📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 মুত্তাকিদের বিশেষ গুণ

📄 মুত্তাকিদের বিশেষ গুণ


আমাদের আলোচনা চলছিল পরকালের উপর বিশ্বাস সম্পর্কে। আল্লাহপাক বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ মুত্তাকিরা আখিরাতের উপর বিশ্বাস রাখে। তবে এই বিশ্বাস হতে হবে দৃঢ়। এমন দৃঢ় যে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। অস্বীকার করলেই আপনার ঈমান চলে যাবে। যেভাবে '১' সংখ্যাটি '২' সংখ্যা থেকে ছোট এবং '২' সংখ্যাটি '১' সংখ্যা থেকে বড়, এতে যেমন কারও কোনো সন্দেহ নেই; বরং সারা দুনিয়াবাসী এটার উপর একমত, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ এক এবং সত্য। এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। যেভাবে নবিজি বলেছেন, আল্লাহ এক, এটাও সত্য। জান্নাত-জাহান্নাম আছে, এটাও সত্য। আখিরাতও সত্য। আমরা যে মৃত্যুবরণ করব, এটাও সত্য। সুতরাং এসব সত্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস করে ঈমান আনলাম। তবে কেউ যদি এই 'মানা'র পাশাপাশি 'না-মানা'র ব্যাপারটিও অন্তরে ধারণ করে, তাহলে হবে না।

এখন কেউ এগুলো মানলো। যখন বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, আমি আল্লাহ মানি, নবি মানি, ইসলাম মানি, এ মুহূর্তে জান বাঁচানো ফরজ। বিপদ কেটে গেলে আবার আগের নাফরমানির জায়গায় চলে যায়। এটা কখনো দৃঢ় বিশ্বাস হতে পারে না। এটা সুবিধাবাদি বিশ্বাস। এ জন্য আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে ঈমান আনতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে।

মৃত্যু নিয়ে দুনিয়ার মানুষ সকলেই একমত যে, মৃত্যু একটি সত্য বিষয়। প্রাণিমাত্রই মৃত্যুবরণ করবে। ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলিম সকলেই এটা বিশ্বাস করে এবং অন্তর থেকেই এটা বিশ্বাস করে থাকে। এই যে একটা বিশ্বাস, আখিরাতের ব্যাপারেও এমন বিশ্বাস থাকতে হবে। আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাসের প্রমাণ রাখতে হবে বেশি বেশি সিজদাহ করার মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন,

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السُّجِدِينَ﴾

হে নবি, আপনি আপনার প্রভুর তাসবিহ পড়ুন এবং বেশি বেশি সিজদা করুন। এ জন্য আমরা বেশি বেশি সিজদা করব। নফল নামাজে একাকী দীর্ঘ সময় সিজদায় ব্যয় করব। সিজদা করলে আপনার শারীরিক অনেক ফায়েদা হবে। আপনি যখন দীর্ঘ সময় নিয়ে সিজদা করবেন, তখন আপনার শরীরের রক্তসঞ্চালন বেড়ে যাবে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে আপনার মাথা হালকা হবে। প্রেশার কন্ট্রোলে থাকবে। এ ছাড়া সিজদা হলো আল্লাহর সঙ্গে নৈকট্য লাভ এবং সম্পর্ক তৈরির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مَعَ الله وهو ساجد

সুতরাং সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। হাদিস শরিফে রাসুল ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মাধ্যম হলো তাকওয়া। আর তাকওয়া হলো গুনাহের বিপরীত। এ জন্য যে গুনাহ করে, সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়, আর গুনাহ থেকে দূরে থাকলে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। এভাবে বান্দা তাকওয়া অর্জন করে একপর্যায়ে ইয়াকিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার পর বান্দার ঈমান বা বিশ্বাসের যে অবস্থা হয়, সেই বিশ্বাসকে ইয়াকিন বলা হয়। এ জন্য মৃত্যুকেও ইয়াকিন বলা হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলে,

وَاعْبُدُ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ

ইয়াকিন আসার আগ পর্যন্ত তুমি তোমার প্রভুর ইবাদত করতে থাকো। এখানে ইয়াকিন মানে মৃত্যু।

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা বলে, 'ইয়াকিন হয়ে গেলে আর ইবাদত করা লাগে না।' এ কথা যারা বলে, তারা হলো ভন্ড, বাটপার। এরা কুরআনের তাফসিরের অপব্যখা করে। এদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

জাহান্নামে যাওয়ার কারণ

বান্দা যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে তার জাহান্নামে যাওয়ার মূল কারণগুলো কী হবে? জাহান্নামিরা যখন জাহান্নামে চলে যাবে, তখন জান্নাতিরা এদের লক্ষ করে বলবে, 'মা সালাকাকুম ফী সাকার?' কোন জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে এসেছে? তখন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কয়েকটি কারণ বলবে। তারা বলবে, لَمْ نَكُ مِنَ لْمُصَلِّينَ

আমরা নামাজি ছিলাম না, অর্থাৎ দুনিয়ায় থাকতে আমরা নামাজ আদায় করতাম না। এরপর وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ আমরা মিসকিন-অভাবীদের খাবার দিতাম না। وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ আমরা সমালোচকদের সঙ্গে সমালোচনা করতাম। রটনাকারীদের সঙ্গে রটনা করতাম।

এক ধরনের মানুষ আছে এমন, অন্যের বিরুদ্ধে কিছু না বললে যেন তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। সারাদিন কারো না কারো সমালোচনা করতে থাকাই তাদের কাজ। অন্যের দোষত্রুটি আর মন্দচর্চা না করলে তারা শান্তি পায় না। অথচ, অসাক্ষাতে কারো দোষচর্চা করাকে গিবত বলে। গিবত একটি জঘন্য কবিরা গুনাহ। নবিজি বলেছেন, গিবত করা মানে নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য ব্যাপার!

তারা যখন কারো গিবত করে, যখন অন্যের সমালোচনা করে, আর তাদের বলাহয়, ভাই! বাদ দিন, লোকটি সামনে নেই। আর কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা করলে গিবত হয়, তখন তারা বলে, আমি এই কথাগুলো তার সামনেও বলতে পারব। তারা ভাবে, যেকথা সামনে বলা যাবে, সেটা অসাক্ষাতে বললে বুঝি গিবত হয় না। অথচ, এটাই গিবত।

এখানে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তারা ভাবেন, কারো বিরুদ্ধে অহেতুক সমালোচনা করলে, তথা মিথ্যা বদনাম করলে সেটা গিবত হয়। সত্য সমালোচনায় গিবত হয় না। অথচ, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারো মধ্যে যদি আসলেই কোনো দোষ থাকে, তাহলে সেই দোষ তার অনুপস্থিতিতে করাকেই গিবত বলাহয়। আর সেই দোষ যদি তার মাঝে না থাকে, তাহলে সেটা হলো তুহমত। তুহমতও কবিরা গুনাহ।

জাহান্নামিরা সেদিন বলবে, আমার অবস্থা এমন ছিল, আমি আমার জীবনের সৌন্দর্যের ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলাম না, বরং অন্যের চিন্তায় আমার জীবনকে নষ্ট করেছি। সময় নষ্ট করেছি। হায়! তখন অন্যের চিন্তা না করে যদি নিজের চিন্তা করতাম, তাহলে আমার জীবন সুন্দর করতে পারতাম। তখন আমি আমার জীবনকে সুন্দর করার পিছনে কাটাইনি। পুরো জীবন অন্যের পিছনে পড়ে কাটিয়েছি।

