📘 হাদিসের গল্প > 📄 নামাযী

📄 নামাযী


যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সূর্যের আলোয় শত্রুর খোলা তরবারি চিকচিক করে উঠল। মুসলিম সেনারাও তৈরী চলল যুদ্ধের জন্য। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল। যুদ্ধ শুরু হল। তুমুল যুদ্ধ।
মুসলমানরা লড়ছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। মিথ্যার অভিশাপকে দূরীভূত করার জন্য। রাজ্য জয়ের কোন লিপ্সা, সম্পদ আহরণের কোন লোভ তাঁদের নেই। মুসলমানরা জান-প্রাণ দিয়ে লড়ছে। সত্য-মিথ্যার এ যুদ্ধে তাঁদের জয়ী হতেই হবে।
উভয় দলে যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। এরই মধ্যে এক অঘটন ঘটে গেল। কোথা থেকে এক তীর এসে বিঁধল হযরত আলী (রা)-এর পায়ে। ক্ষতস্থান দিয়ে দরদর করে রক্ত বের হতে লাগল। তীরটি বিষাক্ত। অসহ্য যন্ত্রণায় হযরত আলী (রা) চিৎকার করে উঠলেন। দূর থেকে সংগী-সাথীরা হযরত আলী (রা)-এর এ অবস্থা দেখলেন। তাঁরা ছুটে এলেন হযরত আলী (রা)-এর কাছে। কিন্তু কার সাধ্য আছে পা থেকে তীর টেনে বের করে। যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করেছেন। পায়ে একটু হাত লাগলেই শিউরে উঠেন যন্ত্রণায়। উঃ আঃ চীৎকার করে উঠেন। সাহাবাগণ পড়ে গেলেন মহা সমস্যায়। এখন তাঁরা কি করেন? তীর বের না করলে রক্ত বন্ধ হবে না। ব্যথাও যাবে না। এদিকে তাঁর যন্ত্রণা দেখে কেউ তীর বের করতেও সাহস পেলেন না।
মহানবী (স)-ও সেখানে উপস্থিত। তিনি সব কিছুই দেখছিলেন। তিনি বুঝলেন এভাবে তাঁর পা থেকে তীর বের করা যাবে না। তিনি কয়েকজন সাহাবাকে ডাকলেন। একটু দূরে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল- নামাযের সময় হোক। নামাযে দাঁড়ালেই তোমরা তীরটা বের করে নেবে।
সাহাবাগণ রাসূলের পরামর্শ মেনে নিলেন। সবাই চলে গেলেন যার যার কাজে। নামাযের সময় হল। সবাই চলল নামাযের জন্য। হযরত আলী (রা)ও বসে নেই। মুয়াজ্জিনের আযান ধ্বনি শোনার সাথে সাথেই তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন সমস্ত ব্যথার কথা। এখনি জামাত শুরু হবে। হযরত আলী (রা) তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে চললেন। অন্যান্য সাহাবীর সাথে একই কাতারে নামাযে শামিল হবেন।
অসহ্য যন্ত্রণায় এতক্ষণ যিনি উহঃ উহঃ আহঃ করছিলেন, আর এ মুহূর্তেই তিনি যেন একেবারে সুস্থ হয়ে উঠলেন। নামাযের প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আকর্ষণ এতই ছিল প্রবল। নামাযের সময় তিনি যেন একেবারে অন্য জগতের মানুষ হয়ে যেতেন। ভুলে যেতেন সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণার কথা, দুনিয়ার কথা।
সবাই নামায পড়ছেন, শুধু মাত্র কয়েকজন সাহাবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন পিছনে। তাঁদের মন তখন অস্থির চঞ্চল। ডর-ভয়ও রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু উপায় নেই। এ সুযোগেই তীর বের করে নিতে হবে।
একজন সাহাবা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন আলী (রা)-এর দিকে। বেশ শক্তভাবে তীরটা পায়ে বিঁধেছে। আস্তে ধীরে টান দিলে চলবে না। তীরের মাথা ধরে সাহাবী সজোরে মারলেন এক টান। টানের চোটে পায়ের মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। ফিনকি দিয়ে ছুটল আবারো তাজা রক্ত।
হযরত আলী (রা) তখনও নামায পড়ছেন। উঃ-আঃ কোন শব্দই করলেন না। একটু নড়লেনও না। নামাযের মধ্যে যে এতসব কাণ্ড ঘটে গেছে, তিনি এর কিছুই টেরও পেলেন না।
হযরত আলী (রা)-এর এমন অবস্থা দেখে সাহাবাগণ অবাক হল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন তাঁর দিকে। মনে মনে ভাবলেন, অদ্ভুত মানুষ হযরত আলী (রা)। একটু আগেও যন্ত্রণায় ছটফঠ করছিলেন। তীরে কেউ হাত দিলেই ভয়ে শিউরে উঠতেন। অথচ নামাযের সময় ব্যথা-বেদনার কথা একদম ভুলেই গেলেন। এমনকি তীর বের করার সময়কার যন্ত্রণাও অনুভব করলেন না। মানুষ কি এত আপন ভোলা হয়ে নামায পড়তে পারে? নিজের সুখ-দুঃখ ভাল-মন্দের কথা ভুলে গিয়ে নামাযে এত মনোযোগী হতে পারে? সাহাবাগণ ভাবছিলেন এমনি আরো অনেক কথা।
হযরত আলী (রা) নামায পড়া শেষ করলেন। ততক্ষণে রক্তে তাঁর জামা-কাপড় ভিজে গেছে। তিনি শরীরে একটু ভেজা অনুভব করলেন। তাকিয়ে দেখলেন তাঁর পায়ে তীর নেই। তিনি একটু অবাক হলেন। সংগী-সাথীগণকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
সাহাবাগণ বললেন, নামাযের সময় আপনার পা থেকে তীর বের করে নেয়া হয়েছে। তখন তাঁর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 মহৎ জীবন

📄 মহৎ জীবন


মহানবী (স) ছিলেন আদর্শ মানুষ। তাঁর মহৎ চরিত্র ছিল সকল গুণের আধার। মানুষের সাথে কথাবার্তা ও আচার ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুবই অমায়িক এবং উদার। কেউ মনে আঘাত পেতে পারে, এরূপ কোন কথা কখনো বলতেন না। মধুর ব্যবহারে তিনি সকলের মন জয় করতেন। এজন্য শত্রু-মিত্র সকলেই তাঁকে সম্মান করত।
