📄 কুরআন ও হাদীসের সংঘর্ষ
কেউ কেউ এ কথা বলেন যে, মহান আল্লাহ আল কুরআনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যকার হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাই আমরা কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীস মানি। তবে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক ও কুরআনের অতিরিক্ত কোনো বক্তব্যকে হাদীস বলে মানি না। আর তা হাদীস নামে প্রচলিত থাকলেও মূলত নবীজির হাদীস নয়। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। তাছাড়া কুরআন ও হাদীস উভয়ই মহান আল্লাহর ওহি। আল্লাহ তাআলার মতো মহান বিধায়ক দুই ধরনের ওহিতে পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিতে পারেন না। আর নবীজি কুরআনের অতিরিক্ত বক্তব্যও দিতে পারেন না। কেননা কুরআন পরিপূর্ণ অনন্য এক মহাগ্রন্থ।
এই বক্তব্যটি পরস্পর সাংঘর্ষিক ও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাদের এই বক্তব্য মেনে নিলে তারা যে বলেন, 'আমরা হাদীস মানি, তবে...' তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়। বিষয়টি আমরা কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করছি।
প্রথমত, এ কথা ষোলো আনা যথার্থ যে, বিশুদ্ধ হাদীসের বক্তব্যের সাথে কুরআনের বক্তব্যের কোনো সংঘর্ষ নেই। যা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তা হাদীসে নববি হতে পারে না। কুরআন ও হাদীস উভয়ই একটিমাত্র সোর্স থেকে এসেছে। উভয়ই আল্লাহ প্রেরিত ওহি। মহান আল্লাহ কখনো পরস্পর সাংঘর্ষিক বক্তব্য বান্দার নিকট নাযিল করতে পারেন না।
কিন্তু হাদীসের কোনো বক্তব্যকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে বাদ দিতে হলে প্রথমে কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য যথাযথভাবে বুঝতে হবে।
যেকোনো ব্যক্তির মনে হলো যে, এই হাদীস কুরআনের অমুক আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক, আর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন যে, এই হাদীস জাল, তবে তো তা হবে নিছক পাগলামিকে জ্ঞানশাস্ত্র বলে অভিহিত করা।
আমরা কীভাবে বুঝব যে, কুরআনের কোনো বক্তব্যের সাথে কোনো হাদীসের বক্তব্য সাংঘর্ষিক হচ্ছে? আমরা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনের যে আলোচনার সাথে হাদীসের যে সংঘর্ষ দেখতে পাচ্ছি তা তো এ কারণে হতে পারে যে, আমরা কুরআনের ওই আয়াতটি অথবা ওই হাদীসটির মর্ম ভুল বুঝেছি। অথবা কুরআন-হাদীস উভয়েরই উদ্দিষ্ট অংশের মর্ম ভুল বুঝেছি। আমাদের ওই ভুল বুঝের কারণেই কুরআন-হাদীসের সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংঘর্ষ কুরআন-হাদীসের নয়, আমাদের ভুল বোঝার!
একটি উদাহরণ দেখুন। যে সকল মুমিন কোনো পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত ইত্যাদির মাধ্যমে জান্নাতে আসবে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস রয়েছে। একটি হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
يَخْرُجُ قَوْمٌ مِّنَ النَّارِ بَعْدَ مَا مَسَّهُمْ مِنْهَا سَفْعُ فَيَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ فَيُسَمِّيْهِمْ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَهَنَّمِيِّينَ.
আগুনে ঝলসে যাবার পর একদল লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে। তারপর জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতিরা তাদেরকে ‘জাহান্নামিয়্যীন’ বলে আখ্যায়িত করবে।২৭৩
একদল লোক এ বিষয়ক হাদীসগুলোকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেয়। অথচ তাদের উদ্ধৃত আয়াতগুলোর সাথে হাদীসগুলোর কোনো বিরোধ تو নেই-ই, বরং হাদীসগুলো অন্য একাধিক আয়াতের বিশুদ্ধ নববি ভাষ্য।
সালিহ ইবন আবী তারীফ (রাহ.) আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সূরা হিজরের ২ নং আয়াতের কোনো ব্যাখ্যা শুনেছেন? আবু সাঈদ (রা.) বলেন, হ্যাঁ, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, পর্যাপ্ত শাস্তির পর আল্লাহ অনেক মুমিনকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। আল্লাহ যখন এইসব মুমিনকে মুশরিকদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন তখন মুশরিকরা তাদেরকে বলবে, তোমরা না দুনিয়াতে দাবি করতে যে, তোমরা আল্লাহর বন্ধু! তাহলে এখন আমাদের সাথে জাহান্নামে কেন? আল্লাহ তাদের এ কথা শুনে শাফাআতের অনুমতি দান করবেন। তাদের জন্য শাফাআত করবেন ফেরেশতামণ্ডলী ও নবীগণ (আ.)। তখন তারা আল্লাহর অনুমতিতে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যাবে। এভাবে যখন তাদের বের করা হবে তখন মুশরিকরা বলবে, হায়, আমরা যদি এদের মতো হতাম, তাহলে শাফাআতের উপযুক্ত হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে পারতাম! সূরা হিজরের দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ এ কথাই বলেছেন :
رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمَيْنَ.