সমাজে কিন্তু এমন মানুষ অনেক। আমাদের এমন স্বভাব থাকলে দূর করতে হবে। এই স্বভাব জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আপনারা মৌমাছি হন; কিন্তু মাছি হবেন না। মাছি কেবল দুর্গন্ধ বসে। যেখানে দুর্গন্ধ সেখানে তার জায়গা। ঠিক তেমনিভাবে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা কেবল অন্যের দোষ খুঁজে। এমন খোঁজাখুঁজি করবেন না। আল্লাহ দোষত্রুটি গোপন করে রেখেছেন, আপনি খুঁজবেন কেন? আপনাকে খুঁজতে বলেছে কে? এটা কি আপনার দায়িত্ব? আপনি আপনার নিজেকে সংশোধনের ব্যবস্থা করুন। কবি বলেন,

فسوف ترى إذا انكشف الغبار : أفرس تحت رجلك ام حمار যখন তোমার অন্তরচক্ষু খুলে যাবে, তখন জানতে পারবে তুমি ঘোড়ার উপর সওয়ার, নাকি গাধার উপর সওয়ার।

এ জন্য সাবধান! অন্যের চিন্তা নয়। গিবত করা ও গিবত শোনা সমপর্যায়ের গুনাহ। সুতরাং, আমরা গিবত তো করবই না, কেউ কারো গিবত করলে আমি সেটা শুনবও না। পারলে তাকে নিবৃত্ত করব, নাহয় সেখান থেকে সরে আসব।

আপনারা মাছি হবেন না, মৌমাছি হোন। মৌমাছি কেবল ফুলে বসে। পারলে মানুষের গুণগান আলোচনা করুন। আর গুণ আলোচনা না করতে পারলে দোষ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। মানুষের দোষচর্চা মারাত্মক অপরাধ। এই অপরাধে অনেকে জাহান্নামে যাবে।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 পরকালে বিশ্বাস

📄 পরকালে বিশ্বাস


ঈমানের অপরিহার্য অংশ হলো আখিরাতে বিশ্বাস। মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন এবং সে জীবনে বিশ্বাস করতে হবে। সুরা বাকারার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوْقِنُوْنَ 'এবং তারা আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস করে।' [সুরা বাকারা : ৩]

সেদিন জাহান্নামিরা বলবে, আখেরাতের ব্যাপারে আমাদের ধারণা ছিল না। বিশ্বাস ছিল না। তাই আমি চিন্তা করিনি। কবরে-হাশরে কী হবে, আমি ভাবিনি। আল্লাহ বলেন, وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَومِ الدِّينِ ‘(তারা বলবে) আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৬]

হাশরের দিন যখন আল্লাহ নেককারদের পুরস্কার আর বদকারদের শাস্তি দেবেন, ওই দিনের কথা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। দুনিয়ার পিছনে পড়ে আখিরাতকে ভুলে গিয়েছিলাম। আল্লাহ বলেন, حَتَّى اَثْنَا اليَقِينُ 'অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে।' [সুরা মুদ্দাসসির: ৪৭]

হঠাৎ করে মৃত্যু এসে গেল। এখানে ইয়াকিন অর্থ মৃত্যু। আর মৃত্যু যখন আসবে, নির্ধারিত সময়েই আসবে। এক সেকেন্ড আগেও না, এক সেকেন্ড পরেও না। আল্লাহ বলেন, فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ ﴾

অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না। [সুরা আরাফ: ৩৪]

যখন মৃত্যু আসবে এক সেকেন্ডও হেরফের হবে না। যে মুহূর্তে যাওয়ার দরকার তখনই প্রাণ পাখি উড়ে চলে যাবে, অথচ আমার কোনো খবর নেই। আমি তো গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হওয়া আসামি। যে কোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এটা হলো ইয়াকিন। যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। মৃত্যুকে তাই ইয়াকিন বলে।

ইয়াকিন তিন প্রকার: ১. ইলমুল ইয়াকিন, ২. হাক্কুল ইয়াকিন, ৩. আইনুল ইয়াকিন। এই তিন প্রকার ইয়াকিনের কথাই কুরআনে বর্ণিত আছে। ইলমুল ইয়াকিন হলো, বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। কেবল বিশ্বাস হলে হবে না, সঙ্গে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাগবে। আইনুল ইয়াকিন চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস। যেন সে নিজ চোখে দেখছে। আর, হাক্কুল ইয়াকিন বাস্তবতার মাধ্যমে বিশ্বাস। আল্লাহ বলেন, اَلْهُكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ

সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা তেমাদের মধ্যে পেয়ে বসেছে। যতক্ষণ-না তোমরা কবরে উপনীত হও। [সুরা তাকাসুর: ১-২]

অর্থাৎ, সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় তোমরা ব্যস্ত থাকবে, আর কবরের ডাক চলে আসবে। এখন তুমি যদি এসব জিনিস পেছনে ফেলে কবরে কী নিয়ে যাওয়া যায়, হাশরের ময়দানে কী নিয়ে উঠা যায়, কীভাবে জান্নাতে যাওয়া যায়, জাহান্নাম থেকে বাঁচা যায়, এগুলো নিয়ে চিন্তা করো, উপকরণ প্রস্তুত করো, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহ সুসংবাদ রেখেছেন। এরপর আল্লাহ বলেন, كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ

কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৩]

অর্থাৎ, সম্পদবৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া তোমার জন্য কখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু এমন সম্পদ, যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয়, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ

নেককারের জন্য উত্তম মাল কতইনা ভালো! কেউ যদি নেককাজে তার সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যক্তিকে নেককার বানিয়ে দেন। সুতরাং সম্পদ থাকলে সেটা যদি ভালো কাজে ব্যবহারের নিয়ত থাকে, তবে সম্পদ অর্জন দোষণীয় নয়। আর যে সম্পদ তোমাকে কবর ভুলিয়ে দেয়, হাশর ভুলিয়ে দেয়, জান্নাত ভুলিয়ে দেয়, জাহান্নাম ভুলিয়ে দেয়, আল্লাহ ভুলিয়ে দেয়, নবি ভুলিয়ে দেয়, এমন সম্পদ অর্জন দোষণীয়। তবে যে সম্পদের কারণে আল্লাহর ভালোবাসা বেড়ে যায়, নবির প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়, আখিরাতের সামানা তৈরি করা যায়, এটা হলো নি'মাল মাল বা উত্তম সম্পদ।

আল্লাহ বলেন, কাল্লা সাওফা তা'লামুন অর্থাৎ, যা করতেছ, তা অতিসত্বর তোমরা জানতে পারবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ধমক। হাশরের ময়দানে উপস্থিত হতেই হবে। সে দিন কয়েকটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না। আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাকে যে জীবন দিয়েছিলাম, তা কোন খাতে ব্যয় করেছ? এখন জবাব দাও। তোমার যৌবন কোন খাতে ব্যয় করেছ, জবাব দাও। তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছিলাম, তা কীভাবে অর্জন করেছ, কীভাবে ব্যয় করেছে, জবাব দাও। তোমাকে যে জ্ঞান দিয়েছিলাম, সেই জ্ঞান অনুযায়ী তুমি কতটুকু আমল করেছ, জবাব দাও। হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, কিয়ামতের দিন এই প্রশ্নসমূহের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ পা নাড়াতে পারবে না।

এ জন্য كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ বলে আল্লাহ একটি হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সে দিন তোমাদের খবর হবে। জানতে পারবে সব। এরপর আবারও ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,

ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ

তারপর কখনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। [সুরা তাকাসুর: ৪] অর্থাৎ, আমি আবারও বলছি, তোমাদের এ কাজ ঠিক হয়নি। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে, তোমরা যা করতে। পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন,

كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ

কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে। [সুরা তাকাসুর: ৫] অর্থাৎ, এটা করা কখনো ঠিক হয়নি। যদি তোমরা জানতে, ইলমুল ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞান যদি তোমরা অর্জন করতে, আল্লাহর কথা মানতে, নবির কথা বিশ্বাস করতে, তবে কখনো এমনটা করতে না। দুনিয়ার পিছে দৌড়াতে না; বরং আখিরাতের সামানা অর্জনের সচেষ্ট থাকতে। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সুতরাং এখানে তোমরা দুনিয়ার পিছনেও লাগতে পারো, আখিরাতের সামানাও অর্জন করতে পারো, এই সুযোগ রয়েছে। তবে বুদ্ধিমানের কাজ হলো আখিরাতের সামানা অর্জন করা। এক হাদিসে রাসুল ইরশাদ করেন,

الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ. وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ

যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে স্বীয় আয়ত্তাধীন রেখেছে এবং মৃত্যুর পরের জন্য নেকির পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত সফল ও বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে আল্লাহর প্রতি ক্ষমার আশা পোষণ করে, মূলত সে-ই অক্ষম (নির্বোধ)।

সত্যিকার বুদ্ধিমান হলো সে, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এবং এমন আমল করে, যে আমলের কারণে আখিরাতে নাজাত পায়। আল্লাহ বলেন,

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتْنِ

আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তার জন্য থাকবে দুটি জান্নাত। [সুরা আর-রাহমান: ৪৬]

সত্যিকার বুদ্ধিমানরা তাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নফস গুনাহ করতে চায় কিন্তু আল্লাহর ভয়ে করে না। আর আল্লাহর ভয়ে যে গুনাহ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে স্পেশাল দুটি জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেন। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ বলেন, যদি সে নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতো, অর্থাৎ, যদি বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হতো, তবে সে কখনো দুনিয়ার পিছনে ছুটত না। অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করত না; বরং হালাল পন্থায় প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনেই সে সন্তুষ্ট থাকত। আর এমন ব্যক্তি মৃত্যুর সাথে সাথেই জান্নাতে পৌঁছে যেত। পরের আয়াতে আল্লাহ আবারও ধমক দিয়ে বলেন,

لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ۞ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ ۞ ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ

অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। আবার বলি, তোমরা তা অবশ্য অবশ্যই দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাবে। তারপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা তাকাসুর: ৬-৮]

যারা শুধু দুনিয়া অর্জনের পেছনে হরদম মত্ত থাকতে, অবশ্যই অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। সেদিন তোমরা স্বচক্ষে জাহান্নাম দেখতে পাবে। অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে দুনিয়াতে দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।

মোটকথা, দুটি বিষয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, একটা হলো ইলমে ইয়াকিন বা বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে। অপরটি আইনুল ইয়াকিন বা চাক্ষুষ দেখার মাধ্যমে। অর্থাৎ, সে চাক্ষুষভাবে জান্নাত-জাহান্নাম দেখবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, দুনিয়াতে কীভাবে দেখবে? হাদিস শরিফে রাসুল বলেন, একজন মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার সামনে জান্নাত-জাহান্নাম পেশ করা হয়। সে যদি জান্নাতি হয়, তবে জান্নাত দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে, আর জাহান্নামি হলে জাহান্নাম দেখে দেখে মৃত্যুবরণ করে। এসময় তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তোমার নামে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, জাহান্নামও বরাদ্ধ ছিল। দুনিয়ার সকল মানুষের নামেই একটা জান্নাত এবং একটা জাহান্নাম রয়েছে। আবু জাহলের নামেও জান্নাতও আছে, জাহান্নামও আছে। ঠিক তমনিভাবে আবু বকরের নামেও জান্নাত এবং জাহান্নাম রয়েছে। কিন্তু আবু জাহল জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামই বেছে নিয়েছে। আর আবু বকর জাহান্নামের পরিবর্তে জান্নাত। তো এখন তার নামে যে জান্নাত বরাদ্ধ ছিল, সেটা কোথায় যাবে বা কে পাবে? এর উত্তর হলো, তার বরাদ্ধে থাকা জান্নাত তখন মুমিনকে বোনাস হিশেবে দিয়ে দেওয়া হবে।

এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, জাহান্নামিদের নামে বরাদ্ধ থাকা জান্নাত বোনাস হিশেবে জান্নাতিদের দান করা হবে। আর জান্নাতিদের নামে বরাদ্ধে থাকা জাহান্নাম তখন ওই জাহান্নামিদের দিয়ে দেওয়া হবে। এটা বোঝাতেই আল্লাহ 'জান্নাতান' বা দুটি জান্নাতের কথা বলেছেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বান্দার সামনে জান্নাত-জাহান্নামের পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরা হবে।

এখন যারা জান্নাতি, তাদের জান্নাত দেখতে পাওয়া- এই দেখা দুনিয়ার দেখা নয়, সেটা অন্যরকম দেখা। ফেরেশতারা তখন রেশমের রুমাল, জান্নাতি খুশবু ইত্যাদি নিয়ে আগমন করেন, তখন সে এসব দেখে হাসতে থাকে। আর জাহান্নামিরা মৃত্যুকালে জাহান্নাম দেখতে থাকে আর ভয় পেতে থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ (বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]

এ জন্য মৃত্যুপথযাত্রী জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পায় কিন্তু তার নিকটে থাকার পরও আমরা দেখতে পাই না। দুনিয়ার চোখ-কান দিয়ে তা দেখা এবং শোনা যায় না। যেভাবে আপনার সাথে ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি স্বপ্নে দেখছে যে, তাকে কুকুর দৌড়াচ্ছে। তাই পেরেশান হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু আপনি পাশে থাকার পরও এটা দেখতে পাননি। ঠিক তেমনিই হবে সাকারাতের সময়ের অবস্থা। এ জন্য সাকরাতের সময় যারা আপনজন, তারাই তার পাশে থাকবে। সেসময় অযথা কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি করা ঠিক নয়। কেননা, এর মাধ্যমে সে কষ্ট পায়。

সাকরাতের সময় আমাদের করণীয় কি, এ সম্পর্কে রাসুল ﷺ বলেন, لَقَّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ তোমরা মৃত্যুর দুয়ারে থাকা ব্যক্তির কানের কাছে গিয়ে কালিমা পাঠ করো। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ভুল করে থাকি। কালিমার পড়ার জন্য চাপ দিই। বলাতে চেষ্টা করি। না, এটা ঠিক নয়; বরং তার কানের কাছে শুধু কালিমা পড়তে থাকবেন। এখন সে যদি একবার কালিমা পড়ে নেয়, তবে আর বলবেন না। এবং এ অবস্থায়ই যদি সে মারা যায়, নবিজি ﷺ বলেন, এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। নবিজি ﷺ বলেন, من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة যার সর্বশেষ কথা হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতি। এ জন্য সাকরাতের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কার কখন কীভাবে মৃত্যু হবে, আল্লাহই ভালো জানেন। হে আল্লাহ, সাকরাতের সময় আমাদের শাস্তি দিয়ো না। ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যু নসিব করো। আমিন।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 শবে কদরের দুআ

📄 শবে কদরের দুআ


আমরা আবারও আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদেরকে কুরআন নাজিলের পবিত্র এ মাসে তাঁরই কালাম কুরআনচর্চায় নিয়োজিত রেখেছেন। আবারও বলি, আলহামদুলিল্লাহ। ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি যে, এই কুরআনের মাধ্যমে শুধু তারাই হিদায়ত লাভ করবে, যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে। আর তাকওয়া এমন একটি ভূষণ, যা পরিধান করে আল্লাহর সামনে যাওয়া যায়। এ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ বলেন,

لِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ আর তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম পোশাক। সুরা আরাফ: ২৬]

আজ ২৬ রমজান দিবাগত রাত। মানে ২৭ এর রাত। এ রাতকে আমরা আমাদের ধারণামতে শবে কদর মনে করে থাকি। তবে এই তারিখই যে কদরের রাত, এমনটা নিশ্চিত নয়; বরং সম্ভাবনা আছে। কেননা, আল্লাহর রাসুল রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর তালাশ করতে বলেছেন। এ হিশেবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখেও শবে কদর হতে পারে। এ জন্য শুধু ২৭-এর রাতকে নির্দিষ্ট না করে সব বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ الْفِ شَهْرٍ লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। [সুরা কাদর: ৩]

