📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 খৃষ্টান গীর্জার মডেল ও মসজিদ

📄 খৃষ্টান গীর্জার মডেল ও মসজিদ


এখন আমরা মসজিদ নির্মাণে খৃষ্টান গীর্জার ডিজাইন অনুসরণ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে আলোচনা করব। কোন কোন প্রত্নতত্ত্ববিদ বলেছেন, মুসলমানরা সিরিয়ান খৃষ্টান গীর্জার অনুসরণে মসজিদ তৈরি করেছে। তাদের অধিকাংশই দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের নজীর পেশ করেন। কেননা, উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক দামেস্কের খৃষ্টান গীর্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং গীর্জার বেশীর ভাগ অংশ অক্ষুণ্ণ রাখেন। তাই দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের খুঁটিগুলো খৃষ্টান গীর্জার আকৃতিতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে তিন সারি বিশিষ্ট।
বাস্তব সত্য এই যে, দামেস্কের উমাইয়া জামে' মসজিদ খৃষ্টান গীর্জার পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কেননা, মসজিদটির পরিকল্পনার উপাদানের সাথে গীর্জার পরিকল্পনার উপাদানের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অনুরূপভাবে, পূর্ব থেকে পশ্চিমে সারিবদ্ধ খুঁটি নির্মাণও মসজিদের পরিকল্পনার স্থায়ী কোন নিয়ম নয়। আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে, দামেস্কের জামে' মসজিদ খৃষ্টান গীর্জার অনুরূপভাবে তৈরি হয়েছে, তাহলে মদীনা,’ বসরা, কুফা, ফোস্তাত ও কায়রাওয়ান সহ অন্যান্য মুসলিম শহরে নির্মিত উমাইয়া মসজিদগুলোও সেরকম হবে। অথচ ঐ সকল মসজিদ দামেস্কের মসজিদ থেকে ভিন্ন ধরনের। পরবর্তিতে যে সকল মসজিদ তৈরি হয়েছে সে গুলো উমাইয়া মসজিদের অনুকরণে নয়, বরং মদীনার মসজিদে নববীর অনুসরণে তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, মসজিদ ও গীর্জার মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য রয়েছে। আর তা হল, গীর্জার রয়েছে উঁচু দেয়াল, ঘন্টার স্থান ও টাওয়ার। এর ফলে গীর্জা আকাশচুম্বি হয়ে থাকে। অপরদিকে মসজিদ হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মসজিদ যমীনের ওপর সাদা-মাটা অবস্থায় সম্মান ও একনিষ্ঠা সহকারে শান্ত বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যিকার অর্থে মসজিদের স্থানটুকুর যতটুকু সদ্ব্যবহার করা হয়, অন্য কোন ধর্মের উপাসনার স্থানের ততটুকু সদ্ব্যবহার অবশ্যই করা হয় না। মন্দির ও উপাসনালয় গুলোর বৃহৎ আয়তন, উঁচু দেয়াল, অসংখ্য বাতির আলোকে উজ্জ্বল আভ্যন্তরীণ হল ও বিরাট খালি স্থান যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সেগুলোর নেতৃত্ব ও পরিচালনার ভার হচ্ছে, ঠাকুর, ব্রাহ্মণ, পাদরী ও যাজকের হাতে। তারা আবার বিশেষ শ্রেণীর লোক এবং তাদের রয়েছে বিশেষ কমিটি। তারা দর্শনার্থীদের অন্তরে প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টিকারী বিশেষ ধরনের পোশাক পরে। তারা উপাসনা ও পূজায় সুঘ্রাণযুক্ত ধুয়া জ্বালায়, বিশেষ ধরনের আলোকসজ্জা করে, গান-বাজনা ও দুর্বোধ্য মন্ত্র ও শ্লোক পাঠ করে। পূজায় বহু অর্থের অপচয় করা হয় এবং বিরাট পরিমাণ খাদ্য নষ্ট করা হয়। মূর্তির সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে খাদ্য পেশ করা হয় এবং তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। স্বয়ং রকমারি মূর্তি তৈরিতেও বিরাট অংকের অপচয় হয়। ইহুদী, খৃষ্টান ও হিন্দু-বৌদ্ধ সহ অন্যান্য সকল ধর্মের উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে এ অপচয় ও বিলাসিতা প্রযোজ্য।
