📄 মসজিদে বসরা
জাযীরাতুল আরব বা আরব দ্বীপের বাইরে নির্মিত প্রথম মসজিদ হচ্ছে মসজিদে বসরা। ১৪ হিজরীতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ইসলামের বিজয় শুরু হওয়ার পর বাইরে এটাই সর্বপ্রথম মসজিদ। ওতবাহ ইবনে গাজওয়ান বসরায় পৌঁছার পর এক খণ্ড যমীন মসজিদের জন্য নির্ধারণ করেন এবং বাঁশ দিয়ে তা তৈরী করেন। ৪৪ হিজরীতে বসরায় হযরত মুআবিয়ার গভর্ণর যিয়াদ বিন আবীহ তা ইট ও চুন দিয়ে পাকা করেন এবং মসজিদের প্রয়োজনীয় সংস্কার করেন।
কোন শহর বা গ্রামে মুসলমানগণ সর্বপ্রথম মসজিদ তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কেননা, এটা রসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাত। রসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম কুবায় ও পরে মদীনায় মসজিদ তৈরী করেন। বরং এটা হচ্ছে, মুসলিম সভ্যতার উজ্জ্বল ছাপ বা বৈশিষ্ট্য।
উমাইয়া শাসনামলে, মসজিদে বসরা সাহিত্য ও জ্ঞানের পুনর্জাগরণে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। তাতে বহু ফকীহ ও আলেম এলেম চর্চা করেছেন। তাদের মধ্যে হাসান বসরী (র) উল্লেখযোগ্য। তিনি মসজিদে নববীতে রাবীআতুর রায়ের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ওয়াসেল বিন আতা হাসান বসরীর অন্যতম ছাত্র ছিলেন। পরে ওয়াসেল বিন আতা, বান্দাহর ইচ্ছা সম্পর্কিত তাকদীরের আকীদার বিষয়ে মতপার্থক্য করে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করেন এবং নিজেই মসজিদে আরেকটি শিক্ষা আসর চালু করেন। ওয়াসেল বিন আতা এলমে কালাম বা দর্শন শাস্ত্রের ওপর খুব বেশী জোর দিতেন। তিনিই মো'তাজেলা সম্প্রদায়ের উদ্ভাবক।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাসান বসরী বসরার অন্য আরেকটি মসজিদে বসতেন। সেখানকার মজলিসে তিনি ফিকহ সম্পর্কিত প্রশ্নের জওয়াব দিতেন এবং ইসলামের জ্ঞান চর্চা করতেন।
আরব কবিরা সেই মসজিদটিকে কবিতা ও সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। কবিতা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে আরবী ভাষার উত্তম চর্চা হয় এবং ভাষার বিভিন্নমুখী বর্ণনা জমা করার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন একদল লোক আরবী ভাষায় গবেষণা শুরু করেন। এ মসজিদটিই প্রথম আরবী ভাষাবিদ খলীল বিন আহমদ আল-ফারাহিদীর কেন্দ্র ছিল। তিনিই সর্বপ্রথম আরবী ভাষার ওপর বই লিখেন। তিনি আরবী কবিতার ছন্দ বিষয়ের ওপর প্রথম বই লিখেছেন। বর্ণিত আছে যে, তিনিই সর্বপ্রথম নোক্তা ভিত্তিক আরবী পাঠের পদ্ধতি পরিবর্তন করে 'হরকত' ভিত্তিক পাঠ প্রথা চালু করেন। তাঁর 'আল-আইন' প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি সবার কাছে সমাদৃত। এ ছাড়াও তিনি আরবী কবিতার অন্যান্য নীতিমালা প্রণয়ন করেন। আরবী ব্যাকরণের পিতা বলে পরিচিত সিবওয়াইহ তাঁর অন্যতম ছাত্র ছিলেন।
প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক 'হারীরী' এ মসজিদে আরবী গদ্য ও পদ্যের ওপর কয়েকটি বক্তৃতা দিয়েছেন। ১
এ মসজিদের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে একটি প্রমাণই যথেষ্ট। সেটা হচ্ছে, হিজরী ৪৫ সালে যিয়াদ ইবনে আবীহ মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তিনি তার সরকারের কঠোর নীতি গ্রহণের উপর জোর দেন যা বসরায় গোলযোগ দমনে সহায়ক হয় এবং সেখানে উমাইয়া শাসন মজবুত হয়।
এখানেই শেষ নয়, ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদও একই নীতি গ্রহণ করেন। তিনি যখন বসরায় হোসাইন ইবনে আলী ও তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকীলের প্রতি জনগণের সহানুভূতি লক্ষ্য করেন, তখন ঐ মসজিদের মিম্বার থেকে জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে বসরা ও কুফার গভর্ণর নিযুক্ত করেছেন। আপনারা কোন মতবিরোধ করবেন না। কেউ মতবিরোধ করলে আমি তাকে ও তার সাহায্যকারীকে হত্যা করবো।