“এক সময় কাফিররা আকাঙ্ক্ষা করবে, হায়, তারা যদি মুসলিম হতো!”২৭৪
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পর্বে পাপের কারণে জাহান্নামে যাওয়া মুমিনদের জন্য সুপারিশ করবেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন এবং তাঁর সুপারিশ কবুল করবেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি গোনাহগার মুমিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী যার উপর জাহান্নাম স্থায়ীভাবে নির্ধারিত সে ছাড়া সবাইকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করাব। তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا .
"সত্বর আপনার প্রতিপালক আপনাকে 'প্রশংসিত অবস্থানে' উন্নীত করবেন।”২৭৫
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটিই হচ্ছে মাকামে মাহমূদ বা প্রশংসিত অবস্থান, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের নবীকে দেওয়া হয়েছে, যার কথা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। ২৭৬
ইয়াযীদ ইবন সুহাইব (রাহ.) বলেন, খারেজিদের একটি মত আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। একবার আমরা একটি দলের সাথে বের হই। উদ্দেশ্য ছিল হজ্জ করা। তারপর মানুষের সাথে যোগাযোগ করা। আমরা মদীনা দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা.) একটি খুঁটির পাশে বসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করছেন। তিনি 'জাহান্নামিয়্যীন'দের বিষয়ে হাদীস বলছিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবি, আপনি এ কী কথা বলছেন? অথচ আল্লাহ বলেছেন:
رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ.
“হে আমাদের প্রতিপালক, নিশ্চয় আপনি যাকে জাহান্নামে প্রবেশ করালেন তাকে লাঞ্ছিত করলেন।”২৭৭
অন্য আয়াতে তিনি বলেছেন:
كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا أُعِيدُوا فِيهَا.
"যখনই তারা তা থেকে বের হতে চাইবে তাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”২৭৮
তাহলে আপনারা এসব কী বলেন? জাবির (রা.) বলেন, তুমি কি কুরআন পড়ো? আমি বললাম, জি। তখন তিনি বললেন, (তাহলে তুমি এর আগের অংশ পড়ে দেখো। এসব তো কাফিরদের ব্যাপারে বলা হয়েছে।২৭৯) তুমি কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'মাকামে মাহমূদ' সম্পর্কে শুনেছ, আল কুরআনে মহান আল্লাহ যা তাঁকে দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? বললাম, জি। তিনি বললেন, এই হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই 'মাকামে মাহমূদ', যা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন।...
ইয়াযীদ ইবন সুহাইব (রাহ.) বলেন, এরপর আমরা আমাদের এলাকায় ফিরে এলাম এবং সকলকে বললাম, ধ্বংস হোক তোমাদের, তোমরা কি মনে করো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৃদ্ধ এই সাহাবি তাঁর নামে মিথ্যা বলছে? তারপর একজন ব্যতীত আমরা সকলেই ওই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে ফিরে আসি। ২৮০
উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম, একদল লোক 'জাহান্নামিয়্যীন' বিষয়ক হাদীসগুলোকে যে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সাব্যস্ত করেছিল বাস্তবতা কিছুতেই তেমন নয়। তাদের উদ্ধৃত আয়াতগুলোর সাথে এ সকল হাদীসের কোনো বিরোধ تو নেই-ই, উপরন্তু এ হাদীসগুলো অন্য একাধিক আয়াতের বিশুদ্ধ নববি ভাষ্য।
ইয়া'লা ইবন হাকীম (রাহ.) বলেন, সাহাবি সাঈদ ইবন যুবাইর (রা.) একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন এক ব্যক্তি বলেন:
فِي كِتَابِ اللهِ مَا يُخَالِفُ هَذَا.
আল্লাহর কিতাবে এর বিপরীত বক্তব্য রয়েছে।
তখন সাঈদ ইবন যুবাইর (রা.) বলেন:
أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتُعَرِّضُ فِيْهِ بِكِتَابِ اللَّهِ كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْلَمَ بِكِتَابِ اللهِ تَعَالَى مِنْكَ.
আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বলছি আর তুমি তাতে আল্লাহর কিতাবের সাথে বৈপরীত্যের কথা বলছ? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কিতাবের বিষয়ে তোমার থেকে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। ২৮১
সুতরাং আমাদের উচিত কুরআন-হাদীসের সংঘর্ষ আবিষ্কার না করে নিজের বুঝকে পরখ করা। কেননা কুরআন নাযিল হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর। তিনি কুরআন বুঝতেন পরিপূর্ণরূপে। এবং মানতেনও পরিপূর্ণভাবে। যেমনটি হাদীস শরীফে এসেছে, সা'দ ইবন হিশাম (রাহ.) বলেন, আমি আয়িশা (রা.)-কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখলাক কেমন ছিল? জবাবে তিনি বললেন :
كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ أَمَا تَقْرَأُ الْقُرْآنَ قَوْلَ اللهِ: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ.
