📄 সালাফের কালাম বিরোধিতার প্রকৃত রহস্য
এটা খোলা চোখের সিদ্ধান্ত। বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হলে আমাদের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। গভীরে গেলে আমরা দেখব-ইমাম আজমসহ সালাফের অন্যান্য আলেম সামগ্রিক কালামের সমালোচনা করেননি, বরং বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিশেষ ধরনের ‘কালাম’- এর সমালোচনা করেছেন। কারণ, সে যুগে ইলমুল কালাম পূর্ণ একটা শাস্ত্র হিসেবেই গড়ে ওঠেনি। তাহলে তারা সমালোচনা করলেন কোন কালামের?
বস্তুত হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দে ‘কালাম’ বলতে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতে যুক্তিতর্ক এবং ওহির বিপরীতে আকলকে কেন্দ্র করে ঈমান ও আকিদাচর্চা বোঝানো হতো। ফলে ‘কালাম’-শাস্ত্রটা কুরআন-সুন্নাহ ও ওহির সাংঘর্ষিক শাস্ত্র গণ্য হতে থাকে। কাদারিয়্যাহ, মুরজিয়া, মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ‘কালাম’ নামে পরিচিতি পায়। সালাফে সালেহিনের বিপরীতে সে যুগের বিভ্রান্ত লোকজন, যেমন—মাবাদ জুহানি, গাইলান দিমাশকি, জাদ ইবনে দিরহাম, জাহম ইবনে সাফওয়ান, ওয়াসিল ইবনে আতা, আমর ইবনে উবাইদ, বিশর আল-মারিসি প্রমুখ ‘মুতাকাল্লিম’ হয়ে ওঠেন। এভাবে ‘কালাম’ তখন ফালসাফা (দর্শন)-সহ সব ধরনের নব-আবিষ্কৃত, প্রত্যাখ্যাত, বিদআত ও ভ্রান্ত চিন্তাধারার সমার্থক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় শতকে ‘কালাম’ কীভাবে ওহির বিপরীতে লাগামহীন যুক্তিতর্ক এবং সে কারণে একপর্যায়ে বিচ্যুতির সমার্থক হয়ে ওঠে, সেটা ইমাম আজমের বক্তব্য দ্বারাও বোঝা যায়। ইমাম আজম রহ. একাধিক জায়গায় বলেছেন, ‘আমি কালাম চর্চা করতাম’ (كنت أنظر في الكلام)। একপর্যায়ে এ শাস্ত্রে এতটাই এগিয়ে যাই যে, মানুষ আমার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করত।' এটা ছিল মূলত ইমামের প্রথম জীবনের কথা, যখন তিনি বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে নাস্তিকদের খণ্ডন করতেন; কিন্তু তিনি তখনও ফিকহের জগতে প্রবেশ করেননি। এমন সময় একদিন এক নারী তাকে তালাকের একটি সাধারণ মাসআলা জিজ্ঞাসা করে। কালাম সম্পর্কে এত বড় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও সেই নারীকে সেদিন তিনি জবাব দিতে পারেননি। তাঁর মনে দুঃখবোধ তৈরি হয়। কালাম তাকে ‘ফিকহ’ সম্পর্কে গাফেল করে রেখেছে মনে করেন তিনি। এভাবে বলে ওঠেন, ‘আমার কালাম দরকার নেই।’ অথচ পরবর্তী সময়ের অসংখ্য আলেম একইসঙ্গে ফকিহ ও মুতাকাল্লিম ছিলেন; ফিকহ, হাদিস, তাফসির, কালাম সকল শাস্ত্রে সমান পাণ্ডিত্যের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত ছিলেন।
বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন— মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহদের গুরু বিশর আল-মারিসি ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর শাগরেদ। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন খলকে কুরআন (কুরআনকে সৃষ্টি বলা)-সহ বিভিন্ন বিভ্রান্ত আকিদায় জড়িয়ে পড়েন, খোদ আবু ইউসুফ তাকে সতর্ক করেন। আবু ইউসুফ তাকে লক্ষ্য করে বলেন, “বিশর, ‘কালাম’ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই অজ্ঞতা। আর ‘কালাম’ সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা জ্ঞান। কোনো ব্যক্তি যখন কালামের শিরোদেশে পৌঁছে যায়, তখন সে যিন্দিকে পরিণত হয় অথবা কমপক্ষে যিন্দিক লকব পায়! বিশর, আমি শুনেছি তুমি কুরআন নিয়ে ‘কালাম’ করছ (কথা বলছ)। যদি আল্লাহর জন্য ইলম সাব্যস্ত করো, তবে নিজেই নিজেকে খণ্ডন করলে। আর যদি আল্লাহর ইলম অস্বীকার করো, তবে তো কাফের হয়ে গেলে।” উক্ত বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু ইউসুফ বিশরের পরিণতি দেখে কালামের সমালোচনা করেছেন। ফলে এটা ‘বিশরীয় কালামের’ সমালোচনা গণ্য হবে।
এক ব্যক্তি হাসান ইবনে যিয়াদের কাছে প্রশ্ন করেন, যুফার রহ. কি কালাম চর্চা করতেন? তিনি বললেন, ‘নির্বোধের মতো কথা বলো না। তারা ইলম ও ফিকহের প্রাসাদ। কালামের মাঝে তো সে ব্যক্তি প্রবেশ করে যার আকল নেই। আর এসব ব্যক্তি আল্লাহ এবং আল্লাহর বিধিবিধান সম্পর্কে এতটা বেশি অবগত ছিলেন যে, তারা তোমার উদ্দিষ্ট এসব কালামে প্রবেশ করতে পারেন না ( هؤلاء كانوا أعلم بالله عز وجل وبحدود الله من أن يدخلوا في الكلام الذي تعني ) পূর্বে যারা ছিলেন, যুফার ও আবু ইউসুফ-সহ আমাদের কোনো শায়খকে ফিকহ এবং পূর্ববর্তী সালাফের অনুসরণ ছাড়া আর কিছুতে মনোযোগ দিতে দেখিনি।’ তখন লোকটি বলল, কিন্তু বিশর আল-মারিসি তো দাবি করে, কুরআনের ক্ষেত্রে তার বক্তব্য আর আবু হানিফা, যুফার ও আবু ইউসুফের বক্তব্য এক। ইবনে যিয়াদ বলেন, ‘আল্লাহর কসম! সে মিথ্যা বলেছে। আমি তাদের কাউকে এ ব্যাপারে কথা বলতে দেখিনি। তাদের এমন কোনো কথা আমার কাছে পৌঁছয়নি। তুমি বরং বিশরকে বলবে—তুমি আবু ইউসুফের সান্নিধ্যে ছিলে। তিনি কেন তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন? এর মাধ্যমেই তার মিথ্যাচার স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই কয়েকটি বর্ণনার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় যে, সালাফে সালেহিন যখন কালামের সমালোচনা করেছেন, তারা কালাম বলতে কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন এবং তখন মুতাকাল্লিম কারা ছিল। অর্থাৎ, তখন জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া ও মুতাযিলারাই ‘মুতাকাল্লিম’ ছিল। ফলে সালাফ তাদের প্রতিহত করবেন, তাদের ভ্রান্ত আকিদার নিন্দা করবেন—এটা নিতান্তই স্বাভাবিক, শরিয়ত ও যুক্তিরও দাবি।