এই জাতীয় কঠোর শাসকদের মাধ্যমে উমাইয়া শাসকরা ইরাকের উপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়।
বহু আগেই মসজিদটি মিটে গেছে। বর্তমানে এর কোন চিহ্নও নেই।
টিকাঃ
১. আল-ইস্পাহানী মোহাদারাতুল ওদাবা- ডঃ আলী আবদুল হালীম।
জাযীরাতুল আরব বা আরব দ্বীপের বাইরে নির্মিত প্রথম মসজিদ হচ্ছে মসজিদে বসরা। ১৪ হিজরীতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ইসলামের বিজয় শুরু হওয়ার পর বাইরে এটাই সর্বপ্রথম মসজিদ। ওতবাহ ইবনে গাজওয়ান বসরায় পৌঁছার পর এক খণ্ড যমীন মসজিদের জন্য নির্ধারণ করেন এবং বাঁশ দিয়ে তা তৈরী করেন। ৪৪ হিজরীতে বসরায় হযরত মুআবিয়ার গভর্ণর যিয়াদ বিন আবীহ তা ইট ও চুন দিয়ে পাকা করেন এবং মসজিদের প্রয়োজনীয় সংস্কার করেন।
কোন শহর বা গ্রামে মুসলমানগণ সর্বপ্রথম মসজিদ তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কেননা, এটা রসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাত। রসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম কুবায় ও পরে মদীনায় মসজিদ তৈরী করেন। বরং এটা হচ্ছে, মুসলিম সভ্যতার উজ্জ্বল ছাপ বা বৈশিষ্ট্য।
উমাইয়া শাসনামলে, মসজিদে বসরা সাহিত্য ও জ্ঞানের পুনর্জাগরণে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। তাতে বহু ফকীহ ও আলেম এলেম চর্চা করেছেন। তাদের মধ্যে হাসান বসরী (র) উল্লেখযোগ্য। তিনি মসজিদে নববীতে রাবীআতুর রায়ের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ওয়াসেল বিন আতা হাসান বসরীর অন্যতম ছাত্র ছিলেন। পরে ওয়াসেল বিন আতা, বান্দাহর ইচ্ছা সম্পর্কিত তাকদীরের আকীদার বিষয়ে মতপার্থক্য করে হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করেন এবং নিজেই মসজিদে আরেকটি শিক্ষা আসর চালু করেন। ওয়াসেল বিন আতা এলমে কালাম বা দর্শন শাস্ত্রের ওপর খুব বেশী জোর দিতেন। তিনিই মো'তাজেলা সম্প্রদায়ের উদ্ভাবক।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাসান বসরী বসরার অন্য আরেকটি মসজিদে বসতেন। সেখানকার মজলিসে তিনি ফিকহ সম্পর্কিত প্রশ্নের জওয়াব দিতেন এবং ইসলামের জ্ঞান চর্চা করতেন।
আরব কবিরা সেই মসজিদটিকে কবিতা ও সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। কবিতা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে আরবী ভাষার উত্তম চর্চা হয় এবং ভাষার বিভিন্নমুখী বর্ণনা জমা করার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন একদল লোক আরবী ভাষায় গবেষণা শুরু করেন। এ মসজিদটিই প্রথম আরবী ভাষাবিদ খলীল বিন আহমদ আল-ফারাহিদীর কেন্দ্র ছিল। তিনিই সর্বপ্রথম আরবী ভাষার ওপর বই লিখেন। তিনি আরবী কবিতার ছন্দ বিষয়ের ওপর প্রথম বই লিখেছেন। বর্ণিত আছে যে, তিনিই সর্বপ্রথম নোক্তা ভিত্তিক আরবী পাঠের পদ্ধতি পরিবর্তন করে 'হরকত' ভিত্তিক পাঠ প্রথা চালু করেন। তাঁর 'আল-আইন' প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি সবার কাছে সমাদৃত। এ ছাড়াও তিনি আরবী কবিতার অন্যান্য নীতিমালা প্রণয়ন করেন। আরবী ব্যাকরণের পিতা বলে পরিচিত সিবওয়াইহ তাঁর অন্যতম ছাত্র ছিলেন।
প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক 'হারীরী' এ মসজিদে আরবী গদ্য ও পদ্যের ওপর কয়েকটি বক্তৃতা দিয়েছেন। ১
এ মসজিদের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে একটি প্রমাণই যথেষ্ট। সেটা হচ্ছে, হিজরী ৪৫ সালে যিয়াদ ইবনে আবীহ মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তিনি তার সরকারের কঠোর নীতি গ্রহণের উপর জোর দেন যা বসরায় গোলযোগ দমনে সহায়ক হয় এবং সেখানে উমাইয়া শাসন মজবুত হয়।
