📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 আমর বিন আ'স জামে' মসজিদ

📄 আমর বিন আ'স জামে' মসজিদ


মিসরের ফোসতাতে এ মসজিদটি অবস্থিত। ২য় খলীফা হযরত ওমর বিন খাত্তাবের আমলে মিসর বিজয়ী আমর বিন আসের হাতে ফোসতাত শহরের ভিত্তি স্থাপিত হয়। হিজরী ২১ সালে, তিনি নিজের নামে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটাকে 'মসজিদে আতীক' এবং 'মসজিদে তাজুল জাওয়ামে'ও বলা হয়। এটা মিসরের প্রথম মসজিদ এবং ইসলামের ৪র্থ মসজিদ। এর আগে, মদীনা, কুফা ও বসরায় তিনটি মসজিদ তৈরি হয়েছিল।
মসজিদটি ছিল খুবই সাদামাটা ধরনের। হযরত আমর বিন আ'স যখন মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নেন তখন উপস্থিত ৮০ জন সাহাবায়ে কেরাম কেবলার দিক নির্ধারণে সহযোগিতা করেন। তাদের মধ্যে হযরত যোবায়ের বিন আওয়াম, মেকদাদ বিন আসওয়াদ, ওবাদাহ বিন সামেত, আবুদ্দারদা এবং আবু যার গিফারী (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরামের নাম উল্লেখযোগ্য। যদিও কেবলাহ সুস্পষ্ট ছিল এবং তা নির্ধারণে কোন বেগ পাওয়ার কথা নয়। তথাপি তাঁরা সবাই মিলে কেবলাহ নির্ধারণ করেন।
হযরত আমর বিন আ'স (রা) ভেতরে খোলা মেহরাব তৈরি করেননি। উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের আমলে তার প্রতিনিধি কোররাহ বিন শোরাইক 'মেহরাব নির্মাণ করেন। কেননা, খলীফা ওয়ালিদের গভর্ণর ওমর বিন আবদুল আযীযই সর্বপ্রথম মসজিদের মেহরাবের ধারণা প্রকাশ করেন।
প্রথমে মসজিদের দৈর্ঘ ছিল ৫০ গজ এবং প্রস্থ ৩০ গজ। দেয়াল ছিল কাঁচা ইটের তৈরি এবং ভিটিতে পাথর। খুঁটি খেজুর গাছের এবং চাল ছিল খেজুর পাতার তৈরি।
সাহাবায়ে কেরামের নিজ হাতে তৈরি ঐ মসজিদে নামায পড়ার সৌভাগ্য কয়জনের আছে?
হযরত আমর বিন আ'স (রা) মসজিদের জন্য একটা মিম্বার তৈরি করেন।
হযরত ওমর ফারুক (রা) তা জেনে তাঁর কাছে একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি বলেন, "তোমার ধারণা কি এই যে, তুমি দাঁড়িয়ে খোতবাহ দেবে এবং লোকেরা তোমার পায়ের গোড়ালীর নীচে অবস্থান করবে?” এই চিঠি পেয়ে হযরত আমর বিন আ'স মিম্বারটি ভেঙ্গে ফেলেন। পরে নাওবার বাদশাহ যাকারিয়া বিন মারকিয়া মিসরের আমীর আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সারাহর কাছে মসজিদের জন্য একটা মিম্বার উপহার দেন। ৫৩ হিজরীতে মিসরে নিযুক্ত উমাইয়া গভর্ণর হযরত মোসলেমা বিন মোখাল্লাদ আনসারী (রা) সর্বপ্রথম মসজিদটি পূর্বদিকে সম্প্রসারণ করেন। ৭৯ হিজরীতে আবদুল আযীয বিন মারওয়ান পশ্চিম দিকে মসজিদ বাড়ান। ৯২ হিজরীতে, মিসরে নিযুক্ত উমাইয়া গভর্ণর কোররা বিন শোরাইক মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলেন এবং পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি হযরত আমর বিন আ'স (রা) ও তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ (রা)-এর ঘরের একটা অংশও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ওমর বিন আবদুল আযীয কর্তৃক মদীনার মসজিদের অনুরূপ একটা মেহরাব তৈরি করেন।
২১২ হিজরীতে আব্বাসী খলীফা মামুনের শাসনামলে মিসরের আব্বাসী গভর্ণর আবদুল্লাহ বিন তাহের মসজিদটি আরো সম্প্রসারণ করেন। ফলে, মসজিদের আয়তন অনেক বেড়ে যায়। এটাই ঐ মসজিদের সর্ববৃহৎ সম্প্রসারণ বলে বিবেচনা করা হয়। এরপর আর মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়নি এবং সে আয়তন আজ পর্যন্তও অব্যাহত আছে। আর তা হচ্ছে, ১১২.৫x১২০ মিটার। অর্থাৎ প্রায় ১৫ হাজার বর্গমিটার। মসজিদে ৩৭৮টি স্তম্ভ, ৩টি মেহরাব, ১৩টি দরজা ও ৫টি মিনারা আছে।