আমি প্রথমে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেছি, যাতে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলা হয়েছে। আয়াতটি হচ্ছে, লিবাসুত তাকওয়া, জালিকা খাইর। অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরিধান করতে বলেছেন। কেননা, এটি উত্তম পোশাক। জালিকা খাইর বলে এটাই বোঝানো হয়েছে। আর এই তাকওয়ার পোশাক, যা পরিধান করে বান্দা সহজেই আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

আল্লাহ যে তাকওয়ার পোশাকের কথা বলেছেন, এটার অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে, আমরা সাধারণত বিভিন্ন পোশাক পরিধান করে থাকি। ঠান্ডা বা শীত থেকে রক্ষা পেতে গরম উলের কাপড় বা মোটা কাপড় অথবা জ্যাকেট পরি। তেমনি গরম থেকে বাঁচতে হালকা-পাতলা পোশাক পরি। আবার যখন কাজ করি, তখন একধরনের পোশাক পরি এবং ইবাদত-বন্দেগি বা মসজিদে নামাজ পড়ার সময় ভিন্ন পোশাক পরি। সফরের সময় আলাদা পোশাক পরি। এটা মূলত স্থান-কাল-পাত্রভেদে আমরা পরিধান করে থাকি। আমাদের নবিজি তিন ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। একটা শুধু ঘরে অবস্থানের সময়, আরেকটা জুমুআর দিন, আরেক ধরণের পোশাক পরতেন মেহমান বা অতিথির সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।

আমরা যেমন কাজের সময় একধরনের পোশাক পরি, আবার নামাজের সময় অন্য পোশাক পরি। কাজের পোশাক পরে মসজিদে যাই না, আবার নামাজের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরে কাজ করি না। তেমনি গরমের সময় ঠান্ডার পোশাক আর ঠান্ডার সময় গরমের পোশাক পরি না; বরং যখন যেটা মানানসই, সেটাই পরিধান করি।

তো আমাদেরকে আল্লাহর সামনে যেতে হলেও একটা পোশাক বা ইউনিফর্ম পরতে হবে। আর সেটা হচ্ছে তাকওয়ার পোশাক। আপনি যদি জান্নাতে যেতে চান, অবশ্যই আপনাকে তাকওয়ার ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। লিবাসুত তাকওয়া বলে কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেটাই বলেছেন।

আল্লাহর সামনে যেতে হলে—যেতে হলে মানে—যেতে তো হবেই, আমাদেরকে তাকওয়ার পোশাক পরতে হবে। হাশরের ময়দানে সকলকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। যেখানে বাহ্যিক পোশাকের কোনো দাম থাকবে না; বরং তাকওয়া নামক পোশাকের মাধ্যমেই আমাদেরকে জান্নাতের অধিকারী হতে হবে। এ জন্য দুনিয়াতেও অনেক বড় বড় মুত্তাকি-পরহেজগারকে আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করিয়ে থাকেন।

সুতরাং বোঝা গেল, আপনার কাছে যদি তাকওয়ার পোশাক থাকে, তাহলে দুনিয়ার পোশাকের কোনো প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার মানুষ যদি আপনাকে উলঙ্গও করে দেয়, তবু আল্লাহর কাছে আপনার দাম কমবে না। দুনিয়াতে এভাবে কেউ কাউকে উলঙ্গ করেছে, এমন নজির আপনাদের জানা আছে কি? মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, তখন তাঁর শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। কিন্তু এরপরও তাঁর সম্মান কমেনি; বরং আল্লাহ তাঁর সম্মান আরও বাড়িয়ে ঘোষণা দেন,

﴿مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَتْكُمُ الْمُسْلِمِينَ﴾

এটাই তোমাদের পিতা ইবরাহিমের দ্বীন, আল্লাহ তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম। [সুরা হজ: ৭৮]

নমরুদের লোকেরা নবি ইবরাহিমের শরীরের পোশাক খুলে ফেললেও তাঁর তাকওয়ার পোশাক খুলতে পারেনি। কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষকে উলঙ্গ করে উঠানো হবে। তবে আল্লাহ সর্বপ্রথম দুজন মানুষকে পোশাক পরিয়ে কবর থেকে উঠাবেন। যে দুজনকে বিশেষভাবে সম্মানিত করবেন, তাদের একজন হলেন আমাদের নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অন্যজন হবেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম।

এখন প্রশ্ন হলো, তাকওয়ার পোশাক আপনি কোথায় পরবেন? এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, নবিজি-কে প্রশ্ন করা হলো, 'তাকওয়া কোথায়, তখন নবিজি উত্তর দিলেন, 'এখানে এখানে এখানে (এটা বলে তিনি তাঁর বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন)।

আপনারা পোশাক পরেন কেন? উত্তরে বলবেন, ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য। এই উদাহরণ আমেরিকা হিশেবে দেওয়া। ঠিক তেমনি আপনাকেও তাকওয়ার এমন পোশাক পরতে হবে, যাতে আপনার অন্তরে গুনার আঁচড় না পড়ে। এ জন্য আল্লাহ বলেন, তাকওয়ার পোশাক পরিধান করো, এটাই উত্তম পোশাক। তোমরা যেভাবে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে উপযুক্ত পোশাক পরো, সেভাবে অন্তরকে গুনাহের কাজ থেকে রক্ষা করতে তাকওয়ার পোশাক পরো। আয়াতে আল্লাহ 'উত্তম' শব্দ বলে যে উত্তম বুঝিয়েছেন, সেটা অবশ্যই আমাদের অর্জন করতে হবে। লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾

কদরের এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এখন আল্লাহর ভাষায় এই উত্তমের ব্যাখ্যা কী, সেটা আমাদের জানতে হবে। আমরা তো ২৭ তারিখে নির্ধারিত করে ফেলেছি। সেটা না করে যদি আমরা রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে শবে কদর সন্ধান করি, তাহলে নিশ্চিতভাবে কদরের বরকত আমাদের অর্জিত হয়ে যাবে। আর যদি কেউ তার জীবনে মাত্র একটি কদরও পেয়ে যায়, তাহলে প্রায় ৮৪ বছর একনাগাড়ে ইবাদত করে সে যে মর্যাদা লাভ করতে পারতো, মাত্র একরাতেই তা পেয়ে যাবে।

কদরের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। কদরের অর্থ সম্মান। আমরা যেমন শব্দটি ব্যবহার করি যে, অমুকের বাড়িতে গিয়েছিলাম কিন্তু তারা কোনো কদর করেনি। এটা সিলেটী একটা বাগধারা। এখন কেউ যদি বাস্তবেই লাইলাতুল কদরের সন্ধান করে এবং তা লাভ করতে পারে, তাহলে তার জীবন সফল। হাজার মাস ইবাদত করে সাওয়াব লাভ করতে পারত না, সেটা মাত্র এক রাতেই সে লাভ করে ফেলবে।

আম্মাজান হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি একবার নবিজির কাছে জানতে চান, 'আল্লাহর রাসুল, আমি যদি শবে কদর পেয়ে যাই, তাহলে কোন দুআ পড়ব?' নবিজি তখন বললেন, 'তুমি যদি শবে কদর পেয়ে যাও, তাহলে এই দুআ করবে, اللَّهمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي

হে আল্লাহ, আপনি মার্জনাকারী। আপনি মার্জনা করা পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে মার্জনা করুন।

