📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 যিকিরের শরীআত বিরোধী পদ্ধতি

📄 যিকিরের শরীআত বিরোধী পদ্ধতি


বান্দাহ যখন এ স্তরে পৌঁছে তখন সে সঠিক অর্থে একত্ববাদী হয়ে যায়। এ হাদীস দ্বারা এ ব্যাপারটি একবারেই পরিষ্কার হয়ে যায়। হাদীসে বলা হয়েছে সর্বোত্তম যিকির হলো:
لا اله الا الله
দুর্ভাগ্যবশত মানুষ যিকিরের ব্যাপারে ভুল মানসিকতা ও ধারণার কারণে খুবই বিপজ্জনক প্রদর্শনী করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পষ্ট এরশাদ থাকার পরও তারা ধারণা পোষণ করে থাকে যে:
لا اله الا الله যিকির শুধু সাধারণ লোকের জন্য। আর খাস খাস লোকদের যিকিরের পদ্ধতি হলো শুধু "আল্লাহ” শব্দের অজিফা করা। আর খাসদের মধ্যেও যারা আরো খাস তাদের শব্দ উচ্চারণেরও কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য শুধু "ইয়াহু” “ইয়াহু” করাই যথেষ্ট। কিন্তু এটা স্পষ্ট ভ্রান্তি ও গোমরাহী। তারা তাদের এ দাবীর ব্যাপারে কুরআনের যেসব আয়াত থেকে দলীল পেশ করে তাতে মূলত কুরআনের অর্থের পরিবর্তন ও বিভ্রান্তিমূলক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই তারা পেশ করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাদের কয়েকটি দলীল নীচে দেয়া হলো।
قُلِ اللَّهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ الانعام : ৯১
“(হে রাসূল!) বলো আল্লাহ (কিতাব নাযিল করেছেন)। তারপর তাদেরকে ছেড়ে দিন তারা তাদের যুক্তিবাদের খেলায়ই মেতে থাকুক।"-সূরা আল আনআম : ৯১
এ আয়াত দ্বারা তারা এ দলীল পেশ করে বলে দেখো, এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, "বলো আল্লাহ"। এর দ্বারা বুঝা গেলো শুধু “আল্লাহ” “আল্লাহ” বলাই যিকির হিসেবে যথেষ্ট। কিন্তু একটি সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও যার কুরআনের শিক্ষা ও আরবী ভাষার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান আছে, এ বাক্যের পূর্বাপর সম্পর্কের প্রতি লক্ষ্য রেখে অনুভব করতে পারে যে, "আল্লাহ' শব্দ এখানে একা একা ব্যবহৃত হয়নি। বরং প্রকৃতপক্ষে তা একটা গোটা বাক্যের অংশ মাত্র। এ বাক্যের অবশিষ্ট অংশকে অবস্থান গত অবস্থার দাবী ও আলামত অনুযায়ী উহ্য রাখা হয়েছে। কারণ এসব শব্দের (قُلِ الله) আগের বাক্য হলো প্রশ্নবোধক। আর প্রশ্নবোধক বাক্যের উত্তর সাধারণতঃ এভাবে দেয়া হয় যে, প্রশ্নবোধক বাক্যের বেশীর ভাগ শব্দ যেগুলো জবাবের বাক্যে আনা হয়, সেগুলোকে উহ্য রাখা হয়। যেমন এ বাক্যের গোটা অংশকে যদি প্রকাশ করা হতো তাহলে তা এরূপ হতো:
قُلِ اللَّهُ الَّذِي أَنْزَلَ الْكِتَبَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَى -
কেননা এ বাক্যটি ওই ইহুদীদের প্রতিবাদে বলা হয়েছে, যারা নুযূলে
مَا أَنْزَلَ الَّذِي عَلَى بَشَرٍ مِّنْ شَيْ
তাআলা কোনো মানুষের উপর কোনো জিনিস নাযিল করেননি।"
একথা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন যে, যদি প্রকৃত অবস্থা তাই হয়ে থাকে যে, আল্লাহ মানুষের উপর নিজের কালাম নাযিল করেন না, তাহলে বলো ওই কিতাব যা মূসা আলাইহিস সালাম তোমাদের নিকট নিয়ে এসেছিলেন তা কে নাযিল করেছিলো?
