📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 হযরত হাসান বাসরী (রহ)

📄 হযরত হাসান বাসরী (রহ)


প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী (রহ) হিজরী ২২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনকাল ছিল ৮৮ বছর। কাজেই জীবনের প্রধান অংশ অতিবাহিত হয় ১ম হিজরীতে। তিনি সূফী হিসেবে আখ্যায়িত নন। এরপরও তাকে সূফীকুল শিরোমণি হিসেবে মান্য করা হয়। তার কারণ, হয়ত তার লেখা একটি রিসালা। রিসালাটির নাম 'আর রেয়ায়াতু কি হুকুকিল্লাহ্' "আল্লাহর হকসমূহের প্রতি যত্নবান হওয়া।” কিতাবটি ইলমে তাসাওফ সম্পর্কে সর্বপ্রথম বই। এর একমাত্র কপিটি অক্সফোর্ডে সংরক্ষিত আছে। মি: নিকলসনের মতে, সর্বপ্রথম যে মুসলমান সূফীধর্মী জীবনযাপন করেন এবং জীবনের গূঢ় রহস্য সম্পর্কে কিতাব রচনা করেন, তিনি হাসান বসরী (রহ)। পরবর্তীতে সূফী সাধকগণ আধ্যাত্মিক জীবনধারার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন স্তর নির্দেশ করেছেন এর প্রথম স্তরটির নাম তওবা।
আরেফদের অনেকেই তাদের আধ্যাত্মিকতার যোগসূত্র হযরত হাসান বসরী (রহ) ও হযরত আলী (র:) হয়ে হযরত রাসূলে করীম (স) এর সঙ্গে সংযুক্ত বলে বিশ্বাস পোষণ করেন। 'আল্ ফেরেস্ত' কিতাবে ইবনুন্ নাদিমের ভাষ্য মোতাবেক হযরত হাসান বসরী (রহ) ৭০ জন সাহাবীর সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ্ ছিলেন।
যাই হোক, সূফীয়ায়ে কেরাম হযরত হাসান বসরীকে (রহ) তাবেয়ীনদের যুগে তাদের পুরোধা বলে গণ্য করেন। তার দুনিয়া বিরাগী জীবনধারার সূত্র ধরেই তাসাওফের বিকাশ ঘটে।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 হযরত যুননুন মিসরী (রহ)

📄 হযরত যুননুন মিসরী (রহ)


আবুল ফয়েয যুনুন মিসরী। আসল নাম সওবান ইবনে ইব্রাহীম অথবা ফয়েয ইবনে ইব্রাহীম। তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ। ফিকাহয় হযরত মালেক ইবনে আনাসের (রহ) শাগরেদ ছিলেন। মওলানা আব্দুর রহমান জামী তাকে সূফীকুল সর্দার বলে অভিহিত করেছেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বক্তব্যে রূপক ব্যবহার করেছেন এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে এমন রূপক পরিভাষার মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন, যাতে ঐ বিষয়ে অভিজ্ঞ লোকেরাই শুধু বুঝে; অনভিজ্ঞরা কিছুই বুঝতে না পারে। আধ্যাত্মিক লেখুনি ও বক্তব্যে এই পদ্ধতিটি পর্যায়ক্রমে চালু হয় এবং আধ্যাত্মিক বিষয় ও বক্তব্যগুলো গযলকাব্যে বিভিন্ন উপমা, রূপক ও প্রতীকী শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্ত করার ধারা চালু হয়ে যায়। কেউ কেউ ধারণা করেন যে, নিউপ্লেটোনিক দর্শনের বহু শিক্ষা ও বিষয় যুন্নুন মিসরীর মাধ্যমে তাসাওফ শাস্ত্রে প্রবেশ লাভ করে। ২৪০-২৫০ হিজরীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি ইন্তিকাল করেন।
যুনুন এর শাব্দিক অর্থ মাছওয়ালা। এ উপাধির পেছনে একটি চমৎকার অলৌকিক ঘটনা আছে। তাক্বিরাতুল আউলিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী একদা জাহাজে করে যুনুন অনেকের সাথে দূরে সফরে যাচ্ছিলেন। সাগরের মাঝে হঠাৎ এক সওদাগর বলে ওঠলেন তার একটি স্বর্ণমুদ্রা হারানো গেছে। এরপর জাহাজের আরোহীদের দেহতল্লাশী শুরু হয় একেক করে। এত মানুষের মধ্যে উলঙ্গ হয়ে চুরির অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে হবে-এটা মেনে নিতে পারছিলেন না আল্লাহর ওলী যুনুন মিসরী। তখন তার প্রতি সন্দেহ আরো ঘনিভূত হয়। অবস্থা এতদূর গড়ালো যে, তার সম্ভ্রম হুমকির মুখে পড়ে। কাপড় খুলে তাকে প্রমাণ করতে হবে, স্বর্ণমুদ্রা তার কাছে নেই। তিনি আল্লাহ্ সাহায্য চেয়ে বললেন : ইয়া আল্লাহ্! তুমি জানো। মূহুর্তে সাগরের বুকে ভেসে ওঠল ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। প্রতিটি মাছের মুখে একেকটি স্বর্ণমুদ্রা। মাছগুলো ভিড় জমালো জাহাজের পাশে। আল্লাহর ওলী একটি মাছের মুখ থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে তুলে দিলেন সওদাগরের হাতে। ততক্ষণে অপরাধবোধে লুটিয়ে পড়ল আরোহীরা আল্লাহ্ ওলীর কদমে।
এবার মাছগুলো সাগরবক্ষে জাহাজের পথ ছেড়ে দিয়ে লুকিয়ে গেল। সেদিন থেকে তার কারামতের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি খ্যাত হলেন যুনুন - মাছওয়ালা নামে।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 হযরত শাক্বীক্ব বাল্খী (রহ)