শবে কদরের কিছু বাহ্যিক আলামত রয়েছে। যে রাত শবে কদর, সেই রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকবে, বেশি ঠান্ডাও হবে না, গরমও হবে না। যে রাত শবে কদর, সেই রাত অন্যান্য রাতের চেয়ে ইবাদতের প্রতি বেশি আগ্রহ তৈরি হবে। শরীর-মনেও একটা ভালোলাগা কাজ করবে। কেননা, শবে কদর যেদিন দিবাগত রাতে হবে, সে রাতে আসমান থেকে রহমতের ফেরেশতারা দলে দলে পৃথিবীতে আগমন করতে থাকেন। ফলে পুণ্যবানদের পদভারে জমিনের বাসিন্দারাও অন্যরকম একটা প্রশান্তি অনুভব করে। এ হচ্ছে বাহ্যিক আলামত।

নবিজি কর্তৃক আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকাকে শিখিয়ে দেওয়া শবে কদরের দুআ, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফউয়া, ফা'ফু আন্নি- এই দুআ শুধু আরবিতে করতে হবে, এমন নয়। বরং যেকোনো ভাষায় অর্থাৎ আপনার মাতৃভাষায়ও করতে পারেন। ভাষা হচ্ছে আল্লাহর দান। আর সারা পৃথিবীতে ভাষার বিচিত্র ব্যবহার রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে সাড়ে চার হাজারেরও অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। বলা হয়, প্রতি ১৬-১৯ মাইল পর পর ভাষার তারতম্য রয়েছে। এ জন্য, এক দেশের গালি অন্য দেশের বুলি।

আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন— শব্দের প্রায় পাঁচটি অর্থ রয়েছে। কুরআনের আয়াত দিয়েই উদাহরণ দিচ্ছি।

১. আফুউউন শব্দের অর্থ মিটানো বা মুছে দেয়া। মানে গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া। আল্লাহ হচ্ছেন গুনাহ মোছনকারী। যেহেতু সুরা বাকারার তাফসির চলছে, এ সুরার একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন,

وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَنَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ

আর আপনি আমাদের মার্জনা করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, আর আমাদের উপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। [সুরা বাকারা: ২৮৬]

সুনানুত তিরমিজির এক বর্ণনায় রয়েছে, মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে কালো একটি দাগ পড়ে। আর মানুষ তখনই গুনাহ করে, যখন তার মধ্যে তাকওয়ার পোশাক থাকে না। লাকড়ি দিয়ে রান্নার ফলে পাতিলের তলা যেমন কালচে হয়, ঠিক তেমনি গুনাহের কারণেও মানুষের অন্তর কালো হয়। তাই তাকওয়া না থাকার কারণে আমাদের অন্তর যখন কালো হয়ে যায়, তখন এটা দূর করতে হলে নবিজির শেখানো দুআ পাঠের বিকল্প নেই।

আফুউউন শব্দের আরেক অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেনেওয়ালা। অর্থাৎ, বেশি করে বোনাস দেন যিনি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ইয়াসআলুনাকা মাজা ইউনফিকুন অর্থাৎ, হে রাসুল! আপনাকে তারা প্রশ্ন করে, আমরা কী খরচ করব? আমরা কি সদকা, ফিতরা, যাকাত ইত্যাদি বেশি করে খরচ করব? এর উত্তর আয়াতের পরের অংশেই রয়েছে, কুলিল আফওয়া। হে নবি, আপনি বলে দিন, তারা যেন অতিরিক্ত জিনিস খরচ করে। যাকাত যে দিচ্ছে, এটা হচ্ছে ফরজ কাজ। আর জাকাত দিলেই শেষ হয়ে যায় না। কেননা, এটা গরিবের প্রতি আপনার অনুগ্রহ নয়; বরং আপনার প্রতি গরিবের অনুগ্রহ।

আপনি জাকাত দিয়ে গরিবকে দয়া করেননি, বরং সে আপনার জাকাত গ্রহণ করে আপনার উপর দয়া করেছে। কারণ, জাকাত খাওয়া তার জন্য ফরজ নয়, এটা তার অপারগতা, কিন্তু জাকাত আদায় করা আপনার জন্য ফরজ। সে জাকাত গ্রহণ না করলে গুনাহগার হবে না, কিন্তু আপনি জাকাত আদায় করার ক্ষেত্র না পেলে জাকাত না দেওয়ার কারণে জাহান্নামি হবেন।

আপনি মসজিদে নামাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন এবং পথিমধ্যে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এখন কেউ একজন আপনাকে ধরে তুলল এবং হাতে ধরে মসজিদে নিয়ে গেল। এই যে আপনার মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, এই নামাজ তো ফরজ ইবাদত। এই যে একজন আপনাকে সহায্য করল, এটা হচ্ছে ইহসান। আপনাকে সে অতিরিক্ত কিছু দিল। আপনার হাত ধরে আপনাকে মসজিদে পৌঁছে দেওয়া লোকটির দায়িত্ব ছিল না। আফুউউন শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। যিনি অতিরিক্ত দেন, আর তা দেবেন আমাদের চাওয়ার মাধ্যমে। এ জন্য আল্লাহর রাসুল এই দুআ পড়তে বলেছেন।

আফুউউন এর আরেক অর্থ হচ্ছে দান করা। ইন্নামা আনা কাসিমুন ওয়াল্লাহু ইউতি। নবিজি বলেন, দাতা হলেন আল্লাহ, আর আমি হলাম বণ্টনকারী। এ জন্য আমাদের যে কোনো প্রয়োজনে আমরা আল্লাহর কাছে চাইব। যেমন আল্লাহর কাছে রিজিক চাওয়া। সহিহ বুখারিতে আছে, আল্লাহ মানুষকে ডেকে ডেকে বলেন, 'কে আছ চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেবো।

আফুউউন এর অন্য অর্থ হচ্ছে ক্ষমা। অর্থাৎ ক্ষমা করে দেওয়া, যাতে কোনো শাস্তি থাকে না। কেউ কোনো ভুল করলে তাকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া। অনেকে দেখা যায়, শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা তো করে দেয়, তবে এমন কিছু কথা বলে, যা শাস্তি থেকেও বড় হয়ে যায়। কলিজায় আঘাত লাগে। যেমন কেউ বলল, তুই আমার সাথে যা করেছিস, তাতে উচিত ছিল থাপড়ে তোর সব দাঁত ফেলে দেওয়া। কিন্তু যা, আমি তোকে ক্ষমা করে দিলাম। এটা আফুউউন নয়। আর যারা এমন করে না, অর্থাৎ কেউ অপরাধ করলে উল্টো তাকে সরি বলে, যেখানে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এরপরও সে তা করে না, এমন ব্যক্তির ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ফামান আফা ওয়াসলাহা ফা-আজরুহু আলাল্লাহ। যে কাউকে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করে দেয়, কোনো ফেরেশতা তাকে পুরস্কার দেবেন না; বরং কিয়ামতের দিন তার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ দেবেন। যে দিন সম্পর্কে অন্য আয়াতে রয়েছে,

لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ

আজ রাজত্ব কার? এক প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহর। [সুরা মুমিন: ১৬]

শবে কদরের রাতে বেশি করে اللَّهِمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ، فَاعْفُ عَنِّي এই দুআ পড়া এবং কান্নাকাটি করে দুআ করা উচিত। হে আল্লাহ, আমি অনেক পাপ করেছি, অপরাধ করেছি, আমাকে আপনি ক্ষমা করে দিন।

এ জন্য শবে কদর তথা পুরো রমজানেই আল্লাহর কাছে পাপমোচনের জন্য তাওবা এবং প্রয়োজনীয় বিষয় চাওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতসহ নফল ইবাদত বেশি করে করতে হবে। এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। তাই এ মাসে কুরআন তিলাওয়াতে অফুরান সাওয়াব রয়েছে। এ ছাড়া অতীতের কাজা নামাজ বা উমরি কাজা আদায় করা জরুরি। কারণ, এটা আল্লাহর কাছে আপনার ঋণগ্রস্থতা। যদি কাজা নামাজ আদায় না করেন, তাহলে পরকালে আটকে যাবেন। যেভাবে কোনো মানুষের কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নিলে সেটা সময়মতো পরিশোধ করা কর্তব্য, ঠিক তেমনি ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الصَّلوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَبًا مَّوْقُوْتًا

নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। [সুরা নিসা: ১০৩]

এ ছাড়া বান্দার কাছে যেভাবে ঋণগ্রস্থ হলে তা সময়মতো আদায় করতে হয়, তেমনি আল্লাহর কাছে যে আপনি ঋণগ্রস্থ, সেটাও আপনাকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ জন্য ফজরের সময় ফজরের কাজা নামাজ, জুহরে জুহরের কাজা নামাজ, এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের কাজা নামাজ পড়বেন। প্রতিটি নামাজের সময় প্রতিদিন কিছু কিছু করে অতীতের কাজা নামাজ পড়বেন।

অনেকে বলেন, কাজা নামাজ বলে কিছু নেই। কথাটি সঠিক নয়। কেউ যদি তার জীবদ্দশায় কাজা নামাজ আদায় করার সুযোগ না পেয়ে মারা যায়, তাহলে তার ওয়ারিসানের উচিত হলো মৃতের কাজা নামাজগুলো হিসাব করে করে কাফফারা আদায় করা। এক ওয়াক্ত নামাজের কাফফারা একটি ফিতরার সমমূল্য। প্রতিদিন ৬ ওয়াক্ত নামাজ হিসাব করে ফিতরা দিতে হবে। ফজর, জুহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও বিতর।

এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করা দরকার। সহিহ বুখারিতে আছে, একবার এক নারী নবিজির কাছে এসে জানতে চান, আল্লাহর রাসুল, আমার বাবা অত্যন্ত অসুস্থ, হাঁটাচলার সামর্থ নেই; কিন্তু হজ করার নিয়ত করেছিলেন, এখন আমি কি তার পক্ষে হজ করতে পারি? তখন নবিজি তাকে জবাব দেন, যদি তোমার পিতা কারও কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নেন, তাহলে সেটা কি তুমি তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করতে পারবে? মহিলা বললেন, হ্যাঁ। তখন নবিজি বলেন, তাহলে হজও করা যাবে। এই হাদিস থেকেই ফুকাহায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মৃতের পক্ষ থেকে হজ করলে সেই হজ যদি আদায় হয়, তাহলে তার পক্ষ থেকে নামাজের কাফফারা দিলে সেটা কেন আদায় হবে না। অবশ্যই হবে。

উমরি কাজা আদায়ের একটা পদ্ধতিঃ প্রথম ফজরের কাজা নামাজ দিয়ে শুরু করবেন। এভাবে অন্যান্য ওয়াক্তের নিয়ত করবেন। এখন কারও যদি ২০ বছরের নামাজ কাজা থাকে আর সে এই কাজা নামাজ শুরুর কয়েকদিন পরে মারা যায়, তাহলে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সে তার নিয়তের কারণে ২০ বছর কাজা নামাজ পড়ে ফেলার সাওয়াব পাবে।

তেমনিভাবে কেউ যদি ২০ বছর কুফরির উপর থাকার নিয়ত করে, আর এই নিয়তের কয়েকদিন পরেই মারা যায়, তাহলে সে জাহান্নামে যাবে তার নিয়তের কারণে। কেননা, হজরত সাহল ইবনু সায়িদ আস-সায়িদি থেকে বর্ণিত হাদিস,

نِيَّةُ الْمُؤْمِنِ خَيْرٌ مِّنْ عَمَلِهِ ، وَعَمَلُ الْمُنَافِقِ خَيْرٌ مِّنْ نِيَّتِهِ ، وَكُلُّ يعمل على نيته ، فإذا عمل المؤمن عملا ، ثار في قلبه نور

মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। মুনাফিকের নিয়ত আমল থেকেও মারাত্মক। প্রত্যেকের আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। মুমিন যখন কোনো আমল করে, তখন সেটা তার কলবের মধ্যে নূর হিসাবে উদ্ভাসিত হয়।

কারণ, মুমিনের নিয়ত অনেক সময় আমলের চেয়েও শ্রেয়। কারণ, নিয়তে কোনো রিয়া বা লোক দেখানোর ব্যাপার থাকে না, কিন্তু আমলে রিয়া থাকতে পারে। আর রিয়াযুক্ত কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

কিয়ামতের দিন প্রথমেই নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নফল নামাজের কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। ফরজের আগে যে সময় পাওয়া যায়, তাতে চাইলে ২-৪ রাকাত উমরি কাজা আদায় করা সম্ভব। বান্দার ফরজ নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। এখন যদি বান্দার ফরজ নামাজে ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই নফল নামাজ আছে কিনা, সেটা দেখা হবে। যদি থাকে, তাহলে সেটা দিয়েই তার ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। তার মানে এই নয় যে, আপনি কাজা নামাজগুলো আর আদায় করবেন না। কাজা নামাজগুলো আদায় করা ফরজ, যেমনভাবে কাজা রোজাগুলো আদায় করা ফরজ।

📘 হুদাল্লিল মুত্তাকিন > 📄 রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ কেন দেবেন

📄 রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ কেন দেবেন


আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে রমজানের রোজাগুলো রাখার সুযোগ দিয়েছেন এবং রমজানের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা রমজানের শেষ পর্যায়ে আছি। এখন আমাদের করণীয় হলো, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যে, তিনি তাওফিক দিয়েছেন বলেই আমরা রোজাগুলো রাখতে পেরেছি। দ্বিতীয় করণীয় হলো, গত হওয়া রোজাগুলো নিয়ে অনুশোচনা করা যে, আমাদের রোজা, তারাওয়িহ ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আমলগুলো কবুল হয়েছে কি-না, সেটার জন্য নিজেকে প্রশ্ন করা এবং এটা স্বীকার করা যে, ‘হে আল্লাহ, আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছিলেন, সেভাবে করতে পারিনি। যেভাবে আপনাকে জানার কথা ছিল, সেভাবে জানতে পারিনি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের এসব ভাঙাচোরা ইবাদতগুলো কবুল করে নিন এবং আমাদের ক্ষমা করে দিন।’ আর বেশি বেশি ইসতিগফার পাঠ করতে থাকা।

এখানে তাহাজ্জুদ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা দরকার। তাহাজ্জুদ অত্যন্ত পুণ্যময় একটি ইবাদত। যারা আল্লাহওয়ালা, তাহাজ্জুদগোজার, তারা সারা রাত ইবাদতের মধ্যে কাটিয়ে দেন। এরপর শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। পবিত্র কুরআনে তাদের গুণাবলি আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। [সুরা জারিয়াত: ১৮] অর্থাৎ, এরা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। কেঁদেকেটে বলে, ‘ওগো আল্লাহ, আমি যে ইবাদত করলাম, জানি না কবুল হয়েছে কি-না। আর আপনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, সেভাবে করতে পারিনি। হে আল্লাহ, নিজ দয়াগুণে আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

এ জন্য বেশি বেশি ইসতিগফার করতে হবে। নিজের আমলের পর্যালোচনা করতে হবে। কেন পর্যালোচনা করব? কারণ, রমজানে দুটি বিশেষ আমল রয়েছে: একটি হলো রোজা, অপরটি হলো তারাবিহ। এখন আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর রোজা কেন ফরজ করলেন এবং নবিজি আল্লাহর নির্দেশে তারাবির নামাজকে সুন্নাত হিশেবে কেন সাব্যস্ত করলেন? এটা জানতে হবে।

