📄 সনদ (سند) ও মতন (متن)
হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য সাহাবীগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এগুলোর অন্যতম হলো সূত্র সংরক্ষণ ও সূত্র বর্ননার অপরিহার্যতা।
কেউ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নামে কিছু বললেই তাঁকে সর্বপ্রথম বলতে হতো, তিনি কার নিকট থেকে এই কথাটি সংগ্রহ করেছেন এবং তিনি কার নিকট থেকে তা শুনছেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরাকে সনদ বলা হয়। মুহাদ্দিসঘনের পরিভাষায় হাদীস বলতে দুটি অংশের সমন্বিত রূপকে বুঝায়। প্রথম অংথঃ হাদীসের সূত্র বা সনদ এবং দ্বিতীয় অংশঃ হাদীসের মূল
বক্তব্য বা মতন ¹³¹। সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনায় বলা যায় যে, হাদীসের দু'টি প্রধান অংশঃ একটি সনদ, অপরটি মতন। এ হাদীসে ইমাম বুখারীর উস্তাদ আব্দুল্লাহ ইব্ন্ন ইউসুফ থেকে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু পর্যন্ত অংশকে 'সনদ' বলা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসের অবশিষ্ট অংশকে এক 'মতন' বলা হয়।
হাদীসের মতন ও সনদ একটির সাথে অপরটি ওতপ্রোত জড়িত। সনদ ব্যতীত মতন হয় না, মতন থাকলে অবশ্যই তার সনদ আছে। তবে একটি 'সহীহ' হলে অপরটি 'সহীহ' হওয়া জরুরী নয়। কখনো সনদ সহীহ হয়, কারণ সহির সকল শর্ত তাতে বিদ্যমান, যেমন সনদ মুত্তাসিল, রাবিগণ আদিল ও দ্বাবিত, তবে মতন শায বা 'ইল্লতের কারণে সহী নয়। কখনো মতন সহীহ হয়, তবে রাবির দুর্বলতা বা ইনকিতা' (বর্ণনাপরম্পরা কাটা পড়া) এর কারণে সনদ সহীহ হয় না। সনদ ও মতন উভয় সহি হলে হাদীস সহীহ। এরূপ হাদীস সম্পর্কে আমরা দৃঢ়ভাবে বলবঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। গ্রন্থকারের উস্তাদকে সনদের শুরু এবং সাহাবীকে সনদের শেষ বলা হয়।
টিকাঃ
¹³¹ হাদীসের সনদ: মৌখিক বর্ননা বনাম পান্ডুলিপি নির্ভরতা ডঃ খন্দকার আ. ন. ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইন্টটিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন এন্ড রিসার্স জার্নাল ১ম খন্ড, ১ম সংখ্যা, জুন ২০০৬ সালে প্রকাশিত
📄 রিজাল
হাদীসের রাবী সমষ্টিকে ‘রিজাল’ বলে।
📄 আসমউর রিজাল (الرجال اسماء)
যে শাস্ত্রে রাবীদের জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে তাকে ‘আসমাউর রিজাল’ বলে। আসমাউর রেজাল সম্পর্কে ডঃ স্প্রেনগার তার "লাইফ অব মুহাম্মদ।” গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেনঃ- "দুনিয়ায় এমন কোন জাতি দেখা যায়নি এবং আজও নেই যারা মুসলমানদের ন্যায় ‘আসমাউর রেজালের’ বিরাট তত্ত্ব ভান্ডার আবিষ্কার করেছে। আর এর বদৌলতে আজ পাঁচ লাখ লোকের বিবরণ জানা যেতে পারে।” (হাদীসের পরিচয়, সুহৃদ প্রকাশন)।
📄 আদব বা আদিল
عدل ‘আদল’ শব্দের অর্থ সোজা ও বক্রতাহীন রাস্তা, যেমন বলা হয় طريق عدل ‘সোজা রাস্তা’। পাপ পরিহারকারী ও সুস্থরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি ন্যায় ও সোজা রাস্তার অনুসরণ করে, তাই তাকে ‘আদল’ বা ‘আদিল’ বলা হয়। عادل কর্তাবাচক বিশেষ্য, অর্থ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। হাদীসের পরিভাষায় দীনদারী ও সুস্থরুচিকে عدالة বলা হয়।
প্রখ্যাত আলেমদের সংজ্ঞাঃ
হাফেয ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ ‘আদল’ এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন: ‘আদল’ ব্যক্তির মধ্যে এমন যোগ্যতা, যা তাকে তাকওয়া ও
রুচিবোধ আঁকড়ে থাকতে বাধ্য করে”। [আন-নুযহাহ: (পৃ. ৮৩)]।
মুহাদ্দিসগণের মতে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ কোন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তাই তাদের সর্ব স্বীকৃত মত হচ্ছে- 'সকল সাহাবীই আ'দিল অর্থাৎ সত্যবাদী। সুতরাং, যে যে ব্যক্তি 'তাকওয়া' ও 'মরুওত' অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তাকে আ'দিল বলে অর্থাৎ যিনি -
১/ হাদীস সম্পর্কে মিথ্যাবাদী বলে প্রতিপন্ন হননি,
২/ সাধারণ কাজ কারবার মিথ্যাবাদী বলে কখনো সাব্যস্ত হননি,
৩/ অজ্ঞাতনামা অপরিচিত অর্থাৎ দোষ গুণ বিচারের জন্য যার জীবনী জানা যায় নি এরূপ লোকও নন,
৪/ বে-আমল ফাসিকও নন, অথবা
৫/ বদ-এতেকাদ বিদাআতীও নন তাকে আ'দিল বলে।