কারো কারো মতে, মসজিদের ভিটি-মাটি ছাড়া হযরত আমরের মসজিদের আর কোন স্মৃতি অবশিষ্ট নেই।
হিজরী ২১ সালে ফোস্তাতে মসজিদ তৈরির পর থেকে আজ পর্যন্ত তা বিরাট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে এবং এর সেবা শুধু মিসরে নয়, মিসরের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছে। তখন থেকেই মসজিদটি ইসলামের নীতিমালা, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির লালনক্ষেত্র হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়াও তা মিসরের শাসকের বিচারালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
মসজিদে সর্বপ্রথম হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আ'স (রা) শিক্ষাদান শুরু করেন এবং বহু ছাত্র তাঁর কাছে হাদীস শিক্ষা-লাভ করেন। তিনি অন্য আরেকটি শিক্ষা আসরে ছাত্রদেরকে সুরিয়ানী ভাষা শিক্ষা দিতেন। এ মসজিদে বসেই তিনি হাদীসের কিতাব 'আস-সাদেকা' এবং অন্য দুইটি কিতাব 'আকদিয়াতুর রসূল' ও 'আশরাতুস সাআহ' রচনা করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা)ই মিসরের সর্বপ্রথম ফকীহ ও শিক্ষক।
শাফেঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেঈ (র) হচ্ছেন ঐ মসজিদের প্রসিদ্ধ শিক্ষক। তিনি ১৯৯ কিংবা ২০১ হিজরীতে মিসর আসেন এবং ফোস্তাতের মসজিদে শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি লোকদের কাছে নিজ মাযহাবের মাসআলাসমূহ পেশ করা শুরু করেন। এ দৃষ্টিতে মসজিদটি হচ্ছে শাফেঈ ফিক্হ শাস্ত্রের প্রথম মাদ্রাসা। এ মসজিদেই তিনি তাঁর জগদ্বিখ্যাত কিতাব 'আল-উন্মু' লিখেন যা শাফেঈ ফিক্সের শ্রেষ্ঠ কিতাব। তিনি প্রত্যেক দিন সকালে ফজরের পর মসজিদে শিক্ষা দিতেন। তাঁর কাছে প্রথমে হাদীস, পরে ফিক্হ এবং সর্বশেষে আরবী ভাষা শিক্ষার্থীরা হাযির হত। ইবনে বতুতা বলেছেন, আবু আবদুল্লাহ শাফেঈ মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে বসে শিক্ষা দিতেন। ইমাম শাফেঈ (র) এ মসজিদে মৃত্যু পর্যন্ত শিক্ষা দান করেন।
এ মসজিদে প্রখ্যাত মোফাস্সের, ফকীহ ও ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ বিন জারীর আত্তাবারীও শিক্ষাদান করেন। তিনি আবুল হাসান বিন সিরাজের আবেদনক্রমে তাফসীর, ফিক্হ, হাদীস, আরবীভাষা ও কবিতা শিক্ষা দেন।
কুফা থেকে কাজী ইসমাইল বিন আল-ইয়াসা' মিসর যান এবং এ মসজিদকে হানাফী মাযহাবের ফিক্ শিক্ষার কেন্দ্র বানান। তিনিই সর্বপ্রথম মিসরে হানাফী মাযহাব প্রবেশ করান।
শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে সাথে মসজিদে ওয়ায ও বক্তৃতার কাজ অব্যাহত থাকে। মিসরের প্রখ্যাত বক্তা লাইস বিন সা'দ এ মসজিদে বক্তৃতা করেন।
মোট কথা, মসজিদে নিয়মিত শিক্ষা আসর বসত। তাতে বহু পাঠকের সমাবেশ ঘটত। দিনে বা রাত্রে ৫ হাজারের বেশী লোক থাকত। মসজিদের আঙ্গিনায় ছাত্র, বিদেশী ও দলীল লেখকসহ বহু লোকের সমাবেশ ঘটত।
মসজিদে শুধু পুরুষদের আসরই নয়, বরং মহিলাদেরও শিক্ষা আসর বসত। মসজিদের এক অংশে নাফীসা বিনতে হাসান বসে শিক্ষা দিতেন এবং সেই অংশে মহিলারা নামায পড়ত। অনুরূপভাবে, ফাতেমা বিনতে আফ্ফান বাগদাদীও সেই অংশে মহিলাদের মধ্যে দীনের দাওয়াতী কাজ আজাম দিতেন।
ফাতেমী শাসনামলে, বিচারক মসজিদে বসে লোকদের বিচার-আচার করতেন। তিনি প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবারে বসতেন।
