📄 স্বভাবগতভাবে প্রত্যেক মানুষেরই ২ টি জিনিসের প্রয়োজন
"যদি কিছু চাইতে হয় আল্লাহর কাছেই তা চাও। আর সাহায্য যদি কারো কাছে চাও তা হলে তা আল্লাহর কাছেই চাও।"
এ দুটি জিনিসের প্রথমটি হলো তার রিয্ক বা জীবিকা ইত্যাদি যা জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজন।
আর দ্বিতীয়টি হলো অনিষ্ট ও ক্ষতিকারক জিনিস হতে নিজেকে হিফাজত করা।
এ দুটো ব্যাপারেই ইসলামের শিক্ষা হলো—এ দুটো জিনিস যখনই চাইবে তখনই আল্লাহর কাছে তা চাইবে। প্রয়োজনের সময়ও তাঁর কাছেই হাত পাতবে। আর বিপন্ন অবস্থায়ও তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করবে। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের উন্নত চরিত্রও আমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান। নিজের পুত্রের বিরহ ব্যথা যখন আর সহ্য হচ্ছিল না, দুঃখের কষ্টে আপনা আপনিই মুখ নড়তে আরম্ভ করলো এবং শব্দ বেরুতে লাগলো:
إِنَّمَا أَشْكُوا بَشِّى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ - يوسف : ٨٦
"আমি 'আমার আহাজারী ও মনোবেদনা শুধু আল্লাহর কাছেই নিবেদন করবো।"-সূরা ইউসুফ: ৮৬
কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা 'হিজরে জামীল'-এর উল্লেখ করেছেন উন্নত চরিত্রের পরিচয় হিসেবে। ওলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন:
'হিজরে জামীল' এর অর্থ কাউকে কোনো কষ্ট দেয়া ছাড়া নীরবে তার কাছ থেকে কেটে পড়া।
এবং 'সফহে জামীল' এর অর্থ হলো, কপাল ও ভ্রু কুঁচকানোর বিরক্তি দেখানো ছাড়াই কাউকে মাফ করে দেয়া।
এবং 'সবরে জামীল' অর্থ হলো কোনো প্রকার অভিযোগ ছাড়াই বিপদ-আপদ সয়ে যাওয়া।
হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহিমাতুল্লাহ আলাইহিকে একবার রোগ শয্যায় একথা শুনানো হয়েছিলো—ইমাম তাউস রাহেমাহুল্লাহু রোগীর আহ! উহ! শব্দ মুখ থেকে উচ্চারণ করে কাতরানোকে অপসন্দ করতেন। তিনি বলতেন, এটা হলো মাখলুকের কাছে অভিযোগ। একথা শুনে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রোগশয্যায় কাতরানো বন্ধ করে দিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তার মুখ থেকে আর এ আহ! উহ! শব্দ কোনো দিন বের হয়নি।
এখন বাকী রইলো বিপদ মুসীবতে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মনের কোনো মিনতি অভিযোগ আকারে নিবেদন করা। এটা কিন্তু সবরে জামিলের বিপরীত কিছু নয়। একথার প্রমাণ হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আগে বর্ণিত বাক্যগুলোতে বিদ্যমান। একদিকে তিনি বলেছেন ফাসব্রুন জামিল এবং এর পরপরই তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا أَشْكُوا بِشَيْ وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ -
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ফজরের নামাযে সূরা ইউসুফ, সূরা ইউনুস ও সূরা আন নাহল, তিলাওয়াত করতেন। এসব আয়াতে (اشكو الخ) পৌঁছলে তিনি কেঁদে ফেলতেন। তাঁর কাঁদার শব্দ শেষ কার্তার পর্যন্ত শুনা যেতো।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম দোয়া করতেন- "হে আল্লাহ! সব প্রশংসা একমাত্র তোমারই প্রাপ্য। তুমি আমাদের মনের কাকুতি শুনার একমাত্র অধিকারী। তুমিই আমাদের ভরসাস্থল, তুমিই আমাদের ফরিয়াদ শ্রবণকারী। তোমার উপরই আমাদের ভরসা। আমাদের শক্তি ও অনুপ্রেরণার তুমিই একমাত্র উৎস।
