📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি > 📄 শিবলিঙ্গ পূজা

📄 শিবলিঙ্গ পূজা


শিবলিঙ্গ পূজা অন্যতম প্রধান হিন্দুদেবতা শিবের পূজার জন্য বিভিন্ন মন্দিরে নিয়মিত ব্যবস্থা আছে। আসলে শিবের পূজা করা হয় না, করা হয় তার লিঙ্গের পূজা। বিভিন্ন মন্দিরে তার জননেন্দ্রিয় বা লিঙ্গের যে প্রতীক রাখা হয়, তাকে বলা হয় শিবলিঙ্গ। যে মন্দিরে শিবলিঙ্গ থাকে তাকে বলা হয় শিবমন্দির। ভারতের বারটি তীর্থস্থান শিবলিঙ্গের জন্য প্রসিদ্ধ। এসব স্থানের লিঙ্গগুলোকে বলা হয় জ্যোতির্লিঙ্গ। হিন্দুদের বিশ্বাস, "প্রভাতে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের পুণ্য নাম স্মরণে সপ্তজন্মকৃত পাপের স্খলন হয়। শিবের ভক্ত শৈবগণই শিবলিঙ্গ পূজা করে থাকেন।

বাংলাদেশের শৈবগণও কোন কোন স্থানে শিবলিঙ্গ পূজা করে থাকেন। এসব স্থানের মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ ধাম খ্যাত। প্রতি বছর দোলপূর্ণিমার রাতে সেখানে অবস্থিত শিবমন্দিরে বহু পুণ্যার্থী পূজা অর্চনা করতে সমবেত হন। সাধারণভাবে প্রত্যহ যেসব শিবলিঙ্গ পূজিত হয়ে থাকে, যোনিপীঠ সেগুলো আকারে দেড় হতে দুই ইঞ্চির ঊর্ধ্বে হয় না। এ ক্ষেত্রে সাধারণত যোনিপীঠকে রৌপ্য ব্রোঞ্জ দ্বারা পৃথকভাবে নির্মাণ করা হয়। পূজার সময় পাথর নির্মিত লিঙ্গ মূর্তিটিকে এর মধ্যে স্থাপন করা হয়। লিঙ্গটিকে যোনীর (স্ত্রীলিঙ্গের) প্রতীকের মধ্যস্থলে এমনভাবে স্থাপন করা হয় যাতে দেখা যায়, তা খাড়া অবস্থায় আছে। শিবমন্দিরে প্রতিদিন পানি, দুধ ও ভাং (যা শিব পছন্দ করেন) দিয়ে শিবের লিঙ্গের প্রতিমাকে স্নান করানো হয়। পরে এর সামনে নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। পূজা করার সময় প্রতিমাটির সামনে ফুল, আগর এবং কাপড় রাখা হয়। শৈবিক উপদলে নারীগণ স্নানের সময় মাটি দিয়ে শিবলিঙ্গের একটি প্রতীক তৈরি করে এবং প্রতীকটির দিকে মাথা নত করে প্রণাম জানায়।

শিবের পরিবর্তে তার লিঙ্গের পূজা করা হয় কেন? এমন প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক। এ সম্পর্কে শাস্ত্রে দুটো কাহিনী উল্লেখ আছে। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে, ভৃগু নামক এক ঋষির অভিশাপের ফলেই শিবের এ দশা হয়েছে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব, প্রধান এ তিন দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কে, তা জানার জন্য একসময় ভৃগুকে পাঠনো হয়েছিল। তিনি যখন শিবের ঘরের সামনে গেলেন, তখন দারোয়ান তাকে এই বলে ঘরে ঢুকতে দিল না যে, তার প্রভু শিব নিজ স্ত্রী পার্বতীর সাথে সঙ্গমরত আছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ভৃগুর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি শিবকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, হে শংকর, যেহেতু পার্বতীর আলিঙ্গনকে প্রধান্য দিতে গিয়ে তুমি আমাকে অপমান করেছ, কাজেই তোমার পূজা পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ আকারে হবে।

