📄 এক. প্রাচীন পাণ্ডুলিপির বিদ্যমানতা
ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ এর সাক্ষী। প্রথম যুগের উলামা কর্তৃক এসব গ্রন্থের ব্যাখ্যা এগুলোর প্রমাণিকতার পরিচায়ক। যেমন— ইমাম তহাবি (৩২১ হি.) তাঁর আকিদাতে ইমাম আজম এবং তাঁর দুই সঙ্গীর আকিদা লিখেছেন। ইমাম আজম ও তহাবির মাঝে ব্যবধান এক শতাব্দের বেশি; অথচ আকিদাহ তহাবিয়্যাহতে সংকলিত ইমাম আজমের আকিদার উৎস কী সেটা তহাবি স্পষ্ট করেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়, তিনি এসব গ্রন্থকে ইমাম আজমের প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য করেছেন এবং এগুলো থেকেই তাঁর আকিদা সংগ্রহ করেছেন। এটা অনুমানভিত্তিক দাবি নয়, বরং আমাদের সামনে বিদ্যমান ইমাম আজমের পাঁচটি গ্রন্থ আর আকিদাহ তহাবিয়্যাহ সামনে রেখে তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাওহিদ ও ঈমানের সংজ্ঞায়ন ও হাকিকত, আল্লাহর যাত ও সিফাত, রিসালাত, কুরআন, এমনকি কিয়ামতের আলামতসমূহের আলোচনার ক্ষেত্রে সচেতন পাঠকের কাছে আকিদাহ তাহাবিয়্যাহকে ইমাম আজমের গ্রন্থসমূহের এবং বিশেষত হাম্মাদ বর্ণিত আল-ফিকহুল আকবারের সারসংক্ষেপ ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। হ্যাঁ, সময়ের ব্যবধান, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদির কারণে ইমাম তহাবি এসব গ্রন্থের শব্দ ও বাক্য হুবহু সংরক্ষণ করেননি। কিন্তু তিনি যে উস্তায-মাশায়েখের পাশাপাশি মৌলিকভাবে এগুলোকে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য ধরে এগুলোর উপর নির্ভর করেছেন, সেটা সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত সত্য। একইভাবে আবুল লাইস সমরকন্দি (৩৭৩ হি.) আল-ফিকহুল আবসাতের ব্যাখ্যা লিখেছেন, যা ইমাম মাতুরিদির (৩৩৩ হি.) ব্যাখ্যা হিসেবে প্রসিদ্ধ। উক্ত ব্যাখ্যাটি ইমাম মাতুরিদির ধরা হোক কিংবা সমরকন্দির ধরা হোক, এটা আল-ফিকহুল আবসাতের বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে। পাশাপাশি পঞ্চম শতাব্দের আগে এসব গ্রন্থের অস্তিত্ব নেই এমন ধারণা নাকচ করে।
📄 দুই. সনদের প্রামাণ্যতা
এসব গ্রন্থের সনদ নিয়ে কথা বললেও এগুলোর গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণিত হয়। নিম্নে আমরা এগুলোর সনদ উল্লেখপূর্বক এ ব্যাপারে দিক-নির্দেশনামূলক কিছু সংক্ষিপ্ত জরুরি কথা বলছি।
আল-ফিকহুল আকবার : নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া → মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল আর রাযি → ইসাম ইবনে ইউসুফ বলখি → হাম্মাদ ইবনে আবু হানিফা → আবু হানিফা।
আল-ফিকহুল আবসাত : এক. আবুল মুঈন মাইমুন নাসাফি → হুসাইন ইবনে আলি আল-কাশগরি → নাসরান ইবনে নসর আল-খাতালি → আলি ইবনে আহমদ আল-ফারেস → নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া → আবু মুতি বলখি → আবু হানিফা।
দুই. আবুল মুঈন নাসাফি → ইয়াহইয়া ইবনে মুতাররিফ বলখি → আবু সালেহ মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন সমরকন্দি → আবু সাইদ সাদান ইবনে মুহাম্মাদ আল-বুসতি → আলি ইবনে আহমদ আল-ফারেস → নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া → আবু মুতি বলখি → আবু হানিফা। ইসফারায়েনি (৪৭১ হি.) এটার সনদকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম : এক. আবু মুহাম্মাদ আল-হারেসি আল-বুখারি → মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ → হাসান ইবনে সালেহ → আবু মুকাতিল সমরকন্দি → আবু হানিফা।
দুই. আবু মনসুর মাতুরিদি → আবু বকর জুযজানি → আবু সুলাইমান জুযজানি ও মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি → আবু মুতি বলখি ও ইসাম ইবনে ইউসুফ বলখি → আবু মুকাতিল সমরকন্দি → আবু হানিফা।
আল-ওয়াসিয়্যাহ : আবুল মুঈন নাসাফি → আবু তাহের মুহাম্মাদ ইবনুল মাহদি → ইসহাক ইবনে মনসুর → আহমদ ইবনে আলি সুলাইমানি → হাতেম ইবনে আকিল জাওহারি → মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ → আবু ইউসুফ → আবু হানিফা।
আর-রিসালাহ : আবুল মুঈন নাসাফি → আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মুতাররিফ বলখি → আবু সালেহ মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন সমরকন্দি → আবু সাইদ সাদান ইবনে মুহাম্মাদ আল-বুসতি → আবুল হাসান আলি ইবনে আহমদ আল-ফারেস → নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া বলখি → মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ → আবু ইউসুফ → আবু হানিফা।
সনদে থাকা এসব ব্যক্তিদের প্রত্যেকের জীবনচরিত এবং তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন আলেমের বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাব না আমরা। কারণ, এ গ্রন্থে আমরা ইমাম আজমের আকিদা বর্ণনার ইচ্ছা করেছি। ঐতিহাসিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং হানাফি উলামায়ে কেরামের প্রতি তাদের প্রতিপক্ষের জুলুমের ফর্দ বর্ণনার ইচ্ছা নেই আমাদের। তবুও প্রসঙ্গক্রমে পিছনে আমরা ইমাম আজম রহ.-এর উপর প্রতিপক্ষের সীমালঙ্ঘনের কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছি। বিজ্ঞ পাঠক অনুভব করবেন—যদি ইমাম আজমের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য এমন থাকে, তবে তাঁর শাগরেদদের ব্যাপারে কেমন হতে পারে!
