📄 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যাবলী (Functions)
কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Central Bank) অনেক কাজ সম্পাদন করে থাকে। এখানে তা আলোচনা করা হল:
১. এটা একটা সরকারি ব্যাংক। সরকারের অর্থ এতে রাখা হয়, কিন্তু এ ব্যাংক সরকারের টাকার কোনো সুদ প্রদান করে না। প্রয়োজনের মুহূর্তে সরকারকে ঋণ প্রদান করে এবং তার থেকে সামান্য হারে সুদও নেয়।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করে।
৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ ও মজুদ করে এবং প্রয়োজনের সময় তা চালুও করে।
৪. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দুটি। এক হল, সে সকল বণিজ্যিক ব্যাংকের (Commercial Banks) দেখাশুনা করে এবং তাদের নীতিও নিয়ন্ত্রণ করে। যাতে তার থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভ হয় এবং ক্ষতিকর পথ বন্ধ হয়।
এ উদ্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করে থাকে। যেমন-
১. কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পূর্বে তাকে অনুমোদন দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনুমোদন ছাড়া ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর অনুমোদন প্রদানের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
২. অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় যেখানে অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন বেশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকের গতি সেদিকে ফিরিয়ে দেয়। যেমন কোনো বিশেষ অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজন। অথবা কোনো বিশেষ বিভাগে (যেমন কৃষি, বাণিজ্য বা শিল্প ইত্যাদি) পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সে অঞ্চলে বা বিভাগে অধিক হারে ঋণ প্রদানের জন্য বাধ্য-বাধকতা আরোপ করে।
৩. যে সব লোক (Depositers) ব্যাংকে তাদের অর্থ আমানত রেখেছে, তাদের অর্থ সংরক্ষণ করার জন্য আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করে। যেমন জনগণের আমানতের টাকার এত অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হবে এবং এত অংশ ব্যাংক তার নিজের কাছে সংরক্ষিত রাখবে ইত্যাদি।
৪. আর্থিকভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সামগ্রিক অবস্থা সুদৃঢ় রাখার এবং তার নিজের দেনা পরিশোধের যোগ্যতা বজায় রাখার প্রতি দৃষ্টি রাখে।
৫. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক লেনদেনের নিষ্পত্তিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক করে। এ উদ্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি বিভাগ থাকে। একে আরবিতে 'غرفة المقاصة' ইংরেজিতে Clearing House এবং বাংলায় 'নিকাশ ঘর' বলে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে যে লেনদেন হয়, পরস্পরের উপর চেক বা ড্রাফট ইস্যু হয়, তা প্রতিদিন নিকাশ ঘরে হিসাব করা হয়।
৬. বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রয়োজনের মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণও দেয়। যখন কোনো ব্যাংকের কাছে টাকা উত্তোলনের জন্য এত বেশি পরিমাণে চাহিদা হয় যে, তাতে তার তরল অর্থ দ্বারা তার সংকুলান হয় না, তখন ব্যাংকের কাছে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে 'ঋণদানের শেষ আশ্রয়স্থল' (Lender of the last Resort) বলে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে, এ ব্যাংক দেশের মধ্যে মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। যদি দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায় তাহলে এমন পন্থা অবলম্বন করে যাতে মুদ্রা সংকুচিত হতে শুরু করে। আর মুদ্রা সংকোচনের অবস্থা হলে এমন কাজ করে যাতে মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। মুদ্রার প্রবাহ সম্প্রসারণ ও সংকোচনের কয়েকটি পন্থা হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংককে যে সুদের হারে ঋণ প্রদান করে তাকে ব্যাংক হার (Bank Rate) এবং আরবিতে 'سعر البنك' বলে। একে ইংরেজিতে Official Rate এবং আরবিতে 'السعر الرسمى'ও বলে। এ ব্যাংক হারও মুদ্রার প্রবাহের উপর প্রভাব ফেলে। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার (ব্যাংক রেট) বাড়িয়ে দেবে তখন বাণিজ্যিক ব্যাংক বর্ধিত সুদে ঋণ পাবে। সুতরাং সেও জনসাধারণকে অধিক সুদের উপর ঋণ দেবে। ফলে মানুষ ঋণ কম গ্রহণ করবে। যখন মানুষ কম ঋণ নেবে তখন ব্যাংকের ঋণ আমানত সৃষ্টির কাজ কমে যাবে এবং মুদ্রার আবর্তনও কমে যাবে। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমালে বাণিজ্যিক ব্যাংকও কমাবে। ফলে মানুষ ঋণ বেশি নেবে এবং ঋণ আমানত সৃষ্টির কাজ বেশি হয়ে অর্থের যোগান বৃদ্ধি পাবে।
📄 ট্রেজারি বিল
