেলে বলা যায়: ইসলাম জগৎ ও সমর জগৎ। প্রথমটি বলতে বোঝাত মুসলিম শাসিত দেশ। এখানকার অধিবাসীরা ছিলেন জন্মগত বা ধর্মান্তরিত মুসলিম। যে সব গোষ্ঠীর লোক তাদের ধর্ম বদলায় নি ও যারা জিযিয়া করের বিনিময়ে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও তাহযীবের রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল, তারাও দারুল ইসলামে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশিষ্ট সনদের মাধ্যমে অমুসলিমগণ মুসলিম শাসন মেনে নিয়েছিল। এ সব সনদই মুসলিম অমুসলিমের সম্পর্ক নির্ণয় করে এসেছে। মুসলিম জগতের বাইরে যে সব রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল, তাদের সম্মিলিত সংস্থার নাম হল দারুল হারব। এখানকার অধিবাসীদের অবিশ্বাসী বলে গণ্য করা হত।
সমগ্র বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হওয়াই ছিল ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। আইনের দৃষ্টিতে তাই দারুল ইসলামের সঙ্গে দারুল হারবের যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান ছিল সর্বক্ষণ। মুসলমানদের কর্তব্য হল বুঝিয়ে শুনিয়ে ইসলামী আদর্শ প্রচার করা। আর খলিফা ও তাঁর সৈন্যাধ্যক্ষগণ যুদ্ধ বা জিযিয়া থেকে রেহাই পাবার পন্থা হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শকে বিকল্পরূপে পেশ করতেন। আইনের দৃষ্টিতে ইসলামী আইন বাস্তবে রূপায়িত করাই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্য। অন্য কোন আইন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইসলামী রাষ্ট্র বাধ্য ছিল না। অমুসলিমগণ যখন যুদ্ধ এড়িয়ে ইসলামী আদর্শকে মেনে নিত, তখনও ইসলামী আইনের বিষয়ে কোন প্রকার শৈথিল্য বরদাশত করা হয় নি।
কাজেই জেহাদই যুদ্ধের ব্যাপারে মুসলিম-অমুসলিমের সম্পর্কের পথ নির্দেশ করে এসেছে। দারুল হারবকে দারুল ইসলামে পরিণত করার রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারই হল জেহাদ। কিন্তু অমুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে জেহাদ একমাত্র পন্থা নয়। জেহাদ ছাড়া অন্যান্য শন্তিপূর্ণ পন্থাও ছিল। যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর আলাপ-আলোচনা, সালিসী ও চুক্তি সম্পাদন—এগুলোই মুসলিম-অমুসলিমের সম্পর্ক নির্ণয়ে প্রয়োগ করা হত।
প্রসারণশীল মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের মাধ্যমেই মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের সৃষ্টি। আর এভাবেই নানা বিধি-ব্যবস্থা গড়ে উঠল। যুদ্ধ বা শান্তিকাল, সব সময়েই মুসলমানেরা এগুলো মেনে চলত। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবদের এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অপর গোষ্ঠীর সংঘর্ষকালে যে সব নীতি এবং পন্থা অনুসরণ করা হত, তাকে অতি অমানুষিক ও বর্বরোচিত বলে মনে করা হত। কারণ, এসব সংঘর্ষের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-ভিত্তিক ছিল। ইসলামের আগমনে জেহাদ বা ন্যায়সংগত যুদ্ধ ভিন্ন আর সব রকম যুদ্ধ ও হানাহানির অবসান ঘটে। বিশেষ সতর্কতার সাথেই আইনবিদগণ ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে আইনের বিধি-ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। যুক্তিবাদিতা ও ধর্মীয় সমর্থনই ছিল এ ব্যবস্থার মূলে।
📄 জেহাদের নীতি
জেহাদের তাৎপর্য
পঞ্চম অধ্যায়
জেহাদ কথাটি এসেছে "জাহাদা" থেকে। এর মানে হল, যে সাধ্যমত চেষ্টা করেছিল। ধর্মীয় আইনে এভাবে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে: আল্লাহর পথে নিজের শক্তিকে নিয়োজিত করা। অর্থাৎ আল্লাহর আদর্শ প্রচার করা আর তাঁর নীতিকে দুনিয়াতে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। জেহাদের মাধ্যমেই ব্যক্তি নাজাত বা মুক্তিলাভ করে। বেহেশতের সুখলাভ করার প্রত্যক্ষ পন্থা হিসেবে আল্লাহতায়ালা জেহাদকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আল-কোরআনে নিম্নলিখিত নির্দেশ থেকে জেহাদের এ সংজ্ঞাটি পাওয়া যায়:
"হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের আমি সেই কাজের নির্দেশ করব, যা তোমাদের কঠোর শাস্তি থেকে রেহাই দেবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ইমান রাখ এবং আল্লাহর পথে তোমাদের বিত্ত-সম্পদ ও ব্যক্তিগত সত্তা নিয়োগ করে জেহাদে ব্রতী হও। তোমরা দিব্য দৃষ্টিসম্পন্ন হলেই বুঝতে পারবে যে, এটা তোমাদের পক্ষে মঙ্গলজনক। তোমাদের পাপ-কালিমা তিনি ক্ষমা করে দেবেন ও তোমাদের জন্য এমন ফুলের বাগিচা তিনি তৈরি করে রাখবেন, যার পাদদেশে ঝর্ণা প্রবাহিত হবে। আর তোমাদের জন্য মনোরম আবাসভূমি রয়েছে বেহেশতে—এ কতবড় নেয়ামত"—(আল-কোরআন: আস-সাফা: ৬১-১০-১৩)।
ব্যাপকতর অর্থে জেহাদ বলতে সাধনা বা প্রচেষ্টা বোঝায়। জেহাদ বলতে কেবল যুদ্ধ বোঝায় না। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও যুদ্ধ পরিচালনা—এ উভয় পন্থার মাধ্যমেই আল্লাহর পথে সাধনা বা প্রচেষ্টা চালান সম্ভব হতে পারে। জেহাদ নিছক ধর্মপ্রচার হিসেবেও গণ্য হতে পারে। গোড়ার দিকে অবতীর্ণ সূরাগুলোতে নবী হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন ও এক আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহ্বান জানিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। নিম্নলিখিত আয়াত থেকে তার নজির মিলেঃ "যে ব্যক্তি জেহাদ পরিচালনা করে, সে তার আত্মার জন্যই তা করে"।—(আল-কোরআন: ২৯: ৬)। আত্মার সদগতি বা নাজাতের দিকেই এখানে বেশী নজর দেয়া হয়েছে। ধর্মপ্রচারের বিষয় এখানে বড় একটা গুরুত্ব পায় নি। মদিনায় অবতীর্ণ সূরাগুলোতে কিন্তু জেহাদ বলতে যুদ্ধের কথাই বলা হয়েছে। কোন কোন সূরায় জোহদ বলতে নিঃসন্দেহে শুধু যুদ্ধকেই বোঝানো হয়েছে।
আইনবিদগণ বিশ্বাসীদের পক্ষে জেহাদের চারটি পন্থা নির্দেশ করেছেন : মনের জেহাদ, জিহ্বার জেহাদ, হস্তের জেহাদ ও তরবারীর জেহাদ। শয়তানকে শায়েস্তা করার জন্য ও তার ষড়যন্ত্র থেকে রেহাই পাবার জন্য হল মন দিয়ে জেহাদ। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) দৃষ্টিতে এ জেহাদ ছিল সব চাইতে বড় জেহাদ। সত্য-প্রতিষ্ঠা ও অসত্য দূরীকরণের জন্য জিভ ও মনের জেহাদ বিশেষ কার্যকরী। চতুর্থটি হল সত্যিকার যুদ্ধ। অমুসলিম ও ইসলামী আদর্শের দুশমনদের বিরুদ্ধেই এ জেহাদ পরিচালিত হয়। জেহাদ চালিয়ে যাবার জন্য নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন বিসর্জন দেয়া বিশ্বাসীদের কর্তব্য।
জেহাদ বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ
যে জেহাদ বিশেষ একটি আইন-ব্যবস্থার বিধি-নিষেধাদি পালনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয় কিংবা কোন ধর্মীয় নীতি বা সামাজিক রীতি-নিয়মের ওপর ভিত্তি করে চালিত হয়, তা যথার্থ বিবেচিত হয়। প্রাচীন রোমের মত ইসলামেও ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি রয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য একটা যুক্তিযুক্ত কারণ ও আনুষ্ঠানিক বিধি-নিষেধ থাকা চাই। প্রাচীন রোমের মত ইসলামেও যুদ্ধের ব্যাপারে শুধু যে ন্যায় নীতির অস্তিত্ব ছিল তাই নয়, তা ধর্মসঙ্গত ও আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত কি না সেকথাও বিচার্য।
যুদ্ধ যখন সামাজিক আচার অবশ্য কর্তব্য পালন করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জেহাদী সৈনিকরা এটা যতটা নিশ্চিতরূপে পান, তেমনটি আর কেউ পাবে না।
সাধু টমাস ও অন্যান্য মধ্যযুগীয় দার্শনিকগণ ষোড়শ, সপ্তাদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক নিয়মের প্রত্যয়ের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের জনক গ্লোশিয়াস প্রাকৃতিক নিয়মজাত ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক আইন-ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি তাঁর ধারণাগুলোরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য; যদিও উনবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের আইনের ওপর প্রাকৃতিক নিয়মের প্রভাব পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর তুলনায় বেশ কমে এসেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের পর আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে ভিন্ন আর সব যুদ্ধকে বে-আইনী ঘোষণা করার মধ্যে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আর ইসলামী আইন-ব্যবস্থায় এ নীতি একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। আইন-ব্যবস্থাই ধর্মীয় উদ্দেশ্য সাধনের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, আর ধর্ম আইনকে জানিয়েছে সমর্থন।
মুসলিম আইন-ব্যবস্থা অনুসারে ইসলাম এবং শিরক এক সঙ্গে পাশাপাশি বাস করতে পারে না। আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই যে কেবল ইমাম ও প্রত্যেকটি মুমিনের কর্তব্য তাই নয়, অমুসলিমগণও যাতে করে আল্লাহকে অস্বীকার না করে বা তাঁর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ না হয়, সেটা লক্ষ্য করাও তাঁদের কর্তব্য। জেহাদের মধ্যে তাই বহু ঈশ্বরবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্যায়ের শাস্তি-বিধানের জন্যও বিশেষ কারণে ইসলামে জেহাদের ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। এর ওপরেই নির্ভর করে আল্লাহর বাণীর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও তার রাষ্ট্রনৈতিক প্রাধান্য।
জেহাদ: স্থায়ী যুদ্ধ
ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যে আরব দেশে যুদ্ধের প্রচলন হয়েছে, এ কথা ঠিক নয়। আরবদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। এসব যুদ্ধ ছিল নিতান্ত গোষ্ঠীগত। এর প্রকৃতি নির্ভর করত তদানীন্তন সমাজব্যবস্থার বিশেষত্বের ওপর। যুদ্ধ সম্পর্কীয় নিয়ম-কানুন সামাজিক আচার বা ঐতিহ্যগত সুন্নার ভেতরেই সুসংবদ্ধ ছিল। গোষ্ঠীই ছিল রাজনীতির মূল কাঠামো। যুদ্ধ ছিল আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর দস্যুবৃত্তি বা প্রতিশোধ গ্রহণের মধ্য দিয়েই ছিল তার প্রকাশ। ইবনে খালদুন বলেন, যুদ্ধের পরিবেশে আরবদের মধ্যে স্বাবলম্বন, সাহসিকতা ও গোষ্ঠীগত সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এসব গুণই আবার যুদ্ধ-পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে ও অনিশ্চিত বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করে।
ইসলামী জেহাদের মূল্য হল এই যে, তা গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিকে গোষ্ঠীগত কোন্দল থেকে বহির্বিশ্বের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর পথে (সত্যের তাগিদে) জেহাদ ছাড়া আর সব রকমের যুদ্ধ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। জেহাদের এই নীতি ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে বেঁচে থাকাই ছিল খুব কঠিন। গোষ্ঠীগত আক্রমণের স্থান দখল করলো জেহাদের নীতি। অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষে যে শক্তির অপচয় হত, তা এখন জাতীয় ঐক্যসাধন ও নতুন ধর্মের তাগিদে বহির্বিশ্বের সঙ্গে জেহাদে নিয়োজিত হতে লাগল।
জেহাদকে তাই হিংসাত্মক ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেয়া চলে না। ইসলাম জেহাদকে মাইন ও ধর্মের আওতায় নিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে অনেকগুলো জটিল শক্তি এর পেছনে কাজ করেছে। কোন কোন লেখক আরব দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর বেশী জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে আরবদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা ঘনীভূত হতে থাকে এবং আরব দেশের বাইরে উর্বর জমির সন্ধানে তারা বেরিয়ে পড়ে। আরব উপদ্বীপ থেকে বাইরের দুনিয়ার দিকে ধাবিত হবার কারণ হিসেবে এ থিয়োরীটা আপাতঃদৃষ্টিতে যতটা সত্য বলে মনে হয়, আসলে এটা জেহাদের প্রকৃতিকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ, জেহাদ ছিল স্থায়ী যুদ্ধের পর্যায়ে। আরবের বাইরে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরেও অমুসলমানদের বিরুদ্ধে এ জেহাদ পরিচালিত হত। এর পেছনে অন্যান্য আরও অনেক কারণ ছিল। এগুলোই মুসলমানদের মনে একটা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিশনের মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল এবং বিজয়ী জাতি হিসেবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ন্ত্রিত করেছিল।
প্রথমে ইসলামের সার্বজনীন দিকটার কথাই বলতে হয়। ইসলাম ধর্ম ও আদর্শের প্রসারে সাহায্য করা হল প্রত্যেক সুস্থ সক্ষম মুসলমানের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। ইহুদী ধর্ম মিশনারী ধর্ম নয়। তাদের ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ধর্ম-যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল-ধর্ম বিস্তারের জন্য নয়। অন্যদিকে খৃষ্টান ধর্ম শুধু পরলোকে মুক্তি-বিধান নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং প্রথম দিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। রাজনীতির সঙ্গে এ ধর্ম যখন সংশ্লিষ্ট ছিল, তখনও চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদাই থাকে। ইসলাম কিন্তু এ দুই ধর্মমত থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সার্বজনীন ধর্ম ও সার্বজনীন রাষ্ট্র-এ দুটোকে ইসলাম সম্মিলিত করে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইসলাম শান্তিপূর্ণ ও জেহাদী উভয় পন্থাই অবলম্বন করেছে। ইসলামের সার্বজনীনতা ইসলাম-জগতের সমগ্র মুসলমান সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করেছে। আর ইসলামের আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং জেহাদের নীতি সমগ্র বহির্বিশ্ব বা সমর-জগতের বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। দুনিয়ার সব জাতিকে মুসলমান করার উদ্দেশ্য সাধনে জেহাদকে ইসলামের হাতিয়ার বলে মনে করা যেতে পারে। জিম্মীদের যদি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নবুয়তে বিশ্বাসী করে তোলা না যায়, তবে অন্ততঃপক্ষে তাদের যাতে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী করে তোলা যায়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এক বর্ণনায় জানা যায় যে, রাসূলে করীম হযরত মুহম্মদ (সঃ) বলেছেন যে, আমার উম্মতের কোন কোন লোক সত্যের জন্য জেহাদ চালিয়ে যাবে এবং তাদের মধ্যে শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত বিজয়ী বেশে দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। সেদিন না আসা পর্যন্ত জেহাদ, কোন না কোন রকমে সমগ্র মুসলিম সমাজের কর্তব্য হয়ে থাকবে।
ইসলামী আইনে দারুল হারবের অস্তিত্ব বে-আইনী ব্যাপার বলে সাব্যস্ত হয়। যতদিন না দারুল হারব বিলুপ্ত হয়ে যায়, ততদিন দারুল ইসলাম জেহাদ চালিয়ে যাবে। কোন সম্প্রদায় যদি অমুসলিম রয়ে যায়, আর তারা যদি দারুল ইসলামে বসবাস করতে চায়, তবে তারা সাধারণ মুসলিম আইনের আওতায় আসতে বাধ্য থাকবে। সর্বাত্মক ও সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম সর্বক্ষণ বিশ্বাসীদের সামরিক না হোক, অন্ততঃ মানসিক ও রাজনৈতিক জেহাদের সবক দেয়।
জেহাদ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামপন্থীগণের সম্পর্ক নির্ণয়ের স্থায়ী নীতি। কিন্তু এর অর্থ মোটেই এই নয় যে, সব সময়ে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। হিংসাত্মক পন্থা ছাড়াও জেহাদের কর্তব্য শুধু যে পালন করা সম্ভব হয়েছে তাই নয়, দুশমনদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে অবিরাম সংগ্রামের পন্থা অনুসৃত হয় নি। তাই জেহাদকে সংগ্রাম নীতি বলা যায়, অবিরত যুদ্ধ-নীতি নয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, জেহাদের প্রস্তুতি জেহাদের কর্তব্য পালনেরই শামিল। অবশ্য রাষ্ট্রকে সব সময়ে সামরিক দিক দিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে করে কেবল যে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় তা নয়, খলিফা প্রয়োজন মনে করলে আক্রমণের ভূমিকাও যেন গ্রহণ করা যায়।
কার্যতঃ দেখা যায় যে, পরিবর্তিত পরিবেশে জেহাদের ভূমিকা বিভিন্ন অর্থ বহনহাদের বিষয়টি অতি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হলেও খারেজী আইন-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কোন আইনের শাখাতেই জেহাদকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তার কারণ হল এই যে, পাঁচটি নীতি বাস্তবায়িত করা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই ব্যক্তিকে এ কর্তব্যগুলো পালন করতে হয়— রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। ন্যায়সঙ্গত জেহাদ সবসময়েই রাষ্ট্রের মাধ্যমে রূপায়িত হয়। আইনের দৃষ্টিতে ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ, যেমন— নামাজ, রোজা ইত্যাদি হল ব্যক্তিগত কর্তব্যের অন্তর্গত (ফারদ আয়েন) প্রত্যেক মুমিনকে এগুলো ব্যক্তিগতভাবেই সমাধা করতে হবে। আর এ কর্তব্য পালন না করলে ব্যক্তিগতভাবেই তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আকস্মিক আক্রমণের সময় মুসলিম নরনারীর জেহাদের কর্তব্যের কথা বাদ দিলে দেখা যায় যে, জোহদ সব আইনবিদের দৃষ্টিতেই সমগ্র মুসলিম জাতির সামগ্রিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ব্যাপারে আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ নেই। এ কর্তব্য “ফারদ-ই-কিফা”য়ার পর্যায়ভুক্ত। সমগ্র মুসলিম জাতির ওপরই এ গুরুভার ন্যস্ত হয়। কেবল ব্যক্তির ওপর এ দায়িত্ব বর্তাতে পারে না। মুসলিম সমাজের একটা বিশেষ অংশ যদি এ কর্তব্য সুসম্পন্ন করেন, তবে অন্যান্য লোকের ওপর জেহাদ আর কার্যতঃ অবশ্য কর্তব্যরূপে গণ্য হয় না। আর জেহাদের কর্তব্য যদি মোটেই পালিত না হয়, তবে বুঝতে হবে, এ সমাজ সত্যপথ থেকে দূরে সরে গেছে।
ব্যক্তির কর্তব্য বলে গণ্য না হয়ে জেহাদ যে গোটা মুসলিম সমাজের কর্তব্য বলে পরিগণিত হয়, এর মধ্যে দুটো নিগূঢ় তাৎপর্য নিহিত আছে। প্রথমতঃ, প্রতিটি মুসলমানই যে জেহাদে শরীক হবে, এমন নয়; কারণ, সব মুসলমানকে সৈন্যদলে ভর্তি করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরীর জন্যও লোকের দরকার। তাছাড়া খোঁড়া, অন্ধ ও অসুস্থ লোকেরা সৈনিক হবার পক্ষে উপযুক্ত ছিল না। যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে শরীক হওয়া থেকে মহিলা ও শিশুগণ রেহাই পেত। অবশ্য অনেক মহিলা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদ ব্যক্তির কর্তব্য হিসেবে গণ্য না হয়ে সমগ্র সমাজের কর্তব্য হওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেহাদ পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছিল। এ ক্ষমতা নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়—রাষ্ট্রগত ব্যাপার। বিষয়টি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দায়িত্বের ভিত্তিতে ছেড়ে না দেবার ফলে রাষ্ট্রপ্রধান সমাজের সার্বজনীন কল্যাণ সাধনের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে পারেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্তব্য পালনের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয় নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় সূত্রে এবং রাষ্ট্রীয় ও সমাজ নেতাদের উক্তিতে সমর্থিত হয়েছে। যাঁরা আল্লাহর পথে সংগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন, তারা যে শাহাদাত লাভ করবেন এবং কিয়ামতের দিন বিনাবিচারে বেহেশতে অনন্ত জীবন ভোগ করতে পারবেন, এ ওয়াদা তাঁরা খুব বড় করে দেখিয়েছেন। সাধারণ নিয়ম অনুসারে এ সব শহীদকে গোসল করানো হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁদের দাফন করা হয়। অবশ্য একথাও মনে রাখা দরকার যে, যেসব মুসলমান পাঁচটি অবশ্য কর্তব্য পালন করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জেহাদী সৈনিকরা এটা যতটা নিশ্চিতরূপে পান, তেমনটি আর কেউ পাবে না।
সাধু টমাস ও অন্যান্য মধ্যযুগীয় দার্শনিকগণ ষোড়শ, সপ্তাদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক নিয়মের প্রত্যয়ের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের জনক গ্লোশিয়াস প্রাকৃতিক নিয়মজাত ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক আইন-ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি তাঁর ধারণাগুলোরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য; যদিও উনবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের আইনের ওপর প্রাকৃতিক নিয়মের প্রভাব পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর তুলনায় বেশ কমে এসেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের পর আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে ভিন্ন আর সব যুদ্ধকে বে-আইনী ঘোষণা করার মধ্যে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আর ইসলামী আইন-ব্যবস্থায় এ নীতি একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। আইন-ব্যবস্থাই ধর্মীয় উদ্দেশ্য সাধনের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, আর ধর্ম আইনকে জানিয়েছে সমর্থন।