আবদুল কাদের কুরাশি বর্ণনা করেন, ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আমর ইবনে উবাইদের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক। কারণ, সে মানুষের উপর ইলমে কালামের দরজা খুলে দিয়েছে।’ আবদুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, আমি মালেকের কাছে গেলাম। তখন তার কাছে একব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল। মালেক তাকে বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমর ইবনে উবাইদের শাগরেদ। আমরের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক! সে দ্বীনের মাঝে এসব কালাম নামক বিদআত ঢুকিয়েছে। যদি কালাম কোনো ‘ইলম’ হতো, তবে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ দ্বীন ও শরিয়ত নিয়ে যেভাবে কথা বলেছেন, এটা নিয়েও কথা বলতেন। বোঝা গেল, এটা বাতিল।’ উপরের দুটো বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানিফা ও মালেক দুজনই মুতাযিলাদের সমালোচনা করেছেন। তারাই তখন মুতাকাল্লিম ছিল। কালাম বলতে তখন তাদের আকিদাই বোঝাত।
একইভাবে ইবনে ইসহাক বলেন, একদিন শাফেয়ি রহ. একদল ফকিহের সঙ্গে বিতর্ক করলেন। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আলোচনা ও মুনাযারা করলেন। আবু ইসহাক তাকে বললেন, আবু আবদুল্লাহ, এগুলো তো আহলে কালামের (মানহাজ বা কর্মপদ্ধতি)। আহলে হালাল ও হারাম (তথা ফকিহদের) মানহাজ নয়। তিনি বললেন, এটার আগে আমরা ওটা মজবুত করে শিখেছি। এতে স্পষ্ট হয়, ইমাম শাফেয়িও কালামের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেছিলেন। কারণ, বিভ্রান্ত লোকদের খণ্ডন করতে হলে এর বিকল্প নেই। ফলে ইমাম শাফেয়ি যে কালাম শিখতে নিষেধ করেছেন, সেটা হলো গোমরাহদের কালাম, যারা এটাকে হাতিয়ার বানিয়ে বিভ্রান্ত আকিদা প্রচার করে। বরং শাফেয়ির বক্তব্যও- শিরক ছাড়া যেকোনো গুনাহ নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হওয়া কালাম নিয়ে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে উত্তম-সে কথার প্রমাণ। নতুবা চুরি, ডাকাতি, যিনা- ব্যভিচার ইত্যাদির চেয়ে ইলমুল কালাম নিকৃষ্ট, এটা হতেই পারে না। হ্যাঁ, এটাকে যখন নেতিবাচকভাবে গোমরাহির কাজে ব্যবহার করা হবে, তখন নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট; কিন্তু উন্মুক্তভাবে নয়।
ইমামদের এসব বক্তব্যের মাধ্যমে ‘কালাম’-এর সমালোচনার ক্ষেত্রে ঠিক কোন ধরনের কালাম এবং কারা উদ্দেশ্য সেটা স্পষ্ট। আর এমন কালাম ও কালামিদের সমালোচনা যুক্তিযুক্ত, বরং আবশ্যক বইকি!
পরবর্তীকালে উলামায়ে ইসলামের একটি দলই ‘কালাম’-এর ‘ইসলামিকরণ’ করেন। এতদিন যেটা কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকিদা ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটাকে কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকিদা সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশেষত ইসলামি রাষ্ট্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, অন্যান্য সভ্যতা ও জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর সংস্পর্শ ও সম্পর্ক, জ্ঞান ও সংস্কৃতির সম্মিলন ও আদানপ্রদান, বিভিন্ন মতাদর্শ ও ধর্মের গ্রন্থসমূহ এবং চিন্তা-দর্শনের আরবি অনুবাদ ইত্যাদি নানা কারণে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর নিত্য-নতুন আপত্তি তৈরি হয়, ‘আল্লাহ বলেছেন’, ‘আল্লাহর রাসুল বলেছেন’-এটুকুতে সন্তুষ্ট না হতে পারার মতো ‘সুশীল চিন্তক’ ও ‘বুদ্ধিজীবী’ মস্তিষ্কের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ইসলামি আকিদা বুঝতে চাওয়া লোকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন ‘ইসলামি’ কালামের চাহিদাও বাড়তে থাকে। উলামায়ে কেরামের একটি দল নিজেদের ইসলামি আকিদার সুরক্ষা এবং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষিত সমাজে ইসলাম প্রচারের খেদমত আঞ্জাম দিতে মাঠে নামেন। শুরু হয় সুশীল (মুতাযিলা) ও আলেমদের লড়াই। এ লড়াইয়ে মুতাযিলাদের বিরুদ্ধে উলামায়ে ইসলাম দ্বীনের ব্যাপক খেদমত করেন। মুতাযিলাদের বিভ্রান্তিকর আকিদা থেকে মুসলিম উম্মাহকে হেফাজতের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাদের যুক্তিতেই তাদের পরাজিত করেন। যে শাস্ত্র ছিল তাদের সকল বিভ্রান্তির ভিত, সেটাকেই ধসিয়ে দেন আহলে সুন্নাতের আলেমগণ। এভাবে যে শাস্ত্রটি একসময় ইসলাম ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, যেগুলোর চর্চাকারী সালাফে সালেহিনের কাছে ‘যিন্দিক’ নামে পরিচিত হয়েছে, একসময় মূল ধারার আলেমগণ সেটাকে সংস্কার করে ইসলামের খেদমতে লাগান। ‘কালাম’ তখন ‘বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদা’র সমার্থক হয়ে ওঠে। আলেমরাই মুতাকাল্লিম হয়ে ওঠেন। শাহরাস্তানি (৫৪৮ হি.) লিখেন, ‘একপর্যায়ে আসেন আবুল হাসান আশআরি। তিনি তাদের (তথা সালাফের) বক্তব্যকে কালামি মানহাজে শক্তিশালী করেন।
