📄 আকিদা শেখার ন্যূনতম পরিমাণ
আকিদা শেখার গুরুত্ব স্পষ্ট হওয়ার পরে প্রশ্ন আসতে পারে, আকিদা ঠিক কতখানি শিখতে হবে? একজন দাঈ ও ইমামের আকিদা সম্পর্কে যতটা জ্ঞান থাকা আবশ্যক, সমাজের একজন সাধারণ মুসল্লির কি ততটা জ্ঞান থাকা আবশ্যক? তা ছাড়া, আবশ্যক বলা হলেও সবার জন্য তো সমান পর্যায়ে শেখা সম্ভবও নয়। একজন আলেম যতখানি আকিদা শিখতে পারবেন, একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে ততখানি শেখা সম্ভব হবে না। বোঝা গেল, আকিদা শেখার আবশ্যকতা, পর্যায় ও স্তর সবার জন্য সমান নয়। ফলে ‘আকিদা শেখার পরিমাণ’ সম্পর্কে কিছু কথা বলা আবশ্যক মনে করছি।
সংক্ষেপে প্রথমেই যে বিষয়টি বুঝে নিতে হবে সেটা হলো, আকিদা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন জরুরি হলেও আকিদার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন জরুরি নয়। কারণ, আকিদার আলোচনায় এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো দ্বীনের কোনো মৌলিক মাসআলা নয়, ঈমানের জরুরি বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়।
যেমন—আল্লাহর সিফাতসংক্রান্ত বিস্তৃত আলোচনা, ঈমান ও কুফরের বিস্তৃত সংজ্ঞায়ন, প্রকারভেদ ও ব্যাখ্যা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাবসমূহ, পরকাল ইত্যাদির সবিস্তার বিবরণ ঈমানের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। সবার উপর এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা আবশ্যক নয়। বরং এ ব্যাপারে মোটা দাগে ধারণা থাকাই যথেষ্ট। তবে যদি কোনো বিষয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, সে সন্দেহ দূর করা আবশ্যক। অন্যকথায়, ঈমানের ছয় রুকন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকাই যথেষ্ট, বিস্তারিত জানা আবশ্যক নয়। যেমন—নবি-রাসুল সম্পর্কে ঈমান আনা আবশ্যক; কিন্তু প্রত্যেক নবির নাম, তাঁর বংশপরিচয় ও গোত্রের নাম, তাঁর দাওয়াতের বিস্তারিত ইতিহাস জানা আবশ্যক নয়। তবে যদি কোনো নবি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তখন তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি।
ইমাম আজম আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ঈমান ও কুফর সম্পর্কে অজ্ঞতার বিধান কী? তিনি বললেন, ‘মানুষ মুমিন হিসেবে গণ্য হয় আল্লাহকে চেনা ও স্বীকার করার মাধ্যমে। একইভাবে কাফের হয় আল্লাহকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। ফলে কেউ যখন আল্লাহকে রব ও মাবুদ হিসেবে স্বীকার করবে, তাওহিদকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে, আল্লাহর কাছ থেকে আগত সবকিছু মেনে নেবে, তার জন্য ঈমান কিংবা কুফরের সংজ্ঞার্থ জানা থাকা জরুরি নয়। কারণ, সে জানে ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ, ঈমান কল্যাণ আর কুফর অকল্যাণ। এটুকু জানা ও মানাই যথেষ্ট। যেমন—কেউ মধু ও মাকাল ফল দুটোই মুখে দিয়ে পরীক্ষা করে মধুর মিষ্টতা আর মাকালের তিক্ততা অনুভব করল। তার জন্য মধু কিংবা মাকালের নাম বা সংজ্ঞার্থ জানা জরুরি নয়। তার ব্যাপারে এ কথাও বলা যাবে না যে, সে মিষ্টতা বা তিক্ততা চেনে না। বেশির চেয়ে বেশি এটুকু বলা যাবে যে, সে এগুলোর সংজ্ঞার্থ জানে না। একই কথা ঈমান ও কুফরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন কেউ জানবে যে, ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ, এটুকু জানলে ও মানলেই যথেষ্ট হবে। আলাদা করে ঈমান ও কুফরের সংজ্ঞার্থ জানার দরকার নেই। কেউ এই সংজ্ঞার্থ না জানলেই তাকে অস্বীকারকারী বলা যাবে না।’
বরং এগুলো নিয়ে যখন অর্থহীন বিতর্কের আশঙ্কা থাকবে, তখন এগুলো নিয়ে আলোচনা বর্জন করাই কর্তব্য হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, “তোমরা দ্বীন নিয়ে বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করো। কেননা, দ্বীন স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা কিছু ফরয বিধান দিয়েছেন, কিছু সুন্নাত দিয়েছেন। কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন। হালাল বলে দিয়েছেন। হারাম স্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ নِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ অর্থ : ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ [মায়িদা : ৩] সুতরাং কুরআনে যা হালাল করা হয়েছে, সেটা হালাল হিসেবে গ্রহণ করো। কুরআনে যা হারাম করা হয়েছে, সেটা হারাম মানো। কুরআনের স্পষ্ট বিষয়গুলোর উপর আমল করো। অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকো। যদি দ্বীন নিয়ে বিতর্কের মাঝে তাকওয়া থাকত, তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর পরে সাহাবায়ে কেরাম সবার আগে সেটা করতেন। তারা কি দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছেন? হ্যাঁ, তারা ফিকহ নিয়ে আলোচনা করেছেন, ফারায়েজ নিয়ে মতভেদ করেছেন। নামায, হজ, হালাল-হারাম, তালাক ইত্যাদি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কিন্তু কেউ দ্বীন (তথা আকিদা) নিয়ে বিতর্ক করেননি। এ বিষয়ে বিবাদ করেননি। সুতরাং তোমরা তাকওয়ার উপর থাকো। সুন্নাতের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকো। এটুকুই যথেষ্ট হবে। পরবর্তী লোকেরা দ্বীন নিয়ে যেসব ঝগড়া সৃষ্টি করেছে, যেগুলো নিয়ে বিবাদ-বিতর্কে জড়িয়েছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকো। কারণ, সুন্নাতের অনুসরণের মাঝেই মুক্তি।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي ءَايَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ، وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ অর্থ : ‘যখন আপনি তাদের আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাস করতে দেখবেন, তখন তাদের থেকে সরে যান যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে আর বসবেন না।’ [আনআম : ৬৮] আল্লাহ চাইলে কুরআনের মাঝেও বিতর্ক ও বিবাদ অবতীর্ণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেটা করেননি; বরং নিষেধ করেছেন। সুতরাং বিতর্ককারীদের সঙ্গ পরিহার করো। তাদের সঙ্গে বসো না। যদি তারা গায়ে পড়ে বিতর্ক করে, তবে কুরআনের আইন মানো : فَإِنْ حَاجُّوكَ فَقُلْ أَسْلَمْتُ وَজْهِيَ لِلَّهِ وَمَنِ اتَّبَعَنِ وَقُل لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ وَالْأُمِّينَ أَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوا وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ وَاللَّهُ بَصِيرُ بِالْعِبَادِ অর্থ : “যদি তারা আপনার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি এবং আমার অনুসারীগণও।’ আর যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের ও নিরক্ষরদের বলুন, ‘তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তবে নিশ্চয়ই তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ বান্দাদের সবকিছু দেখছেন।” [আলে ইমরান : ২০] এখানে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে, বিতর্ক করতে বলা হয়নি।’
বরং ইমাম আবু ইউসুফ থেকে ‘দ্বীন নিয়ে বিতর্ক নিষিদ্ধ’ শিরোনামে একটি পুস্তিকাতে এসেছে, ‘দ্বীন নিয়ে বিতর্ক বিদআত। বাতিলপন্থিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যা করে, সেগুলো বিদআত। যদি তাতে কোনো কল্যাণ থাকত তবে সাহাবিরা এবং সাহাবিদের সন্তানরা এগুলো আগে করতেন। কারণ, তারা এগুলো করতে বেশি সক্ষম ছিলেন। এগুলো সম্পর্কে বেশি জ্ঞান রাখতেন; দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং সুন্নাতের সুরক্ষা ও প্রচারে অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। যদি তাতে কোনো কল্যাণ থাকত, তারা সবার আগে সেটা অর্জনের চেষ্টা করতেন। একদল দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করে বিদআতি হয়ে গেছে। আরেক দল দ্বীন থেকে উদাসীনতা দেখিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। আহলে সুন্নাতের অবস্থান এই দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি সিরাতে মুস্তাকিমের উপর প্রতিষ্ঠিত।’
তথাপি প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে ঈমানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সীমারেখা কী? ইসলাম, ঈমান, তাওহিদ এবং আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কতটুকু জানা জরুরি? কতগুলো সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি?