এরপর আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
قُلِ اللَّهُ ، ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ ، الانعام : ٩١
"হে নবী! বলে দিন আল্লাহ। অর্থাৎ তিনিই আল্লাহ যিনি মূসার উপর কিতাব নাযিল করেছেন।"
এখন ইসমে মোযমের অর্থাৎ "ইয়াহু”-কে শরীআতসম্মত যিকির বলার ব্যাপারটা নিন। এ ব্যাপারে দলীল হিসেবে তারা এ আয়াতকে পেশ করে:
وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللهُ م - ال عمران : ۷
"অথচ এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না।"
এ আয়াতকে তারা তাদের ভুল ব্যাখ্যার অনুশীলন ক্ষেত্রে বানিয়েছে। তাদের মতে এ আয়াতের মতলব হলো,
وَالرَّسْخُوْنَ آمَنَّابه অর্থ আল্লাহ রাসেখিন ফিল ইলমে (জ্ঞানের পারদর্শীগণ) ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর কালামের সাথে এর চেয়ে বড় যুলুম আর কি হতে পারে যা এখানে করা হয়েছে।
মোটকথা 'ইসমে জাহেরই' হোক অথবা 'ইসমে মুযমের'ই হোক না কেন, শুধু একটি শব্দ দ্বারা না সলফে সালেহীনদের কেউ যিকির করেছেন আর না নবী-রাসূলগণ একে শরীআতসম্মত বলেছেন বলে কোনো বর্ণনা আছে। কারণ একটি শব্দ দ্বারা কোনো বাক্য গঠিত হয় না। এর দ্বারা কোনো অর্থ বুঝা যায়না। এজন্য এটাকে ঈমান অথবা কুফরের ভিত্তি বলা যেতে পারে না। একটি শব্দ শুধু ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। যে ধারণার দ্বারা 'হ্যাঁ' অথবা 'না' কোনো হুকুম নির্দেশ করা যায় না। যদি আগ থেকেই মনে কোনো পরিচয় ও অবস্থা বিদ্যমান না থাকে, যা এ শব্দটি মিলে একটি নির্দিষ্ট অর্থ সৃষ্টি করে। নতুবা সাধারণ অবস্থায় একটি শব্দ কি হৃদয়কে শুধু একটি ধারণা দেয়া ছাড়া আর কোনো পরিপূর্ণ কথা ও নির্দিষ্ট কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না? অথচ শরীআত যত প্রকার যিকিরের তালীম দিয়েছে, তার সবগুলোই এমন যা স্বয়ং নিজে অন্য কোনো জিনিসের সাহায্য ছাড়া পরিপূর্ণ কথার অর্থ প্রকাশ করতে পারে, সে আমাদেরকে আলোচ্য যিকিরের ব্যাপারে দুধারী তরবারী চালাবার কোনো অনুমতি দেয়নি। বস্তুত আমরা দেখছি যে, যেসব লোক এ বিপজ্জনক খেলা খেলছে তারা এ তরবারী দিয়েই তাদের নিজের গর্দান দু টুকরো করে কেটেছে। তাওহীদ ও মারেফাতে ইলাহীর উচ্চতর মাকামে পৌঁছার পরিবর্তে বিভিন্ন রকমের ইলহাদ (কুফরী) ও আকীদার অভিশপ্ত গোমরাহীতে গিয়ে ফেঁসে গেছে। বিশেষ করে ইসমে মুযমের অর্থাৎ 'ইয়াহু' 'ইয়াহু' যিকির তো বিপজ্জনক ফিতনার উৎসমুখ। এ তরিকার যিকিরের সাথে নবীদের তরিকার যিকিরের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।
বরং তা আপাদমস্তক বিদআত ও গুমরাহী। কারণ যে ব্যক্তি "ইয়াহু” "ইয়াহু" শব্দ বার বার উচ্চারণ করতে থাকে এবং আল্লাহর মূল নাম না নেয়, তখন তার এ সন্দেহযুক্ত কথায় "হু” এর যমীরের ইশারা শুধু ওই জিনিসই হতে পারে, যার ধারণা আগ থেকেই তার মনে গেড়ে আছে।