ফলে তারা ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, যুফার, হাসান ইবনে যিয়াদ লু'লুই, আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দি, ইউসুফ ইবনে খালেদ আস-সামতি, পুত্র হাম্মাদ-সহ তাঁর প্রাথমিক স্তরের ছাত্রগণ, মুহাম্মাদ ইবনে শুজা এবং পৌত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ-সহ তাঁর পরবর্তী স্তরের ছাত্রগণ কাউকে ছাড় দেননি। পার্থক্য এটুকু যে, কাউকে স্রেফ ‘দুর্বল’ বলেছেন, আর কাউকে সরাসরি ‘মিথ্যুক’, ‘খেয়ানতকারী’-সহ বিভিন্ন গালিগালাজে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তারা আবু মুতি বলখিকে জাহমি ও মুরজিয়াদের প্রধান বানিয়েছেন। আবু মুকাতিল সমরকন্দিকে হাদিস জালকারী ও মিথ্যুক বানিয়েছেন। ইসমাইল ইবনে হাম্মাদকে মুতাযিলা ঘোষণা করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে শুজাকে মুতাযিলা ও জাহমি আখ্যা দিয়েছেন। ইউসুফ ইবনে খালেদ সামতিকে সর্বসম্মতিক্রমে মিথ্যুক বানিয়েছেন। বরং তারা কাউকে কাউকে তো মুতাযিলি ও কাফের সাব্যস্ত করেছেন।
ইমাম আজম এবং তাঁর শাগরেদ, অন্যকথায়, হানাফি ফকিহদের প্রতি মুহাদ্দিসদের এই বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি যুগের পর যুগ অব্যাহত থেকেছে। আল্লামা ইবনে আবদিল বার (৪৬২ হি.) লিখেন, ‘...বিপরীতে সকল আহলে হাদিস আবু হানিফা ও তাঁর সঙ্গী-অনুসারীদের শত্রুদের মতো।’ শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি লিখেন, ‘আরেক ধরনের সমালোচনা হলো ফিকহি মাসআলার শাখাগত বিশ্লেষণ ও প্রকারভেদ বের করা। এটা ব্যক্তির ইজতিহাদি শক্তি ও দূরদৃষ্টির প্রমাণ। এটা কী করে সমালোচনার কারণ হয়? ... মোটকথা, শত্রুতার ভিত্তিতে কেউ কারও সমালোচনা করলে তাতে সমালোচিত ব্যক্তি দোষী হবেন না, যেমন ভ্রান্ত লোকদের আহলে সুন্নাতের সমালোচনা। একইভাবে কিছু ... ব্যক্তির আমাদের বড় বড় আলেমের সমালোচনা। এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আমরা জানি সেটা গোঁড়ামি ও শত্রুতার দোষে দুষ্ট।’ সদরুল ইসলাম বাযদাবি লিখেন, ‘কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আহলে হাদিসদের বক্তব্য—তাঁর হাদিস গ্রহণ করা হবে না, কারণ, সে যয়িফ—ইত্যাদি উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করা হবে না। কী কারণে যয়িফ, সেটা নির্ধারণের আগে এমন ব্যক্তির হাদিস বর্জন করা হবে না। কারণ, আহলে হাদিস তথা মুহাদ্দিসদের অভ্যাস হলো একে অন্যের সমালোচনা করা, বিশেষত ফকিহদের ব্যাপারে মন্দ বলা। তারা মনে করেন, ফকিহগণ হাদিস মানেন না। অথচ ফকিহগণ কখনোই অকারণে বিশুদ্ধ হাদিস বর্জন করেন না।’
এই ধারণাপ্রসূত অভিযোগের কারণে আজ সহস্র বছর পরও বর্তমান সময়ে তাদের অনুসারী দাবিদাররা ইমাম আজম এবং তাঁর শাগরেদদের শানে জবান দরাজি অব্যাহত রেখেছে, তাদের জাহেল আখ্যা দিচ্ছে। যফর আহমদ উসমানি রহ. এই দুঃখজনক চিত্র দেখে প্রাচীন আরব কবি নাবেগা যুবইয়ানির স্রেফ একটি পঙ্ক্তি দিয়েই নিজের মনোবেদনা উল্লেখ করেন : ( وَلاَ عَيْبَ فِيهِمْ غَيْرَ أَنَّ سُيُوفَهُمْ، بهন فلول من قراع الكتائب) অর্থাৎ, ‘দুশমনের মাথা কাটতে কাটতে তাদের তরবারি ভোঁতা হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের কোনো দোষ নেই।