ইমাম আজমসহ আমাদের ইমামগণ বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, এখানে যার সবকিছু উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ফলে আমরা কেবল তাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরার চেষ্টা করব।
(ইমাম মুহাম্মাদের ছাত্র) আবু সুলাইমান জুযজানি থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইমাম আজমের কাছে এসে বলল, (দ্বীনের) বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের বিভিন্ন কথা শুনে আমি পেরেশান হয়ে পড়েছি। কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক বুঝতে পারছি না। তাই আমি চাই, আপনি আমাকে এমন একটা পথ দেখান, যার উপর অটল থাকলে আমি কাল জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে পারি। আপনি নিজের জন্য যা পছন্দ করেন আমাকেও তা-ই বলুন। আমার বিশ্বাস, আপনাকে অনুসরণ করলে আমি নিন্দিত হব না। ইমাম বললেন, ‘আমি এমন একদল মানুষ পেয়েছি (সাহাবা ও তাবেয়িন) যারা বলতেন, “যে ব্যক্তি ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসুল।”- এমন সাক্ষ্য দেবে, সে আল্লাহর একনিষ্ঠ (বান্দা) হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয় সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহর জন্য শরিক ও প্রতিপক্ষ নির্ধারণ করা থেকে পবিত্র থাকবে। এভাবে আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার পরে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত যাবতীয় ফরয ইবাদত, যথা—নামায, রোযা, যাকাত ও হজ ইত্যাদির স্বীকৃতি দিতে হবে। সেগুলোর উপর আমল করতে হবে। কুফর ও শিরক থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। যদি কেউ এ সবকিছুর উপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর ওলি গণ্য হবে। আর যদি কেউ শাহাদাতের উপর অটল থাকে, কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি করে, তবে তার পরিণতি আল্লাহর উপর সমর্পিত থাকবে—চাইলে তিনি তাকে বিচ্যুতির শাস্তি দেবেন অথবা চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করবে না। তাদের অন্তরের অবস্থা আল্লাহর কাছে সঁপে দেবে। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘তারা এক গত সম্প্রদায়। তারা যা করেছে সেটার ফল তারা পাবে। তোমরা যা করছ সেটার ফল তোমরা পাবে।’ তাকদিরের সবকিছুর উপর ঈমান আনবে। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো অন্যায়-অশোভন কথা বলবে না। নিজের জন্য যা পছন্দ করো, মানুষের জন্য তা পছন্দ করবে। নিজের জন্য যা অপছন্দ করো, মানুষের জন্য তা অপছন্দ করবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে মনগড়া কথা বলবে না। আল্লাহর উপর নিজের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেবে না। তাঁর কোনো নির্দেশের উপর আপত্তি করবে না। কারণ, তিনি যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন না, মানুষ যা করে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [আম্বিয়া : ১২৩]
ইমাম আজমের উপরের কথাগুলো মূলত ঈমানের ছয় রুকনের সারমর্ম। এটুকুই দ্বীন। এটুকুর উপর অবিচল থাকলেই পরকালে মুক্তি মিলবে, আল্লাহর দিদার লাভ হবে। জান্নাত পাওয়া সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। এর বাইরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানলে ভালো, না জানলে অসুবিধা নেই। কিন্তু বিস্তারিত জানতে গিয়ে যদি বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতিতে নিমজ্জিত হতে হয়, দ্বীন বিকৃতির শিকার হয়, তবে সেটা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্য।
এ বক্তব্য ইমাম আজমের নিজের নয়, বরং তিনি—যেমনটা শুরুতেই বলেছেন—এগুলো সাহাবি ও তাবেয়িদের বলতে শুনেছেন। এ জন্য আমরা একাধিক হাদিসে ইমামের বক্তব্যের সত্যতা দেখি। যেমন—তালহা বিন উবাইদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত; নজদ থেকে এলোকেশী (সাধারণ) এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে।’ সে বলল, আর কিছু? তিনি বললেন, ‘না। তবে চাইলে অতিরিক্ত (নফল নামায পড়তে পারো)।’ অতঃপর রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘রমযানের রোযা রাখবে।’ সে বলল, আর কিছু? রাসুল বললেন, ‘না। তবে চাইলে অতিরিক্ত (নফল রোযা রাখতে পারো)।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, ‘যাকাত দেবে।’ সে বলল, আর কিছু? তিনি বললেন, ‘না। তবে অতিরিক্ত (নফল সদকা করতে পারো)।’ তখন লোকটি এ কথা বলে চলে গেল: আল্লাহর শপথ! আমি এগুলোর উপর কিছু বাড়াবাব না, কমাবও না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘যদি সত্য বলে, তবে সে সফল!’
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত; এক গ্রাম্য সাহাবি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যেটা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করব। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। ফরয নামাযগুলো আদায় করবে। ফরয যাকাত দেবে। রমযানের রোযা রাখবে।’ লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! আমি এর উপর কিছু বাড়াব না। সে চলে যাওয়ার পরে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘যদি কেউ জান্নাতি কাউকে দেখতে চায় তবে যেন তাকে দেখে!’
আল্লাহর দ্বীনের সারল্য দেখুন! আল্লাহর দ্বীনের সহজ প্রকৃতি দেখুন! দেখুন জান্নাতের পথ কত সংক্ষিপ্ত! দ্বীনের এসব মৌলিক বিষয় মেনে নেওয়াই যথেষ্ট। বাকি সব অতিরিক্ত। সবার উপর অপরিহার্য নয়। ইমাম আজমের উপরের বক্তব্য আর এই হাদিসগুলোর সামঞ্জস্য বিস্ময়কর, কিন্তু অদ্ভুত নয়। কারণ, সকল সালাফে সালেহিনের মানহাজ এটা। জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্ত ফিরকাগুলোর কারণে।
কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের এই আলোকিত মানহাজের উপরই হেঁটেছেন আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমাম। ফলে এবার আমরা এ ব্যাপারে আলেমদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করব :
* ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) লিখেন—ঈমান ও ইসলামের অর্থ হলো আল্লাহর সকল গুণের সত্যায়ন করা এবং স্বীকৃতি দেওয়া; তাঁর শরিয়তের সকল বিধান কবুল করে নেওয়া। এটার দুটো পর্যায় রয়েছে। এক. মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত বিশ্বাস—মাতা-পিতা ও পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইসলামের বিধান। দুই. দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সকল গুণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। এটাই প্রকৃত কামালত তথা পূর্ণাঙ্গতা; কিন্তু এটা সবার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেননা, আল্লাহ তায়ালার গুণাবলির তফসিলি জ্ঞানের ক্ষেত্রে সকল মানুষ সমস্তরের নয়। ফলে কামালত দ্বিতীয় পর্যায় থেকে প্রথম পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে। ইজমালিভাবে সত্যায়ন ও স্বীকৃতিই ঈমানের ক্ষেত্রে কামালত গণ্য হবে; ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত দলিল-প্রমাণ-সহ জানা জরুরি হবে না। এ কারণে মুসলমানকে (ঈমানের তফসিল) প্রশ্ন না করে তার কাছে বরং ঈমান তুলে ধরে বলা হবে, ‘ঠিক আছে?’ যদি সে বলে, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে’, তাহলে তার ইসলাম পূর্ণ হয়ে যাবে। এটা যদি কোনো আলামত দ্বারা প্রকাশ পায়, তবে জিজ্ঞাসা করাও নিষ্প্রয়োজন। যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তিকে তোমরা জামাতে (নামাযে) অভ্যস্ত দেখবে, তার ঈমানের সাক্ষ্য দেবে।’ আরেক হাদিসে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের নামায পড়বে, আমাদের কিবলা অভিমুখী হবে, আমাদের যবাইকৃত পশু খাবে, তোমরা তার জন্য ঈমানের সাক্ষ্য দাও।’ (কারণ, এগুলোই প্রমাণ করে সে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর শরিয়তকে স্বীকার করে। তফসিল জানা আবশ্যক নয়।) হ্যাঁ, যদি কারও সামনে তফসিল উপস্থাপন করে বলা হয়, ‘ঠিক আছে?’ তদুপরি সে অজ্ঞতা জাহির করে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না।
আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের মতে ইজমালি ঈমান যথেষ্ট, তফসিলি ঈমান আবশ্যক নয়। ফলে কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (এ) আল্লাহর রাসুল, তাঁর নিয়ে আসা দ্বীন আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য—এটুকু মেনে নেয়, তাতেই যথেষ্ট। তবে যদি কোনো মাসআলাতে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়, সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং সন্দেহ দূরীভূত করা আবশ্যক।’
