📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কেবল সালাফে সালেহিনের প্রথম যুগে কুরআন-সুন্নাহর মানহাজ থেকে বিচ্যুত লোকজন কালামকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ভ্রান্তি প্রচারে ব্যবহার করেছে আর ইসলামিকরণের পরে সেটা কেবল ইতিবাচক অর্থে, কুরআন ও সুন্নাহর খেদমতে, আহলে সুন্নাতের সুনির্মল আকিদা প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সরল সমীকরণ সঠিক নয়। বরং কালামচর্চার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন অব্যাহত থেকেছে।
কখনো কখনো এর সঙ্গে দর্শন ও মানতেক মিশ্রিত হয়ে কুরআন-সুন্নাহর সরল ও সহজ আকিদার পথে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করেছে। আকিদার নামে এমন অনেক গ্রন্থ লেখা হয়েছে, যেগুলোর মাঝে আর দার্শনিকদের গ্রন্থাবলির মাঝে ফারাক করা কঠিন; বরং সেগুলোতে সকল ইলম আছে, স্রেফ আকিদাটাই নেই। ইসলামের ইতিহাসের মাঝামাঝি শতাব্দের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি আমাদের কথার সুস্পষ্ট সাক্ষী। খোদ তাফতাযানির ভাষায়— ‘সামইয়্যাত (তথা গায়েব ও আখেরাতবিষয়ক কিছু আকিদা, যা কেবল শেষের দিকে আলোচনা করা হয়) যদি না থাকত, তবে এসব (কালামি) গ্রন্থ আর ফালসাফা তথা দর্শনের গ্রন্থগুলোর মাঝে কোনো ফারাক খুঁজে পাওয়া যেত না। ’
তাই কালামের ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখা উচিত, কালাম ওহিভিত্তিক মানহাজের বিকল্প নয়; সুন্নতে নববির হেদায়াতের সমার্থক নয়; ইসলামি আকিদার উৎস নয়। ইসলামি আকিদার উৎস ও ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ। আধুনিক বিভিন্ন শাস্ত্রকে ইসলামের সেবায় ব্যবহার, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তির অপনোদন এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার বিষয়টি খোদ কুরআন-সুন্নাহতেই বিদ্যমান। এটা নবিদের দাওয়াতের সুস্পষ্ট ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কুরআন ও সুন্নাহ এমন সুস্থ যুক্তির সমৃদ্ধ ভান্ডার। এর জন্য নতুন কোনো শাস্ত্র গঠন নিষ্প্রয়োজন। তাই ‘কালাম’ বলতে যদি নিত্যনতুন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, যুগ সমস্যার সংকটে ইসলামকে নবরূপে উপস্থাপন বোঝায়, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আকিদার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা বোঝায়, তবে এমন যুক্তিতর্ক ইসলামে সাধুবাদযোগ্য। সেটা করতে গিয়ে যদি ইসলামের বাইরে থেকে বিভিন্ন উপাদান ও উপকরণ নিতে হয়, বিভিন্ন পরিভাষা ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি আকিদাকে ব্যাখ্যা করতে হয়, তবে সেটা অবশ্যই কুরআন-সুন্নাহর বেঁধে দেওয়া সীমার ভিতরে হতে হবে, কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতি এবং সালাফে সালেহিনের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হতে হবে।
এমন ‘কালাম’ ইসলামে গ্রহণযোগ্য। বরং এ পদ্ধতিতে কেবল ‘ইলমে কালাম’ নয়, জগতের যেকোনো শাস্ত্রকে ইসলামের সেবায় ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। বিপরীতে যদি কোনো শাস্ত্র ওহির ফিতরতি পথে প্রতিবন্ধক হয়, ইসলামি আকিদা ও উসুলকে এমন পথে নিয়ে যায় যা সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের পথ নয়, তবে ইসলামে এমন কোনো শাস্ত্র গ্রহণ ও চর্চার অনুমোদন নেই। সেটার নাম, উৎস কিংবা প্রতিষ্ঠাতা যে বা যারাই হোন না কেন।