রোজা কেন রাখতে হবে—এর বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘যাতে তোমরা মুত্তাকি হয়ে জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারো।’ আর মুত্তাকিদের জন্যই আল্লাহ জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন। যে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, সে অবশ্যই মুত্তাকি। এ জন্য আল্লাহর ফরজ বিধান রোজা রেখে মুত্তাকি হয়ে নিজেকে জান্নাতের উপযোগী করার জন্য আল্লাহ আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন। সুবহানাল্লাহ। এবার আমরা لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ সম্পর্কে আলোচনা করব।

لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর অর্থ হলো, যাতে তোমরা বাঁচতে পারো। তবে কি থেকে বাঁচতে পারো, এটার উল্লেখ না থাকলেও এর ব্যাখ্যা হলো, তোমরা দুনিয়ায় যদি একটা জিনিস থেকে বাঁচো, তবে পরকালে আল্লাহও তোমাদের একটা জিনিস থেকে রক্ষা করবেন। এ জন্য মুফাসসিরগণ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -এর তাফসিরে লিখেছেন, الْعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ من المعاصی অর্থাৎ, দুনিয়াতে যদি তোমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারো, তবে আল্লাহ পরকালে তোমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। সুতরাং বোঝা গেল, রোজা ফরজ করা হয়েছে মানুষকে জান্নাতের উপযুক্ত বানাতে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন,

فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ

অর্থাৎ, যাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, তারাই মহা সফল। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]

হাদিস শরিফে রাসুলে কারিম আলাইহিত তাহিয়্যাতু ওয়াত তাসলিম বলেছেন,

من صام يوما في سبيل الله باعد الله وجهه عن النار سبعين خريفا

যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি নফল রোজা রাখে, তবে আল্লাহ তাআলা সেই নফল রোজাদারকে জাহান্নামের রাস্তা থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে রাখেন। সুবহানাল্লাহ। তো নফল রোজার যদি এত ফজিলত হয়, তাহলে ফরজ রোজার ফজিলত কেমন হবে, ভেবে দেখা দরকার।

অন্য এক হাদিসে আছে, রাসুল বলেন,

من صام يوما في سبيل الله في غير رمضان بعد من النار مائة عام

রোজাদার ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে ১০০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন। উপর্যুক্ত দুটি হাদিসের মর্ম হলো, আল্লাহ রোজাদারকে জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে রাখবেন। অর্থাৎ, জাহান্নামকে সরিয়ে দেবেন। এ জন্য হাদিসে আছে, রাসুল একটি দুআ করতেন,

اللهم باعد بيني وبين خطاياي كما باعدت بين المشرق والمغرب হে আল্লাহ, আমার ও গুনাহের মধ্যখানে এমন নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও, যেভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে রেখেছ। আমাদেরকেও এই দুআ বেশি বেশি করে করতে হবে। যে নবির কোনো গুনাহ নাই, সেই নবি যদি এভাবে জাহান্নাম থেকে পানাহ চান, তাহলে আমাদের মতো গুনাহগারদের কতোবেশি পানাহ চাওয়া দরকার।

কীভাবে গুনাহ থেকে বাঁচা যায়

আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন, যাতে আমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারি। এবার দেখা যাক, গুনাহ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকব। আমরা রমজানে দিনের বেলা কিছুই খাই না, তা যত হালাল এবং উন্নতই হোক না কেন। এমন কি জমজমের পানি অথবা আজওয়া খেজুর হলেও।

এই যে খাই না, এটা কার আদেশে? অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশে।

রমজানে দিনের বেলা কিছু খেতে আল্লাহ নিষেধ দিয়েছেন, তাই আমরা খাই না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর এই আদেশ পালন করল, রমজানের পুরো একমাস এই ট্রেনিং নিল, সে এটা করেছে একমাত্র আল্লাহর জন্যই। ফলে এমন ব্যক্তির অন্তরে যদি রোজার রুহ ঢুকে যায়, তাহলে সে কখনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে পারে না। আর আল্লাহর নিষেধ থেকে বেঁচে থাকাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নামই তাকওয়া। এটাই হলো রোজার মূল ম্যাসেজ এবং রোজা ফরজ হওয়ার কারণ।

বান্দা আল্লাহর হুকুমে হালাল খাবার ত্যাগ করেছে, এ জন্য আল্লাহ তাআলা নিজেই রোজাদারের রোজার বদলা দেবেন। আপনাদের স্মরণ থাকার কথা, রমজানের শুরুর দিকে আমরা আলোচনা করে এসেছি রোজার প্রতিদান আল্লাহপাক স্বয়ং দেবেন। এব্যাপারে একটি হাদিসও উল্লেখ করেছিলাম, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, الصوم ﻟﻲ وَأَنَا أَجْزِي ﺑﻪ ‘রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো।’ সুবহানাল্লাহ!

রোজা আল্লাহর জন্য, নামাজ কার

রোজা একমাত্র আল্লাহর জন্য। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে নামাজ কার জন্য? আমরা জানি, নামাজও আল্লাহর জন্য; কিন্তু আল্লাহ তাআলা রোজার ব্যাপারে যেভাবে ‘আমার জন্য’ বলেছেন, নামাজের ব্যাপারে কিন্তু এভাবে বলেননি। অথচ কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ ﴾

বলো, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব। [সুরা আনআম : ১৬২]

আমার নামাজ, আমার রোজা, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছুই শুধু আল্লাহর জন্য। কিন্তু এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর উত্তর হলো, সব ইবাদতই আমরা আল্লাহর জন্য করি। নামাজ পড়ি আল্লাহর জন্য। এখন যদি আমার এই নামাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য হয়, তাহলে তো নামাজই হবে না। কুরআনে আল্লাহ বলেন,

﴿ أَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِى ﴾

আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো। [সুরা তাহা : ১৪]

অর্থাৎ, হে বান্দা, আমাকে স্মরণ করার জন্যই তুমি নামাজ আদায় করো, অন্য কাউকে দেখানোর জন্য নয়। এমনিভাবে হজও আমরা আল্লাহর জন্যই করি। কুরআনে আছে,

﴿ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَ مَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعُلَمِينَ ﴾

আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরি করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন। [সুরা আলে ইমরান: ৯৭]

এরপরেও রোজার ব্যাপারে আলাদাভাবে কেন ‘রোজা আমার জন্য’ বললেন? এর রহস্য উদ্‌ঘাটনে হাদিসবেত্তাগণ বলেন, আমরা যে নামাজ পড়ি, এটা নিশ্চিত আল্লাহর জন্য ইবাদত। কেউ যখন নামাজ পড়ে, তখন অন্যজন তার এই নামাজ দেখতে পায়। আর ফরজ নামাজ সকলে একসাথে মিলে জামাআতে আদায় করে। ফলে একে অন্যকে দেখা হয়ে যায়। এ জন্য নামাজ কোনো গোপন আমল নয়। মানুষ আপনাকে দেখে সহজে বুজে নেওয়া যায় যে, আপনি নামাজি। সুতরাং নামাজ যদিও একমাত্র আল্লাহর জন্য, তবে মানুষের চোখেও আপনি নামাজি হয়ে যান।

এমনিভাবে জাকাত একটি ফরজ ইবাদত এবং এটা প্রকাশ্যে আদায় করা সুন্নাত। যেভাবে আমরা প্রকাশ্যে জামাআতে নামাজ পড়ি, ঠিক সেভাবে জাকাতও একটি প্রকাশ্য আমল। জাকাত আমরা প্রকাশ্যে দেব। এতে অন্যরা উৎসাহিত হবে। তবে এমন যেন না হয় যে, জাকাতের নাম দিয়ে কিছু কাপড় দিলেন এবং জাকাত গ্রহীতাদের লম্বা সারি দাঁড় করালেন। বরং জাকাতদাতা তার সব সম্পদের হিসাব করে প্রকৃত হকদারদের মধ্যে জাকাত পৌঁছে দেবে।