আলাউদ্দিন আবদুল আযিয বুখারি (৭৩০ হি.) লিখেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি অন্তরে আল্লাহকে সত্যায়ন করবে, মুখে তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেবে, একত্ববাদ (তাওহিদ), জ্ঞান (ইলম), কুদরত, জীবন-সহ আল্লাহর সকল গুণ, পরম করুণাময় (রহমান), দয়ালু (রহিম), সর্বশক্তিমান (কাদের), মহাজ্ঞানী (আলিম) ইত্যাদি সকল সুন্দর নামের স্বীকৃতি দেবে, সে মুসলিম হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু আমাদের ইন্দ্রীয়-অনুভবের ঊর্ধ্বে, ফলে এমন কিছু নাম ও গুণ দরকার, যার মাধ্যমে তাকে চেনা সম্ভব। আল্লাহর পাশাপাশি আল্লাহর ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুল, পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাসও দরকার। আর এ সবকিছু মুসলিম পরিবারে এবং ইসলামি সমাজে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান থাকে। একটা শিশু যখন এখানে বড় হয়, এগুলোর সাক্ষ্য এবং এগুলোর মাধ্যমে ইবাদতের উপরই বড় হয়। এটা হলো সত্যায়ন ও স্বীকৃতির এক পর্যায়। আরেকটা পর্যায় হলো দলিল-প্রমাণের মাধ্যেমে ইয়াকিনি পদ্ধতিতে আল্লাহকে জানা ও মানা; পরিবার ও সমাজ অনুসরণের মাধ্যমে নয়। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে ইজমালিভাবে ঈমানকেই গ্রহণযোগ্য ও কামালত ধরা হবে। ঈমান সাব্যস্ত করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে।’
এগুলো ইমাম তহাবিরও সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা, যেটা তিনি আকিদাহ তাহাবিয়্যাহতে এভাবে দিয়েছেন, ‘আমরা আমাদের কিবলার অনুসারীদের ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম-মুমিন হিসেবে আখ্যায়িত করব, যতক্ষণ তারা নবি কারিম (ﷺ) আনীত সকল বিষয়ের স্বীকৃতি দেবে, তাঁর সকল বক্তব্য এবং সংবাদকে সত্যায়ন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয় না, যতক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে, যেগুলোর স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে ঈমানে প্রবেশ করেছিল।’ প্রথম বাক্যে সকল বিষয়ে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ঈমানের সবগুলো বিষয় জানা ও শেখা সবার জন্য জরুরি; বরং ইজমালি সাক্ষ্য দেবে। এটার প্রমাণ হচ্ছে ইমামের দ্বিতীয় বাক্য। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় (ঈমানের ছয় রুকনের) ইজমালি সাক্ষ্যদানের মাধ্যমেই প্রত্যেকে মুমিন গণ্য হবে।
কিন্তু যদি এমন কোনো কথা বলে বা কাজ করে, যা ঈমানের তফসিলি আলোচনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।
আবদুল আযিয বুখারি আরও লিখেন, “যদি কাউকে বলা হয়—তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ তায়ালা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, তিনি শক্তিমান, তিনি জ্ঞানী, তিন সর্বশ্রোতা, তিনি সর্বদ্রষ্টা, তিনি সবকিছুর ইচ্ছা ও ফয়সালাকারী ইত্যাদি...? অথবা বলা হয়—তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ সকল পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী, আল্লার রাসুল মুহাম্মাদ (ﷺ) যা-কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন সব সত্য? প্রশ্নের জবাবে যদি সে ‘হ্যাঁ’ বলে, তার ঈমানকে বিশুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এসব সাক্ষ্যের তফসিলি আলোচনা তার কাছে চাওয়া হবে না। তবে এটা স্বাভাবিক অবস্থায়। ফলে সে ব্যক্তি যদি ইসলামবিরোধী কোনো আকিদা লালন করে, তবে তার জন্য স্রেফ ‘হ্যাঁ’ বলা যথেষ্ট হবে না, বরং সেই আকিদা পরিবর্তন করা জরুরি হবে।”
সাফফার বুখারি বলেন, ‘কেউ যদি ঈমানের ছয়টি বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, সে মুমিন গণ্য হবে। তবে বিস্তারিত বিশ্বাস এই সংক্ষিপ্ত ঈমানের মূলনীতিতে হতে হবে। ফলে কেউ ছয়টি বিষয়ের উপর ঈমান আনার পরে যদি বিস্তারিত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহকে সাদৃশ্য দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না। তাই এসব সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ব্যাখ্যা জানা জরুরি।’
টিকাঃ
১৯. দেখুন: ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/৩)।
২০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৯)।
২১. ফাযায়িলু আবি হানিফাহ, ইবনে আবিল আওয়াম (৩২৮-৩২৯)।
২২. দেখুন: ফাযায়িলু আবি হানিফাহ, ইবনে আবিল আওয়াম (৩২৮-৩২৯)।
২৩. দেখুন: আল-ইতিকাদ, সাইয়েদ নিশাপুরি (১৭৪-১৭৫)।
২৪. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯৫-৯৬)।
২৫. বুখারি (কিতাবুল ঈমান: ৪৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৪)।
২৬. বুখারি (কিতাবুয যাকাত : ১৩৯৭)।
২৭. উসুলুল বাযদাবি (১৬৭)। প্রথম হাদিসটি তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩০৯৩) এবং ইবনে মাজাতে (আবওয়াবুল মাসাজিদ ওয়াল জামাত: ৮০২) এসেছে। আর দ্বিতীয় হাদিসটি বুখারি (কিতাবুস সালাত : ৩৯১), নাসায়ি (কিতাবুল ঈমান ওয়া শারায়িউহু: ২/৫০১২)-সহ একাধিক গ্রন্থে এসেছে।
২৮. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৪)।
২৯. কাশফুল আসরার, আলাউদ্দিন বুখারি (২/৫৮৭)।
৩০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০-২১)।
৩১. কাশফুল আসরার (২/৫৮৭)।
৩২. তালখিসুল আদিল্লাহ (১৫০-১৫১)।
📄 ন্যূনতম সীমা নির্ধারণে সংশয় নিরসন
ইমাম আজম রহ.-এর নামে ‘নূন্যতম’ জ্ঞানের সীমা নির্ধারণে বিভিন্ন ভুল বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে, যা থেকে তিনি মুক্ত। এটা মূলত মুহাদ্দিস ও ফকিহদের সংঘাতের কুফল ছিল, যার কিছু চিত্র আমরা সামনে বিভিন্ন স্থানে পেশ করব। যেমন—তাঁর ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়: তাকে মক্কাতে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সে ব্যক্তির বিধান কী যে বিশ্বাস করে আল্লাহ শূকর হারাম করেছেন, কিন্তু শূকর বলতে কী উদ্দেশ্য সেটা তার জানা নেই? তিনি বললেন, ‘সে মুমিন!’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: সে ব্যক্তির বিধান কী যে বিশ্বাস করে আল্লাহ কাবার হজ ফরয করেছেন, কিন্তু সে মক্কার কাবার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়; বরং অন্য কোথাও কাবা হতে পারে? আবু হানিফা বললেন, ‘সেও মুমিন!’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, যদি কেউ বলে, আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আল্লাহর রাসুল মানি; কিন্তু তিনি আফ্রিকানও হতে পারেন, তার ব্যক্তির বিধান কী? আবু হানিফা বললেন, ‘সেও মুমিন!’
এটা ইমাম আজমের উপর ভিত্তিহীন অপবাদ। কোনো সাধারণ আলেমও এটা বলতে পারে না, তাহলে ইমাম কীভাবে বলবেন? এটা ন্যূনতম ঈমান হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এমন হলে মদ খেয়ে বলা হবে, কুরআনে মদ বলতে অন্যকিছু বোঝানোও হতে পারে! ব্যভিচার করে বলবে, কুরআনে এই ধরনের ব্যভিচার নিষিদ্ধ নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা দিয়ে বলা হবে, কুরআনে শিরক বলতে কী বোঝানো হয়েছে আমি নিশ্চিত নই! এটা চরমপন্থি মুরজিয়াদের বক্তব্য হতে পারে। কিন্তু ইমাম আজম রাহিমাহুল্লাহ এ ধরনের আকিদা থেকে পবিত্র। ইবনে আবিল আওয়াম বর্ণনা করেন—আবু ইউসুফ ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কাবা ছাড়া অন্য কোনো দিকে ফিরে নামায পড়ে, ঘটনাক্রমে সেটা কাবার দিকে হয়ে গেলেও উক্ত ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধান অস্বীকার করেছে। ফলে কাবা সম্পর্কে জানে অথচ কোন কাবা উদ্দেশ্য সেটা না জানলেও মুমিন থাকবে এমন হতে পারে না।
মোটকথা, উসুলুদ্দিন তথা দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে এটুকু জ্ঞান অর্জন প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব, যা তাকে তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং শিরক ও কুফর থেকে সুরক্ষিত রাখে। ফলে বিস্তারিত জ্ঞান ব্যতীত কেউ তাওহিদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারলে মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু সংশয়ের মাঝে পড়লে, তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিশ্বাস মনে এলে সেটা দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম সীমারেখা নেই। বরং বিশুদ্ধ তাওহিদের সুরক্ষা এবং কুফর-শিরক প্রতিহত করতে পারাই ন্যূনতম সীমারেখা। ইমাম আজমের বক্তব্যও উক্ত কথার সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘যখন কারও মনে তাওহিদের কোনো সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তৎক্ষণাৎ তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে যেটা সত্য সেটার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যতক্ষণ না জিজ্ঞাসা করার জন্য কোনো আলেম পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার ক্ষেত্রে দেরি করা যাবে না। নীরব বসে থাকলেও পার পাওয়া যাবে না। যদি নিরপেক্ষ হয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে বসে থাকে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।’