তাঁর আখলাক ছিল কুরআন। তুমি কি কুরআন কারীমে মহান আল্লাহর এই বাণী পড়োনি, 'নিশ্চয় আপনি আছেন সুমহান আখলাকের উপর?। '২৮২
উপরন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে করেছেন কুরআন পাকের বাহক, ব্যাখ্যাকার ও নমুনা। সুতরাং তাঁর বুঝকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলতে আমাদের বুক কেঁপে উঠা উচিত।
এ আলোচনার পরও যদি এ কথা বলা হয় যে, আমরা তাঁর বুঝকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বলছি না; বরং হাদীসের কিতাবসমূহে তাঁর নামে সংকলিত যেসব কথা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে তাঁর হাদীস বলেই মানছি না। কেননা আমরাও এ কথা বিশ্বাস করি যে, তাঁর কথা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। সুতরাং সাংঘর্ষিক কথাগুলো হাদীস নয়।
তাদের এ কথা মূলত হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনে এবং মিথ্যা ও ভুল কথা থেকে যাচাই-বাছাই করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে নির্ভেজাল বিশুদ্ধরূপে সংরক্ষণে মুসলিম উম্মাহর কর্মপদ্ধতি ও এক্ষেত্রে তাদের সফলতার বিষয়ে অজ্ঞতার ফল এবং নিজের বুঝকে চূড়ান্তরূপে গ্রহণ করা থেকে উৎসারিত। অর্থাৎ তারা নিজের বুঝকে এমন চূড়ান্ত বিশুদ্ধ ও সঠিকতার মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করেছে যে, তার বিপরীতে তারা চৌদ্দশত বছরের উম্মাহর হাজার হাজার মনীষীর অক্লান্ত পরিশ্রমলব্ধ সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দেবে, কিন্তু নিজের বুঝ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করা ও তা নতুন করে পরখ করে দেখার গরজ বোধ করবে না। এমন আত্মমুগ্ধতার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনো সঠিক পথের দিশা পেতে পারে না। এরা হবে পথহারা, দুনিয়া-আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত। মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالًا . الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا.
"বলুন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না, কর্মের দিক থেকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কারা? যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনেই ব্যর্থ হয়ে গেছে। অথচ নিজেদের ধারণায় তারা খুবই উত্তম কর্ম সম্পাদন করে চলেছে।”২৮৩
মনে রাখতে হবে, মুহাদ্দিস ইমামগণ হাদীস যাচাই-বাছাই ও সত্যাসত্য নিরুপণে কেবল বর্ণনাসূত্রই নিরীক্ষা করেননি, হাদীসের বক্তব্যও নিরীক্ষা করেছেন, তা বাস্তবতা ও কুরআনের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক কি না পরীক্ষা করেছেন। যেগুলো প্রকৃতপক্ষে বিরোধী হয়েছে সেগুলোকে শায, মুনকার, বাতিল, ওয়াহি ইত্যাদি বলে প্রমাণিত হাদীসের কাতার থেকে বের করে দিয়েছেন। এভাবেই যোগ্যতা, সততা, সত্যবাদিতা ও খোদাভীরুতায় প্রবাদতুল্য হাজার হাজার মনীষীর গবেষণার একটা চূড়ান্ত ফলাফল আমাদের সামনে রয়েছে। হাদীসশাস্ত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত এই যে, তা পরিপক্বতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। اقد نضجت واحترقت
উম্মাতের মূলধারার এই জ্ঞান-গবেষণাকে অস্বীকার করে নিজের বুঝমতো চলতে গিয়ে যে ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে তার ব্যাপারে সতর্কতা ও কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى ضَلَالَةٍ وَيَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَدَّ شَدَّ إِلَى النَّارِ.
নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মাতকে ভ্রান্তির উপর একত্র করবেন না। আল্লাহর হাত ঐক্যবদ্ধতার উপর। আর যে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করবে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ২৮৪
টিকাঃ
২৭৩. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬৫৫৯; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১২৩৭৫。
২৭৪. সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৭৪৩২; তাবারানি, আল মু'জামুল আওসাত, হাদীস: ৮১১০। ইবন হিব্বান, আলবানি, শুআইব আরনাউত প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন。
২৭৫. সূরা [১৭] ইসরা', আয়াত: ৭৯。
২৭৬. সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৪৪০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১৩৫৬২。
২৭৭. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ১৯২。
২৭৮. সূরা [৩২] সাজদাহ, আয়াত: ২০। আরো দেখুন: সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২২。
২৭৯. ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১০/৪৮৮。
২৮০. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯১; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদীস: ৩১০。
২৮১. সুনান দারিমি, হাদীস ৬১০। আজুররি, আশ শারীআহ, হাদীস: ৯৯; ইবন বাত্তাহ, আল ইবানাহ, হাদীস: ৮১। হুসাইন দারানি বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ。
২৮২. মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ২৪৬০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৪৬。
২৮৩. সূরা [১৮] কাহাফ, আয়াত: ১০৩-১০৪。
২৮৪. সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২১৬৭; মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৩৯২-৩৯৭। হাদীসটিকে ইমাম হাকিম, জিয়া মাকদিসি, সাখাবি প্রমুখ মুহাদ্দিস প্রমাণিত বলেছেন。
📄 হাদীস মানি, তবে
দ্বিতীয়ত, কুরআন সকল কিছু সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে, এ কথার অর্থ এই নয় যে, কুরআনের বাইরে হাদীসও মানা যাবে না; বরং হাদীস মানতে হবে এ কথাও কুরআন সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে। সুতরাং 'কুরআন সকল কিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা' এ কথার আলোকেই হাদীস মানা আবশ্যক। পাঠক, এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা আপনি কিছুক্ষণ আগে পড়ে এসেছেন। এ কারণে এখানে আমরা এ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না।
তৃতীয়ত, তারা যে দাবি করেন, আমরা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা কুরআনের অতিরিক্ত নয় এ ধরনের হাদীস মান্য করি— এসব হাদীস তারা কোথায় পান? মুহাদ্দিসদের হাদীস সংরক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতিতে যদি তাদের আস্থা না থাকে; বরং যদি তারা মনে করেন, এভাবে মুহাদ্দিসরা সফল হননি, তবে তারা যে সকল হাদীস মান্য করেন তাদের কাছে তার সোর্স কী? তারা তো মুহাদ্দিসদের সংকলিত হাদীসের কিতাব থেকেই তাদের মতে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ হাদীস গ্রহণ করে থাকেন।
ধরুন, ইমাম বুখারি (রাহ.) শুধু সহীহ হাদীস সংকলন করবেন মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে মুহাদ্দিসদের নিকট হাদীস সহীহ হওয়ার যে সকল শর্ত রয়েছে তার আলোকে হাদীস সংকলন করলেন। পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হলেন যে, এক্ষেত্রে ইমাম বুখারি (রাহ.) সফল। কিন্তু এখন যদি কোনো ব্যক্তি সহীহ বুখারির কিছু হাদীস গ্রহণ করেন আর বাকি হাদীসগুলো এ কথা বলে বাতিল করে দেন যে, সেগুলো কুরআনের অতিরিক্ত বা কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, বুখারি (রাহ.) যে শুধু নবীজির হাদীস সংকলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি, তাতে অন্যের কথাও ঢুকে পড়েছে—হয়তো তাঁর অসততার কারণে, না হয় তাঁর অবহেলা বা শর্ত ও প্রচেষ্টার দুর্বলতার কারণে।
এখন তারা এই সহীহ বুখারি থেকে যে হাদীসগুলো গ্রহণ করছেন তা যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই হাদীস তার প্রমাণ কী? তারা তো এ কথা মানছেন যে, ইমাম বুখারির অসততা হোক আর ব্যর্থতা হোক, সহীহ বুখারিতে নবীজির কথার বাইরেও অন্যদের কথা নবীর কথা নামে ঢুকে পড়েছে। হয়তো ইমাম বুখারি নিজেই জালিয়াতি করে অন্যের কথা নবীর নামে চালিয়ে দিয়েছেন, অথবা তাঁর অবহেলা ও শর্তের দুর্বলতার কারণে ঢুকে পড়তে পেরেছে।
তাহলে সহীহ বুখারির যে হাদীসগুলোকে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস হিসাবে গ্রহণ করলেন সেগুলোও যে ইমাম বুখারির জালিয়াতি নয় বা তাঁর শর্তের দুর্বলতার সুযোগে বুখারিতে ঢুকে পড়া অন্যের কথা নয়, তাদের কাছে এর প্রমাণ কী? তাদের কাছে এর প্রমাণ কি শুধু এই যে, এগুলো তাদের বুঝ অনুযায়ী কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ? যারা কুরআনের সাথে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য নবীর নামে হাদীসের কিতাবে ঢুকিয়ে দিতে পারে বা যাদের অসর্তকতার কারণে এ ধরনের বক্তব্য কিতাবে ঢুকে যেতে পারে তাদের অসততা বা অসতর্কতার কারণে কি সংগতিপূর্ণ মিথ্যা ও ভুল বক্তব্য ঢুকে যেতে পারে না? তাছাড়া এমনও তো নয় যে, কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ কথা কেবল নবীজিই বলতে পারেন আর কেউ বলতে পারে না। তাহলে তাদের গৃহীত হাদীসগুলো যে বিশুদ্ধ নবী-বাণী তার বিশ্বাসযোগ্যতা কী?
তারা যদি বলেন, হাদীস না হলেও অসুবিধা নেই। যেহেতু কুরআন-বিরোধী নয়, বরং কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ কথা, সুতরাং এ কথা মানলে তো ইসলাম-বিরোধী কিছু মানা তো হচ্ছে না, নাই-বা হলো হাদীস। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়— আপনাদের হাদীস মানার দাবির যথার্থতা কোথায়?
তাদের এক পণ্ডিত বলেছেন, 'হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে, বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতার মানদণ্ডে নয়'। অর্থাৎ যে কেউ কোনো একটা কথাকে হাদীস বলে দাবি করল, আর পণ্ডিত মহাশয়ের মনে হলো যে, এ কথা কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ, তাহলেই সেটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশুদ্ধ বাণী, সহীহ হাদীস। এ-ই হচ্ছে তাদের কাছে 'কুরআনের মানদণ্ড'। পণ্ডিতির নামে এমন বিশুদ্ধ বিনোদনই তারা বিতরণ করে চলেছেন!
