📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 যিনার সংজ্ঞা

📄 যিনার সংজ্ঞা


যিনা একটি অত্যন্ত জঘন্য ও কুৎসিত অপরাধ, যা সমাজে চরম নৈতিক বিপর্যয় ও চরম লাম্পট্য সৃষ্টি করে এবং পারিবারিক বন্ধনকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। এটা ব্যাপকভাৱে সমাজে প্রসার লাভ করলে যুবক-যুবতীরা সনাতন বিবাহ পদ্ধতিতে জড়িত না হয়ে পশুদের মত চরম পাশবিক যৌনতায় মেতে ওঠে। বর্তমানে পশ্চিমা সমাজে যৌন স্বাদ আস্বাদনের কোন সীমা বা নৈতিক বিধি-নিষেধের পরোয়া করা হয় না। যিনা সে সমাজে নিতান্ত ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার রূপে গণ্য। এ কারণেই সেখানে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা আজ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। তদুপরি এ অবৈধ যৌনকর্ম এইট্স নামক মারাত্মক ঘাতক ব্যাধির জন্ম দিয়েছে। এর ফলেই আজ বিশ্বের সচেতন জনসমাজ যিনা পরিহার করে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিবাহের মাধ্যমে যৌনকর্ম সমাধার জন্য প্রতিনিয়ত আহবান জানাচ্ছে।
সকল ধর্মেই অভিন্নভাবে যিনাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে; তবে ইসলামী আইনে এর বীভৎস কদর্যতাকে অত্যন্ত প্রকট করে তুলেছে এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। এর নিকটে যেতেও কঠিন ভাষায় নিষেধে করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, و لا تقربوا الزنا إنه كان فاحشة وساء .سبيلا - "তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না। কেননা তা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও খুব বেশি খারাপ পথ।" একজন ঈমানদারের জন্য তা সম্পূর্ণ কল্পনাতীত ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, إذا زنى الرجل خرج منه .الإيمان - "কোন ব্যক্তি যখন যিনায় লিপ্ত হয় তখন তার থেকে ঈমান বের হয়ে যায়।"
যিনার আভিধানিক অর্থ হল পাপকর্ম করা। সাধারণ অর্থে যিনা বলতে নারী-পুরুষের অবৈধ যৌনমিলনকে বোঝানো হয়। ইসলামী শরী'আতের পরিভাষায় বিশুদ্ধ বৈবাহিক বন্ধন কিংবা সন্দেহজনিত বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া বালিগ ও সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন দুজন নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মতিতে নারীর সামনের যৌনাঙ্গ দিয়ে পুরুষের সঙ্গমক্রিয়াকে যিনা বলা হয়।

টিকাঃ
১. আল-কুর'আন, ১৭ (সূরা বনী ইসরাইল): ৩২
২. আবূ দাউদ, (কিতাবুস সুন্নাহ), হা.নং: ৪৬৯০; আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হা.নং: ৫৬
৩. এটা হানাফী ইমামগণের প্রদত্ত সংজ্ঞার সার কথা। আল্লামা কাসানী বলেন, أما الزنا فهو اسم للوطء الحرام في قبل المرأة الحية في حالة الاختيار العاري عن حقيقة النكاح و شبهته. (আল-কাসানী, বাদাইউস সানা'ই, খ.৭,পৃ. ৩৩-৪) শাফি'ঈগণের মতে, যিনা হল إيلاج حشفة - أو قدرها من ذكر في فرج محرم لعينه مشتهى طبعا بلا شبهة. যৌনকামনাময়ী নিষিদ্ধ কোন লজ্জাস্থানের মধ্যে কোন ধরনের সন্দেহ ছাড়াই পুরুষাঙ্গ কিংবা তার মাথা প্রবেশ করা।" (আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১২৫) হাম্বলীগণের মতে কারোর ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরেজের দিকে অশ্লীল কাজ করাকে যিনা বলা হয়।" (আল-বহুতী, দকা ইক.., খ.৩,পৃ. ৩৪৩)

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 যিনার শাস্তি

📄 যিনার শাস্তি


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 পূর্ববর্তী ধর্মসমূহে যিনার শাস্তি

📄 পূর্ববর্তী ধর্মসমূহে যিনার শাস্তি


ইসলামে বিবাহিত নর-নারীর ব্যভিচারের শাস্তি হল রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা)। কিন্তু এ শাস্তি নতুনভাবে ইসলামে প্রবর্তন করা হয়নি; বরং তাওরাতেও এ শাস্তির কথা বর্ণিত রয়েছে। আর তাওরাতের যে বিধানগুলো রহিত হয়নি, সেগুলো পরবর্তীতে অবতীর্ণ ইঞ্জিলের বিধান রূপেও গণ্য হয়ে থাকে। তাওরাতে অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে, তা সত্ত্বেও আজকের তাওরাতে সেই রজমের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। তবে বর্তমানে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা এ শাস্তি কার্যকর করে না। তাতে অবশ্য এর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না।

