📄 মসজিদে নববীর রাজনৈতিক ভূমিকা
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীকে 'দারে নাদওয়া' বা শলা-পরামর্শের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি মুসলমানদের সাথে মসজিদে দীন ও দুনিয়ার সকল বিষয়ে এবং বিশেষ করে যুদ্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পরামর্শ করতেন। আমরা দেখতে পাই, তিনি মসজিদে নববী থেকেই বদর যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি মসজিদে আনসার ও মোহাজেরদেরকে ডাকেন এবং মক্কার আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মক্কাগামী বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণের প্রস্তাব দেন। কেননা, মক্কার কোরাইশরা ইতিপূর্বে মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছে তার কোন নজীর নেই। তারা মুসলমানদেরকে হিজরত করতে বাধ্য করে এবং তাদের সকল ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা ভোগ করে। বাণিজ্য কাফেলার ওপর প্রস্তাবিত আক্রমণ দ্বারা উপরোল্লিখিত বিষয়ের কিছুটা ক্ষতিপূরণ হতে পারে।
কিন্তু রসূলুল্লাহ (স) যখন খবর পেলেন যে, কোরাইশরা মদীনার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। তখন তিনি মোহাজির ও আনসারদেরকে পুনরায় মসজিদে একত্রিত করে তাদের সাথে শলা-পরামর্শ শুরু করেন। মোহাজিরগণ রসূলুল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শপথ ব্যক্ত করেন এবং সর্বাবস্থায় ও যে কোন সিদ্ধান্তের বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তারপর আনসারদের মুখপাত্র সা'দ বিন মোআ'য (রা) আনসারদের মতের প্রতিধ্বনি করে বলেন, "হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যবাদী মনে করেছি এবং সাক্ষী দিচ্ছি যে, আপনি যে অহী নিয়ে এসেছেন, তা হক ও সত্য। এ বিষয়ে আমরা আপনাকে 'শুনা' ও 'আনুগত্যে'র প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আল্লাহ আপনাকে যা আদেশ করেন কিংবা আপনি যা ইচ্ছা করেন তা বাস্তবায়ন করুন। আল্লাহর শপথ! আমরা আপনাকে ঐরকম বলবো না, যেরকম ইহুদীরা হযরত মূসা (আ)-কে বলেছিল যে, "তুমি ও তোমার রব যাও এবং যুদ্ধ কর; আমরা এখানে বসা আছি।” কিন্তু আমরা বলবো, "আপনি ও আপনার রব যান এবং যুদ্ধ করেন, আমরা অবশ্যই আপনাদের উভয়ের সাথে আছি। আমরা আপনার সাথে থাকবো। সেই আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদেরকে নিয়ে এই সাগরে পাড়ি জমান, আমরা অবশ্যই আপনার সাথে থাকবো, আমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তিও পিছপা হবে না। আমরা আগামীকাল পর্যন্ত শত্রুর মোকাবিলা অপসন্দ করি। আমরা যুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করবো এবং সত্যবাদিতার পরিচয় দেব। আল্লাহ হয়তো আমাদের মধ্যে আপনাকে এমন জিনিস দেখাবেন যার দ্বারা আপনার চোখ শীতল হবে। আমাদেরকে নিয়ে আল্লাহর বরকতের উদ্দেশ্যে রওনা করুন।"
বদর যুদ্ধে ৩১৩ জনের মুসলিম বাহিনী ১ হাজার কোরাইশ বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করে এবং কাফেরদের মনে ভীতি সঞ্চার করে। আল্লাহ মু'মিনদেরকে সাহায্য করে নিজ ওয়াদা পূরণ করেছেন। মসজিদ থেকেই যুদ্ধের মূল পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। তাই এ বিজয়ও বরকত।
বদর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মক্কার কোরাইশরা এর প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে পরের বছর ওহোদ যুদ্ধের জন্য মদীনা আগমন করে। রসূলুল্লাহ (স) কোরাইশ বাহিনীর মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে এক বৈঠকের আয়োজন করেন। বৈঠকে যে বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত হয়, সেটি হল, মুসলমানরা মদীনা শহরের ভেতর থেকে প্রতিরক্ষার কাজ করবে, না শহরের বাইরে যাবে।
দীর্ঘ শলা-পরামর্শ ও আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, মুসলিম বাহিনী শহরের বাইরে যাবেন। বিশেষ করে তারা ওহোদ প্রান্তরে যাবেন। বদর যুদ্ধে যে সকল যুবক অংশগ্রহণ করে সম্মানিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেনি, তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রসূলুল্লাহ (স) শহরের বাইরে ওহোদ প্রান্তরে যেতে রাজী হলেন। যদিও তিনি প্রথম দিকে শহরের বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। মোনাফেক সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলও বাইরে যেতে প্রস্তুত ছিল না।
