📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 মুসলিম আইনের মৌলিক চিন্তাধারা

📄 মুসলিম আইনের মৌলিক চিন্তাধারা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 রাষ্ট্রনীতি

📄 রাষ্ট্রনীতি


সমাজ ও রাষ্ট্র
প্রথম অধ্যায়

গ্রীক দার্শনিকদের মত মুসলিম চিন্তাবিদরাও একথা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছিলেন যে, মানুষ স্বভাবতঃই সামাজিক জীব। শুধু সমাজবদ্ধভাবেই সে বেঁচে থাকতে পারে। একমাত্র আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কেউ একা বাস করতে পারে না। মানুষের জন্ম হয়েছে একত্রে সমাজবদ্ধভাবে বাস করার জন্য। রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর জামানা থেকে শুরু করে (৬৩২ খৃস্টাব্দ) ইবনে খালদুন অবধি (১৪০৬ খৃস্টাব্দ) সব মুসলিম চিন্তানায়কই ব্যক্তির দাবী-দাওয়া, কর্তব্য ও আনুগত্যকে সব সময়েই বৃহত্তর সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করতে প্রয়াস পেয়েছেন। হাদিসে কথিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মুসলিম সমাজকে একটি অঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন: দৃঢ়-সংবদ্ধ ইটের সমষ্টি যেন এক সুসংবদ্ধ প্রাচীর রচনা করে রয়েছে। আল-কোরআনে মুসলিম সমাজকে সুমহান আল্লাহর কর্তৃত্বের সার্বজনীন আনুগত্য দ্বারা আবদ্ধ একটা পৃথক জাতি (উম্মা) বা ভ্রাতৃত্ব ("ইখওয়াত")-রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। উম্মা বা ইখওয়াতের প্রত্যয় হল ইসলামী-ভিত্তি। আর এ সমাজের অন্যতম সদস্য হওয়ার ওপরেই মু'মিনের পার্থিব সমৃদ্ধি ও পারলৌকিক মুক্তি বা নাজাত নির্ভর করে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও মদিনাবাসীদের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তাতে মুসলিম সমাজকে "অন্যান্য আর সব জাতি থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতি"রূপে অভিহিত করা হয়েছে। এ সমাজে গোষ্ঠীগত তথা সর্বপ্রকার আনুগত্যের ওপরে স্থান ছিল মুসলিম ইখওয়াত বা ভ্রাতৃত্বের। চুক্তিটার অপর এক অংশে লেখা ছিল: "আল্লাহতায়ালার প্রদত্ত নিরাপত্তা দীনহীন ক্ষুদ্রতম মু'মিনের প্রতিও সমানভাবে প্রযোজ্য। ইখওয়াতের সদস্যদের মধ্যে কোন সামাজিক বিভেদ বা ভেদ-বিচার নেই। কারণ, যদিও আল্লাহ তোমাদের নর-নারী এবং বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছেন, তবু পুণ্যপ্রাণতা ও তাকওয়া ভিন্ন তিনি তাদের মধ্যে আর কোন পার্থক্যের স্বীকৃতি দেন নি।" উম্মা সম্পর্কীয় এ প্রত্যয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বীজ লুকিয়েছিল। বিষয়টা পরে আলোচনা করা যাবে।
পৈত্রিক, আচারগত বা ধর্মীয় বন্ধন যাই থাকুক না কেন, প্রাচীন সমাজের ইতিহাস থেকে একথা সহজেই জানতে পারা যায় যে, প্রাচীনকালে গোষ্ঠীগত সংহতির ওপরেই সব চাইতে বেশী জোর দেয়া হত। তখনকার দিনে ব্যক্তির মূল্য ছিল নিতান্ত সামান্য। কারণ, জীবিকা সংস্থানের ব্যাপারে ব্যক্তি ছিল একেবারেই অক্ষম। বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতাও তার ছিল না। কেবলমাত্র নিজের পরিবার বা গোষ্ঠীগত আচার ও সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার মাধ্যমে সে নিজেকে রক্ষা করবার ভরসা পেত। আদর্শ রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় আল-ফারাবী (৮৭০-৯৫০ খৃস্টাব্দ) এমন এক সমাজব্যবস্থার ওপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যার কল্যাণে ব্যক্তি দৈহিক ও নৈতিক উৎকর্ষ লাভ করতে পারে।
আল-ফারাবী বলেন: মানুষের জন্য যা খুব বেশী দরকারী, তা অন্যের সাহায্য ছাড়া অর্জন করার ক্ষমতা তার নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক। মানুষ যদি তার স্বভাবকে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করতে চায়, তবে তাকে সমাজ বা কওমের একজন হিসেবেই বাস করতে হবে এবং সমাজের আর দশজনের সঙ্গে তাকে সহযোগিতা করতে হবে।
জীবন-যুদ্ধে জয়ী হবার জন্যই যে কেবল সমাজ মানুষের জন্য অপরিহার্য তাই নয়, একমাত্র সমাজব্যবস্থার মাধ্যমেই কর্তৃত্বের ভূমিকা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা ব্যতীত সমাজ বেশীদিন টিকে থাকতে পারে না। ইসলামী সমাজ বা উম্মার প্রত্যয়ের পেছনের সার্বভৌম আইনপ্রণেতা আল্লাহর দেয়া কতকগুলো নির্দেশনামা ধরে নেয়া হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার এগুলোই মৌলিক আইন বা গঠনতন্ত্রের মূল ভিত্তি বলে বিবেচিত হয়। এ আইনকে অপরিহার্য বলে মনে করা হয়েছে; কারণ, ক্ষমতা ছাড়া মানবসমাজের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। যদিও মানুষ স্বভাবতঃ সামাজিক জীব, তবু সে সব সময়ে সদাচারী হতে পারে না। তাইত' আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- “মানুষ একে অপরের দুশমন; একজনকে দিয়ে আর একজনকে আল্লাহ যদি ঠেকিয়ে না রাখতেন, তবে দুনিয়াটা দুর্নীতিতে ভরে যেত।” ক্ষমতার মাধ্যমেই মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। আর আইনের মারফত সে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সহজ-সরল পথ-নির্দেশ করাই আইনের কাজ। 'শরিয়ত কথাটির অর্থও ত' তাই। ক্ষমতা হল আইনের বাস্তব রূপায়ণের মৌলিক ও কার্যকরী সমর্থন। প্রসিদ্ধ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খৃস্টাব্দ) ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শেষটায় মন্তব্য করেছেন:
"মানুষের পক্ষে সমাজ-বন্ধন বিশেষ প্রয়োজনীয়। কারণ, মানুষকে এমনভাবে পয়দা করা হয়েছে, যার ফলে খাদ্য ব্যতীত সে জীবন-ধারণ করতে পারে না। একজন যতটা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, তা তার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এজন্যই তাকে আর দশজনের সঙ্গে মিলিত হতে হয়, যাতে করে সমবায়ের ভিত্তিতে তারা যথেষ্ট ও প্রয়োজনের চাইতে বেশী খাদ্য উৎপাদন করতে পারে। নিজেকে রক্ষা করার জন্যও তার অন্যের সাহায্যের দরকার। আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ প্রতিটি জীবকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন। আল্লাহর দেয়া সৃজনধর্মী মন ও হাতের সাহায্যেই শিল্পের কলা-কৌশলের উৎকর্ষ সাধিত হয় আর এর মাধ্যমেই হাতিয়ার তৈরি করা হয়। অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট প্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের রক্ষণাবেক্ষণে যে কাজ করে, মানুষের পক্ষে হাতিয়ারের রয়েছে সেই একই ভূমিকা। আর দশজনের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে যেমন মানুষ জীবন-ধারণের উপযোগী যথেষ্ট খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না, তেমনি আত্মরক্ষার জন্য হাতিয়ার না থাকলে সে কেমন করে হিংস্র পশুর কবল থেকে রক্ষা পাবে? হাতিয়ার ও অস্ত্র-শস্ত্রের উদ্ভাবন না হলে গোটা মানবজাতিটাই হয়ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। সহযোগিতার মাধ্যমেই জীবনধারণের উপযোগী খাদ্য সংগ্রহ করা ও আত্মরক্ষার জন্য হাতিয়ার তৈরি করা সম্ভবপর হয়েছে। এভাবেই মানবজাতি বেঁচে থাকে ও আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ হয়। তাই সমাজ-ব্যবস্থা মানুষের জন্য খুব বেশী দরকারী। সমাজ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না।
"মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠার পর তাদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা মাথা তুলে দাঁড়ায়। কারণ, আক্রমণ ও নিপীড়নের পশুসুলভ প্রবৃত্তি মানুষের মধ্যেও বিদ্যমান রয়েছে। অতীতে যে সব হাতিয়ার দিয়ে হিংস্র পশু থেকে মানুষ নিজেকে রক্ষা করত, তা এখন অকেজো হয়ে পড়ল। প্রতিটি মানুষই ত' এখন তা সমানে ব্যবহার করতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে লাগল। যাতে করে একে অপরকে আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য একটি লোককে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে হল। এই ক্ষমতার নামই 'মূলক' বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব। তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, রাষ্ট্র মানুষের পক্ষে স্বভাবজাত—তার জীবন-ধারণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অপরিহার্য।"
মুসলিম চিন্তাবিদরা সমাজ-ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে তার উপপদ হিসেবে রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকেও জুড়ে দিয়েছেন। কারণ, রাষ্ট্র ছাড়া সমাজের অস্তিত্ব নেই। একথা যদিও সত্য যে, মানবসমাজ পত্তনের পূর্বে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয় নি, তবু রাষ্ট্রের ওপরেই সমাজের অস্তিত্ব নির্ভর করে। মানুষের আক্রমণাত্মক ও অশুভ প্রবণতার ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। নৈরাজ্যসুলভ এ প্রবৃত্তি যদি প্রশমিত করা না হত, তবে সমাজ ধ্বংস হয়ে যেত। সাধারণতঃ মনে করা হয় যে, এ ধারণাটা কয়েক শতাব্দী পর ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি তাঁর 'সামাজিক চুক্তির নীতি'র পেছনে মানুষের অশুভ প্রবৃত্তি ও প্রবণতার কথা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ এ চুক্তির ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশবিশেষ বৃহত্তর কর্তৃত্বের নিকট সমর্পণ করতে বাধ্য হল। হবসের সামাজিক চুক্তির মত কোন নীতি বা থিয়োরীর মধ্যে ইসলামের রাষ্ট্রনৈতিক অবদান খুঁজে পাওয়া যাবে না। একথা সত্য যে, হবস মানুষের প্রবৃত্তিগুলোর যথাযথ বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সামাজিক তাৎপর্যটুকু দেখাতে পারেন নি। ইবনে খালদুন হবস থেকে তিনশ' বছর আগেই মানুষের সমাজতাত্ত্বিক সম্পর্ক সুস্পষ্টরূপে ধরতে পেরেছিলেন।
প্রাথমিক ইসলামী যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে খুব বড় একটা পার্থক্য ছিল না। তখন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রায় একার্থবোধকই ছিল। "রাষ্ট্র" কথাটি আল-কোরআনে পাওয়া যায় না। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) সময়েও ঠিক রাষ্ট্র কথাটি প্রচলিত ছিল না। অবশ্য আল-কোরআনে সুনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার উল্লেখ আছে। আর এ ক্ষমতা ন্যস্ত রয়েছে আল্লাহর ওপরে। আল্লাহর ক্ষমতা শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার উৎস ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশবিশেষ। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত হোক আর না হোক, মানুষের সামাজিক প্রয়োজন মেটাবার তাগিদেই সমাজব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল।
রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তি