আর এটা একটা স্পষ্ট কথা যে, প্রত্যেকটা হৃদয়ে সবসময় যাতে "ইলাহীর" সঠিক ধারণা রাখা ও নূরে হক-এ ভরে যাওয়া জরুরী নয়। সে কখনো গুমরাহ হয়ে যায়, কখনো হিদায়াত প্রাপ্ত হয়। কখনো মাবুদ ও মা'বুদিয়াতের সঠিক ধারণা পায়, কখনো আবার ভুল ধারণা করে। এ কারণে "ইয়াহু” বলতে থাকার অর্থ অবশ্যম্ভাবী রূপে এক আল্লাহর ডাক নাও হতে পারে। বরং একথার সম্ভাবনা আছে যে, যে 'জাত'কে সে ডাকছে তার ধারণা তার মনে ওই ধারণা হতে বেশ দূরে যা এক আল্লাহ লা-শারীক এর প্রকৃত ধারণা। তাই যিকিরের এ রীতি পদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের ঈমানের শত্রুর বিপদাপদ দ্বারা বেষ্টিত। একা একটি শব্দ দ্বীনের মধ্যে কোনো মর্যাদা রাখে না। 'জমহুর আহলে ইসলাম' একথায় একমত যে, শুধু একটি শব্দ 'আল্লাহ' বলে দিলেই কাউকে মু'মিন বলা যাবে না। এ কারণেই দিবালোকের মত স্পষ্ট শরীআত কাউকে শুধু একটি শব্দ দ্বারা যিকির করার অনুমতি দেয়নি।
এখানে কুরআনে মাজীদের এসব আয়াত থেকে কোনো সন্দেহ হওয়া উচিত নয়। যেসব আয়াতে "নিজের রবের নামকে স্মরণ করো" শব্দে ব্যবহার করা হয়েছে এসব আয়াতে যিকরে ইস্‌ম বা নাম স্মরণ করার অর্থ অবশ্যই এটা নয় যে, শুধু আল্লাহ শব্দ বার বার বলতে থাকো। বরং স্বয়ং কুরআনের মোবাল্লেগ ও ব্যাখ্যাদাতা এ যিকিরের অর্থ ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে, এ 'যিকরে ইসম'-এর অর্থ এ ধরনের বাক্যের অজিফা যা আল্লাহ তা'আলার যিকির ও তার তাসবীহ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বস্তুত যখন :
فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيم - ওয়াক্বিয়া : ৪৭
- এ আয়াত নাযিল হয়েছে তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, "এ হুকুম অনুসারে তোমরা রুকূ'তে আমল করো।"
যখন :
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى - আ'লা : ১
এ আয়াত নাযিল হলো তখন তিনি এরশাদ করলেন, এ হুকুম অনুসারে তোমরা সাজদায় আমল করো।
এরপর এসব আমলের উপর আমল করার পদ্ধতি এভাবে বলে দিয়েছেন যে, রুকূ'তে
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيم
সাজদায়
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
পড়বে।
বুঝা গেলো 'ইসমে রব'-এর তাসবীহ অর্থ হলো এমন ধরনের বাক্যের অজিফা আদায় করা যা আল্লাহ তা'আলার 'হামদ' ও পবিত্রতার অর্থ বহন করে। শুধু 'আল্লাহ' একটি শব্দের যিকির নয়। নামাযে, আযানে ঈদে ও হজ্জের রসম-রেওয়াজে যেসব যিকির-আযকার নির্দিষ্ট ও শরীআতসম্মত করা হয়েছে তার সবগুলোই পূর্ণ বাক্যে শেষ করা হয়েছে। শুধু একটি শব্দের আকৃতিতে নয়। শুধু একটি শব্দের আকারে চাই, তা ইসমে জাহের হোক অথবা যমির (বিশেষণ) এদের যিকিরের শরীআতের কোনো ভিত্তি নেই। এ সবকে যদি আকাবির আওলিয়া আরেফিনে কামেলীনের খাস তরিকায়ে যিকিরও বলা হয় তবুও এসব তো নানা ধরনের বিদআত ও গুমরাহীর উৎসমুখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00