অপর একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, কয়েকজন ঋষির অভিশাপের ফলেই শিব পূজা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং তার স্থলে তার লিঙ্গ পূজ্য হয়েছে। স্ত্রী পার্বতীর মৃত্যুর পর শিব দারুণভাবে শোকাগ্রস্ত হয়েছিলেন। এ সময় তিনি উন্মাদের মতো বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন এবং নানা আশ্রমে গিয়ে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। শিবের রূপ দেখে এসব আশ্রমের ঋষিদের স্ত্রীগণ তার প্রতি দারুণভাবে আসক্ত হয়। শিবকে পাওয়ার জন্য তার পিছু নিয়ে তারা নানা স্থানে ঘুরতে থাকে। স্ত্রীদের এ অবস্থা দেখে ঋষিগণ খুবই অপমানিত বোধ করেন এবং শিবকে অভিশাপ দেন। এ অভিশাপের ফলেই শিব পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পুরুষত্ব হারিয়ে শিব দারুণভাবে চিন্তাগ্রস্ত হলেন। তার এ বিপদ দেখে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এগিয়ে আসলেন এবং ঋষিদের অভিশাপ প্রত্যাহার করতে এই মর্মে সম্মত হলেন যে, শিব নিজে কোন উপাসনা লাভ করবেন না বরং তার উপাসনার বস্তু হবে তার লিঙ্গ। এভাবেই শিবলিঙ্গ মানুষ ও দেবতাদের পূজার বস্তু হয়েছে। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত প্রাক্তন ব্রাহ্মণ পুরোহিত আবুল হুসেন ভট্টাচার্য শিবলিঙ্গ পূজা প্রসঙ্গে লিখেছেন, "হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী একমাত্র নিজ নিজ স্বামী ছাড়া নারীদের আর কোন উপাস্য নেই কিন্তু বিধবা নারীদের বেলায় এই নিয়মের ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। তাদের জন্য বান-লিঙ্গের পূজা, জপতপ এবং ভাগবত গ্রন্থ পাঠের অধিকার স্বীকৃতি হয়েছে। তবে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যে, স্বামী জ্ঞানেও বাণ-লিঙ্গের পূজা করতে হবে। এ পূজার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এক সময় মহাদেব (বাণেশ্বর শিব) এবং পার্বতী (দুর্গা) সঙ্গমরত ছিলেন, সে সময় মহাদেবের উত্তেজনা এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে, পার্বতীর জীবন নাশের উপক্রম হয়ে পড়ে। পার্বতীর প্রার্থনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এগিয়ে আসে এবং নিজ হস্তস্থিত সুদর্শন চক্র দ্বারা উভয়ের গুপ্ত অঙ্গ কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। উভয় গুপ্তাঙ্গের মিলিত সংস্করণই 'বানলিঙ্গ' নামে আখ্যায়িত হয়ে হিন্দু সমাজ কর্তৃক পূজিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন মন্দিরে ছোট বড় নানা আকারের প্রস্তর নির্মিত বাণলিঙ্গ রয়েছে এবং পূজিত হয়ে আসছে। দৈনন্দিনপূজার বেলায় মাটি দিয়ে নিজহাতে গড়া লিঙ্গ পূজাই অধিক পুণ্যজনক এবং শাস্ত্রসম্মত। সাধারণত বিধবা দিগকেই ওটা গড়তে হয়। উভয় লিঙ্গের মিলিত এই সংস্করণকে নিজ হাতে গড়া এবং পূজা করার বেলায় অন্তত যৌবনবতী-বিধবাদিগের মনে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া যে খুবই স্বাভাবিক, কোন স্বস্তি-প্রাজ্ঞ এবং চিন্তাশীল ব্যক্তি সে কথা অস্বীকার করতে পারেন না।"

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি > 📄 দুর্গাপূজা/শ্যামপূজা

📄 দুর্গাপূজা/শ্যামপূজা


দুর্গাপূজার আর একটি প্রকার হলো শ্যামপূজা। দুর্গার অপর নাম কালী এবং তারা। মহাবীর রক্তবীযার সঙ্গে দুর্গার মহাযুদ্ধ ঘটে। রক্তবীযা ছিল দুর্গার শত্রুপক্ষের সেনাপতি। এই যুদ্ধে বিজয়ের পরই দুর্গা মহানন্দে মহানৃত্য শুরু করেন। তার পদভারে সমগ্র বিশ্ব কম্পমান হয় এবং তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়।