হ্যাঁ, যদি ইমামের উপরের (আপত্তিকর) বক্তব্যগুলো প্রমাণিত ধরাও হয়, তবে সেটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। সে ব্যাখ্যা হলো, বাস্তবেই যদি কারও এসব বিষয়ে অজ্ঞতার ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ থাকে, গভীর জঙ্গল কিংবা জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস কিংবা যেকোনো গ্রহণযোগ্য ওজরের কারণে কেউ উপরের বিষয়গুলো কিংবা দ্বীনের মৌলিক কোনো বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তবে সেটা তার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ওজর (অপারগতা) গণ্য হবে। এটা বিভিন্ন হাদিস এবং ইমামদের বক্তব্য থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি। যেমন-আবু সাইদ খুদরি ও আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, (পূর্বযুগে) ‘এক ব্যক্তি তার নফসের উপর অত্যধিক জুলুম করেছিল (অর্থাৎ, গুনাহে লিপ্ত ছিল)। মৃত্যু ঘনিয়ে এলে সে তার পুত্রদের বলল, মৃত্যুর পর আমাকে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করবে। অতঃপর ছাইগুলো গুঁড়া করে বাতাসে উড়িয়ে দেবে। কারণ, আল্লাহ যদি আমাকে ধরতে পারেন, তবে তিনি আমাকে এত কঠোর শাস্তি দেবেন, যা অন্য কাউকে দেননি। সত্যি সত্যিই যখন তার মৃত্যু হলো, ওসিয়ত মোতাবেক সেভাবেই তাকে পুড়িয়ে ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর আল্লাহ জমিনকে সে ব্যক্তির ছাইগুলো একত্র করার আদেশ দিলেন (জমিন তৎক্ষণাৎ ছাইগুলো একত্র করল এবং) লোকটি (জীবিত হয়ে) দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এমন করলে কেন? সে বলল, হে প্রভু, আপনার ভয়ে! আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।’
উক্ত হাদিসটিতে গভীরভাবে লক্ষ করে দেখুন। উক্ত ব্যক্তি দ্বীনের একাধিক মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। তার এ কাজের মাধ্যমে প্রকারান্তরে সে আল্লাহর ‘সর্বশক্তিমান’ হওয়া, ‘মৃতকে জীবিত করা’, ‘শারীরিক পুনরুত্থান’ ইত্যাদির মতো একাধিক অত্যাবশক আকিদার বিষয় নাকচ করেছে। সে ভেবেছে, স্বাভাবিক অবস্থায় তাকে দাফন করা হলে আল্লাহ তাকে সশরীরে পুনরুত্থিত করতে সক্ষম। কিন্তু লাশ পুড়িয়ে ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দিলে আল্লাহ তার শরীর পুনর্গঠিত করতে পারবেন না। ফলে তাকেও জীবিত করা সম্ভব হবে না! এ ধরনের বিশ্বাস না থাকলে উক্ত ব্যক্তি এমন কাজ করত না। এগুলো সুস্পষ্ট কুফরি আকিদা। তথাপি আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারণ, সে যা করেছে প্রথমত অজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়ত আল্লাহর ভয়ে করেছে। তার অজ্ঞতার কারণ সম্ভবত যৌক্তিক ছিল। সে কারণে আল্লাহ তার ভয়কে মূল্যায়ন করে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
ইবনে আবদিল বার লিখেন, “উক্ত ব্যক্তি যে মুমিন ছিল সেটা স্পষ্ট। কিন্তু ‘আল্লাহ যদি আমাকে ধরতে পারেন’-এ কথার দ্বারা বোঝা যায়, সে আল্লাহর ‘কুদরত’ (তথা তিনি সর্বশক্তিমান) সিফাত সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। এক্ষেত্রে প্রথম যুগের (অর্থাৎ সালাফের) আলেমদের বক্তব্য হলো, যদি কেউ আল্লাহর সকল সিফাত জানে ও মানে কিন্তু কিছু সিফাত সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তবে তাতে কাফের হবে না। কারণ, অজ্ঞতা কুফর নয়; কুফর হলো সত্যকে জেনেবুঝে প্রত্যাখ্যান করা।’
কেবল পূর্বযুগে নয়, দ্বীনের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে এমন না জানার চিত্র সাহাবাদের মাঝেও বিদ্যমান। এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস রয়েছে, যার সবগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যেমন-কোনো কোনো সাহাবি তাকদিরের বিষয়ে রাসুলুল্লাহকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছেন। সেসব প্রশ্নে স্পষ্ট হয় যে, তারা এগুলো জানতেন না। ফলে অজ্ঞতাকে কুফর বলা হলে সাহাবাদেরও উত্তর জানার আগে কাফের বলতে হবে। ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. রাসুলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল, কারা জান্নাতি আর কারা জাহান্নামি এটা কি (আল্লাহর) জানা বিষয়? রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, তাহলে আমল করে কী লাভ? রাসুল (স) বললেন, ‘প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে।’
এ ধরনের প্রশ্ন অন্যান্য সাহাবা থেকেও বর্ণিত। যেমন—আয়েশা রাযি. প্রশ্ন করেন, ‘মানুষ যখন কোনোকিছু গোপন করে, আল্লাহ তায়ালা কি সেটা জানতে পারেন?’ রাসুলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন, ‘হ্যাঁ।’
খেয়াল করে দেখুন, আল্লাহর ইলম তথা জ্ঞান ও তাকদির নিয়ে না জানার কারণেই সাহাবাগণ এ ধরনের প্রশ্ন করেছেন। কেউ তাকদিরের কথা জানতেন না। কেউ মানুষের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ জ্ঞাত কি না সেটা জানতেন না। রাসুলুল্লাহ (স) তাদের জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ জানানোর আগে তারা কাফের হয়ে যাননি। সুতরাং মূল ঈমানের অধিকারী থাকার কারণে সাহাবাদের ক্ষেত্রে যদি ঈমানের কোনো মৌলিক রুকন এবং আল্লাহর মৌলিক কোনো সিফাত জানার আগ পর্যন্ত অজ্ঞ থাকা বৈধ হয় এবং এ জন্য তারা সে সময় কাফের সাব্যস্ত না হন, বোঝা গেল, এটা অন্যদের ক্ষেত্রেও বৈধ। অন্যরাও এতে কাফের সাব্যস্ত হবে না। অর্থাৎ, বাস্তবেই গ্রহণযোগ্য কোনো কারণে যদি কেউ দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে দ্বীনের অন্য সকল বিষয় জানে ও মানে, তবে আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।
ইবনে কুতাইবা (২৭৬ হি.) লিখেন, ‘মুসলিম ব্যক্তি কিছু সিফাতের ক্ষেত্রে ভুল করে ফেলতে পারে। এর জন্য তাকে পাকড়াও করা হবে না। খাত্তাবি লিখেন, সে এগুলো অস্বীকার করেনি, বরং অজ্ঞ ছিল। কিন্তু মৌলিক ঈমান থাকাতে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ যেমনটা আমরা বলেছি যে, এটা অসম্ভব নয়। কারণ, আহলে ফাতরাহ (যার কাছে দ্বীন বা নবিদের দাওয়াত পৌঁছয়নি) কিংবা জনবিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ বা জঙ্গলের অধিবাসীদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া মোটেও বিস্ময়কর নয়। ফলে এমন ব্যক্তি কিংবা এমন ব্যক্তির মতো যেকোনো ব্যক্তির যৌক্তিক ওজর অজ্ঞতার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। আর তাই ‘ইজমালি ঈমানের ন্যূনতম পরিমাণ’ মৌলিক ছয়টি বিষয় নির্ধারণ করা হলেও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আলোকে বিধান ভিন্ন হতে পারে।
এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে। সাধারণ মুসলমানদের যেন দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সব ধরনের জাহালাত ও অজ্ঞতা থেকে রক্ষা করা যায়, সে মহান আমানত আলেমদের কাঁধে রয়েছে। আমরা আমাদের নিজেদের চারপাশে দৃষ্টি দিলে এমন অনেক লোককে পাব যারা দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা, ভুল ধারণা ও বিচ্যুতিতে লিপ্ত। এক্ষেত্রে তাদের যৌক্তিক ওজরের চেয়ে অলসতা, ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, আলেমদের দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে ত্রুটি বিভিন্ন বিষয় দায়ী। ফলে উপরের হাদিসগুলোর উপর ভিত্তি করে অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন এমন আশা নিয়ে নির্লিপ্ত বসে থাকা নির্বুদ্ধিতা। কারণ, এ ধরনের ক্ষমা পাওয়ার জন্য ‘গ্রহণযোগ্য ওজর’ থাকা জরুরি। অথচ অলসতা, ইচ্ছাকৃত গাফিলতি গ্রহণযোগ্য ওজর নয়।
টিকাঃ
৩৩. দেখুন: আল-ফাসল, ইবনে হাযাম (৩/১৩৯)। আত-তাবসির ফি মাআলিমিদ দ্বীন, তাবারি (১৪৯)।
৩৪. মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন, আশআরি (১/১১৯)। খতিবও তারিখে বাগদাদে উক্ত বক্তব্য নকল করেছেন (১৫/৫০৭)।
৩৫. ফাযায়িলু আবি হানিফা, ইবনে আবিল আওয়াম (৩৬৯)।
৩৬. আল-ফিকহুল আকবার (৮)।
৩৭. বুখারি (কিতাবু আহাদিসিল আম্বিয়া: ৩৪৮১)। মুসলিম (কিতাবুত তাওবা: ২৭৫৭)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি সাইদ খুদরি: ১১২৬৫)।
৩৮. আত-তামহিদ (১৮/৪২)।
৩৯. মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৪৯)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৭০৯)।
৪০. মুসলিম (কিতাবুল জানায়েয: ১৭৪)। নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ১/২০৩৬)।
৪১. দেখুন: আত-তামহিদ, ইবনে আবদিল বার (১৮/৪২-৪৭)।
৪২. ফাতহুল বারি (৬/৫২৩)।
📄 আহলে সুন্নাতের পরিচয়
ইজমালি তথা সংক্ষিপ্ত ঈমানের ব্যাপারে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। ফলে ঈমানের ছয়টি রুকন (আল্লাহ, ফেরেশতা, নবি-রাসুল, আসমানি কিতাব, আখেরাত ও তাকদির) বিষয়ে সামগ্রিকভাবে সকল মুসলিম ঈমান রাখে। কেউ এগুলোর কোনোটা সরাসরি নাকচ করলে সে মুমিনই থাকবে না। ফলে এগুলোর উপর ঈমান আনার আবশ্যকতার ক্ষেত্রে গোটা মুসলিম উম্মাহর মাঝে দ্বিমত নেই। কিন্তু এসব বিষয়ের যখন তফসিলি ব্যাখ্যার কথা আসে, তখনই জটিলতা তৈরি হয়। কারণ, এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়েই মুসলিম উম্মাহর মাঝে চরম মতভেদ-মতবিরোধ, বিবাদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর অন্তর্গত অনেক ফিরকা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। ফলে আমরা দেখব :
ঈমানের প্রশ্নে বেশকিছু সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হয়েছে। কেউ কেউ ঈমানকে স্রেফ জানার নাম দিয়েছে। কেউ বিপরীতে ঈমানকে স্রেফ মুখের স্বীকৃতি আখ্যা দিয়েছে। কেউ কোনো গুনাহ করলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুমিনদের তালিকা থেকে ফেলে দিয়ে কাফের বানিয়ে দিয়েছে। কেউ আবার বলেছে, যত গুনাহই করুক, যত অপরাধে জড়াক, কালিমা পড়লেই সে খাঁটি মুমিন গণ্য হবে! কুফর বিষয়টা তারা সম্পূর্ণ ভুলেই গেছে।
