📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 দুনিয়া বিরাগীদের ভুল ধারণা

📄 দুনিয়া বিরাগীদের ভুল ধারণা


আল্লাহ প্রেমের এ সঠিক দৃষ্টিভংগির আলোকে দেখলে দেখতে পাবেন, এই তথাকথিত আল্লাহ প্রেমিকরা অনেক ক্ষেত্রেই শরীআতের বিরোধিতা করে থাকে। আল্লাহর রাহে চেষ্টা-প্রচেষ্টা তথা জিহাদ চালাবার ধারণা পর্যন্ত পোষণ করে না। শরীআত এবং জিহাদ ত্যাগ করার পরও তারা আল্লাহর মহব্বতের বড় দাবীদার। আবার কেউ এমন খামখেয়ালী করেন যেমন খামখেয়ালী করেছে নাসারা জাতি। এরা এদের এসব চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতির সমর্থনে এমন উদ্ভট কথা ও যুক্তি পেশ করে, যেসব যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করতো নাসারা জাতি। অর্থাৎ তারা হয় কুরআন ও হাদীসের মুতাশাবেহ শব্দাবলীর মনগড়া ব্যাখ্যা করতো, অথবা এমন গল্প কাহিনীর উপরে তাদের দলীলের ভিত্তি রচনা করতো যাদের এসব গল্প-কাহিনী সত্য হবার ব্যাপারে কোনো প্রমাণাদি ছিলো না। যদি ভালো ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের সততা ও নিষ্ঠার উপর বিশ্বাসস্থাপন করাও যায় তাহলেও এসত্য অস্বীকার করতে পারা যাবে না যে, তারা মাসুম ছিলো না। এরপরও তারা তাদের কথা মেনে নেয়াকে ওহীর মতো ফরয বলে মনে করতো। এর অর্থই হলো, যেভাবে নাসারা জাতি তাদের ওলামা মাশায়েখকে প্রকৃতপক্ষে দীনের প্রণেতার (শারেয়) মর্যাদা দিয়ে রেখেছিলো। এ লোকরাও তাদের মুরশিদ ও পীর-মাশায়েখকে আসলে শরীআতের আমীর মনে করতো। এ ব্যাপারে অবস্থা কখনো এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছতো, এসব ইবাদাত ও গোলামীর শিকড়ের উপর দিয়ে সরাসরি করাত চালিয়ে দিয়ে দাবী করতে শুরু করে যে, খাস লোকেরা বন্দেগীর সীমারেখা পার হয়ে যায়। যেমন ঈসায়ী সম্প্রদায় ঈসা মাসীহ-এর ব্যাপারে দাবী করে আসছিলো অথচ পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর গোলামীর প্রকৃত ও বাস্তব প্রকাশের নামই হলো দীন এবং আল্লাহ জাল্লাশানুহুর চরম ও সার্বজনীন মহব্বতকেই দীন বলে। একটি জিনিসের কমতি অপর জিনিসের কমতির অকাট্ট প্রমাণ। এভাবে গায়রুল্লাহর মহব্বত গায়রুল্লাহর গোলামীরই প্রমাণ। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ওইসব জিনিস পসন্দ করেন যেসব জিনিস আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা ও কাজের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব যে আমল আল্লাহর জন্য হবে না তা পরিত্যাজ্য।
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ الخ
"কাজের কর্মফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।"
যে কাজ উত্তয়ায়ে রাসূলের মুতাবিক হবে না তাও পরিত্যাজ্য।
٩. مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدَّ - رواه احمد و مسلم
“যে ব্যক্তি আমার হুকুমের বাইরে কোনো কাজ করবে, সে কাজ বাতিল বলে গণ্য হবে।"
এটাই দীন ইসলামের মূল বুনিয়াদ। আসমানী কিতাব নাযিল হবার এটাই ছিলো উদ্দেশ্য। আর আম্বিয়ায়ে কেরামকে পাঠাবারও লক্ষ্য ছিলো এটাই। শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পয়গামই শুনিয়েছেন। আর এ জন্যই তিনি তার শারীরিক ও মানসিক সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 শিরকের বিপদ