অর্থাৎ তাদের এই মূলনীতি গ্রহণ করলে পুরো হাদীসের ভান্ডারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং তাদের 'হাদীস মানি, তবে...' এই বক্তব্য মূলত হাদীস অস্বীকারেরই রকমফের। আর হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের গৃহীত রীতি-পদ্ধতিই সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক। পাঠক, আপনি যদি এই বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝতে চান তবে যোগ্য শাস্ত্রজ্ঞ উস্তাদের তত্ত্বাবধানে হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়নের আক্ষরিক অর্থেই কোনো বিকল্প নেই।
📄 হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে
হাদীস মানি কুরআনের মানদণ্ডে—এটা হাদীস অস্বীকারকারীদের কৌশলী বক্তব্য। এর অর্থ হচ্ছে, আমি প্রথমে নিজের মতো করে কুরআন বুঝব। তারপর আমার বুঝ মহান আল্লাহর নির্ধারিত ও নির্বাচিত ব্যাখ্যাকার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বুঝ, অর্থাৎ হাদীসের উপর প্রয়োগ করব। যদি আমার বুঝের সাথে হাদীসের বক্তব্য না মেলে তবে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত ধরে মহান আল্লাহর অনুমোদিত বুঝকে বাতিল করে দেব। ভেবে দেখুন তো, এর চেয়ে বড় আত্মপূজা, আল্লাহর অবাধ্যতা, রাসূল-অবমাননা, ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা আর কী হতে পারে? এদের ক্ষেত্রেই কি মহান আল্লাহর এ বাণী প্রযোজ্য নয়:
فَإِنْ لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ.
“তবে তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জেনে রাখুন, তারা নিজ প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে মাত্র। যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত ব্যতীত নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক বিপথগামী আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।”২৮৫
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ .
“আপনি কি ওই ব্যক্তির বিষয়টি খেয়াল করেছেন, যে নিজ প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করেছে? এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞানতই পথহারা করেছেন, তার কর্ণ ও কলবে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং চোখের উপরে পর্দা এঁটে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর পর কে আর তাকে পথ দেখাবে? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?২৮৬
এরা আবার নিজেদের মধ্যেও হাদীস গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে একমত হতে পারেন না। কেউ কোনো হাদীসকে কুরআনের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে গ্রহণ করেন তো অন্যে আবার সেটাকে অসংগতিপূর্ণ বলে বাতিল করে দেন। যেমন ধরুন, সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক হাদীস। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে সালাতের ওয়াক্ত পাঁচটি। কুরআনেও সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। তারা কেউ কেউ সালাতের ওয়াক্ত বিষয়ক হাদীসগুলোকে কুরআনের এ বিষয়ক আলোচনার বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হিসাবে সহীহ হাদীস বলে গ্রহণ করেন। আবার তাদের কারো কারো গবেষণায় কুরআনে দুই বা তিন ওয়াক্ত সালাতের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এদের মতে, কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে এ বিষয়ক সকল হাদীস জাল ও বাতিল।
এদের এ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে আল কুরআন বারবার জানাচ্ছে, পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, উম্মাতকে কুরআন বুঝতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যা তথা হাদীস অনুযায়ী। অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাদের আল্লাহর কালাম আল কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে এবং তাদেরকে সে ব্যাখ্যা নিতে হবে আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে।
হাদীস অস্বীকারকারীরা মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগ সরাসরি সকল হাদীস অস্বীকার করে। আরেক ভাগ দাবি করে, আমরা হাদীস মানি। তবে কুরআনের অতিরিক্ত ও কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক বক্তব্যকে হাদীস হিসাবে মানি না। এরা কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীসের প্রয়োজনীয়তার কথা মুখে স্বীকার করে। আমাদের এখনকার আলোচনা এই দ্বিতীয় দল নিয়ে। তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আপনারা তো কুরআনের ব্যাখ্যায় হাদীসের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন? তবে বলুন তো, কোনো বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির জন্য অন্যের ব্যাখ্যার কেন প্রয়োজন হয়? আংশিক বা পুরো বক্তব্য না বোঝা বা ভুল বুঝের সম্ভাবনার কারণেই তো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়! আপনারা যখন কুরআন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন তখন নিশ্চয় এ কথা স্বীকার করবেন যে, আপনাদের জন্যও না বোঝার বা ভুল বোঝার সম্ভাবনা বিদ্যমান। এখন বলুন, আপনি কুরআন পড়ে যা বুঝলেন তা যখন হাদীসের সাথে মিলল না তখন কী বলবেনড়নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল বুঝেছেন (নাউযু বিল্লাহ), বা হাদীসটাকে জাল বলে বাতিল করে দেবেন, শুধু এ কারণে যে তা আপনার বুঝের সাথে মিলল না, হাদীস সহীহ হওয়া না-হওয়ার নীতিমালার দিকে আর ভ্রুক্ষেপই করবেন না, নাকি নিজের বুঝটাকে পুনর্নিরীক্ষণ করবেন?