মুসলিম আইন-ব্যবস্থা অনুসারে ইসলাম এবং শিরক এক সঙ্গে পাশাপাশি বাস করতে পারে না। আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই যে কেবল ইমাম ও প্রত্যেকটি মুমিনের কর্তব্য তাই নয়, অমুসলিমগণও যাতে করে আল্লাহকে অস্বীকার না করে বা তাঁর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ না হয়, সেটা লক্ষ্য করাও তাঁদের কর্তব্য। জেহাদের মধ্যে তাই বহু ঈশ্বরবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্যায়ের শাস্তি-বিধানের জন্যও বিশেষ কারণে ইসলামে জেহাদের ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। এর ওপরেই নির্ভর করে আল্লাহর বাণীর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও তার রাষ্ট্রনৈতিক প্রাধান্য।
জেহাদ: স্থায়ী যুদ্ধ
ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যে আরব দেশে যুদ্ধের প্রচলন হয়েছে, এ কথা ঠিক নয়। আরবদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। এসব যুদ্ধ ছিল নিতান্ত গোষ্ঠীগত। এর প্রকৃতি নির্ভর করত তদানীন্তন সমাজব্যবস্থার বিশেষত্বের ওপর। যুদ্ধ সম্পর্কীয় নিয়ম-কানুন সামাজিক আচার বা ঐতিহ্যগত সুন্নার ভেতরেই সুসংবদ্ধ ছিল। গোষ্ঠীই ছিল রাজনীতির মূল কাঠামো। যুদ্ধ ছিল আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর দস্যুবৃত্তি বা প্রতিশোধ গ্রহণের মধ্য দিয়েই ছিল তার প্রকাশ। ইবনে খালদুন বলেন, যুদ্ধের পরিবেশে আরবদের মধ্যে স্বাবলম্বন, সাহসিকতা ও গোষ্ঠীগত সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এসব গুণই আবার যুদ্ধ-পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে ও অনিশ্চিত বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করে।
ইসলামী জেহাদের মূল্য হল এই যে, তা গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিকে গোষ্ঠীগত কোন্দল থেকে বহির্বিশ্বের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর পথে (সত্যের তাগিদে) জেহাদ ছাড়া আর সব রকমের যুদ্ধ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। জেহাদের এই নীতি ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে বেঁচে থাকাই ছিল খুব কঠিন। গোষ্ঠীগত আক্রমণের স্থান দখল করলো জেহাদের নীতি। অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষে যে শক্তির অপচয় হত, তা এখন জাতীয় ঐক্যসাধন ও নতুন ধর্মের তাগিদে বহির্বিশ্বের সঙ্গে জেহাদে নিয়োজিত হতে লাগল।
জেহাদকে তাই হিংসাত্মক ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেয়া চলে না। ইসলাম জেহাদকে মাইন ও ধর্মের আওতায় নিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে অনেকগুলো জটিল শক্তি এর পেছনে কাজ করেছে। কোন কোন লেখক আরব দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর বেশী জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে আরবদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা ঘনীভূত হতে থাকে এবং আরব দেশের বাইরে উর্বর জমির সন্ধানে তারা বেরিয়ে পড়ে। আরব উপদ্বীপ থেকে বাইরের দুনিয়ার দিকে ধাবিত হবার কারণ হিসেবে এ থিয়োরীটা আপাতঃদৃষ্টিতে যতটা সত্য বলে মনে হয়, আসলে এটা জেহাদের প্রকৃতি-ব্যবহার ও বিধির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে, তখন তা ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়, এ ধারণা অতি প্রাচীনকালের ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া যায়। এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর এক গোষ্ঠীর প্রতিশোধের নীতির মধ্যেই যুদ্ধের বীজ সুপ্ত রয়েছে। আরাস্তু তাঁর "রাষ্ট্রনীতি” নামক বইতে কোন কোন যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত বলে অভিহিত করেছেন। রোমানদের যুদ্ধের আইন একটি সংগ্রাম-পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হত। এ পরিষদের একজন সভাপতি ছিলেন। ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের আইন-কানুন রচনা করাই ছিল এ পরিষদের কাজ। মধ্যযুগীয় খৃস্টান রাষ্ট্রে সাধু অগাস্টিন ও আইসডর-দ্য-সেভিল সিসেরোর ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের প্রত্যয় দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। সাধু টমাস অ্যাকুইনস মুসলিম দার্শনিকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি ছিল ইসলামী জেহাদেরই মত। এ কারণেই বোধহয় জেহাদের বিষয়টি অতি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হলেও খারেজী আইন-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কোন আইনের শাখাতেই জেহাদকে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তার কারণ হল এই যে, পাঁচটি নীতি বাস্তবায়িত করা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই ব্যক্তিকে এ কর্তব্যগুলো পালন করতে হয়— রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। ন্যায়সঙ্গত জেহাদ সবসময়েই রাষ্ট্রের মাধ্যমে রূপায়িত হয়। আইনের দৃষ্টিতে ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ, যেমন— নামাজ, রোজা ইত্যাদি হল ব্যক্তিগত কর্তব্যের অন্তর্গত (ফারদ আয়েন) প্রত্যেক মুমিনকে এগুলো ব্যক্তিগতভাবেই সমাধা করতে হবে। আর এ কর্তব্য পালন না করলে ব্যক্তিগতভাবেই তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আকস্মিক আক্রমণের সময় মুসলিম নরনারীর জেহাদের কর্তব্যের কথা বাদ দিলে দেখা যায় যে, জোহদ সব আইনবিদের দৃষ্টিতেই সমগ্র মুসলিম জাতির সামগ্রিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ব্যাপারে আইনবিদদের মধ্যে মতবিরোধ নেই। এ কর্তব্য “ফারদ-ই-কিফা”য়ার পর্যায়ভুক্ত। সমগ্র মুসলিম জাতির ওপরই এ গুরুভার ন্যস্ত হয়। কেবল ব্যক্তির ওপর এ দায়িত্ব বর্তাতে পারে না। মুসলিম সমাজের একটা বিশেষ অংশ যদি এ কর্তব্য সুসম্পন্ন করেন, তবে অন্যান্য লোকের ওপর জেহাদ আর কার্যতঃ অবশ্য কর্তব্যরূপে গণ্য হয় না। আর জেহাদের কর্তব্য যদি মোটেই পালিত না হয়, তবে বুঝতে হবে, এ সমাজ সত্যপথ থেকে দূরে সরে গেছে।
ব্যক্তির কর্তব্য বলে গণ্য না হয়ে জেহাদ যে গোটা মুসলিম সমাজের কর্তব্য বলে পরিগণিত হয়, এর মধ্যে দুটো নিগূঢ় তাৎপর্য নিহিত আছে। প্রথমতঃ, প্রতিটি মুসলমানই যে জেহাদে শরীক হবে, এমন নয়; কারণ, সব মুসলমানকে সৈন্যদলে ভর্তি করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ ও অস্ত্রশস্ত্র তৈরীর জন্যও লোকের দরকার। তাছাড়া খোঁড়া, অন্ধ ও অসুস্থ লোকেরা সৈনিক হবার পক্ষে উপযুক্ত ছিল না। যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে শরীক হওয়া থেকে মহিলা ও শিশুগণ রেহাই পেত। অবশ্য অনেক মহিলা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদ ব্যক্তির কর্তব্য হিসেবে গণ্য না হয়ে সমগ্র সমাজের কর্তব্য হওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেহাদ পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছিল। এ ক্ষমতা নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়—রাষ্ট্রগত ব্যাপার। বিষয়টি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দায়িত্বের ভিত্তিতে ছেড়ে না দেবার ফলে রাষ্ট্রপ্রধান সমাজের সার্বজনীন কল্যাণ সাধনের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে পারেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্তব্য পালনের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয় নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় সূত্রে এবং রাষ্ট্রীয় ও সমাজ নেতাদের উক্তিতে সমর্থিত হয়েছে। যাঁরা আল্লাহর পথে সংগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন, তারা যে শাহাদাত লাভ করবেন এবং কিয়ামতের দিন বিনাবিচারে বেহেশতে অনন্ত জীবন ভোগ করতে পারবেন, এ ওয়াদা তাঁরা খুব বড় করে দেখিয়েছেন। সাধারণ নিয়ম অনুসারে এ সব শহীদকে গোসল করানো হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁদের দাফন করা হয়। অবশ্য একথাও মনে রাখা দরকার যে, যেসব মুসলমান পাঁচটি অবশ্য কর্তব্য পালন করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জেহাদী সৈনিকরা এটা যতটা নিশ্চিতরূপে পান, তেমনটি আর কেউ পাবে না।
সাধু টমাস ও অন্যান্য মধ্যযুগীয় দার্শনিকগণ ষোড়শ, সপ্তাদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রাকৃতিক নিয়মের প্রত্যয়ের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের জনক গ্লোশিয়াস প্রাকৃতিক নিয়মজাত ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক আইন-ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি তাঁর ধারণাগুলোরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য; যদিও উনবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের আইনের ওপর প্রাকৃতিক নিয়মের প্রভাব পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলোর তুলনায় বেশ কমে এসেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের পর আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে ভিন্ন আর সব যুদ্ধকে বে-আইনী ঘোষণা করার মধ্যে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের ক্রম-বিবর্তনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের নীতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আর ইসলামী আইন-ব্যবস্থায় এ নীতি একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। আইন-ব্যবস্থাই ধর্মীয় উদ্দেশ্য সাধনের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, আর ধর্ম আইনকে জানিয়েছে সমর্থন।
মুসলিম আইন-ব্যবস্থা অনুসারে ইসলাম এবং শিরক এক সঙ্গে পাশাপাশি বাস করতে পারে না। আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই যে কেবল ইমাম ও প্রত্যেকটি মুমিনের কর্তব্য তাই নয়, অমুসলিমগণও যাতে করে আল্লাহকে অস্বীকার না করে বা তাঁর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ না হয়, সেটা লক্ষ্য করাও তাঁদের কর্তব্য। জেহাদের মধ্যে তাই বহু ঈশ্বরবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্যায়ের শাস্তি-বিধানের জন্যও বিশেষ কারণে ইসলামে জেহাদের ভূমিকা রয়েছে। মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। এর ওপরেই নির্ভর করে আল্লাহর বাণীর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও তার রাষ্ট্রনৈতিক প্রাধান্য।
জেহাদ: স্থায়ী যুদ্ধ
ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যে আরব দেশে যুদ্ধের প্রচলন হয়েছে, এ কথা ঠিক নয়। আরবদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। এসব যুদ্ধ ছিল নিতান্ত গোষ্ঠীগত। এর প্রকৃতি নির্ভর করত তদানীন্তন সমাজব্যবস্থার বিশেষত্বের ওপর। যুদ্ধ সম্পর্কীয় নিয়ম-কানুন সামাজিক আচার বা ঐতিহ্যগত সুন্নার ভেতরেই সুসংবদ্ধ ছিল। গোষ্ঠীই ছিল রাজনীতির মূল কাঠামো। যুদ্ধ ছিল আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর দস্যুবৃত্তি বা প্রতিশোধ গ্রহণের মধ্য দিয়েই ছিল তার প্রকাশ। ইবনে খালদুন বলেন, যুদ্ধের পরিবেশে আরবদের মধ্যে স্বাবলম্বন, সাহসিকতা ও গোষ্ঠীগত সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এসব গুণই আবার যুদ্ধ-পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে ও অনিশ্চিত বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করে। করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রায়ই দুশমনদের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছে। আর সবসময় ইচ্ছামত সুবিধাজনক চুক্তি সম্পাদন করাও সম্ভব হয় নি। কাজেই আইনবিদগণ এমনভাবে আইনের পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে করে সাময়িকভাবে হলেও জেহাদের নীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে তাঁরা ঐক্যমতে পৌঁছেছেন বলেই মনে হয়। যখন মুসলিম শক্তির পতন ঘনিয়ে এল, তখন মুসলিম আইনবেত্তাগণ একথা একরকম ধরে নিলেন যে, স্থায়ী সংগ্রাম হিসেবে জেহাদ মুসলিম- স্বার্থের পরিপন্থী। যুদ্ধ হিসেবে জেহাদের প্রত্যক্ষ ধারণার মধ্যেও কতকগুলো রদ-বদল হল। এ পরিবর্তন দ্বারা অবশ্য জেহাদের মূলনীতিতে কোন পরিবর্তন আসে নি। কিছুদিনের জন্য জেহাদের কর্তব্য স্থগিত থাকবে মাত্র। ইমাম প্রয়োজনবোধে যে কোন সময়ে এ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিবর্তন সাধন করে জেহাদের নীতিকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন। কার্যতঃ কিন্তু মুসলমানেরা এটাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে ধরে নিয়েছেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ফলেই জেহাদের নীতিকে যুদ্ধ থেকে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে পরিচালিত করা হল। হিজরী চতুর্থ শতকে (খৃস্টীয় দশম শতক) ইসলামের মননশীল ও দার্শনিক জাগরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ অবস্থার সৃষ্টি হল। তখন সীমান্তে বাইজান্টীয় হানা রোখবার চাইতেও যুক্তিবাদীদের বিতর্ক নিয়েই মুসলমানরা অধিক লিপ্ত ছিলেন। ইবনে খালদুন প্রমুখ মুসলিম চিন্তানায়কদের মতে জেহাদের নীতি শিথিল হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ-বহুল স্তর পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত সভ্য-স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়। কাজেই জেহাদের নীতির পরিবর্তন শুধু দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে জন্ম নেয় নি-ইসলামী রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সামাজিক পরিবেশের চাপেই এ বিবর্তন সম্ভব হল।
শিয়া ও খারেজী মতে জেহাদের নীতি
সাধারণভাবে একথা বলা যায় যে, শিয়াদের জেহাদ সম্পর্কীয় নীতি সুন্নীদের নীতি থেকে খুব বেশী পৃথক নয়। কিন্তু জেহাদের সঙ্গে "ওয়ালাইয়া” বা ইমামের প্রতি আনুগত্যের নীতি জড়িত থাকায় শিয়া মতবাদে জেহাদের নীতি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শিয়া-মতে অ-মুসলিম আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী-কেবল এ অজুহাতেই তার বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা চলবে। কোন মুসলমানও যদি ইমামের হুকুম তামিল না করেন, তবে তাকেও জেহাদের মারফত শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে। সুন্নীমতে যেমন জেহাদ বেহেশত লাভ করার সর্বোত্তম পন্থা, শিয়া-মতে তেমনি ইমামের প্রতি আনুগত্য ছাড়া জেহাদ পরিচালনা ইমান বা ধর্ম-বিশ্বাসের পরিপন্থী। আর ইমাম না থাকলে নাজাত বা মুক্তিলাভ করাও সম্ভব নয়।
ইমামতের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হল জেহাদ। জেহাদ পরিচালনার যোগ্যতাই ইমাম নিযুক্ত হবার গুণগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম। ইমাম যদি জেহাদের কর্তব্য পালন করতে না পারেন, তবে যায়দী-মতে ইমাম নিযুক্ত হবার সর্বোত্তম গুণ যে তাঁর মধ্যে নেই, একথা অবধারিত। একক অভ্রান্ত শাসক হিসেবে ইমামই কেবল নির্ধারণ করতে পারেন যে, কখন জেহাদ ঘোষণা করতে হবে আর কখন দুশমনদের সঙ্গে যুদ্ধে নামা অনুচিত। ইমাম যদি মনে করেন যে, দুশমনের সঙ্গে সমঝোতায় আসা প্রয়োজন, তবে তিনি তা করতে পারেন। এমনকি, পরাজয়ের গ্লানি থেকে রক্ষা পাবার জন্য তিনি অমুসলিম ও মুশরিকদের সাহায্যও নিতে পারেন। যদি শত্রুপক্ষ মুসলমানদের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়, তবে ইমামের পক্ষে কখনই যুদ্ধের ঝক্কি নেয়া সমীচীন হবে না।
ইমামের অন্তর্ধানের ফলে কিন্তু জেহাদের কর্তব্য অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মুজতাহিদরা জেহাদ ঘোষণা করতে পারেন কিনা, এ সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। যেহেতু বিশ্বাসীদের যুদ্ধে আহ্বান করা অভ্রান্ত বিচার ক্ষমতা সাপেক্ষ ও সমগ্র মুসলিম সমাজের স্বার্থ এর মধ্যে জড়িত রয়েছে, তাই কেবল ইমামই এ কর্তব্য সমাধা করতে পারেন। ইমামের অনুপস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ চালানোও অসম্ভব ব্যাপার। তাই এক্ষেত্রে জেহাদের ভূমিকা এক রকম অনুপস্থিত বললেই চলে। সুতরাং, শিয়া মযহাবের আইন-ব্যবস্থায় জেহাদ শক্তিহীন ও স্থগিত অবস্থায় রয়ে গেছে। সুন্নী-মতে যেমন মুসলিম শক্তির অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে জেহাদের পুনরুত্থান প্রয়োজন হয়ে পড়ে, শিয়া মতানুসারে ইমাম মেহদী হিসেবে 'গাইবা' বা অন্তর্লীন অবস্থা থেকে ইমামের প্রত্যাবর্তনের ওপরই জেহাদ-নীতির পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়। ইমামের কর্তব্য হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং ইনসাফ ও ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা করা।
আবার খারেজীরা বলেন যে, জেহাদ ইসলাম ধর্মের একটা মৌলিক নীতি। তাই এ নীতি বর্জন করা বা শিথিল করা কখনই সম্ভব নয়। শিয়া মযহাবের মতের সঙ্গে এ মতের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মতে জেহাদ হল ধর্মের ষষ্ঠ স্তম্ভ এবং প্রতিটি মুসলমান এবং সমগ্র সমাজের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। যাঁরা ইসলামের এ ব্যাখ্যা মেনে নেন না, তাঁদের খারেজীরা জোর করে এ মতবাদে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেন।
তাঁরা বলেন যে, রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যখন সারাজীবন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন বিশ্বাসী মুসলিমেরও কর্তব্য হবে জেহাদ করা। তাঁদের অটল ধর্মবিশ্বাস জেহাদের নীতি পালনে তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে রেখেছিল। রাষ্ট্র বলতে তাঁরা সামরিক রাষ্ট্র বোঝাতেন : এ ছিল এমন এক সমাজ, যা ইমামের কর্তৃত্বাধীনে ধর্মীয় দুশমনদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। যদি ইমাম জেহাদ পরিচালনা না করেন, তবু মুমিনকে জেহাদের কর্তব্য ব্যক্তিগতভাবে হলেও পালন করতে হবে। যদি মুমিন এ কর্তব্য সমাধা না করেন, তবে তিনি সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হলেন।
খারেজী মতে, জেহাদ হল এক হিংসাত্মক সংগ্রাম। সুন্নীদের মত হলো জেহাদ এখানে মত-বিরকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ, জেহাদ ছিল স্থায়ী যুদ্ধের পর্যায়ে। আরবের বাইরে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরেও অমুসলমানদের বিরুদ্ধে এ জেহাদ পরিচালিত হত। এর পেছনে অন্যান্য আরও অনেক কারণ ছিল। এগুলোই মুসলমানদের মনে একটা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিশনের মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল এবং বিজয়ী জাতি হিসেবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ন্ত্রিত করেছিল।
প্রথমে ইসলামের সার্বজনীন দিকটার কথাই বলতে হয়। ইসলাম ধর্ম ও আদর্শের প্রসারে সাহায্য করা হল প্রত্যেক সুস্থ সক্ষম মুসলমানের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। ইহুদী ধর্ম মিশনারী ধর্ম নয়। তাদের ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ধর্ম-যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল-ধর্ম বিস্তারের জন্য নয়। অন্যদিকে খৃষ্টান ধর্ম শুধু পরলোকে মুক্তি-বিধান নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং প্রথম দিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। রাজনীতির সঙ্গে এ ধর্ম যখন সংশ্লিষ্ট ছিল, তখনও চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদাই থাকে। ইসলাম কিন্তু এ দুই ধর্মমত থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সার্বজনীন ধর্ম ও সার্বজনীন রাষ্ট্র-এ দুটোকে ইসলাম সম্মিলিত করে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইসলাম শান্তিপূর্ণ ও জেহাদী উভয় পন্থাই অবলম্বন করেছে। ইসলামের সার্বজনীনতা ইসলাম-জগতের সমগ্র মুসলমান সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করেছে। আর ইসলামের আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং জেহাদের নীতি সমগ্র বহির্বিশ্ব বা সমর-জগতের বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। দুনিয়ার সব জাতিকে মুসলমান করার উদ্দেশ্য সাধনে জেহাদকে ইসলামের হাতিয়ার বলে মনে করা যেতে পারে। জিম্মীদের যদি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নবুয়তে বিশ্বাসী করে তোলা না যায়, তবে অন্ততঃপক্ষে তাদের যাতে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী করে তোলা যায়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এক বর্ণনায় জানা যায় যে, রাসূলে করীম হযরত মুহম্মদ (সঃ) বলেছেন যে, আমার উম্মতের কোন কোন লোক সত্যের জন্য জেহাদ চালিয়ে যাবে এবং তাদের মধ্যে শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত বিজয়ী বেশে দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। সেদিন না আসা পর্যন্ত জেহাদ, কোন না কোন রকমে সমগ্র মুসলিম সমাজের কর্তব্য হয়ে থাকবে।
