📄 আহলে সুন্নাতের ইমাম
একদিকে ইমাম আজম রহ.-এর ইলমি সনদ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী; কারণ, তিনি নিজে তাবেয়িদের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে তাঁর শিক্ষকগণ প্রথম সারির তাবেয়ি, সাহাবাদের শাগরেদ এবং তাদের শাগরেদদের শাগরেদ। ফলে তিনি দ্বীন ও আকিদা গ্রহণ করেছেন এ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ একদল মানুষের হাতে। খলিফা মনসুর ইমাম আজমকে জিজ্ঞাসা করলেন, নুমান, আপনি ইলম নিয়েছেন কাদের থেকে? ইমাম জবাবে বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাবের ছাত্রদের মাধ্যমে উমর থেকে। আলি ইবনে আবি তালিবের ছাত্রদের মাধ্যমে আলি থেকে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ছাত্রদের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ছাত্রদের মাধ্যমে ইবনে মাসউদ থেকে।' মনসুর বললেন, 'পবিত্র সব মানুষের সনদ আপনার হাতে। '
অন্যদিকে আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার সাগরসম গভীর জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, বিশুদ্ধ আকিদার প্রচার ও বিভ্রান্ত ধ্যানধারণা খণ্ডনে, খারেজি, কাদারিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া, মুতাযিলা-সহ সে যুগের বিভিন্ন গোমরাহ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, ত্যাগ ও কুরবানির ফলে আল্লাহ তাঁকে উত্তম বদলা দান করেন। ফলে বাইরের ও ভিতরের এত সংকট ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে ফিকহের মতো আকিদার ক্ষেত্রেও আহলে সুন্নাতের ইমাম বানিয়ে দেন। পৃথিবীর বিশাল সংখ্যক মানুষকে তাঁর বিশ্বাস ও ইজতিহাদের অনুসারী বানিয়ে দেন। ইসলামের ইতিহাসে তাঁকে চিরদিনের জন্য অনিবার্য এবং গোটা মানবেতিহাসে অমর করে রাখেন।
মোটকথা, ইমাম আজম রহ.-এর আহলে সুন্নাতের ইমাম হওয়া একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত বিষয়। যুগে যুগে ইমামগণ এটার স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং কাজে পরিণত করে দেখিয়েছেন। ফলে ইমাম তহাবিকে দেখি হিজরি তৃতীয় শতকে এসে ইমাম আজম রহ.-এর আকিদা সংকলন করে আকিদাহ তহাবিয়্যাহ লিখেন। গ্রন্থের শুরুতেই স্পষ্ট করে বলে দেন, 'এটা ফুকাহায়ে মিল্লাত ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর দুই শাগরেদ আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ.-এর আকিদা।' এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ, তিনি সালাফে সালেহিনের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে বর্ণিত শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্মের দ্বিতীয় প্রজন্ম। উপরন্তু তিনি সালাফের ফিকহ এবং আকিদার ধারক ও বাহক, প্রচারকারী ও প্রহরী। ফলে ফিকহ ও আকিদা উভয় ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করাই আবশ্যক এবং এটাই নিরাপদ। তাঁর মাসলাক—যা মূলত সাহাবায়ে কেরাম ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পথ—এর উপর থাকা জরুরি। এবার আমরা এ বিষয়ে আলেমদের কিছু মূল্যায়ন উল্লেখ করব :
শাইখুল হারাম আবদুল আযিয ইবনে আবি রাওয়াদ (১৫৯ হি.) বলেন, 'আবু হানিফা রহ. আমাদের ও মানুষের মাঝে সত্যের মাপকাঠি। যে তাঁকে ভালোবাসবে, তাঁর সঙ্গে থাকবে, সে আহলে সুন্নাত। আর যে তাঁকে অপছন্দ করবে, তাঁর প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, সে আহলে বিদআত।'
ওয়াকি ইবনুল জাররাহ (১৯৭ হি.) বলেন, 'ফিকহ ও কালাম (তথা উসুলুদ্দিন=আকিদা)-এর ক্ষেত্রে আবু হানিফার যে গভীর পাণ্ডিত্য ছিল, তা অন্য কারও ছিল না। এর সুবাদে তিনি মুসলমানদের জন্য এক সরল কর্মপদ্ধতি তৈরি করেন। সশংয়ের অন্ধকারে তাঁর মাযহাব আলো, মুক্তি ও আশ্রয়ে পরিণত হয়।'
আবুল মুজাফফর আল-ইসফারায়েনি (৪৭১ হি.) লিখেন, 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ি, মালেক, আওযায়ি, দাউদ, যুহরি, লাইস ইবনে সা'দ, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুফিয়ান সাওরি, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হানযালি, মুহাম্মাদ ইবনে আসলাম তুসি, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া, হুসাইন ইবনুল ফযল বাজালি, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, যুফার, আবু সাওর প্রমুখ হিজায, শাম, ইরাক, খোরাসান, মা-ওয়ারাউন-নাহর (ট্রান্স-অক্সিয়ানা)-সহ সবার আকিদা ছিল এক। এটাই ছিল সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের আকিদা। '
ইবনে তাইমিয়্যাহ (৭২৮ হি.) লিখেন, 'শাফেয়ি, মালেক, সাওরি, আওযায়ি, ইবনুল মুবারক, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ সবার আকিদা ছিল এক ও অভিন্ন। এই একই আকিদা লালন করতেন ফুযাইল ইবনে ইয়ায, আবু সুলাইমান দারানি, সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুসতরি প্রমুখ (সুফি) মাশায়েখে কেরাম। দ্বীনের মৌলিক আকিদার ক্ষেত্রে এসব ইমাম মতভেদ করেননি। একই আকিদা পোষণ করতেন ইমাম আবু হানিফা রহ.। তাওহিদ, তাকদির ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর থেকে বর্ণিত আকিদা অন্যান্য ইমামের আকিদার মতোই। আর এটাই সাহাবি ও তাবেয়িদের আকিদা, কুরআন ও সুন্নাহর আকিদা।'
