📄 বিদ্যালয়
বিদ্যালয়ের দিনগুলো পার করার পর কেউ পরিণত হন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকে, আবার কারো কাছে কোনো একটি বিষয় নিয়ে আসে বিরক্তির শেষ সীমা। খেলার দিন থেকে শুরু করে কঠিনতম পরীক্ষা আমাদের ঝুলিতে মজুদ হয় স্মৃতি আর স্মৃতি। মাথা ভর্তি জ্ঞান নিয়ে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের জীবন থাকে সময়সূচির ছাঁচে আবদ্ধ।
মুসলিম দেশগুলোতে এক হাজার বছর পূর্বে মসজিদই ছিল বিদ্যালয়। ধর্ম ও জ্ঞানের মাঝে খুব সামান্যই পার্থক্য টানা হতো, যেহেতু মসজিদই ছিল সালাত আদায় ও বিদ্যা শিক্ষার স্থান। বিদ্যালয়ে পড়ানো বিষয়গুলোতে বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত থাকতো, যা থেকে সহজেই অনুমিত হয় যে, ধর্ম ও বিজ্ঞান নির্বিঘ্নে পাশাপাশি অবস্থান করতো, যে চিত্র বিশ্বের অন্যসব অঞ্চলে দেখা যেত না। ডেনিশ ঐতিহাসিক ইয়োহান পেডারসনের মতে, বিদ্যা শিক্ষা "ধর্মের সাথে অন্তরঙ্গ বা ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ... নিজেকে উভয় বিষয়ে নিয়োজিত করলে (তা এনে দেয়) সামর্থ্য... আত্মিক প্রশান্তি; স্রষ্টার খিদমত বিদ্বান ব্যক্তিবর্গকে কেবল বিয়োগব্যথা মেনে নিতে শেখায় না, বরং এটা অন্যের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে।"
নবী মুহাম্মদ () মসজিদকে পরিণত করেন বিদ্যা শিক্ষার প্রধান স্থানে এবং এগুলোর মাঝে যাতায়াত করে তিনি শিক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শন করতেন। যেখানেই মসজিদ স্থাপিত হতো, সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হতো। তিনি আরব গোত্রগুলোতে কুরআনের শিক্ষকদের পাঠাতেন, যারা আহলে ইলম বা 'জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ' হিসেবে পরিচিত ছিল। এর মানে দাঁড়াচ্ছে শিক্ষা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং ভ্রমণরত এই শিক্ষকগণ বেশ পরিতৃপ্তির জীবনযাপন করতেন। পালেরমোতে ১০ম শতাব্দির ভূবিজ্ঞানী ইবনে হাওক্বাল দাবী করেন যে, তিনি এমন ৩০০ জন প্রাথমিক শিক্ষাদানকারী শিক্ষকের দেখা পেয়েছেন।
৭ম শতাব্দিতে নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সময়ে মদীনাতে ৯-টি মসজিদ ছিল। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শিক্ষার ধারণা চারদিক ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে ৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কে বিকশিত হয় আরেকটি বিদ্যালয়। ৮ম শতাব্দির স্পেনের কর্ডোবাতে বহু বিদ্যালয় ছিল এবং ৯ম শতাব্দির শেষের দিকে প্রায় প্রতিটি মসজিদেই বালক ও বালিকাদের জন্য ছিল প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা।
"তোমার শিক্ষকের জন্য (শ্রদ্ধাবশত) দাঁড়িয়ে যাও এবং সম্মানের সাথে তার প্রশংসা করো। কেননা তিনি বার্তাবাহকের ন্যায়। তুমি কি তার থেকে অন্য কাউকে সম্মানিত ও মহান দেখো, যে সৃষ্টি করে, লালন করে এবং সমৃদ্ধ করে ব্যক্তিত্ব ও মেধাকে।" আহমাদ শাওকীর কবিতার একটি ছত্র
ছয় বছর বয়সেই প্রায় সকল বালক (ধনী পরিবারের বালকেরা ছাড়া, যেহেতু তাদের গৃহ শিক্ষক থাকতো) এবং কিছু বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করতো। শিক্ষা সাধারণত বিনামূল্যে প্রদান করা হতো অথবা তা এতটাই স্বল্প মূল্যের ছিল যে, তা সবার জন্য সহজলভ্য ছিল। লেখার প্রথম দরস (পাঠ) ছিল: কীভাবে আল্লাহর ৯৯-টি আসমাউল হুসনা (সুন্দরতম নাম) এবং কুরআনের সহজ কিছু আয়াত লিখতে হয়, তা শেখা। এর পরবর্তীতে থাকতো কুরআনের আদ্যন্ত অধ্যয়ন এবং পাটিগণিতের শিক্ষা।
১০ম শতাব্দির দিকে শিক্ষাদান মসজিদ থেকে স্থানান্তরিত হতে থাকে এবং তা শিক্ষকগণের গৃহে বাসা বাঁধতে শুরু করে, অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বিদ্যালয় বিকশিত হতে থাকে। পারস্যে এটা প্রথম ঘটে। এরপর ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেলজুকগণ নিজামিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করে। এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বাগদাদের উজীর নিজামুল মুলকের নামে এর নামকরণ করা হয়। এটাই ছিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয়, যার আলাদা শিক্ষা-ভবন ছিল। ইসলামের প্রথম দিকের বহু বিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন হতে থাকে এবং শিক্ষকদের জন্য সেগুলোতে বেতনেরও বন্দোবস্ত ছিল।
বহু মুসলিম স্থাপত্য ভবনের মতো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও পয়সার কোনো কার্পণ্য করা হতো না এবং এর পাশাপাশি সৌন্দর্যের বিষয়টিও বিশেষ বিবেচনায় থাকতো।
শিক্ষার চারটি স্তর
বিদ্যালয়ের বেড়ে উঠার সাথে সাথে সেগুলোতে কী শেখানো হচ্ছে এবং কোন স্তরে শেখানো হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে বিদ্যালয়কে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাত্যহিক পাঠশালা, উচ্চ বিদ্যালয় বা পাঠক পাঠশালা, হাদীছের পাঠশালা এবং চিকিৎসা পাঠশালা।
প্রাত্যহিক পাঠশালাগুলো সাধারণ বিষয়সমূহ শিক্ষা দিতো এবং এগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমতুল্য ছিল। পাঠ শেষে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সনদপত্র (সার্টিফিকেট) প্রদান করা হতো, যাতে তারা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারে। প্রাত্যহিক বিদ্যালয়গুলো বেশ সাধারণ ছিল এবং প্রতিটি গ্রামেই এমন বিদ্যালয়ের দেখা মিলতো।
দারুল কুরা বা পাঠক পাঠশালাগুলোতে আরবী ভাষা, কুরআন তিলাওয়াত ও কিরাতের পারদর্শিতা শেখানো হতো।
দারুল হাদীছ বা হাদীছের পাঠশালাগুলো নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর হাদীছ গবেষণা ও শিক্ষার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ছিল। এখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় সমতুল্য ডিগ্রি প্রদান করা হতো, যাতে তারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে পারে।
চিকিৎসার জন্য পূর্ণভাবে নিবেদিত প্রথম বিদ্যালয় ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে প্রতিষ্ঠত হয়। এর আগে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় শিক্ষা হাসপাতাল এবং শিক্ষানবিশির মাধ্যমে চর্চা করা হতো। মহামতি অটোমান সুলতান সুলায়মানের শাসনকাল ১৬শ শতাব্দির আগ পর্যন্ত চিকিৎসা বিদ্যালয় তেমনভাবে বিকশিত হয়নি।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের উঠানের সাথে একটি, দুটি, তিনটি অথবা চারটি আয়ওয়ান (উঠানের দিকে সরাসরি উন্মুক্ত বিশালাকার খিলানাকৃতির হলঘর) থাকতো, যা পাঠদান এবং একইসাথে সালাত আদায়, থাকার কক্ষ এবং ওজুখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রাষ্ট্র অথবা খলীফা শিক্ষাদানের ব্যাপারে তদারকি করতেন এবং শিক্ষাদানের পূর্বে শিক্ষকদের নিকট অনুমতি থাকতে হতো।