ইসলামী আইনে দারুল হারবের অস্তিত্ব বে-আইনী ব্যাপার বলে সাব্যস্ত হয়। যতদিন না দারুল হারব বিলুপ্ত হয়ে যায়, ততদিন দারুল ইসলাম জেহাদ চালিয়ে যাবে। কোন সম্প্রদায় যদি অমুসলিম রয়ে যায়, আর তারা যদি দারুল ইসলামে বসবাস করতে চায়, তবে তারা সাধারণ মুসলিম আইনের আওতায় আসতে বাধ্য থাকবে। সর্বাত্মক ও সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম সর্বক্ষণ বিশ্বাসীদের সামরিক না হোক, অন্ততঃ মানসিক ও রাজনৈতিক জেহাদের সবক দেয়।
জেহাদ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামপন্থীগণের সম্পর্ক নির্ণয়ের স্থায়ী নীতি। কিন্তু এর অর্থ মোটেই এই নয় যে, সব সময়ে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। হিংসাত্মক পন্থা ছাড়াও জেহাদের কর্তব্য শুধু যে পালন করা সম্ভব হয়েছে তাই নয়, দুশমনদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে অবিরাম সংগ্রামের পন্থা অনুসৃত হয় নি। তাই জেহাদকে সংগ্রাম নীতি বলা যায়, অবিরত যুদ্ধ-নীতি নয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, জেহাদের প্রস্তুতি জেহাদের কর্তব্য পালনেরই শামিল। অবশ্য রাষ্ট্রকে সব সময়ে সামরিক দিক দিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে করে কেবল যে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় তা নয়, খলিফা প্রয়োজন মনে করলে আক্রমণের ভূমিকাও যেন গ্রহণ করা যায়।
কার্যতঃ দেখা যায় যে, পরিবর্তিত পরিবেশে জেহাদের ভূমিকা বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রায়ই দুশমনদের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছে। আর সবসময় ইচ্ছামত সুবিধাজনক চুক্তি সম্পাদন করাও সম্ভব হয় নি। কাজেই আইনবিদগণ এমনভাবে আইনের পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে করে সাময়িকভাবে হলেও জেহাদের নীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে তাঁরা ঐক্যমতে পৌঁছেছেন বলেই মনে হয়। যখন মুসলিম শক্তির পতন ঘনিয়ে এল, তখন মুসলিম আইনবেত্তাগণ একথা একরকম ধরে নিলেন যে, স্থায়ী সংগ্রাম হিসেবে জেহাদ মুসলিম- স্বার্থের পরিপন্থী। যুদ্ধ হিসেবে জেহাদের প্রত্যক্ষ ধারণার মধ্যেও কতকগুলো রদ-বদল হল। এ পরিবর্তন দ্বারা অবশ্য জেহাদের মূলনীতিতে কোন পরিবর্তন আসে নি। কিছুদিনের জন্য জেহাদের কর্তব্য স্থগিত থাকবে মাত্র। ইমাম প্রয়োজনবোধে যে কোন সময়ে এ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিবর্তন সাধন করে জেহাদের নীতিকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন। কার্যতঃ কিন্তু মুসলমানেরা এটাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে ধরে নিয়েছেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ফলেই জেহাদের নীতিকে যুদ্ধ থেকে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে পরিচালিত করা হল। হিজরী চতুর্থ শতকে (খৃস্টীয় দশম শতক) ইসলামের মননশীল ও দার্শনিক জাগরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ অবস্থার সৃষ্টি হল। তখন সীমান্তে বাইজান্টীয় হানা রোখবার চাইতেও যুক্তিবাদীদের বিতর্ক নিয়েই মুসলমানরা অধিক লিপ্ত ছিলেন। ইবনে খালদুন প্রমুখ মুসলিম চিন্তানায়কদের মতে জেহাদের নীতি শিথিল হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ-বহুল স্তর পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত সভ্য-স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়। কাজেই জেহাদের নীতির পরিবর্তন শুধু দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে জন্ম নেয় নি-ইসলাম
ইসলামী জেহাদের মূল্য হল এই যে, তা গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিকে গোষ্ঠীগত কোন্দল থেকে বহির্বিশ্বের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর পথে (সত্যের তাগিদে) জেহাদ ছাড়া আর সব রকমের যুদ্ধ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। জেহাদের এই নীতি ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে বেঁচে থাকাই ছিল খুব কঠিন। গোষ্ঠীগত আক্রমণের স্থান দখল করলো জেহাদের নীতি। অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষে যে শক্তির অপচয় হত, তা এখন জাতীয় ঐক্যসাধন ও নতুন ধর্মের তাগিদে বহির্বিশ্বের সঙ্গে জেহাদে নিয়োজিত হতে লাগল।
জেহাদকে তাই হিংসাত্মক ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেয়া চলে না। ইসলাম জেহাদকে মাইন ও ধর্মের আওতায় নিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে অনেকগুলো জটিল শক্তি এর পেছনে কাজ করেছে। কোন কোন লেখক আরব দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর বেশী জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে আরবদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা ঘনীভূত হতে থাকে এবং আরব দেশের বাইরে উর্বর জমির সন্ধানে তারা বেরিয়ে পড়ে। আরব উপদ্বীপ থেকে বাইরের দুনিয়ার দিকে ধাবিত হবার কারণ হিসেবে এ থিয়োরীটা আপাতঃদৃষ্টিতে যতটা সত্য বলে মনে হয়, আসলে এটা জেহাদের প্রকৃতিকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ, জেহাদ ছিল স্থায়ী যুদ্ধের পর্যায়ে। আরবের বাইরে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরেও অমুসলমানদের বিরুদ্ধে এ জেহাদ পরিচালিত হত। এর পেছনে অন্যান্য আরও অনেক কারণ ছিল। এগুলোই মুসলমানদের মনে একটা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিশনের মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল এবং বিজয়ী জাতি হিসেবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ন্ত্রিত করেছিল।
প্রথমে ইসলামের সার্বজনীন দিকটার কথাই বলতে হয়। ইসলাম ধর্ম ও আদর্শের প্রসারে সাহায্য করা হল প্রত্যেক সুস্থ সক্ষম মুসলমানের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। ইহুদী ধর্ম মিশনারী ধর্ম নয়। তাদের ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই ধর্ম-যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল-ধর্ম বিস্তারের জন্য নয়। অন্যদিকে খৃষ্টান ধর্ম শুধু পরলোকে মুক্তি-বিধান নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং প্রথম দিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। রাজনীতির সঙ্গে এ ধর্ম যখন সংশ্লিষ্ট ছিল, তখনও চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদাই থাকে। ইসলাম কিন্তু এ দুই ধর্মমত থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সার্বজনীন ধর্ম ও সার্বজনীন রাষ্ট্র-এ দুটোকে ইসলাম সম্মিলিত করে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইসলাম শান্তিপূর্ণ ও জেহাদী উভয় পন্থাই অবলম্বন করেছে। ইসলামের সার্বজনীনতা ইসলাম-জগতের সমগ্র মুসলমান সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করেছে। আর ইসলামের আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং জেহাদের নীতি সমগ্র বহির্বিশ্ব বা সমর-জগতের বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। দুনিয়ার সব জাতিকে মুসলমান করার উদ্দেশ্য সাধনে জেহাদকে ইসলামের হাতিয়ার বলে মনে করা যেতে পারে। জিম্মীদের যদি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নবুয়তে বিশ্বাসী করে তোলা না যায়, তবে অন্ততঃপক্ষে তাদের যাতে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী করে তোলা যায়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এক বর্ণনায় জানা যায় যে, রাসূলে করীম হযরত মুহম্মদ (সঃ) বলেছেন যে, আমার উম্মতের কোন কোন লোক সত্যের জন্য জেহাদ চালিয়ে যাবে এবং তাদের মধ্যে শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত বিজয়ী বেশে দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। সেদিন না আসা পর্যন্ত জেহাদ, কোন না কোন রকমে সমগ্র মুসলিম সমাজের কর্তব্য হয়ে থাকবে।
ইসলামী আইনে দারুল হারবের অস্তিত্ব বে-আইনী ব্যাপার বলে সাব্যস্ত হয়। যতদিন না দারুল হারব বিলুপ্ত হয়ে যায়, ততদিন দারুল ইসলাম জেহাদ চালিয়ে যাবে। কোন সম্প্রদায় যদি অমুসলিম রয়ে যায়, আর তারা যদি দারুল ইসলামে বসবাস করতে চায়, তবে তারা সাধারণ মুসলিম আইনের আওতায় আসতে বাধ্য থাকবে। সর্বাত্মক ও সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম সর্বক্ষণ বিশ্বাসীদের সামরিক না হোক, অন্ততঃ মানসিক ও রাজনৈতিক জেহাদের সবক দেয়।
জেহাদ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামপন্থীগণের সম্পর্ক নির্ণয়ের স্থায়ী নীতি। কিন্তু এর অর্থ মোটেই এই নয় যে, সব সময়ে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। হিংসাত্মক পন্থা ছাড়াও জেহাদের কর্তব্য শুধু যে পালন করা সম্ভব হয়েছে তাই নয়, দুশমনদের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে অবিরাম সংগ্রামের পন্থা অনুসৃত হয় নি। তাই জেহাদকে সংগ্রাম নীতি বলা যায়, অবিরত যুদ্ধ-নীতি নয়। কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, জেহাদের প্রস্তুতি জেহাদের কর্তব্য পালনেরই শামিল। অবশ্য রাষ্ট্রকে সব সময়ে সামরিক দিক দিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে করে কেবল যে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় তা নয়, খলিফা প্রয়োজন মনে করলে আক্রমণের ভূমিকাও যেন গ্রহণ করা যায়।
কার্যতঃ দেখা যায় যে, পরিবর্তিত পরিবেশে জেহাদের ভূমিকা বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রায়ই দুশমনদের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছে। আর সবসময় ইচ্ছামত সুবিধাজনক চুক্তি সম্পাদন করাও সম্ভব হয় নি। কাজেই আইনবিদগণ এমনভাবে আইনের পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে করে সাময়িকভাবে হলেও জেহাদের নীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে তাঁরাোধ বা ধর্মীয় প্রচারের ব্যাপার নয়। তাঁরা বলেন যে, সত্যিকার ইমান দৃঢ়প্রত্যয়-নির্ভর। আর এ বিশ্বাস যাদের নেই, তাদের ওপর জেহাদ চাপিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ধর্মান্ধ খারেজীরা যুদ্ধে যেমন কঠোর ও নৃশংস ছিল, তেমনি মরুভূমিতে তাদের গোষ্ঠীগত জীবনে ধর্মের মানবীয় ও নৈতিক আবেদন ছিল নিতান্ত সামান্য। যুদ্ধের সময় তারা নির্বিবাদে নারী ও শিশু হত্যা করত এবং যুদ্ধবন্ধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করত। এ নিয়ম অবশ্য সব সময়ে পালন করা হত না। তবু নাফী ইবনে আল-আযরাকের (হিজরী ৬৮৬) দলের চরমপন্থী খারেজীগণ বলেন যে, এ কীর্তি সর্বদা বাস্তবায়িত করা উচিত।
জেহাদ ও সাধারণ যুদ্ধে পার্থক্য
মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম জেহাদ ছাড়া আর সর্বপ্রকার যুদ্ধেরই অবসান ঘটিয়েছে। যে সংগ্রামের পেছনে বিশেষ ধর্মীয় উদ্দেশ্য রয়েছে এবং আল্লাহর আইনের রূপায়ণ ও তার বরখেলাপ দূর করার জন্য যে যুদ্ধ, কেবল তাই যথার্থ বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের মধ্যে বা বাইরে এ ভিন্ন আর কোন রকমের যুদ্ধ অনুমোদিত হতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে অবশ্য দেখা যায় যে, মুসলিম শাসক ও ক্ষমতাশালী বিভিন্ন দলের সংঘ-সংগ্রাম বাইরের দুশমনদের সংঘ-সংগ্রামের মতোই অবিরত লেগেই ছিল। "বিদাত” দূরীকরণ ও ধর্ম-পরিত্যাগকারীদের শাস্তি বিধানের জন্য বার বার জেহাদের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। সিংহাসন লাভের জন্য বা বড় বড় রাজনৈতিক পদের লোভে বিরোধীদলের নেতাদের নির্লজ্জভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। খলিফার সম্মান ও প্রতিপত্তি যখন ক্ষীণ হয়ে এল, তখন স্থানীয় শাসকদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অবমাননা ও বিরোধিতা করাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল। ফলে ক্ষমতার ভীষণ লড়াই চলল এবং ইসলামী জগতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দিল। তদানীন্তন বাস্তব পরিবেশ উপেক্ষা করে আইনবিদগণ অবশ্য আল-মাওয়ার্দীর মতবাদ অনুসরণ করে বলতে চেয়েছেন যে, 'খলিফাই' সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর এ ক্ষমতা নাচক করে দেবার ক্ষমতা কারো নেই। গলিফা যদি অত্যাচারী হন, তবুও এ কথা প্রযোজ্য। কারণ, অরাজকতার চাইতে অত্যাচারী শাসক শতগুণে শ্রেয়ঃ। এ প্রকার ব্যাখ্যা তখনকার দিনের ভয়াবহ অরাজকতার পরিচায়ক।
ী রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সামাজিক পরিবেশের চাপেই এ বিবর্তন সম্ভব হল।
শিয়া ও খারেজী মতে জেহাদের নীতি
সাধারণভাবে একথা বলা যায় যে, শিয়াদের জেহাদ সম্পর্কীয় নীতি সুন্নীদের নীতি থেকে খুব বেশী পৃথক নয়। কিন্তু জেহাদের সঙ্গে "ওয়ালাইয়া” বা ইমামের প্রতি আনুগত্যের নীতি জড়িত থাকায় শিয়া মতবাদে জেহাদের নীতি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শিয়া-মতে অ-মুসলিম আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী-কেবল এ অজুহাতেই তার বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা চলবে। কোন মুসলমানও যদি ইমামের হুকুম তামিল না করেন, তবে তাকেও জেহাদের মারফত শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে। সুন্নীমতে যেমন জেহাদ বেহেশত লাভ করার সর্বোত্তম পন্থা, শিয়া-মতে তেমনি ইমামের প্রতি আনুগত্য ছাড়া জেহাদ পরিচালনা ইমান বা ধর্ম-বিশ্বাসের পরিপন্থী। আর ইমাম না থাকলে নাজাত বা মুক্তিলাভ করাও সম্ভব নয়।
ইমামতের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হল জেহাদ। জেহাদ পরিচালনার যোগ্যতাই ইমাম নিযুক্ত হবার গুণগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম। ইমাম যদি জেহাদের কর্তব্য পালন করতে না পারেন, তবে যায়দী-মতে ইমাম নিযুক্ত হবার সর্বোত্তম গুণ যে তাঁর মধ্যে নেই, একথা অবধারিত। একক অভ্রান্ত শাসক হিসেবে ইমামই কেবল নির্ধারণ করতে পারেন যে, কখন জেহাদ ঘোষণা করতে হবে আর কখন দুশমনদের সঙ্গে যুদ্ধে নামা অনুচিত। ইমাম যদি মনে করেন যে, দুশমনের সঙ্গে সমঝোতায় আসা প্রয়োজন, তবে তিনি তা করতে পারেন। এমনকি, পরাজয়ের গ্লানি থেকে রক্ষা পাবার জন্য তিনি অমুসলিম ও মুশরিকদের সাহায্যও নিতে পারেন। যদি শত্রুপক্ষ মুসলমানদের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়, তবে ইমামের পক্ষে কখনই যুদ্ধের ঝক্কি নেয়া সমীচীন হবে না।
ইমামের অন্তর্ধানের ফলে কিন্তু জেহাদের কর্তব্য অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মুজতাহিদরা জেহাদ ঘোষণা করতে পারেন কিনা, এ সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। যেহেতু বিশ্বাসীদের যুদ্ধে আহ্বান করা অভ্রান্ত বিচার ক্ষমতা সাপেক্ষ ও সমগ্র মুসলিম সমাজের ঐক্যমতে পৌঁছেছেন বলেই মনে হয়। যখন মুসলিম শক্তির পতন ঘনিয়ে এল, তখন মুসলিম আইনবেত্তাগণ একথা একরকম ধরে নিলেন যে, স্থায়ী সংগ্রাম হিসেবে জেহাদ মুসলিম- স্বার্থের পরিপন্থী। যুদ্ধ হিসেবে জেহাদের প্রত্যক্ষ ধারণার মধ্যেও কতকগুলো রদ-বদল হল। এ পরিবর্তন দ্বারা অবশ্য জেহাদের মূলনীতিতে কোন পরিবর্তন আসে নি। কিছুদিনের জন্য জেহাদের কর্তব্য স্থগিত থাকবে মাত্র। ইমাম প্রয়োজনবোধে যে কোন সময়ে এ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিবর্তন সাধন করে জেহাদের নীতিকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন। কার্যতঃ কিন্তু মুসলমানেরা এটাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে ধরে নিয়েছেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ফলেই জেহাদের নীতিকে যুদ্ধ থেকে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে পরিচালিত করা হল। হিজরী চতুর্থ শতকে (খৃস্টীয় দশম শতক) ইসলামের মননশীল ও দার্শনিক জাগরণের সঙ্গে সঙ্গেই এ অবস্থার সৃষ্টি হল। তখন সীমান্তে বাইজান্টীয় হানা রোখবার চাইতেও যুক্তিবাদীদের বিতর্ক নিয়েই মুসলমানরা অধিক লিপ্ত ছিলেন। ইবনে খালদুন প্রমুখ মুসলিম চিন্তানায়কদের মতে জেহাদের নীতি শিথিল হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ-বহুল স্তর পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত সভ্য-স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়। কাজেই জেহাদের নীতির পরিবর্তন শুধু দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে জন্ম নেয় নি-ইসলামী রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সামাজিক পরিবেশের চাপেই এ বিবর্তন সম্ভব হল।
শিয়া ও খারেজী মতে জেহাদের নীতি
সাধারণভাবে একথা বলা যায় যে, শিয়াদের জেহাদ সম্পর্কীয় নীতি সুন্নীদের নীতি থেকে খুব বেশী পৃথক নয়। কিন্তু জেহাদের সঙ্গে "ওয়ালাইয়া” বা ইমামের প্রতি আনুগত্যের নীতি জড়িত থাকায় শিয়া মতবাদে জেহাদের নীতি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শিয়া-মতে অ-মুসলিম আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী-কেবল এ অজুহাতেই তার বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা চলবে। কোন মুসলমানও যদি ইমামের হুকুম তামিল না করেন, তবে তাকেও জেহাদের মারফত শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে। সুন্নীমতদানীন্তন অবস্থার কথা চিন্তা করে কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, ইসলামী সমাজে জেহাদ ছাড়া অন্য প্রকারের যুদ্ধও বার বার সংঘটিত হয়েছে। ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে জেহাদের কথা অনেকটা বাদ দিয়েই তাঁরা বলেছেন যে, যুদ্ধের বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য মুসলিম শাসকদের সব সময়েই সচেষ্ট হওয়া উচিত। আল-তুর তুশী (মৃত্যু ৫২০ হিজরী) যুদ্ধের দুর্যোগকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বলে বর্ণনা করেন। আর আল-হাসান ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে সামাজিক ব্যাধির সঙ্গে তুলনা করেছেন। উভয় লেখকই যুদ্ধের রীতি-নীতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা পেশ করেছেন এবং শাসকদের এই উপদেশ দিয়েছেন যে, যদি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব না হয়, তবে যুদ্ধ-জয়ের সর্বোত্তম পন্থা হল সামরিক দিকে সুষ্ঠুভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকা। অতীতের রোমান লেখকদের মত মুসলিম আইনবিদরাও একথা দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি বজায় রাখার জন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
ইবনে খালদুনই (খৃস্টীয় ১৩৩২-১৪০৬) বোধহয় সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে, “যুদ্ধ সামাজিক দুর্যোগ-” পূর্ববর্তী মুসলিম চিন্তানায়কদের এ মতবাদ যথার্থ নয়। তিনি বলেন যে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানব-সমাজে যুদ্ধ চলে আসছে। মানুষের মধ্যে প্রতিশোধ নেবার আকাংখা বিদ্যমান থাকায় সমাজে যুদ্ধ স্থায়ী আসন পেতেছে। অর্থাৎ, মানুষ স্বভাবতঃ যুদ্ধবাজ। স্বার্থের খাতিরে বা হিংসা-ক্রোধ চরিতার্থ করার জন্য বা (খোদার দৃষ্টিতে) অপরাধ খণ্ডনের জন্য মানুষ যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়। এসব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এক গোষ্ঠী বা জাতি অন্য জাতির বিরুদ্ধে জমায়েত হয়। ফলে যুদ্ধ হয়ে পড়ে অনিবার্য।
ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ চার রকমের। প্রথমতঃ গোষ্ঠীগত যুদ্ধ। আরবদের মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধ প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়তঃ আদিম মানুষের হানাহানি ও হামলা। তৃতীয়তঃ শরিয়ত-অনুমোদিত যুদ্ধ ও জেহাদ। চতুর্থতঃ বিদ্রোহী ও বিভ্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইবনে খালদুন বলেন যে, প্রথম দু'রকমের যুদ্ধ আইন-অনুমোদিত নয়। তাই এ ধরনের যুদ্ধ যথাযথ বলে গণ্য হয় না। বাকী দু'রকমের যুদ্ধকে ন্যায়সম্মত যুদ্ধ (আদল) বলে মনে করা হয়েছে।