এ কারণে হানাফি মুহাক্কিক আলেমগণ যুগে যুগে ফিকহ ও আকিদা উভয় ক্ষেত্রে ইমাম আজমের অনুসরণ করেছেন, তাঁর অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) বলেন, ‘তাওহিদ ও সিফাতের ইলমের ক্ষেত্রে কর্তব্য হলো কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিদআত বর্জন করা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথে অবিচল থাকা, যে পথে ছিলেন সাহাবা, তাবেয়িন এবং সকল সালাফে সালেহিন। এ পথেই অটল ছিলেন আমাদের সালাফ তথা ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ এবং তাঁদের সকল শাগরেদ। ’
ফখরুল ইসলামের সহোদর আবুল ইউসর বাযদাবি (৪৯৩ হি.) বলেন, ‘আমরা আবু হানিফার অনুসরণ করি। তিনি উসুল ও ফুরু (আকিদা ও ফিকহ) উভয় ক্ষেত্রে আমাদের ইমাম।’ তিনি অন্যত্র বলেন, ‘আবু হানিফা এই মাসআলাতে আহলে সুন্নাতের প্রধান (রইস)। কেবল এই মাসআলা নয়; তিনি সকল মাসআলাতে আহলে সুন্নাতের প্রধান। আহলে সুন্নাতের সকল মাযহাব আবু হানিফা রহ. থেকেই বর্ণিত।’ তিনি তাঁর ‘উসুলুদ্দিন’-শীর্ষক পুরো গ্রন্থে নিজেদের মতাদর্শকে ‘আহলে সুন্নাত’ বলেছেন। বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে আবু হানিফার অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
মাইমুন নাসাফি (৫০৮ হি.) বলেন, ‘আমাদের আসহাবগণ (আকিদার) মাযহাব গ্রহণ করেছেন আবু হানিফা রহ. থেকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবু হানিফার শাগরেদ ইমামগণ উসুল ও ফুরু তথা ফিকহ ও আকিদা উভয় ক্ষেত্রে তাঁর অনুসারী ছিলেন, মুতাযিলাদের মাযহাব থেকে দূরে ছিলেন। মা-ওয়ারাউন-নাহর, খোরাসান, মারভ, বলখ ইত্যাদি অঞ্চলের আলেমগণ প্রাচীন কাল থেকেই এই (হানাফি) মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। ’
তাজুদ্দিন সুবকি (৭৭১ হি.) তাঁর প্রসিদ্ধ ‘আসসাইফুল মাশহুর’ গ্রন্থে ‘আশআরি মাযহাবের’ বিপরীতে ‘হানাফি মাযহাব’, ‘হানাফি জামাতের আকিদা’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন।
আবু শাকুর সালেমি (মৃ. ৪৬০ হি. পরবর্তী) তাঁর বিখ্যাত ‘আত-তামহিদ’ গ্রন্থে ইমাম আজমকে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’ (ফিরকায়ে নাজিয়ার) ইমাম হিসেবে তাঁর মত উল্লেখ করেছেন। পুরো গ্রন্থে মুতাযিলা, আশআরিদের বিপরীতে ‘আহলে সুন্নাত’ কিংবা ‘ফুকাহায়ে আহলিস সুন্নাহ’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।
আবু ইসহাক সাফফার বুখারি (৫৩৪ হি.) তাঁর ‘তালখিসুল আদিল্লাহ’-শীর্ষক পুরো গ্রন্থ জুড়েই ইমাম আজম রহ.-এর আকিদাগুলো পরিবর্তিত সময়ের আলোকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ, তাঁর গ্রন্থে মুতাকাল্লিমিন তথা কালামি ধারার প্রভাব সুস্পষ্ট হলেও তিনি ইমাম আজম রহ. এবং সালাফে সালেহিনকেই আগে রেখেছেন। সর্বত্র ইমাম আজমের মতামতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
নাজমুদ্দিন (মানকুবারস) নাসেরিও (৬৫২ হি.) তাঁর ‘আন-নুরুল-লামি’তে ইমাম তহাবির আকিদাকে আহলে সুন্নাতের একাধিক হানাফি মুজতাহিদ ইমাম, যথা-আবু হাফস কাবির, হাকিম সমরকন্দি, আবু আবদুর রহমান আল-বুখারি এবং আবু মনসুর আল-মাতুরিদি প্রমুখ সকলের বক্তব্যের আলোকে ব্যাখ্যার কথা বলেছেন।
আল্লামা শায়খ যাদাহ ‘নাজমুল ফারায়েদ’ গ্রন্থে সর্বত্র আশআরিদের বিপরীতে ‘মাশায়েখে হানাফিয়্যাহ’ বা হানাফি মাশায়েখ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
এভাবে একদল বড় বড় হানাফি ইমাম নিজেদের সরাসরি ইমাম আজম আবু হানিফার প্রতি সম্পৃক্ত করেছেন; ইমাম তহাবি বা মাতুরিদি কিংবা পরবর্তী কারও প্রতি সম্পৃক্ত করেননি। কারণ, তারা ইমাম তহাবি ও মাতুরিদির মতো আলিমদের স্বতন্ত্র ও ভিন্ন কোনো মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মনে করতেন না; বরং তাদের হানাফি মাযহাব ও আকিদার অনুসারী মুজতাহিদ মনে করতেন। নাসাফি বাহরুল কালামে লিখেন, ‘শায়খ ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি উসুল ও ফুরু (আকিদা ও ফিকহ) উভয় ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর প্রচণ্ড বেশি অনুসারী ছিলেন।’ আর এটা তো স্পষ্ট যে, মাযহাবের অনুসারী এবং মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত কোনো আলেম যত বড়ই হোন না কেন তাঁর নামে আলাদাভাবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া নিষ্প্রয়োজন।
টিকাঃ
১০৫. দেখুন: ফাযায়িলু আবি হানিফা (১০১)।
১০৬. আখবারু আবি হানিফাহ (৮৬)। মানাকিব, মক্কি (২৮৫)।
১০৭. তালখিসুল আদিল্লাহ, সাফফার (৫৩)।
১০৮. আত-তাবসির ফিদ-দ্বীন (১৮৪)।
১০৯. মাজমুউল ফাতাওয়া ৫/২৫৬।
১১০. উসুলুল বাযদাবি (৩)।
১১১. উসুলুদ্দিন (১৬)।
১১২. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১২০)।
১১৩. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৫০)।
১১৪. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (১/৪৯৮)।
১১৫. প্রাগুক্ত (১/৫৫২-৫৫৩)।
১১৬. দেখুন: আসসাইফুল মাশহুর (১১, ১২, ১৭ ইত্যাদি)।
১১৭. উদাহরণস্বরূপ দেখুন: আত-তামহিদ ফি বায়ানিত তাওহিদ (পাণ্ডুলিপি) (৬৪, ৮০)।
১১৮. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (১৩২, ২০৯)।
১১৯. আবু শুজা মানকুবারস সালেহি কৃত 'আন-নুরুল-লামি' (পাণ্ডুলিপি) (৫)।
১২০. উদাহরণস্বরূপ দেখুন: নাজমুল ফারায়েদ ওয়া জামউল ফাওয়ায়েদ (৪০-৪২)।
১২১. আত-তামহিদ ফি উসুলিদ্দিন (৩৫)।
১২২. দেখুন: মাসালিকুল আবসার, উমরি (৬২)।
📄 কালামের সমালোচনায় ইমাম
ইলমুল কালামের ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল? যেমনটা পিছনে বলে এসেছি, প্রথম জীবনে ইমাম নিজেই ছিলেন একজন বড় মাপের মুতাকাল্লিম (কালাম বা তর্কশাস্ত্রবিদ)। ‘কালাম’-শাস্ত্রে তিনি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। হারেসি (৩৪০ হি.) লিখেন: ‘আবু হানিফা রহ., আবু ইউসুফ, যুফার, মুহাম্মাদ, হাম্মাদ ইবনে আবু হানিফা—তারা প্রত্যেকেই কালাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। তারা মানুষের সঙ্গে বিতর্ক করেছেন, মুনাযারা করেছেন, প্রতিপক্ষকে পরাভূত করেছেন।