📄 হযরত শাক্বীক্ব বাল্খী (রহ)


পুরো নাম শাক্বীকু ইবনে ইব্রাহীম বাল্বী। আসল নাম ছিল আবূ মূসা। প্রথম জীবনে তিনি যুক্তিবাদী ছিলেন। পরবর্তীতে হাদীসবেত্তা হন। তিনি হাতেম আসমের ওস্তাদ ছিলেন এবং হযরত ইব্রাহীম আদহামের সাহচর্যে ছিলেন। তার তরীকা ছিল 'তাওয়াক্কুল- আল্লাহর ওপর ভরসা করা।' নাফাহাতুল উত্স - পৃ:৪৯।
তাযকিরাতুল আউলিয়ায় হযরত ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেনঃ "সেই তাওয়াক্কুলকারী বুজর্গ, তত্ত্বজ্ঞানের ওপর কর্তত্ববান।" তার কুনিয়াত 'আবু আলী' বলেও উল্লেখিত আছে।
মওলানা আব্দুর রহমান জামী (রহ) বাল্বের বিভিন্ন ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে নাফাহাতুল উন্‌নন্স লিখেছেন যে, শাক্বীক্বকে ১৭৪ হিজরীতে 'খাতলান' (আফগানিস্তানে) রাজ্যে শহীদ করা হয় এবং তার কবর সেখানেই অবস্থিত।
শাক্বীকু যখন মক্কায় গমন করেন এবং ইব্রাহীম আদহামের সাথে তার দেখা হয়, তখন শাক্বীকু জানতে চাইলেন: হে ইব্রাহীম! রুটি-রোযগারের বিষয়ে আপনি কি করেন? বললেন: কিছু যদি হাতে আসে শোকরিয়া আদায় করি; যদি হাতে না আসে সবর করি। শাক্বীকু বললেন: বল্বের কুকুররাও তাই করে। তারা কিছু পেলে যত্নবান হয়, লেজ নাচায়। না পেলে সবর করে। ইব্রাহীম বললেন: তাহলে আপনি কি করেন? বললেন: কোন জিনিস যদি আমার হাতে আসে, অন্যের মাঝে বিলাই আর না আসলে শোকরিয়া আদায় করি। ইব্রাহীম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তার কপালে চুমো খেয়ে বললেন: খোদার কসম! আপনি ওস্তাদ।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 হযরত আবূ বকর শিবলী (রহ)

📄 হযরত আবূ বকর শিবলী (রহ)