এ প্রসঙ্গে ইবনে হেশাম তার সীরাত গ্রন্থে লিখেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আল্লাহর শপথ। আমি ভাল স্বপ্ন দেখেছি। আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটি গরু জবেহ করা হয়েছে, আমি আমার তলোয়ারকে ভোঁতা দেখেছি এবং আরো দেখেছি যে, আমি আমার হাত সুরক্ষিত লৌহবর্মের ভেতর ঢুকিয়েছি। আমি একে মদীনা শহর বলে ব্যাখ্যা করেছি। তোমরা যদি চাও মদীনা শহরে অবস্থান কর এবং তাদেরকে তাদের অবতরণ স্থলে থাকতে দাও। তারা যদি অবস্থান করে তাহলে, নিকৃষ্ট স্থানেই অবস্থান করবে এবং যদি তারা আমাদের শহরে প্রবেশ করে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো।"
এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, রসূলুল্লাহ (স) মদীনার বাইরে যাওয়াটাকে পসন্দ করেননি। তারপরও مسلمانوں পরামর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ওহোদ প্রান্তরে বেরিয়ে যান। সেখানে কাফের বাহিনীর সাথে مسلمانوں বিরাট যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধ مسلمانوں জন্য বিরাট শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে আছে।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানাতেন। প্রতিনিধিরা মসজিদের পার্শ্বে সওয়ারী বেঁধে মসজিদের খোলা অংশে রসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সাক্ষাত করতেন। সম্ভবত মদীনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম মসজিদ তৈরির এটাই প্রধান কারণ। ঐ মসজিদের উদ্দেশ্য শুধু ইবাদাত ও নামায পড়াই নয় বরং তার উদ্দেশ্য আরো ব্যাপক এবং তাতে রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য।
ইসলামের প্রথম যুগে মসজিদকে বর্তমান যুগের পার্লামেন্টের সাথে তুলনা করা যায়। এর উত্তম উদাহরণ হল, মক্কা বিজয়ের পর কা'বার দরজায় দাঁড়িয়ে রসূলুল্লাহ (স) মক্কাবাসীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি ইসলামের কিছু মূলনীতি ঘোষণা করেন এবং বিজিত মক্কাবাসীর কাছে তাদের বিষয়ে কি ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া যায় সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। তারা ক্ষমা-সুন্দর ভূমিকার আহবান জানায়। রসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।
রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পর মক্কাবাসীরা ঐ খবর শুনে এবং তাদের মধ্যে একটি বিরাট সংখ্যক লোক ইসলাম ত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তখন সোহাইল বিন আমর কা'বার দরজায় দাঁড়িয়ে জোরে আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং রসূলুল্লাহ (স)-এর মৃত্যুর খবর ঘোষণা করে বলেন, "এই মৃত্যু ইসলামকে শক্তিশালী ছাড়া আর কিছুই করবে না। কেউ যদি ইসলাম ত্যাগ করে মোরতাদ হয়ে যায়, আমরা তার গর্দান উড়িয়ে দেব। তারপর বলেন, হে মক্কাবাসী! তোমরা এমন হয়ো না যে, সবশেষে ইসলাম গ্রহণ করে সর্বাগ্রে তা ত্যাগ করবে। আল্লাহর শপথ। আল্লাহ এ দীনকে রসূলুল্লাহ (স)-এর কৃত ভবিষ্যদ্বাণীর পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছাবেন। আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে আমার এ স্থানে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি এবং তোমরাও এখন আমার সাথে তা উচ্চারণ করে বল, 'আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই,' আরবরা তোমাদের অনুগত হবে, অনারবরা তোমাদেরকে জিযিয়া কর দেবে। আল্লাহর শপথ! তোমরা অবশ্যই পারস্যের কেসরা ও রোম সম্রাট কাইসারের সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে। এ কথার প্রতি ঠাট্টাকারী ও তালিদানকারী উভয়ই থাকবে। ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর যে অংশ এখন বাস্তবায়িত হয়েছে তাতো তোমরা দেখলে। আল্লাহর কসম, বাকী অংশও সত্যে পরিণত হবে। "এরপর লোকেরা মোরতাদ হওয়ার মনোভাব ত্যাগ করল। ১
রসূলুল্লাহ (স)-এর পরে আমরা খোলাফায়ে রাশেদাকেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেখি। তারাও উম্মাহর কাছে মসজিদে নিজেদের শাসন পদ্ধতি এবং লোকদের সাথে ভবিষ্যত আচরণের ধরনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এমন কি খলীফাদের প্রতি বাইআত বা আনুগত্যের শপথও তারা মসজিদে নিতেন। এ সব কিছু মসজিদ ও মিম্বার থেকেই হত। এটা ছিল পুরো রাজনৈতিক বিষয়।
হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা হওয়ার পর মসজিদে নববীতে বাইআতের জন্য যান এবং তিনি যে নীতি অনুসরণ করবেন সে সম্পর্কে ভাষণ দেন। বাইআত শেষে তিনি মিম্বারে ওঠেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন। তারপর বলেন, "হে লোকেরা। আমি তোমাদের খলীফা নির্বাচিত হয়েছি অথচ আমি তোমাদের উত্তম ব্যক্তি নই। যদি আমি ভাল কাজ করি আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি খারাপ কাজ করি তাহলে আমাকে সোজা করে দেবে। সত্যবাদিতা আমানত এবং মিথ্যা হচ্ছে খেয়ানত। তোমাদের দুর্বল ব্যক্তিও আমার কাছে সবল যে পর্যন্ত না আমি তার অধিকার তাকে ফিরিয়ে দেই। তোমাদের সবল ব্যক্তিও আমার কাছে দুর্বল যে পর্যন্ত না আমি তার কাছ থেকে অন্যের অধিকার কেড়ে আনি। তোমাদের কেউ আল্লাহর পথে জিহাদ ত্যাগ করতে পারবে না। কোন জাতি জিহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ তাদের ওপর বিপদ নাযিল করেন। তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমার আনুগত্য কর যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করি। আমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করি, তাহলে তোমাদের ওপর আমার কোন আনুগত্য নেই। তোমরা নামাযের জন্য দাঁড়াও।”১
হযরত আবু বকর (রা) নিজ বক্তৃতায় ইসলামের সুমহান নীতিমালা তুলে ধরেন। আজও তাঁর সেই ভাষণ ইতিহাসের কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে। ১৪'শ বছর যাবত মানুষ সেই ভাষণ পড়ে আশ্চর্য হচ্ছে। সংক্ষিপ্ত ভাষণটিতে তিনি রাজনৈতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচী ঘোষণা করেন। এটি ইতিহাসের সর্বোত্তম রাজনৈতিক সরকারী কর্মসূচী হিসেবে বিবেচিত। তিনি নিজ ভাষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তুলে ধরেছেন। সেগুলো হচ্ছে: ১. তিনি সাধারণ মানুষের কাতারের লোক। তাই তিনি মানুষের কাছে উপদেশ চেয়েছেন ও সমালোচনা কামনা করেছেন। ২. তিনি মিথ্যা ত্যাগ করার আহবান জানিয়েছেন। এটা একটা নৈতিক গুণ। ৩. তিনি সরকারী নীতিতে সাম্যকে গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করে বলেছেন, তাঁর কাছে সবল-দুর্বল সবাই সমান। কেউ বিশেষ কোন প্রাধান্য পাবে না। ৪. তিনি মুসলমানদেরকে জিহাদের আহবান জানিয়েছেন। ৫. ইসলামী শরীয়াতের ভেতর থাকা অবস্থায় তিনি লোকদেরকে আনুগত্য করার আহবান জানিয়েছেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) রসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর উসামা বিন যায়েদের বাহিনীর যাত্রা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ২য় দফা মসজিদে নববীতে ভাষণ দেন। তখন একদল লোক মোরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে। ইহুদী-নাসারারা শত্রুতা শুরু করেছে এবং মুসলমানরা গভীর বিপদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমতাবস্থায় সাহাবায়ে কেরামের একটা অংশ উসামা বাহিনী না পাঠানোর পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা) উসামা বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে দৃঢ়মত ব্যক্ত করেন, তিনি মদীনার তিনমাইল দূরে জোরফে অবস্থানকারী উসামা বাহিনীকে রওনা দেয়ার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বহু ধর্মত্যাগী ও মুসলমানের শত্রু ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর কিছু আরব গোত্র মোরতাদ হয়ে যায়। এ সমস্যাকে কেন্দ্র করে হযরত আবু বকর (রা) মসজিদে নববীতে ৩য় বার ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি যাকাত অস্বীকারকারীদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "তারা রসূলুল্লাহর কাছে প্রদত্ত যাকাতের উটের একটি রশি দিতে অস্বীকার করলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো।”
এ প্রসঙ্গে মুসলমানরা পরস্পর আলোচনা করতে থাকেন। হযরত ওমর (রা) বলেন, "আল্লাহ হযরত আবু বকরের রায়ের ব্যাপারে আমার অন্তর প্রশস্ত করে দিয়েছেন।” অর্থাৎ তিনি হযরত আবু বকরের সিদ্ধান্তের বিজ্ঞতা পরে বুঝতে পেরেছেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) মন্তব্য করেছেন, "আমরা রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিলাম যে, প্রায় ধ্বংস হয়ে যাই, যদি না আল্লাহ আবু বকরকে আমাদের কাছে দান করতেন।"
হযরত ওমর (রা) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর মসজিদে নববীতে এক ভাষণ দেন। তিনি ভাষণের প্রথমে বলেন, "আরবদের উদাহরণ হচ্ছে সেই উটের মত যা বেত্রাঘাতের পর তার চালককে বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করে। তাদের দেখা উচিত, পরিচালক কোন্ দিকে পরিচালনা করে। কা'বার রবের শপথ, আমি তাদেরকে (সঠিক) রাস্তায় তুলবো।” ১