তুর তুশীর মত ইবনে খালদুন এমত পোষণ করতেন না যে, সামরিক প্রস্তুতির ওপরেই কেবল যুদ্ধ-জয় নির্ভর করে। অস্ত্র-শস্ত্র ও যুদ্ধের সরঞ্জাম ছাড়াও যুদ্ধ-জয়ের অনেক গভীরতর কারণ রয়েছে। এ গুলোকে তিনি আল আসবাব আল খাফিয়া বা সুপ্ত কারণরূপে অভিহিত করেন। যুদ্ধে সৈন্যদের মনোবল প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু তাঁর মতে মনোবল আর গুপ্ত কারণ এক জিনিস নয়। যুদ্ধে জয়লাভের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও কলা-কৌশলকেই তিনি গুপ্ত কারণ বলে মনে করতেন। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। উঁচু জমি থেকে যদি আক্রমণ শুরু করা যায়, তবে যুদ্ধ পরিচালনায় বিশেষ সুবিধা হয়। প্রতারণামূলক রণ-কৌশলেও শত্রুপক্ষ সহজেই প্রতারিত হয়।
বিশেষ লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে ইবনে খালদুন অবধি মুসলিম চিন্তানায়কগণ সাধারণ যুদ্ধকে সব সময়েই অসংগত বলে মনে করেছেন। ধর্মীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা ভিন্ন আর সব যুদ্ধই আল্লাহর আইনে নিষিদ্ধ হয়েছে। কাজেই সাধারণ যুদ্ধ আল্লাহর আইনের পরিপন্থী ছিল। সামাজিক পরিবেশের সুষ্ঠু বিশ্লেষণের ফলে মুসলিম চিন্তানায়করা একথা বুঝতে পারলেন যে, ভ্রান্ত মানুষের পক্ষে সাধারণ যুদ্ধ এড়িয়ে চলা সহজ ব্যাপার নয়। আবার মুসলিম ইখওয়াতের বা ভ্রাতৃত্বের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্যও নবীর প্রেরণ বা হযরত উমর ফারুকের (রাঃ) মত ক্ষমতাশালী ও মর্যাদাবান খলিফারই প্রয়োজন ছিল। খলিফাগণ যখন রাসূলের সুন্না থেকে বিচ্যুত হলেন, তখন যুদ্ধ কেবল যে ধর্ম-যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকত, এমন নয়। বৈষয়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধি এসব যুদ্ধ মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যুদ্ধ বা হারব আর জেহাদ এক জিনিস নয়। মানবসমাজে যুদ্ধকে মানুষের তাচ্ছিল্য ও পাপের ফলে উদ্ভুত অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করা হত। ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে ব্যাধি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ মানুষের স্বভাবজাত। যুদ্ধ সর্বক্ষণ সংঘটিত হয়। তাই একে সামাজিক জীবনের চিরন্তন সাথী বলেই ধরা উচিত।
ইবনে খালদুন যে কেবল উত্তর আফ্রিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অবিরাম সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এ সিদ্ধান্তে পৌছেন, তা নয়। অন্যান্য জাতির ইতিহাস থেকেও তিনি তাঁর মাল-মশলা সংগ্রহ করেন। ইবনে খালদুনের সিদ্ধান্ত মানব সমাজ সম্পর্কে তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টিরই পরিচায়ক। তাঁর বিশ্লেষণের সত্যতা আধুনিক গবেষণায় ধরা পড়েছে। গবেষণার ফলে দেখা যায় যে, আদিম সমাজে মানুষ খুব বেশী যুদ্ধবাজ ছিল। শান্তিপূর্ণ অবস্থা তখন মোটেই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। স্যার হেনরী মেইন বলেন, "শান্তি স্থাপন করা মোটেই স্বাভাবিক, আদিম ও প্রাচীন ব্যাপার নয়-যুদ্ধই হল মানুষের স্বভাবিক প্রবৃত্তি।' খৃস্টান ধর্ম পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় নি। ইসলাম কিন্তু দুনিয়াতেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইসলামের পক্ষে ফের শান্তি প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও খোদায়ী সমাজ কায়েম করা সম্ভব হয় নি। বর্তমান মানুষের কাছে যুদ্ধ যেমন সমস্যাবহুল অবস্থার সৃষ্টি করে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছেও এ সমস্যা সমানভাবে প্রকট ছিল। তাঁরা ধর্মকে খুব সম্মানের চক্ষে দেখতেন ও ধর্মের ভিত্তিতে যুদ্ধ দমনের চেষ্টা করতেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মর্যাদা আমাদের কাছে ধর্মের সমতুল্য। আমরা যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে বদ্ধপরিকর।
📄 বিভিন্ন প্রকার জেহাদ
মুসলিম আইনবেত্তাগণ অমুসলিমের বিরুদ্ধে জেহাদ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জেহাদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। যে সব মুসলমান ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় বা ধর্মবিরোধী মতবাদ পোষণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও জেহাদ প্রয়োজন হতে পারে। এসব লোকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্পর্কে সব আইনবিদই মতৈক্যে পৌছেছেন। জেহাদের প্রকৃতি ও পরিসমাপ্তি সম্পর্কে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মতবিরোধের অবকাশ রয়েছে। আল-মাওয়ার্দী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন—প্রথমতঃ, ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে জেহাদ (আর-রিদ্দা); দ্বিতীয়তঃ, বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ (আলবাগী); তৃতীয়তঃ, মুসলিম-ভ্রাতৃত্ব থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গঠন (মহারিবুন)। অন্যান্য আইনবিদরা আর একটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন। তা হল আর-রিবাত বা সীমান্ত অঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণ। তা ছাড়াও আর এক রকমের জেহাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা হল কেতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ।
পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ
আল্লাহর উপর যারা ঈমান আনেনি, তাদের সঙ্গে কোন সমঝোতা বরদাশত করা হয় না। তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে, নতুবা যুদ্ধে নামতে হবে। আল-কোরআনের অনেক নির্দেশের মধ্যে রয়েছে: যেখানে পাও, পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। এটা হল মুসলমানদের কর্তব্য। তোমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যারা পৌত্তলিক, তাদের সঙ্গেও সংগ্রাম কর। যারা অবিশ্বাসী, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেই তাদের মাথায় আঘাত করে হত্যা কর। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রচার করেছেন : আমি পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত তারা আল্লাহ ভিন্ন আর কোন উপাস্য নেই, একথা ঘোষণা না করে। প্রায় সব আইনবিদই বলেছেন যে, পৌত্তলিকতা ও ইসলাম পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না। কারণ, পৌত্তলিকগণ আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেবতাদের মিশিয়ে ফেলে। অর্থাৎ তারা শিরক করে থাকে। তাই তাদেরকে যুদ্ধ ও ইসলামের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিতে হয়। অবশ্য কোন আইনবিদই পৌত্তলিকের সুষ্ঠু সংজ্ঞা দিতে পারে নি। তাঁরা পৌত্তলিকদের পর্যায় থেকে শুধু যে কিতাবী (যারা খোদায় বিশ্বাস করে; কিন্তু রাসূলে বিশ্বাসী নয়) স্বার্থ এর মধ্যে জড়িত রয়েছে, তাই কেবল ইমামই এ কর্তব্য সমাধা করতে পারেন। ইমামের অনুপস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ চালানোও অসম্ভব ব্যাপার। তাই এক্ষেত্রে জেহাদের ভূমিকা এক রকম অনুপস্থিত বললেই চলে। সুতরাং, শিয়া মযহাবের আইন-ব্যবস্থায় জেহাদ শক্তিহীন ও স্থগিত অবস্থায় রয়ে গেছে। সুন্নী-মতে যেমন মুসলিম শক্তির অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে জেহাদের পুনরুত্থান প্রয়োজন হয়ে পড়ে, শিয়া মতানুসারে ইমাম মেহদী হিসেবে 'গাইবা' বা অন্তর্লীন অবস্থা থেকে ইমামের প্রত্যাবর্তনের ওপরই জেহাদ-নীতির পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়। ইমামের কর্তব্য হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং ইনসাফ ও ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা করা।
আবার খারেজীরা বলেন যে, জেহাদ ইসলাম ধর্মের একটা মৌলিক নীতি। তাই এ নীতি বর্জন করা বা শিথিল করা কখনই সম্ভব নয়। শিয়া মযহাবের মতের সঙ্গে এ মতের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মতে জেহাদ হল ধর্মের ষষ্ঠ স্তম্ভ এবং প্রতিটি মুসলমান এবং সমগ্র সমাজের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। যাঁরা ইসলামের এ ব্যাখ্যা মেনে নেন না, তাঁদের খারেজীরা জোর করে এ মতবাদে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেন। তাঁরা বলেন যে, রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যখন সারাজীবন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন বিশ্বাসী মুসলিমেরও কর্তব্য হবে জেহাদ করা। তাঁদের অটল ধর্মবিশ্বাস জেহাদের নীতি পালনে তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে রেখেছিল। রাষ্ট্র বলতে তাঁরা সামরিক রাষ্ট্র বোঝাতেন : এ ছিল এমন এক সমাজ, যা ইমামের কর্তৃত্বাধীনে ধর্মীয় দুশমনদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। যদি ইমাম জেহাদ পরিচালনা না করেন, তবু মুমিনকে জেহাদের কর্তব্য ব্যক্তিগতভাবে হলেও পালন করতে হবে। যদি মুমিন এ কর্তব্য সমাধা না করেন, তবে তিনি সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হলেন।
খারেজী মতে, জেহাদ হল এক হিংসাত্মক সংগ্রাম। সুন্নীদের মত হলো জেহাদ এখানে মত-বিরোধ বা ধর্মীয় প্রচারের ব্যাপার নয়। তাঁরা বলেন যে, সত্যিকার ইমান দৃঢ়প্রত্যয়-নির্ভর। আর এ বিশ্বাস যাদের নেই, তাদের ওপর জেহাদ চাপিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ধর্মান্ধ খারেজীরা যুদ্ধে যেমন কঠোর ও নৃশংস ছিল, তেমনি মরুভূমিতে তাদের গোষ্ঠীগত জীবনে ধর্মের মানবীয় ও নৈতিক আবেদন ছিল নিতান্ত সামান্য। যুদ্ধের সময় তারা নির্বিবাদে নারী ও শিশু হত্যা করত এবং যুদ্ধবন্ধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করত। এ নিয়ম অবশ্য সব সময়ে পালন করা হত না। তবু নাফী ইবনে আল-আযরাকের (হিজরী ৬৮৬) দলের চরমপন্থী খারেজীগণ বলেন যে, এ কীর্তি সর্বদা বাস্তবায়িত করা উচিত।
জেহাদ ও সাধারণ যুদ্ধে পার্থক্য
মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম জেহাদ ছাড়া আর সর্বপ্রকার যুদ্ধেরই অবসান ঘটিয়েছে। যে সংগ্রামের পেছনে বিশেষ ধর্মীয় উদ্দেশ্য রয়েছে এবং আল্লাহর আইনের রূপায়ণ ও তার বরখেলাপ দূর করার জন্য যে যুদ্ধ, কেবল তাই যথার্থ বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের মধ্যে বা বাইরে এ ভিন্ন আর কোন রকমের যুদ্ধ অনুমোদিত হতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে অবশ্য দেখা যায় যে, মুসলিম শাসক ও ক্ষমতাশালী বিভিন্ন দলের সংঘ-সংগ্রাম বাইরের দুশমনদের সংঘ-সংগ্রামের মতোই অবিরত লেগেই ছিল। "বিদাত” দূরীকরণ ও ধর্ম-পরিত্যাগকারীদের শাস্তি বিধানের জন্য বার বার জেহাদের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। সিংহাসন লাভের জন্য বা বড় বড় রাজনৈতিক পদের লোভে বিরোধীদলের নেতাদের নির্লজ্জভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। খলিফার সম্মান ও প্রতিপত্তি যখন ক্ষীণ হয়ে এল, তখন স্থানীয় শাসকদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অবমাননা ও বিরোধিতা করাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল। ফলে ক্ষমতার ভীষণ লড়াই চলল এবং ইসলামী জগতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দিল। তদানীন্তন বাস্তব পরিবেশ উপেক্ষা করে আইনবিদগণ অবশ্য আল-মাওয়ার্দীর মতবাদ অনুসরণ করে বলতে চেয়েছেন যে, 'খলিফাই' সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর এ ক্ষমতা নাচক করে দেবার ক্ষমতা কারো নেই। গলিফা যদি অত্যাচারী হন, তবুও এ কথা প্রযোজ্য। কারণ, অরাজকতার চাইতে অত্যাচারী শাসক শতগুণে শ্রেয়ঃ। এ প্রকার ব্যাখ্যা তখনকার দিনের ভয়াবহ অরাজকতার পরিচায়ক।
তদানীন্তন অবস্থার কথা চিন্তা করে কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, ইসলামী সমাজে জেহাদ ছাড়া অন্য প্রকারের যুদ্ধও বার বার সংঘটিত হয়েছে। ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে জেহাদের কথা অনেকটা বাদ দিয়েই তাঁরা বলেছেন যে, যুদ্ধের বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য মুসলিম শাসকদের সব সময়েই সচেষ্ট হওয়া উচিত। আল-তুর তুশী (মৃত্যু ৫২০ হিজরী) যুদ্ধের দুর্যোগকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বলে বর্ণনা করেন। আর আল-হাসান ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে সামাজিক ব্যাধির সঙ্গে তুলনা করেছেন। উভয় লেখকই যুদ্ধের রীতি-নীতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা পেশ করেছেন এবং শাসকদের এই উপদেশ দিয়েছেন যে, যদি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব না হয়, তবে যুদ্ধ-জয়ের সর্বোত্তম পন্থা হল সামরিক দিকে সুষ্ঠুভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকা। অতীতের রোমান লেখকদের মত মুসলিম আইনবিদরাও একথা দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি বজায় রাখার জন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
ইবনে খালদুনই (খৃস্টীয় ১৩৩২-১৪০৬) বোধহয় সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে, “যুদ্ধ সামাজিক দুর্যোগ-” পূর্ববর্তী মুসলিম চিন্তানায়কদের এ মতবাদ যথার্থ নয়। তিনি বলেন যে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানব-সমাজে যুদ্ধ চলে আসছে। মানুষের মধ্যে প্রতিশোধ নেবার আকাংখা বিদ্যমান থাকায় সমাজে যুদ্ধ স্থায়ী আসন পেতেছে। অর্থাৎ, মানুষ স্বভাবতঃ যুদ্ধবাজ। স্বার্থের খাতিরে বা হিংসা-ক্রোধ চরিতার্থ করার জন্য বা (খোদার দৃষ্টিতে) অপরাধ খণ্ডনের জন্য মানুষ যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়। এসব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এক গোষ্ঠী বা জাতি অন্য জাতির বিরুদ্ধে জমায়েত হয়। ফলে যুদ্ধ হয়ে পড়ে অনিবার্য।
ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ চার রকমের। প্রথমতঃ গোষ্ঠীগত যুদ্ধ। আরবদের মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধ প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়তঃ আদিম মানুষের হানাহানি ও হামলা। তৃতীয়তঃ শরিয়ত-অনুমোদিত যুদ্ধ ও জেহাদ। চতুর্থতঃ বিদ্রোহী ও বিভ্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইবনে খালদুন বলেন যে, প্রথম দু'রকমের যুদ্ধ আইন-অনুমোদিত নয়। তাই এ ধরনের যুদ্ধ যথাযথ বলে গণ্য হয় না। বাকী দু'রকমের যুদ্ধকে ন্যায়সম্মত যুদ্ধ (আদল) বলে মনে করা হয়েছে।
তুর তুশীর মত ইবনে খালদুন এমত পোষণ করতেন না যে, সামরিক প্রস্তুতির ওপরেই কেবল যুদ্ধ-জয় নির্ভর করে। অস্ত্র-শস্ত্র ও যুদ্ধের সরঞ্জাম ছাড়াও যুদ্ধ-জয়ের অনেক গভীরতর কারণ রয়েছে। এ গুলোকে তিনি আল আসবাব আল খাফিয়া বা সুপ্ত কারণরূপে অভিহিত করেন। যুদ্ধে সৈন্যদের মনোবল প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু তাঁর মতে মনোবল আর গুপ্ত কারণ এক জিনিস নয়। যুদ্ধে জয়লাভের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও কলা-কৌশলকেই তিনিতে যেমন জেহাদ বেহেশত লাভ করার সর্বোত্তম পন্থা, শিয়া-মতে তেমনি ইমামের প্রতি আনুগত্য ছাড়া জেহাদ পরিচালনা ইমান বা ধর্ম-বিশ্বাসের পরিপন্থী। আর ইমাম না থাকলে নাজাত বা মুক্তিলাভ করাও সম্ভব নয়।
ইমামতের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হল জেহাদ। জেহাদ পরিচালনার যোগ্যতাই ইমাম নিযুক্ত হবার গুণগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম। ইমাম যদি জেহাদের কর্তব্য পালন করতে না পারেন, তবে যায়দী-মতে ইমাম নিযুক্ত হবার সর্বোত্তম গুণ যে তাঁর মধ্যে নেই, একথা অবধারিত। একক অভ্রান্ত শাসক হিসেবে ইমামই কেবল নির্ধারণ করতে পারেন যে, কখন জেহাদ ঘোষণা করতে হবে আর কখন দুশমনদের সঙ্গে যুদ্ধে নামা অনুচিত। ইমাম যদি মনে করেন যে, দুশমনের সঙ্গে সমঝোতায় আসা প্রয়োজন, তবে তিনি তা করতে পারেন। এমনকি, পরাজয়ের গ্লানি থেকে রক্ষা পাবার জন্য তিনি অমুসলিম ও মুশরিকদের সাহায্যও নিতে পারেন। যদি শত্রুপক্ষ মুসলমানদের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়, তবে ইমামের পক্ষে কখনই যুদ্ধের ঝক্কি নেয়া সমীচীন হবে না।
ইমামের অন্তর্ধানের ফলে কিন্তু জেহাদের কর্তব্য অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মুজতাহিদরা জেহাদ ঘোষণা করতে পারেন কিনা, এ সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। যেহেতু বিশ্বাসীদের যুদ্ধে আহ্বান করা অভ্রান্ত বিচার ক্ষমতা সাপেক্ষ ও সমগ্র মুসলিম সমাজের স্বার্থ এর মধ্যে জড়িত রয়েছে, তাই কেবল ইমামই এ কর্তব্য সমাধা করতে পারেন। ইমামের অনুপস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ চালানোও অসম্ভব ব্যাপার। তাই এক্ষেত্রে জেহাদের ভূমিকা এক রকম অনুপস্থিত বললেই চলে। সুতরাং, শিয়া মযহাবের আইন-ব্যবস্থায় জেহাদ শক্তিহীন ও স্থগিত অবস্থায় রয়ে গেছে। সুন্নী-মতে যেমন মুসলিম শক্তির অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে জেহাদের পুনরুত্থান প্রয়োজন হয়ে পড়ে, শিয়া মতানুসারে ইমাম মেহদী হিসেবে 'গাইবা' বা অন্তর্লীন অবস্থা থেকে ইমামের প্রত্যাবর্তনের ওপরই জেহাদ-নীতির পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়। ইমামের কর্তব্য হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং ইনসাফ ও ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠা করা।
আবার খারেজীরা বলেন যে, জেহাদ ইসলাম ধর্মের একটা মৌলিক নীতি। তাই এ নীতি বর্জন করা বা শিথিল করা কখনই সম্ভব নয়। শিয়া মযহাবের মতের সঙ্গে এ মতের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মতে জেহাদ হল ধর্মের ষষ্ঠ স্তম্ভ এবং প্রতিটি মুসলমান এবং সমগ্র সমাজের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। যাঁরা ইসলামের এ ব্যাখ্যা মেনে নেন না, তাঁদের খারেজীরা জোর করে এ মতবাদে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেন। তাঁরা বলেন যে, রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যখন সারাজীবন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তখন বিশ্বাসী মুসলিমেরও কর্তব্য হবে জেহাদ করা। তাঁদের অটল ধর্মবিশ্বাস জেহাদের নীতি পালনে তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে রেখেছিল। রাষ্ট্র বলতে তাঁরা সামরিক রাষ্ট্র বোঝাতেন : এ ছিল এমন এক সমাজ, যা ইমামের কর্তৃত্বাধীনে ধর্মীয় দুশমনদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ সংগ্রামের জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। যদি ইমাম জেহাদ পরিচালনা না করেন, তবু মুমিনকে জেহাদের কর্তব্য ব্যক্তিগতভাবে হলেও পালন করতে হবে। যদি মুমিন এ কর্তব্য সমাধা না করেন, তবে তিনি সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হলেন।
খারেজী মতে, জেহাদ হল এক হিংসাত্মক সংগ্রাম। সুন্নীদের মত হলো জেহাদ এখানে মত-বিরোধ বা ধর্মীয় প্রচারের ব্যাপার নয়। তাঁরা বলেন যে, সত্যিকার ইমান দৃঢ়প্রত্যয়-নির্ভর। আর এ বিশ্বাস যাদের নেই, তাদের ওপর জেহাদ চাপিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ধর্মান্ধ খারেজীরা যুদ্ধে যেমন কঠোর ও নৃশংস ছিল, তেমনি মরুভূমিতে তাদের গোষ্ঠীগত জীবনে ধর্মের মানবীয় ও নৈতিক আবেদন ছিল নিতান্ত সামান্য। যুদ্ধের সময় তারা নির্বিবাদে নারী ও শিশু হত্যা করত এবং যুদ্ধবন্ধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করত। এ নিয়ম অবশ্য সব সময়ে পালন করা হত না। তবু নাফী ইবনে আল-আযরাকের (হিজরী ৬৮৬) দলের চরমপন্থী খারেজীগণ বলেন যে, এ কীর্তি সর্বদা বাস্তবায়িত করা উচিত।
জেহাদ ও সাধারণ যুদ্ধে পার্থক্য
মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম জেহাদ ছাড়া আর সর্বপ্রকার যুদ্ধেরই অবসান ঘটিয়েছে। যে সংগ্রামের পেছনে বিশেষ ধর্মীয় উদ্দেশ্য রয়েছে এবং আল্লাহর আইনের রূপায়ণ ও তার বরখেলাপ দূর করার জন্য যে যুদ্ধ, কেবল তাই যথার্থ বলে বিবেচিত হতে পারে। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের মধ্যে বা বাইরে এ ভিন্ন আর কোন রকমের যুদ্ধ অনুমোদিত হতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে অবশ্য দেখা যায় যে, মুসলিম শাসক ও ক্ষমতাশালী বিভিন্ন দলের সংঘ-সংগ্রাম বাইরের দুশমনদের সংঘ-সংগ্রামের মতোই অবিরত লেগেই ছিল। "বিদাত” দূরীকরণ ও ধর্ম-পরিত্যাগকারীদের শাস্তি বিধানের জন্য বার বার জেহাদের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। সিংহাসন লাভের জন্য বা বড় বড় রাজনৈতিক পদের লোভে বিরোধীদলের নেতাদের নির্লজ্জভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। খলিফার সম্মান ও প্রতিপত্তি যখন ক্ষীণ হয়ে এল, তখন স্থানীয় শাসকদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অবমাননা ও বিরোধিতা করাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল। ফলে ক্ষমতার ভীষণ লড়াই চলল এবং ইসলামী জগতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দিল। তদানীন্তন বাস্তব পরিবেশ উপেক্ষা করে আইনবিদগণ অবশ্য আল-মাওয়ার্দীর মতবাদ অনুসরণ করে বলতে চেয়েছেন যে, 'খলিফাই' সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর এ ক্ষমতা নাচক করে দেবার ক্ষমতা কারো নেই। গলিফা যদি অত্যাচারী হন, তবুও এ কথা প্রযোজ্য। কারণ, অরাজকতার চাইতে অত্যাচারী শাসক শতগুণে শ্রেয়ঃ। এ প্রকার ব্যাখ্যা তখনকার দিনের ভয়াবহ অরাজকতার পরিচায়ক।