তবে শুরুটাই যেহেতু জটিলতাপূর্ণ ছিল, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের প্রাকৃতিক ও সহজ-সরল পথের সঙ্গে প্রথম থেকেই এর দূরত্ব ছিল (অর্থাৎ, কালামের সাহায্যে আকিদাচর্চা ফিতরত ও স্বাভাবিক অবস্থা নয়; বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির ফল, বিদ্যমান জটিলতার বিরুদ্ধে লড়াই), ফলে ‘ইসলামিকরণ’ করা সত্ত্বেও দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতিগত দূরত্ব অব্যাহতই থাকল। যতই ‘কালাম’-শাস্ত্রের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছিল, নতুন নতুন পরিভাষা ও শাখা-প্রশাখা সংযুক্ত হচ্ছিল, ততই সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল। আর এটাই ছিল মুহাদ্দিসিন ও মুতাকাল্লিমিনের সংঘাতের অন্যতম কারণ। সেসব জটিলতার সংজ্ঞায়ন, সেগুলো মোকাবিলার পদ্ধতি নির্ধারণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে কালামের প্রতি আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি মতভেদপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই এ ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই। একদিকে যেমন সালাফের কালাম-বিরোধিতাকে উন্মুক্ত নিষেধাজ্ঞা মনে না করা চাই, অপরদিকে এটা চর্চার দরজা অবাধে উন্মোচিত না করা চাই। সকল যুগের মুহাক্কিক আলেমের দৃষ্টিভঙ্গিও এটা।
বাযযাযি লিখেন, ‘ইমাম আবু ইউসুফ বলেছেন, ‘কালাম চর্চাকারী (মুতাকাল্লিম) হক কথা বললেও তার পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়।’ এই নিষেধাজ্ঞাকে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এক. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যক্তি, যে ইলমুল কালাম চর্চার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে। কালামের অত্যন্ত জটিল ও গভীর গলি-ঘুপচিতে প্রবেশ করে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহচর্চা বাদ দিয়ে কালামের মাঝেই ডুবে থাকে। দুই, কারও মতে এটা কালামচর্চার উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে বিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ, প্রথম যুগে ইমামগণ মুনাযারা করতেন প্রতিপক্ষকে ভ্রান্তি থেকে ফেরানোর জন্য। কিন্তু পরবর্তীকালে মুনাযারা ও বিতর্কের উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টা করা। ফলে ইমামগণ কালামকে নিষিদ্ধ করেন। তাই কেউ যদি কালামশাস্ত্রের মাধ্যমে হকের কাছে পৌঁছতে চায়, অন্যের হেদায়াত উদ্দেশ্য হয়, তবে এটা তো উত্তম। তিন. কারও মতে, ইমামগণ যে ‘কালাম’ নিষিদ্ধ করেছেন, সেটা হলো আহলে বিদআত ও হুকামা তথা দার্শনিকদের কালাম, মাশায়েখের কালাম নয়। ’
বাইহাকি লিখেন, ‘উমর ইবনে আবদুল আযিয-সহ অন্যান্য সালাফ কালামের মাঝে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তারা মনে করতেন, বিশুদ্ধ দ্বীন বোঝার জন্য এটার প্রয়োজন নেই। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যেসব দলিল-প্রমাণ নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন সেগুলো তাওহিদ, নবুওত ইত্যাদি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। উপরন্তু তারা ভয় করতেন, যদি ইলমে কালামের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে অদূরদর্শী লোকেরা তাতে বিভ্রান্ত হবে এবং অবিশ্বাসীদের জালে ফেঁসে যাবে। সাঁতার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ লোককে সমুদ্রে ফেললে যেমন হয়, তাদের অবস্থাও তেমন হবে। মোটকথা, ইলমে কালাম থেকে তাদের নিষেধাজ্ঞা এ কারণে নয় যে, মৌলিকভাবে এটা নিন্দনীয় ও অনুপকারী শাস্ত্র। এমন এক শাস্ত্র যার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা যায়, তাঁর গুণাবলি চেনা যায়, রাসুলদের সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়, যার মাধ্যমে সত্য নবি ও মিথ্যা নবির মাঝে পার্থক্য করা যায়, সেটা কীভাবে নিন্দনীয় শাস্ত্র হতে পারে? তাই কালামশাস্ত্রের ক্ষেত্রে তাদের নিষেধাজ্ঞা ছিল মূলত বিভ্রান্তি থেকে দুর্বলচিত্তের মানুষদের বাঁচানোর তাগিদে।
আবু আলি দাক্কাক বলেন, ‘যদি দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়িস্বরূপ বিবাদ (কালাম) করা হয়, সেটা নিষিদ্ধ; হক প্রকাশের জন্য হলে নিষিদ্ধ নয়। আবু নসর সাফফার বলেন, কাফেররা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে সব ধরনের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করত, যুক্তিতে পরাজিত করতে চাইত। তাহলে নবিজি নীরব থাকতে এবং বিবাদ পরিত্যাগ করতে আদিষ্ট হবেন কোন যুক্তিতে? হ্যাঁ, যদি দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং অর্থহীন বিসংবাদ হয়, সে ক্ষেত্রে বিবাদ পরিত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي ءَايَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ، وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْমِ الظَّالِمِينَ অর্থ : ‘যখন আপনি তাদের আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাস করতে দেখবেন, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান যে পর্যন্ত না তারা অন্যকথায় প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে আর বসবেন না।’ [আনআম : ৬৮] কিন্তু হক প্রকাশের জন্য বিবাদ করা দূষণীয় নয়।’
স্বয়ং ইমাম আজমের পরবর্তী সময়ের বক্তব্যের মাঝেও কালামকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার বৈধতা পাওয়া যায়। আবু মুকাতিল সমরকন্দি ইমামকে বলেন, অনেকে এসব বিষয়ে (কালাম/মুনাযারা ইত্যদিতে) ঢুকতে নিষেধ করেন। তাদের কথা, রাসুলের সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তো এ পথে হাঁটেননি। আমরা কেন হাঁটব? ইমাম জবাবে বলেন, ‘আমরা যদি সাহাবাদের যুগে তাদের পর্যায়ে থাকতাম, তাহলে তারা যা করতেন যতটুকু করতেন, আমাদের ক্ষেত্রেও তা শতভাগ প্রযোজ্য হতো। কিন্তু আমাদের যুগ তাদের যুগ নয়। আমরা যেসব সমস্যার মোকাবিলা করছি, সেগুলো তাদের যুগে ছিল না। আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের সামনে এসে পড়েছি, যারা আমাদের আঘাত করে, আমাদের রক্তকে হালাল মনে করে। তাহলে তাদের মাঝে কারা সঠিক কারা ভুল সেটা না জেনে বসে থাকা যাবে? আমরা আমাদের জানমালের হেফাজত না করে বসে থাকব? সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল না; ফলে তাদের হাতিয়ার হাতে নিতে হয়নি। আমাদের যুগে তারা আছে; ফলে হাতিয়ার হাতে নিতে হবে। ’