তায়েফের সেই ময়দানে দুষ্ট দুরাচার জাহিলরা রাহমাতুল্লিল আলামীনের সাথে যে হৃদয়হীন দুব্যবহার করেছিলো তাতেও তাঁর পাক যবান দিয়ে একথাগুলো বের হয়ে আসতে শুনা গিয়েছিলো।
"হে আমার আল্লাহ! আমার অপারগতা, আমার অসহায়তা, আমার অক্ষমতার অভিযোগ তোমার নিকটেই আবেদন করছি। তুমিই অসহায়ের সহায়। তুমিই আমার রব।"
এসব ঘটনা ও বিশ্লেষণের আলোকে এ সত্য কোনো আলোচনার অপেক্ষা রাখে না যে, আল্লাহর দরবারে নিজেদের অভাব অভিযোগ পেশ করা এবং নিজেদের বিপদ আপদের কথা বলা নিষেধ নয়, খারাপও নয়। বরং এমন এক কাজ যার আদেশ দেয়া হয়েছে। শরীআতের দৃষ্টিকোণ থেকে যা পসন্দনীয় কাজ। আল্লাহর যে বান্দা তার প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের যত বেশী প্রত্যাশী হবে বান্দাহর বন্দেগী ততবেশী মজবুত ও একনিষ্ঠ হবে। গায়রুল্লাহ থেকে তার অমুখাপেক্ষিতা দৃঢ় ও পরিপূর্ণ হবে। যেভাবে কোনো মাখলুকের কাছে কিছু চাওয়া ও তার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা তার গোলাম হবার প্রমাণ, তেমনি তাঁর থেকে কিছু পাবার আশা না করা ও তাঁর প্রতি কোনো আকর্ষণ অনুভব না করা তাঁর থেকে মনের বিমুখতার প্রমাণ। ঠিক এভাবে নিজের স্রষ্টা ও জীবিকাদাতার প্রকৃত নেয়ামতের প্রতি প্রত্যাশী ও আকৃষ্ট হওয়া তাঁরই গোলামী ও বন্দেগীর নিদর্শন। মানুষের হৃদয় আল্লাহর কাছে চাওয়া ও তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে ফিরে থাকা প্রকৃতপক্ষে তাঁকে উপেক্ষা করারই অর্থ বহন করে।
📄 গায়রুল্লাহর ভালোবাসা ও গায়রুল্লাহর বন্দেগী
যারা নিজেদের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা ও আকর্ষণকে নিজের স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তারা মূলত তা অন্য কোনো মাখলুকের সাথে জুড়ে দেয়। জুড়ে দেয় এমনভাবে যে, তাকেই নিজের আশা আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে নেয়। আর তার উপরই নিজের আশা-ভরসা ও নির্ভরতার প্রাসাদ গড়ে তোলে। যেমন কেউ এরূপ প্রাসাদ নির্মাণ করে নিজের রিয়াসাত, নিজের হুকুমাত, নিজের বাহিনী, নিজের দাস-দাসীর উপর। অন্য এক ব্যক্তি তৈরি করে নিজের পরিবার পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের উপর। তৃতীয় এক ব্যক্তি স্বীয় ধন-সম্পদের পাহাড়ের উপর। চতুর্থ আর এক ব্যক্তি নিজের কোনো মনিব, কোনো শাসক, কোনো মাখদুম, কোনো পীর, কোনো মুরশীদ ও এভাবে অন্যান্য বুযুর্গের প্রতি ফানা হয়ে যায়। অথচ সে যার উপর নির্ভর করে এবং যার জন্য 'ফানা' হয়, তার নিজের তো ফানা হওয়াটা নিশ্চিত ব্যাপার।
এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাহদের হেদায়াত ও নসীহত করেছেন:
تَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَسَبِّحْ بِحَمْدِهِ ، وَكَفَى بِهِ بِنُونُوبِ عِبَادِهِ خَبِيران الفرقان : ٥٨
"নির্ভর করো সেই শক্তির উপর যিনি জীবন্ত। যে শক্তির কোনো ক্ষয় নেই। প্রশংসার সাথে তাঁর পাক পবিত্রতা বর্ণনা করো। আর তিনিই তাঁর বান্দাহদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে অবহিত থাকার জন্য যথেষ্ট।” -সূরা আল ফুরকান: ৫৮
