📄 মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা শর্ত?
উল্লিখিত আলোচনায় এ প্রশ্নের পর্যাপ্ত উত্তর এসে গেছে। কারণ, প্রথমত মুরতাদের শাস্তির ব্যাপারে যেসকল হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোতে বিদ্রোহ ও বিরোধিতার কোনো শর্ত নেই। বরং মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের সাধারণ ঘোষণা রয়েছে। তারপর ইসলাম ধর্মত্যাগের শাস্তিস্বরূপ যেসকল লোককে খোলাফায়ে রাশেদিন হত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে দু-ধরনের লোকই ছিল। এমন লোকও ছিল, যারা মুরতাদ হওয়ার পর বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এমনও ছিল, যাদের থেকে কোনো প্রকার সন্ত্রাস ও বিদ্রোহের ইচ্ছা প্রকাশ পায়নি।
যেসকল লোক মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডকে এই বলে উড়িয়ে দিতে চায়, ইসলামে শুধু ঐসকল মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে যারা দারুল ইসলামের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে; তারা কী বলে, তারা যেন চোখ খুলে হাদিস ও পূর্বসূরিদের আমলে দৃষ্টিপাত করে জেনে নেয়!
📄 মুরতাদকে হত্যা করার জন্য অগ্রাহ্যার্থ করা যাবে?
উল্লিখিত হাদিস ও পূর্বসূরিদের ঘটনাবলিতে এ প্রশ্নেরও উত্তর রয়েছে। কারণ, সেগুলো দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে, মুরতাদের মূল শাস্তি হলো হত্যা। আর আমরা ইমাম রাগিব আসফাহানি ও অন্যান্য ভাষাবিদদের থেকে বর্ণনা করে এসেছি, হত্যা অর্থ জীবন হরণ করা, চাই তা তরবারি দ্বারা, প্রস্তরাঘাতে, বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে হোক।
অতএব যখন মুরতাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রমাণিত হয়ে গেল, তখন যুগের ইমামের জন্য সময়ের উপযোগিতা লক্ষ্য রেখে যে পদ্ধতিতে ইচ্ছা, হত্যা করার এখতিয়ার রয়েছে। হজরত আলি রাজিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি এক মুরতাদকে অধিক অহংকারী মনে করে পায়ের তলা বা গোড়ালি দিয়ে লাথি মেরে হত্যা করার আদেশ করেছেন।
📄 খোলাফায়ে রাশেদিনের পর ইসলামের অন্যান্য খলিফাদের দৃষ্টিতে মুরতাদ হওয়া
১. হজরত আবদুল্লাহ বিন জুবাইর রাজিয়াল্লাহু আনহু [১-৭৩ হি.) তাঁর খেলাফতকালে মুখতার বিন আবি উবাইদকে [১-৬৭ হি.) এ অপরাধেই হত্যা করেছিলেন, যা বর্তমানে মির্জা সাহেবের জন্য উন্নতির সোপান। অর্থাৎ মুখতার বিন আবি উবাইদের নবুওয়াতের দাবিকে ইসলাম ধর্মত্যাগ সাব্যস্ত করে তাকে হত্যা করেছিলেন। (১)
২. উমাইয়া নেতা খালেদ বিন আবদুল্লাহ কাসরি [মৃ. ৭৪৩ খ্রি.) তার রাজত্বকালে জাদ বিন দিরহামকে [৪৬-১০৫ হি.] ইসলাম ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবেই হত্যা করেছিলেন। (২)
৩. আবদুল মালিক বিন মারওয়ান রাহিমাহুল্লাহ [২৬-৮৬ হি.] তাঁর খেলাফাতকালে হারেস নামক এক লোককে এ অপরাধেই [নবুওয়াত দাবি করা] হত্যা করেছেন, যা বর্তমানে মির্জা সাহেবের দাবি ও তার উম্মতের ধর্ম। (১)
৪. আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মনসুর রাহিমাহুল্লাহ [৯৫-১৫৮ হি.] তাঁর খেলাফতকালে বাতিনি ফেরকার মুরতাদদেরকে হত্যা করেছেন। (২)
স্মর্তব্য, বাতিনি ফেরকার প্রতিষ্ঠাতাও শুরুতে একজন সুফি মানসিকতার লোক ছিল। সে সাধারণভাবে মুসলমানদের প্রতি এবং বিশেষভাবে নবি পরিবারের প্রতি অনেক সহমর্মিতার দাবিদার ছিল। প্রথম দিকে মির্জা সাহেবের মতো মানুষের সামনে নিজের তাসাউফের রঙ প্রকাশ করেছে। কিছু লোক তার ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তখন সে নবুওয়াতের দাবি করে বসেছে। এ অপরাধেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
৫. খলিফা মনসুরের পর খেলাফতের আসন অলংকৃত করেছেন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ আল-মাহদি রাহিমাহুল্লাহ [১২৭-১৬৯ হি.]। তিনি অবশিষ্ট বাতিনিদেরকে মূলোৎপাটন করার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। এবং তাদের অনেককে মৃত্যুর ঘাটের পানি পান করিয়েছেন। (৩)
৬. খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ [১৭৯-২২৭ হি.] নিজ খেলাফতকালে ইবনে আবিল গারাকিরকে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যাওয়ার কারণে হত্যা করেছেন। (৪)
কাজি ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ [৪৯৬-৫৪8 হি.] 'শিফা' কিতাবে প্রচুর সংখ্যক মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের আলোচনার পর লিখেছেন,
وَفَعَلَ ذَلِكَ غَيْرُ وَاحِدٍ مِنَ الْخُلَفَاءِ وَالمُلُوكِ بِأَشْبَاهِهِمْ، وَأَجْمَعَ عُلَمَاءُ وَقْتِهِمْ عَلَى صَوَابٍ فِعْلِهِمْ.
অনেক খলিফা ও বাদশাহ মুরতাদদের সাথে অনুরূপ আচরণ করেছেন। এবং তাঁদের যুগের আলেমগণ তাঁদের কাজটি শরিয়তের অনুকূল হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। (১)
এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সকল খলিফার ইতিহাস ও তাঁদের মুরতাদ হত্যার সকল ঘটনা উল্লেখ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং কয়েকজন খলিফার কর্মপদ্ধতির নমুনা পেশ করে 'পয়গামে সুল্ল্হ'-এর সম্পাদককে দেখানো উদ্দেশ্য, আজ নেয়ামতুল্লাহ মির্জায়ির হত্যা উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের যেসকল আপত্তি কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, তা দ্বারা প্রকৃতপক্ষে শুধু সকল মুসলিম খলিফা ও ইসলামি খেলাফতকে দোষারোপ করা হচ্ছে না, উপরন্তু তা খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতের বিরুদ্ধে অর্থহীন অভিযোগ, এবং কোরআন মাজিদ ও নববি হাদিসের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপনও বটে। নাউযুবিল্লাহ।
টিকাঃ
১. ফাতহুল বারি, ৬: ৪৫৫, তারিখুল খোলাফা, পৃ. ১৫০
২. ফাতহুল বারি, ১২: ২৩৯
১. কাজি ইয়াজ প্রণীত 'শিফা', পৃ. ২
২. ফাতহুল বারি, ১২ : ২৩৯
৩. ফাতহুল বারি।
৪. শিফা, পৃ. ২৮২
১. মিশরে প্রকাশিত 'শিফা', পৃ. ২৮২