📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 মহব্বত আর খুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য

📄 মহব্বত আর খুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য


'মহব্বত' ও 'খুল্লাতের' মধ্যে পার্থক্য হলো 'খুল্লাত' হয়ে যাবে একান্ত এবং নির্ভেজাল আর মহব্বতের মধ্যে তা পাওয়া যায়। 'খুল্লাত' শুধু একজনের সাথেই হওয়া সম্ভব। কিন্তু মহব্বত একের অধিক লোকের সাথে হতে পারে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে খুল্লাতের সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে আর অন্য কাউকে খলীল বানাতে অস্বীকার করে দিয়েছেন। আবার আল্লাহ তা'আলার সাথে মহব্বত রাখা সত্ত্বেও অনেক মানুষের নিজের হাবীব (বন্ধু) বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত উসামা সম্পর্কে বলেছেন: হে আমার আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি। অতএব তুমিও তাদের ভালোবাস। এভাবে নারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আর পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি সবচেয়ে বড় মাহবুব হিসেবে গণ্য করেছেন। আল্লাহর রাসূলের কাلامের পর আল্লাহর কালামের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। স্থানে স্থানে দেখতে পাবেন যে, “আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন।” “আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ এমন লোকদের আনবেন যাদেরকে তিনি মাহবুব হিসেবে গণ্য করবেন এবং তারাও তাঁকে মাহবুব মনে করবে।" এসব কথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা একথা বুঝাতে চান যে, সত্যিকারের মু'মিন ব্যক্তি তিনি হবেন, যাকে আল্লাহ মহব্বত করেন আর তিনি আল্লাহকে মহব্বত করেন। অন্য এক জায়গায় বলেছেন, ঈমানদার ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে মহব্বত করে। একথা দ্বারা প্রমাণিত হলো, মু'মিন যদিও সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ভালোবাসে কিন্তু অন্যদেরকেও মহব্বত করতে পারে। একথার অবশ্যম্ভাবী ফল এ দাঁড়ায় যে, মহব্বতে এককত্ব প্রয়োজন নেই কিন্তু 'খুল্লাত' এর বিপরীত। এতে একমুখীনতা অপরিহার্য।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন

📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন


সাধারণভাবে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব ছিলেন। আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর খলীল। মনে করা হয়, মহব্বতের দরজা 'খুল্লাতে'র চেয়ে উঁচু। কিন্তু এ ধারণার পেছনে কোনো প্রমাণ নেই। সহীহ হাদীস দ্বারা একথা ভালোভাবে প্রমাণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তা'আলার খলীল ছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম উভয় কিতাবেই এ রেওয়ায়াত বিদ্যমান আছে। বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيْلاً كَمَا اتَّخَذَا إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً -
"নিসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর খলীল বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাঁর খলীল বানিয়েছিলেন।"