সুতরাং হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করলে সেটা করা যাবে এবং খোদ ইমামও প্রথম জীবনে সেটা করেছেন। কিন্তু অতিরঞ্জন তৈরি হলে, মাধ্যমকে গন্তব্য মনে করা হলে, উপলক্ষ্যকে লক্ষ্য গণ্য করলে সেটা বর্জন করতে হবে, যেমনটা ইমামও করেছেন। কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, ‘ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ সূত্রে মুহাম্মাদ রহ. বর্ণনা করেন, কালাম চর্চাকারীর পিছনে নামায হবে না। এর দ্বারা মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে কালামের অত্যন্ত গভীরের বিষয়গুলোতে যাওয়া।’ কারও মতে, কালামশাস্ত্রকে অন্যায় পথে ব্যবহারকারীরা এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে, সাধারণ কালামচর্চা নয়। তাদের দলিল হচ্ছে ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর সন্তান হাম্মাদের একটি ঘটনা। হাম্মাদকে তিনি একদিন কালাম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখে নিষেধ করেন। তখন হাম্মাদ বলেন, আপনাকেও তো আমি এ শাস্ত্র চর্চা করতে দেখেছি। তাহলে আমাকে নিষেধ করছেন কেন, আব্বাজান? ইমাম বললেন, আমরা এটা নিয়ে মুনাযারা করার সময় আতঙ্কিত থাকতাম যেন কেউ বিভ্রান্ত না হই। আর তোমরা এখন এটা নিয়ে মুনাযারা করোই প্রতিপক্ষকে গোমরাহ করতে। আর যে ব্যক্তি এমন কামনা করে, সে মূলত তার কুফর কামনা করে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কুফর কামনা করে, দেখা যায়, সে অন্যের আগে নিজে তাতে পতিত হয়। এটা নিষিদ্ধ। ফলে এ ধরনের মুতাকাল্লিমের পিছনে নামায হবে না।
ইমাম আজমের প্রসিদ্ধ জীবনীকার মুওয়াফফাক ইবনে আহমদ মক্কির (৫৬৮ হি.) কথায় কালামের প্রতি ইমাম রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন এবং সেটার কারণ আরও স্পষ্ট হয়। তার বর্ণনানুযায়ী-হাম্মাদ বলেন, আব্বাজান আমাকে কালাম শিখতে বলতেন। এটা চর্চার প্রতি অত্যন্ত উদ্বুদ্ধ করতেন। আমাকে বলতেন, বৎস, কালাম শিক্ষা করো। কারণ, সেটা সবচেয়ে বড় ফিকহ (আল-ফিকহুল আকবার)। হাম্মাদ বলেন, তখন থেকে আমি কালাম শেখা শুরু করি মূলত তাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। একপর্যায়ে কালামশাস্ত্রে আমি গভীর জ্ঞান লাভ করি। তখন সেটা আমি আমার নিজের নফস ও শাহওয়াতের জন্য চর্চা করতে থাকি। একদিন আমি একদল লোকের সঙ্গে বিতর্ক করছিলাম। আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে উঠছিল। এমন সময় আব্বাজান এলেন। আমি তাঁর কাছে ছুটে গেলাম। তিনি বললেন—হাম্মাদ, তোমার সাথে এরা কারা? আমি বললাম, অমুক অমুক তাদের সকলের নাম জানালাম। তিনি বললেন, কী নিয়ে বিতর্ক করছ? আমি বললাম, অমুক বিষয়ে। তিনি বললেন—হাম্মাদ, কালাম ছেড়ে দাও! ইতঃপূর্বে আমি আব্বাজানকে কোনো জিনিসের নির্দেশ দিয়ে সেটা ছাড়তে বলতে দেখিনি।
তাই আমি বললাম—আব্বাজান, আপনিই কি আমাকে এটা শিখতে বলেছিলেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আজ আবার আমিই নিষেধ করছি। আমি কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কালামের বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ককারী মানুষগুলো একই মতবাদ এবং একই দ্বীনের অনুসারী ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে শয়তান তাদের মাঝে ঢুকে যায়। তাদের মাঝে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও মতভেদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। একে অপরকে কাফের বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাশায়েখ এটা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং একত্র হয়ে বলেন—হে লোকসকল, তোমরা এক দ্বীনের অনুসারী। তোমাদের ইমাম একজন। কিবলা এক। কিতাব এক। শরিয়ত অভিন্ন। তবুও ইবলিস তোমাদের মাঝে ঢুকে বিভেদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সত্যের জয় সুনিশ্চিত। মিথ্যার পরাজয়ও অবধারিত। তাই তোমরা সত্যকে প্রকাশ করো। দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে মিথ্যার খণ্ডন করো। এতে হয়তো তোমাদের মতভেদ দূর হবে। ঐক্য ও হৃদ্যতা ফিরে আসবে। আবু হানিফা বলেন, ‘এই পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা কালামচর্চা শুরু করেছিলাম। আমরা যখন কথা বলতাম, শয়তান প্রবেশের ভয়ে আমরা তটস্থ থাকতাম। কান্নায় আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসত। ...আর আজ দেখছি কালামের মজলিসে মানুষ হইহই করে হাসে, বিদ্রুপ ও ঠাট্টা করে। প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করাই হয় তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। এই যেহেতু কালামের অবস্থা, তাই এটাকে পরিত্যাগ করাই কল্যাণ।’
আল্লামা তাফতাযানি লিখেন, ‘সালাফে সালেহিন থেকে কালামের সমালোচনা এবং এটা চর্চায় নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। এ মূলত সে কালাম যাতে ইয়াকিন আসার পরিবর্তে ইয়াকিন বিনষ্ট হয়, মুসলমানদের আকিদা বরবাদ হয়, আকিদার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় ফালসাফা তথা দর্শন চর্চা হয়। নতুবা এ শাস্ত্র (যাতে মূলত তাওহিদ ও আকায়েদ নিয়ে আলোচনা করা হয়) সর্বপ্রধান ওয়াজিব এবং সকল আমলের ভিত্তি। এটার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব কী করে?