মহানবী (স) দুনিয়ায় এসেছিলেন মানুষকে সৎপথ দেখাবার জন্য। কি করে মানুষ প্রকৃত ভাল মানুষ হয়ে চলতে পারে, সে শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তাই তাঁর প্রত্যেকটি কাজ ও আচার ব্যবহারে আমরা অতুলনীয় শিক্ষালাভ করি এবং একেই আমরা সুন্নাত বা আদর্শরূপে গ্রহণ করি।
এখানে তাঁর জীবনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করব। এ থেকে তাঁর মহত্ত্ব ও উদারতা সম্পর্কে তোমরা কিছুটা ধারণা করতে পারবে।
মদীনার কাছাকাছি জহীর নামে এক ব্যক্তি পল্লীতে বাস করত। গ্রাম থেকে সে তরি-তরকারী, শাক-সবজি কাঁধে করে বয়ে এনে মদীনায় এক রাস্তার পাশে দোকান করে বিক্রি করত। সে ছিল যেমন কাল, তেমনি কুৎসিত। সবাই তাকে ঘৃণা করত, কেউ তার কাছ ঘেঁষতে চাইত না। কিন্তু মহানবী (স) তার দোকান থেকে কেনাকাটা করতেন এবং অবসর সময়ে তার পাশে বসে নানান কথাবার্তা বলতেন। সবাই দেখে তাজ্জব হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, জহীর যখন তার জিনিসপত্র বিক্রি করে বাড়ি যেত, তখন মহানবী (স) স্বয়ং সারা শহরে ঘুরে ঘুরে জহীরের জন্য সে সব জিনিস সংগ্রহ করতেন। এভাবে গ্রামের জিনিস এনে শহরে, আর শহরের জিনিস গ্রামে বেচাকেনা করে জহীর বেশ সম্পদের মালিক হল।
মহানবী (স) তাকে দেখিয়ে বলতেন: জহীর আমাদের গ্রাম আর আমি জহীরের শহর। এজন্য জহীরের আনন্দের কোন সীমা ছিল না। মহানবী (স)-এর ভালবাসা আর নেক সোহবত পেলে কার না আনন্দ হয়, বল! একদিন সে মহানবী (স)-কে জিজ্ঞেস করল: হে নবী (স)! আমি এত কুৎসিত যে, দুনিয়ায় সবাই আমাকে দেখে ঘৃণা করে অথচ আপনি আমাকে এত ভালবাসেন কেন?
মহানবী (স) হেসে বললেন: মানুষের চোখে তুমি কাল এবং কুৎসিত হতে পার, কিন্তু আল্লাহ্ চোখে তুমি সুন্দর এবং তুমি আল্লাহ্ প্রিয়।
অতএব, কাল কুৎসিত, অন্ধ-আতুর কাউকেই ঘৃণা করতে নেই। সকলকেই আল্লাহ্র বান্দা আর আল্লাহ্র রাসূল (স) সকল মানুষকেই ভালবাসার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
যায়েদ ছিল প্রিয় নবী (স)-এর ভৃত্য। আমরা চাকর-বাকরদের যেমন ঘৃণার চোখে দেখি, তিনি কখনো তাদেরকে সেরূপ চোখে দেখতেন না। তিনি নিজের কাজ সব নিজেই করতেন। কাপড় ধোয়া, ঘর ঝাড় দেয়া, জুতা পরিস্কার করা, কাপড় সেলাই করা থেকে শুরু করে বড় বড় কাজ পর্যন্ত সবকিছুই তিনি নিজের হাতে করতেই পছন্দ করতেন। ভৃত্যকে তিনি কখনো চাকরের মত মনে করতেন না, তাকেও নিজের একজন ভাইয়ের মতই দেখতেন। কোন কোন সময় তিনি তাঁর ভৃত্যের সেবা যত্ন গ্রহণ করতেন। বিনিময়ে আবার তারও সেবা-যত্ন করতেন নিজ হাতে। কেননা, চাকরের সেবা-যত্ন পাওয়ার অধিকার যেমনি মনিবের রয়েছে, মানুষ হিসেবে চাকরের আবার তেমনই সেবাযত্ন পাওয়ার অধিকার আছে। বিদায় হজ্বের বাণীতে তিনি ঘোষণা করেছেন: "তোমরা যা খাবে, যা পরবে, তোমাদের দাস-দাসীকেও ঠিক তাই খেতে দেবে এবং তাই পরতে দেবে।"
মহানবী (স) তাঁর ভৃত্যের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করতেন, তা তারই মুখ থেকে শোনা যাক। যায়েদ বলেছেন: আল্লাহ্র কসম, আমি মহানবী (স)-এর যতটুকু সেবা করেছি, মহানবী (স) আমার সেবা করেছেন এরও অধিক। দশ বছর কাল আমি তাঁর গোলাম ছিলাম। এ সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে একটি বারও তিনি আমার উপর রাগ করেন নাই এবং আমার কোন কাজে অসন্তোষও প্রকাশ করেন নাই।
কত মহৎ এবং উদার ছিলেন তিনি। চাকর বাকর এবং অন্য মানুষের প্রতি কিরূপ আচরণ করতে হবে এ থেকেই আমরা তাঁর শিক্ষা পেতে পারি।
খন্দকের যুদ্ধের সময়কার ঘটনা। মহানবী (স) খবর পেলেন, মক্কার কাফেরগণ বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে আসছে। মহানবী (স) চিন্তিত হলেন। সকল মুসলমানকে নিয়ে তিনি আলোচনায় বসলেন। যুবকেরা সবাই অগ্রসর হয়ে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু যাঁরা বয়স্ক, তাঁরা মদীনায় থেকে চারদিকে পরিখা খনন করে শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করার পরামর্শ দিলেন। মহানবী (স) তাঁদের কথাই মেনে নিলেন।
পরিখা খনন করার কাজ শুরু হল। মুসলমানরা প্রতি দশজনের এক একটি দলে বিভক্ত হয়ে মাটি কাটতে লাগলেন। হযরত বেলাল (রা)-এর দলে ছিল নয় ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর কাছে গিয়ে বললেন : বেলাল, তোমার দলে কজন? হযরত বেলাল (রা) বললেন, নয় জন।
মহানবী (স) বললেন, আমাকে তোমাদের দশম ব্যক্তি করে নাও! হযরত বেলাল অসম্মতি জানালেন। না, তা কি করে হয়? মহানবী (স) মাটি কাটবেন এটা কি কখনো হতে পারে? কিন্তু মহানবী (স) নাছোড়বান্দা। তিনি কেবল মাটি কাটবেন না, মাটি বয়েও নেবেন। অগত্যা হযরত বেলাল (রা) তাঁকে দলে নিয়ে এক টুকরি মাটি তাঁর মাথায় তুলে দিলেন। মহানবী (স) বললেন : আরেক টুকরি দাও। হযরত বেলাল (রা) বললেন-তা কেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সবাইতো এক টুকরি করে নিচ্ছে, আপনি কেন দুই টুকরি নেবেন?