মসজিদটি বর্তমান যুগের বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাতে চিকিৎসা বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অংক, জ্যামিতি, তাফসীর, হাদীস, ফিক্ ও আরবী ব্যাকরণ সহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করা হত। তুরস্কের ওসমানী সুলতানদের মিসর শাসনের আগ পর্যন্ত মসজিদটির জ্ঞানসেবা অব্যাহত থাকে। ওসমানী শাসনের পর লোকেরা সেখানে জ্ঞানচর্চা বন্ধ করে দেয় এবং তা শুধু ইবাদাতের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
এ মসজিদের ভূমিকা শুধু সাংস্কৃতিক, দীনী ও জ্ঞানসেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাতে রাজনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত ছিল। হযরত আ'মর বিন আস মসজিদকে পরামর্শ সভা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ করতেন। তিনি ঐ মসজিদের মিম্বার থেকে রাজনৈতিক ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি জনকল্যাণের স্বার্থে কাজ করা, স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং লোকদেরকে সংক্রামক ব্যাধি থেকে সতর্ক থাকার আহবান জানাতেন।
মসজিদের ভেতর মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুলমাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। কথিত আছে যে, হিজরী ৯৯ সালে উসামা বিন যায়েদ তানুখী প্রথম মসজিদে বাইতুলমাল প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি উমাইয়া খলীফা সোলাইমান বিন আবদুল মালেকের পক্ষ থেকে মিসরে খাজনা আদায়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন।
এ মসজিদটি বিভিন্নমুখী ভূমিকার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 তূলূন জামে' মসজিদ

📄 তূলূন জামে' মসজিদ


তুলুন জামে' মসজিদ মিসরের 'আল-কাতায়ে' শহরের আস্কার নামক স্থানে অবস্থিত। এটি বর্তমান কায়রো ও ফোস্তাত শহরের মাঝে সাইয়েদা যায়নাব এলাকায় বিদ্যমান। বর্তমানে কায়রো শহর সম্প্রসারিত হয়ে ঐ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাই এটি বৃহত্তম কায়রো শহরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। মিসরে নিযুক্ত আব্বাসী গভর্ণর আহমদ বিন তুলুন আব্বাসী খলীফা আবুল আব্বাসের নির্দেশে ঐ মসজিদ তৈরি করেন। আহমদ বিন তুলুন ২৫৪-২৭২ হিজরী সাল পর্যন্ত মিসরের গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আঙ্কার শহরে অবস্থান করেন। কিন্তু দূ' বছর পর আস্কার শহর থেকে মিসরের নূতন রাজধানী কাতায়ে'তে স্থানান্তরিত হন। তিনি নিজে মিসরের নূতন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করার পর ২৬৩-২৬৫ হিজরীর মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করেন।
এটি মিসরের ৩য় মসজিদ। এর আগে ২১ হিজরীতে সর্বপ্রথম ফোসতাতে আমর বিন আ'স জামে মসজিদ এবং পরে আস্কারে ১৬৯ হিজরীতে ২য় মসজিদ তৈরি হয়। এটি ৩য় মসজিদ হলেও ডিজাইন ও নকশার দিক থেকে এটি হচ্ছে উন্নত ও প্রাচীন মসজিদ। এর মিনারা হচ্ছে অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী। মিনারাটির বাইরের সিঁড়ির আকৃতি চতুর্ভুজ ও ওপরে ৮ বাহু সম্পন্ন। ওপরে হচ্ছে গম্বুজ। এর উচ্চতা হচ্ছে ৪০ মিটার। মিনারার ভিত্তির দৈর্ঘ্য উত্তর থেকে দক্ষিণে ১২.৭৫ মিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১৩.৬৫ মিটার। এটি দেখতে অপূর্ব মনে হয়। মিনারাটি পাথরের তৈরি, কিন্তু মসজিদ ভবন ইটের তৈরি। মসজিদটি বৃহদাকার। এর আয়তন হচ্ছে, ২৬ হাজার ২৪৪ বর্গমিটার।