ইসলামের মতে আদিম যুগে দুনিয়ার বিভিন্ন জাতির বসবাস ছিল এবং প্রতিটি জাতির মধ্যে একটা করে আল্লাহর দেয়া বিধানও বিদ্যমান ছিল। প্রত্যেক জাতির কাছে আল্লাহ তাঁর বিধান দিয়ে এক একজন পয়গম্বর পাঠান। তার ফলে এ সব জাতির সঙ্গে আল্লাহর একটা সরাসরি চুক্তি সম্পাদিত হয়। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আগমনের অব্যবহিত পূর্বে দুনিয়ার অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তখন কেবলমাত্র একটি কেন্দ্রীভূত সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল না; নানান জাতির সমাবেশে তখন এক বিচিত্র মানবসমাজের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিটি জাতিকে তার নিজ নিজ চুক্তি মেনে চলতে হত ও স্বজাতীয় পয়গম্বরের প্রতি আনুগত্য দেখাতে হত। কিন্তু এরা একে একে তাদের চুক্তি ভঙ্গ করতে থাকে এবং নবীদের বিধি-বিধান বিনষ্ট ও বিভ্রান্ত করে ফেলে। যদিও এ অবস্থার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে প্রায়ই সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে, তবু তাতে বিশেষ কোন ফায়দা হয় নি। অতপর আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে একটি সুসংগঠিত ও সুসংহত সমাজব্যবস্থা কায়েম করবার জন্য শেষনবী হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) প্রেরণ করলেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রথম দিকে তাঁর নিজের জাতির প্রতি সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেন। তারপর তাঁর বিধান মেনে নেবার জন্য অন্য সব জাতিকেও আহ্বান জানালেন। এমনি করে ইসলাম নামে পরিচিত হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শিক্ষাবিধান সমগ্র মানবসমাজের জন্য সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ধর্ম বা জীবনদর্শনরূপে গণ্য হল।
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নবুয়ত থেকেই বোঝা যায় যে, আল্লাহতায়ালা বার বার মানুষের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চেয়েছেন। যারা হযরতের আহ্বানে সাড়া দিলেন, কেবলমাত্র তাঁরাই আল্লাহর দিক থেকে সত্যিকার মু'মিন বলে গণ্য হলেন। 'ইসলাম' শব্দের অর্থ হল, আল্লাহ'র ইচ্ছার ওপর আত্মসমর্পণ বা আনুগত্য। এজন্যেই আল্লাহর এক নাম "মালিক”। আর এ থেকেই আল্লাহতায়ালা ও তাঁর অধীনস্থ মু'মিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের আসল প্রকৃতি বুঝতে পারা যায়। ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা একটি চুক্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত। চুক্তিটি অবশ্য দুটো সমস্থানীয় দলের মধ্যে সম্পাদিত হয়নি। আল্লাহতায়লার প্রতি আনুগত্যের ভিতিতেই এ চুক্তি সম্ভব হয়েছে। মানুষের সঙ্গে আল্লাহর চুক্তির প্রকৃতিও এরই মধ্যে নিহিত আছে। কেবলমাত্র ধর্মতত্ত্বের ব্যাপারে যে একথা সত্য, তা নয়- ইসলামী আইনের বেলায়ও এটা সমানভাবে প্রযোজ্য। চুক্তি জিনিসটি ইসলামী আইনে একদলের প্রস্তাব ও অন্য আর একদলের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর নিজের জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতিটি মানুষের কাছে হযরত ইসলামের জীবনাদর্শ পেশ করেন। যাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ঐহিক ও পারত্রিক কল্যাণের তাগিদে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর আত্মসমর্পণ করলেন। পরবর্তী যুগে ইসলামী সমাজে প্রতিটি মুসলমানের ব্যাপারে তা তিনি ধর্মান্তরিত মুসলমান হোক আর না হোন-ব্যক্তিগত আনুগতামূলক চুক্তির ভিত্তিটা ধরে নেয়া হয়েছে।
ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের পেছনে কি একটি চুক্তি ছিল, না দুটি? একক চুক্তির নীতিতে বলা হয়: সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে সমাজব্যবস্থার পত্তন করে। আল-ফারাবী ও হবসের মতে, সার্বজনীন চুক্তির মাধ্যমে পরস্পরবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগণ সার্বভৌম শাসকের আনুগত্য মেনে নেয় চিরকালের জন্য। আবার দু'টি চুক্তির নীতিতে বলা হয়েছে: প্রথম চুক্তি সম্পাদিত হবার পরে সমাজ কায়েম হলে পুনরায় আর একটি চুক্তির দ্বারা শাসক নিযুক্ত করা হয়। শাসককে অবশ্য কতগুলো শর্ত ও পরিসীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয়। এখন প্রশ্ন হল, এ দুই প্রকারের চুক্তির মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্র কোন্ পর্যায়ে পড়ে? ইনজিলের রাষ্ট্রনীতির আলোকে ইহুদীদের জাতীয় চুক্তিকে একক চুক্তি বলেই ধরে নিতে হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে আল্লাহর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) রাষ্ট্র ও তাঁর পরবর্তী খলিফাদের রাষ্ট্রের মধ্যে এ ব্যাপারে বিশেষ কোন পার্থক্য চোখে পড়ে না। অবশ্য একথা সত্য যে, যদিও আল্লাহ রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ শাসক নন, তবু উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহকে সার্বভৌম বলে মনে করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) শাসনব্যবস্থায় কেবল শাসনবিভাগ নয়, আইন ও বিচার বিভাগও একীভূত ছিল। স্বয়ং আল্লাহর বার্তাবাহক হিসেবে শাসনব্যবস্থার সমস্ত ক্ষমতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে: সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত ছিল একমাত্র আল্লাহর ওপরেই; আর আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসন করবার জন্য আইনের প্রয়োগ ও রূপায়ণের বিষয়টি দেয়া হয়েছিল হযরত মুহাম্মদের (সঃ) হাতে। রাষ্ট্রের নামকরণের দিক থেকেও শাসক ও শাসন-কর্তৃত্বের উৎস হলেন আল্লাহ; আর সরকার পরিচালনার ভার পড়ল হযরতের ওপর।
হযরতের মৃত্যুর পর পয়গম্বরী রাষ্ট্রের বিবর্তন ঘটল। পরবর্তী যুগে শাসনকর্তা নিয়োগের কোন সুনির্দিষ্ট পন্থা হযরত নির্ধারিত করে দিয়ে যান নি। আল্লাহর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হযরতের অবর্তমানে আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি কি বাতিল হয়ে গেছে?- এমনি ধারা অনেক বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি হল। এ বিষয় নিয়ে ইসলামী সমাজে দুটো দল মাথা তুলে দাঁড়াল। একদল যুক্তি দেখিয়ে বললেন, হযরতের প্রতি ত' তাঁদের প্রকৃত আনুগত্য ছিল না তাঁদের প্রত্যক্ষ আনুগত্য ছিল একমাত্র আল্লাহর প্রতি। তাই পরবর্তী যুগে শাসনকর্তা নিয়োগ করে আল্লাহর নির্দেশাবলী রূপায়ণের পন্থা নির্ধারণের বিষয়টি তাঁরা খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। অন্য দলটিতে ছিল বেদুঈনরা। তারা সরদারের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যের গোত্রীয় নীতি পালনে অধিক অভ্যস্ত ছিল। তারা বলতে লাগল: হযরতের ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি তাদের আনুগত্যের অবসান হয়েছে। মদিনার নবনিযুক্ত শাসন-কর্তৃপক্ষকেও তারা অমান্য করতে চাইল।
এ সব বাক-বিতণ্ডার অবসানে সমঝোতার ভেতর দিয়ে এক নতুন নিয়ম প্রবর্তিত হল। অবশ্য, এ বিরোধের অবসান ঘটানোর ব্যাপারে শক্তির প্রয়োগ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। শাসনব্যবস্থার প্রধান হিসেবে হযরতের স্থান দখল করলেন তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া বিধান আল্লাহর নিকট থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া ও রূপায়িত করা, হযরতের এ কাজ থেকে তিনি রেহাই পেলেন। খলিফা ঘোষণা করলেন যে, তাঁর কাজ হবে শুধু আল্লাহর দেয়া বিধান কার্যকরী করা ও সে অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা। ফলে আইনগত ও শাসন-ক্ষমতা যে কেবল আলাদা হয়ে গেল, তাই নয়— দার্শনিক বিচারে দেখা যায় যে, আল্লাহর দেয়া আইন প্রণয়নের পর্যায়ও শেষ হল। খলিফার বিচার-ক্ষমতা আইনের ব্যাখ্যার মধ্যে সীমিত হয়ে এল। কিন্তু তাঁর নতুন আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা আর রইল না। এখন দেখা যাক, এ নতুন পরিস্থিতিতে ইসলামী রাষ্ট্রে চুক্তির ভিত্তিটার কতখানি রদ-বদল হয়েছে?
মনে রাখা দরকার যে, একক চুক্তির নীতিতে জনগণকে একেবারে নিষ্ক্রিয় বলে মনে করা হয়েছে। হযরতের পরবর্তী যুগে গণমান্য মুসলমানদের দ্বারা খলিফা নির্বাচন শাসন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মনোনয়নের ব্যাপারে গণতন্ত্রের পত্তন করেছিল। ফলে প্রথম চুক্তির সঙ্গে আর একটি নতুন চুক্তি সন্নিবেশিত হয়—মুসলিম সমাজ (উম্মা) ও খলিফা পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। আল্লাহর বিধান কার্যকরী করার জন্যই খলিফাকে নিযুক্ত করা হল। প্রথম ও দ্বিতীয় চুক্তি—এ দুটোর সম্মেলনে এক পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে আল্লাহর প্রতি জনগণের আনুগত্য নতুন করে কার্যকরী হল। আবার সমগ্র জনগণের আনুগত্যের মতোই খলিফা আল্লাহর সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন এবং সে চুক্তি অনুযায়ী কর্তব্য সমাধা করতেও তিনি বাধ্য ছিলেন।
এ প্রশ্ন অবশ্য উঠতে পারে যে, খলিফা কার কাছে সরাসরি দায়ী ছিলেন? আল্লাহর কাছে না জনগণের কাছে? দ্বি-চুক্তির নীতি অনুসারে ক্ষমতার ওপর কয়েকটি বিশেষ শর্ত ও পরিসীমার ভিত্তিতে শাসককে নিযুক্ত করা হয়। কাজেই যে খলিফা হযরতের মতোই ক্ষমতা (পয়গম্বরী ও মৌলিক আইনগত ক্ষমতা ভিন্ন) ভোগ করেন, তাঁকেও জনগণের কাছে দায়ী থাকতে হয় আল্লাহর দেয়া বিধান কার্যকরী করার বিষয়ে বিশ্বস্ত তার নজির হিসেবে। কিন্তু খলিফা যদি সুষ্ঠুভাবে তাঁর কর্তব্য সমাধা করতে না পারেন, তবে কি তাঁকে পদচ্যুত করা চলবে? মুসলিম আইন ও ধর্ম-শাস্ত্রবিদগণ এ-ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। আল-মাওয়ার্দী (৯৭৪-১০৫৮ খৃস্টাব্দ) আদর্শস্থানীয় খলিফার প্রয়োজনীয় গুণাবলী ও কার্যধারা বিশদভাবে বিবৃত করেছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন যে, যদি খলিফা যথাযথরূপে তাঁর কর্তব্য সমাধা না করেন বা কর্তব্য সম্পাদনে অক্ষম হন, তবে খলিফার মত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার তাঁর কোন অধিকার নেই। মাওয়ার্দী অবশ্য দেখান নি যে, কোন্ সুষ্ঠু আইনগত পদ্ধতির মাধ্যমে খলিফাকে অপসারণ করা হবে। একমাত্র খারেজীরা খোলাখুলিভাবে বিপ্লবের নীতি ঘোষণা করেছেন। তাঁদের মতে খিলাফত হল দ্বিতীয় চুক্তিভিত্তিক সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। এ চুক্তি অনুসারে যে খলিফা তাঁর কর্তব্যে অবহেলা করেন, তাঁকে পদচ্যুত বা নিবৃত্ত করার ক্ষমতা জনগণের রয়েছে। কারণ, নির্বাচন করার ক্ষমতা আছে একমাত্র তাদেরই। এর বিরুদ্ধে এক পাল্টা মত পেশ করেছেন আল-আশারী (মৃত্যু ৯৩৫ খৃস্টাব্দ)। তিনি গণ-বিপ্লবের দাবী সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। খলিফা তাঁর কর্তব্যে অবহেলা করলেও জনগণ তাঁর প্রতি সম্পূর্ণরূপে অনুগত থাকতে বাধ্য। খলিফার প্রতি আনুগত্যের দাবী খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। আল- আশারী বলেন: "আমরা মুসলমানদের ইমামদের (খলিফাদের) ও তাঁদের ইমামতের মঙ্গলাকাঙ্খী। তাঁরা সত্য-ভ্রষ্ট হয়েছেন, এ অজুহাতে যারা তাঁদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান অনুমোদন করে, তাদের আমরা ভ্রান্ত বলে সাব্যস্ত করছি। তাঁদের (ইমামদের) বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান আমরা অনুমোদন করি না। গৃহযুদ্ধে পক্ষাবলম্বন না করারই আমরা পক্ষপাতী।" পরবর্তী যুগে মুসলিম ব্যবস্থাপকদের মধ্যে খলিফার পদমর্যাদা বৃদ্ধি এবং গোলযোগ ও অরাজকতার আশংকায় তাঁর ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেবার অধিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষার তাগিদে কোন কোন চিন্তানায়ক যে কোন শাসককেই মেনে নেবার সপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। সে শাসক চরিত্রবান বা ন্যায়পরায়ণ হোন বা না হোন, তাতে কিছুই আসে যায় না। ফিতনা' বা গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে আল-কোরআনে যে সতর্কবাণী রয়েছে, তারই নজির দিয়ে এ ধরনের শাসনকে সহজে মেনে নেবার সপক্ষে যুক্তি দেয়া হয়েছে। আইনজ্ঞগণ বিদ্রোহের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে বার বার বলেছেন যে, শৃংখলামূলক স্বৈরতন্ত্র ও অসাধুতা অরাজকতার চাইতে বহুগুণে শ্রেয়। প্রতিষ্ঠিত শাসকের প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে বদরউদ্দীন ইবনে জামআর (মৃত্যু ১৩৩৩ খৃস্টাব্দ) মতের চাইতে বেশী সঙ্গত উদাহরণ আর নেই। ক্ষমতা লাভের পদ্ধতি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি বলেন: "নেতৃত্বহীন অবস্থায় কোন অযোগ্য ব্যক্তিও যদি শক্তিবলে ও বায়াত ব্যতীত ক্ষমতা লাভ করেন, তবে তাঁর ইমামত অবশ্য পালনীয় বলে সাব্যস্ত হবে এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য মুসলিম জাতির ঐক্য রক্ষার্থ বিশেষ প্রয়োজনীয় বলে গণ্য হবে। তিনি অত্যাচারী, পাপাচারী ও অশিক্ষিত হতে পারেন, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। যদি এই শক্তিধর ইমাম অন্য এক ইমামের বিরোধিতার সম্মুখীন হন এবং শেষোক্ত ইমাম প্রথম ইমামকে শক্তিবলে পরাজিত করেন, তবে শেষোক্ত ইমাম মুসলমান জাতির স্বার্থ ও ইসলামের ঐক্যের তাগিদে সর্বসম্মত ইমাম হিসেবে গণ্য হবেন।" ইবনে উমরের একটি উক্তি থেকেও এর প্রমাণ মেলে। তিনি বলেছেন: "যিনি বিজয়ী হবেন, আমরা তাঁরই পক্ষে থাকব।" আল্লাহ-প্রদত্ত সার্বজনীন আদর্শতন্ত্র যে সব রাষ্ট্রে আদি ও মহান খোদায়ী উৎস থেকে পাওয়া পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতা একীভূত করা হয়, তাকে অনেক সময় ভুল করে 'থিওক্রেসী' বলে অভিহিত করা হয়েছে। যে রাষ্ট্রে ধর্মীয় ও পার্থিব—এ দু'ভাগে ক্ষমতা বিভক্ত হয়েছে, সে রাষ্ট্রকেও কোন কোন লেখক থিওক্রেসীর আওতায় ফেলেছেন। কারণ, তাঁদের মতে সব রকমের ধর্মীয় রাষ্ট্রই থিওক্রেসীর পর্যায়ে পড়ে। একথা অবশ্য ধরে নেয়া হয় যে, পার্থিব ক্ষমতা ধর্মীয় ক্ষমতা দ্বারাই সমর্থিত হয়। যে ক্ষমতা আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি উদ্ভূত হয় ও স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রযুক্ত হয়, আর যে ক্ষমতা আল্লাহর দেয়া বিধান থেকে উদ্ভূত হয়, তাঁর প্রতিনিধির (পার্থিব শাসক) দ্বারা বাস্তবায়িত হয় এবং শাসক ও জনগণ উভয়কেই নিয়ন্ত্রিত করে—এ দুই ক্ষমতার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য নির্দেশ করা প্রয়োজন। ক্ষমতার মৌলিক উৎস ও প্রয়োগের মধ্যে তফাতটুকুই প্রমাণ করে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের পূর্বকথিত আলোচনার সঙ্গে 'থিওক্রেসী' কথাটির কোন সামঞ্জস্য নেই।
ইসলামী রাষ্ট্র তা হলে কোন্ পর্যায়ে পড়বে? আরাম্ভর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা যদি যুক্তির মাধ্যমে বা শক্তিবলে এক ব্যক্তির করায়ত্তে আসে, তবে তাকে রাজকীয় বা সংকীর্ণ দলীয় শাসক বলে ধরে নিতে হবে। আর জনগণ যেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলে বিবেচিত হয় এবং সে ক্ষমতা যেখানে তাদের সম্মতিভিত্তিক হয়, তবে সেখানেই পাওয়া যাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাইডার স্মিথ বলেন:
"একটি রাষ্ট্রকে তখনই থিওক্রেসী বলা চলবে, যখন তা দেবতা বা দেবতাগণ দ্বারা শাসিত হয়।"
'অক্সফোর্ড অভিধান' থিওক্রেসীর সংজ্ঞা দিয়েছে এ ভাবে:
"থিওক্রেসী এমন এক সরকার, যেখানে আল্লাহকেই বাদশাহ বা প্রত্যক্ষ শাসনকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।"
ফ্লেভিয়াস জোসেফাস থিওক্রেসী বলতে খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর ইসরাইলীয় রাষ্ট্রকেই বুঝেছেন। জোসেফাস বলেন:
"আচার-ব্যবহার ও আইন-কানুনের ব্যাপারে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে বিস্তর প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। এগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা যেতে পারে—কোন কোন আইনবেত্তা বাদশাহী শাসন, কেউ-বা সংকীর্ণ দলগত কর্তৃত্ব, আবার কেউ বা গণতান্ত্রিক সরকার অনুমোদন করেছেন। কিন্তু মূসা (আঃ) আমাদের সরকারকে থিওক্রেসী বা আল্লাহর সরকার বলে সাব্যস্ত করেছন। এ সরকারের বৈশিষ্ট্য হল এই যে, এখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা আল্লাহর ওপরেই আরোপ করা হয়। হযরত মূসা (আঃ) সমগ্র ইহুদী জাতিকে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে করে তাঁরা একমাত্র আল্লাহকেই সর্বময় কর্তা বলে মনে করে।"
ওয়েলহ'সেন জোসেফাসের মত মেনে নিয়ে আরব রাষ্ট্রকেও এই একই আওতায় এনে শামিল করেছেন। তিনি বলেছেন: কেবলমাত্র কাগজে-কলমেই ইসরাইলীয় থিওক্রেসী বিদ্যমান ছিল; ইহুদীদের পতনের যুগেই কেবল আমরা আদর্শ ইহুদী রাষ্ট্রের নজির পাই। আদতে রাজনীতির সঙ্গে খৃস্টান ধর্মের কোন সম্পর্ক ছিল না। অবশ্য খৃস্টান ধর্মে ক্রমশঃ এ প্রথা স্থায়ী হয়ে পড়ে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাঁর হাতেই থাকুক না কেন, তাঁকেই আল্লাহর অনুমোদিত শাসন কতৃর্পক্ষ বলে ধরে নিতে হবে। রাষ্ট্রশক্তি যখন খৃস্টান ধর্মকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিল, তখন রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে প্রয়োজন হয়ে পড়ল চার্চের সমর্থন। আর আল্লাহর আইন রূপায়িত করাই হয়ে গেল রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য। খৃস্টান ধর্ম ও রাষ্ট্রশক্তি তখন পরস্পরের সাথে এত নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে গেল যে, তার ফলে খৃস্টান ধর্ম খৃস্টীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হল।
এ কথাটা মনে রাখা দরকার যে ইহুদী ধর্ম, খৃস্টান ধর্ম ও ইসলামে আল্লাহকে মানুষের প্রত্যক্ষ শাসক বলে মনে করা হয় নি। তাঁর প্রতিনিধি বা খলিফারাই ছিলেন প্রকৃত শাসক। তাই আল্লাহর আইন বা পবিত্র বিধানই শাসন-ক্ষমতার উৎসরূপে গণ্য হত। এসব ধর্মীয় ব্যবস্থা—যা শাসন ক্ষমতা রূপায়িত করার ব্যাপারে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে, তাই হল আল্লাহর আইন। আল্লাহর বিধানের স্থান রাষ্ট্রেরও অনেক ওপরে—এ বিধান রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তাই বলা চলে যে, আল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন পরিচালনা করেন না—তাঁর দেয়া আইনের দ্বারাই শাসন পরিচালনা করা হয়, এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। এ ধরনের সরকারকে আল্লাহর শাসন না বলে আইনানুগ সরকার (Nomocracy) বলাই বেশী ঠিক বলে মনে হয়। অক্সফোর্ড অভিধানে আইনানুগ সরকারের এ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে: আইনগত বিধানের ওপর যে সরকার গড়ে উঠে অর্থাৎ সমাজে আইনের রাজত্ব। ইসরাইলীয়, খৃস্টীয় ও ইসলামী রাষ্ট্রগুলো আল্লাহর আইন ও বিধানের ওপর স্থাপিত ছিল। তাই এ রাষ্ট্রগুলোর নাম দেয়া যেতে পারে, আল্লাহর আইনানুগ সরকার।
ইসলামী রাষ্ট্রকে কি আল্লাহর আইনানুগ জাতীয় রাষ্ট্র, না সার্বজনীন রাষ্ট্ররূপে মনে করতে হবে? হযরত মুহাম্মদ (সঃ) শুধু আরব জাতিকেই সত্য ধর্মের পথে নিয়ে এসেছিলেন, না গোটা দুনিয়ার প্রতিই ছিল তাঁর উদাত্ত আহ্বান—ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপটি নিহিত রয়েছে এ প্রশ্নের জবাবের মধ্যেই। এ ব্যাপারে যদিও পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধের সুরাহা হয় নি, তবু রাষ্ট্র যখন আল্লাহর দেয়া নতুন আমানত বাস্তবায়িত করার উপায় বৈ আর কিছু নয়, তখন ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র তামাম দুনিয়ার কল্যাণেই নিয়োজিত হয়েছে, কেবল আরব জাতির জন্য নয়—নিঃসন্দেহে একথা বলা চলে। অবশ্য আল-কোরআনে কোন কোন নির্দেশের মধ্যে আরবীয় ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ নজরে পড়ে। বিশেষ লক্ষ্য করবার যে, প্রথম দিকে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবীয় আচার-ব্যবহার অনেকাংশে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আল-কোরআনে গোড়া থেকেই সার্বজনীন রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তি স্বীকৃত হয়েছিল, আল্লাহর দৃষ্টিতে সব গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সাম্য ও একই রাষ্ট্র প্রধানের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে।
খৃস্টান ধর্মের মত ইসলামও এমন এক সমাজে উদ্ভূত হয়েছিল, যেখানে সংকীর্ণ ভাবধারা ও স্থান-কেন্দ্রিক সংকীর্ণতার ছিল কায়েমী আসন। এ দুটো ধর্ম এ অবস্থার প্রতিবাদ হিসেবেই জন্ম নিয়েছে। তাই গ্রীকজগতে প্রচলিত সার্বজনীন ভাবধারার মূল্যবোধ তাদের সম্বল হল। আলেকজান্দার কর্তৃক মানবজাতির ঐক্য প্রচারিত হবার সময় থেকে যে ধারা চলে আসছিল, ক্রমে তাই সংকীর্ণ পথ পেরিয়ে সার্বজনীন ভাবধারায় এসে রূপ পেয়েছিল, স্টোয়িকগণ সার্বজনীন মূল্যবোধের মাধ্যমে যে দার্শনিক তত্ত্বের পত্তন করেছেন, তা আলেকজান্দারের ভাবধারাকে সুপ্রসারিত করেই সম্ভব হতে পেরেছে। রোমানদের হাতে আলেকজান্দারের ভাবধারা ও স্টোয়িক-দর্শন সুসম জীবন ব্যবস্থাতে পরিণত রূপ লাভ করেছে। এসব ভাবধারার প্রভাবের ফলেই খৃস্টান ধর্ম ও ইসলামের উদ্ভব সম্ভব হয়েছিল। এ অবস্থায়ই ইসলামকে সার্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করতে হয়েছে। আরব-বিজয়ের পরবর্তীযুগে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে গ্রীক ভাবধারায় সম্পৃক্ত হয়। এসব মূল্যবোধ গৃহীত হবার পূর্বেই আমরা দেখতে পাই, ইহুদী রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিবর্তন। স্বাভাবিকভাবেই তা ছিল সংকীর্ণপন্থী। ইহুদীদের আল্লাহর বিশেষ অনুগৃহীত জাতি বলে মনে করা হয়। ইহুদী রাষ্ট্রকে সার্বজনীন রাষ্ট্র বলা চলে না—সে রাষ্ট্র ছিল জাতীয় রাষ্ট্র।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 আইনের প্রকৃতি ও উৎস

📄 আইনের প্রকৃতি ও উৎস


আচারগত আইন ও ইসলামী আইন

প্রাক-ইসলামী আইনের সঙ্গে ইসলামী আইনের কোন সম্পর্ক নেই বলে মুসলিম আইনবিদগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন। কারণ, ইসলামী আইন হল আল্লাহ-প্রদত্ত বিধান। কেউ কেউ এতদূর বলেছেন যে, আল-কোরআনে সর্ববিষয়ের বিশদ বর্ণনা থাকায় ইসলাম প্রাক-ইসলামী যুগের আইনের সকল বিধানই বাতিল করে দিয়েছে। আবার অনেকে, বিশেষ করে মালিকী ও হানাফী আইনবিদগণ প্রাক-ইসলামী যুগের আইন-কানুন ও আচার-ব্যবহারের মধ্যে কেবলমাত্র সেগুলোই গ্রহণ করেছেন, যেগুলো আল্লাহর আইন দ্বারা বাতিল হয়ে যায় নি। শেষোক্ত অর্থাৎ হানাফী ও মালিকী আইনবিদেরা প্রাক-ইসলামী যুগের আইন অংশতঃ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পূর্বোক্ত আইনবিদগণ প্রাক-ইসলামী যুগের সব রীতি-নীতি বাতিল করে দিতে চেয়েছেন।
অবশ্য এ দুদলের মধ্যে মূলতঃ কোন বৈসাদৃশ্য বা বিরোধ নেই— একথা প্রমাণ করার জন্য ইবনে খালদুন "বাতিলকরণ” কথাটির জায়গায় "বিকল্পীকরণ” কথাটির প্রবর্তন করেছিলেন। প্রাক-ইসলামী আইনের মূল্যমান নির্ধারণ না করেই তিনি একথা বলেছেন। ইসলামী আইনের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে কোন দলের আইনবিদেরাই যথাযথ ব্যাখ্যা পেশ করেন নি। অবশ্য ইসলামী আইন যে আরবদের আচার-ব্যবহার থেকেই বিবর্তিত হয়েছে, তাঁর যথেষ্ট নজির পাওয়া যায়। ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিজিত দেশের আচার-ব্যবহার ইসলামী আইনের সঙ্গে বেমালুম মিশে গিয়েছিল। ভিন্নতর ধর্মীয় ব্যবস্থার ইতিহাসেও আমরা এই একই ব্যাপার দেখতে পাই।
আচারগত আইনের ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত ছিল আইনগত ও নৈতিক নির্দেশাবলী। এগুলোই 'ঐতিহ্যগত সুন্না' (Customary Law) নামে অভিহিত। আরব জাতির পূর্বপুরুষদের আচার-ব্যবহার থেকেই এ প্রাচীন 'সুন্নার' উৎপত্তি হয়ে ছিল; আর বাস্তব রূপায়ণের মধ্যেই নিহিত ছিল এর আইনগত ভিত্তি। প্রাক-ইসলামী আরবের সামাজিক কাঠামো এবং এমন কি মক্কা ও মদিনার মত বড় বড় শহরও সম্পূর্ণরূপে নাগরিক পরিবেশে গড়ে ওঠে নি। তাই এসব স্থায়ী বাসিন্দাদের আচার- ব্যবহারের প্রকৃতি গোষ্ঠী-কেন্দ্রিক বেদুঈনদের আচার থেকে খুব বেশী পৃথক ছিল না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি জনপদের খৃস্টান ও ইহুদীরা তাদের স্বীয় আইন দ্বারা পরিচালিত হত। এদের বাদ দিলে আরবে পৌত্তলিকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। কাজেই মূলতঃ এ ঐতিহ্যবাদ ইসলামভিত্তিক ছিল না; যাযাবর ও আধা-যাযাবর বেদুইনদের প্রয়োজন ও আনুগত্যের ওপরেই ছিল এর ভিত্তি।