মহানবী (স) বললেন, আমি তোমাদের মতই মানুষ, তাই এক টুকরি নিয়েছি, কিন্তু আমার উপরে নবুওয়তের দায়িত্ব রয়েছে, সে জন্য আমাকে অতিরিক্ত আর এক টুকরি নিতে হবে।
হযরত বেলাল (রা) আর কি করবেন! অতিরিক্ত আর এক টুকরি মাটি রাসূলুল্লাহ (স) মাথায় তুলে দিলেন। এক সাথে দুই টুকরি মাটি মাথায় নিয়ে হেঁটে চলেছেন মহানবী (স)।
দুনিয়ায় এমন দৃষ্টান্ত কোথাও লক্ষ্য করেছ? আমাদের প্রিয়নবী (স) অহংকার আর পদমর্যাদা কাকে বলে জানতেন না। অহংকার আর পর্দমযাদা মূলে কুঠারাঘাত করে জগতে সমান মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। এমন কি, নবী হিসেবেও তিনি কোন অতিরিক্ত মর্যাদা দাবী করেন নাই বরং নবী হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন মহৎ আর তুলনাহীন চরিত্রের মানুষকে কে না শ্রদ্ধা করবে বল?

📘 হাদিসের গল্প > 📄 মহানুভবতা

📄 মহানুভবতা


"(আর) যারা আপন প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী হয় (যখন প্রতিজ্ঞা করে, আর যারা ধীরস্থির থাকে অভাব-অভিযোগে, অসুখে-বিসুখে এবং ধর্মযুদ্ধে, তারাই সত্যিকারের মানুষ এবং তারাই সত্যিকারের ধর্মভীরু।"
-(আল কুরআন) তাই যে মুসলমান আল্লাহ্ পথে চলে, যে আল্লাহকে ভয় করে আর সত্যিকারের মানুষের মত সুন্দর ও পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়, সে সব সময়ই তার প্রতিশ্রুতি, তার ওয়াদা পূর্ণ করে। কথা দিয়ে কথা না রাখা হচ্ছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। পরম দয়ালু আল্লাহ্ তা'আলা কোনদিনও এটা পছন্দ করেন না। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তাই জীবনে কোন দিনও নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হননি, কোন ও দিন তিনি ওয়াদার খেলাফ করেনি। শত দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অত্যাচারের মাঝেও কোনদিন নিজের ওয়াদা, নিজের প্রতিশ্রুতি কথা ভোল নি, কথা যখন দিয়েছেন তখন সে কথা অনুযায়ীই কাজ করেছেন। তাঁর প্রতিশ্রুতির একচুলও নড়চড় হয়নি।
৬৩০ খৃষ্টাব্দের ঘটনা। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তখনও জীবিত। তাঁর পবিত্র বাণী শোনার জন্য তখন মদীনায় রোজই অসংখ্য লোকের সমাগম হত। শত সহস্র লোক রোজই তাঁকে দেখতে আসে, তাঁর পবিত্র বাণী শোনার জন্য ধীরস্থিরভাবে অপেক্ষা করে আর শ্রোতাদের মধ্য থেকে অগণিত ব্যক্তি প্রায় রোজই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
মোজায়না বলে তখন আরব জাতির মধ্যে একটি গোত্র ছিল। তাঁদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছিলেন। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক লোক তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। অমুসলিমদের মধ্যে কাব ইবনে যুহাইর নামে একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। কিন্তু কবিতা লেখার এ সুন্দর প্রতিভা তিনি বিশেষ কোন ভাল কাজে লাগাতেন না বরং মুসলমানদের হেয় করার জন্য এবং ইসলাম ধর্মকে অপমান করার জন্য, তুচ্ছ করার জন্য তিনি তার প্রতিভাকে ব্যবহার করতেন। স্বভাবতই মুসলমানদের সংখ্যা যখন প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেল, সমগ্র আরবে যখন ছড়িয়ে পড়ল ইসলামের পবিত্র আলো, সমগ্র আরব যখন মেনে নিল ইসলামের মাহাত্ম্য ও আধিপত্য, তখন ইসলামের এ শত্রুদের ঘৃণ্য প্রচার, অশ্লীল কবিতা রচনা সম্পূর্ণরূপেই বন্ধ করে দেয়া হল। ফলে কা'বও বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিলেন ইসলামবিরোধী কবিতা রচনা এবং যদিও মুসলমানেরা বিধর্মীদের ওপর কোনদিনও কোন অত্যাচার করেনি, তবুও কবি কিন্তু তাঁর অতীতের ঘৃণিত ইসলাম বিরোধী প্রচারের জন্য ভয়ে আত্মগোপন করে থাকতে লাগলেন।
কাবের ভাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কা'বকে বারবার অনুরোধ করতে লাগলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে, আল্লাহ্র পথে এগিয়ে আসার জন্য। ভাইয়ের পুনঃ-পুনঃ অনুরোধ শুনে কাব একদিন রাসূল (স)-এর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। দেখাই যাক না কেন লোকে তাঁর কথা শোনে, কেন এত শ্রদ্ধা করে, কেন এত সুনাম তাঁর! সকলের অজান্তে একদিন অত্যন্ত গোপনে কা'ব পবিত্র মদীনায় ঢুকে পড়লেন এবং হযরত মুহাম্মদ (স) যে মসজিদে ওয়াজ করতেন সরাসরি সেখানে পৌঁছে গেলেন। অজস্র লোক তখন শৃঙ্খলার সাথে নিঃশব্দে ধীরস্থিরভাবে রাসূল (স)-এর অমর বাণী শুনে যাচ্ছে। রাসূল (স)-এর মত দিব্যকান্তি জ্যোর্তিময় পুরুষকে ভিড়ের মাঝে খুঁজে বের করা কাবের পক্ষে মোটেই কষ্টকর হল না। ভিড় ঠেলে কাব সামনে এগিয়ে গেলেন এবং হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন, "হে আল্লাহ্র রাসূল, আমি যদি আপনার সামনে মুসলমান হিসাবে বিধর্মী কা'বকে এখানে উপস্থিত করি, তাহলে আপনি কি তাঁকে ক্ষমা করবেন?"