এভাবে আর একটি হাদীসও আগে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আমি আল্লাহ তা'আলার খলীল। তাই এখন আমার আর কাউকে খলীল বানাবার অবকাশ নেই।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 ঈমানের স্বাদ ও মজা

📄 ঈমানের স্বাদ ও মজা


উপরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, 'মহব্বতে ইলাহী' অর্থ হলো ওই সব কাজ-কর্মকে পসন্দ করা হবে যা আল্লাহ পসন্দ করেন। শরীআতের দলীলের আলোকেই আমি 'মহব্বতে ইলাহীর' এ ব্যাখ্যা করেছি।
এ প্রসঙ্গে বুখারী, মুসলিমের উপরে উল্লেখিত হাদীসটির তাৎপর্যপূর্ণ শব্দমালার প্রতি লক্ষ্য করুন। সেখানে বলা হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি জিনিস পাওয়া যাবে সে ব্যক্তিই ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। এভাবে কথা বলার কারণ হলো, মানুষ তখনই কোনো জিনিসের স্বাদ পায় যখন সে জিনিসের উপর হৃদয়ে অনুরাগ ও আর্কষণ বদ্ধমূল হয়। কোনো জিনিসের প্রতি যখন ভালোবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয় তখন সে জিনিস পেলে মনে এক প্রশান্তি তৃপ্তি ও পুলক শিহরণ জাগে। স্বাদ শব্দটি এমন একটি বিশেষ অবস্থার নাম যা রুচি সম্মত ও আকর্ষিত জিনিস অনুভব ও হাসিল করার পর মনে সৃষ্টি হয়। কোনো দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীর মতে আকর্ষিক জিনিস ভোগ ও লাভ করার অপর নাম হলো স্বাদ। একথাটা এত ওযনহীন ও অমূলক কথা যে, এর প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন নেই। কারণ এ ভোগ ও লাভই তো হলো আকর্ষণ ও স্বাদের মধ্যমণি। শুধু স্বাদই স্বয়ং নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে খাবারের ব্যাপারটি নিন। খাবার মানুষের জন্য একটি চিত্তাকর্ষক জিনিস। যখন সে খাবার খেয়ে ফেলে তখন এর স্বাদ অনুভব করে। তারপর একথা বলা কতটুকু ভুল যে, খাবার খাওয়াটাই হলো স্বাদ। এভাবে দৃষ্টিশক্তির কথা ধরুন। মানুষ কোনো প্রিয় জিনিস দেখার পর তার মনে একটা তৃপ্তি লাভ করে। তাই বুঝা গেলো যে, তৃপ্তি লাভ হয় ওই প্রিয় জিনিস দেখার ও দৃষ্টিপাতের পর। এ কারণে নজর এক জিনিস আর স্বাদ ও তৃপ্তি আর এক জিনিস যা দেখার পরই সৃষ্টি হয়। কুরআনের শব্দাবলীও এ সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়:
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ : - الزخرف : ۷۱
"মন ভুলানো ও চোখের আস্বাদনের জিনিসসমূহ সেখানে বর্তমান থাকবে।"-সূরা আয যুখরুফ: ৭১
এতে বুঝা গেলো শুধু দেখার নামই লয্যত (স্বাদ) নয় নতুবা এভাবে বলা হতো না যে, চোখ তাকে দেখেই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে।
অন্যান্য অনুভূতি সম্পন্ন ব্যাপারগুলোরও এ একই অবস্থা। আনন্দ ও বিপদের যেসব অবস্থা আত্মা অনুভব করবে তা কোনো না কোনো পসন্দনীয় জিনিস অথবা অপসন্দনীয় জিনিস লাভের ও ভোগের অনুভূতিরই ফলাফল। স্বয়ং অনুভূতি ও উপলব্ধির ফল নয়। অতএব ঈমানের স্বাদ ও এর থেকে প্রাপ্ত মজা ও আনন্দ আল্লাহ তা'আলাকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসারই ফল। তিনটি কথা পুরোপুরিভাবে বুঝার পরই এ ফল লাভ হতে পারে।
এক: এ ভালোবাসায় পরিপূর্ণতা থাকতে হবে।
দুই: ভালোবাসা বাড়তে থাকতে হবে।
তিন: এ ভালোবাসার পথে প্রতিবন্ধক এমন সবকিছুকে ঘৃণা ও প্রতিরোধ করতে হবে।