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ক্ষেত্রে বিশাল একদল লোক গোমরাহ হয়ে গিয়েছে। কেউ আল্লাহকে সৃষ্টির মতো বানিয়ে ফেলেছে; আবার কেউ তাঁর সকল গুণ নাকচ করে তাকে ‘অস্তিত্বহীন’ (মাদুম) করে দিয়েছে। আরেক দল তাঁর উপর এমন অনেক শব্দ প্রয়োগ করেছে, তাঁর শানে এমন আকিদা ও বিশ্বাস রেখেছে, যেগুলো তাঁর জন্য শোভনীয় নয়। কেউ আল্লাহর তাওহিদ জানতে না পেরে শিরকে লিপ্ত হয়েছে, কেউ সুন্নাহ চিনতে না পেরে বিদআতে ডুবে গেছে।
ফেরেশতার ক্ষেত্রে নানান সম্প্রদায় নানা প্রকারের বিচ্যুতির শিকার হয়েছে; নবি-রাসুলদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। নবিদের মুজিযা অস্বীকার করেছে। ওলিদের নবি-রাসুলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বানিয়ে দিয়েছে। আরেক দল নবিদের দার্শনিক মনে করেছে। নবিদের সহচর তথা সাহাবাদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়েছে—একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছে।
আসমানি কিতাবের ক্ষেত্রে কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়েছে। আল্লাহর কুরআন, যা তাঁর সিফাত বা গুণ, সেটাকে সৃষ্টি বানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর ‘কালাম’ (কথা) সিফাত নিয়ে উম্মাহ শতাব্দের পর শতাব্দ সংক্ষুব্ধ ও শতধাবিভক্ত থেকেছে, আজও আছে।
পরকালসম্পৃক্ত অনেক বিষয় বিভিন্ন ফিরকা অস্বীকার করেছে। কবরের শাস্তি, দৈহিক পুনরুত্থান, মিযান (দাঁড়িপাল্লা), হিসাব, হাউযে কাউসার, পুলসিরাত, আল্লাহর দিদার—এ সবকিছু অস্বীকার করেছে কিংবা নিদেনপক্ষে অপব্যাখ্যা করেছে। অনেকে জান্নাত-জাহান্নামের বর্তমানে বিদ্যমান থাকা এবং এগুলোর সৃষ্টি হওয়াকে অস্বীকার করেছে। কেউ কেউ জাহান্নামকে অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল বলেছে।
তাকদিরের ক্ষেত্রে অনেকে বিভ্রান্ত্রির শিকার হয়েছে—একদল মানুষকে পূর্ণ স্বাধীন স্বীকৃতি দিয়ে তাকদির অস্বীকার করেছে; আরেক দল মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। তাকদিরের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে মানুষকে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মতো বানিয়ে ফেলেছে, যা বাতাসের সঙ্গে ভেসে বেড়ায়, যার নিজের নড়াচড়ার কোনো ক্ষমতা নেই।
এভাবে দ্বীনের প্রত্যেকটি মাসআলায় কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে। বিভিন্নমুখী প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছে, যারা কেউ একেবারে ডানে আবার কেউ একেবারে বামে চলে গেছে; মাঝামাঝি থাকেনি। যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এ সবকিছু জানতেন, এ জন্য কুরআনে আমরা দেখব বারবার মধ্যপথ থেকে সরে ডানে-বামে চলে যেতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, রাসুলুল্লাহ(ﷺ) একদিন মাটিতে একটি সোজা দাগ দিলেন। বললেন, এটা আল্লাহর পথ। অতঃপর সেটার ডানে ও বামে অনেকগুলো দাগ দিলেন। বললেন, এগুলোর প্রত্যেকটি পথের উপর শয়তান দাঁড়িয়ে ডাকছে। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করলেন,
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُم عَن سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَضَّكُم بِهِ، لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ অর্থ : ‘আর এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো। অন্য পথগুলোতে যেয়ো না। গেলে তা তোমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হও।’ [আনআম : ১৫৩]
আকিদাকে কেন্দ্র করে যে মুসলিম উম্মাহর মাঝে অসংখ্য ফিরকার জন্ম হবে সেটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ওহির মাধ্যমে আগেই জেনেছেন। ফলে তিনি সাহাবাদের এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করেছেন। পরবর্তী উম্মাহর জন্য নসিহত রেখে গিয়েছেন। কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। ইরবাজ ইবনে সারিয়াহ রাযি. থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিয়ে নামায পড়লেন। নামায শেষে আমাদের দিকে ফিরে গুরুগম্ভীর ওয়াজ করলেন। তাতে অশ্রু প্রবাহিত হলো, হৃদয় কম্পিত হলো। কেউ বলল, হে আল্লাহর রাসুল, মনে হচ্ছে আপনি বিদায়ের ওয়াজ করলেন! আমাদের প্রতি আপনার ওসিয়ত কী? রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘আমি তোমাদের তাকওয়া ও আনুগত্যের ওসিয়ত করছি। একজন হাবশি দাসকেও তোমাদের শাসক বানানো হলে তার আনুগত্য করবে। কেননা আমার পরে তোমরা প্রচণ্ড মতভেদ দেখতে পাবে...।’
বরং তিনি কতগুলো ফিরকাতে বিভক্ত হবে সেটাও বলে গিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, ‘ইহুদিরা একাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে; খ্রিষ্টানরা বাহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মত তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। সবগুলো ফিরকা জাহান্নামে যাবে, কেবল একটি জান্নাতে যাবে...।’ আবু হুরাইরা থেকে হাদিসটি বর্ণনার পরে ইমাম তিরমিযি লিখেন, ‘এ হাদিসটি সাদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, আউফ ইবনে মালেক-সহ বিভিন্ন সাহাবি থেকে বর্ণিত।’
ইমাম আজম আবু হানিফা নিজস্ব সনদে আবু হুরাইরা রাযি. সূত্রে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর এই হাদিস বর্ণনা করেন, ‘বনি ইসরাইল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। তারা সকলে জাহান্নামে। (মুক্তি পাবে) কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মুসলমান (সাওয়াদে আজম)।’
ফলে আকিদার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর শতধাবিভক্ত হওয়া কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে প্রমাণিত। বিভিন্ন ভ্রান্ত ফিরকার আবির্ভাব সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে সাব্যস্ত। এ কারণে কেবল ‘আমি ইসলামি আকিদা’ মানি অথবা ‘আমি মুসলিম’ এটুকুই যথেষ্ট নয়। কারণ, ইসলামের উপর থেকেও, মুসলিম দাবি সত্ত্বেও বিভ্রান্ত হওয়া স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। তিয়াত্তর দলের মাঝে সবাই নিজেকে মুসলিম দাবি করবে, অথচ কেবল একটি জান্নাতে যাবে, সেটাও প্রমাণিত। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত ইসলামের দাবি সত্ত্বেও বিভ্রান্ত ও গোমরাহ শত শত ফিরকার উদ্ভব এ তিক্ত বাস্তবতার সাক্ষী। এগুলোর কিছু ফিরকা বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো কোনো ফিরকা কুফরে নিমজ্জিত, ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ তথা বহিষ্কৃত।
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত? হকপন্থি দল কারা? কোন পথে কিংবা কাদের সঙ্গে থাকলে এই শত শত বিভ্রান্ত ফিরকা থেকে বেঁচে থেকে প্রকৃত ইসলামের অনুসারী হওয়া যাবে? ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ কাদের কাছে বিদ্যমান? এই সবকিছুর উত্তর হলো ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা বিশুদ্ধ আকিদা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথ বিশুদ্ধ পথ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সঙ্গে থাকা হকপন্থি দলের সঙ্গে থাকা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উপর থাকা মানে বিশুদ্ধ কুরআন ও সুন্নাহর পথে থাকা, সালাফে সালেহিনের সঙ্গে থাকা।
কেউ কেউ মনে করেন, কুরআন ও সুন্নাহতে তো এমন কোনো ফিরকার কথা নেই; বরং এর নামে ইসলামে কি আরেকটি ফিরকা বানানো হলো না? এটা অজ্ঞতাপ্রসূত বক্তব্য। কারণ, ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’ কারও বানানো মত নয়, কারও মনগড়া শিরোনাম নয়; বরং এটা খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলে গিয়েছেন। ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-কে তিনি বিশুদ্ধতার সনদ দিয়েছেন।
পিছনে উল্লিখিত ইরবাজ ইবনে সারিয়ার হাদিসের শেষাংশে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমার পরে তোমাদের যারা বেঁচে থাকবে, প্রচণ্ড মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরবে। সেগুলো তোমরা মজবুতভাবে ধরে রাখবে। দাঁত কামড়ে পড়ে থাকবে। সাবধান! (দ্বীনের মাঝে) নবসৃষ্ট বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, (দ্বীনের ক্ষেত্রে) প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় বিদআত; আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি।’ উম্মাহর বিভক্তিসংক্রান্ত হাদিসের শেষে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘সবগুলো ফিরকা জাহান্নামে যাবে। কেবল একটি জান্নাতে যাবে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, তারা কারা, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, ‘যারা আমার এবং আমার সাহাবাগণের পথে থাকবে।’ অর্থাৎ, সুন্নাত এবং সাহাবাগণের জামাত বা দলের সঙ্গে থাকবে। অন্যকথায়, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী হবে।
ইমাম আজম বলেন, ‘তোমরা যেসব বস্তু শিখছ এবং মানুষকে শেখাচ্ছ, তন্মধ্যে সবচেয়ে উত্তম (ইলম) হলো সুন্নাত। মানুষের আবিষ্কৃত বিদআতের মাঝে হেদায়াত নেই। হেদায়াত তো কেবল কুরআন, রাসুলুল্লাহর সুন্নাত এবং সাহাবায়ে কেরামের পথে। এ ছাড়া সবই দ্বীনের ক্ষেত্রে সংযোজন ও বিদআত।’ ইমাম আরও বলেন, ‘সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরো। সালাফের অনুসরণ করো। প্রত্যেক নবসৃষ্ট বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সেগুলো বিদআত!’