তদানীন্তন অবস্থার কথা চিন্তা করে কোন কোন আইনবিদ বলেন যে, ইসলামী সমাজে জেহাদ ছাড়া অন্য প্রকারের যুদ্ধও বার বার সংঘটিত হয়েছে। ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে জেহাদের কথা অনেকটা বাদ দিয়েই তাঁরা বলেছেন যে, যুদ্ধের বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য মুসলিম শাসকদের সব সময়েই সচেষ্ট হওয়া উচিত। আল-তুর তুশী (মৃত্যু ৫২০ হিজরী) যুদ্ধের দুর্যোগকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বলে বর্ণনা করেন। আর আল-হাসান ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে সামাজিক ব্যাধির সঙ্গে তুলনা করেছেন। উভয় লেখকই যুদ্ধের রীতি-নীতি সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা পেশ করেছেন এবং শাসকদের এই উপদেশ দিয়েছেন যে, যদি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব না হয়, তবে যুদ্ধ-জয়ের সর্বোত্তম পন্থা হল সামরিক দিকে সুষ্ঠুভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকা। অতীতের রোমান লেখকদের মত মুসলিম আইনবিদরাও একথা দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি বজায় রাখার জন্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
ইবনে খালদুনই (খৃস্টীয় ১৩৩২-১৪০৬) বোধহয় সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে, “যুদ্ধ সামাজিক দুর্যোগ-” পূর্ববর্তী মুসলিম চিন্তানায়কদের এ মতবাদ যথার্থ নয়। তিনি বলেন যে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানব-সমাজে যুদ্ধ চলে আসছে। মানুষের মধ্যে প্রতিশোধ নেবার আকাংখা বিদ্যমান থাকায় সমাজে যুদ্ধ স্থায়ী আসন পেতেছে। অর্থাৎ, মানুষ স্বভাবতঃ যুদ্ধবাজ। স্বার্থের খাতিরে বা হিংসা-ক্রোধ চরিতার্থ করার জন্য বা (খোদার দৃষ্টিতে) অপরাধ খণ্ডনের জন্য মানুষ যুদ্ধের তাদের বাদ দেন, তা নয়, ম্যাজীয় পন্থিগণকেও (জরথ্রুস্টপন্থিগণ) তাঁরা বাদ দেন। ম্যাজীয়দের খোদা-বিশ্বাস অনেকটা হেঁয়ালী। কিন্তু তাদের যে একটা ধর্মীয় কেতাব আছে, একথা বলা চলে। তাই মহান আল্লাহর ধারণা যাদের মধ্যে একেবারেই নেই, সেই প্যাগান মতবাদকেই কেবলমাত্র পৌত্তলিকতার পর্যায়ে ফেলা হয়। এ নীতি হেজাযে সর্বতোভাবে প্রয়োগ করা হয়। আরবের ইয়েমেন প্রভৃতি অঞ্চলে ইহুদীদের বসবাস করতে দেয়া হত। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলে বা কিতাবী না হলে আরব দেশের অভ্যন্তরে কাউকে অবস্থান করতে দেয়া হত না। নাজরানের খৃস্টানগণ নিরাপত্তা-সনদ লাভ করছিলেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর হযরত ওমরের (রাঃ) নির্দেশক্রমে তাঁরা সিরিয়া ও লেবাননে হিজরত করতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে এই নিয়ম শিখিল করা হয়। বর্তমানকালে কিতাবীদের পক্ষে শুধু মক্কা শরীফে বসবাস করা নিষিদ্ধ। আরব উপদ্বীপের বাইরে পৌত্তলিকতা একরকম ছিল না বললেই চলে। অবশ্য ইরানের জরথুষ্ট্রপন্থীদের মধ্যে এবং ইসলামী জগতের সুদূর প্রান্তে অবস্থিত এশিয়া ও আফ্রিকার প্যাগানদের মধ্যে ঘটেছে এর ব্যতিক্রম।
ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার বিরুদ্ধে জেহাদ
ধর্মত্যাগ দুই রকমের হতে পারে। (ক) যে মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, কিন্তু যার দারুল হারবে যাবার অভিপ্রায় নেই। (খ) কয়েকজন মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, দারুল হারবের নাগরিক হতে পারে কিংবা তারা মিলিত হয়ে পৃথক আবাসভূমি (দার) গঠন করতে পারে। জেহাদ সম্পর্কীয় বর্তমান আলোচনায় শেষোক্তটিই এসে পড়ে। প্রথমটি শান্তি সম্পর্কীয় আইনের বিষয়ভুক্ত। যথাস্থানে এলাকা সম্পর্কীয় পরিচ্ছেদে এ সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে।
যদি ধর্মদ্রোহীগণ সংখ্যায় খুব বেশী হয় ও তাদের মুসলিম রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বানচাল করার মত শক্তি থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা ইমামের অবশ্য কর্তব্য। আইনবিদগণ কিন্তু যুদ্ধের পূর্বে বোঝাপড়া করার দিকেই বেশী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেননা, তার ফলে হয়ত ধর্মদ্রোহীরা ইসলাম ধর্মে আবার ফিরে আসতেও পারে। এ ব্যাপারে শান্তি স্থাপন, শুল্ক গ্রহণ বা জিযিয়া গ্রহণ, কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ইসলামকে খারিজ করে দেয়া ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। ধর্মদ্রোহীরা হয় ইসলাম ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে, নতুবা জেহাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে। অবিশ্বাসীদের আগেই জানিয়ে দিতে হবে যে, শীঘ্রই জেহাদ শুরু হবে। একথা জানিয়ে দেয়া যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
ধর্মদ্রোহীরা যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অসম্মত হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়, তবে দারুল হারবের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে যে রীতি-নীতি প্রযোজ্য হয়, এখানে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। তারা বা তাদের সম্পত্তি অবিশ্বাসীদের আত্মসমর্পণের সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়বে না। তাদের বা তাদের স্ত্রীগণকে দাসে পরিণত করা যাবে না। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা বা যুদ্ধের মাল হিসেবে বণ্টন করে দেয়া চলবে না। যুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করবে, তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। অনেক হানাফী আইনবিদ বলেন যে, ধর্মদ্রোহী স্ত্রীকে সাবী বা দাসী হিসেবে গণ্য করতে হবে, যুদ্ধার্জিত বিষয় বলে মনে করতে হবে বা বিক্রয় করে দিতে হবে। ধর্মদ্রোহের পর যে সব সন্তান- সন্তুতি জন্মগ্রহণ করবে, তারাও সমগোত্রীয় বলে গণ্য হবে। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ এটা প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) মৃত্যুর পর আরবীয় গোষ্ঠীগুলোর মুসলিম কওম থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গ্রহণ করা ধর্মদ্রোহিতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এদের প্রথম ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে আহ্বান করেন। যারা তবু ফিরে আসল না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ এ জেহাদ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ধর্মদ্রোহীদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারা হয়। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যেই পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি উঠেছিল। ধর্মদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকেও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল-বালাযুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যারা পুনরায় ইসলাম কবুল করে, তারা ভিন্ন আর কেউ মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায় নি।
বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ
বিভেদ সৃষ্টি করার প্রয়াসের নামই হল 'বাগী' বা বিদ্রোহ। যদি বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ ইমামের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হত না ও তাদের দারুল ইসলামে শান্তিতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হত। অবশ্য ইমাম তাদের বিভেদমূলক ধারণাগুলো বর্জন করতে ও প্রচলিত মতবাদ মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করবেন। তারা যদি এতে রাজী না থাকে ও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে অস্বীকৃত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। কতকগুলো অভিযোগ ও দাবী-দাওয়া যদি বিরোধের কারণ হয়ে থাকে ও ধর্মের মূলনীতির সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক না থাকে, (যেমন, প্রাদেশিক শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) তবে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি বিভেদকারীগণ সংখ্যায় খুব অল্প হয়, তবে তাদের শায়েস্তা করা মোটেই কঠিন হবে না। খারেজীরা এর এক দৃষ্টান্ত। খলিফা হযতর আলীর (রাঃ) সাথে যখন তাদের মতবিরোধ হল, তখন তাদের এ তিনটি ব্যাপারে বিশেষ ঔদার্য দেখান হয় : মসজিদে নামাজ পড়তে তাদের অনুমতি দেয়া হয়, খলিফা কর্তৃক আক্রমণ থেকেও তারা রেহাই পেল। তাছাড়া তাদের দারুল ইসলামে বসবাস করতেও অনুমতি দেয়া হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা খলিফাকে আক্রমণ করে বসল, অমনি খলিফা হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে ধাবিত হলেন; আন-নাহরোওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৮ খৃস্টাব্দ) তাদের শক্তি নস্যাৎ করে দিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইমামকে মুসলিম জনমত সমর্থন করতে চাইত না, যিনি নিজেই আইনের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ক্রমশঃ এ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন যে, ইমামের বিরুদ্ধে কোন রকম বিদ্রোহই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম যদি ভুলও করে বসেন, তবু তাঁর কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতেই হবে, এ মতবাদই তাঁরা পোষণ করতেন। আশারীপন্থী চিন্তানায়কগণ ও পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত সুন্নী আইনবিদগণ সর্বপ্রকার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ইমামের কর্তৃত্বকেই সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, বিদ্রোহ "স্বৈরাচারের" চাইতে অনেক বেশী নিন্দনীয়। তাঁদের মতে নতুন ইমামের প্রতি একবার "বাইয়া" বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার পর তা ফিরিয়ে নেবার আর কোন আইনগত পন্থা নেই। কারণ আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারেই বিশ্বাসী মুসলমানকে "আল্লাহ এবং রসূলের ও তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নিযুক্ত ইমামের কর্তৃত্ব"কে মেনে নিতে হবে। যদি ইমামের সঙ্গে মুসলমানদের কোন বিষয়ে মতবিরোধ উপস্থিত হয়, তবে তা "তোমরা যদি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হও, তবে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ছেড়ে দাও” (অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও রাসূল প্রদত্ত কার্যবিধির আলোকে তার মীমাংসা কর)। কিন্তু রাসূলের অনুপস্থিতিতে আইন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইমামই রাসূলের স্থান দখল করেন। তাই রাষ্ট্রে কার্যতঃ ইমামই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য তিনি জেহাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিদ্রোহ বিভেদেরই নামান্তর মাত্র—ইমামের কর্তৃত্ব বিদ্রোহের দ্বারা বানচাল হয়ে যায়। ইমামতের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ও তাঁর অধীনস্থ নাগরিকদের বিভেদকারীদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে কোনও উপায় নেই।
পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ
মুসলিম সমাজ-পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের কার্যকলাপ বড় রকমের চৌর্য-বৃত্তি বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে নিম্নলিখিত আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে:
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও দুনিয়ায় গোলমাল-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এভাবে দুনিয়াতে তারা অপমানিত হবে ও আখেরাতেও তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে।" (৫: ৩৭)।
আল-কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতেই আইনবিদগণ সমাজ পরিত্যাগ করা ও সড়কী দস্যুদের ইমাম কর্তৃক শাস্তি বিধানের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। কিন্তু শাস্তির মাত্রা সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ তাদের হত্যা করা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন, কেউ বা হাত-পা কেটে ফেলার সুপারিশ করেছেন। আবার কেউ বা নির্বাসন দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। অপরাধীর চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। নির্বাসন দেবার ব্যাপারেও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন যে, অপরাধীকে দারুল হারবে নির্বাসিত করা হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে নির্বাসিত করতে হবে; কিন্তু দারুল ইসলামে সে অবস্থান করতে পারবে। (খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজও এই মত পোষণ করতেন)। ইমাম আবু হানিফার মতে অপরাধীকে কারাভোগ করতে হবে।
কিতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ
কিতাবী বা আহলুল কিতাবের মধ্যে ইহুদী, সেবীয় ও খৃস্টানরা রয়েছেন। এঁরা আল্লাহয় বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারে মনে করা হয় যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কিতাব নানাভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর রহমত থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আল্লাহ যখন তাঁদের সত্যপথে আহ্বান করার জন্য শেষ রাসূল পাঠালেন, তখন তাঁরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন; কিন্তু তাঁর রাসূল ও আল- কোরআনের ওপর তাঁরা ইমান আনেন নি। তাই পৌত্তলিকদের মত কিতাবীদেরও নিশ্চয়ই শান্তি ভোগ করতে হবে। তবু আল্লাহর ওপর যখন তাঁদের বিশ্বাস আছে, তখন তাঁরা আংশিকভাবে শাস্তি ভোগ করবেন। একথা সত্য যে, তাঁদের বিরুদ্ধেও জেহাদ পরিচালিত হয়। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যতটা কঠিনভাবে জেহাদের গুপ্ত কারণ বলে মনে করতেন। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। উঁচু জমি থেকে যদি আক্রমণ শুরু করা যায়, তবে যুদ্ধ পরিচালনায় বিশেষ সুবিধা হয়। প্রতারণামূলক রণ-কৌশলেও শত্রুপক্ষ সহজেই প্রতারিত হয়।
বিশেষ লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে ইবনে খালদুন অবধি মুসলিম চিন্তানায়কগণ সাধারণ যুদ্ধকে সব সময়েই অসংগত বলে মনে করেছেন। ধর্মীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা ভিন্ন আর সব যুদ্ধই আল্লাহর আইনে নিষিদ্ধ হয়েছে। কাজেই সাধারণ যুদ্ধ আল্লাহর আইনের পরিপন্থী ছিল। সামাজিক পরিবেশের সুষ্ঠু বিশ্লেষণের ফলে মুসলিম চিন্তানায়করা একথা বুঝতে পারলেন যে, ভ্রান্ত মানুষের পক্ষে সাধারণ যুদ্ধ এড়িয়ে চলা সহজ ব্যাপার নয়। আবার মুসলিম ইখওয়াতের বা ভ্রাতৃত্বের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্যও নবীর প্রেরণ বা হযরত উমর ফারুকের (রাঃ) মত ক্ষমতাশালী ও মর্যাদাবান খলিফারই প্রয়োজন ছিল। খলিফাগণ যখন রাসূলের সুন্না থেকে বিচ্যুত হলেন, তখন যুদ্ধ কেবল যে ধর্ম-যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকত, এমন নয়। বৈষয়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধি এসব যুদ্ধ মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যুদ্ধ বা হারব আর জেহাদ এক জিনিস নয়। মানবসমাজে যুদ্ধকে মানুষের তাচ্ছিল্য ও পাপের ফলে উদ্ভুত অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করা হত। ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে ব্যাধি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ মানুষের স্বভাবজাত। যুদ্ধ সর্বক্ষণ সংঘটিত হয়। তাই একে সামাজিক জীবনের চিরন্তন সাথী বলেই ধরা উচিত।
ইবনে খালদুন যে কেবল উত্তর আফ্রিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অবিরাম সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এ সিদ্ধান্তে পৌছেন, তা নয়। অন্যান্য জাতির ইতিহাস থেকেও তিনি তাঁর মাল-মশলা সংগ্রহ করেন। ইবনে খালদুনের সিদ্ধান্ত মানব সমাজ সম্পর্কে তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টিরই পরিচায়ক। তাঁর বিশ্লেষণের সত্যতা আধুনিক গবেষণায় ধরা পড়েছে। গবেষণার ফলে দেখা যায় যে, আদিম সমাজে মানুষ খুব বেশী যুদ্ধবাজ ছিল। শান্তিপূর্ণ অবস্থা তখন মোটেই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। স্যার হেনরী মেইন বলেন, "শান্তি স্থাপন করা মোটেই স্বাভাবিক, আদিম ও প্রাচীন ব্যাপার নয়-যুদ্ধই হল মানুষের স্বভাবিক প্রবৃত্তি।' খৃস্টান ধর্ম পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় নি। ইসলাম কিন্তু দুনিয়াতেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইসলামের পক্ষে ফের শান্তি প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও খোদায়ী সমাজ কায়েম করা সম্ভব হয় নি। বর্তমান মানুষের কাছে যুদ্ধ যেমন সমস্যাবহুল অবস্থার সৃষ্টি করে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছেও এ সমস্যা সমানভাবে প্রকট ছিল। তাঁরা ধর্মকে খুব সম্মানের চক্ষে দেখতেন ও ধর্মের ভিত্তিতে যুদ্ধ দমনের চেষ্টা করতেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মর্যাদা আমাদের কাছে ধর্মের সমতুল্য। আমরা যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে বদ্ধপরিকর।
মুসলিম আইনবেত্তাগণ অমুসলিমের বিরুদ্ধে জেহাদ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জেহাদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। যে সব মুসলমান ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় বা ধর্মবিরোধী মতবাদ পোষণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও জেহাদ প্রয়োজন হতে পারে। এসব লোকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্পর্কে সব আইনবিদই মতৈক্যে পৌছেছেন। জেহাদের প্রকৃতি ও পরিসমাপ্তি সম্পর্কে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মতবিরোধের অবকাশ রয়েছে। আল-মাওয়ার্দী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন—প্রথমতঃ, ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে জেহাদ (আর-রিদ্দা); দ্বিতীয়তঃ, বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ (আলবাগী); তৃতীয়তঃ, মুসলিম-ভ্রাতৃত্ব থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গঠন (মহারিবুন)। অন্যান্য আইনবিদরা আর একটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন। তা হল আর-রিবাত বা সীমান্ত অঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণ। তা ছাড়াও আর এক রকমের জেহাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা হল কেতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ।
পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ
আল্লাহর উপর যারা ঈমান আনেনি, তাদের সঙ্গে কোন সমঝোতা বরদাশত করা হয় না। তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে, নতুবা যুদ্ধে নামতে হবে। আল-কোরআনের অনেক নির্দেশের মধ্যে রয়েছে: যেখানে পাও, পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। এটা হল মুসলমানদের কর্তব্য। তোমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যারা পৌত্তলিক, তাদের সঙ্গেও সংগ্রাম কর। যারা অবিশ্বাসী, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেই তাদের মাথায় আঘাত করে হত্যা কর। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রচার করেছেন : আমি পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত তারা আল্লাহ ভিন্ন আর কোন উপাস্য নেই, একথা ঘোষণা না করে। প্রায় সব আইনবিদই বলেছেন যে, পৌত্তলিকতা ও ইসলাম পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না। কারণ, পৌত্তলিকগণ আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেবতাদের মিশিয়ে ফেলে। অর্থাৎ তারা শিরক করে থাকে। তাই তাদেরকে যুদ্ধ ও ইসলামের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিতে হয়। অবশ্য কোন আইনবিদই পৌত্তলিকের সুষ্ঠু সংজ্ঞা দিতে পারে নি। তাঁরা পৌত্তলিকদের পর্যায় থেকে শুধু যে কিতাবী (যারা খোদায় বিশ্বাস করে; কিন্তু রাসূলে বিশ্বাসী নয়) তাদের বাদ দেন, তা নয়, ম্যাজীয় পন্থিগণকেও (জরথ্রুস্টপন্থিগণ) তাঁরা বাদ দেন। ম্যাজীয়দের খোদা-বিশ্বাস অনেকটা হেঁয়ালী। কিন্তু তাদের যে একটা ধর্মীয় কেতাব আছে, একথা বলা চলে। তাই মহান আল্লাহর ধারণা যাদের মধ্যে একেবারেই নেই, সেই প্যাগান মতবাদকেই কেবলমাত্র পৌত্তলিকতার পর্যায়ে ফেলা হয়। এ নীতি হেজাযে সর্বতোভাবে প্রয়োগ করা হয়। আরবের ইয়েমেন প্রভৃতি অঞ্চলে ইহুদীদের বসবাস করতে দেয়া হত। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলে বা কিতাবী না হলে আরব দেশের অভ্যন্তরে কাউকে অবস্থান করতে দেয়া হত না। নাজরানের খৃস্টানগণ নিরাপত্তা-সনদ লাভ করছিলেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর হযরত ওমরের (রাঃ) নির্দেশক্রমে তাঁরা সিরিয়া ও লেবাননে হিজরত করতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে এই নিয়ম শিখিল করা হয়। বর্তমানকালে কিতাবীদের পক্ষে শুধু মক্কা শরীফে বসবাস করা নিষিদ্ধ। আরব উপদ্বীপের বাইরে পৌত্তলিকতা একরকম ছিল না বললেই চলে। অবশ্য ইরানের জরথুষ্ট্রপন্থীদের মধ্যে এবং ইসলামী জগতের সুদূর প্রান্তে অবস্থিত এশিয়া ও আফ্রিকার প্যাগানদের মধ্যে ঘটেছে এর ব্যতিক্রম।
ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার বিরুদ্ধে জেহাদ
ধর্মত্যাগ দুই রকমের হতে পারে। (ক) যে মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, কিন্তু যার দারুল হারবে যাবার অভিপ্রায় নেই। (খ) কয়েকজন মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, দারুল হারবের নাগরিক হতে পারে কিংবা তারা মিলিত হয়ে পৃথক আবাসভূমি (দার) গঠন করতে পারে। জেহাদ সম্পর্কীয় বর্তমান আলোচনায় শেষোক্তটিই এসে পড়ে। প্রথমটি শান্তি সম্পর্কীয় আইনের বিষয়ভুক্ত। যথাস্থানে এলাকা সম্পর্কীয় পরিচ্ছেদে এ সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে।
যদি ধর্মদ্রোহীগণ সংখ্যায় খুব বেশী হয় ও তাদের মুসলিম রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বানচাল করার মত শক্তি থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা ইমামের অবশ্য কর্তব্য। আইনবিদগণ কিন্তু যুদ্ধের পূর্বে বোঝাপড়া করার দিকেই বেশী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেননা, তার ফলে হয়ত ধর্মদ্রোহীরা ইসলাম ধর্মে আবার ফিরে আসতেও পারে। এ ব্যাপারে শান্তি স্থাপন, শুল্ক গ্রহণ বা জিযিয়া গ্রহণ, কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ইসলামকে খারিজ করে দেয়া ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। ধর্মদ্রোহীরা হয় ইসলাম ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে, নতুবা জেহাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে। অবিশ্বাসীদের আগেই জানিয়ে দিতে হবে যে, শীঘ্রই জেহাদ শুরু হবে। একথা জানিয়ে দেয়া যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
ধর্মদ্রোহীরা যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অসম্মত হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়, তবে দারুল হারবের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে যে রীতি-নীতি প্রযোজ্য হয়, এখানে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। তারা বা তাদের সম্পত্তি অবিশ্বাসীদের আত্মসমর্পণের সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়বে না। তাদের বা তাদের স্ত্রীগণকে দাসে পরিণত করা যাবে না। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা বা যুদ্ধের মাল হিসেবে বণ্টন করে দেয়া চলবে না। যুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করবে, তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। অনেক হানাফী আইনবিদ বলেন যে, ধর্মদ্রোহী স্ত্রীকে সাবী বা দাসী হিসেবে গণ্য করতে হবে, যুদ্ধার্জিত বিষয় বলে মনে করতে হবে বা বিক্রয় করে দিতে হবে। ধর্মদ্রোহের পর যে সব সন্তান- সন্তুতি জন্মগ্রহণ করবে, তারাও সমগোত্রীয় বলে গণ্য হবে। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ এটা প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) মৃত্যুর পর আরবীয় গোষ্ঠীগুলোর মুসলিম কওম থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গ্রহণ করা ধর্মদ্রোহিতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এদের প্রথম ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে আহ্বান করেন। যারা তবু ফিরে আসল না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ এ জেহাদ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ধর্মদ্রোহীদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারা জন্য তৈরি হয়। এসব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এক গোষ্ঠী বা জাতি অন্য জাতির বিরুদ্ধে জমায়েত হয়। ফলে যুদ্ধ হয়ে পড়ে অনিবার্য।
ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ চার রকমের। প্রথমতঃ গোষ্ঠীগত যুদ্ধ। আরবদের মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধ প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়তঃ আদিম মানুষের হানাহানি ও হামলা। তৃতীয়তঃ শরিয়ত-অনুমোদিত যুদ্ধ ও জেহাদ। চতুর্থতঃ বিদ্রোহী ও বিভ্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইবনে খালদুন বলেন যে, প্রথম দু'রকমের যুদ্ধ আইন-অনুমোদিত নয়। তাই এ ধরনের যুদ্ধ যথাযথ বলে গণ্য হয় না। বাকী দু'রকমের যুদ্ধকে ন্যায়সম্মত যুদ্ধ (আদল) বলে মনে করা হয়েছে।
তুর তুশীর মত ইবনে খালদুন এমত পোষণ করতেন না যে, সামরিক প্রস্তুতির ওপরেই কেবল যুদ্ধ-জয় নির্ভর করে। অস্ত্র-শস্ত্র ও যুদ্ধের সরঞ্জাম ছাড়াও যুদ্ধ-জয়ের অনেক গভীরতর কারণ রয়েছে। এ গুলোকে তিনি আল আসবাব আল খাফিয়া বা সুপ্ত কারণরূপে অভিহিত করেন। যুদ্ধে সৈন্যদের মনোবল প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু তাঁর মতে মনোবল আর গুপ্ত কারণ এক জিনিস নয়। যুদ্ধে জয়লাভের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও কলা-কৌশলকেই তিনি গুপ্ত কারণ বলে মনে করতেন। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। উঁচু জমি থেকে যদি আক্রমণ শুরু করা যায়, তবে যুদ্ধ পরিচালনায় বিশেষ সুবিধা হয়। প্রতারণামূলক রণ-কৌশলেও শত্রুপক্ষ সহজেই প্রতারিত হয়।
বিশেষ লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে ইবনে খালদুন অবধি মুসলিম চিন্তানায়কগণ সাধারণ যুদ্ধকে সব সময়েই অসংগত বলে মনে করেছেন। ধর্মীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা ভিন্ন আর সব যুদ্ধই আল্লাহর আইনে নিষিদ্ধ হয়েছে। কাজেই সাধারণ যুদ্ধ আল্লাহর আইনের পরিপন্থী ছিল। সামাজিক পরিবেশের সুষ্ঠু বিশ্লেষণের ফলে মুসলিম চিন্তানায়করা একথা বুঝতে পারলেন যে, ভ্রান্ত মানুষের পক্ষে সাধারণ যুদ্ধ এড়িয়ে চলা সহজ ব্যাপার নয়। আবার মুসলিম ইখওয়াতের বা ভ্রাতৃত্বের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্যও নবীর প্রেরণ বা হযরত উমর ফারুকের (রাঃ) মত ক্ষমতাশালী ও মর্যাদাবান খলিফারই প্রয়োজন ছিল। খলিফাগণ যখন রাসূলের সুন্না থেকে বিচ্যুত হলেন, তখন যুদ্ধ কেবল যে ধর্ম-যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকত, এমন নয়। বৈষয়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধি এসব যুদ্ধ মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যুদ্ধ বা হারব আর জেহাদ এক জিনিস নয়। মানবসমাজে যুদ্ধকে মানুষের তাচ্ছিল্য ও পাপের ফলে উদ্ভুত অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করা হত। ইবনে আবদুল্লাহ যুদ্ধকে ব্যাধি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু ইবনে খালদুনের মতে যুদ্ধ মানুষের স্বভাবজাত। যুদ্ধ সর্বক্ষণ সংঘটিত হয়। তাই একে সামাজিক জীবনের চিরন্তন সাথী বলেই ধরা উচিত।
ইবনে খালদুন যে কেবল উত্তর আফ্রিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অবিরাম সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এ সিদ্ধান্তে পৌছেন, তা নয়। অন্যান্য জাতির ইতিহাস থেকেও তিনি তাঁর মাল-মশলা সংগ্রহ করেন। ইবনে খালদুনের সিদ্ধান্ত মানব সমাজ সম্পর্কে তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টিরই পরিচায়ক। তাঁর বিশ্লেষণের সত্যতা আধুনিক গবেষণায় ধরা পড়েছে। গবেষণার ফলে দেখা যায় যে, আদিম সমাজে মানুষ খুব বেশী যুদ্ধবাজ ছিল। শান্তিপূর্ণ অবস্থা তখন মোটেই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। স্যার হেনরী মেইন বলেন, "শান্তি স্থাপন করা মোটেই স্বাভাবিক, আদিম ও প্রাচীন ব্যাপার নয়-যুদ্ধই হল মানুষের স্বভাবিক প্রবৃত্তি।' খৃস্টান ধর্ম পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় নি। ইসলাম কিন্তু দুনিয়াতেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইসলামের পক্ষে ফের শান্তি প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও খোদায়ী সমাজ কায়েম করা সম্ভব হয় নি। বর্তমান মানুষের কাছে যুদ্ধ যেমন সমস্যাবহুল অবস্থার সৃষ্টি করে, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছেও এ সমস্যা সমানভাবে প্রকট ছিল। তাঁরা ধর্মকে খুব সম্মানের চক্ষে দেখতেন ও ধর্মের ভিত্তিতে যুদ্ধ দমনের চেষ্টা করতেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মর্যাদা আমাদের কাছে ধর্মের সমতুল্য। আমরা যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে বদ্ধপরিকর।
ষষ্ঠ অধ্যায়
মুসলিম আইনবেত্তাগণ অমুসলিমের বিরুদ্ধে জেহাদ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জেহাদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। যে সব মুসলমান ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় বা ধর্মবিরোধী মতবাদ পোষণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও জেহাদ প্রয়োজন হতে পারে। এসব লোকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্পর্কে সব আইনবিদই মতৈক্যে পৌছেছেন। জেহাদের প্রকৃতি ও পরিসমাপ্তি সম্পর্কে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মতবিরোধের অবকাশ রয়েছে। আল-মাওয়ার্দী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন—প্রথমতঃ, ধর্মত্যাগের বিরুদ্ধে জেহাদ (আর-রিদ্দা); দ্বিতীয়তঃ, বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ (আলবাগী); তৃতীয়তঃ, মুসলিম-ভ্রাতৃত্ব থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গঠন (মহারিবুন)। অন্যান্য আইনবিদরা আর একটি জিনিসের উল্লেখ করেছেন। তা হল আর-রিবাত বা সীমান্ত অঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণ। তা ছাড়াও আর এক রকমের জেহাদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা হল কেতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ।
পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ
আল্লাহর উপর যারা ঈমান আনেনি, তাদের সঙ্গে কোন সমঝোতা বরদাশত করা হয় না। তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে, নতুবা যুদ্ধে নামতে হবে। আল-কোরআনের অনেক নির্দেশের মধ্যে রয়েছে: যেখানে পাও, পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। এটা হল মুসলমানদের কর্তব্য। তোমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যারা পৌত্তলিক, তাদের সঙ্গেও সংগ্রাম কর। যারা অবিশ্বাসী, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেই তাদের মাথায় আঘাত করে হত্যা কর। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রচার করেছেন : আমি পৌত্তলিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যে পর্যন্ত তারা আল্লাহ ভিন্ন আর কোন উপাস্য নেই, একথা ঘোষণা না করে। প্রায় সব আইনবিদই বলেছেন যে, পৌত্তলিকতা ও ইসলাম পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না। কারণ, পৌত্তলিকগণ আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেবতাদের মিশিয়ে ফেলে। অর্থাৎ তারা শিরক করে থাকে। তাই তাদেরকে যুদ্ধ ও ইসলামের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিতে হয়। অবশ্য কোন আইনবিদই পৌত্তলিকের সুষ্ঠু সংজ্ঞা দিতে পারে নি। তাঁরা পৌত্তলিকদের পর্যায় থেকে শুধু যে কিতাবী (যারা খোদায় বিশ্বাস করে; কিন্তু রাসূলে বিশ্বাসী নয়) তাদের বাদ দেন, তা নয়, ম্যাজীয় পন্থিগণকেও (জরথ্রুস্টপন্থিগণ) তাঁরা বাদ দেন। ম্যাজীয়দের খোদা-বিশ্বাস অনেকটা হেঁয়ালী। কিন্তু তাদের যে একটা ধর্মীয় কেতাব আছে, একথা বলা চলে। তাই মহান আল্লাহর ধারণা যাদের মধ্যে একেবারেই নেই, সেই প্যাগান মতবাদকেই কেবলমাত্র পৌত্তলিকতার পর্যায়ে ফেলা হয়। এ নীতি হেজাযে সর্বতোভাবে প্রয়োগ করা হয়। আরবের ইয়েমেন প্রভৃতি অঞ্চলে ইহুদীদের বসবাস করতে দেয়া হত। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলে বা কিতাবী না হলে আরব দেশের অভ্যন্তরে কাউকে অবস্থান করতে দেয়া হত না। নাজরানের খৃস্টানগণ নিরাপত্তা-সনদ লাভ করছিলেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর হযরত ওমরের (রাঃ) নির্দেশক্রমে তাঁরা সিরিয়া ও লেবাননে হিজরত করতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে এই নিয়ম শিখিল করা হয়। বর্তমানকালে কিতাবীদের পক্ষে শুধু মক্কা শরীফে বসবাস করা নিষিদ্ধ। আরব উপদ্বীপের বাইরে পৌত্তলিকতা একরকম ছিল না বললেই চলে। অবশ্য ইরানের জরথুষ্ট্রপন্থীদের মধ্যে এবং ইসলামী জগতের সুদূর প্রান্তে অবস্থিত এশিয়া ও আফ্রিকার প্যাগানদের মধ্যে ঘটেছে এর ব্যতিক্রম।
ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার বিরুদ্ধে জেহাদ
ধর্মত্যাগ দুই রকমের হতে পারে। (ক) যে মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, কিন্তু যার দারুল হারবে যাবার অভিপ্রায় নেই। (খ) কয়েকজন মুসলমান ইসলাম ধর্ম বর্জন করে, দারুল হারবের নাগরিক হতে পারে কিংবা তারা মিলিত হয়ে পৃথক আবাসভূমি (দার) গঠন করতে পারে। জেহাদ সম্পর্কীয় বর্তমান আলোচনায় শেষোক্তটিই এসে পড়ে। প্রথমটি শান্তি সম্পর্কীয় আইনের বিষয়ভুক্ত। যথাস্থানে এলাকা সম্পর্কীয় পরিচ্ছেদে এ সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে।
যদি ধর্মদ্রোহীগণ সংখ্যায় খুব বেশী হয় ও তাদের মুসলিম রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বানচাল করার মত শক্তি থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা ইমামের অবশ্য কর্তব্য। আইনবিদগণ কিন্তু যুদ্ধের পূর্বে বোঝাপড়া করার দিকেই বেশী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেননা, তার ফলে হয়ত ধর্মদ্রোহীরা ইসলাম ধর্মে আবার ফিরে আসতেও পারে। এ ব্যাপারে শান্তি স্থাপন, শুল্ক গ্রহণ বা জিযিয়া গ্রহণ, কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ইসলামকে খারিজ করে দেয়া ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। ধর্মদ্রোহীরা হয় ইসলাম ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে, নতুবা জেহাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে। অবিশ্বাসীদের আগেই জানিয়ে দিতে হবে যে, শীঘ্রই জেহাদ শুরু হবে। একথা জানিয়ে দেয়া যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
ধর্মদ্রোহীরা যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অসম্মত হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়, তবে দারুল হারবের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে যে রীতি-নীতি প্রযোজ্য হয়, এখানে সেগুলো প্রয়োগ করা হবে। তারা বা তাদের সম্পত্তি অবিশ্বাসীদের আত্মসমর্পণের সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়বে না। তাদের বা তাদের স্ত্রীগণকে দাসে পরিণত করা যাবে না। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা বা যুদ্ধের মাল হিসেবে বণ্টন করে দেয়া চলবে না। যুদ্ধে যারা মৃত্যুবরণ করবে, তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। অনেক হানাফ নীতি পরিচালিত হয় এদের বিরুদ্ধে ততখানি প্রযোজ্য হয় না।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া পৌত্তলিকদের আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কিতাবীরা এ তিনটি পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেনঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা জেহাদে প্রবৃত্ত হওয়া। যদি তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তাঁরা মুসলমানদের মত পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন। আর যদি তাঁরা জিযিয়া প্রদান করে কিতাবী হিসেবেই অবস্থান করতে চান, তবে তাঁদের কতকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। এদিক থেকে তাঁদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলা যায়। আর যদি তাঁরা যুদ্ধ করতে চান, তবে যুদ্ধকালে তাঁদের পৌত্তলিকদের সম- পর্যায়ভুক্ত মনে করা হবে।
রিবাত
আত্মরক্ষার খাতিরে (সুগুর) বন্দর ও সীমান্তের শহরগুলোতে ফৌজ মোতায়েন করে দারুল ইসলামের সীমান্ত সংরক্ষণের নাম "রিবাত”। যদিও একথা সত্য যে, এ জেহাদ আল-কোরআনের একটা নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, তবু ইসলামী রাষ্ট্র দেশ-রক্ষার ওপর যখন বেশী জোর দিতে শুরু করল, তখনই এ জেহাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জেহাদের মধ্যে আল-কোরআন কোন পার্থক্য নির্দেশ করে নি। আল-কোরআনে রয়েছে:
"খোদার দুশমন, তোমার দুশমন ও অন্যান্যদের মনে ভীতিসঞ্চার করার জন্য তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ও অশ্ব প্রস্তুত করে রাখ।" (৮ঃ ৬২)।
কিন্তু আইনবেত্তাগণ এবং বিশেষ করে স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মালিকী আইনবিদগণ (যাঁদের সীমান্ত ইউরোপীয় ফৌজ কর্তৃক হামেশা আক্রান্ত হত) রিবাতের আত্মরক্ষামূলক দিকটার ওপরেই বেশী জোর দিয়েছেন। হাদিসেও আত্মরক্ষামূলক রিবাতের খুব মূল্য দেয়া হয়েছে। তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তখনই এ হাদিসগুলো প্রচারিত হয়, যখন রিবাত আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একটি হাদিসে আছে: আবদুল্লাহ উমর বর্ণনা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহর মতে জেহাদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য। আর রিবাতের কাজ হল, বিশ্বাসী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণ। স্পেনে জেহাদের চাইতে রিবাত অধিক প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। কারণ, তাদের সীমান্ত হামেশাই খৃস্টান ফৌজ দ্বারা আক্রান্ত হত। এ কারণে ইবনে হোদাইল বৃস্টীয় দ্বাদশ শতকে (যখন স্পেনে ইসলামী শাসন কেবলমাত্র দক্ষিণাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে) জেহাদ সম্পর্কে লিখিত তাঁর কিতাবের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রিবাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং স্থলে ও সমুদ্রপথে আত্মরক্ষা বিশ্বাসীদের অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইসলামী জগতের পশ্চিম সীমান্ত আন্দালুস (স্পেন) সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাদিসের উল্লেখ করে রিবাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপীয় আক্রমণ থেকে স্পেনকে রক্ষা করা। হাদিসে আছে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: আত্মরক্ষার জন্য একটি রাত্র জাগরণ হাজার রাতের ইবাদাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
📄 যুদ্ধ পরিচালনার পন্থা
জেহাদিগণ
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
চতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহ কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬) যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা- হয়। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যেই পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি উঠেছিল। ধর্মদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকেও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল-বালাযুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যারা পুনরায় ইসলাম কবুল করে, তারা ভিন্ন আর কেউ মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায় নি।
বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ
বিভেদ সৃষ্টি করার প্রয়াসের নামই হল 'বাগী' বা বিদ্রোহ। যদি বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ ইমামের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হত না ও তাদের দারুল ইসলামে শান্তিতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হত। অবশ্য ইমাম তাদের বিভেদমূলক ধারণাগুলো বর্জন করতে ও প্রচলিত মতবাদ মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করবেন। তারা যদি এতে রাজী না থাকে ও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে অস্বীকৃত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। কতকগুলো অভিযোগ ও দাবী-দাওয়া যদি বিরোধের কারণ হয়ে থাকে ও ধর্মের মূলনীতির সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক না থাকে, (যেমন, প্রাদেশিক শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) তবে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি বিভেদকারীগণ সংখ্যায় খুব অল্প হয়, তবে তাদের শায়েস্তা করা মোটেই কঠিন হবে না। খারেজীরা এর এক দৃষ্টান্ত। খলিফা হযতর আলীর (রাঃ) সাথে যখন তাদের মতবিরোধ হল, তখন তাদের এ তিনটি ব্যাপারে বিশেষ ঔদার্য দেখান হয় : মসজিদে নামাজ পড়তে তাদের অনুমতি দেয়া হয়, খলিফা কর্তৃক আক্রমণ থেকেও তারা রেহাই পেল। তাছাড়া তাদের দারুল ইসলামে বসবাস করতেও অনুমতি দেয়া হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা খলিফাকে আক্রমণ করে বসল, অমনি খলিফা হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে ধাবিত হলেন; আন-নাহরোওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৮ খৃস্টাব্দ) তাদের শক্তি নস্যাৎ করে দিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইমামকে মুসলিম জনমত সমর্থন করতে চাইত না, যিনি নিজেই আইনের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ক্রমশঃ এ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন যে, ইমামের বিরুদ্ধে কোন রকম বিদ্রোহই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম যদি ভুলও করে বসেন, তবু তাঁর কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতেই হবে, এ মতবাদই তাঁরা পোষণ করতেন। আশারীপন্থী চিন্তানায়কগণ ও পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত সুন্নী আইনবিদগণ সর্বপ্রকার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ইমামের কর্তৃত্বকেই সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, বিদ্রোহ "স্বৈরাচারের" চাইতে অনেক বেশী নিন্দনীয়। তাঁদের মতে নতুন ইমামের প্রতি একবার "বাইয়া" বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার পর তা ফিরিয়ে নেবার আর কোন আইনগত পন্থা নেই। কারণ আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারেই বিশ্বাসী মুসলমানকে "আল্লাহ এবং রসূলের ও তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নিযুক্ত ইমামের কর্তৃত্ব"কে মেনে নিতে হবে। যদি ইমামের সঙ্গে মুসলমানদের কোন বিষয়ে মতবিরোধ উপস্থিত হয়, তবে তা "তোমরা যদি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হও, তবে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ছেড়ে দাও” (অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও রাসূল প্রদত্ত কার্যবিধির আলোকে তার মীমাংসা কর)। কিন্তু রাসূলের অনুপস্থিতিতে আইন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইমামই রাসূলের স্থান দখল করেন। তাই রাষ্ট্রে কার্যতঃ ইমামই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য তিনি জেহাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিদ্রোহ বিভেদেরই নামান্তর মাত্র—ইমামের কর্তৃত্ব বিদ্রোহের দ্বারা বানচাল হয়ে যায়। ইমামতের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ও তাঁর অধীনস্থ নাগরিকদের বিভেদকারীদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে কোনও উপায় নেই।
পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ
মুসলিম সমাজ-পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের কার্যকলাপ বড় রকমের চৌর্য-বৃত্তি বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে নিম্নলিখিত আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে:
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও দুনিয়ায় গোলমাল-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এভাবে দুনিয়াতে তারা অপমানিত হবে ও আখেরাতেও তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে।" (৫: ৩৭)।
আল-কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতেই আইনবিদগণ সমাজ পরিত্যাগ করা ও সড়কী দস্যুদের ইমাম কর্তৃক শাস্তি বিধানের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। কিন্তু শাস্তির মাত্রা সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ তাদের হত্যা করা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন, কেউ বা হাত-পা কেটে ফেলার সুপারিশ করেছেন। আবার কেউ বা নির্বাসন দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। অপরাধীর চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। নির্বাসন দেবার ব্যাপারেও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন যে, অপরাধীকে দারুল হারবে নির্বাসিত করা হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে নির্বাসিত করতে হবে; কিন্তু দারুল ইসলামে সে অবস্থান করতে পারবে। (খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজও এই মত পোষণ করতেন)। ইমাম আবু হানিফার মতে অপরাধীকে কারাভোগ করতে হবে।
কিতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ
কিতাবী বা আহলুল কী আইনবিদ বলেন যে, ধর্মদ্রোহী স্ত্রীকে সাবী বা দাসী হিসেবে গণ্য করতে হবে, যুদ্ধার্জিত বিষয় বলে মনে করতে হবে বা বিক্রয় করে দিতে হবে। ধর্মদ্রোহের পর যে সব সন্তান- সন্তুতি জন্মগ্রহণ করবে, তারাও সমগোত্রীয় বলে গণ্য হবে। কিন্তু অধিকাংশ আইনবিদ এটা প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) মৃত্যুর পর আরবীয় গোষ্ঠীগুলোর মুসলিম কওম থেকে আলাদা হয়ে নতুন দল গ্রহণ করা ধর্মদ্রোহিতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এদের প্রথম ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে আহ্বান করেন। যারা তবু ফিরে আসল না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে জেহাদ পরিচালনা করা হয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ এ জেহাদ পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ধর্মদ্রোহীদের মধ্যে অনেক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারা হয়। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যেই পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি উঠেছিল। ধর্মদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকেও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল-বালাযুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, যারা পুনরায় ইসলাম কবুল করে, তারা ভিন্ন আর কেউ মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায় নি।
বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জেহাদ
বিভেদ সৃষ্টি করার প্রয়াসের নামই হল 'বাগী' বা বিদ্রোহ। যদি বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ ইমামের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হত না ও তাদের দারুল ইসলামে শান্তিতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হত। অবশ্য ইমাম তাদের বিভেদমূলক ধারণাগুলো বর্জন করতে ও প্রচলিত মতবাদ মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করবেন। তারা যদি এতে রাজী না থাকে ও প্রচলিত আইনের আওতায় আসতে অস্বীকৃত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ পরিচালনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। কতকগুলো অভিযোগ ও দাবী-দাওয়া যদি বিরোধের কারণ হয়ে থাকে ও ধর্মের মূলনীতির সঙ্গে এগুলোর কোন সম্পর্ক না থাকে, (যেমন, প্রাদেশিক শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) তবে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করবার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি বিভেদকারীগণ সংখ্যায় খুব অল্প হয়, তবে তাদের শায়েস্তা করা মোটেই কঠিন হবে না। খারেজীরা এর এক দৃষ্টান্ত। খলিফা হযতর আলীর (রাঃ) সাথে যখন তাদের মতবিরোধ হল, তখন তাদের এ তিনটি ব্যাপারে বিশেষ ঔদার্য দেখান হয় : মসজিদে নামাজ পড়তে তাদের অনুমতি দেয়া হয়, খলিফা কর্তৃক আক্রমণ থেকেও তারা রেহাই পেল। তাছাড়া তাদের দারুল ইসলামে বসবাস করতেও অনুমতি দেয়া হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা খলিফাকে আক্রমণ করে বসল, অমনি খলিফা হযরত আলী (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে ধাবিত হলেন; আন-নাহরোওয়ানের যুদ্ধে (৬৫৮ খৃস্টাব্দ) তাদের শক্তি নস্যাৎ করে দিলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইমামকে মুসলিম জনমত সমর্থন করতে চাইত না, যিনি নিজেই আইনের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ ক্রমশঃ এ ধারণা পোষণ করতে লাগলেন যে, ইমামের বিরুদ্ধে কোন রকম বিদ্রোহই সমর্থনযোগ্য নয়। ইমাম যদি ভুলও করে বসেন, তবু তাঁর কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতেই হবে, এ মতবাদই তাঁরা পোষণ করতেন। আশারীপন্থী চিন্তানায়কগণ ও পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত সুন্নী আইনবিদগণ সর্বপ্রকার বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ইমামের কর্তৃত্বকেই সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, বিদ্রোহ "স্বৈরাচারের" চাইতে অনেক বেশী নিন্দনীয়। তাঁদের মতে নতুন ইমামের প্রতি একবার "বাইয়া" বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার পর তা ফিরিয়ে নেবার আর কোন আইনগত পন্থা নেই। কারণ আল-কোরআনের নির্দেশ অনুসারেই বিশ্বাসী মুসলমানকে "আল্লাহ এবং রসূলের ও তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নিযুক্ত ইমামের কর্তৃত্ব"কে মেনে নিতে হবে। যদি ইমামের সঙ্গে মুসলমানদের কোন বিষয়ে মতবিরোধ উপস্থিত হয়, তবে তা "তোমরা যদি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাসী হও, তবে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ছেড়ে দাও” (অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও রাসূল প্রদত্ত কার্যবিধির আলোকে তার মীমাংসা কর)। কিন্তু রাসূলের অনুপস্থিতিতে আইন ও শাসনের ক্ষেত্রে ইমামই রাসূলের স্থান দখল করেন। তাই রাষ্ট্রে কার্যতঃ ইমামই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আল-কোরআন ও রাসূলুল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য তিনি জেহাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিদ্রোহ বিভেদেরই নামান্তর মাত্র—ইমামের কর্তৃত্ব বিদ্রোহের দ্বারা বানচাল হয়ে যায়। ইমামতের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ও তাঁর অধীনস্থ নাগরিকদের বিভেদকারীদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে কোনও উপায় নেই।
পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ
মুসলিম সমাজ-পরিত্যাগকারী ও সড়কী দস্যুদের কার্যকলাপ বড় রকমের চৌর্য-বৃত্তি বলে গণ্য করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে নিম্নলিখিত আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে:
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ও দুনিয়ায় গোলমাল-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদেরকে হত্যা করা হবে, ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। এভাবে দুনিয়াতে তারা অপমানিত হবে ও আখেরাতেও তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে।" (৫: ৩৭)।
আল-কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতেই আইনবিদগণ সমাজ পরিত্যাগ করা ও সড়কী দস্যুদের ইমাম কর্তৃক শাস্তি বিধানের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেন। কিন্তু শাস্তির মাত্রা সম্বন্ধে তাদের মধ্যে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ তাদের হত্যা করা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন, কেউ বা হাত-পা কেটে ফেলার সুপারিশ করেছেন। আবার কেউ বা নির্বাসন দিয়েইপয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকেিতাবের মধ্যে ইহুদী, সেবীয় ও খৃস্টানরা রয়েছেন। এঁরা আল্লাহয় বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারে মনে করা হয় যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কিতাব নানাভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর রহমত থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আল্লাহ যখন তাঁদের সত্যপথে আহ্বান করার জন্য শেষ রাসূল পাঠালেন, তখন তাঁরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন; কিন্তু তাঁর রাসূল ও আল- কোরআনের ওপর তাঁরা ইমান আনেন নি। তাই পৌত্তলিকদের মত কিতাবীদেরও নিশ্চয়ই শান্তি ভোগ করতে হবে। তবু আল্লাহর ওপর যখন তাঁদের বিশ্বাস আছে, তখন তাঁরা আংশিকভাবে শাস্তি ভোগ করবেন। একথা সত্য যে, তাঁদের বিরুদ্ধেও জেহাদ পরিচালিত হয়। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যতটা কঠিনভাবে জেহাদের নীতি পরিচালিত হয় এদের বিরুদ্ধে ততখানি প্রযোজ্য হয় না।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া পৌত্তলিকদের আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কিতাবীরা এ তিনটি পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেনঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা জেহাদে প্রবৃত্ত হওয়া। যদি তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তাঁরা মুসলমানদের মত পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন। আর যদি তাঁরা জিযিয়া প্রদান করে কিতাবী হিসেবেই অবস্থান করতে চান, তবে তাঁদের কতকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। এদিক থেকে তাঁদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলা যায়। আর যদি তাঁরা যুদ্ধ করতে চান, তবে যুদ্ধকালে তাঁদের পৌত্তলিকদের সম- পর্যায়ভুক্ত মনে করা হবে।
রিবাত
আত্মরক্ষার খাতিরে (সুগুর) বন্দর ও সীমান্তের শহরগুলোতে ফৌজ মোতায়েন করে দারুল ইসলামের সীমান্ত সংরক্ষণের নাম "রিবাত”। যদিও একথা সত্য যে, এ জেহাদ আল-কোরআনের একটা নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, তবু ইসলামী রাষ্ট্র দেশ-রক্ষার ওপর যখন বেশী জোর দিতে শুরু করল, তখনই এ জেহাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জেহাদের মধ্যে আল-কোরআন কোন পার্থক্য নির্দেশ করে নি। আল-কোরআনে রয়েছে:
"খোদার দুশমন, তোমার দুশমন ও অন্যান্যদের মনে ভীতিসঞ্চার করার জন্য তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ও অশ্ব প্রস্তুত করে রাখ।" (৮ঃ ৬২)।
কিন্তু আইনবেত্তাগণ এবং বিশেষ ক্ষান্ত হয়েছেন। অপরাধীর চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে। নির্বাসন দেবার ব্যাপারেও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক বলেন যে, অপরাধীকে দারুল হারবে নির্বাসিত করা হবে। আবার অন্যান্য আইনবিদ বলেন যে, তাকে তার নিজের শহর থেকে নির্বাসিত করতে হবে; কিন্তু দারুল ইসলামে সে অবস্থান করতে পারবে। (খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজও এই মত পোষণ করতেন)। ইমাম আবু হানিফার মতে অপরাধীকে কারাভোগ করতে হবে।
কিতাবীদের বিরুদ্ধে জেহাদ
কিতাবী বা আহলুল কিতাবের মধ্যে ইহুদী, সেবীয় ও খৃস্টানরা রয়েছেন। এঁরা আল্লাহয় বিশ্বাস করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম অনুসারে মনে করা হয় যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় কিতাব নানাভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর রহমত থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। আল্লাহ যখন তাঁদের সত্যপথে আহ্বান করার জন্য শেষ রাসূল পাঠালেন, তখন তাঁরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন; কিন্তু তাঁর রাসূল ও আল- কোরআনের ওপর তাঁরা ইমান আনেন নি। তাই পৌত্তলিকদের মত কিতাবীদেরও নিশ্চয়ই শান্তি ভোগ করতে হবে। তবু আল্লাহর ওপর যখন তাঁদের বিশ্বাস আছে, তখন তাঁরা আংশিকভাবে শাস্তি ভোগ করবেন। একথা সত্য যে, তাঁদের বিরুদ্ধেও জেহাদ পরিচালিত হয়। কিন্তু পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যতটা কঠিনভাবে জেহাদের নীতি পরিচালিত হয় এদের বিরুদ্ধে ততখানি প্রযোজ্য হয় না।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া পৌত্তলিকদের আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কিতাবীরা এ তিনটি পন্থার যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেনঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান অথবা জেহাদে প্রবৃত্ত হওয়া। যদি তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে তাঁরা মুসলমানদের মত পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার পাবেন। আর যদি তাঁরা জিযিয়া প্রদান করে কিতাবী হিসেবেই অবস্থান করতে চান, তবে তাঁদের কতকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। এদিক থেকে তাঁদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলা যায়। আর যদি তাঁরা যুদ্ধ করতে চান, তবে যুদ্ধকালে তাঁদের পৌত্তলিকদের সম- পর্যায়ভুক্ত মনে করা হবে।
রিবাত
আত্মরক্ষার খাতিরে (সুগুর) বন্দর ও সীমান্তের শহরগুলোতে ফৌজ মোতায়েন করে দারুল ইসলামের সীমান্ত সংরক্ষণের নাম "রিবাত”। যদিও একথা সত্য যে, এ জেহাদ আল-কোরআনের একটা নির্ তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইন-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়।
সেনাপতির হুকুম তামিল করতে ও ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে জেহাদিগণ বাধ্য।
সমর পরিচালনার সাধারণ দিকটার মধ্যে ওপরের সবটা বিষয় রয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পর্কে আলোচনা এবং চুক্তি সম্পাদনা ও যুদ্ধে লব্ধ ধন-সম্পদ বণ্টনের বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।
সেনাদলের গঠন পদ্ধতি
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাথমিক অনুসারীদের নিয়ে সম্পূর্ণ একটি সৈন্য দল গঠিত হয়েছিল। কিন্তু মুসলিম সমাজে যখন লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল, তখন তাঁদেরই সৈন্যদলে ভর্তি করা হত, যাঁরা জেহাদের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। জেহাদীরা ছিলেন "মুকাতিলা” বা সংগ্রামীদের দলে। আর যাঁরা বাড়ীতে থাকতেন, তাঁদের বলা হত "কা'য়াদা"। মুকাতিলাদের মুহাজিরও বলা হত। কারণ, নববিজিত ভূখণ্ড দখল করার ব্যাপারে যাঁরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, তাঁরা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সহ এসব জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এ সব অঞ্চলকে মুসলিম শাসনাধীনে রাখার অনুকূলে এঁরাই সামরিক শক্তি যুগিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীতে যোগদান করে এঁরা সামরিক শক্তি সংগঠিত করেন এবং এঁদের মধ্য থেকেই প্রতিভাশালী শাসকগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ ইরাক ও সিরিয়া দখলের পর মুকাতিলাদের সংখ্যা খুব বেশী বেড়ে যায়। সেখানকার খৃস্টান এবং অন্যান্য আরব গোষ্ঠী ইরানী ও বাইজান্টীয় প্রভুদের বিরুদ্ধে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করে।
ইসলামের অভ্যুত্থানের সময় থেকে খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের (৭৪৪-৭৫০ খৃস্টাব্দ) আমলে নতুন ফৌজী সংগঠন কাল পর্যন্ত সৈন্যদলকে পাঁচটি শ্রেণীতে (আল- খামিস) বিভক্ত করা হত: কেন্দ্রস্থল (কালব), দুই পার্শ্ব বা বাহু (মায়মানা ও মায়সারা), সম্মুখভাগ (মুকাদ্দমা) ও পশ্চাদ্ভাগ (সাকা)। প্রত্যেক সৈন্য বিভাগের গোষ্ঠীগত ঐক্য রক্ষিত হত এবং এক এক গোষ্ঠীর নিজস্ব নিশানও থাকত। প্রায়ই অশ্বারোহীগণ পার্শ্বদ্বয়ের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতেন। কারণ তাঁদের অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সাথে ও কার্যকরীভাবে যুদ্ধ চালাবার ক্ষমতা ছিল। তাঁদের অস্ত্র ছিল রুমহ বা বর্শা। পদাতিক সৈন্য তীর-ধনুক ও পরবর্তীকালে ঢাল-তলোয়ার ব্যবহার করত। ইসলামী রাষ্ট্র প্রসারের প্রাথমিক যুগে সৈন্যসংখ্যা খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এতে মাত্র চার থেকে বার হাজার লোক ছিল। বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারী তাঁর বর্ণনায় বলেছেন যে, কাদেসিয়ার করে স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মালিকী আইনবিদগণ (যাঁদের সীমান্ত ইউরোপীয় ফৌজ কর্তৃক হামেশা আক্রান্ত হত) রিবাতের আত্মরক্ষামূলক দিকটার ওপরেই বেশী জোর দিয়েছেন। হাদিসেও আত্মরক্ষামূলক রিবাতের খুব মূল্য দেয়া হয়েছে। তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তখনই এ হাদিসগুলো প্রচারিত হয়, যখন রিবাত আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একটি হাদিসে আছে: আবদুল্লাহ উমর বর্ণনা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহর মতে জেহাদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য। আর রিবাতের কাজ হল, বিশ্বাসী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণ। স্পেনে জেহাদের চাইতে রিবাত অধিক প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। কারণ, তাদের সীমান্ত হামেশাই খৃস্টান ফৌজ দ্বারা আক্রান্ত হত। এ কারণে ইবনে হোদাইল বৃস্টীয় দ্বাদশ শতকে (যখন স্পেনে ইসলামী শাসন কেবলমাত্র দক্ষিণাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে) জেহাদ সম্পর্কে লিখিত তাঁর কিতাবের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রিবাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং স্থলে ও সমুদ্রপথে আত্মরক্ষা বিশ্বাসীদের অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইসলামী জগতের পশ্চিম সীমান্ত আন্দালুস (স্পেন) সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাদিসের উল্লেখ করে রিবাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপীয় আক্রমণ থেকে স্পেনকে রক্ষা করা। হাদিসে আছে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: আত্মরক্ষার জন্য একটি রাত্র জাগরণ হাজার রাতের ইবাদাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