এটা একটা অনস্বীকার্য সত্য, যে ব্যক্তির হৃদয়ই কোনো সৃষ্টির দিকে প্রত্যাশার সাথে ঝুঁকে পড়বে এ অর্থে যে, তার সংকট সময়ে সে কাজে আসবে অথবা তার কাছ থেকে জীবিকা সংগ্রহ করবে, অথবা তাকে সত্য ও সঠিক পথপ্রদর্শন করবে; তাহলে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে তার অন্তরে অবশ্যই একটা ভক্তি মর্যাদার সৃষ্টি হবে। সে তার সামনে অসহায়ের মতো মাথা নুইয়ে থাকবে। পরিশেষে এ ধ্যান-ধারণা ও এ ধরনের অসহায় ভাবের কারণে তার মধ্যে তার গোলামী ও বন্দেগী করার অবস্থারও সৃষ্টি অবশ্যই হবে। যদিও বাহ্যদৃষ্টিতে সে তার আমীর, নেতা, মনিব ও হুকুমদাতাই হোক না কেন। কারণ হাকিম বাহ্যিক দিকে দেখে তো সিদ্ধান্ত ও বিচার ফায়সালা করে না বরং তথ্যের ভিত্তিতে তা করে।
এ বিরাট সত্যকে বাস্তব দৃষ্টান্তের দ্বারা বুঝুন। আমরা দেখছি, যখন কোনো ব্যক্তি কোনো সুন্দরী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়, শরীআতের দৃষ্টিতে সে নারী তার স্ত্রীই হোক না কেন এরপরেও তার হৃদয় তার তরে বন্দী হয়ে থাকে। তার খুশীমত সে তাকে নাচায়। অথচ স্বামী হিসেবে সে বাহ্যতঃ তার মুরব্বি ও মনিব। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে সে পুরুষ তার হুকুম বরদার ও আজ্ঞাবহ। বিশেষ করে পুরুষের প্রেম ভালোবাসার কথা সে যখন বুঝে, সাথে সাথে একথাও বুঝে যে, তার বিচ্ছেদ ওর জন্য অসহ্য। আর যাই হোক তাকে ছেড়ে অন্য কোনো নারীর সান্নিধ্য লাভ করার কল্পনাও তার জন্য দুঃসাধ্য। ফলে সে তার উপর এমন শাসকের ভূমিকা গ্রহণ করে যেমন কোনো যালিম ও একনায়ক মনিব তার ক্রয় করা ও অসহায় দাসদাসীর উপর করে থাকে। বরং সে এর চেয়েও শক্ত করে কষে ধরে। কারণ মনের বন্দী শরীরের বন্দী হতে এবং মনের গোলামী দেহের গোলামী হতে অনেক বেশী শক্তিশালী হয়ে থাকে।
যদি একজন মানুষের দেহ গোলামীতে বন্দী থাকে কিন্তু তার হৃদয় থাকে বন্দী জীবনের প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত, তাহলে তার কোনো পরোয়া থাকে না। বরং কোনো কোনো সময় এ বন্দী জীবন হতে মুক্তিও মিলে যায়। কিন্তু দেহ-রাজ্যের বাদশাহ 'মন'-এর উপর যখন এ বিপদ এসে পড়ে এবং সে কোনো গায়রুল্লাহর হাতে বন্দী হয়। অথবা হালকা গোলামীর মধ্যে আটকে যায় তাহলে সে হয় প্রকৃত গোলাম। এ গোলামীই প্রকৃতপক্ষে অবমাননাকর এবং ইবাদাতের আয়নায় ধরা পড়ার যোগ্য। হৃদয় মনের গোলামী হলো সেই জিনিস যার ভিত্তিতে পুরস্কার ও 'শান্তি নির্ধারিত হয়। বস্তুত তোমরা জানতেই পারবে যদি কোনো মুসলমানকে কোনো কাফির অন্যায়ভাবে কয়েদ করে রাখে অথবা কোনো ফাসিক তাকে জোর করে গোলাম বানিয়ে নেয় তাহলে এ জিনিস তার দীন ও ঈমানের ব্যাপারে কোনো ক্ষতি সাধন করে না। যদি সে এ গোলামী জীবনের ভেতরও দীনের দাবীসমূহ যথাসাধ্য পূরণ করতে থাকে। এভাবে একজন মুসলমান যদি প্রকৃতই কারো গোলাম হয় আর সে আল্লাহর হকসমূহও পালন করে চলে এবং নিজের দুনিয়ায় মনিবের হকও আদায় করে তাহলে তার জন্য আল্লাহর নিকট দ্বিগুণ প্রতিদান মওজুদ আছে। এমন কি কোনো মুসলমান যদি কাফিরের অধীনে পড়ে কুফরী কালাম পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয় এবং তার ঈমান যদি অটল থাকে, তবে তিনি ইসলামের উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকবেন।
এর বিপরীত যদি কারো দেহ নয় বরং তার মন কোনো সৃষ্টির গোলাম বনে যায়, তাহলে এ কাজ সরাসরি তার ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। বাহ্যতঃ সে যদি একটি সাম্রাজ্যের শাসকও হয় তাতেও কোনো ফল হবে না। কেননা আযাদী ও গোলামী মনের উপর নির্ভরশীল, দেহের উপর নয়। যেমন ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের উপর ধনী হওয়া নির্ভরশীল নয়। বরং প্রাচুর্য মনের উপর নির্ভরশীল। প্রকৃত প্রস্তাবে মনের প্রাচুর্যই প্রকৃত প্রাচুর্য।