এখানেই শেষ নয়, ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদও একই নীতি গ্রহণ করেন। তিনি যখন বসরায় হোসাইন ইবনে আলী ও তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকীলের প্রতি জনগণের সহানুভূতি লক্ষ্য করেন, তখন ঐ মসজিদের মিম্বার থেকে জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে বসরা ও কুফার গভর্ণর নিযুক্ত করেছেন। আপনারা কোন মতবিরোধ করবেন না। কেউ মতবিরোধ করলে আমি তাকে ও তার সাহায্যকারীকে হত্যা করবো।
এই জাতীয় কঠোর শাসকদের মাধ্যমে উমাইয়া শাসকরা ইরাকের উপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়।
বহু আগেই মসজিদটি মিটে গেছে। বর্তমানে এর কোন চিহ্নও নেই।
টিকাঃ
১. আল-ইস্পাহানী মোহাদারাতুল ওদাবা- ডঃ আলী আবদুল হালীম।
📄 মসজিদে কুফা
বসরার পর মুসলমানরা ২য় যে শহরের গোড়াপত্তন করেন, তা হচ্ছে কুফা। রসূলুল্লাহ (স)-এর প্রখ্যাত সাহাবী সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস শহরটি তৈরি করেন। শহরে সর্বপ্রথম জামে মসজিদ তৈরি করা হয়। ১৭ হিজরী সালে সা'দ মসজিদের জন্য একখণ্ড চতুর্ভুজ জমি নির্দিষ্ট করেন এবং দেয়ালের পরিবর্তে চারদিকে পরিখা খনন করে মসজিদের সীমানা চিহ্নিত করেন। যাতে করে মানুষ পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত এবং পশু মসজিদে প্রবেশ করতে না পারে। মসজিদের পাকা খুঁটির ওপর ছাদ ছিল।
বর্ণিত আছে যে, প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা বিন শো'বা (রা) মসজিদটি সম্প্রসারণ করেছিলেন। ৫১ হিজরীতে যিয়াদ বিন আবীহর আমলে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ঐ মসজিদ ফিক্হ শাস্ত্রের কেন্দ্রে পরিণত হয়। হযরত আলী (রা) এ মসজিদে বসে লোকদেরকে দীনের শিক্ষা দান করেছেন। এ ছাড়াও তাতে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ এবং আবদুল্লাহ বিন হাবীব আস-সেলমী কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এ মসজিদে ব্যাপক তাফসীর চর্চাও হত। সাঈদ বিন যোবায়ের এবং আলী বিন হামযা আল-কিসাঈ তাফসীর শিক্ষা দিতেন। একই মসজিদে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হত। হযরত আলী এবং আবুল আসওয়াদ আদ্দুওয়াইলী হচ্ছেন এই মসজিদের প্রথম শিক্ষক। বর্ণিত আছে, হযরত আলী আরবী ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করেন এবং আবুল, আসওয়াদ তা হযরত আলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তখন বহু অনারব ইসলাম গ্রহণ করায় তাদের আরবী শিখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আরবী ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করা জরুরী হয়ে পড়ে।
এ মসজিদে আরবী কবিতা চর্চাসহ এর সমালোচনা হত। কোমাইত বিন যাইদ এবং হাম্মাদ আর রাওইয়াহ ঐ মসজিদে কবিতা চর্চা করেন। অনুরূপভাবে, কবি নাসীব বিন আবি রেবাহও ঐ মসজিদে কবিতা চর্চা করেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মসজিদের উদ্দেশ্য শুধু দীনী ভূমিকা পালন নয়, বরং এর পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রও এই মসজিদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
এই মসজিদের রয়েছে বিরাট রাজনৈতিক ভূমিকা, তদানীন্তন সরকারের প্রতিনিধি কিংবা গভর্ণর ঐ মসজিদ থেকে নিজ নিজ সরকারের নীতি ঘোষণা করতেন। ইরাক ও পূর্ববর্তী এলাকার গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দায়িত্ব লাভ করার পর মসজিদের মিম্বার থেকে নিজ নীতি ঘোষণা করে এক ভাষণ দেন। তিনি যিয়াদ বিন আবীহর অনুরূপ কঠোর নীতি অনুসরণের কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বিন আবীহ কুফা ও বসরার গভর্ণর নিযুক্ত হওয়ার পর কুফার জামে মসজিদ থেকে এক ভাষণ দেন।