১৪শ শতাব্দির মুসলিম শিক্ষাবিদ ইবনুল হাজ্জের এক্ষেত্রে অনেক কিছু বলার আছে, তিনি বলেন, “বিদ্যালয়কে অবশ্যই বাজার অথবা ব্যস্ত সড়কের পাশে হতে হবে এবং তা কোনো জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় হতে পারবে না... এটা শিক্ষাদানের স্থান। শ্রেণিকক্ষ পাঠের উপযুক্ত করা, দর্শনার্থীদের আসনের ব্যবস্থা করা, ঘুমন্ত ছাত্রদের জাগানো, করণীয় ও বর্জনীয় ব্যাপারে সতর্ক করা এবং শিক্ষকের পাঠদান শ্রবণ নিশ্চিত করতে শিক্ষকের একজন প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন। শ্রেণিকক্ষে কথা-বার্তা বলা, হাসাহাসি করা এবং কৌতুক বলা নিষিদ্ধ।”
১৫শ শতাব্দিতে অটোমানগণ তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও এডিরনের মতো শহরে শিক্ষা কমপ্লেক্স-ভবন স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাদের বিদ্যালয় ব্যবস্থাকে কুল্লিয়া বলা হতো এবং ওই শিক্ষা ক্যাম্পাসে সাধারণত মসজিদ, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, গণ রান্নাঘর ও খাবার ঘর পর্যন্ত থাকতো। এগুলো বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন, চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং কখনো কখনো থাকার ব্যবস্থা প্রদানসহ শিক্ষাকে জনগণের মাঝে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিল। ইস্তাম্বুলের ফাতেহ কুল্লিয়া এমনই একটি কমপ্লেক্স ভবন ছিল, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা দেয়ার জন্য ১৬-টি বিদ্যালয় ছিল।
এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ কোথা থেকে আসতো? ট্যাক্স থেকে তেমন একটা আসতো না, বরং তা ফাউন্ডেশনের আদলে বিভিন্ন দান থেকে সংগৃহীত সরকারি অনুদান থেকে আসতো, যা ওয়াক্ফ নামে পরিচিত। ফাউন্ডেশনের দলিলপত্রের আওতায় ইসলামে বিশ্বাসী যে কেউ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারতো। ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের বেতন, আবাসন, শিক্ষার্থীদের খাবার এবং যাদের প্রয়োজন, তাদের জন্য বৃত্তির সুবিধা ওই ওয়াফ্ফের অর্থ দ্বারা বহন করা হতো।
শিক্ষাকে এতটা সম্মান দেয়ায় দু'হাত ভরে মুসলিম জনসাধারণ দান করতো এবং যার ফলে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। ১৪শ শতাব্দির মুসলিম পর্যটক, ইবনে বতুতা শতভাগ দানে চলা শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে বলেন: “কেউ যদি বিদ্যা শিক্ষার একটি কোর্সে ভর্তি হতে চাইতো কিংবা নিজেকে ধর্মীয় জীবনযাত্রায় নিয়োজিত করতে চাইতো, তবে সে তার এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সব ধরনের সহায়তা লাভ করতো।”
"বিদ্যালয়ে মানুষকে শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে মুসলিমগণ যে পরিমাণ উদারতার স্বাক্ষর রেখেছে, মূলত তা ছিল তাদের সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ লাভ ও দ্রুত বিকাশের অন্যতম প্রধান কারণ। শিক্ষা ওই সভ্যতাতে এতটাই বৈশ্বিকভাবে বিস্তৃত ছিল যে, এটা বলা হতো যে, (ওই সময়) লিখতে ও পড়তে জানে না, এমন মুসলিম খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর ছিল।" -শিক্ষাবিদ, ই. এইচ. ওয়াইল্ডস
একবিংশ শতাব্দির প্রায় সকল শিক্ষার্থী এমন বিনামূল্যে শিক্ষা লাভ করতে ব্যাকুল হয়ে উঠবে, যদিও ১৪শ শতাব্দি বেশ দূরের বলে মনে হয়, তথাপি বর্তমানের খুব কম প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি এবং আনুষাঙ্গিক সহায়তা প্রদান করে থাকে।
📄 বিশ্ববিদ্যালয়
আজ যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি লোক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য আবেদন করে। জ্ঞানের প্রতি এই তৃষ্ণাটাই ছিল মধ্যযুগীয় মুসলিমদের হৃদয় মনি, যেহেতু কুরআন তাদেরকে জ্ঞানার্জন, নিরীক্ষণ এবং অনুধাবনের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছে। অর্থাৎ গোটা মুসলিম বিশ্বের মসজিদ, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, মানমন্দির এবং শিক্ষকদের গৃহগুলোতে উচ্চতর বিষয়সমূহ কেবল পড়ানোই হতো না, বরং জ্ঞান ও শেখার এই সংস্কৃতি অবশেষে ইউরোপে পা রাখে।
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মাঝে কিছুটা যুগপৎ সাদৃশ্য রয়েছে। মূলত উভয় শিক্ষাই মসজিদে শুরু হতো। 'বিশ্ববিদ্যালয়' শব্দটির আরবী জামেয়া, যা মসজিদের জন্য ব্যবহৃত আরবী জামি' শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। দৃশ্যত আরবীতে ধর্ম চর্চার স্থান এবং উচ্চতর জ্ঞানার্জনের স্থান যুগপৎভাবে সংযুক্ত, যার নিকটতম কোনো নজির অন্য কোনো সভ্যতা বা ভাষায় নেই। বস্তুত, ইসলামের কিছু মসজিদই ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়।
বিখ্যাত মসজিদভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে রয়েছে আল-আযহার, যা ১০৩০ বছর ধরে আজও বিদ্যমান। মিশরে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটা বহু শ্রেষ্ঠ বিদ্বানকে আকৃষ্ট করেছে। আল-আযহার তার বয়স এবং তার প্রাক্তন কৃতী ছাত্রদের জন্যও বেশ পরিচিত: পরীক্ষালব্ধ আলোকবিজ্ঞানের জনক ইবনুল হাইছাম এখানে দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়েছেন এবং ১৪শ শতাব্দির শীর্ষস্থানীয় সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদূন এখানে শিক্ষকতা করেছেন।
আরেকটি সুবিশাল মসজিদভিত্তিক কলেজ কমপ্লেক্স ছিল মরক্কোর ফেয নগরীতে অবস্থিত আল-কায়রাওয়ান। এই বিশ্ববিদ্যালয় মূলত ইদরিসীদের শাসনামলে ফাতিমা আল-ফিহরী নামের এক ধার্মিক ও পুণ্যবতী যুবতী নারী কর্তৃক ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়। তিনি অত্যন্ত বিদুষী ছিলেন এবং সফল ব্যবসায়ী পিতা থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে এই প্রতিজ্ঞা করেন যে, নিজ শহর ফেযের জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে তিনি তার পুরো সম্পত্তি দিয়ে একটি মসজিদভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন।
সানকুরি বিশ্ববিদ্যালয়
মুসলিম ভূমির একেবারে দক্ষিণে ছিল তিমবাকতুর সানকুরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এটা ছিল মালি, ঘানা ও সঙ্গাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান।
৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিমবাকতুর বিদ্বান প্রধান বিচারপতি আল-কাদী আকলিব মাহমুদ ইবনে উমর দ্বারা সানকুরি মসজিদে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন ঘটে। মসজিদের অভ্যন্তরীণ দরবার মক্কার কাবাঘরের আয়তনের একদম অনুরূপ ছিল। একজন বিত্তবান মানদিকা নারী সানকুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন করেন এবং এটাকে জ্ঞান ও শিক্ষার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এটা ক্রমশ উন্নতি করতে থাকে এবং ১২শ শতাব্দিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫,০০০-এ পৌঁছায়, যা ১০০,০০০ অধিবাসীর শহরের সাপেক্ষে বেশ বড় সংখ্যা।
বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক স্বাধীন কলেজ ছিল এবং প্রতিটি কলেজ একজন শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হতো। সেখানে পড়ানো বিষয়গুলোর মাঝে কুরআন, ইসলামী শিক্ষা, আইন, সাহিত্য, চিকিৎসা, সার্জারি, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, দর্শন, ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস এবং শিল্পকলা উল্লেখযোগ্য ছিল।
এই প্রতিষ্ঠান কেবল মেধা ও মনন বিকাশের তাত্ত্বিক কেন্দ্র ছিল না, বরং শিক্ষার্থীরা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যবসার নিয়ম-কানুন ও নীতি-নৈতিকতা শেখার কাজেও সময় ব্যয় করতো। এই কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যবসা, কাঠমিস্ত্রি, কৃষি, মৎস, নির্মাণ, জুতা প্রস্তুত, দর্জিগিরি ও নৌযান চালনা শিক্ষা দিতো।
পিএইচডি ডিগ্রির সমতুল্য 'উচ্চতর' ডিগ্রি লাভ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগতো এবং এর মাধ্যমে বিশ্ব সেরা পণ্ডিত বেরিয়ে আসতো, যারা তাদের প্রকাশনা ও তাদের পাণ্ডিত্য দ্বারা স্বীকৃত ছিল। পিএইচডি থিসিসকে রিসালা বলা হতো এবং যারা এই ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষা সমাপ্ত করতো, তাদেরকে আয়াতুল্লাহ বলা হতো। ইরানের কুম ও ইরাকের নাজাফের শীয়া ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আজও এই পরিভাষা ব্যবহৃত হয়।
তিনি ভবনের নকশার ক্ষেত্রে এই শর্ত আরোপ করে দেন যে, ভবন নির্মাণের পুরো উপকরণ একই এলাকার হতে হবে। এই নির্মাণ প্রকল্প শুরু হওয়ার দিন থেকে ক্যাম্পাসের নিমার্ণ কাজ শেষ হওয়ার দিন পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন রোযা রেখেছিলেন।
সুবিশাল মসজিদগুলোর মতো আল-কায়রাওয়ান শীঘ্রই ধর্মীয় শিক্ষা ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়, ক্রমান্বয়ে এখানে সব ধরনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটা নিজের নাম ইতিহাসে পাকাপোক্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি সুসজ্জিত ও প্রয়োজনীয় উপকরণ বিশেষভাবে জ্যোতিষশাস্ত্রীয় যন্ত্রপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। 'সময় নির্ণায়ক কক্ষ'-টি আঙুর্লাব, বালির ঘড়ি এবং সময় গণনার অন্যান্য যন্ত্রপাতি দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। জ্যোতির্বিদ্যার পাশাপাশি কুরআন, ইলমে কাلام (ধর্মতত্ত্ব), আইন, অলংকার শাস্ত্র, গদ্য, কবিতার চরণ রচনা, যুক্তিবিদ্যা, পাটিগণিত, ভূগোল এবং চিকিৎসাবিদ্যাও পড়ানো হতো। এছাড়াও এখানে আরবী ব্যাকরণ, মুসলিম ইতিহাস, রসায়ন ও গণিতের সাথে সম্পৃক্ত কিছু কোর্সও পড়ানো হতো। বৈচিত্রময় বিষয়াদি এবং শিক্ষার উচ্চমানের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের দূর-দূরান্তের বিদ্বান ও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে সফল হয়েছিল।
মসজিদভিত্তিক 'বিশ্ববিদ্যালয়'-গুলিতে স্থানীয় শিক্ষার্থীরাই শুধু ভর্তি হতো না, বরং প্রতিবেশী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখানে ভর্তি হতো। এর ফলে আব্বাসী খিলাফতের সময় ইরাকের বাগদাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসা, ঔষধ বিজ্ঞান, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যাসহ বহু বিষয় সিরিয়া, পারস্য ও ভারত থেকে আগত শিক্ষার্থীদের পড়ানো হতো।
কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কায়রোর বাহিরের এলাকার মিশরীয় শিক্ষার্থী ছাড়াও বিপুল সংখ্যক ভিনদেশী শিক্ষার্থী পড়াশুনা করতো।
"(বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে) বই উপহার দেয়া হতো এবং বহু বিদ্বান ব্যক্তি তার নিজস্ব গ্রন্থাগার নিজ শহরের মসজিদের নামে উইল করে দিতেন, যাতে তার গ্রন্থাগারের গ্রন্থগুলো সংরক্ষিত হয় এবং প্রতিনিয়ত যারা বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে, সেসব বিদ্বানের নিকট সেগুলো সহজলভ্য হয়। এভাবেই বেড়ে উঠে কর্ডোবা ও টলেডোর বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে গোটা বিশ্ব থেকে খ্রিস্টান ও মুসলিমগণ ভিড় জমাতেন।" • আর. এস. ম্যাককেনসেন, মুসলিম গ্রন্থাগার বিষয়ের একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক
তিউনিসিয়ার যাইতুনা মসজিদে ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, নথি সংরক্ষণ, গবেষণার নিয়ম-নীতি, সৃষ্টিতত্ত্ব, পাটিগণিত, জ্যামিতি, খনিজবিজ্ঞান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের উপর পাণ্ডুলিপি ছিল। তিউনিসিয়ার কায়রাওয়ানের আতিকা গ্রন্থাগারে ৪২০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে সেন্ট জেরোমের লেখা History of Ancient Nations-এর আরবী অনুবাদের কপি ছিল।
কোর্সগুলো কঠিন ছিল এবং বিশেষভাবে চিকিৎসাবিদ্যা বেশ শ্রমের ছিল, যেমনটি আজকের দিনের বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোতে চিকিৎসা অনুষদে বেশ দুরূহ ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরীক্ষণ চলতে থাকে। পাস নম্বরের চেয়ে কম যেকোন কিছুর মানে হচ্ছে: ওই ব্যক্তি চিকিৎসা শাস্ত্র চর্চা করতে পারবে না।
আইনের শিক্ষার্থীরা স্নাতক পর্যায়ের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেত এবং তারা যদি সফলভাবে এই ধাপ অতিক্রম করতো, তবে তারা তাদের শিক্ষকদের গবেষণা সহকর্মী হিসেবে মনোনীত হতো। কেবল তখনই তারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাতে অধ্যয়নের সুযোগ পেত, যা অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতো। নিজেদের পেশাগত আসন অধিকারের আগ পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ প্রায় ২০ বছর পর্যন্তও হতো। আইন পেশা চর্চার আগে আইনের শিক্ষার্থীদের নিকট আইনে পারদর্শীতার প্রাধিকারদানের সনদপত্র এবং লাইসেন্স থাকতে হতো।
এই সনদপত্রগুলো ইজাযা নামে পরিচিত এবং সম্ভবত তা 'baccalareus' (বাকালারিয়াস ব্যাচেলর ডিগ্রি) শব্দের উৎস হয়ে থাকবে, যা দ্বারা নিম্নতর বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিকে বোঝায়। ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে পোপ নবম গ্রেগরি দ্বারা প্রবর্তিত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ব্যবস্থাতে সর্বপ্রথম এই পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এটা সম্ভবত সনদপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের ব্যবহৃত আরবী বাক্যের পশ্চিমা সংস্করণ। 'বি-হাক্কির রিয়াওয়াহ' দ্বারা: অন্যের আজ্ঞাবলে শিক্ষাদানের অধিকার লাভকে বোঝায় এবং এই বাক্য সনদপত্রে ব্যবহৃত হতো। যখন কোনো শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত করতো, তখন তাকে এই লাইসেন্স দেয়া হতো এবং এই বাক্যের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে: তার এখন 'শিক্ষাদানের অধিকার' রয়েছে।
অধ্যাপকের আসন
একজন অধ্যাপককে 'আসন' দেয়া কিংবা কোনো সভার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিকে 'সভাপতি' (chair) বলে সম্বোধনের এই সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠলো?