কাযি সদর আবুল ইউসর বাযদাবি (৪৯৩ হি.) লিখেন, ‘ইলমুল কালাম’ চর্চার ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। অধিকাংশ মুতাকাল্লিম এটাকে সম্পূর্ণ বৈধ বলেছেন। আশআরি ও মুতাযিলাদের মত এটাই। বিপরীতে অধিকাংশ মুহাদ্দিস কালাম চর্চাকে অবৈধ বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রথম জীবনে এটা চর্চা করেছেন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে তিনি কালাম চর্চাকে বৈধ বলেছেন। এটাকে হাতিয়ারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ...কিন্তু আমাদের অঞ্চলের অধিকাংশ ফকিহ ও ইমাম মানুষকে প্রকাশ্যে এটা শিখতে, শেখাতে এবং এ বিষয়ে বিতর্ক করতে নিষেধ করেন। ...আমরা আকিদা ও ফিকহ উভয়ক্ষেত্রে আবু হানিফাকে অনুসরণ করি। তিনি (প্রথম জীবনে) কালাম শিক্ষা ও শিক্ষাদান, কালাম বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়ন ইত্যাদি সবকিছু বৈধ বলতেন। কিন্তু জীবনের শেষদিকে তিনি কালাম নিয়ে মুনাযারা পরিত্যাগ করেন। এর মাঝে তাঁর শাগরেদদের প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। তিনি তাদের যেভাবে প্রকাশ্যে ফিকহ শিক্ষা দিতেন, সেভাবে এটা শেখাতেন না...।’ অতঃপর বাযদাবি নিজের মত প্রকাশ করেন এভাবে: ‘তবে যেহেতু দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো দলিল-সহ জানা দরকার, এ জন্য ইলমে কালাম শেখা মুবাহ (বৈধ)। বরং কখনো কখনো ফরযে কিফায়াহ। তবে যে এটা শিখবে, সবার কাছ থেকে শিখবে না; বরং আহলে ইলম ও আহলে সুন্নাতের আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত এ শাস্ত্রে ইমাম পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে শিখবে।
ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহর সংকলক আল্লামা ইবনুল আলা দেহলভি (৭৮৬ হি.) ‘সিরাজিয়্যাহ’র উদ্ধৃতিতে লিখেন, ‘একদল আলেম ইলমে কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন। এটা মূলত দ্বীন নিয়ে ঝগড়া-বিবাদসম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার উপর আরোপিত হবে। কারণ, তখন সেটা বিদআত ও ফেতনা ছড়াতে সহায়ক হবে। আকিদার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। একইভাবে নিষিদ্ধ হবে যখন বিতর্ককারী অদূরদর্শী হবে (ফলে সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে)। অথবা সত্যের জয়ের জন্য নয়, নফসের জন্য লড়াই করবে। কিন্তু এসব নিষিদ্ধ বিষয়ের পরিবর্তে এটা যদি আল্লাহর মারিফাত, তাওহিদ, নবুওত এবং ইসলামের অন্যান্য আকিদা জানার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে এমন কালাম নিষিদ্ধ নয়।’
কারও মনে হতে পারে, এগুলো স্রেফ মুতাকাল্লিমিনের বক্তব্য। তারা তো কালামকে বাঁচাতে পক্ষে বলবেনই। তাদের বাইরে অন্যান্য আলেমের বক্তব্য দেখানো হোক। হাম্বলি ফকিহ ইবনে মুফলিহ লিখেন, ‘বিশুদ্ধ মাযহাব মতে ইলমে কালাম শেখা বৈধ ও অনুমোদিত। এটার সহায়তায় আহলে বিদআতের সঙ্গে মুনাযারা এবং তাদের খণ্ডন করা, তাদের বিরুদ্ধে (এর মানহাজে) গ্রন্থ লেখা জায়েয। এটাই (হাম্বলি মাযহাবের) মুহাক্কিক ইমামদের মত। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়; কিন্তু সেটা খোদ তার কর্মের বিপরীত। কারণ, ইমাম তাঁর নিজের ‘আর-রাদ্দু আলায যানাদিকাহ’ গ্রন্থে কুরআন-সুন্নাহ এবং আকলি দলিলের মাধ্যমে তাদের খণ্ডন করেছেন। বরং তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে বোঝা যায়, কালামের বিরোধিতায় দেওয়া প্রথম বক্তব্য থেকে তিনি ফিরে এসে বলেন, আমরা এ ব্যাপারে চুপ থাকতাম। কিন্তু যখন তারা এগুলোতে প্রবেশ করল, তখন তাদের খণ্ডন না করে উপায় ছিল না।’ ‘ইকনা’র ব্যাখ্যায় আরেক হাম্বলি আলেম বাহুতি লিখেন, “নিন্দিত অথবা হারাম ইলমে কালাম হলো সেটা, যেটা স্রেফ যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যেটা ‘নস’ তথা কুরআন-সুন্নাহর সমর্থনে আকলের সমন্বয়ে গঠিত, সেটা ‘আসলুদ-দ্বীন’ (আকিদা) এবং আহলে সুন্নাতের মানহাজ।” আরেক হাম্বলি আলেম সাফারিনি লিখেন, ‘আমাদের ইমামগণ যে ইলমে কালাম শিখতে নিষেধ করেছেন, সেটা হলো ফালসাফা (দর্শন), তাবিল (রূপক ব্যাখ্যা), ইলহাদ (সীমালঙ্ঘন, বক্রতা ও বিকৃতি), মিথ্যা-জোচ্চুরি, কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা ইত্যাদি দিয়ে ভরা।’ বোঝা গেল, সকল মাযহাব-মাসলাকের মুহাক্কিক আলেমের সর্বসম্মতিক্রমে সত্তাগতভাবে কালাম নিন্দনীয় নয়; বরং কীভাবে এটাকে ব্যবহার করা হবে সেটার উপর এর বিধান নির্ভর করবে।
টিকাঃ
১৩২. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, গাযালি (১/৯৪)।
১৩৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা, যাহাবি (৬/৩৯৭)।
১৩৪. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি (২/৯৪২)।
১৩৫. ফাযায়িলু আবি হানিফা (১১৮)।
১৩৬. আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ, কুরাশি (১/৩১)।
১৩৭. যাম্মুল কালাম, হারাভি (৫/৭২-৭৩)।
১৩৮. মানাকিবে শাফেয়ি, বাইহাকি (১/৪৫৭)।
১৩৯. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৬৩-৬৪)। আরও দেখুন: ইমাম আশআরির দিকে সম্বন্ধকৃত পুস্তিকা 'ইসতিহসানুল খাওজ ফি ইলমিল কালাম'।
১৪০. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৯৩)।
১৪১. দেখুন: মানাকিব, বাযযাযি (১৩৮-১৩৯)। তাবয়িন কাযিবিল মুফতারি, ইবনে আসাকির (৩৩৪)।
১৪২. শুআবুল ঈমান, বাইহাকি (১/৯৫)।
১৪৩. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৭-৫৮)।