যেখানে আপনার বুঝ হাদীসের সাথে মিলে গেল সেখানে তো আপনি সঠিক বুঝলেন আর যেখানে মিলল না সেখানে আপনার বুঝকে চূড়ান্ত সঠিক ধরে হাদীসকে বাতিল করে দিলেন, তবে তো কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে সর্বত্রই আপনি আপনার বুঝকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেন কোথায়? 'হাদীস মানি, তবে বলে যে হাদীস মানার দাবি করেন, সেই হাদীসটা কোথায় মানেন, কীভাবে মানেন?
আমাদের এক বন্ধু রসিকতা করে বলেন, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মতামতের সমতা রক্ষার জন্য তিনি একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তা এই যে, যে ক্ষেত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একমত হন সে ক্ষেত্রে তিনি স্ত্রীর মতকে মেনে নেন। আর যে ক্ষেত্রে তারা স্বামী-স্ত্রী একমত হতে পারেন না সে ক্ষেত্রে তিনি নিজের মতকে প্রাধান্য দেন। তাহলে দুজনের মতই মানা হলো, মূল্যায়ন করা হলো। আসলে ফলাফল কী? সব ক্ষেত্রেই নিজের মতই প্রতিষ্ঠা করা! আপনার হাদীস মানাও কি এমন হচ্ছে না?
কিন্তু সাহাবিগণ (রা.) কী করতেন? আসুন একটি দৃষ্টান্ত দেখি। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدْخُلُواْ بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَّعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ . فَإِن لَّمْ تَجِدُواْ فِيهَآ أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّىٰ يُؤْذَنَ لَكُمْ ۖ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ٱرْجِعُواْ فَٱرْجِعُواْ ۖ هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ.
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজ গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না অনুমতি গ্রহণ করো এবং তার বাসিন্দাদেরকে সালাম প্রদান করো। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। হয়তো তোমরা মেনে চলবে। যদি সেখানে কাউকে না পাও তবুও অনুমতি না মিললে প্রবেশ করবে না। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ফিরে যাও, তবে তোমরা ফিরে যাবে। এটি তোমাদের জন্য পবিত্রতর। আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।”২৮৭
এ আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যের গৃহে প্রবেশের আগে বাইরে থেকে সালাম দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না মিললে প্রবেশ করবে না, ফিরে যেতে বললে ফিরে আসতে হবে।
সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, আবু মূসা আশআরি (রা.) উমার (রা.)-এর ডাকে তাঁর বাসায় যান। দরজায় গিয়ে তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। সম্ভবত উমার (রা.) ব্যস্ত ছিলেন। অনুমতি না পেয়ে আবু মূসা (রা.) যখন ফিরে আসতে উদ্যত হন উমার (রা.) বলেন, কেন ফিরে যাচ্ছেন, কে আপনাকে বাধা দিল? আবু মূসা (রা.) বলেন, আমি তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেছি। কিন্তু অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই ফিরে যাচ্ছি। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
إِذَا اسْتَأْذَنَ أَحَدُكُمْ ثَلَثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ فَلْيَرْجِعْ.
তোমাদের কেউ যখন তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করেও অনুমতি পাবে না, সে তখন ফিরে যাবে।
এ বিষয়ক উল্লেখিত আয়াতে কারীমা উমার (রা.)-এর জানা ছিল, কিন্তু হাদীসটি জানা ছিল না। দেখুন, এ হাদীস আয়াতে উল্লেখিত কুরআনি নির্দেশনাকে বাহ্যত আংশিক পরিবর্তন করে দিচ্ছে। কুরআনে শুধু অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে আর হাদীসে 'তিনবার' অনুমতি চাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কুরআন বলছে, ফিরে যেতে বললে ফিরে যাবে আর হাদীস বলছে, অনুমতি না মিললে ফিরে যেতে না বললেও ফিরে যাবে। সম্ভবত এ কারণেই উমার (রা.)-এর খটকা লাগে। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চান— আবু মূসা (রা.) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ঠিক ঠিক শুনেছেন এবং সঠিক শব্দে বর্ণনা করতে পেরেছেন কি না। তাই তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলেন:
وَمَنْ يَعْلَمُ ذَلِكَ؟ لَئِنْ لَّمْ تَأْتِنِي بِمَنْ يَعْلَمُ ذُلِكَ لَأَفْعَلَنَّ بِكَ كَذَا وَكَذَا.
