📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 যিনার শাস্তি

📄 যিনার শাস্তি


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 পূর্ববর্তী ধর্মসমূহে যিনার শাস্তি

📄 পূর্ববর্তী ধর্মসমূহে যিনার শাস্তি


ইসলামে বিবাহিত নর-নারীর ব্যভিচারের শাস্তি হল রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা)। কিন্তু এ শাস্তি নতুনভাবে ইসলামে প্রবর্তন করা হয়নি; বরং তাওরাতেও এ শাস্তির কথা বর্ণিত রয়েছে। আর তাওরাতের যে বিধানগুলো রহিত হয়নি, সেগুলো পরবর্তীতে অবতীর্ণ ইঞ্জিলের বিধান রূপেও গণ্য হয়ে থাকে। তাওরাতে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে, তা সত্ত্বেও আজকের তাওরাতে সেই রজমের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। তবে বর্তমানে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা এ শাস্তি কার্যকর করে না। তাতে অবশ্য এর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না।

টিকাঃ
৪. হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কতিপয় ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারীর যিনা করার অপরাধের শাস্তির কথা জানতে চাইল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের তাওরাতে রজমের শাস্তি দেখতে পাও কি? জবাবে তারা বললো, এ রূপ অপরাধে আমরা তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে লাঞ্ছিত করি এবং তাদের দূররাও মারা হয়। এ সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছো। তাওরাতে তো বিবাহিত নারী-পুরুষের যিনার অপরাধে রজমের কথা বর্ণিত রয়েছে। অতঃপর তাওরাত আনা হলো ও খুলে ধরা হলে একজন রজমের নির্দেশ সংক্রান্ত আয়াতটি হাত দিয়ে ঢেকে রাখল ও তার পূর্বের ও পরের অংশ পাঠ করল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বললেন, তোমরা হাত তুলে ফেল। হাত তুলে নিতেই আয়াতটি সকলে দেখতে পেলেন। তখন ইয়াহুদীরা স্বীকার করল যে, তাওরাতে রজমের নির্দেশ স্পষ্ট ভাষায় লিখিত রয়েছে। অতঃপর তদনুযায়ী রজম করার নির্দেশ জারী করা হলো। -সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল মানাকিব), হা.নং: ৩৪৩৪
৫. পুরাতন নিয়ম, দ্বিতীয় বিবরণ, সূত্র- ২১, ২২ ও ২৩

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ইসলামে যিনার শাস্তির ক্রম বিবর্তন

📄 ইসলামে যিনার শাস্তির ক্রম বিবর্তন


ইসলামের আর্বিভাবের সময় আরব সমাজে যিনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এ অবৈধ যৌনচর্চায় কলুষিত সমাজকে সফলভাবে সংশোধন করার দিকে লক্ষ্য রেখে ইসলামে প্রথমবারেই তার চূড়ান্ত শাস্তির বিধান জারি করা হয়নি; বরং তা ক্রমে ক্রমে জারি হয়েছে, যাতে জনগণের পক্ষে তা গ্রহণ করা সহজ হয়। ইসলামের প্রথম দিকে বিবাহিতের ব্যভিচারের শাস্তি ছিল গৃহবন্দী করে রাখা। আর অবিবাহিতের শাস্তি ছিল কথা ও কাজের সাহায্যে কিংবা বেত্রাঘাত করে কষ্টদান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِنْكُمْ فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّىٰ يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا ۚ وَاللَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا مِنْكُمْ فَآذُوهُمَا فَإِنْ تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَحِيمًا
নির্লজ্জতার কাজ করবে, তোমাদের মধ্য থেকে তাদের এ অপকর্মের চারজন সাক্ষী কায়েম কর। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখ, যতক্ষণ না তারা মৃত্যুবরণ করবে অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন উপায় বের করে দেন। আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দুজন এই নির্লজ্জতার কাজ করবে, তাদেরকে কষ্ট দাও। তবে তারা যদি তাওবাহ করে নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে তাদেরকে আর কষ্ট দিওনা। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিঃসন্দেহে তাওবাহ কবুলকারী ও অতিশয় মেহেরবান।" এখানে প্রথম আয়াতে 'مِنْ نِسَائِكُمْ' বলে বিবাহিতাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় আয়াতে وَاللَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا দ্বারা অবিবাহিত নারী-পুরুষদেরকে বোঝানো হয়েছে। এ দু'আয়াতে দু'ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ দু'ধরনের শাস্তির মধ্যে একটি ছিল অধিকতর কঠোর। আর তা বিবাহিতের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। অপর শাস্তিটি ছিল হালকা। আর তা অবিবাহিতের জন্য প্রযোজ্য ছিল।
এ আয়াতে ব্যভিচারিণীদেরকে গৃহবন্দী করে রাখতে বলা হয়েছে, যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য অন্য কোন বিহিত ব্যবস্থা নির্দেশ করেন। এ থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, এ বিষয়ে অচিরেই একটি চূড়ান্ত বিধান অবতীর্ণ হবে। পরে সে বিধান নাযিল হয়েছে। হযরত 'উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, خُذُوا عَنِّي خُذُوا عَنِّي "قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَالرَّجْمُ - "তোমরা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর, তোমরা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তা হলো, অবিবাহিত যুবক-যুবতীদের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন এবং বিবাহিতদের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা।" এ হাদীস থেকে জানা যায়, যিনাকারীর অবস্থার পার্থক্যের কারণে যিনার শাস্তির মধ্যেও তারতম্য হবে। বিবাহিতের যিনার শাস্তি অবিবাহিতের তুলনায় অত্যন্ত কঠিন ও অধিকতর মর্মন্তুদ। এর কারণ এটা হতে পারে যে, অবিবাহিতদের হালাল পথে যৌনস্পৃহা পূরণের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই তাদের দ্বারা তা সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার মনে করা যায় না। অপরদিকে বিবাহিত নারী-পুরুষের যেহেতু হালাল পথেই তাদের যৌন বাসনা পূরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা রয়েছে, তাই সে ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে বাইরে গিয়ে যিনা করার মানে হল তাদের মনের মধ্যে অন্যায় প্রবণতা বাসা বেধেছে, যা মূলোৎপাটন করা একান্তই জরুরী। তদুপরি তারা নিজেদের মান-মর্যাদা এবং তা লঙ্ঘনের পরিণতি ও বীভৎসতা সম্পর্কে অবহিত। এ কারণেই তাদের শাস্তি তুলনামূলক অধিকতর কঠিন হওয়াই যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক।