এতো গেলো সেই লোকদের মধ্যকার প্রেমের কথা, শরীআতের দৃষ্টিতে যাদের মধ্যকার ভালোবাসা মুবাহ। এবার আলোচনা করা যাক প্রেমের আরেকটি ধরন সম্পর্কে। তাহলো, কারো মন পর-নারী অথবা কোনো সুন্দর যুবকের ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়। সে তার প্রেমের বেদীমূলে তার সারা দেহ ও মন উজাড় করে দেয়। এরূপ প্রেমের পরিণতি কঠিন আযাব ছাড়া আর কিছু নয়। এসব লোক হতভাগা। এরা আল্লাহর রহমত হতে সবচেয়ে দূরে এবং আযাবের সবচেয়ে নিকটবর্তী। কেননা কোনো অপরূপ প্রেমিক যতক্ষণ ওই রূপের ধ্যান-ধারণায় ডুবে থাকে এবং তার পূজারী হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তার হৃদয় মন যে অসংখ্য খারাপ কাজ ও খারাপ খেয়ালের বধ্যভূমী হয়ে থাকে তা কে জানে। যদি ধরে নেয়া হয়, এ ব্যাপারে সে কোনো বড় গুনাহে লিপ্ত হওয়া হতে বেঁচেও থাকে তবুও প্রিয়তমার কল্পিতরূপে তার হৃদয়-মন সবসময় ডুবে থাকার মধ্যেই তার অনিষ্ট নিহিত। এর চেয়েও সহজ কথা হলো যে, সে কোনো বড় থেকে বড় গুনাহ করে ফেলে আবার তার থেকে এমনভাবে তাওবা করে যে, এ গুনাহ হতে তার মন একেবারেই পবিত্র হয়ে যেতে চায়। এ ধরনের অতি লোভী ও রূপের পূজারীদের অবস্থা মাস্তান ও বেহুঁশ লোকের মত বরং তার চেয়েও বেশী খারাপ হয়। কারণ বেহুঁশের কোনো কোনো সময় হুঁশ ফিরেও আসে কিন্তু প্রেমের নেশাচর নেশাগ্রস্থতা হতে এক মুহূর্তের জন্যও মুক্তি পায় না।
এ রূহানী বিপদের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ও শেষ দুর্ভাগ্য হলো এসব লোকের মন আল্লাহর যিকির ও ফিকির থেকে একেবারেই খালি হয়ে যায় এবং ঈমানের স্বাদ অনুভব করা হতে তারা বঞ্চিত হয়ে যায়। মানুষের হৃদয় যদি ঈমানের ব্যাপারে সরল-সহজ হতো ও আল্লাহর ইবাদতের মজা পেতো তাহলে তাদের মনে এর চেয়ে বেশী মজা ও আকর্ষিত জিনিস আর কিছুতেই পরিলক্ষিত হতো না। কারণ এটা হলো মানুষের স্বভাব। মানুষ কোনো প্রিয় জিনিসকে তখনই পরিহার করে যখন তার দৃষ্টিতে এর চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো জিনিস সে দেখতে পায়। অথবা এ ব্যাপারে তাকে আরো কোনো ক্ষতি অথবা মুসিবতে ফেলে দেবার আশংকা দেখা দেয়। অতএব কোনো ভুল ও অনিষ্টকর ভালোবাসা থেকে মানুষের মনকে শুধু আল্লাহর প্রতি খাঁটি ভালোবাসাই মুক্ত করতে পারে। অথবা কোনো বড় ক্ষতির আশংকা প্রকট হয়ে দেখা দিলেই আল্লাহ প্রেমে নিবিষ্ট হতে পারে। আর এই আল্লাহ প্রেমের কারণেই হযরত ইউসুফ আঃ কঠিন পরীক্ষায় বিজয় লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আঃ সালামের পবিত্রতার রহস্য সম্পর্কে এরশাদ করেনঃ
كَذَٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
“এরূপই ঘটল যাতে আমরা ইউসুফকে পাপ ও নির্লজ্জতা হতে বাঁচিয়ে নেই। নিশ্চয়ই সে ছিলো আমার বাছাই করা বান্দাদের একজন।” - সূরা ইউসুফ : ২৪
বুঝা গেলো, আল্লাহ তাআলা মানুষের মনকে কোনো খারাপ কাজ অর্থাৎ কোনো অসঙ্গত পদ্ধতিতে মানব রূপ-সৌন্দর্যের আকর্ষণে ফেঁসে যাওয়া হতে বাঁচিয়ে রাখেন। ঈমানের নিষ্ঠার কারণে তাকে গর্হিত কাজ হতে হিফাজত করেন। এ কারণেই মানুষ যখন আল্লাহর বন্দেগীতে সত্যিকারের মজা পায় না তখনই তার নফস তাকে খায়েশের দাসে পরিণত করে এবং সে তার সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। কিন্তু সে যখন একবার ইবাদতে নিষ্ঠার মজা পেয়ে যায় এবং এর প্রভাব হৃদয় মনে বসে যায় তখন কোনো আকর্ষণ ছাড়াই নফসের খায়েশ তার নিকট আত্মসমর্পণ করে বসে, নামাযের দর্শনের ব্যাপারে কুরআনের বর্ণনায় আমরা এ সত্যই দেখতে পাই :