ইমামের উল্লিখিত শাগরেদদের প্রত্যেকে আহলে সুন্নাতের বড় বড় আলেম এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। সুতরাং স্বাভাবিক মূলনীতি অনুযায়ী যদি ইমাম আজমের এসব ছাত্রের ব্যাপারে সেসব বক্তব্য গ্রহণ করা হয়, তবে ইমাম আজমের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা হবে। আর যদি ইমাম আজমের ক্ষেত্রে বর্জন করা হয়, তবে তাঁর ছাত্রদের ক্ষেত্রেও বর্জন করা হবে। কিন্তু সেটা না করে যদি ইমাম আজমের সমুন্নত মর্যাদা এবং উম্মাহকেন্দ্রিক স্বীকৃতির কারণে তাঁর ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের সমালোচনা পরিহার করা হয়, বিপরীতে একই ব্যক্তি কর্তৃক একই প্রেক্ষিতে তাঁর ছাত্রদের সমালোচনা গ্রহণ করা হয়, তবে এটা কোনো যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ কর্মপদ্ধতি হলো না। অথচ দুঃখজনকভাবে তা-ই ঘটেছে। ফলে প্রতিপক্ষের কথার উপর ভিত্তি করে অনেক হানাফি আলেম ইমাম আজমের শাগরেদদের দুর্বল ভেবেছেন, এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতার ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ফলে সনদে বিদ্যমান ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের মতামত পড়ার সময় এসব বিষয় মনে রাখা জরুরি। আমরা দাবি করছি না যে, সনদে বিদ্যমান এসব হানাফি আলেম সকলে সত্যবাদিতা, ন্যায়-ইনসাফের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চূড়ায় ছিলেন কিংবা ভুল-বিচ্যুতি থেকে একেবারে নিষ্পাপ ছিলেন। কিন্তু আমরা প্রতিপক্ষের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে তাদের ‘মিথ্যুক’, ‘খেয়ানতকারী’, ‘পরিত্যক্ত’, ‘মুতাযিলা’, ‘জাহমিয়্যাহ’, ‘হাদিস জালকারী’, ‘সুন্নাহর শত্রু’ ইত্যাদি মানতেও প্রস্তুত নই। কারণ, নির্ভরযোগ্য সূত্রে তাদের ‘তাদিল’ (সামগ্রিক সত্যনিষ্ঠতা) প্রমাণিত। উপরন্তু আকিদার শাখাগত মাসাইল, সিয়ার, তারাজিম ও তাবাকাত তথা জীবনচরিত ও ইতিহাসের গ্রন্থে আমরা হাদিসের মূলনীতি প্রয়োগের যথার্থতা স্বীকার করতেও রাজি নই। যদি এসব গ্রন্থে হাদিস যাচাই-বাছাইয়ের কঠোর মূলনীতি প্রয়োগ করা হয়, তবে কেবল ইমামের গ্রন্থ নয়, অতীতের অধিকাংশ গ্রন্থই বাতিল ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হবে। উপরন্তু মুহাদ্দিসদের বাইরে জীবনী সংরক্ষণের প্রচলনও তত বিস্তৃত ছিল না। ফলে জারহ-তাদিলের (হাদিস বর্ণনাকারীদের ভালোমন্দ নিরূপণ) নীতি এখানে প্রয়োগ করতে গেলে অনেককে খুঁজে পাওয়া যাবে না, আবার অনেককে অগ্রহণযোগ্য বলতে হবে। এভাবে এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতা নাকচ হয়ে যাবে। অথচ এসব গ্রন্থ সেসব ইমামের সামগ্রিক আকিদাই বহন করছে। তাই এক্ষেত্রে সনদের চেয়ে বইয়ের মাঝে থাকা বক্তব্যের সাক্ষ্য ও সামঞ্জস্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
টিকাঃ
১৬৬. নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া বলখি। আবু সুলাইমান জুযজানির শাগরেদ। ২৬৮ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন।
১৬৭. মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি। ‘রাই’ শহরের কাযি। ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর শীর্ষ পর্যায়ের শাগরেদ। আবু মুতি বলখিরও শাগরেদ। কেউ কেউ তাকে যয়িফ (দুর্বল) বলেছেন। কিন্তু সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ২৪৮ হিজরিতে ওফাত লাভ করেছেন।
১৬৮. ইসাম ইবনে ইউসুফ বলখি। ইমাম আজমের শাগরেদের শাগরেদ। অর্থাৎ, তিনি হাম্মাদ, আবু মুকাতিল সমরকন্দি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক-সহ ইমাম আজমের একাধিক ছাত্রের ছাত্র। হানাফিদের ইমাম পর্যায়ের ফকিহ ও মুহাদ্দিস। ২১০ (/২১৫) হিজরিতে ওফাত লাভ করেন। রীতিমতো তাকেও কেউ কেউ যয়িফ বলেছেন। সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।
১৬৯. ইমাম আজমের সন্তান ও শাগরেদ হাম্মাদ ইবনে আবু হানিফা। ১৭৬ হিজরিতে ওফাত লাভ করেছেন। তাকেও কেউ কেউ যয়িফ বলেছেন। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য ধর্তব্য নয়।