তবে জাকাত দেওয়ার সময় 'এটা জাকাতের মাল' এভাবে বলার দরকার নেই। গিফট, হাদিয়া বা উপঢৌকন ইত্যাদি শব্দেও বলা যেতে পারে। এটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি বিষয়। কেউ যদি জাকাতের নিয়ত ছাড়াই অনেক সম্পদ বিলিয়ে দেয়, তবে তার জাকাত আদায় হবে না। এটা সদকা হয়ে যাবে। এ ছাড়া যে জাকাত গ্রহণের হকদার নয়, তাকে জাকাত দিলে আদায় হবে না। আপনার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যদি কেউ কেউ হকদার থাকেন, তবে তাকেই জাকাত দেন। কিন্তু আপনার পিতা, দাদা এভাবে উপরের স্তরের কাউকে দিতে পারবেন না। এমনিভাবে আপনার নিচের স্তর তথা ছেলেমেয়েকে জাকাত দিতে পারবেন না।

আপনি যে জাকাত দিলেন, এটা আর কেউ না জানলেও আপনি এবং যে জাকাত গ্রহণ করছে, সে তো জানে। এ জন্য জাকাত প্রকাশ্যে দেওয়া সুন্নত। এতে অন্যরা উৎসাহিত হয়। তা ছাড়া মানুষের সমালোচনা থেকেও মুক্ত থাকা যায়। মানুষ যাতে আপনার ব্যাপারে এই ধারণা করতে না পারে যে, এই ব্যক্তি জাকাত দেওয়ার উপযুক্ত হয়েও জাকাত দিচ্ছে না। সুতরাং নামাজের মতো জাকাতের ইবাদতও আল্লাহ জানেন এবং মানুষও জানে।

এবার আসুন হজের আলোচনায়। হজ কার জন্য করা হয়? অবশ্যই আল্লাহর জন্য। এ ছাড়া হজ প্রকাশ্যে আদায়যোগ্য ইবাদত। এটা গোপন করার কিছু নেই। হজ আমরা আদায় করি আল্লাহর জন্য। তাঁকে খুশি করার জন্য। তবে হজে আমরা ইহরামের যে পোশাক পরি, এটা কোন ধরণের পোশাক? সাদা না কালো? অবশ্যই সাদা। আর এই পোশাকের সাথে কাফনের কাপড়ের একটা সাদৃশ্য রয়েছে। কাফনের কাপড়ও সাদা, ইহরামের কাপড়ও সাদা। এই যে আমরা হজের জন্য নির্দিষ্ট একটা কাপড় পরিধান করি, এর মাধ্যমে অন্যরা বুঝে নেয় যে, আমরা হজ করছি। সুতরাং বোঝা গেল, নামাজ ও জাকাতের মতো হজ ইবাদতও মানুষ জেনে যায়। ফলে মানুষ আমাদেরকে 'নামাজি', 'জাকাতদাতা' ও 'হজ আদায়কারী' হিশেবে পরিচয় করে ফেলে।

কিন্তু রোজা হলো ভিন্ন। যে রোজা রাখে, তার ব্যাপারে এটা জানার সুযোগ নেই। এখন কেউ যদি সাহরি খায়, ইফতারও করে এবং মধ্যখানে কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে মানুষ সেটা বুঝতে পারবে না। আর যারা আল্লাহর বিধান মেনে দিনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু খায় না, এটা তো একমাত্র আল্লাহর ভয়ের কারণে। এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন, রোজা হলো আমার জন্য, আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেবো। সুবহানাল্লাহ।

ইহসান এবং নৈকট্য

এভাবে অন্তরে একমাত্র আল্লাহর ভয় রেখে ইবাদত করার নাম ইহসান। আর ইহসান হলো এমন এক গুণ, যে গুণের মাধ্যমে ইবাদত সুন্দর হয়। এখন ইবাদত যদি সুন্দর না হয়, তাহলে এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাওয়া যাবে না। দুনিয়াতে যেমন আমরা সবসময় ভালো, উন্নত ও মানসম্পন্ন জিনিস খুঁজি, ভালো কোয়ালিটির জিনিস না পেলে সেটা ক্রয় করি না, ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহও ইবাদত সুন্দর না হলে সেটা গ্রহণ করেন না। এ জন্য আমরা আমাদের ইবাদত সুন্দর করার চেষ্টা করব। আর এটাই হলো ইহসান।

এই ইহসানের দিকেই ইঙ্গিত করে একবার রাসুলে কারিম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ما الإحسان يا رسول الله؟ ‘আল্লাহর রাসুল, ইহসানের মর্ম কি?' তখন রাসুল জবাবে বললেন, أن تعبد الله كأنك تراه ، فإن لم تكن تراه فإنه يراك ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তুমি যদি এভাবে ইবাদত করতে না পারো, তাহলে অন্তত এভাবে করো যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'

এমনভাবে ইবাদত করার নাম হলো ইহসান। আর আমরা যে আল্লাহকে না দেখে ইবাদত করি, এ জন্য আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানে তাঁর দিদার লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করে দেবেন। সুবহানাল্লাহ। অর্থাৎ, জান্নাতি যারা, তারা আল্লাহকে দেখতে পাবে।

দিদারে এলাহি

হাদিস শরিফে নবিজি ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন বান্দা আল্লাহকে এত সহজ ও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবে, যেভাবে দুনিয়াতে চন্দ্রকে দেখেছে। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে তাঁর দর্শন লাভ করিয়ে আমাদের কলিজা ঠান্ডা করেন। আমিন।

এই দুনিয়াতে চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। তবে অন্তরচক্ষু দিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখা যেতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كُنْتَ فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا فَكَشَفْنَا عَنْكَ غِطَاءَكَ فَبَصَرُكَ الْيَوْمَ حَدِيدٌ

(বলা হবে) এ দিন সম্পর্কে তুমি ছিলে উদাসীন। তোমার সামনে যে পর্দা ছিল তা আমি সরিয়ে দিয়েছি। (সে কারণে) তোমার দৃষ্টি আজ খুব তীক্ষ্ম। [সুরা কাফ: ২২]

অর্থাৎ, পরকালে চোখের পাওয়ার ভিন্ন এবং অনেক শক্তিশালী হবে। তো আমরা আলোচনা করছিলাম ইহসান সম্পর্কে। ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, এটা না হলে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন, এমনভাবে ইবাদত করো। আর আল্লাহ যে আমাদের দেখতেছেন, এটা আমরা সকলেই বিশ্বাস করি। যদি বিশ্বাস না থাকত, রোজা রাখার দরকার ছিল না।

এখন আপনি রমজানে দিনের বেলা প্রকাশ্যে অথবা গোপনেও কিছু ভক্ষণ করেন না, পান করেন না, এটা কার ভয়ে করেন না? অবশ্যই আল্লাহর ভয়ে। এই যে ভয়, এটা হলো ইহসানের গুণ। আর বান্দার ইবাদতে যখন এরকম গুণ তৈরি হয়, তখন আল্লাহর কাছে তার এই ইবাদতের মর্যাদাও বেড়ে যায়। এ জন্য রমজানে একটা নফল ইবাদত করলে একটা ফরজ ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়, আর একটা ফরজ আদায় করলে ৭০টি ফরজের সাওয়াব পাওয়া যায়। এর কারণ হলো, তখন বান্দার মধ্যে ইহসান ও ইখলাসের গুণ একত্রিত হয়ে যায়। নবিজি বলেন, من تقرب بخصلة من الخير، كان كمن أدى فريضة فيما سواه

যে ব্যক্তি রমজানে আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য একটি নফল আদায় করবে, সে যেন রমজান ছাড়া অন্যমাসে একটি ফরজ আদায় করল।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে ইবাদত করার তাওফিক দিন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00