মোটকথা, রাসুলুল্লাহর সুন্নাত এবং তাঁর সাহাবাদের পথ মুক্তির পথ। এই পথে যারা থাকবে তারাই ‘আহলে সুন্নাত’ তথা সুন্নাতের অনুসারী হিসেবে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সত্যপন্থি দল হিসেবে বিবেচিত হবে। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এ পথেই অটল-অবিচল ছিলেন। তাদের পরে তাদের ছাত্ররা (তাবেয়িন) এ পথের অনুসরণ করেছেন। তাদের পরে তাদের ছাত্ররা (তাবে-তাবেয়িন) এ পথেই হেঁটেছেন। এ পথে ছিলেন চার ইমাম এবং প্রত্যেক যুগের সকল ফকিহ ও মুহাদ্দিস। সকল যুগের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম এবং তাদের অনুসারী এই ‘আহলে সুন্নাতের’ পথেই ছিলেন। আর আল্লাহর অনুগ্রহে যুগে যুগে তারাই যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ (সাওয়াদে আজম) ছিলেন, বিভ্রান্ত ও প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলো সংখ্যালঘু ছিল, এ কারণেই তাদের বলা হয়েছে ‘জামাত’। তারা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন তথা সালাফে সালেহিনের জামাতের পথের উপর প্রতিষ্ঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহ। আর এভাবে এই সত্যপন্থি ও মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাম হয়েছে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’। তাদের আকিদাই ইসলামের বিশুদ্ধ আকিদা। তারাই ইসলামের প্রকৃত প্রতিনিধি। হ্যাঁ, আহলে সুন্নাতের মাঝেও বিভিন্ন শাখাগত বিষয়ে বিরোধ রয়েছে, তথাপি সামগ্রিকভাবে তারা সকলেই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
রাসুলুল্লাহ () একটি হাদিসে বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকে গোমরাহির উপর একত্র করবেন না। তাই যখন মতভেদ দেখতে পাবে, তখন সাওয়াদে আজম তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের সঙ্গে থাকবে।’ (৫১) অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহে অধিকাংশ মুসলিম সবসময় হকের উপর থাকবে। বিভ্রান্ত ফিরকাগুলো মূল ধারার মুসলিমদের চেয়ে নিতান্তই ক্ষুদ্র ও গৌণ হবে। এটাই উক্ত হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, একদল লোক খোদ আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার উপর এই হাদিস প্রয়োগ করেন। তারা সাওয়াদে আজম কিংবা জামাতের অপব্যাখ্যা করে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মতামত ও সংখ্যালঘু দলকে ‘জামাত’ ও ‘সাওয়াদে আজম’ আহলে সুন্নাত দাবি করেন এবং আহলে সুন্নাতের অনুসারী বিভিন্ন ধারার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমকে বিভ্রান্ত আখ্যা দেন। এটা যুগপৎ ভয়ংকর ও বেদনাদায়ক; বরং যুগে যুগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহ, উলামা-ফুকাহা, মুতাকাল্লিমিন-মুহাদ্দিসিন, সুফি-সাধক, দাঈ, সংস্কারক এবং সাধারণ মুসলমান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত নামক হক, মধ্যমপন্থি ও সত্যাগ্রহী দল হিসেবে বিবেচিত হবেন, ইনশাআল্লাহ।
আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থার উপর প্রতিষ্ঠিত, যে পথে ছিলেন সাহাবা, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন এবং উম্মাহর প্রথম প্রজন্ম। তারা ‘জাহমিয়্যাহ’, ‘মুতাযিলা’ ও ‘কাদারিয়্যাহ’দের মতো আল্লাহর সিফাত অস্বীকার করে না। আবার সিফাত সাব্যস্তের নামে চরমপন্থি ‘হাম্বলি’, ‘কাররামিয়্যাহ’ ও ‘মুজাসসিমাহ’দের মতো আল্লাহর জন্য শরীর, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, চলাফেরা ও স্থানান্তর সাব্যস্ত করে না। বরং তারা আল্লাহর ‘ইলম’, ‘কুদরত’, ‘দর্শন’, ‘শ্রবণ’, ‘সৃষ্টি’-সহ সকল কদিম সিফাতে বিশ্বাস করে। আল্লাহকে ‘দেহ’, ‘অঙ্গপ্রত্যঙ্গ’, ‘স্থানান্তর’ ও ‘পরিবর্তনে’র ঊর্ধ্বে মনে করে। ... তাকদিরের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত তাকদির অস্বীকারকারী ‘কাদারিয়্যাহ’ এবং তাকদিরের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনকারী ‘জাবরিয়্যাহ-দের মাঝামাঝি থাকে। ঈমানের প্রশ্নে ‘খারেজি’ ও ‘মুরজিয়া’-দের মাঝামাঝি থাকে। সাহাবাদের ভালোবাসার প্রশ্নে ‘নাসেবি’ (খারেজি) ও ‘রাফেযি’-দের মাঝামাঝি থাকে। এভাবে দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত সকল প্রান্তিকতামুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যমপন্থি জামাত।
এটা মূলত ইমাম আজম রহ.-এর বক্তব্যের সারমর্ম। ইমাম আজম বলেন, ‘আমরা (সর্বত্র) দুই প্রান্তিক বক্তব্যের মাঝামাঝি অবস্থান করি। ফলে (সিফাতের ক্ষেত্রে) আল্লাহকে সৃষ্টির সদৃশ মনে করি না, আবার তাঁর সিফাতগুলো নাকচও করি না। (তাকদিরের ক্ষেত্রে) মানুষকে বাধ্য বলি না, আবার সর্বৈব ক্ষমতার অধিকারী মনে করি না।’
‘আল-হাভি’র উদ্ধৃতিতে তাতারখানিয়্যাহতে এসেছে-আহলে সুন্নাতের দশটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে : এক. আল্লাহর জন্য শোভনীয় নয় এমন কিছু তাঁর ব্যাপারে না বলা। দুই. কুরআনকে আল্লাহর কালাম গাইরে মাখলুক (সৃষ্টি নয়) বলা। তিন. প্রত্যেক সৎ-অসৎ ব্যক্তির পিছনে নামায পড়া। চার. তাকদিরের ভালো ও মন্দ দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বাস করা। পাঁচ. মোজার উপর মাসাহ করা বৈধ মনে করা। ছয়. শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ না করা। সাত. আবু বকর, উমর ও উসমানকে বাকি সকল সাহাবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা। আট. গুনাহের কারণে আহলে কিবলার কাউকে কাফের না বলা। নয়. আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত সকল মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়া। দশ. জামাত তথা ঐক্যকে আল্লাহর রহমত মনে করা, অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলাকে আযাব মনে করা।
টিকাঃ
৪৩. ইবনে হিব্বান (মুকাদ্দিমা : ৬)। দারেমি (মুকাদ্দিমা: ২০৮)।
৪৪. আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬০৭)। দারেমি (মুকাদ্দিমা : ৯৬)। ইবনে হিব্বান (মুকাদ্দিমা : ৫)।
৪৫. তিরমিযি (আবওয়াবুল ঈমান: ২৬৪০)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৫৯৬)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৩৯৯১)।
৪৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৫২)।
৪৭. আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬০৭)। দারেমি (মুকাদ্দিমা: ৯৬)। ইবনে হিব্বান (মুকাদ্দিমা : ৫)।
৪৮. তিরমিযি (আবওয়াবুল ঈমান: ২৬৪০)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৫৯৬)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৩৯৯১)।
৪৯. আর-রিসালাহ (৩৫)।
৫০. যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহি (৫/২০৭)।
৫১. ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৩৯৫০)। মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল কুফিয়্যিন (১৯৬৫৯)।
৫২. ইসলামের ইতিহাসের জঘন্যতম ভ্রান্ত সম্প্রদায়। তাদের নেতা জাহম ইবনে সাফওয়ানের দিকে সম্পৃক্ত হয়ে তারা জাহমিয়্যাহ নামে পরিচিত হয়েছে। এই ফিরকা ইসলামের ইতিহাসের সকল বিভ্রান্তির কারখানা। আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে তারা ‘মুআত্তিলাহ’ তথা সিফাত অস্বীকারকারী। তাকদিরের ক্ষেত্রে তারা জাবরিয়্যাহ। তারা মনে করে, মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই; মানুষ পরাধীন ও বাধ্য। একইভাবে আল্লাহর কালামের ক্ষেত্রে মুতাযিলা (তথা কালামকে সৃষ্টি আখ্যাদানকারী), ঈমানের ক্ষেত্রে মুরজিয়া। তারা মনে করে, কেবল জানার নামই ঈমান; সত্যায়ন কিংবা স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। [আল-ফাসল, ইবনে হাযাম; উসুলুদ্দিন, বাযদাবি: ২৫৮]