১৭০. আবু মুতি হাকাম ইবনে আবদুল্লাহ বলখি। ইমাম আজমের শীর্ষস্থানীয় শাগরেদদের একজন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর উপর মারাত্মক অপবাদ আরোপ করেছেন। তাঁকে মুরজিয়া-সম্রাট, জাহমি, মিথ্যুক এবং হাদিস জালকারী আখ্যা দিয়েছেন; অথচ যাহাবি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. তাঁকে তাঁর ইলম ও দ্বীনের কারণে সম্মান করতেন। একজন মুরজিয়া-সম্রাট ও জাহমির আবার কীসের ইলম ও দ্বীনদারি? ইবনুল মুবারকের মতো মানুষ তাঁকে কেন সম্মান করবেন? বোঝা গেল, আবু মুতির ব্যাপারে এসব বক্তব্য আর ইমাম আজমের ব্যাপারে তাদের বক্তব্যের মাঝে খুব একটা ফারাক নেই। এ মহান ইমাম ১৯৫ হিজরিতে ওফাত লাভ করেন।
১৭১. দেখুন: আত-তাবসির (১৮৪)।
১৭২. আবু মুকাতিল হাফস ইবনে সালম সমরকন্দি। ইমাম আজমের প্রথম সারির প্রসিদ্ধ শাগরেদদের একজন। ইমামের যুগে সমরকন্দবাসীর ইমাম ছিলেন। ইমামের অন্যান্য শাগরেদের মতো তিনিও হাদিস নকলকারীদের কাছে ‘মিথ্যুক’ এবং ‘হাদিস জালকারী’ হিসেবে পরিচিত; বরং কেউ কেউ তাঁকে পাগলের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা নাজায়েয বলেছেন! এগুলোর ব্যাপারে আমাদের সেই বক্তব্য যে বক্তব্য ইমামের ব্যাপারে আমরা বলেছি। বাযযাযি তাকে সমরকন্দের ইমাম বলেছেন। আবু ইয়ালা খলিলি বলেছেন, ‘তিনি ইলম ও সত্যবাদিতার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর যুগে তিনি ফাতাওয়া দিতেন। ইলম ও ফিকহের ক্ষেত্রে তাঁর উচ্চ মর্যাদা ছিল। হাদিস সংগ্রহের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন! [আল ইরশাদ : ৩/৯৭৫] এমন একজন ইমামকে তারা ‘মিথ্যুক’ আখ্যা দিয়েছেন! ২০৮ হিজরিতে তিনি ওফাত লাভ করেন।
১৭৩. আবু বকর জুযজানি ইমাম মাতুরিদির শায়খ এবং ইমাম আজমের তৃতীয় স্তরের শাগরেদ। অর্থাৎ, আবু বকর জুযজানির শায়খ হচ্ছেন আবু সুলাইমান জুযজানি। আবু সুলাইমান জুযজানির শায়খ হচ্ছেন আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.।
১৭৪. আবু সুলাইমান জুযজানি ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর প্রথম সারির শাগরেদ। তিনি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকেরও শাগরেদ।
১৭৫. এটা আল্লামা কাওসারি রহ. উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এর শেষাংশ জটিল ও সন্দেহপূর্ণ। খুব সম্ভবত বিশুদ্ধতর হলো : ইসাম ইবনে ইউসুফ→ আবু মুতি বলখি ও আবু মুকাতিল সমরকন্দি→ আবু হানিফা। কারণ, আবু মুতি ও আবু মুকাতিল দুজনই ইমাম আজম রহ.-এর সরাসরি শাগরেদ। বিপরীতে ইসাম দ্বিতীয় স্তরের তথা শাগরেদের শাগরেদ। তা ছাড়া, কিছু সনদে সরাসরি আবু মুতি→ আবু হানিফা উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং তিনি ও ইসাম একই স্তরের হবেন এবং আবু মুকাতিল থেকে গ্রহণ করবেন এটা অনেকটা অসম্ভব। বরং ইসাম আবু মুতি ও আবু মুকাতিল দুজন থেকে নিয়েছেন এটার সম্ভাবনা অধিক। আল্লাহ ভালো জানেন।
১৭৬. মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ। ইমাম আজমের দ্বিতীয় স্তরের তথা আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর শাগরেদ। ২৩৩ হিজরিতে ওফাত লাভ করেন।
১৭৭. বিস্তারিত দেখুন: আল-কামিল, ইবনে আদি (৭/৫৫০-৫৫১)। আহওয়ালুর রিজাল, আবু ইসহাক জুযজানি (১১৭-১২০)। এগুলোর খশুনে দেখুন: ইমাম কাওসারির আল-ইমতা (৬২-৮০, ৮৮-১১০)। যফর আহমদ উসমানির ‘আবু হানিফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসুন’ (মুকাদ্দিমাতু ই’লায়িস সুনান)। শায়খ আবদুর রশিদ নুমানির ‘মাকানাতুল ইমাম আবি হানিফা ফিল হাদিস, তাহকিক: আল্লামা আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.
