📄 জামে' কারওয়ীন
মরক্কোর মসজিদ
এ মসজিদটি মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত। মসজিদটির অপর নাম হচ্ছে, জামে' আশারাফা। উত্তর আফ্রিকায় হেলালীদের আক্রমণের ফলে কায়রাওয়ান থেকে যে সকল উদ্বাস্তু ফেজে পালিয়ে আসেন তাদের জন্য ২য় ইদ্রিস ফেজ শহরের পশ্চিমাংশে ঐ মসজিদ তৈরি করেন। মরক্কোর ফেজ শহরকে অধিকতর নিরাপদ মনে করে শরণার্থীরা এখানে এসে আশ্রয় নেন। প্রথম ইদ্রিস বিন আবদুল্লাহ আলাভী ইদ্রিসী শাসনের জন্য ওলাইলে ১ম রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। আর ২য় ইদ্রিস ফেজে ২য় রাজধানী কায়েম করেন। মসজিদটি ১৯২ হিঃ থেকে ২৪৫ হিজরী পর্যন্ত একইভাবে ছোট আকৃতি সহকারে বহাল থাকে।
মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ আল-ফেহরী কায়রাওয়ান থেকে মরক্কোতে পালিয়ে আসেন। তিনি ধনী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কন্যা ফাতেমা ঐ সম্পদের বিরাট অংশের উত্তরাধিকার লাভ করেন। তিনি ঐ সম্পদের এক অংশ দিয়ে ২৪৫ হিজরী মোতাবেক ৮৫৯ খৃঃ মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন।
৫৩৮ হিঃ পর্যন্ত মসজিদে নিয়মিত ফিক্হ ও ইসলামী শরীয়াহর শিক্ষা পরিচালিত হত। কায়রাওয়ান থেকে আগত ওলামায়ে কেরাম শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন। কারওইন শব্দটি কায়রাওয়ানের দিকে সম্বোধনসূচক। তারা কায়রাওয়ান থেকে যে জ্ঞান-ভাণ্ডার নিয়ে এসেছেন এখানে তা বিলির ব্যবস্থা করেন। তখন থেকে মসজিদে মরক্কোর হাযার হাযার লোক শিক্ষা গ্রহণ করে বেরিয়েছে। এটি মরক্কোর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মসজিদ যার প্রভাব মরক্কোর ওপর আজ পর্যন্তও বিদ্যমান আছে। মসজিদটি ইউরোপের বহু পণ্ডিত ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ ১১ শতাব্দী যাবত মসজিদটি মাদ্রাসা, সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। কুরআন শিক্ষা, কুরআনের ভাষা আরবী শিক্ষা, দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র, ফার্মেসী, পদার্থ বিদ্যা, প্রকৌশল বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করে মসজিদটি মূলত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে বিরাট অবদান রেখেছে। ছাত্র ও শিক্ষকরা নিজেদের পসন্দের ব্যাপারে ছিল পূর্ণ স্বাধীন। পাশ্চাত্যের বহু পণ্ডিতও এ মসজিদ থেকে ইসলাম সম্পর্কে লেখা-পড়া করেছেন।
এ মসজিদ থেকেই বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত ইবনে রুশদ, ইবনে তোফায়েল, ইবনে বাজাহ, ইবনে হাযাম এবং ইবনুল আরবী শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মসজিদে ছিল একটি কোষাগার।
১৯৩১ খৃঃ মসজিদের শিক্ষাকে তিনভাগে বিভক্ত করে একটি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারী করা হয়। সেগুলো হল, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। এরপর এটাকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করা হয় এবং তাতে শরীয়ah, সাহিত্য ও বিজ্ঞান অনুষদ খোলা হয়।
মরক্কোতে ফরাসী শাসন কায়েম হওয়ার পর তারা মসজিদটিকে খুব ভয় পায়। তারা মসজিদটি বন্ধ কিংবা তাতে ছাত্রের সংখ্যা সীমিত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মরক্কোর বাদশাহ মুহাম্মাদ তা বুঝতে পেরে এর বিরোধিতা করেন এবং মুহাম্মাদ আল-ফাসীকে ১৯৩৭ খৃঃ কারওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর নিয়োগ করেন। মুহাম্মাদ আল-ফাসী কারওইনের ছাত্র এবং প্যারিসেও লেখা-পড়া করেছেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিদেশী ভাষা শিক্ষা এবং মহিলা শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মরক্কোকে বিদেশী উপনিবেশবাদী শাসনের শৃংখলমুক্ত করে। তাই পাশ্চাত্যের কিছু সংখ্যক লেখক ও বুদ্ধিজীবী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কলম ধরে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি উন্নতি ও প্রগতির জন্য কাজ করছে না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা নেই। ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছাড়া এ সকল মন্তব্য ও বক্তব্যের আর কোন অর্থ নেই। কেননা, আফ্রিকা ও ইউরোপে ইসলাম বিস্তারে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অতুলনীয়।
গোটা আফ্রিকা আজ ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোয় আলোকিত। এটি মরক্কোর ইসলাম ও মুসলমানের পুনর্জীবনে অতীতের মত ভবিষ্যতেও বড় ধরনের অবদান রাখবে। -ইনশাআল্লাহ।