তদানীন্তন সময়ের জন্য মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক বড় ঐ মসজিদ তৈরির পেছনে আহমদ বিন তুলুনের ইচ্ছা ছিল, ফোসতাতে তৈরি আমর বিন আ'স জামে' মসজিদের ভূমিকার মোকাবেলা করা। তাই দেখা যায়, পরবর্তিতে ফোসতাত থেকে ক্বারী, ফকীহ্ ও ছাত্ররা তুলুন জামে' মসজিদে স্থানান্তরিত হয়। কাযী বাক্কার বিন কোতাইবাকে মসজিদের ইমাম, খতীব ও ফিকহের শিক্ষক এবং রবী বিন সোলায়মানকে হাদীসের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাদের ভাষণ লেখার জন্য দু'জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।
এ মসজিদে চার মাযহাবের ফি, কুরআনের তাফসীর, হাদীস ও চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর বক্তৃতা দানের ব্যবস্থা চালু করা হয়। মসজিদের পার্শ্বে ছিল ইয়াতীম খানা। তাতে ইয়াতীম শিশুদেরকে কুরআন শিক্ষা দেয়া হত।
সুয়ূতী (র) উল্লেখ করেছেন, মসজিদের পিছনে চিকিৎসালয় ও ফার্মেসী খোলা হয়। জুমার দিনসহ অন্যান্য সময়ে আগত মুসল্লীদের জরুরী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তাতে ডাক্তার ও ফার্মাসিষ্ট নিয়োগ করা হয়। পরবর্তিতে ঐ অংশটুকু শত শত ছাত্রের চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং ডাক্তাররা এসে তাতে মূল্যবান বক্তৃতা করতেন।
অনেক লেখক উল্লেখ করেছেন যে, মসজিদের ঐ সকল সেবা ছাড়াও আহমদ তুলুনের আরেকটি সামরিক লক্ষ্য ছিল। আর তা হল, বাহিরের কোন আক্রমণের সময় তাকে দুর্গম দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এটা ছাড়াও মসজিদটি একটি সরকারী ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেখান থেকে সরকারী ফরমান বা আদেশ জারী করা হত এবং মামলা-মোকদ্দমার বিচার করা হত। তিনি তাতে ঔষধ ও রোগীদের প্রয়োজনীয় পথ্য বা খাবার গুদামজাত করেন। তাই মসজিদটি একাধারে ইবাদাতখানা, আদালত, হাসপাতাল ও দূর্গ হিসেবে ভূমিকা পালন করে। সাথে সাথে তাকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এখান থেকে সরকারী নীতি ঘোষণা করা হত।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 আযহার জামে' মসজিদ

📄 আযহার জামে' মসজিদ


এটা কায়রোর প্রথম শ্রেণীর মসজিদ। ফাতেমী শাসক মোয়ে'য লি-দীনিল্লাহ সেনাপতি জাওহার সাকাল্লী ৩৫৯ হিজরীতে মিসর জয় করেন। তিনি মিসরের আখশিদীন শাসকদের উৎখাত করে কায়রো শহর তৈরির পরিকল্পনা নেন এবং একই সময় আযহার জামে' মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ৩৬১ হিজরীর রমযান মাসে, মোতাবেক ৯৭২ খৃঃ, মসজিদ নির্মাণ শেষ হয় এবং ৭ই রমযান প্রথম জুমা আদায় করা হয়।
আযহার নামকরণের বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, ফাতেমী শাসকরা শিয়া ইসমাইলী মাযহাবের অনুসারী ছিল। তারা বরকতের জন্য হযরত ফাতেমা যোহরার নামের সাথে মিল রেখে মসজিদের নামকরণ করেন 'আযহার জামে' মসজিদ।
অন্য একদলের মত হল, ফাতেমী শাসকরা মসজিদটিকে একটা বিরাট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হবে। তাই তারা মসজিদে বিভিন্ন শিক্ষা বিভাগ ও ছাত্রাবাস খোলেন এবং রাষ্ট্রের বাইতুলমাল থেকে তাদের জন্য ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্যে একটা অংক বরাদ্ধ করেন। কিন্তু অন্য একদল ঐতিহাসিক বলেন, মসজিদ তৈরির পেছনে ফাতেমী শাসকদের উপরোল্লিখিত কথিত উদ্দেশ্য যথার্থ নয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কায়রোতে একটি সরকারী মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা যাতে তাদের প্রচার হয় এবং সার্বভৌমত্বের প্রকাশ ঘটে। সেখানে পরবর্তীতে শিক্ষা চর্চা একটা দৈব ঘটনা হিসেবে সংযোজিত হয়।