১৪৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (৯)। দেখুন : আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (১৯১)।
১৪৫. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)। দেখুন: তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬-২৭৭)।
১৪৬. মানাকিব, মক্কি (১৮৩-১৮৪)।
১৪৭. শরহুল আকায়েদ (২৪)।
১৪৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন (১৫-১৬)।
১৪৯. ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬)।
১৫০. আল-আদাবুশ শরইয়্যাহ (১/২২৬-২২৭)।
১৫১. কাশশাফুল কিনা (৭/৮)।
১৫২. লাওয়ামিউল আনওয়ার (১/১১-১১২)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কেবল সালাফে সালেহিনের প্রথম যুগে কুরআন-সুন্নাহর মানহাজ থেকে বিচ্যুত লোকজন কালামকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ভ্রান্তি প্রচারে ব্যবহার করেছে আর ইসলামিকরণের পরে সেটা কেবল ইতিবাচক অর্থে, কুরআন ও সুন্নাহর খেদমতে, আহলে সুন্নাতের সুনির্মল আকিদা প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সরল সমীকরণ সঠিক নয়। বরং কালামচর্চার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন অব্যাহত থেকেছে।
কখনো কখনো এর সঙ্গে দর্শন ও মানতেক মিশ্রিত হয়ে কুরআন-সুন্নাহর সরল ও সহজ আকিদার পথে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করেছে। আকিদার নামে এমন অনেক গ্রন্থ লেখা হয়েছে, যেগুলোর মাঝে আর দার্শনিকদের গ্রন্থাবলির মাঝে ফারাক করা কঠিন; বরং সেগুলোতে সকল ইলম আছে, স্রেফ আকিদাটাই নেই। ইসলামের ইতিহাসের মাঝামাঝি শতাব্দের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি আমাদের কথার সুস্পষ্ট সাক্ষী। খোদ তাফতাযানির ভাষায়— ‘সামইয়্যাত (তথা গায়েব ও আখেরাতবিষয়ক কিছু আকিদা, যা কেবল শেষের দিকে আলোচনা করা হয়) যদি না থাকত, তবে এসব (কালামি) গ্রন্থ আর ফালসাফা তথা দর্শনের গ্রন্থগুলোর মাঝে কোনো ফারাক খুঁজে পাওয়া যেত না। ’
তাই কালামের ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখা উচিত, কালাম ওহিভিত্তিক মানহাজের বিকল্প নয়; সুন্নতে নববির হেদায়াতের সমার্থক নয়; ইসলামি আকিদার উৎস নয়। ইসলামি আকিদার উৎস ও ক্ষেত্র হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ। আধুনিক বিভিন্ন শাস্ত্রকে ইসলামের সেবায় ব্যবহার, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তির অপনোদন এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার বিষয়টি খোদ কুরআন-সুন্নাহতেই বিদ্যমান। এটা নবিদের দাওয়াতের সুস্পষ্ট ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কুরআন ও সুন্নাহ এমন সুস্থ যুক্তির সমৃদ্ধ ভান্ডার। এর জন্য নতুন কোনো শাস্ত্র গঠন নিষ্প্রয়োজন। তাই ‘কালাম’ বলতে যদি নিত্যনতুন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, যুগ সমস্যার সংকটে ইসলামকে নবরূপে উপস্থাপন বোঝায়, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আকিদার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা বোঝায়, তবে এমন যুক্তিতর্ক ইসলামে সাধুবাদযোগ্য। সেটা করতে গিয়ে যদি ইসলামের বাইরে থেকে বিভিন্ন উপাদান ও উপকরণ নিতে হয়, বিভিন্ন পরিভাষা ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি আকিদাকে ব্যাখ্যা করতে হয়, তবে সেটা অবশ্যই কুরআন-সুন্নাহর বেঁধে দেওয়া সীমার ভিতরে হতে হবে, কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতি এবং সালাফে সালেহিনের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হতে হবে।
এমন ‘কালাম’ ইসলামে গ্রহণযোগ্য। বরং এ পদ্ধতিতে কেবল ‘ইলমে কালাম’ নয়, জগতের যেকোনো শাস্ত্রকে ইসলামের সেবায় ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। বিপরীতে যদি কোনো শাস্ত্র ওহির ফিতরতি পথে প্রতিবন্ধক হয়, ইসলামি আকিদা ও উসুলকে এমন পথে নিয়ে যায় যা সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের পথ নয়, তবে ইসলামে এমন কোনো শাস্ত্র গ্রহণ ও চর্চার অনুমোদন নেই। সেটার নাম, উৎস কিংবা প্রতিষ্ঠাতা যে বা যারাই হোন না কেন।
কালামের ময়দানের সিপাহসালার হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালি রহ. কালামের পক্ষের ও বিপক্ষের লোকদের মতামত ও দলিল-প্রমাণ বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তাঁর নিজের লম্বা মতামত তুলে ধরেন, যা সকল প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এবং কালামের ময়দানের এক অগ্রদূতের বক্তব্য হিসেবে মূল্যায়িত। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো :
"...‘জাদাল’ ও ‘কালামশাস্ত্র’ নিয়ে মানুষ প্রান্তিকতায় লিপ্ত—বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির শিকার। একদল এটাকে বিদআত ও হারাম ফাতাওয়া দিয়েছে। কালাম নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে দুনিয়ার সকল গুনাহ নিয়ে উপস্থিত হওয়াকে উত্তম বলেছে! আরেক দল এটাকে ওয়াজিব ও ফরয ঘোষণা করেছে। সকল আমলের চেয়ে উত্তম, সবচেয়ে বড় ইবাদত ঘোষণা করেছে। কারণ, তাদের মতে, এটা ইলমে তাওহিদ বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিরক্ষার হাতিয়ার। প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন শাফেয়ি, মালেক, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি ও সালাফের মুহাদ্দিসিনে কেরাম। তারা বিভিন্ন যুক্তি দেখান। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সাহাবায়ে কেরাম এমন কোনো জ্ঞান চর্চা করেননি। তা ছাড়া, হাদিসে দ্বীনের ব্যাপারে বিতর্ক করতে নিষেধ করা হয়েছে। বিপরীত দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন মুতাকাল্লিমিন। তাদের দলিল হচ্ছে কুরআনের সেসব আয়াত এবং সালাফের সেসব ঘটনা, যেখানে তারা যুক্তি ও বুদ্ধির আলোকে বাতিলকে খণ্ডন করেছেন, কাফের ও বিদআতিদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছেন। '