إِنَّ الصَّلَوةَ تَنْهَىٰ عَنِ ٱلْفَحْشَاءِ وَٱلْمُنكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ ٱللَّهِ أَكْبَرُ ۗ - العنكبوت : 45
“নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড় বিষয়।” - সূরা আল আনকাবুত : ৪৫
অর্থাৎ নামাযের উপকারিতা দু' ধরনের:
এক. স্বভাবগত গর্হিত কাজের (ফাহশা ও মুনকার) অপনোদন।
দুই. স্বভাবগত প্রিয়বস্তু (আল্লাহর স্মরণ) অর্জন। উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে দ্বিতীয়টি প্রথমটির থেকে অধিক উত্তম। কেননা আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর ইবাদাতই হলো মূল উদ্দেশ্য আর খারাপ ও অপসন্দনীয় কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা এ পথের একটি আবশ্যকীয় স্তর। অথবা এ কথাটাকে এভাবে বলা যেতে পারে যে, এটা উদ্দেশ্য হাসিলের একটি সিঁড়ি। এজন্য কুদরতীভাবে এর অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে হবে। মানুষের মন এমন এক জিনিস যা জন্মগতভাবে সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও সত্য সন্ধানী। এ কারণে যখন খারাপ কাজের ধারণা তার সামনে পেশ করা হয় তখন সে তাকে দূরে ঠেলে দিতে চেষ্টা করে। কেননা খারাপ কাজ ও খারাপ চিন্তা তাকে এভাবে ধ্বংস করে দেয় যেমন আগাছা ও ঘাস শস্যকে ঢেকে ফেলে। নীচের আয়াতটি এ সত্যটিকে প্রকাশ করে :
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّهَا ۞ الشمس : ١٠-٩
"যে নিজের নক্সকে পরিশুদ্ধ করেছে সে নিঃসন্দেহে কামিয়াব হয়েছে। আর যে নফসের খাহিশ পূরণ করেছে সে ব্যর্থ হয়েছে।"
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى ۞ الاعلى : ١٥-١٤
"কল্যাণ লাভ করল সে, যে পরিশুদ্ধি অবলম্বন করলো এবং নিজের প্রভুর নাম স্মরণ করলো, নামাযও পড়লো।"-সূরা আ'লা : ১৪-১৫
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ، ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ ۞
"হে নবী! মু'মিনদের বলুন, তারা যেন তাদের চোখ বাঁচিয়ে চলে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম নীতি।"-সূরা আন নূর : ৩০
وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا ۞ - النور : ۲۱
"যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর ফযল ও রহমত না থাকতো তাহলে তোমাদের কেউই পরিশুদ্ধ হতে পারতো না।"-সূরা আন নূর : ২১
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তা'আলা কিভাবে "চোখ বাঁচিয়ে রাখা ও লজ্জাস্থানের হিফাজত করাকে" নফসের জন্য সবচেয়ে পরিশুদ্ধতম কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, প্রবৃত্তির খাহেশ পূরণ করা হতে দূরে থাকা নক্সকে পবিত্র রাখার একটি মৌলিক অংশ। "নক্সের পরিশুদ্ধির” একটি অর্থ হলো, নক্সকে গর্হিত কথা ও কাজ, যুলুম, মিথ্যা, শিকসহ সকল খারাপ কাজ থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ রাখা।