ইবনু আবৃন্দি রাব্বিহি বলেছেন, হযরত ওমর (রা) খেলাফত লাভ করার পর মসজিদে নববীর মিম্বারে ওঠেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও শুক্রিয়া আদায় করে বলেন, "হে লোকেরা। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া জানাচ্ছি, তোমরা আমীন বল। হে আল্লাহ! আমি কঠোর, আমাকে তোমার আনুগত্যকারীদের প্রতি বিনম্র করে দাও, আমি যেন সত্যের অনুসরণ, তোমার সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তির ভিত্তিতে তাদের সাথে নরম ব্যবহার করতে পারি, আমাকে তোমার দুশমন ও মোনাফেকের প্রতি কঠোর হওয়ার তওফীক দান কর, আমি যেন তাদের ওপর কোন যুলুম ও অন্যায় না করি। হে আল্লাহ। আমি কৃপণ, আমাকে অপচয়, সুনাম ও লোক দেখানোর অন্যায় থেকে বাঁচিয়ে নেক কাজের দাতা বানিয়ে দাও। আমি যেন এর মাধ্যমে তোমার সন্তুষ্টি ও আখেরাতে মুক্তি লাভ করতে পারি। হে আল্লাহ। আমি যেন মু'মিনদের জন্য বাহু নীচু করতে পারি এবং তাদের প্রতি নরম হতে পারি। হে আল্লাহ! আমি বেশী উদাসীন ও বেশী ভুল করি, আমাকে প্রতি মুহূর্তে তোমার যিকর করার তওফীক দাও এবং সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করার যোগ্যতা দাও। হে আল্লাহ! আমি তোমার অনুগত আমলের ক্ষেত্রে দুর্বল, আমাকে সেক্ষেত্রে কর্মতৎপর করে দাও এবং নেক নিয়ত সহকারে শক্তি দাও। তোমার সাহায্য ও তওফীক ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়। হে আল্লাহ। আমাকে দৃঢ় বিশ্বাস বা ইয়াকীন, নেক কাজ ও তাকওয়ার তওফীক দান কর এবং তোমার সামনে উপস্থিত হওয়ার কথা ও লজ্জা পাওয়ার ব্যথা স্মরণ করিয়ে দিও। তুমি যে কাজে সন্তুষ্ট থাক সে কাজে আমাকে বিনয় দান কর, নিজের আত্ম-সমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ দাও এবং সন্দেহ থেকে বাঁচিয়ে রাখ। হে আল্লাহ। আমার জিহ্বা থেকে তোমার কিতাবের যে সকল কথা উচ্চারিত হয় সেগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা এবং অন্তর্নিহিত ভাব বুঝাসহ সেগুলোর প্রতি আমল ও চিন্তা-গবেষণা করার তওফীক দাও। তুমি সকল বিষয়ের ওপর সর্বশক্তিমান।১
মুসলিম মিল্লাতের ২য় খলীফা হযরত ওমর (রা) দোয়ার মাধ্যমেও নিজের সম্ভাব্য নীতির আভাষ দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে তওফীক কামনা করেছেন, যেন ন্যায়ের প্রতি আপোষকামী ও বাতিলের প্রতি আপোষহীন হতে পারেন এবং তাতে যেন অন্যায়কারীদের ওপর কোন যুলুম না হয়। এ ছাড়াও তিনি তাকওয়া, মৃত্যু ও পরকালের ভয় এবং সকল কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তওফীক কামনা করেছেন।
হযরত ওমর (রা) আরেক দিন মসজিদে নববীতে এক ভাষণে বলেন : “হে লোকেরা! আমি তোমাদেরকে মারার জন্য কিংবা তোমাদের সম্পদ নেয়ার জন্য কোন কর্মচারী পাঠাই না। আমি তাদেরকে পাঠাই তোমাদের দীন ও নবীর সুন্নাত শিক্ষা দেয়ার জন্য। কোন কর্মকর্তা যদি এর বাইরে কোন কাজ করে সে ব্যাপারে আমার কাছে যেন অভিযোগ করা হয়, আল্লাহর কসম, আমি এর প্রতিশোধ নেবো। তখন আমর বিন আস লাফ দিয়ে হাযির হন এবং জিজ্ঞেস করেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার কোন কর্মচারী যদি প্রজা সাধারণকে আদব শিক্ষার উদ্দেশ্যে মারে তাহলেও কি আপনি এর প্রতিশোধ নেবেন? ওমর (রা) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি বদলা নেবো। কেননা, আমি রসুলুল্লাহ (স)-কেও অনুরূপ ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নিতে দেখেছি। সাবধান! তোমরা মুসলমানদেরকে মেরে লাঞ্ছিত করো না এবং তাদেরকে ধ্বংস করো না।" ২
পারস্য বিজয়ের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী পাঠানোর সময় তিনি মুসলমানদেরকে মসজিদে নামাযের জন্য আহবান করেন। ইতিমধ্যে তিনি বুদ্ধিজীবী মহলের সাথে এ বিষয়ে শলা-পরামর্শ শেষ করেন। তারপর মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে তিনি বলেনঃ
“আল্লাহ মুসলমানদেরকে দীন ইসলামের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, তিনি তাদের অন্তরকে জোড়া দিয়েছেন, তাদেরকে ভাই হিসেবে আপন করে দিয়েছেন। মুসলমানরা একই দেহের মত। তাদের একজনের শরীর ব্যথা হলে অন্যরাও সে ব্যথা অনুভব করবে। মুসলমানদের সকল বিষয় পরামর্শের ভিত্তিতে সংঘটিত হবে। মুসলিম চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ দিতে হবে। অন্যদের সে ঐক্যবদ্ধ পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরী।” ১