আযহার জামে' মসজিদ হিজরীতে, মোয়ে'য লি-দীনিল্লাহর শেষ শাসনামলে আলী বিন নোমান মসজিদে শিয়া ফিক্হের শিক্ষাদান শুরু করে। জামে' মসজিদে এটাই প্রথম শিক্ষার আসর। তিনি বড় লেবাস পরে শিয়া মাযহাবের দাওয়াত দেন। প্রথমদিকে শিক্ষা আসরে সাধারণ লোকদের প্রবেশের সুযোগ ছিল না।
মসজিদে সর্বপ্রথম শিক্ষাদানের চিন্তা করেন ফাতেমী শাসকের মন্ত্রী আবু ইয়াকুব বিন ইউসুফ। তিনি ৩৬৯ হিজরীতে মসজিদে শিক্ষাদান শুরু করেন এবং শিয়া ইসমাইলী মাযহাবের ফিক্হ শিক্ষা দেন। তিনি যে কিতাব শিক্ষা দেন এর নাম হচ্ছে, 'আররেসালাতুল উযিরিয়া'। তিনি একজন প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। তিনি কোন কোন সময় মসজিদে আরবী সাহিত্যের আসরও বসাতেন।
৩৭৮ হিজরী মোতাবেক, ৯৮৮ খৃঃ মন্ত্রীর ছেলে খলীফা আ'যীয বিল্লাহর কাছে একদল ফকীহ নিযুক্ত করার আহবান জানান। খলীফা ৩৭ জন ফকীহ নিযুক্ত করেন এবং তাদের জন্য ভাতা ও হোষ্টেল তৈরী করে দেন।
জামে' আযহারের শিক্ষা কর্মসূচীর জন্য এটাই হচ্ছে প্রথম সরকারী নিয়োগ। এই ব্যবস্থার ফলে, জামে' আযহার প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
খলীফা আযীয মিসরের ১০ জন প্রখ্যাত আলেমকে ঐ মসজিদের নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ করেন। তাদেরকে জামে' আযহারের শিক্ষা কার্যক্রম ভালোভাবে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁরা মসজিদে শরীআহ বা ইসলামী আইনসহ অর্থনীতি এবং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে এসে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে। আযহার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে জ্ঞানের সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং খৃষ্টানদের দূর্গ রোম পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তার লাভ করে। তারা ইসলামের সৌন্দর্য সম্পর্কে বুঝতে ও জানতে পারে। আযহার ইসলামী জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে ৬৫৬ হিজরীতে, চেঙ্গিসখানের উত্তরসূরী হালাকু খানের হাতে বাগদাদের পতনের পর আযহারই শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় দুর্যোগ নেমে আসায় ওলামায়ে কেরাম ও মুসলিম পন্ডিত ব্যক্তিরা আযহারে আশ্রয় নেন। খৃষ্টানদের হাতে স্পেনের পতনের পরও সেখানকার ওলামায়ে কেরাম আযহারে আশ্রয় নেন।
জামে' আযহারে চার মাযহাবের ওলামার জন্য পৃথক পৃথক স্তম্ভ ছিল। কেউ কারুর পার্শ্বে বসে শিক্ষা দিতেন না। শিক্ষক ও শিক্ষা আসর নির্বাচনে ছাত্ররা ছিল স্বাধীন।
এ মসজিদে বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত আলেমগণ শিক্ষাদান করেন। তাদের মধ্যে ইবনে খালদুন ছিলেন অন্যতম। তিনি এ মসজিদে বসেই 'আল-এবার' এবং 'মোকাদ্দমা' বই দু'টো রচনা করেন। তিনি মরক্কো থেকে মিসরে স্থায়ী হওয়ার পর বিচারক হিসেবেও কাজ করেন। অনুরূপভাবে, আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী, মোকরীজী এবং আবুল আবাস কালকাসিন্দীও জামে' আযহারে শিক্ষাদান করেন। আল্লামা মোহাদ্দেস মোকরীও এ মসজিদে হাদীস শিক্ষা দেন। এ ছাড়াও বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাতা আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী, আল্লামা সাখাবীও এ মসজিদে শিক্ষকতার কাজ করেন। এ মসজিদটি পৃথিবীর সেরা ইসলামী কেন্দ্রে পরিণত হয়।