ওই ব্যক্তির অবস্থা রূপ ও সুন্দরের পূজারীর মতোই, যে রাষ্ট্রক্ষমতার মোহে নিমজ্জিত হয়। পৃথিবীতে নিজের হুকুম জারী, নেতৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে দেখা যাবে, এ ব্যক্তিও তার সহযোগী ও সাহায্যকারীদের হাতে বন্দী। যদিও প্রকাশ্যে সে তাদের নেতা ও শাসক বলে মনে হবে। কেননা সে তার উপর অবশ্যই নেতৃত্বের খোলস পরে বসে আছে। কিন্তু এ খোলসের আবরণে যে মন বিদ্যমান তা উল্টে ওই সহযোগী ও সাহায্যকারীদের 'ডর-ভয়' ও 'আশা-নিরাশার' উপর নির্ভরশীল। এজন্যই দেখা যায়, তাদের জন্য সে তার ধন ভাণ্ডারের দরযা খুলে রাখে, তাদেরকে বড় বড় জায়গীরদারী দিয়ে দেয়। তাদের অনেক দোষ-ত্রুটি দেখেও দেখে না। সে কেন এমন করে? শুধু এজন্য করে যে, এর দ্বারা তারা তার হুকুম পালনের জন্য প্রস্তুত থাকবে। তার মনোবাঞ্ছা অনুযায়ী কাজ করে যেতে ত্রুটি করবে না। যদি তারা তা না করে তাহলে তার নেতৃত্ব ও হুকুম জারীর কাজ ব্যর্থ হবে। এ কারণে প্রকাশ্যেই এ ব্যক্তি তাদের নেতা ও সরদার তো বটে, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে সেই বরং তাদের আজ্ঞাবহ দাস।
যদি আরো গভীর মনোনিবেশ সহকারে দেখা যায় তাহলে বুঝা যাবে, সত্যিকার এ দু ধরনের লোকই একে অপরের গোলাম। ভিতরে ভিতরে উভয়ের মধ্যেই উভয়ের গোলামী বা বন্দেগীর মানসিকতা বিদ্যমান। কেননা এ দুয়ের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের মুখাপেক্ষী। এজন্য এরা সকলেই আল্লাহর ইবাদাতের প্রকৃত মর্ম অনবহিত। এ দু'জনের উপরে উল্লেখিত এ সহযোগিতা আল্লাহর যমীনে স্বৈরাচারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতা হাসিলের উদ্দেশ্যে যদি হয় তাহলে তাদের অবস্থা ওই দুই ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্য অর্জন করা থেকে পৃথক কিছু নয়, যারা বদমায়েশী, রাহাজানি ও ছিনতাইয়ে একে অপরের সাহায্য করে।
ধন-সম্পদের লোভী ব্যক্তিও এ ধরনের অবস্থার শিকারে পরিণত হয়। রূপের পাগল যদি রূপ-লাবণ্যের এবং ক্ষমতার লোভী যদি তার সৈন্য-সামন্ত ও সিপাহসালারের পূজারী হয়, তাহলে এরাও নিজেদের জীবনকে ধন-সম্পদের বন্দেগী ও পূজারীর শিকারে পরিণত করে।
📄 এর অর্থ দুনিয়া ত্যাগ নয়
আমার এ আলোচনা থেকে কারো মধ্যে যেনো এ ভুল ধারণার সৃষ্টি না হয় যে, ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ তথা বৈরাগ্যবাদের শিক্ষা দেয়। প্রকৃত কথা হলো বস্তু ও পার্থিব জিনিস দুপ্রকার। কিছু জিনিস এমন আছে যা প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের প্রয়োজন। যেমন, পানাহার, পোশাক-আশাক, ঘর-বাড়ী, স্বামী-স্ত্রী ইত্যাদি। একজন মু'মিন বান্দাও এ উদ্দেশ্যেই এসব জিনিস গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু এসব জিনিস গ্রহণ করার পদ্ধতি হলো, তা আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহর দিকে রুজু হতে হবে। তা ছাড়াও যেসব মাল ও আসবাবপত্র যা মানুষ নিজের জৈবিক প্রয়োজন পূরণে কাজে লাগায় সে সবের অবস্থান তার নিকট ওই ঘোড়া বা ওই গাধার চেয়ে বেশী কিছু নয়, যার উপর সে আরোহণ করে। অথবা ওই বিছানা যার উপর সে বসে। বরং ওই পাদানীর চেয়েও বেশী কিছু নয় যার উপর সে বসে নিজের প্রয়োজন সেরে নেয়। জীবন ধারণের এসব আসবাবপত্র তাকে এমন পাগল পারা করে দেয়নি যে, সে তারই হয়ে যাবে। এবং তার উপর-
إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا المعارج : ২০-২১
"যেমন যখন তার কোনো অনিষ্ট ও ক্ষতি হয় তখন হাহুতাশ শুরু করে দেয়। আর যখন কল্যাণ লাভ করে, তখন কৃপণ বনে যায়। তার অবস্থা এমনতর হয়ে যায়।"-সূরা আল মাআরিজ: ২০-২১