‘মোটকথা, এক কথায় কালামশাস্ত্রকে ভালো কিংবা মন্দ বলার সুযোগ নেই। কেননা, এর মাঝে উপকার ও অপকার, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক দুটোই আছে। ইতিবাচক দিকের প্রতি লক্ষ করলে এটা হালাল, আর নেতিবাচক দিকে লক্ষ করলে হারাম। এটার উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর দিক হলো, মনে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি করা, ঈমান-আকিদার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের ভিত দুর্বল করে ফেলা, মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গিগত গোঁড়ামি তৈরি করা, প্রতিপক্ষকে হারানোর নেশার সামনে সত্য ও হককে গৌণ বানিয়ে ফেলা। বিপরীতে এর উপকারী দিক হিসেবে মনে করা হয়, বিভিন্ন বিষয়ের হাকিকত তথা স্বরূপ উদ্ঘাটন, বাস্তবতা উপলব্ধীকরণ ইত্যাদি।
কিন্তু আফসোস! কালামের মাঝে এই মহান উদ্দেশ্যগুলো পূর্ণ করার ক্ষমতাই নেই। বরং এর মূল কাজই হলো মানুষের সন্দেহ-সংশয় আরও বাড়িয়ে দেওয়া, অন্ধকারের মাঝে ছেড়ে দেওয়া।’ গাযালি বলেন, ‘এই কথা যদি কোনো মুহাদ্দিস বা হাশাভি বলত, তুমি হয়তো তাকে কালামের শত্রু গণ্য করে পাত্তা দিতে না। কিন্তু তোমাকে এটা বলছে সে ব্যক্তি যে কালামকে চর্চা করেছে, সবদিক থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। কালামের মাঝে প্রবেশ করে মুতাকাল্লিমিনের ইমাম হয়ে গেছে। হ্যাঁ, কালাম কিছু কিছু বিষয়ের ভালো ব্যাখ্যা দেয়, অস্পষ্টতা দূর করে। কিন্তু সেটা একেবারেই দুর্লভ। বরং কালাম এমন বিষয়ের অস্পষ্টতা দূর করে, যেগুলো কালাম ছাড়াই বোঝা সম্ভব! ...কারণ, কালামের মাঝে যেসব যুক্তি থাকে, কুরআন-সুন্নাহতেও সেসব সুন্দর যুক্তি রয়েছে। বিপরীতে কালামের মাঝে যে অস্পষ্ট প্রকরণ এবং জটিল বিভাজন-বিন্যাসকরণ ইত্যাদি রয়েছে, কুরআন- সুন্নাহ ও স্বচ্ছ হৃদয় সেগুলো থেকে মুক্ত। আর এ কারণেই শাফেয়ি-সহ অন্য ইমামগণ কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন। '
তা ছাড়া, সাধারণ মানুষকে এ শাস্ত্রে জড়িয়ে ফেলার পরিণতি সুখকর নয়। এ জন্য এটা চর্চা করলেও সীমিত পরিসরে করতে হবে। খোদ ইমাম আজম রহ. আবু ইউসুফকে প্রদত্ত তার প্রসিদ্ধ ওসিয়তের মাঝে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মাঝে কালাম ও উসুলুদ্দিন নিয়ে কথা বলো না। কারণ, এমন করলে তারা এক্ষেত্রে তোমার তাকলিদ (অনুসরণ) করবে এবং তাতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।’ শুরুম্বুলালি লিখেন, ‘ইমাম আবু হানিফা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কালাম শেখা এবং মুনাযারাকে মাকরুহ বলেছেন।’ ফাতাওয়া আলমগিরিতেও প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কালাম শেখা ও চর্চা করা মাকরুহ বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১৫৩. দেখুন: শরহুল আকায়েদ (২৩)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৬৪)।
১৫৪. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, গাযালি (১/৯৪-৯৯)।
১৫৫. প্রাগুক্ত (১/৯৪-৯৯)।
১৫৬. মানাকিব, মক্কি (৩৭৩)।
১৫৭. গুনইয়াতু যাবিল আহকাম (১/৩১৩) [দুরারুল হুক্কামের সঙ্গে সংযুক্ত হাশিয়া।।
১৫৮. দেখুন : ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৩৭৭)।
📄 কালাম নিষিদ্ধ হলে আকিদা নিয়ে সকল বিতর্কও নিষিদ্ধ
এখানে আরও একটি বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। সেটা হলো, একদল লোক সালাফের বিভিন্ন বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে কালামকে সর্বাঙ্গীণভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ মনে করলেও আকিদাকেন্দ্রিক অর্থহীন ঝগড়া-বিবাদ ও তর্কবিতর্ককে ঠিকই বড় জিহাদ এবং দ্বীনের বিশাল খেদমত মনে করেন। অথচ সালাফের কালামচর্চার নিষেধাজ্ঞা স্রেফ শাস্ত্র হিসেবে নয়, বরং এই অর্থহীন বিতর্কের মূল উপকরণ হওয়ার কারণে। ইমাম আজমসহ সালাফের বক্তব্যে এ বাস্তবতা স্পষ্ট থাকলেও তারা এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যেমন—ইমাম আজম রহ. যখন পুত্র হাম্মাদকে কালামচর্চা করতে নিষেধ করেন, তখন কারণ হিসেবে বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে মুনাযারা করার সময় আতঙ্কিত থাকতাম যেন কেউ বিভ্রান্ত না হই। আর তোমরা এখন এটা নিয়ে মুনাযারা করোই প্রতিপক্ষকে গোমরাহ করতে। যে ব্যক্তি এমন কামনা করে, সে মূলত তার কুফর কামনা করে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কুফর কামনা করে, দেখা যায়, সে অন্যের আগে নিজে তাতে পতিত হয়। এটা নিষিদ্ধ। এ ধরনের মুতাকাল্লিমের পিছনে নামায হবে না।’ এখানে স্পষ্ট যে, শাস্ত্রটা কালাম হোক কিংবা অন্যকিছু হোক সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, দ্বীন নিয়ে বিবাদ-বিতর্ক করা, অন্য মুসলিমকে ভ্রান্ত সাব্যস্তের কোশেশ করাটাই নিন্দনীয়।