১৭৮. আল-ইনতিকা (৩০১)।
১৭৯. উসুলুস সারাখসি (২/১১)।
১৮০. মারিফাতুল হুজাজিশ শরইয়্যাহ (১৩২)।
১৮১. কাওয়ায়িদু ফি উলুমিল হাদিস (৪২৫)।
১৮২. দেখুন: আল-ইমতা (৮৯)। লামাহাতুন নাযার (২২-২৪)।
📄 তিন. উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্যতা
এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতার আরেকটি মজবুত দলিল হলো এগুলোর ব্যাপারে সহস্রাধিক বছরব্যাপী বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য। হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দ থেকেই বিভিন্ন আলেম ও গবেষকের গ্রন্থে আবু হানিফা রহ.-এর প্রতি এসব গ্রন্থ সম্পৃক্ত করা ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। উপরে ইমাম তহাবি, আবু মনসুর মাতুরিদি এবং আবুল লাইস সমরকন্দির ব্যাপারে বলা হয়েছে।
শাইখুল মুতাকাল্লিমিন আবু বকর ইবনে ফওরক (৪০৬) ইমামের ‘আল-আলিম ওয়াল-মুতাআল্লিম’ পুস্তিকার ব্যাখ্যা লিখেছেন যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থের শুরুতে তিনি এটাকে ইমাম আজমের কিতাব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবনুন নাদিম (৪৩৮ হি.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফিহরিস্ত’ (৩৭৭ হি.)-এ ইমাম আজমের দিকে একাধিক গ্রন্থ সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি লিখেন, “আবু হানিফা বেশকিছু গ্রন্থ রেখে গিয়েছেন। তন্মধ্যে ‘আল-ফিকহুল আকবার’, ‘আর-রিসালাহ ইলাল বাত্তি’, মুকাতিলের বর্ণনায় ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ এবং ‘আর-রাদ্দু আলাল কাদারিয়্যাহ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।” ‘আল ফিহরিস্ত’ লেখা হয়েছিল চতুর্থ হিজরিতে। সুতরাং ‘পঞ্চম হিজরির আগে এসব গ্রন্থের অস্তিত্ব নেই’ এটা আরেকবার নাকচ হলো।
আবদুল কাহের বাগদাদি (৪২৯ হি.) ইমামের বিভিন্ন গ্রন্থের আলোচনা করেছেন। তিনি তাঁর ‘উসুলুদ্দিন’ গ্রন্থে লিখেন, “ফকিহদের মাঝে প্রথম মুতাকাল্লিম হলেন আবু হানিফা ও শাফেয়ি। কাদারিয়্যাহদের খণ্ডনে আবু হানিফার একটি গ্রন্থ রয়েছে, যার নাম রেখেছেন ‘আল-ফিকহুল আকবার।’ তাঁর একটি রিসালাহও রয়েছে, যা তিনি আহলে সুন্নাতের ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে’ নীতির সমর্থনে লিখেছেন।”
আবুল মুজাফফর আল-ইসফারায়েনি (৪৭১ হি.) লিখেন, “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ি, মালেক, আওযায়ি, দাউদ, যুহরি, লাইস ইবনে সাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হানযালি.... আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, যুফার, আবু সাওর প্রমুখের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। হিজায, শাম, ইরাক, খোরাসান, মা-ওয়াগাউন-নাহারসহ সকল আলেমের আকিদা এটা। এটাই সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনের আকিদা। যে ব্যক্তি যাচাই করতে চায়, সে যেন আবু হানিফা রহ.-এর গ্রন্থগুলো দেখে। যেমন : ‘কিতাবুল ইলম’ (আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম?), ‘আল-ফিকহুল আকবার’ [বর্তমানে আল-ফিকহুল আবসাত নামে প্রসিদ্ধ], যেটা আবু হানিফা → আবু মুতি → নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া থেকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমার কাছে এসে পৌঁছেছে, ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ যেটাকে তিনি আবু আমর উসমান আল-বাত্তির কাছে লিখেছেন...।” যদিও ইসফারায়েনির তথ্যের মাঝে কিছু বিভ্রাট রয়েছে, কিন্তু মৌলিক বিষয় যে প্রমাণিত, আমাদের সেটা দেখানো উদ্দেশ্য।
ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘উসুল’-এর শুরুতে লিখেন, “ইলম দুই প্রকারের। এক. আল্লাহর তাওহিদ ও সিফাতের ইলম। দুই. ফিকহ, শরিয়ত ও হালাল-হারামের ইলম। প্রথম প্রকারের ইলমের ক্ষেত্রে একমাত্র বিশুদ্ধ পদ্ধতি হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিদআত বর্জন করা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথে অবিচল থাকা, যে পথে ছিলেন সাহাবা, তাবেয়িন ও সালাফে সালেহিন। এ পথেই অটল ছিলেন ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং তাদের সকল শাগরেদ। ইমাম আবু হানিফা রহ. ইলমে তাওহিদের ক্ষেত্রে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ নামে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন। তাতে তিনি (আল্লাহর) সিফাত ‘ইসবাত’ করতে বলেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’, ‘রিসালাহ’ ইত্যাদি।”
হাফিজুদ্দিন নাসাফি (৭১০ হি.) ইমাম আজমের ‘আল-ফিকহুল আকবার’, ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ ও ‘আর-রিসালাহ’ তিনটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন। আবদুল আযিয বুখারি (৭৩০ হি.) উসুলুল বাযদাবির ব্যাখ্যায় আল-ফিকহুল আকবার ও আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম দুটো গ্রন্থই তাঁর কাছে আছে বলে জানিয়েছেন এবং তিনি এসব গ্রন্থ থেকে একাধিক মাসআলার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মক্কির (৫৬৮) বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, খলিফা মামুনের কাছেও ইমাম আজমের কিছু কিতাব পৌঁছেছিল। শায়খ ইবনে তাইমিয়্যাহও (৭২৮ হি.) ‘আল-ফিকহুল আকবার’ (আবু মুতির আল-ফিকহুল আবসাত)-কে ইমাম আজমের গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবনে কুতলুবুগা (৮৭৯ হি.) আবু মুতি বলখিকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’- (যা মূলত আবসাত) এর বর্ণনাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এভাবে যুগে যুগে বিভিন্ন মাযহাব-মাসলাক নির্বিশেষে মুহাক্কিক আলেমগণ এগুলোকে ইমাম আজমের গ্রন্থ বিবেচনা করেছেন এবং সেগুলো থেকে নিজ রচনায় উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