জামে' আযহার থেকে যে সকল বিখ্যাত শিক্ষার্থী লেখা-পড়া শেষ করে বেরিয়েছেন, তারা হলেন, আল্লামা রেফাআহ তাহতাভী, আলী মোবারক, মুহাম্মাদ আবদুহ, সা'দ যাগলুল, তাহা হোসাইন, মোস্তফা লুতফী মানফালুতী, আহমদ হাসান যাইয়াত ও আলী আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।
মোকরীজী বলেন, মসজিদে ফেকাহ, হাদীস, তাফসীর, আরবী ব্যাকরণ, ওয়াজ মাহফিল ও যিকিরসহ সকল বিষয়ের অনুশীলন হত। ধনী ও দাতা ব্যক্তিরা মসজিদের শিক্ষার্থীদের জন্য সোনা-রূপা, বিভিন্ন প্রকার খাবার, রুটি ও মিষ্টি উপহার দেন।
বর্তমান যুগের আলোকে আযহারকে মিসরের একটি জাতীয় কিংবা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না। বরং এটা ছিল মুসলিম বিশ্বের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। আযহার আরবী ও ইসলামী শিক্ষার পাদপীঠে পরিণত হয়। কিন্তু তুরস্কের ওসমানী শাসনামলে এর জ্ঞানসেবা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কেননা, ওসমানীরা অনারব হওয়ায় এ বিষয়ের প্রতি তাদের যথার্থ সুনজর ছিল না। কিন্তু ওসমানী শাসনের অবসানের পর পর তা পুনরায় সাবেক পূর্ণ ভূমিকায় ফিরে যায়। দীর্ঘ ১ হাজার বছর যাবত আযহার তার জ্ঞানসেবা অব্যাহত রেখেছে। এ সেবার ফলে, সে মুসলিম বিশ্ব থেকে কুফরী মতবাদ ও চিন্তা-চেতনা, বাতিল মতাদর্শ, খৃষ্টান মিশনারী তৎপরতা, কাদিয়ানী ও ইহুদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক কর্মসূচীর মাধ্যমে সে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বিরাট রাজনৈতিক ভূমিকাও পালন করে।
আযহারের রয়েছে সশ্রদ্ধ ও সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ভূমিকা। ১৭ই জুলাই, ১৭৯৮ খৃঃ মোতাবেক ১৭ই মুহররম ১২১৩ হিজরীতে ফরাসী উপনিবেশবাদীরা মিসরের ওপর হামলা করে এবং আলেকজান্দ্রিয়ার পানি সীমানায় নেপোলিয়ান বোনাপার্ট এর নেতৃত্বে ফরাসী বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে, ১৭৯৮ খৃঃ ২১শে অক্টোবর, কায়রোতে ফরাসী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয়। এর আগে, ২০শে অক্টোবর, জামে' আযহারে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট বিপ্লবী পরিষদের বৈঠকে পরের দিন বিপ্লবের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মসজিদে বৈঠক অনুষ্ঠান এবং তাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে, বিপ্লব সম্পর্কে ফরাসীদের আর কোন সন্দেহ সংশয় থাকল না। এই বিপ্লব তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই পরিচালিত হবে। বিপ্লবী পরিষদ ২১শে অক্টোবর সকল দোকান-পাট বন্ধ এবং ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদেরকে জাতীয় বিপ্লবী মিছিলে অংশ নেয়ার জন্য জামে' আযহারে আসার আহবান জানায়। পরিষদের মতে, এ মিছিল হবে পরবর্তীতে বিশৃংখলা, গোলযোগ ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির প্রথম পদক্ষেপ। এর মাধ্যমেই বিপ্লবের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া যাবে। এটাকে 'কায়রোর ১ম বিপ্লব' বলা হয়। বাহ্যত তা নূতন ফরাসী করারোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও মূলত তা ইসলামী বিশ্বাসের সাথে খৃষ্টান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিল সুস্পষ্ট বিদ্রোহ।