নাফাহাতুল উন্‌ন্স-এ মওলানা আব্দুর রহমান জামী (রহ) হযরত শিবলীর (রহ) নাম উল্লেখ করেছেন আবু বকর জাফর ইবনে ইউনুস হিসেবে। হাজবীরী 'কাশফুল মাজুব'-এ বলেছেন তার নাম 'দালফ ইবনে জাহদার'। তিনি সূফী ও আরেফদের শিরোমণি এবং তাসাওফের পুরোধা বুজর্গগণের অতিশয় শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) তাজকিরাতুল আউলিয়ায় আরো বলেছেন: আধ্যাত্মিক হাল ও জ্ঞানে তার সমকক্ষ ছিল না। তিনি রহস্যজ্ঞান, তত্ত্বকথা, ইঙ্গিতবহ ভাষা ও বক্তব্য, কৃচ্ছসাধনা ও কারামত প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির এতখানি উচ্চমার্গে ছিলেন যে, ভাষা ও বর্ণনায় তার গণনা অসম্ভব। তিনি বহু হাদীস লিখেছিলেন আর শুনেছিলেন। ফিকাহতে তিনি ইমাম মালেকের অনুসারী ছিলেন এবং মানুষের জন্য ছিলেন আল্লাহ্র সাক্ষ্য প্রমাণ- 'হুজ্জাত'।
শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) আরো লিখেছেন যে, শিবলী (রহ) প্রথম জীবনে দামাভান্দ এর আমীর ছিলেন। ও সময় বাগদাদ থেকে তাঁর কাছে খলীফার একটি পত্র আসে। তিনি একদল সঙ্গি নিয়ে খলীফার দরবারে হাজির হন।
খলীফা একটি খেলাত- (রাজকীয় উপাধির জামা) দান করেন। ফেরার সময় হঠাৎ আমীরের হাঁচি পায়। তখন তিনি খেলাত এর জামার আস্তীন নিয়ে মুখ ও নাকের পানি মোছেন। তৎক্ষণাৎ কথাটি খলীফার কানে পৌঁছে গেল। বলা হলো যে, রাজকীয় খেলাতের সাথে আমীর শিবলী এমন আচরণটি করেছেন। খলীফা হুকুম দিলে তার খেলাত কেড়ে নেয়া হল। আমীরের পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হলো। এ ঘটনায় শিবলী যেন সম্বিত ফিরে পান। চিন্তা করতে লাগলেন যে, একজন মাখলুকের দেয়া খেলাতকে হাতের রুমাল হিসেবে ব্যবহার করলে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়, পদমর্যাদা থাকে না। আমীরের পদ চলে যায়। এখন কোনো লোক যদি জগতের বাদশাহ্ খেলাতকে রুমাল বানায়, তার সাথে কি আচরণ করা হবে? ঐ অবস্থায় তিনি খলীফার দরবারে ফিরে আসেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো- ব্যাপার কি, কেন আসলেন? তিনি বললেন: ওহে আমীর! আপনি তো আল্লাহ্ সৃষ্টজীব। আপনি পছন্দ করেন না যে, আপনার খেলাতের অমর্যাদা করা হোক। এখান থেকেই বুঝা যায় আপনার খেলাতের মূল্য কতখানি ছিল? জগতের যিনি বাদশাহ্, তিনি তো আমাকে খেলাত দিয়েছেন, আপন ভালবাসা ও পরিচয় আমাকে দিয়েছেন। কাজেই কে পছন্দ করবে যে, আমি একজন মাখলুকের খেদমত করার জন্য মহান খালেকের খেলাতের অমর্যাদা করি? একথা বলে তিনি বেরিয়ে আসেন এবং নাসসাজের মজলিসে গমণ করেন। নাসসাজ তাকে হযরত জুনাইদ বাগদাদীর খেদমতে প্রেরণ করেন। সেখানে কঠিন সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও সিদ্ধি লাভ করেন। তরীকত সম্বন্ধে প্রথমে যিনি ইঙ্গিত ইশারায় কথা বলেন, তিনি ছিলেন যুন্নুন মিসরী (রহ)। জুনাইদ বাগদাদী (রহ) এসে তাসাওফ-বিজ্ঞান বিন্যস্ত করেন। শিবলী (রহ) তা জনসমক্ষে প্রকাশ্য রূপ দেন।
শিবলী ৩২৪ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তবে, নাফাহাতুল উন্‌ন্স-এ হযরত জামী (রহ) তার মৃতু সাল ৩৩৪ হিজরীর যিলহজ্ব মাস বলে উল্লেখ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00