📄 শিরকের বিপদ


গোলামীর এ স্তরে পৌছার ব্যাপারে মানুষের নক্সের কিছু কিছু বড় দুর্বলতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ দুর্বলতাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় বুনিয়াদই হলো শিরকের প্রতি আকর্ষণ। শিরক মানুষের নক্সের এক বড় দুষ্ট ক্ষত। এমন কি এ উম্মতের মধ্যেও শিরকের অদৃশ্য জীবাণু পাওয়া যায় যে, উম্মাত তাওহীদের পতাকাবাহী। স্বয়ং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই এর ইংগিত দিয়েছেন। এ কারণে সাহাবায়ে কেরাম সবসময়ে এ বিপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য যিকির-ফিকির করতে থাকতেন।
হযরত সিদ্দীকে আকবর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন : "আপনি যে বলছেন 'শিরকের প্রতি আকর্ষণ পিঁপড়ার পায়ের আওয়াজ থেকেও গোপনে হয়ে থাকে। তাহলে এ বিপদ থেকে আমাদের বাঁচার উপায় কি? একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন। এসো! শিরকের ছোট বড় বিপদ থেকে বাঁচার জন্য তোমাদেরকে আমি ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছি। তোমরা আল্লাহর নিকট দোয়া করো :
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَالَا أَعْلَمُ -
"হে আল্লাহ! জেনে শুনে কখনো আমি কাউকে তোমার শরীক করা হতে তোমার নিকট পানাহ চাই। আর আমি অজান্তে কোনো শরীক করে ফেললে তার থেকেও তোমার মাগফিরাত কামনা করছি।”

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 শান ও সম্পদের ভালোবাসা

📄 শান ও সম্পদের ভালোবাসা


রাসূল (স) দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلَى كُلَّهُ صَالِحًا وَاجْعَلْهُ لِوَجْهِكَ خَالِصًا وَلَا تَجْعَلْ لِأَحَدٍ فِيهِ شَيْئًا .
“হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রতিটি কাজকে শুধু তোমার জন্যই একনিষ্ঠ বানাও। এতে অন্য কারো যেনো কোনো অংশ না থাকে।”
গোলামীর পথে দ্বিতীয় বাধা হলো ধন-সম্পদের আকর্ষণ। আমিত্বের অধ্যয়ন থেকে জানা যায়, মানুষের মধ্যে সাধারণত এমন এমন গোপন প্রত্যাশা লুক্কায়িত থাকে যা আল্লাহর সত্যিকারের ভালোবাসা, বন্দেগী ও ইখলাসের বীজের উপর আবরণ ফেলে দেয়, যাতে তা বাড়তে ও অগ্রসর হতে না পারে। শাদ্দাদ ইবনে আউস (র) আহলে আরবকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন:
“হে আরববাসী! তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ভয় যে বিষয়ে তা হলো তোমাদের 'রিয়া' ও 'নক্সের গোপন লালসা'।”
স্বয়ং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের সর্বোচ্চ হন্তা সম্পর্কে নিম্নোক্ত শব্দগুলো দিয়ে সাবধান করেছেন:
مَا ذِنْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلاً فِي ذَرِيبَةٍ غَنَمٍ بِأَفْسَدِ لَهَا مِنْ حَرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ لِشَرفِ دينه - رواه احمد وترمذى
"দুটি ভুখা চিতাকে বকরীর পালে ছেড়ে দেয়া হলেও বকরীদের জন্য তা এত ধ্বংসাত্মক নয়, যত বড় ধ্বংসাত্মক ধন-সম্পদের লোভী মানুষ দীন ও ঈমানের জন্য।”-আহমাদ, তিরমিযি
বুঝা গেলো, যে অন্তরে সত্য ও খাঁটি দীন স্থান পাবে, সে অন্তরে ধন-সম্পদ ও শান-শওকতের স্থান নেই। কারণ মানুষের মন যখন আল্লাহর ভালোবাসা ও ইবাদাতের আসল মজা পায় তখন তার দৃষ্টিতে এর চেয়ে বড় মজাদার জিনিস আর কিছু থাকে না। তখন অন্য কোনো দিকে যাবার তার কোনো প্রয়োজনও পড়ে না। এ কারণেই সরলমতি মু'মিনরা সকল প্রকার খারাপ কাজ ও কথা থেকে এর সাহায্যে মাহফুয থাকে। কুরআনে পাকে এরশাদ হয়েছে:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ، إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
“এরূপ ঘটল, যাতে করে আমরা ইউসুফের থেকে অন্যায়, পাপ ও নির্লজ্জতা দূরীভূত করে দেই। আসলে সে আমার বাছাই করা বান্দাদের একজন।”-সূরা ইউসুফ: ২৪
এর কারণ একেবারেই স্পষ্ট। খালিস বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা ও আল্লাহর ইবাদাতের এমন মজা ও স্বাদ পায় যা গায়রুল্লাহর বন্দেগী হতে তাকে ফিরিয়ে রাখে। কারণ তার হৃদয়ে ঈমানের চেয়ে বেশী প্রিয়, সুস্বাদু, আনন্দদায়ক ও সম্মোহনের অধিকারী আর কোনো জিনিস নেই। আর এই বাতিনী অবস্থা আল্লাহর দিকে তার হৃদয়কে টেনে নিয়ে যায়। সবসময়ই তাঁর দিকে মাথা নত রাখে। তাঁর যিকিরে হৃদয়কে মগ্ন রাখে। তাঁর ভয়ে বান্দা ভীত-প্রকম্পিত এবং রহমতের প্রত্যাশী থাকে। আল্লাহ এরশাদ করছেন-
مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيبِ ق : ٣٣
“যে ব্যক্তি গায়েবিভাবে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে এবং তাঁর দরবারে নৈকট্যের আবেগাপ্লুত হৃদয় নিয়ে হাজির হয়।" -সূরা কাফ: ৩৩
ভালোবাসার প্রাকৃতিক দাবীই হলো, প্রেমিক যদি একদিকে প্রেমাস্পদের মিলনের আশায় আন্দোলিত থাকে তাহলে সাথে সাথে আবার না পাবার হতাশার দুর্ভোগে ভুগতে থাকে। এ কারণেই আল্লাহর বান্দা ও তার প্রেমিক সবসময়ই আশা-নিরাশার দ্বিগুণ ভাবাবেগ পোষণ করে:
يَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَه - - بنى اسرائيل : ٥٧
"তারা হয়ে থাকে তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর আযাবের ভয়ে ভীত।"-সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৭
কুরআনের এ শব্দগুলো এ সত্যেরই আয়না। মানুষের নক্স মূলত দুটি অবস্থার যে কোনো একটিতে নিমজ্জিত থাকে। হয় সে এক আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাহ ও দাস হবে অথবা মাখলুকের বান্দা হয়ে থাকবে। আর বিভিন্ন রকমের শয়তান তার দিল ও দেমাগের উপর ছায়া বিস্তার করে রাখবে। এছাড়া তৃতীয় আর কোনো সুরত নেই। কারণ মানুষের হৃদয় যদি গায়রুল্লাহ হতে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর জন্য পাগলপারা না হয়ে যায় তাহলে শিরকের নাজাসাতের সাথে তার মিশে যাওয়া এক নিশ্চিত ব্যাপার। কুরআন মাজীদ যে ঈমানের দাবী করে তার মর্ম এর থেকে একটুও ভিন্ন নয়।
আল্লাহ বলেছেন :
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ... ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ الروم: ৩০-৩১
"অতএব তোমরা একাগ্রচিত্তে তোমাদের চেহারা আল্লাহর দীনের দিকে ফিরিয়ে দাও ...... এটাই সোজা সুদৃঢ় দীন। কিন্তু এ সম্পর্কে অনেক লোকই জানে না। তাঁর প্রতি অবনত হয়ে তাঁকে ভয় কর। আর নামায কায়েম করো। মুশরিকদের মধ্যে পরিগণিত হয়ো না।" -সূরা আর রূম : ৩০-৩১