রাজনৈতিক ঐক্যের স্বল্পতা ছিল এ সমাজের বৈশিষ্ট্য। সব গোষ্ঠীগত সমাজ-ব্যবস্থারই এই দশা। "সাইয়িদ" বা গোষ্ঠীর সরদার নিয়োগ করার সময় সরদারের বয়স, বংশ-মর্যাদা, মেধা সুখ্যাতির মূল্য ছিল সব চাইতে বেশী। গোষ্ঠীর লোকদের বিশ্বাস ও সম্মানভাজন হওয়ার ওপরেই তাঁর শাসন ক্ষমতা নির্ভর করত। কারণ, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তখন যেমন দুর্বল ও শিথিল ছিল, তেমনি তার ক্ষমতাও ছিল সীমাবদ্ধ।
আচারগত আইনের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিষয়ের মীমাংসা করা সরদারের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে বিবেচিত হত। আর গোষ্ঠীগত জনমতের ভয়ে এগুলো সবাই মেনে চলত। কিন্তু আচারগত আইনের বাইরে কোন হুকুম জারী করার ক্ষমতা সরদারের ছিল না। কারণ, আইন-প্রণয়নের ক্ষমতার এখতিয়ার তাঁর ছিল না — তাঁর হাতে ছিল কেবলমাত্র গোষ্ঠীর শাসন কর্তৃত্ব। অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে সরদারই নিজের গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতেন। কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সার্বভৌম-ক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকার কেবল তাঁরই ছিল। কাজেই আরবীয় ঐতিহ্যগত 'সুন্না' হল এক প্রাচীন সমাজব্যবস্থার সাধারণ আইন। অপেক্ষাকৃত শিথিল রাজনৈতিক সংস্থায় সরদারের উদার কর্তৃত্বের পরিপূরক হিসেবে কাজ করত এই আইন। 'দাখালা' বা আশ্রিতের সাহায্যের ব্যাপারে সরদারের কর্তৃত্বের চাইতে সামাজিক বিধান সুন্নারই প্রতিপত্তি ছিল সব চাইতে বেশী। ঊষর মরু-জীবনে জীবনধারণের সংস্থানের ব্যবস্থা ছিল নিতান্ত নগণ্য। আর এ কঠোর জীবন-সংগ্রামে সামাজিক ঔদার্যের নীতিগুলোই কেবল জীবনকে কিছুটা সহনীয় করে তুলতে পারে।
'দাখালা' ও 'নাজদা' প্রভৃতি আচারগত আতিথেয়তার বিধানের মাধ্যমে ধূসর মরু প্রান্ত রে অসহায় পথচারীদের খাদ্য, আশ্রয় ও সাহায্যের একমাত্র অবলম্বন ছিল। সরদারের কর্তৃত্ব ছিল নিতান্ত নগণ্য এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সরদারের কর্তৃত্ব একেবারে ছিল না বললেই চলে। প্রতিশোধের প্রথা ও চোরের হাত কেটে দেবার কঠোরতম রীতি প্রচলিত হবার ফলে এ কর্তৃত্ব কিন্তু অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রতিশোধের প্রথার মাধ্যমে ব্যক্তি-জীবনে নিরাপত্তা এবং হাত কাটার রীতির ভেতর দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হত। এ সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার কেউ বড় একটা স্বীকার করত না; তাই চৌর্যবৃত্তির দিকে একটা স্বাভাবিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যেত। যদিও যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে কতকগুলো কঠোর সামাজিক বাধা-নিষেধ ছিল, তবু পুরুষেরা বিবাহের ব্যাপারে অবাধ ও উচ্ছৃঙ্খল অধিকার ভোগ করত—বাধাহীনভাবে বহুবিবাহ, মুতা (অস্থায়ী বিবাহ) ও বিবাহ-বিচ্ছেদ ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। অতি নিকট-আত্মীয় মহিলাদের বিবাহ করতে পুরুষদের পক্ষে কোন বাধাই ছিল না। বিমাতা ও স্ত্রীর ভগিনীদের সঙ্গেও বিবাহ অনুমোদিত ছিল। সর্বোপরি পৌত্তলিকতা আচারগত বিধি-ব্যবস্থার এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছিল, যার ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যধারা—যেমন হজ্জ্ব ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবেই গণ্য হত। এমন কি গ্রীক দৈববাণীর পুরোহিতদের (Oracle) মতো কাহিন বা দৈবজ্ঞ কবিরাজগণ ধর্ম-নির্ধারিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্তব্য পালন করতেন।
গোড়ার দিকে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এসবের রদবদল করতে কিংবা আচারগত নিয়ম লংঘন করতে চান নি। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিক বিধান মেনে চলতেন, যার ফলে তিনি "আমীন" বা বিশ্বস্ত নাম অর্জন করতে পেরেছিলেন। মক্কা অবস্থান কালে তিনি একথা বিশেষ জোর দিয়ে ঘোষণা করেন যে, তাঁর জীবন-সাধনা হল সাধারণ মানুষকে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেয়া ও আল্লাহর একত্ব প্রচার করা। তিনি বার বার ঘোষণা করেন যে, অসত্য ও কালিমার প্রতীক প্রতিমার স্থানে এক আল্লাহর ইবাদাত কায়েমই তাঁর লক্ষ্য। তবু বিরুদ্ধবাদীদের দৃষ্টিতে পৌত্তলিকতার উৎখাত ও অবসান করাই ছিল সামাজিক আচার লংঘনের শামিল। প্রাচীন সমাজ-ব্যবস্থায় আইন ও ধর্মীয় আদর্শ এতটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল যে, ধর্মের ওপর আক্রমণ আর প্রচলিত সামাজিক বিধি লংঘন ছিল একই ব্যাপার। তাই পৌত্তলিকতা বর্জন করে এক আল্লাহকে মেনে নেবার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যে আহ্বান জানালেন, তার ফলে পৌত্তলিক আচার-ব্যবহারের স্থানে আল্লাহর বিধানের সার্বভৌমত্বই প্রতিষ্ঠিত হল।
ইসলামী আইনের স্বরূপ
ইসলামী জীবন-দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এই যে, এর আইন-ব্যবস্থা অন্যান্য যে কোন ধর্মের চাইতে অনেক বেশী সুস্পষ্ট। শেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ওহীর মারফত যে আল্লাহর বাণী প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তাই আইনের ভিত্তিরূপে কাজ করেছে। আর আল্লাহ-প্রদত্ত এ ব্যবস্থাই বিশ্বাসীদের জীবন ও চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রিত করে। এইভাবে ইসলাম নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও ভাল-মন্দের ওপর ভিত্তি করে এক অভ্রান্ত ন্যায়নীতির ব্যবস্থা কায়েম করেছে। এ ব্যবস্থা আদর্শস্থানীয় বলে দাবী করতে পারে। কারণ, এ আইন স্বয়ং আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে এবং ইচ্ছা ও ন্যায়নীতির ধারণা থেকে জন্মলাভ করেছে।
ইসলামী আইন অনুসারে একমাত্র আল্লাহই হলেন সব ক্ষমতার মালিক; স্বয়ংসম্পূর্ণ আইনের নীতি সম্পর্কে একমাত্র তিনিই ওয়াকিবহাল রয়েছেন। ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মে এ আইনকে আল্লাহর ইচ্ছার প্রকাশ বা আল্লাহর প্রত্যক্ষ সৃষ্টি হিসেবে দেখান হয়েছে। মুসলিম আইন ও ধর্মবেত্তাগণ কিন্তু একে আর এক ধাপ ওপরে দাঁড় করিয়েছেন। বিশেষ করে সনাতনপন্থীদের হাতে মু'তাযিলাদের পরাজয়ের পর এ অবস্থারই সৃষ্টি হয়েছিল। গোড়া থেকেই আল্লাহর আইন আল-কোরআনে বিধিবদ্ধ রয়েছে। একে প্রাকৃতিক নিয়ম বলে অভিহিত করা চলে। আল্লাহর অস্তিত্ব ও আল্লাহর আইনের কর্তৃত্ব তাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাশ্চাত্যে যেমন প্রাকৃতিক নিয়ম বলতে সাধারণ ন্যায়নীতিভিত্তিক আদর্শ আইন-ব্যবস্থা বুঝাত, তেমনি মুসলমানদের দৃষ্টিতে ইসলামী আইন হল এক আদর্শ-স্থানীয় নীতি-বিধান। আল্লাহর আইন হিসেবে এ হল, ন্যায়ানুগ, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শাশ্বত-সর্বযুগে সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কেবলমাত্র এ আইনানুগ জীবন-ব্যবস্থাই আদর্শস্থানীয় বলে নির্বাচিত হতে পারে।
মুসলিম আইন অনুসারে সমাজ ও রাষ্ট্র পত্তনের অনেক পূর্বেই এসেছে আল্লাহর প্রদত্ত আইন। আর এ আইনের রূপায়ণের জন্যই হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এ আইন-বিধান রূপায়িত করতে অসমর্থ হয়, তবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হয়ে পড়ে অর্থহীন। যদি আল্লাহর আইনের রূপায়ণের কোন ব্যবস্থা নাও থাকে, তবু বিশ্বাসীকে এ আইন অবশ্যই মেনে চলতে হবে। আইনের সামাজিক রূপায়ণের ব্যবস্থা বা কর্তৃত্ব যদি না থাকে, তাতেও কিছু আসে যায় না। কারণ, আইনের সত্যতা ও আইনের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। আইনের যথাযথ রূপায়ণের কর্তৃত্ব বা ব্যবস্থা থাকুক বা নাই থাকুক, আইনের কাজ হল বিশ্বাসীকে সহজ সরল পথ (শরিয়ত) ও জীবন-পদ্ধতির নির্দেশ দেয়া। খারেজী দল ভিন্ন অন্যসব মুসলিম আইনিবেত্তা এই সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মুসলিম সমাজে একজন ইমাম বা খলিফা থাকা অপরিহার্য। ইমামের কর্তব্য হল, আইনের যথোপযুক্ত রূপায়ণের ব্যবস্থা করা। ইমাম না থাকলে সমাজ ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়। কথিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি ইমামহীন অবস্থায় মারা যায়, তার যেন কুফুরী অবস্থাতেই মৃত্যু হল।' অবশ্য ইমাম যদি নিজে আইনের সঠিক রূপায়ণে অসমর্থ হন, তবু মুসলমানগণ আল্লাহর আইন মেনে চলতে বাধ্য। ইমাম তাঁর কর্তব্য পালনে অসমর্থ হলে মুসলিম সমাজের ইমামের পদ থেকে তিনি অপসারিত হবেন কিনা, সেটা হল এক স্বতন্ত্র প্রশ্ন।
এ আইনের দুটো দিক আছে। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও কর্তব্য আর মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক। যদি বিশ্বাসী মুসলমান এ আইন পুরোপুরিভাবে মেনে চলেন, তবে তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হল বলা চলে। কারণ, কর্তব্য পালনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে নাজাত বা মুক্তির পথ।
আল্লাহর আইনের অস্তিত্ব মানুষের ওপর নির্ভর করে না। প্রাকৃতিক নিয়মের ভিত্তিগুলো যেমন প্রকৃতিতেই বিদ্যমান রয়েছে এবং বুদ্ধিমত্তার দ্বারা বোধগম্য হয়, তেমনি ইসলামী আইনের নীতিগুলো আল্লাহর পয়গম্বরের কাছে নাযেল হয় এবং অনুরূপভাবে ইসলামী ভাবাদর্শের মধ্যেই এর তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। এ আইনের মূল সারবস্তু স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে উম্মুল কিতাবে (মৌলিক গ্রন্থ বা প্রকৃতিতে) লিপিবদ্ধ রয়েছে ও রাসূলে আকরাম হযরত মুহম্মদের (সঃ) প্রতি কাল ও অবস্থা অনুযায়ী ধীরে ধীরে নাযিল হয়েছে। এর নামই হল আল-কোরআন।
আল্লাহর আইন এক সুসংবদ্ধ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা পেশ করেছে। এ আইন সৌন্দর্য (হুসন পাশ্চাত্যের প্রচলিত ভাষায়: ভাল) থেকে কদর্যতা (কুবহ- পাশ্চাত্যের প্রচলিত ভাষায়: মন্দ) আলাদা করার পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা কিছু সুন্দর, তা-ই অনুসরণ করতে হবে আর যা মন্দ বা কুৎসিত, তা বর্জন করাই এ আইনের নির্দেশ। আল্লাহর আইনে কতকগুলো অবশ্য কর্তব্য (ফারায়েজ) নির্ধারিত হয়েছে। এ নির্দেশগুলো মুসলিমকে সহজ সরল পথে (শরিয়তে বা সরল পথে) চলতে সাহায্য করে, যাতে করে তিনি পরিশেষে নাজাত বা মুক্তি লাভ করতে পারেন।
আপাতঃদৃষ্টিতে শরিয়তকে অতি অল্প-পরিসর মনে হলেও 'ফরয' (অবশ্য কর্তব্য) ও "হারামের” (নিষিদ্ধ) মাঝখানে এক সুপ্রশস্ত বিচরণ ক্ষেত্র রয়েছে, যার মধ্যে মানদুব (বিধিসম্মত) ও মাকরুহ্ (আপত্তিজনক)—এ দু'পর্যায়ের কার্যাবলী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিধিসম্মত ব্যাপারগুলো মেনে চলতে হবে ও আপত্তিজনক কাজগুলো বর্জন করতে হবে। তবু বিধিসম্মত বিষয়গুলো অবশ্য কর্তব্য এবং আপত্তিজনক কাজগুলো একেবারে নিষিদ্ধ বলে সাব্যস্ত হয় নি। বিধিসম্মত ও আপত্তিজনক বিষয়গুলোর মাঝামাঝি এক পর্যায় রয়েছে। একে বলা হয়, "জায়েয"। জায়েযের পর্যায়ে আইনের বিধানে সুস্পষ্ট কোন বাধ্যবাধকতার উল্লেখ নেই। তাই এসব বিষয়ে বিশ্বাসী মুসলিমের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, দৈনন্দিন নামাজ ও রমজান মাসের রোজা অবশ্য পালনীয়; শূকরের গোশত সুরা ও ব্যভিচার নিষিদ্ধ; অতিরিক্ত নামাজ বা দাসমুক্তি বিধিসম্মত; হায়নার গোশত, বা হায়েযের সময় স্ত্রীকে তালাক দেয়া মাকরুহ বা আপত্তিজনক। এ দুই পর্যায়ের মধ্যে যেগুলো পড়ে না, সেগুলো হল "জায়েয" বা অনুমোদিত। ক্রয়-বিক্রয় বা যে সব চুক্তি নিষিদ্ধ নয়, তা জায়েয। আল-কোরআনে নির্দেশ রয়েছে: আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় অনুমোদন করেছেন ও "রিবা” (সুদ ও অর্থনৈতিক শোষণ) নিষিদ্ধ করেছেন (সুরা-২ : ২৭৫)।