দ্বিতীয় হলো ওই সব জিনিস, যা মানুষের জন্য প্রকৃতিগতভাবে প্রয়োজনীয় নয়, প্রয়োজনের খাতিরেও প্রয়োজনীয় নয়। এজন্য এ ধরনের জিনিসের পেছনে লেগে থাকা ও এগুলোর ধ্যানে মগ্ন থাকা আল্লাহর বান্দাহর কাজ হতে পারে না। এ সব জিনিসের সাথে যদি হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠে তাহলে নিশ্চয়ই এ জিনিস তাকে নিজের গোলামে পরিণত করে ছাড়ে।
কোনো কোনো সময় তো নিজের গোলামীতে তাকে এমনভাবে ফাঁসিয়ে নেয় যে, সে তার জন্য গায়রুল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পর্যন্ত শুরু করে। এমন হবার পর তার হৃদয়ে আল্লাহর খাঁটি বন্দেগী ও তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করার ভাব কোনো অবস্থায়ই বিদ্যমান থাকতে পারে না। বরং তখন সে পরিষ্কারভাবে একথা বলতে চায় যে, তার মধ্যে গায়রুল্লাহর বন্দেগী এবং গায়রুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল পরিপূর্ণভাবে না থাকলেও আংশিকভাবে তো অবশ্যই পাওয়া যাবে। এ ধরনের মানুষ আল্লাহর রাসূলের বাণী : تَعَسَ عَبْدُ الدُّرْهُمْ "ধন-সম্পদের বান্দাহ ধ্বংস হয়েছে” এর প্রথম প্রমাণ। এসব মানুষ নিসন্দেহে ধন-সম্পদ ও টাকা পয়সার বান্দাহ হয়ে থাকে, তা যদি সে আল্লাহর কাছেও চেয়ে থাকে।
কেননা আল্লাহর কাছে চাওয়ার পরও সে তার ফায়সালার উপর ধৈর্যধারণ ও শোকর করে না। বরং আল্লাহ তার মনমত দিলে সে খুব খুশী। আর তা নাহলে সে হয় অখুশী। আল্লাহর বন্দেগীর অর্থ কি এই? আল্লাহর বান্দাহ তো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর খুশীতে রাযী থাকে এবং আল্লাহর অখুশীতে অখুশী ও বেজার থাকে। ওই কাজকে পসন্দ করে, যে কাজ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পসন্দ করেন। ওই কাজকে ঘৃণা করে যে কাজ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ঘৃণা করেন। আল্লাহর বন্ধুকে বন্ধু ও আল্লাহর শত্রুকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করে। এমন ব্যক্তিরাই পূর্ণ ঈমানের অধিকারী। ঈমানের মুয়াল্লিম হাদিয়ে কামেল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্নভাবে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে এরশাদ করেছেন:
(۱) مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَابْغَضَ لِلَّهِ وَاعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ - আবু দাউদ
(১) “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকেও ভালবেসেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কারো সাথে শত্রুতা করেছে, আল্লাহর জন্যই দান করেছে আবার আল্লাহর কারণেই দান করা হতে বিরত থেকেছে, সে ব্যক্তি ঈমানকে কানায় কানায় পূর্ণ করেছে।"
(۲) أَوْثَقَ عُرَى الْإِيْمَانِ الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبَغْضُ فِي اللَّهِ -
(২) "ঈমানের সবচেয়ে মযবুত রজ্জু হলো মানুষ আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে এবং আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করবে।"
(۳) ثَلَاثُ مَنْ كُنْ فِيْهِ وُجِدَ حَلَاوَةُ الْإِيمَانِ - مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَمَنْ كَانَ يُحِبُّ الْمَرْءُ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَمَنْ كَانَ يَكْرَهُ أَنْ يَرْجِعَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ فِيْهِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ - বুখারী, মুসলিম