রাসূল (স)-এর পবিত্র ও সুন্দর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। শান্তভাবে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তাকে আমি ক্ষমা করব।” রাসূল (স)-এর এ মহানুভবতা দেখে আনন্দে, বিস্ময়ে, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অভিভূত কা'ব পুনরায় চীৎকার করে বললেন, "আমি হচ্ছি জুহরের পুত্র কা'ব, আপনার সামনে আজ দাঁড়িয়ে আছি।” শ্রোতাদের মধ্য থেকে বেশ কয়েক জন উগ্র ব্যক্তি চীৎকার করে উঠলেন এবং দাবী করলে কা'বকে যেন অবিলম্বে হত্যা করা হয় তাঁর ঘৃণিত ও জঘন্য ইসলামবিরোধী কবিতার জন্য। কিন্তু আল্লাহ্ রাসূলের মুখে ফুটে উঠল সে একটি স্নিগ্ধ ও পবিত্র হাসি, দয়া ও ক্ষমার এক অপূর্ব জ্যোতিতে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আগের মতই ধীরস্থিরভাবে তিনি স্নেহমাখা সুরে বললেন, 'না আমি তাকে ক্ষমা করেছি। মুসলমান কোনদিনও তার ওয়াদার খেলাপ করে না।" ভক্তি ও শ্রদ্ধায় কা'ব অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং সবিনয়ে একটি "কাসিদা” (এক ধরনের কবিতা) পড়ার অনুমতি চাইলেন।
রাসূল (স)-এর অনুমতি পেয়ে অন্তরের সমস্ত ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা উজাড় করে দিয়ে কাব সেদিন যে কাসিদাটি পড়ে শোনালেন তা ছন্দমাধুর্য, ভাব-ঐশ্বর্য ও শব্দ চয়নের জন্য আরবী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে আজও বিবেচিত হয়। কবির সুললিত কণ্ঠস্বর ও ছন্দ-মাধুর্য রাসূল (স)-কে এতই মুগ্ধ ও অভিভূত করল যে পুরস্কার হিসাবে তাঁর নিজের পবিত্র "খিরকা” (সেকালের আরবেরা ঢোলা যে পোশাক পরতেন) খুলে তিনি কবিকে উপহার দিলেন।

📘 হাদিসের গল্প > 📄 তিনের পরীক্ষা

📄 তিনের পরীক্ষা


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন: বনী ইসরাঈল বংশে তিন ব্যক্তি ছিল। একজন কুঠে। একজন টেকো। একজন অন্ধ।
আল্লাহ্ তা'আলা একদিন এদের তিনজনের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। একজন ফেরেশতাকেই প্রতিনিধি হিসেবে এ তিন ব্যক্তির কাছে পাঠানো হ'ল। ফেরেশতা প্রথমে কুঠের কাছে এলেন। এই যে বল, কি জিনিস তোর সবচেয়ে বেশি প্রিয়? কুঠে বলল-আমার এ শরীরের বদ রং বদলে যদি ভাল রং আর এ কুৎসিত চামড়াটা বদলে যদি সুন্দর চামড়া হত তাহলে, আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। আমার এ রোগের জন্যই তো মানুষেরা আমাকে ভীষণ ঘেন্না করে, তাদের পাশে বসতে দেয় না, তা আবার বসতে দেবে? হুঁ! দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।
ফেরেশতা এ কুঠের শরীরের উপর দিয়ে তাঁর একটা হাত বুলিয়ে দিলেন। সাথে সাথেই কুঠে লোকটি দিব্যি এক সুপুরুষে রূপ নিল-যাকে বলে সৌম্য ও সুদর্শন। তার শরীরের বদ রং এবং কুৎসিত চামড়ার পরিবর্তে সুন্দর রং আর সুন্দর চামড়া বেরিয়ে এল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন: এবার বল, কি ধরনের সম্পত্তির উপর তোর খুব বেশি লোভ? কুঠে যে এখন সুপুরুষ অর্থাৎ সৌম্য ও সুদর্শন এবং সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেছে, সে বলল: একটি উট। ফেরেশতা একটি গর্ভবতী উট ভাল হয়ে যাওয়া কুঠেকে দিলেন। আর বললেন: এর মধ্যে আল্লাহ্ তোর উন্নতি দিন।
ফেরেশতা এর পর টেকোর কাছে এলেন। এই যে বল, কি জিনিসে তোর সবচে বেশি লোভ? টেকো বলল: আমার এ টেকো মাথায় যদি কুচকুচে কাল এবং সুন্দর মসৃণ চুল গজিয়ে উঠত, তা হলে মানুষেরা আমাকে আর ঘেন্না করত না, কাছে টেনে নিত। আমার মাথার উপর থেকে এ বালা মুসিবত অর্থাৎ বিপদ যাই বলুন, সরে গিয়ে সুন্দর হওয়ার প্রতি আমার সবচেয়ে বেশি লোভ।
ফেরেশতা এ টেকোর মাথার উপর তাঁর একটি হাতের মুদু পরশ বুলিয়ে দিলেন। সাথে সাথে টেকো লোকটাও তার টেকো মাথা ভর্তি সুন্দর চুল পেয়ে গেল।
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন : এবার বল কি ধরনের সম্পত্তির উপর তোর আগ্রহটা খুব বেশি? টেকো, যে এখন তার মাথায় কুচকুচে কাল এবং সুন্দর মসৃণ চুল ফিরে পেয়েছে, সে বলল : গাভী। ফেরেশতা একটি গর্ভবতী গরু ভাল হয়ে যাওয়া টেকোকে দিলেন এবং বললেন : এর মধ্যে আল্লাহ্ তোর উন্নতি দিন।
ফেরেশতা এবার অন্ধের কাছে এলেন। এই যে বল, শুনি-তোমার কি জিনিস চাই। অন্ধ বলল : আল্লাহ্ তা'আলা যদি আমার এ অন্ধ চোখ দুটি ভাল করে দিতেন, তাহলে আমি সব মানুষকেই দেখতে পেতাম, আর আমার যে কি খুশি হত-ভাষা নেই যে, বলব। আমি চাই আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন যেন আমি আমার মন ভরে সব কিছু এবং সবাইকে দেখতে পারি।
ফেরেশতা অন্ধের চোখের উপর তার একটা হাত বুলিয়ে দিলেন। সাথে সাথে অন্ধও আল্লাহ্ হুকুমে তার দৃষ্টিহীন চোখে দৃষ্টি ফিরে পেল। হ্যাঁ, এমন বল তুমি কি ধরনের সম্পত্তি পেলে খুশি হও?