কালামের ময়দানের সিপাহসালার হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালি রহ. কালামের পক্ষের ও বিপক্ষের লোকদের মতামত ও দলিল-প্রমাণ বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তাঁর নিজের লম্বা মতামত তুলে ধরেন, যা সকল প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এবং কালামের ময়দানের এক অগ্রদূতের বক্তব্য হিসেবে মূল্যায়িত। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো :
"...‘জাদাল’ ও ‘কালামশাস্ত্র’ নিয়ে মানুষ প্রান্তিকতায় লিপ্ত—বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার। একদল এটাকে বিদআত ও হারাম ফাতাওয়া দিয়েছে। কালাম নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে দুনিয়ার সকল গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হওয়াকে উত্তম বলেছে! আরেক দল এটাকে ওয়াজিব ও ফরয ঘোষণা করেছে। সকল আমলের চেয়ে উত্তম, সবচেয়ে বড় ইবাদত ঘোষণা করেছে। কারণ, তাদের মতে, এটা ইলমে তাওহিদ বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিরক্ষার হাতিয়ার। প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন শাফেয়ি, মালেক, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি ও সালাফের মুহাদ্দিসিনে কেরাম। তারা বিভিন্ন যুক্তি দেখান। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাহাবায়ে কেরাম এমন কোনো জ্ঞান চর্চা করেননি। তা ছাড়া, হাদিসে দ্বীনের ব্যাপারে বিতর্ক করতে নিষেধ করা হয়েছে। বিপরীত দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন মুতাকাল্লিমিন। তাদের দলিল হচ্ছে কুরআনের সেসব আয়াত এবং সালাফের সেসব ঘটনা, যেখানে তারা যুক্তি ও বুদ্ধির আলোকে বাতিলকে খণ্ডন করেছেন, কাফের ও বিদআতিদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছেন। '
‘মোটকথা, এক কথায় কালামশাস্ত্রকে ভালো কিংবা মন্দ বলার সুযোগ নেই। কেননা, এর মাঝে উপকার ও অপকার, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক দুটোই আছে। ইতিবাচক দিকের প্রতি লক্ষ করলে এটা হালাল, আর নেতিবাচক দিকে লক্ষ করলে হারাম। এটার উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর দিক হলো, মনে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি করা, ঈমান-আকিদার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের ভিত দুর্বল করে ফেলা, মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গিগত গোঁড়ামি তৈরি করা, প্রতিপক্ষকে হারানোর নেশার সামনে সত্য ও হককে গৌণ বানিয়ে ফেলা। বিপরীতে এর উপকারী দিক হিসেবে মনে করা হয়, বিভিন্ন বিষয়ের হাকিকত তথা স্বরূপ উদ্ঘাটন, বাস্তবতা উপলব্ধীকরণ ইত্যাদি।