প্রথম আব্বাসী খলীফা আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মদ বিন আলী খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর কুফার জামে মসজিদের মিম্বার থেকে এক ভাষণ দেন এবং উমাইয়াদের পরিবর্তে আব্বাসী শাসনের অধিকারের ওপর আলোকপাত করেন। আবুল আব্বাস জ্বরের কারণে বক্তৃতা পরিপূর্ণ করতে না পারায় তার চাচা দাউদ বিন আলী তা সম্পূর্ণ করেন। বক্তৃতায় ১৩২ হিঃ সালে উমাইয়া শাসনের পতনের পর আব্বাসী শাসনের নীতিমালার উপর আলোকপাত করা হয়।
এ ছাড়াও শাসকদের যে কোন ঘোষণা কিংবা আদেশ-নিষেধ জানানোর জন্যও লোকদেরকে মসজিদে আহবান জানানো হত। একবার যিয়াদ বিন আবীর একজন ঘোষক এই বলে লোকদেরকে মসজিদে আসার আহবান জানায়, যে মসজিদে না আসবে, তার ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধে বাতিল হয়ে যাবে।
মসজিদে কুফা এভাবে জ্ঞান ও রাজনীতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে উমাইয়া আমলে, ইরাক ও কুফাবাসীরা শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার জন্য সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চায় বেশী মনোযোগ দেয়। অপরদিকে, অনারব নূতন মুসলমানগণ নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করেন।
এক কথায় বলা যায়, ইসলামের ৪র্থ খলীফা হযরত আলী কুফাকে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ও কেন্দ্র বানানোর পর থেকে তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র ছিল।
মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে মুসলিম বিন আ'কীল বিন আবি তালেবের কবর।
বসরার পর মুসলমানরা ২য় যে শহরের গোড়াপত্তন করেন, তা হচ্ছে কুফা। রসূলুল্লাহ (স)-এর প্রখ্যাত সাহাবী সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস শহরটি তৈরি করেন। শহরে সর্বপ্রথম জামে মসজিদ তৈরি করা হয়। ১৭ হিজরী সালে সা'দ মসজিদের জন্য একখণ্ড চতুর্ভুজ জমি নির্দিষ্ট করেন এবং দেয়ালের পরিবর্তে চারদিকে পরিখা খনন করে মসজিদের সীমানা চিহ্নিত করেন। যাতে করে মানুষ পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত এবং পশু মসজিদে প্রবেশ করতে না পারে। মসজিদের পাকা খুঁটির ওপর ছাদ ছিল।
বর্ণিত আছে যে, প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা বিন শো'বা (রা) মসজিদটি সম্প্রসারণ করেছিলেন। ৫১ হিজরীতে যিয়াদ বিন আবীহর আমলে মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ঐ মসজিদ ফিক্হ শাস্ত্রের কেন্দ্রে পরিণত হয়। হযরত আলী (রা) এ মসজিদে বসে লোকদেরকে দীনের শিক্ষা দান করেছেন। এ ছাড়াও তাতে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ এবং আবদুল্লাহ বিন হাবীব আস-সেলমী কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এ মসজিদে ব্যাপক তাফসীর চর্চাও হত। সাঈদ বিন যোবায়ের এবং আলী বিন হামযা আল-কিসাঈ তাফসীর শিক্ষা দিতেন। একই মসজিদে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হত। হযরত আলী এবং আবুল আসওয়াদ আদ্দুওয়াইলী হচ্ছেন এই মসজিদের প্রথম শিক্ষক। বর্ণিত আছে, হযরত আলী আরবী ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করেন এবং আবুল, আসওয়াদ তা হযরত আলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তখন বহু অনারব ইসলাম গ্রহণ করায় তাদের আরবী শিখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আরবী ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করা জরুরী হয়ে পড়ে।