অন্ধ, যে এখন তার দৃষ্টিহীন চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে, সে বললঃ বকরি। ফেরেশতা একটি গর্ভবতী বকরি ভাল হয়ে যাওয়া অন্ধকে দিলেন। আর বললেন : এর মধ্যেই আল্লাহ্ তোমাকে বরকত দিন।
দিন যায়। সপ্তাহ আসে। মাস গত হয়।
উটনি, গাভী আর বকরি যথা সময়ে বাচ্ছা দিল। এরপর?
আবার মাসের পর মাস-ছ'মাস যায়। বছর আসে। উটনি, গাভী আর বকরি বাচ্চা দিয়েই চলল। এরপর? বাচ্চাদের থেকে আবার বাচ্চা। আবার। ক্রমান্বেয়ে বিয়োনের পালা চলে। এরপর থেকে বিয়োনোর পর বিয়োনো। কেবলি সংখ্যা বৃদ্ধি। আর বিয়োনোর-চাপে তিন জন ফেঁপে উঠল। শুধু কি তাই?
এদিকে দেখতে না দেখতে কয়েক বছরের মধ্যেই মনে হল যে উট, গরু, আর বকরিতে ঘর-বাড়ি মাঠ-ঘাট এবং জঙ্গল-মরুভূমি সব ভরে গেছে। আল্লাহ্ তা'আলা আবার একদিন তাদের তিন জনের অর্থাৎ কুঠে, টোকো এবং অন্ধের পরীক্ষা নিতে চাইলেন।
আগের সে ফেরেশতাকেই আবার পাঠানো হল। ফেরেশতা প্রথমেই আগের সে আকৃতি বা রূপ নিয়েই ভাল হয়ে যাওয়া মানে ভূতপূর্ব কুঠের কাছে এলেন।
-ভাই, আমি একজন মিসকিন সফরে বেরিয়েছিলাম। আমার সব সামানই শেষ হয়ে গেছে। এখন এক আল্লাহ্ আর আছ তুমি এছাড়া আজ আমার আর কোন উপায় গতি নেই। যিনি তোমার শরীরের বদ রং এবং কুৎসিত চামড়ার পরিবর্তে সুন্দর রূপ আর চামড়া বশিশ স্বরূপ দান করেছিলেন, আমি আজ সে আল্লাহ্ নামের উপর তোমার কাছে একটা উট চাই। দিবে, ভাই? এ জন্য চাইছি-এর পিঠে আমি সওয়ার হয়ে তাড়াতাড়ি যেন আমার বাড়ি গিয়ে পৌঁছতে পারি।
ভাল হয়ে যাওয়া কুঠে বলল: যা-যা! যা বেটা এখান থেকে। বলি আপনি কোন নোয়াবের পুত্তর? বড় যে এসেছেন লাট সাবের পো সেজে একটা উট চাইতে! হুঁ, যেন তার বাপ-দাদা কেউ আমার কাছে গচ্ছিত রেখে বলে গেছে, ও মিয়াঁ! এসে চাইলেন দিয়ে দিও। যা বেটা, ভাগ, এখান থেকে।
ফেরেশতা বলে উঠলেন: আরে ভাই, এমন করছ কেন? একটু থাম, শোন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তাই তোমার কাছে বড় দাবি নিয়ে এসেছি। দাও ভাই, দাও! দিয়ে দাও একটা উট। তোমার তো অভাব নেই। সামান্য একটা উটেরই তো মামলা -- দিলে যে আমার কত বড় উপকার হয়, তা আর কি বলব!
কুঠে রেগে বলে উঠল: গেলে! তুই বেটা আমাকে চিনিসনা? আমি যে কে! তুমি না চিনিয়ে দিলে আমি কি করে চিনব। বলি, ভালয় ভালয় যাবে না যাবে না? বলি, যা। আমাকে আর রাগাসনে। আমি খুব খারাপ মানুষ-ভাগ। যা আমার সামনে থেকে। আমি যা বলি তাই করি। যা, আমি কিছু দিতে টিতে পারব না। তা ছাড়া তোকে যে দেব, সে রকম দেয়ার মত এখানে তেমন কোন বাড়তি উটও নেই। আর আমাকে আগেরই আরো অনেকগুলো ঋণ শোধতে হবে! বুঝলে?