টিকাঃ
৪. হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কতিপয় ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারীর যিনা করার অপরাধের শাস্তির কথা জানতে চাইল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের তাওরাতে রজমের শাস্তি দেখতে পাও কি? জবাবে তারা বললো, এ রূপ অপরাধে আমরা তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে লাঞ্ছিত করি এবং তাদের দূররাও মারা হয়। এ সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছো। তাওরাতে তো বিবাহিত নারী-পুরুষের যিনার অপরাধে রজমের কথা বর্ণিত রয়েছে। অতঃপর তাওরাত আনা হলো ও খুলে ধরা হলে একজন রজমের নির্দেশ সংক্রান্ত আয়াতটি হাত দিয়ে ঢেকে রাখল ও তার পূর্বের ও পরের অংশ পাঠ করল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বললেন, তোমরা হাত তুলে ফেল। হাত তুলে নিতেই আয়াতটি সকলে দেখতে পেলেন। তখন ইয়াহুদীরা স্বীকার করল যে, তাওরাতে রজমের নির্দেশ স্পষ্ট ভাষায় লিখিত রয়েছে। অতঃপর তদনুযায়ী রজম করার নির্দেশ জারী করা হলো। -সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল মানাকিব), হা.নং: ৩৪৩৪
৫. পুরাতন নিয়ম, দ্বিতীয় বিবরণ, সূত্র- ২১, ২২ ও ২৩

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ইসলামে যিনার শাস্তির ক্রম বিবর্তন

📄 ইসলামে যিনার শাস্তির ক্রম বিবর্তন


ইসলামের আর্বিভাবের সময় আরব সমাজে যিনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এ অবৈধ যৌনচর্চায় কলুষিত সমাজকে সফলভাবে সংশোধন করার দিকে লক্ষ্য রেখে ইসলামে প্রথমবারেই তার চূড়ান্ত শাস্তির বিধান জারি করা হয়নি; বরং তা ক্রমে ক্রমে জারি হয়েছে, যাতে জনগণের পক্ষে তা গ্রহণ করা সহজ হয়। ইসলামের প্রথম দিকে বিবাহিতের ব্যভিচারের শাস্তি ছিল গৃহবন্দী করে রাখা। আর অবিবাহিতের শাস্তি ছিল কথা ও কাজের সাহায্যে কিংবা বেত্রাঘাত করে কষ্টদান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِنْكُمْ فَإِنْ شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّىٰ يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا ۚ وَاللَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا مِنْكُمْ فَآذُوهُمَا فَإِنْ تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَحِيمًا
নির্লজ্জতার কাজ করবে, তোমাদের মধ্য থেকে তাদের এ অপকর্মের চারজন সাক্ষী কায়েম কর। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখ, যতক্ষণ না তারা মৃত্যুবরণ করবে অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোন উপায় বের করে দেন। আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দুজন এই নির্লজ্জতার কাজ করবে, তাদেরকে কষ্ট দাও। তবে তারা যদি তাওবাহ করে নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে তাদেরকে আর কষ্ট দিওনা। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিঃসন্দেহে তাওবাহ কবুলকারী ও অতিশয় মেহেরবান।" এখানে প্রথম আয়াতে 'مِنْ نِسَائِكُمْ' বলে বিবাহিতাদেরকেই বোঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় আয়াতে وَاللَّذَانِ يَأْتِيَانِهَا দ্বারা অবিবাহিত নারী-পুরুষদেরকে বোঝানো হয়েছে। এ দু'আয়াতে দু'ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ দু'ধরনের শাস্তির মধ্যে একটি ছিল অধিকতর কঠোর। আর তা বিবাহিতের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। অপর শাস্তিটি ছিল হালকা। আর তা অবিবাহিতের জন্য প্রযোজ্য ছিল।
এ আয়াতে ব্যভিচারিণীদেরকে গৃহবন্দী করে রাখতে বলা হয়েছে, যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য অন্য কোন বিহিত ব্যবস্থা নির্দেশ করেন। এ থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, এ বিষয়ে অচিরেই একটি চূড়ান্ত বিধান অবতীর্ণ হবে। পরে সে বিধান নাযিল হয়েছে। হযরত 'উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, خُذُوا عَنِّي خُذُوا عَنِّي "قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلًا الْبِكْرُ بِالْبِكْرِ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَالرَّجْمُ - "তোমরা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর, তোমরা আমার নিকট থেকে গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তা হলো, অবিবাহিত যুবক-যুবতীদের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন এবং বিবাহিতদের জন্য একশত বেত্রাঘাত ও প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা।" এ হাদীস থেকে জানা যায়, যিনাকারীর অবস্থার পার্থক্যের কারণে যিনার শাস্তির মধ্যেও তারতম্য হবে। বিবাহিতের যিনার শাস্তি অবিবাহিতের তুলনায় অত্যন্ত কঠিন ও অধিকতর মর্মন্তুদ। এর কারণ এটা হতে পারে যে, অবিবাহিতদের হালাল পথে যৌনস্পৃহা পূরণের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই তাদের দ্বারা তা সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার মনে করা যায় না। অপরদিকে বিবাহিত নারী-পুরুষের যেহেতু হালাল পথেই তাদের যৌন বাসনা পূরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা রয়েছে, তাই সে ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে বাইরে গিয়ে যিনা করার মানে হল তাদের মনের মধ্যে অন্যায় প্রবণতা বাসা বেধেছে, যা মূলোৎপাটন করা একান্তই জরুরী। তদুপরি তারা নিজেদের মান-মর্যাদা এবং তা লঙ্ঘনের পরিণতি ও বীভৎসতা সম্পর্কে অবহিত। এ কারণেই তাদের শাস্তি তুলনামূলক অধিকতর কঠিন হওয়াই যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক।

টিকাঃ
৬. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা): ১৫-১৬
৭. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯০; আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00