📄 সূরা বনি ইসরাইল
সুরা বনি ইসরাইল-এর ২৫ ও ৪৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-২৫ رَّبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِن تَكُونُوا صَالِحِينَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا
“তোমাদের অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে তোমাদের রবই অধিক জ্ঞাত। যদি তোমরা নেককার হও তবে তিনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল।”
অর্থাৎ পিতা-মাতার সম্মান, তাদের খিদমত এবং তাদের সামনে বিনয় এসব কিছুই অন্তর থেকে হওয়া চাই। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের অন্তরের হালাত জানেন। তোমরা যদি বাস্তবেই অন্তর থেকে নেক এবং ভাল হও আর কখনো সাময়িকের জন্য পিতা-মাতার ব্যাপারে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, তারপর এর জন্য তাওবা করে নাও তাহলে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাকারী ও দয়ালু। অন্তরের পবিত্রতা, অন্তরের সংশোধন ও অন্তরের ভাল নিয়ত এসবই মাগফিরাতের কারণসমূহের অন্যতম।
আয়াত নং-৪৪
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
"সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁর তাসবিহপাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রসংশায় তাসবিহপাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবিহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।”
অর্থাৎ এমন মহান সত্তা, সকল সৃষ্টি যার তাসবিহও ইবাদাতে লিপ্ত। তোমরা তাঁর সাথে শরিক কর, তাঁর জন্য (নাউজুবিল্লাহ) সন্তান সাব্যস্ত কর, এটা এমন অপরাধ যার ফলে তোমাদেরকে সাথে সাথেই ধ্বংস করে দেওয়া হত কিন্তু তিনি হালিম তথা সহনশীল অর্থাৎ সাথে সাথেই প্রতিশোধ নেন না। তিনি গাফুর তথা ক্ষমাপরায়ণ অর্থাৎ তাওবা করলে ক্ষমা করে দেন।
📄 সূরাতুল কাহাফ
সূরাতুল কাহাফ-এর ৫৫ ও ৫৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৫৫ وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَن يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَىٰ وَيَسْتَغْفِرُوا رَبَّهُمْ إِلَّا أَن تَأْتِيَهُمْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ قُبُلًا
“আর যখন মানুষের নিকট হিদায়াত এসেছে, তখন তাদেরকে ইমান আনতে কিংবা তাদের রবের কাছে ইস্তিগফার করতে বাধা প্রদান করেছে কেবল এ বিষয়টিই যে, পূর্ববর্তীদের (ব্যাপারে আমার নির্ধারিত) রীতি তাদের উপর পুনরায় নেমে আসবে কিংবা তাদের উপর আজাব সরাসরি এসে উপস্থিত হবে।”
মক্কার কাফিররা যারা ইমান গ্রহণ করছে না এবং স্বীয় কুফরী থেকে তাওবাও করছে না। তারা মূলত নিজেদের উপর আজাবকে দাওয়াত দিচ্ছে। যেন তাদের উপরও পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ন্যায় আজাব চলে আসে। অতঃপর এমনটাই হয়েছে এবং বদরের যুদ্ধে আজাবের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে।
আয়াত নং-৫৮
وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ لَوْ يُؤَاخِذُهُم بِمَا كَسَبُوا لَعَجَّلَ لَهُمُ الْعَذَابَ بَل لَّهُم مَّوْعِدُ لَّن يَجِدُوا مِن دُونِهِ مَوْبِلًا
“আর তোমার রব ক্ষমাশীল, দয়াময়। তারা যা উপার্জন করেছে, তার কারণে তিনি যদি তাদেরকে পাকড়াও করতেন তবে অবশ্যই তাদের জন্য আজাব ত্বরান্বিত করতেন। বরং তাদের জন্য রয়েছে প্রতিশ্রুত সময়, যা থেকে তারা কোন আশ্রয়স্থল পাবে না।”
আল্লাহ তা'আলা গাফুর তথা ক্ষমাপরায়ণ এবং যুর-রাহমাহ তথা দয়া ও অনুগ্রহকারী। অর্থাৎ কাফির ও অপরাধীদের কর্মকাণ্ড তো এমন যে, আজাব আসতে একটুও বিলম্ব হবার নয় কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ধৈর্য্য এবং মাগফিরাত সাথে সাথে আজাব আসতে দেয় না। তিনি তাঁর রহমতের কারণে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন এবং অনেক বড় বড় অপরাধীকেও সুযোগ দেন, যেন তাওবা করে নিজের গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নেয় এবং ইমান গ্রহণ করে রহমতের উপযুক্ত হয়ে যায়।
📄 সূরা মারইয়াম
সুরা মারইয়াম-এর ৪৭ ও ৬০ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৪৭
قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا
“ইবরাহিম বলল, তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল।"
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্বীয় পিতাকে বললেন যে, আমি আপনার জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব। তিনি আমার প্রতি বড়ই দয়ালু। অতঃপর তিনি এই ওয়াদা পূর্ণ করলেন এবং ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু বিষয়টি যখন সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখন তা পরিত্যাগ করলেন।
আয়াত নং-৬০
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَبِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا
“তবে তারা নয় যারা তাওবা করেছে, ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে; তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন জুলুম করা হবে না।”