ফেরেশতা নিজের মনেই হেসে উঠলেন: বাইরে এর লেশ মাত্রও প্রকাশ পেল না। কুঠের অবস্থা তো ফেরেশতার জানাই ছিল। কিন্তু যিনি শরীরের বদ রং এবং কুৎসিত চামড়ার পরিবর্তে সুন্দর রং আর সুন্দর চামড়া বশি স্বরূপ দান করেছিলেন-কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরেও যখন কুঠে তা স্বীকার করল না, তখন বাধ্য হয়েই ফেরেশতা এবার 'সম্ভবত' দিয়ে এ জন্য কথা শুরু করলেন: কুঠে যেন সাথে সাথেই আর অস্বীকার করে না বসে, ভেবে-চিন্তে উত্তর দেয়, অথচ এবারও হল হিতে বিপরীত। চোরা না শোনে ধর্মের কথা।
ফেরেশতা এবার জোর গলায় বলে উঠলেন: নিশ্চয়ই তোমাকে আমি চিনি। এখন তুমি যতই সাফাই গেয়ে যাওয়া কেন? আমি সব জানি, আগে তুমি কুঠে ছিলে। মনে পড়ে? কি, মনে পড়ে না, অত শিগগিরই ভুলে গেলে? এ রোগের জন্য ওই যে মানুষ তোমাকে ঘেন্না করত, তুমি গরীব ছিলে, কি গরীব ছিলেনা? পরে আল্লাহ্ তোমাকে আমার মাধ্যমে এত ধন-সম্পত্তি দিয়েছেন। আমি তো তোমার কাছে একটা উটই চাচ্ছি। এর বেশি তো আর কিছুই চাচ্ছিনা। চাবও না। আল্লাহ্ ওয়াস্তে একটা উট দিয়ে আমার বিদায় করে দাও। আমি চলে যাই।
কুঠে গর্জে বলে উঠল: রে মিথ্যুক, দেখছি তোর আস্পর্ধা তো খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছে। সামনের দিকে আর একটা কথা বললে জানিস তোর জীবনের জন্য বড় বেশি ভাল হবে না। হুঁ! বলে রাখলাম। আচ্ছা ফ্যাসাদ দেখছি-খুবত, চমৎকার বাহ! কার সামনে দাঁড়িয়ে আচিস, বুঝতে পারিসনি। একদম মুখ থেঁতলে দেব। আরে এটা তুই কি বললে যে, আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছে। আর দিয়েছে তোর মাধ্যমে। রে মিথ্যুক, কান পেতে শুনে নে এবং এসব ধন-সম্পত্তি তো আমার কয়েক পুরুষ থেকে। আমার বাপ-দাদার, দাদার দাদার বংশ থেকেই চলে আসছে, আর তুই কিনা বলছিস আল্লাহ্ দিয়েছেন তোর মাধ্যমে।
ফেরেস্তা সাথে সাথে বলে উঠলেন: দেখ আমি মিথ্যুক নই। যদি তুমি মিথ্যুক হও তাহলে?
কুঠে বলে উঠল: তাহলে আবার কি? আমারটা আমি বুঝব। এখান থেকে তুই যাবে, কি যাবে না। এবার তাই জানতে চাই। নইলে ঘাড়ে কয়েক ঘা কসিয়েই মারব। আমাকে আরেকটু ত্যক্ত করলে-অমনি অমনিতেই আর ছেড়ে দিচ্ছি না। আমার শেষ কথাটা কান খুলে শুনে নে-আর একটু টু শব্দ করছে কি...তোর মঙ্গল নেই, হ্যাঁ!
ফেরেস্তা বললেন: বেশ, আমি চলে যাচ্ছি। যাবার আগে বলে যাই তা হলে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে ঠিক তেমনটিই করে দিন, প্রথমে তুমি ঠিক যেমনটি ছিলে। কেমন?
কথা শেষ করার সাথে সাথেই ফেরেস্তার দোআ কবুল হয়ে গেল।
ফেরেস্তা এরপর আগের বার আসা রূপ নিয়েই সে ভাল হয়ে যাওয়া টেকোর কাছে এলেন। ভাই আমি মিসকিন মানুষ। সফরে বেরিয়ে ছিলাম। এখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার এখন এক আল্লাহ্ আর তুমি ছাড়া কোন উপায় দেখছি না। কোন গতি না দেখে উপায়হীন হয়েই তোমার কাছে ছুটে এসেছি। যিনি তোমাকে টেকো মাথায় কুঁচকুঁচে কাল সুন্দর চুল গজিয়ে দিয়ে, মানুষের খারাপ দৃষ্টি থেকে তোমাকে রক্ষা করেছেন-আমি আজ সে আল্লাহ্ নামের উপর তোমার কাছে একটা গরু চাই। দিবে? দাও না ভাই, তোমার পছন্দ মত একটা গরু। বড় আশা নিয়ে এসেছি।
ভাল হয়ে যাওয়া টেকো বলল: বড় আশা নিয়ে এসেছ বাছা! শুনি কোথা থেকে আসা হয়েছে? যেমন বাপ-দাদার রাখা সম্পত্তি! পছন্দসই একটা গরু দিতে হবে, হুঁ! এ বেটা, আজেবাজে না বকে নিজের সোজা পথটি দেখ, বুঝলে? রংবাজি আর কারো সাথে গিয়ে কর গে। যা, ফকড়ামী ছেড়ে খেটে খা! দেখতে তো ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। তাই বলছি যা। ভাগ! ভবিষ্যতের জন্য ভাল হয়ে এ পথ ছেড়ে এখান থেকে সোজা চলে যা। আর হ্যাঁ, ও রকম দাবি জানাতে যেন ভবিষ্যতে ভুলেও আর কেন দিন এখানে ছুটে আসবে না। এলে আচ্ছা মত শায়েস্তা করে দেব। দেখ দেখি, কত বড় বজ্জাত-হারামি, বলে কিনা একটা গরু দাও। মরার সময় তোর বাবা কি আমার কাছে একটা গরু জমা রেখে গিয়েছিল নাকি যে, চাইলেই দিয়ে দিতে হবে। কত কষ্ট-সাধনার পর এগুলো করেছি। তুই বেটা বুঝবে কি? তুই কি খান্দানী ফকিরের বাচ্চা নাকি! কোন বাপের মাল চাইতে এসেচিস হুঁ! কি হল এখানে দেখছি এখনো দাঁড়িয়ে রয়েচিস। যা, ভালয় ভালয় চলে যা, নইলে খুব বেশি ভাল হবে না। আমি বেহায়া দেখতে পারি না। মেরে হালুয়া করে দেব।
ফেরেশতা বলে উঠলেন: ভাই, তুমি যত রাগই কর আর যতই কথা শুনাও এবং মেরে যত মজার হালুয়াই বানাও না কেন, কিছুতেই আমার আপত্তি নেই। তোমার যা মন চায়, তাই কর। কিন্তু আমাকে একটা গরু দিতেই হবে। গরু না নিয়ে আমি যাচ্ছি না। দাও তোমার মত ধনীর জন্য আমার এ ক্ষুদ্র সওয়াল পূরণ করা এমন কেন শক্ত কাজ নয়। মনটাকে একটু নরম কর, ভাই! এতটা কঠিন হয়ো না-রহম কর, আমি বড় বিপদে আছি।
টেকো রেগে বলে উঠল : আচ্ছা ফ্যাসাদ দেখছি! সোজা কথায় চলে যাওয়ার পাত্র তুই না। এখন দেখছি-কয়েক ঘা না বসানো পর্যন্ত তুই এখান থেকে নড়বে না। দেখ, আমি বড়ই ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। একবার সত্যি সত্যিই বিগড়ে গেলে রক্ষা নেই। জান না নিয়ে শান্তি পাইনা। আমাকে বিগড়ে ফেললে আর তোকে আস্ত ছাড়ছিনা। তাই বলছি আমাকে আর ত্যক্ত না করে সেজো এখান থেকে তোর আপন পথে চলে যা। যা, তো ভাল হবে।
তখন ফেরেশতা আপন মনেই হেসে বলে উঠলেন সত্যি মানুষ কত অকৃতজ্ঞ, অবিশ্বাসী, হীন-নীচু-বেঈমান-মিথ্যুক হয়ে থাকে। ধনের লোভে, সম্পত্তির মোহে ভুলে যায় সবকিছু-হারায় তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ ঈমান-বিবেক। এ নগন্য, তুচ্ছ ধন-সম্পত্তির লোভের মোহে ভুলে যায় তার স্রষ্টাকে। এর চাইতে আর দুঃখ কি হতে পারে, মানুষ এত বড় স্বার্থপরও হয়? এ স্বার্থপর মানুষ করতে না পারে এমন কাজ নেই। সব করতে পারে-পারে না লাখে দু'চার জন ছাড়া লোভকে সংবরণ করতে। ছি, কি জঘন্য মন-মানসিকাতা!