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক হাজারের বেশি সময় আগে, পাঠচক্র বা হালাক্বায়ে ইলম বা হালাক্বাহ-তে আপনি উচ্চাসনে বসা অধ্যাপককে ঘিরে শিক্ষার্থীদের জড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখবেন। এভাবে বসার কারণে অধ্যাপক সবার নিকট দৃশ্যমান ও শ্রুতিগোচর হতেন। এই অধ্যাপক হয় খলীফা কিংবা আলিমদের কমিটি দ্বারা নির্বাচিত হতেন এবং খলীফা কর্তৃক যখন কোনো অধ্যাপক কোনো একটি জামে মসজিদে নিয়োগ পেতেন, তখন তিনি আমৃত্যু ওই আসন অলংকৃত করে রাখতেন। আসন এভাবে অলংকৃত করে রাখার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেমন: আলী আল-কাত্তানী ১০৬১ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছর তার আসন অলংকৃত করে রেখেছিলেন।
বর্তমানে বিশ্বের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য International Baccalaureate (ব্যাচেলর/স্মাতক সম্পন্ন করাকে) ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মুসলিমগণ উচ্চশিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। সেখানে ছিল প্রবেশিকা পরীক্ষা, চূড়ান্ত পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ, ডিগ্রির সনদপত্র, পাঠচক্র, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং বৃত্তি। প্রকৃতপক্ষে, মধ্যযুগীয় 'বিশ্ববিদ্যালয়' এবং আজকের দিনের শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। এমনকি তাদের কলেজ কোর্স এবং পাণ্ডিত্যে বুৎপত্তির জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল।
মুসলিম শিক্ষা পদ্ধতি ১২শ শতাব্দীতে মধ্যযুগীয় ইউরোপকে নাড়া দেয়। পূর্ববর্তী ৫০০ বছরের আরবী কাজগুলোর মধ্যযুগীয় লাতিন অনুবাদের এক হিড়িক শুরু হয়। যাতে করে পরীক্ষালব্ধ এসব যুক্তিনির্ভর ধারণা ও তত্ত্ব নতুন পাঠক সমাজের কাছে সহজলভ্য হয়। চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ উপকরণাদি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে পদাঘাত করতে শুরু করে এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাঝে সংঘাত থাকার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। চার্ট্রেসের গির্জার বিদ্যালয়ে ১১৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে থিয়েরি অব চার্ট্রেস (Thierry of Chartres) শিক্ষা দিতে শুরু করেন যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সংগতিপূর্ণ, যা রেনেসাঁর পথ প্রশস্ত করে।
পশ্চিম ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ইতালির সালেরনোতে, যা ১১শ শতাব্দীর শেষের দিকে কন্সট্যান্টিন দ্য আফ্রিকানের আগমনের পর প্রাণ ফিরে পায়। ফ্রান্সের মন্টেপেলিয়ার শহরটি সালেরনোরই উপশহর এবং তা ছিল মুসলিম চিকিৎসা ও জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চার প্রধান কেন্দ্র। বিপুল সংখ্যক মুসলিম-ইহুদি অধিবাসী নিয়ে এই শহর মুসলিম স্পেনের কাছাকাছি ছিল।
১২শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ার হাউজ স্থানান্তরিত হয় 'শিক্ষকদের শহর' হিসেবে পরিচিত প্যারিসে, যেহেতু সদা ভ্রমণরত শিক্ষকদের বদৌলতে আরবী গ্রন্থগুলোর জ্ঞানের বিস্তৃতি চতুর্দিকে অব্যাহত থাকে। প্রকৃতপক্ষে আজকের অনেক ঐতিহাসিকই বলেন যে, অক্সফোর্ডের মতো প্রথম দিকের ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামো এসব ভ্রমণরত, উদারমনা বিদ্বান এবং ক্রুসেড অভিযান ফেরত ব্যক্তিবর্গের হাত ধরেই রচিত হয়। ক্রুসেডাররা কর্ডোবার মতো স্থানে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিদর্শনের পাশাপাশি ফেরার পথে ধর্মীয় চিন্তায় সীমাবদ্ধ গ্রন্থাবলীর পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর তত্ত্বের উপর রচিত আরবী গ্রন্থগুলোর অনুবাদ সাথে করে নিয়ে আসে।
📄 বায়তুল হিকমা
বাগদাদের সোনালি দিন ছিল ১২০০ বছর পূর্বে, তখন এটা ছিল ইসলামী বিশ্বের সমৃদ্ধ রাজধানী। প্রায় ৫০০ বছর ধরে শহরটি সংস্কৃতি ও বিদ্বানদের শ্রেষ্ঠ অংশ নিয়ে গর্ব করেছে। শহরটি খলীফা হারুন উর-রশিদ, আল-মামুন, আল-মুতাদীদ ও আল-মুক্তাফীর শাসনামলে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছায়।
বাগদাদ নগরীর এই জৌলুসের চূড়ায় পৌঁছা এবং তা ধরে রাখার পিছনে ওইসব খলীফার অবদান অগ্রগণ্য ছিল, যারা বৈশ্বিক ও যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাদি সংগ্রহের বিষয়কে তাদের ব্যক্তিগত আগ্রহে পরিণত করেছিলেন। গ্রন্থের পাশাপাশি তারা বায়তুল হিকমা নামের অন্যতম ইতিহাস শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম বিদ্বানদের একত্র করেছিলেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ার-হাউজ বাগদাদের শক্তিকে দ্বিগুণ করে দেয়, অর্থাৎ এই নগরী ছিল শিল্পকলা, বিজ্ঞান এবং জ্ঞানী-গুণীজনের সদর দপ্তর। শিল্পকলা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিকাশ ও বিস্তৃতিতে এই নগরী যে ভূমিকা রেখেছিল, তা ছিল সত্যই অভূতপূর্ব।
বায়তুল হিকমার বিকাশের পর্যায় অনুসারে এটা দুটো নামে পরিচিত। খলীফা হারুন উর-রশিদের সময় এক কক্ষবিশিষ্ট অবস্থায় এটা খিযানাতুল হিকমা (প্রজ্ঞার সংগ্রহশালা) নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে খলীফা আল-মামুনের সময় যখন এটা বৃহৎ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়, তখন এটা বায়তুল হিকমা (প্রজ্ঞার নীড়) নামে পরিচিতি লাভ করে। এটাতে বেশ বড় গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে বিভিন্ন ভাষায় বিজ্ঞানের নানা শাখা-প্রশাখা নিয়ে লেখা গ্রন্থের এক বিশাল সংগ্রহশালা ছিল; আর এভাবেই তা পরিণত হয় বৈজ্ঞানিক একাডেমিতে।
খলীফা মুহাম্মদ আল-মাহদী তার সমর অভিযানে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিসমূহ সংগ্রহের প্রথম উদ্যোগ হাতে নেন। তার পুত্র খলীফা আল-হাদী এই ধারা অব্যাহত রাখেন এবং পরবর্তীতে ৭৮৬ থেকে ৮০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন কার্য পরিচালনাকারী তার পুত্র খলীফা হারুন উর-রশিদ বৈজ্ঞানিক সংগ্রহশালা ও বিজ্ঞান একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ৮১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০ বছর শাসন চালানো খলীফা আল-মামুন বায়তুল হিকমা-কে সম্প্রসারিত করেন এবং বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার জন্য পৃথক পৃথক বিভাগ চালু করেন। যার ফলে স্থানটি আলিম, শিল্পকলার পণ্ডিত, বিখ্যাত অনুবাদক, লেখক, জ্ঞানীগুণী, কবি এবং বিভিন্ন শিল্প ও কলাকৌশলের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমাগমে টইটম্বুর হয়ে পড়ে।
