📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 না করার পরিণতি

📄 না করার পরিণতি


যেসব লোক প্রাকৃতিক বিধানকে মোশাহিদা করার পর এ মোশাহিদা দ্বারা প্রাকৃতিক ও শরীআতের বিধান ও আহকামের অনুসরণ করা বাধা মনে করেন অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও মোশাহিদাকে শরীআতের অনুসরণ বাদ পড়ে যাবার কারণ বলে মনে করে তারা বিভ্রান্তির বিভিন্ন স্তরে নিমজ্জিত।
এক : যারা বেশী বাড়াবাড়ী করার মত লোক তারা তো এটাকে সাধারণ নীতি বলে মনে করে। শরীআত বিরোধী যেসব কাজ করে, এসব কাজকে তারা তাকদীরের উপর ছেড়ে দেয়। এদের এ নীতি ইহুদী- নাসারাদের বিভ্রান্তিমূলক নীতির চেয়েও বেশী খারাপ। এদের কথাবার্তা সেইসব মুশরিকদের কথাবার্তার মতো যারা বলে :
لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ شَيْه - الانعام : ١٤٨ :
"যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষগণ শিরক করতে পারতাম না এবং কোনো জিনিসকে তার হুকুমের খিলাপ হারাম বলে নির্দিষ্ট করতাম না।" - সূরা আল আনআম : ১৪৮
বিশ্বের বুকে এদের মতো বিপরীতমুখী আচরণকারী আর কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না। যারা তাকদীরকে দোষ দিয়ে তদবীর থেকে বিরত থাকে, তারা বিপরীত পথেই চলে থাকে। কেননা তারা মানুষের ভালো মন্দ সকল ধরনের আমলের একই পরিণতি হবে, এটা মনে করে না। তাছাড়া সব ধরনের কাজকে এক সমান পসন্দের দৃষ্টিতে দেখাও তাদের জন্য সম্ভব নয়। বরং তারা যদি কেউ যুলুম করে অথবা কোনো যালিম ব্যক্তি সাধারণ লোকদেরকে কষ্ট দেয়, অথবা কোনো মানুষ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে ও মানুষের রক্ত ঝরায়, তাদের মান-ইজ্জত নষ্ট করে, এবং এভাবে অন্যান্য বিপজ্জনক ও হায়েনার মতো আচার-আচরণের কাজ করতে শুরু করে তাহলে এরা এসব যুলুমমূলক কাজের বিরোধিতার জন্য তৈরি হয়ে যায়।
তারা এ যালিম ও অশান্তি সৃষ্টিকারীদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। এ শাস্তি অন্যান্য যালিমদের জন্যও শিক্ষামূলক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এসব ঘটনার সময় তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে হয়, তাকদীর যদি ওযরই হয় তাহলে তোমরা কেনো কোনো ব্যক্তির অনিষ্ট ও খারাপ কাজের ব্যাপারে অস্থির, অতিষ্ট হয়ে উঠো? প্রত্যেক ব্যক্তিকেই যা সে করতে চায়, করতে দাও। কারণ যা সে করে তাকদীর অনুযায়ীই তো করে। যদি কাযা ও কদরকে এখানে তোমরা ওযর হিসেবে না মানো, তাহলে নিজের মূল দাবীকেই বাতিল হিসেবে মেনে নাও।
আসলে এ লোকেরা বাস্তব ক্ষেত্রে এ নীতির অনুসরণকারী মোটেই নয়। তারা নিজেদের কথায় অটল থাকে না। তাদের দৃষ্টি সবসময়ই তাদের নিজের স্বার্থসিদ্ধির প্রতিই নিবদ্ধ থাকে। যেখানেই তাদের স্বার্থ আদায় হয় সেখানেই তারা এ নীতিকে মেনে নেয়। আর যেখানে অবস্থা তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ায় সেখানেই তারা এ নীতিমালাকে এড়িয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্যেই একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি কত সঠিক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, "আনুগত্যের ব্যাপারে তোমরা কদরী হও আর পাপের সময় হও জবরী। যে সময় যে মত তোমাদের স্বার্থ পূরণ করে সে সময় তোমরা সে মত গ্রহণ করো।"
দুই : দ্বিতীয় প্রকার লোক তারা-যারা এ নীতিমালাকে সাধারণ নীতিমালা বলে মনে করে না, তারা এর ব্যবহারকে 'সাধারণ ও বিশেষ' এ. দু’ভাগে ভাগ করে থাকেন। তারা তাদের এ জ্ঞান গবেষণার জন্যে গর্ব অনুভব করেন। তাদের ধারণা, যেসব লোক শরীআতের আহকামের বাধ্যবাধকতায় আছে এবং যারা নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে এ অনুভূতি রাখে যে, তা তাদের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার অধীনে সংঘটিত হয়। কিন্তু ওইসব লোক শরীআত মেনে চলে না যারা মনে করে যে, সকল কাজকর্ম আল্লাহরই সৃষ্টি। তাতে তার নিজের কোনো অংশ বা দায়-দায়িত্ব নেই। বরং তাকে তা করতে বাধ্য হতে হয়'। এবং আল্লাহ তাদের মধ্যে অর্থাৎ তাদের অবস্থা ও কাজকর্ম ঠিক সেভাবে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করেন, যেমন প্রতিটি গতিমান বস্তুকে গতিদান করে থাকেন। মোটকথা, তাদের কথা হলো, ওইসব লোকের শরীআত মেনে চলার প্রয়োজন নেই—যারা আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কে অবগতি লাভ করে, তাদের কারো কারো ধারণা যে, হযরত খিষির এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।
উপরোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী এ ধরনের লোকদের কথাবার্তায় প্রকাশ পায় যে, তারা সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে। সাধারণ লোকদেরকে তো শরীআত মানতে বাধ্য মনে করে। কিন্তু বিশেষ লোকেরা বাধ্য নয়। তারপর তারা সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মতই সংজ্ঞা বর্ণনা করে থাকে।
কখনো বলা হয়ে থাকে যেসব লোক প্রাকৃতিক বিধান উপলব্ধি করে এবং এ দর্শন পোষণ করে যে, মানুষের সকল কাজকর্মের মালিক স্বয়ং আল্লাহ। গোটা বিশ্ব তাঁরই ইচ্ছার অনুসারী, তাদেরকে শরীআত মেনে চলতে হবে না।
আবার কখনো কখনো বলে থাকে যে, যারা সত্যকে শুধু জানে কিন্তু প্রত্যক্ষ করে না এবং প্রত্যক্ষ করা ছাড়াই ঈমান পোষণ করে, তারাই শুধু 'শরীআতের আহকাম পালন করতে বাধ্য। তারা শরীআতের হুকুম না মেনে চলতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি এ সত্য উপলব্ধি করে ও একে প্রত্যক্ষ করে সে দীনের আহকাম মানতে বাধ্য নয়।
এর স্পষ্ট অর্থ হলো, এসব লোক আল্লাহর ইচ্ছার বাধ্যবাধকতা এবং তাকদীরের ফায়সালাকে শরীআতের বিধান মেনে চলার প্রতিবন্ধক বলে মনে করে। এ ধারণা এবং এ বিপজ্জনক গুমরাহীতে এমন সর লোক ফেঁসে আছে যাদেরকে জ্ঞান-গবেষণা ও মারেফাতের দিকপাল এবং তাওহীদের রহস্য উদ্‌ঘাটনকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাদের এ ভুল চিন্তার কারণ তারা বুঝতেই পারছে না যে, বান্দাহকে এমন কাজেরও নির্দেশ দেয়া যেতে পারে যে কাজের বিরোধিতা করা তার ভাগ্যে আগ থেকেই লিখা হয়ে গেছে। মুতাযিলা ছাড়াও অন্যান্য কাদরিয়ারাও তাদের মতো এ সত্যকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো, মুতাযিলারা শরীআতের বিধান মেনে চলা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জরুরী বলে মনে করে। এবং তাদের মধ্যে কেউ শরীআত মেনে চলা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা প্রতিটি জিনিসকে বেষ্টন করে আছে এবং বান্দার আমল আল্লাহর সৃষ্ট তা তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত একথা তারা অস্বীকার করে। এদের মুকাবিলায় এসব লোকের অবস্থা হলো তারা কাযা ও কদরকে তো (তাকদীর) স্বীকার করে। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য শরীআত মেনে চলা জরুরী বলে তারা স্বীকার করে না এবং যারা তাকদীরকে মোশাহিদা করেছে তারা শরীআত মেনে চলা হতে মুক্ত।
এসব লোকদের মতে শরীআতের আহকাম মেনে চলা শুধু ওই সব লোকদের জন্য দরকার যারা প্রাকৃতিক বিধানের তাৎপর্য বুঝে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। আর যারা এ স্তর পর্যন্ত গিয়ে পৌছেছে তাদেরকে এরা শরীআতের আহকাম মেনে চলার ঊর্ধ্বে এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ দলের মধ্যে গণ্য করে। তাদের একথার স্বপক্ষে তারা কুরআনে কারীমের এ আয়াতে কারীমা পেশ করেন।
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ الحجر : ٩٩
"নিজের 'রবের' বন্দেগী কক্সে ইয়াকীন আসা পর্যন্ত।"
-সূরা আল হিজর : ৯৯
এ আয়াতের তারা মনগড়া ব্যাখ্যা করে বলেন 'ইয়াকীন' অর্থই হলো আল্লাহর ইচ্ছার জ্ঞান ও মোশাহিদা। কিন্তু এটা সরাসরি কুফরী বক্তব্য। ইসলামী নীতিমালার প্রতি সচেতনভাবে দৃষ্টি দিলে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে একথা ধরা পড়ে যে, বুদ্ধি-বিবেচনা বিদ্যমান থাকা পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকেই শরীআতের অনুসরণ করতে হবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এ থেকে কোনো ব্যক্তি কখনো এবং কোনো অবস্থাতেই বাদ ও মুক্ত হতে পারে না। অতএব যে ব্যক্তি দীনের এ সুস্পষ্ট নীতমালাকে জানে না, তাকে জানাতে হবে এবং বিস্তারিতভাবে তাকে বুঝাতে হবে। এভাবে বুঝিয়ে দেবার পরও যদি সে শরীআত অনুসরণ করে চলা দরকার নেই বলে বিশ্বাস করে তাহলে সে ব্যক্তি হত্যাযোগ্য।
এ ধরনের নাস্তিক্যবাদী কথা ও বিশ্বাসের অস্তিত্ব ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীগুলোতে বিদ্যমান ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীকালে এ ধরনের কথার বেশ প্রচলন হয়েছে, যেসব কথা আল্লাহ ও আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ ও শত্র“তার শামিল। এসব কথা নবীগণকেও মিথ্যাবাদী বলার শামিল। এসব আকীদা পোষণকারীরা যদি এসবের বাতিল হবার ব্যাপারে অবগত না থাকে এবং একথা মনে করে যে, আল্লাহর রাসূল ও অলি-আল্লাহদের মতো এই-ই ছিলো তাহলে তাদের দৃষ্টান্ত ওই ব্যক্তির মতো, যে বিশ্বাস পোষণ করে যে, নামায তার উপর ফরয নয়। কারণ তার মধ্যে এমন রূহানী, কামালিয়াত ও মনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যা থাকলে নামায পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। অথবা তার জন্য মদ এ কারণে হারাম নয়, কারণ তিনি ওই সব আল্লাহর খাস বান্দাদের মধ্যে গণ্য, শরাব পান করলে যাদের কোনো রূহানী ক্ষতি হয় না। অথবা খারাপ কাজ করা তার পক্ষে এজন্য জায়েয যে, সে সমুদ্রের মতো এতো বিরাট বিশাল বিস্তৃত যে, গুনাহর মতো কাজ তার গায়ে কোনো কাদা লাগাতে পারে না।
এটা একটা অনস্বীকার্য সত্য যে, এসব মুশরিক যারা আল্লাহর রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুকুম মুতাবিক চলা অপরিহার্য তা মানে না, চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের দু'টি মৌলিক ভুল আছে।
প্রথমটি হলো বিদআত, আর দ্বিতীয়টি হলো তাকদীর সম্পর্কে ভ্রান্ত যুক্তির আশ্রয় নেয়া। তারা এসব বিদআতকে (অর্থাৎ স্বরচিত আদর্শকে) নিজেদের ধর্মীয় জীবনের ভিত্তি হিসেবে নির্দিষ্ট করে যা শরীআতে ইলাহীর সরাসরি খিলাফ। আবার কখনো কখনো আহকামে ইলাহির পাবন্দীর বিরুদ্ধে তাকদীর সংক্রান্ত ভ্রান্ত যুক্তি খাড়া করে।
মুশরিকদের এ চরিত্র বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে কোনো না কোনো প্রকারে বিদ্যমান। চাই তা শরীআতের খিলাফ বিদআতের অনুসারী হোক, কিংবা হোক তাকদীর থেকে যুক্তি গ্রহণ করা। সর্বাবস্থায় এ দুটো দলই গুমরাহীর মধ্যে শামিল। সকল অবস্থায়ই মুশরিকদের সাথে তাদের আকীদাগত মিল একেবারেই স্পষ্ট। উপরে উল্লেখিত মুশরিকদের দুটি বৈশিষ্ট্যের একটি বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ তাকদীরের যুক্তির পক্ষে তাদের গ্রহণ করা কিছু কুরআনের আয়াত উপরে আলোচিত হয়েছে। তাই সেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে দেয়া প্রয়োজন মনে করি না। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ তাদের বিদআতী কাজ ও শরীআত বানানো কাজ, এসবের আলোচনা এবং খণ্ডন কুরআন মাজীদের অন্যান্য, জায়গাসহ সূরা আল আন'আম ও সূরা আল আরাফে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এসব জায়গায় বলা হয়েছে:
وَقَالُوا هَذِهِ أَنْعَامُ وَحَرْثُ حِجْرَةِ لَا يَطْعُمُهَا إِلَّا مَنْ نَّشَاءُ بِزَعْمِهِمْ وَأَنْعَامُ حُرِّمَتْ ظُهُورُهَا وَأَنْعَامُ لَا يَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا الْتِرَاءُ عَلَيْهِ .