এ মসজিদে আরবী কবিতা চর্চাসহ এর সমালোচনা হত। কোমাইত বিন যাইদ এবং হাম্মাদ আর রাওইয়াহ ঐ মসজিদে কবিতা চর্চা করেন। অনুরূপভাবে, কবি নাসীব বিন আবি রেবাহও ঐ মসজিদে কবিতা চর্চা করেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মসজিদের উদ্দেশ্য শুধু দীনী ভূমিকা পালন নয়, বরং এর পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রও এই মসজিদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
এই মসজিদের রয়েছে বিরাট রাজনৈতিক ভূমিকা, তদানীন্তন সরকারের প্রতিনিধি কিংবা গভর্ণর ঐ মসজিদ থেকে নিজ নিজ সরকারের নীতি ঘোষণা করতেন। ইরাক ও পূর্ববর্তী এলাকার গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দায়িত্ব লাভ করার পর মসজিদের মিম্বার থেকে নিজ নীতি ঘোষণা করে এক ভাষণ দেন। তিনি যিয়াদ বিন আবীহর অনুরূপ কঠোর নীতি অনুসরণের কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বিন আবীহ কুফা ও বসরার গভর্ণর নিযুক্ত হওয়ার পর কুফার জামে মসজিদ থেকে এক ভাষণ দেন।
প্রথম আব্বাসী খলীফা আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মদ বিন আলী খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর কুফার জামে মসজিদের মিম্বার থেকে এক ভাষণ দেন এবং উমাইয়াদের পরিবর্তে আব্বাসী শাসনের অধিকারের ওপর আলোকপাত করেন। আবুল আব্বাস জ্বরের কারণে বক্তৃতা পরিপূর্ণ করতে না পারায় তার চাচা দাউদ বিন আলী তা সম্পূর্ণ করেন। বক্তৃতায় ১৩২ হিঃ সালে উমাইয়া শাসনের পতনের পর আব্বাসী শাসনের নীতিমালার উপর আলোকপাত করা হয়।
এ ছাড়াও শাসকদের যে কোন ঘোষণা কিংবা আদেশ-নিষেধ জানানোর জন্যও লোকদেরকে মসজিদে আহবান জানানো হত। একবার যিয়াদ বিন আবীর একজন ঘোষক এই বলে লোকদেরকে মসজিদে আসার আহবান জানায়, যে মসজিদে না আসবে, তার ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধে বাতিল হয়ে যাবে।
মসজিদে কুফা এভাবে জ্ঞান ও রাজনীতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে উমাইয়া আমলে, ইরাক ও কুফাবাসীরা শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার জন্য সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চায় বেশী মনোযোগ দেয়। অপরদিকে, অনারব নূতন মুসলমানগণ নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করেন।
এক কথায় বলা যায়, ইসলামের ৪র্থ খলীফা হযরত আলী কুফাকে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ও কেন্দ্র বানানোর পর থেকে তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র ছিল।
মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে মুসলিম বিন আ'কীল বিন আবি তালেবের কবর।
📄 বাগদাদের জামে মানসুর
২য় আব্বাসী খলীফা আবু জা'ফর মানসুর ১৪৫ হিজরীতে বাগদাদে নূতন রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি নিজে নূতন শহরের জন্য গোলাকার আকৃতির পরিকল্পনা তৈরি করেন। ফলে, অনেক ঐতিহাসিক শহরটিকে 'গোলাকার শহর' বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি শহরের মাঝখানে জামে মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা নেন। তার নামানুসারে মসজিদটিকে 'জামে মানসুর' বলা হয়। রাজধানী শহর বাগদাদ তৈরির সাথে সাথে মসজিদ তৈরির কাজও এগিয়ে চলে। মসজিদটি চতুর্ভুজ। এর প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ হচ্ছে, ২শ' গজ।
১৯২ হিজরীতে খলীফা হারুনুর রশিদ মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। এটা বাগদাদের সবচাইতে প্রাচীন মসজিদ।