মধ্যযুগীয় এই মেধাগুলো অনুবাদ, পাঠচক্র, লেখা ও আলোচনার কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিদিনই একত্র হতেন। এই স্থান ছিল বিশ্বজনীন তারকার এক মিলন মেলা। লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা বা যোগাযোগের সাধারণ ভাষা হিসেবে আরবী ব্যবহারের পাশাপাশি এখানে ব্যবহৃত হতো: ফারসি, হিব্রু, সিরিয়াক, আরামায়িক, গ্রিক, লাতিন এবং সংস্কৃত - যা প্রাচীন ভারতীয় গণিতের পাণ্ডুলিপিসমূহ অনুবাদে ব্যবহৃত হতো।
বিখ্যাত অনুবাদকদের মাঝে ছিলেন ইউহান্না ইবনুল বিতরকী আত-তুরজুমান, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়: 'বিশপের পুত্র, অনুবাদক ইউহান্না'। চিকিৎসাশাস্ত্রের চেয়ে তিনি দর্শন গ্রন্থ অনুবাদে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি ১৯ অধ্যায়ে বিন্যস্ত এরিস্টটলের The Book of Animals গ্রন্থটি লাতিন থেকে আরবীতে ভাষান্তর করেন। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটাস ও গ্যালেন রচিত গ্রন্থগুলোর আরেক বিখ্যাত অনুবাদক ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক।
বলা হয় যে, সিসিলির রাজার কাছে খলীফা আল-মামুন দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থে সমৃদ্ধ সিসিলি গ্রন্থাগারের পুরো ক্যাটালগ চেয়ে পত্র লেখেন। সিসিলির রাজা সিসিলি গ্রন্থাগার থেকে গ্রন্থের কপি পাঠিয়ে পত্রের ইতিবাচক জবাব দেন।
গ্রন্থ পরিবহনে নানা পন্থা অবলম্বন করা হতো। আধুনিক বিমানের ব্যবস্থা না থাকায়, আল-মামুন হস্তে লেখা গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিসমূহ খোরাসান থেকে বাগদাদে বহন করে আনার জন্য শত উটের পাল ব্যবহার করেছিলেন।
খলীফা আল-মামুন বাইযান্টিন সম্রাটেরও দারস্থ হয়েছিলেন। কেননা খলীফা আল-মামুন চেয়েছিলেন তার বৈজ্ঞানিকদের দিয়ে বাইযান্টিন সম্রাটের অধীনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করাতে। সম্রাট তাতে রাজি হলে বৈজ্ঞানিকগণ সেখানে যায়; এবং এর পাশাপাশি তাদেরকে গ্রিক বিদ্বানদের যেকোন গ্রন্থ সাথে করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দিয়ে দেয়া হয়।
বায়তুল হিকমা প্রতিষ্ঠানকে খলীফা আল-মামুন কেবল সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার হালই ধরেননি, বরং একইসাথে তিনি বৈজ্ঞানিক ও বিদ্বানদের আলোচনাতেও অংশ নিতেন। মারসাদ আল-ফালাক্বী নামে তিনি একটি জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। সানাদ ইবনে আলী আল-ইয়াহুদী নামের এক ইহুদি এবং ইয়াহইয়া ইবনে আবী মানসূর নামের এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ খলীফার এই জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্র পরিচালনা করতো। এরা উভয়েই আল-মামুনের ব্যক্তিগত জ্যোতির্বিদ ছিল।
আল-মামুন তার পিতার মতো বহু উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মানমন্দির ও টেক্সটাইল বা বস্ত্র ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন করেছিলেন। বলা হয় যে, তার শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৩২ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তিনি বিজ্ঞ পণ্ডিতগণের একটি শ্রেণিকে তার জন্য বিশ্ব মানচিত্র প্রস্তুত করতে বলেছিলেন এবং তারা তা সম্পন্ন করেছিল। ওই মানচিত্র 'আল-মামুনের মানচিত্র' (আস-সুরাহ আল-মামুনিয়াহ) নামে পরিচিত। মানচিত্রটি টলেমি ও অন্যান্য গ্রিক ভূগোলবিদদের জীবদ্দশায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়।
বায়তুল হিকমার শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানদের মাঝে ছিলেন বনী মূসার তিন ভাই- মুহাম্মদ, আহমাদ ও আল-হাসান, যারা গণিতজ্ঞ ও ট্রিক ডিভাইসের আবিষ্কারক হিসেবে পরিচিত; আল-খাওয়ারিযমী - বীজগণিতের 'জনক'; আল-কিন্দী - ক্রিপ্টোলজি (সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার) ও সঙ্গীত তত্ত্বের উদ্ভাবক; সাইদ ইবনে হারুন আল-কাতিব - অনুলেখক; হুনাইন ইবনে ইসহাক আল-ইবাদী - চিকিৎসক ও অনুবাদক এবং তার পুত্র ইসহাক। এই নামগুলো আমাদের এই গ্রন্থে বারবার আসতে থাকবে। কেননা এই ব্যক্তিরাই বাস্তব পরীক্ষণের ভিত্তিতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানের সুবিশাল ইমারত নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। আজ আমরা যা জানি, তার অধিকাংশই তাদের নির্মিত ইমারতের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
অবশ্য আমাদেরকে উপরে বর্ণিত আব্বাসী বায়তুল হিকমা-কে ১০০৮ খ্রিস্টাব্দে খলীফা আল-হাকিম কর্তৃক কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত ফাতিমী দারুল হিকমা থেকে আলাদা করতে হবে, যা ১৬৫ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। ইসলামী বিশ্বের প্রাচ্যের শহরগুলোতে ৯ম ও ১০ম শতাব্দিতে বাগদাদের বায়তুল হিকমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বহু দারুল ইলম বা বিজ্ঞানাগার, আরও ভালোভাবে বললে জ্ঞানগৃহ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।
অপ্রতিদ্বন্দ্বি জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র
২০০৪ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকায় ব্রায়ান হুইটেকার লিখেন:
“গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা, ভূগোলসহ মানবিক ও বিজ্ঞানের বিষয়াদি অধ্যয়নের জন্য বায়তুল হিকমা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বি এক কেন্দ্র। পারসীয়, ভারতীয় এবং গ্রিক গ্রন্থাদি - এরিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটাস, ইউক্লিড, পিথাগোরাস এবং অন্যান্য মনীষীদের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে আহরণ করে বায়তুল হিকমার বিদ্বানগণ গড়ে তোলে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জ্ঞান সংগ্রহশালা এবং এর উপর ভিত্তি করে তারা এগিয়ে নেয় নিজেদের আবিষ্কারের অগ্রযাত্রাকে."..