কিন্তু পরবর্তীকালে এ শাস্ত্রের প্রতি তিনি আস্থা হারান এবং সুন্নাহ, ফিকহ ও ইজতিহাদে মনোযোগী হন। জীবনের এক ময়দান ছেড়ে অন্য ময়দানে যাওয়াটাই প্রমাণ করে প্রথমটার প্রতি তিনি বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ ছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর প্রশান্তি, তৃপ্তি এবং জীবনের মঞ্জিল খুঁজে পাননি। ফলে পথ পরিবর্তন করেন। মুহাম্মাদ সালেহি (৯৪২ হি.) বর্ণনা করেন, ‘জীবনের প্রথম দিকে ইমাম প্রবৃত্তিপূজারী (তথা বাতিল) ফিরকাগুলোর সঙ্গে বিতর্ক ও মুনাযারা করতেন। একপর্যায়ে তিনি (তর্কশাস্ত্রে) শিরোমণিতে পরিণত হন। কিন্তু পরবর্তীকালে তর্ক ছেড়ে দেন। ফিকহ ও সুন্নাহর প্রতি মনোযোগী হন। আল্লাহ তাকে ইমাম বানিয়ে দেন। ’
ইমাম কেবল কাজের মাধ্যমেই এটা প্রমাণ করেছেন এমন নয়, বরং মুখেও পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন এবং কালামশাস্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন। যুফার ইবনুল হুযাইল থেকে বর্ণিত, ইমাম আজম বলেন, ‘আমি কালাম চর্চা করতাম। এ শাস্ত্রে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করি। একদিন এক নারী আমাকে তালাকের একটি সাধারণ মাসআলা জিজ্ঞাসা করে। আমি জবাব দিতে পারিনি। ...পরে এ শাস্ত্র পরিত্যাগ করে হাম্মাদের মজলিসে যোগদান করি।’ মক্কির বর্ণনামতে, ইমাম আজম বলেন, ‘আমি কালামশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান ও প্রসিদ্ধির অধিকারী ছিলাম। প্রায় বিশ বছরের অধিক সময় এ শাস্ত্র ও বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কালামকে আমি সর্বোত্তম শাস্ত্র মনে করতাম। আমি এটাকে দ্বীনের মূল বিষয় বলতাম। দীর্ঘ একটা সময় পরে আমার নিজের মনে অনেক ভাবনা জমতে থাকে। আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকি, আমরা যা জানি আমাদের পূর্বে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িগণও তো এগুলো জানতেন। বরং তারা আমাদের চেয়ে আরও বেশি জানতেন, বেশি বুঝতেন। প্রত্যেকটি বিষয় বেশি চিনতেন। অথচ তারা কখনো বিতর্ক করেননি, বিবাদে জড়াননি। বরং বিবাদ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে থাকতেন। বিতর্ক করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। বিপরীতে তারা ফিকহ ও শরিয়ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ফিকহের গভীরে নিমগ্ন ছিলেন। এসব বিষয়ে তারা মজলিস করতেন। এগুলোর উপর মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। এগুলোর দিকে মানুষকে ডাকতেন, এগুলোই শেখাতেন। ...এভাবেই প্রথম যুগ কেটে গেল। পরবর্তী মানুষেরা (তাবেয়িরা) এসে তাদের অনুসরণ করল। যখন এ বাস্তবতা আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন আমি তর্কবিতর্ক ও বিবাদ-বিসংবাদ ছেড়ে দিলাম। কালামশাস্ত্র পরিত্যাগ করলাম। এ ব্যাপারে যতটুকু জ্ঞান লাভ করেছি, সেখানেই থেমে গেলাম। ফিরে গেলাম সালাফের পথে। তাদের ইলম গ্রহণ করলাম। তাদের মজলিসে বসতে লাগলাম। উপরন্তু আমি দেখেছি, যারা কালাম চর্চা করে, তাদের চেহারায় মুতাকাদ্দিমিন (তথা সালাফের) নুর নেই। তাদের পথ সালেহিনের পথ নয়। বরং আমি দেখেছি, তাদের হৃদয় শক্ত হয়, কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের বিরোধিতা করতে তাদের বুক কাঁপে না। তাদের তাকওয়া ও খোদাভীতিও নেই। তখন আমি বললাম, যদি এতে (কালামশাস্ত্রে) কল্যাণ থাকত, তবে সালাফে সালেহিন এটা গ্রহণ করতেন, ছোটলোকরা গ্রহণ করত না। অবশেষে আমি এটা পরিত্যাগ করলাম। আলহামদুলিল্লাহ। ’
বাযযাযি তাঁর মানাকিবে ইমাম রহ. থেকে কাছাকাছি বক্তব্য বর্ণনা করেন, ‘আমি কালামশাস্ত্রে দক্ষ ছিলাম। বসরা শহর তখন বাতিলপন্থিদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। আমি বিশের অধিকবার সেখানে গিয়েছি। কখনো কখনো বছরখানেক কিংবা কমবেশি সেখানে থেকেছি। তাদের সঙ্গে বিতর্ক করেছি। কারণ, আমার তখন বিশ্বাস ছিল, কালামশাস্ত্র সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শাস্ত্র। কিন্তু কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে আমি ভাবলাম—সালাফ তো আমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন, তথাপি তারা তর্কে জড়াননি, বরং দূরে থেকেছেন। শরয়ি ইলমে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। এ কারণে আমি কালামশাস্ত্র পরিত্যাগ করে নিজেকে ফিকহে নিয়োজিত করেছি। উপরন্তু কালামশাস্ত্রে মশগুল লোকদের আমি দেখেছি তাদের চেহারায় সালেহিনের নুর নেই। তাদের হৃদয় শক্ত। তাদের মন ও মনন নির্দয়। কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহিনের বিরোধিতা করতে তাদের বুক কাঁপে না। যদি কালামশাস্ত্র ভালো কিছু হতো, তবে সালাফে সালেহিন এটা চর্চা করতেন।
টিকাঃ
১২৫. মানাকিব, মক্কি (৫১)।
১২৬. মানাকিব, মক্কি (৫৪-৫৫)।
১২৭. মানাকিব, বাযযাযি (১৩৭-১৩৮)।
📄 কালামের সমালোচনায় অন্যান্য ইমাম
আবু ইউসুফ রহ. বলেন, ‘কালাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই অজ্ঞতা। আর কালাম সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা জ্ঞান। কোনো ব্যক্তি যখন কালামের শিরোদেশে পৌঁছে যায়, তখন সে যিন্দিকে পরিণত হয় অথবা কমপক্ষে যিন্দিক লকব পায়।’