আপনি ছাড়া এ বিষয়টি আর কে জানে? কোনো সাক্ষী আমার কাছে না আনতে পারলে আপনাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
দেখুন, উমার (রা.) কিন্তু কুরআন-বিরোধী দাবি করে হাদীসকে বাতিল করে দেননি। বরং সত্যই এটা নবীর হাদীস কি না নিশ্চিত হতে চেয়েছেন। পরে যখন আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সাক্ষ্য দিয়েছেন, তিনি নিশ্চিত হতে পেরেছেন যে, এটা সত্যই নবী-বাণী, তিনি কুরআনের ক্ষেত্রে নিজের বুঝকে ভুল হিসাবে পরিত্যাগ করে হাদীসের বক্তব্যকে কুরআনের সঠিক মর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন :
خَفِيَ عَلَيَّ هَذَا مِنْ أَمْرِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلْهَانِي عَنْهُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণিত এই নির্দেশনাটি আমার অজানা রয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা আমাকে অনবহিত রেখেছে। ২৮৮
জি, এভাবেই সাহাবায়ে কিরাম হাদীসের আলোকে কুরআন বুঝতেন। প্রমাণিত হাদীসের বিপরীতে কুরআন সংক্রান্ত নিজের বুঝ পরিত্যাগ করতেন। নিজের বুঝকে ভুল ভেবে ছেড়ে দিতেন এবং হাদীসের ব্যাখ্যাকে সঠিক মর্ম জেনে গ্রহণ করতেন। কুরআন নির্দেশিত সাহরির শেষ সময় বোঝার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, সাহাবিগণ হাদীসের বিপরীতে নিজেদের বুঝ পরিত্যাগ করেছেন।
তবে আমরা যে কিছু বর্ণনা পাই, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর এক সাহাবির বর্ণিত হাদীসের বিপরীতে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে অন্য সাহাবি তার বিরোধিতা করেছেন, এ সংক্রান্ত আলোচনা আমরা ইতঃপূর্বে ‘প্রবীণ সাহাবিদের হাদীস অনুসরণ’ শিরোনামে করেছি। পাঠক, সে অংশ পুনরায় দেখে নিতে পারেন।
প্রমাণিত হাদীস কখনোই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হয় না। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। তিনি কুরআনে এক কথা বলবেন আর তাঁর রাসূলকে ব্যাখ্যায় শিক্ষা দেবেন তার সাথে সাংঘর্ষিক কথা—এটা কখনোই হতে পারে না। এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকেও আল্লাহর শিক্ষা বদলে দেবার কল্পনা করা যায় না। মহান আল্লাহ বলেন :
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللَّهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَلِكِنْ كُوْنُوْا رَبَّانِتِينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُوْنَ.
“এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ কোনো মানুষকে কিতাব, হিকমত এবং নবুওয়াত দান করবেন, তারপর সে মানুষদেরকে বলবে যে, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার বান্দা হয়ে যাও। বরং (সে তো এ কথাই বলবে যে) কিতাবের পঠন-পাঠনের ভিত্তিতে তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও।”২৮৯
সুতরাং কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বক্তব্য হাদীস হতে পারে না। তবে দুটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। যা আমাদের এতক্ষণের আলোচনায় উঠে এসেছে।
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে প্রচুর জাল কথা বানিয়ে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং ২. আপামর সকল পাঠকের জন্য অনেক স্থানে কুরআন যথাযথভাবে বুঝতে না পারার এবং ভুল বোঝার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং কোনো পাঠকের কুরআন বুঝের সাথে যদি হাদীস হিসাবে বর্ণিত কোনো বক্তব্যের অমিল হয় তখন ওই পাঠকের প্রথম কর্তব্য হাদীস হিসাবে বক্তব্যটি প্রমাণিত কি না তা যাচাই করা। অর্থাৎ শাস্ত্রজ্ঞ আলিমের কাছ থেকে জেনে নেওয়া। প্রমাণিত না হলে তো কথাই নেই। আর প্রমাণিত হলে নিজের বুঝকে হাদীসের অনুকূলে পরিশোধন করে নেওয়া। এর অন্যথা করে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত ধরে প্রমাণিত হাদীসকে বাতিল করে দিলে কী পরিণতি হয় তা আমরা 'নববি ভাষ্য ও সাহাবিদের বুঝ প্রত্যাখ্যানের ফল' শিরোনামের আলোচনায় দেখেছি। খারিজি সম্প্রদায়ের ভয়ংকর পরিণতি এবং সমাজের জন্য তাদের ভয়ংকর হয়ে ওঠার কারণ এটিই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমীন!!
মনে রাখতে হবে, কুরআন বোঝা ও অনুধাবন করা এবং কুরআনের শিক্ষা ও বিধান আত্মস্থ করা এ যুগের নতুন বিষয় নয়। কুরআন নাযিলের যুগ থেকেই তা চলে আসছে। সাহাবিগণ শিখেছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে। তারপর প্রজন্ম পরম্পরায় যোগ্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ট্রেডিশনে সর্বযুগে যে হাদীসটি কুরআনের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা হিসাবে গৃহীত ও স্বীকৃত হয়ে এসেছে আজ তাকে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক দাবি করে বাতিল করে দেওয়ার আমি কোন তালেবর? নাকি এভাবে আমি কুরআনের বিশুদ্ধ মর্ম পরিত্যাগ করে প্রবৃত্তি-পূজারিতে পরিণত হচ্ছি! আমার রব যদি মহান আল্লাহ হন তবে কেন আমি তাঁর শেখানো ও তাঁর রাসূলের বাতলানো ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে নিজের বুঝকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করছি? আমি কি তবে প্রবৃত্তির পূজা করছি না? এভাবে আমি যা মানছি তা তো আর কুরআন নয়। কেননা আমি কুরআনের বিশুদ্ধ মর্মকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আর নিজের ভুল বুঝের উপরে আমল করছি। তবে কি আমি কুরআন অস্বীকারকারী নই?