হযরত ওমর (রা) আরো পরামর্শ করলেন, পারস্য বাহিনীর অধিনায়ক কাকে বানানো যায়। প্রশ্ন ছিল, তিনি নিজেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন না অন্য কেউ। মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা খলীফাকে সেনাবাহিনীর সাহায্যের উদ্দেশ্যে মদীনায় অবস্থানের পরামর্শ দেন এবং হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে অধিনায়ক বানিয়ে পাঠানোর পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এভাবে তদানীন্তন বিশ্বের দুই পরাশক্তির অন্যতম পারাশক্তি পারস্যের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত মসজিদে নববীতেই গৃহীত হয় এবং সে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয় ও পারস্য মুসলমানদের শাসনে আসে।
হযরত ওসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর পরামর্শ সভার বাইআত শেষে মসজিদে নববীতে যান এবং মিম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি সবাইকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের ধোঁকায় পড়তে বারণ করেন এবং পরকালের বিষয়ে উৎসাহিত করেন। তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত উল্লেখ করে বলেন: وَاضْرِبْ لَهُمْ مُّثَلَ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا كَمَاء أَنْزَلْنَهُ مِنَ السَّمَاءِ فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ فَأَصْبَحَ هَشِيمًا تَذَرُوهُ الرِّيحُ ، وَكَانَ اللهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقْتَدِرًا ، اَلْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَالْبَقِيتُ الصَّلِحْتُ خَيْرٌ عِنْدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ أَمَلاً . 0
"তাদেরকে দুনিয়ার জীবনের উদাহরণ শুনাও, যেমন আমরা আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি বর্ষণ করেছি। এর মাধ্যমে যমীনের উদ্ভিদ জন্মেছে। তারপর তা শুকিয়ে যায় ও বাতাসের সাথে উড়ে যায়। আল্লাহ সকল জিনিসের ওপর শক্তিবান ও ক্ষমতাশীল। সম্পদ ও সন্তান হচ্ছে দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য এবং তোমার রবের কাছে রেখে যাওয়া নেক কাজের সওয়াব উত্তম ও অধিকতর আশাপ্রদ।' (সূরা কাহাফ: ৪৫-৪৬)
তাঁর এ ভাষণে যদিও রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা সম্ভাব্য প্রশাসনিক ভূমিকার উল্লেখ নেই, তথাপি তাতে এ সকল কিছু নিয়ন্ত্রণকারী প্রয়োজনীয় আকীদা ও উপদেশের উল্লেখ রয়েছে। একজন মুসলিম খলীফা তাঁর প্রথম ভাষণে বিস্তারিত শাসন প্রণালী সম্পর্কে আলোকপাত না করলেও তিনি যে, ইসলামের নির্দেশিত জীবন ব্যবস্থাই অনুসরণ করবেন তাতে সন্দেহের অবকাশ কোথায়? তাছাড়া, পরবর্তীতে তিনি নিজ ভাষণ ও তৎপরতায় ইসলামী জীবনদর্শনের অনুসরণ ছাড়া আর কিছুই করেননি।
হযরত ওসমানের শাহাদাতের পর মদীনার আনসার ও মোহাজিরগণ মসজিদে নববীতে একত্রিত হন এবং পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা করেন। সবাই হযরত আলী (রা)-কে খলীফা নির্বাচন করেন। কেউ কেউ বলেছেন, কিছু লোক হযরত আলীর ঘরে যান, তাঁকে বাহির করে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন এবং বলেন, আপনি হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা বাইআত নেই। হযরত আলী (রা) তা অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত লোকদের পীড়াপিড়িতে এ শর্তে রাজী হন যে, মসজিদে নববীতে তাঁর প্রকাশ্য বাইআত হতে হবে এবং একজন লোকও তাঁর খেলাফতের বিরোধী থাকলে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না। তখন সবাই মসজিদে যান ও বাইআত গ্রহণ করেন। সর্বপ্রথম যোবাইর বিন আওয়াম ও তালহা বিন ওবাইদুল্লাহ বাইআত নেন। তারপর অন্যান্য লোকেরা বাইয়াত নেন। বাইআত শেষে তিনি মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি তাঁর ভাষণে কিছু জরুরী উপদেশ দেন। উপদেশগুলো নৈতিক ও দীনী বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। সেগুলোতে রাজনৈতিক ও সম্ভাব্য প্রশাসনিক নীতিমালার উল্লেখ ছিল না। তিনি সবাইকে ভাল কাজ করা, খারাপ কাজ পরিহার করা, ফরয আদায় করা, হারাম থেকে দূরে থাকা, এখলাস ও একতা বজায় রাখা, মৃত্যুকে স্মরণ রাখা, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং কল্যাণের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়ার উপদেশ দেন।
একবার মুআবিয়া বিন আবি সুফিয়ান (রা) মদীনায় আসেন এবং মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে মিম্বারে উঠে একটি ভাষণ দেন। পরবর্তী আরেক সময়ে তিনি মদীনায় আসেন এবং পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করে ভাষণ দেন। উভয় ভাষণে তিনি তাঁর সরকারের ভবিষ্যত নীতি নির্ধারণী বক্তব্য পেশ করেন। তিনি মদীনাবাসীকে তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের আহবান জানান।