বরং আবুল লাইস সমরকন্দি থেকে শুরু করে আতা ইবনে আলি জুযজানি (৫৬৫ হি. পূর্ব), আকমালুদ্দিন বাবিরতি (৭৮৬ হি.), ইলিয়াস সিনোবি (৮৯১ হি.), বাহাউদ্দিন যাদাহ রাহমাভি (প্রায় ৯৫২ হি.), আবুল মুনতাহা মাগনিসাভি (১০০০ হি.), মোল্লা আলি কারি (১০১৪ হি.) পর্যন্ত বড় বড় হানাফি মুহাক্কিক এসব কিতাবের ব্যাখ্যা লিখেছেন। এর দ্বারাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা এগুলো এবং বিশেষত আল-ফিকহুল আকবার ও আল-ফিকহুল আবসাত দুটোকেই ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কারণ, এমন না হলে তারা এসব গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখতেন না। ফলে সেই প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত হানাফি আলেমগণ এসব কিতাবকে ইমাম আজমের আকিদার সংকলন হিসেবেই দেখে আসছেন, প্রচার-প্রসার করছেন, শিখছেন এবং মানুষকে শেখাচ্ছেন। বরং আল্লামা মাগনিসাভি স্পষ্টভাবে লিখেন, ‘আল-ফিকহুল আকবার গ্রন্থটি, যা ইমাম আজম লিখেছেন, একটি বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কিতাব।’ তিনি আল-ফিকহুল আকবারের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রন্থের প্রামাণ্যতাও স্বীকার করেছেন।
এভাবে যুগের পর যুগ হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি-সহ সকল ধারার আলেম এসব গ্রন্থকে ইমাম আজম রহ.-এর গ্রন্থ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন, এগুলোর ব্যাখ্যা লিখেছেন এবং চর্চা করেছেন। সমকালীন যুগের আগে কেউ সামগ্রিকভাবে এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন—এমন কোনো বক্তব্য অধমের চোখে পড়েনি। আধুনিক যুগে এসে কিছু প্রাচ্যবিদ এসব গ্রন্থকে ইমামের বলে মেনে নিতে সংশয় সৃষ্টি ও প্রকাশ করেছেন এবং কিছু মুসলিম আলেম সেটার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। ফলে এসব গ্রন্থের উপর আপত্তি নিতান্তই অধুনা সৃষ্ট, যার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
হ্যাঁ, তাদের আগে একদল মানুষ এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতা নাকচ করেছেন, কিন্তু তারা আহলে সুন্নাতের কেউ নন, বরং মুতাযিলা সম্প্রদায়। তদুপরি সেটাও ইলমি দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং ইমামের নামে তাদের নিজস্ব মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার হীন উদ্দেশ্যে তারা এই কাজ করে। বাযযাযি (৮২৭ হি.) লিখেন, ‘কেউ বলতে পারে আবু হানিফার লেখা কোনো গ্রন্থ নেই। আমরা বলব, এটা মুতাযিলাদের দাবি। তারা ইমামকে তাদের তথা মুতাযিলি মাযহাবের অনুসারী দাবি করত। অথচ ইমামের এসব গ্রন্থে, বিশেষত আল-ফিকহুল আকবার এবং আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিমে, মুতাযিলাদের খণ্ডনে এবং আহলে সুন্নাতের আকিদা প্রতিষ্ঠায় একাধিক বক্তব্য রয়েছে। ফলে তাদের এই মিথ্যা দাবি টিকিয়ে রাখতে তারা এসব গ্রন্থ ইমামের বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আবু হানিফা (আস-সগির) বুখারির বলে প্রচার করে। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কারণ, আমি শামসুল মিল্লাহ কারদারির নিজ হাতের লেখায় এই দুটো কিতাব দেখেছি এবং তিনি তাতে এ দুটোকে ইমাম আজমের কিতাব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অসংখ্য মাশায়েখ এ ব্যাপারে একমত। ’
টিকাঃ
১৮৩. দেখুন: শরহুল আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৩-২৪)।
১৮৪. দেখুন: আল-ফিহরিস্ত (২৫১)।
১৮৫. দেখুন: উসুলুদ্দিন (৩০৮)। তাকদির অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
১৮৬. আত-তাবসির ফিদ-দ্বীন (১৮৪)।
১৮৭. দেখুন: উসুলুল বাযদাবি (৩)।
১৮৮. দেখুন: কাশফুল আসরার শরহুল মানার (১/৭)।
১৮৯. দেখুন: কাশফুল আসরার শরহু উসুলিল বাযদাবি (১/১৭-১৮)।
১৯০. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৩১০-৩১১)।
১৯১. আল-ফাতাওয়া আল-হামাবিয়্যাহ আল-কুবরা (৩১৮)।
১৯২, তাজুত তারাজিম (৩৩১)।
১৯৩. যেমনটা পিছনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, উক্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থটি ইমাম মাতুরিদির নামে প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু সেটা সঠিক হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাতে আশআরিদের বিপক্ষে অনেক খণ্ডন রয়েছে। অথচ মাতুরিদি ও আশআরি দুজন সামসময়িক ছিলেন। দুজন পৃথিবীর দুই প্রান্তে ছিলেন। বোঝা গেল, এটা পরবর্তী সময়ে কারও লেখা। তা ছাড়া, ইমাম মাতুরিদির গ্রন্থতালিকার কোথাও এই ব্যাখ্যাগ্রন্থের কথা পাওয়া যায় না। বিপরীতে উক্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ আবুল লাইস সমরকন্দির হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
১৯৪. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১০২)।
১৯৫. দেখুন: মানাকিব, বাযযাযি (১২২)। ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, যাবিদি (২/১৮)।
📄 চার. এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের আকিদার ঐতিহাসিক দলিল