নেপোলিয়ানের উত্তরসূরী জেনারেল ক্লিপারের বিরুদ্ধে আযহারীরা ২য় দফা 'যে বিপ্লবের ডাক দেন তাকে '২য় কায়রো বিপ্লব' বলা হয়। শেখ মুহাম্মাদ সাদাতের নেতৃত্বে পরিচালিত শেষোক্ত বিপ্লবের কেন্দ্রও ছিল আযহার। কায়রোর প্রথম বিপ্লবের সময় মসজিদের মিনারাগুলো থেকে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে مسلمانوں ঈমান-আকীদা রক্ষার আহবান জানানো হয়। কায়রো শহর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো দ্রুত ঐ আহবানের প্রতি সাড়া দেয়। তারা কায়রোর রাস্তায় ফরাসীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। খোদ নেপোলিয়ানও একাধিকবার স্বীকার করেছেন যে, আযহারই হচ্ছে ফরাসী শাসনের বিরুদ্ধে বিরাট দূর্গ। যখনই ফরাসী শাসকরা কোন খারাপ আদেশ জারী করেছে, তখনই জামে' আযহারে প্রতিবাদকারীরা একত্রিত হয়ে এর বিরোধিতা করেছে। নেপোলিয়ান আরো লিখেছেন, খৃষ্টান বিশ্বাসের সাথে مسلمانوں বিশ্বাসের পার্থক্যের কারণেই মিসরে ফরাসী শাসন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, ১৮শ শতাব্দীতে বৃহত্তর ওসমানী খেলাফতের কারণে মিসর একটি শক্তিশালী ইসলামী রাজ্যে পরিণত হয় এবং مسلمانوں ঈমান আকীদা মজবুত হয়।
যাই হোক, ২১শে অক্টোবর আযহারের সম্মানিত শিক্ষক ও শেখদের নেতৃত্বে পরিচালিত মিছিল ১ম দিন ফরাসী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে তোলে। কিন্তু পরের দিন নেপোলিয়ান বোনাপার্ট জামে' আযহার সহ শহরের বাড়ীগুলোর ওপর গোলাবর্ষণের নির্দেশ দেয় এবং তারা জামে' আযহার দখল করে নেয়। বিপ্লবীদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তাদের পক্ষে ফরাসী বাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।
ফরাসী বাহিনী শহরে ব্যাপক হত্যা ও লুটপাট শুরু করে এবং জামে' আযহারের ভেতর আশ্রয়গ্রহণকারীদের হত্যা করে। তারা মসজিদে মল-মূত্র ত্যাগ করে এবং কুরআন শরীফকে পদদলিত করে। তারা জামে' আযহারের ভেতর যা কিছু ছিল সব তছনছ করে এবং ধ্বংস করে ফেলে।
আযহারের ওপর ফরাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর আযহারের কয়েকজন বড় আলেম নেপোলিয়ানের সাথে সাক্ষাত করেন এবং মসজিদের ভেতর থেকে লাশ উদ্ধারসহ তা পরিস্কার করার অনুমতি লাভ করেন। কিন্তু পরে ফরাসী বাহিনী ১৩ জন আলেমকে গুলী করে হত্যা করে। এরপর রাজনৈতিক কারণে নেপোলিয়ান মিসর ত্যাগ করে এবং জেনারেল ক্লিপারকে তার স্থলাভিষিক্ত করে।
জেনারেল ক্লিপারও নেপোলিয়ানের মত যালেম ও নিষ্ঠুর ব্যক্তিত্ব ছিল। একদিন দুপুরে খাওয়া শেষে ফিরে আসার পথে আযহারের একজন ছাত্র ভিক্ষার নামে তাকে ও তার সাথী ইঞ্জিনিয়ার প্রোটানকে হত্যা করে। পরে ফরাসী বাহিনী বাগানে লুকিয়ে থাকা সেই যুবককে আটক করে এবং ক্লিপারের উত্তরসূরী জেনারেল মিনুর নেতৃত্বে সামরিক আদালতে তার বিচার হয়। জামে' আযহারের এই পুরাতন ছাত্র সোলায়মান হেলবী সিরিয়ার অধিবাসী এবং আযহারের ছাত্র। সে লেখা-পড়া শেষে মিসর থেকে সিরিয়া চলে যায় এবং ১৮শ' খৃষ্টাব্দের মে মাসে আবার কায়রো ফিরে এসে পুনরায় আযহারে অবস্থান গ্রহণ করে। সে দীর্ঘ একমাস যাবত আযহারে অবস্থান করে ক্লিপারের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হয় এবং ১ম কায়রো বিপ্লবের প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করে। সামরিক আদালত তাকে নিষ্ঠুরভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার শরীরের ডান হাত জীবন্ত অবস্থায় পুড়ে দেয় এবং পরে পেটের ভেতর গরম লোহা ঢুকিয়ে হত্যা করে। তার লাশ পশুকে খাওয়ায়। এভাবে দোষী সাব্যস্ত করে তার আরো চার সাথীকেও করুণ মৃত্যুদণ্ড দান করে।