"তারা বলে এসব জন্তু জানোয়ার ও এসব ক্ষেত খামার সুরক্ষিত। এসব শুধু তারাই খেতে পারে যাদেরকে আমি খাওয়াতে চাইবো। আসলে এসব বিধি-নিষেধ তাদের নিজেদেরই কল্পিত। এ ছাড়া কিছু জন্তু জানোয়ার এমন আছে যেগুলোর উপর সওয়ার হওয়া ও মাল বোঝাই করাকে হারাম করা হয়েছে, আর জন্তুর যবেহ করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। এসব কিছুই তারা আল্লাহকে মিথ্যা বানাবার জন্য বলছে।"-সূরা আল আনআমঃ ১৩৮
يبَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَنُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ - الاعراف : ۲۷
-- "হে বনী আদম! শয়তান তোমাদেরকে যেনো তার ফেতনায় ফেলতে না পারে। যেমন, তোমাদের মাতা-পিতা (আদম হাওয়া)-কে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিলো।"-সূরা আলু আরাফ: ২৭
وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ، قُلْ إِنَّ اللهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ * الاعراف : ۲৮
"এবং তারা (মুশরিক) যখন কোনো সুস্পষ্ট অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এসব কাজে লিপ্ত দেখতে পেয়েছি। আল্লাহ আমাদেরকে এসব কাজের হুকুম দিয়েছেন'।' হে নবী! তুমি বলো, আল্লাহ অশ্লীল কাজের হুকুম দেন না।"
আরো বলা হয়েছে:
قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ مَن وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ - الاعراف : ٢٩
"তাদেরকে বলো আমার 'রব' তো ন্যায় ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেন। আরো হুকুম দিয়েছেন একথার যে, তোমরা প্রতিটি সাজদা বা ইবাদাত আদায় করার সময় তোমাদের লক্ষ্য ঠিক রাখবে।"-সূরা আল আরাফ : ২৯
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ .
“(হে নবী!) তাদের বলো, আল্লাহর সৃষ্টি ওই সব রূপসৌন্দর্য যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য পয়দা করেছেন এবং পবিত্র জীবিকা-সমূহ কে হারাম করে দিয়েছেন?"-সূরা আল আরাফ: ৩২
আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّي الفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا bṭn وَالْإِثْمِ وَالْبَغْيِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَالَا تَعْلَمُونَ ﴿اعراف: ۳۳
“(হে মুহাম্মাদ!) তাদের বলো, আমার রব সমস্ত গোপন ও প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ হারাম করে দিয়েছেন। তিনি আরো হারাম করে দিয়েছেন গুনাহের কাজ ও সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কাজ। হারাম করে দিয়েছেন আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোনো সনদ নাযিল করেননি। আল্লাহর নামে এমন কথা বলাও হারাম করেছেন যে কথার ব্যাপারে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।" -সূরা আল আরাফ : ৩৩
দুঃখের বিষয় এরপরও এরা তাদের মনগড়া বিদআতকে প্রকৃত সত্য বলে মনে করছে। আর এ সত্য পর্যন্ত পৌঁছার পথ তাদের নিকট ওই পদ্ধতি যার পরিচালক পথপ্রদর্শকরা শরীআতের বিধি-বিধানের অনুসারী নয়। বরং এসব ব্যাপারে অনুসরণ যা হয় তা শুধু মুশাহিদা।
'কদর'কে শরীআত না মানার যুক্তি হিসেবে পেশ করা প্রভৃতপক্ষে একটি ভাওতাবাজি। এসব যুক্তি শুধু প্রতিপক্ষকে লা জবার করে দেবার জন্য তারা ব্যবহার করে থাকে। নতুবা প্রকৃত ব্যাপার হলো, এসব ব্যাপারে তাদের ঝোঁকপ্রবণতা তাদের প্রবৃত্তির পূজা বই আর কিছু নয়। প্রবৃত্তির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই প্রকৃতপক্ষে তাদের দীনের মূল ভিত্তি। এ ব্যাপারে তারা ওই বিদআত পূজারী 'জাহমিয়া' ইত্যাদি কালাম শাস্ত্রবিদদের থেকে কিছুমাত্র পৃথক নয়। যারা তাদের মনগড়া এবং কিতাব ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিরোধী কথাবার্তাকে 'ইলমের মূল হাকীকত' বলে মনে করে। এদের এসব কথাবার্তার উপর ঈমান ও ইতেকাদ রাখা তাদের নিকট শরীআত দ্বারা প্রমাণিত সিদ্ধান্তসমূহ হতেও বেশী জরুরী। এজন্য তারা কুরআন ও সুন্নাহর দলীলকে প্রয়োজনে পরিবর্তন করে দেয়। অথবা স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে একে এড়িয়ে চলতে থাকে। না এটা তারা বুঝে, আর না এ ব্যাপারে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। বরং তারা বলে যে, আমরা তার ক্ষমা পর্যন্ত পৌছতে পারি না। তাই এসব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। অথচ কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের এসব আকীদা-বিশ্বাসের উপর তারা দ্বিধাহীনভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে। এদিকে একজন মোটা বুদ্ধির মানুষও এসব শুনে পরিষ্কার বুঝতে পারে যে, এসব ইসলামের নীতিমালার একেবারেই বিপরীত। কিন্তু এভাবে তারা কুরআন ও সুন্নাতের সিদ্ধান্তসমূহকে আল্লাহর জ্ঞানের হাওলা করে সকল শর্ত হতে মুক্ত হয়ে যাবার কৌশল অবলম্বন করে। এদিকে এদের নামমাত্র "জ্ঞানের উৎস” -এর যুক্তিবত্তার অবস্থা হলো, যদি এটাকে সঠিক জ্ঞান ও যুক্তিবৃত্তির আলোকে দেখা যায় তাহলে তার সবটাই অজ্ঞতা, মূর্খতা ও কুসংস্কার বলেই অনুভূত হবে। অবিকল অবস্থা এসব সালেকীনের (অগ্রবর্তীদের) ব্যাপারেও এদের শরীআত বিরোধী কথাবার্তা ধ্যান-ধারণাকে যদি যাচাই বাছাই করা যায় যাকে তারা অলি-আল্লাহদের হাকীকত বলে মনে করে তাহলে এসবই তাদের নিজেদের মনগড়া কথা এবং প্রকৃতির তাড়না বলেই প্রমাণিত হবে। এসব মেনে চলা আল্লাহদ্রোহী ও তার শত্রুদেরই কাজ। বন্ধুদের নয়।
এসব লোক সত্যের রাজপথ থেকে কেনো বিভ্রান্ত হলো? একথাও এখানে বুঝে নিতে হবে। তাদের সত্যপথ থেকে সরে যাবার কারণ শুধু একটা, আর তাহলো তারা আল্লাহর নাযিল করা আয়াতের উপর নিজেদের ধারণা বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দিয়েছে আর আল্লাহর হুকুমকে ছেড়ে দিয়ে প্রবৃত্তির খেয়াল খুশীর অনুসারী হয়ে পড়েছে। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিরই ইচ্ছা আগ্রহ তার নিজের বিশেষ স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী হয়ে থাকে। স্নেহ ভালোবাসার ছোঁয়া থেকে কোনো হৃদয় খালি থাকে না। এ এক অতি সত্য কথা। এভাবে এটাও সত্য কথা যে, যে ভাবের ও যে ধরনেরই কোনো লোকের মনে স্নেহ ভালোবাসা বিদ্যমান থাকবে, সে অনুযায়ীই তার রুচিপ্রবৃত্তিও তার মধ্যে পাওয়া যাবে। যেমন একজন মু'মিনের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের রুচি প্রকৃতি পাওয়া যায় যা অন্যের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে না। একথার চিত্র একটি সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
ثلث مَنْ كُنْ فِيهِ وُجِدَ حَلَاوَةُ الْإِيْمَانِ - مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سواهما ومن كان يحب المرء لا يحبه إلا لله ومن كان يكره أن يرجع في الكفر بعد أن أنقذه الله منه كما يكره أن يلقى في النار -
"যে ব্যক্তির হৃদয়ে তিনটি জিনিস মওজুদ থাকবে সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে: এক. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট দুনিয়ার সকল জিনিস থেকে বেশী প্রিয় হবেন। দুই. যাকে সে ভালোবাসবে শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে। তিন. কুফরী হতে বের হয়ে আসার পর আবার সে দিকে ফিরে যাওয়াকে সে এমন ভাবে অপসন্দ করবে যেমন তাকে আগুনে ফেলে দেয়াকে সে অপসন্দ করে।"
এ ধরনের আর একটি হাদীসও আছে:
ذَاقَ طَعْمُ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبَّا وَبِالْإِسْلَامِ دِيْنًا وَبِمُحَمَّدٍ نَّبِيًّا -
"ঈমানের স্বাদ সে ব্যক্তিই আস্বাদন করেছে যে আল্লাহকে 'রব' 'ইসলামকে' দীন এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছে।"
ঠিক এভাবে কাফির, বেদআতী ও নক্স পূজারীদের প্রত্যেকের মধ্যে নিজ নিজ ইচ্ছা আগ্রহ ও চাহিদা মোতাবিক একটি বিশেষ ঝোঁক প্রবণতা পাওয়া যায়। সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, 'এটা কেমন কথা যে, যাদের দীন ও ঈমান শুধু তাদের নক্সের খাহেশ মুতাবিক হয়, তারাও তাদের এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তাকে খুব বেশী ভালোবাসে?' তিনি জবাব দিলেন, তোমাদের কি আল্লাহ তা'আলার এ কথা স্মরণ নেই যে, তিনি বলেছেন:
وَأَشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ - - البقرة : ٩٣
"তাদের কুফরীর কারণে তাদের হৃদয়ে গোবাছুরের ভালোবাসা দৃঢ়- ভাবে বসে গিয়েছিলো।"-সূরা আল বাকারা: ৯৩
মূর্তিপূজারীদেরও এ একই অবস্থা। তাদের মনেও দেব-দেবীর গভীর ভালোবাসা ও আস্থা পাওয়া যায়। কুরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِ اللَّهِ ، وَالَّذِينَ امَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ - - البقرة : ١٦٥
"(আল্লাহর একত্ব প্রমাণকারী এসব সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও) কিছু লোক এমন আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অপর শক্তিকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ ও সমতুল্য মনে করে এবং তাদেরকে এমনভাবে ভালোবাসে যেমনভাবে ভালোবাসা উচিত একমাত্র আল্লাহকে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা সর্বাধিক ভালোবাসে আল্লাহকে।"-সূরা আল বাকারা: ১৬৫