এ সকল তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, মসজিদের ভূমিকা শুধু দীনী ভূমিকা নয় বরং মসজিদ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকাও পালন করেছে। মসজিদে নববীর ভূমিকা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র অন্যান্য মসজিদে সম্প্রসারিত হয়েছে।
মসজিদে জনতার ক্ষোভ এবং বিপ্লবও সংঘটিত হয়। যেমন, হযরত ওসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে কয়েকটি দেশের মসজিদে সেই ক্ষোভ দেখা গেছে। খোলাফায়ে রাশেদার দু'জন খলীফা মসজিদেই শহীদ হয়েছেন। একজন হলেন, হযরত ওসমান (রা) এবং অন্যজন হলেন, হযরত আলী (রা)। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, হযরত আলী মসজিদে শহীদ হননি। বরং তিনি ফজরের নামায পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তায় শহীদ হন।
অপরদিকে হত্যার প্রচেষ্টা থেকে দামেস্কের মসজিদে হযরত মুআবিয়া এবং মিসরের মসজিদে হযরত আমর বিন আস রক্ষা পান। খারেজী সম্প্রদায়ের লোকদের ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে ঐ তিনজন মুসলিম নেতাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
আবদুর রহমান বিন মূলজেম হযরত আলীকে হত্যা করে। বারক বিন আব্দুল্লাহ তামীমির হাত থেকে হযরত মুআবিয়াহ (রা) রক্ষা পান এবং আমর বিন বকরের হাত থেকে হযরত আমর বিন আস (রা) রক্ষা পান।
মসজিদে নববীর ভূমিকা সর্বত্র পুনর্জীবিত হউক, এই হচ্ছে আজকের কামনা-বাসনা।
টিকাঃ
১. এতহাফুল ওয়ারা বি আখবারে উম্মিল কোরা ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫৯৪।
১. তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক তাবারী, ৩য় খণ্ড- পৃঃ ২১০।
১. তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক-তাবারী ৩য় খণ্ড।
১. আল-এফসুল ফরীদ ৪র্থ খণ্ড।
২. আল-ফামেল ফিতারীখ-৩য় খণ্ড।
১. তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক-তাবারী ৩য় খণ্ড।
📄 মসজিদে নববীর সামরিক ভূমিকা
রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, ইসলামী সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, নেতা, শিক্ষক-প্রশিক্ষক এবং অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহকারী। তিনি নিজ চরিত্রের আলো দ্বারা সেনাবাহিনীর চরিত্রকে আলোকিত করেছেন। আর এটা করেছিলেন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। ঐ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, নামায। নামাযে যে সাম্য, শৃংখলা, ঐক্য ও আনুগত্যের বাস্তব ট্রেনিং রয়েছে, তা কি দুনিয়ার আর কোন জাতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে? এখানে ধনী-গরীব, বড়-ছোট, স্বাধীন-পরাধীন এবং আশরাফ ও আতরাফ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই নেতার অধীন যে বাস্তব ট্রেনিং গ্রহণ করে তা অপূর্ব। তাই ইসলাম জামায়াতে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং এর ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে। আর নামায ও জামায়াত মসজিদেই অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে নামায পড়ার মাধ্যমে ইসলাম মুসলমানের মনে এ অনুভূতি সৃষ্টি করতে চায় যে, সবাইকে জামায়াতী জিন্দেগী বা সামষ্টিক জীবন যাপন করতে হবে এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। এ জামায়াতের শরীক অন্যান্য সদস্যদের সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ করানোও এর অন্যতম লক্ষ্য। মূলত মানবীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যও তাই।
তাই অমুসলিম প্রাচ্যবিদরাও মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেন যে, নামাযে রয়েছে মূল্যবোধের শিক্ষা। মূলত তা ছিল সামরিক ট্রেনিং এবং মসজিদ ছিল সামরিক মহড়া ও কুচকাওয়াজের স্থান। নামাযের মাধ্যমে সেই কুচকাওয়াজ সম্পন্ন হত। সামরিক বাহিনীতে বর্তমান যুগে উঠা, বসা ও শোয়ার যে ট্রেনিং দেয়া হয়, নামাযের সাথে এর কোন পার্থক্য নেই।
নামায ইসলামের ২য় খুঁটি বা রোকন। ইসলাম ও কুফরীর মধ্যে নামায হচ্ছে, পার্থক্য সৃষ্টিকারী। তাই রসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ مَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
"আমাদের ও তাদের (অমুসলমানদের) মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাযের, যে নামায ত্যাগ করে, সে কুফরী করে।"