কিন্তু আফসোস! কালামের মাঝে এই মহান উদ্দেশ্যগুলো পূর্ণ করার ক্ষমতাই নেই। বরং এর মূল কাজই হলো মানুষের সন্দেহ-সংশয় আরও বাড়িয়ে দেওয়া, অন্ধকারের মাঝে ছেড়ে দেওয়া।’ গাযালি বলেন, ‘এই কথা যদি কোনো মুহাদ্দিস বা হাশাভি বলত, তুমি হয়তো তাকে কালামের শত্রু গণ্য করে পাত্তা দিতে না। কিন্তু তোমাকে এটা বলছে সে ব্যক্তি যে কালামকে চর্চা করেছে, সবদিক থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। কালামের মাঝে প্রবেশ করে মুতাকাল্লিমিনের ইমাম হয়ে গেছে। হ্যাঁ, কালাম কিছু কিছু বিষয়ের ভালো ব্যাখ্যা দেয়, অস্পষ্টতা দূর করে। কিন্তু সেটা একেবারেই দুর্লভ। বরং কালাম এমন বিষয়ের অস্পষ্টতা দূর করে, যেগুলো কালাম ছাড়াই বোঝা সম্ভব! ...কারণ, কালামের মাঝে যেসব যুক্তি থাকে, কুরআন-সুন্নাহতেও সেসব সুন্দর যুক্তি রয়েছে। বিপরীতে কালামের মাঝে যে অস্পষ্ট প্রকরণ এবং জটিল বিভাজন-বিন্যাসকরণ ইত্যাদি রয়েছে, কুরআন- সুন্নাহ ও স্বচ্ছ হৃদয় সেগুলো থেকে মুক্ত। আর এ কারণেই শাফেয়ি-সহ অন্য ইমামগণ কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন। '
তা ছাড়া, সাধারণ মানুষকে এ শাস্ত্রে জড়িয়ে ফেলার পরিণতি সুখকর নয়। এ জন্য এটা চর্চা করলেও সীমিত পরিসরে করতে হবে। খোদ ইমাম আজম রহ. আবু ইউসুফকে প্রদত্ত তার প্রসিদ্ধ ওসিয়তের মাঝে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মাঝে কালাম ও উসুলুদ্দিন নিয়ে কথা বলো না। কারণ, এমন করলে তারা এক্ষেত্রে তোমার তাকলিদ (অনুসরণ) করবে এবং তাতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।’ শুরুম্বুলালি লিখেন, ‘ইমাম আবু হানিফা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কালাম শেখা এবং মুনাযারাকে মাকরুহ বলেছেন।’ ফাতাওয়া আলমগিরিতেও প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কালাম শেখা ও চর্চা করা মাকরুহ বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১৫৩. দেখুন: শরহুল আকায়েদ (২৩)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৬৪)।
১৫৪. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, গাযালি (১/৯৪-৯৯)।
১৫৫. প্রাগুক্ত (১/৯৪-৯৯)।
১৫৬. মানাকিব, মক্কি (৩৭৩)।
১৫৭. গুনইয়াতু যাবিল আহকাম (১/৩১৩) [দুরারুল হুক্কামের সঙ্গে সংযুক্ত হাশিয়া।।
১৫৮. দেখুন : ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩৭৭)।
📄 কালাম নিষিদ্ধ হলে আকিদা নিয়ে সকল বিতর্কও নিষিদ্ধ
এখানে আরও একটি বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। সেটা হলো, একদল লোক সালাফের বিভিন্ন বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে কালামকে সর্বাঙ্গীণভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ মনে করলেও আকিদাকেন্দ্রিক অর্থহীন ঝগড়া-বিবাদ ও তর্কবিতর্ককে ঠিকই বড় জিহাদ এবং দ্বীনের বিশাল খেদমত মনে করেন। অথচ সালাফের কালামচর্চার নিষেধাজ্ঞা স্রেফ শাস্ত্র হিসেবে নয়, বরং এই অর্থহীন বিতর্কের মূল উপকরণ হওয়ার কারণে। ইমাম আজমসহ সালাফের বক্তব্যে এ বাস্তবতা স্পষ্ট থাকলেও তারা এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যেমন—ইমাম আজম রহ. যখন পুত্র হাম্মাদকে কালামচর্চা করতে নিষেধ করেন, তখন কারণ হিসেবে বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে মুনাযারা করার সময় আতঙ্কিত থাকতাম যেন কেউ বিভ্রান্ত না হই। আর তোমরা এখন এটা নিয়ে মুনাযারা করোই প্রতিপক্ষকে গোমরাহ করতে। যে ব্যক্তি এমন কামনা করে, সে মূলত তার কুফর কামনা করে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কুফর কামনা করে, দেখা যায়, সে অন্যের আগে নিজে তাতে পতিত হয়। এটা নিষিদ্ধ। এ ধরনের মুতাকাল্লিমের পিছনে নামায হবে না।’ এখানে স্পষ্ট যে, শাস্ত্রটা কালাম হোক কিংবা অন্যকিছু হোক সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, দ্বীন নিয়ে বিবাদ-বিতর্ক করা, অন্য মুসলিমকে ভ্রান্ত সাব্যস্তের কোশেশ করাটাই নিন্দনীয়।