জেহাদিগণ
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
চতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহদেশের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, তবু ইসলামী রাষ্ট্র দেশ-রক্ষার ওপর যখন বেশী জোর দিতে শুরু করল, তখনই এ জেহাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। দেশরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জেহাদের মধ্যে আল-কোরআন কোন পার্থক্য নির্দেশ করে নি। আল-কোরআনে রয়েছে:
"খোদার দুশমন, তোমার দুশমন ও অন্যান্যদের মনে ভীতিসঞ্চার করার জন্য তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ও অশ্ব প্রস্তুত করে রাখ।" (৮ঃ ৬২)।
কিন্তু আইনবেত্তাগণ এবং বিশেষ করে স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মালিকী আইনবিদগণ (যাঁদের সীমান্ত ইউরোপীয় ফৌজ কর্তৃক হামেশা আক্রান্ত হত) রিবাতের আত্মরক্ষামূলক দিকটার ওপরেই বেশী জোর দিয়েছেন। হাদিসেও আত্মরক্ষামূলক রিবাতের খুব মূল্য দেয়া হয়েছে। তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, তখনই এ হাদিসগুলো প্রচারিত হয়, যখন রিবাত আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। একটি হাদিসে আছে: আবদুল্লাহ উমর বর্ণনা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহর মতে জেহাদ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য। আর রিবাতের কাজ হল, বিশ্বাসী মুসলমানদের রক্ষণাবেক্ষণ। স্পেনে জেহাদের চাইতে রিবাত অধিক প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। কারণ, তাদের সীমান্ত হামেশাই খৃস্টান ফৌজ দ্বারা আক্রান্ত হত। এ কারণে ইবনে হোদাইল বৃস্টীয় দ্বাদশ শতকে (যখন স্পেনে ইসলামী শাসন কেবলমাত্র দক্ষিণাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে) জেহাদ সম্পর্কে লিখিত তাঁর কিতাবের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রিবাত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং স্থলে ও সমুদ্রপথে আত্মরক্ষা বিশ্বাসীদের অবশ্য কর্তব্য বলে সাব্যস্ত করেছেন। ইসলামী জগতের পশ্চিম সীমান্ত আন্দালুস (স্পেন) সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাদিসের উল্লেখ করে রিবাতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপীয় আক্রমণ থেকে স্পেনকে রক্ষা করা। হাদিসে আছে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: আত্মরক্ষার জন্য একটি রাত্র জাগরণ হাজার রাতের ইবাদাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।
জেহাদিগণ
সপ্তম অধ্যায়
রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবনের প্রথম দিকে তাঁর অনুসারীরা, এমন কি মহিলারাও ইসলামের উন্নতি বিধানের সংগ্রামে শরীক হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কার্যতঃ তা ছিল অসম্ভব। অর্থনৈতিক ও বাস্তব কারণে ক্ষুদ্র ও সদ্যজাত মুসলিম সমাজকে লড়াইয়ের ময়দানে সংঘবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। সামরিক দিক থেকে বিচার করে তাই মুসলমানদের (যেমন ইমাম শাফেয়ী বিভক্ত করেছেন) দু'ভাগে ভাগ করা হলঃ যাদের পক্ষে জেহাদে শরীক হওয়া অবশ্য কর্তব্য, আর যাদের পক্ষে জেহাদ বাধ্যতামূলক নয়। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে জেহাদিগণ ও অজেহাদিগণ। যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্য জেহাদিদের কতকগুলো বিশেষ যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমতঃ, জেহাদীকে বিশ্বাসী মুসলিম হতে হবে। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী এই মত সমর্থন করে বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যান্য আইনবিদ, বিশেষ করে হানাফিগণ অবিশ্বাসীদের সৈন্যদলে ভর্তি না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন যে, রাসূলে করীম নিজেই যখন অবিশ্বাসীদের সাহায্য নিতেন, তখন এ সম্বন্ধে আর কোন কথাই উঠতে পারে না। এসম্পর্কে তাঁরা একটা হাদিসের নজির দিয়েছেন। এ হাদিসটিতে আছে: 'পাপীদের সাহায্যেও ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা যেতে পারে'। জেহাদ হিসেবে অমুসলিমদের বাদ দেয়াই সাধারণ নিয়ম। তবু এ নিয়ম সব সময়ে পালন কর হত না। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধে পৌত্তলিকগণ মুসলমানদের সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ জয়ের অব্যবহিত পরেই এসব পৌত্তলিক ইসলাম কবুল করে।
দ্বিতীয়তঃ, জেহাদীদের সাবালক ও সুস্থমনা ব্যক্তি হতে হবে। শিশু ও উন্মাদ জেহাদী হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বয়স্ক বা সুস্থ হবার পর অবশ্য তারাও জেহাদীদের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়তঃ, জেহাদীকে পুরুষ হতেই হবে। নীতিগতভাবে মহিলাগণ জেহাদ শ্রেণীভুক্ত নন। কারণ, আল-কোরআনের আয়াতগুলোতে মুমিন বা পুরুষ বিশ্বাসীদের প্রতি জেহাদের আহ্বান হয়েছে। মুমিনা' বা মহিলা বিশ্বাসীরা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন নি। ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অতর্কিত আক্রমণের সময়ই কেবল মহিলাদের যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে। মহিলাদের অবশ্যই পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করতে হবে, যেমন আহতের সেবা বা যুদ্ধে উৎসাহ দান করা প্রভৃতি আইনবিদগণ অনুমোদন করেছেন।
ঐতিহাসিক যুদ্ধে (৬৩৭ খৃস্টাব্দ) মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র বার হাজার। এঁরা পারস্যের ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
জেহাদীরা কয়েকটি আজনাদ বা রেজিমেন্টে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেকটি রেজিমেন্ট ছাউনী ফেলে থাকত, যেমন সিরিয়ার জাবিয়া, তাবারিয়া ও হোমস; ইরাকে বসরা ও কুফা এবং মিসরে ফুসতাত ও আলেকজান্দ্রিয়ায়। যুদ্ধ করা ছাড়া এ যোদ্ধাদের আর কোন কাজ ছিল না। তাঁরা রাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধা ভোগকারী নাগরিক ছিলেন। ইহজগতে তাঁরা লাভ করতেন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ আর পরলোকে বেহেশত লাভের প্রতিশ্রুতি। তাঁরা কৃষিকার্যে যেন না যান, সেদিকে খলিফা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। কারণ, তাঁরা যদি এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন, তবে লড়াইয়ের ময়দানে তাঁদের একত্রিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। এ নীতি প্রবর্তন করেন হযরত উমর (রাঃ)।
স্থায়ী বসবাস কিন্তু তবু রোধ করা যায় নি এবং সৈন্য ছাউনীর সংখ্যাও বেড়ে যেতে থাকে। ফলে ফৌজের ঘাঁটিগুলোই সাম্রাজ্যের মধ্যে বড় বড় শহরে পরিণত হয়।
ক্রমে ক্রমে সৈন্যদল অনেকটা পেশাদার হয়ে পড়ল। বিশেষ করে উমাইয়াদের তামলে এ ক্রমবিবর্তন বেশ স্পষ্টরূপে লক্ষ্য করা যায়। বিদ্রোহ এবং গৃহযুদ্ধ দমন করার জন্য উমাইয়াদের সুদক্ষ ফৌজের খুবই বেশী প্রয়োজন ছিল। তাঁদের আমলেই পাঁচটি শ্রেণীতে সৈন্য বিভক্ত করার নীতি (খামিস) পরিত্যক্ত হল। সমগ্র সৈন্যদলকে একটি দলে সুসংবদ্ধ করে তার নাম দেয়া হল 'কুদুস'। খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের সময়ে এ পুনর্গঠন করা হয়। তাঁর আমলেই বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার পদ্ধতি প্রচলিত হয়। বাইজান্টীয় প্রভাবের ফলে মুসলিম সৈন্যদের সামরিক বেশভূষার দিক হতে গ্রীকদের থেকে প্রায়ই আলাদা করা যেত না। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও প্রায় একই রকম ছিল। মুসলিম বাহিনীর বলিষ্ঠ স্বাতন্ত্র্যের বিলুপ্তি এবং মানসিক দুর্বলতার জন্য যখন ইবনে খালদুন দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তখনই কিন্তু উমাইয়া শাসনাধীনে সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
আব্বাসীয় খলিফাগণ নিয়মিত সেনা (সর্বদা কার্যে নিযুক্ত মুরতাযিকা) ও স্বেচ্ছা-সেবকবাহিনী (মুতাতাবিয়া) নিয়োগ করতেন। স্বেচ্ছাসেবকদের অস্থায়ী কাজের জন্য সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হত। কার্যকালীন সময়ে কেবল তাঁদের মাইনে দেয়া হত। নিয়মিত সেনাবাহিনীর এক বিশেষ দল থেকে খলিফার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের নেয়া হত। এ প্রহরী দলই সংরক্ষিত সেনাবাহিনী (Standing Army) হিসেবে কাজ করত। খলিফারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য বিদেশীদের দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ করতেন এবং তাদের উচ্চহারে বেতন দিতেন। যখন খলিফার সম্মান ও প্রতিপত্তি কমে আসে, তখন এ সেনাদল তাদের মনিবদের চাইতেও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠে। Praetorian guard-এর মত তুর্কী রক্ষীদলও প্রায় একই ভূমিকা কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬) যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা-পয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইনচতুর্থতঃ, জেহাদীকে সবল ও সক্ষম হতে হবে। আল-কোরআন সুস্পষ্টভাবে দুর্বল, খঞ্জ ও অসুস্থ ব্যক্তিকে জেহাদ থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা থাকাই যথেষ্ট। (৯: ৯২)। এ নিয়মটা আর একটি আয়াতে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে:
"আল্লাহ কারোর ওপরে সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না”। (২: ২৮৬)
যুদ্ধ করতে অক্ষম স্বচ্ছল মুসলমানরা টাকা-পয়সা বা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে জেহাদের কর্তব্য পালন করতে পারেন।
পঞ্চমতঃ, জেহাদীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাধীন হওয়া চাই। তাঁর কোন ঋণ থাকলে ঋণদানকারীর তাঁকে ক্ষমা করে দেয়া চাই। নিজেকে ও তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণ চালাবার মত যথেষ্ট ধন-সম্পদ তাঁর থাকা চাই। দাসকে প্রভুর ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়; তাই জেহাদে যোগদান করা তার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য নয়। মুক্তিলাভ করলে অবশ্য দাস জেহাদে শামিল হতে পারে। মহিলাদের মত দাসগণও আক্রমণের সময় আক্রমণকারীকে প্রতিহত করার জন্য সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।
ষষ্ঠতঃ, জেহাদীকে মাতা-পিতার অনুমতি নিয়ে তবে যুদ্ধে যোগদান করতে হবে। অতর্কিত আক্রমণের সময় অবশ্য সব মুমিনকে মাতা-পিতা বা ইমামের অনুমতি ছাড়াই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বনে তৎপর হতে হবে।
সপ্তমতঃ, জেহাদীকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জেহাদে নামতে হবে। এ হল এক মৌলিক নীতি। এটা এসেছে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এ-বাণী থেকে : "উদ্দেশ্য দেখেই কাজের বিচার হবে।"
মুসলিম আইন অনুসারে জেহাদের আসল উদ্দেশ্য হল, ধর্মের উন্নয়ন ও প্রসার। যুদ্ধে ধন-সম্পদ লাভ করা জেহাদীর উদ্দেশ্য হতে পারে না। আপনা আপনি অবশ্য ধন-লাভ করা যেতে পারে। কেননা, একমাত্র আল্লাহই বিজয়-গৌরব দান করেন।
পরিশেষে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা অবস্থায় জেহাদীকে কতকগুলো নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল সেনাধ্যক্ষের আদেশ মান্য করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। কারণ, আল-কোরআনে আছে : “আল্লাহ ও রাসূলকে মেনে চল, আর তোমাদের মধ্যে যাদের হাতে তোমাদের পরিচালনার কর্তৃত্ব রয়েছে, তাদেরকেও।”— (৬৪: ৬২)। সামরিক ব্যাপারে ও যুদ্ধে অর্জিত ধন-সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে জেহাদীকে সেনাপতির সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হয়। শত্রুপক্ষ যদি খুব শক্তিশালী হয় ও মুসলমানদের চাইতে সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়, তবে জেহাদী ইচ্ছা করলে জেহাদ পরিত্যাগ করে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁর জেহাদ বর্জন করার কোন অধিকার নেই। দুশমনদের হাতে পরাজিত হলে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশংকা থাকলেই কেবল পশ্চাদপসরণ করা অনুমোদিত হতে পারে। তাছাড়া, জেহাদীকে সৎ ও স্পষ্টবাদী হতে হবে এবং বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। যদি তিনি আমান বা নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে তা মেনে চলতেই হবে। জেহাদ পরিচালনায় যদি তাঁর হাতে মানুষ মারা পড়ে থাকে, তবে তিনি দেখবেন মৃতের ওপর যেন আর অত্যাচার করা না হয়।
জেহাদীদের পরিচালনা
খলিফার কর্তব্য হল আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ। তাঁর গ্রহণ করে। এরা নিজেদের খেয়ালখুশী মাফিক একজন শাসককে পদচ্যুত করে যথেচ্ছভাবে আর একজনকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করত।
যুদ্ধ পরিচালনা
সেনাপতির হুকুমেই যুদ্ধ শুরু হত। হুকুমের পর আসে তাকবীর বা দোওয়া— (আল্লাহু আকবর—আল্লাহ' মহান)। যুদ্ধ আরম্ভ হবার পূর্বে তাকবীর ধ্বনি শুভ সূচনার ইঙ্গিত বহন করে। তাবারীর বর্ণনায় জানা যায় যে, কাদেসিয়ার যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি সাদ যোহরের নামাজের পূর্বে যুদ্ধ শুরু না করার হুকুম করেন। যোহরের নামাজের অব্যবহিত পরেই তিনি চারবার তাকবীর ধ্বনি করে যুদ্ধ সূচনার সংকেত দান করেন। রোমানদের অভ্যন্তরীণ আইনের (Jus fetiale) অনুষ্ঠানের মত কোন কোন খলিফাও সেনাপতিগণকে কয়েকটি বিশেষ দিন বাদ দিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে পরামর্শ দিতেন।
যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে আল-কোরআন থেকে জেহাদ সম্পর্কীয় সূরা পাঠ করে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধিরও রেওয়াজ ছিল। যুদ্ধে যোগদানকারী কবি-সাহিত্যিকগণ বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা আবৃত্তি করতেন। আরবদের সাহসিকতা, আত্মসম্মানবোধ ও ধর্মীয়-উদ্দীপনা প্রভৃতি প্রেরণামূলক আরবীয় গুণাবলীর প্রতি আবেদন জানানো হত। যুদ্ধক্ষেত্রে কবিগণ সামরিক বীরত্বব্যঞ্জক নতুন নতুন কবিতা রচনা করে আবৃত্তি করতেন। এ কবিতাগুলো মোটেই নিম্নশ্রেণীর নয়। সত্যি কথা বলতে কি, যুদ্ধের উদ্দীপনা ও উন্মাদনার মধ্যেই বড় বড় লড়াইয়ের ময়দানে কতকগুলো উচ্চাংগের কবিতা রচিত হয়।
গোড়ার দিকে যুদ্ধের পরিচালনা খুব সুশৃঙ্খল ছিল না। পরবর্তীকালে এর ব্যতিক্রম ঘটে। প্রথমদিকে যে সব যুদ্ধের ফলে রাষ্ট্রীয় পরিধি বেড়ে যায়, তার মধ্যে প্রাক- ইসলামী যুদ্ধের গোষ্ঠী-যুদ্ধরীতিই অনুসৃত হত। সাধারণতঃ কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সাহসী সৈনিক শত্রুপক্ষের সৈন্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে লড়াইয়ে আহ্বান করে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ আরম্ভ করত। কোন কোন যুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে উভয়পক্ষের যোদ্ধাদের মধ্যে মল্লযুদ্ধ চলত কয়েক ঘণ্টা। কখনও কখনও এতেই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যেত; অথবা এ যুদ্ধই কয়েকদিন ধরে চলত। তারপর বাকী সৈন্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। প্রাক-ইসলামী যুদ্ধে প্রচলিত "কার" ও "ফার" নামক যুদ্ধরীতি মুসলমানরাও অনুমোদন করতেন। এ রীতি অনুসারে সেনাবাহিনী সর্বশক্তি নিয়োগ করে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করত; তারপর অকস্মাৎ পশ্চাদপসরণ করত। এ রীতি বার বার অনুসৃত হত। ফলে শত্রুসেনা বহুল পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হত এবং বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। কিন্তু মুসলিম ফৌজের গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগতে পারত না। অশ্বারোহী সৈন্যগণ দ্রুতগতিশীল এবং তাদের আক্রমণ শক্তি অধিকতর কার্যকরী হওয়ায় এ ধরনের আক্রমণে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়। সেনাপতির হুকুম তামিল করতে ও ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে জেহাদিগণ বাধ্য।
সমর পরিচালনার সাধারণ দিকটার মধ্যে ওপরের সবটা বিষয় রয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পর্কে আলোচনা এবং চুক্তি সম্পাদনা ও যুদ্ধে লব্ধ ধন-সম্পদ বণ্ট হাতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় বিষয়েরই কর্তৃত্ব থাকে। তিনি শাসন বিভাগ ও সামরিক বিভাগে কর্মচারী নিয়োগ করেন। বিভিন্ন শাসনকর্তা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। খলিফা ও প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে আল্লাহর কাছে তিনি দায়ী থাকেন এবং তাঁকে আইন-নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বিধি পালন করতে হয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর খলিফাগণ কখনও কখনও সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সময়ে তাঁরা সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। এ সেনাপতিগণ খলিফাদের প্রতিনিধি হিসেবে জেহাদ পরিচালনা করতেন। আইনবিদগণ সামরিক শক্তিকে খলিফার হাতে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদনের হাতিয়ার হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু যখন খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে আসলো এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সেনাধ্যক্ষগণ তাঁর চাইতে বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন, তখন শক্তি-বলে ক্ষমতা দখলের নীতিকেও আইনবিদগণ কখনও কখনও সমর্থন জানিয়েছেন। অনেক আইনবেত্তা সামরিক শক্তিকে শাসন-কর্তৃত্ব লাভ করার ব্যাপারে একটি মৌলিক গুণ বলে সাব্যস্ত করেছেন। সামরিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে শাসন-কর্তৃত্ব আরোপ করার প্রবণতা এ মতবাদের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে।
সমর পরিচালনার দুটো পন্থা আছে, বিশিষ্ট পন্থা ও সাধারণ পন্থা। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে সামরিক নীতি-নির্ধারণ। আর অপরটি হল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে। বিশিষ্ট সমরনীতিকে সাধারণ পন্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশিষ্ট সমরনীতি পরিচালনার মধ্যে আসে:
১। সৈন্য পরিচালনা, প্রত্যেকটি সৈন্যের প্রতি নজর রাখা এবং ঘোড়া ও সাজ-সরঞ্জামাদির তত্ত্বাবধান।
২। যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের উৎসাহ প্রদান।
৩। সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ। রাসূল (সঃ) বলেন: যুদ্ধ ফন্দী-ফিকিরেরই নামান্তর। অতর্কিত আক্রমণ থেকে ফৌজকে রক্ষা করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই এ পন্থা অবলম্বন করতে হয়। একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকেই সেনাপতিকে আক্রমণ চালাতে হয়।
৪। সামরিক কর্তব্য পালন। এর মধ্যে আছে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ আয়ত্ত করা। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জেহাদীরা সৈন্যদল ছেড়ে না যায়। সেনাপতির হুকুম তাম করত।
ক্রমে মুসলিম সেনাবাহিনী যতই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করতে লাগল, ততই কেবল যে নতুন নতুন আক্রমণের নিয়মিত পদ্ধতি তাদের আয়ত্তে আসে তা-ই নয়, তারা নিজেদের বিন্যাস-ব্যবস্থা ও সংগঠন পদ্ধতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে এবং অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যবহারে ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করে। সামরিক কলাকৌশল শরিয়তের বিধান অনুসারে আইনানুমোদিত বলেই গণ্য হত। কারণ, রণকৌশল ছিল যুদ্ধে নৈপুণ্য ও পারদর্শিতার ব্যাপার। তীক্ষ্ণ সতর্কতা, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং অধ্যবসায়ই এ কলাকৌশলের ভিত্তি ছিল।