দ্বিতীয় প্রক্রিয়াকে খোলা বাজার নীতি (Open Market Operation) এবং আরবিতে 'عمليات السوق المفتوحة বলে। এ প্রক্রিয়া বুঝার আগে ট্রেজারি বিল কি তা বুঝা জরুরি। সরকারের যখন টাকার প্রয়োজন হয় তখন টাকা সংগ্রহের জন্য সরকার বিভিন্ন দলিল বা সনদ জারি করে, যাকে 'সরকারি ঋণপত্র' বলে। এর আলোচনা আগেই করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিল জারি করে। যাকে ইংরেজিতে ট্রেজারি বিল (Treasury Bill) এবং আরবিতে 'سندات الخزينة' বলে। এক বিলের অভিহিত মূল্য (Face Value) 'قيمة اسمية' একশ টাকা হয়।
এ বিল নির্দিষ্ট সময়, সাধারণত ছয় মাসের জন্য জারি করা হয়। এ বিল নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকই এর প্রাথমিক ক্রেতা। সাধারণ মানুষ কখনো ব্যাংক থেকে ক্রয় করে থাকে। নিলামের পদ্ধতি হল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করে, এত টাকার (যেমন দশ কোটি টাকার) ট্রেজারি বিল জারি করা হচ্ছে। তখন বাণিজ্যিক ব্যাংক নিজ নিজ চাহিদা জানায়। প্রত্যেক ব্যাংক বলে, আমি এত টাকায় এত বিল ক্রয় করতে ইচ্ছুক। বর্তমানে এর রেট তের বা চৌদ্দ শতাংশ।¹ অর্থাৎ একশ টাকার বিল সাধারণত ৮৬ বা ৮৭ টাকায় বিক্রি হয়। যে ব্যাংকের ডাক গৃহীত হয় তাকে তার চাহিদা অনুযায়ী বিল দিয়ে তার থেকে টাকা আদায় করা হয়। এখন যে ব্যাংক এ বিল ৮৬ টাকায় ক্রয় করল সে ছয় মাস পর তার পুরো একশ টাকা আদায় করবে এবং চৌদ্দ টাকা হবে তার সুদ বা মুনাফা। এ বিলের মেয়াদ পূর্ণ হবার পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অথবা শেয়ার বাজারে (Stock Exchange) হুন্ডির ন্যায় এ বিলের ডিসকাউন্টিংও (বাট্টাকরণ) হয়ে থাকে।
'খোলা বাজার নীতি' অর্থ হচ্ছে, মুদ্রার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর কোনো প্রকার বিধি-নিষেধ আরোপ না করে নিজেই ট্রেজারি বিল ক্রয় বা বিক্রয় করার জন্য খোলা বাজারে এসে মুদ্রার যোগান ও তার প্রবাহের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যখন মুদ্রার প্রবাহ কম করার প্রয়োজন হবে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল অল্প মূল্যে বিক্রয় করার আগ্রহ প্রকাশ করে। যার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংক তার মূলধন দিয়ে বিল ক্রয় করতে থাকে এবং ব্যাংকের মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে যেতে আরম্ভ করে। ব্যাংকের কাছে মূলধন কমে যায় এবং ঋণ সরবরাহ কমে গিয়ে মুদ্রার উপযোগ সৃষ্টির কাজও কমে যায়। এর বিপরীতে যদি মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে হয় তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রেজারি বিল অধিক মূল্যে ক্রয় করার জন্য খোলা বাজারে এসে পড়ে। মানুষ বিল বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে নেয়। ফলে মুদ্রার প্রবাহ বেড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষিত জমার হার হ্রাস বৃদ্ধি করেও মুদ্রার যোগান নিয়ন্ত্রণ করে। রিজার্ভ কম হলে ব্যাংক অধিক পরিমাণে ঋণ সরবরাহ করার সুযোগ পায় এবং মুদ্রার উপযোগ সৃষ্টির কাজ বৃদ্ধি পায়। রিজার্ভ বেশি হলে ব্যাংক ঋণ সরবরাহ কম করে। ফলে মুদ্রার উপযোগ সৃষ্টির কাজও কমে যায়। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর জন্য রিজার্ভ কমিয়ে দেয় এবং মুদ্রার প্রবাহ কমানোর জন্য রিজার্ভ বাড়িয়ে দেয়।¹
সুদের হার হ্রাস বৃদ্ধি করেও মুদ্রার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বৃদ্ধি করার বাধ্য-বাধকতা আরোপ করলে মানুষ ঋণ কম নেবে এবং মুদ্রার প্রবাহ কম হবে। আর সুদের হার কমানোর শর্তারোপ করলে মানুষ বেশি ঋণ নেবে এবং মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।³
ঋণ জারি করার সীমাবদ্ধতা বা বিভিন্ন বিভাগের কোটা নির্দিষ্ট করেও মুদ্রার প্রবাহ কমানো যায়। যেমন আদেশ জারি করা হল, ব্যাংক তার আমানতের মাত্র চল্লিশ ভাগ পর্যন্ত ঋণ প্রদান করতে পারবে। অথবা ব্যাংক তার আমানতের পঁচিশ ভাগ অমুক বিভাগে ঋণ প্রদান করবে। এ বিধি-নিষেধের কারণে ব্যাংক ঋণ কম জারি করতে পারবে এবং মুদ্রার প্রবাহ কমে যাবে।²
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোট ছাপিয়েও মুদ্রার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যাবলীর মধ্যে এটাও অন্তর্ভুক্ত, সে ব্যাংকের ঋণ প্রদানের জন্য এমন নীতিমালা নির্ধারণ করে যাতে জনগণেরও কোনো ক্ষতি না হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বা ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক অবস্থায় কোনো দুর্বলতা সৃষ্টি না হয়।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়া অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (যার আলোচনা সামনে আসছে) দেখাশুনা করার অধিকারও দেয়া হয়েছে।
টিকাঃ
১. এটা পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হার। আমাদের দেশের ট্রেজারি বিলের হার হচ্ছে,
১. একে বাংলায় জমার হার পরিবর্তন নীতি, ইংরেজিতে Reserve Rate Variation Policy বলে।
২. একে বাংলায় ঋণ বরাদ্দকরণ নীতি এবং ইংরেজিতে Rationing of Credit Policy বলে।
৩. একে বাংলায় সুদের হার নীতি এবং ইংরেজিতে Profit Rate Policy বলা হয়।