হাসান ইবনে যিয়াদ লু'লুইকে ইমাম যুফার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘তিনি কি কালাম চর্চা করতেন?’ ইবনে যিয়াদ বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! নির্বোধের মতো কথা বলো না। আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, যুফার-সহ আমাদের সকল মাশায়েখ, যাদের বৈঠকে আমরা বসতাম, যাদের কাছ থেকে ইলম শিখতাম, ফিকহ এবং সালাফে সালেহিনের অনুসরণ ছাড়া তারা অন্য কোনো দিকে তাকাতেন না।’
শাফেয়ি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আহলে কালামের ব্যাপারে আমার রায় হলো, তাদের খেজুরের ডাল দিয়ে পেটানো হবে। পাড়ায়-মহল্লায় তাদের ঘোরানো হবে। কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে যারা কালামে মগ্ন হয়, তাদের এটাই শাস্তি।’ বরং শাফেয়ি থেকে আরও বর্ণিত আছে, ‘শিরক ছাড়া যেকোনো গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া, কালাম নিয়ে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে উত্তম।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যদি জানত কালামের মাঝে কী পরিমাণ প্রবৃত্তির অনুসরণ থাকে, তবে তারা এটা থেকে সেভাবে পালাত, যেভাবে বাঘের মুখ থেকে পালায়।’
অহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, ‘কালামের অধিকারী কখনো সাফল্য লাভ করে না। যখনই কোনো ব্যক্তি কালামের মাঝে প্রবেশ করে, তার হৃদয় নষ্ট হয়ে যায়।’
গাযালি বলেন, ‘মানুষের উপর আল্লাহর বিশাল অনুগ্রহ যে, মানুষের হৃদয় ছোট থেকেই ঈমান গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এর জন্য বড় বড় দলিল- আদিল্লার দরকার হয় না। আর এই ঈমান বৃদ্ধি ও অবিচল রাখার উপায় হলো কুরআন তেলাওয়াত, তাফসির ও হাদিস নিয়ে ব্যাপৃত থাকা। তর্কশাস্ত্র ও কালাম শিখে ঈমান মজবুত করা সম্ভব নয়। মুমিনের কান বিতর্ক ও কালাম থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা উচিত। কারণ, এটা পথ যতটা সহজ করে, তারচেয়ে বেশি কঠিন করে; যতটা না গড়ে, তারচেয়ে বেশি ভাঙে। ...এ কারণে একজন সাধারণ মানুষের আকিদা একজন মুতাকাল্লিমের আকিদার চেয়ে বেশি অনড় ও অটল থাকে; সন্দেহ-সংশয়ের ঝড়-তুফানের সামনে পাহাড়ের মতো দৃঢ় থাকে। আর মুতাকাল্লিমের অবস্থা হয় বাতাসে ছেড়ে দেওয়া সুতোর মতো, যাকে বাতাস কখনো এদিকে উড়িয়ে নেয়, কখনো ওদিকে।
টিকাঃ
১২৮. তারিখে বাগদাদ, খতিবে বাগদাদি (৭/৫৩৮)।
১২৯. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, ইবনে আবদিল বার (২/৯৪২)।
১৩০. দেখুন: জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, ইবনে আবদিল বার (২/৯৪১)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১৪/১৩৭)।
১৩১. আল-বুরহান ফি বায়ানিল কুরআন, ইবনে কুদামা (১/১৪৩)।
📄 সালাফের কালাম বিরোধিতার প্রকৃত রহস্য
এটা খোলা চোখের সিদ্ধান্ত। বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হলে আমাদের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। গভীরে গেলে আমরা দেখব-ইমাম আজমসহ সালাফের অন্যান্য আলেম সামগ্রিক কালামের সমালোচনা করেননি, বরং বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিশেষ ধরনের ‘কালাম’- এর সমালোচনা করেছেন। কারণ, সে যুগে ইলমুল কালাম পূর্ণ একটা শাস্ত্র হিসেবেই গড়ে ওঠেনি। তাহলে তারা সমালোচনা করলেন কোন কালামের?
বস্তুত হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দে ‘কালাম’ বলতে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতে যুক্তিতর্ক এবং ওহির বিপরীতে আকলকে কেন্দ্র করে ঈমান ও আকিদাচর্চা বোঝানো হতো। ফলে ‘কালাম’-শাস্ত্রটা কুরআন-সুন্নাহ ও ওহির সাংঘর্ষিক শাস্ত্র গণ্য হতে থাকে। কাদারিয়্যাহ, মুরজিয়া, মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ‘কালাম’ নামে পরিচিতি পায়। সালাফে সালেহিনের বিপরীতে সে যুগের বিভ্রান্ত লোকজন, যেমন—মাবাদ জুহানি, গাইলান দিমাশকি, জাদ ইবনে দিরহাম, জাহম ইবনে সাফওয়ান, ওয়াসিল ইবনে আতা, আমর ইবনে উবাইদ, বিশর আল-মারিসি প্রমুখ ‘মুতাকাল্লিম’ হয়ে ওঠেন। এভাবে ‘কালাম’ তখন ফালসাফা (দর্শন)-সহ সব ধরনের নব-আবিষ্কৃত, প্রত্যাখ্যাত, বিদআত ও ভ্রান্ত চিন্তাধারার সমার্থক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় শতকে ‘কালাম’ কীভাবে ওহির বিপরীতে লাগামহীন যুক্তিতর্ক এবং সে কারণে একপর্যায়ে বিচ্যুতির সমার্থক হয়ে ওঠে, সেটা ইমাম আজমের বক্তব্য দ্বারাও বোঝা যায়। ইমাম আজম রহ. একাধিক জায়গায় বলেছেন, ‘আমি কালাম চর্চা করতাম’ (كنت أنظر في الكلام)। একপর্যায়ে এ শাস্ত্রে এতটাই এগিয়ে যাই যে, মানুষ আমার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করত।' এটা ছিল মূলত ইমামের প্রথম জীবনের কথা, যখন তিনি বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে নাস্তিকদের খণ্ডন করতেন; কিন্তু তিনি তখনও ফিকহের জগতে প্রবেশ করেননি। এমন সময় একদিন এক নারী তাকে তালাকের একটি সাধারণ মাসআলা জিজ্ঞাসা করে। কালাম সম্পর্কে এত বড় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও সেই নারীকে সেদিন তিনি জবাব দিতে পারেননি। তাঁর মনে দুঃখবোধ তৈরি হয়। কালাম তাকে ‘ফিকহ’ সম্পর্কে গাফেল করে রেখেছে মনে করেন তিনি। এভাবে বলে ওঠেন, ‘আমার কালাম দরকার নেই।’ অথচ পরবর্তী সময়ের অসংখ্য আলেম একইসঙ্গে ফকিহ ও মুতাকাল্লিম ছিলেন; ফিকহ, হাদিস, তাফসির, কালাম সকল শাস্ত্রে সমান পাণ্ডিত্যের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত ছিলেন।
বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন— মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহদের গুরু বিশর আল-মারিসি ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর শাগরেদ। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন খলকে কুরআন (কুরআনকে সৃষ্টি বলা)-সহ বিভিন্ন বিভ্রান্ত আকিদায় জড়িয়ে পড়েন, খোদ আবু ইউসুফ তাকে সতর্ক করেন। আবু ইউসুফ তাকে লক্ষ্য করে বলেন, “বিশর, ‘কালাম’ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই অজ্ঞতা। আর ‘কালাম’ সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা জ্ঞান। কোনো ব্যক্তি যখন কালামের শিরোদেশে পৌঁছে যায়, তখন সে যিন্দিকে পরিণত হয় অথবা কমপক্ষে যিন্দিক লকব পায়! বিশর, আমি শুনেছি তুমি কুরআন নিয়ে ‘কালাম’ করছ (কথা বলছ)। যদি আল্লাহর জন্য ইলম সাব্যস্ত করো, তবে নিজেই নিজেকে খণ্ডন করলে। আর যদি আল্লাহর ইলম অস্বীকার করো, তবে তো কাফের হয়ে গেলে।” উক্ত বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু ইউসুফ বিশরের পরিণতি দেখে কালামের সমালোচনা করেছেন। ফলে এটা ‘বিশরীয় কালামের’ সমালোচনা গণ্য হবে।
এক ব্যক্তি হাসান ইবনে যিয়াদের কাছে প্রশ্ন করেন, যুফার রহ. কি কালাম চর্চা করতেন? তিনি বললেন, ‘নির্বোধের মতো কথা বলো না। তারা ইলম ও ফিকহের প্রাসাদ। কালামের মাঝে তো সে ব্যক্তি প্রবেশ করে যার আকল নেই। আর এসব ব্যক্তি আল্লাহ এবং আল্লাহর বিধিবিধান সম্পর্কে এতটা বেশি অবগত ছিলেন যে, তারা তোমার উদ্দিষ্ট এসব কালামে প্রবেশ করতে পারেন না ( هؤلاء كانوا أعلم بالله عز وجل وبحدود الله من أن يدخلوا في الكلام الذي تعني ) পূর্বে যারা ছিলেন, যুফার ও আবু ইউসুফ-সহ আমাদের কোনো শায়খকে ফিকহ এবং পূর্ববর্তী সালাফের অনুসরণ ছাড়া আর কিছুতে মনোযোগ দিতে দেখিনি।’ তখন লোকটি বলল, কিন্তু বিশর আল-মারিসি তো দাবি করে, কুরআনের ক্ষেত্রে তার বক্তব্য আর আবু হানিফা, যুফার ও আবু ইউসুফের বক্তব্য এক। ইবনে যিয়াদ বলেন, ‘আল্লাহর কসম! সে মিথ্যা বলেছে। আমি তাদের কাউকে এ ব্যাপারে কথা বলতে দেখিনি। তাদের এমন কোনো কথা আমার কাছে পৌঁছয়নি। তুমি বরং বিশরকে বলবে—তুমি আবু ইউসুফের সান্নিধ্যে ছিলে। তিনি কেন তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন? এর মাধ্যমেই তার মিথ্যাচার স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই কয়েকটি বর্ণনার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় যে, সালাফে সালেহিন যখন কালামের সমালোচনা করেছেন, তারা কালাম বলতে কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন এবং তখন মুতাকাল্লিম কারা ছিল। অর্থাৎ, তখন জাহমিয়্যাহ, মুরজিয়া ও মুতাযিলারাই ‘মুতাকাল্লিম’ ছিল। ফলে সালাফ তাদের প্রতিহত করবেন, তাদের ভ্রান্ত আকিদার নিন্দা করবেন—এটা নিতান্তই স্বাভাবিক, শরিয়ত ও যুক্তিরও দাবি।
আবদুল কাদের কুরাশি বর্ণনা করেন, ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আমর ইবনে উবাইদের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক। কারণ, সে মানুষের উপর ইলমে কালামের দরজা খুলে দিয়েছে।’ আবদুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, আমি মালেকের কাছে গেলাম। তখন তার কাছে একব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল। মালেক তাকে বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমর ইবনে উবাইদের শাগরেদ। আমরের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক! সে দ্বীনের মাঝে এসব কালাম নামক বিদআত ঢুকিয়েছে। যদি কালাম কোনো ‘ইলম’ হতো, তবে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ দ্বীন ও শরিয়ত নিয়ে যেভাবে কথা বলেছেন, এটা নিয়েও কথা বলতেন। বোঝা গেল, এটা বাতিল।’ উপরের দুটো বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ইমাম আবু হানিফা ও মালেক দুজনই মুতাযিলাদের সমালোচনা করেছেন। তারাই তখন মুতাকাল্লিম ছিল। কালাম বলতে তখন তাদের আকিদাই বোঝাত।
একইভাবে ইবনে ইসহাক বলেন, একদিন শাফেয়ি রহ. একদল ফকিহের সঙ্গে বিতর্ক করলেন। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আলোচনা ও মুনাযারা করলেন। আবু ইসহাক তাকে বললেন, আবু আবদুল্লাহ, এগুলো তো আহলে কালামের (মানহাজ বা কর্মপদ্ধতি)। আহলে হালাল ও হারাম (তথা ফকিহদের) মানহাজ নয়। তিনি বললেন, এটার আগে আমরা ওটা মজবুত করে শিখেছি। এতে স্পষ্ট হয়, ইমাম শাফেয়িও কালামের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেছিলেন। কারণ, বিভ্রান্ত লোকদের খণ্ডন করতে হলে এর বিকল্প নেই। ফলে ইমাম শাফেয়ি যে কালাম শিখতে নিষেধ করেছেন, সেটা হলো গোমরাহদের কালাম, যারা এটাকে হাতিয়ার বানিয়ে বিভ্রান্ত আকিদা প্রচার করে। বরং শাফেয়ির বক্তব্যও- শিরক ছাড়া যেকোনো গুনাহ নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হওয়া কালাম নিয়ে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে উত্তম-সে কথার প্রমাণ। নতুবা চুরি, ডাকাতি, যিনা- ব্যভিচার ইত্যাদির চেয়ে ইলমুল কালাম নিকৃষ্ট, এটা হতেই পারে না। হ্যাঁ, এটাকে যখন নেতিবাচকভাবে গোমরাহির কাজে ব্যবহার করা হবে, তখন নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট; কিন্তু উন্মুক্তভাবে নয়।
ইমামদের এসব বক্তব্যের মাধ্যমে ‘কালাম’-এর সমালোচনার ক্ষেত্রে ঠিক কোন ধরনের কালাম এবং কারা উদ্দেশ্য সেটা স্পষ্ট। আর এমন কালাম ও কালামিদের সমালোচনা যুক্তিযুক্ত, বরং আবশ্যক বইকি!