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত

📄 গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত


গোটা মানবজাতি এ দুভাগেই বিভক্ত।
এক শ্রেণী হলো আল্লাহর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান বান্দাহর দল। যারা আল্লাহর মহব্বত, বন্দেগী ও আনুগত্যের নির্ভেজাল পথের অনুসারী।
আর দ্বিতীয় শ্রেণী হলো মুশরিকের দল। এ দল নফসের খাহেশের পূজারী। আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম ও আলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে প্রথম দলের ইমাম বানিয়েছেন। যেভাবে তিনি ফিরআউন ও আলে ফিরআউনকে দ্বিতীয় দলের নেতা বানিয়েছেন।
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلاً جَعَلْنَا صُلِحِينَ وَجَعَلْنَا هُمْ أئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا - الانبياء : ۷۲-۷۳
"আমি ইবরাহীমকে বখশিশ হিসেবে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুবকে। তাদের প্রত্যেককে আমি সালেহ এবং ঈমানদার বানিয়েছি। তারা আমার হুকুম অনুসারে মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখাতো।" -সূরা আল আম্বিয়া : ৭২-৭৩
এভাবে ফিরআউন ও আলে ফিরআউন সম্পর্কে বলা হয়েছে :
وَجَعَلْنُهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ - قصص : ٤١
"আর আমি তাদেরকে গোমরাহীর নেতা বানিয়েছি। তারা মানুষকে জাহান্নামের পথে ডেকে আনতো।"-সূরা আল কাসাস: ৪১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00