"ভালোবাসার পরিপূর্ণতার” অর্থ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পৃথিবীর সবকিছু হতে বেশী প্রিয় হবে। শুধু একথা বললেই হবে না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাস্তবেই সর্বাধিক ভালোবাসতে হবে।
ভালোবাসা বৃদ্ধি হবার দাবী হলো, যদি বান্দা অন্য কাউকেও ভালোবাসে সে ভালোবাসাও আল্লাহর জন্য হতে হবে। মূল ভালোবাসা তার জন্যে হবে না-হবে আল্লাহর জন্য। তার প্রতি ভালোবাসা হবে আল্লাহর ভালোবাসা কেন্দ্রিক। ভালোবাসার পথের প্রতিবন্ধকজনিত প্রতিটি জিনিসকে ঘৃণা করার অর্থ হলো, ঈমানের বিপরীত জিনিস কুফর ও শিরককে আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকেও অধিক অপসন্দ করা।
এসব কথা বুঝার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মু'মিনদেরকে ভালোবাসাও প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে ভালোবাসার সমতুল্য। অর্থাৎ তার একটা অংশ। রাসূলের প্রতি মহব্বত এজন্য যে, রাসূল আল্লাহ তা'আলাকে সবচেয়ে বেশী মহব্বত করতেন। এ কারণেই আল্লাহর প্রিয়দের প্রতি মহব্বত অবশ্যম্ভাবী। এখন 'মহব্বতের' বিপরীত 'খুল্লাতের" অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করুন। কিভাবে এতে গায়রুল্লাহর জন্য এক কণাও কোনো অংশ নেই। মূলগতভাবেও নেই, আংশিকভাবেও নেই। বরং তা আল্লাহর জন্যই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। এর দ্বারা 'মহব্বতের' চেয়ে 'খুল্লাতে'র শ্রেষ্ঠত্ব দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায়।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 আল্লাহর মহব্বতের ব্যাপারে চিন্তা ও আমলের ত্রুটি

📄 আল্লাহর মহব্বতের ব্যাপারে চিন্তা ও আমলের ত্রুটি


মোটকথা আল্লাহর মহব্বত ও খুল্লাতের মধ্যেই 'ইবাদাতে ইলাহীর' প্রকৃত রহস্য লুকায়িত। কিন্তু কত জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তি অতিবাহিত হয়েছেন যারা এ সূত্র বুঝতে পারেননি। তাদের ধারণা ইবাদাত বন্দেগী তো শুধু বিনয় ও নিজকে ছোট জানার একটা নিরস অজিফা। এতে আবার মহব্বতের স্বাদ কোথায়? কারণ মহব্বত তো হৃদয়ের একটি কামনা বাসনার মিলিতরূপ। আর দ্বিতীয় পক্ষের তরফ থেকে আনন্দ উল্লাস প্রকাশের নাম। একথা তো খুবই স্পষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলার জাত এ ধরনের কথাবার্তা হতে একেবারই দূরে। এ জন্য এটা কিভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ তা'আলাকে একজন 'মাহবুব' বা একজন 'মুহিব'-এর অবস্থান দেয়া যায়। এ ধারণাটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মহব্বতের সঠিক অর্থ না বুঝারই ফল। এ ধরনের ভুল বুঝার আশংকায় হযরত যুননূন মিসরী (র) তাঁর সামনে 'মইব্বতে ইলাহীর' উল্লেখ করা হলে বলেছিলেন:
"চুপ থাকো। এ ব্যাপারে কোনো কথা বলো না। তোমার একথা যেনো সাধারণ লোকদের কানে না যায়, তারা আল্লাহর মহব্বতের দাবী করতে শুরু করে।"
বস্তুত কিছু আলেম ওইসব লোকের সাথে উঠাবসা মাকরুহ বলে দিয়েছে, যারা আল্লাহ তা'আলার ভয়-ভীতির যিকির ও ধারণা দেয়া ছাড়া শুধু তার মহব্বতের কথাই বলে। এ ব্যাপারে একজন বুযুর্গের কথা হৃদয়ের মাঝে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মত। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত শুধু মহব্বতের সাথে করে সে হলো 'যিন্দিক' অর্থাৎ কাফির। আর যে ব্যক্তি শুধু আশা নিয়ে ইবাদাত করে সে 'মুরযি' আশাবাদী। আর যে ব্যক্তি শুধু ভয়ের সাথে ইবাদাত করে সে 'হারুরী”। তাওহীদবাদী মু'মিন কেবল সে ব্যক্তি যে মহব্বত, ভয় ও আশা এ তিনটি জিনিসের সাথে ইবাদাত করে।"