পরবর্তীকালে উলামায়ে ইসলামের একটি দলই ‘কালাম’-এর ‘ইসলামিকরণ’ করেন। এতদিন যেটা কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকিদা ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটাকে কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকিদা সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশেষত ইসলামি রাষ্ট্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, অন্যান্য সভ্যতা ও জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর সংস্পর্শ ও সম্পর্ক, জ্ঞান ও সংস্কৃতির সম্মিলন ও আদানপ্রদান, বিভিন্ন মতাদর্শ ও ধর্মের গ্রন্থসমূহ এবং চিন্তা-দর্শনের আরবি অনুবাদ ইত্যাদি নানা কারণে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপর নিত্য-নতুন আপত্তি তৈরি হয়, ‘আল্লাহ বলেছেন’, ‘আল্লাহর রাসুল বলেছেন’-এটুকুতে সন্তুষ্ট না হতে পারার মতো ‘সুশীল চিন্তক’ ও ‘বুদ্ধিজীবী’ মস্তিষ্কের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে ইসলামি আকিদা বুঝতে চাওয়া লোকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন ‘ইসলামি’ কালামের চাহিদাও বাড়তে থাকে। উলামায়ে কেরামের একটি দল নিজেদের ইসলামি আকিদার সুরক্ষা এবং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষিত সমাজে ইসলাম প্রচারের খেদমত আঞ্জাম দিতে মাঠে নামেন। শুরু হয় সুশীল (মুতাযিলা) ও আলেমদের লড়াই। এ লড়াইয়ে মুতাযিলাদের বিরুদ্ধে উলামায়ে ইসলাম দ্বীনের ব্যাপক খেদমত করেন। মুতাযিলাদের বিভ্রান্তিকর আকিদা থেকে মুসলিম উম্মাহকে হেফাজতের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাদের যুক্তিতেই তাদের পরাজিত করেন। যে শাস্ত্র ছিল তাদের সকল বিভ্রান্তির ভিত, সেটাকেই ধসিয়ে দেন আহলে সুন্নাতের আলেমগণ। এভাবে যে শাস্ত্রটি একসময় ইসলাম ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, যেগুলোর চর্চাকারী সালাফে সালেহিনের কাছে ‘যিন্দিক’ নামে পরিচিত হয়েছে, একসময় মূল ধারার আলেমগণ সেটাকে সংস্কার করে ইসলামের খেদমতে লাগান। ‘কালাম’ তখন ‘বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদা’র সমার্থক হয়ে ওঠে। আলেমরাই মুতাকাল্লিম হয়ে ওঠেন। শাহরাস্তানি (৫৪৮ হি.) লিখেন, ‘একপর্যায়ে আসেন আবুল হাসান আশআরি। তিনি তাদের (তথা সালাফের) বক্তব্যকে কালামি মানহাজে শক্তিশালী করেন।
তবে শুরুটাই যেহেতু জটিলতাপূর্ণ ছিল, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের প্রাকৃতিক ও সহজ-সরল পথের সঙ্গে প্রথম থেকেই এর দূরত্ব ছিল (অর্থাৎ, কালামের সাহায্যে আকিদাচর্চা ফিতরত ও স্বাভাবিক অবস্থা নয়; বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির ফল, বিদ্যমান জটিলতার বিরুদ্ধে লড়াই), ফলে ‘ইসলামিকরণ’ করা সত্ত্বেও দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতিগত দূরত্ব অব্যাহতই থাকল। যতই ‘কালাম’-শাস্ত্রের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছিল, নতুন নতুন পরিভাষা ও শাখা-প্রশাখা সংযুক্ত হচ্ছিল, ততই সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল। আর এটাই ছিল মুহাদ্দিসিন ও মুতাকাল্লিমিনের সংঘাতের অন্যতম কারণ। সেসব জটিলতার সংজ্ঞায়ন, সেগুলো মোকাবিলার পদ্ধতি নির্ধারণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে কালামের প্রতি আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি মতভেদপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই এ ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই। একদিকে যেমন সালাফের কালাম-বিরোধিতাকে উন্মুক্ত নিষেধাজ্ঞা মনে না করা চাই, অপরদিকে এটা চর্চার দরজা অবাধে উন্মোচিত না করা চাই। সকল যুগের মুহাক্কিক আলেমের দৃষ্টিভঙ্গিও এটা।
বাযযাযি লিখেন, ‘ইমাম আবু ইউসুফ বলেছেন, ‘কালাম চর্চাকারী (মুতাকাল্লিম) হক কথা বললেও তার পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়।’ এই নিষেধাজ্ঞাকে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এক. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যক্তি, যে ইলমুল কালাম চর্চার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে। কালামের অত্যন্ত জটিল ও গভীর গলি-ঘুপচিতে প্রবেশ করে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহচর্চা বাদ দিয়ে কালামের মাঝেই ডুবে থাকে। দুই, কারও মতে এটা কালামচর্চার উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে বিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ, প্রথম যুগে ইমামগণ মুনাযারা করতেন প্রতিপক্ষকে ভ্রান্তি থেকে ফেরানোর জন্য। কিন্তু পরবর্তীকালে মুনাযারা ও বিতর্কের উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টা করা। ফলে ইমামগণ কালামকে নিষিদ্ধ করেন। তাই কেউ যদি কালামশাস্ত্রের মাধ্যমে হকের কাছে পৌঁছতে চায়, অন্যের হেদায়াত উদ্দেশ্য হয়, তবে এটা তো উত্তম। তিন. কারও মতে, ইমামগণ যে ‘কালাম’ নিষিদ্ধ করেছেন, সেটা হলো আহলে বিদআত ও হুকামা তথা দার্শনিকদের কালাম, মাশায়েখের কালাম নয়। ’
বাইহাকি লিখেন, ‘উমর ইবনে আবদুল আযিয-সহ অন্যান্য সালাফ কালামের মাঝে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তারা মনে করতেন, বিশুদ্ধ দ্বীন বোঝার জন্য এটার প্রয়োজন নেই। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যেসব দলিল-প্রমাণ নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন সেগুলো তাওহিদ, নবুওত ইত্যাদি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। উপরন্তু তারা ভয় করতেন, যদি ইলমে কালামের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে অদূরদর্শী লোকেরা তাতে বিভ্রান্ত হবে এবং অবিশ্বাসীদের জালে ফেঁসে যাবে। সাঁতার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ লোককে সমুদ্রে ফেললে যেমন হয়, তাদের অবস্থাও তেমন হবে। মোটকথা, ইলমে কালাম থেকে তাদের নিষেধাজ্ঞা এ কারণে নয় যে, মৌলিকভাবে এটা নিন্দনীয় ও অনুপকারী শাস্ত্র। এমন এক শাস্ত্র যার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা যায়, তাঁর গুণাবলি চেনা যায়, রাসুলদের সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়, যার মাধ্যমে সত্য নবি ও মিথ্যা নবির মাঝে পার্থক্য করা যায়, সেটা কীভাবে নিন্দনীয় শাস্ত্র হতে পারে? তাই কালামশাস্ত্রের ক্ষেত্রে তাদের নিষেধাজ্ঞা ছিল মূলত বিভ্রান্তি থেকে দুর্বলচিত্তের মানুষদের বাঁচানোর তাগিদে।
আবু আলি দাক্কাক বলেন, ‘যদি দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়িস্বরূপ বিবাদ (কালাম) করা হয়, সেটা নিষিদ্ধ; হক প্রকাশের জন্য হলে নিষিদ্ধ নয়। আবু নসর সাফফার বলেন, কাফেররা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে সব ধরনের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করত, যুক্তিতে পরাজিত করতে চাইত। তাহলে নবিজি নীরব থাকতে এবং বিবাদ পরিত্যাগ করতে আদিষ্ট হবেন কোন যুক্তিতে? হ্যাঁ, যদি দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং অর্থহীন বিসংবাদ হয়, সে ক্ষেত্রে বিবাদ পরিত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي ءَايَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ، وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْমِ الظَّالِمِينَ অর্থ : ‘যখন আপনি তাদের আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাস করতে দেখবেন, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান যে পর্যন্ত না তারা অন্যকথায় প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে আর বসবেন না।’ [আনআম : ৬৮] কিন্তু হক প্রকাশের জন্য বিবাদ করা দূষণীয় নয়।’