৫৩. কুরআন-সুন্নাহর পরিবর্তে আকলের অনুসারী ভ্রান্ত সম্প্রদায়। যুগে যুগে তারা উলামায়ে সুন্নাতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইসলামের বিকৃতি সাধন করেছে। আকিদার অধিকাংশ মাসআলাতে তারা কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের অনুসারী। ফলে কাদারিয়্যাহরা আল্লাহ ও পরকালসংশ্লিষ্ট যেসব বিষয় অস্বীকার করে, তাদের অধিকাংশ ব্যক্তি সেসব বিষয় অস্বীকার করত। আবার জাহমিয়্যাহদের অনুসরণে কুরআনকে মাখলুক বলত। [উসুলুদ্দিন, বাযদাবি : ২৫৫, ২৫৭]
৫৪. আল্লাহর সিফাত অস্বীকার, পরকালে আল্লাহর দিদার অস্বীকার, আল্লাহর কালামকে মাখলুক বলা-সহ বিভিন্ন গোমরাহির উৎস এই ফিরকা। তাকদিরের ক্ষেত্রেও তারা বিভ্রান্ত। তারা আল্লাহকে মানুষের কর্মের স্রষ্টা মনে করে না, বরং মানুষকে নিজেদের কর্মের স্রষ্টা বলে। তাদের মাঝে প্রথম যুগের চরমপন্থি কাদারিয়্যাহরা আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার করত। পরকাল-সম্পৃক্ত—যেমন কবরের শাস্তি, মুনকার নাকিরের প্রশ্ন, পুলসিরাত, মিযান-সহ—অধিকাংশ বিষয় তারা অস্বীকার করে। কিয়ামতের দিন আমলনামা পাঠকে তারা নাকচ করে। জান্নাত ও জাহান্নামের সৃষ্টি হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে। মিরাজকে অস্বীকার করে। কারামতে আউলিয়াতে বিশ্বাস রাখে না। প্রথম যুগের কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় পরবর্তীকালে ‘মুতাযিলাহ’তে রূপান্তরিত হয়। [উসুলুদ্দিন, বাযদাবি : ২৫৬]
৫৫. মুজাসসিমাহ মানে দেহবাদী সম্প্রদায়। ইসলামের অনেকগুলো ভ্রান্ত সম্প্রদায় এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, যারাই আল্লাহর সিফাতগুলো সাব্যস্তের নামে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহকে সৃষ্টির মতো মনে করবে, তারাই মুজাসসিমাহ (দেহবাদী) ও মুশাব্বিহাহ (সাদৃশ্যবাদী) নাম পাবে। এ হিসেবে মুহাম্মাদ ইবনে কাররামের অনুসারী কাররামিয়্যাহ, মুকাতিল ইবনে সুলাইমান, হিশাম ইবনুল হাকাম সকলে এবং তাদের অনুসারী মুজাসসিমাহ। উল্লেখ্য, এখানে ‘হাম্বলি’ বলতে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এবং তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের বোঝানো হয়নি। কারণ, তারা বিশুদ্ধ আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত; বরং ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম আহমদের অনুসারী এবং নিজেদের হাম্বলি পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে হাম্বলিদের একটি ধারা প্রচণ্ডভাবে দেহবাদের শিকার হয়। এখানে সেই চরমপন্থি দেহবাদীদেরই বোঝানো হয়েছে। [উসুলুদ্দিন, বাযদাবি: ২৫৮-২৫৯]
৫৬. তাকদিরের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত সম্প্রদায়। কাদারিয়্যাহদের বিপরীত প্রান্তে তাদের অবস্থান। তারা আল্লাহকে সকল কাজের স্রষ্টা ও কর্তা মনে করে। ফলে বান্দাকে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং কোনোকিছু করতে সক্ষম নয় বলে বিশ্বাস করে। তাদের ধারণা-বান্দার কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের কাছে মানুষের নড়াচড়া, কম্পন, নাচানাচি সব সমান। সিফাত অস্বীকারের কারণে এরা জাহমিয়্যাহ নামেও পরিচিতি।
৫৭. ইসলামের প্রথম দিকের একটি বিচ্যুত সম্প্রদায়। এরা আলি, উসমান, যুবাইর, তালহা, আয়েশা ও মুআবিয়া রাযি.-কে কাফের মনে করে; বরং যেকোনো মুমিন কবিরা গুনাহ করে ফেললে তাকে কাফের বলে। মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ মনে করে। আল্লাহর সিফাত, তাকদির-সহ বিভিন্ন মাসআলায় তারা ভ্রান্ত কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মতো আকিদা রাখে। তারা মুসলিম উম্মাহর একটি নিকৃষ্টতর ভ্রান্ত সম্প্রদায়। তারা ‘মুহাক্কিমাহ’, ‘শুরাহ’, ‘ওয়াইদিয়্যাহ’ নামেও পরিচিত। [দেখুন: আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, বাগদাদি; আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানি]
৫৮. এরাও বিভিন্ন গোমরাহির উৎস। তাদের মূল মাযহাব ছিল ঈমানের প্রশ্নে। তারা মনে করত, জানার নামই ঈমান। সুতরাং কেউ মুমিন হওয়ার পরে যত গুনাহ করুক কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ কোনো মুমিনকে জাহান্নামের শাস্তি দেবেন না। গুনাহ ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না। অতঃপর তারা সকল ভ্রান্ত সম্প্রদায় থেকে ভ্রান্তি ধার করে-জাহমিয়্যাহদের কাছ থেকে সিফাত অস্বীকারের আকিদা নেয়; জাবরিয়্যাহদের কাছ থেকে তাকদির নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং মানুষের পরাধীনতার আকিদা নেয়; রাফেযিদের কাছ থেকে সাহাবা-সম্পর্কিত আকিদার বিভ্রান্তি নেয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা খারেজিদের আকিদাও গ্রহণ করে। ঈমানের সংজ্ঞার্থে তাদের একদল কাররামিয়্যাহদের আকিদাও গ্রহণ করে। [বাগদাদি; শাহরাস্তানি]
৫৯. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৪৪-২৪৫)।
৬০. তালখিসুল আদিল্লাহ, সাফফার (১৫১)।
৬১. ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/১৩)।
📄 আবু হানিফা : আহলে সুন্নাতের আকিদার ইমাম
ইমাম আজম রহ.-এর সকল জীবনীকার ও ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, ফিকহের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আগে তিনি বিধর্মী, নাস্তিক ও ইসলামবিরোধীদের বিরুদ্ধে ইসলামের একজন প্রখ্যাত মুনাযির হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তির মাধ্যমে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতেন। সালাফের আকিদার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেন। বিভ্রান্ত ফিরকাগুলোর বিভ্রান্তি খণ্ডন করতেন। আকিদা ছাড়া সে সময়ে তিনি আর কোনো শাস্ত্র চর্চা করতেন না। ফলে তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ মুনাযির, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। খালেদ ইবনে ইয়াযিদ আল-উমরি বলেন, ‘আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, যুফার ও হাম্মাদ ইবনে হানিফা, তাদের প্রত্যেকেই কালাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। তারা মানুষের সঙ্গে মুনাযারা করেছেন, তাদের খণ্ডন করেছেন। তারা এ শাস্ত্রের ইমাম।’
যুফার বলেন, ‘আমি আবু হানিফা রহ.-কে বলতে শুনেছি—(ইমাম বলেন) আমি কালাম চর্চা করতাম। এ শাস্ত্রে পর্বতপ্রমাণ প্রসিদ্ধি লাভ করি...।’ কবিসা ইবনে উকবা বলেন, ‘আবু হানিফা তাঁর জীবনের প্রথম দিকে প্রবৃত্তিপূজারী ও বাতিলপন্থিদের বিরুদ্ধে মুনাযারা (বিতর্ক) করতেন। এক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তর্কশাস্ত্র পরিত্যাগ করে ফিকহ ও সুন্নাহতে মনোযোগী হন, আহলে সুন্নাতের ইমামে পরিণত হন।’ ইয়াহইয়া ইবনে শাইবান থেকে বর্ণিত, আবু হানিফা রহ. বলেন, ‘আমাকে কালামশাস্ত্রে আল্লাহ গভীর জ্ঞান দান করেছিলেন। বিশাল একটা সময় আমি এ শাস্ত্রে ব্যাপৃত থাকি, চর্চা করি, এর সুরক্ষা নিশ্চিত করি। বসরা তখন ছিল (ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে) বিতর্ক-বিবাদের কেন্দ্র বিন্দু। আমি কুড়িবারেরও বেশি সেখানে গিয়েছি। কোনো কোনোবার এক বছর থেকেছি। কখনো আরও কম বা বেশি। আমি ইবাযিয়্যাহ ও সুফরিয়্যাহ-সহ বিভিন্ন খারেজি ও হাশাভি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিতর্ক করি...। পরবর্তীকালে আমি বিতর্ক ছেড়ে দিই। সালাফে সালেহিনের আদর্শ (ফিকহ, হাদিস ইত্যাদিতে) মনোযোগী হই।’