পরবর্তীকালের সূফীদের মধ্যে এমন সব লোকের আবির্ভাব ঘটে যারা মহব্বতের দাবীর ব্যাপারে নিজেদের সীমারেখা ভুলে গিয়ে সীমালংঘন করে বসেছিলো। এমন কি এদের মধ্যে এক রকমের অহংকার পর্যন্ত সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তারা এমন দাবীও করে যা ইবাদাতের বিপরীত। তারা নিজেদের মধ্যে এমন সব খোদায়ী গুণের দাবী করে যা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারো মধ্যে থাকতে পারে না। তারা নিজেদেরকে এমন মর্যাদাবান বলে প্রকাশ করে যা নবী-রাসূলদের মর্যাদার চেয়েও উপরে।
তারা নিজেদের জন্য আল্লাহর নিকট এমন গুণাবলী দাবী করে, যেসব গুণাবলী শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। এমন কি নবীগণও যার উপযুক্ত নয়।
এ হলো ওইসব বিপজ্জনক গোমরাহী যার শয়তানী জালে তরীকতের বড় বড় শেখগণও আটকা পড়েছে। তাদের এত বড় ভুলে নিমজ্জিত হবার কারণ তারা ইবাদাতের মর্ম বুঝতে পারেনি এবং ইবাদাতের হক আদায় করতে পারেনি। বরং এর কারণ সেই বিবেক বুদ্ধির ত্রুটি যা ছাড়া বান্দা নিজের পরিচয়ও জানতে পারে না। আসল বুদ্ধি যখন ভুল পথে চলে এবং দীনের জ্ঞান যখন পুরোপুরি লাভ হয় না, তখন যদি নফসের মধ্যে আল্লাহর মহব্বতের জযবা পয়দা হয়ে যায়, তখন তা মহব্বতের দৃষ্টিতে দেখেন। কেননা আল্লাহ কোনো বান্দাহকে এতটুকুনই ভালোবাসেন যতটুকুন তার মধ্যে ঈমান ও তাকওয়া থাকে। আর যে ব্যক্তি মনে করে মাহবুবে খোদা হবার পর কোনো গুনাহই তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে মনে করে, "যেহেতু আমি সুঠামদেহী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাই আমি যত বিষই পান করি না কেনো এবং অবিরত খেতে থাকি না কেনো এতে আমার কোনো অনিষ্ট বা ক্ষতি হবে না। বিবেক-বুদ্ধির এ শত্রুরা যদি কুরআনের প্রতি দৃষ্টিপাত করতো এবং আম্বিয়ায়ে কিরামের জীবনাদর্শ মনোনিবেশ সহকারে অবলোকন করতো যে, মানব জাতির এ সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানগণকেও কখনো কখনো আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে তাওবা অলক্ষ্যে অজান্তে আবার নিজ থেকেই বেরিয়ে যায়। তখন সে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে বসে। বস্তুত ভালোবাসার মধ্যে মানবীয় দুর্বলতার মুশাহিদা করা যায়। এরপর নক্স যখন শয়তানের প্রতারণার স্বীকার হয়ে যায় তখন মুখ দিয়ে বড় বড় বুলি বেরুতে থাকে। সে স্পষ্ট করে বলতে শুরু করে, আমি তো আল্লাহর আশেক। আমি যা চাইবো করবো। এতে আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু এ ধরনের কথাবার্তা যে সরাসরি গুমরাহী তা স্পষ্ট। আর ঠিক এ ধরনের কথাবার্তা ইহুদী নাসারাদের মুখ থেকে বের হতো। তারা বলতোঃ
"আমরা আল্লাহর পুত্রের ও তাঁর খুবই মাহবুব"
একথার জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