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَ هُمْ ، وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ - القصص : ٥٠
"এখন তারা যদি তোমার এ দাবী মেনে না নেয় তাহলে বুঝে নিবে, এরা আসলে নিজেদের কামনা বাসনারই অনুগামী। আর সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক ভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর হেদায়াত বাদ-দিয়ে শুধু নিজের কামনা বাসনার অনুগমন করে।"-সূরা আল কাসাস : ৫০
أَنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّnَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنْفُسُ ، وَلَقَدْ جَاءَ هُمْ مِنْ رَبِّهِمُ الْهُدَى
"এরা শুধু তাদের ধারণা ও নফসের খায়েশ পূরণের তাড়নায় ব্যস্ত। অথচ তাদের নিকট তাদের 'রবে'র তরফ থেকে হেদায়াত এসে পৌঁছেছে।"-সূরা আন নাজম: ২৩
তাই বুঝা গেলো প্রত্যেক ব্যক্তির ঝোঁক প্রবণতা ও স্বভাব প্রকৃতি তার বিশেষ আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী গড়ে উঠে। আর শুধু ঝোঁক প্রবণতা দ্বারা প্রকৃত সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করার অধিকার দেয়া যায় না। কিন্তু এ নামসর্বস্ব পথের দিশারী আলেমদের অবস্থা হলো 'এই, যাদের দলিল প্রমাণ পেশ করার ধরন সম্পর্কে আমরা এখন আলোচনা করছি। এদের আকীদা ও আমলের 'কেবলানামা' স্বয়ং তাদের রুচি ও প্রবৃত্তির আকর্ষণ বই আর কিছু নয়। এ কারণেই এরা সাধারণত রাগ-অনুরাগ ও বাদ্য- বাজনার পাগল হয়ে থাকে। তাদের মতে বাদ্য-বাজনা, রাগ-অনুরাগ মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করে। এর দ্বারা স্বাভারিক ভালোবাসার জবা মনে উপচে উঠে। আর এ স্বাভাবিক প্রেমপ্রীতি শুধু ঈমানদারদের মধ্যে পাওয়া যায় না বরং আল্লাহ পূজারী, মূর্তি পূজারী, নফস পূজারী, দেশ পূজারী, জাতি পূজারী, নারী পূজারী, রাজা বাদশাহ পূজারী সহ সকলেই সমানভাবে এর মধ্যে শরীকদার। কারণ কোনো মনই ভালোবাসা হতে খালি নয়। এজন্য যার হৃদয়ে যে অনুরাগ থাকবে- গানের লহরী, বাদ্যের উতালতা ও সূরের মূর্ছনা তার সেই অগ্নিশিখাকে তেজোদ্দীপ্ত করে তুলবে। একথা প্রকৃতপক্ষে মোটেই সত্য নয় যে, গান ও সুরের লহরী শুধু ঈমানদারদেরকে আলোড়িত করে এবং অন্যান্য বস্তুর অলোবাসাকে জাগিয়ে দেয় না।
এসব লোক নিজেদের অভিপ্রায় ও অভিরুচির প্রতি এত আসক্ত ও বিশ্বস্ত যে, এর তুলনায় কুরআন ও সুন্নাতের হিদায়াতের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। অথচ আল্লাহ যে তাঁর ইবাদাতের তাবলীগের জন্যই দুনিয়াতে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর আনুগত্যের তালকীন দেয়াই যে আম্বিয়ায়ে কেরামকে দুনিয়ায় প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য তার বিপরীত পথে দীনে হকের পায়রুবী করা যায় না সে কথা খুবই স্পষ্ট। সেটা তো মূলত শুধু নিজের নক্সের খাহেশেরই পায়রুবী হতে পারে।
তিন: তৃতীয় শ্রেণীর লোক তারা, যারা এ দলের সবচেয়ে বেশী ইয্যত ও মর্যাদার অধিকারী। এসব লোক দীনের সাধারণ ফরয কাজগুলো পালন করেন ও হারাম কাজসমূহ হতে বেঁচে থাকার ব্যাপারে পুরোপুরি-ভাবে আল্লাহর হুকুম মানেন। কিন্তু তাদের ভ্রান্তি হলো, কার্যকারণ পরম্পরায় গ্রথিত জগতে বসবাস করেও তার প্রতি কোনো লক্ষ্য আরোপ করেন না। বরং এড়িয়ে চলেন। অথচ এসব কার্যকারণও প্রকৃতপক্ষে ইবাদাতের শামিল। তাদের এ কর্মপদ্ধতি বা আমলের ভিত্তি হলো তাদের এ ধারণা যে, যখন কোনো আরেফ কামেল তাকদীর সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত হয়ে যান, তখন তিনি আর এর মুখাপেক্ষী থাকেন না। তারপক্ষে আর কোনো চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবার প্রয়োজন হয় না। এমন কি তাঁদের মধ্যে তো কেউ কেউ পরিষ্কারভাবে বলে যে, 'তাওয়াক্কুল' (অর্থাৎ কোনো কাজে নিজের সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর পরিণাম পরিণতি আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়া) এবং দোয়া ও এ ধরনের অপরাপর ঈমানী গুণাগুণ আল্লাহর খাস বান্দাদের জন্য নয়। বরং এসব হলো সাধারণ মানুষের মান। কারণ, যে ব্যক্তি তাঁর নিজের চোখে তাকদীর অবলোকন করে ফেলেছে সে তো জেনেই গেছে যে, অমুক জিনিস 'তাকদীর লিপিতে' লেখা হয়ে গেছে। এবং তা অমুক সময়ে প্রকাশ হয়েই পড়বে। অতপর তার পক্ষে আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবার কি প্রয়োজন বাকী থাকে? স্মরণ রাখতে হবে, এটাও একটি বিরাট বিভ্রান্তি। কারণ আল্লাহ পাক বস্তুকে তার কার্যকারণের সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই পরিণতিকে তার কার্যকারণ থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন সায়াদাত (সৌভাগ্য) ও শাকাওয়াত (দুর্ভাগ্য)-কে কার্যকারণের সাথে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যেমন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ لِلْجَنَّةِ أَهْلاً خَلَقَهَا لَهُمْ وَهُمْ فِي أَصْلَابِ آبَائِهِمْ وَيَعْمَلُ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَعْمَلُونَ وَخَلَقَ لِجَهَنَّمَ أَهْلاً خَلَقَهَا لَهُمْ وَهُمْ فِي أَصْلَابِ آبَائِهِمْ وَيَعْمَلُ أَهْلَ جَهَنَّمَ يَعْمَلُونَ - احمد، مسلم، ابو داؤد
"কিছু লোককে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের পিতার ঔরষে থাকাকালীনই তাদের জন্য এ জান্নাত তৈরি করে রাখা হয়েছে। আর তারাও জান্নাতবাসীদের মতই আমল করে থাকে।
এভাবে কিছু লোককে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতৃপুরুষের ঔরষে থাকা অবস্থায়ই তাদের জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। তারাও জাহান্নামের অধিবাসীদের মতো আমল করে থাকে।"-বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ
অন্য আর একটি হাদীসে আছে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামকে জানালেন যে—
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْمَقَادِيرَ - "আল্লাহ প্রত্যেকের তাকদীর লিখে রেখেছেন; তখন তাঁরা আরজ করলেন।"
يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نَدْعُ الْعَمَلَ وَنَتَّكِلُ عَلَى الْكُتُبِ .
"হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আমল করা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর বিধিলিপির উপর ভরসা করব?"
তখন রাসূল (স) উত্তরে বললেন:
لَا اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرٍ لِمَا خُلِقَ لَهُ - أَمَّا مَنْ كَانَ أَهْلُ السَّعَادَةِ فَسَيَسِّرُ لِعَمَلِ أَهْلِ السَّعَادَةِ وَأَمَّا مَنْ كَانَ أَهْلُ الشَّقَاوَةِ فَسَيَسِّرُ لِعَمَلِ أَهْلِ الشَّقَاوَةِ - بخاری و مسلم
"না এমন করো না। বরং আমল করো। কেননা যে কাজ তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে সে কাজ করা তার জন্য সহজ করে দেয়া হয়। নেক ব্যক্তির জন্য নেক কাজের ও বদ লোকের জন্য বদ কাজের পথ সুগম করে দেয়া হয়।"-বুখারী ও মুসলিম
এর দ্বারা বুঝা গেলো যে, আল্লাহ তা'আলা যেসব কার্যকারণ ও উপায় অবলম্বন করার জন্য তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তা স্বয়ং ইবাদাতের মর্যাদা রাখে। আর তাওয়াক্কুলের যে সম্পর্ক, তার উৎসতো ইবাদাতের সাথে পুরোপুরিভাবেই সম্পর্কিত। নীচে দেয়া কুরআনের আয়াতের শব্দসমূহ ও বর্ণনাভঙ্গির প্রতি লক্ষ্য করুন।
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ - هود : ۱۲۳
"অতএব তাঁর ইবাদাত করো এবং তার উপর ভরসা করো।"
-সূরা হুদ : ১২৩
قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ رعد : ٣٠
"বলুন তিনি আমার রব। তিনি ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। আমি তাঁর উপর ভরসা করেছি। তাঁর নিকটেই আমাকে ফিরে যেতে হবে।"-সূরা আর রা'দ: ৩০
হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম বলেছেন:
عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَالَيْهِ أُنِيبُ - هود : ۸۸
"তাঁর উপর আমি ভরসা করি এবং তাঁর 'দিকেই আমরা ফিরে যাবো।”-সূরা হুদ: ৮৮
চার : চতুর্থ প্রকার লোক হলো তারা, যারা দীনের ফরয বিধানসমূহ মেনে চলে। কিন্তু মুস্তাহাব ও নফল কাজের প্রতি যত্নশীল হয় না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওই হিসেবে তাদের মর্যাদা, ত্রুটি ও কমতি এসে যায়।
পাঁচ: পঞ্চম হলো ওরা, যারা কাল্ফ ও কারামতের বাতেনী শক্তি অর্জন করার নামে আত্ম-প্রবঞ্চনার শিকার হয়। ইবাদাত বন্দেগী করা হতে তারা বেপরওয়া হয়ে যায়। আল্লাহর শোকর আদায় করারও প্রয়োজন মনে করে না।
উপরে আলোচিত এসব গোমরাহী এবং এ ধরনের আরো অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি সুলুকপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। এসব ত্রুটি থেকে আত্মরক্ষার পথ একটাই। আর সে পথ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেসব কাজ সহকারে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে সেসব কাজ খুবই পাবন্দীর সাথে আদায় করতে থাকা।