অর্থাৎ তাওবার দরজা কোন অপরাধীর জন্যই বন্ধ নয়। এটা সালাতকে বরবাদকারী এবং প্রবৃত্তিতে লিপ্ত অপরাধীও যদি সত্যিকারের তাওবা করে এবং নেক আমলের পথ অবলম্বন করে তাহলে তার জন্যও জান্নাতের দরজা খুলে দেয়। তাওবার পরে যে নেক আমল করবে তাতে তার পেছনের অপরাধের কারণে কোন কমতি করা হবে না। অর্থাৎ তাওবাকারী একদম তেমন যেমনটি একজন বেগুনাহ নিষ্পাপ।
📄 সূরা ত্ব-হা
সুরা ত্ব-হা-এর ৪০. ৭৩. ৮২. ও ১৩৩ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৪০ إِذْ تَمْشِي أُخْتُكَ فَتَقُولُ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى مَن يَكْفُلُهُ فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ ۚ وَقَتَلْتَ نَفْسًا فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ وَفَتَنَّاكَ فُتُونًا ۚ فَلَبِثْتَ سِنِينَ فِي أَهْلِ مَدْيَنَ ثُمَّ جِئْتَ عَلَى قَدَرٍ يَا مُوسَى
“যখন তোমার বোন (সিন্দুকের সাথে সাথে) চলছিল। অতঃপর সে গিয়ে বলল, আমি কি তোমাদেরকে এমন একজনের সন্ধান দেব, যে এর দায়িত্বভার নিতে পারবে? অতঃপর আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম; যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে। তখন আমি তোমাকে মনোবেদনা থেকে মুক্তি দিলাম এবং তোমাকে আমি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদইয়ানবাসীর মধ্যে অবস্থান করেছ। হে মূসা, তারপর নির্ধারিত সময়ে তুমি এসে উপস্থিত হলে।”
হজরত মূসা আলাইহিস সালামের উপর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের আলোচনার। এতে বলা হয়েছে- وَقَتَلْتَ نَفْسًا فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ "তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে। তখন আমি তোমাকে মনোবেদনা থেকে মুক্তি দিলাম।"
অর্থাৎ হজরত মূসা আলাইহিস সালামের হাতে এক কিবতী মারা গেল তখন তার দুটি পেরেশানি হল। একটি হল এই হত্যার জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে ও শাস্তি পেতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হল দুনিয়াতেও এর জন্য গ্রেপ্তার হতে হবে। আল্লাহ তা'আলা উভয় চিন্তা ও পেরেশানী থেকে মুক্তি দিলেন। পরকালের পেরেশানি থেকে মুক্তি দিলেন এভাবে যে, তাওবার তাওফিক দান করলেন যা কবুল হয়ে যায়। আর দুনিয়াবী পেরেশানি থেকে মুক্তি দিলেন এভাবে যে, ফির'আউনের দেশ থেকে বের করে স্বাধীন অঞ্চল মাদায়েন পৌঁছে দিলেন।
আয়াত নং-৭৩ إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْfِرَ لَنَا خَطَايَانَا وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ واللهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى “নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের প্রতি ইমান এনেছি, যাতে তিনি আমাদের অপরাধসমূহ এবং যে জাদু তুমি আমাদেরকে করতে বাধ্য করেছ, তা ক্ষমা করে দেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী।”
ফির'আউন যখন তার জাদুকরদেরকে ধমক দিল যে, তোমাদেরকে লটকাব এবং হত্যা করব। তখন তারা বলল, আমরা এমন পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দেখে এখন তোমার জন্য কুফরীর উপর থাকতে পারব না। আমাদের আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির বিপরীতে তোমার এসব হুমকি-ধমকির কোন পরওয়া নেই। তুমি যা করতে পার কর। তুমি তো বেশি থেকে বেশি এটাই করবে যে, আমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। এর জন্য আমাদের কোন চিন্তা নেই। আমরা এখন পরকালের চিরস্থায়ী জীবন ও সফলতাকে আমাদের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছি। দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট ও সুখ- শান্তির কোন চিন্তা নেই। আশা ও আকাঙ্ক্ষা কেবল এটাই যে, আমাদের রব আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেন। বিশেষ করে ঐ গুনাহ যা আমরা তোমার ভয়ে জোর-জবরদস্তিমূলক করতে হয়েছে। অর্থাৎ সত্যের মোকাবিলা জাদু দ্বারা করেছি। আমরা শুধু আমাদের রবের সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত চাই।
আয়াত নং-৮২
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
"আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎপথে চলতে থাকে।"
পেছনের আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে যারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম না মেনে অবাধ্যতা করেছে। এমন লোকদের উপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়। আর এই আয়াて আলোচনা করা হচ্ছে ঐ সকল লোকদের যাদের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, যদি খাঁটি অন্তরে তাওবা করে ইমান ও নেক কাজের পথ অবলম্বন করে এবং তারপরে মৃত্যু পর্যন্ত এর উপর দৃঢ়পদ থাকে তাহলে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা ও অনুগ্রহের কমতি নেই।
আয়াত নং-১২৩
قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى
"তিনি বললেন, তোমরা উভয়েই জান্নাত হতে একসাথে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না।"
আল্লাহ তা'আলা হজরত আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল করেছেন।