তোমরা তো তাঁর পুত্রের মাহবুব হবার কথা দাবী করছো কিন্তু একথা কি বলতে পারো, তিনি কেন তোমাদেরকে আযাবের পর আযাব দিয়ে যাচ্ছেন? "পুত্র আর প্রিয় হবার" এটা কি আলামত? অতএব এ নফস হলো একটি বিপজ্জনক ধোঁকা। নতুবা প্রকৃত সত্য কথা হলো, যিনি আসলে আল্লাহর 'মাহবুব' হবেন তিনি তো তার নক্সকে শুধু এমন কাজে লাগাবেন যে কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি উৎপাদনের কারণ হবে। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হবে এমন কাজ তিনি কখনো করবেন না।
যে ব্যক্তি গুনাহ কবীরা করে, নাফরমানীর পর নাফরমানী করে, আল্লাহ তা'আলা তার খারাপ আমলগুলোকে এমনভাবে ঘৃণা ও রাগত দৃষ্টিতে দেখেন, যেভাবে তিনি তার ভালো আমলগুলোকেও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেন। আল্লাহ তাআলার এ প্রিয় বান্দা নবী-রাসূলগণকে নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী আত্মগঠনের জন্য বিভিন্ন বিপদাপদ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে হয়েছে। তাহলেই তারা জানতে পারতো অনিষ্ট ও ক্ষতি করার ব্যাপারে গুনাহ হলো এমন ধারালো হাতিয়ার এবং নিজের লাভ আদায়ের ব্যাপারে এত নির্দয় নিষ্ঠুর প্রমাণিত যে আল্লাহর অনেক বড় বড় খাস বান্দাহকেও ছাড়েননি। আর এটা ঠিক প্রকৃতির দাবীও। স্বয়ং মানুষ মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ নীতিমালার কার্যকারিতা দেখতে পাওয়া যায়। এক ব্যক্তির আশেক যদি তার মাশুকের খেয়াল-খুশী রুচিমর্জি সম্পর্কে অবগত না হয় এবং সে অনুযায়ী কাজ না করে বরং নিজের প্রেমের আবেগের ইশারার উপর নাচতে থাকে তাহলে অবশ্যই তার এ আচরণ মাশুকের তথা প্রেমাস্পদের অসন্তুষ্টি ও অতৃপ্তিরই নয় বরং শত্রুতা ও মনোপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্ভাগ্যবশত বেশ কিছুসংখ্যক আহলে সুলুক আল্লাহর ভালবাসার ধারণা দিতে গিয়ে দ্বীনের ব্যাপারে কিছু ভুল কথাবার্তা বলেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুমের সীমারেখার পরওয়াও করেননি। আবার কখনো আল্লাহর হকসমূহকে এড়িয়ে চলেছেন। আবার কখনো তা নির্দ্বিধায় বাতিল দাবীও করেছেন। একজন আহলে সুলুক বলেছেন: "আমার যে কোনো মুরিদ একজন ব্যক্তিকেও জাহান্নামে দিয়েছে, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
কেউ কেউ বলেছেন: "যে কোনো মুরীদ একজন মু'মিনকেও জাহান্নামে থাকতে দিয়েছে আমি তার উপর অসন্তুষ্ট।”
তৃতীয় একজনকে শুনানো হয়েছে: "কিয়ামতের দিন আমার খিমা বা তাবু স্থাপিত হবে জাহান্নামের দরজায়। যাতে একজন লোককেও জাহান্নামে প্রবেশ করতে দেয়া না হয়।”
একথা ও এ ধরনের আরো অনেক কথা বিভিন্ন প্রখ্যাত প্রখ্যাত মাশায়েখরা বলেছেন বলে প্রচার আছে। এসব কথাবার্তা, এসব লোক সম্পর্কে হয় মিথ্যামিথ্যি প্রচার করা হচ্ছে, আর যদি সত্যি সত্যি এসব কথা তারা বলে থাকেন, তাহলে এসবই ভিত্তিহীন মিথ্যাকথা। এসব কথাবার্তা তারা সচেতন ভাবে বলেননি। বরং নেশাগ্রস্থ বেহুঁশ অবস্থার এসব কথাবার্তা। আর নেশাগ্রস্থ অবস্থায় মানুষের হুঁশ থাকে না। অথবা এ অবস্থায় মানুষের বিবেচনা শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। কি বলছে না বলছে সে তা বুঝতে পারে না। এ কারণেই নেশাগ্রস্থ অবস্থা কেটে যাবার পর এদের অনেকেই এসব কথাবার্তার জন্যও ইস্তেগফার করেছেন। ঠিক এ ব্যাপারটি ওইসব সুফীদের মধ্যে কাজ করেছে, যারা প্রেমাস্পদের গুণাগুণ শুনার অবকাশ রেখেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00