টিকাঃ
৬. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা): ১৫-১৬
৭. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯০; আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অবিবাহিতের যিনার শাস্তি

📄 অবিবাহিতের যিনার শাস্তি


অবিবাহিত বালিগ ও বুদ্ধিমান মুসলিম-নারী হোক বা পুরুষ- যদি যিনা করে, তার শাস্তি হল একশতটি বেত্রাঘাত। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, الزانية و الزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة - “ব্যভিচারী পুরুষ ও ব্যভিচারিণী নারী- তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত কর।” রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, البكر بالبكر جلد مائة - “অবিবাহিত নারী-পুরুষ যিনা করলে একশত বেত্রাঘাত।” এ বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। তবে শাস্তির অংশ হিসেবে ব্যভিচারী নারী-পুরুষকে বেত্রাঘাত করার পরও এক বছরের জন্য নির্বাসিত করতে হবে কি না- তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরাট মতানৈক্য রয়েছে।
হানাফীগণের মতে, ব্যভিচারীকে-নারী হোক বা পুরুষ- এক বছরের নির্বাসন দণ্ড দেয়া ওয়াজিব নয়। তবে বিচারক যদি রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর মনে করেন, তাহলে হদ্দের অংশ হিসেবে নয়; তা'যীরী শাস্তির আওতায় এক বছরের জন্য নির্বাসন দিতে পারেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, পবিত্র কুর'আনে তাদের শাস্তি হিসেবে কেবল বেত্রাঘাতের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় খবরে ওয়াহিদের ভিত্তিতে এক বছরের নির্বাসন দণ্ড দেয়ার মানে হল কুর'আনের অকাট্য দলীলের ওপর অতিরিক্ত বৃদ্ধি সাধন, যা যুক্তিযুক্ত নয়।
শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, ব্যভিচারী পুরুষ হোক বা নারী- তাকে এক বছরের জন্য অবশ্যই নির্বাসিত করতে হবে। তাঁদের প্রধান দলীল হল, ইতঃপূর্বে বর্ণিত হযরত 'উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা)-এর হাদীস, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, অবিবাহিত ব্যভিচারী -নারী হোক বা পুরুষ- প্রত্যেককে এক বছরের জন্য নির্বাসন দণ্ড দিতে হবে।
মালিকীগণের মতে, কেবল ব্যভিচারী পুরুষকেই এক বছরের জন্য নির্বাসনের দণ্ড দেয়া ওয়াজিব। মহিলাদের জন্য নির্বাসন দণ্ড প্রযোজ্য নয়। তাঁদের বক্তব্য হলো, মহিলাদেরকে দূরে নির্বাসন দেয়া হলে সে সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত হয়ে যাবে। সে কোথায় থাকবে, কিভাবে দিন কাটাবে, তা একটি কঠিন সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। তদুপরি তাকে একাকী অবস্থায়ও পাঠানো সম্ভব নয়। কোন অ-মুহরামের সাথে নির্বাসনে পাঠানো হলে, তাকে চরম ব্যভিচারের পথে ঠেলা দেয়া হবে। আর কোন মুহরামকে তার সাথে নির্বাসিত করা হলে, তা হবে যে অপরাধী নয় তাকে শাস্তি দান করা।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, বিচারক প্রয়োজন ও কল্যাণকর মনে করলে এক বছরের জন্য নির্বাসন দণ্ড দিতে পারবে - এতে কারো কোন দ্বিমত নেই। তবে বর্তমানে বিভিন্ন দেশের যে পরিবেশ- তাতে তাদেরকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নির্বাসনে পাঠানো হলে সংশোধনের পরিবর্তে তাদের আরো অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে বেশি। যদি একান্ত প্রয়োজনই হয়, তাহলে তাদেরকে নির্বাসনের পরিবর্তে এক বছরের জন্য কারাগারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটক রাখা যেতে পারে। এতে নির্বাসনের উদ্দেশ্যও অর্জিত হবে। সম্ভবত এ ধরনের অবস্থা বিবেচনা করেই হযরত আলী (রা) দু'জন অবিবাহিত নারী-পুরুষ যখন যিনা করল, তখন রায় দিলেন যে, তাদেরকে বেত্রাঘাত করতে হবে, নির্বাসন দেয়া যাবে না। কেননা তাতে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে।

টিকাঃ
৮. আল-কুর'আন, ২৪ (সূরা আন-নূর): ২
৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯০; আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৫
১০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৪৪; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ. ৩৯
১১. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ. ৭, পৃ.১৭১; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১২৯; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ,১০, পৃ.১৭৩-৪; আল-বহুতী, কশশাফ, খ.৬, পৃ.৯১-২
১২. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ.৫০৪; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৩৭
১৩. আল-জাসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.৫, পৃ.৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00