ইসলামের মসজিদে ঐ সকল অপচয় ও বিলাসিতা নেই। মসজিদ সাধারণত ছোট একখন্ড জায়গার ওপর কায়েম করা হয়। কোন কোন মসজিদ বৃহদাকারেও হয় কিন্তু তাই বলে তাতে অপচয় ও বাহুল্য নেই। মসজিদকে সর্বদা পবিত্র ও পরিষ্কার রাখা হয়। তাতে কেবলার দিক নির্ধারিত থাকে এবং এতে নিয়মিত নামায আদায় করা হয়। যে ভূ-খন্ডের ওপর মসজিদ নির্মিত হয়েছে তা চারদিক থেকে দেয়াল পরিবেষ্টিত থাকে। খুব কম মসজিদই দেয়াল ঘেরা নয়। মেঝেতে, ইটপাথর লাগানো হয় এবং এর ওপর বিছানা কিংবা জায়-নামায পাতা হয়। মসজিদের জন্য সাধারণ ঘর কিংবা পাকা ভবন তৈরি করা হয়। এতে দেয়াল, ছাদ, গম্বুজ ও মিনারা থাকে। আবার কোন কোন মসজিদে এগুলোর কিছুই বিদ্যমান নেই। তাতে কিছু আসে যায় না। মসজিদ ছোট হোক কিংবা বড় হোক, মুসলমানের মনে এর বিরাট সম্মান ও শ্রদ্ধা বর্তমান আছে। মসজিদ পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটাকে ঈমান ও বিশ্বাসের কেন্দ্র মনে করা হয়। মূলত মসজিদ হচ্ছে একটি দর্শন ও আত্মার নাম।
দর্শন এই ভিত্তিতে যে, রসূলুল্লাহ (স) নিজ হাতে এই মসজিদের গোড়া পত্তন করেন।
আর আত্মা বলতে বুঝায়, তা ইসলামের আত্মা বা প্রাণ। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ লাভ করার পর রসূলুল্লাহ (স) মদীনায় ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদ তৈরির পূর্বে তিনি কোন গীর্জা কিংবা মন্দির অথবা মঠের আকৃতি দেখা কিংবা অনুসরণ করার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
তিনি যে মসজিদ তৈরি করেন, তা খুবই সাদাসিধে ছিল। মসজিদের আকৃতিতে মুসলমানের সঠিক পরিচিতি ফুটে উঠত। পরবর্তীতেও মুসলমানরা মসজিদের একই আকৃতি ও অবস্থা অব্যাহত রাখেন।
খৃষ্টানদের গীর্জা বা গীর্জার অংশ বিশেষকে মসজিদ বানানোর প্রয়োজনটাই বা কি? কেননা, খালি একখন্ড যমীনে মসজিদ নির্মাণ করা এর চাইতে আরো সহজ এবং কম ব্যয় সাপেক্ষ। এ ছাড়াও এর মাধ্যমে কারুর অনুভূতিতে কষ্ট দেয়া হয় না। শুধুমাত্র তুরস্কের ওসমানী সুলতানগণ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের যে অংশগুলো জয় করেছেন, সেখানকার গীর্জাগুলোকে মসজিদে রূপান্তর করেছেন। সম্ভবত তা স্পেনের মসজিদগুলোকে মন্দিরে রূপান্তর করার খৃষ্টান কর্মসূচীর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছিল। এটা ইতিহাসের একটা বিশেষ অধ্যায়ের ঘটনা এবং এটা ইসলামের কোন সাধারণ নিয়ম নয়।
কোন কোন প্রাচ্যবিদ বলেছেন, মসজিদের মূল পরিকল্পনায় গীর্জার সকল বিষয় নয় বরং অংশ বিশেষকে অনুকরণ করা হয়েছে। যেমন, মিনারা, মিম্বার, মেহরাব ও হুজরাহখানা ইত্যাদি। প্রাচ্যবিদদের এ সকল কথার যে, কোন ভিত্তি নেই তা ইতিমধ্যেই আমরা প্রমাণ করেছি। কেননা, মিনারা তৈরি করা হয় আযান দেয়ার জন্য। মিম্বর নির্মাণ করা হয় খোতবা দেয়ার উদ্দেশ্যে। মেহরাব নির্মাণ করা হয় ইমাম যেখানে দাঁড়িয়ে মুসল্লীদের নামাযের নেতৃত্ব দেবেন। মেহরাব কেবলার দিক নির্দেশক। ইমামের পিছনে সকল মুসল্লী সাম্য ও ঐক্যের নিদর্শন হিসেবে কোন ভেদাভেদ ছাড়াই আল্লাহর সান্নিধ্যে হাজির হয়। যেমন সেনাপতি সৈনিকদের সাথে অবস্থান করে তাদের নেতৃত্ব দেন। ইমামকে মেহরাব ছাড়া অন্য কোন বিশেষ পোশাক বা চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা নেই। তিনিও সাধারণ মুসল্লীদের মতই একজন সাধারণ মানুষ। ইসলামে গণতন্ত্রের এই ভিত্তির কারণেই মসজিদগুলোর বিস্তার হয়েছে।
মুসলমানরা মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়ে থাকেন। মসজিদে গীর্জার অনুরূপ কোন গান-বাজনা, ছবি ও বিশেষ ধরনের তথাকথিত বরকতময় সুগন্ধি বিতরণের ব্যবস্থা থাকে না কিংবা এমন কোন বিশেষ রং ও উপকরণ নেই যা সমবেত লোকদের মনে বিশেষভাবে দাগ কাটতে পারে ও প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম।
ইসলাম ঐ সকল চমকপ্রদ ও চোখ ঝলসানো উপকরণের মাধ্যমে মানুষের মনে প্রভাবসৃষ্টির পরিবর্তে সরাসরি আল্লাহর সাথে বান্দাহর সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়ার ব্যবস্থা করে। পার্থিব ও জড় উপাদানের প্রভাব সৃষ্টির পরিবর্তে এগুলোর স্রষ্টা আল্লাহ রবুল আলামীনের আদেশ-নিষেধ বুঝে তা বাস্তবায়ন করতে পারলেই মনে স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি হবে। জড় উপাদানের ইতি ঘটলে জড় প্রভাবেরও ইতি ঘটে। তাই ইসলামে কৃত্রিম প্রভাব সৃষ্টির ব্যবস্থা নেই।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 ইহুদী সিনাগগ মডেল ও মসজিদ