ইসলামী আইন ও ধর্মবেত্তাগণ এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, আইনের মৌলিক নীতি হল, স্বাধিকার। কিন্তু এরও আবার পরিসীমা আছে। মানুষের স্বভাব সাধারণত: খুব দুর্বল। তাই আল্লাহর বিধান না থাকলে সে সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হয়। এ জন্যই আল্লাহর আইন হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কাছে নাযেল হয়েছিল। এ আইনের মধ্যে কতকগুলো সুদূরপ্রসারী নির্দেশ রয়েছে। ধর্ম-বিশ্বাস আর সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতি নিয়ে এর মধ্যে এক অবিভাজ্য ঐক্যেরও সৃষ্টি হয়েছে। আইনের নির্দেশ মেনে চলা যেমন ধর্মীয় কর্তব্য, তেমনি ধর্মের রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে এই আইনের ওপরেই।
ইসলামী আইনের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে মুসলিম আইন ও ধর্মবেত্তাগণ সর্বসম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। প্রথমটা হল, স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে আইনের চিরন্তনত্ব। ইসলামী রাষ্ট্রের এলাকার বাইরে বসবাস করলেও মুসলমানেরা এ আইন মানতে বাধ্য। কেবলমাত্র কোন একটি বিশেষ ভৌগোলিক গোষ্ঠীর পরিচালনার জন্য ইসলাম আসেনি। মুসলমানের ব্যক্তিগত সত্তার নিয়ন্ত্রণের জন্যই আইনের বিধান নাযিল হয়।
দ্বিতীয়তঃ, এ আইন মুসলিম সমাজের সাধারণ কল্যাণ ও নৈতিক মানকে সব চাইতে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বাসীগণের ব্যক্তিগত স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয় সাধারণ জনকল্যাণের কষ্টিপাথরে যাচাই করে। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে ব্যক্তি-স্বার্থ বিসর্জন দেবার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পারস্পরিক সমঝোতা ও সালিসির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের বিরোধ নিয়ন্ত্রিত করার দিকে খুব বেশী দৃষ্টি দেয়া হয় নি।
তৃতীয়তঃ, সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে আইনের নির্দেশ মেনে চলা চাই। ইসলামে আইন-ব্যবস্থা হল মুমিনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কার্যধারার মৌলিক ভিত্তি। সাধারণ অবস্থায় অবিশ্বাস, মোনাফেকী ও দলত্যাগ আইনের মূল উদ্দেশ্যের ঘোর বিরোধী। কতকগুলো বিশেষ ব্যতিক্রমমূলক পরিস্থিতিতে আইনের বিধানগুলো 'কিঞ্চিত শিথিল করা যেতে পারে। যেমন, যদি কোন মুমিনের জীবন বিপন্ন হয় কিংবা মৃত্যুর আশংকা দেখা দেয়। এ শৈথিল্যটুকু মধ্যমপন্থী নীতি থেকে জন্ম নিয়েছে। এর ফলে একজন মুমিন আইন নির্ধারিত কর্তব্য ও পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা সমঝোতা করার অধিকার লাভ করবেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, রমজান মাসে রোজা রাখা সব মুসলিমের উপর ফরজ বা অবশ্য করণীয়। কিন্ত সফরকালে মধ্যমপন্থীর নীতি অনুসরণ করে রোজা না রাখাও অনুমোদিত হয়েছে। অসামর্থ্যের দরুন অসুস্থ লোকের পক্ষে রোজা না রেখে পরে কাজা করলেও চলে। কর্তব্য-পালন থেকে অব্যাহতি বা অক্ষমতার ফলে আইনের বিধান কার্যকরীকরণে ব্যর্থতা সত্ত্বেও আইনের এখতিয়ারের ঊর্ধ্বে ব্যক্তি-স্বার্থের গুরুত্ব মোটেই স্বীকৃতি পায় নি। কারণ, আদর্শ ধর্মীয় আইন-ব্যবস্থার মূল্যমান মুমিনকে সব সময়েই মেনে চলতে হয়। নিজের সুযোগ-সুবিধা মত সে আইনের রদবদল করতে পারে না।
আইনের উৎস
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) ওফাতের পর মুসলিম সমাজ ইসলামের প্রাকৃতিক আইন ও আরবের সাধারণ আইন উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিল। হযরত নবুয়তের মহাদায়িত্ব তাঁর পরবর্তী যুগের খলিফাগণকে দিয়ে যান নি। তাই ইসলামী রাষ্ট্র যখন আরব দেশের বাইরে বিস্তৃত হতে চলল, তখন আল্লাহর আইন প্রণয়নের যুগ শেষ হয়ে গেল। ফলে মুসলিম সমাজ স্বভাবতঃই সামাজিক আচার-ব্যবহারের দিকে বেশী মাত্রায় ঝুঁকে পড়ল। আরবীয় জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসলামী আইন এসব আচার-ব্যবহার থেকে কিছু কিছু মাল-মশলা সংগ্রহ করেছিল।
যদি আরব দেশেই মুসলিম সমাজের ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে ইসলামী আইনের বিবর্তনে এতখানি জটিলতার সৃষ্টি হত না-আর আইনবিদদের মধ্যেও এতটা বিভিন্নতা দেখা যেত না। আরবীয় আইনের ভিত্তিতে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, মিসর প্রভৃতি নববিজিত দেশের আইনগত সমস্যার সমাধান খুব সহজসাধ্য ছিল না। প্রাথমিক যুগের খলিফা ও আইনজ্ঞগণ তাই আল্লাহর আইন ও সামাজিক আচারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত মতামত বা রায়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছেন। আইনের উৎসরূপে ব্যক্তিগত মতামতকে স্বীকৃতি দেবার স্বপক্ষে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনেক বাণী উদ্ধৃত করে দেখান হয়েছে। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) বসরার কাজী আবু মুসা আল আশারীকে যে সব উপদেশ-বাণী দিয়েছিলেন, তার মধ্যে আইনের তিনটি বিষয়ের উল্লেখ আছে: আল-কোরআন, তদানীন্তন সুন্না (আস-সুন্নাহ) ও যুক্তি। এ উপদেশ- বাণী ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুক্তি প্রয়োগের এক অকাট্য প্রমাণ। 'সুন্না' কথাটির ব্যবহারের ফলে এ দলিলটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেবল হযরত মুহাম্মদের (সঃ) জীবন- যাপন প্রণালী ও আচার-ব্যবহার অর্থে সুন্না কথাটি তখনও প্রচলিত হয় নি। কোন কোন ক্ষেত্রে সাহাবা ও খলিফাদের চাল-চলনকেও (আসার) সুন্নারই পর্যায়ভুক্ত বলে মনে করা হত। কোরআনের বিধান ও সুন্নার অবর্তমানে রায় বা ব্যক্তিগত মতামতের আশ্রয় নেয়া হত। কিন্তু বিভিন্ন মতবাদের পাকে পড়ে আইনের উৎস হিসেবে রায় শীঘ্রই পরিত্যক্ত হল। রায়ের মারফত নাকি মৌলিক আইন প্রণয়ন করার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, এভাবে অনেক আক্রমণ আসতে লাগল চারদিক থেকে। আইনবিদগণ তাই ভিন্নতর পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন: যুক্তির একমাত্র কাজ হল, কোরআন ও সুন্নার নীতিগুলোকে শক্তিশালী করা।
ইরাকে ইমাম আবু হানিফা (৬৯৯-৭৬৮ খৃস্টাব্দ) কোরআনের আয়াত ও সুন্নার অনুপস্থিতিতে আইনের উৎস হিসেবে কিয়াস-এর ওপরে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করলেন। তিনি খুব সাবধানে সুন্না বেছে নিতেন বিশেষ করে সাহাবী ও খুলাফা-ই- রাশেদার কার্যাবলীকে ভিত্তি করে। এজন্য তাঁকে তাঁর সমসাময়িক সমালোচকগণ এই বলে দোষারোপ করতেন যে, হাদিস সম্বন্ধে ইমাম সাহেবের জ্ঞান নাকি ছিল নিতান্ত সামান্য। ইমাম হানিফা অবশ্য তাঁর সমালোচকদের এই জবাব দেন যে, তিনি কিয়াসের ব্যাপারে সাহাবীদের সুন্নার ওপরেই নির্ভর করেছেন নিছক ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেন নি। কোন একটি বিষয়ে যদি ইমাম আবু হানিফা দুটো সুন্নার নজীর দেখতে পেতেন, তবে এর মধ্যে যেটা সবচাইতে কম ক্ষতিকর, সেটাই তিনি গ্রহণ করতেন। একে বলা হয় "ইস্তিহসান"। ইমাম হানিফার শাগরেদ ইমাম আবু ইউসুফের জটিল যুক্তি-পদ্ধতিকে (আল-হিয়াল) কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
কতিপয় নিয়ম-কানুনের কঠোরতা ও তার মারাত্মক ফলাফল থেকে রেহাই পাবার জন্য জটিল যুক্তি-পদ্ধতি বা 'হিয়াল' ব্যবহার করা হত। কিন্তু এর অপব্যবহারও যে হয় নি, তা নয়।
নতুন সামাজিক পরিবেশের চাহিদা মেটানোর জন্যেই ইমাম আবু হানিফা রূপকমূলক যুক্তির অবতারণা করেছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্রের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আরবীয় আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়ে পড়ল এবং আইনের ক্ষেত্রে বিবর্তন ও ক্রমোন্নতির নতুন পথ খুলে গেল। ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর শিষ্যগণ ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশের ওপরে খুব বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। ইরাক ও সিরিয়ায় ইমাম সাহেবের সমালোচকদের মধ্যে ইবনে আবু লায়লা ও আল-আউযায়ীর নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এঁরাও সামাজিক পরিবেশের দ্বারা কম প্রভাবিত হন নি। যুফার নামে ইমাম সাহেবের জনৈক শিষ্য কিয়াসের সীমা পেরিয়ে অনেক দূর অগ্রসর হন। অন্যদিকে আবার আবু ইউসুফ (মৃত্যু ৭৯৯ খৃস্টাব্দ) এবং বিশেষ করে মুহম্মদ ইবনে আল-হাসান আশশায়বানী (মৃত্যু ৮০৫ খৃস্টাব্দ) কিয়াসের ব্যাপারে খুব বেশী রক্ষণশীল ছিলেন।
মদিনায় ইমাম মালিক ইবনে আনাস (৭১৮-৭৯৬ খৃস্টাব্দ) তাঁর সমসাময়িক ইরাকী আইনবিদদের চাইতে রাসূলে আকরাম ও তাঁর সাহাবীদের সুন্নার বহুল ব্যবহার প্রচলন করেছিলেন। ইমাম মালিক ও মদিনার আইনবেত্তাগণ মদিনা নগরীকে অভ্রান্ত মুসলিম সুন্নার কেন্দ্রস্থল বলে মনে করতেন। এ কারণেই মুসলিম আইনে এ চিন্তাধারার নাম দেয়া হয়েছে হাদিসপন্থী। কথিত আছে, ইমাম মালিক তাঁর আইনের সুবিখ্যাত কিতাব "আল-মুওয়াত্তা" প্রণয়ন করেছেন কয়েক হাজার হাদিস থেকে। এ হাদিসগুলোকে তিনি সতর জন আইন ও ধর্মবেত্তার কাছে তাঁদের অনুমোদনের জন্য পেশ করেন। এ বিরাট সংকলনের মধ্যে শুধু হাদিসই স্থান পায় নি-এর মধ্যে স্থানীয় সুন্না ও মদিনার আইনবিদদের ব্যবহার-বিধান-এ সবই সংগৃহীত হয়েছিল। সুন্নার এ সংকলনটি প্রামাণ্য মুসলিম হাদিসের কিতাব হিসেবে গণ্য হত।
ইমাম মালিক হাদিস মনোনয়নের জন্য এক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন। সম্ভবত তিনিই এ পদ্ধতির আবিষ্কারক ছিলেন। মদিনার প্রখ্যাত আইনবিদগণও এ পদ্ধতি মেনে নিয়েছিলেন। এর নাম হল "ইজমা" বা ঐক্যমতে পৌঁছানো। অনেক ইরাকী আইনবিদের মধ্যে কিন্তু পরস্পরবিরোধী মতবাদ বিদ্যমান ছিল। ইমাম মালিকের মতে, হাদিসানুগ আইনের প্রশ্নে মদিনার আইনবিদদের ইজমাই আইনের ভিত্তি। সে হাদিস কখনও কখনও স্থানীয় আচার-অনুগ ছিল; আবার কখনও-বা হাদিসের স্বল্প-প্রামাণ্যতার দরুন তার বিচার করা হত ইজমা বা ঐক্যমতের আলোকে। ইরাকী আইনবেত্তাদের বিরুদ্ধে হিজাজী আইনবিদেরা ইজমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। আর বলতেন যে, ইরাকীরা রাসূলে আকরমের (সঃ) সুন্না থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। ইমাম মালিক অতঃপর "ইসতিসলাহ্” নামে এক নীতির উদ্ভাবন করেন। তিনি এর ভিত্তিতেই সামাজিক স্বার্থ ও কল্যাণের তাগিদে আইনগত অভিমত ব্যক্ত করতেন। সমগ্র সমাজের ঐক্যমত থেকেই এ পদ্ধতির অবতারণা করা হয়। কাজেই একে ইজমার একটা অংশও বলা যেতে পারে।
ইজমার নীতি গ্রহণের ব্যাপারেও বিরোধিতা কম ছিল না। কারণ, এতে এই আশংকা ছিল যে, মানুষের হাতে তা হলে আইন প্রণয়নের অধিকার চলে যাবে। আইনবিদরা ইমাম মালিকের ইজমা-নীতির কিঞ্চিৎ রদ-বদল করে সব মুজতাহিদের মতামতের গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ঐক্যমতের গুরুত্ব স্বীকার করে এ পদ্ধতিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়েছেন। নবী করিম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) এই হাদিসের ভিত্তিতে "ইজমা" যুক্তিযুক্ত বলে সাব্যস্ত হয়েছে: "আমার উম্মাতের লোকেরা ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারে কখনও একমত হবে না।" আল-কোরআনের নিম্নলিখিত আয়াতটিও অনেক সময় ইজমার যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়-'মুমিনদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ কর' (৪: ১১৫)। হযরত অন্যত্র বলেছেন: 'জ্ঞানীরা নবীদের উত্তরাধিকারী; তাই তাঁরা আল-কোরআনের ব্যাখ্যা করার পক্ষে উপযুক্ত বলে গণ্য হবেন।'