আমরা যদি তাদের আপত্তির সঙ্গে একমত হয়ে এই গ্রন্থগুলো সরাসরি ইমাম আজম রহ.-এর লেখা নয় বলে মেনে নিই, তবুও এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, এগুলোতে যেসব আকিদা রয়েছে, সেগুলো সামগ্রিকভাবে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা। অর্থাৎ, হয়তো আমরা বলব, স্বয়ং ইমাম রহ. এসব গ্রন্থ নিজের হাতে লিখেছেন, অথবা বলব, তিনি তাঁর ছাত্রদের ক্লাসে এবং বিভিন্ন মজলিসে এগুলো বলেছেন, লিখিয়েছেন এবং ছাত্ররা কিংবা ছাত্রদের ছাত্ররা পরবর্তীকালে এগুলো সংকলন করেছেন। এই উভয় অবস্থাতেই ফলাফল এক। অর্থাৎ, তাঁর ছাত্ররা কিংবা ছাত্রের ছাত্ররা সংকলন করলেও এগুলোকে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর গ্রন্থ বলা যাবে। কারণ, সে সময়ে রচিত বা সংকলিত অধিকাংশ গ্রন্থের সংকলনের গল্পই এমন। বরং ছাত্ররা সংকলন করার কারণে যদি তাঁর আকিদা বলা না যায়, তবে তো ফিকহের ক্ষেত্রেও ইমাম আজমের ফিকহ এবং হানাফি মাযহাব বলতে কিছু থাকে না। কারণ, তিনি ফিকহ বিষয়েও নিজের হাতে লেখা কোনো গ্রন্থ রেখে যাননি। তাঁর শাগরেদদের লেখা গ্রন্থ এবং তাদের মতামত থেকেই ইমামের মত জানতে পারি আমরা।
উপরন্তু যদি আমরা আক্ষরিক অর্থে তাঁর গ্রন্থ নাও বলতে পারি, তথাপি এগুলোতে বিদ্যমান বিষয়সমূহকে তাঁর আকিদা বলার মাঝে বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কেউ মতভেদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। কারণ, তাওহিদ ও সিফাতের ক্ষেত্রে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গি, তাকদিরের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানের সংজ্ঞার্থ, হাকিকত ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইমামের প্রতিষ্ঠিত মাযহাবের বাস্তব ও পুঙ্খানুপুঙ্খ রেকর্ড এসব গ্রন্থ। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যেটা ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে উম্মাহর কাছে স্বীকৃত নয়। এগুলোতে এমন কোনো বক্তব্য নেই যা পরবর্তী হানাফি ফুকাহা এবং উলামায়ে কেরাম আবু হানিফার মাযহাব হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হ্যাঁ, কিছু মাসআলাতে তারা ইমামের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু সেটা ইমামের আকিদা হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে নয়, বরং ইমামের বক্তব্য হিসেবে মেনে নেওয়ার পরেই। উপরন্তু এসব গ্রন্থের পারস্পরিক আলোচ্য বিষয়ের মাঝে মিল-মিছিল বেশ বিস্ময়কর ও ইতিবাচক। অর্থাৎ, প্রায় প্রত্যেকটি মাসআলাতে আলোচ্য পাঁচটি গ্রন্থকে আমরা একে অন্যের পরিপুরক দেখি। ফলে এগুলো যে একই ব্যক্তির আকিদা ও আদর্শ সেটা বুঝতে দূরদর্শী মানুষের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এমনকি আকিদার বাইরে হানাফি মাযহাবের ফিকহি মুসতানাদ গ্রন্থগুলো, ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত হাদিসের মাসানিদগুলো—সবগুলোতে বর্ণিত ইমামের বক্তব্য অত্যন্ত কাছাকাছি। একই উৎস থেকে উৎসারিত।
তা ছাড়া, এগুলোর বাইরের আরও একাধিক প্রাচীন সূত্র ইমামের দিকে সামগ্রিকভাবে এক ও অভিন্ন আকিদাই সম্পৃক্ত করে, যেমন ইমাম তহাবি (৩২১ হি.)-এর ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’। সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ উসতাওয়াবি নিশাপুরি (৪৩২ হি.)-এর ‘আল-ইতিকাদ’। এগুলো ইমামের প্রায় দেড়-দুইশো বছর পরে লেখা হলেও উভয় গ্রন্থের বিষয়বস্তু অত্যন্ত কাছাকাছি এবং ইমাম আজমের দিকে নিসবতকৃত উপরের পাঁচটি গ্রন্থের সঙ্গে এগুলোর মৌলিক কোনো সংঘাত তো নেই-ই, উপরন্তু এসব গ্রন্থের মিল-মিছিল দেখলে যে কাউকে বিস্মিত হতে হয়; বরং তহাবিতে বর্ণিত আকিদা এবং ‘আল-ইতিকাদে’ বর্ণিত ইমাম আজমের শাগরেদদের দিকে নিসবতকৃত বক্তব্যগুলো দেখলে যে কারও বুঝে আসবে, ইমামের পাঁচটি গ্রন্থে বর্ণিত আকিদা সামগ্রিকভাবে সকল হানাফি ইমামের আকিদা ছিল। এগুলো হানাফি আলেমদের মজলিসে মজলিসে চর্চা হতো, ধারণ করা হতো। এগুলোর সঙ্গে যদি মুওয়াফফাক ইবনে আহমদ আল-মক্কি (৫৬৮ হি.)-এর ‘মানাকিব’-এর বিস্তারিত ঘটনাগুলো মিলিয়ে পড়া হয়, তবে যে-কেউ উপলব্ধি করবে যে, এসব গ্রন্থে যেসব আকিদা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষেই ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ আকিদা। তাঁর ছাত্ররা বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরম্পরায় এসব আকিদা বহন করেছেন, চর্চা করেছেন এবং প্রচার করেছেন। ফলে এগুলোতে বর্ণিত আকিদা ইমাম আজমের কি না সেটা নিয়ে সশংয় প্রকাশ বিলকুল অযৌক্তিক ব্যাপার।
এখানে আরেকটি বিষয় পর্যালোচনার দাবি রাখে। সেটা হলো, ইমাম তহাবির আকিদাগ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। খোদ সংশয় প্রকাশকারীরাও ইমাম তহাবির বর্ণিত আকিদাকে ইমাম আজমের আকিদা বলে মানেন। অথচ ইমাম তহাবি তাঁর আকিদার কোনো সনদ উল্লেখ করেননি; তিনি কোত্থেকে ইমাম আজম এবং তাঁর দুই শাগরেদের আকিদা গ্রহণ করেছেন সেটাও স্পষ্ট করেননি; তবুও বিনাবাক্যে তাঁর বর্ণিত বক্তব্যকে ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি ইমাম আজমের কয়েক স্তরের পরের শাগরেদ। তাহলে তার পুত্র হাম্মাদ এবং প্রথম স্তরের শাগরেদ আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দির বর্ণনা মেনে নিতে এত কষ্ট কেন? এগুলোর সনদকে হাদিসের সনদের মতো নিরীক্ষণ করা হচ্ছে কেন?