স্বয়ং ইমাম আজমের পরবর্তী সময়ের বক্তব্যের মাঝেও কালামকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার বৈধতা পাওয়া যায়। আবু মুকাতিল সমরকন্দি ইমামকে বলেন, অনেকে এসব বিষয়ে (কালাম/মুনাযারা ইত্যদিতে) ঢুকতে নিষেধ করেন। তাদের কথা, রাসুলের সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তো এ পথে হাঁটেননি। আমরা কেন হাঁটব? ইমাম জবাবে বলেন, ‘আমরা যদি সাহাবাদের যুগে তাদের পর্যায়ে থাকতাম, তাহলে তারা যা করতেন যতটুকু করতেন, আমাদের ক্ষেত্রেও তা শতভাগ প্রযোজ্য হতো। কিন্তু আমাদের যুগ তাদের যুগ নয়। আমরা যেসব সমস্যার মোকাবিলা করছি, সেগুলো তাদের যুগে ছিল না। আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের সামনে এসে পড়েছি, যারা আমাদের আঘাত করে, আমাদের রক্তকে হালাল মনে করে। তাহলে তাদের মাঝে কারা সঠিক কারা ভুল সেটা না জেনে বসে থাকা যাবে? আমরা আমাদের জানমালের হেফাজত না করে বসে থাকব? সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল না; ফলে তাদের হাতিয়ার হাতে নিতে হয়নি। আমাদের যুগে তারা আছে; ফলে হাতিয়ার হাতে নিতে হবে। ’
সুতরাং হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করলে সেটা করা যাবে এবং খোদ ইমামও প্রথম জীবনে সেটা করেছেন। কিন্তু অতিরঞ্জন তৈরি হলে, মাধ্যমকে গন্তব্য মনে করা হলে, উপলক্ষ্যকে লক্ষ্য গণ্য করলে সেটা বর্জন করতে হবে, যেমনটা ইমামও করেছেন। কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, ‘ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ সূত্রে মুহাম্মাদ রহ. বর্ণনা করেন, কালাম চর্চাকারীর পিছনে নামায হবে না। এর দ্বারা মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে কালামের অত্যন্ত গভীরের বিষয়গুলোতে যাওয়া।’ কারও মতে, কালামশাস্ত্রকে অন্যায় পথে ব্যবহারকারীরা এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে, সাধারণ কালামচর্চা নয়। তাদের দলিল হচ্ছে ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর সন্তান হাম্মাদের একটি ঘটনা। হাম্মাদকে তিনি একদিন কালাম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখে নিষেধ করেন। তখন হাম্মাদ বলেন, আপনাকেও তো আমি এ শাস্ত্র চর্চা করতে দেখেছি। তাহলে আমাকে নিষেধ করছেন কেন, আব্বাজান? ইমাম বললেন, আমরা এটা নিয়ে মুনাযারা করার সময় আতঙ্কিত থাকতাম যেন কেউ বিভ্রান্ত না হই। আর তোমরা এখন এটা নিয়ে মুনাযারা করোই প্রতিপক্ষকে গোমরাহ করতে। আর যে ব্যক্তি এমন কামনা করে, সে মূলত তার কুফর কামনা করে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কুফর কামনা করে, দেখা যায়, সে অন্যের আগে নিজে তাতে পতিত হয়। এটা নিষিদ্ধ। ফলে এ ধরনের মুতাকাল্লিমের পিছনে নামায হবে না।
ইমাম আজমের প্রসিদ্ধ জীবনীকার মুওয়াফফাক ইবনে আহমদ মক্কির (৫৬৮ হি.) কথায় কালামের প্রতি ইমাম রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন এবং সেটার কারণ আরও স্পষ্ট হয়। তার বর্ণনানুযায়ী-হাম্মাদ বলেন, আব্বাজান আমাকে কালাম শিখতে বলতেন। এটা চর্চার প্রতি অত্যন্ত উদ্বুদ্ধ করতেন। আমাকে বলতেন, বৎস, কালাম শিক্ষা করো। কারণ, সেটা সবচেয়ে বড় ফিকহ (আল-ফিকহুল আকবার)। হাম্মাদ বলেন, তখন থেকে আমি কালাম শেখা শুরু করি মূলত তাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই। একপর্যায়ে কালামশাস্ত্রে আমি গভীর জ্ঞান লাভ করি। তখন সেটা আমি আমার নিজের নফস ও শাহওয়াতের জন্য চর্চা করতে থাকি। একদিন আমি একদল লোকের সঙ্গে বিতর্ক করছিলাম। আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে উঠছিল। এমন সময় আব্বাজান এলেন। আমি তাঁর কাছে ছুটে গেলাম। তিনি বললেন—হাম্মাদ, তোমার সাথে এরা কারা? আমি বললাম, অমুক অমুক তাদের সকলের নাম জানালাম। তিনি বললেন, কী নিয়ে বিতর্ক করছ? আমি বললাম, অমুক বিষয়ে। তিনি বললেন—হাম্মাদ, কালাম ছেড়ে দাও! ইতঃপূর্বে আমি আব্বাজানকে কোনো জিনিসের নির্দেশ দিয়ে সেটা ছাড়তে বলতে দেখিনি।
তাই আমি বললাম—আব্বাজান, আপনিই কি আমাকে এটা শিখতে বলেছিলেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আজ আবার আমিই নিষেধ করছি। আমি কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কালামের বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ককারী মানুষগুলো একই মতবাদ এবং একই দ্বীনের অনুসারী ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে শয়তান তাদের মাঝে ঢুকে যায়। তাদের মাঝে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও মতভেদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তাদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। একে অপরকে কাফের বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাশায়েখ এটা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং একত্র হয়ে বলেন—হে লোকসকল, তোমরা এক দ্বীনের অনুসারী। তোমাদের ইমাম একজন। কিবলা এক। কিতাব এক। শরিয়ত অভিন্ন। তবুও ইবলিস তোমাদের মাঝে ঢুকে বিভেদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সত্যের জয় সুনিশ্চিত। মিথ্যার পরাজয়ও অবধারিত। তাই তোমরা সত্যকে প্রকাশ করো। দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে মিথ্যার খণ্ডন করো। এতে হয়তো তোমাদের মতভেদ দূর হবে। ঐক্য ও হৃদ্যতা ফিরে আসবে। আবু হানিফা বলেন, ‘এই পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা কালামচর্চা শুরু করেছিলাম। আমরা যখন কথা বলতাম, শয়তান প্রবেশের ভয়ে আমরা তটস্থ থাকতাম। কান্নায় আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসত। ...আর আজ দেখছি কালামের মজলিসে মানুষ হইহই করে হাসে, বিদ্রুপ ও ঠাট্টা করে। প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করাই হয় তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। এই যেহেতু কালামের অবস্থা, তাই এটাকে পরিত্যাগ করাই কল্যাণ।’
আল্লামা তাফতাযানি লিখেন, ‘সালাফে সালেহিন থেকে কালামের সমালোচনা এবং এটা চর্চায় নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। এ মূলত সে কালাম যাতে ইয়াকিন আসার পরিবর্তে ইয়াকিন বিনষ্ট হয়, মুসলমানদের আকিদা বরবাদ হয়, আকিদার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় ফালসাফা তথা দর্শন চর্চা হয়। নতুবা এ শাস্ত্র (যাতে মূলত তাওহিদ ও আকায়েদ নিয়ে আলোচনা করা হয়) সর্বপ্রধান ওয়াজিব এবং সকল আমলের ভিত্তি। এটার প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব কী করে?