ইরাকী আইনবিদরা ইজমা সম্পর্কীয় মালিকী প্রত্যয় মেনে নিতে পারেন নি। তাঁরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, মদিনার আইনবিদদের মত ইসলামী-জগতের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদেরও 'ইজমা'-নীতি প্রয়োগের অধিকার আছে। অবশ্য আঞ্চলিক সংকীর্ণতা তাঁদের মধ্যেও সমানে বিদ্যমান ছিল। ইমাম শাফেয়ী (৭৬৮-৮২০ খৃস্টাব্দ) আঞ্চলিক ইজমার বিরুদ্ধে সব চাইতে কঠোর গঠনমূলক সমালোচনা পেশ করেন। মুসলিম আইনবিদদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা সুবিন্যস্ত আইন-দর্শনের গোড়াপত্তন করেন এবং বহুলাংশে ইজমা-পদ্ধতির সম্প্রসারণ করেন। বিভিন্ন আইনবিদের প্রদত্ত ইজমাকে যদিও-বা তিনি একেবারে নস্যাৎ করে দেন নি, তবু সমগ্র মুসলিম সমাজের ঐক্যমতকেই তিনি চূড়ান্ত বলে মনে করতেন। তাঁর মতে 'ইজমা' হল আইনগত কর্তৃত্বের সহজতম পন্থা।
স্ববিন্যস্ত আইন-বিজ্ঞান রচনা করার জন্য ইমাম শাফেয়ী আল-কোরআনকে সব চাইতে উঁচুস্থান দিয়েছিলেন। আইনের উৎস হিসেবে সুন্নাকে তিনি খুব বেশী গুরুত্ব দেন নি। প্রামাণ্য হাদিস গ্রহণ করতে অবশ্য তাঁর কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু রাসূলে আকরম হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কাছ থেকে সরাসরিভাবে যে সব বাণী পাওয়া গেছে, কেবলমাত্র সেগুলোই তিনি গ্রহণ করেন। এর ফলে সুন্নার ব্যবহার বহুল পরিমাণে স্তিমিত হয়ে এল। আইনের বিশেষ বিশেষ সূত্র রচনার ব্যাপারে তিনি মুসলিম সমাজের অবিসংবাদিত ঐক্যমতকেই অধিক প্রাধান্য দিতেন। যে সব খুঁটিনাটি ব্যাপারে আল-কোরআনে বা সুন্নায় কোনও নজির পাওয়া যেত না অথবা ইজমায় পৌঁছানোও সম্ভব হত না, কেবল সে ব্যাপারেই তিনি কিয়াস ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বলতেন যে, আইনের নীতি হিসেবে কিয়াসকে অন্যান্য উৎসগুলোর চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা যায় না। কারণ, এগুলো কিয়াসের চাইতে অনেক বেশী সুদূরপ্রসারী। বিশেষ একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে কিয়াস প্রযোজ্য হতে পারে না। কারণ, আইনের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী উপেক্ষা করে কিয়াস প্রয়োগ করা চলে না। যাঁরা আইনের উৎসরূপে কিয়াসের ভূমিকা একেবারেই স্বীকার করতেন না—আর যাঁরা কিয়াসের বহুল ব্যবহার প্রচলন করেছিলেন—এ দু'দলের মাঝামাঝি একটা সমঝোতা ইমাম শাফেয়ীর দৃষ্টিভঙ্গীতে ফুটে উঠেছে।
ইমাম শাফেয়ী মুসলিম সমাজের ঐক্যমত-অনুগ যে ইজমা পেশ করেন, তা ক্ষণস্থায়ী হল। কারণ, অন্যান্য আইনবিদই কেবল যে এর বিরোধিতা করেন তা নয়, তাঁর শিষ্যগণও ইজমার ব্যবহার অনেকখানি কমিয়ে এনেছিলেন। ইমাম গাজ্জালী সর্বসম্মত ঐক্যমতের সমর্থন করেছেন। কিন্তু তাঁর মতে এ ঐক্যমত কেবলমাত্র মৌলিক নীতিগুলোর ব্যাপারে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত—আর খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো আইনবিদদের ঐক্যমতের ওপরেই ছেড়ে দিতে হবে। ইবনুল হুমাম (মৃত্যু ৮৬১ হিজরী) হানাফী ও শাফেয়ী চিন্তাধারার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে প্রয়াস পেয়েছেন এবং একই যুগের আইনবিদদের ঐক্যমতকে ইজমা বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য অন্যান্যদের মত ইজমাভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌছানোর পূর্বেই ইজমার যুগ শেষ হয়ে গেছে—এমন কথা তিনি মনে করতেন না।
ইমাম শাফেয়ীর সার্বজনীন ঐক্যমতের মধ্যে সব চাইতে বড় গলদ হল পদ্ধতিমূলক। মুসলিম সমাজ ইজমায় পৌঁছানোর জন্য কোন্ সন্তোষজনক পদ্ধতি অবলম্বন করে অগ্রসর হবে, তার কোন হদিস মেলে নি। সমগ্র মুসলিম সমাজের সর্বসম্মত অভিমতের ওপর ভিত্তি করেই হোক বা আইনবিদদের ঐক্যমতের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হোক, গোটা ইজমার নীতিটাই পদ্ধতিমূলক ত্রুটি থেকে রেহাই পায় নি। আইনবিদগণ মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন। তাই তাঁদের মধ্যে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। মুতাযিলাপন্থী আন্-নায়যাম প্রমুখ সমালোচকগণ এই কারণে ইজমার সমালোচনায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কোন কোন আইনবিদ বলেছেন যে, কতিপয় আইনবেত্তা যদি ঐক্যমতে পৌঁছান এবং তার বিরুদ্ধে কোনরূপ ওজর-আপত্তি না ওঠে, (ইজমা আসুবুত) অথবা যদি অধিক সংখ্যক আইনবিদ একটি মত প্রকাশ করেন এবং মাত্র কয়েকজন এর বিরোধিতা করে থাকেন, তবে সে ঐক্যমত (ইজমা) মুসলিম সমাজের ওপর সর্বতোভাবে প্রযোজ্য হবে। এভাবেই এঁরা এ বিষয়ে বিরোধের একটা সুরাহা করতে চেয়েছেন। এর ফলে অনৈক্যের সম্ভাবনা কমে আসলেও ঐক্যমতে পৌঁছাবার পদ্ধতি সম্পর্কে সুষ্ঠু ব্যাখ্যা প্রদান করা আর সম্ভব হল না। ইজমার সুনিশ্চিত সংজ্ঞা যেমন দেয়া হল না, আইনবিদের যোগ্যতা সম্পর্কেও তেমনি ধর্মবেত্তা ও আইনবিদগণ একমত হতে পারেন নি।
আইন সম্পর্কীয় বিভিন্ন মত ও পন্থা
হযরত মুহাম্মদের (সঃ) প্রাপ্ত ওহীর পরিসমাপ্তিতে আইনের উৎস সম্পর্কে মতবিশেষ মাথা তুলে দাঁড়াল। রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন নিয়ে বড় রকমের সমস্যার উদ্ভব হল। কারণ, হযরতের (সঃ) আকস্মিক ওফাতের ফলে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আসা আর সম্ভব হল না। আইনগত ঐতিহ্যের ব্যাপারে এ সমস্যা দু'টি ইসলামের রাজনৈতিক ও আইনগত বিবর্তনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। একটি থেকে বিভিন্ন দল-উপদলের সৃষ্টি হয়।
সব ধর্মবেত্তা ও আইনবিদ এ সম্বন্ধে একমত পোষণ করেছেন যে, আল-কোরআন আইনের অবিসংবাদিত উৎস। কারণ, তার মধ্যে অনুপম ওহীর সমাবেশ ঘটেছে। কিন্তু এখানেই ঐক্যমতের পরিসমাপ্তি হল। কারণ, আল-কোরআনে নতুন আইন প্রণয়নের কোন সুনির্দিষ্ট পন্থা নির্দিষ্ট হয় নি। ফলে আইনের মর্মবাণী নিয়ে নয় বিশেষভাবে তৈরী উৎস নিয়েই মত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। আসলে আইনগত ব্যাপার নিয়ে এ মতবিরোধের সৃষ্টি হয় নি; এ সমস্যা আদতে ছিল ধর্মীয় ব্যাপার। কারণ, কোন্ কোন্ বিষয় আল-কোরআনে বিধিবদ্ধ ওহীর পরিপূরক হিসেবে ধরা যেতে পারে, তা মূলতঃ আইনের আওতায় পড়ে না। সমস্যাটি ধর্মীয় নীতির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট।
গোড়াতে আইনবিদগণ প্রাথমিক বিশৃঙ্খলা ও বিভিন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন নি। তাঁরা বলতেন যে, আল-কোরআনের নির্দেশে ধর্মীয় বিষয়ে বিরোধ অস্বীকৃত হয়েছে। সম্ভবতঃ সর্বপ্রথম যে মুসলিম আইনবেত্তা আইনের ক্রমোন্নতিতে বিরোধের নিষ্ফলতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তিনি হলেন ইবনুল মুকাফফা। খলিফা আল-মামুনের (৭৫৪-৭৭৫ খৃস্টাব্দ) আইন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি খলিফার নামে একখানি আইনের বই উৎসর্গ করেছিলেন। এ বইতে সুসংবদ্ধ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আইনগত বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য তিনি সুপারিশ করেছিলেন।
পরবর্তী যুগের আইনবিদগণ অবশ্য ঐক্যের চাইতে মতবিরোধ বেশী পছন্দ করতেন। স্থানীয় সংকীর্ণতা ও পূর্ববর্তী নজির অনুসরণ এ মতবাদ গঠনে খুব বেশী প্রভাব বিস্তার করেছিল। মতবিরোধের সপক্ষে হযরত মুহাম্মদের (সঃ) অনেক হাদিস উদ্ধৃত করে দেখান হত। এ বিষয়ে এ হাদিসটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য: "আমার উম্মতের লোকদের মতবিরোধ আল্লাহর রহমতস্বরূপ।"
আইনের চিন্তারাজ্যে স্বাধীনতার ফলে বিভিন্ন মতাদর্শ সৃষ্টির আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এক একটি দলের পুরোধা ছিলেন এক একজন জবরদস্ত মুজাতাহিদ, যাঁকে কেন্দ্র করে এক একটি শিষ্যমণ্ডলী গড়ে ওঠতে থাকে। মুজতাহিদগণ আইন পর্যালোচনায় আত্মনিয়োগ করেন। এসব নেতৃস্থানীয় আইনবিদ পরস্পরকে আক্রমণ করতে কসুর করেন নি। এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর সমালোচকদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এসব সত্ত্বেও একথা বলা যায় যে, মুসলিম সমাজ মোটামুটি সব নেতৃস্থানীয় আইনবিদের প্রতিই ঔদার্য প্রদর্শন করেছে। কারণ, যদিও খুঁটিনাটি ব্যাপারে (ফুরু) তাঁদের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা ছিল, তবু তাঁরা সবাই স্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যকে খুঁজে বার করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ইজতিহাদের ব্যাপারে সুনির্দেশের অভাব ও বিরোধের দরুন আইনে বিভিন্ন মতাদর্শ ও দল-উপদলের সংখ্যা বাড়তে লাগল এবং তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে লাগল। হিজরী দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতকে (খৃষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতক) ইসলামী জগতের আইনের রাজ্যে ছোট বড় বহুসংখ্যক মতাদর্শ ও দল-উপদলের সৃষ্টি হল। তখনও কিন্তু তাঁদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ খুব বেশী প্রকট হয়ে ওঠেনি। অপেক্ষাকৃত উদার ও বহুলাংশে স্বাধীন যুক্তি ব্যবহারের (ইজতিহাদ) পক্ষপাতী হানাফী ও মুতাযিলাপন্থী থেকে শুরু করে রক্ষণশীল যাহেরী ও হাম্বলিগণ যে কেবল ইজতিহাদের খুব স্বল্প ব্যবহার করতেন তাই নয়, আল-কোরআন ও হাদিসের অবিকল শব্দার্থ করার দিকে তাঁদের বেশী ঝোঁক ছিল। গোড়াতে এক এক দলে মাত্র কয়েকজন শিষ্য ছিলেন। কয়েকটি বাস্তব ও দার্শনিক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এঁরা তাঁদের ইমামকেই অনুসরণ করতেন। সম্ভবতঃ কেবল হিজরী তৃতীয় শতক থেকেই ইমাম শাফেয়ী-প্রবর্তিত আইনগত সুসংবদ্ধতার ফলে বিভিন্ন দলের ইমাম সাহেবদের অনুসারীদের প্রতি বিশিষ্ট পরিভাষা "মযহাব" কথাটি ব্যবহার হতে লাগল। এর পূর্বে প্রত্যেক ইমামের অনুসারীদের 'আসহাব' বলে অভিহিত করা হত। সম্ভবতঃ ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফা তাঁদের মৃত্যুর পূর্বে একথা বুঝতে পারেন নি যে, ভবিষ্যতে তাঁদের নামে নতুন নতুন আইনের মতাদর্শ ও দল গড়ে উঠবে এবং তাঁরা এক একটি দলের প্রবর্তক বলে বিবেচিত হবেন। ইমাম মালিকের অনুসারীদের 'হাদিসপন্থী' (আহলে-হাদিস) ও ইমাম আবু হানিফার অনুসারীদের 'যুক্তিপন্থী' (আহলুর রায়) বলা হত; কিন্তু "আহলুল রায়" বলতে শুধু হানাফীদেরই বোঝানো হত না, বহুসংখ্যক ইরাকী আইনবিদকেও এ পর্যায়ভুক্ত বলে মনে করা হত। এর মধ্যে ইমাম আবু হানিফার প্রতিদ্বন্দ্বী ইবনে আবি লায়লা, সুফিয়ান আস-সাউরী ও ইবনে শুবরুমার অনুসারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হত।