(৩) "যার মধ্যে তিনটি বিষয় বিদ্যমান থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। ১. আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তার নিকট সমগ্র পৃথিবীর চেয়ে বেশী প্রিয়। ২. যাকেই ভালোবাসে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে। ৩. কুফরী হতে ফিরে আসার পর আবার কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার মত অপসন্দ করে।"
📄 রাসূলের ভালোবাসার মূলকথা
কেউ যখন ঈমানের এ সোপানে পৌঁছে যাবে তখনই সে নিজের পছন্দ ও অপসন্দকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির ভিত্তিতে গড়ে তুলতে পারবে। এ সময় দুনিয়ার সব জিনিস হতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট প্রিয় হবে। আর আল্লাহর সৃষ্টি জগতের কাউকে সে ভালোবাসলে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তা করবে না। এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের কাউকে ভালোবাসা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাসারই শামিল। বরং তার পরিপূর্ণতার একটি দিক। ভালোবাসার এটাই নিয়ম।
এর থেকে আল্লাহর নবী এবং অলীদের ভালোবাসার কথা বুঝা যায়। এসব বুযুর্গদের তাঁরা শুধু এ জন্য ভালোবাসে যে, তাঁরা আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় পথের দিকে আহবান জানায়। তাই তাঁদেরকে ভালোবাসা আল্লাহকে ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। কারণ তাদেরকে তো আল্লাহর জন্যেই ভালোবাসা হয়, ব্যক্তিগত কারণে নয়। কুরআন মজীদে এরশাদ হচ্ছে:
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ ۚ الْمَائِدَةَ : ٥٤
"অচিরেই আল্লাহ এমন অনেক লোকের আবির্ভাব ঘটাবেন যারা হবে আল্লাহর প্রিয়, আল্লাহ হবেন তাদের প্রিয়। তারা মুমিনের প্রতি নম্র-বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর।" -সূরা আল মায়েদা : ৫৪
বুঝা গেলো, মু'মিন ও আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে নম্রতা-ভদ্রতা, ভালো ব্যবহার করা আল্লাহকে ভালোবাসারই অন্তর্ভুক্ত এবং তারই এক প্রাকৃতিক দাবী। এ বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ - ال عمران : ٣١
“(হে রাসূল!) বলো, তোমরা যদি প্রকৃতই আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাহ হিসেবে কবুল করে নেবেন।"-সূরা আলে ইমরান: ৩১
এর কারণ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো সেইসব কাজ করারই হুকুম দেন আর নিজেও তা করেন, যেসব কাজ আল্লাহ পসন্দ করেন। তিনি ওই সব কাজ থেকে বিরত রাখেন ও নিজেও বিরত থাকেন যেসব কাজ আল্লাহর অপসন্দ। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবী করবে তার জন্যে রাসূলকে অনুসরণ করা আবশ্যক। 'গায়েব' ও 'হাজির' সম্পর্কে তিনি যেসব খবর দিয়েছেন তা হৃদয় দিয়ে সত্য বলে মানতে হবে। তার এক একটি হুকুমের সামনে সানন্দে মাথা নত করতে হবে। বাস্তব জীবনে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে রাসূলের অনুসৃত নীতি দেখে নিতে হবে। যে ব্যক্তি এভাবে কাজ করেছে সে-ই আল্লাহকে ভালোবাসে এ দাবীতে সঠিক ও পরীক্ষায় সফল হলো। পরিণতিতে এ ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্তিতে ধন্য হবে।