মসজিদ ভিত্তিক নামায ইসলামী শিক্ষা ও চরিত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মূলত 'মসজিদ একটি প্রশিক্ষণ শিবির। কিসের প্রশিক্ষণ শিবির? নিয়ম-নীতি ও শৃংখলার প্রশিক্ষণ শিবির। সময়ের নিয়মানুবর্তিতা ও এর মূল্য বুঝা এবং ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার জন্য আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। নির্ধারিত নামাযসমূহের জন্য মসজিদে জামায়াতের সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সে সময় অনুযায়ী দিনে পাঁচ বার মসজিদে হাযির হতে হয়।
এরপর রয়েছে, সোজা ও সমানভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। কাতার সোজা না হলে গুনাহ হয় এবং নামায অসম্পূর্ণ থাকে। এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
صَفًّوا صُفُوقَكُمْ فَإِنْ تَصْفِيَّةَ الصُّفُوفِ مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ
"তোমরা কাতার সোজা করে দাঁড়াও। কাতারের মাধ্যমে নামায পরিপূর্ণ হয়।"
এটা মু'মিনের ব্যবহারিক জীবনের জন্য বিরাট শিক্ষা।
মুসল্লীকে প্রতি মুহূর্তে ইমামের প্রতিটি নড়াচড়া ও বিশ্রামের অনুসরণ করতে হয়। যেমন, ইমাম রুকূ'তে গেলে মুসল্লীকেও রুকূতে যেতে হয় এবং ইমাম বসলে মুসল্লীকেও বসতে হয়। এভাবে ইমামের অনুসরণ করে নিজের জীবনে যুক্তিসঙ্গত কাজ ও শৃংখলার শিক্ষা নিতে হয়।
এ ছাড়াও তাতে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে ইমামত বা নেতৃত্ব দানের শিক্ষা রয়েছে। কেননা, মুসল্লীদের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী, ইমামতি করার যোগ্যতা ও অধিকার তার। যেন অপাত্রে কোন কিছু না রাখা হয়। কেননা, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, নেতৃত্ব বা পরিচালনার দায়িত্ব অপাত্রে দান করলে কেয়ামতের অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ তা কেয়ামতের লক্ষণ।
নব্য উপনিবেশবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদীরা কোন দেশ জয় করে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে নিজেদের পতাকা উত্তোলন করে। পক্ষান্তরে, মুসলমানরা বিজয়ের পর মসজিদ তৈরি করে প্রমাণ করে যে, এটি ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে। মসজিদ তৈরির অন্য উদ্দেশ্য হল, সংশ্লিষ্ট যমীনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা, বিজিতের ওপর বিজয়ীর সার্বভৌমত্ব নয়। কুবা ও মদীনায় পৌঁছে রসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম ঐ মসজিদ দু'টো তৈরি করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বই ঘোষণা করেছিলেন। আমরা আরো দেখতে পাই কুফা, ফোস্তাত ও কায়রাওয়ানে বিজয়ী মুসলমানরা নিজেদের গর্ব-অহংকারের কথা বাদ দিয়ে জুমআর খোতবায় শুধুমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসা আদায় করেছেন।
মুসলমানের জীবনে মসজিদ সামরিক কেন্দ্র ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদ থেকে জিহাদের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী পাঠানো ছাড়াও ইসলাম গ্রহণেচ্ছু প্রতিনিধিদলকে মসজিদেই স্বাগত জানান। এর উত্তম উদাহরণ হল, ৯ম হিজরীর তাবুক যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ (স) সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধিবৃন্দের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে তাঁবু তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল, তারা যেন মসজিদে কুরআন শুনে, মুসল্লীদেরকে নামায পড়তে দেখে এবং তাদের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধবন্দীদেরকে মসজিদে বেঁধে রাখতেন। এ ক্ষেত্রে সামামাহ বিন আসালের উদাহরণ দেয়া যায়। বন্দী অবস্থায় আসার পর রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে চিনতে পেরে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার হুকুম দেন। এবং তার সাথে ভাল ব্যবহারের আদেশ দান করেন। যদিও সবার সাথেই ভাল ব্যবহার করা হত। রসূলুল্লাহ (স) তার কাছে তিনদিন পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন কিন্তু সামামাহ ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে মুক্তিদানের নির্দেশ দেন। মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে তিনি গোসল করেন এবং নবী করীম (স)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। (বুখারী, কিতাবুস সালাত ১ম খণ্ড)