খতীব বাগদাদী তার 'তারীখু বাগদাদ' বইতে এ মসজিদের বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ২৬১ হিজরীতে ২য় আব্বাসী যুগের একজন শাসক মোফলেহ তুর্কী পার্শ্ববর্তী কাত্তান নামক ঘরটিকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করে তাকে আরো সম্প্রসারিত করেন। ২৮০ হিজরীতে খলীফা মো'তাদেদ খলীফা মানসুরের প্রাসাদকেও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
আব্বাসী শাসনামলে, বাগদাদের জামে' মানসুর মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে পরিণত হয়।
প্রখ্যাত আরবী ব্যকরণের পণ্ডিত আল্লামা কিসাঈ এ মসজিদে বসে আরবী ভাষা শিক্ষা দিতেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে আল-ফাত্রা, আল-আহ্মার এবং ইবনে সা'দান ছিলেন অন্যতম। আবুল আ'তাহিয়া এ মসজিদে ছাত্রদের সামনে আরবী কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং তাদেরকে তা শিক্ষা দিতেন। কথিত আছে যে, আবু আ'মর যাহেদ ৩২৬ হিজরীতে এ মসজিদে নিজ কিতাব 'আল-ইয়াকুত' শিক্ষা দিয়েছেন। এ মসজিদে মিসরের ফাতেমীয় খলীফার পক্ষে বাগদাদের সেনাধ্যক্ষ আল-বাসাসিরী খোতবাহ দিয়েছিলেন।
ফলে মসজিদটি তদানীন্তন সময়ের জন্য জ্ঞান চর্চা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, মসজিদটি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই, তবে ইসলামের ইতিহাসে এতটুকু উল্লেখ আছে যে, ১৪৫ হিজরী থেকে ৭২৭ হিজরী পর্যন্ত মোট ৬শ বছর মুসলমানদের ঐ মসজিদটি বিদ্যমান ছিল।
২য় আব্বাসী খলীফা আবু জা'ফর মানসুর ১৪৫ হিজরীতে বাগদাদে নূতন রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি নিজে নূতন শহরের জন্য গোলাকার আকৃতির পরিকল্পনা তৈরি করেন। ফলে, অনেক ঐতিহাসিক শহরটিকে 'গোলাকার শহর' বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি শহরের মাঝখানে জামে মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা নেন। তার নামানুসারে মসজিদটিকে 'জামে মানসুর' বলা হয়। রাজধানী শহর বাগদাদ তৈরির সাথে সাথে মসজিদ তৈরির কাজও এগিয়ে চলে। মসজিদটি চতুর্ভুজ। এর প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ হচ্ছে, ২শ' গজ।
১৯২ হিজরীতে খলীফা হারুনুর রশিদ মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন। এটা বাগদাদের সবচাইতে প্রাচীন মসজিদ।
খতীব বাগদাদী তার 'তারীখু বাগদাদ' বইতে এ মসজিদের বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ২৬১ হিজরীতে ২য় আব্বাসী যুগের একজন শাসক মোফলেহ তুর্কী পার্শ্ববর্তী কাত্তান নামক ঘরটিকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করে তাকে আরো সম্প্রসারিত করেন। ২৮০ হিজরীতে খলীফা মো'তাদেদ খলীফা মানসুরের প্রাসাদকেও মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
আব্বাসী শাসনামলে, বাগদাদের জামে' মানসুর মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে পরিণত হয়।
প্রখ্যাত আরবী ব্যকরণের পণ্ডিত আল্লামা কিসাঈ এ মসজিদে বসে আরবী ভাষা শিক্ষা দিতেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে আল-ফাত্রা, আল-আহ্মার এবং ইবনে সা'দান ছিলেন অন্যতম। আবুল আ'তাহিয়া এ মসজিদে ছাত্রদের সামনে আরবী কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং তাদেরকে তা শিক্ষা দিতেন। কথিত আছে যে, আবু আ'মর যাহেদ ৩২৬ হিজরীতে এ মসজিদে নিজ কিতাব 'আল-ইয়াকুত' শিক্ষা দিয়েছেন। এ মসজিদে মিসরের ফাতেমীয় খলীফার পক্ষে বাগদাদের সেনাধ্যক্ষ আল-বাসাসিরী খোতবাহ দিয়েছিলেন।
ফলে মসজিদটি তদানীন্তন সময়ের জন্য জ্ঞান চর্চা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, মসজিদটি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই, তবে ইসলামের ইতিহাসে এতটুকু উল্লেখ আছে যে, ১৪৫ হিজরী থেকে ৭২৭ হিজরী পর্যন্ত মোট ৬শ বছর মুসলমানদের ঐ মসজিদটি বিদ্যমান ছিল।