একইভাবে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত আরেকটি ঘটনাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। আবু ইউসুফ রহ. বর্ণনা করেন, ‘আমরা আবু হানিফা রহ.-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় একদল লোক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে এলো। এসে বলল, এই ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে। আর দ্বিতীয় জন তাকে নিষেধ করে বলে, কুরআন মাখলুক নয় (আমরা তাদের ব্যাপারে কী করব?)। ইমাম বললেন, ‘তাদের কারও পিছনে নামায পড়ো না।’ আমি বললাম, প্রথম জনের ব্যাপার তো স্পষ্ট। কারণ, সে কুরআনকে মাখলুক বলে। কিন্তু দ্বিতীয় জনের পিছনে নামায বাদ দেওয়ার কারণ কী? তার কথা তো ঠিকই আছে। ইমাম বললেন, ‘কারণ, তারা দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছে। অথচ দ্বীন নিয়ে বিবাদ বিদআত।’
এখানে কালামের কোনো উল্লেখ নেই; বরং স্রেফ কুরআন নিয়ে বিতর্ককেও ইমাম নিষেধ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ককারীর পিছনে নামায পড়তে বারণ করেছেন। ফাতহুল কাদিরে আরও স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুতাকাল্লিম তথা কালাম চর্চাকারীর পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়, সত্য বললেও।’ অর্থাৎ আকিদা নিয়ে যে বিতর্ক করবে সে-ই বিদআতি গণ্য হবে, হোক সে সত্যবাদী। তার পিছনে নামায বর্জন করা হবে।
সুতরাং বিতর্ক কোন নামে হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং আহলে সুন্নাতের মাঝে এগুলো নিয়ে বিতর্ক করা সর্বতোভাবেই নিন্দনীয়। কারণ হলো, এগুলো দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় নয়। সামগ্রিকভাবে সকলেই হকের উপর। স্রেফ উত্তম-অনুত্তমের ব্যাপার। কিন্তু সেটা নিয়ে যখন বিতর্ক অব্যাহত থাকবে, একপর্যায়ে তা বিরাট বিষয়ে পরিণত হবে। ফেতনা ছড়াবে। দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ হ্রাস পাবে। উপরন্তু শাখাগত বিষয়ে বিতর্ক শুরু করলে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি অনিবার্য হবে। ঐক্য বিনষ্ট হবে। উম্মাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয়ের মাঝে ডুবে যাবে। দ্বীনের শাখাগত বিষয়গুলোকে মৌলিক বানিয়ে ফেলবে। এটা অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার, যা আমাদের চারপাশে আমরা নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। ফলে কালামকে নিন্দা করে ‘আকিদা’র নামে উম্মাহর মাঝে শাখাগত ও গৌণ বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক করা, একে অন্যকে আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করা এবং বিদআতি আখ্যা দিয়ে মুসলিম উম্মাহর দুর্বল দেহকে কেটে টুকরো টুকরো করা আর যা-ই হোক, ইসলামের কাজ নয়। এটা এক ধরনের তালবিসে ইবলিস তথা শয়তানের ধোঁকা। কালামকে নিন্দা করলে আকিদার নামে শাখাগত বিষয় নিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করারও নিন্দা করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘হেদায়াত লাভের পরে কোনো সম্প্রদায় তখনই বিভ্রান্ত হয়, যখন তারা বিতর্কে জড়ায়। ’ ফলে দ্বীনের শাখাগত সকল বিষয় নিয়ে বিতর্ক বাদ দিতে হবে। কারণ, তাতে হেদায়াত নেই, কল্যাণ নেই। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারা হাজার বছর ধরে আকিদার শাখাগত বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধ করছে। আজ পর্যন্ত কোনো সর্বসম্মত সমাধানে আসতে পেরেছে? পারেনি। কিয়ামত পর্যন্ত আসতে পারবে না। কারণ, এগুলো একমত হওয়ার বিষয়ই নয়। আবার এগুলোতে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও তাদের একদল অন্যদলকে কাফের বা জাহান্নামি বলতে পারছে না. নিজেকে জান্নাতি সনদও দিতে পারছে না। ফলে এই সহস্রাধিক বছরের বিতর্ক একটা বদ্ধগলিতে গিয়ে আটকা পড়ছে। এখান থেকে উম্মাহকে বের হতে হবে। দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিলে সকলে মিলে সেটার বিরোধিতা করতে হবে। শিরকের পরিবর্তে তাওহিদ এবং বিদআতের পরিবর্তে সুন্নাহ প্রচারের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু নিজেদের মাঝে বিদ্যমান শাখাগত বিষয়ে বিতর্ক পরিহার করতে হবে। উম্মাহর আলেম ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ এটা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল।
টিকাঃ
১৫৯. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)। তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬-২৭৭)।
১৬০. তালখিসুল আদিল্লাহ, সাফফার (৫৬)।
১৬১. ফাতহুল কাদির (১/৩৫১)।
১৬২, তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩২৫৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৪৮)
📄 আকিদা বিষয়ে ইমাম আজমের গ্রন্থগুলোর প্রামাণ্যতা
আকিদা বিষয়ে লিখিত পাঁচটি প্রসিদ্ধ প্রাচীন পুস্তিকা ইমাম আবু হানিফা রহ.- এর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। সেগুলো হলো : এক. আল-ফিকহুল আকবার। সংকলক : ইমামপুত্র হাম্মাদ ইবনে আবু হানিফা। দুই. আল-ফিকহুল আবসাত। সংকলক : আবু মুতি বলখি। তিন. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম। সংকলক : আবু মুকাতিল সমরকন্দি। চার. আর-রিসালাহ। বসরার আলেম উসমান আল- বাত্তির কাছে লেখা ইমামের চিঠি। পাঁচ. আল-ওয়াসিয়্যাহ। জীবনের শেষলগ্নে ইমামপ্রদত্ত ওসিয়ত সংকলন।
যেহেতু এসব গ্রন্থ অত্যন্ত প্রাচীন, সহস্র বছরের চেয়েও বেশি পুরোনো, ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতার উপর আপত্তি ওঠে, যেমন প্রাচীন অসংখ্য গ্রন্থের উপরই উঠেছে। এগুলোর উপর ওঠা আপত্তি মোটা দাগে দুই ধরনের। নিচে আমরা সেসব আপত্তি এবং সেগুলোর উপর আমাদের পর্যালোচনা ধারাবাহিকভাবে পেশ করছি।
📄 সামগ্রিক সংশয়