📄 ইহুদী সিনাগগ মডেল ও মসজিদ


কোন কোন পাশ্চাত্যবিদ মনে করেন, মসজিদের বাঁকা মেহরাবের সাথে ইহুদী উপাসনালয় (Synagogue) এর বক্রতার মিল আছে। অনুরূপভাবে, মসজিদের মিম্বারের সাথে ইহুদী সিনাগগের ফ্লাটফরমের সাদৃশ্য রয়েছে। মিঃ ল্যামপিয়ার এই মতকে স্বীকার করে বলেছেন, শুধুমাত্র মসজিদের মিম্বরের সাথে সিনাগগের উঁচু আসনের মিল আছে। ১
মূলত এ সকল মতামতের সত্য কোন ভিত্তি নেই। ইহুদী ধর্মানুসারী লেখক নিজ ধর্মের ব্যাপারে শুধুমাত্র গোঁড়ামীর পরিচয় দিয়েছেন। কেননা, মসজিদের মিম্বার ও সিনাগগের উঁচু আসনের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে, মিল থাকার কোন প্রশ্নই উঠে না। কেননা, দু'টো জিনিস দু'টো পদ্ধতি ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

টিকাঃ
১. মাওখাল ইলা মাসাজিদিল কাহেরা ওয়া মাদারিসেহা- ২৮৯ পৃঃ

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 পারস্যের রাজ প্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষ ও মসজিদ

📄 পারস্যের রাজ প্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষ ও মসজিদ


পাশ্চাত্যবিদ ক্রেজওয়েলের মতে, মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণ পদ্ধতি দু'টো। একটি হচ্ছে, সিরিয়ার খৃষ্টান পদ্ধতি এবং অন্যটি হচ্ছে, ইরাকের গৃহীত পারস্য রাজপ্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষ পদ্ধতি। পারস্য রাজপ্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষ ছিল চারকোণ বিশিষ্ট। মসজিদেরও রয়েছে চারকোন। ক্রেজওয়েল এর ওপর ভিত্তি করে মসজিদ সম্পর্কে ঐ ভ্রান্ত মন্তব্য করেন। ১
অথচ এটা সবার কাছে পরিষ্কার, ইরাকের মসজিদগুলোও মদীনার মসজিদে নববীর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। কেননা, মসজিদগুলোর সাদামাটা রূপ এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তা কোন রাজপ্রাসাদের অনুকরণে তৈরি করা হয়নি।

টিকাঃ
১. মাওখাল ইলা মাসাজিদিল কাহেরা ওয়া মাদারিসেহা- ২৮৯ পৃঃ

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 রোমান বাজার এবং আদালত মডেল ও মসজিদ

📄 রোমান বাজার এবং আদালত মডেল ও মসজিদ


প্রাচ্যবিদ সোভাজিয়ার মতে, ২ مسلمانوں মসজিদ রোমাণ বাজার ও আদালতের অনুকরণে গড়ে উঠেছে। তার মতে, মসজিদ হচ্ছে সরকারী ও জাতীয় ভিত্তিক সভা-বৈঠকের স্থান। এটা মূলত আদালত কক্ষ এবং অস্ত্রাগার ও বাইতুলমালের সমপর্যায়ের। তাই সোভাজিয়া বলেছেন, মসজিদের এ ভূমিকার সাথে রোমান অভ্যর্থনা কক্ষের মিল রয়েছে, তিনি আরো বলেছেন, এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য এতটুকু যে, অভ্যর্থনা কক্ষ বিশেষ লোকদের জন্য এবং মসজিদ হচ্ছে সাধারণ লোকদের জন্য।
বাস্তবতা হচ্ছে এ যে, সোভাজিয়ার এ মতটি ভারসাম্যপূর্ণ নয়। তিনি মসজিদের মূল কক্ষকে উপেক্ষা করেছেন। অর্থাৎ রোমান অভ্যর্থনা কক্ষ ও মসজিদের কক্ষের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি।
মূল কথা হল, مسلمانوں মসজিদের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিজস্ব। এটা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয়ের পদ্ধতি থেকে ধার করা নয়। ইসলামের পূর্বে মসজিদের এ আকৃতি ও ডিজাইন কোথাও ছিল না। তাই পাশ্চাত্যবিদদের ঐ সকল মনগড়া কথার কোন যৌক্তিকতা নেই। মুসলমানরা সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তি ও প্রতিভার ভিত্তিতে ঐ নূতন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।

টিকাঃ
২. ঐ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00