হিজরী চতুর্থ শতকে কেবল এ চারটি দলকে সমর্থনযোগ্য দল হিসেবে স্বীকার করা হত : হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী। তাঁদের আইনের কিতাবগুলো প্রামাণ্য বলে গণ্য হতে লাগল এবং তা থেকে এতটুকু বিচ্যুতি বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করা (বি'দা) ভ্রান্ত বলে মনে করা হত। ফলে ইজতিহাদের নীতি ক্রমশঃ পরিত্যক্ত হতে লাগল। 'তাকলীদ' (হুবহু নকল) সে স্থান দখল করল। এর চারটি দলের নিয়ম-কানুন নির্বিবাদে মেনে নেয়াই রীতি হয়ে দাঁড়াল এবং ইজতিহাদের দরজাও গেল বন্ধ হয়ে। অবশ্য গোড়ার দিকে আইনবিদদের পারস্পরিক বিরোধ ও দল-উপদলের সংখ্যা সীমিত করার জন্যই তাকলীদের বহুল ব্যবহার প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু ক্রমশঃ মুসলমানদের মধ্যে আইনগত যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে অনুদারতার মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে। ফলে তাকলীদ আইনের ক্রমোন্নতিতে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ইমাম ইবনে হাম্বলের অনুসারীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনুদার ভাবধারার ক্রমপ্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সমানভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে থাকে। ইজতিহাদকে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে বানচাল করে দেন এবং সর্বপ্রকার কিয়াসকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন। তাঁরা হাদীসের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। তাঁদের মতে, ইজমাই ছিল সর্বসম্মত ও অপরিহার্য আইনের নীতি। কিন্তু হাম্মলীদের দৃষ্টিতে ইজমার স্থান অপ্রামাণ্য হাদিসের চাইতেও অনেক নীচে বলে গণ্য হত।
অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি হাম্বলী চিন্তাধারার কঠোর বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এঁরা হানাফী ও শাফেয়ী মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। হাম্বলীগণ সরকারী চাকরী গ্রহণ করতেন না; এমনকি সমর্থকদের কাছ থেকে উপহারও নিতে চাইতেন না। 'এ দুটি কারণে হাম্বলীদের বিরুদ্ধবাদিগণ তাঁদের শায়েস্তা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে হাম্বলীগণ খুব দুর্বল হয়ে পড়লেন। পরে কতিপয় প্রভাবশালী আইনবিদ ও ধর্মবেত্তার প্রচেষ্টার ফলে হাম্বলী মতবাদ আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। বিশেষ করে খৃস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত হাম্বলী আইনবেত্তা ইমাম ইবনে তাইমিয়ার (১২৬০-১৩২৭ খৃস্টাব্দ) শিক্ষার ফলে হাম্বলী মতাদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। হাম্বলী মতবাদ ওহাবী আন্দোলনের মূল ভিত্তিরূপে স্বীকৃত হয়। এসব সত্ত্বেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হাম্বলী মতবাদ উপেক্ষা করে সবাই অন্যান্য মতাদর্শের দিকেই বেশী পরিমাণে ঝুঁকে পড়ে।
আরব দেশের বাইরে ইরাক, সিরিয়া, মিসর ও তুরস্কে হানাফী ও শাফেয়ী নিয়ম-কানুন বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। মালিকী কানুন যদিও হেজাযে ক্রমশঃ ক্ষীয়মান হয়ে এসেছিল, তবু খৃস্টান আধিপত্যের পূর্ববর্তী যুগে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। মুসলমানদের পক্ষে একটি দলের মতাদর্শ ত্যাগ করে আর একদলভুক্ত হবার তেমন কোন বাধা নেই। এ ব্যাপারে সামাজিক সমালোচনা বা সংস্কারের কোন অবকাশ নেই। একই পরিবারে এক ব্যক্তি হয়ত একটি দলের আবার আর একজন অপর আর এক দলের সমর্থক। এমনও দেখা গেছে যে, একটি পরিবারে চারটি পুত্র সন্তানের চারজনই চারটি বিভিন্ন দলে শামিল হয়েছেন।
শিয়া আইনের মতাদর্শ
মুসলিম সমাজে সুন্নীদের মধ্যে যে চারটি মতবাদ আছে, তা আগেই বলা হয়েছে। শিয়ারাও একটি দল। এ দলটার এতবেশী ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে যে, এ সম্বন্ধে পৃথকভাবে আলোচনা করা উচিত। শিয়া ও সুন্নীর মধ্যে মূল পার্থক্য হল ইমামতের প্রশ্ন (শিয়াদের দৃষ্টিতে খিলাফত) নিয়ে। শিয়া মতানুযায়ী ইমামতকে কোরেশ বংশের আওতা হতেও সংকীর্ণতর করে আহলুল বায়েত বা হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ফাতিমার (রাঃ) বংশধরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। শিয়াদের মতে ইমামতের উপর সত্যিকার অধিকার যদি কারুর থেকে থাকে, তা শুধু হযরত আলীরই (রাঃ) ছিল। এ সম্বন্ধে শিয়াগণ দৃঢ়বিশ্বাস পোষণ করেন। তাঁরা বলেন যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) হযরত আলীকে ইমাম নিযুক্ত করেন এবং তাঁর ওফাতের পর ইমামত তাঁর বংশধরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করেন। বিশেষ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হযরত আলী (রাঃ) ইমামত ও আল্লাহর আইনের কর্তৃত্বের এখতিয়ার লাভ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে তত্ত্বজ্ঞান (তাভিল) প্রদান করা হয়। আর এর ফলেই তিনি আল-কোরআনের ব্যাখ্যা ও আইন রহিত করার ক্ষমতা লাভ করেন। এ তত্ত্বজ্ঞান হযরত আলী (রাঃ) থেকে যুগে যুগে তাঁর পুরুষ বংশধরদের ওপর বর্তায়।
ইসলামের মহাসত্য সম্পর্কে হযরত আলী (রাঃ) ও তাঁর বংশধরদের যে বিশেষ জ্ঞান আছে, এ কথা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। তাঁর অনুগত শিষ্যগণ এ বিষয়টিকে আরও বহুদূর সম্প্রসারিত করেছেন। তাঁরা অতি-মানবীয় গুণাবলী হযরত আলী ও তাঁর বংশধরগণের ওপর আরোপ করেছেন ও সাধারণ ভ্রান্ত মানুষের ঊর্ধ্বস্তরে তাঁদের অধিষ্ঠিত করেছেন। শিয়াপন্থী অনেক ব্যক্তির কাছে হযরত আলীর (রাঃ) স্থান হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কিঞ্চিৎ ওপরে। কোন কোন চরমপন্থী বলেন যে, আল্লাহর ওহী মূলতঃ হযরত আলীর (রাঃ) ওপরেই নাজিল হবার কথা ছিল। কিন্তু ফেরেশতা জিবরাইল ভুল করে তা হযরত মুহাম্মদের (সঃ) নিকট নিয়ে যান। অধিকাংশ শিয়ার মতে হযরত আলী (রাঃ) শাসন পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহ-প্রদত্ত আইনের অধিকার (Divine right) লাভ করেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁকে এমন মৌলিক তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেন, যার ফলে তিনি সাধারণ মানুষের সমালোচনার ঊর্ধ্বে এক উচ্চ মার্গে উন্নীত হয়েছেন। হযরত আলী ও তাঁর বংশধরদের সঙ্গে খলিফাদের তুলনা করা যেতে পারে না। কেননা, তাঁর বংশধরেরা একটি বিশেষ অভ্রান্ত ইমাম গোষ্ঠী বলে বিবেচিত হতেন।
ইমামত নিয়ে নানা মতবিরোধের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হয়। একই কারণে শিয়াদের মধ্যেও অনেক দল ও উপদলের উদ্ভব হয়েছিল। যায়েদীদের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এঁরা হযরত আলী (রাঃ) বংশধরদের মধ্যে ইমাম নির্বাচনের পক্ষপাতী। যায়েদী ভিন্ন আর যে সব উপদল রয়েছে, তাঁরা হলেন 'দ্বাদশপন্থী' ও 'সপ্তমপন্থীর' দল। ষষ্ঠ ইমাম জাফর আল-সাদেকের (মৃত্যু ৭৬৫ খৃস্টাব্দ) মৃত্যুর পর এ বিরোধের সূত্রপাত হয়। দ্বাদশপন্থীগণ তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মুসা আল-কাযিমকে ইমাম বলে সাব্যস্ত করেন। আর সপ্তমপন্থীগণ তাঁর জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা ইসমাইলকে ইমাম হিসেবে সমর্থন জানিয়েছিলেন। শিয়াদের মধ্যে সংখ্যালঘু দলটি ইসমাইলকে সমর্থন করতেন। তাঁর বংশধরগণই মিসরে ফাতিমী খিলাফত (৯৬৯-১১৭১ খৃস্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সপ্তমপন্থীদের আজকাল পাকিস্তান, ভারত, মধ্য এশিয়া, সিরিয়া, পারস্য উপসাগরীয় উপকূল ও পূর্ব আফ্রিকায় দেখতে পাওয়া যায়। এদেরই বলা হয় "ইসমাইলী"।
শিয়াদের সংখ্যাগুরু দলটি অতীতে মুসা আল-কাযিম থেকে শুরু করে দ্বাদশ ইমাম মুহম্মদ ইবনুল হাসান আল আসকারীর অন্তর্ধান (হিজরী: ২৬০: খৃস্টীয় ৮৭৪) পর্যন্ত তাঁর সব বংশধরকে সমর্থন করে এসেছে। বর্তমানকালেও তাঁরা এ মতবাদের সমর্থক। এঁদেরই বলা হয় দ্বাদশপন্থী। ইমাম মুহম্মদের অন্তর্ধানের পর দ্বাদশপন্থীগণ আর কোন ইমাম মনোনীত করেন নি। এঁদের মতে ইমামের মৃত্যু ঘটেনি, তিনি অনুপস্থিত রয়েছেন মাত্র। তাঁদের বিশ্বাস, তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর আত্মা সর্বক্ষণ অদৃশ্যালোকে অবস্থান করছে। ইমাম সাহেবের সাময়িক অনুপস্থিতি ("গায়েব") ঘটেছে মাত্র। পরিশেষে তিনি ইমাম মেহদী বা প্রাণবত্তা হিসেবে পাপ- কালিমাময় পৃথিবীতে সুবিচার ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য পুনরায় অবতীর্ণ হবেন। এই হল দ্বাদশপন্থীদের বিশ্বাস। ইমামের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মুজতাহিদ বা পণ্ডিতগণ ধর্মীয় আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। শিয়াগণ সুন্নী খিলাফতের বিরোধিতা করতেন। তাই কতিপয় সুন্নী খলিফা ও সুলতানের হাতে তাঁদের ক্রমাগত নির্যাতিত হতে হয়। ফলে তাঁরা বিশ্বাস গোপন রাখার নীতি (কিতমান বা তাকিয়া) গ্রহণ করেন। এ নীতিতে নিরাপত্তার খাতিরে নিজের বিশ্বাস লুকিয়ে রাখাকে সমর্থন করা হত। মুজতাহিদগণ এটাকে বিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে গণ্য করেছেন।
মনে রাখা দরকার যে, আইনের বিষয়ে শিয়া মতাবদ সুন্নী আইনের চাইতে অনেক বেশী কর্তৃত্বমূলক। কিন্তু বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে তার সংযোগ ছিল নিতান্ত সামান্য। ব্যাখ্যা প্রদানের চূড়ান্ত ক্ষমতা ইমামের ওপরই ন্যস্ত ছিল। তার ওপর আবার ইমাম সম্পূর্ণ অভ্রান্ত বলে বিবেচিত হতেন এবং আইনের সত্যিকার অর্থ ও তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। ইমামের অনুপস্থিতিতেও আইনের প্রকৃতি বদলায় নি। কেননা, মুজতাহিদগণ ইমামের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করতেন। নিজের যুক্তি ও বিবেক অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার তাঁদের ছিল না। কাজেই শিয়া আইনে ইজতিহাদ নতুনরূপে দেখা দেয়। সুন্নী আইনের ইজতিহাদ থেকে এ ইজতিহাদের পার্থক্য বেশ সুস্পষ্ট। বিশেষ করে ইজতিহাদের তথাকথিত দ্বার-রুদ্ধ হবার পূর্বে এ পার্থক্য খুবই প্রকট ছিল।
সুন্নী আইন-বিজ্ঞানের মত শিয়া আইনেও আল-কোরআনকেই আইনের প্রধান সর্বসম্মত উৎস হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। কিন্তু শিয়াদের স্বীকৃত ইমামের অনুমোদিত হাদিস ছাড়া আর কোন হাদিস তাঁরা মেনে নিতে চান না। ইমাম যদি ইজমার ব্যাপারে শরীক না হন, তবে সে ইজমাও প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারণ, শিয়া মতাদর্শ অনুসারে গোটা সমাজ বা উলামা সম্প্রদায় কারোরই আইনের ব্যাখ্যা প্রদানের পূর্ণ ক্ষমতা নেই। উদারপন্থী সুন্নী মতের সঙ্গে তুলনা করলেই একথা স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, শিয়াদের আইন প্রণয়নে কিয়াসের কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকৃত হয় নি। কারণ, হাদিস বা পূর্ববর্তী ইমামদের আচার-ব্যবহার কর্তৃক সমর্থিত না হলে মুজতাহিদদের মতামত কিছুতেই গ্রাহ্য হয় না। খুঁটিনাটি ব্যাপারে (ফুরু) শিয়া ও সুন্নী আইনের পার্থক্যটুকু বিভিন্ন সুন্নী মতাদর্শের মধ্যকার পার্থক্যের চাইতে মোটেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়।

📘 ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ > 📄 মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন

📄 মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন


মানবজাতির ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বহিঃশত্রুদের আক্রমণের ভয় না থাকলে একটি সভ্যতার মধ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও জাতির সমন্বয় গড়ে ওঠে। এসব জাতির পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয়ে আচার-ব্যবহারের ভূমিকা সব চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। গোটা জাতি একই কর্তৃত্ব বা আইন দ্বারা শাসিত হয়, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। সহজেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন নিকট-প্রাচ্য, গ্রীস, রোম, চীন, ইসলাম জগত ও পাশ্চাত্য খৃস্টান রাষ্ট্র গোষ্ঠী; প্রত্যেক দেশে বা অঞ্চলে এক একটা করে স্বতন্ত্র সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। শান্তির সময়ে অথবা যুদ্ধকালে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অপর রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতকগুলো নিয়ম-কানুন ও ব্যবহার-বিধি গড়ে ওঠে। ব্যারন করফ বলেন, পাশাপাশি বাস করার ফলে নৈতিক ও আইনগত বিধি-নিষেধ গড়ে ওঠে। কালক্রমে এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের বিধানে রূপান্তরিত হয়। এমনকি, প্রাচীন জাতিদের মধ্যেও দেখা যায় যে, এই আইন ছিল তাদের আচার-ব্যবহারেরই অংশ বিশেষ। সভ্য জাতিদের মধ্যে পরবর্তীকালে এগুলো সুসংবদ্ধ আইন হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। মতেসক্যু বলেছেন, সব জাতির মধ্যে, এমন কি ইরকোয়দের (উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার আদিম জাতি) মধ্যেও আন্তর্জাতিক আইনের বিধান বহাল ছিল। কিন্তু এরা খুব সভ্য ছিল না; যুদ্ধবন্দীদের গোশত খাওয়ার রীতি এদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। সে যুগে সংঘর্ষ ও অরাজকতার রাজত্ব ছিল। তবু একথা তারা খুব স্পষ্টরূপে বুঝতে পারল যে, সার্বিক কল্যাণের দিক থেকে যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মত ব্যবস্থা এবং প্রতিহিংসা থেকে অব্যাহতি পাবার তাগিদে কতকগুলো নিবৃত্তিমূলক বিধি অনেক বেশী ফলপ্রসূ হবে। পাশাপাশি বসবাসের ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যখন মাত্র গুটিকয়েক আইনের প্রয়োজন থাকে, তখনই কয়েকটি জাতি নিয়ে এক বৃহত্তর সামাজিক সংস্থা গড়ে ওঠতে পারে।
অতীত যুগে আন্তর্জাতিক আইন আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের মত বিশ্বব্যাপী বা সর্বজনীন ছিল না। কারণ, তখন আন্তর্জাতিক আইনের কাজ ছিল একটি বিশেষ এলাকার ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও জাতিগুলোর পরস্পর সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ আইন কেবলমাত্র একটি সভ্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাছাড়া, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাচীন আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে আর একটি পার্থক্য হল এই যে, প্রাচীন আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্র ছিল খুবই সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। কারণ, এ আইন-বিধান পৃথিবীর জাতিগুলোর মধ্যে আইনের ব্যাপারে পারস্পরিক সাম্য মেনে নেয় নি। কিন্তু বিভিন্ন জাতির আইনগত সাম্য আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি রচনা করেছে। তাই তখন বিভিন্ন জাতির আন্তর্জাতিক আইন সুসংবদ্ধ ও একত্রিত করে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ আইন-ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অবশ্য এক আইন বিধান অপর আইন থেকে অবাধে প্রচুর মালমশলা সংগ্রহ করেছে। তবু তা হয়ত বা অস্বীকৃত রয়ে গেছে। কারণ, প্রত্যেকটি আইন-ব্যবস্থাই শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে এসেছে। একটি সভ্যতার অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তার আইন-ব্যবস্থারও বিলুপ্তি ঘটেছে। কারণ, একটি সভ্যতার কল্যাণে তার আইন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বেন্থামই প্রথম "আন্তর্জাতিক আইন" কথাটির প্রবর্তন করেছিলেন। "আন্তর্জাতিক আইন” কথাটিই "জাতিসমূহের আইনের" চাইতে বেশী প্রচলিত হয়ে গেছে। "জাতিসমূহের আইন" কথাটি কিন্তু অধিক সুদূরপ্রসারী এবং বিচিত্র সমাজব্যবস্থায় একে প্রয়োগ করা চলে। বর্তমান গ্রন্থে "জাতিসমূহের আইন" কথাটিই ব্যবহার করা যাক।
ইসলামের মিশন ও অন্যান্য জাতির প্রতি ইসলামের মিশন স্বতঃই অন্যান্য অমুসলিম দেশের সঙ্গে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ইসলামের শেষ লক্ষ্য হল সমগ্র দুনিয়ার সমাজকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা। কিন্তু সব জাতিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা সম্ভব হয় নি। অনেকগুলো অমুসলিম গোষ্ঠী রয়ে গেল; যুগে যুগে এদের সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রকে বোঝাপড়া করতে হয়েছে।
মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের প্রকৃতি অন্যান্য আইন বিধান থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। এ আইনকে আইনের সাময়িক বিধি-ব্যবস্থা বলে মনে করা হত। কিতাবিগণ (খৃস্টান, ইহুদী প্রভৃতি) ছাড়া অন্য সব জাতি যতদিন পর্যন্ত মুসলমান না হন, কেবলমাত্র ততদিন পর্যন্তই এ আইন বলবৎ থাকবে। কাজেই ইসলামের মিশন যদি সফল হয়, তবে ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের আর প্রয়োজন হবে না। ইসলামের বিস্তৃতি একসময়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; সুতরাং যতদিন পর্যন্ত অমুসলমানদের সঙ্গে মুসলমানকে বাস করতে হবে, ততদিন মুসলিম অমুসলিম সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতকগুলো আইনের প্রয়োজন রয়েছে।
কয়েকটি জাতি নিয়ে একটি জাতিপুঞ্জের অস্তিত্ব আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হয়েছে। এক একটি জাতির সম্পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা ও সমমর্যাদাও স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেয়া হয়েছে। মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন কিন্তু মুসলিম জাতি ছাড়া আর কোন জাতিকে স্বীকার করে না। কারণ, ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল, সমগ্র দুনিয়াকে একই ইমামের অধীনে এবং একই আইন ও ধর্মের আওতায় আনা। প্রাচীন রোম ও মধ্যযুগীয় খৃস্টান রাষ্ট্রের আইন-ব্যবস্থার মতোই মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন সার্বজনীন রাষ্ট্রের প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আল্লাহ-প্রদত্ত সার্বজনীন আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে খৃস্টান রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্র উভয়ই একথা ধরে নিয়েছিল যে, সব মানুষ একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ গোষ্ঠী এক আইন দ্বারা পরিচালিত ও একই শাসকের কর্তৃত্বাধীনে থাকবে। সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ধর্মপ্রচার করাই ছিল এর লক্ষ্য। গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থের ওপরেই এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নির্ভর করত; পারস্পরিক সম্বলিত ও সুযোগ সুবিধা এ আইনের পেছনে খুব বেশী কাজ করে নি।
তাছাড়া মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হত ব্যক্তির ওপর। আঞ্চলিক গোষ্ঠীর ওপর এ আইন প্রয়োগ করা চলত না। কারণ, প্রাচীনকালের আইন বিধানগুলোর মত ইসলামী আইন-ব্যবস্থা স্থান-কেন্দ্রিক ছিল না; এ ছিল একান্তরূপেই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। যে দেশের অধিবাসীই হোক না কেন, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হিসেবে সব মুসলমানের ওপর এ আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক ব্যাপার। আধুনিক যুগে বস্তুগত সভ্যতা ও সংস্কৃতির চাপে আইন বিধানকে গোষ্ঠীগতভাবে প্রযুক্ত না করে, একে স্থান-নির্ভর করে আনবার রীতি চালু হয়েছে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, সার্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম তার আদর্শের প্রতি আনুগত্যকেই সবচাইতে বেশী মর্যাদা দিয়েছে। এ ব্যাপারে কোন বিশেষ রাষ্ট্রীয় সীমানা স্বীকার করা হয় নি। ইসলামী জীবন-দর্শন অনুযায়ী সাধুতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই ছিল সুষ্ঠু নাগরিকত্বের মাপকাঠি। জাতি, শ্রেণী বা মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যের কোন মূল্য নেই। আইনের ব্যক্তিগত ভিত্তিটা মুসলিম আইনবেত্তাগণ কোনদিনই বাদ দেন নি। এ আইন প্রযোজ্য ছিল ব্যক্তির ওপরে। আধুনিক গোষ্ঠীর ওপর এ আইন প্রয়োগ করা হত না।
পরিশেষে একথাও মনে রাখা উচিত যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন নয়। ইসলামী জগতের ভেতরে-বাইরে মুসলিম অমুসলিমের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আইনের সম্প্রসারণ করেই আন্তর্জাতিক আইনের জন্ম হয়েছে। সূক্ষ্ম বিচারে ধরা পড়বে যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনে জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উৎস বা সমর্থন (Sanction)-এর ব্যাপারেও কোন বিভিন্নতা নেই। হযরত মূসা (আঃ) কর্তৃক প্রবর্তিত আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন ইহুদী আইন-বিধান ও মুসলিম আন্তর্জাতিক আইন প্রাণবস্তুতে প্রায় একই জিনিস। ইহুদী জাতি ও অইহুদী জাতিদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ে এ আইন বলবৎ ছিল। প্রাথমিক যুগে মুসলমান আইনবিদগণ 'জিহাদে' যুদ্ধক্ষেত্রে লব্ধ ধনসম্পদ আমান (নিরাপত্তা) ও আলখারাজ, এসব বিষয়ের সঙ্গেই বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনা করতেন। বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি পরে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে এবং আন্তর্জাতিক আইন বুঝতে "আস-সিয়ার" কথাটি প্রচলিত হয়ে যায়। আইনের যে শাখাটি কেবলমাত্র বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ণয়ে প্রযুক্ত হয়, তারই নাম "আস-সিয়ার"। কোন কোন আইনবিদ অবশ্য 'জিহাদ' কথাটিই চালু রেখেছিলেন।
শরিয়তের উৎস বা সমর্থন Sanction) যা, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনেরও ঠিক তাই। আন্তর্জাতিক আইন বলতে আমরা যদি অন্যান্য জাতির সঙ্গে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের সমগ্র আইন-কানুন ও বিধি-ব্যবস্থার কথা বলি, তবে আইনের চিরাচরিত মূল (উসুল) ও শরিয়তের উৎস ভিন্ন আরও অনেক জায়গা থেকেই মুসলিম আইনের নজির খুঁজে পাওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, মুসলিম অমুসলিম সম্পর্কিত চুক্তি, জনসমক্ষে খলিফার উক্তি ও যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতিদের প্রতি তাঁর প্রদত্ত নির্দেশাবলী (যেগুলো আইনবিদগণ পরবর্তী যুগে লিপিবদ্ধ করেন) এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে মুসলিম আইনবিদদের মতামত, অনুশীলন ও ব্যাখ্যা।
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে একথা বলা চলে যে, মুসলিম আন্তর্জাতিক আইনের উৎসগুলো আধুনিক যুগের আইনবিদ ও আন্তর্জাতিক আদালতের বিধি (Statute) সম্মত উৎসগুলোর সঙ্গে একই পর্যায়ে পড়ে। এর মধ্যে আছে : মতৈক্যমূলক চুক্তি (Agreement), আচার-ব্যবহার, চুক্তি ও কর্তৃত্ব। আল-কোরআন ও প্রামাণ্য হাদিস কর্তৃত্বের পর্যায়ে, আরবীয় প্রচলিত আইন আচার-বিধির পর্যায়ে, অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির আইন মতৈক্যমূলক চুক্তির পর্যায়ে আর ফতোয়া, আইন-সম্পর্কীয় তফসীর, কিয়াস ও অন্যান্য প্রামাণ্য সূত্র থেকে লব্ধ আইনের ব্যাখ্যা ও রূপায়ণের ব্যাপারে খলিফাদের বাণী ও অভিমত যুক্তির পর্যায়ে পড়বে। এসব বাণী, মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রথম যুগের আইনের তফসীর ও ফতোয়ার সংকলনের মধ্যে পাওয়া যায়। আইনের বিবর্তনে এসব আইনের গ্রন্থ ও সংক্ষিপ্তসারগুলো বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। পরবর্তীকালে আইনবিদগণ যেভাবে এগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ও বহুল ব্যবহার করেছেন, তা থেকে এ প্রভাব আরও বেশী সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00