📄 খুন্নাত শব্দের অর্থ
খুল্লাত শব্দ হতে খলীল শব্দ গঠিত হয়েছে, খলীল শব্দের আখ্যা হতে আর বড় কোনো আখ্যা নেই। একথার দলিল স্বয়ং “খলীল” ও “খুল্লাত” শব্দের মধ্যেই নিহিত। ‘খুল্লাত' শব্দের অর্থই হলো আল্লাহর সাথে বান্দার সীমাহীন ভালোবাসা। আর এ ভালোবাসা, গোলামী ও বন্দেগী করার পরিপূর্ণতার উপর নির্ভরশীল। বান্দার সাথে আল্লাহ তা'আলার সীমাহীন ভালোবাসার উপরও তা নির্ভর করে। যে ভালোবাসা বান্দার জন্য আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে ‘রব’ মানা অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। আগেই বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইবাদাত ও বন্দেগী হলো চরম সীমার বিনয় ও ভালোবাসার সমষ্টির নাম। এজন্য ‘খুল্লাতের’ মর্যাদা মহব্বতের মানের চেয়ে অনেক উন্নত। আর এটাই সবচেয়ে উঁচু পদমর্যাদা যা আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহমত ও নেয়ামাত হিসেবে দান করেছেন। তাই তো এ দুনিয়ার কোনো মানুষ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ‘খলিল’ ছিলো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذَا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ خَلِيْلًا لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا وَلَكِنْ صَاحِبُكُمْ خَلِيْلُ اللَّهِ - متفق عليه
"আমি যদি দুনিয়াবাসীদের কাউকে আমার খলিল বানাতাম, তাহলে আবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বানাতাম। কিন্তু আমি তো আল্লাহ তাআলার খলিল।"-বুখারী, মুসলিম
বুঝা গেলো মানুষ কোনো একজনেরই খালিল হতে পারে। খুল্লাত-এর মধ্যে কোনো অংশীদারীত্ব নেই। একজন কবি কতো সুন্দর বলেছেন:
قَدْ تَخَلَّلَتْ مَسْلَكَ الرُّوحِ مِنِّى وَبِذَا اسْمِي الْخَلِيلُ خَلِيلاً .
"মোর সাথে প্রিয়তমা মিশে গেছে মোর জীবনের মতো খলীলের নাম খলীল হলো মিশে যাবার কারণেই তো"
📄 মহব্বত আর খুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য
'মহব্বত' ও 'খুল্লাতের' মধ্যে পার্থক্য হলো 'খুল্লাত' হয়ে যাবে একান্ত এবং নির্ভেজাল আর মহব্বতের মধ্যে তা পাওয়া যায়। 'খুল্লাত' শুধু একজনের সাথেই হওয়া সম্ভব। কিন্তু মহব্বত একের অধিক লোকের সাথে হতে পারে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সাথে খুল্লাতের সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে আর অন্য কাউকে খলীল বানাতে অস্বীকার করে দিয়েছেন। আবার আল্লাহ তা'আলার সাথে মহব্বত রাখা সত্ত্বেও অনেক মানুষের নিজের হাবীব (বন্ধু) বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত উসামা সম্পর্কে বলেছেন: হে আমার আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি। অতএব তুমিও তাদের ভালোবাস। এভাবে নারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আর পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি সবচেয়ে বড় মাহবুব হিসেবে গণ্য করেছেন। আল্লাহর রাসূলের কাلامের পর আল্লাহর কালামের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। স্থানে স্থানে দেখতে পাবেন যে, “আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালোবাসেন।” “আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" "আল্লাহ এমন লোকদের আনবেন যাদেরকে তিনি মাহবুব হিসেবে গণ্য করবেন এবং তারাও তাঁকে মাহবুব মনে করবে।" এসব কথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা একথা বুঝাতে চান যে, সত্যিকারের মু'মিন ব্যক্তি তিনি হবেন, যাকে আল্লাহ মহব্বত করেন আর তিনি আল্লাহকে মহব্বত করেন। অন্য এক জায়গায় বলেছেন, ঈমানদার ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে মহব্বত করে। একথা দ্বারা প্রমাণিত হলো, মু'মিন যদিও সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে ভালোবাসে কিন্তু অন্যদেরকেও মহব্বত করতে পারে। একথার অবশ্যম্ভাবী ফল এ দাঁড়ায় যে, মহব্বতে এককত্ব প্রয়োজন নেই কিন্তু 'খুল্লাত' এর বিপরীত। এতে একমুখীনতা অপরিহার্য।
📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন
সাধারণভাবে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব ছিলেন। আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর খলীল। মনে করা হয়, মহব্বতের দরজা 'খুল্লাতে'র চেয়ে উঁচু। কিন্তু এ ধারণার পেছনে কোনো প্রমাণ নেই। সহীহ হাদীস দ্বারা একথা ভালোভাবে প্রমাণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তা'আলার খলীল ছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম উভয় কিতাবেই এ রেওয়ায়াত বিদ্যমান আছে। বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيْلاً كَمَا اتَّخَذَا إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً -
"নিসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর খলীল বানিয়েছেন। যেমন তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাঁর খলীল বানিয়েছিলেন।"
এভাবে আর একটি হাদীসও আগে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আমি আল্লাহ তা'আলার খলীল। তাই এখন আমার আর কাউকে খলীল বানাবার অবকাশ নেই।
📄 ঈমানের স্বাদ ও মজা
উপরে বর্ণনা করা হয়েছে যে, 'মহব্বতে ইলাহী' অর্থ হলো ওই সব কাজ-কর্মকে পসন্দ করা হবে যা আল্লাহ পসন্দ করেন। শরীআতের দলীলের আলোকেই আমি 'মহব্বতে ইলাহীর' এ ব্যাখ্যা করেছি।
এ প্রসঙ্গে বুখারী, মুসলিমের উপরে উল্লেখিত হাদীসটির তাৎপর্যপূর্ণ শব্দমালার প্রতি লক্ষ্য করুন। সেখানে বলা হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি জিনিস পাওয়া যাবে সে ব্যক্তিই ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। এভাবে কথা বলার কারণ হলো, মানুষ তখনই কোনো জিনিসের স্বাদ পায় যখন সে জিনিসের উপর হৃদয়ে অনুরাগ ও আর্কষণ বদ্ধমূল হয়। কোনো জিনিসের প্রতি যখন ভালোবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয় তখন সে জিনিস পেলে মনে এক প্রশান্তি তৃপ্তি ও পুলক শিহরণ জাগে। স্বাদ শব্দটি এমন একটি বিশেষ অবস্থার নাম যা রুচি সম্মত ও আকর্ষিত জিনিস অনুভব ও হাসিল করার পর মনে সৃষ্টি হয়। কোনো দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীর মতে আকর্ষিক জিনিস ভোগ ও লাভ করার অপর নাম হলো স্বাদ। একথাটা এত ওযনহীন ও অমূলক কথা যে, এর প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন নেই। কারণ এ ভোগ ও লাভই তো হলো আকর্ষণ ও স্বাদের মধ্যমণি। শুধু স্বাদই স্বয়ং নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে খাবারের ব্যাপারটি নিন। খাবার মানুষের জন্য একটি চিত্তাকর্ষক জিনিস। যখন সে খাবার খেয়ে ফেলে তখন এর স্বাদ অনুভব করে। তারপর একথা বলা কতটুকু ভুল যে, খাবার খাওয়াটাই হলো স্বাদ। এভাবে দৃষ্টিশক্তির কথা ধরুন। মানুষ কোনো প্রিয় জিনিস দেখার পর তার মনে একটা তৃপ্তি লাভ করে। তাই বুঝা গেলো যে, তৃপ্তি লাভ হয় ওই প্রিয় জিনিস দেখার ও দৃষ্টিপাতের পর। এ কারণে নজর এক জিনিস আর স্বাদ ও তৃপ্তি আর এক জিনিস যা দেখার পরই সৃষ্টি হয়। কুরআনের শব্দাবলীও এ সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়:
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ : - الزخرف : ۷۱
"মন ভুলানো ও চোখের আস্বাদনের জিনিসসমূহ সেখানে বর্তমান থাকবে।"-সূরা আয যুখরুফ: ৭১
এতে বুঝা গেলো শুধু দেখার নামই লয্যত (স্বাদ) নয় নতুবা এভাবে বলা হতো না যে, চোখ তাকে দেখেই পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে।
অন্যান্য অনুভূতি সম্পন্ন ব্যাপারগুলোরও এ একই অবস্থা। আনন্দ ও বিপদের যেসব অবস্থা আত্মা অনুভব করবে তা কোনো না কোনো পসন্দনীয় জিনিস অথবা অপসন্দনীয় জিনিস লাভের ও ভোগের অনুভূতিরই ফলাফল। স্বয়ং অনুভূতি ও উপলব্ধির ফল নয়। অতএব ঈমানের স্বাদ ও এর থেকে প্রাপ্ত মজা ও আনন্দ আল্লাহ তা'আলাকে পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসারই ফল। তিনটি কথা পুরোপুরিভাবে বুঝার পরই এ ফল লাভ হতে পারে।
এক: এ ভালোবাসায় পরিপূর্ণতা থাকতে হবে।
দুই: ভালোবাসা বাড়তে থাকতে হবে।
তিন: এ ভালোবাসার পথে প্রতিবন্ধক এমন সবকিছুকে ঘৃণা ও প্রতিরোধ করতে হবে।
"ভালোবাসার পরিপূর্ণতার” অর্থ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পৃথিবীর সবকিছু হতে বেশী প্রিয় হবে। শুধু একথা বললেই হবে না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাস্তবেই সর্বাধিক ভালোবাসতে হবে।
ভালোবাসা বৃদ্ধি হবার দাবী হলো, যদি বান্দা অন্য কাউকেও ভালোবাসে সে ভালোবাসাও আল্লাহর জন্য হতে হবে। মূল ভালোবাসা তার জন্যে হবে না-হবে আল্লাহর জন্য। তার প্রতি ভালোবাসা হবে আল্লাহর ভালোবাসা কেন্দ্রিক। ভালোবাসার পথের প্রতিবন্ধকজনিত প্রতিটি জিনিসকে ঘৃণা করার অর্থ হলো, ঈমানের বিপরীত জিনিস কুফর ও শিরককে আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকেও অধিক অপসন্দ করা।
এসব কথা বুঝার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মু'মিনদেরকে ভালোবাসাও প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে ভালোবাসার সমতুল্য। অর্থাৎ তার একটা অংশ। রাসূলের প্রতি মহব্বত এজন্য যে, রাসূল আল্লাহ তা'আলাকে সবচেয়ে বেশী মহব্বত করতেন। এ কারণেই আল্লাহর প্রিয়দের প্রতি মহব্বত অবশ্যম্ভাবী। এখন 'মহব্বতের' বিপরীত 'খুল্লাতের" অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করুন। কিভাবে এতে গায়রুল্লাহর জন্য এক কণাও কোনো অংশ নেই। মূলগতভাবেও নেই, আংশিকভাবেও নেই। বরং তা আল্লাহর জন্যই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। এর দ্বারা 'মহব্বতের' চেয়ে 'খুল্লাতে'র শ্রেষ্ঠত্ব দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায়।