দেবতাগণ তখন সৃষ্টি রক্ষার জন্য মহাদেব শিবকে আহ্বান করেন। মহাদেব শিব স্বীয় স্ত্রী দুর্গাকে শান্ত করতে বিফল হয়ে মৃতদের সঙ্গে দুর্গার পদতলে পড়ে থাকেন। এক পর্যায়ে দুর্গা স্বামী শিবকে তার পায়ের নীচে দেখতে পেয়ে লজ্জিত, হতভম্ব ও শান্ত হয়ে পড়েন। ক্ষোভ ও লজ্জায় তাঁর জিহ্বাটি মুখ থেকে বের হয়ে আসে এবং দুর্গা তার দাঁত চাপিয়ে ধরেন। এ কারণে দুর্গার মূর্তিতে স্বীয় জিহ্বাকে কামড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখানো হয়। মা দুর্গা তাঁর এক হাতে তরবারী ধারণ করেন, অন্য হাতে ধরেন এক দৈত্যের মাথা এবং অন্য দু'টি হাত দিয়েছেন তার পূজারী এবং আতিথ্য প্রদানকারীদের।

দুর্গার কানের অলংকার হিসেবে ছিল দানবদের মাথা। তাঁর কণ্ঠে ছিল মাথার খুলির হাড়। কোমরবন্দ ছিল পরাজিত শত্রুদের হাড় দিয়ে তৈরি। তাঁর পরিধানে কোমরবন্দ ছাড়া আর কোন পরিচ্ছদই ছিল না। মা দুর্গার কেশরাজী কোমর পর্যন্ত বিলম্বিত ছিল। তার নয়ন ছিল ক্রোধে পরিপূর্ণ। দুর্গা তখন ছিলেন রক্তে মাতাল। পূজার প্রকৃতি ছিল দুর্গার প্রকৃতির প্রতিফলন।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি > 📄 কার্তিক পূজা

📄 কার্তিক পূজা


মহাদেব শিব এবং দুর্গার পুত্র হলেন কার্তিক। কার্তিকের জন্ম কাহিনীও চমকপ্রদ। যৌন সম্রাট মহাদেব শিব একদা স্বীয় পত্নী পার্বতীর সঙ্গে প্রবল রমণ ও রতিকর্মে লিপ্ত ছিলেন। শিবের তীব্র যৌনতায় পার্বতীর জীবন সংশয় দেখা দেয়। তবু মহাদেব শিব পার্বতীকে যৌনতা হতে অব্যাহতি দিচ্ছিল না। অগত্যা সেখানে পার্বতীর আহ্বানে তার প্রাণ রক্ষার জন্য বিষ্ণু ও শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে দেবতাগণের আবির্ভাব হয়।

কার্তিক সৌন্দর্যে এতো অনুপম ছিলেন যে, স্বীয় মাতা দুর্গাদেবীও তার পুত্রের আকর্ষণ সংবরণ করতে পারেননি। কার্তিক ছিলেন সৌন্দর্যের দেবতা। সুন্দর মানুষের তুলনা করা হয় কার্তিকের ন্যায় সুন্দর বলে। কার্তিক এতো সুন্দর ছিলেন যে, তার কোন শত্রু ছিল না।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি > 📄 কার্তিকের জন্ম

📄 কার্তিকের জন্ম


কার্তিকের জন্ম সেখানে আকষ্মিক দেবতাদের দেখে মহাদেব শিব গাত্রোত্থান করেন। ফলে মহাদেব শিবের বীর্যের ফোঁটা ভূমিতে নিক্ষিপ্ত হয়। পৃথিবী এই শক্তিশালী বীর্য দেহে ধারণে অক্ষম হয়ে তা অগ্নির দিকে নিক্ষেপ করেন। অগ্নি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তা শরবনে নিক্ষেপ করেন। এই শরবনে জন্ম হয় কার্তিকের। শিশু কার্তিককে প্রতিপালন করেন কর্তৃকগণ। কার্তিক প্রতিপালিত হয় কর্তৃকগণের কোলে। তাই তার নাম হয় কার্তিক।

টিকাঃ
১. শিব পুরাণ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00