জীবনের এই পরিবর্তনের মুখে তিনি আকিদাচর্চা কিংবা আকিদার সুরক্ষা ছেড়ে দিয়েছিলেন এমন নয়, বরং তৎকালীন কালামশাস্ত্র ও প্রচলিত বিতর্ক ছেড়ে দিয়েছিলেন; কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিশুদ্ধ আকিদাচর্চা এবং বিভ্রান্ত আকিদার খণ্ডন কখনোই পরিত্যাগ করেননি। সেটা সম্ভবও ছিল না। কারণ, ইরাক ছিল বিভিন্ন বিভ্রান্ত ফিরকার কারখানা। কুফা ও বসরাতে প্রতিদিন নতুন নতুন বিভ্রান্তি ও বিদআতের জন্ম হতো, মক্কা কিংবা মদিনা যা থেকে মুক্ত ছিল। ফলে ইমাম আজমকে জীবনভর সহিহ আকিদার সুরক্ষা এবং নানামুখী গোমরাহির বিরুদ্ধে যতটা লড়াই করতে হয়েছে, খুব কম ইমামকেই সেটা করতে হয়েছে। কেবল নিজে নন, ছাত্রদেরও তিনি আকিদার ক্ষেত্রে বীর সেনানী করে গড়ে তোলেন। ফিকহের পাশাপাশি তাঁর মজলিসগুলোতে আকিদাচর্চা অব্যাহত রাখেন। আবু ইউসুফের সঙ্গে এক কুরআনের মাসআলা নিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস আলোচনা করেন। আকিদার বিভিন্ন মাসআলায় তাঁর বিছিন্ন ছাত্র ও আলেমের কাছে চিঠি লিখেন। বিভ্রান্ত ফিরকাগুলোর বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর ছাত্ররা মুনাযারা অব্যাহত রাখেন। হিজরি দ্বিতীয় শতকের তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার দিকে আকিদার কমপক্ষে পাঁচটি কিতাব সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়। এ কারণে ফিকহের ক্ষেত্রে তিনি যেমন ইমাম, আকিদার ক্ষেত্রেও তিনি আহলে সুন্নাতের প্রধান সারির ইমাম।
কিন্তু এটা এত সহজ ছিল না। অসংখ্য কুরবানি দিতে হয়েছে এর জন্য। বিশুদ্ধ আকিদা প্রচার এবং ভ্রান্তদের খণ্ডনের কারণে তিনি কম মুসিবতের শিকার হননি। বরং আকিদার কারণে ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. যতটা চতুর্মুখী সংকট, নানামুখী জটিল সমস্যা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন, সালাফে সালেহিনের ইমামদের মাঝে সেটা একদম বিরল। খারেজিরা বারবার তাঁর মাথায় তরবারি ধরেছে, হত্যা করতে চেয়েছে। দাহরিয়্যিন নাস্তিকরা তাকে হত্যা করার জন্য উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে কুফার মসজিদে হামলা করেছে। জাহমিয়্যাহরা তাকে খারেজি আখ্যা দিয়েছে। মুরজিয়ারা তার নামে নিজেদের মতাদর্শ বিক্রির উদ্দেশ্যে তাকে মুরজিয়া বলে প্রচার করেছে। এগুলো বাইরের আঘাত। ভিতরের আঘাতও কম নয়। একদল তাকে ‘খালকে কুরআন’ (কুরআন সৃষ্টির) মিথ্যা অভিযোগে মুশরিক আখ্যা দিয়েছে, আরেক দল মুরজিয়া বানিয়ে দিয়েছে। একদল হাদিস-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আরেক দল তাকে যমিনের উপর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ, ইসলামের কলঙ্ক বানিয়ে দিয়েছে। শেষে শাসকগোষ্ঠীর হাতে তিনি অন্তরিন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছেন।
আকিদা ও আদর্শের কারণে ঘর ও বাইরের এত আঘাত আর কোনো তাবেয়ি ইমামকে সহ্য করতে হয়নি। জীবনভর বিভ্রান্ত লোকেরা তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অপবাদ রটিয়েছে, হত্যার চেষ্টা করেছে। আর ঘরের লোকেরা ভুল বুঝেছে। কিন্তু আল্লাহ তাকে চিনেছেন। তাঁর কুরবানির মূল্য দিয়েছেন। ফলে জীবদ্দশায় যে মানুষটি মুশরিক, মুরজিয়া, পরিত্যক্ত-সহ নানান অপবাদবাণে জর্জরিত হয়েছেন, মৃত্যুর পরে আল্লাহ তাকে সুরাইয়াসম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তাকে ‘ইমাম আজম’ হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। ফিকহ ও আকিদা উভয় ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমাম বানিয়ে দিয়েছেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু।
এই গ্রন্থে আমরা তাঁর উপর ঘরে-বাইরের লোকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সকল অভিযোগ-অপবাদের জবাব দিতে পারব না। কারণ, এটা আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় নয়। তবে বিশুদ্ধ আকিদা প্রচার এবং ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডনে তাঁর কুরবানির কিছু দিক অবশ্যই উল্লেখ করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে আলোচনার সময় প্রতিপক্ষ কীভাবে তাকে ভুল বুঝেছে কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, সেগুলো দেখাব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৬২. মানাকিব, মক্কি (১০০)। বাযযাযি (৪৪)।
৬৩. মানাকিবে মক্কি (৫১, ৫৪,৫৫)।
৬৪. আসমা ওয়াস সিফাত, বাইহাকি (১/৩৮১)।
৬৫. শাদ্দাদ ইবনে হাকিম বর্ণনা করেন, আবু হানিফা রহ. কাদারিয়্যাহদের সঙ্গে মুনাযারার পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে বলেন, “যখন তাকদির অস্বীকারকারীর সঙ্গে বিতর্ক করবে, তখন মাত্র দুটো কথা দিয়েই তাকে পরাস্ত করতে পারবে। হয়তো তাওবা করবে, নয়তো কাফের হয়ে যাবে। তৃতীয় কোনো পথ নেই। তাকে জিজ্ঞাসা করবে, আল্লাহ তায়ালা অনাদিতে বর্তমানের সবকিছু সম্পর্কে জানতেন কি না? যদি বলে, ‘না’, তবে সে কাফের। আর যদি বলে, ‘হ্যাঁ’, তবে তাকে জিজ্ঞাসা করবে, তিনি কি চেয়েছেন তাঁর জানা ঠিক থাকুক এবং তাঁর নির্দেশে সবকিছু সেভাবেই ঘটুক, নাকি চাননি? যদি বলে, ‘না’, তবে সে কাফের। আর যদি বলে, ‘হ্যাঁ’, তবে সে তাকদির স্বীকার করে নিল।” [তারিখে বাগদাদ: ১৫/৫১৬] হাসান বসরির শাগরেদ উসমান আল-বাত্তির কাছে লেখা চিঠিতে ইমাম তাকে আকিদার ব্যাপারে বলেন, ‘এটা আপনার সঙ্গী-শাগরেদদের শিক্ষা দিন। তাদের এ পথে ডাকুন। এর উপর উৎসাহিত করুন। কেননা, এটাই সর্বোত্তম ইলম। এরচেয়ে উত্তম কোনো ইলম আপনি শিখতে পারবেন না, শেখাতে পারবেন না। এটা করতে পারলে নামাযি, রোযাদার এবং আল্লাহর পথে জিহাদকারীর চেয়ে আপনার বেশি পুণ্য মিলবে। যদি আহলে বিদআত আপনার মাঝে কোনো সন্দেহ তৈরি করে, তবে আমাকে জানান। আমি আপনার সংশয় দূর করতে সহায়তা করব।’ [আর-রিসালাহ : ৩৭; তালখিসুল আদিল্লাহ: ৫৪]
৬৬. ইমাম আজম রহ. তাবেয়ি ছিলেন। তিনি আনাস ইবনে মালেক (৯৩ হি.), আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (৮৭ হি.), আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (৮৮ হি.), আবুত তুফাইল-সহ (১১০ হি.) একাধিক সাহাবিকে দেখেছেন। এটা ইবনে সাদ, শিরাজি, সাইমারি, বাযযাযি, খতিবে বাগদাদি, নববি, আসকালানি, সাখাভি, সুয়ুতি, আইনি-সহ সকল মুহাক্কিক ইমামের বক্তব্য। কাযি সাইমারি (৪৩৬ হি.) আনাস ইবনে মালেক রাযি.-এর সঙ্গে ইমামের কথোপকথনের কথাও উল্লেখ করেছেন। খতিবে বাগদাদিও আনাস রাযি.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন। শিরাজি (৪৭৬ হি.) তাকে ফকিহ তাবেয়িদের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। এ এমন এক বিরল সৌভাগ্য যা তাঁর সামসময়িক অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইমামের কারও নসিব হয়নি।