বায়তুল হিকমা বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ার হাউজ
বাগদাদের বিশ্বমানের একাডেমি, যা দূর-দূরান্তের বিদ্বানদের আকৃষ্ট করেছিল
উল্লেখযোগ্য পরম্পরা: বীজগণিতে বিশেষ অবদান; চিকিৎসা, দর্শন ও গণিত শাস্ত্রের গ্রন্থাদির অনুবাদ।
স্থান: বাগদাদ, ইরাক
তারিখ: ৯ম শতাব্দির গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত
প্রধান ব্যক্তিত্ব: খলীফা আল-মামুন, যিনি তার পিতার গড়া প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধির চূড়ায় নিয়ে যান
এক হাজার বছর আগে বাগদাদ ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও ধনী শহরগুলোর একটি। কিন্তু এর সম্পদ অর্থের সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। দুই শতাব্দিরও বেশী সময় ধরে এটা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবাসস্থল: এটা ছিল দুনিয়ার দূর-দূরান্তের বিদ্বানদের আকর্ষণকারী এক প্রতিষ্ঠান। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা থেকে শুরু করে প্রাণিবিদ্যা- এই প্রতিষ্ঠান ছিল মুসলিম সভ্যতার গবেষণা, চিন্তা এবং বিতর্কের প্রধান কেন্দ্র- এক কথায় তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ার হাউজ।
এই একাডেমিতে পণ্ডিতগণ বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শন শাস্ত্রের বিশাল সংগ্রহশালার গ্রন্থাদি থেকে সহায়তা নিতে পারতেন। যেই খলীফাগণ এই জ্ঞানগৃহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা এখানে বিশ্বমানের এক গ্রন্থাগারের গোড়াপত্তন করেন, যেখানে বহু প্রাচীন সভ্যতার লিখিত পাণ্ডুলিপি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে শাসন করা খলীফা হারুন উর- রশিদ তার পিতা ও দাদার সংগৃহিত পাণ্ডুলিপিগুলো দিয়ে এই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তিন যুগ অতিবাহিত হতে না হতেই সংগ্রহশালাটি এতটাই বিস্তৃতি লাভ করে যে, তার পুত্র খলীফা আল-মামুন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জন্য এই গৃহকে সম্প্রসারিত করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও অসংখ্য গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন, যেন আরও অধিক সংখ্যক পণ্ডিতগণ তাদের গবেষণা চালিয়ে যেতে পারেন। ৮২৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
বায়তুল হিকমাতে আরবী, ফারসি, আরামায়িক, গ্রিকসহ নানা ভাষা বলা ও পড়া হতো। দক্ষ পণ্ডিতগণ প্রাচীন লেখাগুলো আরবীতে অনুবাদের জন্য কাজ করে যেতেন, যেন বিদ্বানগণ সেগুলো উপলব্ধি ও সমালোচনার পাশাপাশি সেগুলোর উপর নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সৌধ নির্মাণ করতে পারে। একাডেমির শীর্ষস্থানীয় জ্যোতির মাঝে আল-কিন্দী একজন, যিনি এরিস্টটলের অনুবাদে নিযুক্ত ছিলেন, অন্যদিকে হুনাইন ইবনে ইসহাক হিপোক্রেটাসের অনুবাদে নিয়োজিত ছিলেন। বায়তুল হিকমার গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধ করতে খলীফা আল-মামুন অনুবাদক ও পণ্ডিতদের উৎসাহিত করতেন এবং এমনটি বলতে শোনা যায় যে, প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ গ্রন্থের জন্য তিনি ওই গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে তাদের মূল্য পরিশোধ করতেন।
জ্ঞানের এই সফল স্থানান্তর পরবর্তীতে ১২শ শতাব্দির স্পেনে প্রতিফলিত হয়। ওই সময় টলেডো ছিল আরেকটি বিশাল অনুবাদ প্রচেষ্টার প্রধান কেন্দ্র কিন্তু এই সময় ছিল আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদের কাল। আরবী গ্রন্থাদি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন গ্রিক লেখনীগুলো সবার সম্মুখে আসে এবং খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম পণ্ডিতগণ শহরটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে সমাবেত হতে থাকেন। একত্রে তারা প্রাচীন গ্রিসের লেখনীগুলো ও মূল আরবী প্রবন্ধগুলো লাতিন ভাষায়, অতঃপর লাতিন থেকে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। এখানে এবং দক্ষিণ ইউরোপের অন্যত্র এরিস্টটলের কিছু গ্রন্থ মাইকেল স্কট কর্তৃক আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুদিত হয়। ক্রিমোনার জেরার্ড আয-যাহরাবীর চিকিৎসা বিশ্বকোষ এবং আর-রাযীর রসায়ন বিষয়ক লেখাগুলোর অনুবাদ করেন।
বায়তুল হিকমার পণ্ডিতগণ যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন, বর্তমান যুগে এসেও তার প্রভাব সদা বিদ্যমান। 'আলজেবরা' (বীজগণিত) শব্দটি এসেছে পণ্ডিত আল-খাওয়ারিযমী রচিত "আল-জাবর ওয়াল মুকাবালা" গ্রন্থের শিরোনাম থেকে। ৯ম শতাব্দীর শুরুর দিকে বায়তুল হিকমাতে কাজ করার বদৌলতে তিনি বীজগণিতকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করান। আল-खাওয়ারিযমীর উত্তরসূরি আল-কারাজী এই তত্ত্বগুলোর পরিমার্জন ও সমৃদ্ধি সাধন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি বীজগণিত চর্চার নতুন এক ধারার সূচনা করেন, যা শত শত বছর ধরে সমৃদ্ধ হতে থাকে। এই পণ্ডিতগণ এবং অন্যরা তাত্ত্বিক গাণিতিক ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেন, যার উপর আধুনিককালের হিসাব-নিকাশ নির্ভর করে।
খলীফা আল-মামুনের দূরদৃষ্টি ও তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান সুস্পষ্ট। Almanon (আলমানন) নামে চাঁদের একটি গর্তের নামকরণের মাধ্যমে তার নাম আজও বেঁচে আছে।
📄 গ্রন্থাগার ও বই বিপণন
বলা হয় যে, আব্বাসী খলীফা আল-মামুন গ্রিক থেকে আরবী ভাষায় অনুবাদ করা প্রতিটি গ্রন্থের জন্য ওই গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ অনুবাদকদের পারিশ্রমিক হিসেবে দান করতেন। এ ধরনের ঔদার্য বইয়ের বিপুল সরবরাহের পথ প্রশস্ত করে, যা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পরবর্তী প্রজন্মের সবার নজর এবং সম্মান আদায় করে। আব্বাসী খিলাফতকালে শত শত গ্রন্থাগার গড়ে উঠে, যার অধিকাংশই ছিল ব্যক্তি মালিকাধীন, আর এভাবেই শত-হাজার গ্রন্থ পাঠকদের নিকট সহজলভ্য হয়ে পড়ে।