একইভাবে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত আরেকটি ঘটনাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। আবু ইউসুফ রহ. বর্ণনা করেন, ‘আমরা আবু হানিফা রহ.-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় একদল লোক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে এলো। এসে বলল, এই ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে। আর দ্বিতীয় জন তাকে নিষেধ করে বলে, কুরআন মাখলুক নয় (আমরা তাদের ব্যাপারে কী করব?)। ইমাম বললেন, ‘তাদের কারও পিছনে নামায পড়ো না।’ আমি বললাম, প্রথম জনের ব্যাপার তো স্পষ্ট। কারণ, সে কুরআনকে মাখলুক বলে। কিন্তু দ্বিতীয় জনের পিছনে নামায বাদ দেওয়ার কারণ কী? তার কথা তো ঠিকই আছে। ইমাম বললেন, ‘কারণ, তারা দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছে। অথচ দ্বীন নিয়ে বিবাদ বিদআত।’
এখানে কালামের কোনো উল্লেখ নেই; বরং স্রেফ কুরআন নিয়ে বিতর্ককেও ইমাম নিষেধ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ককারীর পিছনে নামায পড়তে বারণ করেছেন। ফাতহুল কাদিরে আরও স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুতাকাল্লিম তথা কালাম চর্চাকারীর পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়, সত্য বললেও।’ অর্থাৎ আকিদা নিয়ে যে বিতর্ক করবে সে-ই বিদআতি গণ্য হবে, হোক সে সত্যবাদী। তার পিছনে নামায বর্জন করা হবে।
সুতরাং বিতর্ক কোন নামে হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং আহলে সুন্নাতের মাঝে এগুলো নিয়ে বিতর্ক করা সর্বতোভাবেই নিন্দনীয়। কারণ হলো, এগুলো দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় নয়। সামগ্রিকভাবে সকলেই হকের উপর। স্রেফ উত্তম-অনুত্তমের ব্যাপার। কিন্তু সেটা নিয়ে যখন বিতর্ক অব্যাহত থাকবে, একপর্যায়ে তা বিরাট বিষয়ে পরিণত হবে। ফেতনা ছড়াবে। দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ হ্রাস পাবে। উপরন্তু শাখাগত বিষয়ে বিতর্ক শুরু করলে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি অনিবার্য হবে। ঐক্য বিনষ্ট হবে। উম্মাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয়ের মাঝে ডুবে যাবে। দ্বীনের শাখাগত বিষয়গুলোকে মৌলিক বানিয়ে ফেলবে। এটা অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার, যা আমাদের চারপাশে আমরা নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। ফলে কালামকে নিন্দা করে ‘আকিদা’র নামে উম্মাহর মাঝে শাখাগত ও গৌণ বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক করা, একে অন্যকে আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করা এবং বিদআতি আখ্যা দিয়ে মুসলিম উম্মাহর দুর্বল দেহকে কেটে টুকরো টুকরো করা আর যা-ই হোক, ইসলামের কাজ নয়। এটা এক ধরনের তালবিসে ইবলিস তথা শয়তানের ধোঁকা। কালামকে নিন্দা করলে আকিদার নামে শাখাগত বিষয় নিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করারও নিন্দা করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘হেদায়াত লাভের পরে কোনো সম্প্রদায় তখনই বিভ্রান্ত হয়, যখন তারা বিতর্কে জড়ায়। ’ ফলে দ্বীনের শাখাগত সকল বিষয় নিয়ে বিতর্ক বাদ দিতে হবে। কারণ, তাতে হেদায়াত নেই, কল্যাণ নেই। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারা হাজার বছর ধরে আকিদার শাখাগত বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধ করছে। আজ পর্যন্ত কোনো সর্বসম্মত সমাধানে আসতে পেরেছে? পারেনি। কিয়ামত পর্যন্ত আসতে পারবে না। কারণ, এগুলো একমত হওয়ার বিষয়ই নয়। আবার এগুলোতে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও তাদের একদল অন্যদলকে কাফের বা জাহান্নামি বলতে পারছে না. নিজেকে জান্নাতি সনদও দিতে পারছে না। ফলে এই সহস্রাধিক বছরের বিতর্ক একটা বদ্ধগলিতে গিয়ে আটকা পড়ছে। এখান থেকে উম্মাহকে বের হতে হবে। দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিলে সকলে মিলে সেটার বিরোধিতা করতে হবে। শিরকের পরিবর্তে তাওহিদ এবং বিদআতের পরিবর্তে সুন্নাহ প্রচারের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু নিজেদের মাঝে বিদ্যমান শাখাগত বিষয়ে বিতর্ক পরিহার করতে হবে। উম্মাহর আলেম ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ এটা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল।
টিকাঃ
১৫৯. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)। তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬-২৭৭)।
১৬০. তালখিসুল আদিল্লাহ, সাফফার (৫৬)।
১৬১. ফাতহুল কাদির (১/৩৫১)।
১৬২, তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩২৫৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৪৮)
📄 আকিদা বিষয়ে ইমাম আজমের গ্রন্থগুলোর প্রামাণ্যতা
আকিদা বিষয়ে লিখিত পাঁচটি প্রসিদ্ধ প্রাচীন পুস্তিকা ইমাম আবু হানিফা রহ.- এর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। সেগুলো হলো : এক. আল-ফিকহুল আকবার। সংকলক : ইমামপুত্র হাম্মাদ ইবনে আবু হানিফা। দুই. আল-ফিকহুল আবসাত। সংকলক : আবু মুতি বলখি। তিন. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম। সংকলক : আবু মুকাতিল সমরকন্দি। চার. আর-রিসালাহ। বসরার আলেম উসমান আল- বাত্তির কাছে লেখা ইমামের চিঠি। পাঁচ. আল-ওয়াসিয়্যাহ। জীবনের শেষলগ্নে ইমামপ্রদত্ত ওসিয়ত সংকলন।
যেহেতু এসব গ্রন্থ অত্যন্ত প্রাচীন, সহস্র বছরের চেয়েও বেশি পুরোনো, ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব গ্রন্থের প্রামাণ্যতার উপর আপত্তি ওঠে, যেমন প্রাচীন অসংখ্য গ্রন্থের উপরই উঠেছে। এগুলোর উপর ওঠা আপত্তি মোটা দাগে দুই ধরনের। নিচে আমরা সেসব আপত্তি এবং সেগুলোর উপর আমাদের পর্যালোচনা ধারাবাহিকভাবে পেশ করছি।