ফেরেশতা এবার জোর গলায় বলে উঠলেন : ভাই, শুধু শুধু রাগ কর কেন! আমি তো তোমাকে অনেক আগে থেকেই খুব ভাল চিনি ও জানি। অস্বীকার করতে পারনা কি ছিলে আর কি হয়েছ। সবই আমার জানা আছে। তোমার ব্যাপারে আমার কিছুই অজানা নেই। আল্লাহ্ তোমাকে এত ধন-সম্পত্তি দিয়েছেন বলি, তোমার কাছে একটা গরু এমন কিইবা? ইচ্ছা করলেই তো আমাকে একটা গরু দিতে পার। দিতে পার একটা কেন কয়েকটাই। কিন্তু রে ভাই, আমার সওয়াল একটাই। যেন তেন একটা গরু দিয়ে দাওনা ভাই। আল্লাহ্র কাছে যেদিন তুমি চুল আর ধনের মুখাপেক্ষী ছিলে, সেদিন আল্লাহ্ তোমাকে আমার উসিলায় তা দিয়েছেন। আজ আমি তোমার কাছে মুখাপেক্ষী। দাও ভাই, আমাকে দাও একটা গরু। খালি হাতে ফিরিয়ে দিওনা ভাই! দোআ করব যেন আল্লাহ্ তোমাকে আরো প্রচুর ধন দেন এবং বিরাট ধনী হও তুমি।
টেকো গর্জে বলে উঠল : আরে এ মিথ্যুক, কি বললে তুই? তোর এত বড় আস্পর্ধা! যত্তসব মিথ্যা কথা আল্লাহর কাছে আমি চুল আর গরু চেয়েছিলাম কবে? কখন? তোর সামনে? এখন দেখছি তুই আসলে পাগল না, পাগলের অভিনয়ে সেরা ছেচ্চর। রং জমাবার জায়গা আর পাসনি, এখানে এসেচিস জমাতে? আল্লাহর কাছে আমি চুল আর গরু চেয়েছিলাম। আর তা-ও সে দিয়েছে আমাকে তোর উসিলায়! তবে রে -- শোন, কে আছে এমন যে, বুক ফুলিয়ে বলতে পারে এসব আল্লাহ্ আমাকে তোর উসিলায় দিয়েছে। হুঁ, তুই বললে! আরে এ মিথ্যুক, ফেরেশতা সাথে সাথে বলে উঠলেন: সত্যিই যদি তুমি মিথ্যুক হও, তাহলে?
টেকো বলে উঠল: তাহলে আবার কি? আমি কি মিথ্যুক নাকি? সাবধান হয়ে, মুখ সামলে কথা বল। বলে রাখছি-উলটা, পালটা কথা বলচিস কি... বেশি ভাল হবে না, হ্যাঁ! বড় যে উঁচু গলায় বলতে এসেচিস, মুখ থেঁতলে দেব। এখন পর্যন্ত আমার আসল রূপটি দেখিসনি তো-ফের আমার বিরুদ্ধে আর একটা বলচিস তো দেখিয়ে দেব।
ফেরেশতা বললেন: এখানে ভাল-মন্দের কথা নয়, লেনদেনের কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। কিন্তু সত্যিই যদি তুমি মিথ্যুক হও, তাহলে আল্লাহ্ তোমাকে ঠিক তাই যেন করে দেন আগে তুমি যা ছিলে। কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ফেরেশতার দোআ মঞ্জুর হয়ে গেল।
ফেরেশতা এবার অন্ধের কাছে প্রথমবারের সে রূপ নিয়ে এলেন। এই যে ভাই, দেখ-আমি একজন মুসাফির। ভীষণ বিপদগ্রস্ত। নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছি। ভাইরে আজ হয়তো তুমি আমাকে চিনতে পারবে না এবং আজ আমার একমাত্র ভরসা আল্লাহ্ আর তুমি, সত্যি বলছি, এ ছাড়া আমার আর কেন গতি আশ্রয় নেই। আমি আল্লাহ্ নামে তোমার কাছে একটা বকরি চাই। সে আল্লাহর নামে আমাকে একটা বকরি দাও যিনি তোমাকে দ্বিতীয়বার তোমার অন্ধ চোখকে দৃষ্টির উপহার দিয়েছিলেন। তোমার কাছ থেকে একটা বকরি পেলে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করে ওই বকরিটাকে দিয়েই কোন মতে-সতে আমার সফর পুরা করব।
ভাল হয়ে যাওয়া অন্ধ বলল: হ্যাঁ, ভাই! মনে হয় যেন তোমার কথা ঠিকই। হ্যাঁ ভাই, তুমি ঠিকই বলছ, আমি তো অন্ধই ছিলাম। সর্বশক্তিমান রাহমানুর রাহীম আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর খাস মেহেরবাণীর বদৌলতে আমার অন্ধ চোখে দৃষ্টি উপহার দিয়েছেন। আমার মনে আছে। একজন লোকের উছিলায় আমি এসব পেয়েছি। মনে হয় যেন সে লোকটি ... হ্যাঁ, সে লোকটা যেন তুমিই ছিলে। অনেক দিনের কথা তো পরিষ্কার মনে না হলেও একটু একটু মনে পড়ছে, চোখ ভাল হওয়ার সাথে সাথে তোমাকেই যেন আমি প্রথম দেখছিলাম। যদিও অনেক দিন পর খটকা লাগার কারণে বিশ্বাস হতে না চাইলেও অবিশ্বাসও করতে পারছিনা আসলেই সে তুমি ছাড়া আর কেউ নয়। সে যাক। মোট কথা আমি তোমার কেন কথারই