জ্ঞানের এসব শাখায় এত পুস্তকের বিস্তৃতির পূর্বে ৭ম শতাব্দিতে মুসলিমদের নিকট কেবল একটি গ্রন্থই ছিল কুরআন। কুরআনের ওহী নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর নিকট আয়াত হিসেবে নাযিল হয়। নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বহু সাহাবা মুখস্ত করে ফেলতেন এবং ওহী লেখকগণ সহজলভ্য লেখনী উপাদান, যেমন: পাতা, বস্ত্র, হাড় ও পাথরে ওই আয়াতগুলো লিখে রাখতেন। পরবর্তীতে ওহী নাযিলের ধারা সমাপ্ত হলে আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক গোটা কুরআন তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। কুরআনের বিন্যাসে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নবী (ﷺ) এটার সংরক্ষণে কোনো ঘাটতি রাখেননি। কুরআন মুখস্ত করা এবং অন্যদের তা শেখানোর এক জীবন্ত কালচার তিনি তার অনুসারীদের মাঝে জন্ম দিতে সফল হয়েছিলেন, যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকলেই অংশ নিয়েছিল। প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য মোতাবেক কুরআন মুখস্তে নেমে পড়ে কেউ পুরো কুরআন, কেউ অর্ধেক, কেউ এক তৃতীয়াংশ। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থানান্তরিত হতে থাকে মৌখিক কুরআন, ইসলামী পরিভাষায় যা কিরাতে আম্মা। এজন্যই কুরআন লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপির মুখাপেক্ষী নয়, বরং লিখিত কুরআন কিরাতে আম্মা বা সর্বসাধারণের কিরাতের মুখাপেক্ষী। এ যেন বর্তমান সময়ের অডিও বুক (Audio Book)-এর মানবীয় সংস্করণ, যা বয়ে বেড়াচ্ছে হাজারো থেকে লাখো হাফিজ। সংরক্ষণের এ প্রক্রিয়া সত্যই অভূতপূর্ব।
পরবর্তীতে ইসলামের তৃতীয় খলীফা উছমান ইবনে আফফান (রা.) প্রস্তুত করেন কুরআনের একটি আদর্শ নুসখা। তার এই কাজের ফলশ্রুতিতে আরবী ভাষার পঠন ও লেখনীতে প্রমিতকরণের পথ প্রশস্ত হয় এবং এর মাধ্যমে কুরআনের বিস্তৃতি বেশ সহজ হয়ে উঠে। দুনিয়ার বড় বড় গ্রন্থাগারে আজও প্রায় ১৪০০ বছরের পুরানো উছমান (রা.)-এর সময়কালের পাণ্ডুলিপির নকল পাওয়া যায়।
গ্রন্থ ও পুস্তকাদির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বাভাবিক মানে দাঁড়াচ্ছে: মুসলিমগণ বই-পুস্তক সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার কাজকেও ভালোবাসে। বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধাসম্পন্ন এসব সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগার এবং সেইসাথে বহু স্বনামধম্য ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা মুসলিম বিশ্বের দূর-দূরান্তের পণ্ডিতদের আকর্ষণ করেছিল। এসব গ্রন্থাগারে উন্নতমানের কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় লেখাসমৃদ্ধ এবং চামড়ায় বাঁধানো বিভিন্ন আকারের বই ও পাণ্ডুলিপি ছিল।
৭৩২ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার তিউনিসে যাইতুনা মসজিদভিত্তিক কলেজ কমপ্লেক্সটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩শ শতাব্দিতে এই গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখ্যা ১০০,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
"যতক্ষণ আপনার নীরবতা প্রয়োজন, বই ততক্ষণ নীরব থাকে; যখন আলোচনায় মশগুল হতে চান, তখন তা সরব হয়ে উঠে। বই কখনো আপনার ব্যস্ততাতে বিঘ্ন ঘটায় না; কিন্তু যখনি আপনি নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন, তখন বই হয়ে উঠে আপনার সব থেকে ভালো সঙ্গী। বইয়ের মতো বন্ধু না কখনো প্রতারণা বা তোষামোদের পথ বেছে নেয়, আর না কখনো আপনার ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।"
আজ-জাহিয, ৮ম শতাব্দীর ইরাকের বসরার মুসলিম দার্শনিক ও বিদ্বান
বইয়ের সরকারি সংগ্রহশালাগুলো এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, এমন একটি মসজিদ, শিক্ষালয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল, যেখানে বইয়ের কোনো সংগ্রহশালা ছিল না। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলদের দ্বারা বাগদাদের পতনের আগ পর্যন্ত এই নগরীতে ৩৬-টি গ্রন্থাগার এবং কয়েক শ'য়ের উপর গ্রন্থ ব্যবসায়ী ছিল, যাদের অনেকেই ছিল প্রকাশক এবং যাদের অধীনে অনুলিপিকারদের দল কাজ করতো। কায়রো, আলেপ্পো, ইরানের বৃহৎ শহরগুলো, মধ্য এশিয়া এবং মেসোপটেমিয়াতে এ ধরনের বহু গ্রন্থাগার ছিল।
মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগারগুলোকে দারুল কুতুব বলা হতো এবং এগুলো ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। লেখক ও বিদ্বানগণ এখানে তাদের গবেষণার ফলাফল যুবক, পণ্ডিত ও সাধারণ শ্রোতাদের মিশ্র সমাবেশে তুলে ধরতেন। এ ধরনের আলোচনা সভায় যেকেউ অংশ নিতে পারতো। পেশাদার ওরাক্ব (নুস্সাখ) বা অনুলিপিকারগণ অতঃপর আলোচনার বিষয়বস্তুকে নকল করে গ্রন্থ বানিয়ে ফেলতেন। এমনকি সরকারিভাবে যখন গ্রন্থ লেখার দায়িত্ব দেয়া হতো, তখনও তা এভাবে প্রকাশিত হতো।
সিরিয়ার আলেপ্পো নগরেই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগার ছিল। দশ হাজারেরও অধিক পুস্তকে সমৃদ্ধ সায়ফিয়া নামে সুবিদিত এই গ্রন্থাগার সুবিশাল উমাইয়া মসজিদে অবস্থিত ছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনা মোতাবেক এই গ্রন্থগুলো শহরের বিখ্যাত শাসক সাইফুদ্দোলা উইল করে দান করেন।
সায়ফিয়া যেমন ছিল সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ, তেমনিভাবে তিউনিসের যাইতুনা মসজিদ কমপ্লেক্স ছিল সম্ভবত সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এতে লাখের কাছাকাছি পুস্তক ছিল এবং বলা হয় যে, হাবশী সাম্রাজ্যের অধিকাংশ শাসক এই গ্রন্থাগার রক্ষণাবেক্ষণ ও সমৃদ্ধকরণকে মর্যাদার ইস্যুতে পরিণত করেন এবং এ ব্যাপারে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতো। এক পর্যায়ে এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ১০০,০০০-কেও ছাড়িয়ে যায়।
৮ম শতাব্দীর মুসলিম দার্শনিক ও বিদ্বান আল-জাহিয ৫০ বছরের অধিক সময় অধ্যয়ন এবং ২০০-এরও অধিক গ্রন্থ রচনায় অতিবাহিত করার পর বাগদাদ থেকে নিজ বাড়ি বসরাতে প্রত্যাবর্তন করেন। তার এই বিস্তৃত লেখনীর মাঝে "কিতাবুল হাইওয়ান” (প্রাণিজগৎ) উল্লেখযোগ্য, যেখানে তিনি পিঁপড়াদের সামাজিক ব্যবস্থা, পশুপাখির মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং খাদ্যচক্র ও পরিবেশের প্রভাব পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা তুলে ধরেছেন। তার অন্যান্য গ্রন্থের মাঝে রয়েছে "আল-বয়ান ওয়াত তাবইয়ীন” (অলংকার ও বক্তব্য উপস্থাপন) এবং "কিতাবুল বুখালা” (কৃপণতা)। বস্তুত তিনি যথাযথ মৃত্যুই বরণ করেন; ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ৯২ বছর বয়সে নিজের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে অধ্যয়নকালে এক স্তুপ বই তার উপর পড়লে তিনি সেখানেই মারা যান।