টিকাঃ
২৮৫. সূরা [২৮] কাসাস, আয়াত: ৫০。
২৮৬. সূরা [৪৫] জাসিয়াহ, আয়াত : ২৩。
২৮৭. সূরা [২৪] নূর, আয়াত: ২৭ ও ২৮。
২৮৮. মুআত্তা মালিক, হাদীস: ২০৩০; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ১১০২৯, ১৯৬১১; সহীহ বুখারি, হাদীস: ৭৩৫৩, ৬২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৫৩; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৫১৮০-৫১৮৪; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল: ৬/৫৭৯。
২৮৯. সূরা [৩] আলে ইমরান, আয়াত: ৭৯。
📄 কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ
আমরা জেনে এসেছি, হাদীস ওহি। এ ওহি দুই প্রকার: ১. কুরআনে বর্ণিত বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সম্পূরক বর্ণনা এবং ২. কুরআনের অতিরিক্ত বিষয়-আশয়ের বর্ণনা। যারা এই দ্বিতীয় প্রকারের ওহি অর্থাৎ হাদীসকে অস্বীকার করেন তারা বলেন, কুরআনের অতিরিক্ত শর্তারোপ বৈধ নয়। স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই এ কথা বলেছেন। সুতরাং হাদীস নামে প্রচলিত কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় বিধৃত বর্ণনাগুলো হাদীস নয়। বরং নবীজির নামে জালকৃত বিষয়। আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
مَنِ اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ وَإِنِ اشْتَرَطَ مِائَةَ شَرْطٍ شَرْطُ اللَّهِ أَحَقُّ وَأَوْثَقُ.
যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল, যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে একশত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।
হাদীসটি ইমাম মালিক, আহমাদ ও কুতুবে সিত্তাহর সংকলকগণসহ অনেক মুহাদ্দিস ইমাম সংকলন করেছেন। এ হাদীসে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল কুরআনে ও অন্য হাদীসেও 'আল্লাহর কিতাব' আল্লাহর বিধান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'কুরআন-বহির্ভূত ওহির গুরুত্ব ও মর্যাদা' শিরোনামের আলোচনায় আমরা তা দেখেছি। এ হাদীসে যে 'আল্লাহর কিতাব' শব্দযুগল 'আল্লাহর বিধান' অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে হাদীসের পুরো ঘটনাটি পড়লেই আমরা তা বুঝতে পারব।
বারীরাহ (রা.) তাঁর মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করেন। এ মর্মে তিনি আয়িশা (রা.)-এর সাহায্য চান। আয়িশা (রা.) বলেন, হ্যাঁ, তোমার মনিব রাজি হলে আমি তোমার চুক্তির সমুদয় অর্থ এককালীন দিয়ে তোমাকে মুক্ত করে দিতে পারি। তবে সে ক্ষেত্রে তোমার সম্পদের উত্তরাধিকারী হব আমি। কিন্তু বারীরাহ (রা.)-এর মনিব পক্ষ উত্তরাধিকার ছাড়তে রাজি হন না। সব শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা (রা.)-কে বলেন, মনিব পক্ষ যত ইচ্ছা শর্ত দিক। তুমি তাঁকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দাও আর শুনে রাখো:
إِنَّمَا الْوَلَاءُ لِمَنْ أَعْتَقَ.
'মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর।'
এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, লোকদের কী হলো তারা এমন শর্ত আরোপ করে, যা আল্লাহর বিধানে নেই? যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা আল্লাহর কিতাবে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে। আল্লাহর শর্ত অগ্রগণ্য ও দৃঢ়তর।২৯০
মুক্তদাসের উত্তরাধিকার দাস মুক্তকারীর-এটা হাদীসে বর্ণিত বিধান। বারীরাহ (রা.)-এর মালিক পক্ষের দাবি হাদীসে বর্ণিত এ বিধানের বিরোধী হয়। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতিবাদে বলেন, 'যে ব্যক্তি এমন শর্ত আরোপ করল যা কিতাবুল্লাহ বা আল্লাহর বিধানে নেই তা বাতিল। যদিও সে শত শর্ত আরোপ করে।' সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তো কুরআনের অতিরিক্ত বিষয় সম্বলিত হাদীস কুরআনের অতিরিক্ত শর্ত হিসাবে বাতিল হয়ই না; বরং এ জাতীয় হাদীস আল্লাহরই বিধান এবং মান্য করা আবশ্যক বলে প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
২৯০. মুআত্তা মালিক, হাদীস : ২৭৪৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস : ২৫৭৮৬; সহীহ বুখারি, হাদীস : ২১৬৮, ২৫৬৩,; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫০৪; সুনান আবু দাউদ, হাদীস : ৩৯২৯; সুনান নাসায়ি, হাদীস : ৪৬৫৫; সুনান তিরমিযি, হাদীস: ১২৫৬; সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস : ২৫২১; ইবনুল আসীর, জামিউল উসূল, ১/৫২০।