ইসলামী দাওয়াতের ইতিহাসে ঐ ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। নৈতিক প্রশিক্ষণ ও ইসলামী সংস্কৃতি বিস্তারের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে উত্তম পদ্ধতি। মসজিদ আল্লাহর সঠিক পরিচয় ও অন্তর থেকে অন্ধকার দূর করার উদ্দেশ্যে আলো বিকিরণের স্থান।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদের আঙ্গিনাকে সেনাবাহিনীর সমাবেশ এবং তাদের নেতা নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করেন। এর উত্তম উদাহরণ হল, হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, হাবশীরা (নিগ্রো) মসজিদে নববীতে অস্ত্র নিয়ে খেলা শুরু করে। রসূলুল্লাহ (স) তা দেখেন কিন্তু নিষেধ করেননি।
বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, "হাবশীরা তাদের অস্ত্র নিয়ে ঈদের দিন মসজিদে খেলা শুরু করে। রসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকেন। আমি তাঁর কাঁধের ওপর মাথা রাখি এবং তাদের খেলা দেখি যে পর্যন্ত না আমি তাদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আসি। রসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে বনী আরফেদা! খেলতে থাক। এতে তারা আরো উৎসাহিত হয় এবং খেলা অব্যাহত রাখে।"
সন্দেহ নেই যে, নিগ্রোদের ঐ খেলা নিছক খেল-তামাশা ছিল না। বরং এর মাধ্যমে তারা অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলেন। তারা শুধু খেল-তামাশা করলে রসূলুল্লাহ (স) অবশ্যই তাদেরকে নিষেধ করতেন। কেননা, মসজিদ খেলা-ধূলার জায়গা নয়। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের জন্য মসজিদে সামরিক প্রশিক্ষণ জায়েয আছে।
রসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কেরামকে মসজিদে তীর শিক্ষার জন্য উৎসাহিত করতেন। যেন তারা যুদ্ধ ও শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে যুদ্ধের পতাকা বাঁধেন। উল্লেখ্য যে, ইসলামে উপনিবেশবাদ কিংবা শোষণের উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অবকাশ নেই। ইসলামে শুধু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের সুযোগ আছে। কেউ ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসে বাধা দিলে এবং ইসলামের দাওয়াতী কাজে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি রয়েছে। ইসলামের দাওয়াতী রোশনী প্রজ্জ্বলিত করার দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর। দাওয়াতী মশাল হাতে নিয়ে তারা গোটা দুনিয়ায় হেরার রশ্মি ছড়িয়ে অন্ধকার দূর করে দেবে। কিন্তু কেউ যদি বান্দার কাছে আল্লাহর সেই নূর পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। যে পর্যন্ত না সে আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসে। কিন্তু আল্লাহর বাতি নিভানোর প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরাজিত হলে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। বরং দেশের প্রতিরক্ষার জন্য তাদের কাছে সামান্য একটা জিযিয়া কর ধার্য করা হয়। তারা তাদের অর্থ-সম্পদ থেকে তা আদায় করবে। পক্ষান্তরে, মুসলমানরা নিজেদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে।
📄 মসজিদে নিষিদ্ধ কাজ
মসজিদ সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ (স) শিশু ও পাগলকে মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "তোমাদের মসজিদগুলো থেকে ছোট শিশু ও পাগলদেরকে দূরে রাখ। কেননা, তারা মসজিদের দেয়াল ময়লা করে এবং অপবিত্রতা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে পারে না।" তাই দেখা যায়, অতীতে বাজারে কিংবা মসজিদের পার্শ্বে পৃথক ঘর তুলে শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হত।
মসজিদে বেচা-কেনা কিংবা নিখোঁজ জিনিসের ঘোষণা দেয়া নিষিদ্ধ। কেননা, তা মসজিদের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরবেও মক্তব ও ফোককানিয়া মাদ্রাসায় শিশুদের পৃথক ব্যবস্থার ঐ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
إِذَا رَأَيْتُمْ مِّنْ يَّبِيعُ أَوْ يَبْتَاعُ فَقُولُوا لَا أَرْبَحَ اللَّهُ تِجَارَتَكَ وَإِذَا رَأَيْتُمْ مِّنْ يُنْشُدُ ضَالَّةً فَقُولُوا لَا رَدُّ اللَّهُ عَلَيْكَ -
"তোমরা যদি কাউকে মসজিদে বেচা-কেনা করতে দেখ, তখন বল, আল্লাহ তোমার ব্যবসায় কোন লাভ না দিক এবং যদি কাউকে হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে দেখ, তাহলে বল, আল্লাহ তোমাকে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়।"
অনুরূপভাবে, মসজিদে খেলা-ধূলা করাও নিষিদ্ধ। রসূলুল্লাহ (স) এ হাদীসে ব্যবসার অকল্যাণ ও হারানো জিনিস না পাওয়ার জন্য বদ দোয়া করেছেন। ২
টিকাঃ
১. রেসালাতুল মসজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয মুস্তাম্মদ লোমাইলাম।
২. নাইলুল আওতার- ২য় খন্ড- পৃঃ ১৬৬।