যদিও এসব গ্রন্থ অত্যন্ত প্রাচীন এবং সেই প্রথম কয়েক শতাব্দীতেই এগুলোর উপর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখা হয়েছে, এসব গ্রন্থের আলোকে বড় বড় ইমাম আবু হানিফার আকিদা লিখেছেন, চর্চা করেছেন, বিচার করেছেন, যাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ইমাম আবু জাফর তহাবি, আবু মনসুর আল-মাতুরিদি, আবুল লাইস সমরকন্দি, ইবনে ফওরক, আবদুল কাহের বাগদাদি, আবুল মুজাফফর ইসফারায়েনি প্রমুখ, তবুও কোনো কোনো গবেষক এসব গ্রন্থের উপর আপত্তি তুলেছেন; বরং তাদের কেউ কেউ সুস্পষ্ট ভাষায় এসব গ্রন্থকে ইমাম আবু হানিফার নয় বলে মত দিয়েছেন। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষক কার্ল ব্রুকলম্যান। তিনি তাঁর ‘আরবি সাহিত্যের ইতিহাস’-শীর্ষক গ্রন্থে বলেন, ‘আবু হানিফা থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত কোনো গ্রন্থ নেই। ফলে আল-ফিকহুল আকবার নামে প্রসিদ্ধ দুটো গ্রন্থ তাঁর নয়। খুব সম্ভবত এগুলো আশআরির পরে লেখা হয়েছে। ’
মিশরীয় গবেষক আহমদ আমিন ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এর উপর নানান সন্দেহ ও সংশয় উত্থাপন করেছেন। এ কিতাবগুলোর প্রামাণ্যতার ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। শেষে অবশ্য আংশিকভাবে হলেও ইতিবাচক মত দিয়েছেন। তার মতে, আমাদের সামনে বিদ্যমান ‘আল-ফিকহুল আকবার’ মৌলিকভাবে ইমাম আবু হানিফার গ্রন্থ। তবে তাতে পরবর্তী সময়ে কিছু সংযোজিত হয়েছে। কী সংযোজিত হয়েছে সেটা অবশ্য বলেননি।
শায়খ শিবলি নুমানিও ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এর প্রামাণ্যতার উপর সশংয় প্রকাশ করেছেন এবং এটা যে ইমামের কিতাব সেটা মেনে নিতে তাঁর দ্বিধার কথা জানিয়েছেন। তাঁর একটি যুক্তি হলো, আল-ফিকহুল আকবারে এমন কিছু পরিভাষা এসেছে, যেগুলো ইমামের যুগে ছিল না। যেমন: ‘জাওহার’, ‘আরাজ’ ইত্যাদি দার্শনিক পরিভাষা, যেগুলো পরবর্তী সময়ে অস্তিত্বে এসেছে, বিশেষত আব্বাসি যুগে অনুবাদকেন্দ্রিক জাগরণের মাধ্যমে। শিবলি নুমানির আরেকটি আপত্তি হচ্ছে : দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দের গ্রন্থগুলোতে এই কিতাবের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই; বরং পঞ্চম শতাব্দে বাযদাবিই সর্বপ্রথম এটার নাম উল্লেখ করেন। শিবলি নুমানির তৃতীয় সংশয় হলো আবু মুতি বলখিকে ঘিরে। তাঁর ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের তাজরিহ তথা সমালোচনা অত্যন্ত বেশি। ফলে তিনি নির্ভরযোগ্য নন। সুতরাং স্রেফ এমন ব্যক্তির মাধ্যমে বর্ণিত কোনো গ্রন্থকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। এ কারণে শিবলি নুমানির কথা হচ্ছে, আবু মুতি বলখি নিজে হয়তো এ কিতাব লিখে থাকবেন, যা ধীরে ধীরে ইমাম আজমের নামে প্রচারিত হয়েছে এবং পরবর্তীকালেও এর সংযোজন অব্যাহত থেকেছে। বরং কেবল আল-ফিকহুল আকবার নয়, শায়খ নুমানি মনে করেন, ‘আজ ইমাম আজমের কোনো গ্রন্থ আমাদের সামনে নেই।’ এর মানে, তিনি কেবল ‘আল-ফিকহুল আকবার’ নয়, বরং ‘আল-ফিকহুল আবসাত’, ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’, উসমান বাত্তির কাছে ইমাম আজমের চিঠি (আর-রিসালাহ), তাঁর ওসিয়ত সংকলন ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ এগুলোর কোনোটা ইমাম আজমের গ্রন্থ হিসেবে মানছেন না।
টিকাঃ
১৬৩. দেখুন : তারিখুল আদাবিল আরাবি (৩/২২৭-২২৮)।
১৬৪. দেখুন: যুহাল ইসলাম (২/১৯৭-১৯৮)।
১৬৫. দেখুন: সিরাতে নুমান (২/১১৭-১১৯)।