মুরতাযা যাবিদি (১২০৫ হি.) লিখেন, “উক্ত পাঁচটি কিতাবের প্রামাণ্যতা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উম্মাহর আলেমগণ এগুলো কবুল করে নিয়েছেন। ইমাম নিজে এগুলো হাম্মাদ, আবু ইউসুফ, আবু মুতি বলখি, আবু মুকাতিল সমরকন্দি প্রমুখ শাগরেদকে লিখিয়েছেন, তারা নিজেরা সেগুলো সংকলন করেছেন। তাদের থেকে পরবর্তী আলেমগণ তথা ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযি, মুহাম্মাদ ইবনে সামাআহ, নুসাইর ইবনে ইয়াহইয়া, শাদ্দাদ ইবনুল হাকাম প্রমুখ গ্রহণ করেছেন। এভাবে বিশুদ্ধ সনদে সেগুলো ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে [বলা বাহুল্য, এভাবে ইমামে আহলে সুন্নাত আবু জাফর তহাবি পর্যন্তও পৌঁছেছে]। সুতরাং কেউ যদি এসব গ্রন্থ ইমাম আজমের দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটা যেমন সঠিক; কারণ এসব আকিদা তাঁরই, কেউ যদি এগুলোর প্রথম স্তরের সংকলক কিংবা আরও পরবর্তী কারও দিকে সম্পৃক্ত করে, সেটাও সঠিক; কারণ, তারা এগুলো সংকলন করেছেন। মোটকথা, পরবর্তী উম্মাহ এগুলো ইমাম আজমের আকিদা হিসেবে মেনে নিয়েছে। এ কারণে ফখরুল ইসলাম বাযদাবির ‘উসুল’ এবং এটার বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যথা—হুসামুদ্দিন সিগনাকির ‘আল-কাফি’, কিওয়ামুদ্দিন (আমির কাতিব) ইতকানির ‘আশ-শামেল’, জালালুদ্দিন কারলানির ‘আশ-শাফি’, কিওয়ামুদ্দিন সাক্কাকির ‘বায়ানুল উসুল’, আলাউদ্দিন বুখারির ‘কাশফুল আসরার’, আকমালুদ্দিন বাবিরতির ‘আত-তাকরির’ ইত্যাদি সকল গ্রন্থে এসব পুস্তিকার আলোচনা এসেছে। হামাদানির ‘খিযানাতুল আকমাল’-এর শেষের দিকে ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ পুস্তিকা পুরোটাই উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম নাতেফি ‘আল-আজনাস ফি ফুরুয়িল ফিকহিল হানাফি’ গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেছেন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থের অনেক মাসআলা নাজমুদ্দিন নাসাফি, খাওয়ারযেমি প্রমুখ কৃত ইমামের ‘মানাকিব’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-ফিকহুল আকবারের কিছু মাসআলা ‘আল-মুহিতুল বুরহানি’, শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনে ইলিয়াসের ‘ফাতাওয়া’, ইবনুল হুমামের ‘আল-মুসায়ারাহ’-তে এসেছে। আল-ফিকহুল আবসাতের কিছু মাসআলা আবুল মুইন নাসাফি তার ‘আত-তাবসিরাহ’, নুরুদ্দিন সাবুনি তাঁর ‘আল-কিফায়াহ’, হাফিজুদ্দিন নাসাফি তাঁর ‘আল-ইতিমাদ’, আবুল আলা সায়েদ তাঁর ‘আল-ইতিকাদ’, আবু শুজা নাসেরি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যা ‘আন-নূরুল লামি’ ওয়াল-বুরহানুস সাতি’, আবুল মাহাসিন কওনভি তাঁর তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাতে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে আলি আল-জুযজানি এর একটি মূল্যবান ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন (শরহুল ফিকহিল আকবার নামে; মূল ব্যাখ্যা আবসাতের)। .... আকমালুদ্দিন বাবিরতি আল-ওয়াসিয়্যাহর ব্যাখ্যা লিখেছেন। এভাবে উক্ত পাঁচটি পুস্তিকার বিভিন্ন অংশ ইমামদের প্রায় ত্রিশটি কিতাবে আলোচিত হয়েছে। উম্মাহর কাছে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।”
টিকাঃ
১৯৬. দেখুন: ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন (২/১৮-১৯)।