অস্বীকার করে যাব না। আর কিছুই অস্বীকার করব না-আমার এ জীবনের উপর দিয়ে যত বড় ধরনের বিপদই আসুক না কেন। তুমি বিশ্বাস কর আমি ভাই অকৃতজ্ঞ বেঈমান নই। তুমি আমার কাছে মোটে একটা মাত্র বকরি চাচ্ছ কেন, তুমি নিজে বেছে যতটা খুশি নিয়ে যাও। তুমি ভাই বিশ্বাস কর আর নাই কর শোন এ দীর্ঘদিনের মধ্যে আমি বহুবার একথা ভেবেছি সে মানুষটা কোথায়? আচ্ছা যে আমার চোখে হাত বুলিয়েছিল এবং আমি সাথে সাথে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে ভালও হয়ে গিয়েছিলাম আর আমার জীবনে চলার জন্য দাবিও পূরণ করেছিল একটি বকির দিয়ে। তাকে আর দেখতে পেলাম না। আজ আমার মনে হচ্ছে সে আশা আমার মিটাল। যাক, সে তুমিই হবে- তুমি না হলে এমনভাবে ঠিক ঠিক একদম নির্ভুল কেউ বলতে পারত না এবং পারবেও না। কি ঠিক বলেছি না?
ফেরেশতা সাথে সাথে বলে উঠলেন: হ্যাঁ! দেখলাম তিনজনের মধ্যে সত্যি তুমিই অকৃতজ্ঞ নও।
অন্ধ বলে উঠল: আমি ভাই গণ্ডমূর্খ মানুষ, মিথ্যা কথা বলব না; আমৃত্যুই আমি আল্লাহ্ রাসূলের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলেছি এবং মেনে চলার ইচ্ছাপোষণ করে চলেছি-চলব। তুমিও আমার জন্য সে দো'আই কর। হ্যাঁ, ভাই! তুমিও বল- আজ আমার কিসের অভাব? কি, কোন কিছুর অভাব আছে? তবে কেন আমি অকৃতজ্ঞ হয়ে লোভে পড়ে আল্লাহ্র নাফরমানী করতে যাব এবং গুনাহাগার হব। বেঈমান হয়ে মরব কেন? শোন ভাই তুমি একটা বকরি নিও না। কেন ভাই একটা চাচ্ছ-যতটা তোমার ইচ্ছা তোমার মনে যত নিয়ে যাবার চায় নিয়ে নাও এবং যতটা তোমার ইচ্ছা রেখে যাবার রেখে যাও। আর যদি মনে কর সবগুলোই নিয়ে যাবার তো 'আলহামদুলিল্লাহ-সব তারিফ আল্লাহ্ তা'আলার, নিয়ে যাও, আমি এত খুশি হব ভাই, ভাষা নেই যে বর্ণনা করার নিজের কাছে দেয়ার মত যত জিনিস রয়েছে এর কোনটা থেকেই আমি তোমাকে মানা করব না। তোমার উসিলায় আমি আজ এ পর্যায়ে সম্মানের সাথে এসে পৌঁছেছি। তুমি আমার সব নিয়ে যাও। আমার এসবই তোমার। এস ভাই, এস আমার সাথে। হ্যাঁ, এখন তো আমি এ কথা আল্লাহ্র কসম খেয়ে বলতে পারি, তুমিই সে! ঠিক মত দাঁড়াও তোমাকে একটু ভাল করে তোমার সেদিনের পরশ বুলিয়ে দেয়া আলো দিয়ে দেখে-নেই, দেখি তো........ হ্যাঁ; তুমিই। এবার আমার শেষ কথা শোন তুমিই সে ব্যক্তি, অতএব সব নিয়ে যাও। এসবই তোমার। তুমি আমার সম্মানিত মেহমান, যতদিন ইচ্ছা নিজের বাড়ি মনে করে বেড়িয়ে যাও। আমি আজ কত সৌভাগ্যবান।
ফেরেশতা বললেন: ভাইরে, তুমি তোমার নিজের জিনিস তোমার নিজেরই কাছে রেখে দাও। আমার কোন জিনিসেরই দরকার নেই। আমি কিছুই চাইনা। আল্লাহ্ আমাকে পাঠিয়েছিলেন পরীক্ষা করার জন্য। শুধু তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়ার ছিল, নিয়েছি। নেয়া আমার হয়েছে। এবার আমার বিদায়ের পালা। আল্লাহ্ তা'আলা তোমার উপর ভীষণ খুশি, তিনি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং ওদের সে দু'জনের উপর খুব নাখোশ অর্থাৎ ভীষণ অসন্তুষ্ট। একবার গিয়ে তোমার স্বচক্ষে দেখে এস এরা আগের মতই অবস্থায় এখন কুঠে আর টেকোর কিচ্ছু নেই।
কথা শেষ করেই ফেরেশতা আর কালবিলম্ব না করে তাঁর গন্তব্য পথে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। ভূতপূর্ব অন্ধ ফেরেশতার গমন পথের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তার নিজের মনেই বলে উঠল-হে আল্লাহ্! তোমার প্রেরিত মানুষটা আমার এখানে এসে একটু খেজুর তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খেয়ে গেল না। তুমি আমার অপরাধ মার্জনা কর। ক্ষমা কর আমার গুনাহ। আমীন আল্লাহুম্মা আমীন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00