ইমাম যুহরী এ সত্যের দিকেই ইংগিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের অতীতের বুযুর্গগণ বলতেন, মযবুত করে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার মধ্যেই নাজাত নিহিত। প্রকৃতপক্ষে এটা এমন একটা মহাসত্য যার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। ইমাম মালিক (র)-এর মতে সুন্নাতের দৃষ্টান্ত হলো-হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কিস্তির মতো। যে ব্যক্তি এ কিস্তিতে উঠে বসতে পেরেছেন তিনিই মুক্তি পেয়েছেন। আর যে ব্যক্তি এ কিস্তি হতে দূরে থেকেছে সে নির্ঘাত পানিতে ডুবে মরেছে।
কুরআন ও হাদীসে ব্যবহার করা- 'ইবাদাত' 'এতায়াত' 'ইসতেকামাত' 'লুঘুমে সিরাতে মুসতাকীম' ইত্যাদি শব্দগুলোর অর্থের মধ্যে পার্থক্য খুব কমই। পার্থক্য শুধু নামে এবং ব্যাখ্যায়। এসব নাম ও অর্থের বাস্তব অস্তিত্ব প্রকৃতপক্ষে দুটো জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথমতঃ মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বন্দেগী করবে। আর দ্বিতীয় হলো, এ বন্দেগী শুধু আল্লাহর নাযিল করা ও বলে দেয়া পদ্ধতিতেই করতে হবে। নিজের মনগড়া কোনো পথে ও পদ্ধতিতে নয়। কুরআনের এসব আয়াতেও হেদায়াতের পথ সুস্পষ্ট:
(১) فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أحَدًا - الكهف : ۱۱۰
(১) “অতএব যে তার রবের সামনে হাজির হবার আশা রাখে; সে যেন নেক আমল করে। আর তাঁর বন্দেগীতে কাউকে শরীক না করে।”-সূরা আল কাহাফ: ১১০
(২) بَلَى وَ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِنْدَ رَبِّهِ مِن
(২) “(বস্তুত তোমাদের বা অন্য কারো বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।) বরং সত্য কথা হলো এই যে, যে ব্যক্তিই নিজের সত্তাকে আল্লাহর আনুগত্যে পরিপূর্ণভাবে সোপর্দ করে দেবে এবং কার্যত সত্য-নিষ্ঠা অবলম্বন করবে, তার জন্য তার রবের নিকট প্রতিদান রয়েছে।”-সূরা আল বাকারা: ১১২
(৩) وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ، وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلا - النساء : ١٢٥
(৩) “যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে মাথা অবনত করে দিয়েছে ও নিজের জীবন চলার পথ সততা সহকারে সম্পন্ন করে এবং সম্পূর্ণ একমুখী ও একনিষ্ঠ হয়ে ইবরাহীমের পথ অনুসরণ করে, সেই ইবরাহীমের পথ থেকে আল্লাহ তা'আলা বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন— তার চেয়ে উত্তম জীবন যাপনের পথ আর কার হতে পারে?”-সূরা আন নিসা: ১২৫
এ তিনটি আয়াতকে একটির আলোকে অপরটিকে দেখলে বুঝা যাবে যে, প্রথম আয়াতে যে জিনিসকে 'আমলে সালেহ' বলা হয়েছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে সে জিনিসকে 'ইহসান' বলা হয়েছে। এর অর্থ আমলে সালেহ-এর অপর নামই হলো 'ইহসান।' ইহসানের অর্থ হলো 'হাসানাত' পালন করে চলা। আর 'হাসানাত' ওই সব জিনিসকে বলা হয় যেসব জিনিস আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পসন্দ করেন। ওই সব জিনিস আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পসন্দনীয়, যা করার জন্য তিনি হুকুম দিয়েছেন। অতএব ওই সব 'বিদআত' দীনের মধ্যে যার কোনো ভিত্তি ও প্রমাণ নেই সেসব বিদআত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট গ্রহণীয় হতে পারে না। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট যেসব কাজ গ্রহণীয় ও পসন্দীয় নয় সেসব কাজ হাসানাত ও আমলে সালেহ বলে গণ্য হতে পারে না। এসব কাজ ফিসক-ফুজুরি হিসেবেই স্পষ্টভাবে পরিচিত।
أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ ۖ وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
কুরআনের আয়াতে এ দুটি অংশে দীনের ইখলাসের ব্যাপারে হেদায়াত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর বন্দেগী হতে হবে একাগ্র, নিখুঁত এবং নির্ভেজাল। এ সময়ে আল্লাহর চিন্তা ছাড়া আর কারো চিন্তা বিন্দুমাত্রও মনে জাগবে না।
হযরত ওমর (রা) এভাবে দোয়া করতেন: "হে আমার আল্লাহ! আমার প্রত্যেকটি কাজ সৎ ও সঠিক এবং তোমারই জন্য করে দাও। এতে আর কাউকে অংশ দিও না।” ফুযাইল ইবনে আয়াজ (র) لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًاً আয়াতটির তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, আহসান শব্দের অর্থ হলো আখলাসু ও আসওয়াবু অর্থাৎ খালিস, সঠিকভাবে ও একান্তভাবে।
জিজ্ঞেস করা হলো, আখলাসু ও আসওয়াবু এর অর্থ কি? উত্তরে তিনি বললেন, আমল যদি একনিষ্ঠ হয়, কিন্তু সঠিক না হয় তাহলে তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় নয়। এভাবে আমল যদি সঠিক হয়, কিন্তু একনিষ্ঠ না হয় তাহলেও গ্রহণীয় নয়। আল্লাহর দরবারে ওই আমলই গ্রহণযোগ্য যা খালিসও আবার সঠিকও। খালিসের অর্থই আল্লাহর জন্য নিবেদিত, একনিষ্ঠ। আর সঠিক হবার অর্থ হলো, সুন্নাতে রাসূল অনুযায়ী হওয়া।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 জাবরিয়্যাদের ভ্রান্তি ও তার প্রতিকার

📄 জাবরিয়্যাদের ভ্রান্তি ও তার প্রতিকার


যেসব লোক প্রাকৃতিক বিধানকে মোশাহিদা করার পর এ মোশাহিদা দ্বারা প্রাকৃতিক ও শরীআতের বিধান ও আহকামের অনুসরণ করা বাধা মনে করেন অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও মোশাহিদাকে শরীআতের অনুসরণ বাদ পড়ে যাবার কারণ বলে মনে করে তারা বিভ্রান্তির বিভিন্ন স্তরে নিমজ্জিত।
এক : যারা বেশী বাড়াবাড়ী করার মত লোক তারা তো এটাকে সাধারণ নীতি বলে মনে করে। শরীআত বিরোধী যেসব কাজ করে, এসব কাজকে তারা তাকদীরের উপর ছেড়ে দেয়। এদের এ নীতি ইহুদী- নাসারাদের বিভ্রান্তিমূলক নীতির চেয়েও বেশী খারাপ। এদের কথাবার্তা সেইসব মুশরিকদের কথাবার্তার মতো যারা বলে :
لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ شَيْه - الانعام : ١٤٨ :
"যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষগণ শিরক করতে পারতাম না এবং কোনো জিনিসকে তার হুকুমের খিলাপ হারাম বলে নির্দিষ্ট করতাম না।" - সূরা আল আনআম : ১৪৮
বিশ্বের বুকে এদের মতো বিপরীতমুখী আচরণকারী আর কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না। যারা তাকদীরকে দোষ দিয়ে তদবীর থেকে বিরত থাকে, তারা বিপরীত পথেই চলে থাকে। কেননা তারা মানুষের ভালো মন্দ সকল ধরনের আমলের একই পরিণতি হবে, এটা মনে করে না। তাছাড়া সব ধরনের কাজকে এক সমান পসন্দের দৃষ্টিতে দেখাও তাদের জন্য সম্ভব নয়। বরং তারা যদি কেউ যুলুম করে অথবা কোনো যালিম ব্যক্তি সাধারণ লোকদেরকে কষ্ট দেয়, অথবা কোনো মানুষ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে ও মানুষের রক্ত ঝরায়, তাদের মান-ইজ্জত নষ্ট করে, এবং এভাবে অন্যান্য বিপজ্জনক ও হায়েনার মতো আচার-আচরণের কাজ করতে শুরু করে তাহলে এরা এসব যুলুমমূলক কাজের বিরোধিতার জন্য তৈরি হয়ে যায়।
তারা এ যালিম ও অশান্তি সৃষ্টিকারীদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। এ শাস্তি অন্যান্য যালিমদের জন্যও শিক্ষামূলক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এসব ঘটনার সময় তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে হয়, তাকদীর যদি ওযরই হয় তাহলে তোমরা কেনো কোনো ব্যক্তির অনিষ্ট ও খারাপ কাজের ব্যাপারে অস্থির, অতিষ্ট হয়ে উঠো? প্রত্যেক ব্যক্তিকেই যা সে করতে চায়, করতে দাও। কারণ যা সে করে তাকদীর অনুযায়ীই তো করে। যদি কাযা ও কদরকে এখানে তোমরা ওযর হিসেবে না মানো, তাহলে নিজের মূল দাবীকেই বাতিল হিসেবে মেনে নাও।
আসলে এ লোকেরা বাস্তব ক্ষেত্রে এ নীতির অনুসরণকারী মোটেই নয়। তারা নিজেদের কথায় অটল থাকে না। তাদের দৃষ্টি সবসময়ই তাদের নিজের স্বার্থসিদ্ধির প্রতিই নিবদ্ধ থাকে। যেখানেই তাদের স্বার্থ আদায় হয় সেখানেই তারা এ নীতিকে মেনে নেয়। আর যেখানে অবস্থা তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ায় সেখানেই তারা এ নীতিমালাকে এড়িয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্যেই একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি কত সঠিক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, "আনুগত্যের ব্যাপারে তোমরা কদরী হও আর পাপের সময় হও জবরী। যে সময় যে মত তোমাদের স্বার্থ পূরণ করে সে সময় তোমরা সে মত গ্রহণ করো।"
দুই : দ্বিতীয় প্রকার লোক তারা-যারা এ নীতিমালাকে সাধারণ নীতিমালা বলে মনে করে না, তারা এর ব্যবহারকে 'সাধারণ ও বিশেষ' এ. দু’ভাগে ভাগ করে থাকেন। তারা তাদের এ জ্ঞান গবেষণার জন্যে গর্ব অনুভব করেন। তাদের ধারণা, যেসব লোক শরীআতের আহকামের বাধ্যবাধকতায় আছে এবং যারা নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে এ অনুভূতি রাখে যে, তা তাদের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার অধীনে সংঘটিত হয়। কিন্তু ওইসব লোক শরীআত মেনে চলে না যারা মনে করে যে, সকল কাজকর্ম আল্লাহরই সৃষ্টি। তাতে তার নিজের কোনো অংশ বা দায়-দায়িত্ব নেই। বরং তাকে তা করতে বাধ্য হতে হয়'। এবং আল্লাহ তাদের মধ্যে অর্থাৎ তাদের অবস্থা ও কাজকর্ম ঠিক সেভাবে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করেন, যেমন প্রতিটি গতিমান বস্তুকে গতিদান করে থাকেন। মোটকথা, তাদের কথা হলো, ওইসব লোকের শরীআত মেনে চলার প্রয়োজন নেই—যারা আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কে অবগতি লাভ করে, তাদের কারো কারো ধারণা যে, হযরত খিষির এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।
উপরোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী এ ধরনের লোকদের কথাবার্তায় প্রকাশ পায় যে, তারা সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে। সাধারণ লোকদেরকে তো শরীআত মানতে বাধ্য মনে করে। কিন্তু বিশেষ লোকেরা বাধ্য নয়। তারপর তারা সাধারণ ও বিশেষ লোকদের মতই সংজ্ঞা বর্ণনা করে থাকে।
কখনো বলা হয়ে থাকে যেসব লোক প্রাকৃতিক বিধান উপলব্ধি করে এবং এ দর্শন পোষণ করে যে, মানুষের সকল কাজকর্মের মালিক স্বয়ং আল্লাহ। গোটা বিশ্ব তাঁরই ইচ্ছার অনুসারী, তাদেরকে শরীআত মেনে চলতে হবে না।
আবার কখনো কখনো বলে থাকে যে, যারা সত্যকে শুধু জানে কিন্তু প্রত্যক্ষ করে না এবং প্রত্যক্ষ করা ছাড়াই ঈমান পোষণ করে, তারাই শুধু 'শরীআতের আহকাম পালন করতে বাধ্য। তারা শরীআতের হুকুম না মেনে চলতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি এ সত্য উপলব্ধি করে ও একে প্রত্যক্ষ করে সে দীনের আহকাম মানতে বাধ্য নয়।
এর স্পষ্ট অর্থ হলো, এসব লোক আল্লাহর ইচ্ছার বাধ্যবাধকতা এবং তাকদীরের ফায়সালাকে শরীআতের বিধান মেনে চলার প্রতিবন্ধক বলে মনে করে। এ ধারণা এবং এ বিপজ্জনক গুমরাহীতে এমন সর লোক ফেঁসে আছে যাদেরকে জ্ঞান-গবেষণা ও মারেফাতের দিকপাল এবং তাওহীদের রহস্য উদ্‌ঘাটনকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাদের এ ভুল চিন্তার কারণ তারা বুঝতেই পারছে না যে, বান্দাহকে এমন কাজেরও নির্দেশ দেয়া যেতে পারে যে কাজের বিরোধিতা করা তার ভাগ্যে আগ থেকেই লিখা হয়ে গেছে। মুতাযিলা ছাড়াও অন্যান্য কাদরিয়ারাও তাদের মতো এ সত্যকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো, মুতাযিলারা শরীআতের বিধান মেনে চলা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জরুরী বলে মনে করে। এবং তাদের মধ্যে কেউ শরীআত মেনে চলা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা প্রতিটি জিনিসকে বেষ্টন করে আছে এবং বান্দার আমল আল্লাহর সৃষ্ট তা তাকদীরের সাথে সম্পর্কিত একথা তারা অস্বীকার করে। এদের মুকাবিলায় এসব লোকের অবস্থা হলো তারা কাযা ও কদরকে তো (তাকদীর) স্বীকার করে। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য শরীআত মেনে চলা জরুরী বলে তারা স্বীকার করে না এবং যারা তাকদীরকে মোশাহিদা করেছে তারা শরীআত মেনে চলা হতে মুক্ত।
এসব লোকদের মতে শরীআতের আহকাম মেনে চলা শুধু ওই সব লোকদের জন্য দরকার যারা প্রাকৃতিক বিধানের তাৎপর্য বুঝে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। আর যারা এ স্তর পর্যন্ত গিয়ে পৌছেছে তাদেরকে এরা শরীআতের আহকাম মেনে চলার ঊর্ধ্বে এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ দলের মধ্যে গণ্য করে। তাদের একথার স্বপক্ষে তারা কুরআনে কারীমের এ আয়াতে কারীমা পেশ করেন।
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ الحجر : ٩٩
"নিজের 'রবের' বন্দেগী কক্সে ইয়াকীন আসা পর্যন্ত।"
-সূরা আল হিজর : ৯৯
এ আয়াতের তারা মনগড়া ব্যাখ্যা করে বলেন 'ইয়াকীন' অর্থই হলো আল্লাহর ইচ্ছার জ্ঞান ও মোশাহিদা। কিন্তু এটা সরাসরি কুফরী বক্তব্য। ইসলামী নীতিমালার প্রতি সচেতনভাবে দৃষ্টি দিলে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে একথা ধরা পড়ে যে, বুদ্ধি-বিবেচনা বিদ্যমান থাকা পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকেই শরীআতের অনুসরণ করতে হবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এ থেকে কোনো ব্যক্তি কখনো এবং কোনো অবস্থাতেই বাদ ও মুক্ত হতে পারে না। অতএব যে ব্যক্তি দীনের এ সুস্পষ্ট নীতমালাকে জানে না, তাকে জানাতে হবে এবং বিস্তারিতভাবে তাকে বুঝাতে হবে। এভাবে বুঝিয়ে দেবার পরও যদি সে শরীআত অনুসরণ করে চলা দরকার নেই বলে বিশ্বাস করে তাহলে সে ব্যক্তি হত্যাযোগ্য।
এ ধরনের নাস্তিক্যবাদী কথা ও বিশ্বাসের অস্তিত্ব ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীগুলোতে বিদ্যমান ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীকালে এ ধরনের কথার বেশ প্রচলন হয়েছে, যেসব কথা আল্লাহ ও আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ ও শত্র“তার শামিল। এসব কথা নবীগণকেও মিথ্যাবাদী বলার শামিল। এসব আকীদা পোষণকারীরা যদি এসবের বাতিল হবার ব্যাপারে অবগত না থাকে এবং একথা মনে করে যে, আল্লাহর রাসূল ও অলি-আল্লাহদের মতো এই-ই ছিলো তাহলে তাদের দৃষ্টান্ত ওই ব্যক্তির মতো, যে বিশ্বাস পোষণ করে যে, নামায তার উপর ফরয নয়। কারণ তার মধ্যে এমন রূহানী, কামালিয়াত ও মনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যা থাকলে নামায পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। অথবা তার জন্য মদ এ কারণে হারাম নয়, কারণ তিনি ওই সব আল্লাহর খাস বান্দাদের মধ্যে গণ্য, শরাব পান করলে যাদের কোনো রূহানী ক্ষতি হয় না। অথবা খারাপ কাজ করা তার পক্ষে এজন্য জায়েয যে, সে সমুদ্রের মতো এতো বিরাট বিশাল বিস্তৃত যে, গুনাহর মতো কাজ তার গায়ে কোনো কাদা লাগাতে পারে না।
এটা একটা অনস্বীকার্য সত্য যে, এসব মুশরিক যারা আল্লাহর রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে, আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুকুম মুতাবিক চলা অপরিহার্য তা মানে না, চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের দু'টি মৌলিক ভুল আছে।
প্রথমটি হলো বিদআত, আর দ্বিতীয়টি হলো তাকদীর সম্পর্কে ভ্রান্ত যুক্তির আশ্রয় নেয়া। তারা এসব বিদআতকে (অর্থাৎ স্বরচিত আদর্শকে) নিজেদের ধর্মীয় জীবনের ভিত্তি হিসেবে নির্দিষ্ট করে যা শরীআতে ইলাহীর সরাসরি খিলাফ। আবার কখনো কখনো আহকামে ইলাহির পাবন্দীর বিরুদ্ধে তাকদীর সংক্রান্ত ভ্রান্ত যুক্তি খাড়া করে।
মুশরিকদের এ চরিত্র বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে কোনো না কোনো প্রকারে বিদ্যমান। চাই তা শরীআতের খিলাফ বিদআতের অনুসারী হোক, কিংবা হোক তাকদীর থেকে যুক্তি গ্রহণ করা। সর্বাবস্থায় এ দুটো দলই গুমরাহীর মধ্যে শামিল। সকল অবস্থায়ই মুশরিকদের সাথে তাদের আকীদাগত মিল একেবারেই স্পষ্ট। উপরে উল্লেখিত মুশরিকদের দুটি বৈশিষ্ট্যের একটি বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ তাকদীরের যুক্তির পক্ষে তাদের গ্রহণ করা কিছু কুরআনের আয়াত উপরে আলোচিত হয়েছে। তাই সেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে দেয়া প্রয়োজন মনে করি না। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ তাদের বিদআতী কাজ ও শরীআত বানানো কাজ, এসবের আলোচনা এবং খণ্ডন কুরআন মাজীদের অন্যান্য, জায়গাসহ সূরা আল আন'আম ও সূরা আল আরাফে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এসব জায়গায় বলা হয়েছে:
وَقَالُوا هَذِهِ أَنْعَامُ وَحَرْثُ حِجْرَةِ لَا يَطْعُمُهَا إِلَّا مَنْ نَّشَاءُ بِزَعْمِهِمْ وَأَنْعَامُ حُرِّمَتْ ظُهُورُهَا وَأَنْعَامُ لَا يَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا الْتِرَاءُ عَلَيْهِ .
"তারা বলে এসব জন্তু জানোয়ার ও এসব ক্ষেত খামার সুরক্ষিত। এসব শুধু তারাই খেতে পারে যাদেরকে আমি খাওয়াতে চাইবো। আসলে এসব বিধি-নিষেধ তাদের নিজেদেরই কল্পিত। এ ছাড়া কিছু জন্তু জানোয়ার এমন আছে যেগুলোর উপর সওয়ার হওয়া ও মাল বোঝাই করাকে হারাম করা হয়েছে, আর জন্তুর যবেহ করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। এসব কিছুই তারা আল্লাহকে মিথ্যা বানাবার জন্য বলছে।"-সূরা আল আনআমঃ ১৩৮
يبَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَنُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ - الاعراف : ۲۷
-- "হে বনী আদম! শয়তান তোমাদেরকে যেনো তার ফেতনায় ফেলতে না পারে। যেমন, তোমাদের মাতা-পিতা (আদম হাওয়া)-কে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিলো।"-সূরা আলু আরাফ: ২৭
وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ، قُلْ إِنَّ اللهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ * الاعراف : ۲৮
"এবং তারা (মুশরিক) যখন কোনো সুস্পষ্ট অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এসব কাজে লিপ্ত দেখতে পেয়েছি। আল্লাহ আমাদেরকে এসব কাজের হুকুম দিয়েছেন'।' হে নবী! তুমি বলো, আল্লাহ অশ্লীল কাজের হুকুম দেন না।"
আরো বলা হয়েছে:
قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ مَن وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ - الاعراف : ٢٩
"তাদেরকে বলো আমার 'রব' তো ন্যায় ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেন। আরো হুকুম দিয়েছেন একথার যে, তোমরা প্রতিটি সাজদা বা ইবাদাত আদায় করার সময় তোমাদের লক্ষ্য ঠিক রাখবে।"-সূরা আল আরাফ : ২৯
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ .
“(হে নবী!) তাদের বলো, আল্লাহর সৃষ্টি ওই সব রূপসৌন্দর্য যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য পয়দা করেছেন এবং পবিত্র জীবিকা-সমূহ কে হারাম করে দিয়েছেন?"-সূরা আল আরাফ: ৩২
আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّي الفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا bṭn وَالْإِثْمِ وَالْبَغْيِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَالَا تَعْلَمُونَ ﴿اعراف: ۳۳
“(হে মুহাম্মাদ!) তাদের বলো, আমার রব সমস্ত গোপন ও প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ হারাম করে দিয়েছেন। তিনি আরো হারাম করে দিয়েছেন গুনাহের কাজ ও সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কাজ। হারাম করে দিয়েছেন আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, যার স্বপক্ষে তিনি কোনো সনদ নাযিল করেননি। আল্লাহর নামে এমন কথা বলাও হারাম করেছেন যে কথার ব্যাপারে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।" -সূরা আল আরাফ : ৩৩
দুঃখের বিষয় এরপরও এরা তাদের মনগড়া বিদআতকে প্রকৃত সত্য বলে মনে করছে। আর এ সত্য পর্যন্ত পৌঁছার পথ তাদের নিকট ওই পদ্ধতি যার পরিচালক পথপ্রদর্শকরা শরীআতের বিধি-বিধানের অনুসারী নয়। বরং এসব ব্যাপারে অনুসরণ যা হয় তা শুধু মুশাহিদা।
'কদর'কে শরীআত না মানার যুক্তি হিসেবে পেশ করা প্রভৃতপক্ষে একটি ভাওতাবাজি। এসব যুক্তি শুধু প্রতিপক্ষকে লা জবার করে দেবার জন্য তারা ব্যবহার করে থাকে। নতুবা প্রকৃত ব্যাপার হলো, এসব ব্যাপারে তাদের ঝোঁকপ্রবণতা তাদের প্রবৃত্তির পূজা বই আর কিছু নয়। প্রবৃত্তির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই প্রকৃতপক্ষে তাদের দীনের মূল ভিত্তি। এ ব্যাপারে তারা ওই বিদআত পূজারী 'জাহমিয়া' ইত্যাদি কালাম শাস্ত্রবিদদের থেকে কিছুমাত্র পৃথক নয়। যারা তাদের মনগড়া এবং কিতাব ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিরোধী কথাবার্তাকে 'ইলমের মূল হাকীকত' বলে মনে করে। এদের এসব কথাবার্তার উপর ঈমান ও ইতেকাদ রাখা তাদের নিকট শরীআত দ্বারা প্রমাণিত সিদ্ধান্তসমূহ হতেও বেশী জরুরী। এজন্য তারা কুরআন ও সুন্নাহর দলীলকে প্রয়োজনে পরিবর্তন করে দেয়। অথবা স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে একে এড়িয়ে চলতে থাকে। না এটা তারা বুঝে, আর না এ ব্যাপারে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। বরং তারা বলে যে, আমরা তার ক্ষমা পর্যন্ত পৌছতে পারি না। তাই এসব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। অথচ কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের এসব আকীদা-বিশ্বাসের উপর তারা দ্বিধাহীনভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে। এদিকে একজন মোটা বুদ্ধির মানুষও এসব শুনে পরিষ্কার বুঝতে পারে যে, এসব ইসলামের নীতিমালার একেবারেই বিপরীত। কিন্তু এভাবে তারা কুরআন ও সুন্নাতের সিদ্ধান্তসমূহকে আল্লাহর জ্ঞানের হাওলা করে সকল শর্ত হতে মুক্ত হয়ে যাবার কৌশল অবলম্বন করে। এদিকে এদের নামমাত্র "জ্ঞানের উৎস” -এর যুক্তিবত্তার অবস্থা হলো, যদি এটাকে সঠিক জ্ঞান ও যুক্তিবৃত্তির আলোকে দেখা যায় তাহলে তার সবটাই অজ্ঞতা, মূর্খতা ও কুসংস্কার বলেই অনুভূত হবে। অবিকল অবস্থা এসব সালেকীনের (অগ্রবর্তীদের) ব্যাপারেও এদের শরীআত বিরোধী কথাবার্তা ধ্যান-ধারণাকে যদি যাচাই বাছাই করা যায় যাকে তারা অলি-আল্লাহদের হাকীকত বলে মনে করে তাহলে এসবই তাদের নিজেদের মনগড়া কথা এবং প্রকৃতির তাড়না বলেই প্রমাণিত হবে। এসব মেনে চলা আল্লাহদ্রোহী ও তার শত্রুদেরই কাজ। বন্ধুদের নয়।
এসব লোক সত্যের রাজপথ থেকে কেনো বিভ্রান্ত হলো? একথাও এখানে বুঝে নিতে হবে। তাদের সত্যপথ থেকে সরে যাবার কারণ শুধু একটা, আর তাহলো তারা আল্লাহর নাযিল করা আয়াতের উপর নিজেদের ধারণা বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দিয়েছে আর আল্লাহর হুকুমকে ছেড়ে দিয়ে প্রবৃত্তির খেয়াল খুশীর অনুসারী হয়ে পড়েছে। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিরই ইচ্ছা আগ্রহ তার নিজের বিশেষ স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী হয়ে থাকে। স্নেহ ভালোবাসার ছোঁয়া থেকে কোনো হৃদয় খালি থাকে না। এ এক অতি সত্য কথা। এভাবে এটাও সত্য কথা যে, যে ভাবের ও যে ধরনেরই কোনো লোকের মনে স্নেহ ভালোবাসা বিদ্যমান থাকবে, সে অনুযায়ীই তার রুচিপ্রবৃত্তিও তার মধ্যে পাওয়া যাবে। যেমন একজন মু'মিনের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের রুচি প্রকৃতি পাওয়া যায় যা অন্যের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে না। একথার চিত্র একটি সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ
ثلث مَنْ كُنْ فِيهِ وُجِدَ حَلَاوَةُ الْإِيْمَانِ - مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سواهما ومن كان يحب المرء لا يحبه إلا لله ومن كان يكره أن يرجع في الكفر بعد أن أنقذه الله منه كما يكره أن يلقى في النار -
"যে ব্যক্তির হৃদয়ে তিনটি জিনিস মওজুদ থাকবে সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে: এক. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট দুনিয়ার সকল জিনিস থেকে বেশী প্রিয় হবেন। দুই. যাকে সে ভালোবাসবে শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে। তিন. কুফরী হতে বের হয়ে আসার পর আবার সে দিকে ফিরে যাওয়াকে সে এমন ভাবে অপসন্দ করবে যেমন তাকে আগুনে ফেলে দেয়াকে সে অপসন্দ করে।"
এ ধরনের আর একটি হাদীসও আছে:
ذَاقَ طَعْمُ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبَّا وَبِالْإِسْلَامِ دِيْنًا وَبِمُحَمَّدٍ نَّبِيًّا -
"ঈমানের স্বাদ সে ব্যক্তিই আস্বাদন করেছে যে আল্লাহকে 'রব' 'ইসলামকে' দীন এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছে।"
ঠিক এভাবে কাফির, বেদআতী ও নক্স পূজারীদের প্রত্যেকের মধ্যে নিজ নিজ ইচ্ছা আগ্রহ ও চাহিদা মোতাবিক একটি বিশেষ ঝোঁক প্রবণতা পাওয়া যায়। সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, 'এটা কেমন কথা যে, যাদের দীন ও ঈমান শুধু তাদের নক্সের খাহেশ মুতাবিক হয়, তারাও তাদের এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তাকে খুব বেশী ভালোবাসে?' তিনি জবাব দিলেন, তোমাদের কি আল্লাহ তা'আলার এ কথা স্মরণ নেই যে, তিনি বলেছেন:
وَأَشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ - - البقرة : ٩٣
"তাদের কুফরীর কারণে তাদের হৃদয়ে গোবাছুরের ভালোবাসা দৃঢ়- ভাবে বসে গিয়েছিলো।"-সূরা আল বাকারা: ৯৩
মূর্তিপূজারীদেরও এ একই অবস্থা। তাদের মনেও দেব-দেবীর গভীর ভালোবাসা ও আস্থা পাওয়া যায়। কুরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِ اللَّهِ ، وَالَّذِينَ امَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ - - البقرة : ١٦٥
"(আল্লাহর একত্ব প্রমাণকারী এসব সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও) কিছু লোক এমন আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অপর শক্তিকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ ও সমতুল্য মনে করে এবং তাদেরকে এমনভাবে ভালোবাসে যেমনভাবে ভালোবাসা উচিত একমাত্র আল্লাহকে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা সর্বাধিক ভালোবাসে আল্লাহকে।"-সূরা আল বাকারা: ১৬৫
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَ هُمْ ، وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ - القصص : ٥٠
"এখন তারা যদি তোমার এ দাবী মেনে না নেয় তাহলে বুঝে নিবে, এরা আসলে নিজেদের কামনা বাসনারই অনুগামী। আর সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক ভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর হেদায়াত বাদ-দিয়ে শুধু নিজের কামনা বাসনার অনুগমন করে।"-সূরা আল কাসাস : ৫০
أَنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّnَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنْفُسُ ، وَلَقَدْ جَاءَ هُمْ مِنْ رَبِّهِمُ الْهُدَى
"এরা শুধু তাদের ধারণা ও নফসের খায়েশ পূরণের তাড়নায় ব্যস্ত। অথচ তাদের নিকট তাদের 'রবে'র তরফ থেকে হেদায়াত এসে পৌঁছেছে।"-সূরা আন নাজম: ২৩
তাই বুঝা গেলো প্রত্যেক ব্যক্তির ঝোঁক প্রবণতা ও স্বভাব প্রকৃতি তার বিশেষ আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী গড়ে উঠে। আর শুধু ঝোঁক প্রবণতা দ্বারা প্রকৃত সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করার অধিকার দেয়া যায় না। কিন্তু এ নামসর্বস্ব পথের দিশারী আলেমদের অবস্থা হলো 'এই, যাদের দলিল প্রমাণ পেশ করার ধরন সম্পর্কে আমরা এখন আলোচনা করছি। এদের আকীদা ও আমলের 'কেবলানামা' স্বয়ং তাদের রুচি ও প্রবৃত্তির আকর্ষণ বই আর কিছু নয়। এ কারণেই এরা সাধারণত রাগ-অনুরাগ ও বাদ্য- বাজনার পাগল হয়ে থাকে। তাদের মতে বাদ্য-বাজনা, রাগ-অনুরাগ মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করে। এর দ্বারা স্বাভারিক ভালোবাসার জবা মনে উপচে উঠে। আর এ স্বাভাবিক প্রেমপ্রীতি শুধু ঈমানদারদের মধ্যে পাওয়া যায় না বরং আল্লাহ পূজারী, মূর্তি পূজারী, নফস পূজারী, দেশ পূজারী, জাতি পূজারী, নারী পূজারী, রাজা বাদশাহ পূজারী সহ সকলেই সমানভাবে এর মধ্যে শরীকদার। কারণ কোনো মনই ভালোবাসা হতে খালি নয়। এজন্য যার হৃদয়ে যে অনুরাগ থাকবে- গানের লহরী, বাদ্যের উতালতা ও সূরের মূর্ছনা তার সেই অগ্নিশিখাকে তেজোদ্দীপ্ত করে তুলবে। একথা প্রকৃতপক্ষে মোটেই সত্য নয় যে, গান ও সুরের লহরী শুধু ঈমানদারদেরকে আলোড়িত করে এবং অন্যান্য বস্তুর অলোবাসাকে জাগিয়ে দেয় না।
এসব লোক নিজেদের অভিপ্রায় ও অভিরুচির প্রতি এত আসক্ত ও বিশ্বস্ত যে, এর তুলনায় কুরআন ও সুন্নাতের হিদায়াতের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। অথচ আল্লাহ যে তাঁর ইবাদাতের তাবলীগের জন্যই দুনিয়াতে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর আনুগত্যের তালকীন দেয়াই যে আম্বিয়ায়ে কেরামকে দুনিয়ায় প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য তার বিপরীত পথে দীনে হকের পায়রুবী করা যায় না সে কথা খুবই স্পষ্ট। সেটা তো মূলত শুধু নিজের নক্সের খাহেশেরই পায়রুবী হতে পারে।
তিন: তৃতীয় শ্রেণীর লোক তারা, যারা এ দলের সবচেয়ে বেশী ইয্যت ও মর্যাদার অধিকারী। এসব লোক দীনের সাধারণ ফরয কাজগুলো পালন করেন ও হারাম কাজসমূহ হতে বেঁচে থাকার ব্যাপারে পুরোপুরি-ভাবে আল্লাহর হুকুম মানেন। কিন্তু তাদের ভ্রান্তি হলো, কার্যকারণ পরম্পরায় গ্রথিত জগতে বসবাস করেও তার প্রতি কোনো লক্ষ্য আরোপ করেন না। বরং এড়িয়ে চলেন। অথচ এসব কার্যকারণও প্রকৃতপক্ষে ইবাদাতের শামিল। তাদের এ কর্মপদ্ধতি বা আমলের ভিত্তি হলো তাদের এ ধারণা যে, যখন কোনো আরেফ কামেল তাকদীর সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত হয়ে যান, তখন তিনি আর এর মুখাপেক্ষী থাকেন না। তারপক্ষে আর কোনো চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবার প্রয়োজন হয় না। এমন কি তাঁদের মধ্যে তো কেউ কেউ পরিষ্কারভাবে বলে যে, 'তাওয়াক্কুল' (অর্থাৎ কোনো কাজে নিজের সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর পরিণাম পরিণতি আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়া) এবং দোয়া ও এ ধরনের অপরাপর ঈমানী গুণাগুণ আল্লাহর খাস বান্দাদের জন্য নয়। বরং এসব হলো সাধারণ মানুষের মান। কারণ, যে ব্যক্তি তাঁর নিজের চোখে তাকদীর অবলোকন করে ফেলেছে সে তো জেনেই গেছে যে, অমুক জিনিস 'তাকদীর লিপিতে' লেখা হয়ে গেছে। এবং তা অমুক সময়ে প্রকাশ হয়েই পড়বে। অতপর তার পক্ষে আর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালাবার কি প্রয়োজন বাকী থাকে? স্মরণ রাখতে হবে, এটাও একটি বিরাট বিভ্রান্তি। কারণ আল্লাহ পাক বস্তুকে তার কার্যকারণের সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই পরিণতিকে তার কার্যকারণ থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন সায়াদাত (সৌভাগ্য) ও শাকাওয়াত (দুর্ভাগ্য)-কে কার্যকারণের সাথে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যেমন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ لِلْجَنَّةِ أَهْلاً خَلَقَهَا لَهُمْ وَهُمْ فِي أَصْلَابِ آبَائِهِمْ وَيَعْمَلُ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَعْمَلُونَ وَخَلَقَ لِجَهَنَّمَ أَهْلاً خَلَقَهَا لَهُمْ وَهُمْ فِي أَصْلَابِ آبَائِهِمْ وَيَعْمَلُ أَهْلَ جَهَنَّمَ يَعْمَلُونَ - احمد، مسلم، ابو داؤد
"কিছু লোককে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের পিতার ঔরষে থাকাকালীনই তাদের জন্য এ জান্নাত তৈরি করে রাখা হয়েছে। আর তারাও জান্নাতবাসীদের মতই আমল করে থাকে।
এভাবে কিছু লোককে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতৃপুরুষের ঔরষে থাকা অবস্থায়ই তাদের জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। তারাও জাহান্নামের অধিবাসীদের মতো আমল করে থাকে।"-বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ
অন্য আর একটি হাদীসে আছে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামকে জানালেন যে—
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْمَقَادِيرَ - "আল্লাহ প্রত্যেকের তাকদীর লিখে রেখেছেন; তখন তাঁরা আরজ করলেন।"
يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نَدْعُ الْعَمَلَ وَنَتَّكِلُ عَلَى الْكُتُبِ .
"হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আমল করা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর বিধিলিপির উপর ভরসা করব?"
তখন রাসূল (স) উত্তরে বললেন:
لَا اعْمَلُوا فَكُلُّ مُيَسَّرٍ لِمَا خُلِقَ لَهُ - أَمَّا مَنْ كَانَ أَهْلُ السَّعَادَةِ فَسَيَسِّرُ لِعَمَلِ أَهْلِ السَّعَادَةِ وَأَمَّا مَنْ كَانَ أَهْلُ الشَّقَاوَةِ فَسَيَسِّرُ لِعَمَلِ أَهْلِ الشَّقَاوَةِ - بخاری و مسلم
"না এমন করো না। বরং আমল করো। কেননা যে কাজ তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে সে কাজ করা তার জন্য সহজ করে দেয়া হয়। নেক ব্যক্তির জন্য নেক কাজের ও বদ লোকের জন্য বদ কাজের পথ সুগম করে দেয়া হয়।"-বুখারী ও মুসলিম
এর দ্বারা বুঝা গেলো যে, আল্লাহ তা'আলা যেসব কার্যকারণ ও উপায় অবলম্বন করার জন্য তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তা স্বয়ং ইবাদাতের মর্যাদা রাখে। আর তাওয়াক্কুলের যে সম্পর্ক, তার উৎসতো ইবাদাতের সাথে পুরোপুরিভাবেই সম্পর্কিত। নীচে দেয়া কুরআনের আয়াতের শব্দসমূহ ও বর্ণনাভঙ্গির প্রতি লক্ষ্য করুন।
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ - هود : ۱۲۳
"অতএব তাঁর ইবাদাত করো এবং তার উপর ভরসা করো।"
-সূরা হুদ : ১২৩
قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ رعد : ٣٠
"বলুন তিনি আমার রব। তিনি ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। আমি তাঁর উপর ভরসা করেছি। তাঁর নিকটেই আমাকে ফিরে যেতে হবে।"-সূরা আর রা'দ: ৩০
হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম বলেছেন:
عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَالَيْهِ أُنِيبُ - هود : ۸۸
"তাঁর উপর আমি ভরসা করি এবং তাঁর 'দিকেই আমরা ফিরে যাবো।”-সূরা হুদ: ৮৮
চার : চতুর্থ প্রকার লোক হলো তারা, যারা দীনের ফরয বিধানসমূহ মেনে চলে। কিন্তু মুস্তাহাব ও নফল কাজের প্রতি যত্নশীল হয় না। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওই হিসেবে তাদের মর্যাদা, ত্রুটি ও কমতি এসে যায়।
পাঁচ: পঞ্চম হলো ওরা, যারা কাল্ফ ও কারামতের বাতেনী শক্তি অর্জন করার নামে আত্ম-প্রবঞ্চনার শিকার হয়। ইবাদাত বন্দেগী করা হতে তারা বেপরওয়া হয়ে যায়। আল্লাহর শোকর আদায় করারও প্রয়োজন মনে করে না।
উপরে আলোচিত এসব গোমরাহী এবং এ ধরনের আরো অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি সুলুকপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। এসব ত্রুটি থেকে আত্মরক্ষার পথ একটাই। আর সে পথ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেসব কাজ সহকারে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে সেসব কাজ খুবই পাবন্দীর সাথে আদায় করতে থাকা।
ইমাম যুহরী এ সত্যের দিকেই ইংগিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের অতীতের বুযুর্গগণ বলতেন, মযবুত করে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরার মধ্যেই নাজাত নিহিত। প্রকৃতপক্ষে এটা এমন একটা মহাসত্য যার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। ইমাম মালিক (র)-এর মতে সুন্নাতের দৃষ্টান্ত হলো-হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কিস্তির মতো। যে ব্যক্তি এ কিস্তিতে উঠে বসতে পেরেছেন তিনিই মুক্তি পেয়েছেন। আর যে ব্যক্তি এ কিস্তি হতে দূরে থেকেছে সে নির্ঘাত পানিতে ডুবে মরেছে।
কুরআন ও হাদীসে ব্যবহার করা- 'ইবাদাত' 'এতায়াত' 'ইসতেকামাত' 'লুঘুমে সিরাতে মুসতাকীম' ইত্যাদি শব্দগুলোর অর্থের মধ্যে পার্থক্য খুব কমই। পার্থক্য শুধু নামে এবং ব্যাখ্যায়। এসব নাম ও অর্থের বাস্তব অস্তিত্ব প্রকৃতপক্ষে দুটো জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথমতঃ মানুষ একমাত্র আল্লাহরই বন্দেগী করবে। আর দ্বিতীয় হলো, এ বন্দেগী শুধু আল্লাহর নাযিল করা ও বলে দেয়া পদ্ধতিতেই করতে হবে। নিজের মনগড়া কোনো পথে ও পদ্ধতিতে নয়। কুরআনের এসব আয়াতেও হেদায়াতের পথ সুস্পষ্ট:
(১) فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أحَدًا - الكهف : ۱۱۰
(১) “অতএব যে তার রবের সামনে হাজির হবার আশা রাখে; সে যেন নেক আমল করে। আর তাঁর বন্দেগীতে কাউকে শরীক না করে।”-সূরা আল কাহাফ: ১১০
(২) بَلَى وَ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِنْدَ رَبِّهِ مِن
(২) “(বস্তুত তোমাদের বা অন্য কারো বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।) বরং সত্য কথা হলো এই যে, যে ব্যক্তিই নিজের সত্তাকে আল্লাহর আনুগত্যে পরিপূর্ণভাবে সোপর্দ করে দেবে এবং কার্যত সত্য-নিষ্ঠা অবলম্বন করবে, তার জন্য তার রবের নিকট প্রতিদান রয়েছে।”-সূরা আল বাকারা: ১১২
(৩) وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ، وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلا - النساء : ١٢٥
(৩) “যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে মাথা অবনত করে দিয়েছে ও নিজের জীবন চলার পথ সততা সহকারে সম্পন্ন করে এবং সম্পূর্ণ একমুখী ও একনিষ্ঠ হয়ে ইবরাহীমের পথ অনুসরণ করে, সেই ইবরাহীমের পথ থেকে আল্লাহ তা'আলা বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন— তার চেয়ে উত্তম জীবন যাপনের পথ আর কার হতে পারে?”-সূরা আন নিসা: ১২৫
এ তিনটি আয়াতকে একটির আলোকে অপরটিকে দেখলে বুঝা যাবে যে, প্রথম আয়াতে যে জিনিসকে 'আমলে সালেহ' বলা হয়েছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে সে জিনিসকে 'ইহসান' বলা হয়েছে। এর অর্থ আমলে সালেহ-এর অপর নামই হলো 'ইহসান।' ইহসানের অর্থ হলো 'হাসানাত' পালন করে চলা। আর 'হাসানাত' ওই সব জিনিসকে বলা হয় যেসব জিনিস আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পসন্দ করেন। ওই সব জিনিস আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পসন্দনীয়, যা করার জন্য তিনি হুকুম দিয়েছেন। অতএব ওই সব 'বিদআত' দীনের মধ্যে যার কোনো ভিত্তি ও প্রমাণ নেই সেসব বিদআত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট গ্রহণীয় হতে পারে না। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট যেসব কাজ গ্রহণীয় ও পসন্দীয় নয় সেসব কাজ হাসানাত ও আমলে সালেহ বলে গণ্য হতে পারে না। এসব কাজ ফিসক-ফুজুরি হিসেবেই স্পষ্টভাবে পরিচিত।
أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ ۖ وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
কুরআনের আয়াতে এ দুটি অংশে দীনের ইখলাসের ব্যাপারে হেদায়াত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর বন্দেগী হতে হবে একাগ্র, নিখুঁত এবং নির্ভেজাল। এ সময়ে আল্লাহর চিন্তা ছাড়া আর কারো চিন্তা বিন্দুমাত্রও মনে জাগবে না।
হযরত ওমর (রা) এভাবে দোয়া করতেন: "হে আমার আল্লাহ! আমার প্রত্যেকটি কাজ সৎ ও সঠিক এবং তোমারই জন্য করে দাও। এতে আর কাউকে অংশ দিও না।” ফুযাইল ইবনে আয়াজ (র) لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًاً আয়াতটির তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, আহসান শব্দের অর্থ হলো আখলাসু ও আসওয়াবু অর্থাৎ খালিস, সঠিকভাবে ও একান্তভাবে।
জিজ্ঞেস করা হলো, আখলাসু ও আসওয়াবু এর অর্থ কি? উত্তরে তিনি বললেন, আমল যদি একনিষ্ঠ হয়, কিন্তু সঠিক না হয় তাহলে তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় নয়। এভাবে আমল যদি সঠিক হয়, কিন্তু একনিষ্ঠ না হয় তাহলেও গ্রহণীয় নয়। আল্লাহর দরবারে ওই আমলই গ্রহণযোগ্য যা খালিসও আবার সঠিকও। খালিসের অর্থই আল্লাহর জন্য নিবেদিত, একনিষ্ঠ। আর সঠিক হবার অর্থ হলো, সুন্নাতে রাসূল অনুযায়ী হওয়া।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 একটি অভিযোগ ও তার জবাব

📄 একটি অভিযোগ ও তার জবাব


এখানে অভিযোগ করা যেতে পারে, যদি আল্লাহর পসন্দনীয় আমল ও গুণাবলী ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হয়, তবে কেনো কুরআন মাজীদে 'ইবাদাত' শব্দটির প্রতি অন্যান্য নেক আমল অথবা ভালো গুণাবলীকে আল্ফ করা হয়েছে? আল্ফ তো হলো একথার দলিল যে, মাতুফ ও মাতুফে আলাইহে দুটি পৃথক জিনিস। এক জিনিস নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলো-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ - الفاتحة : ٤
"হে প্রভু! আমরা তোমারই ইবাদাত করছি। আর তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি।"-সূরা আল ফাতিহা: ৪
فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ - هود : ۱۲۳
"অতএব তাঁরই ইবাদাত করো এবং তাঁর উপরে ভরসা করো।" -সূরা হুদ: ১২৩
أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ وَأَطِيعُونِ - نوح : ٣
"আল্লাহর বন্দেগী করো এবং ভয় তাঁকেই করো। আর আমার কথা মেনে চলো।"-সূরা নূহঃ ৩
প্রথম আয়াতে 'ইবাদাত' শব্দটির প্রতি "ইস্তেয়ানাত” (সাহায্য কামনা করা) শব্দটিকে, দ্বিতীয় আয়াতে "তাওয়াক্কুল” ও তৃতীয় আয়াতে "তাকওয়া” ও “এতায়াতে রাসূলকে” আল্ফ করা হয়েছে। এটা একথারই প্রমাণ যে, এসব জিনিস ইবাদাতের অংশ নয় বরং এর থেকে পৃথক নিজস্ব স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রাখে।
এসব অভিযোগ ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। একটি শব্দকে আর একটি শব্দের উপর "এবং" দ্বারা নির্দেশ করলে দুটি ভিন্ন জিনিস হয়ে যায়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। স্বয়ং কুরআনে কারীমে এমন অনেক বাক্য আছে যা এ অভিযোগ ভুল বলে প্রমাণ করে। যেমন:
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ - العنكبوت : ٤٥
"নিশ্চয়ই নামায অশ্লীলতা ও অসৎকাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।" -সূরা আল আনকাবুত : ৪৫
এ বাক্যটিতে 'ফাহশা' অশ্লীলতা শব্দের প্রতি 'মুনকার'শব্দটিকে 'এবং' দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। অথচ 'মুনকারের' মধ্যে ফাহশার অর্থ নিহিত এবং ফাহশা মুনকারের একটি অংশ বই কিছুই নয়। নিম্নের আয়াতটিও এ ধরণের:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبي - النحل : ٩٠
"নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার ও ইহসান অনুগ্রহ এবং আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করার নির্দেশ দেন।"-সূরা আন নাহল : ৯০
এ বাক্যটিতেও 'ইতায়িজিল কুরবা' (আত্মীয় স্বজন) শব্দটিকে 'আদল' ও ইহসান' শব্দের প্রতি সংযুক্ত করা হয়েছে অথচ আত্মীয় স্বজনকে আর্থিক সাহায্য করা আদল ও ইহসানেরই একটি রূপ।
এর আর একটি দৃষ্টান্ত:
وَالَّذِينَ يُمْسِكُونَ بِالْكِتٰبِ وَأَقَامُو الصلوة - - الاعراف : ۱۷۰
"যারা আল্লাহর কিতাবকে মযবুতভাবে ধারণ করে ও নামায় কায়েম করে।"-সূরা আল আ'রাফ: ১৭০
এখানে 'ইকামাতে সালাত' শব্দকে 'তামাসুক বিল কিতাবে'র সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ ইকামাতে সালাত 'তামাসসুক বিল কিতাবের'ই একটি রূপ শুধু নয় বরং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
এসব দলিল প্রমাণ দ্বারা একথাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, 'আতঙ্ক' সবসময় ভিন্নধর্মী কাজ বুঝাবার জন্যই ব্যবহৃত হয় না বরং অন্য উদ্দেশ্য বুঝাবার কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন কোনো সময় একটি শব্দের অর্থ অন্য আর একটি শব্দের অর্থের অংশ হিসেবে প্রকাশ পায়। কিন্তু এরপরও ঐ শব্দের উপর এ শব্দটিকে 'আতঙ্ক' করে দেয়া হয়। আর এ 'আফ্ফের' বা সংযুক্ত করা বাক্যের উদ্দেশ্য হলো যে, এভাবে এর উল্লেখের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ হয়ে যায়। এভাবে কখনো কখনো একটি শব্দ বিভিন্ন জায়গায় ক্ষেত্র বিশেষে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যদি তা একা নেয়া হতো তাহলে এর অর্থে স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা লাভ হতো। আর যদি অন্য কোনো শব্দের সাথে মিলিয়ে নেয়া হতো তাহলে তার বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট অর্থ হয়ে যেতো। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কুরআনের এ আয়াতে:
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أَحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ - البقرة : ۲۷۳
সূরা বাকারার এ আয়াতে 'ফকির' শব্দটিকে একা আনা হয়েছে। এভাবে 'মিসকিন' শব্দটি কুরআনে সূরা মায়েদার ৮৯ আয়াতে-
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسْكِينَ - المائدة : ٨٩
একা একা ব্যবহার হয়েছে। এতে ফকিরের অর্থও নিহিত আছে। কিন্তু এ দুটো শব্দই আবার যখন-সূরা তাওবার ৬০ আয়াতে
إِنَّمَا الصَّدَقْتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسْكِينِ - التوبة : ٦٠
পৃথক পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তখন উভয় শব্দের অর্থ পৃথক পৃথক ও সীমাবদ্ধ অর্থে রূপান্তরিত হয়েছে এবং উভয় শব্দই পৃথক পৃথক অর্থে ভাগ হয়ে গেছে।
এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি অর্থাৎ কোনো সাধারণ শব্দের উপর তার কোনো বিশেষ অংশকে সংযুক্ত করে দেবার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ইলমে বালাগাতের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর দিক দৃষ্টিগোচর হয়। এ ধরনের ব্যবহারে কোনো কোনো সময় বিশেষ কোনো শব্দের এমন কোনো বৈশিষ্ট্য ও দিক তুলে ধরা হয় যা সাধারণ শব্দের অন্যান্য অংশে পাওয়া যায় না।
বর্ণনার এমন ধরনের ভঙ্গি ও 'ইল্মে বালাগাতের' ব্যবহার বিধি কুরআন মাজীদের অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। উপরে কিছু আয়াত আমি বর্ণনা করে এসেছি। আরো কিছু দৃষ্টান্ত একটু বিস্তারিতভাবে পেশ করা হচ্ছে-
(۱) أَتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتٰبِ وَأَقِمِ الصَّلوةَ - - العنكبوت : ٤٥
"এ কিতাব যা ওহীর মাধ্যমে তোমার উপর নাযিল হয়েছে তা তিলাওয়াত করো আর নামায কায়েম করো।"-সূরা আল আনকাবৃত: ৪৫
এখানে 'তিলাওয়াত করো' অর্থ শুধু মুখে শব্দগুলো উচ্চারণ করাই নয়। বরং কুরআনের হুকুম-আহকামের অনুসরণ করাও এর মধ্যে শামিল। হযরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-সূরা বাকারার ১২১ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন:
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَبَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاوَتِه - - البقرة : ١٢١
"যে সব লোককে আমি কিতাব দান করেছি তারা একে যথাযথভাবে পড়ে।"-সূরা আল বাকারা: ১২১
অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত হারাম জিনিসকে হারাম মনে করে আর হালালকে হালাল বলে মানে। এর মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর উপর ঈমান পোষণ করে এবং মুহকাম আয়াতগুলোর উপর নিজের আমলের ভিত্তিস্থাপন করে।
"কুরআনের আহকামের" মধ্যে যেসব হুকুমের অনুসরণ করার জন্য এ আয়াতে হুকুম দেয়া হয়েছে তার মধ্যে গোটা শরীআতই শামিল। এটা খুবই সুস্পষ্ট কথা। নামাযও গোটা শরীআতের একটি অংশ। কিন্তু এরপরও এ আয়াতে তিলাওয়াতে কিতাব এর উপর ইকামাতে সালাতকে সংযুক্ত করে এটাকে বিশেষ যত্নের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্বারা যেন এর গুরুত্ব ও মহান মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।
সূরা আহযাবের ৭০ আয়াতে বলা হয়েছে :
(২) اتقوا الله وقولوا قولا سديداً الاحزاب : ۷۰
"আল্লাহকে ভয় করো এবং সরলভাবে কথা বলো।" -সূরা আল আহযাবঃ ৭০
(۲) اتقوا الله وابتغوا اليه الوسيلة - المائدة : ٣٥
"আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর সন্তুষ্টি ও সন্নিকটবর্তী হবার জন্য উপায় অনুসন্ধান করো।"-সূরা আল মায়েদা: ৩৫
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো এসব আয়াতে 'তাকওয়ার' উপর 'কাওলে সাদীদ' ও ইবতিগায়ে ওয়াসিলাকে আত্ফ বা সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ কাওলে সাদীদ ও ইবতিগায়ে ওয়াসিলা স্বয়ং তাকওয়ারই পরিপূরক অংশ ও এর শাখা। কিন্তু এসব গুণাগুণ দৃষ্টিতে রাখার পরও 'তাকওয়ার' সাধারণ হুকুমকে বিশেষভাবে আবার উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিশ্লেষণের আলোকে এখন এসব শব্দগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করুন, যেগুলোকে আপত্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত স্বরূপ পেশ করা হয়েছে। এগুলোকে "ইবাদাত” শব্দের উপর "তাওয়াক্কুল” ও “ইসতেআনাত" এবং "তাকওয়া” শব্দগুলোকে যদি সংযুক্ত হিসেবে নেয়া হয়ে থাকে তাহলে এ সংযুক্তির অর্থ অবশ্যই এ নয় যে, এসব জিনিস ইবাদাতের সীমারেখার বাইরে। বরং ব্যাপারটা হলো যদিও এসব জিনিস ইবাদাতেরই অংশ কিন্তু ইবাদাতের এই আম শব্দ ব্যবহারের পরে একে খাসভাবে এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে যেন 'আবেদের' চোখে এর একটি বিশেষ স্থান লাভ হতে পারে এবং 'আবেদ' যেন এসব ঈমানের গুণাগুণকে নিজের মধ্যে বেশী বেশী সৃষ্টি করার ফিকিরে ডুবে থাকে। কারণ এসব জিনিস বাকী সব ইবাদাতকে সঠিকভাবে পালন করার ব্যাপারে মৌলিকভাবে গুরুত্বের অধিকারী। এর সাহায্য ছাড়া কোনো ইবাদাতই আদায় হতে পারে না।

📘 ইবাদাতের মর্মকথা > 📄 সৃষ্টির কামিয়াবাতের মাপকাঠি

📄 সৃষ্টির কামিয়াবাতের মাপকাঠি


এ গোটা আলোচনা হতে এ সত্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষসহ যে কোনো সৃষ্টির জন্য কামালিয়াতে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হলো আল্লাহর ইবাদাত। যে বান্দাহর ইবাদাত যত বেশী উন্নত হবে তার মর্যাদা বা কামালিয়াত ততবেশী উন্নত হবে। আর যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে, আল্লাহর সৃষ্টির জন্যে ইবাদাত-বন্দেগীর স্তর পার হয়ে আরো সামনে অগ্রসর হয়ে যাওয়া সম্ভব অথবা কোনো সৃষ্টির জন্য কামালিয়াতের স্তরে পৌছা ইবাদাত ছাড়াও অন্য কোনো জিনিসের মাধ্যমে সম্ভব, তারা জিহালাত ও গুমরাহীর চরম অধপতনে গিয়ে পৌঁছেছে। এ ধরনের গুমরাহীর নীচে আর কোনো গুমরাহী নেই। এ আলোচনার প্রথম দিকে কুরআনের আয়াত দিয়ে আমি একথাগুলো বুঝিয়ে দিয়েছি। আমি বলেছি যে, আল্লাহ যখন তার কোনো নিকটতম বান্দাহকে প্রশংসামূলক শব্দ দিয়ে ডাকতে চান তখন তিনি তাকে 'আবদ' শব্দ দিয়ে ডাকেন। তার ইবাদাত বন্দেগীই তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ঠিক এভাবে যখন কারো নিন্দা ও বদনাম করা হয় তখন তার উপর আল্লাহর ইবাদাতের হক আদায় না করার অপরাধকেই এর কারণ হিসেবে বলা হয়। এ ব্যাপারটিকে কুরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যত নবী দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন সকলকেই এ 'ইবাদাত'-এর নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই তাঁর দাওয়াতের সূচনায় উম্মতকে ইবাদাত করার নির্দেশ দানের মাধ্যমেই শুরু করেছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00