দ্বিতীয় কায়রো বিপ্লবের পর জামে' আযহারের ওলামায়ে কেরামের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। তাদের সহায়-সম্পত্তি এবং স্ত্রীদের গয়না-অলংকার বিক্রি করে জরিমানার টাকা আদায় করতে বাধ্য করা হয়। ক্লিপারের মৃত্যুর কারণে ওলামাদের ওপর ঐ নির্যাতন নেমে আসে।
সাম্রাজ্যবাদী ফরাসীরা জামে' আযহারকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। কেননা, ক্লিপারের হত্যাকারী ১ মাস ব্যাপী আযহারে অবস্থান করায় তারা এটাকে আযহারেরই ষড়যন্ত্র বলে মনে করে। শেষ পর্যন্ত ফরাসী জেনারেল মিনু আযহার পরিদর্শনে যান এবং মসজিদের ভেতর কোন অস্ত্র আছে কিনা তা ঘুরে ঘুরে দেখেন। তিনি আযহারের ওপর বহু বিধি-নিষেধ আরোপ করে আযহারকে বিরক্ত করে তোলেন। শেষ পর্যন্ত ফরাসী শাসনের বিধি-নিষেধের যাঁতাকলে অতিষ্ঠ হয়ে শেখুল আযহার আবদুল্লাহ শারকাভীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল জেনারেল মিনুর কাছে গিয়ে জামে' আযহার বন্ধ করে দেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। জেনারেল অনুমতি দেন। জামে' আযহারের সাড়ে ৮শ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত ১ বছরের জন্য তা বন্ধ রাখা হয়।
১৯ শে সফর ১২১৬ হিজরী মোতাবেক ২রা জুলাই, ১৮০১ খৃঃ ফরাসীদের মিশর ত্যাগের আগ পর্যন্ত তা বন্ধ থাকে। জামে' আযহার পুনরায় তার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন শুরু করে এবং জ্ঞান, চিন্তা, দর্শন, সামাজিক ও রাজনীতির দিক নির্দেশনা দিতে থাকে। গোটা দুনিয়ার সর্বত্র থেকে ছাত্ররা আযহারে আসে এবং লেখা-পড়া শেষ করে স্বদেশে ফিরে যায়।
পরবর্তীতে মিসরের বিভিন্ন শহরে জামে' আযহারের শাখা-প্রশাখা কায়েম হতে থাকে। বিশেষ করে আলেকজান্দ্রিয়া, তান্তা, যাকাযীক, মানসুরা, দিমইয়াত এবং আসিউতে এর শাখা কায়েম হয়। বিংশত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গোটা মিসরে ২শতেরও বেশী ইনস্টিটিউট কায়েম হয়। এগুলো সবই আযহারের অবদান এবং তার শাখা-প্রশাখা।
১৯৬১ খৃঃ, আযহারকে জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করা হয়। এখন তাতে আরবী ও ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এতে বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা, কৃষি, বাণিজ্য, কলা, সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হচ্ছে।
আযহার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করছে। দীনী এলেম শিক্ষা দিয়ে গোটা দুনিয়ায় জাহেলিয়াতের মোকাবিলা করছে এবং দেশে দেশে আলেম সৃষ্টি করে দাওয়াত ও একামতে দীনের মর্দে মোজাহিদ তৈরি করছে।
আশ্চর্যের বিষয় যে, একটি সাধারণ মসজিদ কি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় এবং দেশের জনগণকে বুদ্ধিবৃত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান করে। এছাড়াও তা গোটা দুনিয়ায় ঈমান ও ইসলামের আলো বিতরণ করে যথার্থই ধন্য হয়েছে। ধন্য হে আযহার।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00