📄 জামে' কায়রাওয়ান
ইসলামী শাসনের সোনালী যুগে বসরা, কুফা ও ফোস্তাতের পরে কায়রাওয়ান হচ্ছে ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ৪র্থ শহর। উমাইয়া সেনাপতি আকাবা বিন নাফে' হচ্ছেন ঐ শহরের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মাগরেব দেশসমূহের অন্যতম বিজয়ী নেতাও বটে। খলীফা মুআবিয়া বিন আবি সুফিয়ান (রা) হিজরী ৫০ সালে তাঁকে আফ্রিকার গভর্ণর নিযুক্ত করেন। তিনি আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সারাহর নেতৃত্বে ঐ সকল দেশ জয়ের সময় অংশগ্রহণ করেন। ফলে সে সকল দেশ সম্পর্কে তিনি অপেক্ষাকৃত বেশী অভিজ্ঞ।
আকাবা বিন নাফে' আল-ফেহরী ১০ হাজার মুসলিম বাহিনী সহকারে তিউনিশিয়া জয় করেন। তিনি সেখানে ইসলামকে স্থায়ী করার চিন্তা করেন। তিনি বলেন :
ইমাম আফ্রিকায় প্রবেশের সাথে সাথে সেখানকার অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং নেতা বা ইমাম চলে গেলে তারা আবার কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করে। হে মুসলমানগণ! আমি মনে করি তোমরা এখানে একটি শহর কায়েম কর, আমরা সেখানে শিবির স্থাপন করি। যাতে করে ইসলাম এখানে স্থায়ী হয়। তখন তিনি কায়রাওয়ান শহরটি তৈরি করেন। অর্থনীতি, সামরিক কৌশল ও যোগাযোগের গুরুত্বের কারণে তিনি কায়রাওয়ান শহরটি নির্মাণ করেন। উপকূল থেকে দূরে হওয়ায় তা রোমান নৌবহরের নাগালের বাইরে ছিল এবং এর প্রতিরক্ষার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থার দরকার ছিল না। সামনে ছিল আওরাস পাহাড়। যা পরবর্তীতে বিভিন্ন আক্রমণকারীদেরকে প্রতিহত করেছে। আকাবা বিন নাফে' শহর প্রতিষ্ঠার আগে সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেন। সেই মসজিদ আজও তার প্রতিষ্ঠাতার নামের স্মারক হয়ে আছে।
কায়রাওয়ান শহর প্রতিষ্ঠার ফলে, ইসলামের শৌর্যবীর্য ও বিজয় সামনে অগ্রসর হতে থাকে। এর ফলে, সাহায্য-সহযোগিতার জন্য মিসরের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যায় এবং এ শহরেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে মিসরের সাথে পথের দূরত্ব হ্রাস পায় এবং সময়ের অপচয় থেকে বাঁচা সম্ভব হয়। কেননা, ইতিপূর্বে মিসরের আদেশ-নিষেধ, অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে উপায় ছিল না। আকাবাসহ অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ মসজিদ থেকেই নিজেদের অগ্রাভিযান, শাসন ও অগ্রগতির অভিযান পরিচালনা করেন। ফলে, পরবর্তীকালে উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহ সহ স্পেন বিজয় সম্ভব হয়। আকাবা বিন নাফে' মসজিদের কেবলা নির্ধারণে ব্যাপক পরিশ্রম করেন। জানা যায় যে, শেষ পর্যন্ত তিনি স্বপ্নে প্রাপ্ত নিদর্শনের ভিত্তিতে মসজিদের কেবলা নির্ধারণ করেন। তিনি মসজিদে একটি মেহরাব তৈরি করেন। এ মসজিদ পরবর্তীতে ঐ সকল দেশসমূহের অন্যান্য মসজিদের দিশারীর ভূমিকা পালন করে।