গ্রন্থপ্রেমীদের মাঝে একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠে। মারা যাওয়ার পূর্বে তারা তাদের সংগৃহিত পাণ্ডুলিপিগুলো যে সংখ্যা কখনো হাজারও ছাড়িয়ে যেত – মসজিদভিত্তিক গ্রন্থাগারগুলোতে দান করে দিতেন, যেন সবাই তার সংগ্রহশালা থেকে উপকৃত হতে পারে। ঐতিহাসিক আল-জাবুরী বলেন, তুর্কি বংশোদ্ভূত নায়লা খাতুন নামের এক বিত্তশালী বিধবা নারী তার পরলোকগত স্বামী মুরাদ এফেন্দির নামে একটি মসজিদ গড়ে তোলেন, যার সাথে একটি বিদ্যালয় ও গ্রন্থাগার সংযুক্ত ছিল। ভ্রমণরত বিদ্বানদের কাছ থেকে গ্রন্থের আরেকটি সরবরাহ আসতো, বস্তুত মসজিদ কর্তৃক আয়োজিত
উমাইয়া গ্রন্থাগার
স্পেনের উমাইয়া শাসকদের অধীন কর্ডোবা গ্রন্থাগারে ৬০০,০০০-এরও অধিক পুস্তক ছিল। ৯৬১ থেকে ৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্পেন শাসন করা খলীফা দ্বিতীয় আল-হাকিমের জন্য পুস্তকের সান্নিধ্য এতটাই প্রিয় ছিল যে, বলা হয়, "সিংহাসনের চেয়ে পুস্তকের সান্নিধ্যই তাকে বেশি বিভোর করে রাখতো।”
বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও মনিহারী দ্রব্যের সরবরাহের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা মসজিদে গ্রন্থ ও পুস্তকাদি দান করে দিতেন। গ্রন্থাগারগুলোও বিশাল আয়োজনসমৃদ্ধ হতো। ১০ম শতাব্দির ইরানের শিরাজে অবস্থিত এসব কমপ্লেক্সের বিবরণ ঐতিহাসিক আল-মুকাদ্দিসী এভাবে দেন, "হ্রদ ও পানির নালাসহ ভবনগুলো বাগান দ্বারা বেষ্টিত ... সুউচ্চ গম্বুজ, উপর ও নিচ তলাসহ ... মোট ৩৬০-টি কামরা ... প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে ক্যাটালগ (গ্রন্থ তালিকা) তাকের উপর সাজানো ... কক্ষগুলো গালিচা দ্বারা সুসজ্জিত।" শিরাজ, কর্ডোবা ও কায়রোর গ্রন্থাগারগুলোর মতো কিছু কিছু গ্রন্থাগার মসজিদ ভবন থেকে পৃথক ছিল। ভবনগুলো বেশ প্রশস্ত এবং বই-পুস্তকাদি জমা করে রাখার সুসজ্জিত গ্যালারি, পাঠকক্ষ, পাণ্ডুলিপি থেকে অনুলিপি তৈরির কামরা ও সম্মেলন কক্ষসহ নানা উদ্দেশ্যে এই ভবনগুলো ব্যবহৃত হতো। গালিচা, মাদুর ও বসার গদিসহ এ সমস্ত কামরা পর্যাপ্ত আলোকসজ্জিত ও আরামদায়ক হতো। আজকের দিনের গ্রন্থাগারগুলোর মতোই এক হাজার বছর আগের সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকদের সুবিধার্থে পুস্তকের শ্রেণিবিন্যাস ও নির্ভুল ক্যাটালগিং ব্যবস্থাসহ বেশ উচ্চমানের বিন্যাস ব্যবস্থা ছিল। বই-পুস্তকাদি ও নথিপত্রের সংখ্যা ও গুণগত মানের উপর লাইব্রেরিয়ান বা গ্রন্থাগারিকের নিয়ন্ত্রণ থাকতো। ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কায়রোর আল-আযহার গ্রন্থাগারের পুস্তক সংগ্রহের সংখ্যা ১২০,০০০-কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং সেগুলোর ক্যাটালগই ছিল ৬০ খণ্ডে প্রায় ৩,৫০০ পৃষ্ঠার মতো। বলা হয়, স্পেনের আল-হাকিম গ্রন্থাগারের ক্যাটালগ প্রায় ৪৪ খণ্ডের ছিল। গ্রন্থাগার দেখভালের জন্য গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেয়া হতো, যা খুবই সম্মানজনক পদ ছিল এবং এই পদ শুধু শ্রেষ্ঠ বিদ্বানদের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। যারা 'অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর' রাখতেন কেবল তারাই গ্রন্থাগার ও জ্ঞানের জিম্মাদার (রক্ষক) ও তত্ত্ববধায়ক হিসেবে বিবেচিত হতেন। ১২শ ও ১৩শ শতাব্দির দিকে উত্তর আফ্রিকার আলমোহাদ রাজত্বকালে সর্বাধিক প্রাধিকারযুক্ত রাষ্ট্রীয় পদগুলোর মাঝে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা অন্যতম ছিল। এ সকল গ্রন্থাগার ছিল অপরিহার্য জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ধারক, যেমনটি ১৯শ শতাব্দির মার্কিন লেখক রাল্ফ ওয়ালদো এমারসন বলেন, "বাছাই করা সবচেয়ে ছোট একটি গ্রন্থাগারে আপনি কী পাবেন, তা একবার চিন্তা করুন। (এখানে আপনি) সকল সভ্য দেশের হাজার বছরের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও বিদগ্ধজনের সান্নিধ্য (বইয়ের মাঝে) পাবেন এবং তাদের শিক্ষা ও প্রজ্ঞার প্রাপ্তিসমূহকে সবচেয়ে সুবিন্যস্ত আকারে পাবেন... আমাদের ন্যায় ভিন্ন সময় ও কালের মানুষজনের নিকট (তাদের এসব কীর্তি) বোধগম্য ভাষায় লিখিত আছে।" জ্ঞানের বিকাশে বই বিপণীর বিশেষ অবদান ছিল। ১০ম শতাব্দির গ্রন্থানুরাগী ও বই বিক্রেতা ইবনে নাদিমের প্রসিদ্ধ বই বিপণীটি বৃহদাকার ভবনের উপর তলায় অবস্থিত ছিল, যেখানে খরিদদারগণ পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশ্রাম নেয়া এবং ভাবের আদান-প্রদানের জন্য একত্র হতেন। এক হাজার বছর পূর্বে মুসলিম বিশ্বে সরকারি ও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের পাশাপাশি শতাধিক শিরোনামের পুস্তকসমৃদ্ধ বইয়ের দোকানেরও কমতি ছিল না। আরবী ওয়ারাক্ব বা কাগজ শব্দটি আসলে ওয়াররাক্ব পেশা থেকে এসেছে। এই ওয়াররাক্ত উপাধি কাগজ বিক্রেতা, লেখক, অনুবাদক, অনুলিপিকার, বই বিক্রেতা, গ্রন্থাগারিক এবং সমাজের আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। চীন থেকে মুসলিম বিশ্বে কাগজ তৈরির শিল্পের সূচনার পরপরই ওয়াররাক্বীন পেশাটির সূচনা হয়েছে বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়। বাগদাদই সম্ভবত প্রথম বড় শহর, যেখানে প্রথমবারের মতো ওয়াররাক্বী বই বিপণন চালু হয় এবং কাগজ উৎপাদনের বিস্তৃতির সাথে সাথে বইয়ের দোকানের সংখ্যা মুসলিম বিশ্বে নাটকীয় হারে বৃদ্ধি পায়। ১২শ শতাব্দির মরক্কোর মারাকেশের একটি প্রদেশে যেসব বই বাঁধাইকারী বা বইয়ের সওদাগর নিজেদের বই বিপণী ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি লেখক ও অনুলিপিকারদের নিয়োগ দিতেন, তাদের বোঝানোর জন্য মরক্কোতে কুতুবিয়্যুন নামটি ব্যবহৃত হতো। এই প্রদেশে রাস্তার দুপাশে ৫০টি করে মোট ১০০-টি বই বিপণী ও গ্রন্থাগার ছিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইয়াকুব আল-মানসূরের শাসনামলে একেবারে চূড়ায় আরোহণ করে, যিনি বই বাঁধাই শিল্পের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা এবং বই-পুস্তক পাঠের মনোবৃত্তিতে বেশ উৎসাহ জুগিয়েছেন।