কাযি সদর আবুল ইউসর বাযদাবি (৪৯৩ হি.) লিখেন, ‘ইলমুল কালাম’ চর্চার ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। অধিকাংশ মুতাকাল্লিম এটাকে সম্পূর্ণ বৈধ বলেছেন। আশআরি ও মুতাযিলাদের মত এটাই। বিপরীতে অধিকাংশ মুহাদ্দিস কালাম চর্চাকে অবৈধ বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রথম জীবনে এটা চর্চা করেছেন। ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে তিনি কালাম চর্চাকে বৈধ বলেছেন। এটাকে হাতিয়ারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ...কিন্তু আমাদের অঞ্চলের অধিকাংশ ফকিহ ও ইমাম মানুষকে প্রকাশ্যে এটা শিখতে, শেখাতে এবং এ বিষয়ে বিতর্ক করতে নিষেধ করেন। ...আমরা আকিদা ও ফিকহ উভয়ক্ষেত্রে আবু হানিফাকে অনুসরণ করি। তিনি (প্রথম জীবনে) কালাম শিক্ষা ও শিক্ষাদান, কালাম বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়ন ইত্যাদি সবকিছু বৈধ বলতেন। কিন্তু জীবনের শেষদিকে তিনি কালাম নিয়ে মুনাযারা পরিত্যাগ করেন। এর মাঝে তাঁর শাগরেদদের প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। তিনি তাদের যেভাবে প্রকাশ্যে ফিকহ শিক্ষা দিতেন, সেভাবে এটা শেখাতেন না...।’ অতঃপর বাযদাবি নিজের মত প্রকাশ করেন এভাবে: ‘তবে যেহেতু দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো দলিল-সহ জানা দরকার, এ জন্য ইলমে কালাম শেখা মুবাহ (বৈধ)। বরং কখনো কখনো ফরযে কিফায়াহ। তবে যে এটা শিখবে, সবার কাছ থেকে শিখবে না; বরং আহলে ইলম ও আহলে সুন্নাতের আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত এ শাস্ত্রে ইমাম পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে শিখবে।
ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহর সংকলক আল্লামা ইবনুল আলা দেহলভি (৭৮৬ হি.) ‘সিরাজিয়্যাহ’র উদ্ধৃতিতে লিখেন, ‘একদল আলেম ইলমে কালাম চর্চা করতে নিষেধ করেছেন। এটা মূলত দ্বীন নিয়ে ঝগড়া-বিবাদসম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার উপর আরোপিত হবে। কারণ, তখন সেটা বিদআত ও ফেতনা ছড়াতে সহায়ক হবে। আকিদার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। একইভাবে নিষিদ্ধ হবে যখন বিতর্ককারী অদূরদর্শী হবে (ফলে সহজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে)। অথবা সত্যের জয়ের জন্য নয়, নফসের জন্য লড়াই করবে। কিন্তু এসব নিষিদ্ধ বিষয়ের পরিবর্তে এটা যদি আল্লাহর মারিফাত, তাওহিদ, নবুওত এবং ইসলামের অন্যান্য আকিদা জানার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে এমন কালাম নিষিদ্ধ নয়।’
কারও মনে হতে পারে, এগুলো স্রেফ মুতাকাল্লিমিনের বক্তব্য। তারা তো কালামকে বাঁচাতে পক্ষে বলবেনই। তাদের বাইরে অন্যান্য আলেমের বক্তব্য দেখানো হোক। হাম্বলি ফকিহ ইবনে মুফলিহ লিখেন, ‘বিশুদ্ধ মাযহাব মতে ইলমে কালাম শেখা বৈধ ও অনুমোদিত। এটার সহায়তায় আহলে বিদআতের সঙ্গে মুনাযারা এবং তাদের খণ্ডন করা, তাদের বিরুদ্ধে (এর মানহাজে) গ্রন্থ লেখা জায়েয। এটাই (হাম্বলি মাযহাবের) মুহাক্কিক ইমামদের মত। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়; কিন্তু সেটা খোদ তার কর্মের বিপরীত। কারণ, ইমাম তাঁর নিজের ‘আর-রাদ্দু আলায যানাদিকাহ’ গ্রন্থে কুরআন-সুন্নাহ এবং আকলি দলিলের মাধ্যমে তাদের খণ্ডন করেছেন। বরং তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে বোঝা যায়, কালামের বিরোধিতায় দেওয়া প্রথম বক্তব্য থেকে তিনি ফিরে এসে বলেন, আমরা এ ব্যাপারে চুপ থাকতাম। কিন্তু যখন তারা এগুলোতে প্রবেশ করল, তখন তাদের খণ্ডন না করে উপায় ছিল না।’ ‘ইকনা’র ব্যাখ্যায় আরেক হাম্বলি আলেম বাহুতি লিখেন, “নিন্দিত অথবা হারাম ইলমে কালাম হলো সেটা, যেটা স্রেফ যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যেটা ‘নস’ তথা কুরআন-সুন্নাহর সমর্থনে আকলের সমন্বয়ে গঠিত, সেটা ‘আসলুদ-দ্বীন’ (আকিদা) এবং আহলে সুন্নাতের মানহাজ।” আরেক হাম্বলি আলেম সাফারিনি লিখেন, ‘আমাদের ইমামগণ যে ইলমে কালাম শিখতে নিষেধ করেছেন, সেটা হলো ফালসাফা (দর্শন), তাবিল (রূপক ব্যাখ্যা), ইলহাদ (সীমালঙ্ঘন, বক্রতা ও বিকৃতি), মিথ্যা-জোচ্চুরি, কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা ইত্যাদি দিয়ে ভরা।’ বোঝা গেল, সকল মাযহাব-মাসলাকের মুহাক্কিক আলেমের সর্বসম্মতিক্রমে সত্তাগতভাবে কালাম নিন্দনীয় নয়; বরং কীভাবে এটাকে ব্যবহার করা হবে সেটার উপর এর বিধান নির্ভর করবে।
টিকাঃ
১৩২. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, গাযালি (১/৯৪)।
১৩৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা, যাহাবি (৬/৩৯৭)।
১৩৪. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি (২/৯৪২)।
১৩৫. ফাযায়িলু আবি হানিফা (১১৮)।
১৩৬. আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ, কুরাশি (১/৩১)।
১৩৭. যাম্মুল কালাম, হারাভি (৫/৭২-৭৩)।
১৩৮. মানাকিবে শাফেয়ি, বাইহাকি (১/৪৫৭)।
১৩৯. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৬৩-৬৪)। আরও দেখুন: ইমাম আশআরির দিকে সম্বন্ধকৃত পুস্তিকা 'ইসতিহসানুল খাওজ ফি ইলমিল কালাম'।
১৪০. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল (১/৯৩)।
১৪১. দেখুন: মানাকিব, বাযযাযি (১৩৮-১৩৯)। তাবয়িন কাযিবিল মুফতারি, ইবনে আসাকির (৩৩৪)।
১৪২. শুআবুল ঈমান, বাইহাকি (১/৯৫)।
১৪৩. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৭-৫৮)।
১৪৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (৯)। দেখুন : আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (১৯১)।
১৪৫. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)। দেখুন: তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬-২৭৭)।
১৪৬. মানাকিব, মক্কি (১৮৩-১৮৪)।
১৪৭. শরহুল আকায়েদ (২৪)।
১৪৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন (১৫-১৬)।
১৪৯. ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/২৭৬)।
১৫০. আল-আদাবুশ শরইয়্যাহ (১/২২৬-২২৭)।
১৫১. কাশশাফুল কিনা (৭/৮)।
১৫২. লাওয়ামিউল আনওয়ার (১/১১-১১২)।