মসজিদটির দৈর্ঘ ১২৬ মিটার এবং প্রস্থ ৭৭ মিটার। এর সামনের আঙ্গিনার দৈর্ঘ হচ্ছে ৬৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫৬ মিটার। মিনারাটি মসজিদের উত্তর বাহুর মাঝামাঝি অবস্থিত। হিজরী ৫০ সালে (৬৭০খৃঃ) যে স্থানে আকাবা বিন নাফে' ঝাণ্ডা দাঁড় করিয়েছিলেন সে স্থানে আজও মেহরাবটি অব্যাহত আছে। ২২১ হিজরী মোতাবেক ৮৩৬ খৃঃ যেয়াদাতুল্লাহ বিন আগলাবের সংস্কারের সময় আকাবার মেহরাবটি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এটিকে ঢেকে দেয়া হয় এবং এর ওপর নূতন মেহরাব নির্মাণ করা হয়। তখন তা ভেঙ্গে নূতন করে নির্মাণের প্রস্তাব করা হলে ফকীহগণ তার বিরোধিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত এর ওপর দেয়াল নির্মাণ করে তাকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়।
তিউনেশিয়ার শাসক হাসান বিন নো'মান গাস্সানী মেহরাব ছাড়া মসজিদটি ভেঙ্গে তা পুনরায় নির্মাণ করেন। তিনি মসজিদের জন্য যে মিনারা তৈরি করেন তা আজ পর্যন্তও বিদ্যমান আছে। মসজিদে মুসল্লী সংকুলান না হওয়ায় হাসান তা সম্প্রসারণ করেন। কেননা, কায়রাওয়ান শহরে লোকসংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায়।
মাগরেবের দেশসমূহের জন্য ঐ মসজিদটিকে জ্ঞানের মিনারা বলা যায়। কেননা, সেখান থেকে ঐ সকল দেশের জন্য বহু আলেম ও পণ্ডিত ব্যক্তি তৈরি হন। এর উত্তম সাক্ষী হল, কায়রাওয়ানের শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে মরক্কোর ফেজ শহরে 'জামে' কারওইন' প্রতিষ্ঠা করেন। কায়রাওয়ান থেকে বের হওয়ার কারণে তারা নিজেদেরকে এর সাথে সম্বোধন করে ঐ মসজিদের নামকরণ করেন 'কারওইন'।
কায়রাওয়ান মসজিদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইমাম মালেকের ছাত্র আলী বিন যিয়াদ, আসাদ বিন ফোরাত এবং সাহনুন বিন সাঈদ অন্যতম। আসাদ বিন ফোরাত দীর্ঘ দিন মদীনায় বাস করেন। পরে তিনি মালেকী মাযহাব শিক্ষার জন্য কায়রাওয়ান আসেন। এরপর তিনি হানাফী মাযহাব সম্পর্কে জানার জন্য ইমাম আবু ইউসুফের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশে ইরাক আসেন। অপরদিকে, সাহনুন বিন সাঈদ মদীনা থেকে এলেম শিক্ষা করে কায়রাওয়ানের জামে' মসজিদে শিক্ষকতার কাজ করেন এবং পরে কায়রাওয়ানের ইমাম ও বিচারক নিযুক্ত হন। এই কয়জন হচ্ছেন, কায়রাওয়ান মসজিদের অসংখ্য ছাত্রের মাত্র অল্প কয়েকজন।
কায়রাওয়ানের ওলামায়ে কেরাম দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে অংশ গ্রহণ করেন। আসাদ বিন ফোরাত সহ অনেক আলেম আকাল্লিয়া দ্বীপ জয়ের পরিকল্পনায় অংশ নেন। আসাদ বিন ফোরাতের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সেই দ্বীপের বহুলাংশ জয় করেন। শেষ পর্যন্ত এক দুর্গ অবরোধকালীন সময়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৭০ বছর। তিনি কায়রাওয়ানের একজন বিচারপতিও ছিলেন।
এ কায়রাওয়ান মসজিদ থেকেই দীনী জ্ঞানের চর্চা, দাওয়াতে দীন ও তাবলীগ, জিহাদ ও ইকামাতে দীনের প্রচেষ্টা পাশাপাশি চলতে থাকে। এ মসজিদের আলো উত্তর আফ্রিকার সর্বত্র প্রজ্জ্বলিত হয় এবং কুফর ও জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে দূর করতে সক্ষম হয়। প্রতিষ্ঠাতা জীবিত না থাকলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ তাঁর জিহাদী ভূমিকাসহ দীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ অব্যাহত রেখে অন্যান্য মসজিদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রয়েছে। পরবর্তীতে মসজিদটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় এবং জ্ঞানের আলো জোরালোভাবে বিতরণের কাজ অব্যাহত রাখে।